📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 তাওহিদ ও আকিদাগত চিন্তাধারার সংশোধন

📄 তাওহিদ ও আকিদাগত চিন্তাধারার সংশোধন


পূর্ববর্তী জাতিসমূহের অলিক ধ্যানধারণা, কুসংস্কার ও আকিদাগত ভ্রান্তির মোকাবিলায় এবং গোটা বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার সামনে যেদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব ঘটল, সেদিন থেকেই তাওহিদের আকিদার ক্ষেত্রে মুসলিমদের অবদান শুরু হয়েছে।

এই আকিদা মানবতার জন্য ইসলামের সবচেয়ে বড় উপহার, মানবতা এমন উপহার কখনো পায়নি এবং কিয়ামত পর্যন্ত কখনো পাবেও না।

ইসলামের আকিদায় এই বিশ্ব মালিকহীন নয়, বরং তার একজন মালিক রয়েছে। তিনি হলেন তার স্রষ্টা, তার রূপকার, তার শাসনকর্তা, তার নিয়ন্ত্রক, সকল সৃষ্টি ও কর্তৃত্ব তাঁরই। শাসন চলবে তাঁরই।

أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ
জেনে রাখো, সৃজন ও আদেশ তাঁরই।(৬০৯)

এই পৃথিবীতে তাঁর আদেশ ও ক্ষমতার বাইরে কিছুই ঘটে না। পৃথিবীর অস্তিত্বের মূল কারণ হলো তাঁর অভিপ্রায় ও সক্ষমতা। বিশ্বজগৎ সৃষ্টি ও অস্তিত্বের ক্ষেত্রে তাঁর বশীভূত ও তাঁর অনুগত এবং তাঁর কাছে সমর্পিত।
وَلَهُ أَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
আকাশে ও পৃথিবীতে যা-কিছু রয়েছে তার সবই তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।(৬১০)

ইচ্ছা ও স্বাধীনতার অধিকারী সকল সৃষ্টির উচিত তাঁর আনুগত্য করে নেওয়া।
أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ
জেনে রাখো, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য।(৬১১),(৬১২)

কারণ আল্লাহ তাআলাই গোটা বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন, সকল বান্দাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই একমাত্র উপাস্য, সকল সৃষ্টির তাঁরই উদ্দেশ্যে ইবাদত করা আবশ্যক।

ইসলাম এ ব্যাপারে চূড়ান্ত দলিল-প্রমাণ পেশ করেছে যে, আল্লাহ তাআলাই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং এ ব্যাপারেও চূড়ান্ত প্রমাণ পেশ করেছে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল পেশের আঙ্গিকে আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَوْ كَانَ فِيهِمَا أَلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا
যদি আল্লাহ ব্যতীত বহু ইলাহ থাকত আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে, তাহলে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত।(৬১৩)

আল্লাহ তাআলা সকল মানুষের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন,
قُلْ أَرُونِي الَّذِينَ أَلْحَقْتُمْ بِهِ شُرَكَاءَ كَلَّا بَلْ هُوَ اللَّهُ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
বলো, তোমরা আমাকে দেখাও যাদের শরিকরূপে তাঁর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছ তাদের। না, কখনো না,(৬১৪) বরং তিনি আল্লাহ, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।(৬১৫)

সত্য এই যে, এই যুক্তি অত্যন্ত সন্তোষজনক, বিশ্ববাসী সবাই এই যুক্তি গ্রহণ করেছে ও সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাই আল্লাহর দ্বীনে মানুষ দলে দলে প্রবেশ করেছে।

এখানে কারও কারও ভুল হয়ে থাকে, যারা এই ধারণা করেন যে, আরব মুসলিমরা পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তার ফলে ইসলামও ছড়িয়ে পড়েছে এবং আরবদের সংখ্যাধিক্যের ফলে তাওহিদি বিশ্বাসের বিস্তৃতি ঘটেছে এবং ভুল করে থাকে যারা এই ধারণা করে যে, আরব মুসলিমরা তরবারি ও অস্ত্রের শক্তি প্রয়োগ করে মানুষকে ইসলামে প্রবেশ করতে ও তাওহিদি বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরতে বাধ্য করেছে। আমরা পৃথিবীর ইতিহাস ঘেঁটে দেখতে পারি।

আরব মুসলিমরা ছিল সংখ্যায় অল্প। সংখ্যায় ও গুণগত দিক থেকে তাদের অস্ত্রবল ছিল দুর্বল। তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্ভাবনাও ছিল অতি নগণ্য। তারপরও ওই সময় বিশ্বের মানুষ দেশ ও জাতির ধর্মাদর্শ এবং শক্তিশালী ও উন্নত সভ্যতা ত্যাগ করে এই নগণ্য মানুষের ধর্মাদর্শে প্রবেশ করেছে!

স্বাভাবিকভাবেই মনের মধ্যে এই প্রশ্ন জেগে ওঠে যে, বিশ্বের মানুষ এই কাজ কেন করেছিল? কেন তারা এই ধর্মাদর্শে প্রবেশ করেছিল?

এই প্রশ্নের জবাব এইভাবে দেওয়া যেতে পারে যে, এই ধর্মাদর্শ ছিল সন্তোষজনক, এই ধর্মের আকিদা-বিশ্বাস ছিল যৌক্তিক ও মানুষের স্বভাব চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই আকিদা-বিশ্বাসের ফিতরাত দিয়েই আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তারা এক সত্তার ইবাদত করবে, যার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, কোনো শরিক নেই।

এখন আমরা কয়েকটি বিষয় জিজ্ঞাসাবাদ করব:

• আরবদের মূলত কে বাধ্য করেছিল ইসলামে প্রবেশ করতে, অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবিরা ছিলেন সংখ্যায় ও শক্তিতে নগণ্য ও দুর্বল?
• ইসলামে প্রবেশ করতে মিশরীয়দের বাধ্য করেছিল কে? কে তাদের জবরদস্তি করেছিল? এটা কি বোধগম্য যে, মাত্র আট হাজার সৈনিক মিশরীয়দের মতো একটি প্রাচীন জাতিকে বাধ্য করেছিল? বিজয়কালীন যাদের সংখ্যা ছিল ৮০ লাখেরও বেশি তা ছাড়া এটাও জানা কথা যে, মিশর ছিল কার্যতভাবে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীন এবং তখন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী।

• কে পারস্যবাসীকে শত শত বছরের পৌত্তলিকতা ত্যাগ করতে এবং ইসলামকে আলিঙ্গন করতে বাধ্য করেছে? অথচ তারা সংখ্যায় বিপুল এবং তাদের রয়েছে দীর্ঘ সমৃদ্ধ ইতিহাস!
• কে দক্ষিণ আফ্রিকা, আন্দালুস, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুর্কি ও অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেছে?
• বরং কে বর্তমান বিশ্বকে ইসলামে প্রবেশ করতে বাধ্য করেছে? অথচ সবাই স্বীকার করছে যে মুসলিমরা অন্যদের তুলনায় অত্যন্ত নাজুক ও দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। কেবল যে ইসলামে প্রবেশের ঘটনা ঘটছে তা নয়, ইসলাম বরং বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে সম্প্রসারণশীল ধর্ম!

যে সত্যে কোনো সন্দেহ নেই তা এই যে, আল্লাহ তাআলার কর্তৃত্ব পূর্ণাঙ্গ এবং আল্লাহর দ্বীনে কোনো ত্রুটি নেই, কোনো ভ্রান্তি নেই। এ কারণেই যে-কেউ ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা করবে, ইসলামকে ভালোভাবে জানবে, তাকে স্বীকার করতেই হবে যে এটি সত্য ধর্ম। চাই সে এই ধর্মের অনুসরণ করুক বা না করুক।

আরেকটি সত্য এই যে, আকিদা ও বিশ্বাসগত ধারণার ক্ষেত্রে মুসলিমদের যে অবদান তার প্রভাব কেবল যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের ওপরই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অমুসলিমরাও এতে উপকৃত হয়েছে। (যার আলোচনা সামনে আসব)। তাদের কাছে আকিদা ও বিশ্বাসের বাস্তবিক দিকগুলো উন্মোচিত হয়েছে, একত্ববাদ (তাওহিদ) কী এবং কেন তা-ও তাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে।

এটা স্পষ্ট যে, ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের ফলস্বরূপ মানুষের ওপর প্রথম যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব তাতে তারা উপলব্ধি করেছে যে গোটা বিশ্ব একটি কেন্দ্রের ও একই ব্যবস্থার অনুসারী বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে স্পষ্ট সম্পর্ক বিদ্যমান এবং তাদের নীতি-বিধানের মধ্যেও ঐক্য রয়েছে। এই বিশ্বাস ও উপলব্ধির পর মানুষ জীবনের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে এবং নিজেদের চিন্তা ও কর্মাবলিকে প্রজ্ঞা ও অন্তর্দৃষ্টির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।(৬১৬)

কোনো সন্দেহ নেই যে, সর্বশক্তিমান এক ইলাহের প্রতি ঈমান মানুষের চিন্তাকে বহু-ঈশ্বরবাদের খপ্পর থেকে মুক্তি দিয়েছে, বিশুদ্ধ স্বভাব ও চরিত্রের সঙ্গে বহু-ঈশ্বরবাদ কখনো মেলে না। জীবন ও জগতের সকল গতিপথের নিয়ন্তা মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী আত্মশক্তি ও দেহশক্তির মুক্তি ঘটেছে, আল্লাহর হাতেই রয়েছে সৃষ্টি সকলের ভাগ্যলিপি, সৃষ্টির সবাই কাজেকর্মে তাঁরই ওপর নির্ভরশীল। সকলের অন্তরে দৃঢ়বিশ্বাস রয়েছে যে বিশ্বজগতের একজন প্রতিপালক রয়েছেন, যিনি চতুষ্পার্শ্বে চলমান সবকিছু দেখেন, যিনি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করেন এবং অপরাধী-পাপীদের শাস্তি দেন, দুনিয়াতে না হলে আখিরাতে দেন। তিনি কারও সৎকর্মকে বাতিল করেন না এবং তাঁর কাছে কারও অধিকার খর্ব হয় না।(৬১৭)

কোনো সন্দেহ নেই যে, সমাজব্যবস্থার ওপরও ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিদ্যমান। যখন আমরা একটি পরিচ্ছন্ন সমাজ গঠন করতে চাই, যে সমাজের নেতৃত্ব ন্যায়পরায়ণ ও চালিকাশক্তি প্রজ্ঞাপূর্ণ, যে সমাজ অপরাধমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ, সদস্যরা ভ্রাতৃত্বকামী ও কল্যাণকর কাজে পরস্পর সহযোগী, তখন ইসলামি বিশ্বাসের প্রভাবের বিষয়টিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন একটি সমাজই যখন আমাদের কাম্য, আমাদের উচিত ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের ওপরই সেই সমাজকে গড়ে তোলা। তার কারণ ইসলামি বিশ্বাসই এমন সমাজনির্মাণের ভিত্তি। এই ভিত্তির ওপরই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবিদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং একটি উন্নত সভ্য শ্রেষ্ঠ সমাজ নির্মাণ করেছেন। ফলে যে ইসলামি উম্মাহ গঠিত হয়েছে তার কাছে পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত গোটা বিশ্ব নতি স্বীকার করেছে।

উস্তাদ আবুল হাসান আলি নদবি বলেন, সবচেয়ে বড় জট খুলে গেল। সেটা হলো শিরক ও কুফরির জট। এই জট খোলার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ছোট-বড় সব জটও খুলে গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সঙ্গে তার প্রথম জিহাদই করেছেন, ঈমান ও আকিদার জিহাদ। তাই তার প্রতিটি আদেশ ও প্রতিটি নিষেধের জন্য নতুন নতুন জিহাদের প্রয়োজন পড়েনি। প্রথম লড়াইয়েই ইসলাম জাহিলিয়াতের ওপর বিজয়ী হয়েছে। পরবর্তী প্রতিটি লড়াইয়ে বিজয়ই ছিল ইসলামের মিত্র।... যখন মদ হারাম হওয়ার আয়াত নাযিল হলো তখন উপচে পড়া পানপাত্র ছিল তাদের হাতে, কিন্তু মুহূর্তেই আল্লাহর নির্দেশ মদের পেয়ালা এবং উন্মুক্ত ঠোঁট ও উত্তেজিত চিত্তের মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল। মদের মটকাগুলো ভেঙে ফেলা হলো, ফলে মদিনার অলিতে-গলিতে বয়ে গেল মদের প্রবাহ!(৬১৮)

একটিমাত্র কথাই জাতির মধ্যে দৃঢ়মূল অভ্যাসের মূলোৎপাটন করেছিল, যে অভ্যাস তারা কয়েক পুরুষ ধরে লালন করছিল।

فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ) তোমরা নিবৃত্ত হবে না?
তারা বলেছিল, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা নিবৃত্ত হলাম; আমরা নিবৃত্ত হলাম, হে আমাদের প্রতিপালক...।

আমেরিকাও মদ নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে এবং আধুনিক সভ্যতার যাবতীয় উপকরণ তারা এই কাজে ব্যবহার করেছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন-সাময়িকী, ভাষণ-বক্তৃতা, ছবি, সিনেমা সবই তারা মদের অপকারিতা বর্ণনা করতে ব্যবহার করেছে। মদ-বিরোধী যুদ্ধে ৬০ মিলিয়ন(৬১৯) ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে তারা। মদের ক্ষতিকর দিক বর্ণনা করে প্রায় দুই বিলিয়ন (দুইশ কোটি) পৃষ্ঠা ছেপেছে। মদ-বিরোধী আইন প্রয়োগে ২৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ করেছে। তিনশ লোককে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। অর্ধ-মিলিয়নেরও বেশি লোককে কারাগারে পুরেছে। প্রায় চারশ চার মিলিয়ন ডলারের ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। কিন্তু এতকিছুর পরও মদের প্রতি মার্কিন জাতির আসক্তিই বেড়েছে। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে ১৯৩৩ সালে মদ বৈধ ঘোষণা করেছে। কারণটা খুব সহজ। তাদের মদ-বিরোধী নির্দেশ বাস্তবায়ন বিশ্বাসজাত বা আকিদাজাত কিছু ছিল না।(৬২০)

এই ভিত্তির ওপরই ইসলামের সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইসলাম মানবজাতিকে বিশুদ্ধ, সুন্দর ও সহজ আকিদা-বিশ্বাস প্রদান করে অন্যান্য বিশ্বাস থেকে তাদের অমুখাপেক্ষী করেছে। এই বিশ্বাস প্রশান্তিদায়ক, স্বস্তিকারক, দুশ্চিন্তাবিদারক এবং সঞ্জীবনী। তাই এই বিশ্বাসের আশ্রয়ে মানুষ ভীতি ও দুঃখ-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছে এবং আল্লাহকে ছাড়া কাউকে ভয় না করার পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। তারা নিশ্চিতভাবে জেনেছে যে, একমাত্র আল্লাহ তাআলাই কল্যাণ ও অকল্যাণ সাধনকারী, তিনিই দাতা এবং তিনিই বারণকারী। একমাত্র তিনিই মানুষের সকল প্রয়োজনের তত্ত্বাবধায়ক। এই নতুন জ্ঞান ও চৈতন্যের আলোকে মানুষ পৃথিবীকে নতুনভাবে ও নতুনরূপে দেখতে পায়। পৃথিবী তার কাছে নবরূপে উন্মোচিত হয়। সব ধরনের দাসত্ব ও গোলামি থেকে সে সুরক্ষিত থাকে। সৃষ্টিজীবের (মানুষের) থেকে সে কিছু আশা করে না এবং ভয়ও করে না। চিত্তকে বিক্ষিপ্ত করে এবং চিন্তাকে এলোমেলো করে দেয় এমন সবকিছু থেকে সে দূরে থাকে। এই বহুত্বের মধ্যেও সে একত্ব অনুভব করে এবং নিজেকে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বলে বিবেচনা করে। উপলব্ধি করে যে, সেই এই পৃথিবীর নেতা এবং পৃথিবীর বুকে আল্লাহ তাআলার খলিফা বা প্রতিনিধি। সে তার রব ও স্রষ্টার আনুগত্য করে এবং তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়ন করে। এভাবেই তার মানবিক মহান মর্যাদা প্রমাণিত হয়, মানুষের চিরস্থায়ী শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, যে শ্রেষ্ঠত্ব থেকে পৃথিবী তাকে দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চিত করে আসছে।

ইসলামি সভ্যতাই মানবতাকে এই দুর্লভ উপহারে ভূষিত করেছে, তা হলো তাওহিদি আকিদা-বিশ্বাসের উপহার। পৃথিবীর যেকোনো বিশ্বাসের চেয়ে এই আকিদা-বিশ্বাস ছিল অধিক অজ্ঞাত, অপরিচিত, নির্যাতিত ও প্রবঞ্চিত। কিন্তু তারপরই গোটা বিশ্বে এই বিশ্বাসের ধ্বনিই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। বিশ্বের সব ধরনের দর্শন ও দাওয়াতি কার্যক্রম এই বিশ্বাসের দ্বারা কমবেশি প্রভাবিত হয়েছে। ফলে বড় বড় কিছু ধর্ম-যাদের ভিত্তি ও বেড়ে ওঠা ছিল শিরক ও বহু-ঈশ্বরবাদের ওপর এবং যাদের রক্তে-মাংসে ছিল শিরক-ক্ষীণ আওয়াজে ও ফিসফিসিয়ে হলেও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। তাদের শিরকপূর্ণ বিশ্বাসরাশির দার্শনিকতাপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতেও বাধ্য হয়েছে এবং সেগুলোকে শিরক ও বিদআতের কলঙ্ক থেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করেছে। ইসলামের তাওহিদি আকিদার সঙ্গে তাদের বিশ্বাসের সামঞ্জস্য বিধান করতে চেয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই বড় বড় ধর্মের গুরুরা ও নেতৃস্থানীয়রা শিরকের ব্যাপারটা স্বীকার করতে এবং মানুষের সামনে তা উল্লেখ করতে লজ্জিত ও অপমানিত বোধ করতে শুরু করেছে। এসব শিরকপন্থী ব্যবস্থা ও ধর্মাদর্শের সবগুলোই হীনম্মন্যতাবোধে ও তুচ্ছতাবোধে আক্রান্ত হয়েছে। তাই তাওহিদি আকিদার উপহারই সবচেয়ে দামি ও মূল্যবান উপহার, যা পেয়ে মনুষ্যজাতি সৌভাগ্যমণ্ডিত হয়েছে। এটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত ও ইসলামি সভ্যতার অবদানের কল্যাণেই সম্ভব হয়েছে।(৬২১)

টিকাঃ
৬০৯. সুরা আরাফ: আয়াত ৫৪।
৬১০. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৮৩।
৬১১. সুরা যুমার: আয়াত ৩।
৬১২. আবুল হাসান আলি নদবি, আল-ইসলাম ওয়া আসারুহু ফিল-হাদারাতি ওয়া ফাদলুহু আলাল ইনসানিয়‍্যাহ, পৃ. ২১।
৬১৩. সুরা আম্বিয়া: আয়াত ২২।
৬১৪. যাদেরকে শরিক করা হয়েছে তাদেরকে শরিক হওয়ার যোগ্যতা প্রদান করতে পারোনি এবং কখনো পারবেও না।-অনুবাদক
৬১৫. সুরা সাবা: আয়াত ২৯।
৬১৬. আবুল হাসান আলি নদবি, আল-ইসলাম ওয়া আসারুহু ফিল-হাদারাতি ওয়া ফাদলুহু আলাল ইনসানিয়্যাহ, পৃ. ২২।
৬১৭. জামাল ফাওযি, মাআলিমুল হাদারাতিল ইনসানিয়াহ, পৃ. ১৬।
৬১৮. আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৯০।
৬১৯. ১ মিলিয়ন = ১০ লাখ।
৬২০. আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৬৮।
৬২১. আবুল হাসান আলি নদবি, আল-ইসলাম ওয়া আসারুহু ফিল-হাদারাতি ওয়া ফাদলুহু আলাল ইনসানিয়্যাহ, পৃ. ২১-২৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00