📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 পরবর্তী জাতি-গোষ্ঠীর আকিদা-বিশ্বাস

📄 পরবর্তী জাতি-গোষ্ঠীর আকিদা-বিশ্বাস


ইসলামপূর্ব বিশ্ব ইলাহত্বের হাকিকত ও সত্য সম্পর্কে অস্বচ্ছ ধারণার বশীভূত ছিল। আল্লাহর মহত্ত্বকে সঠিকভাবে নিরূপণ করতে পারে এমন কোনো পরিচ্ছন্ন ধারণা বা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। এ ব্যাপারে সবার ধারণা ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন ও ধোঁয়াশাপূর্ণ। অজ্ঞতা ও অলিক ধ্যানধারণাই এমন দৃষ্টিভঙ্গির চারপাশ ঘিরে রেখেছিল। সত্য এই যে, অন্যান্য সভ্যতা-যেমনটা তাদের ইতিহাস থেকে স্পষ্ট হয়-আল্লাহ তাআলাকে সঠিকভাবে চিনতে পারেনি, মহান আল্লাহর পরিচয়ই তাদের কাছে স্পষ্ট হয়নি। বিশ্বজগতের স্রষ্টা ও নিয়ন্তার ব্যাপারে যথার্থ ঈমানের পথ তারা পায়নি। পরিপূর্ণ ইলাহত্বের হাকিকতও তারা উপলব্ধি করতে পারেনি। যে ইলাহ সর্বজ্ঞানী, সর্বশক্তিমান, সর্বনিয়ন্তা এবং ক্ষমাপরায়ণ ও দয়ালু। কারণ পথপ্রদর্শক নবুয়তের সঙ্গে তাদের পরিচয় ছিল না, নিষ্কলঙ্ক ওহির সঙ্গেও তাদের সরাসরি যোগাযোগ ঘটেনি। ফলে তারা 'প্রথম কার্যকারণ' বা 'প্রথম অনুঘটক' বা 'ওয়াজিবুল উজুদ' সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে নিজস্ব পথ অবলম্বন করেছে। তাই তারা হোঁচট খেয়েছে এবং ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে অনুমান-আন্দাজ, ভ্রান্তি এবং প্রবৃত্তিতাড়িত ধ্যানধারণাই প্রাধান্য পেয়েছে।

এমনকি যেসব দার্শনিকের নাম ইতিহাস ঈশ্বরবাদী হিসেবে উল্লেখ করেছে, অর্থাৎ যারা মোটামুটিভাবে ইলাহত্বকে স্বীকার করেছে, যেমন সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটলের মতো বিশাল বিশাল দার্শনিক, যারা ঈশ্বরের প্রতি অবিশ্বাস ও নাস্তিকতাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাদেরও ইলাহত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছিল না, বরং তাদের ধারণা ছিল ত্রুটিপূর্ণ, সংশয়গ্রস্ত এবং অনেক অনুমান ও ভেজালমিশ্রিত। গ্রিকদের প্রথম শিক্ষক অ্যারিস্টটল যে ইলাহ বা স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকার করেছে তা আমরা এখানে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। দেখি কেমন সেই ইলাহ? তিনি কি সেই ইলাহ যাকে আমরা জানি সবকিছুর স্রষ্টা, জীবিত সবকিছুর রিযিকদাতা, সবকিছুর নিয়ন্তা, যা কিছু হয়েছে এবং যা কিছু হবে সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত, যা চান তা-ই করেন, সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান? নাকি তিনি আমরা যাকে জানি সেই ইলাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ?(৫৯৩)

উইল ডুরান্ট 'মাবাহিজুল ফালাসাফা' গ্রন্থে বলেছেন, অ্যারিস্টটল ঈশ্বর বা আল্লাহকে একটি আত্মারূপে কল্পনা করেছে, যা তার সত্তাকে ধারণ করে আছে। তা একটি রহস্যময় দুর্জেয় গুপ্ত আত্মা। কারণ অ্যারিস্টটলের ইলাহ বা ঈশ্বর কখনো কোনো কাজ করেন না। তার কোনো ইচ্ছা নেই, অভিপ্রায় নেই, উদ্দেশ্য নেই। তার কার্যক্ষমতা এতটাই পবিত্র ও নির্ভেজাল যে, তা তাকে কোনো কাজ করতে দেয় না। তিনি সম্পূর্ণরূপে পরিপূর্ণ, কোনো ব্যাপারে নাক গলানো তার জন্য সংগত নয়। এ কারণেই তিনি কোনো কাজ করেন না। তার একটিই দায়িত্ব, বস্তুরাশির মৌল পদার্থ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। এই যুক্তিতে যে, তিনিই সত্তাগতভাবে যাবতীয় বস্তুর মৌল পদার্থ এবং সকল বস্তুর আকৃতি। এ কারণে তার একমাত্র কাজ হলো নিজ সত্তা নিয়ে চিন্তা গবেষণা করা। এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে, ইংরেজরা অ্যারিস্টটলকেই ভালোবাসবেন, কারণ তার ঈশ্বর স্পষ্টভাবে তাদের সম্রাটেরই অবিকল নকল অথবা তাদের সম্রাট অ্যারিস্টটলের ঈশ্বরেরই কার্বন কপি।(৫৯৪)

অ্যারিস্টটলের ঈশ্বর ছিলেন নিঃস্ব-অপদার্থ, বিশ্বনিখিলে ক্রিয়াকর্মে তার সক্ষমতা ছিল না, কোনোকিছুর সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কিন্তু প্লেটোর ঈশ্বর অ্যারিস্টটলের ঈশ্বরের চেয়েও নিঃস্ব-অপদার্থ, অর্থাৎ আধুনিক প্লেটোবাদ যে ঈশ্বরের কথা বলে থাকে। কারণ এই ঈশ্বর কোনোকিছু নিয়ে চিন্তা করেন না, এমনকি তার নিজের সত্তা নিয়েও নয়!(৫৯৫)

ষষ্ঠ খ্রিষ্টীয় শতাব্দীতে পৌত্তলিকতাবাদ তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, শুধু ভারতে ঈশ্বরের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৩৩০ মিলিয়ন বা ৩৩ কোটিতে। প্রতিটি বস্তু হয়ে উঠেছিল অনন্য, প্রতিটি জিনিসই ছিল আকর্ষক, জীবনের সঙ্গে যুক্ত সবকিছুই ছিল দেবতা, যাদের উপাসনা করা হতো। এভাবে মূর্তি, প্রতিমা, দেবতার সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পেতে অসংখ্য হয়ে গিয়েছিল। ঈশ্বর ও দেবতারা ঐতিহাসিক চরিত্র ও বীরের রূপ পরিগ্রহ করেছিল, কতিপয় দেবতা ভাস্বর হয়েছিল পাহাড়ের ওপর, কেউ কেউ উপস্থিত হয়েছিল সোনা-রুপা ইত্যাদি খনিজ পদার্থরূপে, নদীরূপেও ছিল দেবদেবী, কোনো কোনো দেবতা ছিল যুদ্ধাস্ত্ররূপে, প্রজননযন্ত্ররূপেও ছিল কেউ কেউ, চতুষ্পদ জন্তুজানোয়ারও ছিল দেবদেবী, এগুলোর প্রধান হলো গাভি। গ্রহনক্ষত্রও ছিল দেবতা, দেবতা ছিল আরও অনেককিছু। ধর্ম পরিণত হয়ে ছিল কুসংস্কার, রূপকথা ও সংগীতের রূপে। তাদের আকিদা-বিশ্বাস ও উপাসনার ব্যাপারে আল্লাহ কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি। কোনো কালে সুস্থ বিবেকবুদ্ধিও তা মেনে নেয়নি। বর্তমান যুগে মূর্তির আকার-আকৃতি পূর্বের সব যুগকে ছাড়িয়ে গেছে। সব স্তরের মানুষ, রাজাবাদশা থেকে নিয়ে কপর্দকহীন লোক পর্যন্ত সবাই মূর্তিপূজার ওপর অটল রয়েছে।(৫৯৬)

অবস্থা এই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মানুষের কাছেই মানবিকতার মূল্য হারিয়েছে। তারা পাথর, বৃক্ষ ও নদনদীর সিজদা করেই যাচ্ছে, তারা এমন সবকিছুর পূজা করছে যা নিজেরই কোনো উপকার করতে পারে না, ক্ষতি প্রতিহত করতে পারে না।

রোমান সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীতে খ্রিষ্টধর্মের ধ্বজাধারী। তারা বড় দুটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তাদের একটি ক্যাথলিক, অপরটি অর্থোডক্স। অর্থোডক্সরা তাদের কর্মকাণ্ড অনুযায়ী দুটি উপদলে বিভক্ত হয়েছিল, একটি হলো মুলকানিয়া, অপরটি হলো মানুফিসিয়া। এসব দল ও উপদলের মধ্যে তীব্র লড়াই জারি ছিল। প্রত্যেক দলই তাদের ধর্মকে বিকৃত করে ফেলেছিল। তারা সবাই আল্লাহর সঙ্গে অন্যদের শরিক করত, শরিক করার পদ্ধতি নিয়ে ছিল তাদের মধ্যে মতবিরোধ। আল্লাহর বদলে পুরোহিত ও ধর্মগুরুরাই হয়ে উঠেছিল ঈশ্বর।

ইউরোপের মধ্যযুগের ইতিহাস হলো ধর্মীয় (পোপীয়) কর্তৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের মধ্যে বিরোধ ও লড়াইয়ের ইতিহাস। পোপীয় কর্তৃত্ব আল্লাহর নামে কথা বলার অধিকার কুক্ষিগত করে নিয়েছিল। তারা ছিল সাধারণ মানুষের ঊর্ধ্বে, তাদের জবাবদিহি আদায় করার বা তাদের কর্মকাণ্ড তত্ত্বাবধান করার অধিকার কারও ছিল না। রাজাবাদশাদের ওপরও কর্তৃত্ব ফলাত তারা, ধর্মের নামে রাজাবাদশাদেরও চূড়ান্তভাবে বশ্যতা স্বীকার করতে হতো। এই পোপীয় কর্তৃত্বের সঙ্গে লড়াই জারি ছিল শাসকগোষ্ঠীর, সম্রাট, বিশপ ও আমিরদের, যারা জনগণের ওপর তাদের ক্ষমতা চর্চা করতে চাইত, তাদের উপযুক্ততা প্রমাণ করতে চাইত এবং প্রজাদের ওপর তাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব বজায় রাখত। তারা চাইত না কোনো শক্তি তাদের চ্যালেঞ্জ করুক, সেটা যে নামেই হোক, যে কারণেই হোক, এমনকি ধর্মের আচ্ছাদনে আবৃত পোপীয় শক্তিও নয়।

১০৭৩ খ্রিষ্টাব্দে পোপ সপ্তম গ্রেগরি(৫৯৭) ঘোষণা দিলেন যে গোটা পৃথিবীতে কর্তৃত্বের মালিক একমাত্র গির্জা। আল্লাহর পক্ষ থেকে তারা সরাসরি কর্তৃত্ব বাস্তবায়ন করবে। গির্জার এই ভূমিকা পালনের ফলে পৃথিবীর সব সম্রাট ও শাসকদেরকে পোপের বশ্যতা স্বীকার করতে হবে। জ্ঞানের ক্ষেত্রেও পোপ হবেন একচ্ছত্র কর্তৃত্বপরায়ণ। তিনিই বিশপ ও যাজকদের নিয়োগ দেবেন এবং তাদের বরখাস্ত করবেন। এমনকি তিনি প্রধান বিশপদের বা গির্জাপ্রধানদেরও পদচ্যুত করার ক্ষমতা রাখেন। কারণ পোপই তাদের নেতা, অন্যরা সবাই তাদের কাজের জন্য জবাবদিহি করবে, তিনি যা করবেন তার জন্য কোনো জবাবদিহি করবেন না। এই নীতির ওপর ভিত্তি করে পোপেরা যেসব বিশপ ও সম্রাটদের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকত তাদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করতেন। ইংল্যান্ডের সম্রাট চতুর্থ হেনরির(৫৯৮) সঙ্গে এই ঘটনা ঘটেছে। ১১০৭ খ্রিষ্টাব্দে পোপ তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ফলে তিনি পোপের ফটকের সামনে খালি পায়ে ও খালি মাথায় বরফ ও বৃষ্টির মধ্যে তিন দিন অবস্থান করতে বাধ্য হন। আরও ঘটনা আছে। পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট(৫৯৯) ইংল্যান্ডের রাজা জনের ওপর ক্রুদ্ধ হন। গোটা ইংল্যান্ডের ওপর তার ক্রোধের অভিশাপ নেমে আসে। তিনি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণা করেন। ফরাসি সম্রাটকে তিনি ইংল্যান্ডে আক্রমণ করতে ও তা দখল করে নিয়ে নিজের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে উসকানি দেন। ফলে ইংল্যান্ডের রাজা পোপের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য হন। রাজা জন পোপের আনুগত্য করার ঘোষণা দেন এবং তার কর্তৃত্বাধীন থাকবেন বলে শপথ গ্রহণ করেন। পোপের জন্য মূল্যবান উপঢৌকন প্রেরণ করেন। তারপর পোপ তাকে ক্ষমা করেন।

১১৯৮ খ্রিষ্টাব্দে পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট তার শীর্ষস্থানীয় লোকদের কাছে একটি নির্দেশনা পাঠান। তাতে তিনি ঘোষণা করেন যে তিনিই ঈসা মাসিহের স্থলাভিষিক্ত, তার অবস্থান আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের মধ্যবর্তী স্থানে, রবের নিচে ও মানুষের ওপরে। তিনি সবার ওপর কর্তৃত্ব করবেন, তার ওপর কেউ কর্তৃত্ব করতে পারবে না।(৬০০)

কোনো সন্দেহ নেই যে, খ্রিষ্টধর্মের গুরুদের এমন বিকৃতি, কর্তৃত্বপরায়ণতা, জোর-জুলুম-জবরদস্তি মানুষকে গির্জা বিমুখ করে দিয়েছিল। এসব কারণেই আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজ গির্জা কর্তৃপক্ষের হম্বিতম্বি ও ঔদ্ধত্য থেকে পালিয়ে বেড়ানোর চেষ্টা করছে, ধর্মের লাগাম ছিঁড়ে বেরিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতায় মনোযোগী হচ্ছে এবং ধর্মকে পার্থিব যাবতীয় বিষয় থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

আরবরা শুরুর দিকে-ইতিপূর্বে আমরা তা আলোচনা করেছি-আল্লাহর ইবাদত করত, আল্লাহর একত্ব স্বীকার করত এবং বিশ্বাস করত যে তিনি সবচেয়ে বড় ইলাহ, বিশ্বজগতের স্রষ্টা, আকাশ ও জমিনের নিয়ন্ত্রক, সবকিছুর কর্তৃত্ব তাঁরই হাতে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَبِنْ سَأَلْتَهُمْ مِّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ

তুমি যদি তাদের জিজ্ঞেস করো, কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ।(৬০১)

কিন্তু বহু কাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাদের যা-কিছু স্মরণ রাখতে বলা হয়েছিল তার অধিকাংশই তারা ভুলে গেল এবং আল্লাহর সঙ্গে শরিক করতে শুরু করল। আল্লাহ ও তাদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী বানিয়ে নিলো। আল্লাহর কাছে প্রার্থনার ক্ষেত্রে তাদের উসিলা মানত এবং তাদের নাম উল্লেখ করে তাদের কাছেও প্রার্থনা করত। আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى
আমরা তো এদের পূজা এই জন্যই করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।(৬০২)

তারা এগুলোর নানা ধরনের পূজায় লিপ্ত হলো এবং তাদের মগজে এদের সুপারিশের চিন্তা বদ্ধমূল হয়ে গেল এবং তারা এই বিশ্বাসে উপনীত হলো যে এগুলো তাদের জন্য কল্যাণের বা অকল্যাণের সুপারিশ করতে সক্ষম। এভাবে তারা শিরকে উপনীত হলো এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্যদেরকে ইলাহরূপে গ্রহণ করল। তারা এ ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন করল যে এগুলো পৃথিবীর পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে এবং সত্তাগতভাবেই উপকার ও অপকার, কল্যাণ ও অকল্যাণ, দেওয়া ও না দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।(৬০৩)

জাযিরাতুল আরবে মূর্তিপূজা ছড়িয়ে পড়ল। এমনকি প্রতি গোত্রে মূর্তি স্থাপিত হলো, তারপর ঘরে ঘরে মূর্তি তৈরি হলো। ইবনুস সায়িব আল-কালবি(৬০৪) বলেছেন, মক্কার প্রত্যেক গৃহকর্তার বাড়িতে একটি করে মূর্তি ছিল, বাড়ির সবাই সেই মূর্তির উপাসনা করত। তাদের কেউ সফর করতে চাইলে বাড়িতে সর্বশেষ যে কাজটি করত তা হলো মূর্তিটির গায়ে হাত বুলানো। সফর থেকে ফিরে এসে বাড়িতে প্রবেশ করে প্রথম যে কাজটি করত তা হলো ওই মূর্তির গায়েই হাত বুলানো। আরবরা মূর্তিপূজায় এতটা মগ্ন হলো যে তাদের বিচারবুদ্ধি লোপ পেয়ে গেল। তাদের কেউ কেউ মূর্তিঘর নির্মাণ করল, কেউ মূর্তি নির্মাণ করল। যাদের এসব করার সামর্থ্য ছিল না তারা হারামের সামনে একটি পাথর স্থাপন করল অথবা যেখানে ভালো মনে করল সেখানে পাথর স্থাপন করল। তারপর কাবাঘরের মতো এটির চারপাশে তাওয়াফ করতে লাগল। তারা এগুলোর নাম দিলো 'আনসাব'। কেউ সফরে বেরুতে চাইলে হাতে চারটি পাথর নিত, যে পাথরটিকে সবচেয়ে সুন্দর মনে হতো সেটিকে প্রভু হিসেবে গ্রহণ করে সঙ্গে নিয়ে যেত এবং বাকি তিনটিকে চুলার ঝিক(৬০৫) হিসেবে রেখে দিত। সফর থেকে ফিরে এসে ওই সুন্দর পাথরটিকে ফেলে দিত।(৬০৬) আবু রাজা আল-আতারিদি বলেন,
كُنَّا نَعْبُدُ الْحَجَرَ فَإِذَا وَجَدْنَا حَجَرًا هُوَ أَخْبَرُ مِنْهُ أَلْقَيْنَاهُ وَأَخَذْنَا الْآخَرَ فَإِذَا لَمْ نَجِدْ حَجَرًا جَمَعْنَا جُثْوَةً مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ جِئْنَا بِالشَّاةِ فَحَلَبْنَاهُ عَلَيْهِ ثُمَّ طُفْنَا بِهِ»
আমরা পাথরের পূজা করতাম। যখন এটির চেয়ে ভালো কোনো পাথর পেতাম তখন এটি ফেলে দিয়ে ওই ভালোটিকে প্রভু হিসেবে গ্রহণ করতাম। পাথর না পেলে আমরা মাটির ঢিবি বানিয়ে নিতাম, দুগ্ধবতী ছাগী নিয়ে এসে ওই ঢিবির ওপর দোহন করাতাম, তারপর ঢিবিটির চারপাশে তাওয়াফ করতাম।(৬০৭)

কাবাঘরের ভেতরে ও তার আঙিনায় তিনশ ষাটটি মূর্তি ছিল, যে ঘরটি একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে।(৬০৮)

দ্বীন-ধর্ম, আকিদা-বিশ্বাস ও ইবাদতের উপযুক্ত উপাস্যের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ধ্যানধারণা ছিল এমনই। তাওহিদের ধারণা বিলুপ্ত হয়ে সেখানে পৌত্তলিকতা স্থান করে নিয়েছিল। কুদরত, রবুবিয়্যাত ও স্রষ্টার বৈশিষ্ট্যাবলি তিরোহিত হয়েছিল। একইসঙ্গে মানবতার বিপর্যয় ঘটেছিল, সভ্যতাকেন্দ্রিক সব ধরনের মূল্যবোধেরও অবক্ষয় ঘটেছিল।

টিকাঃ
৫৯৩. ড. ইউসুফ আল-কারযাবি, আল-ইসলাম হাদারাতুল গাদ, পৃ. ১৪।
৫৯৪. উইল ডুরান্ট, দা স্টোরি অফ ফিলোসফি (The Story of Philosophy), আরবি অনুবাদ, মাবাহিজুল ফালসাফা, অনুবাদক, আহমাদ ফুয়াদ আল-আহওয়ানি, পৃ. ১৬১-১৬২, ইউসুফ আল-কারযাবি, আল-ইসলাম হাদারাতুল গাদ, পৃ. ১৪-১৫ থেকে উদ্ধৃত।
৫৯৫. মাহমুদ আব্বাস আল-আক্কাদ, আল্লাহ, পৃ. ৭৮, ১৩১।
৫৯৬. আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৪০ এবং আল-ইসলাম ওয়া আসারুহু ফিল-হাদারাতি ওয়া ফাদলুহু আলাল ইনসানিয়্যাহ, পৃ. ২১।
৫৯৭. Pope Gregory VII, 1015-1085.
৫৯৮. Henry IV of England (Henry Bolingbroke).
৫৯৯. Pope Innocent III, 1160-1216.
৬০০. আবদুল্লাহ নাসিহ উলওয়ান, মাআলিমুল হাদারাতি ফিল ইসলাম ওয়া আসারুহা ফিন নাহদাতিল উরুব্বিয়া, পৃ. ৩৮-৩৯।
৬০১. সুরা আনকাবুত: আয়াত ৬১।
৬০২. সুরা যুমার: আয়াত ৩।
৬০৩. আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৪৫।
৬০৪. ইবনুস সায়িব আল-কালবি: আবুন নদর মুহাম্মাদ ইবনুস সায়িব ইবনে বিশর ইবনে আমর (মৃ. ১৪৬ হি./৭৬৩ খ্রি.)। আরবদের ইতিহাস বিশেষজ্ঞ। কথক ইতিহাসবিদ। কুফার অধিবাসী, এখানেই জন্মগ্রহণ ও মৃত্যুবরণ করেন। তিনি শিয়া মতাবলম্বী। ইতিহাস বিষয়ে তার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৬, পৃ. ২৪৮-২৪৯।
৬০৫. চুলার ওপর বসানো পাথরের তিনটি টুকরো, যেগুলোয় রান্নার হাঁড়ি বসানো হয়।
৬০৬. আবুল মুনযির হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনুস সায়িব আল-কালবি, কিতাবুল আসনাম, তাহকিক, আহমাদ যাকি পাশা, পৃ. ৩৩।
৬০৭. বুখারি, কিতাব : আল-মাগাযি, বাব : ওয়াফদু বানি হানিফাহ ওয়া হাদিসু সুমামাহ ইবনে আসাল, হাদিস নং ৪১১৭।
৬০৮. বুখারি, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, কিতাব : আল-মাযালিম, বাব: হাল তুকসারুদ দিনান আল্লাতি ফিহাল খাম্ আও তুখাররাকুয যিকাক, হাদিস নং ২৩৪৬; মুসলিম, কিতাব: আল-জিহাদ ওয়াস-সিয়ার, বাব: ইযালাতুল আসনাম মিন হাওলিল কাবা, হাদিস নং ১৭৮১।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 তাওহিদ ও আকিদাগত চিন্তাধারার সংশোধন

📄 তাওহিদ ও আকিদাগত চিন্তাধারার সংশোধন


পূর্ববর্তী জাতিসমূহের অলিক ধ্যানধারণা, কুসংস্কার ও আকিদাগত ভ্রান্তির মোকাবিলায় এবং গোটা বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার সামনে যেদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাব ঘটল, সেদিন থেকেই তাওহিদের আকিদার ক্ষেত্রে মুসলিমদের অবদান শুরু হয়েছে।

এই আকিদা মানবতার জন্য ইসলামের সবচেয়ে বড় উপহার, মানবতা এমন উপহার কখনো পায়নি এবং কিয়ামত পর্যন্ত কখনো পাবেও না।

ইসলামের আকিদায় এই বিশ্ব মালিকহীন নয়, বরং তার একজন মালিক রয়েছে। তিনি হলেন তার স্রষ্টা, তার রূপকার, তার শাসনকর্তা, তার নিয়ন্ত্রক, সকল সৃষ্টি ও কর্তৃত্ব তাঁরই। শাসন চলবে তাঁরই।

أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ
জেনে রাখো, সৃজন ও আদেশ তাঁরই।(৬০৯)

এই পৃথিবীতে তাঁর আদেশ ও ক্ষমতার বাইরে কিছুই ঘটে না। পৃথিবীর অস্তিত্বের মূল কারণ হলো তাঁর অভিপ্রায় ও সক্ষমতা। বিশ্বজগৎ সৃষ্টি ও অস্তিত্বের ক্ষেত্রে তাঁর বশীভূত ও তাঁর অনুগত এবং তাঁর কাছে সমর্পিত।
وَلَهُ أَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
আকাশে ও পৃথিবীতে যা-কিছু রয়েছে তার সবই তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।(৬১০)

ইচ্ছা ও স্বাধীনতার অধিকারী সকল সৃষ্টির উচিত তাঁর আনুগত্য করে নেওয়া।
أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ
জেনে রাখো, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য।(৬১১),(৬১২)

কারণ আল্লাহ তাআলাই গোটা বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন, সকল বান্দাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই একমাত্র উপাস্য, সকল সৃষ্টির তাঁরই উদ্দেশ্যে ইবাদত করা আবশ্যক।

ইসলাম এ ব্যাপারে চূড়ান্ত দলিল-প্রমাণ পেশ করেছে যে, আল্লাহ তাআলাই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং এ ব্যাপারেও চূড়ান্ত প্রমাণ পেশ করেছে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল পেশের আঙ্গিকে আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَوْ كَانَ فِيهِمَا أَلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا
যদি আল্লাহ ব্যতীত বহু ইলাহ থাকত আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে, তাহলে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত।(৬১৩)

আল্লাহ তাআলা সকল মানুষের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন,
قُلْ أَرُونِي الَّذِينَ أَلْحَقْتُمْ بِهِ شُرَكَاءَ كَلَّا بَلْ هُوَ اللَّهُ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
বলো, তোমরা আমাকে দেখাও যাদের শরিকরূপে তাঁর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছ তাদের। না, কখনো না,(৬১৪) বরং তিনি আল্লাহ, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।(৬১৫)

সত্য এই যে, এই যুক্তি অত্যন্ত সন্তোষজনক, বিশ্ববাসী সবাই এই যুক্তি গ্রহণ করেছে ও সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাই আল্লাহর দ্বীনে মানুষ দলে দলে প্রবেশ করেছে।

এখানে কারও কারও ভুল হয়ে থাকে, যারা এই ধারণা করেন যে, আরব মুসলিমরা পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তার ফলে ইসলামও ছড়িয়ে পড়েছে এবং আরবদের সংখ্যাধিক্যের ফলে তাওহিদি বিশ্বাসের বিস্তৃতি ঘটেছে এবং ভুল করে থাকে যারা এই ধারণা করে যে, আরব মুসলিমরা তরবারি ও অস্ত্রের শক্তি প্রয়োগ করে মানুষকে ইসলামে প্রবেশ করতে ও তাওহিদি বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরতে বাধ্য করেছে। আমরা পৃথিবীর ইতিহাস ঘেঁটে দেখতে পারি।

আরব মুসলিমরা ছিল সংখ্যায় অল্প। সংখ্যায় ও গুণগত দিক থেকে তাদের অস্ত্রবল ছিল দুর্বল। তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্ভাবনাও ছিল অতি নগণ্য। তারপরও ওই সময় বিশ্বের মানুষ দেশ ও জাতির ধর্মাদর্শ এবং শক্তিশালী ও উন্নত সভ্যতা ত্যাগ করে এই নগণ্য মানুষের ধর্মাদর্শে প্রবেশ করেছে!

স্বাভাবিকভাবেই মনের মধ্যে এই প্রশ্ন জেগে ওঠে যে, বিশ্বের মানুষ এই কাজ কেন করেছিল? কেন তারা এই ধর্মাদর্শে প্রবেশ করেছিল?

এই প্রশ্নের জবাব এইভাবে দেওয়া যেতে পারে যে, এই ধর্মাদর্শ ছিল সন্তোষজনক, এই ধর্মের আকিদা-বিশ্বাস ছিল যৌক্তিক ও মানুষের স্বভাব চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই আকিদা-বিশ্বাসের ফিতরাত দিয়েই আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তারা এক সত্তার ইবাদত করবে, যার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, কোনো শরিক নেই।

এখন আমরা কয়েকটি বিষয় জিজ্ঞাসাবাদ করব:

• আরবদের মূলত কে বাধ্য করেছিল ইসলামে প্রবেশ করতে, অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবিরা ছিলেন সংখ্যায় ও শক্তিতে নগণ্য ও দুর্বল?
• ইসলামে প্রবেশ করতে মিশরীয়দের বাধ্য করেছিল কে? কে তাদের জবরদস্তি করেছিল? এটা কি বোধগম্য যে, মাত্র আট হাজার সৈনিক মিশরীয়দের মতো একটি প্রাচীন জাতিকে বাধ্য করেছিল? বিজয়কালীন যাদের সংখ্যা ছিল ৮০ লাখেরও বেশি তা ছাড়া এটাও জানা কথা যে, মিশর ছিল কার্যতভাবে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীন এবং তখন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী।

• কে পারস্যবাসীকে শত শত বছরের পৌত্তলিকতা ত্যাগ করতে এবং ইসলামকে আলিঙ্গন করতে বাধ্য করেছে? অথচ তারা সংখ্যায় বিপুল এবং তাদের রয়েছে দীর্ঘ সমৃদ্ধ ইতিহাস!
• কে দক্ষিণ আফ্রিকা, আন্দালুস, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুর্কি ও অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেছে?
• বরং কে বর্তমান বিশ্বকে ইসলামে প্রবেশ করতে বাধ্য করেছে? অথচ সবাই স্বীকার করছে যে মুসলিমরা অন্যদের তুলনায় অত্যন্ত নাজুক ও দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। কেবল যে ইসলামে প্রবেশের ঘটনা ঘটছে তা নয়, ইসলাম বরং বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে সম্প্রসারণশীল ধর্ম!

যে সত্যে কোনো সন্দেহ নেই তা এই যে, আল্লাহ তাআলার কর্তৃত্ব পূর্ণাঙ্গ এবং আল্লাহর দ্বীনে কোনো ত্রুটি নেই, কোনো ভ্রান্তি নেই। এ কারণেই যে-কেউ ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা করবে, ইসলামকে ভালোভাবে জানবে, তাকে স্বীকার করতেই হবে যে এটি সত্য ধর্ম। চাই সে এই ধর্মের অনুসরণ করুক বা না করুক।

আরেকটি সত্য এই যে, আকিদা ও বিশ্বাসগত ধারণার ক্ষেত্রে মুসলিমদের যে অবদান তার প্রভাব কেবল যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের ওপরই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অমুসলিমরাও এতে উপকৃত হয়েছে। (যার আলোচনা সামনে আসব)। তাদের কাছে আকিদা ও বিশ্বাসের বাস্তবিক দিকগুলো উন্মোচিত হয়েছে, একত্ববাদ (তাওহিদ) কী এবং কেন তা-ও তাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে।

এটা স্পষ্ট যে, ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের ফলস্বরূপ মানুষের ওপর প্রথম যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব তাতে তারা উপলব্ধি করেছে যে গোটা বিশ্ব একটি কেন্দ্রের ও একই ব্যবস্থার অনুসারী বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে স্পষ্ট সম্পর্ক বিদ্যমান এবং তাদের নীতি-বিধানের মধ্যেও ঐক্য রয়েছে। এই বিশ্বাস ও উপলব্ধির পর মানুষ জীবনের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে এবং নিজেদের চিন্তা ও কর্মাবলিকে প্রজ্ঞা ও অন্তর্দৃষ্টির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।(৬১৬)

কোনো সন্দেহ নেই যে, সর্বশক্তিমান এক ইলাহের প্রতি ঈমান মানুষের চিন্তাকে বহু-ঈশ্বরবাদের খপ্পর থেকে মুক্তি দিয়েছে, বিশুদ্ধ স্বভাব ও চরিত্রের সঙ্গে বহু-ঈশ্বরবাদ কখনো মেলে না। জীবন ও জগতের সকল গতিপথের নিয়ন্তা মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী আত্মশক্তি ও দেহশক্তির মুক্তি ঘটেছে, আল্লাহর হাতেই রয়েছে সৃষ্টি সকলের ভাগ্যলিপি, সৃষ্টির সবাই কাজেকর্মে তাঁরই ওপর নির্ভরশীল। সকলের অন্তরে দৃঢ়বিশ্বাস রয়েছে যে বিশ্বজগতের একজন প্রতিপালক রয়েছেন, যিনি চতুষ্পার্শ্বে চলমান সবকিছু দেখেন, যিনি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করেন এবং অপরাধী-পাপীদের শাস্তি দেন, দুনিয়াতে না হলে আখিরাতে দেন। তিনি কারও সৎকর্মকে বাতিল করেন না এবং তাঁর কাছে কারও অধিকার খর্ব হয় না।(৬১৭)

কোনো সন্দেহ নেই যে, সমাজব্যবস্থার ওপরও ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিদ্যমান। যখন আমরা একটি পরিচ্ছন্ন সমাজ গঠন করতে চাই, যে সমাজের নেতৃত্ব ন্যায়পরায়ণ ও চালিকাশক্তি প্রজ্ঞাপূর্ণ, যে সমাজ অপরাধমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ, সদস্যরা ভ্রাতৃত্বকামী ও কল্যাণকর কাজে পরস্পর সহযোগী, তখন ইসলামি বিশ্বাসের প্রভাবের বিষয়টিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন একটি সমাজই যখন আমাদের কাম্য, আমাদের উচিত ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের ওপরই সেই সমাজকে গড়ে তোলা। তার কারণ ইসলামি বিশ্বাসই এমন সমাজনির্মাণের ভিত্তি। এই ভিত্তির ওপরই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবিদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং একটি উন্নত সভ্য শ্রেষ্ঠ সমাজ নির্মাণ করেছেন। ফলে যে ইসলামি উম্মাহ গঠিত হয়েছে তার কাছে পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত গোটা বিশ্ব নতি স্বীকার করেছে।

উস্তাদ আবুল হাসান আলি নদবি বলেন, সবচেয়ে বড় জট খুলে গেল। সেটা হলো শিরক ও কুফরির জট। এই জট খোলার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ছোট-বড় সব জটও খুলে গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সঙ্গে তার প্রথম জিহাদই করেছেন, ঈমান ও আকিদার জিহাদ। তাই তার প্রতিটি আদেশ ও প্রতিটি নিষেধের জন্য নতুন নতুন জিহাদের প্রয়োজন পড়েনি। প্রথম লড়াইয়েই ইসলাম জাহিলিয়াতের ওপর বিজয়ী হয়েছে। পরবর্তী প্রতিটি লড়াইয়ে বিজয়ই ছিল ইসলামের মিত্র।... যখন মদ হারাম হওয়ার আয়াত নাযিল হলো তখন উপচে পড়া পানপাত্র ছিল তাদের হাতে, কিন্তু মুহূর্তেই আল্লাহর নির্দেশ মদের পেয়ালা এবং উন্মুক্ত ঠোঁট ও উত্তেজিত চিত্তের মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল। মদের মটকাগুলো ভেঙে ফেলা হলো, ফলে মদিনার অলিতে-গলিতে বয়ে গেল মদের প্রবাহ!(৬১৮)

একটিমাত্র কথাই জাতির মধ্যে দৃঢ়মূল অভ্যাসের মূলোৎপাটন করেছিল, যে অভ্যাস তারা কয়েক পুরুষ ধরে লালন করছিল।

فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ) তোমরা নিবৃত্ত হবে না?
তারা বলেছিল, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা নিবৃত্ত হলাম; আমরা নিবৃত্ত হলাম, হে আমাদের প্রতিপালক...।

আমেরিকাও মদ নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে এবং আধুনিক সভ্যতার যাবতীয় উপকরণ তারা এই কাজে ব্যবহার করেছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন-সাময়িকী, ভাষণ-বক্তৃতা, ছবি, সিনেমা সবই তারা মদের অপকারিতা বর্ণনা করতে ব্যবহার করেছে। মদ-বিরোধী যুদ্ধে ৬০ মিলিয়ন(৬১৯) ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে তারা। মদের ক্ষতিকর দিক বর্ণনা করে প্রায় দুই বিলিয়ন (দুইশ কোটি) পৃষ্ঠা ছেপেছে। মদ-বিরোধী আইন প্রয়োগে ২৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ করেছে। তিনশ লোককে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। অর্ধ-মিলিয়নেরও বেশি লোককে কারাগারে পুরেছে। প্রায় চারশ চার মিলিয়ন ডলারের ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। কিন্তু এতকিছুর পরও মদের প্রতি মার্কিন জাতির আসক্তিই বেড়েছে। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে ১৯৩৩ সালে মদ বৈধ ঘোষণা করেছে। কারণটা খুব সহজ। তাদের মদ-বিরোধী নির্দেশ বাস্তবায়ন বিশ্বাসজাত বা আকিদাজাত কিছু ছিল না।(৬২০)

এই ভিত্তির ওপরই ইসলামের সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইসলাম মানবজাতিকে বিশুদ্ধ, সুন্দর ও সহজ আকিদা-বিশ্বাস প্রদান করে অন্যান্য বিশ্বাস থেকে তাদের অমুখাপেক্ষী করেছে। এই বিশ্বাস প্রশান্তিদায়ক, স্বস্তিকারক, দুশ্চিন্তাবিদারক এবং সঞ্জীবনী। তাই এই বিশ্বাসের আশ্রয়ে মানুষ ভীতি ও দুঃখ-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছে এবং আল্লাহকে ছাড়া কাউকে ভয় না করার পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। তারা নিশ্চিতভাবে জেনেছে যে, একমাত্র আল্লাহ তাআলাই কল্যাণ ও অকল্যাণ সাধনকারী, তিনিই দাতা এবং তিনিই বারণকারী। একমাত্র তিনিই মানুষের সকল প্রয়োজনের তত্ত্বাবধায়ক। এই নতুন জ্ঞান ও চৈতন্যের আলোকে মানুষ পৃথিবীকে নতুনভাবে ও নতুনরূপে দেখতে পায়। পৃথিবী তার কাছে নবরূপে উন্মোচিত হয়। সব ধরনের দাসত্ব ও গোলামি থেকে সে সুরক্ষিত থাকে। সৃষ্টিজীবের (মানুষের) থেকে সে কিছু আশা করে না এবং ভয়ও করে না। চিত্তকে বিক্ষিপ্ত করে এবং চিন্তাকে এলোমেলো করে দেয় এমন সবকিছু থেকে সে দূরে থাকে। এই বহুত্বের মধ্যেও সে একত্ব অনুভব করে এবং নিজেকে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বলে বিবেচনা করে। উপলব্ধি করে যে, সেই এই পৃথিবীর নেতা এবং পৃথিবীর বুকে আল্লাহ তাআলার খলিফা বা প্রতিনিধি। সে তার রব ও স্রষ্টার আনুগত্য করে এবং তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়ন করে। এভাবেই তার মানবিক মহান মর্যাদা প্রমাণিত হয়, মানুষের চিরস্থায়ী শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, যে শ্রেষ্ঠত্ব থেকে পৃথিবী তাকে দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চিত করে আসছে।

ইসলামি সভ্যতাই মানবতাকে এই দুর্লভ উপহারে ভূষিত করেছে, তা হলো তাওহিদি আকিদা-বিশ্বাসের উপহার। পৃথিবীর যেকোনো বিশ্বাসের চেয়ে এই আকিদা-বিশ্বাস ছিল অধিক অজ্ঞাত, অপরিচিত, নির্যাতিত ও প্রবঞ্চিত। কিন্তু তারপরই গোটা বিশ্বে এই বিশ্বাসের ধ্বনিই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। বিশ্বের সব ধরনের দর্শন ও দাওয়াতি কার্যক্রম এই বিশ্বাসের দ্বারা কমবেশি প্রভাবিত হয়েছে। ফলে বড় বড় কিছু ধর্ম-যাদের ভিত্তি ও বেড়ে ওঠা ছিল শিরক ও বহু-ঈশ্বরবাদের ওপর এবং যাদের রক্তে-মাংসে ছিল শিরক-ক্ষীণ আওয়াজে ও ফিসফিসিয়ে হলেও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। তাদের শিরকপূর্ণ বিশ্বাসরাশির দার্শনিকতাপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতেও বাধ্য হয়েছে এবং সেগুলোকে শিরক ও বিদআতের কলঙ্ক থেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করেছে। ইসলামের তাওহিদি আকিদার সঙ্গে তাদের বিশ্বাসের সামঞ্জস্য বিধান করতে চেয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই বড় বড় ধর্মের গুরুরা ও নেতৃস্থানীয়রা শিরকের ব্যাপারটা স্বীকার করতে এবং মানুষের সামনে তা উল্লেখ করতে লজ্জিত ও অপমানিত বোধ করতে শুরু করেছে। এসব শিরকপন্থী ব্যবস্থা ও ধর্মাদর্শের সবগুলোই হীনম্মন্যতাবোধে ও তুচ্ছতাবোধে আক্রান্ত হয়েছে। তাই তাওহিদি আকিদার উপহারই সবচেয়ে দামি ও মূল্যবান উপহার, যা পেয়ে মনুষ্যজাতি সৌভাগ্যমণ্ডিত হয়েছে। এটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত ও ইসলামি সভ্যতার অবদানের কল্যাণেই সম্ভব হয়েছে।(৬২১)

টিকাঃ
৬০৯. সুরা আরাফ: আয়াত ৫৪।
৬১০. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৮৩।
৬১১. সুরা যুমার: আয়াত ৩।
৬১২. আবুল হাসান আলি নদবি, আল-ইসলাম ওয়া আসারুহু ফিল-হাদারাতি ওয়া ফাদলুহু আলাল ইনসানিয়‍্যাহ, পৃ. ২১।
৬১৩. সুরা আম্বিয়া: আয়াত ২২।
৬১৪. যাদেরকে শরিক করা হয়েছে তাদেরকে শরিক হওয়ার যোগ্যতা প্রদান করতে পারোনি এবং কখনো পারবেও না।-অনুবাদক
৬১৫. সুরা সাবা: আয়াত ২৯।
৬১৬. আবুল হাসান আলি নদবি, আল-ইসলাম ওয়া আসারুহু ফিল-হাদারাতি ওয়া ফাদলুহু আলাল ইনসানিয়্যাহ, পৃ. ২২।
৬১৭. জামাল ফাওযি, মাআলিমুল হাদারাতিল ইনসানিয়াহ, পৃ. ১৬।
৬১৮. আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৯০।
৬১৯. ১ মিলিয়ন = ১০ লাখ।
৬২০. আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৬৮।
৬২১. আবুল হাসান আলি নদবি, আল-ইসলাম ওয়া আসারুহু ফিল-হাদারাতি ওয়া ফাদলুহু আলাল ইনসানিয়্যাহ, পৃ. ২১-২৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00