📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 সাহিত্য

📄 সাহিত্য


আরবরা ইসলামপূর্ব কাল থেকেই সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত। কিছু কিছু সাহিত্যের সূচনালগ্ন শনাক্ত করা সম্ভব হলেও-যেমন লাতিন সাহিত্য, ফারসি সাহিত্য-আরবি সাহিত্যের সূচনালগ্ন শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

আমাদের কাছে আরবদের যা-কিছু পৌঁছেছে তার মধ্যে সাহিত্য সবচেয়ে প্রাচীন। মুসলিমরা যদিও ইউনান (গ্রিস) থেকে নানা ধরনের জ্ঞানবিজ্ঞান গ্রহণ করেছে, কিন্তু তারা গ্রিক সাহিত্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রহণ করেননি। অথচ ইউনানি (গ্রিক) সাহিত্য ছিল সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বল। তা ছাড়া আরবি সাহিত্য ইউনানি (গ্রিক) সাহিত্য-চরিত্রের দ্বারাও প্রভাবিত হয়নি।

যদিও মুসলিমরা গ্রিক সাহিত্যের কিছু গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন, যেমন অ্যারিস্টটলের কবিতা, দুই বিখ্যাত গ্রিক মহাকাব্য ইলিয়াড(৬৭০) ও ওডিসি(৬৭১)। বরং উলটো ঘটনা ঘটেছে। ইউরোপীয় সাহিত্যে আরবি সাহিত্যের প্রভাব রয়েছে। যথাস্থানে আমরা তা দেখব। ইউরোপীয় সাহিত্য মূলত গ্রিক ও লাতিন সাহিত্যেই একটি জাত। কোনো সন্দেহ নেই যে সাহিত্য জাতির আত্মা থেকে উৎসারিত হয়, তেমনই আরবি সাহিত্যও আরবি ও ইসলামি আত্মার অন্তস্থল থেকে উৎসারিত হয়েছে।(৬৭২)

বিশেষজ্ঞগণ সাহিত্য বা সাহিত্যবিদ্যার সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, আরবি ভাষার মৌখিক ও লেখ্য রূপে যাবতীয় ভুলভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকা যায় যে বিদ্যার দ্বারা তাই সাহিত্যবিদ্যা। এই বিদ্যার উদ্দেশ্য হলো পদ্যে ও গদ্যে উৎকর্ষসাধন, একইসঙ্গে বুদ্ধিকে শাণিত করা এবং চিত্তকে বিশুদ্ধ করা।(৬৭৩) ইবনে খালদুন বলেন, ভাষাভাষীদের কাছে সাহিত্যবিদ্যার উদ্দেশ্য তার ফল বা পরিণতি। তা হলো আরবদের শৈলী ও রীতি-পদ্ধতি অনুসারে পদ্যে ও গদ্যে উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি সাধন।(৬৭৪)

আরবি 'আদব' (সাহিত্য) শব্দটির মূল অজ্ঞাত, ইসলামি যুগে শব্দটির বিকাশ কীভাবে ঘটেছিল তাও জানা যায় না। তার কারণ এই যে, আরবরা বিজিত দেশগুলোর সঙ্গে-যাদের পূর্ববর্তী সাহিত্য বিদ্যমান ছিল- নিজেদের মিশ্রণ এবং এসব দেশের অধিবাসীদের মধ্যে ইসলামের প্রচার-প্রসার ঘটিয়ে তাদের জীবনকে পরিবর্তন করে ফেলেছিল। ইসলামের শুরুর যুগে 'আদব' শব্দটি ধর্মীয় অর্থ বহন করত এবং সুন্নাহ বোঝাত। তারপর এটি যেকোনো কাজের রীতি ও পদ্ধতি বোঝাতে শুরু করল। তারপর সাধারণ সংস্কৃতি অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকল। প্রত্যেক জ্ঞানশাখার একটি অংশকে গ্রহণ করাও বোঝাত 'আদব' শব্দটি। অবশেষে 'আদব' শব্দটি সাধারণ অর্থেই গদ্যে ও পদ্যে উৎকর্ষ সাধনের ওপর সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।(৬৭৫)

পদ্য সাহিত্য: পদ্য মানে কবিতা। মানে ছন্দবদ্ধ ও প্রত্যেক পঙ্ক্তিতে অন্ত্যমিলযুক্ত কথা। আরবদের কাব্য সাহিত্য অত্যন্ত প্রাচীন এবং এটি তাদের পরিচয়ের অন্যতম বড় দিক। জাহিলি যুগের ছন্দবদ্ধ ও অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতাও আমরা পেয়েছি। আরবরা পদ্য বা কবিতাকে বিভিন্ন রীতি ও প্রকারে শৃঙ্খলিত করেছে। পরবর্তীকালে চারটি নামে এগুলোর নামকরণ করা হয়েছে: ১. রাজায (এই রীতিতে রচিত কাব্যকে আরজুযাহ বলা হয়। আরজুযাহ শব্দের বহুবচন আরাজিয) ২. কারিয (এটি রাজাযের বিপরীত) ৩. মাকবুয এবং ৪. মাবসুত। জাহিলি যুগে আরবরা তাদের কবিদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে মেলা বা বাজার বসাত। এতে বড় বড় কবি অংশগ্রহণ করতেন এবং তাদের কবিতা পাঠ করে শোনাতেন। যে কবি শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হতেন তার কবিতা কাবাঘরের খুঁটিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো এবং কবিতাটির নাম দেওয়া হতো মুআল্লাকাহ (ঝুলন্ত কবিতা)।

আরবি কবিতার বিষয়বস্তু অজস্র। এসব বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে গৌরব, প্রশংসা, নিন্দা, শোক, গুণগান, প্রেম ও প্রণয়। এগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো পারস্পরিক প্রতিযোগিতামূলক গৌরবগাথা রচনা, অর্থাৎ উপজাতীয় ও গোত্রগত কৌলীন্য ও বংশমর্যাদা প্রকাশ করে কবিতা রচনা। জাহিলি যুগে বিভিন্ন গোত্রের কবিদের মধ্যে গৌরবগাথা রচনার প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান হতো। আরবি সাহিত্যের উৎসগুলোতে এ ধরনের গৌরবগাথার প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। এসব গৌরবগাথা মাঝে মাঝেই যুদ্ধ ও রক্তপাত ঘটাত। ইসলাম আসার পর এ ধরনের বিদ্বেষমূলক গৌরবগাথা রচনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। জাহিলি যুগের শ্রেষ্ঠ কবিদের কয়েকজন হলেন : মুহালহিল(৬৭৬), ইমরুল কাইস(৬৭৭), নাবিগা যুবয়ানি(৬৭৮), যুহাইর ইবনে আবি সুলমা(৬৭৯), আনতারা ইবনে শাদ্দাদ(৬৮০), তারাফা ইবনুল আবদ(৬৮১), আলকামা আল-ফাহল(৬৮২), আ'শা(৬৮৩) ও লাবিদ ইবনে রবিআহ। জাহিলি যুগে কয়েকজন বিখ্যাত মহিলা কবিও ছিলেন, যেমন হিন্দ বিনতে আসাদ আদ-দাবাবিয়্যাহ ও খানসা।(৬৮৪)

ইসলাম আসার পর উপজাতীয়তা ও কৌলীন্য নিয়ে বড়াই ও গৌরবের প্রতিযোগিতা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়, যা ছিল আরবি কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু। এ ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ গৌরবগাথা রচনার ফলে আরবদের মধ্যে বিভেদ প্রকট হয়ে উঠেছিল, তাদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। ইসলাম কবিতার নতুন চরিত্র ও প্রকৃতি নির্দেশ করে এবং একটি ভারসাম্য পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে কবিতার বিচার করে। মিথ্যাবাদী মুনাফিক কবিদের নিন্দা প্রকাশ করে এবং সত্যবাদীদের প্রশংসা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ ( أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَتِ وَذَكَرُوا اللَّهَ كَثِيرًا وَانْتَصَرُوا مِنْ بَعْدِ مَا ظُلِمُوا وَسَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيَّ مُنْقَلَبٍ يَنْقَلِبُونَ
এবং কবিদের অনুসরণ করে বিভ্রান্তরাই। তুমি কি দেখো না তারা উদ্ভ্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? এবং তারা এমন কথা বলে যা তারা করে না। কিন্তু তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে ও অত্যাচারিত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে। অত্যাচারীরা শীঘ্রই জানবে কোন স্থলে তারা প্রত্যাবর্তন করবে।(৬৮৫)

উবাই ইবনে কাব রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«إِنَّ مِنَ الشَّعْرِ حِكْمَةً» নিশ্চয় কিছু কিছু কবিতা প্রজ্ঞাপূর্ণ।(৬৮৬)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
إِذَا خَفِيَ عَلَيْكُمْ شَيْءٌ مِنَ الْقُرْآنِ فَابْتَغُوْهُ فِي الشَّعْرِ؛ فَإِنَّهُ دِيْوَانُ الْعَرَبِ
তোমাদের কাছে কুরআনের কোনো শব্দ অস্পষ্ট মনে হলে কবিতায় তা খুঁজে দেখো। কারণ, তা আরবদের তথ্য-বিবরণী।(৬৮৭)

কবিরা ইসলামি দাওয়াতকে জোরালো রূপ দিয়েছেন। তারা মুক্তি ও বিজয়ের লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণের উদ্দেশ্যে স্তবগীতি রচনা করেছেন। জিহাদে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং আল্লাহর পথে শহিদ হতে উৎসাহ জুগিয়েছেন। মুজাহিদ শহিদগণের জন্য শোকগাথা রচনা করেছেন। ইসলামের শুরুর যুগের প্রখ্যাত কবিদের মধ্যে কয়েকজন হলেন: কাব ইবনে যুহাইর রা. (মৃ. ২৬ হি./৬৪৫ খ্রি.), আবু যুআইব আল-হুযালি রা. (মৃ. ২৭ হি./৬৪৮ খ্রি.-এর দিকে) এবং হাসসান ইবনে সাবিত রা. (মৃ. ৫৪ হি./৬৭৪ খ্রি.)। কাব ইবনে যুহাইর কাসিদায়ে বুরদা রচনা করেন।

উমাইয়া যুগে কবিতার উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনের বিস্তৃতি ঘটে। নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হয় কবিতায়, যেগুলো ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। কারণ খলিফারা, প্রশাসক ও গভর্নররা একদিক থেকে কবিতাকে গুরুত্ব দিতেন, সামাজিক জীবনের রূপান্তর ও বিবর্তন ঘটত অন্যদিকে থেকে, আরেকদিকে ছিল নতুন নতুন রাজনৈতিক দল-উপদলের আত্মপ্রকাশ। এই যুগে কাব্য-সাহিত্য উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি লাভ করে। কারণ রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালকরা তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই কবিতাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিত। তা ছাড়া সাধারণ জনমণ্ডলীর মধ্যে কবিতার প্রভাব ছিল ব্যাপক। উমাইয়া খলিফা ও আমিররা কবিতাকে তাদের প্রশংসার প্রচারযন্ত্রে পরিণত করেছিলেন। কবিতার দ্বারা তারা তাদের কর্তৃত্বকে অটুট রাখতে এবং প্রতিপক্ষ নেতৃবৃন্দকে ঘায়েল করারও চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে শিয়া, খারেজি ও যুবাইরি আমিররা(৬৮৮) এই দিকে এগিয়ে ছিলেন। উমাইয়া যুগের প্রখ্যাত কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আশা রবিআহ আবদুল্লাহ ইবনে খারিজা (মৃ. ১০০ হি./৭১৮ খ্রি.), আদি ইবনুল রিকা আল-আমিলি (মৃ. ৯৫ হি./৭১৪ খ্রি.), তিনি খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের সভাকবি ছিলেন। উমাইয়া যুগে ইরাকের শক্তিমান কবিদের মধ্যে যারা খলিফা ও আমিরদের পৃষ্ঠপোষকতা ও আদরযত্ন পেয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, জারির ইবনে আতিয়্যাহ (৩৩-১১০ হি./৬৫৩-৭২৮ খ্রি.), ফারাযদাক (৩৮-১১৪ হি./৬৪১-৭৩২ খ্রি.) ও আল-আখতাল আত-তাগলিবি (১৯-৯০ হি./৬৪০-৭০৮ খ্রি.)। উমাইয়াদের বিরোধী দলীয় কবিদের মধ্যে শিয়া কবিরা বিখ্যাত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ালি (মৃ. ৬৯ হি./৬৮৮ খ্রি.), আল-কুমাইত ইবনে যায়েদ (মৃ. ১২৬ হি./৭৪৩ খ্রি.)। খারিজি কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন তিরিম্মাহ ইবনুল হাকিম (মৃ. ১০০ হি.)। আবদুল্লাহ ইবনুল যুবাইর-দলীয় (যুবাইরি) কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইবনে কাইস আর-রুকাইয়াত (মৃ. ৮৫ হি.)। উমাইয়া যুগে গযল-রচয়িতা কবিদেরও আত্মপ্রকাশ ঘটে। গযল দুই ধরনের : ১. উযরি এবং ২. সারিহ। কবিরা এই দুই ধরনের গযলই রচনা করতেন। উযরি গযলের বৈশিষ্ট্য হলো বক্তব্যের সারল্য ও সততা এবং গাম্ভীর্য। এই শ্রেনীর গযল-রচয়িতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন জামিল বাসিনা(৬৮৯) (মৃত্যু : ৮২ হি./৭০১ খ্রি.) এবং লাইলা আল-আখিলিয়্যাহ(৬৯০) (মৃ. ৭৫ হি./৭০৪ খ্রি.)। সারিহ গযল-রচয়িতাদের মধ্যে বিখ্যাত হলেন উমর ইবনে আবি রবিআহ (২৩-৯৩ হি./৬৪৪-৭১১ খ্রি.)।(৬৯১)

আব্বাসি যুগ কবিতায় এক গভীর বিপ্লব প্রত্যক্ষ করে-পরিমাণেও, প্রকরণেও। কবিতার বিষয়বস্তু, অর্থ, শৈলী, শব্দের প্রয়োগে ব্যাপক পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটে। নতুন নতুন উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে কবিতা রচিত হতে থাকে, যা পূর্বে দেখা যায়নি। অন্যান্য বিষয়ও কবিতায় যুক্ত হয়। রাজনৈতিক কবিতা দুর্বল হয়ে পড়ে, নিস্তেজ হয়ে পড়ে বীরত্বপূর্ণ কবিতাগাথাও, উযরি গযলের গায়েও লাগে রুণতার বাতাস। অন্যদিকে শক্তিশালী হয়ে ওঠে স্তবগীতি ও শোক-কবিতা, প্রজ্ঞামণ্ডিত কবিতার সয়লাব বয়ে যায়, তপস্যামূলক ও দুনিয়াবিমুখতায় চিহ্নিত কবিতার জোয়ার ওঠে। সুফিতাত্ত্বিক, দার্শনিক, শিক্ষামূলক, কাহিনিমূলক এমন নানা প্রকারের কবিতা পাখা মেলে ছড়িয়ে পড়ে। নবাগত কবিরা অলংকারশাস্ত্রের বিভিন্ন অলংকার, যেমন শ্লেষালংকার ও বিরোধালংকার ইত্যাদি অপরিমিত ব্যবহার করেন। তারা শব্দের কারুকাজ ও অলংকরণে অধিক মনোযোগ দেন। ফলে কাব্য-আন্দোলন ও সাহিত্য-আন্দোলন উজ্জ্বলরূপ ধারণ করে। এই আন্দোলনে সামাজিক উপাদানগুলোর সঙ্গে কার্যকরী অর্থেই অন্যান্য উপাদানের সংশ্লেষ ঘটে। অনুবাদের পথ ধরে আরবে আগমন করে অনারব সাহিত্য-সংস্কৃতি। একদিকে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক রাজনৈতিক ও ধর্মাদর্শিক বিরোধ, অন্যদিকে তাদের সঙ্গে অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিরোধ সাহিত্য-আন্দোলনে প্রভাব বিস্তার করে। তা ছাড়া বাগদাদ ও অন্যান্য শহরে খলিফা ও শাসকরা কবিদের বেশ উৎসাহ দিতেন, উজ্জীবিত করতেন। আব্বাসি সাহিত্যের আকাশে বড় বড় কবি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলে ওঠেন। উদাহরণ হিসেবে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে: বাশশার ইবনে বাব্দ (৯৬-১৬৮ হি./৭১৪-৭৮৪ খ্রি.), আবু নাওয়াস (১২৯-১৯৮ হি./৭৪৭-৮১৪ খ্রি.), আবু তাম্মাম হাবিব ইবনে আওস আত-তায়ি (মৃ. ২১৮ হি.), আল-বুহতুরি (২০৪-২৮৪ হি./৮১৯-৮৯৭ খ্রি.), ইবনে রুমি (২২১-২৮৩ হি./৮৩৫-৮৯৬ খ্রি.), আবুত তাইয়িব আল-মুতানাব্বি (৩০৩-৩৫৪ হি./৯১৫-৯৬৫ খ্রি.), আবু ফিরাস হামদানি (৩২০-৩৫৭ হি./৯৩২-৯৬৮ খ্রি.), আবুল আলা মাআররি (৩৬৩-৪৪৯ হি./৯৭৩-১০৫৭ খ্রি.)।(৬৯২)

আন্দালুসীয় কবিরা আন্দালুসে কাব্যের 'মুওয়াশশাহ' প্রকরণের উদ্ভাবন করেন এবং এটিকে বিকশিত করেন। কবিতার এই প্রকরণের বিভিন্ন শৈলীতে দক্ষতা ও নৈপুণ্যের পরিচয় দেন। আরবি কবিতার গঠন-উৎকর্ষে 'মুওয়াশশাহ' প্রকরণটি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ। এটি কবিকে কবিতার অন্ত্যমিল নিয়ে কারিকুরি করার স্বাধীনতা এনে দেয়। ছন্দ নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষার স্বাধীনতাও কবিরা পান। কাব্যের 'মুওয়াশশাহ' প্রকরণের প্রচার-প্রসারের ফলে উপজাতীয় জাযাল(৬৯৩) সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। ইবনে খালদুন বলেন, আন্দালুসের ভূখণ্ডে কবিতাচর্চা বেড়ে গেল। কবিতার প্রকরণ, বিষয় ও প্রবণতা মার্জিত রূপ নিলো। শৈলীবদ্ধকরণ (স্টাইলাইজেশন) তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছল। ফলে আন্দালুসের পরবর্তী কবিরা কবিতার একটি প্রকরণ উদ্ভাবন করেন এবং এটির নাম দেন 'মুওয়াশশাহ'।(৬৯৪) আন্দালুসীয় বিখ্যাত কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইবনে যাইদুন (৩৯৪-৪৬৩ হি.) এবং সেভিলের শাসক মুতামিদ ইবনে আব্বাদ (৪৩১-৪৮৮ হি./১০৪০-১০৯৫ খ্রি.)।

গদ্য সাহিত্য: গদ্য মানে অন্ত্যমিলহীন কথা। সমৃদ্ধি ও উর্বরতার দিক থেকে এটি পদ্যের চেয়ে কম নয়। ইসলামের শুরুর যুগেই গদ্য সাহিত্যের সাবলীল ও সহজ সূচনা দেখা যায়। বাক্যগুলো ছোট ছোট এবং কাঠামোও ভিন্ন ভিন্ন। যেমন: পত্র, ভাষণ-বক্তৃতা, হাদিস, উপমা, কাহিনি ইত্যাদি। সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে গদ্য সাহিত্যেরও অগ্রগতি ঘটে। গদ্যের বিষয়বস্তুতেও বৈচিত্র্য আসে এবং প্রকরণেও দেখা যায় ভিন্নতা। তাই লিখন-শিল্পের প্রকাশ ঘটে এবং উমাইয়া যুগে তা উজ্জ্বল রূপ ধারণ করে। প্রথম যুগের বড় লিখন-শিল্পীদের অন্যতম হলেন আবদুল হামিদ আল-কাতিব (মৃ. ১৩২ হি.)। তিনি লিখনের শর্তাবলি তার বিখ্যাত পুস্তিকাগুলোতে সন্নিবিষ্ট করেছেন এবং লিখন-শিল্পীদের সামনে তা তুলে ধরেছেন। এমনকি এ কথা প্রচলিত আছে যে, লিখন-শিল্প শুরু হয়েছে আবদুল হামিদের হাতে এবং এর সমাপ্তি ঘটেছে ইবনুল আমিরের হাতে।

আব্বাসি যুগে গদ্য-শিল্প বিস্তার লাভ করে। এই সময়ে যারা গদ্য-শিল্পে খ্যাতি লাভ করেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন জাহিয (১৫০-২৫৫ হি./৭৬৭-৮৬৮ খ্রি.)। তিনি গদ্যের উৎকর্ষ সাধন করেন এবং গদ্যের দিগন্ত বিস্তৃত করেন। গদ্যের ইমামে পরিণত হন তিনি। ইবনুল মুকাফফাও (১০৬-১৪২ হি./৭২৪-৭৫৯ খ্রি.) গদ্য সাহিত্যে জাহিযের মতো অবদান রাখেন। হিজরি চতুর্থ শতকে গদ্য সাহিত্য তার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়। এই সময় অন্ত্যমিলযুক্ত গদ্য রচনা করে খ্যাতি লাভ করেন আবু হাইয়ান আত-তাওহিদি (মৃ. ৪০০ হি.-এর দিকে) এবং ইবনুল আমিদ (মৃ. ৩৬৬ হি.) ও অন্যরা। এরপর গদ্যের উপর দিয়ে শাব্দিক কারুকাজ ও অলংকারের প্রবল তরঙ্গ বয়ে যায়। অর্থগত সূক্ষ্মতার চেয়ে শব্দের কারিকুরিতেই অপচয় ঘটে বেশি। পরবর্তী কয়েকজন লেখকের মাকামা-সাহিত্যে(৬৯৫) ও চিঠিপত্রে এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চিঠিপত্র হলো শৈল্পিক গদ্যের একটি প্রকার। চিঠিপত্র দুই ধরনের: ১. সরকারি বা সাধারণ চিঠি এবং ২. ব্যক্তিগত বা বিশেষ চিঠি। ইসলামের শুরুর যুগে ও উমাইয়া খিলাফতকালে প্রাতিষ্ঠানিক চিঠিপত্র ছিল সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট, এগুলোতে লৌকিকতার কোনো স্পর্শ ছিল না। আব্বাসি যুগ থেকে সরকারি দপ্তরগুলোতে কাতেব বা মুন্সি নিয়োগ দেওয়া হয়, তারা চিঠিপত্রে ভাষার কারুকাজ ও শব্দের কারিকুরি দেখাতে শুরু করেন। চিঠিপত্রের বিখ্যাত লেখকদের মধ্যে রয়েছেন আবদুল হামিদ আল-কাতিব, ইবনুল আমিদ, সাহিব ইবনে আব্বাদ প্রমুখ। বিশেষ বা ব্যক্তিগত অথবা ভ্রাতৃত্বসুলভ চিঠি হলো, যা এক বন্ধু অপর বন্ধুকে লিখে থাকে। এ ধরনের চিঠির বিখ্যাত লেখকদের মধ্যে ছিলেন আল-জাহিয ও ইবনে যাইদুন।

আরবি গদ্যের আরেকটি প্রকার হলো খুতবা বা বক্তৃতা। মুসলিমরা কবিতার পর বক্তৃতার ব্যাপারেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ বক্তৃতা মূলত বাগ্মিতাপূর্ণ কথা, যা সাহসিকতা ও উপস্থিত বুদ্ধিতে ভাস্বর। জাহিলি যুগে ও ইসলামের শুরুর যুগে বক্তৃতার বড় ভূমিকা রয়েছে। আরবরা তাদের কিশোর-যুবাদেরকে তাদের শিশুকাল থেকেই বক্তৃতার প্রশিক্ষণ দিত। সাহিত্যের গ্রন্থগুলোতে বেশ কিছু অলংকারপূর্ণ বক্তৃতা সংকলিত হয়েছে। রাশেদি যুগের বিখ্যাত খতিব বা বক্তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন চতুর্থ খলিফা আলি ইবনে আবু তালিব। 'নাহজুল বালাগাহ' গ্রন্থে তার অলংকারসমৃদ্ধ বক্তৃতাসমূহ ও চিঠিপত্র সংকলিত হয়েছে। এই গ্রন্থের অধিকাংশ বক্তৃতাই আলি রা.-এর নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, যদিও বাস্তবে তিনি সেগুলোর বক্তা নন।

উমাইয়া যুগে বক্তৃতার জোয়ার বয়ে যায়। কয়েকজন আমির ও খলিফা, যেমন আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান, হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ, যিয়াদ ইবনে আবিহি ছিলেন বিখ্যাত বক্তা। তারা জনমণ্ডলীর কাছে তাদের উদ্দেশ্য পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের নীতি-আদর্শ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য মেনে নিতে জনমণ্ডলীকে প্রভাবিত করার জন্য বক্তৃতার ওপর নির্ভর করতেন। উমাইয়া যুগ আমাদের জন্য বিপুল সংখ্যক উৎকৃষ্ট বক্তৃতার উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছে, এসব বক্তৃতা বাক্যে যেমন অলংকারপূর্ণ তেমনই চিন্তায়ও অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

আব্বাসি যুগে বক্তৃতা-শিল্পে পূর্ববর্তী যুগের তুলনায় বড় ধরনের অধঃপতন ঘটে। আব্বাসি খলিফাদের মধ্যে বক্তা হিসেবে কেউই খ্যাতি বা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারেননি।

মুসলিমরা উপমা-সাহিত্যেও গুরুত্ব প্রদান করেন। তারা উপমা সংগ্রহ করেন এবং সেগুলোকে গ্রন্থাকারে সংকলন করেন। উপমা-সাহিত্যের বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি নিম্নরূপ : ১. মাজমাউল আমসাল, আবুল ফজল আল-মাইদানি(৬৯৬) ২. আল-মুসতাকসা ফি আমসালিল আরাব, আল-যামাখশারি(৬৯৭), এটি আরবি উপমাসমগ্র, যেখানে উপমাগুলোকে আরবি বর্ণমালাভিত্তিক সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে।

কাহিনি ও গল্প সাহিত্যে মুসলিমদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার অনেক বিশাল। মানুষ এখনো এগুলো পড়ে এবং এসব কাহিনির দিগন্তবিস্তৃত প্রেক্ষাপট, ভাবনার মাধুর্য ও ঘটনার অভিনবত্বে বিমুগ্ধ হতেন। সম্ভবত এসব কাহিনির মধ্যে আক্স গোত্রের কৃষ্ণবর্ণ ঘোড়সওয়ার আনতার বা আনতারার কাহিনি(৬৯৮), ইয়ামেনের বিখ্যাত বীর সাইফ ইবনে যি-ইয়াযানের কাহিনি(৬৯৯), মাগরিবের (মরক্কোর) বীরপুরুষ আবু যায়দ আল-হিলালির কাহিনি এবং মিশরের সুলতান জাহির বাইবার্সের কাহিনি, এ ছাড়াও মোগল-বিরোধী যুদ্ধ ও ক্রুসেড যুদ্ধের বীর সেনানীদের বীরত্বগাথা সবচেয়ে বিখ্যাত।

হিজরি চতুর্থ শতকে আরবি সাহিত্যে ছোট গল্পের ভিত প্রস্তুত করা হয়, এগুলোকে বলা হয় মাকামাত। বিখ্যাত মাকামাত-রচয়িতাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বদিউযযামান আল-হামাদানি (৩৫৮-৩৯৮ হি./৯৬৯-১০০৭ খ্রি.)। তিনি চারশ মাকামাত রচনা করেছেন। এই চারশ মাকামাত রচনা করা হয়েছে দুজন বীরপুরুষকে নিয়ে, তাদের একজন হলেন ঈসা ইবনে হিশাম এবং দ্বিতীয়জন হলেন আবুল ফাত্‌হ আল-ইস্কান্দারি। আরও আছেন ইবনে নাকিয়া আল-বাগদাদি (৪১০-৪৮৫ হি./১০২০-১০৯২ খ্রি.)। তিনি আল-হামদানির পদ্ধতি অনুসরণ করে গদ্য রচনা করেন। আরও আছেন আল-হারিরি(৭০০) (৪৪৬-৫১৬ হি./১০৫৪-১১২২ খ্রি.)। তিনি তার মাকামাতে আবু যায়দ আস-সারুজি এবং হারিস ইবনে হাম্মام নামের দুজন ব্যক্তির সাহসিকতার কাহিনি বর্ণনা করেছেন। এ দুজন ব্যক্তিই অত্যন্ত মেধাবী।(৭০১)

সাহিত্যের বিখ্যাত গ্রন্থাবলি সম্পর্কে ইবনে খালদুন বলেছেন, আরবি (ভাষা ও) সাহিত্যের ভিত্তি হলো চারটি দিওয়ান (সংকলনগ্রন্থ): ১. আদাবুল কাতিব, ইবনে কুতাইবা দিনাওরি(৭০২) ২. আল-কামিল (ফিল-লুগাহ ওয়াল-আদাব), আল-মুবাররাদ(৭০৩) ৩. আল-বায়ান ওয়াত-তাবয়িন, আল-জাহিয(৭০৪) ৪. আন-নাওয়াদির, আবু আলি আল-কালি(৭০৫)।(৭০৬) আরবি সাহিত্যের আরও কিছু বিখ্যাত গ্রন্থ রয়েছে, এখানে সেগুলোর নাম না নিলেই নয়: আল-ইদুল ফারিদ, ইবনে আব্দ রাব্বিহি (মৃ. ৩২৮ হি.); আল-আগানি, আবুল ফারাজ আল-ইস্পাহানি (মৃ. ৩৫৬ হি.); বাহজাতুল মাজালিস ওয়া উনসুল মুজালিস, ইবনে আবদুল বার ইত্যাদি।

এই গ্রন্থের শেষ অধ্যায়ে আমরা আল্লাহ চাহে তো বিশ্বের অন্যান্য সাহিত্যের ওপর ইসলামি আরবি সাহিত্যের প্রভাব সম্পর্কে জানব।

টিকাঃ
৬৭০. ইলিয়াড গ্রিক মহাকাব্য। প্রাচীন গ্রিসের ইলিওন শহরের নামানুসারে এই মহাকাব্যের নামকরণ করা হয়। মহাকবি হোমার এই মহাকাব্যের রচয়িতা। এটি গ্রিক ভাষায় রচিত ও ২৪টি সর্গে বিভক্ত। এর বিষয় ট্রয়ের যুদ্ধ। এতে ১৬,০০০ পঙ্ক্তি কবিতা আছে। যুদ্ধ সংঘটিত হয় হেলেন নামের এক নারীকে কেন্দ্র করে। যুদ্ধে গ্রিকদের সেরা বীর ছিলেন অ্যাকিলিস আর ট্রয়ের পক্ষে ছিলেন হেক্টর। যুদ্ধ যখন শেষ পর্যায়ে তখন হেক্টর অ্যাকিলিস কর্তৃক নিহত হন এবং এর মধ্য দিয়ে মূলত ট্রয়বাসীর পরাজয় নিশ্চিত হয়। যুদ্ধ শেষে গ্রিক সেনারা সুরক্ষিত ও সাজানো নগরী ট্রয় জ্বালিয়ে দেয়। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭১. ওডিসিও কবি হোমারের রচিত মহাকাব্য। এই কবিতায় ট্রয় নগরীর ধ্বংসের পরে ইথাকার রাজা ওডিসিউসের আপন ভূমিতে ফিরে আসার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে তাকে পোহাতে হয়েছে নানা ঝড়ঝাপটা, সংগ্রাম করতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে। নিজের সহযোগযোদ্ধাদের হারিয়ে তাকে একাই ফিরতে হয়েছে ইথাকায়। হোমার সেই কাহিনিই তার ওডিসি মহাকাব্যে তুলে ধরেছেন। আধুনিক গ্রহণযোগ্য সংস্করণে ইলিয়াডের ১৫,৬৯৩টি ছত্র রয়েছে। এটি আইওনিক গ্রিক ও অন্যান্য উপভাষার সংমিশ্রণে গঠিত হোমারীয় গ্রিক ভাষায় রচিত। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭২. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ১৯৭।
৬৭৩. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৪৪।
৬৭৪. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৫৩।
৬৭৫. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ১৯৮।
৬৭৬. নাজদের অধিবাসী এবং কবি ইমরুল কাইসের মামা। আসল নাম আদি ইবনে রবিআহ ইবনুল হারিস আত-তাগলিবি। ৫৩১ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭৭. ইমরুল কাইস হলেন ৬ষ্ঠ শতকের আরবি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি। তার পুরো নাম হল ইমরুল কাইস জুনদুহ ইবনে হুজর আল-কিন্দি। তার পিতার নাম হুজর ইবনুল হারিছ এবং মায়ের নাম ফাতিমা বিনতে রাবিয়াহ আল-তাগলিবি। তিনি আরবের নাজদ এলাকায় ৬ষ্ঠ শতকের প্রথম দিকে জন্মগ্রহণ করেন এবং রাজকীয়ভাবে প্রাথমিক জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি বাল্যকালে কবিতা রচনা শুরু করলে তার পিতা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। তারপর তিনি বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়ে মদ্যপায়ী জীবন শুরু করেন। তার প্রেমিকার নাম ছিল উনাইযা। ইমরুল কাইস আরবি ভাষায় লেখা বিখ্যাত কাব্য সংকলন মুআল্লাকার অন্যতম ও শ্রেষ্ঠ লেখক। এই মহান কবি ৫৪০ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭৮. ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তার একটি কবিতাকে ঝুলন্ত গীতিকার অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হয়। তার আসল নাম যিয়াদ ইবনে মুআবিয়া ইবনে দাব্বাব। তার কবিতা শিল্পকুশলতা ও ছন্দমাধুর্যে উৎকৃষ্ট এবং সর্বাপেক্ষা সাবলীল। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭৯. শ্রেষ্ঠ কবিত্রয়ের অন্যতম। অন্য দুজন হলেন ইমরুল কাইস ও নাবিগা। জীবৎকাল : ৫২০- ৬০৯ খ্রিষ্টাব্দ। কবিদের মধ্যে প্রজ্ঞাবান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তলাভের এক বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮০. আনতারা ইবনে শাদ্দাদ ইবনে কাররাদ আল-আবসি (৫২৫-৬০৮ খ্রি.) ছিলেন বিখ্যাত ইসলাম-পূর্ব আরব কবি। ঘোড়সওয়ার হিসেবেও খ্যাতি ছিল তার। কবিতার জন্য যেমন, তেমনই দুঃসাহসিক জীবনের জন্য বিখ্যাত। তিনি কাবাঘরের দেওয়ালে ঝুলন্ত সপ্তগীতিকার অন্যতম কবি। আনতারার কবিতাগুলো ভিলহেল্ম অলওয়ার্ড-এর লেখা 'দা ডিভান্স অব দা সিক্স এনশিয়েন্ট এরাবিক পোয়েটস (লন্ডন, ১৮৭০) প্রকাশিত হয়। এটি পরবর্তীকালে বৈরুত থেকে (১৮৮৮) আলাদাভাবে প্রকাশিত হয়। ৬০৮ খ্রি. মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮১. তারাফা ইবন আবদ জাহিলি প্রথম সারির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তিনি বিখ্যাত ঝুলন্ত সপ্তগীতিকার কবিদের একজন। বাহরাইনের এক অভিজাত পরিবারে ৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দের দিকে জন্মগ্রহণ করেন। হিরার অধিপতি আমর ইবনে হিন্দ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গকবিতা রচনার অভিযোগে তারাফাকে হত্যার নির্দেশ দেন। মাত্র ২৬ বছর বয়সে ৫৬৯ খ্রিষ্টাব্দে তারাফার জীবনাবসান ঘটে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮২. আলকামা ইবনে আবাদাহ ইবনে নাশিরাহ ইবনে কাইস। আলকামা আল-ফাহল নামে পরিচিত। ৬০৩ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। জাহিলি যুগের প্রথম স্তরের কবি।
৬৮৩. মাইমুন ইবনে কাইস ইবনে জানদাল। আ'শা শব্দের অর্থ রাতকানা। তিনি রাতে কম দেখতেন বলে এই নামকরণ হয়েছে। জাহিলি যুগের প্রথম স্তরের কবি। জন্ম ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে এবং মৃত্যু ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮৪. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ১৯৮-২০০।
৬৮৫. সুরা শুআরা: আয়াত ২२৪-২২৭।
৬৮৬. বুখারি, কিতাব: আল-আদব, বাব: মা ইয়াজুযু মিনাশ-শি'রি ওয়ার-রাজযি ওয়া মা ইয়ুকরাহু মিনহু, হাদিস নং ৫৭৯৩; আবু দাউদ, হাদিস নং ৫০১০; তিরমিজি, হাদিস নং ২৮৪৪; ইবনে মাজাহ, ৩৭৫৫।
৬৮৭. মুসতাদরাকে হাকেম, কিতাবুত তাফসির, বাব: তাফসিরু সুরাতি নুন, হাদিস নং ৩৮৪৫।
৬৮৮. আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.-এর খিলাফতকালে (৬৪-৭৩ হি.) যারা আমির ও গভর্নর ছিলেন।
৬৮৯. জামিল ইবনে মা'মার, বা জামিল ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মা'মার আল-উযরি আল- কুযায়ি।-অনুবাদক
৬৯০. লাইলা বিনতে আবদুল্লাহ আর-রিহাল ইবনে শাদ্দাদ ইবনে কা'ব আল-আখিলিয়্যাহ।
৬৯১. রহিম কাযিম মুহাম্মাদ আল-হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আল-আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭৩-১৭৪।
৬৯২. রহিম কাযিম মুহাম্মাদ আল-হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আল-আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭৪।
৬৯৩. জাযাল )زجل( : কথ্য উপভাষায় রচিত মৌখিক স্ট্রফিক কাব্যের একটি ঐতিহ্যবাহী রূপ। জাযালের সঠিক উৎস সম্পর্কে তেমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে জাযালের প্রথম কবি হিসেবে আন্দালুসের আবু বকর ইবনে কুযমান ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। তার জীবৎকাল ১০৭৮-১১৬০ খ্রিষ্টাব্দ। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৯৪. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৮৩।
৬৯৫. আরবি গদ্য-সাহিত্যের একটি আঙ্গিক।
৬৯৬. আল-মাইদানি : আবুল ফজল আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে ইবরাহিম (মৃ. ৫১৮ হি./১১২৪ খ্রি.)। সাহিত্যিক, গবেষক। নিসাপুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। খাইরুদ্দিন আয-যিরিকলি তার 'মাজমাউল আমসাল' গ্রন্থ সম্পর্কে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এ ধরনের গ্রন্থ ইতিপূর্বে লেখা হয়নি। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ১, পৃ. ১৪৮; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২১৪।
৬৯৭. আয-যামাখশারি: জারুল্লাহ আবুল কাসিম মাহমুদ ইবনে উমর আল-খাওয়ারিজমি (৪৬৭-৫৩৮ হি./১০৭৫-১১৪৪ খ্রি.)। ধর্মীয় জ্ঞান, তাফসির, ভাষা ও সাহিত্যের ইমাম। তার রচিত গ্রন্থ অনেক। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কুরআনুল কারিমের তাফসির 'আল-কাশশাফ'। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১৬৮-১৭১।
৬৯৮. কবি আনতারা ইবনে শাদ্দাদ ও তার প্রেমাস্পদ আবলার কাহিনি।-অনুবাদক।
৬৯৯. ইয়ামেনের প্রাচীন হিময়ারি বাদশাহ সাইফ ইবনে যি-ইয়াযান বা মাদিকারিব ইবনে আবু মুররাহ (৫১৬-৫৭৬ খ্রি.)-এর কাহিনি। তিনি ইয়ামেন থেকে হাবশিদের বিতাড়িত করেছিলেন।- অনুবাদক।
৭০০. আবু মুহাম্মাদ আল-কাসিম ইবনে আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে উসমান আল-হারিরি আল-বসরি আল-হারামি।-অনুবাদক
৭০১. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ২০৬-২১০; রহিম কাযিম মুহাম্মাদ হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭৫-১৭৭।
৭০২. ইবনে কুতাইবা আদ-দিনাওরি : আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবনে মুসলিম ইবনে কুতাইবা আদ-দিনাওরি (২১৩-২৭৬ হি./৮২৮-৮৮৯ খ্রি.)। মুফাসসির, ফকিহ, সাহিত্যবিশারদ, ঐতিহাসিক ও ভাষাবিদ। হিজরি তৃতীয় শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম। কুফায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন বাগদাদে। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৩, পৃ. ২৯৬।
৭০৩. আল-মুবাররাদ: মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে আবদুল আকবার ইবনে উমাইর ইবনে হাসসান (২১০-২৮৬ হি./৮২৬-৮৯৯ খ্রি.)। ভাষাবিজ্ঞান ও ব্যাকরণের ইমাম। বসরায় জন্মগ্রহণ করেন ও বেড়ে ওঠেন। মৃত্যুবরণ করেন বাগদাদে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'আল-কামিল ফিল- লুগাহ ওয়াল-আদাব', 'আল-ফাদিল', 'আল-মুকতাদাব', 'শারহু লামিয়াতিল আরাব'। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৩, পৃ. ৫৭৬।
৭০৪. আল-জাহিয: আবু উসমান আমর ইবনে বাহর আল-কিনানি (১৬৩-২৫৫ হি./৭৮০-৮৬৯ খ্রি.)। আরবি সাহিত্যের বড় ইমাম এবং মুতাযিলা সম্প্রদায়ের জাহিযিয়্যাহ গোত্রের প্রধান। বসরায় জন্মগ্রহণ ও মৃত্যুবরণ করেন। তার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে। যেমন: 'আল- বায়ান ওয়াত-তাবয়িন', 'কিতাবুল হায়াওয়ান', 'আল-বুখালা', 'আল-মাহাসিন ওয়াল-আযদাদ'। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ২, পৃ. ১২১-১২২।
৭০৫. আবু আলি আল-কালি: ইসমাইল ইবনুল কাসিম ইবনে ইযুন (২৮৮-৩৫৬ হি./৯০১-৯২৭ খ্রি.)। ভাষা, কবিতা ও সাহিত্যের বিষয়াবলি তিনি সবচেয়ে বেশি মুখস্থ রেখেছিলেন। ফুরাত নদীর পূর্ব তীরে মানযিকাবৃন্দ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং কর্ডোভায় মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'কিতাবুল আমালি', 'আল-বারিউ ফিল-লুগাহ', 'আল-আমসাল' ইত্যাদি। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৯, পৃ. ১৪২।
৭০৬. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৫৩।

আরবরা ইসলামপূর্ব কাল থেকেই সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত। কিছু কিছু সাহিত্যের সূচনালগ্ন শনাক্ত করা সম্ভব হলেও-যেমন লাতিন সাহিত্য, ফারসি সাহিত্য-আরবি সাহিত্যের সূচনালগ্ন শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

আমাদের কাছে আরবদের যা-কিছু পৌঁছেছে তার মধ্যে সাহিত্য সবচেয়ে প্রাচীন। মুসলিমরা যদিও ইউনান (গ্রিস) থেকে নানা ধরনের জ্ঞানবিজ্ঞান গ্রহণ করেছে, কিন্তু তারা গ্রিক সাহিত্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রহণ করেননি। অথচ ইউনানি (গ্রিক) সাহিত্য ছিল সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বল। তা ছাড়া আরবি সাহিত্য ইউনানি (গ্রিক) সাহিত্য-চরিত্রের দ্বারাও প্রভাবিত হয়নি।

যদিও মুসলিমরা গ্রিক সাহিত্যের কিছু গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন, যেমন অ্যারিস্টটলের কবিতা, দুই বিখ্যাত গ্রিক মহাকাব্য ইলিয়াড(৬৭০) ও ওডিসি(৬৭১)। বরং উলটো ঘটনা ঘটেছে। ইউরোপীয় সাহিত্যে আরবি সাহিত্যের প্রভাব রয়েছে। যথাস্থানে আমরা তা দেখব। ইউরোপীয় সাহিত্য মূলত গ্রিক ও লাতিন সাহিত্যেই একটি জাত। কোনো সন্দেহ নেই যে সাহিত্য জাতির আত্মা থেকে উৎসারিত হয়, তেমনই আরবি সাহিত্যও আরবি ও ইসলামি আত্মার অন্তস্থল থেকে উৎসারিত হয়েছে।(৬৭২)

বিশেষজ্ঞগণ সাহিত্য বা সাহিত্যবিদ্যার সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, আরবি ভাষার মৌখিক ও লেখ্য রূপে যাবতীয় ভুলভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকা যায় যে বিদ্যার দ্বারা তাই সাহিত্যবিদ্যা। এই বিদ্যার উদ্দেশ্য হলো পদ্যে ও গদ্যে উৎকর্ষসাধন, একইসঙ্গে বুদ্ধিকে শাণিত করা এবং চিত্তকে বিশুদ্ধ করা।(৬৭৩) ইবনে খালদুন বলেন, ভাষাভাষীদের কাছে সাহিত্যবিদ্যার উদ্দেশ্য তার ফল বা পরিণতি। তা হলো আরবদের শৈলী ও রীতি-পদ্ধতি অনুসারে পদ্যে ও গদ্যে উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি সাধন।(৬৭৪)

আরবি 'আদব' (সাহিত্য) শব্দটির মূল অজ্ঞাত, ইসলামি যুগে শব্দটির বিকাশ কীভাবে ঘটেছিল তাও জানা যায় না। তার কারণ এই যে, আরবরা বিজিত দেশগুলোর সঙ্গে-যাদের পূর্ববর্তী সাহিত্য বিদ্যমান ছিল- নিজেদের মিশ্রণ এবং এসব দেশের অধিবাসীদের মধ্যে ইসলামের প্রচার-প্রসার ঘটিয়ে তাদের জীবনকে পরিবর্তন করে ফেলেছিল। ইসলামের শুরুর যুগে 'আদব' শব্দটি ধর্মীয় অর্থ বহন করত এবং সুন্নাহ বোঝাত। তারপর এটি যেকোনো কাজের রীতি ও পদ্ধতি বোঝাতে শুরু করল। তারপর সাধারণ সংস্কৃতি অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকল। প্রত্যেক জ্ঞানশাখার একটি অংশকে গ্রহণ করাও বোঝাত 'আদব' শব্দটি। অবশেষে 'আদব' শব্দটি সাধারণ অর্থেই গদ্যে ও পদ্যে উৎকর্ষ সাধনের ওপর সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।(৬৭৫)

পদ্য সাহিত্য: পদ্য মানে কবিতা। মানে ছন্দবদ্ধ ও প্রত্যেক পঙ্ক্তিতে অন্ত্যমিলযুক্ত কথা। আরবদের কাব্য সাহিত্য অত্যন্ত প্রাচীন এবং এটি তাদের পরিচয়ের অন্যতম বড় দিক। জাহিলি যুগের ছন্দবদ্ধ ও অন্ত্যমিলযুক্ত কবিতাও আমরা পেয়েছি। আরবরা পদ্য বা কবিতাকে বিভিন্ন রীতি ও প্রকারে শৃঙ্খলিত করেছে। পরবর্তীকালে চারটি নামে এগুলোর নামকরণ করা হয়েছে: ১. রাজায (এই রীতিতে রচিত কাব্যকে আরজুযাহ বলা হয়। আরজুযাহ শব্দের বহুবচন আরাজিয) ২. কারিয (এটি রাজাযের বিপরীত) ৩. মাকবুয এবং ৪. মাবসুত। জাহিলি যুগে আরবরা তাদের কবিদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে মেলা বা বাজার বসাত। এতে বড় বড় কবি অংশগ্রহণ করতেন এবং তাদের কবিতা পাঠ করে শোনাতেন। যে কবি শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হতেন তার কবিতা কাবাঘরের খুঁটিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো এবং কবিতাটির নাম দেওয়া হতো মুআল্লাকাহ (ঝুলন্ত কবিতা)।

আরবি কবিতার বিষয়বস্তু অজস্র। এসব বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে গৌরব, প্রশংসা, নিন্দা, শোক, গুণগান, প্রেম ও প্রণয়। এগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো পারস্পরিক প্রতিযোগিতামূলক গৌরবগাথা রচনা, অর্থাৎ উপজাতীয় ও গোত্রগত কৌলীন্য ও বংশমর্যাদা প্রকাশ করে কবিতা রচনা। জাহিলি যুগে বিভিন্ন গোত্রের কবিদের মধ্যে গৌরবগাথা রচনার প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান হতো। আরবি সাহিত্যের উৎসগুলোতে এ ধরনের গৌরবগাথার প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। এসব গৌরবগাথা মাঝে মাঝেই যুদ্ধ ও রক্তপাত ঘটাত। ইসলাম আসার পর এ ধরনের বিদ্বেষমূলক গৌরবগাথা রচনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। জাহিলি যুগের শ্রেষ্ঠ কবিদের কয়েকজন হলেন : মুহালহিল(৬৭৬), ইমরুল কাইস(৬৭৭), নাবিগা যুবয়ানি(৬৭৮), যুহাইর ইবনে আবি সুলমা(৬৭৯), আনতারা ইবনে শাদ্দাদ(৬৮০), তারাফা ইবনুল আবদ(৬৮১), আলকামা আল-ফাহল(৬৮২), আ'শা(৬৮৩) ও লাবিদ ইবনে রবিআহ। জাহিলি যুগে কয়েকজন বিখ্যাত মহিলা কবিও ছিলেন, যেমন হিন্দ বিনতে আসাদ আদ-দাবাবিয়্যাহ ও খানসা।(৬৮৪)

ইসলাম আসার পর উপজাতীয়তা ও কৌলীন্য নিয়ে বড়াই ও গৌরবের প্রতিযোগিতা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়, যা ছিল আরবি কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু। এ ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ গৌরবগাথা রচনার ফলে আরবদের মধ্যে বিভেদ প্রকট হয়ে উঠেছিল, তাদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। ইসলাম কবিতার নতুন চরিত্র ও প্রকৃতি নির্দেশ করে এবং একটি ভারসাম্য পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে কবিতার বিচার করে। মিথ্যাবাদী মুনাফিক কবিদের নিন্দা প্রকাশ করে এবং সত্যবাদীদের প্রশংসা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ ( أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَتِ وَذَكَرُوا اللَّهَ كَثِيرًا وَانْتَصَرُوا مِنْ بَعْدِ مَا ظُلِمُوا وَسَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيَّ مُنْقَلَبٍ يَنْقَلِبُونَ
এবং কবিদের অনুসরণ করে বিভ্রান্তরাই। তুমি কি দেখো না তারা উদ্ভ্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? এবং তারা এমন কথা বলে যা তারা করে না। কিন্তু তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে ও অত্যাচারিত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে। অত্যাচারীরা শীঘ্রই জানবে কোন স্থলে তারা প্রত্যাবর্তন করবে।(৬৮৫)

উবাই ইবনে কাব রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«إِنَّ مِنَ الشَّعْرِ حِكْمَةً» নিশ্চয় কিছু কিছু কবিতা প্রজ্ঞাপূর্ণ।(৬৮৬)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
إِذَا خَفِيَ عَلَيْكُمْ شَيْءٌ مِنَ الْقُرْآنِ فَابْتَغُوْهُ فِي الشَّعْرِ؛ فَإِنَّهُ دِيْوَانُ الْعَرَبِ
তোমাদের কাছে কুরআনের কোনো শব্দ অস্পষ্ট মনে হলে কবিতায় তা খুঁজে দেখো। কারণ, তা আরবদের তথ্য-বিবরণী।(৬৮৭)

কবিরা ইসলামি দাওয়াতকে জোরালো রূপ দিয়েছেন। তারা মুক্তি ও বিজয়ের লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণের উদ্দেশ্যে স্তবগীতি রচনা করেছেন। জিহাদে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং আল্লাহর পথে শহিদ হতে উৎসাহ জুগিয়েছেন। মুজাহিদ শহিদগণের জন্য শোকগাথা রচনা করেছেন। ইসলামের শুরুর যুগের প্রখ্যাত কবিদের মধ্যে কয়েকজন হলেন: কাব ইবনে যুহাইর রা. (মৃ. ২৬ হি./৬৪৫ খ্রি.), আবু যুআইব আল-হুযালি রা. (মৃ. ২৭ হি./৬৪৮ খ্রি.-এর দিকে) এবং হাসসান ইবনে সাবিত রা. (মৃ. ৫৪ হি./৬৭৪ খ্রি.)। কাব ইবনে যুহাইর কাসিদায়ে বুরদা রচনা করেন।

উমাইয়া যুগে কবিতার উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনের বিস্তৃতি ঘটে। নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হয় কবিতায়, যেগুলো ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। কারণ খলিফারা, প্রশাসক ও গভর্নররা একদিক থেকে কবিতাকে গুরুত্ব দিতেন, সামাজিক জীবনের রূপান্তর ও বিবর্তন ঘটত অন্যদিকে থেকে, আরেকদিকে ছিল নতুন নতুন রাজনৈতিক দল-উপদলের আত্মপ্রকাশ। এই যুগে কাব্য-সাহিত্য উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি লাভ করে। কারণ রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালকরা তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই কবিতাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিত। তা ছাড়া সাধারণ জনমণ্ডলীর মধ্যে কবিতার প্রভাব ছিল ব্যাপক। উমাইয়া খলিফা ও আমিররা কবিতাকে তাদের প্রশংসার প্রচারযন্ত্রে পরিণত করেছিলেন। কবিতার দ্বারা তারা তাদের কর্তৃত্বকে অটুট রাখতে এবং প্রতিপক্ষ নেতৃবৃন্দকে ঘায়েল করারও চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে শিয়া, খারেজি ও যুবাইরি আমিররা(৬৮৮) এই দিকে এগিয়ে ছিলেন। উমাইয়া যুগের প্রখ্যাত কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আশা রবিআহ আবদুল্লাহ ইবনে খারিজা (মৃ. ১০০ হি./৭১৮ খ্রি.), আদি ইবনুল রিকা আল-আমিলি (মৃ. ৯৫ হি./৭১৪ খ্রি.), তিনি খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের সভাকবি ছিলেন। উমাইয়া যুগে ইরাকের শক্তিমান কবিদের মধ্যে যারা খলিফা ও আমিরদের পৃষ্ঠপোষকতা ও আদরযত্ন পেয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, জারির ইবনে আতিয়্যাহ (৩৩-১১০ হি./৬৫৩-৭২৮ খ্রি.), ফারাযদাক (৩৮-১১৪ হি./৬৪১-৭৩২ খ্রি.) ও আল-আখতাল আত-তাগলিবি (১৯-৯০ হি./৬৪০-৭০৮ খ্রি.)। উমাইয়াদের বিরোধী দলীয় কবিদের মধ্যে শিয়া কবিরা বিখ্যাত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আবুল আসওয়াদ আদ-দুওয়ালি (মৃ. ৬৯ হি./৬৮৮ খ্রি.), আল-কুমাইত ইবনে যায়েদ (মৃ. ১২৬ হি./৭৪৩ খ্রি.)। খারিজি কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন তিরিম্মাহ ইবনুল হাকিম (মৃ. ১০০ হি.)। আবদুল্লাহ ইবনুল যুবাইর-দলীয় (যুবাইরি) কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইবনে কাইস আর-রুকাইয়াত (মৃ. ৮৫ হি.)। উমাইয়া যুগে গযল-রচয়িতা কবিদেরও আত্মপ্রকাশ ঘটে। গযল দুই ধরনের : ১. উযরি এবং ২. সারিহ। কবিরা এই দুই ধরনের গযলই রচনা করতেন। উযরি গযলের বৈশিষ্ট্য হলো বক্তব্যের সারল্য ও সততা এবং গাম্ভীর্য। এই শ্রেনীর গযল-রচয়িতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন জামিল বাসিনা(৬৮৯) (মৃত্যু : ৮২ হি./৭০১ খ্রি.) এবং লাইলা আল-আখিলিয়্যাহ(৬৯০) (মৃ. ৭৫ হি./৭০৪ খ্রি.)। সারিহ গযল-রচয়িতাদের মধ্যে বিখ্যাত হলেন উমর ইবনে আবি রবিআহ (২৩-৯৩ হি./৬৪৪-৭১১ খ্রি.)।(৬৯১)

আব্বাসি যুগ কবিতায় এক গভীর বিপ্লব প্রত্যক্ষ করে-পরিমাণেও, প্রকরণেও। কবিতার বিষয়বস্তু, অর্থ, শৈলী, শব্দের প্রয়োগে ব্যাপক পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটে। নতুন নতুন উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে কবিতা রচিত হতে থাকে, যা পূর্বে দেখা যায়নি। অন্যান্য বিষয়ও কবিতায় যুক্ত হয়। রাজনৈতিক কবিতা দুর্বল হয়ে পড়ে, নিস্তেজ হয়ে পড়ে বীরত্বপূর্ণ কবিতাগাথাও, উযরি গযলের গায়েও লাগে রুণতার বাতাস। অন্যদিকে শক্তিশালী হয়ে ওঠে স্তবগীতি ও শোক-কবিতা, প্রজ্ঞামণ্ডিত কবিতার সয়লাব বয়ে যায়, তপস্যামূলক ও দুনিয়াবিমুখতায় চিহ্নিত কবিতার জোয়ার ওঠে। সুফিতাত্ত্বিক, দার্শনিক, শিক্ষামূলক, কাহিনিমূলক এমন নানা প্রকারের কবিতা পাখা মেলে ছড়িয়ে পড়ে। নবাগত কবিরা অলংকারশাস্ত্রের বিভিন্ন অলংকার, যেমন শ্লেষালংকার ও বিরোধালংকার ইত্যাদি অপরিমিত ব্যবহার করেন। তারা শব্দের কারুকাজ ও অলংকরণে অধিক মনোযোগ দেন। ফলে কাব্য-আন্দোলন ও সাহিত্য-আন্দোলন উজ্জ্বলরূপ ধারণ করে। এই আন্দোলনে সামাজিক উপাদানগুলোর সঙ্গে কার্যকরী অর্থেই অন্যান্য উপাদানের সংশ্লেষ ঘটে। অনুবাদের পথ ধরে আরবে আগমন করে অনারব সাহিত্য-সংস্কৃতি। একদিকে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক রাজনৈতিক ও ধর্মাদর্শিক বিরোধ, অন্যদিকে তাদের সঙ্গে অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিরোধ সাহিত্য-আন্দোলনে প্রভাব বিস্তার করে। তা ছাড়া বাগদাদ ও অন্যান্য শহরে খলিফা ও শাসকরা কবিদের বেশ উৎসাহ দিতেন, উজ্জীবিত করতেন। আব্বাসি সাহিত্যের আকাশে বড় বড় কবি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলে ওঠেন। উদাহরণ হিসেবে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে: বাশশার ইবনে বাব্দ (৯৬-১৬৮ হি./৭১৪-৭৮৪ খ্রি.), আবু নাওয়াস (১২৯-১৯৮ হি./৭৪৭-৮১৪ খ্রি.), আবু তাম্মাম হাবিব ইবনে আওস আত-তায়ি (মৃ. ২১৮ হি.), আল-বুহতুরি (২০৪-২৮৪ হি./৮১৯-৮৯৭ খ্রি.), ইবনে রুমি (২২১-২৮৩ হি./৮৩৫-৮৯৬ খ্রি.), আবুত তাইয়িব আল-মুতানাব্বি (৩০৩-৩৫৪ হি./৯১৫-৯৬৫ খ্রি.), আবু ফিরাস হামদানি (৩২০-৩৫৭ হি./৯৩২-৯৬৮ খ্রি.), আবুল আলা মাআররি (৩৬৩-৪৪৯ হি./৯৭৩-১০৫৭ খ্রি.)।(৬৯২)

আন্দালুসীয় কবিরা আন্দালুসে কাব্যের 'মুওয়াশশাহ' প্রকরণের উদ্ভাবন করেন এবং এটিকে বিকশিত করেন। কবিতার এই প্রকরণের বিভিন্ন শৈলীতে দক্ষতা ও নৈপুণ্যের পরিচয় দেন। আরবি কবিতার গঠন-উৎকর্ষে 'মুওয়াশশাহ' প্রকরণটি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ। এটি কবিকে কবিতার অন্ত্যমিল নিয়ে কারিকুরি করার স্বাধীনতা এনে দেয়। ছন্দ নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষার স্বাধীনতাও কবিরা পান। কাব্যের 'মুওয়াশশাহ' প্রকরণের প্রচার-প্রসারের ফলে উপজাতীয় জাযাল(৬৯৩) সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। ইবনে খালদুন বলেন, আন্দালুসের ভূখণ্ডে কবিতাচর্চা বেড়ে গেল। কবিতার প্রকরণ, বিষয় ও প্রবণতা মার্জিত রূপ নিলো। শৈলীবদ্ধকরণ (স্টাইলাইজেশন) তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছল। ফলে আন্দালুসের পরবর্তী কবিরা কবিতার একটি প্রকরণ উদ্ভাবন করেন এবং এটির নাম দেন 'মুওয়াশশাহ'।(৬৯৪) আন্দালুসীয় বিখ্যাত কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইবনে যাইদুন (৩৯৪-৪৬৩ হি.) এবং সেভিলের শাসক মুতামিদ ইবনে আব্বাদ (৪৩১-৪৮৮ হি./১০৪০-১০৯৫ খ্রি.)।

গদ্য সাহিত্য: গদ্য মানে অন্ত্যমিলহীন কথা। সমৃদ্ধি ও উর্বরতার দিক থেকে এটি পদ্যের চেয়ে কম নয়। ইসলামের শুরুর যুগেই গদ্য সাহিত্যের সাবলীল ও সহজ সূচনা দেখা যায়। বাক্যগুলো ছোট ছোট এবং কাঠামোও ভিন্ন ভিন্ন। যেমন: পত্র, ভাষণ-বক্তৃতা, হাদিস, উপমা, কাহিনি ইত্যাদি। সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে গদ্য সাহিত্যেরও অগ্রগতি ঘটে। গদ্যের বিষয়বস্তুতেও বৈচিত্র্য আসে এবং প্রকরণেও দেখা যায় ভিন্নতা। তাই লিখন-শিল্পের প্রকাশ ঘটে এবং উমাইয়া যুগে তা উজ্জ্বল রূপ ধারণ করে। প্রথম যুগের বড় লিখন-শিল্পীদের অন্যতম হলেন আবদুল হামিদ আল-কাতিব (মৃ. ১৩২ হি.)। তিনি লিখনের শর্তাবলি তার বিখ্যাত পুস্তিকাগুলোতে সন্নিবিষ্ট করেছেন এবং লিখন-শিল্পীদের সামনে তা তুলে ধরেছেন। এমনকি এ কথা প্রচলিত আছে যে, লিখন-শিল্প শুরু হয়েছে আবদুল হামিদের হাতে এবং এর সমাপ্তি ঘটেছে ইবনুল আমিরের হাতে।

আব্বাসি যুগে গদ্য-শিল্প বিস্তার লাভ করে। এই সময়ে যারা গদ্য-শিল্পে খ্যাতি লাভ করেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন জাহিয (১৫০-২৫৫ হি./৭৬৭-৮৬৮ খ্রি.)। তিনি গদ্যের উৎকর্ষ সাধন করেন এবং গদ্যের দিগন্ত বিস্তৃত করেন। গদ্যের ইমামে পরিণত হন তিনি। ইবনুল মুকাফফাও (১০৬-১৪২ হি./৭২৪-৭৫৯ খ্রি.) গদ্য সাহিত্যে জাহিযের মতো অবদান রাখেন। হিজরি চতুর্থ শতকে গদ্য সাহিত্য তার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়। এই সময় অন্ত্যমিলযুক্ত গদ্য রচনা করে খ্যাতি লাভ করেন আবু হাইয়ান আত-তাওহিদি (মৃ. ৪০০ হি.-এর দিকে) এবং ইবনুল আমিদ (মৃ. ৩৬৬ হি.) ও অন্যরা। এরপর গদ্যের উপর দিয়ে শাব্দিক কারুকাজ ও অলংকারের প্রবল তরঙ্গ বয়ে যায়। অর্থগত সূক্ষ্মতার চেয়ে শব্দের কারিকুরিতেই অপচয় ঘটে বেশি। পরবর্তী কয়েকজন লেখকের মাকামা-সাহিত্যে(৬৯৫) ও চিঠিপত্রে এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চিঠিপত্র হলো শৈল্পিক গদ্যের একটি প্রকার। চিঠিপত্র দুই ধরনের: ১. সরকারি বা সাধারণ চিঠি এবং ২. ব্যক্তিগত বা বিশেষ চিঠি। ইসলামের শুরুর যুগে ও উমাইয়া খিলাফতকালে প্রাতিষ্ঠানিক চিঠিপত্র ছিল সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট, এগুলোতে লৌকিকতার কোনো স্পর্শ ছিল না। আব্বাসি যুগ থেকে সরকারি দপ্তরগুলোতে কাতেব বা মুন্সি নিয়োগ দেওয়া হয়, তারা চিঠিপত্রে ভাষার কারুকাজ ও শব্দের কারিকুরি দেখাতে শুরু করেন। চিঠিপত্রের বিখ্যাত লেখকদের মধ্যে রয়েছেন আবদুল হামিদ আল-কাতিব, ইবনুল আমিদ, সাহিব ইবনে আব্বাদ প্রমুখ। বিশেষ বা ব্যক্তিগত অথবা ভ্রাতৃত্বসুলভ চিঠি হলো, যা এক বন্ধু অপর বন্ধুকে লিখে থাকে। এ ধরনের চিঠির বিখ্যাত লেখকদের মধ্যে ছিলেন আল-জাহিয ও ইবনে যাইদুন।

আরবি গদ্যের আরেকটি প্রকার হলো খুতবা বা বক্তৃতা। মুসলিমরা কবিতার পর বক্তৃতার ব্যাপারেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ বক্তৃতা মূলত বাগ্মিতাপূর্ণ কথা, যা সাহসিকতা ও উপস্থিত বুদ্ধিতে ভাস্বর। জাহিলি যুগে ও ইসলামের শুরুর যুগে বক্তৃতার বড় ভূমিকা রয়েছে। আরবরা তাদের কিশোর-যুবাদেরকে তাদের শিশুকাল থেকেই বক্তৃতার প্রশিক্ষণ দিত। সাহিত্যের গ্রন্থগুলোতে বেশ কিছু অলংকারপূর্ণ বক্তৃতা সংকলিত হয়েছে। রাশেদি যুগের বিখ্যাত খতিব বা বক্তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন চতুর্থ খলিফা আলি ইবনে আবু তালিব। 'নাহজুল বালাগাহ' গ্রন্থে তার অলংকারসমৃদ্ধ বক্তৃতাসমূহ ও চিঠিপত্র সংকলিত হয়েছে। এই গ্রন্থের অধিকাংশ বক্তৃতাই আলি রা.-এর নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, যদিও বাস্তবে তিনি সেগুলোর বক্তা নন।

উমাইয়া যুগে বক্তৃতার জোয়ার বয়ে যায়। কয়েকজন আমির ও খলিফা, যেমন আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান, হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ, যিয়াদ ইবনে আবিহি ছিলেন বিখ্যাত বক্তা। তারা জনমণ্ডলীর কাছে তাদের উদ্দেশ্য পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের নীতি-আদর্শ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য মেনে নিতে জনমণ্ডলীকে প্রভাবিত করার জন্য বক্তৃতার ওপর নির্ভর করতেন। উমাইয়া যুগ আমাদের জন্য বিপুল সংখ্যক উৎকৃষ্ট বক্তৃতার উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছে, এসব বক্তৃতা বাক্যে যেমন অলংকারপূর্ণ তেমনই চিন্তায়ও অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

আব্বাসি যুগে বক্তৃতা-শিল্পে পূর্ববর্তী যুগের তুলনায় বড় ধরনের অধঃপতন ঘটে। আব্বাসি খলিফাদের মধ্যে বক্তা হিসেবে কেউই খ্যাতি বা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারেননি।

মুসলিমরা উপমা-সাহিত্যেও গুরুত্ব প্রদান করেন। তারা উপমা সংগ্রহ করেন এবং সেগুলোকে গ্রন্থাকারে সংকলন করেন। উপমা-সাহিত্যের বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি নিম্নরূপ : ১. মাজমাউল আমসাল, আবুল ফজল আল-মাইদানি(৬৯৬) ২. আল-মুসতাকসা ফি আমসালিল আরাব, আল-যামাখশারি(৬৯৭), এটি আরবি উপমাসমগ্র, যেখানে উপমাগুলোকে আরবি বর্ণমালাভিত্তিক সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে।

কাহিনি ও গল্প সাহিত্যে মুসলিমদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার অনেক বিশাল। মানুষ এখনো এগুলো পড়ে এবং এসব কাহিনির দিগন্তবিস্তৃত প্রেক্ষাপট, ভাবনার মাধুর্য ও ঘটনার অভিনবত্বে বিমুগ্ধ হতেন। সম্ভবত এসব কাহিনির মধ্যে আক্স গোত্রের কৃষ্ণবর্ণ ঘোড়সওয়ার আনতার বা আনতারার কাহিনি(৬৯৮), ইয়ামেনের বিখ্যাত বীর সাইফ ইবনে যি-ইয়াযানের কাহিনি(৬৯৯), মাগরিবের (মরক্কোর) বীরপুরুষ আবু যায়দ আল-হিলালির কাহিনি এবং মিশরের সুলতান জাহির বাইবার্সের কাহিনি, এ ছাড়াও মোগল-বিরোধী যুদ্ধ ও ক্রুসেড যুদ্ধের বীর সেনানীদের বীরত্বগাথা সবচেয়ে বিখ্যাত।

হিজরি চতুর্থ শতকে আরবি সাহিত্যে ছোট গল্পের ভিত প্রস্তুত করা হয়, এগুলোকে বলা হয় মাকামাত। বিখ্যাত মাকামাত-রচয়িতাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বদিউযযামান আল-হামাদানি (৩৫৮-৩৯৮ হি./৯৬৯-১০০৭ খ্রি.)। তিনি চারশ মাকামাত রচনা করেছেন। এই চারশ মাকামাত রচনা করা হয়েছে দুজন বীরপুরুষকে নিয়ে, তাদের একজন হলেন ঈসা ইবনে হিশাম এবং দ্বিতীয়জন হলেন আবুল ফাত্‌হ আল-ইস্কান্দারি। আরও আছেন ইবনে নাকিয়া আল-বাগদাদি (৪১০-৪৮৫ হি./১০২০-১০৯২ খ্রি.)। তিনি আল-হামদানির পদ্ধতি অনুসরণ করে গদ্য রচনা করেন। আরও আছেন আল-হারিরি(৭০০) (৪৪৬-৫১৬ হি./১০৫৪-১১২২ খ্রি.)। তিনি তার মাকামাতে আবু যায়দ আস-সারুজি এবং হারিস ইবনে হাম্মام নামের দুজন ব্যক্তির সাহসিকতার কাহিনি বর্ণনা করেছেন। এ দুজন ব্যক্তিই অত্যন্ত মেধাবী।(৭০১)

সাহিত্যের বিখ্যাত গ্রন্থাবলি সম্পর্কে ইবনে খালদুন বলেছেন, আরবি (ভাষা ও) সাহিত্যের ভিত্তি হলো চারটি দিওয়ান (সংকলনগ্রন্থ): ১. আদাবুল কাতিব, ইবনে কুতাইবা দিনাওরি(৭০২) ২. আল-কামিল (ফিল-লুগাহ ওয়াল-আদাব), আল-মুবাররাদ(৭০৩) ৩. আল-বায়ান ওয়াত-তাবয়িন, আল-জাহিয(৭০৪) ৪. আন-নাওয়াদির, আবু আলি আল-কালি(৭০৫)।(৭০৬) আরবি সাহিত্যের আরও কিছু বিখ্যাত গ্রন্থ রয়েছে, এখানে সেগুলোর নাম না নিলেই নয়: আল-ইদুল ফারিদ, ইবনে আব্দ রাব্বিহি (মৃ. ৩২৮ হি.); আল-আগানি, আবুল ফারাজ আল-ইস্পাহানি (মৃ. ৩৫৬ হি.); বাহজাতুল মাজালিস ওয়া উনসুল মুজালিস, ইবনে আবদুল বার ইত্যাদি।

এই গ্রন্থের শেষ অধ্যায়ে আমরা আল্লাহ চাহে তো বিশ্বের অন্যান্য সাহিত্যের ওপর ইসলামি আরবি সাহিত্যের প্রভাব সম্পর্কে জানব।

টিকাঃ
৬৭০. ইলিয়াড গ্রিক মহাকাব্য। প্রাচীন গ্রিসের ইলিওন শহরের নামানুসারে এই মহাকাব্যের নামকরণ করা হয়। মহাকবি হোমার এই মহাকাব্যের রচয়িতা। এটি গ্রিক ভাষায় রচিত ও ২৪টি সর্গে বিভক্ত। এর বিষয় ট্রয়ের যুদ্ধ। এতে ১৬,০০০ পঙ্ক্তি কবিতা আছে। যুদ্ধ সংঘটিত হয় হেলেন নামের এক নারীকে কেন্দ্র করে। যুদ্ধে গ্রিকদের সেরা বীর ছিলেন অ্যাকিলিস আর ট্রয়ের পক্ষে ছিলেন হেক্টর। যুদ্ধ যখন শেষ পর্যায়ে তখন হেক্টর অ্যাকিলিস কর্তৃক নিহত হন এবং এর মধ্য দিয়ে মূলত ট্রয়বাসীর পরাজয় নিশ্চিত হয়। যুদ্ধ শেষে গ্রিক সেনারা সুরক্ষিত ও সাজানো নগরী ট্রয় জ্বালিয়ে দেয়। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭১. ওডিসিও কবি হোমারের রচিত মহাকাব্য। এই কবিতায় ট্রয় নগরীর ধ্বংসের পরে ইথাকার রাজা ওডিসিউসের আপন ভূমিতে ফিরে আসার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে তাকে পোহাতে হয়েছে নানা ঝড়ঝাপটা, সংগ্রাম করতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে। নিজের সহযোগযোদ্ধাদের হারিয়ে তাকে একাই ফিরতে হয়েছে ইথাকায়। হোমার সেই কাহিনিই তার ওডিসি মহাকাব্যে তুলে ধরেছেন। আধুনিক গ্রহণযোগ্য সংস্করণে ইলিয়াডের ১৫,৬৯৩টি ছত্র রয়েছে। এটি আইওনিক গ্রিক ও অন্যান্য উপভাষার সংমিশ্রণে গঠিত হোমারীয় গ্রিক ভাষায় রচিত। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭২. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ১৯৭।
৬৭৩. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৪৪।
৬৭৪. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৫৩।
৬৭৫. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ১৯৮।
৬৭৬. নাজদের অধিবাসী এবং কবি ইমরুল কাইসের মামা। আসল নাম আদি ইবনে রবিআহ ইবনুল হারিস আত-তাগলিবি। ৫৩১ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭৭. ইমরুল কাইস হলেন ৬ষ্ঠ শতকের আরবি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি। তার পুরো নাম হল ইমরুল কাইস জুনদুহ ইবনে হুজর আল-কিন্দি। তার পিতার নাম হুজর ইবনুল হারিছ এবং মায়ের নাম ফাতিমা বিনতে রাবিয়াহ আল-তাগলিবি। তিনি আরবের নাজদ এলাকায় ৬ষ্ঠ শতকের প্রথম দিকে জন্মগ্রহণ করেন এবং রাজকীয়ভাবে প্রাথমিক জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি বাল্যকালে কবিতা রচনা শুরু করলে তার পিতা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। তারপর তিনি বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়ে মদ্যপায়ী জীবন শুরু করেন। তার প্রেমিকার নাম ছিল উনাইযা। ইমরুল কাইস আরবি ভাষায় লেখা বিখ্যাত কাব্য সংকলন মুআল্লাকার অন্যতম ও শ্রেষ্ঠ লেখক। এই মহান কবি ৫৪০ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭৮. ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তার একটি কবিতাকে ঝুলন্ত গীতিকার অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হয়। তার আসল নাম যিয়াদ ইবনে মুআবিয়া ইবনে দাব্বাব। তার কবিতা শিল্পকুশলতা ও ছন্দমাধুর্যে উৎকৃষ্ট এবং সর্বাপেক্ষা সাবলীল। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৭৯. শ্রেষ্ঠ কবিত্রয়ের অন্যতম। অন্য দুজন হলেন ইমরুল কাইস ও নাবিগা। জীবৎকাল : ৫২০- ৬০৯ খ্রিষ্টাব্দ। কবিদের মধ্যে প্রজ্ঞাবান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তলাভের এক বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮০. আনতারা ইবনে শাদ্দাদ ইবনে কাররাদ আল-আবসি (৫২৫-৬০৮ খ্রি.) ছিলেন বিখ্যাত ইসলাম-পূর্ব আরব কবি। ঘোড়সওয়ার হিসেবেও খ্যাতি ছিল তার। কবিতার জন্য যেমন, তেমনই দুঃসাহসিক জীবনের জন্য বিখ্যাত। তিনি কাবাঘরের দেওয়ালে ঝুলন্ত সপ্তগীতিকার অন্যতম কবি। আনতারার কবিতাগুলো ভিলহেল্ম অলওয়ার্ড-এর লেখা 'দা ডিভান্স অব দা সিক্স এনশিয়েন্ট এরাবিক পোয়েটস (লন্ডন, ১৮৭০) প্রকাশিত হয়। এটি পরবর্তীকালে বৈরুত থেকে (১৮৮৮) আলাদাভাবে প্রকাশিত হয়। ৬০৮ খ্রি. মৃত্যুবরণ করেন। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮১. তারাফা ইবন আবদ জাহিলি প্রথম সারির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তিনি বিখ্যাত ঝুলন্ত সপ্তগীতিকার কবিদের একজন। বাহরাইনের এক অভিজাত পরিবারে ৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দের দিকে জন্মগ্রহণ করেন। হিরার অধিপতি আমর ইবনে হিন্দ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গকবিতা রচনার অভিযোগে তারাফাকে হত্যার নির্দেশ দেন। মাত্র ২৬ বছর বয়সে ৫৬৯ খ্রিষ্টাব্দে তারাফার জীবনাবসান ঘটে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮২. আলকামা ইবনে আবাদাহ ইবনে নাশিরাহ ইবনে কাইস। আলকামা আল-ফাহল নামে পরিচিত। ৬০৩ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। জাহিলি যুগের প্রথম স্তরের কবি।
৬৮৩. মাইমুন ইবনে কাইস ইবনে জানদাল। আ'শা শব্দের অর্থ রাতকানা। তিনি রাতে কম দেখতেন বলে এই নামকরণ হয়েছে। জাহিলি যুগের প্রথম স্তরের কবি। জন্ম ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে এবং মৃত্যু ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৮৪. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ১৯৮-২০০।
৬৮৫. সুরা শুআরা: আয়াত ২२৪-২২৭।
৬৮৬. বুখারি, কিতাব: আল-আদব, বাব: মা ইয়াজুযু মিনাশ-শি'রি ওয়ার-রাজযি ওয়া মা ইয়ুকরাহু মিনহু, হাদিস নং ৫৭৯৩; আবু দাউদ, হাদিস নং ৫০১০; তিরমিজি, হাদিস নং ২৮৪৪; ইবনে মাজাহ, ৩৭৫৫।
৬৮৭. মুসতাদরাকে হাকেম, কিতাবুত তাফসির, বাব: তাফসিরু সুরাতি নুন, হাদিস নং ৩৮৪৫।
৬৮৮. আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.-এর খিলাফতকালে (৬৪-৭৩ হি.) যারা আমির ও গভর্নর ছিলেন।
৬৮৯. জামিল ইবনে মা'মার, বা জামিল ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মা'মার আল-উযরি আল- কুযায়ি।-অনুবাদক
৬৯০. লাইলা বিনতে আবদুল্লাহ আর-রিহাল ইবনে শাদ্দাদ ইবনে কা'ব আল-আখিলিয়্যাহ।
৬৯১. রহিম কাযিম মুহাম্মাদ আল-হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আল-আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭৩-১৭৪।
৬৯২. রহিম কাযিম মুহাম্মাদ আল-হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আল-আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭৪।
৬৯৩. জাযাল )زجل( : কথ্য উপভাষায় রচিত মৌখিক স্ট্রফিক কাব্যের একটি ঐতিহ্যবাহী রূপ। জাযালের সঠিক উৎস সম্পর্কে তেমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে জাযালের প্রথম কবি হিসেবে আন্দালুসের আবু বকর ইবনে কুযমান ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। তার জীবৎকাল ১০৭৮-১১৬০ খ্রিষ্টাব্দ। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৬৯৪. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৮৩।
৬৯৫. আরবি গদ্য-সাহিত্যের একটি আঙ্গিক।
৬৯৬. আল-মাইদানি : আবুল ফজল আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে ইবরাহিম (মৃ. ৫১৮ হি./১১২৪ খ্রি.)। সাহিত্যিক, গবেষক। নিসাপুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। খাইরুদ্দিন আয-যিরিকলি তার 'মাজমাউল আমসাল' গ্রন্থ সম্পর্কে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এ ধরনের গ্রন্থ ইতিপূর্বে লেখা হয়নি। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ১, পৃ. ১৪৮; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২১৪।
৬৯৭. আয-যামাখশারি: জারুল্লাহ আবুল কাসিম মাহমুদ ইবনে উমর আল-খাওয়ারিজমি (৪৬৭-৫৩৮ হি./১০৭৫-১১৪৪ খ্রি.)। ধর্মীয় জ্ঞান, তাফসির, ভাষা ও সাহিত্যের ইমাম। তার রচিত গ্রন্থ অনেক। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কুরআনুল কারিমের তাফসির 'আল-কাশশাফ'। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১৬৮-১৭১।
৬৯৮. কবি আনতারা ইবনে শাদ্দাদ ও তার প্রেমাস্পদ আবলার কাহিনি।-অনুবাদক।
৬৯৯. ইয়ামেনের প্রাচীন হিময়ারি বাদশাহ সাইফ ইবনে যি-ইয়াযান বা মাদিকারিব ইবনে আবু মুররাহ (৫১৬-৫৭৬ খ্রি.)-এর কাহিনি। তিনি ইয়ামেন থেকে হাবশিদের বিতাড়িত করেছিলেন।- অনুবাদক।
৭০০. আবু মুহাম্মাদ আল-কাসিম ইবনে আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে উসমান আল-হারিরি আল-বসরি আল-হারামি।-অনুবাদক
৭০১. ড. আবদুল মুনয়িম মাজিদ, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উসুরিল উসতা, পৃ. ২০৬-২১০; রহিম কাযিম মুহাম্মাদ হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৭৫-১৭৭।
৭০২. ইবনে কুতাইবা আদ-দিনাওরি : আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবনে মুসলিম ইবনে কুতাইবা আদ-দিনাওরি (২১৩-২৭৬ হি./৮২৮-৮৮৯ খ্রি.)। মুফাসসির, ফকিহ, সাহিত্যবিশারদ, ঐতিহাসিক ও ভাষাবিদ। হিজরি তৃতীয় শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম। কুফায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন বাগদাদে। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৩, পৃ. ২৯৬।
৭০৩. আল-মুবাররাদ: মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে আবদুল আকবার ইবনে উমাইর ইবনে হাসসান (২১০-২৮৬ হি./৮২৬-৮৯৯ খ্রি.)। ভাষাবিজ্ঞান ও ব্যাকরণের ইমাম। বসরায় জন্মগ্রহণ করেন ও বেড়ে ওঠেন। মৃত্যুবরণ করেন বাগদাদে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'আল-কামিল ফিল- লুগাহ ওয়াল-আদাব', 'আল-ফাদিল', 'আল-মুকতাদাব', 'শারহু লামিয়াতিল আরাব'। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৩, পৃ. ৫৭৬।
৭০৪. আল-জাহিয: আবু উসমান আমর ইবনে বাহর আল-কিনানি (১৬৩-২৫৫ হি./৭৮০-৮৬৯ খ্রি.)। আরবি সাহিত্যের বড় ইমাম এবং মুতাযিলা সম্প্রদায়ের জাহিযিয়্যাহ গোত্রের প্রধান। বসরায় জন্মগ্রহণ ও মৃত্যুবরণ করেন। তার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে। যেমন: 'আল- বায়ান ওয়াত-তাবয়িন', 'কিতাবুল হায়াওয়ান', 'আল-বুখালা', 'আল-মাহাসিন ওয়াল-আযদাদ'। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ২, পৃ. ১২১-১২২।
৭০৫. আবু আলি আল-কালি: ইসমাইল ইবনুল কাসিম ইবনে ইযুন (২৮৮-৩৫৬ হি./৯০১-৯২৭ খ্রি.)। ভাষা, কবিতা ও সাহিত্যের বিষয়াবলি তিনি সবচেয়ে বেশি মুখস্থ রেখেছিলেন। ফুরাত নদীর পূর্ব তীরে মানযিকাবৃন্দ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং কর্ডোভায় মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'কিতাবুল আমালি', 'আল-বারিউ ফিল-লুগাহ', 'আল-আমসাল' ইত্যাদি। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৯, পৃ. ১৪২।
৭০৬. ইবনে খালদুন, আল-ইবারু ওয়া দিওয়ানুল মুবতাদায়ি ওয়াল-খাবারি, খ. ১, পৃ. ৫৫৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00