📄 রসায়নশাস্ত্র
রসায়নশাস্ত্র ইসলামি সভ্যতার পূর্বে সস্তা ধাতুকে সোনা ও রুপায় রূপান্তরের ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু ছিল না। এই শাস্ত্রের নির্ভরশীলতা ছিল বুদ্ধি ও যৌক্তিক দলিল-প্রমাণের ওপর, তা পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ধারেকাছেও যায়নি।
মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত রসায়নশাস্ত্রে এ অবস্থাই বিরাজ করছিল। মুসলিম বিজ্ঞানীরা যথাযথ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত করেন এবং বিজ্ঞানের এই শাখায় নির্ভেজাল সত্যে উপনীত হতে নির্ভর করেন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা ও অভিজ্ঞতার ওপর, এগুলোর সঙ্গে বুদ্ধি ও উপলব্ধিকেও যুক্ত করেন। ফলে রসায়নশাস্ত্র-সংশ্লিষ্ট কতিপয় মূলনীতি ও নিয়মের উদ্ভব হয়। জাবির ইবনে হাইয়ান হলেন প্রথম বিজ্ঞানী, যিনি এই বিশাল শাস্ত্রের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এমনকি ইউরোপে রসায়নশাস্ত্র কয়েক শতাব্দীব্যাপী 'জাবিরের সৃষ্টিকর্ম' হিসেবে পরিচিত ছিল।
জাবির ইবনে হাইয়ানই অভিজ্ঞতাকে বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি বলে স্থির করেছেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষামূলক অভিজ্ঞতাকে বিজ্ঞানের গবেষণাপদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত করেছেন, এরূপ গবেষণাপদ্ধতির নীতিমালা প্রতিষ্ঠা করেছেন। আপনি দেখবেন যে, তিনি পরীক্ষানিরীক্ষা (এক্সপেরিমেন্ট) ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানাচ্ছেন, কারণ এ দুটির ওপরই পরীক্ষামূলক পদ্ধতিটি দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলছেন, প্রয়োগ ও অভিজ্ঞতাই এই শাস্ত্রের কাঠামোয় পূর্ণতা দেয়। কেউ প্রয়োগ ও পরীক্ষা না করলে কিছুই অর্জন করতে পারবে না।(৪৮১)
উইল ডুরান্ট বলছেন, বলা যায় মুসলিমরাই পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক শাস্ত্র হিসেবে রসায়নশাস্ত্রের উদ্ভব ঘটিয়েছেন। কারণ, মুসলিমরাই রসায়নশাস্ত্রীয় গবেষণায় সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা ও তার ফলাফল নির্ধারণে যত্নবান হওয়া ইত্যাদি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অথচ এই ময়দানে গ্রিকরা-আমরা যতদূর জানি-কারিগরি মূল্যায়ন ও দুর্বোধ্য অনুমানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। মুসলিমরা আলেমবিক(৪৮২) আবিষ্কার করেছেন এবং একে এই নাম দিয়েছেন। অসংখ্য বস্তু ও ধাতুর রাসায়নিক বিশ্লেষণ প্রস্তুত করেছেন। ক্ষার ও এসিডের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেছেন। যেসব পদার্থ ক্ষার বা এসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে সেগুলোর পরীক্ষা করেছেন। শত শত ওষুধ নিয়ে গবেষণা করেছেন, শত শত ওষুধের প্রস্তুতপ্রণালি তৈরি করেছেন। মুসলিমরা সাধারণ ধাতুকে সোনায় রূপান্তরিত করার যে জ্ঞান তা পেয়েছিলেন মিশর থেকে। এই জ্ঞানই তাদেরকে সত্যিকার রসায়নবিদ্যায় উপনীত করেছে। শত শত আবিষ্কার, যা তারা যুগপৎভাবে বিশ্লেষণ করেছেন এবং রসায়নবিদ্যা নিয়ে কর্মকাণ্ডে তারা যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তা-ই তাদেরকে এই পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। মধ্যযুগে তাদের অবলম্বিত পন্থা ও পদ্ধতিগুলোই সঠিক বৈজ্ঞানিক উপায় হিসেবে সবচেয়ে বেশি উপযোগী ছিল।(৪৮৩)
রসায়নশাস্ত্রের উদ্ভবের পর খালিদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়া নামের একজন তরুণ বিজ্ঞানীর আবির্ভাব ঘটেছে এবং তিনি যেসব প্রতীকের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন তা তার কাছ থেকে কীভাবে শিখেছেন তার বর্ণনা দিয়েছেন।(৪৮৪)
তর্কাতীতভাবেই জাবির ইবনে হাইয়ান হলেন রসায়নশাস্ত্রের জনক এবং এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী। তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং সেগুলোর মধ্যে অধিকাংশই লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। প্রায় হাজার বছর ধরে তার গ্রন্থাবলিই ছিল রসায়নবিদ্যার বিশ্বস্ত উৎস। এসব গ্রন্থে অসংখ্য রাসায়নিক যৌগের(৪৮৫) পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে যা তার আগে কেউ জানত না। এ বৈশিষ্ট্যই তার রচনাবলিকে পাশ্চাত্যের বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের পাঠ্যবিষয়ে পরিণত করেছে। যেমন জোহান বার্থোলোমিউ(৪৮৬), লরেন্স এম. ক্রাউস(৪৮৭), এরিক জন হোলমেয়ার্ড। হোলমেয়ার্ড জাবির ইবনে হাইয়ানের প্রতি ইনসাফপূর্ণ মন্তব্য করেছেন, তাকে শীর্ষস্থানে আসীন করেছেন এবং মতলববাজ সুবিধাবাদী বিজ্ঞানীরা তাকে ঘিরে সন্দেহের যে দেয়াল তৈরি করেছিল তা তিনি গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। জর্জ সার্টন মন্তব্য করেছেন যে, জাবির ইবনে হাইয়ান ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে একটি দীর্ঘ সময় দখল করে আছেন।
আবু বকর আল-রাজি (মৃ. ৩১১-৯২৩ হি.) জাবির ইবনে হাইয়ানের গ্রন্থাবলি থেকে পাঠগ্রহণ করেছেন, রসায়নশাস্ত্রের ভিত্তি মজবুত করেছেন এবং এই শাস্ত্রের বিকাশে বড় অবদান রেখেছেন। তিনি তার 'কিতাবুল আসরার'-এর ভূমিকায় এসব কথা লিখেছেন। তিনি বলেছেন, আমি এই গ্রন্থে পূর্ববর্তী দার্শনিকরা যা লিখেছেন তা ব্যাখ্যা করেছি। যেমন আগাথা ডিমুস(৪৮৮), হারমেস(৪৮৯), অ্যারিস্টটল, খালিদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়া এবং আমাদের গুরু জাবির ইবনে হাইয়ান। বরং তাতে এমন কিছু অধ্যায় রয়েছে যার কোনো দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি। আমার এই গ্রন্থ তিনটি বিষয়ের জ্ঞানভান্ডারকে অন্তর্ভুক্ত করেছে: ওষুধ-সম্পর্কিত জ্ঞান, যন্ত্র-সম্পর্কিত জ্ঞান, পরীক্ষানিরীক্ষার জ্ঞান।(৪৯০)
সাধারণভাবে বলতে গেলে, মুসলিম বিজ্ঞানীরা রসায়নের বহু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও সেগুলোর রহস্য উন্মোচন করেছেন। তাদের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে নাইট্রিক এসিড, সালফিউরিক এসিড, নাইট্রোহাইড্রোক্লরিক এসিড, সিলভার নাইট্রেট, মার্কারি ক্লোরাইড(৪৯১), মার্কারি অক্সাইড(৪৯২), পটাশিয়াম কার্বনেট, সোডিয়াম কার্বনেট, আয়রন সালফাইড। তারা আরও আবিষ্কার করেন অ্যালকোহল, পটাশ, অ্যামোনিয়া বা এজেন, আর্সেনিক, অ্যান্টিমনি, ক্ষার। قلو (ক্ষার) শব্দটি তার আরবি নাম (Alkaki) নিয়েই ইউরোপীয় ভাষাগুলোতে প্রবেশ করেছে।(৪৯৩)
তারা রসায়নবিদ্যাকে চিকিৎসা ও ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগিয়েছেন। তারাই প্রথম ওষুধ প্রস্তুতপ্রণালি, ধাতুনির্মিত বস্তুর প্রস্তুতপ্রণালি, ধাতু পরিষ্কারকরণপদ্ধতি এবং অন্যান্য যৌগ বস্তু ও আবিষ্কারসমূহের কৌশল প্রকাশ করেছেন। যার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক বহু জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন সাবান, কাগজ, সিল্ক, রঞ্জক পদার্থ (রং), বিস্ফোরক দ্রব্যাদি, চামড়া পাকাকরণ, সুগন্ধি তৈরি, স্টিল তৈরি, ধাতু পলিশ এবং অন্যান্য আবিষ্কার। মুসলিম বিজ্ঞানীরা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষায় বেশ কিছু রাসায়নিক যন্ত্র ও উপকরণের ওপর নির্ভর করেছেন। যেমন ধাতু গলানোর পাত্র, চোলাইযন্ত্র, অতি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্ম স্কেল। তারা ধাতুসমূহ ও সেগুলোর ভরের অনুপাত নির্ণয় করতেন।(৪৯৪)
টিকাঃ
৪৮১. জাবির ইবনে হাইয়ান, কিতাবুত তাজরিদ, এরিক জন হোলমেয়ার্ড কর্তৃক সম্পাদিত مصنفات في علم الكيمياء للحكيم جابر بن حيام الصوفي সংকলনগ্রন্থের অন্তর্গত। প্রকাশক, P. Geuthner, ১৯২৮ খ্রি., প্যারিস।
৪৮২. আলকেমিস্টদের চোলাইযন্ত্র। এতে একটি নল দিয়ে দুটি পাত্র যুক্ত থাকে।
৪৮৩. উইল ডুরান্ট, স্টোরি অব সিভিলাইজেশন, খ. ১৩, পৃ. ১৮৭।
৪৮৪. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আয়ান, খ. ২, পৃ. ২২৪; মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ১৬।
৪৮৫. রাসায়নিক যৌগ হলো একপ্রকারের পদার্থ যা দুই বা ততোধিক ভিন্ন মৌলিক উপাদানের মধ্যে রাসায়নিক বন্ধনের মাধ্যমে গঠিত হয়। মৌলিক উপাদানগুলো নির্দিষ্ট ভরের অনুপাতে যুক্ত হয়ে রাসায়নিক যৌগ গঠন করে এবং যৌগ ভাঙলে এর মৌলিক উপাদানগুলো পাওয়া যায়。
৪৮৬. Johann Bartholomew.
৪৮৭. Lawrence M. Krauss.
৪৮৮. Agatha Demus.
৪৮৯. Hermes Trismegistus.
৪৯০. আলি আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িয়িল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২৭৭ থেকে উদ্ধৃতি।
৪৯১. Mercury (II) chloride or mercuric chloride
৪৯২. Mercury (II) oxide or mercuric oxide
৪৯৩. ডোনাল্ড আর. হিল, Islamic Science and Engineering, আরবি অনুবাদ, العلوم والهندسة في الحضارة الإسلامية, অনুবাদক, আহমাদ ফুয়াদ পাশা, পৃ. ১২০-১২৬।
৪৯৪. মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ১৫৯।
📄 ঔষধবিজ্ঞান
মুসলিমদের পক্ষে রসায়নবিজ্ঞান-সম্পর্কিত জ্ঞানশাখাগুলোতে, বিশেষ করে ওষুধবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল, কারণ তারা রসায়নবিজ্ঞানে যথেষ্ট উন্নতি সাধন করেছিলেন। যেহেতু ওষুধের জন্য প্রয়োজন রাসায়নিক নিয়মকানুন ও সমীকরণ জানা এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রয়োগ করে তার ফলাফল নিশ্চিত করা। ফলে কার্যকরী অর্থেই রাসায়নিক ওষুধের বিস্তার ঘটেছিল এবং চিকিৎসাশাস্ত্রের সামনে এক নতুন যুগের দরজাসমূহ উন্মোচিত হয়েছিল।
বাস্তবতা এই যে, ওষুধবিজ্ঞান দারুণভাবে মুসলিম বিজ্ঞানীদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। তাদের যুগেই ওষুধপ্রস্তুতপ্রণালি বৈজ্ঞানিক ও কার্যকরীরূপে এবং নতুন পন্থায় বিকশিত হয়েছিল। এই অনন্য বৈশিষ্ট্য তাদের সভ্যতাকালকে দিয়েছিল ভিন্ন মর্যাদা। এ ব্যাপারে গুস্তাভ লি বোঁ যা বলেছেন তা উল্লেখযোগ্য, আমরা কোনোরকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই মুসলিম বিজ্ঞানীদের ওষুধবিজ্ঞানের প্রবর্তক বলে আখ্যায়িত করতে পারি। আমরা বলি যে, এটি একটি মৌলিক আরবি (ইসলামি) আবিষ্কার।(৪৯৫) পূর্বে যেসব ওষুধ প্রচলিত ছিল সেগুলোর সঙ্গে তাদের সৃষ্টিলব্ধ নতুন নতুন ওষুধি যৌগ যুক্ত করেছিলেন। তারাই প্রথম ওষুধ নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন।(৪৯৬)
অবশ্য মুসলিমরা শূন্য থেকে শুরু করেননি, তারা শুরুর দিকে গ্রিকদের থেকে এই জ্ঞানের ধারণা গ্রহণ করেছেন। গ্রিক চিকিৎসক Pedanius Dioscorides (৪০-৯০ খ্রিষ্টাব্দ) কর্তৃক রচিত De materia medica (On Medical Material)(৪৯৭) গ্রন্থ থেকে সহায়তা গ্রহণ করেছেন। এই গ্রন্থ المادة الطبية في الحشائش والأدوية المفردة নামে আরবিতে অনূদিত হয়েছে।(৪৯৮) বেশ কয়েকবার এটার অনুবাদ হয়েছে। তার মধ্যে বিখ্যাত দুটি : বাগদাদে হুনাইন ইবনে ইসহাকের অনুবাদ(৪৯৯) এবং কর্ডোভায় আবু আবদুল্লাহ আস-সিকিল্লির অনুবাদ। কিছুকাল পরেই মুসলিম ওষুধবিজ্ঞানীরা তাদের চর্চা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই গ্রন্থে অতিরিক্ত বিষয় যুক্ত করেন এবং Dioscorides যেসব বিষয়ের বর্ণনা দেননি সেগুলোর বর্ণনা দেন। এভাবেই ওষুধবিজ্ঞান ও উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে গ্রন্থ রচনা ও সংকলনের সূচনা ঘটে এবং ব্যাপকতা লাভ করে। আবু হানিফা আদ-দিনাওয়ারি(৫০০) রচনা করেন 'মুজামুন নাবাত', ইবনে ওয়াহশিয়্যাহ(৫০১) রচনা করেন 'আল-ফিলাহাতুন নাবাতিয়্যাহ' এবং ইবনুল আওয়াম আল-ইশবিলি(৫০২) রচনা করেন 'আল-ফিলাহাতুল আন্দালুসিয়্যাহ'। পরবর্তীকালে যারা ওষুধবিজ্ঞান বিষয়ে লিখেছেন তারা এই তিনটি গ্রন্থ ও অনুরূপ অন্যান্য গ্রন্থ থেকে সাহায্য গ্রহণ করেছেন।
ভেষজবিদ্যা যে মুসলিমদের বিদ্যা বলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার পেছনে একটি রহস্য আছে। তা এই যে, আরবরা যে দেশে বাস করত তার প্রকৃতি-পরিবেশ ছিল খেজুরগাছ রোপণের জন্য অত্যন্ত উপযোগী... তা ছাড়া ওই এলাকায় অম্লীয় বৃক্ষ প্রচুর জন্মাত, বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যেত ভেষজ নির্যাস এবং অন্যান্য বস্তু, যা মানুষের উপকার করত এবং ক্ষতিও করত। ফলে তাদের ভূমিতে কী কী বৃক্ষ ও উদ্ভিদ জন্মে তার দিকে আরবদের দৃষ্টি আকর্ষিত হলো। মালাবার, সাইলান ও পূর্ব আফ্রিকার উপকূলীয় এলাকাগুলোয়-যেগুলোর সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল-কী কী উদ্ভিদ উৎপন্ন হয় সেগুলোর দিকেও তাদের নজর গেল। ফলে যেসব উদ্ভিদ ও বৃক্ষলতা চিকিৎসা ও ওষুধ তৈরির জন্য উপযোগী, সেগুলো বাছাই করে সংগ্রহ করা তাদের জন্য আবশ্যক হয়ে গেল।(৫০৩)
এই ধরনের উদ্যোগের প্রতি সাড়া দিয়ে স্থানীয় উদ্ভিদ ও লতাপাতা থেকে কীভাবে সাহায্য নেওয়া যায় তার জন্য প্রচেষ্টা শুরু হলো। শুরুর দিকে বিভিন্ন উদ্ভিদের নাম তালিকা আকারে প্রকাশ করে কোষগ্রন্থজাতীয় গ্রন্থ রচিত হলো। উদ্ভিদগুলোর নাম লেখা হলো আরবি, গ্রিক, সুরয়ানি, ফারসি ও বারবারি ভাষায়। একক (অযৌগ) ওষুধসমূহের ব্যাখ্যা দেওয়া হলো। এ ক্ষেত্রে প্রায়োগিক প্রচেষ্টাও শুরু হলো। রশিদুদ্দিন আস-সুরি(৫০৪) এই উদ্যোগ নিলেন। তিনি উদ্ভিদে পরিপূর্ণ জায়গাগুলোতে যেতেন এবং তার সঙ্গে থাকত একজন চিত্রকর। তিনি উদ্ভিদগুলো পর্যবেক্ষণ করতেন এবং খাতায় তার বিবরণী টুকে নিতেন। রশিদুদ্দিন চিত্রকরকে প্রথমবার দেখাতেন উদ্ভিদের প্রাথমিক অবস্থা, যা মাত্র অঙ্কুরিত হয়েছে; দ্বিতীয়বার দেখাতেন উদ্ভিদের পূর্ণ বিকশিত অবস্থা, যখন ফল বা বীজ বেরিয়েছে এবং তৃতীয়বার দেখাতেন ফলে যাওয়া অবস্থায়। চিত্রকর তিনবারই উদ্ভিদটির ছবি এঁকে নিতেন।(৫০৫)
ভেষজবিদ্যার বিকাশের শুরুর দিকে মুসলিমদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এই যে, তারা এতে জবাবদিহির(৫০৬) নীতি ও ওষুধ তত্ত্বাবধানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেন। পেশাটিকে স্বাধীন ব্যবসা থেকে গুটিয়ে এনে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানের অধীনে ন্যস্ত করেন। ফলে যে-কেউ ওষুধ তৈরি ও বিতরণের পেশায় নিয়োজিত হতে পারত না। এটা খলিফা আল-মামুনের যুগের কথা। তিনি এই আইন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ ওষুধ-ব্যবসার পেশায় কতিপয় অসৎ ও প্রতারক ঢুকে গিয়েছিল। তাদের কেউ কেউ দাবি করত যে তার কাছে সব ধরনের ওষুধ আছে। তারা রোগীদের যেমনটা মিলে সেই ওষুধই গছিয়ে দিত। ওষুধ সম্পর্কে রোগীদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তারা এই কাজটি করত। ভাবত যে, রোগীরা তো আর কোনটা কীসের ওষুধ তা জানে না। এ কারণে খলিফা আল-মামুন ওষুধ-প্রস্তুতকারীদের আমানত ও দক্ষতার পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দেন। আল-মামুনের পর খলিফা আল-মুতাসিম বিল্লাহ (মৃ. ২২৭ হিজরি) যেসব ওষুধ-প্রস্তুতকারী সততা ও দক্ষতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে তাদের সনদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। সনদে উল্লেখ থাকবে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য ওষুধ-ব্যবসা বৈধ। এভাবে ওষুধশিল্প জবাবদিহির সামগ্রিক নীতির আওতায় আসে। রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের (৬০৭-৬৪৮ হি./১২১০-১২৫০ খ্রি.) এই ব্যবস্থা ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। মুহতাসিব(৫০৭) শব্দটি বর্তমান সময়েও আরবি উচ্চারণেই স্প্যানিশ ভাষায় ব্যবহৃত হয়।
সরকার দেশের মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য বিধানের জন্য এই প্রয়োজনীয় শিল্পটির সার্বিক তত্ত্বাবধান করত। ওষুধের বিশুদ্ধতা ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার ব্যাপারে ওষুধপ্রস্তুতকারীদের জবাবদিহি করতে হতো। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, সেনাপতি আল-আফশিন (হায়দার ইবনে কাউস) নিজে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ওষুধপ্রস্তুতকারীদের পরিদর্শনে যেতেন এবং তারা যাবতীয় ভালো উপকরণ দিয়ে ওষুধ তৈরি করছে কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতেন।(৫০৮)
এভাবে মুসলিমরাই প্রথম ওষুধশাস্ত্রকে বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন। হিসবাহ (জবাবদিহি)-ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ওষুধালয় ও ওষুধপ্রস্তুতকারীদের তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করেন।(৫০৯)
ম্যাক্স মেয়েরহফ(৫১০) বলেন, এই যুগে ভেষজবিজ্ঞান নিয়ে কী পরিমাণ পুস্তক-পুস্তিকা রচিত হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। একক বা অবিমিশ্র ওষুধের যেমন পুস্তক রচিত রয়েছে, তেমনই মিশ্র বা যৌগিক ওষুধ নিয়েও পুস্তক রচিত হয়েছে। একক ওষুধ নিয়ে যারা পুস্তক রচনা করেছেন, কোনোরূপ তর্কবিতর্ক ছাড়াই তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলেন ইবনুল বাইতার। তার রচিত গ্রন্থের নাম كتاب الجامع لمفردات الأدوية والأغذية (Compendium on Simple Medicaments and Foods)।(৫১১) তিনি ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় অঞ্চল, স্পেন ও সিরিয়া থেকে উদ্ভিদ সংগ্রহ করতেন এবং সেগুলোর গুণাগুণ পরীক্ষা করতেন। তিনি তার এই গ্রন্থে ১৪০০টি ভেষজ উদ্ভিদ ও ওষুধের বর্ণনা দিয়েছেন। রেফারেন্স হিসেবে ১৫০জন আরব বিজ্ঞানীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। এই গ্রন্থ তার গভীর অধ্যয়ন, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও ব্যাপক জানাশোনার পরিপক্ব ফল। আরবি ভাষায় উদ্ভিদ সম্পর্কে যত গ্রন্থ রচিত হয়েছে এটি তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত।(৫১২)
ওষুধশিল্প বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম ওষুধপ্রস্তুতকারীরা নতুন নতুন ওষুধ উৎপাদনের উর্বর ক্ষেত্র পেয়ে যান। এতে তারা স্থানীয় পরিবেশ থেকেই পরিমিত অনুপাতে বিভিন্ন উপকরণের সাহায্যে যৌগিক ওষুধ প্রস্তুতকরণের ধাপে উপনীত হন। রসায়নশাস্ত্র থেকে উপকার লাভের ফলে নতুন নতুন ওষুধ তৈরিতে তারা একটি বড় ধাপ পেরিয়ে যান। কিছু ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভে এসব ওষুধ ইতিবাচক প্রভাব রাখে। যেমন অ্যালকোহল প্রস্তুতকরণ, মার্কারি বা পারদের যৌগ তৈরি, অ্যামোনিয়া সল্ট, সিরাপ ও ইমালশন(৫১৩) তৈরি এবং ছত্রাকীয় নির্যাস তৈরি। তা ছাড়া ঐকান্তিক গবেষণা তাদেরকে উৎস ও শক্তিমাত্রার ভিত্তিতে ওষুধের শ্রেণিবিন্যাস প্রস্তুত করার পথ দেখিয়ে দেয়। তারা তাদের অভিজ্ঞতার বলে এমন কিছু নতুন ভেষজ ওষুধ বা উদ্ভিদের দেখা পান যা পূর্বে পরিচিত ছিল না। যেমন কপূর (গাছ), হানজাল বা রাখালশসা(৫১৪) এবং হেনা বা মেহেদি।(৫১৫)
ওষুধবিজ্ঞান নিয়ে অসংখ্য বইপত্র রচিত হয়। ধীরস্থির গবেষণার ফলে নতুন নতুন ওষুধ উদ্ভাবিত হতে থাকে। পুরোনো ওষুধ তো আছেই। ওষুধবিজ্ঞানী বা গ্রন্থপ্রণেতাদের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী এসব ওষুধের নামাবলি বিন্যস্ত হয়। এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এর বিস্তারিত দৃষ্টান্ত আমরা যেসব গ্রন্থে পাই সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আল-রাজি কর্তৃক রচিত 'কিতাবুল হাবি', আল-বিরুনি কর্তৃক রচিত 'আস-সাইদালাহ ফিত-তিব্বি', আলি ইবনে আব্বাস কর্তৃক রচিত 'কামিলুস সানাআহ' এবং ইবনে সিনা কর্তৃক রচিত 'কিতাবুল কানুন'।
এই ক্ষেত্রে আল-রাজির রচনাবলি দৃষ্টান্ত হতে পারে। তিনি ওষুধপ্রস্তুতকরণ-সংক্রান্ত কয়েকটি জ্ঞানশাখার ভিত্তি নির্মাণ করে দিয়েছেন। সেগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন, প্রস্তুতকরণের পন্থা ও পদ্ধতি নির্দেশ করেছেন, সেগুলোর রহস্য ও শক্তি উন্মোচন করেছেন। সেগুলোর বিকল্প কী হতে পারে তাও উল্লেখ করেছেন। যে সময়সীমার মধ্যে ওষুধ সংরক্ষণ সম্ভব তা নির্দেশ করেছেন। তিনি ওষুধের উপাদানগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করেছেন: ১. মাটির গর্ভজাত বা খনিজ পদার্থসমূহ ২. উদ্ভিতজাত উপাদান ৩. প্রাণীজাত উপাদান এবং ৪. এগুলো থেকে প্রস্তুতকৃত উপাদান।
মুসলিম ওষুধপ্রস্তুতকারীরা ওষুধ প্রস্তুতকরণের প্রক্রিয়ায় বহু নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি পদ্ধতি এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন ১. আত-তাক্তির বা পাতন, তরল পদার্থ শোধন করার প্রক্রিয়া ২. আল-মালগামাহ বা সংমিশ্রণ, পারদকে অন্যান্য খনিজ পদার্থের সঙ্গে মিশ্রণের প্রক্রিয়া ৩. আত-তাসামি বা ঊর্ধ্বপাতন, কঠিন পদার্থকে তরলে রূপান্তরিত না করেই বাষ্পে পরিণত করা, তারপর সেটাকে কঠিন অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া এবং ৪. আত-তাবালুর বা স্ফটিকীকরণ, দ্রবীভূত পদার্থ থেকে স্ফটিক আলাদা করার প্রক্রিয়া ৫. আত-তাকয়িস বা সাধারণ জারণ-প্রক্রিয়া।(৫১৬)
ওষুধবিজ্ঞানে মুসলিমদের আরেকটি আবিষ্কার এই যে, তারা ওষুধকে একবার মধুর সঙ্গে এবং আরেকবার চিনি ও রসের সঙ্গে মেশাতে পারতেন। আরবরা প্রাচীনপন্থীদের বিপরীতে চিনিকে মধুর ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। এর ফলে তারা অনেক উপকারী ওষুধি ফর্মুলা পেয়েছেন।(৫১৭)
আল-রাজিই প্রথম মলম তৈরিতে পারদ ব্যবহার করেন এবং বানরের ওপর প্রয়োগ করে এর কার্যক্ষমতা পরখ করেন। মুসলিম চিকিৎসকেরাই প্রথম বর্ণনা করেন যে, কফি গাছের বীজ হৃদ্রোগের ওষুধবিশেষ। তারা আরও বর্ণনা দেন যে, কফিবীজ (বিচূর্ণ কফি) টনসিল, আমাশয় ও দগদগে জখমের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। তারা বলেন যে, কর্পূর হৃৎপিণ্ডকে সঞ্জীবনীশক্তি দান করে। তারা দারুচিনি বা লবঙ্গের সঙ্গে লেবুর রস বা কমলার রস মিশিয়ে কিছু ওষুধের শক্তিও হ্রাস করেন। তারা বিষের প্রতিষেধক ওষুধও প্রস্তুত করতে সমর্থ হন, যা কয়েক ডজন এবং কখনো কখনো কয়েকশ ওষুধের মিশ্রণে তৈরি করা হতো। আফিমের সঙ্গে পারদ মিশিয়ে উপকারী মিশ্রণ তৈরি করেন। রোগীর অনুভূতিবিলোপ বা অ্যানেসথেসিয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য ভাং ও আফিমের সঙ্গে অন্যান্য বস্তু মিশিয়ে কার্যকরী ওষুধ প্রস্তুত করেন।(৫১৮)
মুসলিম বিজ্ঞানীরা ওষুধ নিয়ে গ্রন্থাবলি রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো كتاب الجامع المفردات الأدوية والأغذية (Compendium on Simple Medicaments and Foods)। এটি রচনা করেছেন আবদুল্লাহ ইবনে আহমাদ আল-মাকালি, যিনি ইবনুল বাইতার নামে সমধিক পরিচিত (মৃ. ৬৪৬ হি./১২৪৮ খ্রি.)। তিনি উদ্ভিদের উৎপাদনস্থানগুলো পর্যবেক্ষণ করতেন এবং কোনো উদ্ভিদ নিয়ে লেখার আগে সেটার বৈশিষ্ট্যাবলি সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন। ইবনুল বাইতার তার এই গ্রন্থে ইউনানি বা গ্রিক তথ্যাবলি সংগ্রহ করেছেন। তিনি এতে প্রায় পনেরোশ ওষুধের বর্ণনা দিয়েছেন। ভেষজ ওষুধ, প্রাণিজ ওষুধ ও খনিজ পদার্থ দিয়ে তৈরি ওষুধের বর্ণনা রয়েছে এতে। তিনি এসব ওষুধের ব্যবহাররীতিও বলে দিয়েছেন। আভিধানিক বর্ণমালার ভিত্তিতে ওষুধের নামাবলি সাজিয়েছেন, যাতে খুঁজে পেতে সহজ হয়। এই গ্রন্থে তিনি একটি ভূমিকা রচনা করেছেন। ভূমিকায় তিনি ওষুধ সম্পর্কে তথ্য সংকলনে যে পরীক্ষামূলক পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন তার বর্ণনা দিয়েছেন। এই গ্রন্থ রচনার দ্বিতীয় উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, পূর্ববর্তীদের থেকে আমি যেসব তথ্য নিয়েছি সেগুলোর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি এবং পরবর্তীদের থেকে তথ্যাবলি যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করেছি। পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ফলে যা বিশুদ্ধ মনে হয়েছে এবং সংবাদের ভিত্তিতে নয় বরং পরীক্ষানিরীক্ষার ভিত্তিতে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেটাকেই আমি প্রবহমান ভান্ডাররূপে সংকলন করেছি। এই ক্ষেত্রে সাহায্যগ্রহণের জন্য নিজেকে আল্লাহ্ ছাড়া কারও মুখাপেক্ষী মনে করিনি। যে ওষুধের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তীদের বা পরবর্তীদের কারও ভ্রান্তি ঘটে গেছে সে ব্যাপারে সতর্ক করেছি। কারণ তাদের অধিকাংশই বিদ্যমান তথ্যাবলি ও সংবাদের ওপর নির্ভর করেছেন। আর আমি নির্ভর করেছি পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষানিরীক্ষার ওপর, যেমন ইতিপূর্বে তা আমি উল্লেখ করেছি।(৫১৯)
ওষুধবিজ্ঞানের ওপর আবু বকর আল-রাজি কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘মানাফিউল আগযিয়া’, ‘সাইদালিয়্যাতুত তিব্ব’, ‘আল-হাবি ফিত-তাদাবি’। আলি ইবনুল আব্বাস ‘কামিলুস সানাআতিত তিব্বিয়্যাহ’ ছাড়াও রচনা করেছেন ‘আল-মালাকি’। গ্রন্থটির দ্বিতীয় খণ্ডে তিনি কেবল ওষুধশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং এতে তিনি ত্রিশটি অধ্যায় সন্নিবিষ্ট করেছেন। আবুল কাসিম খাল্ফ ইবনে আব্বাস আয-যাহরাবি রচনা করেছেন ‘আত-তাসরিফু লিমান আজাযা আনিত তালিফ’। এতে তিনি একটি অধ্যায়ে কেবল ওষুধ নিয়ে আলোচনা করেছেন। দাউদ আল-আনতাকি(৫২০) রচনা করেছেন ‘তাযকিরাতু উলিল আলবাবি ওয়াল-জামিউ লিল আজাবিল-উজাব'। কোহেন আল-আত্তার রচনা করেছেন ‘মিনহাজুদ দাক্কান ওয়া দাসতুরুল আয়ান'। ইবনে যাহর আল- আন্দালুসি(৫২১) রচনা করেছেন 'আল-জামিউ ফিল-আশরিবাতি ওয়াল মাজুনাত'। আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ আল-ইদরিস রচনা করেছেন 'আল- জামিউ লি-সিফাতি আশতাতিন নবাতাত ওয়া দুরুবি আনওয়াইল মুফরাদাতি মিনাল আশজারি ওয়াল-আসমার ওয়াল-উসুল ওয়াল- আযহার'। আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-গাফিকি রচনা করেছেন 'জামিউল আদবিয়াতিল মুফরাদাহ'। আল-কিন্দি চিকিৎসা ও ওষুধবিজ্ঞান নিয়ে বাইশটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। ‘ফিরদাউসুল হিকমা'-কে তাবারি কর্তৃক ওষুধবিজ্ঞান বিষয়ে রচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ বিবেচনা করা হয়। এটি ওষুধবিজ্ঞান বিষয়ে সবচেয়ে পুরোনো কোষগ্রন্থ।
ওষুধবিজ্ঞানের নিয়মনীতি নির্ধারণ এবং তার বিকাশ ও ব্যাপকতা সাধনে মুসলিম বিজ্ঞানীরা অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। ইতিহাসভিত্তিক পর্যালোচনা থেকে তা-ই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওষুধবিজ্ঞান নিয়ে তারা অসংখ্য মূল্যবান স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন, ফলে এটি প্রকৃত অর্থেই একটি বিজ্ঞানশাখার মর্যাদা পেয়েছে।
টিকাঃ
৪৯৫. গুস্তাভ লি বোঁ, The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৫৯১।
৪৯৬. প্রাগুক্ত।
৪৯৭. আরবি উৎসগুলোতে গ্রন্থটি আরও কিছু নামে পরিচিত: كتاب الحشائش، كتاب الحشائش والأدوية، كتاب الخمس مقالات، المقالات الخمس، هيولى الطب، كتاب ديسقوريدوس في الأدوية المفردة.
৪৯৮. আরবি উৎসগুলোতে গ্রন্থটি আরও কিছু নামে পরিচিত: كتاب الحشائش، كتاب الحشائش والأدوية، كتاب الخمس مقالات، المقالات الخمس، هيولى الطب، كتاب ديسقوريدوس في الأدوية المفردة.
৪৯৯. এটি আরবিতে অনুবাদ করেছেন মূলত হুনাইনের শিষ্য স্তাফান ইবনে বাসিল, হুনাইন এটির সম্পাদনা করেছেন। -অনুবাদক
৫০০. আবু হানিফা আদ-দিনাওয়ারি: আহমাদ ইবনে দাউদ ইবনে ওয়ানানদ আদ-দিনাওয়ারি (২১২-২৮২ হি./৮২৮-৮৯৫ খ্রি.)। প্রতিভাবান যন্ত্রপ্রকৌশলী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, উদ্ভিদবিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ, দার্শনিক, ইতিহাসবিদ। ইরানের দিনাওয়ারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৩ খণ্ডে কুরআনের তাফসির রচনা করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের সংখ্যা ত্রিশটিরও বেশি। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ১২৩।
৫০১. ইবনে ওয়াহশিয়্যাহ : আবু বকর আহমাদ ইবনে আলি ইবনে কাইস ইবনে মুখতার ইবনে আবদুল কারিম ইবনে হারসিয়্যাহ (মৃ. ৩১৮ হি./৯৩০ খ্রি.)। আলকেমিস্ট, কৃষিবিদ, বিষবিশেষজ্ঞ ও মিশরবিদ এবং সুফি। যাদুবিদ্যায়ও কারিকুরি দেখিয়েছেন। যাদুবিদ্যা নিয়ে তিনটি, রসায়নশাস্ত্র নিয়ে দুটি, প্রতীকবিদ্যা নিয়ে দুটি এবং কৃষি নিয়ে একটি বই রচনা করেছেন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ১৭০।
৫০২. ইবনুল আওয়াম আল-ইশবিলি: আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ (মৃ. ৫৮০ হি./১১৮৫ খ্রি.)। আন্দালুসীয় বিজ্ঞানী। 'আল-ফিলাহাতুল আন্দালুসিয়া' গ্রন্থটি রচনা করে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। এই গ্রন্থের একটি অংশ স্প্যানিশ ও ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৮, পৃ. ১৬৫।
৫০৩. লুইস সিডিও (Louis-Pierre-Eugène Sédillot), Histoire des Arabes (১৮৫৪), আরবি অনুবাদ, তারিখুল আরাবিল আম, পৃ. ৩৮১।
৫০৪. রশিদুদ্দিন আস-সুরি : রশিদুদ্দিন আবুল ফযল ইবনে আলি (৫৭৩-৬৩৯ হি./১১৭৭-১২৪১ খ্রি.)। উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক। আইয়ুবি সুলতান আল-মালিক আল-আদিলের সহচর। সুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন দামেশকে। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৯, পৃ.১৪২।
৫০৫. ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, খ. ২, পৃ. ২১৯।
৫০৬. আরবিতে 'হিসবাহ' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর একটি অর্থ জবাবদিহি। পরিভাষায় শব্দটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন সৎকাজ পরিত্যাগ করতে দেখলে সৎকাজের আদেশ করা এবং মন্দকাজ করতে দেখলে মন্দকাজ থেকে নিষেধ করা। দেখুন, আবুল হাসান আলি আল-মাওয়ারদি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, পৃ. ২৪০।-অনুবাদক
৫০৭. যিনি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করেন। জবাবদিহি চান।
৫০৮. লুইস সিডিও (Louis-Pierre-Eugène Sédillot), Histoire des Arabes (1854), আরবি অনুবাদ, তারিখুল আরাবিল আম, পৃ. ৩৮২।
৫০৯. مبحث إدارة المستشفيات والمراقبة الصحية المجتمع الإسلامي সম্পাদিত The Preaching of Islam : A history of the Propagation of the Muslim Faith গ্রন্থ থেকে। আরবি অনুবাদ, تراث الاسلام (১৯৫৪), অনুবাদ ও টীকা সংযোজন, জর্জিস ফাতহুল্লাহ, পৃ. ৫১২।
৫১০. Max Meyerhof (১২৯১-১৩৬৪ হিজরি/১৮৭৪-১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ): জার্মান চক্ষু-চিকিৎসক ও প্রাচ্যবিদ। ইউরোপের বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদদের অন্যতম। আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। ১৯০৩ সালে মিশর ভ্রমণ করেন এবং কায়রোতে অবস্থান করেন। কায়রোতেই মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ইসলামি সভ্যতায় চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ভেষজবিজ্ঞানের ইতিহাসের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
৫১১. উনিশ শতকে গ্রন্থটি ফরাসি ও জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়। আধুনিক মুদ্রণে গ্রন্থটির বিস্তৃতি ৯০০ পৃষ্ঠার বেশি।-অনুবাদক
৫১২. ম্যাক্স মেয়েরহফ, মাবহাসুত তিব্ব, থমাস ওয়াকার আর্নল্ড কর্তৃক সম্পাদিত তুরাসুল ইসলাম, পৃ. ৪৮৫।
৫১৩. একটি তরল পদার্থের মধ্যে অমিশ্রণীয় অপর একটি তরল পদার্থ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দুর আকারে বিস্তৃত থাকলে সে মিশ্রণকে ইমালশন বা অবদ্রবণ বলা হয়। ইমালশন দুই প্রকার: ১. পানিতে তেল ইমালশন। যেমন দুধ। এখানে পানিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দুর আকারে তরল চর্বি বিস্তৃত থাকে। ২. তেলে পানির ইমালশন। যেমন কডলিভার অয়েলে কড মাছের লিভারের তেলে পানি, মাখনে চর্বির মধ্যে পানি, আইসক্রিমের ক্রিমের মধ্যে বরফের কণিকা। স্থায়ী ইমালশন তৈরির জন্য তৃতীয় কোনো পদার্থ ইমালশনের সঙ্গে যোগ করতে হয়। এই তৃতীয় পদার্থকে বলা হয় ইমালশনকার বা অবদ্রবণকারক। পানিতে তেল ইমালশনের ক্ষেত্রে ক্ষার ধাতুর সাবান, গাম- অ্যাকাসিয়া প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য ইমালশনকারক। ভারী ধাতুঘটিত সাবান তেলে পানির ইমালশনের স্থায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। দুধের ইমালশনকারক হলো ক্যাজিন। জীবাণুনাশক ফিনাইল ও লাইসল পানিতে ঢাললে ইমালশন তৈরি হয়। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এবং সেই সঙ্গে শিল্প, কৃষি, ওষুধ ও জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ইমালশনের ব্যবহার আছে। ট্যানিং, ডাইয়িং, লুব্রিকেশন শিল্পে ব্যবহৃত কয়েকটি ইমালশন হলো ডিটারজেন্ট, পেইন্ট, বার্নিশ, রেজিন, গাম, গু ইত্যাদি আঠালো পদার্থ।- অনুবাদক
৫১৪. রাখালশসা একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ যার বৈজ্ঞানিক নাম Citrullus colocynthis, যা Cucurbitaceae পরিবারভুক্ত। সংস্কৃত ভাষায় এর নাম গবাক্ষী বা ইন্দ্রবারুণী। ইন্দ্রায়ণ নামেও এটি পরিচিত। রাখালশসার ইংরেজি নামগুলো হলো Bitter apple, Colocynth, Vine of Sodom, Citron, Bitter Cucumber, Egusi, desert gourd ইত্যাদি। এটি লতা-জাতীয় উদ্ভিদ। আদি নিবাস ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, এশিয়া ও তুরস্ক। এর লতা অনেকটা তরমুজ লতার মতো, এতে ছোট ও শক্ত তিতা ফল হয়।
৫১৫. কাদরি তাওকান, উলামাউল আরব ওয়া-মা আতাওহু' লিল-হাদারাহ, পৃ. ২৭।
৫১৬. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ২৫৭।
৫১৭. লুইস সিডিও (Louis-Pierre-Eugène Sédillot), Histoire des Arabes (১৮৫৪), আরবি অনুবাদ, তারিখুল আরাবিল আম, পৃ. ৩৮৩।
৫১৮. কাদরি তাওকান, উলামাউল আরব ওয়া-মা আতাওহু লিল-হাদারাহ, পৃ. ২৭-২৮।
৫১৯. জালাল মাজহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আসারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩০৮-৩০৯; মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ২২৩।
৫২০. দাউদ ইবনে উমর আল-আনতাকি (মৃ. ১০০৮ হি./১৬০০ খ্রি.) আনতাকিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক। ছিলেন অন্ধ। দামেশক, কায়রো, আনাতোলিয়া ভ্রমণ করেছেন। শেষে মক্কায় ভ্রমণ করে সেখানেই স্থির হন। মক্কাতেই মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : تذكرة أولي الألباب والجامع للعجب العجاب (তাজ-বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ), رسالة في الفصد والحجامة (চিকিৎসা-বিষয়ক গ্রন্থ) এবং দর্শন-বিষয়ক গ্রন্থ حجر الفلاسفة। দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৮, পৃ. ৪১৫-৪১৬।
৫২১. ইবনে যাহর আল-আন্দালুসি : আবু মারওয়ান আবদুল মালিক ইবনে যাহর ইবনে আবদুল মালিক আল-ইশবিলি (৪৬৪-৫৫৭ হি./১০৭২-১১৬২ খ্রি.)। চিকিৎসক। সেভিলের বাসিন্দা। তার যুগে তার সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : التيسير في المداواة والتدبير দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৯, পৃ. ১১০。
📄 ভূতত্ত্ববিদ্যা
কুরআনুল কারিমের বহু আয়াতে ভূস্তর-সম্পর্কিত বিদ্যার (জিয়োলজি)(৫২২) প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌ بِيْضٌ وَحُمْرٌ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهَا وَغَرَابِيْبُ سُودٌ
আর পাহাড়ের মধ্যে আছে বিচিত্র বর্ণের পথ-শুভ্র, লাল ও নিকষ কালো।(৫২৩)
وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ
আমি লোহাও দিয়েছি, যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং মানুষের জন্য নানাবিধ কল্যাণ।(৫২৪)
وَلَقَدْ مَكَّنَّاكُمْ فِي الْأَرْضِ وَجَعَلْنَا لَكُمْ فِيهَا مَعَايِشَ
আমি তো তোমাদের দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং তাতে তোমাদের জীবিকার ব্যবস্থাও করেছি।(৫২৫)
এগুলো ছাড়াও আরও বহু আয়াত বিজ্ঞানের এই শাখা অর্থাৎ ভূবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেছে। এ থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে মুসলিম বিজ্ঞানীরা ভূতত্ত্ব নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন।
কোনো সন্দেহ নেই যে, প্রাচীন কালেও মানবজাতির খনিজ ও আকরিক সম্পর্কে জ্ঞানবুদ্ধি ছিল। তবে তা ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের। গ্রিক বিজ্ঞানীরা, বিশেষ করে অ্যারিস্টটল (৩৮৩-৩২২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) পৃথিবীকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করেন : প্রথমত জমিন, যা পানি, আগুন, বায়ু ও মাটি এই চারটি উপাদানের দ্বারা গঠিত এবং দ্বিতীয়ত আকাশ, যা ইথারের দ্বারা গঠিত। ইসলামের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত অ্যারিস্টটলের মতামতই আধিপত্য বিস্তার করে ছিল। ইসলাম এসে যাবতীয় রূপকথা, কল্পকাহিনি ও গালগল্পের অবসান ঘটিয়েছে।(৫২৬)
মুসলিমগণ সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে প্রতিটি বিষয় নিয়ে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা শুরু করেন এবং বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে সত্য উদ্ঘাটনে গবেষণায় ব্রতী হন। ফলে তার প্রাকৃতিক ঘটনাবলির বিচার-বিশ্লেষণে এবং পাথর ও শিলা, পাহাড়-পর্বত ও আকরিক বস্তুরাশির ব্যাখ্যায় প্রভূত সাফল্য অর্জন করেন। অসংখ্য ভূতাত্ত্বিক ঘটনাবলি, যেমন ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি, জোয়ারভাটা, পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকার গঠন, নদীনালা, স্রোতপ্রবাহ ইত্যাদির কার্যকারণ উদ্ঘাটন করেছেন। ভূবিজ্ঞানে মুসলিমদের প্রথম কীর্তি সম্ভবত কোষগ্রন্থ ও অভিধানগুলোতে সংকলিত এই জ্ঞান-সম্পর্কিত শব্দভান্ডার। যেমন ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ আল-জাওহারি কর্তৃক রচিত অভিধান 'আস-সিহাহ', আল-ফাইরুজাবাদি(৫২৭) কর্তৃক রচিত অভিধান 'আল-কামুসুল মুহিত', ইবনে সিদাহ আল-আন্দালুসি(৫২৮) কর্তৃক রচিত 'আল-মুখাসসাস'। ভ্রমণ এবং দেশ ও অঞ্চল সম্পর্কিত গ্রন্থাবলিও এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। আরও রয়েছে ভৌগোলিক গবেষণামূলক গ্রন্থাবলি, যেমন হাসান ইবনে আহমাদ আল-হামদানি কর্তৃক রচিত ‘সিফাতু জাযিরাতিল আরাব’।
তারপর আমরা যে-সকল মুসলিম বিজ্ঞানী এই বিজ্ঞানচর্চায় ব্রতী হয়েছিলেন তাদের কাছ থেকে স্পষ্টভাবে পেয়ে যাই ভূতত্ত্ববিদ্যার সীমারেখা। যেমন আল-কিন্দি, আল-রাজি, আল-ফারাবি, আল-মাসউদি, ইখওয়ানুস সাফা, আল-মাকদিসি(৫২৯), আল-বিরুনি, ইবনে সিনা, আল-ইদরিসি, ইয়াকুত হামাবি, আল-কাযবিনি(৫৩০) এবং আরও অনেকে।
এ সকল জ্ঞানী ও বিজ্ঞানী ভূমিকম্প সম্পর্কে কিছু তত্ত্ব পেশ করেছেন, ভূমিকম্পের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করেছেন, খনিজ বস্তুরাশি ও শিলা সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। পাললিক শিলা ও অশ্মীভূত বস্তুর পরিচয় প্রদান করেছেন। তা ছাড়া শিলার মাত্রাগত রূপান্তর (ডাইমেনশনাল ট্রান্সফরমেশন) সম্পর্কেও ধারণা দিয়েছেন। উল্কা ও উল্কাপিণ্ড সম্পর্কে তারা লিখেছেন। উল্কার প্রকৃতি ও উৎপত্তি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করেছেন। উল্কাপিণ্ডকে তারা দুই ভাগে ভাগ করেছেন, পাথুরে উল্কাপিণ্ড ও লৌহ উল্কাপিণ্ড। তারা এগুলোর আকৃতির বর্ণনা দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো কর্কশ ও এবড়োখেবড়ো উল্কা। ভূগর্ভের তাপমাত্রা হ্রাস-বৃদ্ধি সম্পর্কেও তারা আলোচনা করেছেন। ভঙ্গিল পর্বত(৫৩১) স্তূপ পর্বত(৫০২) ও অন্যান্য শ্রেণিতে পর্বত-বিভাজনের যে তত্ত্ব তাও তারা প্রতিষ্ঠা করেছেন। কী কী কারণে পাহাড়ে ধস নামে এবং নদীপাড়ের মাটি ক্ষয়ে যায় তাও তারা ব্যাখ্যা করেছেন এবং এর প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন।
মুসলিম বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক ভূবিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক ভূবিজ্ঞান সম্পর্কে মূল্যবান গবেষণা উপহার দিয়েছেন। এসব গবেষণায় প্রকৃতিতে বিদ্যমান জলের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে দালিলিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে, মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাদের রচনাবলিতে জলের এসব অবস্থা সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। নদীনালা গঠনে তাদের মতামত নির্ভেজালভাবে বৈজ্ঞানিক। ইখওয়ানুস সাফার প্রবন্ধসমগ্র (রাসায়িলু ইখওয়ানিস সাফা), ইবনে সিনার 'আন-নাজাত' কিতাবে এবং আল-কাযবিনির 'আজায়িবুল মাখলুকাত' গ্রন্থে আমরা এসব মতামত ও বক্তব্য পাই। একইভাবে কেলাসবিজ্ঞান (Crystallography) সম্পর্কে প্রথম ধারণা দেন আল-বিরুনি। তার হাতেই বিজ্ঞানের এই শাখার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। তার রচিত 'আল-জামাহির ফি মারিফাতিল জাওয়াহির(৫০০) গ্রন্থে এ বিষয়ে বর্ণনা রয়েছে। তারপর এই বিজ্ঞান বিকশিত হয় আল-কাযবিনির হাতে, তিনি তার 'আজায়িবুল মাখলুকাত' গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তারা দুজন যে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ করেছেন, যার বিবরণ তাদের কিতাবে পাওয়া যায়, তাতে কেউই তাদের ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।
মুসলিম বিজ্ঞানীরা সেই বিজ্ঞানশাখা নিয়েও আলোচনা করেছেন যাকে আমরা খনিজ তেল-বিষয়ক বিজ্ঞান (বা পেট্রোলিয়াম জিয়োলজি) বলতে পারি। এটি প্রায়োগিক ভূবিজ্ঞানের একটি শাখা। তারা দুই ধরনের খনিজ তেলের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন এবং দুই ধরনের তেলই তারা ব্যবহার করেছেন। তারা তেল অনুসন্ধান (পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন) সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন এবং তেল অনুসন্ধানের কয়েকটি নকশাও তারা প্রদান করেছেন।
মুসলিমদের প্রাথমিক পর্যায়ের বিজ্ঞানীদের অনেকেই পৃথিবীর গঠন, স্থলভাগ ও জলভাগের বিভাজন এবং ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও বিবরণ-বিষয়ক গবেষণায় গুরুত্বারোপ করেছেন। পৃথিবীর গঠনের বাহ্যিক উপাদান নিয়েও তারা আলোকপাত করেছেন। যেমন নদীনালা, সমুদ্র, বায়ু, সামুদ্রিক ঝড় ইত্যাদি। যেসব অভ্যন্তরীণ কার্যকারণ ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে ভূত্বকে পরিবর্তন সাধিত হয় তা নিয়েও তারা চিন্তাভাবনা করেছেন। যেমন আগ্নেয়গিরি, ভূমিকম্প, ভূমিধস ও স্থানচ্যুতি। স্থলভাগ ও জলভাগের মধ্যে স্থানের অদলবদল এবং এই অদলবদলের সময়সীমা সম্পর্কেও তারা আলোচনা করেছেন। নদীর উৎপত্তি ও উচ্ছল প্রবাহ, তারপর বার্ধক্য এবং তারপর মৃত্যু-এসব বিষয় নিয়েও আলোকপাত করেছেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, মুসলিমদের অধীত ভূতত্ত্ববিদ্যা অন্যান্য বিজ্ঞানশাখার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই এগিয়েছে। যা তার বিকাশ ও উৎকর্ষ লাভে সাহায্য করেছে। তখনকার বিজ্ঞানীদের এটাই ছিল রীতি। বিজ্ঞানশাখাগুলোর মধ্যে এখনকার মতো সূক্ষ্ম বিভাজন ছিল না, বরং ব্যাপক ও সামগ্রিক অধ্যয়ন-গবেষণা ছিল। তাই মুসলিম বিজ্ঞানীদের জিয়োলজি ও ভূবিজ্ঞান-সংশ্লিষ্ট কাজগুলো বিভিন্ন নামের অসংখ্য গ্রন্থাবলিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। যেমন আমরা দেখি যে, ইবনে সিনা তার 'আশ-শিফা' গ্রন্থে খনিজ পদার্থ ও আবহাওয়া-সম্পর্কিত একটি প্রবন্ধে আকরিক ও আবহাওয়াবিজ্ঞানের নানা বিষয় সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। শিহাবুদ্দিন আন-নুওয়াইরি(৫০৪) আবহবিদ্যার সঙ্গে সঙ্গে ভূতত্ত্ববিদ্যা নিয়েও আলোকপাত করেছেন তার 'নিহায়াতুল আরাবি ফি ফুনুনিল আদাব' গ্রন্থে। আল-মাসউদি তার 'মুরুজুয যাহাবি ওয়া মাআদিনুল জাওহার' কিতাবে ভৌগোলিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি ভূতাত্ত্বিক বিষয়গুলোর পর্যালোচনাও করেছেন।(৫৩৫)
ভূমিকম্প
আদিকাল থেকেই ভূমিকম্পের বিষয়টি মানুষের মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রেখেছে। কতিপয় প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ভূ-অভ্যন্তরীণ বায়ুপ্রবাহের ফলে ভূকম্পনের সৃষ্টি হয় বলে উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, পৃথিবীর গভীর তলদেশে রয়েছে আগুন, তাই দেখা দেয় ভূমিকম্প। ভূমিকম্পের উৎপত্তি ও কার্যকারণ-সম্পর্কিত আলাপ-আলোচনা প্রথম বৈজ্ঞানিক রূপ পায় মুসলিমদের হাতে, হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে (খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীতে)। মুসলিম বিজ্ঞানীরা তখন ভূমিকম্প, ভূমিকম্প সংঘটনের ইতিহাস ও ভূকম্পনপ্রবণ এলাকাগুলোর ওপর বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় গুরুত্ব প্রদান করেন। ভূমিকম্পের প্রকারভেদ, তার শক্তিমাত্রা, ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসলীলা এবং এর ফলে উদ্গত শিলারাশির স্থানান্তর ও তার অপকার-উপকার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার ওপর জোর দেন। ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি কীভাবে কমানো যায় তার কৌশল উদ্ভাবনের চেষ্টা করেন কেউ কেউ। ইবনে সিনার 'আश-শিফা' গ্রন্থের খনিজ পদার্থ ও আবহাওয়া-সম্পর্কিত অংশে, ইখওয়ানুস সাফার 'রাসায়িল'-এ এবং আল-কাযবিনির 'আজায়িবুল মাখলুকাত'-এ এসব বিষয়ে বক্তব্য রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তারা সবাই তাদের স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করেছেন।
* উদাহরণ হিসেবে ইবনে সিনার বক্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। ভূমিকম্পের বৈশিষ্ট্য, তা সংঘটনের কারণ ও তার প্রকারভেদ সম্পর্কে ইবনে সিনা বলেছেন, ভূমিকম্প হলো পৃথিবীর কোনো একটি অংশের কম্পন, যা তার অভ্যন্তরীণ কারণে সৃষ্টি হয়। ভূ-অভ্যন্তরে কম্পনের সৃষ্টি হয়, তার ফলে আবশ্যকভাবে ওই অংশের ভূত্বকও কেঁপে ওঠে। ভূ-অভ্যন্তরে যে অংশটির নড়ে ওঠা সম্ভব তা হয়তো বাষ্পীভূত, ধূমায়িত ও বাতাসের মতো প্রবলবেগ কাঠামো, বা খরস্রোতা জলীয় কাঠামো, অথবা বায়বীয় কাঠামো, কিংবা আগ্নেয় কাঠামো অথবা ভূমি-কাঠামো। অবশ্য ভূমি-কাঠামোর কম্পনের জন্য এমন একটি কারণ দরকার, যা এই ভূত্বকের কম্পনের কারণের অনুরূপ। এই ক্ষেত্রে প্রথম কারণটিই ভূমিকম্পের সংঘটক। অন্যদিকে বায়বীয় কাঠামো-চাই তা আগ্নেয় হোক বা অন্যকিছু-নিজেই ভূ-অভ্যন্তরে উৎক্ষিপ্ত হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভূত্বকে তরঙ্গের সৃষ্টি করে।(৫০৬)
ইখওয়ানুস সাফা ভূমিকম্পের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ভূ-অভ্যন্তরের উত্তাপের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে গ্যাসের সৃষ্টি হয়। ওসব গ্যাসই ভূমিকম্প ঘটিয়ে থাকে। যদি ওই ভূখণ্ডের জমিন আলগা-আলগা হয় তবে সেসব গ্যাস ছিদ্রপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে, অন্যথায় ভূমিতে ফাটল ধরে ও সেসব গ্যাস বেরিয়ে পড়ে এবং ভূমিতে ধস নামে। ফলে তীব্র আওয়াজ ও কম্পন অনুভূত হয়।(৫০৭)
খনিজ ও শিলা
মুসলিম বিজ্ঞানীরা খনিজ পদার্থ ও মূল্যবান পাথরসমূহের পরিচয় দিয়েছেন এবং সেগুলোর প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যাবলি উল্লেখ করেছেন। খনিজ পদার্থ ও শিলারাশির স্তরবিন্যাস সাজিয়েছেন এবং সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক বর্ণনা প্রদান করেছেন। খনিজ পদার্থ ও মূল্যবান পাথর কোথায় পাওয়া যায় সেসব জায়গাও চিহ্নিত করেছেন। এগুলোর মধ্যে কোনটি উৎকৃষ্ট আর কোনটি অপকৃষ্ট তা নির্ণয় করার ব্যাপারেও গুরুত্ব দিয়েছেন। পাললিক শিলার গঠন, তার উপরিভাগের গঠন, উপত্যকার পলল, ভূমির সঙ্গে সমুদ্রের ও সমুদ্রের সঙ্গে ভূমির সম্পর্ক এবং সম্পর্কের ফলে সৃষ্ট পাথুরে কাঠামো ও ভূমিক্ষয়ের কার্যকারণ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা করেছেন।
সম্ভবত উতারিদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-হাসিব(৫০৮) প্রথম ব্যক্তি যিনি আরবি ভাষায় পাথর সম্পর্কে বই রচনা করেছেন। এই বইটির নাম 'মানাফিউল ‘আহজার’। তিনি এই বইয়ে মণিমুক্তা ও মূল্যবান পাথরের শ্রেণিবিন্যাস করেছেন এবং সেগুলোর প্রত্যেকটির বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন।(৫০৯) আল-রাজি এই বইটির কথা তার 'আল-হাবি' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আল-বিরুনির যুগ পর্যন্ত মুসলিমরা ভূমি থেকে উত্তোলিত বস্তুরাশির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ৮৮টি মণিমাণিক্য ও মূল্যবান পাথরের সন্ধান পেয়েছেন।
ইবনে সিনা তার ‘আশ-শিফা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, তিনটি কারণে শিলা গঠিত হয়। মাটি শুষ্ক হতে হতে তা থেকে গঠিত হয়, পানি বাষ্পীভূত হওয়ার ফলেও শিলা গঠিত হয় এবং পলল জমেও শিলা গঠিত হয়। তিনি খনিজ পদার্থগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন: শিলা বা পাথর, গন্ধক বা সালফার, লবণ বা দ্রবীভূত বস্তুসমূহ। ইবনে সিনা ধাতুসমূহেরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং সেগুলোর গঠনের পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন। তিনি বহু আকরিক ও খনিজ পদার্থের নাম উল্লেখ করে সেগুলোর প্রত্যেকটির বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। এসব পদার্থের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য কীভাবে বজায় থাকে তাও উল্লেখ করেছেন। প্রত্যেক পদার্থের বিশেষ গঠনরূপ রয়েছে, আমাদের পরিচিত রূপান্তরপ্রক্রিয়ায় সেগুলোর পরিবর্তন ঘটে না। যা ঘটা সম্ভব তা হলো ধাতুর আকৃতি ও কাঠামোর বাহ্যিক পরিবর্তন।(৫৪০)
মুসলিম বিজ্ঞানীরা খনিজ পদার্থসমূহের প্রাকৃতিক কাঠামো সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। বাহ্যিক কার্যকারণের ফলে সেগুলোর বিশেষ গুণ ও স্বভাবে কী ধরনের পদার্থগত পরিবর্তন সাধিত হয় তা নিয়েও আলোচনা করেছেন। তারা উল্লেখ করেছেন যে, কিছু কিছু খনিজ পদার্থ প্রাকৃতিকভাবেই নির্দিষ্ট জ্যামিতিক রূপ পরিগ্রহ করে এবং তাদের এরূপ গঠনে মানুষের কোনো হাত নেই। আমরা বর্তমান সময়ে যাকে কেলাসবিজ্ঞান নাম দিয়েছি তারই প্রাথমিক লক্ষণ ছিল এটা। আল-বিরুনি এসব পদার্থের কয়েকটির বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন, যেগুলোর উপরিভাগ পারস্পরিক সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কাঠামো জ্যামিতিক। তিনি উদাহরণ হিসেবে হীরার কথা উল্লেখ করেছেন। হীরার আকৃতি তার একান্ত নিজস্ব, মোচাকার বহুভুজী। কোনো কোনো হীরা হয়ে থাকে যৌগিক। ত্রিভুজাকৃতির, অগ্নিসদৃশ তলগুলো পরস্পর সংলগ্ন, আবার কোনো কোনো হীরা আছে দ্বৈত পিরামিড আকৃতির।
শিলার উৎপত্তি ও গঠন সম্পর্কে মুসলিম বিজ্ঞানীরা আলোকপাত করেছেন। জলপ্রবাহের ফলে পলল জমে যে শিলা গঠিত হয়েছে তা হলো পাললিক শিলা(৫৪১) এবং অগ্নিময় অবস্থা থেকে যে শিলার সৃষ্টি হয়েছে তা হলো আগ্নেয় শিলা(৫৪২)। তা ছাড়া তারা অসংখ্য শিলা ও ধাতুর নির্দিষ্ট ভর বের করেছেন, যা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও যথাযথ। ভূবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তারা ভূ-সংস্থান(৫৪৩), ভূ-প্রকৃতি, জলীয় ভূতত্ত্ব(৫৪৪), জীবাশ্মবিজ্ঞান, মহাকাশীয় প্রভাব বা আবহবিদ্যা সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। আবহবিদ্যা বা আবহাওয়াবিজ্ঞান হলো ভূবিদ্যা ও জলবায়ুবিজ্ঞানের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক।(৫৪৫)
সমুদ্র ও জোয়ারভাটা
মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাঁদের ভূগোল-সংশ্লিষ্ট রচনাবলিতে সমুদ্র ও নদীভিত্তিক ভূতত্ত্ব নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা করেছেন, যা অন্যকোনো বিষয় নিয়ে করেননি। ভূগোল-বিষয়ক গ্রন্থাবলিতে তাঁরা আলাদা আলাদা অধ্যায় রচনা করেছেন, যেখানে সমুদ্রসমূহের নাম, সমুদ্রের অবস্থান ও সমুদ্রের তীরবর্তী দেশগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন। স্থলভাগের যেসব জায়গা একসময় নদী ও সমুদ্র ছিল এবং অতীতকালের যেসব জনপদ সমুদ্রে পরিণত হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। নৌচালনবিদ্যা নিয়ে তাঁরা গ্রন্থ রচনা করেছেন। জোয়ারভাটার ঘটনাবলি-যার ওপর নদীপথে ও সমুদ্রপথে চলাচলের সময় জাহাজের নাবিকেরা নির্ভর করে থাকেন-সম্পর্কেও আলোকপাত করেছেন। এসব বিষয়ে যে-সকল মুসলিম বিজ্ঞানীর নিজস্ব মতামত ও বক্তব্য ছিল তাঁদের মধ্যে রয়েছে আল-কিন্দি, আল-মাসউদি, আল-বিরুনি, আল-ইদরিসি, আল-মাকদিসি প্রমুখ।
যেসব গ্রন্থে দেশ ও অঞ্চল সম্বন্ধে আলোচনা রয়েছে তার কোনোটিই নদী ও সমুদ্র-সম্পর্কিত বিবরণ থেকে মুক্ত নয়। আল-মাসউদি তাঁর ‘আখবারুয যামান’ কিতাবে সমুদ্রের গঠন ও তার কার্যকারণ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্ববর্তী মনীষীদের বক্তব্য কী তা নিয়ে ব্যাপক ও বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। তাঁর ‘মুরুজুয যাহাব’ কিতাবে একগুচ্ছ ভূতাত্ত্বিক পর্যালোচনা রয়েছে, যেখানে সমুদ্র ও নদী এবং জোয়ারভাটা সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে। তিনি সমুদ্র সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রচনা করেছেন, যার নাম ذكر الأخبار عن انتقال البحار (সমুদ্রের স্থানান্তর-সম্পর্কিত তথ্যাবলি)।(৫৪৬)
আল-মাকদিসি এসব সমুদ্রের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ, সমুদ্রবক্ষে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপসমূহ এবং বিপজ্জনক স্থান সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। তিনি জোয়ারভাটা-সংক্রান্ত ঘটনাবলির উল্লেখ করে সেগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।(৫৪৭)
মুসলিম বিজ্ঞানীরা জলীয় পৃষ্ঠের (সমুদ্রপৃষ্ঠের) বিস্তৃতি পরিমাপ করেছেন এবং স্থলভাগের সঙ্গে মিলে তার আয়তন কতটা বিশাল হয় তাও জানিয়েছেন। ভূপৃষ্ঠের নানা প্রকারের উঁচু গঠন সম্পর্কে তারা আলোকপাত করেছেন। এসব উঁচু গঠনের ফলেই সমুদ্রের জলরাশি পৃথিবীকে তলিয়ে দিতে পারে না। এই প্রসঙ্গে ইয়াকুত হামাবি বলেছেন, এসব উঁচু অংশ না থাকলে (সমুদ্রের) পানি স্থলভাগের চারপাশ ঘিরে তাকে নিমজ্জিত করে ফেলত। ফলে পৃথিবীর কোনো স্থলভাগই প্রকাশ পেত না। পৃথিবীর জলভাগের তুলনায় স্থলভাগ কতটুকু সে সম্পর্কে স্পষ্ট বিবরণ পাই আবুল ফিদার কাছে। তিনি তার ‘তাকবিমুল বুলদানী কিতাবে জলভাগ ও স্থলভাগের অনুপাত উল্লেখ করে বলেছেন, ভূপৃষ্ঠের যে অংশ জলে আচ্ছন্ন তার পরিমাণ ৭৫%। পৃথিবীর যে অংশ উন্মোচিত বা দৃশ্যমান তা প্রায় এক চতুর্থাংশ, আর বাকি তিন চতুর্থাংশ সমুদ্রে নিমজ্জিত।(৫৪৮)
ভূপ্রকৃতিবিজ্ঞান বা ভূমিরূপবিদ্যা
মুসলিম বিজ্ঞানীরা জিয়োমোরফোলজি (ভূপ্রকৃতিবিজ্ঞান) বিষয়ে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক গবেষণা করেছেন। তারা এমন কিছু বাস্তবিক সত্যে উপনীত হয়েছেন যা আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ভূপ্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় কালগত কার্যকারণের ভূমিকা ও প্রভাব, স্থলভাগ ও জলভাগের স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় শিলাচক্র ও জ্যোতিশ্চক্রের প্রভাব, ইরোশন বা ক্ষয়কার্যে পানি, বাতাস ও জলবায়ু এদের প্রত্যেকটির সাধারণ ভূমিকা। বিজ্ঞানের এই দিকটি যারা ভালোভাবে আয়ত্ত করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আল-বিরুনি। ভারতবর্ষের একটি সমতলভূমির গঠনের প্রক্রিয়া বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, এই জায়গায় একটি সমুদ্র অববাহিকা ছিল। এখানে পলি জমতে থাকে এবং পলি জমতে জমতে একসময় তা সমতলভূমিতে পরিণত হয়। নদীর পলি সঞ্চিত হওয়ার ঘটনাও তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। বিশেষ করে যখন নদী মোহনার কাছাকাছি আসে তখন পলি বেশি জমে। মূল নদী তার উৎসের কাছে বড় আকারের হয় এবং মোহনার কাছাকাছি এসে তা তুলনামূলক ছোট আকার ধারণ করে। আল-বিরুনির বক্তব্য, পাহাড়ের কাছে পাথরগুলো বড় বড় এবং নদীর জলের প্রবাহও তীব্র, দূরে এসে পাথরগুলো হয় ছোট এবং জলের প্রবাহও থিতিয়ে আসে। জলের প্রবাহ ধীর হয়ে এলে সমুদ্রে প্রবেশপথের কাছাকাছি বালু জমতে থাকে। তাদের এসব সমতলভূমি প্রাচীন কালে সমুদ্র ছিল, তারপর জলপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে বালু ও পলি জমে তা সমতলভূমিতে পরিণত হয়।(৫৪৯)
জিয়োমোরফোলজির ক্ষেত্রে ইবনে সিনার বক্তব্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আধুনিক তাত্ত্বিক মতামতের কাছাকাছি। উদাহরণত, তিনি কিছু পাহাড় গঠনের ক্ষেত্রে দুটি কার্যকারণের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। একটি হলো প্রত্যক্ষ কার্যকারণ, অপরটি পরোক্ষ। যখন প্রচণ্ড শক্তিশালী ভূমিকম্প ভূমির একটি অংশকে স্থানান্তর করে ফেলে তখন সরাসরি ছোট পাহাড় জেগে ওঠে। এটি প্রত্যক্ষ কারণ। যখন ঝড়ো হাওয়া বা খাত সৃষ্টিকারী খরস্রোতা জল পার্শ্ববর্তী ভূমির কিছু অংশের ক্ষয় ঘটায় এবং কিছু অংশ স্বাভাবিক থাকে, ক্ষয়প্রাপ্ত অংশ নিচু হয়ে যায় এবং তার পাশের অংশ উঁচু থাকে। তারপর এই নিচু অংশ দিয়ে জলপ্রবাহ তার পথ তৈরি করে নেয় এবং তা ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে। পাশের অংশ উঁচু টিলার মতোই থেকে যায়। এটা হলো পরোক্ষ কারণ।(৫৫০)
আবহবিদ্যা (মিটিয়োরোলজি)
মুসলিম বিজ্ঞানীরা আবহবিদ্যা(৫৫১) বা আবহাওয়াবিজ্ঞানের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। তারা এই বিজ্ঞানকে علم الآثار العلوية (উচ্চ প্রত্নতত্ত্ব বিজ্ঞান) নামে আখ্যায়িত করেছেন। বায়ুমণ্ডল ও বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা, ঘনত্ব, তাপমাত্রার স্তর, বায়ুপ্রবাহ, মেঘ ও বৃষ্টি এই বিজ্ঞানের মূল বিষয়। একে علم الأرصاد الجوية (আবহাওয়া বিজ্ঞান)-ও বলা হয়। অবশ্য আরও আগে আরব ভাষাবিজ্ঞানীরা এই বিজ্ঞান-সম্পর্কিত বহু পরিভাষা উল্লেখ করেছেন। উদাহরণ হিসেবে কিছু পরিভাষা এখানে উল্লেখ করা হলো। তারা কম তাপমাত্রাকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করেছেন। যথা: বাব্দ (ঠাণ্ডা), হার (উষ্ণ), কূর (ঠাণ্ডা), যামহারির (অতিশয় ঠান্ডা), সাক্আ (হিম বা হিমাঙ্কের নিচের ঠান্ডা), সির্র (প্রচণ্ড ঠান্ডা), আরিয় (বিপজ্জনক ঠান্ডা)। বেশি তাপমাত্রাকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করেছেন। যথা: হার্র (উষ্ণ), হারুর (বেশি গরম), কায়য (অতিশয় গরম), হাজিরাহ (তীব্র গরম), ফায়হ (আগুনের মতো গরম)। তারা বায়ুকেও বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেছেন, বায়ুপ্রবাহের দিক অনুসারে অথবা বায়ুর বৈশিষ্ট্য অনুসারে।
বায়ুপ্রবাহের দিক অনুসারে বায়ুর প্রকার : শামআল, শামাল, শামীয়া (উত্তর দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু), জানুব বা তায়াম্মুন (দক্ষিণ দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু), সাবা (পুব দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু), দাবুর (কাবার পেছন থেকে প্রবাহিত বায়ু), আস-সাবাবিয়্যাহ (উত্তর-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু), আল-আযয়াব (দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু), আদ-দাজিন (দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু), আল-জারায়াবা (উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত বায়ু)। বৈশিষ্ট্য অনুসারে বায়ুর প্রকার: গরম বায়ুকে বলা হয় সামুম, শীতল বায়ুকে বলা হয় সারসার, বর্ষণমুখর বায়ুকে বলে মু'সিরা এবং বর্ষণহীন বায়ুকে বলে আকিম।
আরব ভাষাবিজ্ঞানীরা মেঘেরও বিভিন্ন নাম দিয়েছেন যা সেগুলোর বিভিন্ন অংশ ও গঠনের স্তরসমূহকে নির্দেশ করে। যেমন গামাম (এমন মেঘ যার দ্বারা আকাশের চেহারা পালটে যায়), মুয্ন (বৃষ্টিমুখর সাদা মেঘ), সাহাব (বজ্রহীন ও ঝড়হীন বর্ষণমুখর মেঘ), আরিদ্ (দিগন্তে ভাসমান মেঘ), দিমাছ (ঝড়-বজ্রহীন স্থির মেঘ), রাবাব (সাদা মেঘ)। মেঘের অংশসমূহ: হাইদাব, মানে নিচের মেঘ, কিফাফ, মানে উপরের মেঘ; রাহা, মানে মধ্যবর্তী স্তরে ভাসমান মেঘ, খিনদিয, মানে মেঘের দূরবর্তী প্রান্ত, বাওয়াসিক, মানে মেঘের সর্বোচ্চ অংশ। যে পানি আকাশ থেকে নামে বা কম তাপমাত্রার কারণে জমে যায় তারও বিভিন্ন নাম রয়েছে। যেমন কাত্র (ফোঁটায় ফোঁটায় পড়া বৃষ্টিজল), নাদা (শিশির), সাদা (রাতের শিশির), দাবাব (কুয়াশা), তাল্ল (কুয়াশার মতো বৃষ্টি), গায়স (বৃষ্টি), রাযায (ঝিরিঝিরি বৃষ্টি), ওয়াবিল (প্রবল বৃষ্টি), হাতিল (নিরবচ্ছিন্ন তুমুল বৃষ্টি), হাতুন (প্রবল বর্ষণ)। এগুলোর প্রত্যেকটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইবনে সিনা ও ইখওয়ানুস সাফা।(৫৫২)
জীবাশ্মবিজ্ঞান (palaeontology)
মুসলিম বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বয়স নির্ণয় করতে গিয়ে এবং সমুদ্রের শুষ্ক ভূমিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রমাণাদি উপস্থিত করতে গিয়ে জীবাশ্মবিজ্ঞান সম্বন্ধে আলোকপাত করেছেন। আল-বিরুনি তার ‘তাহদিদু নিহায়াতি আমাকিনি লি-তাসহিহি মাসাফাতিল-মাসাকিন’ কিতাবে সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, জাযিরাতুল আরব বা আরব উপদ্বীপ জলে নিমজ্জিত ছিল। ভূতাত্ত্বিক কালপরিক্রমায় তা থেকে পানি সরে যায়। কেউ যদি জলাশয় বা কূপ খনন করে, সেখানে সে পাথর দেখতে পাবে, সেই পাথর ভাঙলে তা থেকে বেরিয়ে আসবে শঙ্খ (বা সামুদ্রিক প্রাণীর খোলক)। এই যে আরব মরুভূমি, তা একসময় সমুদ্র ছিল, সমুদ্রের জল শুকিয়ে গিয়ে ভূমিতে পরিণত হয়েছে। সেখানে জলাশয় বা কূপ খনন করতে গেলেই আমরা তার স্পষ্ট নিদর্শন দেখতে পাই। মাটি, বালু ও কঙ্করের কয়েকটি স্তর দেখতে পাওয়া যায়। তারপর পাওয়া যায় মৃৎপাত্র বা কুমারের মাটি, কাচ ও হাড়। এর অর্থ এই নয় যে, এখানে আগমনকারী কাউকে এখানে দাফন করা হয়েছিল। খননের ফলে পাথরও বেরিয়ে আসে। পাথর ভাঙলে তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে শঙ্খ। একে মাছের কান বলা হয়। এসব শঙ্খ হয়তো নিজ অবস্থায় বহাল থাকে অথবা জীর্ণ হয়ে মিলিয়ে যায়, তখন তার কাঠামো আকারেই ওই জায়গাটুকু পাথরের ভেতরে খালি থাকে।(৫৫৩)
আল-বিরুনি এখানে ফসিল বা জীবাশ্মের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এগুলো হলো অশ্মীভূত পূর্ণাঙ্গ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অথবা পাথরের অভ্যন্তরে খোদাই হওয়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চিহ্ন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, কিছু অঞ্চল পানিতে নিমজ্জিত ছিল, তারপর তা স্থলভাগে পরিণত হয়েছে।
ইবনে সিনাও আল-বিরুনির অনুরূপ মত ব্যক্ত করেছেন। কোনো শুকনো ভূখণ্ডে বা স্থলভাগে জলজ প্রাণীর জীবাশ্ম প্রমাণ করে যে এই এলাকা কোনো এক সময় জলে নিমজ্জিত ছিল। আশ-শিফা গ্রন্থে ইবনে সিনার বক্তব্য এসেছে এভাবে, অনুমিত হয় যে, এই আবাদিত জনপদ প্রাচীন কালে আবাদ ছিল না, বরং সমুদ্রে নিমজ্জিত ছিল। পরে তা প্রস্তরীভূত হয়েছে। প্রস্তরীভবনের ঘটনা ঘটেছে হয়তো সমুদ্র থেকে পানি সরে গিয়ে তা উন্মোচিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে, বছরের পর বছর ধরে, যার বিবরণ ভূতাত্ত্বিক কালপঞ্জিতে সুরক্ষিত থাকেনি। অথবা সমুদ্রের তলদেশে প্রচণ্ড উত্তাপের সৃষ্টি হয়েছে, ফলে তাতে প্রস্তরীভবনের ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রথম কারণটি অধিকতর যুক্তিযুক্ত। এই ক্ষেত্রে সমুদ্র-এলাকার মাটি এঁটেল হওয়ায় তা প্রস্তরীভবনে সাহায্য করেছে। আবাদিত জনপদে প্রচুর পাওয়া গেছে। এসব পাথর ভাঙলে ভেতরে পাওয়া গেছে জলজ প্রাণীর খোলস, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। যেমন শঙ্খ ও অন্যান্য প্রাণী।(৫৫৪)
এই প্রসঙ্গে ইবনে সিনা আরও বলেছেন, প্রাণীর ও উদ্ভিদের অশ্মীভবনের (পাথরে বা ফসিলে পরিণত হওয়া) যেসব ঘটনা শোনা যায় তা সঠিক বলে ধরে নেওয়া যায়। এর পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। কিছু সামুদ্রিক এলাকায় ভূগর্ভে প্রচণ্ড শক্তির চাপ অশ্মীভবনের ঘটনা ঘটিয়েছে। অথবা ভূমিকম্প ও ভূমিধসের কারণে ভূখণ্ডের একটি অংশ সরে গেছে এবং এর ফলে সেখানে অশ্মীভবনের ঘটনা ঘটেছে।(৫৫৫)
মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাদের গ্রন্থসমূহে ও রচনাবলিতে ভূতত্ত্ব ও ভূবিজ্ঞান বিষয়ে যা-কিছু লিখেছেন, উপরিউক্ত আলোচনা তার সিন্ধুর মধ্যে ভাসমান হিমশৈলের একটি চূড়ামাত্র। এ থেকেই অগ্রগামিতা ও নেতৃত্বের দিকটি স্পষ্ট প্রমাণিত হয়। প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম বিজ্ঞানীরাই ভূবিজ্ঞানের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছেন ইবনে সিনা, আল-বিরুনি ও আল-কিন্দি। মুসলিম বিজ্ঞানীরা এই ক্ষেত্রে যে অবদান ও কীর্তি রেখে গেছেন আধুনিক ভূতত্ত্ববিদ্যা তারই সম্প্রসারিত রূপ।
টিকাঃ
৫২২. ভূতত্ত্ব বা ভূবিদ্যা (geology): ভূপ্তর, শিলা ইত্যাদি ভিত্তিক পৃথিবীর ইতিহাস-সম্পর্কিত বিজ্ঞান। ভূবিজ্ঞানের এই শাখায় পৃথিবী, পৃথিবীর গঠন, পৃথিবী গঠনের উপাদানসমূহ, পৃথিবীর অতীত ইতিহাস এবং তার পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করা হয়।-অনুবাদক
৫২৩. সুরা ফাতির: আয়াত ২৭।
৫২৪. সুরা হাদিদ: আয়াত ২৫।
৫২৫. সুরা আরাফ: আয়াত ১০।
৫২৬. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২৯১।
৫২৭. আল-ফাইরুজাবাদি: আবু তাহির মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াকুব ইবনে মুহাম্মাদ (৭২৯-৮১৭ হি./১৩২৯-১৪১৫ খ্রি.)। ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম ইমাম। ইরানের শিরাজ নগরের একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ইয়ামেনের যুবাইদে মৃত্যুবরণ করেন। 'আল-কামুসুল মুহিত' তার বিখ্যাত রচনা এবং তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য রচনা হলো ا البلغة في تراجم أئمة النحو واللغة দেখুন, ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৭, পৃ. ১২৬।
৫২৮. ইবনে সিদাহ আল-আন্দালুসি: আবুল হাসান আলি ইবনে ইসমাইল, ইবনে সিদাহ আল-মুরসি নামে পরিচিত (৩৯৮-৪৫৮ হি./১০০৭-১০৬৬ খ্রি.)। ভাষাবিজ্ঞান ও সাহিত্যের ইমাম ছিলেন অন্ধ। আন্দালুসের মুরসিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন আন্দালুসেরই شرح إصلاح المنطق، الأنيق، المحكم والمحيط الأعظم، المخصص الوافي في علم أحكام العالم والمتعلم، العلام في اللغة على الأجناس، شرح ما أشكل من شعر المتنبي القوافي দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৩, পৃ. ৩৩০-৩৩১।
৫২৯. আল-মাকদিসি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে আবু বকর আল-বিনা (৯৪৫-৯৯১ খ্রি.)। ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার উদ্দেশে প্রচুর ভ্রমণ করেছেন। ফলে অধিকাংশ দেশ সম্পর্কে তার জানা হয়ে গিয়েছিল। তারপর তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানচর্চায় ব্রতী হন এবং প্রায় সব মুসলিম দেশ ভ্রমণ করেন। এ বিষয়ে তার অর্জিত জ্ঞানভান্ডার সঞ্চিত আছে তার বিখ্যাত গ্রন্থ —আহসানুত তাকাসিম ফি মারিফাতিল আকালিম -এ। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৫, পৃ. ৩১২।
৫৩০. আল-কাযবিনি: যাকারিয়া ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মাহমুদ (৬০৫-৬৮২ হি./১২০৮-১২৮৩ খ্রি.)। ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদ। কাজি ছিলেন। বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: আতার উল-বিলাদ ওয়া আখবার উল-ইবাদ আজায়িব উল-মাখলুকাত ওয়া গারায়িব উল-মাওজুদাৎ। দেখুন, যাহাবি, তাযকিরাতুল হুফফায, খ. ২, পৃ. ২২; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ৪৬।
৫৩১. ভঙ্গিল পর্বত: ভঙ্গ বা ভাঁজ থেকে ভঙ্গিল শব্দটির উৎপত্তি। কোমল পাললিক শিলায় ভাঁজ পড়ে যে পর্বত গঠিত হয়েছে তাকে ভঙ্গিল পর্বত বলে। ভঙ্গিল পর্বতের প্রধান বৈশিষ্ট্য তার উঁচু-নিচু ভাঁজ। পৃথিবীর উচ্চতম অধিকাংশ পর্বত এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ভূ-পৃষ্ঠের কোনো অংশে প্রবল পার্শ্বচাপের ফলে ভূভাগে ক্রমোন্নতি-অবনতির সৃষ্টি হলে সেই স্থানটিতে ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি হয়। এ ধরনের পর্বতগুলো কখনো কখনো ৫০০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতার হয়। এশিয়ার হিমালয়, ইউরোপের আল্পস, উত্তর আমেরিকার রকি, দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বত ভঙ্গিল পর্বতের উদাহরণ।-অনুবাদক
৫৩২. স্তূপ পর্বত: ভূ-আলোড়নের সময় ভূপৃষ্ঠের শিলাস্তরে প্রসারণ ও সংকোচনের সৃষ্টি হয়। এই প্রসারণ ও সংকোচনের জন্য ভূত্বকে ফাটল তৈরি হয়। কালক্রমে এসব ফাটল বরাবর ভূত্বক স্থানচ্যুত হয়। ভূগোলের ভাষায় একে চ্যুতি বলে। ভূত্বকের এমন স্থানচ্যুতি কোথাও উপরের দিকে হয়, কোথাও হয় নিচের দিকে। চ্যুতির ফলে উঁচু হওয়া অংশকে স্তূপ পর্বত বলে। ভারতের বিন্ধ্যা ও সাতপুরা পর্বত, জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্ট, পাকিস্তানের লবণ পর্বত স্তূপ পর্বতের উদাহরণ।-অনুবাদক
৫৩৩. গ্রন্থটির বিষয়বস্তু আকরিক ও খনিজ পদার্থ, শিলা ও পাথর।
৫৩৪. আন-নুওয়াইরি: আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব ইবনে আহমাদ আল-বাকরি (৬৭৭-৭৩৩ হি./১২৭৮-১৩৩৩ খ্রি.)। বিজ্ঞানী ও অনুসন্ধানী গবেষক। মিশরের বনি সুওয়াইফের একটি গ্রাম নুওয়াইরার দিকে সম্পর্কিত করে তাকে আন-নুওয়াইরি বলা হয়। মূলত তিনি কাওসে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন। 'নিহায়াতুল আরাবি ফি ফুনুনিল আদাব' তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, আদ-দুরারুল-কামিনাহ, খ. ১, পৃ. ২৩১।
৫৩৫. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ২৯১ থেকে উদ্ধৃত।
৫৩৬. মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ২৬৪; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ৩১৪।
৫৩৭. ইখওয়ানুস সাফা, রাসায়িলু ইখওয়ানিস সাফা, খ. ২, পৃ. ৯৭, দারু সাদির, বৈরুত।
৫৩৮. উতারিদ ইবনে মুহাম্মাদ: উতারিদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-বাবিলি আল-বাগদাদি (মৃ. ২০৬ হি./৮২১ খ্রি.)। গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: ১. تركيب ٢٠ العمل بالأسطرلاب الأفلاك। দেখুন, ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩৩৬।
৫৩৯. মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ২৬১।
৫৪০. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৩।
৫৪১. পৃথিবীর শুরু থেকে যেসব শিলা উত্তপ্ত গলিত অবস্থা থেকে শীতল ও ঘনীভূত হয়ে কঠিন হয়েছে তা-ই আগ্নেয় শিলা। অগ্নিময় অবস্থা থেকে এ শিলার সৃষ্টি হয়েছিল বলে একে আগ্নেয় শিলা বলে। আগ্নেয় শিলার অন্য নাম অন্তরীভূত শিলা (Unstratified Rock), প্রাথমিক শিলা। আগ্নেয় শিলা স্ফটিকাকার, অপেক্ষাকৃত ভারী, কঠিন ও কম ভঙ্গুর। এতে জীবাশ্ম দেখা যায় না। যেমন গ্রানাইট, গ্যাব্রো, ব্যাসল্ট, ডাইক, ল্যাকোলিথ, ব্যাথোলিথ ইত্যাদি।
৫৪২. পলি বা পলল সঞ্চিত হয়ে যে শিলা গঠন করে তা পাললিক শিলা। এ শিলায় পলি সাধারণত স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয় বলে একে স্তরীভূত শিলাও বলে। পাললিক শিলা নরম ও হালকা, সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। পাললিক শিলায় জীবাশ্ম যেমন দেখা যায়, তেমনই ছিদ্রও দেখা যায়। যেমন চুনাপাথর, কয়লা, নুড়িপাথর, বেলেপাথর, পলিপাথর, চক, কোকিনা, লবণ, ডোলোমাইট, জিপসাম, ডায়াটম ইত্যাদি।-অনুবাদক
৫৪৩. ভূ-সংস্থান (Topography): যেকোনো ভৌগোলিক এলাকার প্রাকৃতিক এবং মানবিক দৃশ্যাবলির বিস্তারিত বিবরণ ও উপস্থাপনকে ভূ-সংস্থান বলে। এখানে প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি বলতে যেকোনো এলাকার উদ্ভিদ, প্রাণী, নদনদী, ভূমির বন্ধুরতা, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র প্রভৃতির বিবরণকে বোঝায়। মানবিক দৃশ্যাবলি বলতে যেকোনো এলাকার বসতি, নগর-বন্দর, হাটবাজার, রাস্তাঘাট, স্কুলকলেজ, অফিস-আদালত, পরিবহন ইত্যাদির বিবরণকে বোঝায়। ভৌগোলিক পঠনপাঠনের জন্য যেকোনো এলাকার প্রাকৃতিক ও মানবিক দৃশ্যাবলির বিস্তারিত বিবরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ভৌগোলিক এলাকার যাবতীয় প্রাকৃতিক ও মানবিক দৃশ্যাবলির বিভিন্ন সূচক ও চিহ্ন দিয়ে প্রদর্শিত মানচিত্রকে ভূ-সংস্থানিক মানচিত্র (Topographic Map) বলে। এটি হলো বৃহৎ স্কেল বা মাপনীর মানচিত্র।-অনুবাদক
৫৪৪. হাইড্রোগ্রাফি বা পৃথিবীর জলভাগ সম্বন্ধে গবেষণামূলক বিজ্ঞান।-অনুবাদক
৫৪৫. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ২৯৪-২৯৫।
৫৪৬. ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ২১৯।
৫৪৭. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ৩১০।
৫৪৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২২-৩২৪।
৫৪৯. আল-বিরুনি, তাহকিক মা লিল হিন্দ, পৃ.৮০।
৫৫০. প্রাগুক্ত।
৫৫১. আবহাওয়াবিজ্ঞান বা আবহবিদ্যা (Meteorology): পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণকারী বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থার বিভিন্নতা নিয়ে যে বিজ্ঞান তার নাম আবহবিদ্যা। আবহাওয়াবিদগণ বায়ুর বেগ, তাপমাত্রা, চাপ, বৃষ্টি, শিলাবর্ষণ, শিশির, কুয়াশা, তুষারপাত, বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক পদার্থ (যেমন কার্বন ডাই-অক্সাইড, জলীয় বাষ্প, অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন) ইত্যাদির পরিমাণ পরিমাপ ও বিশ্লেষণ করেন, আবহাওয়া সম্পর্কে অনুমান করেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন।
৫৫২. রিসালাতুল আসারিল আলাবিয়্যা, মিন রাসায়িলি ইখওয়ানিস সাফা, দারু সাদির, বৈরুত, খ. ২, পৃ. ৬২ ও তার পরবর্তী।
৫৫৩. আল-বিরুনি, তাহদিদু নিহায়াতিল আমাকিনি লি-তাসহিহি মাসাফাতিল মাসাকিন' ইস্তাম্বুলের জামে আল-ফাতিহ গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপি থেকে জার্মান প্রাচ্যবিদ Fritz Krenkow কর্তৃক চয়নকৃত অংশ। আল-মুজাল্লাদুত তাযকারি, পৃ. ২০৪।
৫৫৪. মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ২৬৩।
৫৫৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৫।
📄 বীজগণিত
বীজগণিতের সূচনা ও তার ভিত্তি স্থাপন করেছেন বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী আল-খাওয়ারিজমি (১৬৪-২৩২ হি./৭৮১-৮৪৬ খ্রি.)। মিরাসের অংশবণ্টনে কিছু জটিল সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তিনি বীজগণিতের উদ্ভাবন ঘটিয়েছিলেন। তিনি বীজগণিতের কিছু মূলনীতি ও নিয়ম স্থির করেছেন যা একে প্রকৌশল ও গণিতের অন্যান্য শাখা থেকে স্বতন্ত্র জ্ঞানের মর্যাদা দান করেছে।
আল-খাওয়ারিজমিই প্রথম বর্তমানে আলজেব্রা নামে পরিচিত জ্ঞানশাখাটির জন্য 'জার' শব্দটি ব্যবহার করেন। ইউরোপীয়রা তার থেকে তা গ্রহণ করে। এখনো পর্যন্ত 'আল-জার' তার আরবি নামেই ইউরোপের যাবতীয় ভাষায় পরিচিত। তা ইংরেজি ভাষায় Algebra এবং ফরাসি ভাষায় Algèbre। অন্যান্য ভাষায়ও অনুরূপ। ইউরোপীয় ভাষাগুলোতে যত শব্দে algorithme বা algorithm বা algorism রয়েছে তা 'আল-খাওয়ারিজমি' নামটির অপভ্রংশ। মানুষকে আরবি সংখ্যা শেখানোর কৃতিত্বও তারই। তাই তো আল-খাওয়ারিজমিকে বীজগণিতের জনক বলা হয়।(৫৫৬)
আল-খাওয়ারিজমির কিতাব 'আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা' গণিতশাস্ত্রের একটি প্রধান বই এবং বিপুল প্রভাবসঞ্চারী। এতে তিনি সমীকরণের পক্ষান্তর ও সমাধান নিয়ে আলোচনা করেছেন। গ্রন্থটির ভূমিকায় তিনি জানিয়েছেন যে, খলিফা আল-মামুন তাকে এই গ্রন্থ রচনার অনুরোধ জানান। কীভাবে তিনি অনুরোধ জানান তারও বিবরণ দিয়েছেন। গ্রন্থটি লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেন জেরার্ডো ডি ক্রিমোনা (Gerardo de Cremona)।(৫৫৭) ১৮৫১ সালে লন্ডন থেকে গ্রন্থটির আরবি ভাষ্যসহ ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন ফ্রেডেরিক রোজেন। তিনিই এটির অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন। অনূদিত গ্রন্থটির নাম The Algebra Of Mohammed Ben Musa।
আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা গ্রন্থটির একাধিক অনুবাদের ফলে ভারতীয় গণিত ও দশমিক পদ্ধতির(৫৫৮) ব্যবহার ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি সেখানে গাণিতিক ক্রিয়া-কার্য Alguarismo নামে পরিচিতি লাভ করে। বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, এগুলোই আবার আরবিতে অনূদিত হয় اللوغاريتمات নামে, যদিও তা মূলত আল-খাওয়ারিজমির প্রতি সম্বন্ধিত।
الجداول الخوارزمية يا الخوارزميات
আল-খাওয়ারিজমির আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা গ্রন্থটি খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণিতশাস্ত্রের প্রধান উৎস হিসেবে বিরাজমান ছিল। তার পরে যারা আলজেব্রা বা বীজগণিত নিয়ে বই লিখেছেন তাদের অধিকাংশই এই গ্রন্থের ওপর নির্ভরশীল। আরবি ভাষা থেকে লাতিন ভাষায় এটির অনুবাদ করেন রবার্ট অব চেস্টার (Robert of Chester)। ফলে এর দ্বারা ইউরোপ আলোকিত হয়। আধুনিক কালে দুইজন ডক্টর মিশরীয় পদার্থবিদ আলি মুস্তাফা মুশরাফা ও মিশরীয় গণিতবিদ মুহাম্মাদ মুরসি আহমাদ আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা গ্রন্থটি সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন।(৫৫৯) এটি :كتاب الجبر والمقابلة، تحقيق علی مصطفی مشرفه ومحمد مرسى أحمد ১৯০৭ সালে কায়রোর পল ব্যেরি প্রকাশনাসংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়।
আল-খাওয়ারিজমির পর এই পথপরিক্রমা সমাপ্ত করেন আবু কামিল শুজা আল-মিশরি(৫৬০), আবু বকর আল-কারখি(৫৬১) ও উমর আল-খাইয়াম(৫৬২) এবং অন্যান্য প্রতিভাবান মুসলিম গণিতবিদ।
শূন্য (০) প্রবর্তন
শূন্য (০)-এর প্রবর্তন গণিতশাস্ত্রে মুসলিমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও মহাকীর্তি। কোনো সন্দেহ নেই যে, শূন্য (০) গাণিতিক কার্যাবলিকে সহজতর করে দিয়েছে এবং গণিতবিজ্ঞানকে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছে। শূন্য (০) না থাকলে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক গাণিতিক সমীকরণের সমাধান ততটা সহজে করতে পারতেন না, যা এখন করতে পারছেন। গণিতের বিভিন্ন শাখায় যে অগ্রগতি ঘটেছিল তা সর্বজনবিদিত। কিন্তু এর ফলে সভ্যতার যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল তা বিস্ময়কর।(৫৬৩)
দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান
গণিতশাস্ত্রে মুসলিমদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও কীর্তি হলো দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান। একে ঘন সমীকরণও বলে। তারা দ্বিঘাত সমীকরণের কয়েকটি সমাধানপদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন। গণিতের আধুনিক গ্রন্থগুলোতে এখনো এসব সমাধানপদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। তারা জানিয়েছেন যে, এ ধরনের সমীকরণের দুটি রুট (Root) বা মূল থাকে। মূল দুটি ধনাত্মক হলে কীভাবে সেগুলোকে বের করতে হবে তাও তারা জানিয়েছেন। মুসলিমজাতি যেসব বিষয়ে অগ্রগামী এবং পূর্ববর্তী সব জাতি থেকে এগিয়ে রয়েছে তার মধ্যে গণিতশাস্ত্রে এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার অন্যতম। তারা কতিপয় সমীকরণের সমাধানের জন্য প্রকৌশলীয় পদ্ধতিও আবিষ্কার করেছিলেন। আল-খাওয়ারিজমির আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা গ্রন্থের 'আলা-মাসাহাত' অধ্যায়ে এমন কিছু প্রকৌশলীয় প্রক্রিয়া রয়েছে যেগুলোর সমাধান করা হয়েছে বীজগণিতীয় পদ্ধতি ব্যবহার করে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিমরাই প্রথম প্রকৌশলীয় সমস্যার (engineering problem) সমাধানে বীজগণিতের ব্যবহার চালু করেন।(৫৬৪)
দশমিক ভগ্নাংশের ব্যবহার
যদিও বলা হয়ে থাকে যে ডাচ বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ সিমোন স্টেভিন(৫৬৫) প্রথম দশমিক ভগ্নাংশের ধারণা দেন এবং তিনিই প্রথম এর ব্যবহার চালু করেন, কিন্তু তা যথার্থ নয়। মুসলিম গণিতজ্ঞ গিয়াসুদ্দিন জামশেদ আল কাশি(৫৬৬) মূলত প্রথম ব্যক্তি, যিনি দশমিক ভগ্নাংশের প্রতীক প্রবর্তন করেছিলেন এবং সিমোন স্টেভিনের ১৭৫ বছরেরও বেশি পূর্বে তা ব্যবহার করেছিলেন। তা ছাড়া তিনি দশমিক ভগ্নাংশের ব্যবহারের উপকারিতা এবং তা ব্যবহার করে অঙ্ক কষার পদ্ধতিও বলে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর 'মিফতাহুল হিসাব' গ্রন্থের পঞ্চম পৃষ্ঠায় মুখবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি দশমিক ভগ্নাংশ আবিষ্কার করেছেন, যাতে ওইসব ব্যক্তিদের জন্য অঙ্ক কষা সহজ হয় যারা ষষ্ঠিক (sexagesimal) পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞ। সুতরাং তিনি জেনেশুনেই বলছেন যে, তিনি একটি নতুন বিষয় আবিষ্কার করেছেন।(৫৬৭)
গণিতে প্রতীকের ব্যবহার
আল-খাওয়ারিজমির পরবর্তীকালে মুসলিম বিজ্ঞানীরা গাণিতিক ক্রিয়া-কার্যে প্রতীকের ( ÷ × - +) ব্যবহার শুরু করেন। আল-কালাসাদি আল-আন্দালুসির(৫৬৮) রচনাবলিতে, বিশেষ করে 'কাশফুল আসরারি আন ইলমি হুরুফিল গুবার' গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তা থেকে গাণিতিক প্রতীক ব্যবহারের বিষয়টি যথার্থ প্রমাণিত হয়। গণিতের বিভিন্ন শাখার অগ্রগামিতা ও উৎকর্ষ লাভে এসব প্রতীক ব্যবহারের যে ভূমিকা ও প্রভাব তা কারও অজানা নয়। কিন্তু সত্যিকারই আফসোসের ব্যাপার যে, ফরাসি বিজ্ঞানী ফ্রাঁসোয়া ভিয়েটাকে(৫৬৯) গণিতে প্রতীক ব্যবহারের প্রবর্তক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বলা হয় যে, তিনি এসব গাণিতিক প্রতীক ও চিহ্ন আবিষ্কার করেছেন। অথচ তার জীবৎকাল ১৫৪০-১৬০৩ খ্রি.।(৫৭০)
ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান
উমর আল-খাইয়াম (৪৩৬-৫১৭ হিজরি) বীজগণিতীয় ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করেন। কনিক সেকশন বা কনিক ব্যবহার করে বহুপদী সমীকরণের সমাধানপদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরা মানবসভ্যতাকে যা-কিছু দিয়েছেন এটি তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি। উমর আল-খাইয়াম যে অধিবৃত্ত (parabola) ও বৃত্তের (বৃত্তের ছেদকের) সাহায্যে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করেছেন তা থেকেই প্রতিভাত হয় যে তিনি (শূন্যে অবস্থিত কোনো) বিন্দুর স্থানাঙ্ক (সঠিক অবস্থান) ব্যাখ্যার জন্য আনুভূমিক স্থানাঙ্ক(৫৭১) সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। উমর আল-খাইয়াম তার এই প্রয়াসের মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণাত্মক বা স্থানাঙ্ক জ্যামিতির(৫৭২) ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় প্রথম ইটগুলো স্থাপন করেন। অথচ রেনে দেকার্তেকে এর প্রবর্তক আখ্যায়িত করা হয়। কোনো সন্দেহ নেই যে, বিশ্লেষণাত্মক জ্যামিতির বিকাশ ও মূলনীতি স্থিরীকরণে দেকার্তের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আমরা গণিতশাস্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ শাখাটির উদ্ভাবক উমর আল-খাইয়ামের ভূমিকার কথা ভুলে যাব।(৫৭৩)
টিকাঃ
৫৫৬. কারাম হিলমি ফারহাত, আত-তুরাসুল ইলমি লিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিশ শাম ওয়াল ইরাক খিলালাল কারনির রাবিয়িল হিজরি পৃ. ৬৪২-৬৪৩, মুহাম্মাদ আলি উসমান, মুসলিমুনা আল্লামুল আলামা, পৃ. ৭৪-৭৫, আকরাম আবদুল ওয়াহহাব, মিয়াতু আলিমিন গাইয়ারু ওয়াযহাল আলাম পৃ. ২০।
৫৫৭. গ্রন্থটি রবার্ট অব চেস্টার (Robert of Chester) কর্তৃক লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।- অনুবাদক
৫৫৮. Decimal Numeral System.-অনুবাদক
৫৫৯. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, মুবতাকির ইম্মিল-জাবর... মুহাম্মাদ ইবনে মুসা আল- খাওয়ারিজমি, মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যা, খ. ৫, পৃ. ১৮৭ এবং রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ৭৭: মুহাম্মাদ আলি উসমান, মুসলিমুনা আল্লামুল আলামা, পৃ. ৭৭; আবদুল হালিম মুনতাসির, তারিখুল ইলম ওয়া দাওরুল উলামাইল আরাব ফি তাক্কাদ্দুমিহি, পৃ. ৬৫।
৫৬০. শুজা আল-মিশরি: আবু কামিল শুজা ইবনে আসলাম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে শুজা (মৃ. ৩১৮ হি./৯৩০ খ্রি.)। আবু কামিল আল-হাসিব নামেও পরিচিত। মিশরীয় গণিতজ্ঞ ও প্রকৌশলী। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: كتاب الجمع والتفريق، كتاب الخطأين كتاب كمال الجبر وتمامه والزيادة في أصوله ويعرف بكتاب الكامل كتاب الوصايا بالجبر والمقابلة، كتاب الجبر والمقابلة، كتاب الوصايا بالجذور كتاب الشامل في الجبر والمقابلة ، كتاب الطرائف في الحساب، كتاب الجمع والتفريق، كتاب الخطأين كتاب الكفاية، كتاب المساحة والهندسة والطير، كتاب مفتاح الفلاح، رسالة في المخمس والمعشر، كتاب العصير، كتاب الفلاح দেখুন, ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩৩৯; উমর রিদা কাহহালা, মুজামুল মুআল্লিফিন, খ. ৪, পৃ. ২৯৫।
৫৬১. আবু বকর আল-কারখি (আল-কারজি) মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল-কারখি (মৃ. ৪১০ হি./১০২০ খ্রি.)। গণিতজ্ঞ, প্রকৌশলী। ইরাকের আমির বাহাউদ দাওলার উজির ফাখরুল মালিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তার অনুরোধে তিনি বীজগণিত বিষয়ে কিতাবুল ফাখরি রচনা করেন। তার আরও দুটি গ্রন্থ আল-বাদি ফিল-হিসাব এবং আল-কাফি ফিল-হিসাব। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১২৫; ফুয়াদ সেযগিন, তারিখুত তুরাসিল আরাবি, খ. ১, পৃ. ৫৬২।
৫৬২. উমর আল-খাইয়াম: উমর ইবনে ইবরাহিম আল-খাইয়ামি আন-নিশাপুরি (১০৪৮-১১২১ খ্রি.)। পার্সিয়ান কবি, দার্শনিক, গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। বীজগণিত সম্পর্কে সেই সময়কার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থটি তার লেখা। এই গ্রন্থে তিনি দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান ও ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধানের ক্ষেত্রে জ্যামিতিক পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন। ইউক্লিডের জ্যামিতি সম্পর্কে একটি টাকাও আছে তার। জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি একটি মানমন্দিরের প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, উন্নত জ্যোতিষ-সারণি রচনা ও মুসলিম বর্ষপঞ্জির সংস্কার সাধন (১০৭৪ খ্রি.) করেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, দর্শন ও অধিবিদ্যা নিয়েও লিখেছিলেন তিনি। আইন ও ইতিহাস সম্পর্কেও তার যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। তুর্কি সুলতানদের দরবারে তিনি ছিলেন সম্মানিত বৈতনিক সভাসদ। সাধারণ পাঠকের কাছে তিনি অবশ্য বেশি পরিচিত কবি হিসেবে, রুবাইয়াতের রচয়িতারূপে। বাংলা ও ইংরেজিসহ বহু ভাষায় এর অনুবাদ হয়েছে। এই কবিতাগুচ্ছ থেকে উমর আল-খাইয়ামের শাশ্বত ভাবনা, গভীর অনুভূতি ও জীবন-জিজ্ঞাসার পরিচয় পাওয়া যায়। দেখুন, আব্বাস আল-কোমি, সাফিনাতুল বিহার, খ. ১, পৃ. ৪৩৬; ইবনুল আসির, আল-কামিল, ৪৭৬ হিজরির ঘটনাবলি।
৫৬৩. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা فিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৫৫-৩৫৬।
৫৬৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫৬।
565. সিমন স্টেভিন (Simon Stevin 1548-1620) : গ্যালিলিও, কেপলার ও দেকার্তের মতো তিনিও 'নতুন' বিজ্ঞানের একজন প্রতিষ্ঠাতা। নতুন পদ্ধতি ও প্রথাবিরোধী প্রতীতে তাঁর আগ্রহ ছিল। বিজ্ঞানের প্রাচীন পদ্ধতি ও প্রণালিসমূহকে তিনি সচেতনভাবে বাতিল করেছিলেন। জলগতিবিজ্ঞানের কলাকৌশলে তিনি ছিলেন বিশেষ পারদর্শী এবং এই বিষয়ে একটি সরকারি পদেও অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বলবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল, নৌপরিবহন ও রসায়নসহ বিভিন্ন শাখা তাঁর অনুশীলনের ফলে সমৃদ্ধ হয়েছে। পাটিগণিত ও বীজগণিত সম্পর্কে লেখা তাঁর গ্রন্থ পরবর্তীকালের অনেক উল্লেখযোগ্য গণিতবিদকে অনুপ্রাণিত করেছে।-অনুবাদক।
566. আল-কাশি: গিয়াসুদ্দিন ইবনে মাসউদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-কাশি (১৩৮০-১৪২১ খ্রি.)। হিজরি নবম শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। খুরাসানের কাশান শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং সমরকন্দে মৃত্যুবরণ করেন। বর্গমূল, ঘনমূলের মতো পূর্ণসংখ্যার ঘাতবিশিষ্ট মূল নির্ণয়ের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। বহু শ্রেষ্ঠ আরব বিজ্ঞানীর মতো তিনিও অনুবাদের কাজ করেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: كتاب زيج الخاقاني، الأبعاد والأجرام، نزهة الحدائق সম্বন্ধে। رسالة سلم السماء، رسالة المحيطية رسالة الجيب والوتر، مفتاح الحساب কাহহালা, মুজামুল মুআল্লিফিন, খ. ৮, পৃ. ৪০; নাসরিন মুস্তাফা, জামশিদ গিয়াসুদ্দিন আল কাশি: জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর অবদান, দ্বিতীয় সংস্করণ, মে, ২০০৯, প্রকাশক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, বাংলাদেশ।
567. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৫৬।
৫৬৮. আবুল হাসান আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আলি আল-কুরাশি আল-বাসতি (৮১৫-৮৯১ হি./১৪১২-১৪৮৬ খ্রি.)। আন্দালুসের বাজায় (বাস্তায়) জন্মগ্রহণ করেন এবং তিউনিসিয়ার বাজায় মৃত্যুবরণ করেন। গণিতবিদ। মালিকি মাযহাবপন্থী ইমাম। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: شرح التبصرة الواضحة في المنطق، كشف الجلباب عن علم الحساب، الأرجوزة الياسمينية في الجبر والمقابلة أشرف كتاب النصيحة في السياسة العامة والخاصة، مسائل الأعداد، شرح أيساغوجي في اللائحة الضوء اللامع لأهل القرن التاسع - 2017 | المسالك إلى مذهب مالك، ৬, পৃ. ৫; হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ১, পৃ. ১৫৩।
৫৬৯. ফ্রাঁসোয়া ভিয়েটা (François Viète 1540-1603): ষোড়শ শতকের শ্রেষ্ঠ বীজগণিতজ্ঞ বলে পরিচিত। ত্রিকোণমিতি তার বিকাশের উন্নত পর্যায়ে এসে বীজগণিতের সঙ্গে যখন জড়িয়ে পড়তে লাগল তখন ভিয়েটা এই দুটি শাখা নিয়েই পাশাপাশি কাজ করেছিলেন। তার বলয়ের ক্ষেত্রে ত্রিকোণমিতির প্রয়োগ তার বীজগাণিতিক অঙ্কপাতনকে সাহায্য করেছিল। গাণিতিক বিশ্লেষণ সম্পর্কে আধুনিক ধারণার প্রবর্তনে তিনি উভয় শাখা থেকে উপাদান সংগ্রহ শুরু করেছিলেন। ভিয়েটা প্রাচীন গ্রিক গণিতজ্ঞ আপোলোনিয়াসের একটি মূল সমস্যারও সমাধান করেছিলেন, প্রদত্ত তিনটি বৃত্তকে স্পর্শ করে একটা বৃহদাকার বৃত্ত অঙ্কন। π (পাই)-এর মান নির্ধারণের একটি উন্নত পদ্ধতিও তিনি দেখান। জ্যোতির্বিদ্যায় অবশ্য তার মোটেও দখল ছিল না। সেজন্য তিনি ক্যালেন্ডারের গ্রেগরীয় সংস্কার ও সংশোধনের বিরোধিতা করেছিলেন।- অনুবাদক
৫৭০. জালাল মাযহার: হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৫৮, আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম পৃ. ৬৫।
৫৭১. Horizontal Coordinate/X-coordinate বা ভুজ।-অনুবাদক
৫৭২. স্থানাঙ্ক জ্যামিতি বিশ্লেষণী জ্যামিতি (Analytic geometry): গণিতশাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা যেখানে জ্যামিতি আলোচনা করার জন্য বীজগণিত প্রয়োগ করা হয়। অনেক সময় একে বিশ্লেষণাত্মক জ্যামিতিও বলা হয়। এটি সাধারণত কো-অর্ডিনেট জ্যামিতি বা কার্টেসিয়ান জ্যামিতি নামে পরিচিত। পদার্থবিদ্যা ও কারিগরি শিক্ষায় এর গুরুত্ব অসীম। স্থানাঙ্ক জ্যামিতিতে সমতলে অবস্থান করা একটি বিন্দুর স্থানকে একজোড়া সংখ্যার সহায়তায় উপস্থাপন করা হয়। একে সংখ্যাজোড়ক স্থানাঙ্ক বলা হয়। সমতলে একটি বিন্দুর অবস্থান জানতে একজোড়া অক্ষ ব্যবহার করা হয়। y অক্ষ থেকে একটি বিন্দুর দূরত্বকে স্থানাঙ্ক বা ভুজ বলা হয়। x অক্ষ থেকে একটি বিন্দুর দূরত্বকে y স্থানাঙ্ক বা কোটি বলা হয়। x অক্ষের উপরে থাকা একটি বিন্দুর স্থানাঙ্কের অবস্থান (x, 0) এবং y অক্ষের উপরে থাকা একটি বিন্দুর স্থানাঙ্কের অবস্থান (0, y)।-অনুবাদক
৫৭৩. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ৬৫।