📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 সমাজবিজ্ঞান

📄 সমাজবিজ্ঞান


সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষাকোষ সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দিয়েছে এভাবে, মানবসমাজের সমকালীন বর্ণনামূলক ও ব্যাখ্যামূলক পাঠ, কালে কালে ও স্থানে স্থানে তা যেমন রূপ লাভ করে তেমনই, যাতে বিকাশ ও উৎকর্ষের সেসব রীতিনীতি জানা যায়, মানবসমাজ তার অগ্রগামিতা ও রূপান্তরশীলতায় যেগুলোর অধীন।(৭০৭)

সমাজবিজ্ঞানীরা তাদের জ্ঞানমণ্ডলকে বা জ্ঞানের বিষয়বস্তুকে সামাজিক ঘটনাবলির সঙ্গে সীমাবদ্ধ করেছেন। মানুষের একতাবদ্ধতা ও সমবেত আচরণ, তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, আদান-প্রদানমূলক সম্পর্ক স্থাপন এবং যৌথ সংস্কৃতি উদ্যাপনের ফলে এসব অনুষঙ্গ সামনে আসে। মানুষ তাদের চিন্তাভাবনা প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও শৈলীর ক্ষেত্রে ঐকমত্য পোষণ করে। একইভাবে তারা নির্দিষ্ট কিছু মূল্যবোধও লালন করে। আর্থিক লেনদেন, কর্তৃত্ব ও শাসন, নীতি-নৈতিকতা ও অন্যান্য বিষয়েও তারা কিছু নির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করে।

সমাজের বাহ্যিক ব্যাপারগুলো দুজন বা একাধিক ব্যক্তির পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদির মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। এসব সম্পর্ক যখন অব্যাহতভাবে চলতে থাকে তখন তা মানুষের মধ্যে সামাজিক যূথবদ্ধতা তৈরি করে এবং সামাজিক দল গঠন করে। এই সামাজিক দলসমূহই সমাজবিজ্ঞানের পঠনপাঠনের মৌলিক বিষয়বস্তু।

আরেকটি বিষয় আছে যা সমাজবিজ্ঞানের পাঠ্য। সামাজিক কার্যকলাপে সে বিষয়টি বাস্তবিক রূপ লাভ করে। যেমন দ্বন্দ্ব-কলহ, সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা, মতৈক্য, স্তরভিত্তিক সন্নিবেশ, সামাজিক আন্দোলন ইত্যাদি। একইভাবে সমাজবিজ্ঞানে পঠনপাঠনের একটি বড় ময়দান হলো সাংস্কৃতিক রূপান্তর ও সমাজ-গঠনে পরিবর্তন। সামাজিক সংগঠন ও সংস্থাও রয়েছে বিভিন্ন রকমের, এগুলো মূলত সামাজিক আচার-আচরণের মার্জিত ও স্বীকৃত পদ্ধতি। ব্যক্তিগত আচরণও তাই, ব্যক্তিই হলো সংস্কৃতি গঠনের শ্রমিক, সে সংস্কৃতিকে যেমন গঠন করে তেমনই সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে নিজেও গঠিত হয়।(৭০৮)

সমাজচিন্তা স্বয়ং মানবজাতির মতো প্রাচীন হলেও মানবসমাজ কোনো জ্ঞানশাখার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে এই তো সেদিন! প্রথম যিনি এই জ্ঞানের অস্তিত্বের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং এর স্বতন্ত্র বিষয়বস্তু নির্ধারণ করেন তিনি হলেন মুসলিম সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন!

তিনি কয়েকটি বাক্যে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে তিনি একটি নতুন জ্ঞান আবিষ্কার করেছেন, যে ব্যাপারে পূর্ববর্তীরা কোনো কথা বলেননি। তিনি বলেন, যেন এটি স্বতন্ত্র জ্ঞান, এর বিষয়বস্তুও স্বতন্ত্র। তা হলো মানবসভ্যতা ও মানবসমাজ। এখানে কিছু সমস্যা ও প্রশ্নের সমাধানও করা হয়, সেগুলো হলো উদ্ভূত প্রাসঙ্গিক বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট পারিপার্শ্বিক অবস্থা। একের পর এক এ ধরনের সমস্যা বা প্রশ্ন আসতেই থাকে। এটাই প্রত্যেক জ্ঞানশাখার বৈশিষ্ট্য, চাই তা মানবরচিত হোক অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক হোক।(৭০৯)

ইবনে খালদুন আরও বলেছেন, জেনে রাখো, এই বিষয়ে কথা বলা একটি নতুন শিল্প, একটি অভিনব প্রবণতা। গবেষণাই এর পথ দেখিয়ে দেবে, নিমগ্নতাই এ পথে পরিচালিত করবে। যেন এই জ্ঞানের শৈশব মাত্র উদ্ঘাটিত হলো। আমার প্রাণের শপথ! মনুষ্যজগতের কেউ এই প্রসঙ্গে কথা বলেছেন বলে আমি জানি না। আমার জানা নেই, এটা (তাদের কথা না বলা) তাদের উদাসীনতার ফল এবং তারা কোনো ধারণাই রাখে না এ ব্যাপারে নাকি সম্ভবত তারা এ বিষয়ে যথেষ্ট পরিমাণই লিখেছেন, কিন্তু তা আমাদের কাছে পৌঁছায়নি।(৭১০)

ইবনে খালদুন তার প্রচেষ্টা ব্যয় করেই ক্ষান্ত থাকেননি, বরং এ ব্যাপারে যে খামতি রয়েছে তা পূরণ করার জন্য শক্তিমানদের আহ্বান জনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের পরে এমন অনেকেই আসবে আল্লাহ যাদেরকে বিশুদ্ধ চিন্তাশক্তি দেবে এবং সুস্পষ্ট জ্ঞান দান করবে, তারা হয়তো এই জ্ঞানের (সমাজবিজ্ঞানের) সমস্যাবলি নিয়ে আমরা যা লিখেছি তার চেয়ে অনেক বেশি লিখবে। কোনো শাস্ত্রের উদ্‌গাতার দায়িত্ব শুধু এতটুকু নয় যে, তিনি ওই শাস্ত্রের সমস্যাবলি নিরূপণ করবেন; বরং ওই শাস্ত্রের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা, তার বিভাগগুলো চিহ্নিত করা এবং সে ব্যাপারে যত বক্তব্য রয়েছে সেগুলোর প্রকারভেদ তৈরি করাও তার দায়িত্ব। তার পরবর্তী লোকেরা নতুন নতুন বিষয় সংযোজন করবে এবং শাস্ত্রটিকে পূর্ণতায় পৌঁছে দেবে।(৭১১) ইবনে খালদুন অবশ্য এর চেয়েও বেশি কিছু করেছেন। তার মুকাদ্দিমায় সামসময়িক সমাজবিদ্যার কমপক্ষে সাতটি শাখা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইবনে খালদুন এগুলো নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যামূলক আলোচনা-পর্যালোচনা করেছেন।(৭১২) কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও, এমনকি বিখ্যাত অস্ট্রীয় (পোলিশ) সমাজবিজ্ঞানী লুডভিগ গম্পলোইকস মন্তব্য করেছেন যে, আমরা প্রমাণ উপস্থিত করতে চাই, অগাস্ট কোঁৎ(৭১৩)-এরও পূর্বে, বরং ইতালীয় রাজনৈতিক-দার্শনিক গিয়ামবাতিস্তা ভিকোরও পূর্বে, যাকে ইতালীয়রা প্রথম ইউরোপীয় সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছে, একজন খোদাভীরু মুসলিমের আবির্ভাব ঘটেছিল। তিনি পরিমিত বিচারবিবেচনার সঙ্গে সামাজিক ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং এ বিষয়ে গভীর মতামত ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি এ বিষয়ে যা লিখেছিলেন সেটাকেই আমরা আজ সমাজবিজ্ঞান নামে আখ্যায়িত করি।(৭১৪) তা সত্ত্বেও সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে ফরাসি অগাস্ট কোঁৎকে এই বিজ্ঞানের আদি প্রবর্তক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতার ব্যাপারে অজ্ঞতা জাহির করা হয়েছে, যিনি এই বিজ্ঞানের উদ্ভাবন ঘটিয়েছেন বলে স্পষ্ট ভাষায় ও সচেতনভাবে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।(৭১৫)

অথচ লেখক-গবেষকেরা সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, অগাস্ট কোঁৎ অধিকাংশ সিদ্ধান্ত ও তত্ত্ব ইবনে খালদুনের মুকাদ্দিমা থেকে গ্রহণ করেছেন!(৭১৬)

ইবনে খালদুন মানবেতিহাস রচনা এবং তৎকর্তৃক সমাজবিজ্ঞানের ভিত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রূপান্তরের বা পরিবর্তনের পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করেছেন। এর ফলে বিশ্বমানবচিন্তা আন্দোলিত হয়েছে। কারণ, তিনি নতুন নকশা প্রণয়ন করেছেন এবং নতুন সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। বরং নতুন নীতি ও আইন নির্দেশ করেছেন, যেগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব এবং প্রত্যেক মানবসমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার সিদ্ধান্ত ও নীতিমালার মূলে এই বিষয়গুলো: মানুষকে অবশ্যই সমাজে বসবাস করতে হয়, সমাজের সঙ্গে বসবাস না করে তার উপায় নেই, সমাজে বসবাস করলে অবশ্যই কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে বসবাস করতে হয় এবং কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে বসবাস করলে অবশ্যই তাকে পৃথিবীর কোনো ভূখণ্ডের ওপর বসবাস করতে হয়। আর যেহেতু এ সকল মানুষ অথবা গোত্রবদ্ধ বা গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ কিংবা এসব মানবসংঘের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক বিদ্যমান, তাই তাদের শৃঙ্খলিত রাখার জন্য শাসক প্রয়োজন। শাসকের বিভিন্ন স্তর বা প্রকারভেদ রয়েছে। গোত্রপ্রধান থেকে শুরু করে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী শাসক। মানবসংঘের বা মানবসমাজ যতগুলো উপায় ও উপাদান প্রস্তুত করে রেখেছে, সংশ্লিষ্ট শাসক তার প্রত্যেকটি কাজে লাগাতে পেরেছেন এবং এগুলো কাজে লাগিয়ে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী শাসক হয়ে উঠেছেন। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী শাসক হওয়ার পর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। শাসক যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন তার ওপর ইবনে খালদুন তার চিন্তা ও তত্ত্ব প্রয়োগ করেছেন, সে রাষ্ট্র বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে এগিয়ে গিয়েছে এবং এসব স্তর বাস্তবিক জীবনে যথার্থরূপে প্রয়োগকৃত বলে পর্যবেক্ষণ করা গেছে।(৭১৭)

এখানে সমাজবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা ইবনে খালদুনের জীবনচরিতের ওপর কিছুটা আলোকপাত করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তার প্রকৃত নাম আবু যায়দ আবদুর রহমান ইবনে খালিদ (খালদুন) আল-হাদরামি। তিনি ৭৩২ হিজরির পহেলা রমযান তিউনিসিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ফেজ (ফাস), গ্রানাডা, তিলমসান (টেলমসেন)(৭১৮), আন্দালুস প্রভৃতি শহর ও দেশ ভ্রমণ করেন। মিশরও ভ্রমণ করেন। মিশরের সুলতান আয-যহির সাইফুদ্দিন বারকুক তাকে সম্মানিত করেন। এখানে ইবনে খালদুন মালিকি আদালতের(৭১৯) বিচারকার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মিশরে তিনি সিকি শতাব্দীরও বেশি সময় (৭৮৪-৮০৮ হি.) অতিবাহিত করেন। এখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং স্থানীয় গোরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুকালে ইবনে খালদুনের বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।(৭২০)

ইবনে খালদুন একটি সম্ভ্রান্ত ও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত পরিবারে বেড়ে উঠেছেন। খুব ছোটবেলাতেই তিনি কুরআন মাজিদ হিফয করেছেন। তার পিতাই ছিলেন তার প্রথম শিক্ষক। তা ছাড়া তিনি তার যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমদের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। তাদের দেশে যে মহামারি হয়েছিল সেই মহামারিতে তার অধিকাংশ শিক্ষকই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাদের মৃত্যুর পর ইবনে খালদুন সরকারি কাজে যুক্ত হন। বনি মারিনের (Marinid Sultanate) রাজদরবারে লেখকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু এই চাকরি তাকে আত্মতৃপ্তি দিতে পারেনি। মাগরিবে আকসা বা মরক্কোর সম্রাট আবু ইনান ফেজ শহরে তার বিদ্বান-পরিষদে ইবনে খালদুনকে সদস্যপদ দেন। ফলে তিনি ফেজের বড় বড় আলেম ও সাহিত্যিকের কাছে পাঠ গ্রহণের সুযোগ পান। এ সকল আলেম ও পণ্ডিত তিউনিসিয়া, আন্দালুস ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে ফেজে সমবেত হয়েছিলেন।

ইবনে খালদুন তার পরিবারকে ফেজে রেখে গ্রানাডায় সফর করেন। সেখান থেকে আলজেরিয়ার ওরানে ফিরে আসেন। এখানে তিনি ও তার পরিবার ইবনে সালামার দুর্গে চার বছর বসবাস করেন। এখানেই তিনি তার সেই বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করতে শুরু করেন যার নাম 'আল-ইবারু দিওয়ানিল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি ফি আইয়ামিল আরাব ওয়াল-আজম ওয়াল-বারবার ওয়া মান আসারাহুম মিন যাবিস সুলতানিল আকবার', এটি তারিখে ইবনে খালদুন নামে বিখ্যাত। এই গ্রন্থের মুকাদ্দিমা বা ভূমিকাই সমাজবিজ্ঞান, মানবসমাজের ঘটনাবলি ও তার রীতিনীতি সম্পর্কে রচিত প্রথম ও সবচেয়ে বিখ্যাত ভূমিকা। এই ভূমিকাতেই তিনি সেসব বিষয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করেন যেগুলোকে এখন 'সামাজিক ঘটনাবলি' বা 'মানবসভ্যতার ঘটনাবলি' বা 'মানবসমাজের অবস্থাবলি' নামে আখ্যায়িত করা হয়।(৭২১)

ইবনে খালদুন এই মুকাদ্দিমায় তার সমস্ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ছড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে তা অতি মূল্যবান বস্তুতে পরিণত হয়েছে। বরং যে সময়ে এই মুকাদ্দিমা রচিত হয়েছে সেই সময়ের তুলনায় তা ছিল অত্যন্ত অগ্রসর। মুকাদ্দিমায় ছয়টি অধ্যায় রয়েছে, তা নিম্নরূপ :

প্রথম অধ্যায় মানবসভ্যতা বা মানবসমাজ: এটি সাধারণ সমাজবিজ্ঞানের অনুরূপ। এই অধ্যায়ে ইবনে খালদুন মানবসমাজের ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন এবং যেসব রীতিনীতি ও আইনকানুনের ওপর সমাজ পরিচালিত হয় সেগুলো বিশ্লেষণ করেছেন।

দ্বিতীয় অধ্যায় বেদুইন সমাজ: এই অধ্যায়ে তিনি বেদুইন সমাজ পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। এই সমাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্যাবলি চিহ্নিত করেছেন। বেদুইন সমাজ নাগরিক সমাজের মূল ভিত্তি এবং তার পূর্ববর্তী স্তর।

তৃতীয় অধ্যায় রাষ্ট্র, খিলাফত ও সাম্রাজ্য: এটি রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের অনুরূপ। ইবনে খালদুন এই অধ্যায়ে শাসনের নীতিমালা, ধর্মীয় সংস্থাসমূহ ও অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন।

চতুর্থ অধ্যায় নাগরিক সমাজ: এটি নাগরিক সমাজবিজ্ঞানের অনুরূপ। এই অধ্যায়ে তিনি নগরসভ্যতার সঙ্গে সম্পৃক্ত যাবতীয় ঘটনা এবং নগর উন্নয়নের নিয়মাবলি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, সভ্য ও সংস্কৃতিমান হওয়াই নগরায়ণের উদ্দেশ্য।

পঞ্চম অধ্যায় শিল্পবাণিজ্য, জীবিকা ও উপার্জন: এটি অর্থনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের অনুরূপ। এই অধ্যায়ে তিনি সমাজের অবস্থাবলির ওপর অর্থনৈতিক ঘটনাবলির প্রভাব পর্যালোচনা করেছেন।

ষষ্ঠ অধ্যায় জ্ঞানবিজ্ঞান ও জ্ঞানার্জন: এটি শিক্ষাসংক্রান্ত সমাজবিজ্ঞানের অনুরূপ। শিক্ষা-সম্বন্ধীয় ঘটনাবলি, শিক্ষাগ্রহণ ও জ্ঞানার্জনের পন্থা ও পদ্ধতি এবং জ্ঞানের শ্রেণিবিভাগ আলোচনা-পর্যালোচনা করেছেন।

ইবনে খালদুন এগুলো ছাড়াও ধর্মীয় সমাজবিজ্ঞান ও আইন-সম্বন্ধীয় সমাজবিজ্ঞানের আলোচনা করেছেন, পাশাপাশি রাজনীতি ও নৈতিকতার মধ্যে জোরালো সম্পর্ক স্থাপন করেছেন।(৭২২)

দৃশ্যমান সত্য এই যে, ইবনে খালদুনের পূর্বে কেউই সামাজিক ঘটনাবলির এমন বিচার-বিশ্লেষণমূলক পরীক্ষানিরীক্ষা করেননি, যাতে ফলাফল ও সিদ্ধান্ত পাওয়া গেছে। ইবনে খালদুনের গবেষণা ও বিচার-বিশ্লেষণে ফলাফল ও সিদ্ধান্ত উভয়টি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এই মুসলিম ফকিহ চিন্তাবিদ বিশুদ্ধ ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে সামাজিক ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা করেছেন, যেভাবে বিজ্ঞানীরা পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, গণিতবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যা-সংক্রান্ত বিষয়াদি পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। এ কারণে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সামাজিক ঘটনাবলিকে একটি বিদ্যায়তনিক গবেষণামূলক পদ্ধতির আওতাভুক্ত করেছেন এবং এর দ্বারা বহু প্রতিষ্ঠিত সত্যে উপনীত হয়েছেন যেগুলো আইনকানুনের সমগোত্রীয়। ইবনে খালদুন এই পদ্ধতির ভিত্তিতেই যেসব তত্ত্ব স্থির করেছেন তা মানবচিন্তার অগ্রযাত্রায় সমাজবিজ্ঞান-সংক্রান্ত গবেষণার ময়দানে পথপ্রদর্শক কর্মরূপে বিদ্যমান।(৭২৩)

টিকাঃ
৭০৭. আহমাদ যাকি বাদাবি, মুজামুল মুসতালাحاتিল ইজতিমাইয়্যা, পৃ. ৫।
৭০৮. মানসুর যাবিদ আল-মাতিরি, আস-সিয়াগাতুল ইসলামিয়্যা লি-ইলমিল ইজতিমা : আদ-দাওয়ায়ি ওয়াল-ইমকান, পৃ. ২৮-২৯।
৭০৯. ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, খ. ১, পৃ. ৩৮।
৭১০. প্রাগুক্ত।
৭১১. ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, খ. ১, পৃ. ৫৮৮।
৭১২. হাসান আস-সাআতি, ইলমুল ইজতিমা আল-খালদুনি, পৃ. ২৮-৩৫।
৭১৩. অগাস্ট কোঁৎ (Auguste Comte): ফরাসি চিন্তাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, প্রত্যক্ষবাদ বা দৃষ্টবাদের প্রবক্তা। ফ্রান্সের মঁপেলিয়ে শহরের এক ক্যাথলিক খ্রিষ্টান পরিবারে ১৭৯৮ সালের ১৯ জানুয়ারি তার জন্ম। ১৮১৪ সালে প্যারিসের একোল পলিতেক্লিক-এ তার শিক্ষাজীবন শুরু। কিন্তু প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতিতে নেতৃত্বদানের জন্য অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে তিনিও এই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৮১৬ সালে বহিষ্কৃত হন। ১৮১৭ সালে ফ্রান্সের সমাজবাদী নেতা স্যাসিম-র একান্ত সচিব নিযুক্ত হন। কিন্তু তার সঙ্গে মতের অমিল হওয়ায় ১৮২৪ সালে পদত্যাগ করেন। এরপর তিনি জনসমক্ষে আধুনিক সমাজভাবনামূলক বক্তৃতাদানের কর্মসূচি গ্রহণ করেন। ১৮২৬ সালে প্রত্যক্ষবাদ বা দৃষ্টবাদের ওপর প্রথম বক্তৃতা দেন। এই সম্পর্কে তার প্রথম গ্রন্থ 'কুর দা ফিলসফি পজিতিভ' (দা কোর্স ইন পজিটিভ ফিলোসফি, ১৮৩০-৪২) ছয় খণ্ডে এবং দ্বিতীয় গ্রন্থ 'সিস্টেম দা পলিটিক পজিতিভ' (সিস্টেম অব পজিটিভ পলিটি, ১৮৫১-৫৪) চার খণ্ডে প্রকাশিত হয়। কোঁৎ-এর মতে ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু ঈশ্বর নয়, মনুষ্যত্ব। মানবপ্রেমের ওপরই তিনি অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। স্বভাবে তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা মানুষ। চরম অর্থকষ্টের মধ্যেও তিনি গবেষণার কাজ চালান। ১৮৫৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন।
৭১৪. ড. মোস্তফা আশ-শাকআহ, আল-উসুসুল ইসলামিয়্যা ফি ফিকরি ইবনি খালদুন ওয়া নাযরিয়‍্যাতিহ, পৃ. ১৯৮ থেকে উদ্ধৃত।
৭১৫. মানসুর যাবিদ আল-মাতিরি, আস-সিয়াগাতুল ইসলামিয়্যা লি-ইলমিল ইজতিমা: আদ-দাওয়ায়ি ওয়াল-ইমকান, পৃ. ২৩-২৪।
৭১৬. আবদুল ওয়াহিদ ওয়াফি, দিরাসাহ মুকাদ্দিমাহ ইবনে খালদুন; আবদুল্লাহ নাসিহ উলওয়ান, মাআলিমুল হাদারাতি ফিল ইসলাম ওয়া আসারুহা ফিন নাহদাতিল উরুব্বিয়া, পৃ. ৪৮ থেকে উদ্ধৃত।
৭১৭. সুহাইলাহ বিনতে যাইনুল আবিদিন, নাযরিয়‍্যাতুদ-দাওলাহ ইনদা ইবনে খালদুন, মাজাল্লাতুলা মানার, সংখ্যা ৭৫, ৭৬, ৭৭, বর্ষ ১৪২৪ হি.।
৭১৮. আলজেরিয়ার একটি শহর।
৭১৯. মালিকি মাযহাব অনুযায়ী পরিচালিত আদালত।
৭২০. যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ৩৩০।
৭২১. যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ৩৩০; ড. মোস্তফা আশ-শাকআহ, আল-উসুসুল ইসলামিয়্যা ফি ফিকরি ইবনি খালদুন ওয়া নাযরিয়‍্যাতিহ, পৃ. ২১ ও পরবর্তী।
৭২২. নুমান আবদুর রাজ্জাক আস-সামাররায়ি, নাহনু ওয়াল-হাদারাহ ওয়াশ-শুহুদ, খ. ১, পৃ. ১২০।
৭২৩. ড. মোস্তফা আশ-শাকআহ, আল-উসুসুল ইসলামিয়্যা ফি ফিকরি ইবনি খালদুন ওয়া নাযরিয়‍্যাতিহ, পৃ. ৭৭-৭৮।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 শরিয়া-সংশ্লিষ্ট জ্ঞান

📄 শরিয়া-সংশ্লিষ্ট জ্ঞান


মুসলিম উম্মাহ তাদের দ্বীনের ব্যাপারে যতটা গুরুত্ব দিয়েছে অন্যকোনো জাতি সেটা করেনি। এভাবে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে অবিমিশ্র ইসলামি জ্ঞানের উদ্ভব ঘটেছে। অন্যকোনো জাতির কাছে এ ধরনের দৃষ্টান্ত নেই। ইসলামি জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলো নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো।

১. উসুলুল হাদিস-সম্পর্কিত জ্ঞান
এই জ্ঞান নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত, সুন্নাহ ইসলামি শরিয়ার উৎসগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় উৎস। প্রথম উৎস আল-কুরআন। সুন্নাহর গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ তা কুরআনের সংক্ষিপ্ত বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং দুর্বোধ্য বিষয়গুলোর বিশ্লেষণ উপস্থিত করেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বক্তব্য, কাজ ও অনুমোদনের দ্বারা কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন এবং ইসলামের প্রয়োগ ও তার আইনকানুন বাস্তবায়নের পন্থা ও পদ্ধতি নির্দেশ করেছেন।

ইলমুল হাদিসের পরিচিতি এরূপ: ইলমুল হাদিস এমন জ্ঞান যার দ্বারা হাদিসের সনদের অবস্থাবলি, অর্থাৎ রাবিদের ধারাক্রম এবং হাদিসের বক্তব্য, অর্থাৎ হাদিসের টেক্সট (মতন) ও বিষয়বস্তু জানা যায়। ইলমুল হাদিসের উদ্দেশ্য হলো সহিহ ও গাইরে সহিহ হাদিসের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা।

সুতরাং ইলমুল হাদিস দুই প্রকারের:

ক. রেওয়ায়েত বা বর্ণনা-সম্পর্কিত ইলমুল হাদিস: নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সম্পৃক্ত যাবতীয় কথা বা কাজ বা অনুমোদন অথবা দৈহিক বৈশিষ্ট্য বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সূক্ষ্ম বর্ণনা ইলমুল হাদিসের এই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত।
খ. দিরায়াত বা উসুল ও নীতি-সম্পর্কিত ইলমুল হাদিস : এখানে সেসব উসুল ও নীতি আলোচনা করা হয় যেগুলো দ্বারা সহিহ হাদিস, হাসান হাদিস ও যয়িফ হাদিস বলতে কী বোঝায় তা জানা যায়, এসব হাদিসের প্রকারসমূহও জানা যায়; রেওয়ায়েতের অর্থ, এর শর্তাবলি ও প্রকারভেদ, রাবির অবস্থা ও শর্তাবলি, জারহ ও তাদিল, রাবিদের ইতিহাস, তাদের জন্ম ও মৃত্যু, নাসিখ, মানসুখ, মুখতালিফুল হাদিস, গরিবুল হাদিস ও অন্যান্য বিষয় জানা যায়। সংক্ষিপ্ত আকারে বলা যায়, রাবি (বর্ণনাকারী) ও বর্ণনাকৃত বিষয়ের অবস্থা অথবা সনদ ও মতনের অবস্থা জানা, যাতে গ্রহণ করা যায় অথবা বর্জন করা যায়। এই জ্ঞানের নামই 'ইলমু উসুলিল হাদিস' (হাদিসের নীতিমালা-সম্পর্কিত জ্ঞান) অথবা ইলমু মুসতালাহিল হাদিস (হাদিসের পরিভাষা-সম্পর্কিত জ্ঞান)।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসকে মিথ্যাচার ও বানোয়াট বক্তব্য থেকে সুরক্ষার জন্য এই জ্ঞানের উদ্ভব ঘটেছে। তা ছাড়া এই জ্ঞানের আলোকে কোনটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সম্পর্কিত করা যায় আর কোনটা করা যায় না তা জানা যায়।

উসুলুল হাদিস-বিষয়ক প্রথম গ্রন্থ-রচয়িতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় রামাহুরমুযিকে ৭২৪)। তিনি যে গ্রন্থ রচনা করেছেন তাতে মুহাদ্দিসগণের বহুসংখ্যক নীতি ও পরিভাষা সংকলন করেছেন। তার গ্রন্থটির নাম দিয়েছেন 'আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল বাইনার রাবি ওয়াল-ওয়ায়ি'। তারপর এ বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন হাকিম নিশাপুরি ৭২৫), তার গ্রন্থের নাম 'মারিফাতু উলুমিল হাদিস'। তিনি তার গ্রন্থে রামাহুরমুযিকেই অনুসরণ করেন। আবু নুআইম আল-ইস্পাহানি ৭২৬) তার গ্রন্থে একই পথ অনুসরণ করেন, তার গ্রন্থের নাম 'আল-মুসতাখরাজ আলা মারিফাতি উলুমিল হাদিস'। তারই পথ ধরে এগিয়ে যান খিতিব বাগদাদি তার রচিত গ্রন্থের নাম 'আল-কিফায়া ফি ইলমির-রিওয়ায়া'। একই পদ্ধতি অনুসরণ করেন কাজি ইয়ায, তার গ্রন্থের নাম 'আল-ইলমা ইলা মারিফাতি উসুলির রিওয়াতি ওয়া তাকয়িদিল আসমা'।

তাদের পর আসেন হাফিজ ইবনে সালাহ। তিনি তার নিজস্ব শৈলী ও পদ্ধতি অবলম্বন করে গ্রন্থ রচনা করেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থের নাম 'উলুমুল হাদিস'(৭২৭)। এই গ্রন্থ পূর্ববর্তী সকল রচনার মার্জিত ও সামগ্রিক রূপ, ফলে তা আলেম-উলামার কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং পরবর্তীকালে রচিত যাবতীয় গ্রন্থের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তীকালে রচিত গ্রন্থাবলি হয়তো এটির সংক্ষিপ্তরূপ অথবা বিশ্লেষিতরূপ বা তার ইঙ্গিতবাহী অথবা বিন্যস্তরূপ। হাফিজ ইবনে সালাহর এই গ্রন্থের পরে উসুলুল হাদিস বিষয়ে স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ একটি পুস্তিকা রচিত হয়, সেটি রচনা করেন ইবনে হাজার আসকালানি(৭২৮)। তিনি পুস্তিকাটির নাম দেন 'নুখবাতুল ফিকার'। এরপর তিনি নিজেই এ গ্রন্থের ব্যাখ্যা রচনা করেন, সেটার নাম দেন 'নুযহাতুন নাযার'। পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে। সেগুলোর নাম উল্লেখ করলে আলোচনা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে।(৭২৯)

যে দৃষ্টিকোণ থেকে হাদিসকে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয় তার প্রেক্ষিতে উলুমুল হাদিস কয়েক প্রকারের হয়ে থাকে। নিচে তার আলোচনা করা হলো।

গঠন-কাঠামোর বিবেচনায় হাদিসকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়:

১. সনদ (যে সকল রাবি হাদিসের মূলকথা ও শব্দসমষ্টি বর্ণনা করেছেন)
২. মতন (সনদের শেষে বর্ণিত হাদিসের মূলপাঠ ও শব্দসমষ্টি)

বক্তা অনুযায়ী হাদিসকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়:

১. মারফু, অর্থাৎ যে কথা বা কাজ বা অনুমোদন বা স্বীকৃতি বা গুণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে।
② মাওকুফ, অর্থাৎ যে হাদিসের সনদ সাহাবি পর্যন্ত পৌঁছেছে।
③ মাকতু, অর্থাৎ যে হাদিসের সনদ তাবিয়ি পর্যন্ত পৌঁছেছে।

আমাদের কাছে পৌঁছার বিবেচনায় হাদিসকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়:

১. হাদিসে মুতাওয়াতির: যে হাদিসের সনদের সকল স্তরে রাবি এত বেশি যে, তাদের একত্র হয়ে মিথ্যা রচনা বা মিথ্যা কথা বলা স্বভাবতই ও যৌক্তিকভাবেও অসম্ভব মনে হয়। অর্থাৎ সনদের প্রত্যেক স্তরে একদল রাবি রয়েছেন। এ ধরনের হাদিস শব্দগত দিক থেকে মুতাওয়াতির অথবা অর্থগত দিক থেকে মুতাওয়াতির।
২. হাদিসে আহাদ বা খবরে ওয়াহিদ: প্রত্যেক এমন হাদিস যাতে মুতাওয়াতির হাদিসের শর্তাবলি পাওয়া যায়নি। এ ধরনের হাদিস তিন প্রকারের হয়ে থাকে: ক. মাশহুর, খ. আযিয, গ. গরিব।

ক. হাদিসে মাশহুর : সনদের প্রত্যেক স্তরে যদি রাবিদের সংখ্যা তিনজন বা তার চেয়ে বেশি থাকে তাহলে তা হাদিসে মাশহুর।
খ. হাদিসে আযিয: যে হাদিসের সনদের প্রত্যেক স্তরে রাবির সংখ্যা দুইজনের কম নয় এবং কোনো কোনো স্তরে দুইজনের বেশি হতে পারে, তা হাদিসে আযিয।
গ. হাদিসে গরিব : যে হাদিসের সনদের প্রত্যেক স্তরে অথবা কোনো একটি স্তরে একজনমাত্র রাবি তাকে হাদিসে গরিব বলে। একে হাদিসে ফারদ (একক ব্যক্তির হাদিস)-ও বলা হয়।

গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানের বিবেচনায় হাদিসকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়:
১. সহিহ হাদিস, ২. হাসান হাদিস, ৩. যয়িফ হাদিস। এদের প্রথম দুই ভাগের প্রত্যেকটি আবার দুই প্রকারের: সহিহ লি-যাতিহি এবং সহিহ লি-গাইরিহি, হাসান লি-যাতিহি এবং হাসান লি-গাইরিহি। তৃতীয় ভাগের অর্থাৎ যয়িফ (দুর্বল) হাদিসের প্রকার অনেক; আছে মুআল্লাক, মুরসাল, মুদাল্লাস, মুরসালখফি, মুনকাতি, মু'দাল; আছে মাওজু, মাতরুক, মাতরুহ; আছে শায, মুনকার, মুদতারাব, মাকলুব, মুদরাজ, মাযিদ, মুসাহহাফ ও মুহাররাফ।(৭৩০)

এই জ্ঞান নিয়ে গৌরব ও অহংকার করা কেবল মুসলিম উম্মাহকেই শোভা পায়, তারাই এর হকদার। এই জ্ঞানশাখার নীতিমালা নিয়ে তারাই সম্মানিত বোধ করতে পারে। উসুলুল হাদিস বিদ্যার উদ্দেশ্য একটিই, তা হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা, কাজ, অনুমোদন ও স্বীকৃতিকে স্পষ্টভাবে, নির্ভেজাল ও সন্দেহাতীতভাবে আমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

১. ইলমুল জারহ ওয়াত-তাদিল (রাবি বা হাদিস-বর্ণনাকারীর দোষ ও গুণ বর্ণনা-সম্পর্কিত বিদ্যা)
এটা স্পষ্টভাবেই জানা বিষয় যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদিস ও সংবাদসমূহ রাবিদের ও বাহকদের সূত্র ছাড়া জানা সম্ভব নয়। তাই শুদ্ধ ও অশুদ্ধ এবং সহিহ ও দুর্বল হাদিস জানার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এ সকল রাবি ও বাহকের অবস্থাবলি অবহিত হওয়া, তাদের স্বভাবচরিত্র অনুসন্ধান করা, তাদের অভিপ্রায় ও উদ্দেশ্য উপলব্ধি করা, তাদের শ্রেণি ও স্তর সম্পর্কে জানা এবং কারা আস্থাভাজন ও কারা দুর্বল তা অবগত হওয়া।

এগুলোই হলো 'ইলমুল জারহ ওয়াত-তাদিল' অথবা 'ইলমুর রিজাল'(৭৩১) অথবা 'ইলমু মিযান আও মিয়ারুর রুয়াত(৭৩২)-এর আলোচ্য বিষয়। পৃথিবীর বুকে অন্যকোনো জাতির কাছে এ ধরনের বিদ্যার দৃষ্টান্ত নেই। এই বিদ্যা-সংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, কতিপয় ভিত্তি ও আইন স্থির করা হয়েছে। ফলে এই বিদ্যা সূক্ষ্ম পরিমাপ ও মানদণ্ডের স্থলাভিষিক্ত হয়, যার ভিত্তিতে রাবিদের অবস্থা যাচাই করা হয়। কে বিশ্বস্ত এবং কে দুর্বল, কার বর্ণিত হাদিস গ্রহণযোগ্য এবং কার বর্ণিত হাদিস প্রত্যাখ্যানযোগ্য তা এই বিদ্যার ভিত্তিতে পরীক্ষানিরীক্ষা করা হয়। এই বিদ্যাকে ইলমুল হাদিস বা হাদিস শাস্ত্রের অর্ধেক বিবেচনা করা হয়। এটি হাদিসের রাবিদের নিক্তি এবং তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানদণ্ড। এই বিদ্যাই মিথ্যাচার ও বানোয়াট কথাবার্তা থেকে সুন্নাহকে সুরক্ষাকারী!

হাদিস-বিশেষজ্ঞগণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসকে সুরক্ষাদানের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। কারণ তারা আশঙ্কা করেছেন যে, হাদিসের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা না হলে এতে মিথ্যা ও কল্পনা এবং বানোয়াট ও জাল জিনিসের অনুপ্রবেশ ঘটবে। নানা কারণেই এটা হতে পারে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য, দলীয় উদ্দেশ্য সাধন, চিন্তাগত লক্ষ্য, মাযহাবি মত ও সিদ্ধান্ত, শ্রোতাদের আকর্ষণ করার জন্য মুখরোচক কাহিনি, শাসকদের তোষামোদ ও চাটুকারিতা অথবা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ইত্যাদি যেকোনো কারণেই তা হতে পারে। আলেমগণ হাদিস সুরক্ষার জন্য বিশেষ পন্থা ও পদ্ধতি অবলম্বন করেন আর তারই পরিচিতি ঘটে ‘ইলমুল জারহ ওয়াত-তাদিল' নামে। হাদিসের সনদসমূহ অর্থাৎ যে-সকল রাবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন তাদের পরম্পরার পাঠও এই জ্ঞানশাখার অন্তর্ভুক্ত। কারণ, সনদই মতন বা হাদিসের ভাষ্য পর্যন্ত পৌঁছে দেয় এবং হাদিসের স্তর নির্ণয় করে। তাই হাদিস-বর্ণনাকারীর সত্যবাদিতা ও মিথ্যাবাদিতা নিরূপণ ছাড়া হাদিসের সত্য-মিথ্যার ব্যাপারে প্রমাণ পেশ করা যায় না। সনদ যদি না থাকত তাহলে যে-কেউ যা-খুশি বলতে পারত। যদি সনদের দাবি অপরিহার্য না হতো এবং হাদিসের সুরক্ষার নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা না থাকত তাহলে ইসলামের মিনার ধসে পড়ত। তা ছাড়া ধর্মত্যাগী ও বিদআতপন্থীরা হাদিস বানানোর মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যেত।(৭৩৩)

পারিভাষিক অর্থে জারহ: জারহ বলতে বোঝায় রাবির দোষ বর্ণনা করা বা দোষ প্রকাশ করা, যে দোষের প্রেক্ষিতে তার রেওয়ায়েত প্রত্যাখ্যাত হয়।

পারিভাষিক অর্থে তাদিল: তাদিল বলতে বোঝায় রাবির গুণ বর্ণনা করা, যে গুণের প্রেক্ষিতে তার রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য হয়।

ইলমুল জারহ ওয়াত-তাদিল-এর পারিভাষিক অর্থ, এটা এমন বিদ্যা বা জ্ঞানশাখা যেখানে নির্দিষ্ট শব্দাবলির দ্বারা রাবিদের দোষ ও গুণ বর্ণনা করা হয় এবং ওই নির্দিষ্ট শব্দাবলির স্তরবিন্যাস আলোচনা করা হয়। রাবিদের দোষ বর্ণনার বৈধতার ভিত্তি হলো কল্যাণকামিতা ও শরিয়তের সুরক্ষা এবং যার থেকে দ্বীনি জ্ঞান গ্রহণ করা হচ্ছে তার অবস্থা তুলে ধরা। এটা দ্বীনেরই অংশ, মানুষের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ানো নয়।(৭৩৪)

রাবিদের দোষ-গুণ বর্ণনা মনের বাসনা পূরণের জন্য নয়, প্রবৃত্তিকে তৃপ্ত করার জন্যও নয়। এ কারণে আপনি দেখবেন যে তারা কারও প্রতি সৌজন্য দেখিয়ে বা ভদ্রতার খাতিরে তার দোষ-ত্রুটি গোপন করেননি, সে যতই নিকটাত্মীয় হোক। তাদের কেউ কেউ নিজের জন্মদাতা পিতাকেও দুর্বল রাবি বলে সাব্যস্ত করেছেন। আলি ইবনুল মাদিনি(৭৩৫)-কে তার পিতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি বললেন, আমাকে নয়, অন্যদেরকে জিজ্ঞেস করো। উপস্থিত লোকেরা বলল, আমরা আপনাকেই জিজ্ঞেস করছি। তখন তিনি মাথা নিচু করে আবার মাথা তুললেন। বললেন, এটাই দ্বীন, আমার বাবা দুর্বল (রাবি)।(৭৩৬) কেউ কেউ নিজের ছেলেকে ও ভাইকেও দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন। যায়দ ইবনে আবি উনাইসাহ(৭৩৭) বলেছেন, আমার ভাই ইয়াহইয়া থেকে তোমরা হাদিস গ্রহণ করো না।(৭৩৮)

তাই এখানে কিছু শর্ত রয়েছে যা জারিহ (দোষ বর্ণনাকারী) ও মুআদ্দিল (গুণ বর্ণনাকারী)-এর মধ্যে পর্যাপ্তরূপে থাকা অপরিহার্য। যেমন: ১. পরিপূর্ণ জ্ঞান, তাকওয়া, পরহেযগারি ও সত্যবাদিতা থাকতে হবে। ২. জারহ ও তাদিলের কারণগুলো জানা থাকতে হবে। ৩. আরবদের বাগুঙ্গি সম্পর্কে পরিপূর্ণ ওয়াকিফহাল হতে হবে। কোনো শব্দকে প্রচলিত অর্থের বাইরে ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা যাবে না। এমন শব্দ বর্ণনা করে দোষ প্রকাশ করা যাবে না যা মূলত দোষ-প্রকাশক নয়।(৭৩৯)

হাদিস-বিশেষজ্ঞগণ কিছু নির্দিষ্ট শব্দকে পরিভাষা হিসেবে স্থির করেছেন, এগুলো দ্বারা তারা রাবিদের দোষ-গুণ প্রকাশ করে থাকেন। যাতে গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানের বিবেচনায় তাদের বর্ণিত হাদিসসমূহের স্তর নির্ণয় করা যায়। শব্দগুলো নিম্নরূপ:

*প্রথমত তাওসিক ও তাদিলের শব্দাবলি (যেসব শব্দের দ্বারা রাবিকে বিশ্বস্ত সাব্যস্ত করা হয় বা গুণ প্রকাশ করা হয়): ১. অধিকতর বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতা-প্রকাশক শব্দাবলি: এমন গুণ প্রকাশে সবচেয়ে স্পষ্ট শব্দ হলো 'আফআল' (আধিক্য-প্রকাশক শব্দরূপ)। যেমন আওসাকুন নাস (সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি) অথবা আসবাতুন নাস (সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি) অথবা ইলাইহিল মুনতাহা ফিত-তাসাব্বুত (নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ব্যক্তি)।
২. বিশ্বস্ততা-প্রকাশক বিশেষণের পুনরুক্তি: এটা শব্দগতও হতে পারে, অর্থগতও হতে পারে। যেমন সিকাহ সিকাহ (বিশ্বস্ত বিশ্বস্ত), সিকাহ হাফিজ (বিশ্বস্ত সংরক্ষক), সিকাহ হুজ্জাহ নির্ভরযোগ্য প্রমাণপেশের উপযুক্ত, সিকাহ মুতকান (বিশ্বস্ত যথাযথ)।
৩. বিশ্বস্ততা-প্রকাশক একটি শব্দের ব্যবহার যেমন সিকাহ, সাবত, ইমাম, হুজ্জাহ একক অর্থে একাধিক শব্দের ব্যবহারও হতে পারে। যেমন আদিল হাফিজ বা আদিল দাবিত।

৪. কারও কারও মন্তব্য: লা বা'সা বিহি বা লাইসা বিহি বা'স তার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই, অথবা সাদুক অধিক সত্যবাদী বা খাইয়ার অধিক ভালো। তবে ইবনে মাইন(৭৪০) যখন 'লাইসা বিহি বা'স' বলে মন্তব্য করবেন, তখন তার ভিন্ন অর্থ দাঁড়াবে। কারণ তিনি বলেছেন, যখন আমি তোমাকে বলব, 'লাইসা বিহি বা'স', তার অর্থ হলো সে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য।
৫. মুহাদ্দিসগণের অন্যান্য মন্তব্য: সত্যবাদিতা তার অবস্থান বা সে সত্যবাদিতার কাছাকাছি (অর্থাৎ সে সত্যবাদিতা থেকে দূরে নয়) বা শাইখ বা হাদিসের কাছাকাছি বা সন্দেহকারী সত্যবাদী বা ভ্রমযুক্ত সত্যবাদী বা ইনশাআল্লাহ সত্যবাদী বা আশা করি তার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই বা তার মধ্যে কোনো সমস্যা আছে বলে আমার জানা নেই বা সৎ বা হাদিসের ক্ষেত্রে সৎ।

// উপর্যুক্ত পাঁচটি স্তরের হুকুম : যে রাবির ক্ষেত্রে প্রথম তিন স্তরের কোনো শব্দ বলা হবে তার বর্ণিত হাদিস সহিহ এবং একটি অপরটি থেকে অধিকতর বিশুদ্ধ। চতুর্থ স্তরের শব্দ যাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে তাদের বর্ণিত হাদিস হাসান। আর পঞ্চম স্তরে যারা রয়েছেন, অর্থাৎ যাদেরকে এসব শব্দের দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের হাদিস গ্রহণ করা যাবে না। তবে বিবেচনার জন্য তাদের হাদিস লেখা যেতে পারে। অন্য রাবিগণ তাদের সমর্থক হলে তাদের হাদিস গ্রহণযোগ্য হবে, অন্যথায় প্রত্যাখ্যাত হবে।

দ্বিতীয়ত দোষ-প্রকাশক শব্দাবলি: ১. যেসব শব্দ অধিকতর দোষ প্রকাশ করে সেগুলোর দ্বারা কাউকে চিহ্নিত করা : এমন দোষ প্রকাশে সবচেয়ে স্পষ্ট শব্দ হলো 'আফআল' (আধিক্য-প্রকাশক শব্দরূপ)। যেমন মুহাদ্দিসগণের মন্তব্য, আকযাবুন নাস (সবচেয়ে মিথ্যাবাদী লোক) বা ইলাইহিল মুনতাহা ফিল-কিত্ব (মিথ্যাবাদিতায় চরম পর্যায়ের ব্যক্তি) বা হুয়া রুকুনুল কিম্ব (সে মিথ্যাবাদিতার খুঁটি)।

২. দোষ প্রকাশে যা বলা হয় : সে জাল হাদিসের কারিগর বা সে অতিশয় মিথ্যাবাদী বা সে হাদিস বানায় বা সে হাদিস উদ্ভাবন করে বা সে কিছুই না (এটি ইমাম শাফিয়ির মন্তব্য)।
৩. দোষ প্রকাশে যা বলা হয় : সে মিথ্যায় অভিযুক্ত বা সে জাল হাদিস বানানোর জন্য অভিযুক্ত বা সে হাদিস চুরি করে বা সে বর্জিত বা সে ধ্বংসকারী বা তার হাদিস ছুটে যায় বা তার হাদিস পরিত্যাজ্য বা মুহাদ্দিসগণ তাকে পরিত্যাগ করেছেন বা তার মধ্যে সমস্যা রয়েছে বা মুহাদ্দিসগণ তার ব্যাপারে চুপ রয়েছে (শেষের দুটি মন্তব্য ইমাম বুখারির) বা সে বিশ্বস্ত নয়।
৪. দোষ প্রকাশে মন্তব্য : তোমরা তার হাদিস প্রত্যাখ্যান করো বা সে অত্যন্ত দুর্বল বা সে একেবারেই ভিত্তিহীন বা সে বিনষ্টকারী বা তার থেকে রেওয়ায়েত বৈধ নয় বা 'লা শাইয়া' (সে কিছু নয়) বা লাইসা বি-শাইয়িন (সে কিছু নয়; এটি ইমাম শাফিয়ি ছাড়া অন্যদের মন্তব্য) বা মুনকারুল হাদিস (তার হাদিস অস্বীকৃত; ইমাম বুখারির মন্তব্য এটি)।
৫. দোষ প্রকাশে মন্তব্য : সে দুর্বল বা মুহাদ্দিসগণ তাকে দুর্বল আখ্যায়িত করেছেন বা তার হাদিস অস্বীকৃত (ইমাম বুখারি ছাড়া অন্যদের মন্তব্য) বা তার হাদিস বিশৃঙ্খল বা তার হাদিস দলিলযোগ্য নয় বা সে ভিত্তিহীন।
৬. দোষ প্রকাশে মন্তব্য : তার ব্যাপারে কথা রয়েছে বা তার মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে বা সে তেমনটা নয় বা সে শক্তিশালী নয় বা সে অভিজ্ঞ নয় বা সে দৃঢ়চিত্ত নয় বা তার স্মৃতিশক্তি দুর্বল বা সে তরলচিত্ত বা তুমি তার হাদিস জানো এবং অস্বীকার করো বা সে সংরক্ষক নয়।

উপর্যুক্ত ছয়টি স্তরের হুকুম : প্রথম চারটি স্তরের ক্ষেত্রে হুকুম এই যে, তাদের কারও দ্বারা প্রমাণ পেশ করা যাবে না এবং তাদের বর্ণিত হাদিস দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের হাদিস কোনোভাবেই বিবেচ্য নয়। তাদের প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের রাবিদের হাদিস জাল ও বানোয়াট, তৃতীয় স্তরের রাবিদের হাদিস পরিত্যাজ্য এবং চতুর্থ স্তরের রাবিদের হাদিস অতিশয় দুর্বল। পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্তরের রাবিদের হাদিস বিবেচনার জন্য লেখা যাবে এবং তাদের বর্ণিত কোনো হাদিসের একাধিক সূত্র পাওয়া গেলে তা সর্বোচ্চ হাসান স্তরে উন্নীত হবে।(৭৪১)

হাদিস-বিশেষজ্ঞগণ তাদের রাবি-সংক্রান্ত গবেষণার ফলাফল জারহ ওয়াত-তাদিল-সংশ্লিষ্ট গ্রন্থাবলিতে সংকলন করেছেন। 'আদ-দুআফা' নাম বহনকারী কিতাবসমূহে তারা দুর্বল রাবিদের স্থান দিয়েছেন। যেমন: ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি কর্তৃক রচিত কিতাব 'আদ-দুআফাউল কাবির' ও 'আد-দুআফাউস সাগির', ইমাম নাসায়ি(৭৪২) কর্তৃক রচিত কিতাব 'আদ-দুআফা ওয়াল-মাতরুকিন'। অন্যদিকে 'আস-সিকাত' নাম বহনকারী কিতাবগুলোতে তারা বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য রাবিদের স্থান দিয়েছেন। যেমন ইবনে হিব্বান কর্তৃক রচিত কিতাব 'আস-সিকাত'। কিছু কিছু কিতাবে দুর্বল ও নির্ভরযোগ্য উভয় শ্রেণির রাবিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের বিখ্যাত দুটি কিতাব: ইবনে সাদ কর্তৃক রচিত 'আত-তাবাকাতুল কুবরা' এবং হাফিয ইবনে কাসির কর্তৃক রচিত 'আত-তাকমিল ফিল-জারহি ওয়াত-তাদিল ওয়া মারিফাতিস সিকাত ওয়ায-যুআফায়ি ওয়াল-মাজাহিল'।(৭৪৩)

পবিত্র নববি সুন্নাহকে বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য করা এবং নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসকে সুরক্ষাদানের জন্য মুসলিম জ্ঞানী-মনীষীগণ যে উদ্যোগ গ্রহণ ও প্রচেষ্টা ব্যয় করেছেন উপরিউক্ত আলোচনা থেকে তা স্পষ্ট হয়। তারা সুন্নাহর বিশুদ্ধতা সংরক্ষণে দৃঢ়তা ও নিশ্চয়তার যত পথ আছে তার সবগুলো অবলম্বন করেছেন। এভাবে তারা এই জ্ঞানের (ইলমুল জাহি ওয়াত-তাদিল) উদ্ভব ঘটিয়েছেন এবং একে শীর্ষস্থানে পৌঁছে দিয়েছেন। এটি একমাত্র মুসলিম উম্মাহরই বৈশিষ্ট্য। মানবেতিহাসের প্রাচীন পর্বে এর কোনো দৃষ্টান্ত নেই, আধুনিক পর্বেও নেই।

হাদিসের সিহাহ সিত্তাহ (ছয়টি বিশুদ্ধ গ্রন্থ) এবং অন্যান্য সহিহ হাদিসগ্রন্থ, যেগুলোর শীর্ষস্থানে রয়েছে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম ইতিহাসে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য গ্রন্থ।

৩. ইলমু উসুলিল ফিকহ (ফিকহের মূলনীতি-সংক্রান্ত বিদ্যা)
ইসলামি সভ্যতার কীর্তিগুলো গণনা করতে গেলে অবশ্যই 'ইলমু উসুলিল ফিকহ'-এর কথা জোর দিয়ে উল্লেখ করতে হবে। এই বিদ্যা একমাত্র মুসলিম উম্মাহরই অর্জন, পূর্ববর্তী কোনো জাতির এই অর্জন নেই, পরবর্তী কোনো জাতিরও নেই। মুসলিম উম্মাহ ছাড়া অন্যকোনো জাতির 'ইলমু উসুলিল ফিকহ'-এর মতো স্বতন্ত্র বিদ্যা বা জ্ঞান নেই, এই বিদ্যা পূর্ণাঙ্গতায় ও সূক্ষ্মতায় অনন্য, এর দ্বারা মুসলিম উম্মাহ তার যাবতীয় নিয়মনীতি ও আইনকানুনকে সংরক্ষণ করতে পেরেছে!

এই জ্ঞান-যেমনটি ইবনে খালদুন ইঙ্গিত করেছেন-মুসলিম জাতির মধ্যে নব-উদ্ভাবিত জ্ঞানগুলোর অন্যতম। এটি উলুমে শারইয়্যাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অংশ বলে বিবেচিত হয়। এই জ্ঞানের মর্যাদা অনেক এবং এর উপকারিতা অপরিসীম। 'ইলমু উসুলিল ফিকহ' বলতে বোঝায় শরিয়ার দলিল-প্রমাণ যাচাই-বাছাই করা, এই দৃষ্টিকোণ থেকে যে, এগুলো থেকে (শরয়ি) হুকুম-আহকাম গ্রহণ করা হয়।(৭৪৪) অন্য কথায়, নীতিমালা ও দলিলসমূহ জানা, যার দ্বারা শরয়ি বিধিবিধানে উপনীত হওয়া যায়।

এই মহৎ জ্ঞানশাখা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হলো ইসলামের খেদমত এবং মানুষের ঐচ্ছিক আচার-আচরণ ও কর্মকাণ্ড-সংক্রান্ত ইসলামের সুদৃঢ় হুকুম-আহকামের খেদমত।

উসুলে ফিকহ-সংক্রান্ত বিদ্যার উদ্ভব কীভাবে হলো? তার জবাব এই, কতিপয় ফকিহ ফিকহি বিধান স্থিরীকরণ অথবা সেগুলোর উদ্‌ঘাটনে কিছু মূলনীতি ও পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতেন। এই ক্ষেত্রে অন্যরা তাদের সঙ্গে মতবিরোধ করতেন। ফলে তর্কবিতর্ক ও ঝগড়ার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ফলে যা সহিহ ও বিশুদ্ধ তার শুদ্ধতা নিরূপণের জন্য এবং একই বিষয়ের একাধিক বিধানের মধ্যে কোনটি প্রাধান্য পাবে তা নিশ্চিত করার জন্য শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য দলিল-প্রমাণ উপস্থিত করার প্রয়োজন পড়ে। যদিও ফকিহগণের দৃষ্টিকোণ ও চিন্তাধারার মধ্যে পার্থক্য ছিল। এ বিষয়ে প্রথমে পুস্তিকা আকারে রচনাবলি প্রকাশিত হতে শুরু করল, এগুলোতে মৌলিক নীতিমালার আলোচনা থাকত। অর্থাৎ, কোন নীতির ওপর নির্ভর করা আবশ্যক, কোন নীতির ওপর নির্ভর করা জায়েয এবং কোন নীতির ওপর নির্ভর করা জায়েয নেই ইত্যাদি।(৭৪৫)

যাকে ইলমু উসুলিল ফিকহ বিষয়ে প্রথম কিতাব রচনাকারী বিবেচনা করা হয় তিনি হলেন ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে ইদরিস আশ-শাফিয়ি বা ইমাম শাফিয়ি। এ বিষয়ে তিনি তার কয়েকটি বিখ্যাত কিতাব রচনা ও সংকলন করেন। যেমন: আর-রিসালাহ, জাম্মাউল ইলম, ইবতালুল ইসতিহসান ও ইখলিতাফুল হাদিস। তার হাতেই এই জ্ঞানের উন্মেষ ও বিকাশ ঘটে।

ইবনে খালদুন বলেন, এই বিষয়ে যিনি প্রথম কলম ধরেছেন, তিনি হলেন ইমাম শাফিয়ি রহ. (মৃ. ২০৪ হি.)। এ বিষয়ে তার বিখ্যাত পুস্তিকাটি রচনা করেছেন। তাতে আলোচনা করেছেন শরিয়তের আদেশ ও নিষেধ এবং হাদিস ও নাসেখ-মানসুখ নিয়ে এবং কিয়াসের দ্বারা নির্ধারিত ইল্লতের হুকুম নিয়ে। তারপর এ বিষয়ে হানাফি ফকিহগণ কিতাব রচনা করেছেন এবং ওইসব নীতিমালাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তারা এসব বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন...। এসব নীতিমালা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে হানাফি ফকিহদের অবদান অনেক। কারণ তারা ফিকহি পয়েন্টগুলোর ওপর মনোযোগ দিয়েছেন এবং এসব নিয়মকানুন যথাসম্ভব ফিকহি মাসায়িল থেকে সংগ্রহ করেছেন। হানাফি ইমামগণের মধ্যে অন্যতম হলেন আবু যায়দ আদ-দাবুসি(৭৪৬), তিনি কিয়াস নিয়ে অন্য সবার চেয়ে বিস্তৃত গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি এতে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং কিয়াসের জন্য যেসব শর্ত প্রয়োজন তা বিশ্লেষণ করেছেন। কিয়াসের পূর্ণাঙ্গতার ফলে উসুলে ফিকহের কাঠামোও পূর্ণতা লাভ করে। ফিকহি মাসায়িলগুলো মার্জিতরূপ ধারণ করে এবং ফিকহের নীতিমালাও সুবিন্যস্ত হয়। মানুষ উসুলে ফিকহের ব্যাপারে মুতাকাল্লিমদের (ধর্মতাত্ত্বিকদের) অবলম্বিত পন্থায় আকৃষ্ট হয়। মুতাকাল্লিমগণ এ বিষয়ে যত গ্রন্থ রচনা করেছেন তার মধ্যে উৎকৃষ্ট কয়েকটি নিম্নরূপ:

১. ইমামুল হারামাইন আল-জুওয়াইনি কর্তৃক রচিত 'আল-বুরহান'।
২. ইমাম গাযালি (মৃ. ৫০৫ হি.) কর্তৃক রচিত 'আল-মুসতাসফা'। এই দুইজন হলেন আশআরি ঘরানার ইমাম।
৩. কাজি আবদুল জাব্বার(৭৪৭) কর্তৃক রচিত 'আল-আহদ'।
৪. আবুল হুসাইন আল-বসরি(৭৪৮) কর্তৃক রচিত 'আল-আহদ'-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'আল-মুতামাদ ফি উসুলিল ফিকহ'। এই দুইজন মুতাযিলা সম্প্রদায়ের ইমাম।

এই চারটি গ্রন্থ এই শাস্ত্রের ভিত্তি এবং স্তম্ভ। পরবর্তীকালের মুতাকাল্লিমদের দুইজন মনীষী এই গ্রন্থ চারটির সংক্ষিপ্তরূপ রচনা করেন। তারা হলেন ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি (মৃ. ৬০৬ হি.), তার রচিত সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ 'আল-মাহসুল' এবং সাইফুদ্দিন আল-আমিদি(৭৪৯), তার রচিত সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ 'আল-ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম'।(৭৫০)

ইসলামি শরিয়ার উৎস থেকে মানুষের ঐচ্ছিক কর্মকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট হুকুম ও বিধান উদ্‌ঘাটনের জন্য নিবেদিত ফকিহগণের অবলম্বিত পদ্ধতিকে শৃঙ্খলিত ও সুবিন্যস্ত করার জন্য প্রত্যেক ফিকহি মাযহাবেরই জ্ঞানী-মনীষীগণ মৌলিক নীতিমালা প্রণয়নের চেষ্টা করেছেন। উদ্দেশ্য এই যে, যে-সকল মুজতাহিদ (মূল বিধানের) শাখাগত বিধান উদ্‌ঘাটনের প্রচেষ্টারত তাদের কর্ম যেন অর্থহীন না হয়। কারণ, তাদের কর্ম সুসম্পাদিত নীতিমালার আওতায় না হলে তা অর্থহীনই হবে। মনীষীদের প্রচেষ্টা ও আত্মনিবেদনের ফলে যে জ্ঞানের উদ্ভব ঘটে তার উদ্দেশ্য হলো দূরদৃষ্টি ও যৌক্তিক বিচার, মৌলিক নীতিমালার সুসম্পাদন, শাখাগত বিধান উদ্‌ঘাটনকারীর জন্য যে পদ্ধতি অবলম্বন আবশ্যক তার বর্ণনা; সেই জ্ঞান হলো 'ইলমু উসুলিল ফিকহ'। পূর্ববর্তী কোনো জাতির কাছে এই ধরনের জ্ঞানের দৃষ্টান্ত নেই!(৭৫১)

মানুষের মতামত, তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও তাদের কল্যাণের ওপর নির্ভরশীল নীতিমালার প্রণেতা যারা তারাও মুসলিমদের উসুলে ফিকহ শাস্ত্রের মর্যাদা ও মহিমা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু তাই নয়, শব্দের ব্যাখ্যায় উসুলে ফিকহে কতিপয় নীতি, কিয়াস ও জনকল্যাণ-সংক্রান্ত কতিপয় ফিহকি বিধান এবং পাঁচটি সামগ্রিক জিনিসের প্রতি গুরুত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে ফিকহি আইনকানুন থেকে তারা উপকারও লাভ করেছেন। এই পাঁচটি সামগ্রিক জিনিসের সুরক্ষাদান ইসলামি শরিয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য বলে বিবেচিত। তা হলো : দ্বীন, প্রাণ, বুদ্ধি, বংশ ও সম্পদ। যা-কিছু এই পাঁচটিকে বা এই পাঁচটির কোনোটিকে সুরক্ষা দান করে তা-ই কল্যাণ। যা-কিছু এগুলোর কোনো একটিকে বিঘ্নিত করে তা- ই অকল্যাণ। এগুলোর সুরক্ষাদান ও হেফাজতের বিভিন্ন স্তর ও ধাপ রয়েছে। একটি হলো জরুরি পর্যায়ের স্তর, এটি সর্বোচ্চ স্তর। এই স্তরের বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো প্রয়োজনীয় পর্যায়ের স্তর, এটি মধ্যম স্তর। এই স্তরেরও কয়েকটি ধাপ রয়েছে। এরপর আছে ভালো (হলে ভালো) পর্যায়ের স্তর, এটি সর্বনিম্ন স্তর। এই স্তরেরও আছে কয়েকটি ধাপ।(৭৫২)

'ইলমু উসুলিল ফিকহ' বা উসুলে ফিকহ শাস্ত্র একটি ইসলামি উদ্ভাবন এবং মানবসভ্যতার এক বিরাট ঘটনা!

টিকাঃ
৭২৪. রামাহুরমুযি: আবু মুহাম্মাদ হাসান ইবনে আবদুর রহমান ইবনে খাল্লাদ (মৃ. ৩৬০ হি./৯৭১ খ্রি.)। যুগশ্রেষ্ঠ অনারব মুহাদ্দিস। সাহিত্যিক ও কাজি। কবিতা বিষয়েও প্রবন্ধ রচনা করেছেন। 'আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল বাইনার রাবি ওয়াল-ওয়ায়ি' তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১২, পৃ. ৪২।
৭২৫. হাকিম নিশাপুরি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হামদওয়াইহ আল-হাকিম আন-নিশাপুরি (৩২১-৪০৫ হি./৯৩৩-১০১৪ খ্রি.)। বিশিষ্ট হাফিযে হাদিস এবং হাদিসবিজ্ঞান- বিষয়ক বহু গ্রন্থের রচয়িতা। ইরানের নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আয়ান, খ. ৪, পৃ. ২৮০-২৮২।
৭২৬. আবু নুআইম আল-ইস্পাহানি: আহমাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আহমাদ আল-ইস্পাহানি (৩৩৬-৪৩০ হি./৯৪৮-১০৩৮ খ্রি.)। হাফিযে হাদিস, ইতিহাসবিদ। হাদিস সংরক্ষণ ও বর্ণনায় নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্ব। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'হিলয়াতুল আওলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া', 'দালাইলুন নুবুওয়া', 'তারিখু ইস্পাহান', 'মুজামুস সাহাবাহ'। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ২, পৃ. ২৪৫।
৭২৭. এই গ্রন্থের আরও দুটি নাম আছে: ১. মুকাদ্দিমা ইবনে আস-সালাহ, এ নামেই এটি সমধিক পরিচিত। ২. মারিফাতু আনওয়ায়ি উলুমিল হাদিস।
৭২৮. ইবনে হাজার আসকালানি: আবুল ফজল আহমাদ ইবনে আলি ইবনে মুহাম্মাদ আল-কিনানি (৭৭৩-৮৫২ হি./১৩৭২-১৪৪৯ খ্রি.)। জ্ঞান ও ইতিহাসের জগতে একজন ইমাম। তিনি ফিলিস্তিনের (বর্তমান ইসরাইলের) আসকালান শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং কায়রোতে মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'ফাতহুল বারি'। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৭, পৃ. ২৭০-২৭৩।
৭২৯. মাহমুদ আত-তাহহান, তাইসিরু মুসতালাহিল হাদিস, পৃ. ১২-১৫।
৭৩০. বিস্তারিত জানতে আগ্রহী হলে দেখুন, হাদিস বিজ্ঞান, শামীম আরা চৌধুরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ ২০০১।-অনুবাদক
৭৩১. রিজালশাস্ত্র বা রাবিদের নাম-পরিচয়-সম্পর্কিত বিদ্যা।-অনুবাদক
৭৩২. রাবিদের মানদণ্ড-সম্পর্কিত বিদ্যা।-অনুবাদক
৭৩৩. ড. মুহাম্মাদ দাইফুল্লাহ আল-বিতাইনাহ, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৩২২।
৭৩৪. আশ-শারিফ হাতিম ইবনে আরিফ আল-আওনি, খুলাসাতুত তাসিল লি-ইলমিল জারহ ওয়াত-তাদিল, পৃ. ৬।
৭৩৫. আলি ইবনুল মাদিনি, আবুল হাসান আলি ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে জাফর আস-সাদি (১৬১-২৩৪ হি./৭৭৭-৮৪৯ খ্রি.)। মুহাদ্দিস, ইতিহাসবিদ। তার যুগের শ্রেষ্ঠ হাফিযে হাদিস ছিলেন। রিজালশাস্ত্রের ইমাম। তার শিষ্যদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারি, আহমাদ ইবনে হাম্বল, আবু দাউদ, আবু হাতিম আর-রাযি, আবু ইয়ালা আল-মুসিলি প্রমুখ। তার রচিত প্রায় দুইশটি গ্রন্থ রয়েছে। বসরায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন সামাত্রায়। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : الأسامي والكنى ( আট খণ্ড), الطبقات ( দশ খণ্ড), قبائل العرب ( দশ খণ্ড), التاريخ (দশ খণ্ড), اختلاف الحديث (পাঁচ খণ্ড) مذاهب المحدثين (দুই খণ্ড)। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ২, পৃ. ৮১।
৭৩৬. ইবনে হিব্বান, আল-মাজরুহিন, খ. ২, পৃ. ১৫।
৭৩৭. যায়দ ইবনে আবি উনাইসাহ: আবু উসামা যায়দ ইবনে আবি উনাইসাহ আল-জাযারি আর-রুহাবি (মৃ. ১২৪ হি.)। ইমাম, হাফিয, নির্ভরযোগ্য রাবি। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিক তার থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৬, পৃ. ৮৮।
৭৩৮. সাখাবি, ফাতহুল মুগিস, খ. ৩, পৃ. ৩৫৫।
৭৩৯. আশ-শারিফ হাতেম ইবনে আরিফ আল-আওনি, আত-তাসিল লি-ইলমিল জারহি ওয়াত-তাদিল: ২৭; আবুল হাসানাত আল-লাকনাবি আল-হিনদি, আর-রাফউ ওয়াত-তাকমিল: ৬৭।
৭৪০. ইয়াহইয়া ইবনে মাইন: আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে মাইন ইবনে আওন ইবনে যিয়াদ ইবনে বিসতাম ইবনে আবদুর রহমান আল-মুররি আল-বাগদাদি (১৫৮-২৩৩ হি./৭৭৫-৮৪৮ খ্রি.)। প্রখ্যাত হাফিযে হাদিস এবং মুহাদ্দিসদের ইমাম। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৬, পৃ. ১৩৯; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৮, পৃ. ১৭২।
৭৪১. মাহমুদ আত-তাহহান, তাইসির মুসতালাহিল-হাদিস, পৃ. ১১৬-১১৮।
৭৪২. নাসায়ি: আবু আবদুর রহমান আহমাদ ইবনে শুআইব ইবনে আলি আল-খুরাসানি (২১৫-৩০৩ হি./৮৩০-৯১৫ খ্রি.)। হাদিসের প্রখ্যাত ইমামদের অন্যতম। সুনান রচয়িতা। খুরাসানের নাসা নগরে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন মক্কা মুকাররমায়। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৪, পৃ. ১২৫।
৭৪৩. মুহাম্মাদ যাইফুল্লাহ আল বাতায়িনা, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৩২৩; মাহমুদ আত-তাহহান, তাইসিরু মুসতালাহিল হাদিস, পৃ. ১১৫-১১৬।
৭৪৪. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৪৫২।
৭৪৫. আবদুর রহমান হাসান হাবান্নাকা, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৫১৮-৫২০।
৭৪৬. আবু যায়দ আদ-দাবুসি: আবদুল্লাহ (বা উবাইদুল্লাহ) ইবনে উমর ইবনে ঈসা আদ-দাবুসি আল-বুখারি আল-হানাফি আল-কাযি (মৃ. ৪৩০ হি./১০৩৯ খ্রি.)। হানাফি ঘরানার বিখ্যাত ফকিহ। ইলমুল খিলাফ (বিরোধ-বিদ্যা)-এর প্রবর্তক। বুখারা ও সমরকন্দের মাঝে অবস্থিত দাবুসিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: تقويم الأدلة في أصول الفقه الأسرار، تأسيس النظر، الأنوارا দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৩, পৃ. ৪৮।
৭৪৭. কাজি আবদুল জাব্বার: কাজিউল কুজাত আবুল হাসান আবদুল জাব্বার ইবনে আহমাদ আল-হামদানি আল-মুতাযিলি আল-আসাদাবাদি (৩৫৯-৪১৫ হি./৯৬৯-১০২৫ খ্রি.)। শাফিয়ি ঘরানার বিখ্যাত ফকিহ। সেই যুগের মুতাযিলা সম্প্রদায়ের শাইখ। রায় শহরে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। জন্ম ইরানের হামদান শহরের কাছে আসাদাবাদ এলাকায়। তিনি সত্তরটিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেন। তার রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: النهاية في أصول الفقه الخلاف والوفاق، الدواعي والصواري، شرح الأصول الخمسة. দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৭, পৃ. ২৪৪-২৪৫।
৭৪৮. আবুল হুসাইন আল-বসরি: মুহাম্মাদ ইবনে আলি ইবনে তাইয়িব আল-মুতাকাল্লিম আল-মুতাযিলি (মৃ. ৪৩৬ হি./১০৪৪ খ্রি.)। মুতাযিলি সম্প্রদায়ের ইমাম। বসরায় জন্মগ্রহণ করেন, বসবাস করেন বাগদাদে এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: المعتمد في أصول الفقه। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৪, পৃ. ২৭১।
৭৪৯. সাইফুদ্দিন আল-আমিদি: আবুল হাসান আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সালেম আত-তাগলিবি (৫৫১-৬৩১ হি./১১৫৬-১২৩৩ খ্রি.)। যুক্তিবিদ্যা ও ধর্মতত্ত্বে অনন্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। দিয়ারে বকরে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন দামেশকে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: أبكار الأفكار في أصول الدين غاية المرام في علم الكلام الإحكام في أصول الأحكام، تعليقة الصغيرة في الخلاف | দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ২২, পৃ. ৩৬৪-৩৬৬।
৭৫০. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৪৫৫।
৭৫১. আবদুর রহমান হাসান হাবান্নাকা, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৫১৯।
৭৫২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫২০।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ভাষা-সংশ্লিষ্ট জ্ঞান

📄 ভাষা-সংশ্লিষ্ট জ্ঞান


আরবি ভাষা তো কুরআনের ভাষা এবং ইসলামের নিদর্শন, ইসলামি সভ্যতার আধার এবং তার শক্তির প্রতীক। উম্মাহর গঠনপ্রক্রিয়ায় ও মুসলিম ব্যক্তিত্ব নির্মাণে আরবি ভাষার বড় অবদান রয়েছে। অন্যান্য সভ্যতা থেকে ইসলামি সভ্যতার স্বাতন্ত্র্যে ও শ্রেষ্ঠত্বে আরবি ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম।

আরবি ভাষা-সংশ্লিষ্ট জ্ঞানের কয়েকটি শাখা রয়েছে। আরবি ভাষাবিজ্ঞানীরা এগুলো উদ্ভাবন করেছেন। এসব জ্ঞানশাখা একটি বিশ্বসভ্যতার ভাষা হিসেবে আরবি ভাষার পরিপক্বতা, উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি সাধনে অব্যাহত ভূমিকা পালন করেছে এবং একে বিপুল ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছে, যার চাকচিক্য ও ঔজ্জ্বল্য মুহূর্তের জন্যও ম্লান হয় না। ফলে আরবি ভাষা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা হিসেবে কালযাপন করছে।

ভাষা-সংশ্লিষ্ট জ্ঞানশাখার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিম্নরূপ:

১. ইলমুন নাহব (পদক্রম ও বাক্যবিন্যাসশাস্ত্র)
ইলমুন নাহবকে ইলমুল ইরাবও বলা হয়। এটি আরবি ভাষাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এর দ্বারা আরবি বাক্যের গঠনপ্রক্রিয়া, পদক্রম, বাক্যগঠনে শব্দের অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি শুদ্ধরূপে জানা যায়। কোনটা শুদ্ধ নয় সেটাও জানা যায়। ইলমুন নাহবের উদ্দেশ্য হলো আরবি ভাষা লেখা ও বলায় ভুলত্রুটি থেকে বাঁচা এবং তা বোঝা ও বোঝানোয় সক্ষমতা অর্জন করা।(৭৫৩)

এই জ্ঞানশাখার উদ্ভাবনের পেছনে কিছু কারণ আছে। আরবরা যখন বিজিত দেশগুলোর যেসব জাতি-গোষ্ঠী ইসলামে প্রবেশ করেছিল তাদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করল, অধিক হারে পারস্পরিক সংমিশ্রণ ঘটল এবং তারা এ সকল নওমুসলিম অনারবকে তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী আরবি ভাষা শেখানোর চেষ্টা চালাল, তখন বহু আরবের কথাবার্তায় ভুলভ্রান্তি ও ত্রুটিবিচ্যুতির সংক্রমণ ঘটতে শুরু করল। ধীরে ধীরে ত্রুটিবিচ্যুতির সয়লাব ঘটে গেল। ফলে মুসলিম জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা কুরআনের ভাষার ব্যাপারে আশঙ্কা বোধ করলেন এবং নড়েচড়ে উঠলেন। তারা লেখ্য ও কথ্য ভাষাকে সুরক্ষাদানের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। আরবি বাক্যে শব্দাবলির অবস্থানের ভিন্নতা অনুযায়ী শব্দের শেষে 'হরকত' (যের, যবর, পেশ) প্রদানের নীতিও গ্রহণ করলেন। যাতে সবাই বাক্যের অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝতে পারে।

এ প্রসঙ্গে ইবনে খালদুন বলেন, ...মুসলিম জ্ঞানী সম্প্রদায় আশঙ্কা বোধ করলেন যে, শুদ্ধরূপে কথা বলার যোগ্যতাই পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে এবং এ অবস্থায় দীর্ঘ সময় কেটে যাবে। ফলে কুরআন ও হাদিস কিছু বোঝা যাবে না, এগুলোর অর্থ ও উদ্দেশ্য বোধগম্য হবে না। তাই তারা আরবদের কথার স্রোতধারা থেকে ওই যোগ্যতা-সংশ্লিষ্ট প্রচলিত কানুনগুলো উদ্‌ঘাটন করলেন। এগুলো ছিল সামগ্রিক নীতি ও কায়দার অনুরূপ। এসব কায়দাকানুনের ওপর তারা সব রকমের কথাকে পরিমাপ করলেন এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ কথাকে অনুরূপ কথার সঙ্গে মেলালেন। যেমন: ফায়েল হলো মারফু, মাফউল হলো মানসুব, মুবতাদা হলো মারফু।

তারপর তারা দেখলেন যে, এসব শব্দের হরকতের পরিবর্তনের ফলে উদ্দিষ্ট অর্থেরও পরিবর্তন ঘটে। ফলে তারা এর পারিভাষিক নামকরণ করলেন 'ইরাব'(৭৫৪) এবং পরিবর্তন-কারকের নামকরণ করলেন 'আমিল'(৭৫৫)। এরূপ অন্যান্য বিষয়েরও পারিভাষিক নামকরণ করলেন। এসব পরিভাষা আরবিভাষীদের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে গেল। তারা এগুলোকে লিপিবদ্ধ করলেন এবং তাদের একটি বিশেষ শিল্প হিসেবে স্থির করলেন। তারা পরিভাষাসমগ্রের বিদ্যায়তনিক নাম দিলেন 'ইলমুন নাহব'।(৭৫৬)

আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ালিকে(৭৫৭) ইলমুন নাহব-সংক্রান্ত প্রথম গ্রন্থরচয়িতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। 'ফাতহা' (যবর), 'যম্মা' (পেশ) ও 'কাসরা' (যের)-রূপে পরিচিত হরকতগুলো তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন। তারপর অন্যান্য মনীষী এ বিষয়ে লেখালেখি করেন। হারুনুর রশিদের খিলাফতকালে এ বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন খলিল ইবনে আহমাদ আল-ফারাহিদি(৭৫৮)। খলিল ইবনে আহমাদ থেকে ইলমুন নাহব গ্রহণ করেন এবং ইলমুন নাহবের অধ্যায়গুলোকে পূর্ণতা দান করেন-ইবনে খালদুন যেমনটি উল্লেখ করেছেন-সিবাওয়াইহ(৭৫৯)। সিবাওয়াইহ ইলমুন নাহবে নতুন নতুন সংজ্ঞা ও পরিভাষা যুক্ত করেন। অসংখ্য দলিল-প্রমাণ উপস্থিত করেন। ব্যাকরণ-বিষয়ে 'আল-কিতাব' নামে তার বিখ্যাত গ্রন্থটি রচনা করেন। এই গ্রন্থ ছিল আরবি ব্যাকরণ বিষয়ে পরবর্তীকালে যত গ্রন্থ লিখিত হয়েছে তার সবগুলোর ইমাম বা পথপ্রদর্শক। আবু তাইয়িব আল-লুগাবি(৭৬০) এই গ্রন্থকে 'কুরআনুন নাহব' বা ব্যাকরণের কুরআন বলে আখ্যায়িত করেছেন। সিবাওয়াইহ সম্পর্কে তিনি বলেন, সিবাওয়াইহ হলেন খলিল ইবনে আহমাদের পরে ব্যাকরণ সম্বন্ধে সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি।(৭৬১) তারপর শিক্ষার্থীদের জন্য ছোট ছোট ব্যাকরণগ্রন্থ রচনা করেন আবু ইসহাক আয-যাজ্জাজ(৭৬২) ও আবু আলি আল-ফারিসি(৭৬৩)। সিবাওয়াইহ তার গ্রন্থে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তারা একই পদ্ধতি অবলম্বন করেন।(৭৬৪)

এরপর আরবি ভাষাবিদ ও ভাষাবিজ্ঞানীরা ব্যাকরণের ময়দানে অবতীর্ণ হন এবং ছোট-বড় প্রচুর ব্যাকরণগ্রন্থ রচনা করেন। দীর্ঘ কলেবরযুক্ত, সংক্ষিপ্ত, বিস্তারিত ব্যাখ্যাযুক্ত, টীকাভাষ্য ও হাশিয়া, বিবরণ-সংবলিত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের বিশ্লেষণমূলক ইত্যাদি বিপুল গ্রন্থ রচিত হয়। তারপর আসে 'সহজ ব্যাকরণ পাঠ' জাতীয় পুস্তক রচনার পালা। এসব পুস্তক ব্যাকরণের শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞানার্জনের পথ সুগম করে তোলে।(৭৬৫)

সিবাওয়াইহ কর্তৃক রচিত গ্রন্থের পরে আরবি ব্যাকরণ বিষয়ে প্রচলিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলির মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ:

১. আবু আমর ইবনুল হাজিবের (মৃ. ৬৪৬ হি.) গ্রন্থাবলি: পদপ্রকরণ ও বাক্যগঠন-বিষয়ে তার গ্রন্থ 'আল-কাফিয়া' এবং শব্দপ্রকরণ বিষয়ে তার গ্রন্থ 'আশ-শাফিয়া'। এই দুটি গ্রন্থের ওপর, বিশেষ করে 'আল-কাফিয়া'র ওপর প্রচুর ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হয়েছে।
২. ইবনে মালিকের(৭৬৬) গ্রন্থাবলি : তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-আলফিয়্যাহ’ (ألفية ابن مالك)। এটি ছন্দে ছন্দে রচিত আরবি ব্যাকরণগ্রন্থ এবং বহু ভাষাবিদ এটির ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইবনে হিশাম আল-আনসারি(৭৬৭), তার ব্যাখ্যাগ্রন্থের নাম 'আওযাহুল মাসালিক ইলা আলফিয়্যাতি ইবনে মালিক'। তার আরও কয়েকটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ রয়েছে, সেগুলো হলো : 'মুগনিল লাবিব আন কুতুবিল আ'আরিব', 'শারহু শুযুরিয যাহাব ফি মারিফাতি কালামিল আরাব', ‘কাতরুন নাদা ওয়া বাললুস সাদা'। ইবনে আকিলও(৭৬৮) আল-আলফিয়্যাহর ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন, সেটির নাম ‘শারহু ইবনে আকিল আলাল আলফিয়্যাহ'।

ইলমুন নাহব বা আরবি ব্যাকরণশাস্ত্রের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এভাবেই এবং তা ছিল সংস্কৃতিমূলক উজ্জ্বল মর্যাদাপূর্ণ কীর্তি, কেবল মুসলিমরাই এই কীর্তি সাধন করেছে।

২. ইলমুল আরুয (আরবি ছন্দশাস্ত্র)
ইলমুল আরুয আরবি কবিতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ইলমুল আরুয বলতে এমন নিয়মকানুনকে বোঝায় যার দ্বারা বিশুদ্ধ কবিতা ও অশুদ্ধ কবিতা চিহ্নিত করা যায়। অথবা এটি এমন শাস্ত্র যেখানে গ্রহণযোগ্য ছন্দ ও মাত্রারীতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। অথবা এটি কবিতার মানদণ্ড, যার দ্বারা শুদ্ধ ও ত্রুটিপূর্ণ কবিতার মধ্যে পার্থক্য করা যায়।(৭৬৯)

এটি একটি শিল্প, যার দ্বারা আরবি কবিতার শুদ্ধ ছন্দ ও মাত্রা এবং অশুদ্ধ ছন্দ ও মাত্রা জানা যায় এবং যা ছন্দের যিহাফ(৭৭০) ও ইলাল(৭৭১) সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়-বলেছেন আহমাদ আল-হাশিমি।(৭৭২)

আরবি ছন্দশাস্ত্রের যিনি উদ্ভাবক এবং যিনি একে অস্তিত্বদান করেছেন তিনি হলেন সিবাওয়াইহের গুরু খলিল ইবনে আহমাদ ফারাহিদি। তিনি ছন্দশাস্ত্র নিয়ে 'আল-আইন' গ্রন্থটি রচনা করেছেন, এটি প্রথম কোষগ্রন্থ যেখানে তিনি একটি জাতির ভাষাকে আঁটিয়ে ফেলেছেন। খলিল ইবনে আহমাদ আরবদের কবিতাসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং সেগুলোকে পনেরোটি ছন্দে শৃঙ্খলিত করেছেন। প্রত্যেক ছন্দের নাম দিয়েছেন 'বাহর'। আরও একটি কথা বলা হয়ে থাকে, ছন্দশাস্ত্রের প্রবর্তন করেছেন আহমাদ এবং তা পরিমার্জন করেছেন আবু নাস্ত্র জাওহারি(৭৭৩)। আখফাশ(৭৭৪) আরও একটি ছন্দ বাড়িয়েছেন এবং ছন্দটির নাম দিয়েছেন 'আল-মুতাদারাক'।(৭৭৫) মোট ছন্দ হয়েছে ষোলোটি।

হামযাহ আল-ইস্পাহানি(৭৭৬) বলেন, ইসলামের সাম্রাজ্যে যত নতুন জ্ঞানের উদ্ভব ঘটেছে, আরব জ্ঞানী সম্প্রদায় তার প্রত্যেকটির জন্য খলিল ইবনে আহমাদ থেকে মূলনীতি গ্রহণ করেছেন। এই ক্ষেত্রে আরবি ছন্দশাস্ত্রের চেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ আর কিছু নেই। খলিল ইবনে আহমাদ ছন্দশাস্ত্র কোনো প্রজ্ঞাবান থেকে গ্রহণ করেননি এবং তার পূর্বে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো দৃষ্টান্তও ছিল না যাকে তিনি অনুসরণ করেছেন...। যদি তার যুগ হতো অতিপ্রাচীন এবং নিদর্শনাবলি হতো আরও দূরবর্তী, তাহলে এই জাতির অনেকেই তার সৃষ্টিকর্মের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করত। দুনিয়া সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে তার সৃষ্টিকর্মের মতো কারও সৃষ্টিকর্ম নেই, বিশেষ করে একটু আগে যে শাস্ত্রের (ছন্দশাস্ত্র) কথা বলা হয়েছে সে শাস্ত্রের উদ্ভাবন। একটিমাত্র গ্রন্থ রচনার মধ্য দিয়েই তিনি ছন্দশাস্ত্রের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেটি হলো ‘আল-আইন’। এই গ্রন্থে তিনি একটি জাতির ভাষাকে পুরোপুরি পুরে দিয়েছেন। সিবাওয়াইহ ইলমুন নাহব বা ব্যাকরণশাস্ত্রে খলিল থেকে যে সহযোগিতা পেয়েছেন তাও উল্লেখযোগ্য, তার থেকে জ্ঞান আহরণ করে সিবাওয়াইহ যে গ্রন্থ রচনা করেছেন তা ইসলামি সাম্রাজ্যের সৌন্দর্যরূপে বিদ্যমান।(৭৭৭)

আল-ইয়াফিয়ি(৭৭৮) বলেছেন, খলিল ইবনে আহমাদ ইলমুল আরুয বা আরবি ছন্দশাস্ত্র-যা কবিতার শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতার মানদণ্ড-উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে মহামতি অ্যারিস্টটলের মতোই, যিনি যুক্তিবিদ্যা-যা অর্থের ও দলিলের শুদ্ধতার মানদণ্ড-উদ্ভাবন করেছেন।(৭৭৯)

একটি সূত্র থেকে জানা গেছে যে, খলিল ইবনে আহমাদ পবিত্র মক্কায় হজব্রত পালনাবস্থায় আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করেন, হে আল্লাহ, তুমি আমাকে এমন জ্ঞান দাও যা আমার পূর্বে কাউকে দাওনি এবং সে জ্ঞান যেন কেবল আমার থেকেই গ্রহণ করা হয়।

তিনি হজ থেকে ফিরে এলে আল্লাহ তাআলা তার জন্য ছন্দশাস্ত্রের দরজা উন্মুক্ত করে দেন। সুর ও সংগীত সম্পর্কে খলিলের পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল, সেই জ্ঞানই তাকে ছন্দশাস্ত্র সৃষ্টির পথ দেখিয়ে দেয়। যেহেতু উৎসের ক্ষেত্রে ছন্দশাস্ত্র ও সংগীতশাস্ত্র কাছাকাছি।(৭৮০)

ইলমুল আরুযের বিষয় হলো আরবি কবিতা, যেহেতু আরবি কবিতা বিশেষ কিছু ছন্দে আবদ্ধ। কোনটা গদ্য আর কোনটা কবিতা তা পার্থক্য করার ক্ষেত্রে ইলমুল আরুযের ফায়দাটা বোঝা যায়। এই শাস্ত্রের ফলেই কবিতা-লেখক একটি ছন্দের সঙ্গে আরেকটির তালগোল পাকিয়ে ফেলা থেকে বেঁচে যান। কারণ, আরবি ছন্দগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য অনেক এবং পার্থক্য অতি সূক্ষ্ম। ছন্দের টুটে যাওয়া ও ত্রুটিবিচ্যুতি থেকেও নিরাপদ থাকেন। এই শাস্ত্র জানা থাকলে কবিতা ছন্দ অনুযায়ী শুদ্ধভাবে পাঠ করা যায় এবং কোন কবিতার ছন্দ ঠিকঠাক আছে এবং কোনটার ছন্দে পতন ঘটেছে তাও বোঝা যায়।(৭৮১)

আরবদের জন্য আরবি ভাষা আল্লাহ তাআলার বিশেষ দান। খলিল তাদের ভাষা পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করে আরবি কবিতাকে ষোলোটি ছন্দে শৃঙ্খলিত করেছেন। ছন্দগুলো হলো: আত-তাবিল, আল-মাদিদ, আল- বাসিত, আল-ওয়াফির, আল-কামিল, আল-হাযাজ, আর-রাজায, আর- রামাল, আস-সারি, আল-মুনসারিহ, আল-খফিফ, আল-মুযারি, আল-মুকতাযিব, আল-মুজতাম্স, আল-মুতাকারিব, আল-মুতাদারাক। এই শেষের ছন্দটি সংযোজন করেছেন আখফাশ এবং খলিলের যে ভ্রম ঘটেছিল তা দূর করেছেন।(৭৮২)

আবু তাহির আল-বাইযাবি ষোলোটি ছন্দকে দুটি পঙ্ক্তিতে সন্নিবিষ্ট করেছেন:
طوِيلٌ يَمُدُّ البَسْطَ بِالوَفْرِ كَامِلُ وَيَهْزِجُ فِي رَجْزٍ وَيُرْمِلُ مُسْرِعًا فَسَبِّحْ خَفِيفًا ضَارِعًا يَقْتَضِبُ لَنَا مَنِ اجْتُنَّ مِنْ قُرْبٍ لِنُدْرِكَ مَطْمَعًا

খলিল ইবনে আহমাদ ছাড়াও অন্যান্য ভাষাবিদ আরবি ছন্দশাস্ত্র নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর বিখ্যাত কয়েকটি হলো : ১. কাসিদা ইবনুল হাজিব ২. আল-ওয়াফি ফি ইলমুল আরুজ ওয়া ইলমুল কাওয়াফি ওয়া উইয়ুবুশ শি’র(৭৮৩) , আল কাসিদাতুল খাযরাজিয়্যা ফিল আরুজ(৭৮৪) ৩. খাতিব তাবরিযি আল আরুজ ওয়াল কাওয়াফি ৪. শিফা-উল গালিল ফি ইলমিল খলিল, মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আল-খাযরাজি; ওয়া নুসসির্‌ রামাজাহ, আমিনুদ্দিন আল-মাহাল্লি(৭৮৫) আর ৫. ইউসুফ ইবনে আবু বকর।

আস-সাক্কাকি ‘মিফতাহুল উলুম’ গ্রন্থে আরবি ছন্দ নিয়ে যে আলোচনা করেছেন তা এই শাস্ত্র বোঝার জন্য যথেষ্ট।(৭৮৬)

৩. অভিধান-সংকলন বিদ্যা(৭৮৭)
ড. আদনান আল-খতিব বলেছেন, প্রত্যেক ভাষাই তার অভিধান নিয়ে গৌরব প্রকাশ করে, তাই সমস্ত গৌরব সকল ভাষার মা আরবি ভাষার। কারণ এই পৃথিবী আরবদের মতো কোনো জাতি দেখেনি, মাতৃভাষার যত্ন-পরিচর্যা, সংগ্রহ ও সংকলন, শব্দানুসন্ধান, একক শব্দের হরফ তার অবস্থান অনুযায়ী কী অর্থ প্রকাশ করে তা জানার চেষ্টা করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আরবজাতি পৃথিবীর অন্যসব জাতির চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে।(৭৮৮)

মুজাম বা অভিধান বলতে শুরুর দিকে এমন গ্রন্থ বোঝাত যাতে ভাষার শব্দভান্ডারের এক বিরাট অংশ সংকলিত হয়েছে এবং শব্দগুলোকে উচ্চারণের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বিন্যস্ত করা হয়েছে এবং শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যা যুক্ত করা হয়েছে। মুজামকে কখনো কখনো ‘কামুস’ বা শব্দকোষও বলা হয়। অভিধানের প্রধান গুরুত্ব এখানে যে, তাতে অসংখ্য শব্দের অর্থ দেওয়া থাকে যা সংশ্লিষ্ট ভাষার কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে আয়ত্ত করা সম্ভব নয়, এসব শব্দ অনুসন্ধান করে তার অর্থ জানার যতই আগ্রহ থাকুক এবং ভাষার শব্দরাশি যতই ছড়িয়ে থাকুক। নিজের পরিবেশ ও সংস্কৃতি অনুযায়ী প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য।

আরবদের মধ্যে অভিধান-চিন্তার প্রকাশ ঘটে কুরআন মাজিদ নাযিল হওয়ার পর। কুরআনে আরবদের বহু উপভাষার প্রয়োগ দেখা যায়। অনারবরা ইসলামে প্রবেশ করে এবং তাদের অনেকের কাছে কুরআনের কিছু কিছু শব্দ কঠিন ও দুর্বোধ্য ঠেকে। ফলে কুরআন ও হাদিসের অপ্রচলিত ও দুর্বোধ্য শব্দাবলি এবং সাধারণভাবে আরবি ভাষার কঠিন ও জটিল শব্দগুলোর ব্যাখ্যার দাবি অনিবার্য হয়ে ওঠে।

তাই আরবি ভাষাবিদদের জন্য অভিধান-সংকলন বিদ্যা আরব-ঐশ্বর্য থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তি, অন্য কোথাও থেকে নয়। এ কারণে অভিধান সংকলন-বিদ্যাকে আরব ভাষাবিদদের একটি উদ্ভাবন হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এ ক্ষেত্রে তারা পথিকৃৎ। অভিধান-রচনায় তারা অন্যান্য জাতি থেকে অনেক এগিয়ে রয়েছেন। অভিধান-সংকলনের বহু পদ্ধতি রয়েছে তাদের, অভিধানের প্রকারভেদও অনেক। তাই আরবদের অভিধান-চর্চা নিয়ে সমৃদ্ধ গবেষণাও রয়েছে। এসব গবেষণা থেকে এ স্বীকৃতি মিলেছে যে, অন্যান্য ভাষার পণ্ডিতদের চেয়ে আরবি ভাষার পণ্ডিতরা শ্রেষ্ঠ ও অগ্রগামী। জার্মান প্রাচ্যবিদ অগাস্ট ফিশার (August Fischer 1865-1949) বলেন, চীনকে যদি বাদ দিই, তাহলে আরব ছাড়া আর কোনো জাতি পাওয়া যাবে না যারা ভাষা ও ভাষাবিজ্ঞানের ওপর লিখিত গ্রন্থাবলির প্রাচুর্য এবং নীতিমালা ও নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুযায়ী ভাষার শব্দরাশিকে সুবিন্যস্ত করার প্রয়োজনীয়তাবোধ ও অগ্রসর চিন্তাভাবনার জন্য গৌরবের হকদার হতে পারে।(৭৮৯)

প্রখ্যাত অনারব আরবি-ভাষাবিদ এবং ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্টার্ন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ-এর খ্যাতিমান অধ্যাপক John A. Haywood তার 'সানাআতুল মাআজিম ফিল-আরাবিয়্যাহ' গ্রন্থে বলেছেন, আরবদের একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক অভিধান রয়েছে, সেটি হলো 'লিসানুল আরব'(৭৯০)। ঊনবিংশ শতাব্দীর পূর্বে পৃথিবীর যাবতীয় ভাষার অভিধানাবলি সূক্ষ্মতায় ও সামগ্রিকতায় 'লিসানুল আরব'-এর সমকক্ষ হতে পারেনি।(৭৯১)

পবিত্র কুরআনের অপ্রচলিত ও জটিল শব্দাবলি নিয়ে প্রথম যিনি অভিধানমূলক পুস্তিকা রচনা করেন, তিনি হলেন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (মৃ. ৬৮ হি./৬৮৭ খ্রি.)। এই পুস্তিকায় তিনি খারিজি সম্প্রদায়ের নাফে ইবনুল আযরাক (মৃ. ৬৫ হি./৬৮৪ খ্রি.) কর্তৃক উত্থাপিত প্রশ্নাবলির জবাব দিয়েছেন। পুস্তিকাটির নাম 'মাসায়িলু নাফে ইবনিল আযরাك ফি গরিবিল কুরআন'। তারপর এ বিষয়ে একাধিক পুস্তিকা রচিত হয়। যেমন: গরিফুল কুরআন, আবু সাঈদ আবান ইবনে তাগলিব(৭৯২); ‘তাফসির গরিফুল কুরআন’, ইমাম মালিক; ‘গারিফুল কুরআন’, আবু ফায়েদ মুআররিজ ইবনে আমর আস-সাদুসি(৭৯৩) এবং অন্যান্য।

সাধারণ ও সামগ্রিক অর্থে অভিধানগ্রন্থের প্রকাশ ঘটে হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে। যখন খলিল ইবনে আহমাদ তার ‘আল-আইন’ নামক কোষগ্রন্থটি রচনা করেন। উদাহরণস্বরূপ অনুযায়ী আরবি বর্ণমালার ভিত্তিতে এই কোষগ্রন্থের তুক্সিমূহ বিভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত ও সন্নিবেশিত করা হয়।(৭৯৪) খলিল ইবনে আহমদের পথ অনুসরণ করেন আবু আলি আল-কালি (ম. ৩৫৬ হি./৯৬৬ খ্রি.)। তিনি তার অভিধান ‘আল-বারি’তে হরফের উদাহরণগুলো (মাখরাজ) অনুযায়ী ভুক্তিগুলো বিন্যস্ত করেন। আন্দালুসে রচিত এটিই প্রথম কোষগ্রন্থ। যারা খলিলকে অনুসরণ করেছেন এবং মাখরাজ অনুযায়ী বিন্যাস ও অধ্যায়ভুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁরই পথে হেঁটেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আবু মানসুর আল-আজহারি(৭৯৫), তাঁর রচিত অভিধান ‘তাজহিবুল লুগাহ্’ এবং সাঈহ ইবনে ফাদ (ম. ৩৮৫ হি./৯৯৫ খ্রি.), তাঁর রচিত অভিধান ‘আল-মুহিত ফিল-লুগাহ্’। খলিলের আবিষ্কৃত বিন্যাসপদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন বিন্যাস ও শৈলীতে অভিধান রচনার প্রয়াস পেয়েছেন ইবনে দুরাইদ আল-আজদি। তাঁর রচিত অভিধানের নাম ‘জামহারাতুল লুগাহ্’। এই অভিধানে তিনি বর্ণনাক্রমিক (আলফাবেটিক) পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, যদিও তা পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করেননি। আহমাদ ইবনে ফারিস(৭৯৬) বর্ণনাক্রমিক পদ্ধতি ও শব্দের গঠন অনুযায়ী ভুক্তিবিন্যাসের পদ্ধতির মধ্যে মিশ্রণ ঘটানোর চেষ্টা করেন। তার রচিত অভিধানের নাম 'মাকায়িসুল লুগাহ'।

আবু নাস্ত্র ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ আল-জাওহারি (মৃ. ৪০০ হি./১০০৯ খ্রি.) তার রচিত অভিধান 'আস-সিহাহ'-তে এক নতুন বিন্যাসপদ্ধতির উদ্ভব ঘটান, এই পদ্ধতি ছিল তার পূর্ববর্তীকালে রচিত সব ধরনের অভিধানের বিন্যাসরীতি থেকে ভিন্ন। তিনি বর্ণনানুক্রমিক রীতি অনুসরণ করেন বটে, তবে অধ্যায়ভুক্ত শব্দাবলিকে শেষ হরফ অনুযায়ী বিন্যস্ত করার পদ্ধতি অবলম্বন করেন। যা আর কেউ করেননি।

হিজরি পঞ্চম শতাব্দীর শেষের দিকে এবং ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুর দিকে যামাখশারি তার অভিধান 'আসাসুল বালাগাহ' রচনা করেন। এই অভিধানে তিনি ভিন্নভাবে বর্ণনানুক্রমিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তিনি শব্দাবলিকে তাদের প্রথম বর্ণ অনুযায়ী, তারপর দ্বিতীয় বর্ণ অনুযায়ী, তারপর তৃতীয় বর্ণ অনুযায়ী বিন্যস্ত করেন। আধুনিক অভিধানগুলোতে শব্দের বিন্যাসে এই পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়েছে। তবে যামাখশারির দুই শতাব্দীরও পূর্বে এ একই পদ্ধতি অবলম্বন করে অভিধান রচনা করেন আলি ইবনুল হাসান আল-হুনায়ি, যিনি কুরাউন নাম্ল(৭৯৭) নামে পরিচিত। তার অভিধানের নাম 'আল-মুনাযযাদ'। এই অভিধান তিনি আলিফ-বা-তা-সা বর্ণনানুক্রম অনুসারে রচনা করেন। ইয়াকুত আল-হামাবি তার কোষগ্রন্থে এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন এবং অন্যান্য জীবনীকাররাও তা-ই করেছেন।

অভিধান রচনায় পূর্ববর্তী মনীষীদের যে অভিজ্ঞতা তাকে পুঁজি করেই সাধারণ অভিধান রচনার ধারা অব্যাহত থাকে। আল-জাওহারি তার অভিধান 'আস-সিহাহ'-তে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন একই পদ্ধতি অনুসরণ করে ইবনে মানযুর রচনা করেন 'লিসানুল আরব'। ফাইরুজাবাদি তার অভিধান 'আল-কামুসুল মুহিত'-এ 'লিসানুল আরব' ও 'আস-সিহাহ'-তে অনুসৃত পদ্ধতিই অবলম্বন করেছেন। অন্যদিকে মুরতাযা আয-যাবিদি(৭৯৮) অভিধান রচনায় 'আল-কামুসুল মুহিত'-এর ওপরই নির্ভর করেন। ১০ খণ্ডে রচিত তার অভিধানের নাম 'তাজুল আরুস মিন জাওয়াহিরিল কামুস'। তবে তিনি অভিধানের প্রত্যেক অধ্যায়ে সংশ্লিষ্ট হরফ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন, হরফটির বৈশিষ্ট্য কী এবং ভাষাগত ব্যবহার কী কী তার বর্ণনা দিয়েছেন।

সাধারণ আরবি অভিধানের উদ্দেশ্য ছিল শব্দার্থের ব্যাখ্যা প্রদান করা এবং দ্ব্যর্থবোধক অর্থকে স্পষ্ট করা। এগুলো মুজামুল আলফায বা শব্দাভিধান হিসেবে পরিচিত ছিল। এই ধরনের অভিধান রচনার পাশাপাশি আরেক ধরনের অভিধান রচনার ধারা তৈরি হয়, সেগুলোর নাম মুজামুল মাআনি বা অর্থাভিধান। এসব অভিধানের উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন শব্দ ও শব্দরূপ তৈরি করা, যার দ্বারা লেখক তার নিজস্ব অর্থ ও অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারেন অথবা যা তার জীবনে নতুন কিছু হিসেবে উপস্থিত হয়। এ প্রকারের অভিধানে ভুক্তিবিন্যাসে শব্দাভিধান থেকে ভিন্নতর পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। যেমন বিষয় অনুযায়ী বিন্যাসপদ্ধতি। ইবনুস সিক্কিত (২৪৪ হি./৮৫৮ খ্রি.) কর্তৃক রচিত 'আল-আলফায' এই শ্রেণির প্রথম অভিধান। তারপর এ ধরনের অভিধান রচনার একটি ধারা তৈরি হয়। আবদুর রহমান ইবনে ঈসা আল-হামাদানি(৭৯৯) রচনা করেন 'আল-আলফাযুল ‘কিতাবিয়্যাহ’। তিনি বিষয়ভিত্তিক বিন্যাসের ক্ষেত্রে ইবনুস সিক্কিতের গ্রন্থকেই অনুসরণ করেন। তিনি আলোচ্য বিষয়গুলোকে কয়েকটি অধ্যায়ে সন্নিবিষ্ট করেন।

আল-হামাদানি কর্তৃক রচিত গ্রন্থটির অনুসন্ধান লাভের পর কুদামা ইবনে জাফর(৮০০) রচনা করেন 'জাওয়াহিরুল আলফায'। কিন্তু এটি তার আশা মেটায়নি এবং তাকে পরিতৃপ্ত করেনি। আবু হিলাল আল-আসকারি(৮০১) এই শ্রেণির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটি রচনা করেন, বিন্যাস ও কাঠামোর দিক থেকে এটি বেশ গুরুত্ব বহন করে। গ্রন্থটির নাম 'আত-তালখিস'। সংক্ষিপ্ত হলেও এটি অভিধানের স্তরে উত্তীর্ণ। এই ময়দানে আরও অবতীর্ণ হন আবু মানসুর আস-সাআলিবি(৮০২) এবং রচনা করেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'ফিকহুল লুগাহ'। যিনি এই শ্রেণির রচনাকে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরান তিনি হলেন ইবনে সিদাহ আল-আন্দালুসি(৮০৩), তার রচিত অভিধান 'আল-মুখাসসাস'। গ্রন্থটি বিন্যাস ও অধ্যায়বিভক্তি এবং ব্যাপকতা ও সামগ্রিকতার দিক থেকে শীর্ষস্থান দখল করে নেয়। এখনো পর্যন্ত এটি সবচেয়ে বড় আরবি অর্থাভিধান, বিপুল সংখ্যক ভুক্তি রয়েছে এতে, অর্থাভিধান নামটি ধারণ করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত গ্রন্থ এটি।(৮০৪)

ইউরোপীয় অভিধান-বিশেষজ্ঞ জন এ. হেউড (John A. Haywood) মুসলিমদের কাছে অভিধান ও কোষগ্রন্থের গুরুত্ব ও মহিমা যে কী তা নিয়ে চমৎকার মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, সত্য এই যে, অভিধান ও কোষগ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে প্রাচীন ও আধুনিক পৃথিবী এবং প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের তুলনায় আরবরা কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রয়েছে। তা যুগের বা স্থানের যে বিবেচনাতেই হোক।(৮০৫)

তাই আরবি অভিধান ও কোষগ্রন্থ—তাদের বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রকার নিয়েই—ইসলামি আরবের নবচিন্তার একটি অংশ এবং মুসলিম জ্ঞানী-মনীষীরা হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে যে শ্রম ও প্রচেষ্টা ব্যয় করেছেন তার ফল।

।। দ্বিতীয় খণ্ড সমাপ্ত।।

টিকাঃ
৭৫৩. সিদ্দিক হাসান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৫৬০।
৭৫৪. শব্দের শেষ বর্ণের স্বরধ্বনি নিরূপণ।
৭৫৫. অন্য শব্দের চালক শব্দ।
৭৫৬. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৪৬।
৭৫৭. আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ালি: জালিম ইবনে আমর ইবনে সুফিয়ান (১৬ হিজরিপূর্ব-৬৯ হিজরি/৬০৫-৬৮৮ খ্রি.)। তাবিয়ি। ইলমুন নাহব বা আরবি ব্যাকরণের প্রবর্তক। আলি ইবনে আবি তালিব রা.-এর সঙ্গে সিফফিনযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আলি রা.-এর ইনতেকালের পর মুআবিয়ার রা.-এর দলে যুক্ত হন। দেখুন, ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ৩, পৃ. ৩১২।
৭৫৮. খলিল ইবনে আহমাদ আল-ফারাহিদি: আবু আবদুর রহমান খলিল ইবনে আহমাদ ইবনে আমর ইবনে তামিম আল-ফারাহিদি আল-আযদি আল-ইয়াহমাদি (১০০-১৭০ হি./৭১৮-৭৮৬ খ্রি.)। আরবি ছন্দশাস্ত্রের প্রবর্তক ও ব্যাকরণবিদ। সংগীত ও সুরবিজ্ঞানও অধ্যয়ন করেছেন। তার দুজন বিখ্যাত উস্তাদ হলেন ঈসা ইবনে উমর এবং আবু আমর ইবনুল আলা। খলিল ব্যাকরণবিদ সিবাওয়াইহের গুরু। বসরায় বড় হন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। ছিলেন দুনিয়াবিমুখ, জ্ঞান ও জ্ঞানীদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তার রচিত গ্রন্থাবলি: كتاب معاني الحروف، كتاب الإيقاع، كتاب النقط والشكل كتاب الشواهد، كتاب العروض كتاب النغم، كتاب معجم العين )
৭৫৯. সিবাওয়াইহ: আবু বিশর আমর ইবনে উসমান ইবনে কানবার আল-হারিসি (১৪৮-১৮০ হি./৭৬৫-৭৯৫ খ্রি.)। আরবি ব্যাকরণবিদদের ইমাম। তার উদ্ভাদদের মধ্যে রয়েছেন খলিল ইবনে আহমাদ আল-ফারাহিদি, ইউনুস ইবনে হাবিব, আবুল খিতাব আল-আখফাশ, ঈসা ইবনে উমর। 'আল-কিতাব' ব্যাকরণ বিষয়ে তার প্রধান কীর্তি।
৭৬০. আবু তাইয়িব আল-লুগাবি: আবদুল ওয়াহিদ ইবনে আলি আল-হালাবি (মৃ. ৩৫১ হি./৯৬২ খ্রি.)। আলেম, বিখ্যাত ভাষাবিদ। আলেপ্পোয় বসবাস করতেন। আলেঙ্কোর সম্রাট সাইফুদ দাওলাহ আল-হামদানির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল। ৩৫১ হিজরিতে রোমান সৈন্যরা আলেপ্পোর ওপর আক্রমণ করে এবং হত্যাযজ্ঞ চালায়। তাদের হাতে আবু তাইয়িব নিহত হন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: مراتب النحويين، شجر الدر المثلى، لطيف الإتباع، كتاب الأضداد، طبقات الشعراء
৭৬১. দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৯, পৃ. ১৭৩। আবু তাইয়িব আল-লুগাবি, মারাতিবুন নাহবিয়্যিন, পৃ. ৬৫।
৭৬২. আয-যাজ্জাজ বা আবু ইসহাক আয-যাজ্জাজ: আবু ইসহাক ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সারি ইবনে সাহল আয-যাজ্জাজ আল-বাগদাদি (২৪১-৩১১ হি./৮৫৫-৯২৩ খ্রি.)। ধর্মীয় পণ্ডিত ও সাহিত্য-বিশারদ। বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাগদাদেই মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: معاني القرآن ن تفسير أسماء الله الحسنى ، كتاب ما ينصرف وما لا ينصرف القوافي أو الكافي في أسماء القوافي
৭৬৩. আবু আলি আল-ফারিসি: হাসান ইবনে আহমাদ ইবনে আবদুল গাফফার আল-ফারিসি (২৮৮-৩৭৭ হি./৯০০-৯৮৭ খ্রি.)। আরবি ভাষাবিজ্ঞানী। পারস্যে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: التذكرة (আরবি ভাষাবিজ্ঞানের ওপর ২০ খণ্ডে রচিত), جواهر النحو (2) تعاليق سيبويه। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ২, পৃ. ৮০-৮২।
৭৬৪. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৪৬।
৭৬৫. আবদুর রহমান হাসান হাবান্নাকা, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৪৮৮।
৭৬৬. ইবনে মালিক : জামালুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ আল-আন্দালুসি (৬০০-৬৭২ হি./১২০৩-১২৭৪ খ্রি.)। আরবি ভাষাবিজ্ঞানী। আন্দালুসের জায়ানে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন দামেশকে। ‘আল-আলফিয়্যাহ' তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৫, পৃ. ৩৩৯।
৭৬৭. ইবনে হিশাম আল-আনসারি : জামালুদ্দিন আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ ইবনে আহমাদ (৭০৮-৭৬১ হি./১৩০৯-১৩৬০ খ্রি.)। আরবি ভাষার ইমাম, বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ। মিশরে জন্মগ্রহণ করেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। مغني اللبيب عن كتب الأعاريب তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, আদ-দুরারুল কামিনাহ, খ. ৩, পৃ. ৯২-৯৪।
৭৬৮. ইবনে আকিল : বাহাউদ্দিন আবদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান আল-কুরাশি (৬৯৪-৭৬৯ হি./১২৯৪-১৩৬৭ খ্রি.)। বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ। আবু হাইয়ান তার সম্পর্কে বলেছেন, আকাশের নিচে তার মতো বড় ব্যাকরণবিদ আর নেই। জন্ম ও মৃত্যু কায়রোতে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : الجامع النفيس، مختصر الشرح الكبير، شرح ابن عقيل على ألفية ابن مالك দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৬, পৃ. ২১৪।
৭৬৯. উমর আল-আসআদ, মাআলিমুল আরুয ওয়াল-কাফিয়া, পৃ. ১১; মুহাম্মাদ আলি আশ-শাওয়াবাকাহ ও আনওয়ার আবু সুওয়াইলিম, মুজাম মুসতালাحاتিল আরুয ওয়াল-কাফিয়া, পৃ. ১৭৭; খতিব আত-তাবরিযি, আল-ওয়াফি ফিল-আরুয ওয়াল-কাওয়াফি, পৃ. ৩২-৩৩।
৭৭০. ছন্দের পরিমাপে পরিবর্তন-বিশেষ। পুরো কবিতায় একই পরিবর্তন জরুরি।
৭৭১. ছন্দ ও মাত্রায় পরিবর্তন, পুরো কবিতায় পরিবর্তনের সামঞ্জস্য বিধান জরুরি।
৭৭২. সাইয়িদ আহমাদ আল-হাশিমি, মিযানুয যাহাব ফি সানাআতি শিরিল আরাব, পৃ. ৫।
৭৭৩. আবু নাস্ত্র ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ আল-জাওহারি আল-ফারাবি (মৃ. ৩৯৮ হি./১০০৭ খ্রি.)। ভাষাবিদ ও অভিধান-প্রণেতা। তৎকালীন তুর্কিস্তানের ফারাবে জন্মগ্রহণ করেন। ফারাব বর্তমানে কাজাখস্তানের অন্তর্গত। বিখ্যাত দার্শনিক আল-ফারাবি তার মামা। তার বিখ্যাত গ্রন্থ تاج اللغة وصحاح العربية যা 'আস-সিহাহ' নামে পরিচিত। ব্যাকরণ ও ছন্দশাস্ত্র নিয়েও তার গ্রন্থ রয়েছে। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৯, পৃ. ৬৯।
৭৭৪. আখফাশ আল-আকবার : আবুল খাত্তাব আবদুল হামিদ ইবনে আবদুল মাজিদ। আল-আখফাশ আল-আকবার নামে সমধিক পরিচিত। বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ। তার উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন সিবাওয়াইহ, ইউনুস ইবনে হাবিব, ঈসা ইবনে উমর, আবু উবাইদা মা'মার, আবু যায়দ আল-আনসারি, আল-আসমায়ি। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ২৮৮।
৭৭৫. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৩৮১-৩৮২।
৭৭৬. হামযাহ আল-ইস্পাহানি: আবু আবদুল্লাহ হামযাহ ইবনুল হাসান আল-ইস্পাহানি (২৮০-৩৬০ হি./৮৯৩-৯৭০ খ্রি.)। ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক। ইরানের ইস্ফাহানে জন্মগ্রহণ করেন। বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : تاريخ سني ملوك الأرض، التنبيه على حدوث التصحيف والأنبياء। 'তারিখু আসবাহান' তার আরেকটি বিখ্যাত গ্রন্থ। দেখুন, মুস্তাফা জালবি (হাজি খলিফা), কাশফুয যুনুন, খ. ১, পৃ. ২৮২, ২৮৫, ৩০১; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ২, পৃ. ২৭৭।
৭৭৭. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ২, পৃ. ২৪৫।
৭৭৮. আল-ইয়াফিয়ি: আফিফুদ্দিন আবদুল্লাহ ইবনে আসআদ ইবনে আলি (৬৯৮-৭৬৮ হি./১২৯৮-১৩৬৭ খ্রি.)। ইতিহাসবিদ, গবেষক, সুফি সাধক, ইয়ামেনের শাফিয়িয়্যাহ বংশোদ্ভূত। আন্নে জন্ম এবং মক্কায় মৃত্যু। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : مرأة الجنان وعبرة اليقظان في معرفة حوادث الزمان وتقلب أحوال الإنسان وتاريخ موت بعض المشهورين من الأعيان نشر المحاسن، الغالية في فضائل المشايخ أولي المقامات العالية مختصر الدر النظيم في فضائل القرآن العظيم والآيات، والذكر الحكيم روض البصائر ورياض الأبصار في معالم الأقطار والأنهار الكبار ) দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, আদ-দুরারুল কামিনাহ, খ. ৩, পৃ. ১৮-২০।
৭৭৯. আল-ইয়াফিয়ি, মিরআতুল জিনান ওয়া ইবরাতুল ইয়াকযান ফি মারিফাতি হাওয়াদিসিয যামান, খ. ১, পৃ. ১৬৫।
৭৮০. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ২, পৃ. ২৪৪; সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ৩, পৃ. ৪।
৭৮১. উমর আল-আসআদ, মাআলিমুল আরুদ ওয়াল-কাফিয়া, পৃ. ১৬; মুহাম্মাদ আবদুল মুনয়িম খাফাজি ও আবদুল আযিয শারফ, আল-উসুলুল ফান্নিয়্যাহ লি-আওযানিশ শিরিল আরাবি, পৃ. ২০-২১।
৭৮২. সাইয়িদ আহমাদ আল-হাশিমি, মিযানুয যাহাব ফি সানাআতি শিরিল আরাব, পৃ. ২৯।
৭৮৩. ইবনুল হাজিব: আবু আমর উসমান ইবনে উমর ইবনে আবু বকর (৫৭০-৬৪৬ হি./১১৭৪-১২৪৯ খ্রি.)। মালিকি ঘরানার ফকিহ ও ভাষাবিজ্ঞানী। মিশরের মালভূমিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং আলেকজান্দ্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: আলজামি বাইনাল উম্মাহাত ফিল ফিকহ, কাফিয়া যবিল আরব ফি মা’রিফা কালামিল আরব। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৫, পৃ. ২৩৪।
৭৮৪. খতিব তাবরিযি: আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে আলি ইবনে মুহাম্মাদ আশ-শাইবানি আল-লুগাবি আল-খাতিব (৪২১-৫০২ হি./১০৩০-১১০৯ খ্রি.)। তাবরিযে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাগদাদে বড় হন। সিরিয়া ও মিশর ভ্রমণ করেন। বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: শারহু দিওয়ানিল হামাসাহ লি আবি তাম্মাম, তাহজিব ইসলাহিল মানতিক লি ইবনুস সিক্কিত, আল-মুলাখ্খাস ফি ইরাবিল কুরআন, শারহু ইখতিয়ারাতিল মুফাদ্দাল আদ্দাবি, আল-ওয়াফি ফিল আরুজ ওয়াল কাওয়াফি, শারহু শি’রিল মুতানাব্বি। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ’লাম, খ. ৮, পৃ. ১৫৭; ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আয়ান, খ. ৬, পৃ. ১৯১।
৭৮৫. আমিনুদ্দিন আল-মাহাল্লি: আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে আলি ইবনে মুসা ইবনে আবদুর রহমান আল-আনসারি (৬০০-৬৭৩ হি.)। ভালো ভালো কবিতা লিখেছেন। কয়েকটি ভালো বইও লিখেছেন। উল্লেখযোগ্য বই : উরজুজা ফিল আরুজ। দেখুন, সুয়ুতি, বুগয়াতুল উয়াত ফি তাবাকাতিল লুগাবিয়্যিন ওয়ান-নুহাত, খ. ১, পৃ. ১৯২।
৭৮৬. হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ২, পৃ. ১১৩৩-১১৩৪।
৭৮৭. আল-মাওসুআতুল আরাবিয়‍্যাতুল আলামিয়‍্যাহ, ডিজিটাল ইলেক্ট্রনিক ভার্সন, সৌদি আরব, ২৪২৫ হি./২০০৪ খ্রি.।
৭৮৮. আদনান আল-খতিব, আল-মুজামুল আরাবি বাইনাল মাযি ওয়াল-হাযির, পৃ. ৫।
৭৮৯. আল-মাজাল্লাতুল আরাবিয়্যাহ, সংখ্যা ৩৩৪, বর্ষ ২৯, যিলকদ ১৪২৫ হি./জানুয়ারি ২০০৫ খ্রি.।
৭৯০. ইবনে মানযুর (মৃ. ৭৯০ হি.), লিসানুল আরব।
৭৯১. আদনান আল-খতিব, আল-মুজামুল আরাবি বাইনাল মাযি ওয়াল-হাযির, পৃ. ৫।
৭৯২. আবান ইবনে তাগলিব : আবু সাঈদ আবান ইবনে তাগলিব ইবনে রাবাহ আল-বাকরি আল-জারিফি আল-কুফি (ম. ১৪১ হি./৭৫৮ খ্রি.)। রাবি, মুফাসসির, মুহাদ্দিস, কারি, ভাষাবিদ ও সাহিত্যিক। শিয়াঘ্নী। ইয়াকুল আবিদিন ইবনুল হুসাইনের সহচর। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : গরিবুছ্ সহিহ্, صنين القران, যিরিকলি, আল-আলাম, ৪, ১, পৃ. ২৬।
৭৯৩. আবু ফায়েদ মুআররিজ : আবু ফায়েদ মুআররিজ ইবনে আমর আস-সাদুসি (ম. ১৫৫ হি./৮৭০ খ্রি.)। আরবি ভাষাবিদ ও ব্যাকরণবিদ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : জাহেরুল ফানালি, গরিব কুরআন, প্রভূতি, البلمة في تراجم أسماة النحو واللغة, দেখুন, ফায়েকুজ্জাদি।
৭৯৪. খলিল ইবনে আহমাদ, মুআজজমুল আইন, তারকিব, আবদুল হামিদ হিসাবদিবি, ৪. ১, পৃ. ১৫।
৭৯৫. আবু মনসুর আল-আজহারি : আবু মনসুর মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ ইবনে আজহার আল-হারাবি (২৬২-৩৭০ হি./৮৭৫-৯৮১ খ্রি.)। ভাষা ও সাহিত্যের ইমাম। খুরাসানের হেরাতে জন্ম ও মৃত্যু। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : كتاب التفسير, تفسير الفاظ المزني, علل القراءات, كتاب الروح, كتاب الأسماء الحسنى, شرح ديوان أبى تمام, تفسير إصلاح المنطق। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, ৪, পৃ. ৩০৪।
৭৯৬. ইবনে ফারিস: আবুল হুসাইন আহমাদ ইবনে ফারিস ইবনে যাকারিয়া (৩২৯-৩৯৫ হি./৯৪১-১০০৪ খ্রি.)। আরবি ভাষা ও সাহিত্যের ইমাম। কাযবিনে জন্মগ্রহণ করেন, তারপর রায় শহরে গমন করেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: معجم مقاييس اللغة الإتباع والمزاوجه اختلاف النحويين، أخلاق النبي صلى الله عليه وسلم ! দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ১, পৃ. ১১৮।
৭৯৭. কুরাউন নাম্ল: আবুল হাসান আলি ইবনুল হাসান আল-হুনায়ি (মৃ. ৩১০ হি./৯২২ খ্রি.)। আরবি ভাষাবিদ। মিশরের অধিবাসী। 'আল-মুনায্যাদ' তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২০, পৃ. ২০৯।
৭৯৮. মুরতাযা আয-যাবিদি: আবুল ফায়দ মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রাজ্জাক, তার উপাধি মুরতাযা (১১৪৫-১২০৫ হি./১৭৩২-১৭৯০ খ্রি.)। ভাষা, হাদিস, রিজালশাস্ত্র ও বংশবিদ্যায় অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী। ভারতবর্ষের উত্তরপ্রদেশের হারদুয়ি জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষ ছিলেন ইরাকের ওয়াসিত শহরের বাসিন্দা। তার মা-বাবা তাকে নিয়ে ইয়ামেনের হাজরামাউতে চলে যান। ১২০৫ হিজরিতে মিশরে এক মহামারিতে মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: تاج العروس من جواهر القاموس (203) ، إتحاف السادة المتقين في شرح إحياء علوم الدين للغزالي ( 20) أسانيد الكتب الستة عقود الجواهر المنيفة في أدلة مذهب الإمام أبي حنيفة كشف اللثام عن آداب الإيمان والإسلام، رفع الشكوى وترويح القلوب في ذكر ملوك بني أيوب )
৭৯৯. আবদুর রহমান ইবনে ঈসা আল-হামাদানি (মৃ. ৩২০ হি./৯৩২ খ্রি.) ছিলেন বিখ্যাত লিখন-শিল্পী। আমির বকর ইবনে আবদুল আযিয আল-আজালির চিঠিপত্রের লেখক ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'আল-আলফাযুল কিতাবিয়্যাহ'। তার এই গ্রন্থ সম্পর্কে সাহিব ইবনে আব্বাদ বলেন, তিনি কিছু পৃষ্ঠায় আরবি ভাষার মূল্যবান মুক্তারাশি একত্র করেছেন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ৩২১।
৮০০. কুদামা ইবনে জাফর: আবুল ফারাজ কুদামা ইবনে জাফর ইবনে কুদামা (মৃত্যু: ৩৩৭ হি./৯৪৮ খ্রি.)। লিখন-শিল্পী। যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনশাস্ত্রে অভিজ্ঞ। বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : كتاب صناعة الكتابة، كتاب الخراج، كتاب نقد الشعر। দেখুন, ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১১, পৃ. ২২০।
৮০১. আবু হিলাল আল-আসকারি: আবু হিলাল হাসান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সাহল (৯২০-১০০৫ খ্রি.)। সাহিত্যে পণ্ডিত ছিলেন। কবিতা লিখেছেন। ফিকহেও ব্যুৎপত্তি ছিল। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : شرح الحماسة، جمهرة الأمثال الفروق في اللغة ديوان المعاني المحاسن في تفسير القرآن | দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১২, পৃ. ৫০।
৮০২. সাআলিবি: আবু মানসুর আবদুল মালিক ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাইল (৩৫০-৪২৯ হি./৯৬১-১০৩৮ খ্রি.)। ভাষা ও সাহিত্যের ইমাম। নিশাপুরের অধিবাসী ছিলেন। 'ইয়াতিমাতুদ দাহর' তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৯, পৃ. ১৩০।
৮০৩. ইবনে সিদাহ আল-আন্দালুসি: আবুল হাসান আলি ইবনে ইসমাইল, ইবনে সিদাহ আল-মুরসি নামে পরিচিত (৩৯৮-৪৫৮ হি./১০০৭-১০৬৬ খ্রি.)। ভাষাবিজ্ঞানী ও অভিধানবেত্তা। আন্দালুসের মুরসিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন দায়িনায়। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: المخصص المحكم والمحيط الأعظم، الأنيق، شرح إصلاح المنطق، شرح ما أشكل من شعر المتنبي، العلام في اللغة على الأجناس، العالم والمتعلم، الوافي في علم أحكام القوافي |
৮০৪. আদনান আল-খতিব, আল-মুজামুল আরাবি বাইনাল মাযি ওয়াল-হাযির, পৃ. ৩৭-৪৬।
৮০৫. আহমাদ মুখতার উমর, আল-বাহসুল লুগাবি ইনদাল আরাব, পৃ. ৩৪৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00