📄 ভূতত্ত্ববিদ্যা
কুরআনুল কারিমের বহু আয়াতে ভূস্তর-সম্পর্কিত বিদ্যার (জিয়োলজি)(৫২২) প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌ بِيْضٌ وَحُمْرٌ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهَا وَغَرَابِيْبُ سُودٌ
আর পাহাড়ের মধ্যে আছে বিচিত্র বর্ণের পথ-শুভ্র, লাল ও নিকষ কালো।(৫২৩)
وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ
আমি লোহাও দিয়েছি, যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং মানুষের জন্য নানাবিধ কল্যাণ।(৫২৪)
وَلَقَدْ مَكَّنَّاكُمْ فِي الْأَرْضِ وَجَعَلْنَا لَكُمْ فِيهَا مَعَايِشَ
আমি তো তোমাদের দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং তাতে তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থাও করেছি।(৫২৫)
এগুলো ছাড়াও আরও বহু আয়াত বিজ্ঞানের এই শাখা অর্থাৎ ভূবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেছে। এ থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে মুসলিম বিজ্ঞানীরা ভূতত্ত্ব নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন।
কোনো সন্দেহ নেই যে, প্রাচীন কালেও মানবজাতির খনিজ ও আকরিক সম্পর্কে জ্ঞানবুদ্ধি ছিল। তবে তা ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের। গ্রিক বিজ্ঞানীরা, বিশেষ করে অ্যারিস্টটল (৩৮৩-৩২২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) পৃথিবীকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করেন : প্রথমত জমিন, যা পানি, আগুন, বায়ু ও মাটি এই চারটি উপাদানের দ্বারা গঠিত এবং দ্বিতীয়ত আকাশ, যা ইথারের দ্বারা গঠিত। ইসলামের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত অ্যারিস্টটলের মতামতই আধিপত্য বিস্তার করে ছিল। ইসলাম এসে যাবতীয় রূপকথা, কল্পকাহিনি ও গালগল্পের অবসান ঘটিয়েছে।(৫২৬)
মুসলিমগণ সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে প্রতিটি বিষয় নিয়ে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা শুরু করেন এবং বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে সত্য উদ্ঘাটনে গবেষণায় ব্রতী হন। ফলে তার প্রাকৃতিক ঘটনাবলির বিচার-বিশ্লেষণে এবং পাথর ও শিলা, পাহাড়-পর্বত ও আকরিক বস্তুরাশির ব্যাখ্যায় প্রভূত সাফল্য অর্জন করেন। অসংখ্য ভূতাত্ত্বিক ঘটনাবলি, যেমন ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি, জোয়ারভাটা, পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকার গঠন, নদীনালা, স্রোতপ্রবাহ ইত্যাদির কার্যকারণ উদ্ঘাটন করেছেন। ভূবিজ্ঞানে মুসলিমদের প্রথম কীর্তি সম্ভবত কোষগ্রন্থ ও অভিধানগুলোতে সংকলিত এই জ্ঞান-সম্পর্কিত শব্দভান্ডার। যেমন ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ আল-জাওহারি কর্তৃক রচিত অভিধান 'আস-সিহাহ', আল-ফাইরুজাবাদি(৫২৭) কর্তৃক রচিত অভিধান 'আল-কামুসুল মুহিত', ইবনে সিদাহ আল-আন্দালুসি(৫২৮) কর্তৃক রচিত 'আল-মুখাসসাস'। ভ্রমণ এবং দেশ ও অঞ্চল সম্পর্কিত গ্রন্থাবলিও এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। আরও রয়েছে ভৌগোলিক গবেষণামূলক গ্রন্থাবলি, যেমন হাসান ইবনে আহমাদ আল-হামদানি কর্তৃক রচিত ‘সিফাতু জাযিরাতিল আরাব’।
তারপর আমরা যে-সকল মুসলিম বিজ্ঞানী এই বিজ্ঞানচর্চায় ব্রতী হয়েছিলেন তাদের কাছ থেকে স্পষ্টভাবে পেয়ে যাই ভূতত্ত্ববিদ্যার সীমারেখা। যেমন আল-কিন্দি, আল-রাজি, আল-ফারাবি, আল-মাসউদি, ইখওয়ানুস সাফা, আল-মাকদিসি(৫২৯), আল-বিরুনি, ইবনে সিনা, আল-ইদরিসি, ইয়াকুত হামাবি, আল-কাযবিনি(৫৩০) এবং আরও অনেকে।
এ সকল জ্ঞানী ও বিজ্ঞানী ভূমিকম্প সম্পর্কে কিছু তত্ত্ব পেশ করেছেন, ভূমিকম্পের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করেছেন, খনিজ বস্তুরাশি ও শিলা সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। পাললিক শিলা ও অশ্মীভূত বস্তুর পরিচয় প্রদান করেছেন। তা ছাড়া শিলার মাত্রাগত রূপান্তর (ডাইমেনশনাল ট্রান্সফরমেশন) সম্পর্কেও ধারণা দিয়েছেন। উল্কা ও উল্কাপিণ্ড সম্পর্কে তারা লিখেছেন। উল্কার প্রকৃতি ও উৎপত্তি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করেছেন। উল্কাপিণ্ডকে তারা দুই ভাগে ভাগ করেছেন, পাথুরে উল্কাপিণ্ড ও লৌহ উল্কাপিণ্ড। তারা এগুলোর আকৃতির বর্ণনা দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো কর্কশ ও এবড়োখেবড়ো উল্কা। ভূগর্ভের তাপমাত্রা হ্রাস-বৃদ্ধি সম্পর্কেও তারা আলোচনা করেছেন। ভঙ্গিল পর্বত(৫৩১) স্তূপ পর্বত(৫০২) ও অন্যান্য শ্রেণিতে পর্বত-বিভাজনের যে তত্ত্ব তাও তারা প্রতিষ্ঠা করেছেন। কী কী কারণে পাহাড়ে ধস নামে এবং নদীপাড়ের মাটি ক্ষয়ে যায় তাও তারা ব্যাখ্যা করেছেন এবং এর প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন।
মুসলিম বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক ভূবিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক ভূবিজ্ঞান সম্পর্কে মূল্যবান গবেষণা উপহার দিয়েছেন। এসব গবেষণায় প্রকৃতিতে বিদ্যমান জলের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে দালিলিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে, মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাদের রচনাবলিতে জলের এসব অবস্থা সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। নদীনালা গঠনে তাদের মতামত নির্ভেজালভাবে বৈজ্ঞানিক। ইখওয়ানুস সাফার প্রবন্ধসমগ্র (রাসায়িলু ইখওয়ানিস সাফা), ইবনে সিনার 'আন-নাজাত' কিতাবে এবং আল-কাযবিনির 'আজায়িবুল মাখলুকাত' গ্রন্থে আমরা এসব মতামত ও বক্তব্য পাই। একইভাবে কেলাসবিজ্ঞান (Crystallography) সম্পর্কে প্রথম ধারণা দেন আল-বিরুনি। তার হাতেই বিজ্ঞানের এই শাখার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। তার রচিত 'আল-জামাহির ফি মারিফাতিল জাওয়াহির(৫০০) গ্রন্থে এ বিষয়ে বর্ণনা রয়েছে। তারপর এই বিজ্ঞান বিকশিত হয় আল-কাযবিনির হাতে, তিনি তার 'আজায়িবুল মাখলুকাত' গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তারা দুজন যে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ করেছেন, যার বিবরণ তাদের কিতাবে পাওয়া যায়, তাতে কেউই তাদের ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।
মুসলিম বিজ্ঞানীরা সেই বিজ্ঞানশাখা নিয়েও আলোচনা করেছেন যাকে আমরা খনিজ তেল-বিষয়ক বিজ্ঞান (বা পেট্রোলিয়াম জিয়োলজি) বলতে পারি। এটি প্রায়োগিক ভূবিজ্ঞানের একটি শাখা। তারা দুই ধরনের খনিজ তেলের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন এবং দুই ধরনের তেলই তারা ব্যবহার করেছেন। তারা তেল অনুসন্ধান (পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন) সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন এবং তেল অনুসন্ধানের কয়েকটি নকশাও তারা প্রদান করেছেন।
মুসলিমদের প্রাথমিক পর্যায়ের বিজ্ঞানীদের অনেকেই পৃথিবীর গঠন, স্থলভাগ ও জলভাগের বিভাজন এবং ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও বিবরণ-বিষয়ক গবেষণায় গুরুত্বারোপ করেছেন। পৃথিবীর গঠনের বাহ্যিক উপাদান নিয়েও তারা আলোকপাত করেছেন। যেমন নদীনালা, সমুদ্র, বায়ু, সামুদ্রিক ঝড় ইত্যাদি। যেসব অভ্যন্তরীণ কার্যকারণ ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে ভূত্বকে পরিবর্তন সাধিত হয় তা নিয়েও তারা চিন্তাভাবনা করেছেন। যেমন আগ্নেয়গিরি, ভূমিকম্প, ভূমিধস ও স্থানচ্যুতি। স্থলভাগ ও জলভাগের মধ্যে স্থানের অদলবদল এবং এই অদলবদলের সময়সীমা সম্পর্কেও তারা আলোচনা করেছেন। নদীর উৎপত্তি ও উচ্ছল প্রবাহ, তারপর বার্ধক্য এবং তারপর মৃত্যু-এসব বিষয় নিয়েও আলোকপাত করেছেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, মুসলিমদের অধীত ভূতত্ত্ববিদ্যা অন্যান্য বিজ্ঞানশাখার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই এগিয়েছে। যা তার বিকাশ ও উৎকর্ষ লাভে সাহায্য করেছে। তখনকার বিজ্ঞানীদের এটাই ছিল রীতি। বিজ্ঞানশাখাগুলোর মধ্যে এখনকার মতো সূক্ষ্ম বিভাজন ছিল না, বরং ব্যাপক ও সামগ্রিক অধ্যয়ন-গবেষণা ছিল। তাই মুসলিম বিজ্ঞানীদের জিয়োলজি ও ভূবিজ্ঞান-সংশ্লিষ্ট কাজগুলো বিভিন্ন নামের অসংখ্য গ্রন্থাবলিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। যেমন আমরা দেখি যে, ইবনে সিনা তার 'আশ-শিফা' গ্রন্থে খনিজ পদার্থ ও আবহাওয়া-সম্পর্কিত একটি প্রবন্ধে আকরিক ও আবহাওয়াবিজ্ঞানের নানা বিষয় সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। শিহাবুদ্দিন আন-নুওয়াইরি(৫০৪) আবহবিদ্যার সঙ্গে সঙ্গে ভূতত্ত্ববিদ্যা নিয়েও আলোকপাত করেছেন তার 'নিহায়াতুল আরাবি ফি ফুনুনিল আদাব' গ্রন্থে। আল-মাসউদি তার 'মুরুজুয যাহাবি ওয়া মাআদিনুল জাওহার' কিতাবে ভৌগোলিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি ভূতাত্ত্বিক বিষয়গুলোর পর্যালোচনাও করেছেন।(৫৩৫)
ভূমিকম্প
আদিকাল থেকেই ভূমিকম্পের বিষয়টি মানুষের মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রেখেছে। কতিপয় প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ভূ-অভ্যন্তরীণ বায়ুপ্রবাহের ফলে ভূকম্পনের সৃষ্টি হয় বলে উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, পৃথিবীর গভীর তলদেশে রয়েছে আগুন, তাই দেখা দেয় ভূমিকম্প। ভূমিকম্পের উৎপত্তি ও কার্যকারণ-সম্পর্কিত আলাপ-আলোচনা প্রথম বৈজ্ঞানিক রূপ পায় মুসলিমদের হাতে, হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে (খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীতে)। মুসলিম বিজ্ঞানীরা তখন ভূমিকম্প, ভূমিকম্প সংঘটনের ইতিহাস ও ভূকম্পনপ্রবণ এলাকাগুলোর ওপর বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় গুরুত্ব প্রদান করেন। ভূমিকম্পের প্রকারভেদ, তার শক্তিমাত্রা, ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসলীলা এবং এর ফলে উদ্গত শিলারাশির স্থানান্তর ও তার অপকার-উপকার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার ওপর জোর দেন। ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি কীভাবে কমানো যায় তার কৌশল উদ্ভাবনের চেষ্টা করেন কেউ কেউ। ইবনে সিনার 'আश-শিফা' গ্রন্থের খনিজ পদার্থ ও আবহাওয়া-সম্পর্কিত অংশে, ইখওয়ানুস সাফার 'রাসায়িল'-এ এবং আল-কাযবিনির 'আজায়িবুল মাখলুকাত'-এ এসব বিষয়ে বক্তব্য রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তারা সবাই তাদের স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করেছেন।
* উদাহরণ হিসেবে ইবনে সিনার বক্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। ভূমিকম্পের বৈশিষ্ট্য, তা সংঘটনের কারণ ও তার প্রকারভেদ সম্পর্কে ইবনে সিনা বলেছেন, ভূমিকম্প হলো পৃথিবীর কোনো একটি অংশের কম্পন, যা তার অভ্যন্তরীণ কারণে সৃষ্টি হয়। ভূ-অভ্যন্তরে কম্পনের সৃষ্টি হয়, তার ফলে আবশ্যকভাবে ওই অংশের ভূত্বকও কেঁপে ওঠে। ভূ-অভ্যন্তরে যে অংশটির নড়ে ওঠা সম্ভব তা হয়তো বাষ্পীভূত, ধূমায়িত ও বাতাসের মতো প্রবলবেগ কাঠামো, বা খরস্রোতা জলীয় কাঠামো, অথবা বায়বীয় কাঠামো, কিংবা আগ্নেয় কাঠামো অথবা ভূমি-কাঠামো। অবশ্য ভূমি-কাঠামোর কম্পনের জন্য এমন একটি কারণ দরকার, যা এই ভূত্বকের কম্পনের কারণের অনুরূপ। এই ক্ষেত্রে প্রথম কারণটিই ভূমিকম্পের সংঘটক। অন্যদিকে বায়বীয় কাঠামো-চাই তা আগ্নেয় হোক বা অন্যকিছু-নিজেই ভূ-অভ্যন্তরে উৎক্ষিপ্ত হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভূত্বকে তরঙ্গের সৃষ্টি করে।(৫০৬)
ইখওয়ানুস সাফা ভূমিকম্পের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ভূ-অভ্যন্তরের উত্তাপের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে গ্যাসের সৃষ্টি হয়। ওসব গ্যাসই ভূমিকম্প ঘটিয়ে থাকে। যদি ওই ভূখণ্ডের জমিন আলগা-আলগা হয় তবে সেসব গ্যাস ছিদ্রপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে, অন্যথায় ভূমিতে ফাটল ধরে ও সেসব গ্যাস বেরিয়ে পড়ে এবং ভূমিতে ধস নামে। ফলে তীব্র আওয়াজ ও কম্পন অনুভূত হয়।(৫০৭)
খনিজ ও শিলা
মুসলিম বিজ্ঞানীরা খনিজ পদার্থ ও মূল্যবান পাথরসমূহের পরিচয় দিয়েছেন এবং সেগুলোর প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যাবলি উল্লেখ করেছেন। খনিজ পদার্থ ও শিলারাশির স্তরবিন্যাস সাজিয়েছেন এবং সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক বর্ণনা প্রদান করেছেন। খনিজ পদার্থ ও মূল্যবান পাথর কোথায় পাওয়া যায় সেসব জায়গাও চিহ্নিত করেছেন। এগুলোর মধ্যে কোনটি উৎকৃষ্ট আর কোনটি অপকৃষ্ট তা নির্ণয় করার ব্যাপারেও গুরুত্ব দিয়েছেন। পাললিক শিলার গঠন, তার উপরিভাগের গঠন, উপত্যকার পলল, ভূমির সঙ্গে সমুদ্রের ও সমুদ্রের সঙ্গে ভূমির সম্পর্ক এবং সম্পর্কের ফলে সৃষ্ট পাথুরে কাঠামো ও ভূমিক্ষয়ের কার্যকারণ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা করেছেন।
সম্ভবত উতারিদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-হাসিব(৫০৮) প্রথম ব্যক্তি যিনি আরবি ভাষায় পাথর সম্পর্কে বই রচনা করেছেন। এই বইটির নাম 'মানাফিউল ‘আহজার’। তিনি এই বইয়ে মণিমুক্তা ও মূল্যবান পাথরের শ্রেণিবিন্যাস করেছেন এবং সেগুলোর প্রত্যেকটির বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন।(৫০৯) আল-রাজি এই বইটির কথা তার 'আল-হাবি' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আল-বিরুনির যুগ পর্যন্ত মুসলিমরা ভূমি থেকে উত্তোলিত বস্তুরাশির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ৮৮টি মণিমাণিক্য ও মূল্যবান পাথরের সন্ধান পেয়েছেন।
ইবনে সিনা তার ‘আশ-শিফা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, তিনটি কারণে শিলা গঠিত হয়। মাটি শুষ্ক হতে হতে তা থেকে গঠিত হয়, পানি বাষ্পীভূত হওয়ার ফলেও শিলা গঠিত হয় এবং পলল জমেও শিলা গঠিত হয়। তিনি খনিজ পদার্থগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন: শিলা বা পাথর, গন্ধক বা সালফার, লবণ বা দ্রবীভূত বস্তুসমূহ। ইবনে সিনা ধাতুসমূহেরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং সেগুলোর গঠনের পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন। তিনি বহু আকরিক ও খনিজ পদার্থের নাম উল্লেখ করে সেগুলোর প্রত্যেকটির বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। এসব পদার্থের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য কীভাবে বজায় থাকে তাও উল্লেখ করেছেন। প্রত্যেক পদার্থের বিশেষ গঠনরূপ রয়েছে, আমাদের পরিচিত রূপান্তরপ্রক্রিয়ায় সেগুলোর পরিবর্তন ঘটে না। যা ঘটা সম্ভব তা হলো ধাতুর আকৃতি ও কাঠামোর বাহ্যিক পরিবর্তন।(৫৪০)
মুসলিম বিজ্ঞানীরা খনিজ পদার্থসমূহের প্রাকৃতিক কাঠামো সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। বাহ্যিক কার্যকারণের ফলে সেগুলোর বিশেষ গুণ ও স্বভাবে কী ধরনের পদার্থগত পরিবর্তন সাধিত হয় তা নিয়েও আলোচনা করেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন যে, কিছু কিছু খনিজ পদার্থ প্রাকৃতিকভাবেই নির্দিষ্ট জ্যামিতিক রূপ পরিগ্রহ করে এবং তাদের এরূপ গঠনে মানুষের কোনো হাত নেই। আমরা বর্তমান সময়ে যাকে কেলাসবিজ্ঞান নাম দিয়েছি তারই প্রাথমিক লক্ষণ ছিল এটা। আল-বিরুনি এসব পদার্থের কয়েকটির বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন, যেগুলোর উপরিভাগ পারস্পরিক সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কাঠামো জ্যামিতিক। তিনি উদাহরণ হিসেবে হীরার কথা উল্লেখ করেছেন। হীরার আকৃতি তার একান্ত নিজস্ব, মোচাকার বহুভুজী। কোনো কোনো হীরা হয়ে থাকে যৌগিক। ত্রিভুজাকৃতির, অগ্নিসদৃশ তলগুলো পরস্পর সংলগ্ন, আবার কোনো কোনো হীরা আছে দ্বৈত পিরামিড আকৃতির।
শিলার উৎপত্তি ও গঠন সম্পর্কে মুসলিম বিজ্ঞানীরা আলোকপাত করেছেন। জলপ্রবাহের ফলে পলল জমে যে শিলা গঠিত হয়েছে তা হলো পাললিক শিলা(৫৪১) এবং অগ্নিময় অবস্থা থেকে যে শিলার সৃষ্টি হয়েছে তা হলো আগ্নেয় শিলা(৫৪২)। তা ছাড়া তারা অসংখ্য শিলা ও ধাতুর নির্দিষ্ট ভর বের করেছেন, যা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও যথাযথ। ভূবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তারা ভূ-সংস্থান(৫৪৩), ভূ-প্রকৃতি, জলীয় ভূতত্ত্ব(৫৪৪), জীবাশ্মবিজ্ঞান, মহাকাশীয় প্রভাব বা আবহবিদ্যা সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। আবহবিদ্যা বা আবহাওয়াবিজ্ঞান হলো ভূবিদ্যা ও জলবায়ুবিজ্ঞানের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক।(৫৪৫)
সমুদ্র ও জোয়ারভাটা
মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাঁদের ভূগোল-সংশ্লিষ্ট রচনাবলিতে সমুদ্র ও নদীভিত্তিক ভূতত্ত্ব নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা করেছেন, যা অন্যকোনো বিষয় নিয়ে করেননি। ভূগোল-বিষয়ক গ্রন্থাবলিতে তাঁরা আলাদা আলাদা অধ্যায় রচনা করেছেন, যেখানে সমুদ্রসমূহের নাম, সমুদ্রের অবস্থান ও সমুদ্রের তীরবর্তী দেশগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন। স্থলভাগের যেসব জায়গা একসময় নদী ও সমুদ্র ছিল এবং অতীতকালের যেসব জনপদ সমুদ্রে পরিণত হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। নৌচালনবিদ্যা নিয়ে তাঁরা গ্রন্থ রচনা করেছেন। জোয়ারভাটার ঘটনাবলি-যার ওপর নদীপথে ও সমুদ্রপথে চলাচলের সময় জাহাজের নাবিকেরা নির্ভর করে থাকেন-সম্পর্কেও আলোকপাত করেছেন। এসব বিষয়ে যে-সকল মুসলিম বিজ্ঞানীর নিজস্ব মতামত ও বক্তব্য ছিল তাঁদের মধ্যে রয়েছে আল-কিন্দি, আল-মাসউদি, আল-বিরুনি, আল-ইদরিসি, আল-মাকদিসি প্রমুখ।
যেসব গ্রন্থে দেশ ও অঞ্চল সম্বন্ধে আলোচনা রয়েছে তার কোনোটিই নদী ও সমুদ্র-সম্পর্কিত বিবরণ থেকে মুক্ত নয়। আল-মাসউদি তাঁর ‘আখবারুয যামান’ কিতাবে সমুদ্রের গঠন ও তার কার্যকারণ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্ববর্তী মনীষীদের বক্তব্য কী তা নিয়ে ব্যাপক ও বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। তাঁর ‘মুরুজুয যাহাব’ কিতাবে একগুচ্ছ ভূতাত্ত্বিক পর্যালোচনা রয়েছে, যেখানে সমুদ্র ও নদী এবং জোয়ারভাটা সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে। তিনি সমুদ্র সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রচনা করেছেন, যার নাম ذكر الأخبار عن انتقال البحار (সমুদ্রের স্থানান্তর-সম্পর্কিত তথ্যাবলি)।(৫৪৬)
আল-মাকদিসি এসব সমুদ্রের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ, সমুদ্রবক্ষে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপসমূহ এবং বিপজ্জনক স্থান সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। তিনি জোয়ারভাটা-সংক্রান্ত ঘটনাবলির উল্লেখ করে সেগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।(৫৪৭)
মুসলিম বিজ্ঞানীরা জলীয় পৃষ্ঠের (সমুদ্রপৃষ্ঠের) বিস্তৃতি পরিমাপ করেছেন এবং স্থলভাগের সঙ্গে মিলে তার আয়তন কতটা বিশাল হয় তাও জানিয়েছেন। ভূপৃষ্ঠের নানা প্রকারের উঁচু গঠন সম্পর্কে তারা আলোকপাত করেছেন। এসব উঁচু গঠনের ফলেই সমুদ্রের জলরাশি পৃথিবীকে তলিয়ে দিতে পারে না। এই প্রসঙ্গে ইয়াকুত হামাবি বলেছেন, এসব উঁচু অংশ না থাকলে (সমুদ্রের) পানি স্থলভাগের চারপাশ ঘিরে তাকে নিমজ্জিত করে ফেলত। ফলে পৃথিবীর কোনো স্থলভাগই প্রকাশ পেত না। পৃথিবীর জলভাগের তুলনায় স্থলভাগ কতটুকু সে সম্পর্কে স্পষ্ট বিবরণ পাই আবুল ফিদার কাছে। তিনি তার ‘তাকবিমুল বুলদানী কিতাবে জলভাগ ও স্থলভাগের অনুপাত উল্লেখ করে বলেছেন, ভূপৃষ্ঠের যে অংশ জলে আচ্ছন্ন তার পরিমাণ ৭৫%। পৃথিবীর যে অংশ উন্মোচিত বা দৃশ্যমান তা প্রায় এক চতুর্থাংশ, আর বাকি তিন চতুর্থাংশ সমুদ্রে নিমজ্জিত।(৫৪৮)
ভূপ্রকৃতিবিজ্ঞান বা ভূমিরূপবিদ্যা
মুসলিম বিজ্ঞানীরা জিয়োমোরফোলজি (ভূপ্রকৃতিবিজ্ঞান) বিষয়ে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক গবেষণা করেছেন। তারা এমন কিছু বাস্তবিক সত্যে উপনীত হয়েছেন যা আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ভূপ্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় কালগত কার্যকারণের ভূমিকা ও প্রভাব, স্থলভাগ ও জলভাগের স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় শিলাচক্র ও জ্যোতিশ্চক্রের প্রভাব, ইরোশন বা ক্ষয়কার্যে পানি, বাতাস ও জলবায়ু এদের প্রত্যেকটির সাধারণ ভূমিকা। বিজ্ঞানের এই দিকটি যারা ভালোভাবে আয়ত্ত করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আল-বিরুনি। ভারতবর্ষের একটি সমতলভূমির গঠনের প্রক্রিয়া বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, এই জায়গায় একটি সমুদ্র অববাহিকা ছিল। এখানে পলি জমতে থাকে এবং পলি জমতে জমতে একসময় তা সমতলভূমিতে পরিণত হয়। নদীর পলি সঞ্চিত হওয়ার ঘটনাও তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। বিশেষ করে যখন নদী মোহনার কাছাকাছি আসে তখন পলি বেশি জমে। মূল নদী তার উৎসের কাছে বড় আকারের হয় এবং মোহনার কাছাকাছি এসে তা তুলনামূলক ছোট আকার ধারণ করে। আল-বিরুনির বক্তব্য, পাহাড়ের কাছে পাথরগুলো বড় বড় এবং নদীর জলের প্রবাহও তীব্র, দূরে এসে পাথরগুলো হয় ছোট এবং জলের প্রবাহও থিতিয়ে আসে। জলের প্রবাহ ধীর হয়ে এলে সমুদ্রে প্রবেশপথের কাছাকাছি বালু জমতে থাকে। তাদের এসব সমতলভূমি প্রাচীন কালে সমুদ্র ছিল, তারপর জলপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে বালু ও পলি জমে তা সমতলভূমিতে পরিণত হয়।(৫৪৯)
জিয়োমোরফোলজির ক্ষেত্রে ইবনে সিনার বক্তব্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আধুনিক তাত্ত্বিক মতামতের কাছাকাছি। উদাহরণত, তিনি কিছু পাহাড় গঠনের ক্ষেত্রে দুটি কার্যকারণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। একটি হলো প্রত্যক্ষ কার্যকারণ, অপরটি পরোক্ষ। যখন প্রচণ্ড শক্তিশালী ভূমিকম্প ভূমির একটি অংশকে স্থানান্তর করে ফেলে তখন সরাসরি ছোট পাহাড় জেগে ওঠে। এটি প্রত্যক্ষ কারণ। যখন ঝড়ো হাওয়া বা খাত সৃষ্টিকারী খরস্রোতা জল পার্শ্ববর্তী ভূমির কিছু অংশের ক্ষয় ঘটায় এবং কিছু অংশ স্বাভাবিক থাকে, ক্ষয়প্রাপ্ত অংশ নিচু হয়ে যায় এবং তার পাশের অংশ উঁচু থাকে। তারপর এই নিচু অংশ দিয়ে জলপ্রবাহ তার পথ তৈরি করে নেয় এবং তা ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে। পাশের অংশ উঁচু টিলার মতোই থেকে যায়। এটা হলো পরোক্ষ কারণ।(৫৫০)
আবহবিদ্যা (মিটিয়োরোলজি)
মুসলিম বিজ্ঞানীরা আবহবিদ্যা(৫৫১) বা আবহাওয়াবিজ্ঞানের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। তারা এই বিজ্ঞানকে علم الآثار العلوية (উচ্চ প্রত্নতত্ত্ব বিজ্ঞান) নামে আখ্যায়িত করেছেন। বায়ুমণ্ডল ও বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা, ঘনত্ব, তাপমাত্রার স্তর, বায়ুপ্রবাহ, মেঘ ও বৃষ্টি এই বিজ্ঞানের মূল বিষয়। একে علم الأرصاد الجوية (আবহাওয়া বিজ্ঞান)-ও বলা হয়। অবশ্য আরও আগে আরব ভাষাবিজ্ঞানীরা এই বিজ্ঞান-সম্পর্কিত বহু পরিভাষা উল্লেখ করেছেন। উদাহরণ হিসেবে কিছু পরিভাষা এখানে উল্লেখ করা হলো। তারা কম তাপমাত্রাকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করেছেন। যথা: বাব্দ (ঠাণ্ডা), হার (উষ্ণ), কূর (ঠাণ্ডা), যামহারির (অতিশয় ঠান্ডা), সাক্আ (হিম বা হিমাঙ্কের নিচের ঠান্ডা), সির্র (প্রচণ্ড ঠান্ডা), আরিয় (বিপজ্জনক ঠান্ডা)। বেশি তাপমাত্রাকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করেছেন। যথা: হার্র (উষ্ণ), হারুর (বেশি গরম), কায়য (অতিশয় গরম), হাজিরাহ (তীব্র গরম), ফায়হ (আগুনের মতো গরম)। তারা বায়ুকেও বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেছেন, বায়ুপ্রবাহের দিক অনুসারে অথবা বায়ুর বৈশিষ্ট্য অনুসারে।
বায়ুপ্রবাহের দিক অনুসারে বায়ুর প্রকার : শামআল, শামাল, শামীয়া (উত্তর দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু), জানুব বা তায়াম্মুন (দক্ষিণ দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু), সাবা (পুব দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু), দাবুর (কাবার পেছন থেকে প্রবাহিত বায়ু), আস-সাবাবিয়্যাহ (উত্তর-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু), আল-আযয়াব (দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু), আদ-দাজিন (দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু), আল-জারায়াবা (উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু)। বৈশিষ্ট্য অনুসারে বায়ুর প্রকার: গরম বায়ুকে বলা হয় সামুম, শীতল বায়ুকে বলা হয় সারসার, বর্ষণমুখর বায়ুকে বলে মু'সিরা এবং বর্ষণহীন বায়ুকে বলে আকিম।
আরব ভাষাবিজ্ঞানীরা মেঘেরও বিভিন্ন নাম দিয়েছেন যা সেগুলোর বিভিন্ন অংশ ও গঠনের স্তরসমূহকে নির্দেশ করে। যেমন গামাম (এমন মেঘ যার দ্বারা আকাশের চেহারা পালটে যায়), মুয্ন (বৃষ্টিমুখর সাদা মেঘ), সাহাব (বজ্রহীন ও ঝড়হীন বর্ষণমুখর মেঘ), আরিদ্ (দিগন্তে ভাসমান মেঘ), দিমাছ (ঝড়-বজ্রহীন স্থির মেঘ), রাবাব (সাদা মেঘ)। মেঘের অংশসমূহ: হাইদাব, মানে নিচের মেঘ, কিফাফ, মানে উপরের মেঘ; রাহা, মানে মধ্যবর্তী স্তরে ভাসমান মেঘ, খিনদিয, মানে মেঘের দূরবর্তী প্রান্ত, বাওয়াসিক, মানে মেঘের সর্বোচ্চ অংশ। যে পানি আকাশ থেকে নামে বা কম তাপমাত্রার কারণে জমে যায় তারও বিভিন্ন নাম রয়েছে। যেমন কাত্র (ফোঁটায় ফোঁটায় পড়া বৃষ্টিজল), নাদা (শিশির), সাদা (রাতের শিশির), দাবাব (কুয়াশা), তাল্ল (কুয়াশার মতো বৃষ্টি), গায়স (বৃষ্টি), রাযায (ঝিরিঝিরি বৃষ্টি), ওয়াবিল (প্রবল বৃষ্টি), হাতিল (নিরবচ্ছিন্ন তুমুল বৃষ্টি), হাতুন (প্রবল বর্ষণ)। এগুলোর প্রত্যেকটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইবনে সিনা ও ইখওয়ানুস সাফা।(৫৫২)
জীবাশ্মবিজ্ঞান (palaeontology)
মুসলিম বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বয়স নির্ণয় করতে গিয়ে এবং সমুদ্রের শুষ্ক ভূমিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রমাণাদি উপস্থিত করতে গিয়ে জীবাশ্মবিজ্ঞান সম্বন্ধে আলোকপাত করেছেন। আল-বিরুনি তার ‘তাহদিদু নিহায়াতি আমাকিনি লি-তাসহিহি মাসাফাতিল-মাসাকিন’ কিতাবে সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, জাযিরাতুল আরব বা আরব উপদ্বীপ জলে নিমজ্জিত ছিল। ভূতাত্ত্বিক কালপরিক্রমায় তা থেকে পানি সরে যায়। কেউ যদি জলাশয় বা কূপ খনন করে, সেখানে সে পাথর দেখতে পাবে, সেই পাথর ভাঙলে তা থেকে বেরিয়ে আসবে শঙ্খ (বা সামুদ্রিক প্রাণীর খোলক)। এই যে আরব মরুভূমি, তা একসময় সমুদ্র ছিল, সমুদ্রের জল শুকিয়ে গিয়ে ভূমিতে পরিণত হয়েছে। সেখানে জলাশয় বা কূপ খনন করতে গেলেই আমরা তার স্পষ্ট নিদর্শন দেখতে পাই। মাটি, বালু ও কঙ্করের কয়েকটি স্তর দেখতে পাওয়া যায়। তারপর পাওয়া যায় মৃৎপাত্র বা কুমারের মাটি, কাচ ও হাড়। এর অর্থ এই নয় যে, এখানে আগমনকারী কাউকে এখানে দাফন করা হয়েছিল। খননের ফলে পাথরও বেরিয়ে আসে। পাথর ভাঙলে তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে শঙ্খ। একে মাছের কান বলা হয়। এসব শঙ্খ হয়তো নিজ অবস্থায় বহাল থাকে অথবা জীর্ণ হয়ে মিলিয়ে যায়, তখন তার কাঠামো আকারেই ওই জায়গাটুকু পাথরের ভেতরে খালি থাকে।(৫৫৩)
আল-বিরুনি এখানে ফসিল বা জীবাশ্মের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এগুলো হলো অশ্মীভূত পূর্ণাঙ্গ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অথবা পাথরের অভ্যন্তরে খোদাই হওয়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চিহ্ন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, কিছু অঞ্চল পানিতে নিমজ্জিত ছিল, তারপর তা স্থলভাগে পরিণত হয়েছে।
ইবনে সিনাও আল-বিরুনির অনুরূপ মত ব্যক্ত করেছেন। কোনো শুকনো ভূখণ্ডে বা স্থলভাগে জলজ প্রাণীর জীবাশ্ম প্রমাণ করে যে এই এলাকা কোনো এক সময় জলে নিমজ্জিত ছিল। আশ-শিফা গ্রন্থে ইবনে সিনার বক্তব্য এসেছে এভাবে, অনুমিত হয় যে, এই আবাদিত জনপদ প্রাচীন কালে আবাদ ছিল না, বরং সমুদ্রে নিমজ্জিত ছিল। পরে তা প্রস্তরীভূত হয়েছে। প্রস্তরীভবনের ঘটনা ঘটেছে হয়তো সমুদ্র থেকে পানি সরে গিয়ে তা উন্মোচিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে, বছরের পর বছর ধরে, যার বিবরণ ভূতাত্ত্বিক কালপঞ্জিতে সুরক্ষিত থাকেনি। অথবা সমুদ্রের তলদেশে প্রচণ্ড উত্তাপের সৃষ্টি হয়েছে, ফলে তাতে প্রস্তরীভবনের ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রথম কারণটি অধিকতর যুক্তিযুক্ত। এই ক্ষেত্রে সমুদ্র-এলাকার মাটি এঁটেল হওয়ায় তা প্রস্তরীভবনে সাহায্য করেছে। আবাদিত জনপদে প্রচুর পাওয়া গেছে। এসব পাথর ভাঙলে ভেতরে পাওয়া গেছে জলজ প্রাণীর খোলস, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। যেমন শঙ্খ ও অন্যান্য প্রাণী।(৫৫৪)
এই প্রসঙ্গে ইবনে সিনা আরও বলেছেন, প্রাণীর ও উদ্ভিদের অশ্মীভবনের (পাথরে বা ফসিলে পরিণত হওয়া) যেসব ঘটনা শোনা যায় তা সঠিক বলে ধরে নেওয়া যায়। এর পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। কিছু সামুদ্রিক এলাকায় ভূগর্ভে প্রচণ্ড শক্তির চাপ অশ্মীভবনের ঘটনা ঘটিয়েছে। অথবা ভূমিকম্প ও ভূমিধসের কারণে ভূখণ্ডের একটি অংশ সরে গেছে এবং এর ফলে সেখানে অশ্মীভবনের ঘটনা ঘটেছে।(৫৫৫)
মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাদের গ্রন্থসমূহে ও রচনাবলিতে ভূতত্ত্ব ও ভূবিজ্ঞান বিষয়ে যা-কিছু লিখেছেন, উপরিউক্ত আলোচনা তার সিন্ধুর মধ্যে ভাসমান হিমশৈলের একটি চূড়ামাত্র। এ থেকেই অগ্রগামিতা ও নেতৃত্বের দিকটি স্পষ্ট প্রমাণিত হয়। প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম বিজ্ঞানীরাই ভূবিজ্ঞানের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছেন ইবনে সিনা, আল-বিরুনি ও আল-কিন্দি। মুসলিম বিজ্ঞানীরা এই ক্ষেত্রে যে অবদান ও কীর্তি রেখে গেছেন আধুনিক ভূতত্ত্ববিদ্যা তারই সম্প্রসারিত রূপ।
টিকাঃ
৫২২. ভূতত্ত্ব বা ভূবিদ্যা (geology): ভূপ্তর, শিলা ইত্যাদি ভিত্তিক পৃথিবীর ইতিহাস-সম্পর্কিত বিজ্ঞান। ভূবিজ্ঞানের এই শাখায় পৃথিবী, পৃথিবীর গঠন, পৃথিবী গঠনের উপাদানসমূহ, পৃথিবীর অতীত ইতিহাস এবং তার পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করা হয়।-অনুবাদক
৫২৩. সুরা ফাতির: আয়াত ২৭।
৫২৪. সুরা হাদিদ: আয়াত ২৫।
৫২৫. সুরা আরাফ: আয়াত ১০।
৫২৬. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২৯১।
৫২৭. আল-ফাইরুজাবাদি: আবু তাহির মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াকুব ইবনে মুহাম্মাদ (৭২৯-৮১৭ হি./১৩২৯-১৪১৫ খ্রি.)। ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম ইমাম। ইরানের শিরাজ নগরের একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ইয়ামেনের যুবাইদে মৃত্যুবরণ করেন। 'আল-কামুসুল মুহিত' তার বিখ্যাত রচনা এবং তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য রচনা হলো ا البلغة في تراجم أئمة النحو واللغة দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৭, পৃ. ১২৬।
৫২৮. ইবনে সিদাহ আল-আন্দালুসি: আবুল হাসান আলি ইবনে ইসমাইল, ইবনে সিদাহ আল-মুরসি নামে পরিচিত (৩৯৮-৪৫৮ হি./১০০৭-১০৬৬ খ্রি.)। ভাষাবিজ্ঞান ও সাহিত্যের ইমাম ছিলেন অন্ধ। আন্দালুসের মুরসিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন আন্দালুসেরই شرح إصلاح المنطق، الأنيق، المحكم والمحيط الأعظم، المخصص الوافي في علم أحكام العالم والمتعلم، العلام في اللغة على الأجناس، شرح ما أشكل من شعر المتنبي القوافي দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৩, পৃ. ৩৩০-৩৩১।
৫২৯. আল-মাকদিসি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে আবু বকর আল-বিনা (৯৪৫-৯৯১ খ্রি.)। ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার উদ্দেশে প্রচুর ভ্রমণ করেছেন। ফলে অধিকাংশ দেশ সম্পর্কে তার জানা হয়ে গিয়েছিল। তারপর তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানচর্চায় ব্রতী হন এবং প্রায় সব মুসলিম দেশ ভ্রমণ করেন। এ বিষয়ে তার অর্জিত জ্ঞানভান্ডার সঞ্চিত আছে তার বিখ্যাত গ্রন্থ —আহসানুত তাকাসিম ফি মারিফাতিল আকালিম -এ। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৫, পৃ. ৩১২।
৫৩০. আল-কাযবিনি: যাকারিয়া ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মাহমুদ (৬০৫-৬৮২ হি./১২০৮-১২৮৩ খ্রি.)। ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদ। কাজি ছিলেন। বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: আতার উল-বিলাদ ওয়া আখবার উল-ইবাদ আজায়িব উল-মাখলুকাত ওয়া গারায়িব উল-মাওজুদাৎ। দেখুন, যাহাবি, তাযকিরাতুল হুফফায, খ. ২, পৃ. ২২; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ৪৬।
৫৩১. ভঙ্গিল পর্বত: ভঙ্গ বা ভাঁজ থেকে ভঙ্গিল শব্দটির উৎপত্তি। কোমল পাললিক শিলায় ভাঁজ পড়ে যে পর্বত গঠিত হয়েছে তাকে ভঙ্গিল পর্বত বলে। ভঙ্গিল পর্বতের প্রধান বৈশিষ্ট্য তার উঁচু-নিচু ভাঁজ। পৃথিবীর উচ্চতম অধিকাংশ পর্বত এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ভূ-পৃষ্ঠের কোনো অংশে প্রবল পার্শ্বচাপের ফলে ভূভাগে ক্রমোন্নতি-অবনতির সৃষ্টি হলে সেই স্থানটিতে ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি হয়। এ ধরনের পর্বতগুলো কখনো কখনো ৫০০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতার হয়। এশিয়ার হিমালয়, ইউরোপের আল্পস, উত্তর আমেরিকার রকি, দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বত ভঙ্গিল পর্বতের উদাহরণ।-অনুবাদক
৫৩২. স্তূপ পর্বত: ভূ-আলোড়নের সময় ভূপৃষ্ঠের শিলাস্তরে প্রসারণ ও সংকোচনের সৃষ্টি হয়। এই প্রসারণ ও সংকোচনের জন্য ভূত্বকে ফাটল তৈরি হয়। কালক্রমে এসব ফাটল বরাবর ভূত্বক স্থানচ্যুত হয়। ভূগোলের ভাষায় একে চ্যুতি বলে। ভূত্বকের এমন স্থানচ্যুতি কোথাও উপরের দিকে হয়, কোথাও হয় নিচের দিকে। চ্যুতির ফলে উঁচু হওয়া অংশকে স্তূপ পর্বত বলে। ভারতের বিন্ধ্যা ও সাতপুরা পর্বত, জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্ট, পাকিস্তানের লবণ পর্বত স্তূপ পর্বতের উদাহরণ।-অনুবাদক
৫৩৩. গ্রন্থটির বিষয়বস্তু আকরিক ও খনিজ পদার্থ, শিলা ও পাথর।
৫৩৪. আন-নুওয়াইরি: আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব ইবনে আহমাদ আল-বাকরি (৬৭৭-৭৩৩ হি./১২৭৮-১৩৩৩ খ্রি.)। বিজ্ঞানী ও অনুসন্ধানী গবেষক। মিশরের বনি সুওয়াইফের একটি গ্রাম নুওয়াইরার দিকে সম্পর্কিত করে তাকে আন-নুওয়াইরি বলা হয়। মূলত তিনি কাওসে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন। 'নিহায়াতুল আরাবি ফি ফুনুনিল আদাব' তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, আদ-দুরারুল-কামিনাহ, খ. ১, পৃ. ২৩১।
৫৩৫. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ২৯১ থেকে উদ্ধৃত।
৫৩৬. মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ২৬৪; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ৩১৪।
৫৩৭. ইখওয়ানুস সাফা, রাসায়িলু ইখওয়ানিস সাফা, খ. ২, পৃ. ৯৭, দারু সাদির, বৈরুত।
৫৩৮. উতারিদ ইবনে মুহাম্মাদ: উতারিদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-বাবিলি আল-বাগদাদি (মৃ. ২০৬ হি./৮২১ খ্রি.)। গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: ১. تركيب ٢٠ العمل بالأسطرلاب الأفلاك। দেখুন, ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩৩৬।
৫৩৯. মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ২৬১।
৫৪০. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৩।
৫৪১. পৃথিবীর শুরু থেকে যেসব শিলা উত্তপ্ত গলিত অবস্থা থেকে শীতল ও ঘনীভূত হয়ে কঠিন হয়েছে তা-ই আগ্নেয় শিলা। অগ্নিময় অবস্থা থেকে এ শিলার সৃষ্টি হয়েছিল বলে একে আগ্নেয় শিলা বলে। আগ্নেয় শিলার অন্য নাম অন্তরীভূত শিলা (Unstratified Rock), প্রাথমিক শিলা। আগ্নেয় শিলা স্ফটিকাকার, অপেক্ষাকৃত ভারী, কঠিন ও কম ভঙ্গুর। এতে জীবাশ্ম দেখা যায় না। যেমন গ্রানাইট, গ্যাব্রো, ব্যাসল্ট, ডাইক, ল্যাকোলিথ, ব্যাথোলিথ ইত্যাদি।
৫৪২. পলি বা পলল সঞ্চিত হয়ে যে শিলা গঠন করে তা পাললিক শিলা। এ শিলায় পলি সাধারণত স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয় বলে একে স্তরীভূত শিলাও বলে। পাললিক শিলা নরম ও হালকা, সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। পাললিক শিলায় জীবাশ্ম যেমন দেখা যায়, তেমনই ছিদ্রও দেখা যায়। যেমন চুনাপাথর, কয়লা, নুড়িপাথর, বেলেপাথর, পলিপাথর, চক, কোকিনা, লবণ, ডোলোমাইট, জিপসাম, ডায়াটম ইত্যাদি।-অনুবাদক
৫৪৩. ভূ-সংস্থান (Topography): যেকোনো ভৌগোলিক এলাকার প্রাকৃতিক এবং মানবিক দৃশ্যাবলির বিস্তারিত বিবরণ ও উপস্থাপনকে ভূ-সংস্থান বলে। এখানে প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি বলতে যেকোনো এলাকার উদ্ভিদ, প্রাণী, নদনদী, ভূমির বন্ধুরতা, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র প্রভৃতির বিবরণকে বোঝায়। মানবিক দৃশ্যাবলি বলতে যেকোনো এলাকার বসতি, নগর-বন্দর, হাটবাজার, রাস্তাঘাট, স্কুলকলেজ, অফিস-আদালত, পরিবহন ইত্যাদির বিবরণকে বোঝায়। ভৌগোলিক পঠনপাঠনের জন্য যেকোনো এলাকার প্রাকৃতিক ও মানবিক দৃশ্যাবলির বিস্তারিত বিবরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ভৌগোলিক এলাকার যাবতীয় প্রাকৃতিক ও মানবিক দৃশ্যাবলির বিভিন্ন সূচক ও চিহ্ন দিয়ে প্রদর্শিত মানচিত্রকে ভূ-সংস্থানিক মানচিত্র (Topographic Map) বলে। এটি হলো বৃহৎ স্কেল বা মাপনীর মানচিত্র।-অনুবাদক
৫৪৪. হাইড্রোগ্রাফি বা পৃথিবীর জলভাগ সম্বন্ধে গবেষণামূলক বিজ্ঞান।-অনুবাদক
৫৪৫. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ২৯৪-২৯৫।
৫৪৬. ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ২১৯।
৫৪৭. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ৩১০।
৫৪৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২২-৩২৪।
৫৪৯. আল-বিরুনি, তাহকিক মা লিল হিন্দ, পৃ.৮০।
৫৫০. প্রাগুক্ত।
৫৫১. আবহাওয়াবিজ্ঞান বা আবহবিদ্যা (Meteorology): পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণকারী বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থার বিভিন্নতা নিয়ে যে বিজ্ঞান তার নাম আবহবিদ্যা। আবহাওয়াবিদগণ বায়ুর বেগ, তাপমাত্রা, চাপ, বৃষ্টি, শিলাবর্ষণ, শিশির, কুয়াশা, তুষারপাত, বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক পদার্থ (যেমন কার্বন ডাই-অক্সাইড, জলীয় বাষ্প, অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন) ইত্যাদির পরিমাণ পরিমাপ ও বিশ্লেষণ করেন, আবহাওয়া সম্পর্কে অনুমান করেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন।
৫৫২. রিসালাতুল আসারিল আলাবিয়্যা, মিন রাসায়িলি ইখওয়ানিস সাফা, দারু সাদির, বৈরুত, খ. ২, পৃ. ৬২ ও তার পরবর্তী।
৫৫৩. আল-বিরুনি, তাহদিদু নিহায়াতিল আমাকিনি লি-তাসহিহি মাসাফাতিল মাসাকিন' ইস্তাম্বুলের জামে আল-ফাতিহ গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপি থেকে জার্মান প্রাচ্যবিদ Fritz Krenkow কর্তৃক চয়নকৃত অংশ। আল-মুজাল্লাদুত তাযকারি, পৃ. ২০৪।
৫৫৪. মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ২৬৩।
৫৫৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৫।
📄 বীজগণিত
বীজগণিতের সূচনা ও তার ভিত্তি স্থাপন করেছেন বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী আল-খাওয়ারিজমি (১৬৪-২৩২ হি./৭৮১-৮৪৬ খ্রি.)। মিরাসের অংশবণ্টনে কিছু জটিল সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তিনি বীজগণিতের উদ্ভাবন ঘটিয়েছিলেন। তিনি বীজগণিতের কিছু মূলনীতি ও নিয়ম স্থির করেছেন যা একে প্রকৌশল ও গণিতের অন্যান্য শাখা থেকে স্বতন্ত্র জ্ঞানের মর্যাদা দান করেছে।
আল-খাওয়ারিজমিই প্রথম বর্তমানে আলজেব্রা নামে পরিচিত জ্ঞানশাখাটির জন্য 'জার' শব্দটি ব্যবহার করেন। ইউরোপীয়রা তার থেকে তা গ্রহণ করে। এখনো পর্যন্ত 'আল-জার' তার আরবি নামেই ইউরোপের যাবতীয় ভাষায় পরিচিত। তা ইংরেজি ভাষায় Algebra এবং ফরাসি ভাষায় Algèbre। অন্যান্য ভাষায়ও অনুরূপ। ইউরোপীয় ভাষাগুলোতে যত শব্দে algorithme বা algorithm বা algorism রয়েছে তা 'আল-খাওয়ারিজমি' নামটির অপভ্রংশ। মানুষকে আরবি সংখ্যা শেখানোর কৃতিত্বও তারই। তাই তো আল-খাওয়ারিজমিকে বীজগণিতের জনক বলা হয়।(৫৫৬)
আল-খাওয়ারিজমির কিতাব 'আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা' গণিতশাস্ত্রের একটি প্রধান বই এবং বিপুল প্রভাবসঞ্চারী। এতে তিনি সমীকরণের পক্ষান্তর ও সমাধান নিয়ে আলোচনা করেছেন। গ্রন্থটির ভূমিকায় তিনি জানিয়েছেন যে, খলিফা আল-মামুন তাকে এই গ্রন্থ রচনার অনুরোধ জানান। কীভাবে তিনি অনুরোধ জানান তারও বিবরণ দিয়েছেন। গ্রন্থটি লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেন জেরার্ডো ডি ক্রিমোনা (Gerardo de Cremona)।(৫৫৭) ১৮৫১ সালে লন্ডন থেকে গ্রন্থটির আরবি ভাষ্যসহ ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন ফ্রেডেরিক রোজেন। তিনিই এটির অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন। অনূদিত গ্রন্থটির নাম The Algebra Of Mohammed Ben Musa।
আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা গ্রন্থটির একাধিক অনুবাদের ফলে ভারতীয় গণিত ও দশমিক পদ্ধতির(৫৫৮) ব্যবহার ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি সেখানে গাণিতিক ক্রিয়া-কার্য Alguarismo নামে পরিচিতি লাভ করে। বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, এগুলোই আবার আরবিতে অনূদিত হয় اللوغاريتمات নামে, যদিও তা মূলত আল-খাওয়ারিজমির প্রতি সম্বন্ধিত।
الجداول الخوارزمية يا الخوارزميات
আল-খাওয়ারিজমির আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা গ্রন্থটি খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণিতশাস্ত্রের প্রধান উৎস হিসেবে বিরাজমান ছিল। তার পরে যারা আলজেব্রা বা বীজগণিত নিয়ে বই লিখেছেন তাদের অধিকাংশই এই গ্রন্থের ওপর নির্ভরশীল। আরবি ভাষা থেকে লাতিন ভাষায় এটির অনুবাদ করেন রবার্ট অব চেস্টার (Robert of Chester)। ফলে এর দ্বারা ইউরোপ আলোকিত হয়। আধুনিক কালে দুইজন ডক্টর মিশরীয় পদার্থবিদ আলি মুস্তাফা মুশরাফা ও মিশরীয় গণিতবিদ মুহাম্মাদ মুরসি আহমাদ আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা গ্রন্থটি সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন।(৫৫৯) এটি :كتاب الجبر والمقابلة، تحقيق علی مصطفی مشرفه ومحمد مرسى أحمد ১৯০৭ সালে কায়রোর পল ব্যেরি প্রকাশনাসংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়।
আল-খাওয়ারিজমির পর এই পথপরিক্রমা সমাপ্ত করেন আবু কামিল শুজা আল-মিশরি(৫৬০), আবু বকর আল-কারখি(৫৬১) ও উমর আল-খাইয়াম(৫৬২) এবং অন্যান্য প্রতিভাবান মুসলিম গণিতবিদ।
শূন্য (০) প্রবর্তন
শূন্য (০)-এর প্রবর্তন গণিতশাস্ত্রে মুসলিমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও মহাকীর্তি। কোনো সন্দেহ নেই যে, শূন্য (০) গাণিতিক কার্যাবলিকে সহজতর করে দিয়েছে এবং গণিতবিজ্ঞানকে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছে। শূন্য (০) না থাকলে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক গাণিতিক সমীকরণের সমাধান ততটা সহজে করতে পারতেন না, যা এখন করতে পারছেন। গণিতের বিভিন্ন শাখায় যে অগ্রগতি ঘটেছিল তা সর্বজনবিদিত। কিন্তু এর ফলে সভ্যতার যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল তা বিস্ময়কর।(৫৬৩)
দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান
গণিতশাস্ত্রে মুসলিমদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও কীর্তি হলো দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান। একে ঘন সমীকরণও বলে। তারা দ্বিঘাত সমীকরণের কয়েকটি সমাধানপদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন। গণিতের আধুনিক গ্রন্থগুলোতে এখনো এসব সমাধানপদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। তারা জানিয়েছেন যে, এ ধরনের সমীকরণের দুটি রুট (Root) বা মূল থাকে। মূল দুটি ধনাত্মক হলে কীভাবে সেগুলোকে বের করতে হবে তাও তারা জানিয়েছেন। মুসলিমজাতি যেসব বিষয়ে অগ্রগামী এবং পূর্ববর্তী সব জাতি থেকে এগিয়ে রয়েছে তার মধ্যে গণিতশাস্ত্রে এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার অন্যতম। তারা কতিপয় সমীকরণের সমাধানের জন্য প্রকৌশলীয় পদ্ধতিও আবিষ্কার করেছিলেন। আল-খাওয়ারিজমির আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা গ্রন্থের 'আলা-মাসাহাত' অধ্যায়ে এমন কিছু প্রকৌশলীয় প্রক্রিয়া রয়েছে যেগুলোর সমাধান করা হয়েছে বীজগণিতীয় পদ্ধতি ব্যবহার করে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিমরাই প্রথম প্রকৌশলীয় সমস্যার (engineering problem) সমাধানে বীজগণিতের ব্যবহার চালু করেন।(৫৬৪)
দশমিক ভগ্নাংশের ব্যবহার
যদিও বলা হয়ে থাকে যে ডাচ বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ সিমোন স্টেভিন(৫৬৫) প্রথম দশমিক ভগ্নাংশের ধারণা দেন এবং তিনিই প্রথম এর ব্যবহার চালু করেন, কিন্তু তা যথার্থ নয়। মুসলিম গণিতজ্ঞ গিয়াসুদ্দিন জামশেদ আল কাশি(৫৬৬) মূলত প্রথম ব্যক্তি, যিনি দশমিক ভগ্নাংশের প্রতীক প্রবর্তন করেছিলেন এবং সিমোন স্টেভিনের ১৭৫ বছরেরও বেশি পূর্বে তা ব্যবহার করেছিলেন। তা ছাড়া তিনি দশমিক ভগ্নাংশের ব্যবহারের উপকারিতা এবং তা ব্যবহার করে অঙ্ক কষার পদ্ধতিও বলে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর 'মিফতাহুল হিসাব' গ্রন্থের পঞ্চম পৃষ্ঠায় মুখবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি দশমিক ভগ্নাংশ আবিষ্কার করেছেন, যাতে ওইসব ব্যক্তিদের জন্য অঙ্ক কষা সহজ হয় যারা ষষ্ঠিক (sexagesimal) পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞ। সুতরাং তিনি জেনেশুনেই বলছেন যে, তিনি একটি নতুন বিষয় আবিষ্কার করেছেন।(৫৬৭)
গণিতে প্রতীকের ব্যবহার
আল-খাওয়ারিজমির পরবর্তীকালে মুসলিম বিজ্ঞানীরা গাণিতিক ক্রিয়া-কার্যে প্রতীকের ( ÷ × - +) ব্যবহার শুরু করেন। আল-কালাসাদি আল-আন্দালুসির(৫৬৮) রচনাবলিতে, বিশেষ করে 'কাশফুল আসরারি আন ইলমি হুরুফিল গুবার' গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তা থেকে গাণিতিক প্রতীক ব্যবহারের বিষয়টি যথার্থ প্রমাণিত হয়। গণিতের বিভিন্ন শাখার অগ্রগামিতা ও উৎকর্ষ লাভে এসব প্রতীক ব্যবহারের যে ভূমিকা ও প্রভাব তা কারও অজানা নয়। কিন্তু সত্যিকারই আফসোসের ব্যাপার যে, ফরাসি বিজ্ঞানী ফ্রাঁসোয়া ভিয়েটাকে(৫৬৯) গণিতে প্রতীক ব্যবহারের প্রবর্তক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বলা হয় যে, তিনি এসব গাণিতিক প্রতীক ও চিহ্ন আবিষ্কার করেছেন। অথচ তার জীবৎকাল ১৫৪০-১৬০৩ খ্রি.।(৫৭০)
ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান
উমর আল-খাইয়াম (৪৩৬-৫১৭ হিজরি) বীজগণিতীয় ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করেন। কনিক সেকশন বা কনিক ব্যবহার করে বহুপদী সমীকরণের সমাধানপদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরা মানবসভ্যতাকে যা-কিছু দিয়েছেন এটি তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি। উমর আল-খাইয়াম যে অধিবৃত্ত (parabola) ও বৃত্তের (বৃত্তের ছেদকের) সাহায্যে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করেছেন তা থেকেই প্রতিভাত হয় যে তিনি (শূন্যে অবস্থিত কোনো) বিন্দুর স্থানাঙ্ক (সঠিক অবস্থান) ব্যাখ্যার জন্য আনুভূমিক স্থানাঙ্ক(৫৭১) সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। উমর আল-খাইয়াম তার এই প্রয়াসের মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণাত্মক বা স্থানাঙ্ক জ্যামিতির(৫৭২) ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় প্রথম ইটগুলো স্থাপন করেন। অথচ রেনে দেকার্তেকে এর প্রবর্তক আখ্যায়িত করা হয়। কোনো সন্দেহ নেই যে, বিশ্লেষণাত্মক জ্যামিতির বিকাশ ও মূলনীতি স্থিরীকরণে দেকার্তের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আমরা গণিতশাস্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ শাখাটির উদ্ভাবক উমর আল-খাইয়ামের ভূমিকার কথা ভুলে যাব।(৫৭৩)
টিকাঃ
৫৫৬. কারাম হিলমি ফারহাত, আত-তুরাসুল ইলমি লিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিশ শাম ওয়াল ইরাক খিলালাল কারনির রাবিয়িল হিজরি পৃ. ৬৪২-৬৪৩, মুহাম্মাদ আলি উসমান, মুসলিমুনা আল্লামুল আলামা, পৃ. ৭৪-৭৫, আকরাম আবদুল ওয়াহহাব, মিয়াতু আলিমিন গাইয়ারু ওয়াযহাল আলাম পৃ. ২০।
৫৫৭. গ্রন্থটি রবার্ট অব চেস্টার (Robert of Chester) কর্তৃক লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।- অনুবাদক
৫৫৮. Decimal Numeral System.-অনুবাদক
৫৫৯. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, মুবতাকির ইম্মিল-জাবর... মুহাম্মাদ ইবনে মুসা আল- খাওয়ারিজমি, মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যা, খ. ৫, পৃ. ১৮৭ এবং রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ৭৭: মুহাম্মাদ আলি উসমান, মুসলিমুনা আল্লামুল আলামা, পৃ. ৭৭; আবদুল হালিম মুনতাসির, তারিখুল ইলম ওয়া দাওরুল উলামাইল আরাব ফি তাক্কাদ্দুমিহি, পৃ. ৬৫।
৫৬০. শুজা আল-মিশরি: আবু কামিল শুজা ইবনে আসলাম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে শুজা (মৃ. ৩১৮ হি./৯৩০ খ্রি.)। আবু কামিল আল-হাসিব নামেও পরিচিত। মিশরীয় গণিতজ্ঞ ও প্রকৌশলী। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: كتاب الجمع والتفريق، كتاب الخطأين كتاب كمال الجبر وتمامه والزيادة في أصوله ويعرف بكتاب الكامل كتاب الوصايا بالجبر والمقابلة، كتاب الجبر والمقابلة، كتاب الوصايا بالجذور كتاب الشامل في الجبر والمقابلة ، كتاب الطرائف في الحساب، كتاب الجمع والتفريق، كتاب الخطأين كتاب الكفاية، كتاب المساحة والهندسة والطير، كتاب مفتاح الفلاح، رسالة في المخمس والمعشر، كتاب العصير، كتاب الفلاح দেখুন, ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩৩৯; উমর রিদা কাহহালা, মুজামুল মুআল্লিফিন, খ. ৪, পৃ. ২৯৫।
৫৬১. আবু বকর আল-কারখি (আল-কারজি) মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল-কারখি (মৃ. ৪১০ হি./১০২০ খ্রি.)। গণিতজ্ঞ, প্রকৌশলী। ইরাকের আমির বাহাউদ দাওলার উজির ফাখরুল মালিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তার অনুরোধে তিনি বীজগণিত বিষয়ে কিতাবুল ফাখরি রচনা করেন। তার আরও দুটি গ্রন্থ আল-বাদি ফিল-হিসাব এবং আল-কাফি ফিল-হিসাব। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১২৫; ফুয়াদ সেযগিন, তারিখুত তুরাসিল আরাবি, খ. ১, পৃ. ৫৬২।
৫৬২. উমর আল-খাইয়াম: উমর ইবনে ইবরাহিম আল-খাইয়ামি আন-নিশাপুরি (১০৪৮-১১২১ খ্রি.)। পার্সিয়ান কবি, দার্শনিক, গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। বীজগণিত সম্পর্কে সেই সময়কার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থটি তার লেখা। এই গ্রন্থে তিনি দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান ও ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধানের ক্ষেত্রে জ্যামিতিক পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন। ইউক্লিডের জ্যামিতি সম্পর্কে একটি টাকাও আছে তার। জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি একটি মানমন্দিরের প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, উন্নত জ্যোতিষ-সারণি রচনা ও মুসলিম বর্ষপঞ্জির সংস্কার সাধন (১০৭৪ খ্রি.) করেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, দর্শন ও অধিবিদ্যা নিয়েও লিখেছিলেন তিনি। আইন ও ইতিহাস সম্পর্কেও তার যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। তুর্কি সুলতানদের দরবারে তিনি ছিলেন সম্মানিত বৈতনিক সভাসদ। সাধারণ পাঠকের কাছে তিনি অবশ্য বেশি পরিচিত কবি হিসেবে, রুবাইয়াতের রচয়িতারূপে। বাংলা ও ইংরেজিসহ বহু ভাষায় এর অনুবাদ হয়েছে। এই কবিতাগুচ্ছ থেকে উমর আল-খাইয়ামের শাশ্বত ভাবনা, গভীর অনুভূতি ও জীবন-জিজ্ঞাসার পরিচয় পাওয়া যায়। দেখুন, আব্বাস আল-কোমি, সাফিনাতুল বিহার, খ. ১, পৃ. ৪৩৬; ইবনুল আসির, আল-কামিল, ৪৭৬ হিজরির ঘটনাবলি।
৫৬৩. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা فিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৫৫-৩৫৬।
৫৬৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫৬।
565. সিমন স্টেভিন (Simon Stevin 1548-1620) : গ্যালিলিও, কেপলার ও দেকার্তের মতো তিনিও 'নতুন' বিজ্ঞানের একজন প্রতিষ্ঠাতা। নতুন পদ্ধতি ও প্রথাবিরোধী প্রতীতে তাঁর আগ্রহ ছিল। বিজ্ঞানের প্রাচীন পদ্ধতি ও প্রণালিসমূহকে তিনি সচেতনভাবে বাতিল করেছিলেন। জলগতিবিজ্ঞানের কলাকৌশলে তিনি ছিলেন বিশেষ পারদর্শী এবং এই বিষয়ে একটি সরকারি পদেও অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বলবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল, নৌপরিবহন ও রসায়নসহ বিভিন্ন শাখা তাঁর অনুশীলনের ফলে সমৃদ্ধ হয়েছে। পাটিগণিত ও বীজগণিত সম্পর্কে লেখা তাঁর গ্রন্থ পরবর্তীকালের অনেক উল্লেখযোগ্য গণিতবিদকে অনুপ্রাণিত করেছে।-অনুবাদক।
566. আল-কাশি: গিয়াসুদ্দিন ইবনে মাসউদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-কাশি (১৩৮০-১৪২১ খ্রি.)। হিজরি নবম শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। খুরাসানের কাশান শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং সমরকন্দে মৃত্যুবরণ করেন। বর্গমূল, ঘনমূলের মতো পূর্ণসংখ্যার ঘাতবিশিষ্ট মূল নির্ণয়ের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। বহু শ্রেষ্ঠ আরব বিজ্ঞানীর মতো তিনিও অনুবাদের কাজ করেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: كتاب زيج الخاقاني، الأبعاد والأجرام، نزهة الحدائق সম্বন্ধে। رسالة سلم السماء، رسالة المحيطية رسالة الجيب والوتر، مفتاح الحساب কাহহালা, মুজামুল মুআল্লিফিন, খ. ৮, পৃ. ৪০; নাসরিন মুস্তাফা, জামশিদ গিয়াসুদ্দিন আল কাশি: জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর অবদান, দ্বিতীয় সংস্করণ, মে, ২০০৯, প্রকাশক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, বাংলাদেশ।
567. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৫৬।
৫৬৮. আবুল হাসান আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আলি আল-কুরাশি আল-বাসতি (৮১৫-৮৯১ হি./১৪১২-১৪৮৬ খ্রি.)। আন্দালুসের বাজায় (বাস্তায়) জন্মগ্রহণ করেন এবং তিউনিসিয়ার বাজায় মৃত্যুবরণ করেন। গণিতবিদ। মালিকি মাযহাবপন্থী ইমাম। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: شرح التبصرة الواضحة في المنطق، كشف الجلباب عن علم الحساب، الأرجوزة الياسمينية في الجبر والمقابلة أشرف كتاب النصيحة في السياسة العامة والخاصة، مسائل الأعداد، شرح أيساغوجي في اللائحة الضوء اللامع لأهل القرن التاسع - 2017 | المسالك إلى مذهب مالك، ৬, পৃ. ৫; হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ১, পৃ. ১৫৩।
৫৬৯. ফ্রাঁসোয়া ভিয়েটা (François Viète 1540-1603): ষোড়শ শতকের শ্রেষ্ঠ বীজগণিতজ্ঞ বলে পরিচিত। ত্রিকোণমিতি তার বিকাশের উন্নত পর্যায়ে এসে বীজগণিতের সঙ্গে যখন জড়িয়ে পড়তে লাগল তখন ভিয়েটা এই দুটি শাখা নিয়েই পাশাপাশি কাজ করেছিলেন। তার বলয়ের ক্ষেত্রে ত্রিকোণমিতির প্রয়োগ তার বীজগাণিতিক অঙ্কপাতনকে সাহায্য করেছিল। গাণিতিক বিশ্লেষণ সম্পর্কে আধুনিক ধারণার প্রবর্তনে তিনি উভয় শাখা থেকে উপাদান সংগ্রহ শুরু করেছিলেন। ভিয়েটা প্রাচীন গ্রিক গণিতজ্ঞ আপোলোনিয়াসের একটি মূল সমস্যারও সমাধান করেছিলেন, প্রদত্ত তিনটি বৃত্তকে স্পর্শ করে একটা বৃহদাকার বৃত্ত অঙ্কন। π (পাই)-এর মান নির্ধারণের একটি উন্নত পদ্ধতিও তিনি দেখান। জ্যোতির্বিদ্যায় অবশ্য তার মোটেও দখল ছিল না। সেজন্য তিনি ক্যালেন্ডারের গ্রেগরীয় সংস্কার ও সংশোধনের বিরোধিতা করেছিলেন।- অনুবাদক
৫৭০. জালাল মাযহার: হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৫৮, আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম পৃ. ৬৫।
৫৭১. Horizontal Coordinate/X-coordinate বা ভুজ।-অনুবাদক
৫৭২. স্থানাঙ্ক জ্যামিতি বিশ্লেষণী জ্যামিতি (Analytic geometry): গণিতশাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা যেখানে জ্যামিতি আলোচনা করার জন্য বীজগণিত প্রয়োগ করা হয়। অনেক সময় একে বিশ্লেষণাত্মক জ্যামিতিও বলা হয়। এটি সাধারণত কো-অর্ডিনেট জ্যামিতি বা কার্টেসিয়ান জ্যামিতি নামে পরিচিত। পদার্থবিদ্যা ও কারিগরি শিক্ষায় এর গুরুত্ব অসীম। স্থানাঙ্ক জ্যামিতিতে সমতলে অবস্থান করা একটি বিন্দুর স্থানকে একজোড়া সংখ্যার সহায়তায় উপস্থাপন করা হয়। একে সংখ্যাজোড়ক স্থানাঙ্ক বলা হয়। সমতলে একটি বিন্দুর অবস্থান জানতে একজোড়া অক্ষ ব্যবহার করা হয়। y অক্ষ থেকে একটি বিন্দুর দূরত্বকে স্থানাঙ্ক বা ভুজ বলা হয়। x অক্ষ থেকে একটি বিন্দুর দূরত্বকে y স্থানাঙ্ক বা কোটি বলা হয়। x অক্ষের উপরে থাকা একটি বিন্দুর স্থানাঙ্কের অবস্থান (x, 0) এবং y অক্ষের উপরে থাকা একটি বিন্দুর স্থানাঙ্কের অবস্থান (0, y)।-অনুবাদক
৫৭৩. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ৬৫।
📄 যন্ত্রকৌশল
গ্রিক, রোমান, পারসিক, চৈনিক বিজ্ঞানীরা যন্ত্রপ্রকৌশলের ময়দানে যেসব ছড়ানো-ছিটানো তত্ত্ব ও নিয়ম রেখে গিয়েছিলেন তা-ই ছিল মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক অবলম্বন। পরে তারা যন্ত্রপ্রকৌশলের বিকাশ ঘটিয়েছেন এবং নতুন কৌশল ও যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন। এই বিজ্ঞান তাদের নতুন নতুন আবিষ্কারে সমৃদ্ধি লাভ করেছে এবং অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য প্রায়োগিক বিজ্ঞানশাখায় পরিণত হয়েছে। আগে এমন কৌশলজ্ঞান কেবল বিনোদন ও জাদুবিদ্যাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। আরব বিজ্ঞানীরা এই বিজ্ঞানশাখার নাম দিয়েছিলেন 'ইলমুল হিয়াল' বা (প্র) কৌশলবিজ্ঞান বা কৌশলবিদ্যা। এমন নামকরণ করে তারা বোঝাতে চেয়েছেন যে, এসব কৌশল অবলম্বন করে কঠিন পরিস্থিতি ও অবস্থাকে আয়ত্তে এনে কোনো উদ্দেশ্য সাধন করা যায়। অর্থাৎ, এতে মানুষের কর্মপ্রচেষ্টা ও মানবিক কর্মশক্তি পর্যাপ্ত বৃদ্ধি পায় এবং কৌশলগত শক্তি ব্যাপকতা লাভ করে। মানবশক্তি ও পশুশক্তি থেকেও বহুগুণ বেশি শক্তি আয়ত্তে চলে আসে এবং এর দ্বারা যেকোনো উপকার হাসিল করা যায়।
কৌশলবিদ্যার উদ্দেশ্য
মুসলিম বিজ্ঞানীরা কৌশলবিদ্যা কাজে লাগিয়ে মানুষের উপকার ও কল্যাণ সাধন করতে চেয়েছেন, শক্তির জায়গায় কৌশল এবং পেশির জায়গায় বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে চেয়েছেন। দেহের জায়গায় ব্যবহার করতে চেয়েছেন যন্ত্র। শ্রমিকশ্রেণি ও দাসদের বন্দিদশা, বাধ্যতামূলক শ্রম ও কায়িক পরিশ্রম থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন। বিশেষ করে যেহেতু ইসলাম অত্যধিক কায়িক পরিশ্রমের প্রয়োজন রয়েছে এমন বৈষয়িক কর্মকাণ্ডে বাধ্যতামূলক শ্রম নিষিদ্ধ করেছে। একইভাবে ইসলাম শ্রমিকশ্রেণির ওপর কষ্টদায়ক ও তীব্র ক্লান্তিকর কাজ চাপিয়ে দিতেও নিষেধ করেছে। প্রাণীদের কষ্ট দেওয়াও হারাম করেছে। অর্থাৎ, প্রাণীদের দিয়ে তাদের সাধ্যাতীত বোঝা টানানো বা বহন করানো যাবে না। এ কারণে মুসলিমদের দৃষ্টি ছিল নতুন যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করার দিকে, যাতে মানুষ ও প্রাণীর বদলে যন্ত্রপাতি দিয়েই কষ্টকর কাজগুলো সম্পন্ন করা যায়। এটা মূলত মানুষের সভ্যতাজনিত প্রবণতা। যেসব জাতির মধ্যে এমন প্রবণতা রয়েছে তারা জ্ঞানবিজ্ঞান ও সভ্যতা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বহুদূর এগিয়ে গেছে। এই প্রবণতাকে কেন্দ্র করেই নতুন কিছু আবিষ্কারের দর্শন ঘুরপাক খায়, যে আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের দৈনন্দিন চিন্তাভাবনায় কাঠামোবদ্ধ রূপ লাভ করে। কারণ এর পেছনে সক্রিয় থাকে মানুষের জীবনকে সুন্দর করার এবং মানবজীবন থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের কষ্টকে দূরীভূত করার অভিপ্রায়।
ইসলামি সভ্যতার বিজ্ঞানজগতে উপকারী কৌশলবিজ্ঞান (ইলমুল হিয়ালিন নাফিআ) অগ্রসর প্রযুক্তিগত দিকটিই সবার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদরা তাদের তাত্ত্বিক জ্ঞানবিদ্যাকে প্রয়োগ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ধর্মের সেবায় এবং সভ্যতা ও নগরায়ণের প্রতিটি দিক বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তারা কল্যাণকর প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন।
প্রাচীন লোকেরা কৌশলবিদ্যা কাজে লাগিয়ে তাদের ধর্মাদর্শের অনুসারীদের ওপর ধর্মীয় ও আত্মিক প্রভাব সৃষ্টি করার চেষ্টা করত। যেমন গণকদের মাধ্যমে চলাফেরা করে বা কথা বলে এমন পুতুল ব্যবহার করত। উপাসনাগুলোতে সংগীত, অর্গান ও শব্দযন্ত্র ব্যবহার করা হতো। প্রাচীন লোকদের কৌশলবিদ্যার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ছিল এগুলোই। ইসলাম আসার পর তা বান্দা ও তার রবের মধ্যে যে সম্পর্ক স্থাপন করল তাতে কোনো ওসিলা বা মধ্যস্থতার প্রয়োজন পড়ল না। মানুষের চোখে বিভ্রাট সৃষ্টি করারও কোনো দরকার হলো না। তখন 'উপকারী কৌশলবিদ্যার' নতুন উদ্দেশ্য হলো সক্রিয় (মেকানিক্যাল) যন্ত্র ব্যবহার করে মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করা। সক্রিয় ও চলমান যন্ত্র বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে এমন সব যন্ত্রপাতি যাদের সক্রিয়তা ও চলমানতা বায়ুর গতি অথবা জলের গতি বা সুষম অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের প্রথমটিকে বলে এরোডাইনামিক্স (বায়ুগতিবিদ্যা)(৫৭৪) এবং দ্বিতীয়টিকে বলে হাইড্রোডাইনামিক্স (জলগতিবিদ্যা)(৫৭৫) বা হাইড্রোস্ট্যাটিক্স (জলস্থিতিবিদ্যা)(৫৭৬)। এগুলোর সঙ্গে আরও ছিল ধীরগতির অপারেটিং সিস্টেমযুক্ত কপাটিকা(৫৭৭), দূরবর্তী স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণপদ্ধতিতে কার্যক্ষম ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, জলসাঁকো ও কৃত্রিম জলপ্রণালি (Aqueduct), প্রকৌশলীয় ব্যবস্থা, স্থাপত্য-কারুকার্য ও অন্যান্য বিষয়।(৫৭৮)
মুসলিম বিজ্ঞানীদের হাতে যন্ত্রপ্রকৌশলের বিকাশ
আমরা যন্ত্রপ্রকৌশলের বা উপকারী কৌশলবিদ্যার শুরুর দিনগুলোতে ফিরে গেলে দেখতে পাই যে, ইসলামি বিশ্বে যন্ত্রপ্রকৌশলের প্রযুক্তি বিকাশ লাভ করতে থাকে হিজরি তৃতীয় শতাব্দী (খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দী) থেকেই এবং তা ঘটে একদল প্রতিভাবান মুসলিম বিজ্ঞানীর হাতে। শ্রেষ্ঠ মুসলিম বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মগুলো পর্যালোচনা করলে সহজেই আমরা যন্ত্রপ্রকৌশলের বিকাশের ধাপগুলো জানতে পারি। কারণ তারাই ছিলেন যন্ত্রপ্রকৌশলের ময়দানে ইসলামি প্রযুক্তিবিদ্যার পথিকৃৎ।
১. মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা (বানু মুসা ইবনে শাকির)
তারা ছিলেন তিন ভাই। বড় ভাইয়ের নাম মুহাম্মাদ (মৃ. ২৫৯ হি./৮৭৩ খ্রি.)। তিনি ছিলেন জ্যোতির্বিদ, প্রকৌশলী, ভূগোলবিদ ও শারীরবৃত্তবিদ। দ্বিতীয় ভাই আহমাদ ছিলেন যন্ত্রপ্রকৌশলী। তৃতীয় ভাই হাসান (মৃ. ২৬১ হি./৮৭৪ খ্রি.) ছিলেন প্রকৌশলী ও ভূগোলবিদ। হিজরি তৃতীয় শতকে (খ্রিষ্টীয় নবম শতকে) তাদের জীবৎকাল অতিবাহিত করেছেন। গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রায়োগিক বিজ্ঞান ও যন্ত্রপ্রকৌশলে তারা ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। 'হিয়ালু বানি মুসা' (Book of Ingenious Devices) গ্রন্থটির জন্য তারা সমধিক খ্যাতি লাভ করেন। এটি যন্ত্রবিজ্ঞানের একটি প্রধান ও মূল্যবান গ্রন্থ। ইবনে খাল্লিকান এই গ্রন্থ সম্পর্কে বলেছেন, কৌশলবিদ্যায় তাদের একটি বিস্ময়কর দুর্লভ গ্রন্থ রয়েছে। এতে সব ধরনের বিস্ময়কর কৌশলের বর্ণনা রয়েছে। আমি এই গ্রন্থের সন্ধান পেয়েছি এবং দেখেছি যে এটি একটি সমৃদ্ধ ও উৎকৃষ্ট গ্রন্থ।(৫৭৯)
বানু মুসার 'কিতাবুল হিয়াল'-এ একশ যন্ত্র-স্থাপন (mechanical installation) কৌশল রয়েছে। প্রতিটির সঙ্গে বিস্তারিত বিশ্লেষণ রয়েছে এবং ব্যাখ্যামূলক চিত্রও রয়েছে। চিত্রগুলোতে যন্ত্র-স্থাপন ও যন্ত্রটি চালানোর পদ্ধতি দেখানো হয়েছে। বানু মুসার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার চিন্তাভাবনা ও কলাকৌশলের মধ্যে ছিল একাধিক ধরনের স্বয়ংক্রিয় কপাটিকা (ভাল্ভ), নির্দিষ্ট সময়ের পর সক্রিয় হয়ে ওঠা যন্ত্রব্যবস্থা এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি। সাধারণভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তা ছাড়া তারা উদ্ভাবন করেছিলেন মোচাকার কপাটিকা (কনিক্যাল ভাল্ভ), রোধনী কপাটিকা (প্লাগ ভাল্ভ), স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যক্ষম ক্র্যাংক-দণ্ড(৫৮০) ইত্যাদি। এসব আবিষ্কার ছিল নজিরবিহীন। ইউরোপে যে আধুনিক ক্র্যাংক চালু আছে, পাঁচশ বছর আগেই তার প্রথম যান্ত্রিক বিশ্লেষণ প্রদান করেছিলেন মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা।(৫৮১)
বানু মুসার কয়েকটি যান্ত্রিক কাঠামোর উদাহরণ :
১.০ হারিকেন বাতি (Hurricane lamp) : প্রচণ্ড ঝড়ের মধ্যে রেখে দিলেও এই বাতির আলো নেভে না।
২• স্ব-সজ্জিত বাতি (Self-trimming lamp): নিজেই সলতে বের করে নেয় এবং নিজেই তেল টেনে নেয়। কেউ দেখলে মনে করে যে, আগুন কোনো তেল পোড়াচ্ছে না এবং বাতিটির মূলত কোনো সলতেই নেই।
৩. ফোয়ারা: এ ফোয়ারা থেকে কিছু সময় বর্শার মতো পানি বেরোয় এবং অনুরূপ সময় আইরিস ফুলের মতো পানি বেরোয়। এভাবে অনবরত চলতেই থাকে।
তাদের যান্ত্রিক আবিষ্কারগুলোর যেটি সবচেয়ে বিস্ময়কর সেটি হলো নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের জন্য বিশাল আকারের একটি যন্ত্র। যন্ত্রটি তারা তাদের মানমন্দিরে স্থাপন করেছিলেন। ইতিহাসবিদগণ এই যন্ত্র সম্পর্কে অপার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। জলপ্রবাহের শক্তি প্রয়োগ করে এটিকে ঘোরানো হতো। যন্ত্রটি আকাশের নক্ষত্ররাজির খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ করত এবং এক বৃহদাকার আয়নায় তা প্রতিফলিত করত। আকাশে কোনো তারা ভেসে উঠলেই তা এই যন্ত্রে ধরা পড়ত এবং কোনো তারা বা উল্কা ডুবে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে তা ধরা পড়ত। এগুলোর রেকর্ডও লিখে রাখা হতো।(৫৮২)
মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা কৃষিকাজের জন্যও যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করেন। যেমন নির্দিষ্ট আকারের প্রাণীদের জন্য বিশেষ খাদ্যপাত্র তৈরি করেন, প্রাণীরা এসব পাত্র থেকে অন্যদের সঙ্গে ঠেলাঠেলি না করে সহজেই নিজেদের খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করতে পারত। কৃষিজমিতে স্থাপন করার জন্য যন্ত্র আবিষ্কার করেন, এসব যন্ত্র স্থাপন করা হলে কৃষিজমির পানি নষ্ট হয় না। তা ছাড়া এসব যন্ত্রের দ্বারা জমিতে জলসেচ-ব্যবস্থাও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তারা গোসলখানার জন্য ট্যাংকও তৈরি করেন। তরলের ঘনত্ব পরিমাপের জন্য যন্ত্র আবিষ্কার করেন। তাদের এসব সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী চিন্তা প্রযুক্তির (উপকারী কৌশলের) বা যন্ত্রপ্রকৌশলের উন্নতি ও অগ্রগামিতায় বড় ভূমিকা পালন করেছে। কারণ উর্বরতা-সমৃদ্ধ চিন্তাভাবনা, সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যায়ন ও প্রাগ্রসর পরীক্ষামূলক পদ্ধতির কারণে তাদের প্রদত্ত ডিজাইন ও নকশাগুলো ছিল অনন্য ও অসাধারণ।(৫৮৩)
২. বদিউযযামান আল-জাযারি(৫৮৪)
উপকারী কৌশল-প্রযুক্তির ময়দানে মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে রয়েছে যান্ত্রিক ঘড়ি ও উত্তোলন-যন্ত্রের বিভিন্ন প্রকারের নকশা। দাঁতযুক্ত গিয়ারের ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থার সাহায্যে রৈখিক গতিকে বৃত্তাকার গতিতে রূপান্তর করার প্রক্রিয়াও এগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই যাবতীয় আধুনিক ইঞ্জিন তৈরি করা হয়েছে। এই বিষয়ে মৌলিক পথিকৃৎ গ্রন্থ হলো 'আল-জামিউ বাইনাল ইলমি ওয়াল-আমলিন নাফি ফি সানাআতিল হিয়লি'(৫৮৫)। এটি রচনা করেছেন বদিউযযামান আবুল ইয্য ইবনে ইসমাইল ইবনে রাযযায আল-জাযারি। ডোনাল্ড আর. হিল গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন। অনূদিত গ্রন্থটি The Book of Knowledge of Ingenious Mechanical Devices নামে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের হিজরা কাউন্সিল প্রকাশনাসংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়। সমকালীন বৈজ্ঞানিক ইতিহাসবিদ জর্জ সার্টন মন্তব্য করেছেন যে, আল-জাযারির এই গ্রন্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সবচেয়ে স্পষ্টভাষ্য ও ব্যাখ্যামূলক। মুসলিমদের প্রযুক্তিগত অর্জন ও অবদানের ক্ষেত্রে এটি শীর্ষস্থান দখল করে আছে বলে বিবেচনা করা যেতে পারে।(০৮৬)
আল-জাযারির গ্রন্থে কয়েকটি অধ্যায় রয়েছে। সবচেয়ে দীর্ঘ অধ্যায় হলো জলঘড়ি-সম্পর্কিত। আরেকটি অধ্যায়ে পানি উত্তোলন-যন্ত্র সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। পানি উত্তোলক যন্ত্র-সম্পর্কিত অধ্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। এতে রয়েছে পাম্পের নকশা সম্পর্কে সচিত্র বিস্তারিত বর্ণনা। আধুনিক বৈজ্ঞানিক ইতিহাসবিদগণ একে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের অধিকতর কাছাকাছি বলে বিবেচনা করেছেন। এই পাম্পে যুক্ত রয়েছে মুখোমুখি দুটি পাইপ, পাইপ দুটির প্রত্যেকটিতে রয়েছে একটি বাহু, বাহুতে রয়েছে সিলিন্ডার আকৃতির পিস্টন (চাপদণ্ড)। পাইপ দুটির একটি চাপ বা সংকোচনের অবস্থায় থাকলে অপরটি থাকে টান বা চোষণের অবস্থায়। এই বিপরীতমুখী শক্তিকে সুরক্ষিত করার জন্য রয়েছে দাঁতযুক্ত বৃত্তাকার চাকতি, চাকতিকে কেন্দ্র থেকে দূরে যুক্ত রয়েছে পাইপ দুটির বাহু দুটি। এই চাকতিকে ঘোরানো হয় কেন্দ্রীয় ঘূর্ণনদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত গিয়ারের সাহায্যে। প্রত্যেক পাম্পে রয়েছে তিনটি ভাল্ভ (কপাটিকা), এগুলোর সাহায্যে জল একমুখী হয়ে নিচ থেকে উপরের দিকে ওঠে এবং বিপরীত দিকে (নিচের দিকে) ফিরে আসতে পারে না।(৫৮৭)
আল-জাযারি কর্তৃক উদ্ভাবিত এই পাম্প ধাতুর তৈরি একটি যন্ত্র, যা বায়ুশক্তির সাহায্যে বা চক্রাকারে ঘূর্ণায়মান প্রাণীর সাহায্যে ঘোরে। এই পাম্প নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল গভীর কূপ থেকে পানি ভূপৃষ্ঠে উত্তোলন করা। নদীর পানি নিচে নেমে গেলে (বা নদীর জলস্তর নিচু হলে) তা থেকে উঁচু ভূমিতে পানি ওঠানোর কাজেও এই পাম্প ব্যবহৃত হতো। যেমন মিশরের জাবাল আল-মুকাত্তাম (মুকাত্তাম) পাহাড়ে পানি ওঠানো হতো। সংশ্লিষ্ট বরাতগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই প্রযুক্তি প্রায় দশ মিটার পর্যন্ত পানি উত্তোলন করতে পারত। পাম্পকে সরাসরি জলস্তরের ওপর বসিয়ে দিয়েও পানি ওঠানো হতো, তখন পাম্পের সঙ্গে যুক্ত চোষক দণ্ডটি পানিতে নিমজ্জিত থাকত।(৫৮৮)
৩. তাকিউদ্দিন আদ-দিমাশকি
তাকিউদ্দিন ইবনে মারুফ আর-রাসিদ আদ-দিমাশকি আশ-শামি-যিনি হিজরি দশম শতাব্দীতে (খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে) তার জীবৎকাল অতিবাহিত করেছেন-ইসলামি প্রযুক্তির অহংকার হিসেবে বিবেচিত। তিনি 'আত-তুরুকুস-সানিয়্যাতু ফিল-আলাতির রুহানিয়্যাহ' গ্রন্থটির রচয়িতা। এই গ্রন্থে বেশ কিছু যান্ত্রিক কলের (মেকানিক্যাল ডিভাইস) বর্ণনা রয়েছে। যেমন জলঘড়ি, যান্ত্রিক ঘড়ি, বালুঘড়ি, কপিকল ও গিয়ারের সাহায্যে উত্তোলন-যন্ত্র, জলফোয়ারা, বাষ্পীয় টারবাইনের সাহায্যে ঘূর্ণনযন্ত্র যা বর্তমানেও আমাদের কাছে পরিচিত।(৫৮৯)
তাকিউদ্দিন আদ-দিমাশকির এই গ্রন্থ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ তা ইসলামি যুগে যন্ত্রপ্রকৌশল ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের পূর্ণতা দিয়েছে। তিনি বহু যন্ত্রের বৈশিষ্ট্য ও কার্যপদ্ধতি বর্ণনা করেছেন, যেগুলোর উল্লেখ পূর্ববর্তীদের কোনো কিতাবে নেই। এমনকি তখনও ইউরোপের রেনেসাঁসকালের বিখ্যাত রেফারেন্সগ্রন্থগুলোতেও এসব যন্ত্রের কোনো বর্ণনা পাওয়া যায়নি। তাকিউদ্দিনের এ গ্রন্থটি ছিল অনন্য ও অদ্বিতীয়। কারণ এটি যন্ত্রপাতির উপস্থাপনায়, বৈশিষ্ট্যায়ন ও বর্ণনায় ছিল প্রজেকশনযুক্ত আধুনিক প্রকৌশলীয় অঙ্কনের (engineering drawing) যে ধারণা (কনসেপ্ট) তার অধিকতর নিকটবর্তী। কিন্তু তিনি যন্ত্র-সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিষয়কে স্পষ্ট করেছেন একই ধরনের অঙ্কনে, যেখানে প্রজেকশন- ধারণা ও অঙ্কন-ধারণার সম্মিলন ঘটেছে। অর্থাৎ, তা হলো ঘনদর্শন অঙ্কনকৌশল (stereoscopic perspective)। এ কারণে বিশেষজ্ঞদের টেক্সট পাঠ ও অঙ্কন বোঝার জন্য গভীর অধ্যয়ন প্রয়োজন, যাতে তারা মানসপটে যে চিত্র ফুটিয়ে তুলছেন তা যথার্থ হয়।
তাকিউদ্দিন তার গ্রন্থে একাধিক জল উত্তোলন-যন্ত্রের বর্ণনা দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ছয় সিলিন্ডারযুক্ত পাম্প। এতে তিনি প্রথমবারের মতো একই সারিতে ছয়টি সিলিন্ডার স্থাপনের জন্য সিলিন্ডার-ব্লক ব্যবহার করেছেন, একের পর এক বৃত্তাকারে সজ্জিত ছয়টি উদ্ভেদ (protrusion)-যুক্ত ক্যামশাফ্ট(৫৯০) ব্যবহার করেছেন, ফলে সিলিন্ডারগুলো (ক্যামশাফ্টের ক্যামের পৃষ্ঠদেশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়ে) পর্যায়ক্রমে কাজ করতে থাকে এবং একটি শৃঙ্খলিত ব্যবস্থায় জলের প্রবাহ অব্যাহত থাকে। তাকিউদ্দিন পরামর্শ দিয়েছেন যে, সিলিন্ডারের সংখ্যা তিনটির কম হবে না, যাতে পানির উত্তোলন বিরতিহীনভাবে কোনো বিঘ্ন ছাড়াই চলতে থাকে। এখানে বিচ্ছিন্নতা ও কোনোরকম বাধাবিঘ্নতা এড়িয়ে চলার যে প্রাগ্রসর ধারণা (কনসেপ্ট) তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক গতিশীল সুস্থিতি (Dynamic equilibrium)-এর ধারণা। এই মূলনীতির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক মাল্টি-সিলিন্ডার ইঞ্জিন ও কমপ্রেসরের প্রযুক্তি।
তাকিউদ্দিন ছয় সিলিন্ডারযুক্ত পিস্টন পাম্পের যে নকশা অঙ্কন করেছেন তাতে আমরা দেখতে পাই যে, তিনি প্রতিটি পিস্টনদণ্ডের মাথায় নির্দিষ্ট ওজনের সিসা বসিয়ে দিয়েছেন, যাতে পিস্টনের ওজন ঊর্ধ্বমুখী টিউবের মধ্যে স্থাপিত জলদণ্ডের ওজনের চেয়ে বেশি হয়। এই নকশা প্রস্তুতের মধ্য দিয়ে তাকিউদ্দিন স্যামুয়েল মোরউন্ডের পথিকৃৎ হয়ে রয়েছেন। মোরল্যান্ড ১৬৭৫ সালে প্লাঞ্জারের পাম্পের (Plunger pump) যে নকশা তৈরি করেন তাতে প্লাঞ্জারের ওপর সিসানির্মিত কয়েকটি চাকতি বসিয়ে দেন, তাই প্লাঞ্জারটি জলে নিমজ্জনের অবস্থায় ফিরে যায় এবং সিসার প্রভাবে কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা পর্যন্ত পানি ঠেলে দেয়।(৫৯১)
এভাবেই প্রযুক্তির পশ্চিমা ঐতিহাসিকদের দাবি বাতিল হয়ে যায়। তাদের দাবি এই যে, যন্ত্রপ্রকৌশলের ময়দানে ইসলামি প্রযুক্তির স্বভাব হলো মজা করা, বিনোদন ও খেলাধুলা এবং অলস সময় কাটানো। এসব ঐতিহাসিক তাদের বক্তব্যে মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রতি ইনসাফ ও সুবিচার করেননি। তাদের দাবির অসারতা প্রমাণে ওয়াটার হুইলের সেসব সাক্ষ্যই যথেষ্ট যেগুলো আটার কল ও আখ-মাড়াই যন্ত্র ঘোরাতে, শস্য মাড়াই করতে এবং জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য জল উত্তোলনে ব্যবহৃত হতো। ব্যাপক আকারে জলশক্তি ও বায়ুশক্তিও ব্যবহৃত হতো। বাস্তব জীবনের সব ক্ষেত্রেই তাত্ত্বিক বিজ্ঞান ও তার প্রযুক্তিগত প্রয়োগের মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। পৌর নকশা প্রণয়ন, জলসেচ-ব্যবস্থা, বাঁধ নির্মাণ, ভবন-স্থাপনা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত বিষয় ছিল বাস্তবিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ইসলামি সভ্যতার যুগে প্রকৌশলীরা ও যন্ত্রকারিগরেরা তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। জটিল ক্ষেত্রে তারা প্রথমে পরিকল্পনা তৈরি করতেন, তারপর তারা বাস্তবে যা করতে যাচ্ছেন তার ছোট একটি নমুনা প্রস্তুত করতেন। তারপর অধুনা যন্ত্রকারিগরেরা পূর্ববর্তী মুসলিম প্রযুক্তিবিদেরা তাদের রচনাবলিতে যে ব্যাখ্যা ও বিবরণ রেখে গেছেন সে অনুযায়ী সংযোজনদি ও যন্ত্রপাতি পুনর্নির্মাণ করতেন।(৫৯২)
টিকাঃ
৫৭৪. বায়ুগতিবিদ্যা (Aerodynamics): এটি বায়ুবলবিদ্যার একটি শাখা। এই শাস্ত্র বাতাস ও অন্যান্য বায়বীয় পদার্থ গতিশীল অবস্থায় যেসব ধর্ম ও বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে এবং বল প্রয়োগ করে তা নিয়ে আলোচনা করে। যদি কোনো বস্তু বাতাস বা কোনো গ্যাসে নিমজ্জিত অবস্থায় গতিশীল হয় বা এদের মধ্যে কোনো আপেক্ষিক বেগ থাকে তবে তাও এই শাস্ত্রে আলোচনা করা হয়। বায়ুগতিবিদ্যার বিভিন্ন শাখা রয়েছে।
৫৭৫. জলগতিবিদ্যা (Hydrodynamics): তরল পদার্থের গতিবিজ্ঞান। কেবল আপেক্ষিকভাবে বর্ণনাযোগ্য অনবচ্ছিন্ন বলবিজ্ঞানের একটি শাখা যেখানে অসংনম্য (incompressible) তরলের গতিসূত্রগুলো এবং সীমানার সঙ্গে তরলের মিথস্ক্রিয়া আলোচিত হয়।- অনুবাদক
৫৭৬. জলস্থিতিবিদ্যা (Hydrostatics): স্থিতাবস্থায় তরলের আলোচনা। গতি অনুপস্থিতির তির্যক পীড়ন থাকে না, যেকোনো বিন্দুতে পীড়নের অভ্যন্তরীণ অবস্থা নির্ধারিত হয় শুধু চাপের দ্বারাই। সুতরাং কোনো বিন্দুতে চাপের পরিমাণ সব দিকেই সমান থাকে। সব সীমাপৃষ্ঠের ওপর সচরাচর চাপ কাজ করে। অভিকর্ষের আওতায় সুস্থিতির জন্য যেকোনো আনুভূমিক প্রস্থচ্ছেদের ওপর চাপ সমান হয়, এতে (তরল) ধারণকারী পাত্রের আকার কোনো গুরুত্ব বহন করে না। উচ্চতা বা গভীরতা অনুযায়ী চাপের তারতম্য হয়।-অনুবাদক
৫৭৭. কপাটিকা (Valve): একটি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র। নালি ব্যবস্থায় এবং যন্ত্রপাতির মধ্যে প্রবাহের ধারা নিয়ন্ত্রণ করার যন্ত্র কপাটিকা ব্যবহার করা হয়। যন্ত্রপাতিতে প্রবাহী-প্রতিষঙ্গ অনেক সময় ঝলকিত অথবা সবিরাম প্রকৃতির এবং সংশ্লিষ্ট গিয়ারসহ কপাটিকা একটা সময় নির্বাচনী বৈশিষ্ট্য প্রদান করে।-অনুবাদক
৫৭৮. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ২৯-৩০।
৫৭৯. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১৬১।
৫৮০. ক্র্যাংক বা ঘোড়া (Crank): এটি এমন একটি যান্ত্রিক সংযোগ যা নির্দিষ্ট অক্ষের চারদিকে ঘুরতে পারে। ক্র্যাংকের ঘূর্ণনের কেন্দ্রে থাকে তার পিভট (pivot)। এই পিভট হচ্ছে ক্র্যাংকের দণ্ড (Crankshaft)। এই দণ্ড ক্র্যাংকটিকে নিকটস্থ সংযোগস্থলের সঙ্গে যুক্ত করে।- অনুবাদক
৫৮১. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৩০।
৫৮২. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ১১৮-১১৯।
৫৮৩. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৩০-৩১।
৫৮৪. বদিউযযামান আল-জাযারি: বদিউযযামান আবুল ইয্য ইবনে ইসমাইল ইবনে রাযযায আল-জাযারি (৫৩০-৬০২ হি./১১৩৬-১২০৬ খ্রি.)। উদ্ভাবক, যন্ত্রপ্রকৌশলী, পণ্ডিত ও আর্টিস্ট। তিনি পানি উত্তোলন-যন্ত্র, জলঘড়ি, হস্তীঘড়ি, ফ্ল্যাশ টয়লেট ইত্যাদিসহ প্রায় একশ যন্ত্রের উদ্ভাবক। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ১৫।
৫৮৫. গ্রন্থটি كتاب في معرفة الحيل الهندسية নামেও পরিচিত।-অনুবাদক
৫৮৬. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৩১।
৫৮৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৫।
৫৮৮. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৩৩।
৫৮৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৬।
৫৯০. ক্যাম ব্যবস্থা (cam mechanism): একটা যান্ত্রিক সংযোগ যার কাজ হচ্ছে কোনো পূর্বনির্দিষ্ট পথে এই সংযোগের বহির্মুখী বা ফলদায়ক অংশকে (আউটপুট লিংক) পরিচালিত করা। ফলদায়ক অংশকে বলে ফলোয়ার। বিভিন্ন ইঞ্জিনে এর ব্যবহার দেখা যায়। যেখানে ক্যাম তার ক্যামশাফ্টসহ বৃত্তাকৃতির গতি বা চক্রগতিতে ঘুরতে থাকে। অপরদিকে ফলোয়ার এই ক্যামের পৃষ্ঠদেশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়ে উপর-নিচ করতে থাকে। ক্যামশাফ্টকে বাংলায় 'দন্তক ঈষা' বা দাঁতযুক্ত দণ্ড বলা যায়। ক্যাম মানে দাঁত, শাফ্ট মানে দণ্ড।-অনুবাদক
৫৯১. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৩৬।
৫৯২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯।