📄 বীজগণিত
বীজগণিতের সূচনা ও তার ভিত্তি স্থাপন করেছেন বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী আল-খাওয়ারিজমি (১৬৪-২৩২ হি./৭৮১-৮৪৬ খ্রি.)। মিরাসের অংশবণ্টনে কিছু জটিল সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তিনি বীজগণিতের উদ্ভাবন ঘটিয়েছিলেন। তিনি বীজগণিতের কিছু মূলনীতি ও নিয়ম স্থির করেছেন যা একে প্রকৌশল ও গণিতের অন্যান্য শাখা থেকে স্বতন্ত্র জ্ঞানের মর্যাদা দান করেছে।
আল-খাওয়ারিজমিই প্রথম বর্তমানে আলজেব্রা নামে পরিচিত জ্ঞানশাখাটির জন্য 'জার' শব্দটি ব্যবহার করেন। ইউরোপীয়রা তার থেকে তা গ্রহণ করে। এখনো পর্যন্ত 'আল-জার' তার আরবি নামেই ইউরোপের যাবতীয় ভাষায় পরিচিত। তা ইংরেজি ভাষায় Algebra এবং ফরাসি ভাষায় Algèbre। অন্যান্য ভাষায়ও অনুরূপ। ইউরোপীয় ভাষাগুলোতে যত শব্দে algorithme বা algorithm বা algorism রয়েছে তা 'আল-খাওয়ারিজমি' নামটির অপভ্রংশ। মানুষকে আরবি সংখ্যা শেখানোর কৃতিত্বও তারই। তাই তো আল-খাওয়ারিজমিকে বীজগণিতের জনক বলা হয়।(৫৫৬)
আল-খাওয়ারিজমির কিতাব 'আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা' গণিতশাস্ত্রের একটি প্রধান বই এবং বিপুল প্রভাবসঞ্চারী। এতে তিনি সমীকরণের পক্ষান্তর ও সমাধান নিয়ে আলোচনা করেছেন। গ্রন্থটির ভূমিকায় তিনি জানিয়েছেন যে, খলিফা আল-মামুন তাকে এই গ্রন্থ রচনার অনুরোধ জানান। কীভাবে তিনি অনুরোধ জানান তারও বিবরণ দিয়েছেন। গ্রন্থটি লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেন জেরার্ডো ডি ক্রিমোনা (Gerardo de Cremona)।(৫৫৭) ১৮৫১ সালে লন্ডন থেকে গ্রন্থটির আরবি ভাষ্যসহ ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন ফ্রেডেরিক রোজেন। তিনিই এটির অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন। অনূদিত গ্রন্থটির নাম The Algebra Of Mohammed Ben Musa।
আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা গ্রন্থটির একাধিক অনুবাদের ফলে ভারতীয় গণিত ও দশমিক পদ্ধতির(৫৫৮) ব্যবহার ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি সেখানে গাণিতিক ক্রিয়া-কার্য Alguarismo নামে পরিচিতি লাভ করে। বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, এগুলোই আবার আরবিতে অনূদিত হয় اللوغاريتمات নামে, যদিও তা মূলত আল-খাওয়ারিজমির প্রতি সম্বন্ধিত।
الجداول الخوارزمية يا الخوارزميات
আল-খাওয়ারিজমির আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা গ্রন্থটি খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণিতশাস্ত্রের প্রধান উৎস হিসেবে বিরাজমান ছিল। তার পরে যারা আলজেব্রা বা বীজগণিত নিয়ে বই লিখেছেন তাদের অধিকাংশই এই গ্রন্থের ওপর নির্ভরশীল। আরবি ভাষা থেকে লাতিন ভাষায় এটির অনুবাদ করেন রবার্ট অব চেস্টার (Robert of Chester)। ফলে এর দ্বারা ইউরোপ আলোকিত হয়। আধুনিক কালে দুইজন ডক্টর মিশরীয় পদার্থবিদ আলি মুস্তাফা মুশরাফা ও মিশরীয় গণিতবিদ মুহাম্মাদ মুরসি আহমাদ আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা গ্রন্থটি সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন।(৫৫৯) এটি :كتاب الجبر والمقابلة، تحقيق علی مصطفی مشرفه ومحمد مرسى أحمد ১৯০৭ সালে কায়রোর পল ব্যেরি প্রকাশনাসংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়।
আল-খাওয়ারিজমির পর এই পথপরিক্রমা সমাপ্ত করেন আবু কামিল শুজা আল-মিশরি(৫৬০), আবু বকর আল-কারখি(৫৬১) ও উমর আল-খাইয়াম(৫৬২) এবং অন্যান্য প্রতিভাবান মুসলিম গণিতবিদ।
শূন্য (০) প্রবর্তন
শূন্য (০)-এর প্রবর্তন গণিতশাস্ত্রে মুসলিমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও মহাকীর্তি। কোনো সন্দেহ নেই যে, শূন্য (০) গাণিতিক কার্যাবলিকে সহজতর করে দিয়েছে এবং গণিতবিজ্ঞানকে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছে। শূন্য (০) না থাকলে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক গাণিতিক সমীকরণের সমাধান ততটা সহজে করতে পারতেন না, যা এখন করতে পারছেন। গণিতের বিভিন্ন শাখায় যে অগ্রগতি ঘটেছিল তা সর্বজনবিদিত। কিন্তু এর ফলে সভ্যতার যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল তা বিস্ময়কর।(৫৬৩)
দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান
গণিতশাস্ত্রে মুসলিমদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও কীর্তি হলো দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান। একে ঘন সমীকরণও বলে। তারা দ্বিঘাত সমীকরণের কয়েকটি সমাধানপদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন। গণিতের আধুনিক গ্রন্থগুলোতে এখনো এসব সমাধানপদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। তারা জানিয়েছেন যে, এ ধরনের সমীকরণের দুটি রুট (Root) বা মূল থাকে। মূল দুটি ধনাত্মক হলে কীভাবে সেগুলোকে বের করতে হবে তাও তারা জানিয়েছেন। মুসলিমজাতি যেসব বিষয়ে অগ্রগামী এবং পূর্ববর্তী সব জাতি থেকে এগিয়ে রয়েছে তার মধ্যে গণিতশাস্ত্রে এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার অন্যতম। তারা কতিপয় সমীকরণের সমাধানের জন্য প্রকৌশলীয় পদ্ধতিও আবিষ্কার করেছিলেন। আল-খাওয়ারিজমির আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা গ্রন্থের 'আলা-মাসাহাত' অধ্যায়ে এমন কিছু প্রকৌশলীয় প্রক্রিয়া রয়েছে যেগুলোর সমাধান করা হয়েছে বীজগণিতীয় পদ্ধতি ব্যবহার করে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিমরাই প্রথম প্রকৌশলীয় সমস্যার (engineering problem) সমাধানে বীজগণিতের ব্যবহার চালু করেন।(৫৬৪)
দশমিক ভগ্নাংশের ব্যবহার
যদিও বলা হয়ে থাকে যে ডাচ বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ সিমোন স্টেভিন(৫৬৫) প্রথম দশমিক ভগ্নাংশের ধারণা দেন এবং তিনিই প্রথম এর ব্যবহার চালু করেন, কিন্তু তা যথার্থ নয়। মুসলিম গণিতজ্ঞ গিয়াসুদ্দিন জামশেদ আল কাশি(৫৬৬) মূলত প্রথম ব্যক্তি, যিনি দশমিক ভগ্নাংশের প্রতীক প্রবর্তন করেছিলেন এবং সিমোন স্টেভিনের ১৭৫ বছরেরও বেশি পূর্বে তা ব্যবহার করেছিলেন। তা ছাড়া তিনি দশমিক ভগ্নাংশের ব্যবহারের উপকারিতা এবং তা ব্যবহার করে অঙ্ক কষার পদ্ধতিও বলে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর 'মিফতাহুল হিসাব' গ্রন্থের পঞ্চম পৃষ্ঠায় মুখবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি দশমিক ভগ্নাংশ আবিষ্কার করেছেন, যাতে ওইসব ব্যক্তিদের জন্য অঙ্ক কষা সহজ হয় যারা ষষ্ঠিক (sexagesimal) পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞ। সুতরাং তিনি জেনেশুনেই বলছেন যে, তিনি একটি নতুন বিষয় আবিষ্কার করেছেন।(৫৬৭)
গণিতে প্রতীকের ব্যবহার
আল-খাওয়ারিজমির পরবর্তীকালে মুসলিম বিজ্ঞানীরা গাণিতিক ক্রিয়া-কার্যে প্রতীকের ( ÷ × - +) ব্যবহার শুরু করেন। আল-কালাসাদি আল-আন্দালুসির(৫৬৮) রচনাবলিতে, বিশেষ করে 'কাশফুল আসরারি আন ইলমি হুরুফিল গুবার' গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তা থেকে গাণিতিক প্রতীক ব্যবহারের বিষয়টি যথার্থ প্রমাণিত হয়। গণিতের বিভিন্ন শাখার অগ্রগামিতা ও উৎকর্ষ লাভে এসব প্রতীক ব্যবহারের যে ভূমিকা ও প্রভাব তা কারও অজানা নয়। কিন্তু সত্যিকারই আফসোসের ব্যাপার যে, ফরাসি বিজ্ঞানী ফ্রাঁসোয়া ভিয়েটাকে(৫৬৯) গণিতে প্রতীক ব্যবহারের প্রবর্তক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বলা হয় যে, তিনি এসব গাণিতিক প্রতীক ও চিহ্ন আবিষ্কার করেছেন। অথচ তার জীবৎকাল ১৫৪০-১৬০৩ খ্রি.।(৫৭০)
ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান
উমর আল-খাইয়াম (৪৩৬-৫১৭ হিজরি) বীজগণিতীয় ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করেন। কনিক সেকশন বা কনিক ব্যবহার করে বহুপদী সমীকরণের সমাধানপদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরা মানবসভ্যতাকে যা-কিছু দিয়েছেন এটি তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি। উমর আল-খাইয়াম যে অধিবৃত্ত (parabola) ও বৃত্তের (বৃত্তের ছেদকের) সাহায্যে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করেছেন তা থেকেই প্রতিভাত হয় যে তিনি (শূন্যে অবস্থিত কোনো) বিন্দুর স্থানাঙ্ক (সঠিক অবস্থান) ব্যাখ্যার জন্য আনুভূমিক স্থানাঙ্ক(৫৭১) সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। উমর আল-খাইয়াম তার এই প্রয়াসের মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণাত্মক বা স্থানাঙ্ক জ্যামিতির(৫৭২) ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় প্রথম ইটগুলো স্থাপন করেন। অথচ রেনে দেকার্তেকে এর প্রবর্তক আখ্যায়িত করা হয়। কোনো সন্দেহ নেই যে, বিশ্লেষণাত্মক জ্যামিতির বিকাশ ও মূলনীতি স্থিরীকরণে দেকার্তের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আমরা গণিতশাস্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ শাখাটির উদ্ভাবক উমর আল-খাইয়ামের ভূমিকার কথা ভুলে যাব।(৫৭৩)
টিকাঃ
৫৫৬. কারাম হিলমি ফারহাত, আত-তুরাসুল ইলমি লিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিশ শাম ওয়াল ইরাক খিলালাল কারনির রাবিয়িল হিজরি পৃ. ৬৪২-৬৪৩, মুহাম্মাদ আলি উসমান, মুসলিমুনা আল্লামুল আলামা, পৃ. ৭৪-৭৫, আকরাম আবদুল ওয়াহহাব, মিয়াতু আলিমিন গাইয়ারু ওয়াযহাল আলাম পৃ. ২০।
৫৫৭. গ্রন্থটি রবার্ট অব চেস্টার (Robert of Chester) কর্তৃক লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।- অনুবাদক
৫৫৮. Decimal Numeral System.-অনুবাদক
৫৫৯. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, মুবতাকির ইম্মিল-জাবর... মুহাম্মাদ ইবনে মুসা আল- খাওয়ারিজমি, মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যা, খ. ৫, পৃ. ১৮৭ এবং রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ৭৭: মুহাম্মাদ আলি উসমান, মুসলিমুনা আল্লামুল আলামা, পৃ. ৭৭; আবদুল হালিম মুনতাসির, তারিখুল ইলম ওয়া দাওরুল উলামাইল আরাব ফি তাক্কাদ্দুমিহি, পৃ. ৬৫।
৫৬০. শুজা আল-মিশরি: আবু কামিল শুজা ইবনে আসলাম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে শুজা (মৃ. ৩১৮ হি./৯৩০ খ্রি.)। আবু কামিল আল-হাসিব নামেও পরিচিত। মিশরীয় গণিতজ্ঞ ও প্রকৌশলী। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: كتاب الجمع والتفريق، كتاب الخطأين كتاب كمال الجبر وتمامه والزيادة في أصوله ويعرف بكتاب الكامل كتاب الوصايا بالجبر والمقابلة، كتاب الجبر والمقابلة، كتاب الوصايا بالجذور كتاب الشامل في الجبر والمقابلة ، كتاب الطرائف في الحساب، كتاب الجمع والتفريق، كتاب الخطأين كتاب الكفاية، كتاب المساحة والهندسة والطير، كتاب مفتاح الفلاح، رسالة في المخمس والمعشر، كتاب العصير، كتاب الفلاح দেখুন, ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩৩৯; উমর রিদা কাহহালা, মুজামুল মুআল্লিফিন, খ. ৪, পৃ. ২৯৫।
৫৬১. আবু বকর আল-কারখি (আল-কারজি) মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল-কারখি (মৃ. ৪১০ হি./১০২০ খ্রি.)। গণিতজ্ঞ, প্রকৌশলী। ইরাকের আমির বাহাউদ দাওলার উজির ফাখরুল মালিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তার অনুরোধে তিনি বীজগণিত বিষয়ে কিতাবুল ফাখরি রচনা করেন। তার আরও দুটি গ্রন্থ আল-বাদি ফিল-হিসাব এবং আল-কাফি ফিল-হিসাব। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১২৫; ফুয়াদ সেযগিন, তারিখুত তুরাসিল আরাবি, খ. ১, পৃ. ৫৬২।
৫৬২. উমর আল-খাইয়াম: উমর ইবনে ইবরাহিম আল-খাইয়ামি আন-নিশাপুরি (১০৪৮-১১২১ খ্রি.)। পার্সিয়ান কবি, দার্শনিক, গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। বীজগণিত সম্পর্কে সেই সময়কার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থটি তার লেখা। এই গ্রন্থে তিনি দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান ও ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধানের ক্ষেত্রে জ্যামিতিক পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন। ইউক্লিডের জ্যামিতি সম্পর্কে একটি টাকাও আছে তার। জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি একটি মানমন্দিরের প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, উন্নত জ্যোতিষ-সারণি রচনা ও মুসলিম বর্ষপঞ্জির সংস্কার সাধন (১০৭৪ খ্রি.) করেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, দর্শন ও অধিবিদ্যা নিয়েও লিখেছিলেন তিনি। আইন ও ইতিহাস সম্পর্কেও তার যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। তুর্কি সুলতানদের দরবারে তিনি ছিলেন সম্মানিত বৈতনিক সভাসদ। সাধারণ পাঠকের কাছে তিনি অবশ্য বেশি পরিচিত কবি হিসেবে, রুবাইয়াতের রচয়িতারূপে। বাংলা ও ইংরেজিসহ বহু ভাষায় এর অনুবাদ হয়েছে। এই কবিতাগুচ্ছ থেকে উমর আল-খাইয়ামের শাশ্বত ভাবনা, গভীর অনুভূতি ও জীবন-জিজ্ঞাসার পরিচয় পাওয়া যায়। দেখুন, আব্বাস আল-কোমি, সাফিনাতুল বিহার, খ. ১, পৃ. ৪৩৬; ইবনুল আসির, আল-কামিল, ৪৭৬ হিজরির ঘটনাবলি।
৫৬৩. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা فিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৫৫-৩৫৬।
৫৬৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫৬।
565. সিমন স্টেভিন (Simon Stevin 1548-1620) : গ্যালিলিও, কেপলার ও দেকার্তের মতো তিনিও 'নতুন' বিজ্ঞানের একজন প্রতিষ্ঠাতা। নতুন পদ্ধতি ও প্রথাবিরোধী প্রতীতে তাঁর আগ্রহ ছিল। বিজ্ঞানের প্রাচীন পদ্ধতি ও প্রণালিসমূহকে তিনি সচেতনভাবে বাতিল করেছিলেন। জলগতিবিজ্ঞানের কলাকৌশলে তিনি ছিলেন বিশেষ পারদর্শী এবং এই বিষয়ে একটি সরকারি পদেও অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বলবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল, নৌপরিবহন ও রসায়নসহ বিভিন্ন শাখা তাঁর অনুশীলনের ফলে সমৃদ্ধ হয়েছে। পাটিগণিত ও বীজগণিত সম্পর্কে লেখা তাঁর গ্রন্থ পরবর্তীকালের অনেক উল্লেখযোগ্য গণিতবিদকে অনুপ্রাণিত করেছে।-অনুবাদক।
566. আল-কাশি: গিয়াসুদ্দিন ইবনে মাসউদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-কাশি (১৩৮০-১৪২১ খ্রি.)। হিজরি নবম শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। খুরাসানের কাশান শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং সমরকন্দে মৃত্যুবরণ করেন। বর্গমূল, ঘনমূলের মতো পূর্ণসংখ্যার ঘাতবিশিষ্ট মূল নির্ণয়ের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। বহু শ্রেষ্ঠ আরব বিজ্ঞানীর মতো তিনিও অনুবাদের কাজ করেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: كتاب زيج الخاقاني، الأبعاد والأجرام، نزهة الحدائق সম্বন্ধে। رسالة سلم السماء، رسالة المحيطية رسالة الجيب والوتر، مفتاح الحساب কাহহালা, মুজামুল মুআল্লিফিন, খ. ৮, পৃ. ৪০; নাসরিন মুস্তাফা, জামশিদ গিয়াসুদ্দিন আল কাশি: জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর অবদান, দ্বিতীয় সংস্করণ, মে, ২০০৯, প্রকাশক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, বাংলাদেশ।
567. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৫৬।
৫৬৮. আবুল হাসান আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আলি আল-কুরাশি আল-বাসতি (৮১৫-৮৯১ হি./১৪১২-১৪৮৬ খ্রি.)। আন্দালুসের বাজায় (বাস্তায়) জন্মগ্রহণ করেন এবং তিউনিসিয়ার বাজায় মৃত্যুবরণ করেন। গণিতবিদ। মালিকি মাযহাবপন্থী ইমাম। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: شرح التبصرة الواضحة في المنطق، كشف الجلباب عن علم الحساب، الأرجوزة الياسمينية في الجبر والمقابلة أشرف كتاب النصيحة في السياسة العامة والخاصة، مسائل الأعداد، شرح أيساغوجي في اللائحة الضوء اللامع لأهل القرن التاسع - 2017 | المسالك إلى مذهب مالك، ৬, পৃ. ৫; হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ১, পৃ. ১৫৩।
৫৬৯. ফ্রাঁসোয়া ভিয়েটা (François Viète 1540-1603): ষোড়শ শতকের শ্রেষ্ঠ বীজগণিতজ্ঞ বলে পরিচিত। ত্রিকোণমিতি তার বিকাশের উন্নত পর্যায়ে এসে বীজগণিতের সঙ্গে যখন জড়িয়ে পড়তে লাগল তখন ভিয়েটা এই দুটি শাখা নিয়েই পাশাপাশি কাজ করেছিলেন। তার বলয়ের ক্ষেত্রে ত্রিকোণমিতির প্রয়োগ তার বীজগাণিতিক অঙ্কপাতনকে সাহায্য করেছিল। গাণিতিক বিশ্লেষণ সম্পর্কে আধুনিক ধারণার প্রবর্তনে তিনি উভয় শাখা থেকে উপাদান সংগ্রহ শুরু করেছিলেন। ভিয়েটা প্রাচীন গ্রিক গণিতজ্ঞ আপোলোনিয়াসের একটি মূল সমস্যারও সমাধান করেছিলেন, প্রদত্ত তিনটি বৃত্তকে স্পর্শ করে একটা বৃহদাকার বৃত্ত অঙ্কন। π (পাই)-এর মান নির্ধারণের একটি উন্নত পদ্ধতিও তিনি দেখান। জ্যোতির্বিদ্যায় অবশ্য তার মোটেও দখল ছিল না। সেজন্য তিনি ক্যালেন্ডারের গ্রেগরীয় সংস্কার ও সংশোধনের বিরোধিতা করেছিলেন।- অনুবাদক
৫৭০. জালাল মাযহার: হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৫৮, আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম পৃ. ৬৫।
৫৭১. Horizontal Coordinate/X-coordinate বা ভুজ।-অনুবাদক
৫৭২. স্থানাঙ্ক জ্যামিতি বিশ্লেষণী জ্যামিতি (Analytic geometry): গণিতশাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা যেখানে জ্যামিতি আলোচনা করার জন্য বীজগণিত প্রয়োগ করা হয়। অনেক সময় একে বিশ্লেষণাত্মক জ্যামিতিও বলা হয়। এটি সাধারণত কো-অর্ডিনেট জ্যামিতি বা কার্টেসিয়ান জ্যামিতি নামে পরিচিত। পদার্থবিদ্যা ও কারিগরি শিক্ষায় এর গুরুত্ব অসীম। স্থানাঙ্ক জ্যামিতিতে সমতলে অবস্থান করা একটি বিন্দুর স্থানকে একজোড়া সংখ্যার সহায়তায় উপস্থাপন করা হয়। একে সংখ্যাজোড়ক স্থানাঙ্ক বলা হয়। সমতলে একটি বিন্দুর অবস্থান জানতে একজোড়া অক্ষ ব্যবহার করা হয়। y অক্ষ থেকে একটি বিন্দুর দূরত্বকে স্থানাঙ্ক বা ভুজ বলা হয়। x অক্ষ থেকে একটি বিন্দুর দূরত্বকে y স্থানাঙ্ক বা কোটি বলা হয়। x অক্ষের উপরে থাকা একটি বিন্দুর স্থানাঙ্কের অবস্থান (x, 0) এবং y অক্ষের উপরে থাকা একটি বিন্দুর স্থানাঙ্কের অবস্থান (0, y)।-অনুবাদক
৫৭৩. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ৬৫।
📄 যন্ত্রকৌশল
গ্রিক, রোমান, পারসিক, চৈনিক বিজ্ঞানীরা যন্ত্রপ্রকৌশলের ময়দানে যেসব ছড়ানো-ছিটানো তত্ত্ব ও নিয়ম রেখে গিয়েছিলেন তা-ই ছিল মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক অবলম্বন। পরে তারা যন্ত্রপ্রকৌশলের বিকাশ ঘটিয়েছেন এবং নতুন কৌশল ও যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন। এই বিজ্ঞান তাদের নতুন নতুন আবিষ্কারে সমৃদ্ধি লাভ করেছে এবং অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য প্রায়োগিক বিজ্ঞানশাখায় পরিণত হয়েছে। আগে এমন কৌশলজ্ঞান কেবল বিনোদন ও জাদুবিদ্যাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। আরব বিজ্ঞানীরা এই বিজ্ঞানশাখার নাম দিয়েছিলেন 'ইলমুল হিয়াল' বা (প্র) কৌশলবিজ্ঞান বা কৌশলবিদ্যা। এমন নামকরণ করে তারা বোঝাতে চেয়েছেন যে, এসব কৌশল অবলম্বন করে কঠিন পরিস্থিতি ও অবস্থাকে আয়ত্তে এনে কোনো উদ্দেশ্য সাধন করা যায়। অর্থাৎ, এতে মানুষের কর্মপ্রচেষ্টা ও মানবিক কর্মশক্তি পর্যাপ্ত বৃদ্ধি পায় এবং কৌশলগত শক্তি ব্যাপকতা লাভ করে। মানবশক্তি ও পশুশক্তি থেকেও বহুগুণ বেশি শক্তি আয়ত্তে চলে আসে এবং এর দ্বারা যেকোনো উপকার হাসিল করা যায়।
কৌশলবিদ্যার উদ্দেশ্য
মুসলিম বিজ্ঞানীরা কৌশলবিদ্যা কাজে লাগিয়ে মানুষের উপকার ও কল্যাণ সাধন করতে চেয়েছেন, শক্তির জায়গায় কৌশল এবং পেশির জায়গায় বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে চেয়েছেন। দেহের জায়গায় ব্যবহার করতে চেয়েছেন যন্ত্র। শ্রমিকশ্রেণি ও দাসদের বন্দিদশা, বাধ্যতামূলক শ্রম ও কায়িক পরিশ্রম থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন। বিশেষ করে যেহেতু ইসলাম অত্যধিক কায়িক পরিশ্রমের প্রয়োজন রয়েছে এমন বৈষয়িক কর্মকাণ্ডে বাধ্যতামূলক শ্রম নিষিদ্ধ করেছে। একইভাবে ইসলাম শ্রমিকশ্রেণির ওপর কষ্টদায়ক ও তীব্র ক্লান্তিকর কাজ চাপিয়ে দিতেও নিষেধ করেছে। প্রাণীদের কষ্ট দেওয়াও হারাম করেছে। অর্থাৎ, প্রাণীদের দিয়ে তাদের সাধ্যাতীত বোঝা টানানো বা বহন করানো যাবে না। এ কারণে মুসলিমদের দৃষ্টি ছিল নতুন যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করার দিকে, যাতে মানুষ ও প্রাণীর বদলে যন্ত্রপাতি দিয়েই কষ্টকর কাজগুলো সম্পন্ন করা যায়। এটা মূলত মানুষের সভ্যতাজনিত প্রবণতা। যেসব জাতির মধ্যে এমন প্রবণতা রয়েছে তারা জ্ঞানবিজ্ঞান ও সভ্যতা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বহুদূর এগিয়ে গেছে। এই প্রবণতাকে কেন্দ্র করেই নতুন কিছু আবিষ্কারের দর্শন ঘুরপাক খায়, যে আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের দৈনন্দিন চিন্তাভাবনায় কাঠামোবদ্ধ রূপ লাভ করে। কারণ এর পেছনে সক্রিয় থাকে মানুষের জীবনকে সুন্দর করার এবং মানবজীবন থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের কষ্টকে দূরীভূত করার অভিপ্রায়।
ইসলামি সভ্যতার বিজ্ঞানজগতে উপকারী কৌশলবিজ্ঞান (ইলমুল হিয়ালিন নাফিআ) অগ্রসর প্রযুক্তিগত দিকটিই সবার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদরা তাদের তাত্ত্বিক জ্ঞানবিদ্যাকে প্রয়োগ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ধর্মের সেবায় এবং সভ্যতা ও নগরায়ণের প্রতিটি দিক বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তারা কল্যাণকর প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন।
প্রাচীন লোকেরা কৌশলবিদ্যা কাজে লাগিয়ে তাদের ধর্মাদর্শের অনুসারীদের ওপর ধর্মীয় ও আত্মিক প্রভাব সৃষ্টি করার চেষ্টা করত। যেমন গণকদের মাধ্যমে চলাফেরা করে বা কথা বলে এমন পুতুল ব্যবহার করত। উপাসনাগুলোতে সংগীত, অর্গান ও শব্দযন্ত্র ব্যবহার করা হতো। প্রাচীন লোকদের কৌশলবিদ্যার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ছিল এগুলোই। ইসলাম আসার পর তা বান্দা ও তার রবের মধ্যে যে সম্পর্ক স্থাপন করল তাতে কোনো ওসিলা বা মধ্যস্থতার প্রয়োজন পড়ল না। মানুষের চোখে বিভ্রাট সৃষ্টি করারও কোনো দরকার হলো না। তখন 'উপকারী কৌশলবিদ্যার' নতুন উদ্দেশ্য হলো সক্রিয় (মেকানিক্যাল) যন্ত্র ব্যবহার করে মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করা। সক্রিয় ও চলমান যন্ত্র বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে এমন সব যন্ত্রপাতি যাদের সক্রিয়তা ও চলমানতা বায়ুর গতি অথবা জলের গতি বা সুষম অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের প্রথমটিকে বলে এরোডাইনামিক্স (বায়ুগতিবিদ্যা)(৫৭৪) এবং দ্বিতীয়টিকে বলে হাইড্রোডাইনামিক্স (জলগতিবিদ্যা)(৫৭৫) বা হাইড্রোস্ট্যাটিক্স (জলস্থিতিবিদ্যা)(৫৭৬)। এগুলোর সঙ্গে আরও ছিল ধীরগতির অপারেটিং সিস্টেমযুক্ত কপাটিকা(৫৭৭), দূরবর্তী স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণপদ্ধতিতে কার্যক্ষম ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, জলসাঁকো ও কৃত্রিম জলপ্রণালি (Aqueduct), প্রকৌশলীয় ব্যবস্থা, স্থাপত্য-কারুকার্য ও অন্যান্য বিষয়।(৫৭৮)
মুসলিম বিজ্ঞানীদের হাতে যন্ত্রপ্রকৌশলের বিকাশ
আমরা যন্ত্রপ্রকৌশলের বা উপকারী কৌশলবিদ্যার শুরুর দিনগুলোতে ফিরে গেলে দেখতে পাই যে, ইসলামি বিশ্বে যন্ত্রপ্রকৌশলের প্রযুক্তি বিকাশ লাভ করতে থাকে হিজরি তৃতীয় শতাব্দী (খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দী) থেকেই এবং তা ঘটে একদল প্রতিভাবান মুসলিম বিজ্ঞানীর হাতে। শ্রেষ্ঠ মুসলিম বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মগুলো পর্যালোচনা করলে সহজেই আমরা যন্ত্রপ্রকৌশলের বিকাশের ধাপগুলো জানতে পারি। কারণ তারাই ছিলেন যন্ত্রপ্রকৌশলের ময়দানে ইসলামি প্রযুক্তিবিদ্যার পথিকৃৎ।
১. মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা (বানু মুসা ইবনে শাকির)
তারা ছিলেন তিন ভাই। বড় ভাইয়ের নাম মুহাম্মাদ (মৃ. ২৫৯ হি./৮৭৩ খ্রি.)। তিনি ছিলেন জ্যোতির্বিদ, প্রকৌশলী, ভূগোলবিদ ও শারীরবৃত্তবিদ। দ্বিতীয় ভাই আহমাদ ছিলেন যন্ত্রপ্রকৌশলী। তৃতীয় ভাই হাসান (মৃ. ২৬১ হি./৮৭৪ খ্রি.) ছিলেন প্রকৌশলী ও ভূগোলবিদ। হিজরি তৃতীয় শতকে (খ্রিষ্টীয় নবম শতকে) তাদের জীবৎকাল অতিবাহিত করেছেন। গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রায়োগিক বিজ্ঞান ও যন্ত্রপ্রকৌশলে তারা ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। 'হিয়ালু বানি মুসা' (Book of Ingenious Devices) গ্রন্থটির জন্য তারা সমধিক খ্যাতি লাভ করেন। এটি যন্ত্রবিজ্ঞানের একটি প্রধান ও মূল্যবান গ্রন্থ। ইবনে খাল্লিকান এই গ্রন্থ সম্পর্কে বলেছেন, কৌশলবিদ্যায় তাদের একটি বিস্ময়কর দুর্লভ গ্রন্থ রয়েছে। এতে সব ধরনের বিস্ময়কর কৌশলের বর্ণনা রয়েছে। আমি এই গ্রন্থের সন্ধান পেয়েছি এবং দেখেছি যে এটি একটি সমৃদ্ধ ও উৎকৃষ্ট গ্রন্থ।(৫৭৯)
বানু মুসার 'কিতাবুল হিয়াল'-এ একশ যন্ত্র-স্থাপন (mechanical installation) কৌশল রয়েছে। প্রতিটির সঙ্গে বিস্তারিত বিশ্লেষণ রয়েছে এবং ব্যাখ্যামূলক চিত্রও রয়েছে। চিত্রগুলোতে যন্ত্র-স্থাপন ও যন্ত্রটি চালানোর পদ্ধতি দেখানো হয়েছে। বানু মুসার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার চিন্তাভাবনা ও কলাকৌশলের মধ্যে ছিল একাধিক ধরনের স্বয়ংক্রিয় কপাটিকা (ভাল্ভ), নির্দিষ্ট সময়ের পর সক্রিয় হয়ে ওঠা যন্ত্রব্যবস্থা এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি। সাধারণভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তা ছাড়া তারা উদ্ভাবন করেছিলেন মোচাকার কপাটিকা (কনিক্যাল ভাল্ভ), রোধনী কপাটিকা (প্লাগ ভাল্ভ), স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যক্ষম ক্র্যাংক-দণ্ড(৫৮০) ইত্যাদি। এসব আবিষ্কার ছিল নজিরবিহীন। ইউরোপে যে আধুনিক ক্র্যাংক চালু আছে, পাঁচশ বছর আগেই তার প্রথম যান্ত্রিক বিশ্লেষণ প্রদান করেছিলেন মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা।(৫৮১)
বানু মুসার কয়েকটি যান্ত্রিক কাঠামোর উদাহরণ :
১.০ হারিকেন বাতি (Hurricane lamp) : প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যে রেখে দিলেও এই বাতির আলো নেভে না।
২• স্ব-সজ্জিত বাতি (Self-trimming lamp): নিজেই সলতে বের করে নেয় এবং নিজেই তেল টেনে নেয়। কেউ দেখলে মনে করে যে, আগুন কোনো তেল পোড়াচ্ছে না এবং বাতিটির মূলত কোনো সলতেই নেই।
৩. ফোয়ারা: এ ফোয়ারা থেকে কিছু সময় বর্শার মতো পানি বেরোয় এবং অনুরূপ সময় আইরিস ফুলের মতো পানি বেরোয়। এভাবে অনবরত চলতেই থাকে।
তাদের যান্ত্রিক আবিষ্কারগুলোর যেটি সবচেয়ে বিস্ময়কর সেটি হলো নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের জন্য বিশাল আকারের একটি যন্ত্র। যন্ত্রটি তারা তাদের মানমন্দিরে স্থাপন করেছিলেন। ইতিহাসবিদগণ এই যন্ত্র সম্পর্কে অপার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। জলপ্রবাহের শক্তি প্রয়োগ করে এটিকে ঘোরানো হতো। যন্ত্রটি আকাশের নক্ষত্ররাজির খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ করত এবং এক বৃহদাকার আয়নায় তা প্রতিফলিত করত। আকাশে কোনো তারা ভেসে উঠলেই তা এই যন্ত্রে ধরা পড়ত এবং কোনো তারা বা উল্কা ডুবে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে তা ধরা পড়ত। এগুলোর রেকর্ডও লিখে রাখা হতো।(৫৮২)
মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা কৃষিকাজের জন্যও যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করেন। যেমন নির্দিষ্ট আকারের প্রাণীদের জন্য বিশেষ খাদ্যপাত্র তৈরি করেন, প্রাণীরা এসব পাত্র থেকে অন্যদের সঙ্গে ঠেলাঠেলি না করে সহজেই নিজেদের খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করতে পারত। কৃষিজমিতে স্থাপন করার জন্য যন্ত্র আবিষ্কার করেন, এসব যন্ত্র স্থাপন করা হলে কৃষিজমির পানি নষ্ট হয় না। তা ছাড়া এসব যন্ত্রের দ্বারা জমিতে জলসেচ-ব্যবস্থাও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তারা গোসলখানার জন্য ট্যাংকও তৈরি করেন। তরলের ঘনত্ব পরিমাপের জন্য যন্ত্র আবিষ্কার করেন। তাদের এসব সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী চিন্তা প্রযুক্তির (উপকারী কৌশলের) বা যন্ত্রপ্রকৌশলের উন্নতি ও অগ্রগামিতায় বড় ভূমিকা পালন করেছে। কারণ উর্বরতা-সমৃদ্ধ চিন্তাভাবনা, সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যায়ন ও প্রাগ্রসর পরীক্ষামূলক পদ্ধতির কারণে তাদের প্রদত্ত ডিজাইন ও নকশাগুলো ছিল অনন্য ও অসাধারণ।(৫৮৩)
২. বদিউযযামান আল-জাযারি(৫৮৪)
উপকারী কৌশল-প্রযুক্তির ময়দানে মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে রয়েছে যান্ত্রিক ঘড়ি ও উত্তোলন-যন্ত্রের বিভিন্ন প্রকারের নকশা। দাঁতযুক্ত গিয়ারের ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থার সাহায্যে রৈখিক গতিকে বৃত্তাকার গতিতে রূপান্তর করার প্রক্রিয়াও এগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই যাবতীয় আধুনিক ইঞ্জিন তৈরি করা হয়েছে। এই বিষয়ে মৌলিক পথিকৃৎ গ্রন্থ হলো 'আল-জামিউ বাইনাল ইলমি ওয়াল-আমলিন নাফি ফি সানাআতিল হিয়লি'(৫৮৫)। এটি রচনা করেছেন বদিউযযামান আবুল ইয্য ইবনে ইসমাইল ইবনে রাযযায আল-জাযারি। ডোনাল্ড আর. হিল গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন। অনূদিত গ্রন্থটি The Book of Knowledge of Ingenious Mechanical Devices নামে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের হিজরা কাউন্সিল প্রকাশনাসংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়। সমকালীন বৈজ্ঞানিক ইতিহাসবিদ জর্জ সার্টন মন্তব্য করেছেন যে, আল-জাযারির এই গ্রন্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সবচেয়ে স্পষ্টভাষ্য ও ব্যাখ্যামূলক। মুসলিমদের প্রযুক্তিগত অর্জন ও অবদানের ক্ষেত্রে এটি শীর্ষস্থান দখল করে আছে বলে বিবেচনা করা যেতে পারে।(০৮৬)
আল-জাযারির গ্রন্থে কয়েকটি অধ্যায় রয়েছে। সবচেয়ে দীর্ঘ অধ্যায় হলো জলঘড়ি-সম্পর্কিত। আরেকটি অধ্যায়ে পানি উত্তোলন-যন্ত্র সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। পানি উত্তোলক যন্ত্র-সম্পর্কিত অধ্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। এতে রয়েছে পাম্পের নকশা সম্পর্কে সচিত্র বিস্তারিত বর্ণনা। আধুনিক বৈজ্ঞানিক ইতিহাসবিদগণ একে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের অধিকতর কাছাকাছি বলে বিবেচনা করেছেন। এই পাম্পে যুক্ত রয়েছে মুখোমুখি দুটি পাইপ, পাইপ দুটির প্রত্যেকটিতে রয়েছে একটি বাহু, বাহুতে রয়েছে সিলিন্ডার আকৃতির পিস্টন (চাপদণ্ড)। পাইপ দুটির একটি চাপ বা সংকোচনের অবস্থায় থাকলে অপরটি থাকে টান বা চোষণের অবস্থায়। এই বিপরীতমুখী শক্তিকে সুরক্ষিত করার জন্য রয়েছে দাঁতযুক্ত বৃত্তাকার চাকতি, চাকতিকে কেন্দ্র থেকে দূরে যুক্ত রয়েছে পাইপ দুটির বাহু দুটি। এই চাকতিকে ঘোরানো হয় কেন্দ্রীয় ঘূর্ণনদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত গিয়ারের সাহায্যে। প্রত্যেক পাম্পে রয়েছে তিনটি ভাল্ভ (কপাটিকা), এগুলোর সাহায্যে জল একমুখী হয়ে নিচ থেকে উপরের দিকে ওঠে এবং বিপরীত দিকে (নিচের দিকে) ফিরে আসতে পারে না।(৫৮৭)
আল-জাযারি কর্তৃক উদ্ভাবিত এই পাম্প ধাতুর তৈরি একটি যন্ত্র, যা বায়ুশক্তির সাহায্যে বা চক্রাকারে ঘূর্ণায়মান প্রাণীর সাহায্যে ঘোরে। এই পাম্প নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল গভীর কূপ থেকে পানি ভূপৃষ্ঠে উত্তোলন করা। নদীর পানি নিচে নেমে গেলে (বা নদীর জলস্তর নিচু হলে) তা থেকে উঁচু ভূমিতে পানি ওঠানোর কাজেও এই পাম্প ব্যবহৃত হতো। যেমন মিশরের জাবাল আল-মুকাত্তাম (মুকাত্তাম) পাহাড়ে পানি ওঠানো হতো। সংশ্লিষ্ট বরাতগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই প্রযুক্তি প্রায় দশ মিটার পর্যন্ত পানি উত্তোলন করতে পারত। পাম্পকে সরাসরি জলস্তরের ওপর বসিয়ে দিয়েও পানি ওঠানো হতো, তখন পাম্পের সঙ্গে যুক্ত চোষক দণ্ডটি পানিতে নিমজ্জিত থাকত।(৫৮৮)
৩. তাকিউদ্দিন আদ-দিমাশকি
তাকিউদ্দিন ইবনে মারুফ আর-রাসিদ আদ-দিমাশকি আশ-শামি-যিনি হিজরি দশম শতাব্দীতে (খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে) তার জীবৎকাল অতিবাহিত করেছেন-ইসলামি প্রযুক্তির অহংকার হিসেবে বিবেচিত। তিনি 'আত-তুরুকুস-সানিয়্যাতু ফিল-আলাতির রুহানিয়্যাহ' গ্রন্থটির রচয়িতা। এই গ্রন্থে বেশ কিছু যান্ত্রিক কলের (মেকানিক্যাল ডিভাইস) বর্ণনা রয়েছে। যেমন জলঘড়ি, যান্ত্রিক ঘড়ি, বালুঘড়ি, কপিকল ও গিয়ারের সাহায্যে উত্তোলন-যন্ত্র, জলফোয়ারা, বাষ্পীয় টারবাইনের সাহায্যে ঘূর্ণনযন্ত্র যা বর্তমানেও আমাদের কাছে পরিচিত।(৫৮৯)
তাকিউদ্দিন আদ-দিমাশকির এই গ্রন্থ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ তা ইসলামি যুগে যন্ত্রপ্রকৌশল ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের পূর্ণতা দিয়েছে। তিনি বহু যন্ত্রের বৈশিষ্ট্য ও কার্যপদ্ধতি বর্ণনা করেছেন, যেগুলোর উল্লেখ পূর্ববর্তীদের কোনো কিতাবে নেই। এমনকি তখনও ইউরোপের রেনেসাঁসকালের বিখ্যাত রেফারেন্সগ্রন্থগুলোতেও এসব যন্ত্রের কোনো বর্ণনা পাওয়া যায়নি। তাকিউদ্দিনের এ গ্রন্থটি ছিল অনন্য ও অদ্বিতীয়। কারণ এটি যন্ত্রপাতির উপস্থাপনায়, বৈশিষ্ট্যায়ন ও বর্ণনায় ছিল প্রজেকশনযুক্ত আধুনিক প্রকৌশলীয় অঙ্কনের (engineering drawing) যে ধারণা (কনসেপ্ট) তার অধিকতর নিকটবর্তী। কিন্তু তিনি যন্ত্র-সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিষয়কে স্পষ্ট করেছেন একই ধরনের অঙ্কনে, যেখানে প্রজেকশন- ধারণা ও অঙ্কন-ধারণার সম্মিলন ঘটেছে। অর্থাৎ, তা হলো ঘনদর্শন অঙ্কনকৌশল (stereoscopic perspective)। এ কারণে বিশেষজ্ঞদের টেক্সট পাঠ ও অঙ্কন বোঝার জন্য গভীর অধ্যয়ন প্রয়োজন, যাতে তারা মানসপটে যে চিত্র ফুটিয়ে তুলছেন তা যথার্থ হয়।
তাকিউদ্দিন তার গ্রন্থে একাধিক জল উত্তোলন-যন্ত্রের বর্ণনা দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ছয় সিলিন্ডারযুক্ত পাম্প। এতে তিনি প্রথমবারের মতো একই সারিতে ছয়টি সিলিন্ডার স্থাপনের জন্য সিলিন্ডার-ব্লক ব্যবহার করেছেন, একের পর এক বৃত্তাকারে সজ্জিত ছয়টি উদ্ভেদ (protrusion)-যুক্ত ক্যামশাফ্ট(৫৯০) ব্যবহার করেছেন, ফলে সিলিন্ডারগুলো (ক্যামশাফ্টের ক্যামের পৃষ্ঠদেশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়ে) পর্যায়ক্রমে কাজ করতে থাকে এবং একটি শৃঙ্খলিত ব্যবস্থায় জলের প্রবাহ অব্যাহত থাকে। তাকিউদ্দিন পরামর্শ দিয়েছেন যে, সিলিন্ডারের সংখ্যা তিনটির কম হবে না, যাতে পানির উত্তোলন বিরতিহীনভাবে কোনো বিঘ্ন ছাড়াই চলতে থাকে। এখানে বিচ্ছিন্নতা ও কোনোরকম বাধাবিঘ্নতা এড়িয়ে চলার যে প্রাগ্রসর ধারণা (কনসেপ্ট) তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক গতিশীল সুস্থিতি (Dynamic equilibrium)-এর ধারণা। এই মূলনীতির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক মাল্টি-সিলিন্ডার ইঞ্জিন ও কমপ্রেসরের প্রযুক্তি।
তাকিউদ্দিন ছয় সিলিন্ডারযুক্ত পিস্টন পাম্পের যে নকশা অঙ্কন করেছেন তাতে আমরা দেখতে পাই যে, তিনি প্রতিটি পিস্টনদণ্ডের মাথায় নির্দিষ্ট ওজনের সিসা বসিয়ে দিয়েছেন, যাতে পিস্টনের ওজন ঊর্ধ্বমুখী টিউবের মধ্যে স্থাপিত জলদণ্ডের ওজনের চেয়ে বেশি হয়। এই নকশা প্রস্তুতের মধ্য দিয়ে তাকিউদ্দিন স্যামুয়েল মোরউন্ডের পথিকৃৎ হয়ে রয়েছেন। মোরল্যান্ড ১৬৭৫ সালে প্লাঞ্জারের পাম্পের (Plunger pump) যে নকশা তৈরি করেন তাতে প্লাঞ্জারের ওপর সিসানির্মিত কয়েকটি চাকতি বসিয়ে দেন, তাই প্লাঞ্জারটি জলে নিমজ্জনের অবস্থায় ফিরে যায় এবং সিসার প্রভাবে কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা পর্যন্ত পানি ঠেলে দেয়।(৫৯১)
এভাবেই প্রযুক্তির পশ্চিমা ঐতিহাসিকদের দাবি বাতিল হয়ে যায়। তাদের দাবি এই যে, যন্ত্রপ্রকৌশলের ময়দানে ইসলামি প্রযুক্তির স্বভাব হলো মজা করা, বিনোদন ও খেলাধুলা এবং অলস সময় কাটানো। এসব ঐতিহাসিক তাদের বক্তব্যে মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রতি ইনসাফ ও সুবিচার করেননি। তাদের দাবির অসারতা প্রমাণে ওয়াটার হুইলের সেসব সাক্ষ্যই যথেষ্ট যেগুলো আটার কল ও আখ-মাড়াই যন্ত্র ঘোরাতে, শস্য মাড়াই করতে এবং জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য জল উত্তোলনে ব্যবহৃত হতো। ব্যাপক আকারে জলশক্তি ও বায়ুশক্তিও ব্যবহৃত হতো। বাস্তব জীবনের সব ক্ষেত্রেই তাত্ত্বিক বিজ্ঞান ও তার প্রযুক্তিগত প্রয়োগের মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। পৌর নকশা প্রণয়ন, জলসেচ-ব্যবস্থা, বাঁধ নির্মাণ, ভবন-স্থাপনা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত বিষয় ছিল বাস্তবিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ইসলামি সভ্যতার যুগে প্রকৌশলীরা ও যন্ত্রকারিগরেরা তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। জটিল ক্ষেত্রে তারা প্রথমে পরিকল্পনা তৈরি করতেন, তারপর তারা বাস্তবে যা করতে যাচ্ছেন তার ছোট একটি নমুনা প্রস্তুত করতেন। তারপর অধুনা যন্ত্রকারিগরেরা পূর্ববর্তী মুসলিম প্রযুক্তিবিদেরা তাদের রচনাবলিতে যে ব্যাখ্যা ও বিবরণ রেখে গেছেন সে অনুযায়ী সংযোজনদি ও যন্ত্রপাতি পুনর্নির্মাণ করতেন।(৫৯২)
টিকাঃ
৫৭৪. বায়ুগতিবিদ্যা (Aerodynamics): এটি বায়ুবলবিদ্যার একটি শাখা। এই শাস্ত্র বাতাস ও অন্যান্য বায়বীয় পদার্থ গতিশীল অবস্থায় যেসব ধর্ম ও বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে এবং বল প্রয়োগ করে তা নিয়ে আলোচনা করে। যদি কোনো বস্তু বাতাস বা কোনো গ্যাসে নিমজ্জিত অবস্থায় গতিশীল হয় বা এদের মধ্যে কোনো আপেক্ষিক বেগ থাকে তবে তাও এই শাস্ত্রে আলোচনা করা হয়। বায়ুগতিবিদ্যার বিভিন্ন শাখা রয়েছে।
৫৭৫. জলগতিবিদ্যা (Hydrodynamics): তরল পদার্থের গতিবিজ্ঞান। কেবল আপেক্ষিকভাবে বর্ণনাযোগ্য অনবচ্ছিন্ন বলবিজ্ঞানের একটি শাখা যেখানে অসংনম্য (incompressible) তরলের গতিসূত্রগুলো এবং সীমানার সঙ্গে তরলের মিথস্ক্রিয়া আলোচিত হয়।- অনুবাদক
৫৭৬. জলস্থিতিবিদ্যা (Hydrostatics): স্থিতাবস্থায় তরলের আলোচনা। গতি অনুপস্থিতির তির্যক পীড়ন থাকে না, যেকোনো বিন্দুতে পীড়নের অভ্যন্তরীণ অবস্থা নির্ধারিত হয় শুধু চাপের দ্বারাই। সুতরাং কোনো বিন্দুতে চাপের পরিমাণ সব দিকেই সমান থাকে। সব সীমাপৃষ্ঠের ওপর সচরাচর চাপ কাজ করে। অভিকর্ষের আওতায় সুস্থিতির জন্য যেকোনো আনুভূমিক প্রস্থচ্ছেদের ওপর চাপ সমান হয়, এতে (তরল) ধারণকারী পাত্রের আকার কোনো গুরুত্ব বহন করে না। উচ্চতা বা গভীরতা অনুযায়ী চাপের তারতম্য হয়।-অনুবাদক
৫৭৭. কপাটিকা (Valve): একটি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র। নালি ব্যবস্থায় এবং যন্ত্রপাতির মধ্যে প্রবাহের ধারা নিয়ন্ত্রণ করার যন্ত্র কপাটিকা ব্যবহার করা হয়। যন্ত্রপাতিতে প্রবাহী-প্রতিষঙ্গ অনেক সময় ঝলকিত অথবা সবিরাম প্রকৃতির এবং সংশ্লিষ্ট গিয়ারসহ কপাটিকা একটা সময় নির্বাচনী বৈশিষ্ট্য প্রদান করে।-অনুবাদক
৫৭৮. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ২৯-৩০।
৫৭৯. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১৬১।
৫৮০. ক্র্যাংক বা ঘোড়া (Crank): এটি এমন একটি যান্ত্রিক সংযোগ যা নির্দিষ্ট অক্ষের চারদিকে ঘুরতে পারে। ক্র্যাংকের ঘূর্ণনের কেন্দ্রে থাকে তার পিভট (pivot)। এই পিভট হচ্ছে ক্র্যাংকের দণ্ড (Crankshaft)। এই দণ্ড ক্র্যাংকটিকে নিকটস্থ সংযোগস্থলের সঙ্গে যুক্ত করে।- অনুবাদক
৫৮১. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৩০।
৫৮২. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ১১৮-১১৯।
৫৮৩. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৩০-৩১।
৫৮৪. বদিউযযামান আল-জাযারি: বদিউযযামান আবুল ইয্য ইবনে ইসমাইল ইবনে রাযযায আল-জাযারি (৫৩০-৬০২ হি./১১৩৬-১২০৬ খ্রি.)। উদ্ভাবক, যন্ত্রপ্রকৌশলী, পণ্ডিত ও আর্টিস্ট। তিনি পানি উত্তোলন-যন্ত্র, জলঘড়ি, হস্তীঘড়ি, ফ্ল্যাশ টয়লেট ইত্যাদিসহ প্রায় একশ যন্ত্রের উদ্ভাবক। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ১৫।
৫৮৫. গ্রন্থটি كتاب في معرفة الحيل الهندسية নামেও পরিচিত।-অনুবাদক
৫৮৬. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৩১।
৫৮৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৫।
৫৮৮. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৩৩।
৫৮৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৬।
৫৯০. ক্যাম ব্যবস্থা (cam mechanism): একটা যান্ত্রিক সংযোগ যার কাজ হচ্ছে কোনো পূর্বনির্দিষ্ট পথে এই সংযোগের বহির্মুখী বা ফলদায়ক অংশকে (আউটপুট লিংক) পরিচালিত করা। ফলদায়ক অংশকে বলে ফলোয়ার। বিভিন্ন ইঞ্জিনে এর ব্যবহার দেখা যায়। যেখানে ক্যাম তার ক্যামশাফ্টসহ বৃত্তাকৃতির গতি বা চক্রগতিতে ঘুরতে থাকে। অপরদিকে ফলোয়ার এই ক্যামের পৃষ্ঠদেশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়ে উপর-নিচ করতে থাকে। ক্যামশাফ্টকে বাংলায় 'দন্তক ঈষা' বা দাঁতযুক্ত দণ্ড বলা যায়। ক্যাম মানে দাঁত, শাফ্ট মানে দণ্ড।-অনুবাদক
৫৯১. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৩৬।
৫৯২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯।