📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 জ্যোতির্বিজ্ঞান

📄 জ্যোতির্বিজ্ঞান


জ্যোতির্বিজ্ঞান মুসলিমদের কাছে অনেকাংশে তাদের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। ভৌগোলিক অবস্থান ও ঋতুর ভিন্নতা অনুযায়ী নামাযের সময় নির্ধারণে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে। কেবলার দিক নির্ধারণেও জ্যোতির্বিজ্ঞানের শরণাপন্ন হতে হয়। রোযার সূচনা, হজ ও অন্যান্য বিষয়ের সময় নির্ধারণের জন্য চাঁদের চলাচলও পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়।

জ্যোতির্বিদ্যার ওপর কুরআনের গুরুত্বারোপ
কুরআনে অনেক আয়াত এসেছে যা মহাকাশ ও মানুষকে পরিবেষ্টনকারী মহাবিশ্ব সম্পর্কে গুরুত্বারোপ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যাবলি প্রদান করেছে। শুধু তাই নয়, কুরআন আকাশ ও জমিনে যা-কিছু রয়েছে তার ওপর অনুসন্ধান ও গবেষণা করতে মুসলিমদের উদ্বুদ্ধ করেছে। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি আয়াত এখানে উল্লেখ করা হলো। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَآيَةٌ لَهُمُ اللَّيْلُ نَسْلَخُ مِنْهُ النَّهَارَ فَإِذَا هُمْ مُّظْلِمُونَ وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍ لَّهَا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ وَالْقَمَرَ قَدَّرْنَاهُ مَنَازِلَ حَتَّى عَادَ كَالْعُرْجُونِ الْقَدِيمِ لَا الشَّمْسُ يَنْبَغِي لَهَا أَنْ تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ﴾
তাদের জন্য রাত এক নিদর্শন, তা থেকে আমি দিবালোককে অপসারিত করি, তখন তারা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আর সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, তা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। এবং চাঁদের জন্য আমি নির্দিষ্ট করেছি বিভিন্ন মনযিল।(৪৩৬) অবশেষে তা শুকনো বাঁকা পুরাতন খেজুরশাখার আকার ধারণ করে। সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া এবং রাতের পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।(৪৩৭)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
﴿هُوَ الَّذِي جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَاء وَالْقَمَرَ نُورًا وَقَدَّرَهُ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ مَا خَلَقَ اللهُ ذَلِكَ إِلَّا بِالْحَقِّ يُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ ) إِنَّ فِي اخْتِلافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَمَا خَلَقَ اللَّهُ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَّقُونَ﴾
তিনিই সূর্যকে তেজস্কর ও চাঁদকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং তার মনযিল নির্দিষ্ট করেছেন যাতে তোমরা বছর গণনা ও (মাসসমূহের) হিসাব জানতে পারো। আল্লাহ তা নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি এইসব নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন। নিশ্চয় দিবস ও রাতের পরিবর্তনে এবং আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা-কিছু সৃষ্টি করেছেন তাতে নিদর্শন রয়েছে মুত্তাকি সম্প্রদায়ের জন্য।(৪৩৮)

তারপর কুরআন আরও সামনে এগিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট তারকা ও নক্ষত্রের নাম ধরে তাদের উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَالسَّمَاءِ وَالطَّارِقِ وَمَا أَدْرَاكَ مَا الطَّارِقُ النَّجْمُ الثَّاقِبُ)
শপথ আকাশের এবং রাতে যা আবির্ভূত হয় তার, তুমি কি জানো রাতে যা আবির্ভূত হয় তা কী? তা উজ্জ্বল নক্ষত্র!(৪৩৯)

তিনি আরও বলেন,
وَأَنَّهُ هُوَ رَبُّ الشَّعْرَى

আর এই যে, তিনি শিরা(৪৪০) নক্ষত্রের মালিক।(৪৪১)

আরও ব্যাপার আছে। কুরআন যেসব বৈজ্ঞানিক সত্য তুলে ধরেছে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর অগাধ ও বিস্তৃত জ্ঞান থাকা ছাড়া কারও পক্ষে সেগুলো বোঝা বা সেগুলো ব্যাখ্যার চেষ্টা করা সম্ভব নয়। ফলে তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মুসলিম বিজ্ঞানীদের মনোযোগ ও প্রযত্ন আবশ্যক করে তোলে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে মুসলিমদের মনোনিবেশ
মুসলিমরা তাদের মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটানোর শুরুতে পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর বিজ্ঞানীরা যে উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছিলেন তার ওপর নির্ভর করেছেন। প্রথমেই তারা গ্রিক, ক্যালডিয়ান (Chaldean), সুরয়ানি, পারসিক ও ভারতীয় বিজ্ঞানীরা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর যেসব গ্রন্থ রচনা করেছিলেন সেগুলোর অনুবাদ করেছেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরা প্রথম যে গ্রন্থটির অনুবাদ করেছেন সেটি হলো হার্মেস আল-হাকিম(৪৪২) কর্তৃক রচিত, অনূদিত গ্রন্থটির নাম 'মাফাতিহুন নুজুম'। তারা গ্রিক ভাষা থেকে আরবিতে অনুবাদ করেন। এটা উমাইয়া খিলাফতের শেষ দিকের ঘটনা। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর গ্রিক থেকে অনূদিত গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর মধ্যে আরও ছিল টলেমির আল-মাজেস্ট (Almagest)। আরবিতে এটির নাম হয় كتاب المجسطي । এটি জ্যোতির্বিদ্যা ও নক্ষত্ররাজির সঞ্চরণের ওপর রচিত। এই গ্রন্থের অনুবাদ হয়েছিল আব্বাসি খিলাফতকালে।(৪৪৩)

মুহাম্মাদ মুসা ইবনে শাকির
আব্বাসি যুগে তিনজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর আবির্ভাব ঘটে। তারা বানু মুসা ইবনে শাকির (মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা) নামে পরিচিত। এই মুসা ইবনে শাকির ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। খলিফা আল-মামুনের দরবারে থাকতেন। তিনি মারা গেলে আল-মামুন তার পুত্রদের লালনপালন ও শিক্ষাদীক্ষার দায়িত্ব নেন। তারা তখন ছোট ছিল। তিনি তাদেরকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইয়াহইয়া ইবনে মানসুরের কাছে ন্যস্ত করেন। এই ছোট ছেলেরা যখন বড় হয়ে উঠছিল তখন আল-খাওয়ারিজমি বাগদাদের বাইতুল হিকমায় বসে টলেমির ভ্রান্তিগুলোর সংশোধন করছিলেন। তিনি তখন বাইতুল হিকমায় বিজ্ঞানী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এই ছোট শিশুরা যুবকে পরিণত হলে তাদের মধ্যে একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। তিনি হলেন মুহাম্মাদ ইবনে মুসা ইবনে শাকির।

খলিফা আল-মামুন তার জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য বাগদাদের উপকণ্ঠে সবচেয়ে উঁচু স্থানে একটি মানমন্দির নির্মাণ করে দেন। বাব আশ-শামাসিয়্যার কাছাকাছিই ছিল এটির অবস্থান। বৈজ্ঞানিকভাবে ও সূক্ষ্মরূপে নক্ষত্র-পর্যবেক্ষণ ও বিস্ময়কর হিসাবনিকাশ তৈরির উদ্দেশ্যেই এই মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সে সময় গুনদেশাপুরেও (৮৮৮) একটি মানমন্দির ছিল। তিন বছর পর দামেশকের সন্নিকটে কাসিউন পাহাড়ের ওপর আরেকটি মানমন্দির স্থাপন করা হয়। বাগদাদের মানমন্দিরকে এ দুটির সঙ্গে তুলনা করা হতো এবং এদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত। জ্যোতির্বজ্ঞানীরা তারকা-সারণি তৈরির জন্য বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে কাজ করতেন। এসব তারকা-সারণির নাম হতো 'আল-মুজাররাবা' বা 'আল-মামুনিয়্যাহ'। এগুলো ছিল টলেমির প্রাচীন তারকা-সারণির সূক্ষ্ম ও যথার্থ সংস্কার।(৮৮৯)

খলিফা আল-মামুন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল নিযুক্ত করেন। তাদের অন্যতম ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনে মুসা ইবনে শাকির। বিজ্ঞানী দলটির কাজ ছিল মহাজাগতিক বস্তুরাশি পর্যবেক্ষণ করা ও এই পর্যবেক্ষণের ফলাফল লিপিবদ্ধ করা, টলেমির জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর পরীক্ষানিরীক্ষা করা এবং সৌর-কলঙ্ক (Sunspots) নিয়ে গবেষণা করা। তারা ভূ- গোলককে ভিত্তি ধরে নিয়ে একই সময়ে পালমিরা ও সিনজার থেকে সূর্যের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে পৃথিবীর (অক্ষাংশের ও দ্রাঘিমাংশের) ডিগ্রি পরিমাপ করতে শুরু করেন। তারা এই পর্যবেক্ষণ থেকে ডিগ্রি পরিমাপ করেন ৫৬.৭৫ মাইল। এটা আমাদের আধুনিক যুগের পরিমাপ থেকে আধা মাইল বেশি। এই ফলাফল থেকে তারা পৃথিবীর পরিধি পরিমাপ করেন প্রায় ২০,০০০ মাইল। আধুনিক যুগের হিসাব মতে তা ২১,৬০০ মাইল। এ সকল জ্যোতির্বিজ্ঞানী বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা ও অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রমাণিত না হলে কোনোকিছুই গ্রহণ করতেন না। তারা তাদের গবেষণায় বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক রীতি অনুসরণ করতেন।(৪৪৬)

প্রকৃত সফলতা হলো মুসলিমরা পূর্ববর্তী জাতিগুলোর জ্ঞান সংরক্ষণ করেছেন এবং তাতে যা ভুলভ্রান্তি ছিল তা সংশোধন করেছেন। তা ছাড়া ওই জ্ঞানকে তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে বের করে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা ও অভিজ্ঞতার ময়দানে নিয়ে এসেছেন। আরবরা জাহিলি যুগে যেসব কুসংস্কার ও মায়াবিদ্যায় বিশ্বাস করত তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনেককিছু থেকে এই জ্ঞানকে পবিত্র করেছেন। প্রাচীন জাতিগুলোর মধ্যে যখন জ্যোতিষতত্ত্বের উদ্ভব ঘটে তার সমকালে আরবেও কুসংস্কার ও মায়াবিদ্যায় বিস্তার ঘটে। ইসলামি শরিয়া জ্যোতিষতত্ত্বকে বাতিল করে দিয়েছে এবং একে অস্বীকার করেছে। বরং একে ইসলামি আকিদা- বিশ্বাসের বিরুদ্ধ বলে সাব্যস্ত করেছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে এটাই হলো ইসলামি সভ্যতার প্রকৃত অবদান।

মানমন্দির নির্মাণ
মুসলিমরা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষায় কতটা মনোযোগ ও গুরুত্ব দিয়েছিলেন তার জোরালো প্রমাণ মেলে এতেই যে, তারা বহু বড় বড় মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এসব মানমন্দির ছিল সব ধরনের যন্ত্রপাতিতে সুসজ্জিত এবং সার্বক্ষণিকভাবে নিযুক্ত (বেতনভুক্ত) বিজ্ঞানীরা এগুলোতে গবেষণা করতেন। ইসলামি বিশ্বের দূরদূরান্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল মানমন্দির। খলিফা আল-মামুন মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন দামেশকের সন্নিকটে কাসিয়ুন পাহাড়ের ওপর এবং বাগদাদের আশ-শামাসিয়্যাহ এলাকায়।(৪৪৭) এরই ধারাবাহিকতায় ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানমন্দির নির্মাণের কাজ চলতে থাকে। বানু মুসা ইবনে শাকির বাগদাদে একটি মানমন্দির নির্মাণ করেন। এখানে তারা পূর্ণচন্দ্রের হিসাব বের করেন। ইরানের মারাগিতে (মারাঘায়) একটি মানমন্দির ছিল। এটি নির্মাণ করেছিলেন নাসিরুদ্দিন আত-তুসি। মারাঘার মানমন্দির ছিল সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে বিখ্যাত। এটি সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিল। এই মানমন্দিরের পর্যবেক্ষণ ছিল সবচেয়ে নিখুঁত ও যথার্থ। ইউরোপের বিজ্ঞানীরা তাদের রেনেসাঁসের যুগে ও তার পরেও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই মানমন্দিরের পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করতেন। এগুলোর পাশাপাশি আরও মানমন্দির ছিল। যেমন সিরিয়ায় ইবনে শাতিরের(৪৪৮) মানমন্দির, ইস্পাহানে আদ-দিনাওয়ারির মানমন্দির, সমরকন্দে উলুগ বেগের(৪৪৯) মানমন্দির, ইরানে শারফুদ্দাওলার মানমন্দির (জ্যোতির্বিদ আবু সাহ্ আল-কুহি এ মানমন্দির থেকে সাতটি নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেছিলেন), কায়রোর দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত মুকাত্তাম পাহাড়ের ওপর নির্মিত আল-হাকিমি মানমন্দির এবং আরও অনেক মানমন্দির।(৪৫০)

মানমন্দিরের যন্ত্রপাতি
মুসলিম বিজ্ঞানীরা এসব মানমন্দিরে অসংখ্য যন্ত্রপাতি ও মেশিনারিজ ব্যবহার করেছেন, এগুলো যেমন ছিল সূক্ষ্ম তেমনই কারিগরি শৈলীতে ছিল অনন্য। এসব যন্ত্রপাতির সাহায্যে তারা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাবলি ও অবস্থাবলির ব্যাপারে অবগত হতেন। এসব যন্ত্রের অধিকাংশই ছিল মুসলিম বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত, যেগুলো ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। যেমন কীলকযুক্ত কল, আর্মিলারি স্ফেয়ার (Armillary sphere), সাইন কোয়াড্রেন্ট (Sine quadrant), আর্চেড কোয়াড্রেন্ট (Arched quadrant), হোরারি কোয়াড্রেন্ট (Horary quadrant), ফুইকুলা (Fuicula), দিগংশ ও সুবিন্দু পরিমাপযন্ত্র, ম্যারিডিয়ান কোয়াড্রেন্ট (Meridian quadrant), প্যারাল্যাকটিক রুলার (Parallactic ruler) এবং সময় পরিমাপের বিভিন্ন সূর্যঘড়ি ও অন্যান্য যন্ত্র।(৪৫১)

পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতির সাহায্যও গ্রহণ করেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা। এসব যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে অ্যাস্ট্রোল্যাব(৪৫২)। যন্ত্রটি তার গ্রিক নামই ধরে রেখেছে। মুসলিম বিজ্ঞানীরা অ্যাস্ট্রোল্যাবের উন্নতি সাধন করেন এবং নানা ধরনের নমুনা তৈরি করেন। যা তাদের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারেরই অনুষঙ্গ। যেমন তারা উদ্ভাবন করেছেন গোলকাকার অ্যাস্ট্রোল্যাব ও বোট অ্যাস্ট্রোল্যাব। বিশ্বের বিভিন্ন বিজ্ঞানজাদুঘরে এসব অ্যাস্ট্রোল্যাবের নমুনা সংরক্ষিত আছে। দিগ্বলয় থেকে নক্ষত্ররাজির উচ্চতা এবং সময় নির্ধারণে অ্যাস্ট্রোল্যাবের ব্যবহার জনপ্রিয় ছিল।(৪৫০)

জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপাত্ত-সারণি
মহাকাশের বস্তুরাশির হিসাবনিকাশের জন্য মুসলিমরা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উপাত্ত-সারণি বা তারকা-সারণি তৈরিতে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। নক্ষত্র-পর্যবেক্ষণের জন্য এটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারকা-সারণি বলতে বোঝায় গাণিতিক সংখ্যার তালিকাকে, যেখানে কক্ষপথে চলমান তারকারাজির অবস্থান নির্ধারণ, মাস ও দিন জানার সূত্রাবলি ও অতীতকালের ইতিহাস লিপিবদ্ধ থাকে। গ্রহমণ্ডলীর ঊর্ধ্ব-অবস্থান, নিম্ন-অবস্থান, হেলে বা ঝুঁকে পড়া ও অবস্থান পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ও জানা যায় তারকা-সারণি থেকে। এসব সারণি অতিশয় সূক্ষ্ম ও নির্ভুল গাণিতিক সূত্রাবলি ও সংখ্যাসূচক আইনকানুনের ওপর নির্ভরশীল। সবচেয়ে বিখ্যাত তারকা-সারণি হলো ইবনে ইউনুস আল-মিশরির(৪৫৪) (আলি ইবনে আবদুর রহমান ইবনে ইউনুস) তারকা-সারণি।(৪৫৫)

খ্যাতিমান কয়েকজন
মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেকেই বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তারা অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন এবং তাদের উত্তরসূরিদের জন্য নেতৃত্বের আসনে রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আহমাদ ইবনে ইউনুস আল-ফারগানি। পশ্চিমাবিশ্বে তিনি আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত। জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে তার রচিত গ্রন্থ کتاب في جوامع علم النجوم (A Compendium of the Science of the Stars or Elements of astronomy on the celestial motions) ইউরোপে ও পশ্চিম এশিয়ায় সাতশ বছর ধরে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিরাজমান থেকেছে।(৪৫৬) তার নামেই নামকরণ করা হয়েছে চাঁদের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ আলফ্রাগানুস-এর।

আল-বাত্তানি
বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছেন আল-বাত্তানি। তিনি বিখ্যাত আয়-যিজুস-সাবি এর (الزيج الصابئ) প্রণেতা। এই তারকা-সারণি জ্যোতির্বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি অনেক তারকার অবস্থান চিহ্নিত করেন। চাঁদের সন্তরণ ও গ্রহরাজির কক্ষপথে আবর্তন সম্পর্কে তিনি সঠিক ধারণা দেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে টলেমির কিছু ভুলও তিনি সংশোধন করে দেন। সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ-সম্পর্কিত টলেমি যে তত্ত্ব ব্যক্ত করেছিলেন, আল-বাত্তানি তা ভুল প্রমাণ করে নতুন প্রামাণিক তথ্য প্রদান করেন। সৌর-অপসূর(৪৫৭) নির্ধারণেও তিনি টলেমির বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং তার নিজের মত দেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে আল-বাত্তানির সর্বাধিক পরিচিত অর্জন হলো সৌরবর্ষ নির্ণয়। আল-বাত্তানিই প্রথম নির্ভুল পরিমাপ করে দেখিয়েছিলেন যে, এক সৌরবৎসরে ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ড হয়। এর সঙ্গে আধুনিক পরিমাপের পার্থক্য মাত্র ২ মিনিট ২২ সেকেন্ড কম। আল-বাত্তানি পৃথিবীর বিষুবরেখার মধ্য দিয়ে যাওয়া কাল্পনিক সমতলের সঙ্গে সূর্য ও পৃথিবীর কক্ষপথের মধ্যে যে সমতল, তা অসদৃশ বলে ব্যাখ্যা করেন। বিস্ময়করভাবে তিনি এই দুই কাল্পনিক সমতলের মধ্যকার কোণ পরিমাপ করেন। এই কোণকে বলা হয় 'সৌর অয়নবৃত্তের বাঁক'। আল-বাত্তানি এর পরিমাপ করেন ২৩ ডিগ্রি ৩৫ মিনিট, যা বর্তমানের আধুনিক পরিমাপ ২৩ ডিগ্রি ২৭ মিনিট ৮.২৬ সেকেন্ডের খুবই কাছাকাছি। তার এসব জ্যোতির্বিজ্ঞান-সম্পর্কিত তথ্য রেনেসাঁসের যুগে ইউরোপের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। তারা আল-বাত্তানির কাজের ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেন। কয়েক শতাব্দী পর কোপার্নিকাস কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন পরিমাপের চেয়ে আল বাত্তানির পরিমাপ অনেক বেশি নিখুঁত ছিল।(৪৫৮)

আবদুর রহমান আস-সুফি(৪৫৯)
তিনি পশ্চিমা বিশ্বে Azophi এবং Azophi Arabus নামে পরিচিত।

আবদুর রহমান আস-সুফি স্থির তারকারাজির সারণির প্রথম উদ্ভাবক। এ বিষয়ে তিনি একটি গ্রন্থও রচনা করেছেন যার আরবি নাম صُوَرُ الكَوَاكِبِ الثابتة এবং ইংরেজি নাম Book of Fixed Stars(৪৬০)। এটি তিনি ৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন। এতে তিনি ২৯৯ হিজরির/৯১১ খ্রিষ্টাব্দের স্থির তারকারাজির বিবরণ তুলে ধরেন। বিবরণের পাশাপাশি তিনি চিত্রও অঙ্কন করেছেন। এই সারণি এমনকি আধুনিক কালেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা কতিপয় তারকা এবং তাদের অবস্থান ও গতিময়তার ইতিহাস জানতে চান তাদের জন্য। এতে তিনি এক হাজারেরও বেশি তারকার চিত্র অঙ্কন করেছেন। আবদুর রহমান আস-সুফি ও তার অনন্য কীর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে চাঁদের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ 'আযোফি' ও গৌণ গ্রহ ১২৬২১ আল-সুফির নামকরণ করা হয়েছে তার নামেই।(৪৬১)

আবুল ওয়াফা আল-বুযজানি (আল-বুজানি)(৪৬২)
তিনি চন্দ্র পঞ্জিকা তৈরির জন্য একটি সমীকরণ উদ্ভাবন করেন যা গতি- সমীকরণ নামে পরিচিত। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো চাঁদের গতিময়তায় অসাম্য (lunar inequalities) আবিষ্কার। তার এই আবিষ্কার পরবর্তীকালে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও বলবিদ্যার পরিধি বিস্তৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই আবিষ্কারের মালিক ডেনিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী টাইকো ব্রাহে(৪৬৩) নাকি আল-বুযজানি তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তবে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানে সম্প্রতি প্রমাণিত হয়েছে যে, তৃতীয় অসাম্য (Third lunar inequality) হলো আল-বুযজানির অন্যতম আবিষ্কার। তার আল-মাজেস্ট (Kitāb al-Majisti) (كتاب المجسطي) তার মৃত্যুর পর কয়েক শতাব্দীব্যাপী আরব জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। তার এই গ্রন্থে গোলকাকার ত্রিকোণমিতি, গ্রহতত্ত্ব ও কিবলার দিক নির্ধারণে সমাধান প্রসঙ্গে অসংখ্য বিষয় আলোচিত হয়েছে।(৪৬৪)

আবু ইসহাক আন-নাক্কাশ আয-যারকালি(৪৬৫)
বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ। তিনি আয-যিজুত তুলাইতিলি (Toledan Tables or Tables of Toledo) প্রণেতাদের অন্যতম। এই যিজ বা তারকা-সারণির নামকরণ করা হয়েছে আন্দালুসের শহর তুলাইতিলাহ (Toledo)-এর নামে। টলেমিও আল-খাওয়ারিজমির মতো পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের থেকে আহরিত জ্ঞানের ভিত্তিতে তিনি এই তারকা-সারণি প্রস্তুত করেন। এই সারণিতে তিনি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের ফলাফল লিপিবদ্ধ করেন। তার একটি কিতাব রয়েছে الصحيفة الزيجية নামে, এতে তিনি অ্যাস্ট্রোল্যাব ব্যবহারের নতুন পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন। তিনি অ্যাস্ট্রোল্যাবের একটি উন্নত সংস্করণও উদ্ভাবন করেন। এটিকে আস-সাহিফাতুয যারকালিয়্যাহ বা আয-যারকালাহ বলা হয়। পশ্চিমাবিশ্বে এটি Saphaea নামে পরিচিত। তিনিই প্রথম প্রমাণ পেশ করেন যে, স্থির তারকারাজির তুলনায় সৌর-অপসূরের ঝুঁকে পড়ার পরিমাণ ১২০৫ মিনিটে পৌঁছে। আধুনিক নিরীক্ষায় যার পরিমাণ ১২০৮ মিনিট। আয-যারকালির নির্ণীত পরিমাণের চেয়ে মাত্র ৩ মিনিট বেশি।(৪৬৬) টলেমীয় মডেলের ডায়াগ্রাম (রেখাচিত্র) ব্যবহার করে গ্রহরাজির অবস্থান নির্ণয়ে একটি যন্ত্রও (equatorium) আবিষ্কার করেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি দুটি রচনা লেখেন, রচনা দুটি ক্যাসটাইলের রাজা আলফোনসোর (King Alfonso X) নির্দেশে স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়। এটি হিব্রু ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষাতেও অনূদিত হয়। আয-যারকালি তার کتاب الجدول (Book of Tables) গ্রন্থের জন্যও বিখ্যাত। এর একটি সারণি কিবতি (Coptic), রোমান, পারসিক ও চান্দ্রমাস শুরুর দিনটিকে নির্দেশ করে, অন্য একটি সারণি নির্দিষ্ট সময়ে গ্রহের অবস্থান নির্দেশ করে এবং অপর একটি সারণি সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের সম্ভাব্যতা নির্দেশ করে।

আবুল ইয়ুস্র বাহাউদ্দিন আল-খারাকি(৪৬৭)
ষষ্ঠ হিজরি শতকে যারা জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে মগ্ন হয়েছিলেন তিনি তাদের অন্যতম। গণিত ও ভূগোলবিদ্যায়ও তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো আত-তাবসিরাহ (التبصرة)(৪৬৮) এবং মুনতাহাল-ইদরাক ফি তাকসিমিল-আফলাক (منتهی الإدراك في تقاسيم الأفلاك)(৪৬৯)

আল-বাদি আল-আঙ্গুরলাবি(৪৭০)
তিনি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কারে অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দেন। এই ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন তার যুগের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তার উল্লেখযোগ্য কীর্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি তারকা-সারণি, যা তিনি বাগদাদের সালজুকি সুলতানের প্রাসাদে থেকে তৈরি করেছিলেন। তারকা-সারণিটি তার কিতাবে সন্নিবেশন করেন। সুলতান মাহমুদ আবুল কাসিম ইবনে মুহাম্মাদের নামে সারণিটির নামকরণ করা হয়েছে যিজ আল-মাহমুদি।(৪৭১)

ইবনে শাতির(মৃ. ৭৭৭ হি./১৩৭৫ খ্রি.) জ্যোতির্বিজ্ঞান-বিষয়ক রচনাবলিও অনেক মূল্যবান। তিনি যেসব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন তা কয়েক শতাব্দীব্যাপী প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে চালু ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার উল্লেখযোগ্য কীর্তি হলো: যিজ ইবনে শাতির ইদাহুল মুগাইয়াব ফিল-আমাল বিরল-মুজাইয়াব রিসালাহ ফিল-আঙ্গুরলাব, মুখতাসার ফিল-আমাল বিল-আঙ্গুরলাব, আন-নাফউল আম ফিল-আমাল বির-রুবইত তাম্ম, নুযহাতুস সামি ফিল-আমাল বির-রুবইল জামি, কিফায়াতুল কুনু ফিল-আমাল বির-রুবইল মাকতু, নিহায়াতুল গায়াত ফিল-আমালিল ফালাকিয়্যাত, আয-যিজুল জাদিদ। এই তারকা-সারণি তিনি উসমানি খলিফা প্রথম মুরাদের আহ্বানে প্রস্তুত করেছিলেন। ইবনে শাতির এতে যেসব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উদাহরণ, তত্ত্ব ও মত এবং পরিমাপ পেশ করেন তা ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। তবে তার এই সব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণা-ফলাফল পরবর্তীকালে নিকোলাস কোপার্নিকাসের নামে প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ইতিহাসবিদ ডেভিড এ. কিং(৪৯২) ১৩৯০ হিজরিতে/১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে আবিষ্কার করেন যে, পোলিশ গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাসের নামে চালু অধিকাংশ তত্ত্বই মূলত ইবনে শাতিরের। এর তিন বছর পর ১৩৯৩ হিজরিতে/১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে পোল্যান্ডে কিছু আরবি পাণ্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া যায়, এসব পাণ্ডুলিপি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে কোপার্নিকাস এগুলো অধ্যয়ন করেছিলেন।(৪৯৩)

উলুগ বেগ
উলুগ বেগ বিজ্ঞানীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, তাদের সব ধরনের প্রয়োজন পূরণ করে গবেষণার কাজে ভাবনাহীন রাখতেন। তিনি সমরকন্দে সেই সময়ের সবচেয়ে বড় মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন।

একজন প্রখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ লিখেছেন, উলুগ বেগ ছিলেন জ্ঞানী, ন্যায়পরায়ণ, চমৎকার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও উদ্যমী। জ্যোতির্বিজ্ঞানে ব্যাপক জ্ঞান তার দখলে ছিল। একইসঙ্গে তিনি অলংকারশাস্ত্রেরও অত্যন্ত নিপুণ পরীক্ষক ছিলেন। তার যুগে বিজ্ঞানীদের অবস্থান ছিল সবচেয়ে ঊর্ধ্বে। জ্যামিতিতে তিনি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। আর মহাবিশ্বের মানচিত্র রচনা (Cosmography)-এর ক্ষেত্রে তিনি টলেমির একটি গ্রন্থের ব্যাখ্যা লিখেছিলেন। তার মতো কোনো সম্রাট আজ পর্যন্ত সিংহাসনে বসেননি। তিনি প্রাথমিক যুগের বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় নক্ষত্রসমূহের টীকা লেখেন। তিনি সমরকন্দে একটি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সৌন্দর্যে ও মানে এবং শিক্ষাদীক্ষার উৎকর্ষে এমন মহাবিদ্যালয় সংলগ্ন সাতটি প্রদেশের কোথাও ছিল না।(৪৭৪)

উলুগ বেগ একটি আকাশ-পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে তার কার্যকালে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনে সক্ষম হন। ৭২৭ হি./১৩২৭ খ্রি. থেকে ৮৩৯ হি./১৪৩৫ খ্রি. পর্যন্ত তার আকাশ-পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকে। এই পর্যবেক্ষণ থেকে একটি সামগ্রিক সারণি তৈরি করেন। এই সারণির নাম যিজ উলুগ বেগ বা আয-যিজুস-সুলতানি। এতে তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সঙ্গে ও যথার্থভাবে নক্ষত্ররাজির অবস্থান নির্ণয় করেন। চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের সময়ও নির্ণয় করেন। উলুগ বেগ স্থির তারকারাজিরও একটি সারণি প্রস্তুত করেন। চাঁদ, সূর্য, গ্রহরাজির সন্তরণ এবং গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি শহরগুলোর দ্রাঘিমাংশ ও অক্ষাংশের সারণিও তিনি তৈরি করেন।(৪৭৫)

আর-রুদানি শামসুদ্দিন আল-ফাসি(৪৭৬)
তিনি হলেন পরবর্তীকালের মুসলিম বিজ্ঞানীদের অন্যতম, যারা জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে প্রথম যুগের মুসলিম বিজ্ঞানীদের অর্জিত কীর্তিগুলোর সাহায্য গ্রহণ করে সামনে এগিয়েছেন। আর-রুদানি সময় নির্দেশের জন্য একটি গোলকাকার যন্ত্র (গোলক অ্যাস্ট্রোল্যাব) উদ্ভাবন করেছিলেন। গোলকাকার যন্ত্রটির ওপরে ছিল কিছু বৃত্ত এবং তিসি তেলের প্রলেপযুক্ত সাদা রঙের নকশা। গোলকাকার যন্ত্রটির ওপর আরেকটি গোলক যুক্ত ছিল, যা ছিল দুটি অংশে বিভক্ত, এগুলোর ওপর ছিল সৌর-বন্ধনী ও অন্যান্য বস্তু নির্দেশক ছিদ্র। এগুলোও ছিল নিচেরটির মতো গোলকাকার ও সুবজ রঙে চিহ্নিত। আর-রুদানির এই গোলক অ্যাস্ট্রোল্যাবটি অতি সহজে ব্যবহার করা যেত এবং সব শহরের সময় নির্দেশের জন্যও ছিল যথোপযুক্ত। এ বিষয়ে তিনি 'বাহজাতুত তুল্লাব ফিল-আমাল বিল-আঙ্গুরলাব' নামে একটি পুস্তকও রচনা করেছেন, এতে তিনি অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ ও তার ব্যবহারের পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।(৪৭৭)

পরিশেষে আমরা যা আলোচনা করেছি তার প্রেক্ষিতে বলতে হয়, মুসলিম বিজ্ঞানীরা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ময়দানে-সেই সময়ে লব্ধ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির স্বল্পতা সত্ত্বেও-যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন ও অবদান রেখেছেন তা অবশ্যই সম্মানের যোগ্য, শ্রদ্ধার যোগ্য। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ময়দানে তারা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ এই যে, আকাশের বহু নক্ষত্র এখনো আরবি নাম বহন করে চলেছে। যেমন সুহাইল (Canopus), আল-মাজাররাহ (rogue star), আল-জাওযা (Betelgeuse), আদ-দাব্বুল আকবার (Ursa Major), আদ-দাব্বুল আসগার (Ursa Minor), আল-গাওল (Algol), আস-সাম্ভ এবং আরও অনেকে।

মারয়াম আল-আস্তুরলাবি(৪৭৮) দশম শতাব্দীর একজন মুসলিম নারী জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তার মূল নাম আল-ইজলিয়্যাহ বিনতে আল-ইজলি আল-আস্তুরলাবি। জ্যোতির্বিজ্ঞান ছাড়াও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় পারদর্শী ছিলেন। তার পিতা কুশিয়ার আল-জিলানি কয়েকটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গ্রন্থের রচয়িতা। যেমন 'মাজমালুল-উসুল ফি আহকামিন নুজুম', 'আল-যিজ আল-জামি' 'আল-মাদখাল ফি সানাআতি আহকামিন নুজুম' ও 'আস্তুরলাব'। তারা বসবাস করতেন সিরিয়ার আলেপ্পোতে। সেখানেই মারয়াম আল-আস্তুরলাবি তার বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক কাজ করতেন।

মারয়াম ও তার পিতা মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ নাগুলুসের শিষ্য ছিলেন। নাগুলুস ছিলেন প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী, যিনি ইতিহাসে প্রথম বিস্তৃত অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ করেছিলেন। নাগুলুসের কাছে শিক্ষাগ্রহণের পর মারয়াম 'উন্নত অ্যাস্ট্রোল্যাব' নির্মাণে ব্রতী হন। তার জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এটি ছিল একটি উৎকর্ষের প্রতীক। তিনি তার অ্যাস্ট্রোল্যাবে নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন, যাতে নির্দিষ্ট সময়ে মহাকাশের বস্তুরাশির নির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয় করা যায়।

হিজরি চতুর্দশ শতকে (খ্রিষ্টীয় দশম শতকে) মারয়াম আল-আস্তুরলাবি যখন আলেপ্পোতে বসবাস ও গবেষণা করতেন, সেই সময় সেখানকার গভর্নর ছিলেন সাইফুদ্দাওলাহ। তিনি আলেপ্পো স্টেট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা ছিল হামদানি সাম্রাজ্যের একটি প্রতীক। মারয়াম সাইফুদ্দাওলার রাজদরবারে ৯৪৪-৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মহাকাশ-গবেষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এই সময়ে তিনি একটি নয়, বিভিন্ন ধরনের একাধিক অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ করেছিলেন।

মারয়াম আল-আস্তুরলাবি যে অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ করেছিলেন তা অনেক আধুনিক নৌবৈজ্ঞানিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে বলে মনে করা হয়। যেমন কম্পাস, স্যাটেলাইট ও বিশ্বজনীন অবস্থান-নির্ণায়ক ব্যবস্থা, যা সংক্ষেপে জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) নামে পরিচিত।

মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হেনরি ই. হল্ট ১৯৯০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়াগোতে অবস্থিত পালোমার মানমন্দিরে গবেষণাকালে একটি গ্রহাণু-বেষ্টনী (asteroid belt) আবিষ্কার করেন। তিনি এটির নাম দেন 'মারয়াম আল-আস্তুরলাবি'।(৪৭৯)

টিকাঃ
৪৩৬. منازل শব্দটি منزل শব্দের বহুবচন। আরবি জ্যোতির্বিজ্ঞানে চান্দ্রমাসকে ২৮টি মনযিলে ভাগ করা হয়েছে। চান্দ্রমাসের এই মনযিলকে বাংলায় তিথি বলে।
৪৩৭. সুরা ইয়াসিন: আয়াত ৩৭-৪০।
৪৩৮. সুরা ইউনুস: আয়াত ৫-৬।
৪৩৯. সুরা তারিক: আয়াত ১-৩।
৪৪০. শিরা একটি নক্ষত্রের নাম, একে একটি সম্প্রদায় পূজা করত। বাংলায় 'লুব্ধক', ইংরেজিতে 'Sirius'.
৪৪১. সুরা নাজম: আয়াত ৪৯।
৪৪২. হার্মেস আল-হাকিম (Hermes Trismegistus): একজন গ্রিক ব্যক্তিত্ব। সত্য ও কল্পকাহিনির মিশ্রণে গড়ে উঠেছে তার ব্যক্তিত্ব।
৪৪৩. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ৩৪৮।
৪৪৬. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ১৮২।
৪৪৭. দামেশকে আরেকটি মানমন্দির ছিল, যেটি নির্মাণ করেছিলেন উমাইয়া খলিফারা।-অনুবাদক
৪৪৮. ইবনে শাতির: আবুল হাসান আলাউদ্দিন আলি ইবনে ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ আল-আনসারি আদ-দিমাশকি আল-মুআযযিন, ইবনে শাতির নামে পরিচিত (৭০৪-৭৭৭ হি./১৩০৪-১৩৭৫ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও প্রকৌশলী। ছিলেন দামেশকের প্রধান মুআযযিন। তিনি দামেশকের উমাইয়া জামে মসজিদে একটি ধর্মীয় সময়-নির্দেশক (religious timekeeper) বানিয়ে দিয়েছিলেন এবং মসজিদটির মিনারে তৈরি করে দিয়েছিলেন একটি সূর্যঘড়ি। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ে তার বহু পুস্তিকা রয়েছে। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, আদ-দুরারুল কামিনাহ, খ. ৪, পৃ. ৯।
৪৪৯. উলুগ বেগ: মির্যা মুহাম্মাদ তারাগাই ইবনে শাহরুখ ইবনে তৈমুর লং (৭৯৬-৮৫৩ হি./১৩৯৪-১৪৪৯ খ্রি.)। তৈমুরি পরিবারের চতুর্থ শাসক। উলুগ বেগ নামে সর্বাধিক পরিচিত। গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ। তিনি পাঁচটি ভাষা জানতেন আরবি, ফার্সি, তুর্কি, মঙ্গোলীয় ও চৈনিক। ত্রিকোণমিতি ও গোলীয় জ্যামিতিতে তিনি অসাধারণ দক্ষ ছিলেন। তিনি সেই যুগের সবচেয়ে বড় মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং বুখারা ও সমরকন্দে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহাবিদ্যালয়। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৭, পৃ. ৩২৮।
৪৫০. ডোনাল্ড আর, হিল, Islamic Science and Engineering, আরবি অনুবাদ, العلوم والهندسة في الحضارة الإسلامية, অনুবাদক, আহমাদ ফুয়াদ পাশা, পৃ. ৭৪-৮২; মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ৮১-৮২।
৪৫১. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৯২।
৪৫২. অ্যাস্ট্রোল্যাব (astrolabe) একটি বিস্তৃত নতি-পরিমাপক যন্ত্র (inclinometer)। একে এনালগ ক্যালকুলেটরও বলা যেতে পারে। এই যন্ত্র বিভিন্ন ধরনের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও নাবিকেরা মহাকাশীয় বা মহাজাগতিক বস্তুর দিগ্বলয়ের উপরের উচ্চতা, দিন বা রাত নির্ণয়ের জন্য এই যন্ত্র ব্যবহার করতেন। গ্রহ ও নক্ষত্র নির্ণয়ের জন্যও এই যন্ত্র ব্যবহার করা হতো। নির্দিষ্ট স্থানীয় সময়ে স্থানীয় অক্ষাংশ, জরিপ ও ত্রিভুজীকরণে (triangulation)-ও অ্যাস্ট্রোল্যাব ব্যবহৃত হতো। ধ্রুপদি সভ্যতায়, ইসলামি স্বর্ণযুগে, ইউরোপীয় মধ্যযুগে ও আবিষ্কারের যুগে উপরিউক্ত সব কাজের জন্য অ্যাস্ট্রোল্যাবের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। ইসলামি বিশ্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশকালে মুসলিম বিজ্ঞানীরা অ্যাস্ট্রোল্যাবের নকশার ক্ষেত্রে কৌণিক স্কেল প্রবর্তন করেন। দিগংশকে নির্দেশ করে এমন বৃত্ত যুক্ত করেন। কিবলা অনুসন্ধানের উপায় হিসেবেও যন্ত্রটির ব্যবহার ছিল। অষ্টম শতাব্দীর গণিতজ্ঞ মুহাম্মাদ আল-ফাযারি প্রথম অ্যাস্ট্রোল্যাব-নির্মাতা হিসেবে কৃতিত্ব অর্জন করেন।-অনুবাদক।
৪৫৪. ইবনে ইউনুস: আবুল হাসান আলি ইবনে আবদুর রহমান ইবনে ইউনুস (মৃ. ৩৯৯ হি./১০০৯ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী। উল্লেখযোগ্য রচনা: আয়-যিজুল হাকিমি, যা যিজ ইবনে ইউনুস নামে পরিচিত। মিশরের ফুসতাতে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন কায়রোতে। দশম শতাব্দীতে যিনি সময় পরিমাপের জন্য সরল দোলক ব্যবহার করেছিলেন তিনি হলেন ইবনে ইউনুস। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৩, পৃ. ৪২৯।
৪৫৫. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৫১।
৪৫৬. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ১৮২।
৪৫৭. সূর্যের চারদিকে কোনো গ্রহের কক্ষপথের নিকটতম বিন্দুকে অনুসূর (Perihelion) এবং দূরতম বিন্দুকে অপসূর (Aphelion) বলে। অনুসূর অবস্থান পাড়ি দেওয়ার সময় গ্রহরা জোরে এবং উলটোভাবে অপসূর দিয়ে যাওয়ার সময় ধীরে চলে। আমাদের সৌরজগতের গ্রহরা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। সূর্যের চারদিকে ঘূর্ণায়মান কোনো বস্তু সাধারণত বৃত্তাকার কক্ষপথে না ঘুরে অনেকটা উপবৃত্তাকার কক্ষপথ অনুসরণ করে। তাই সূর্য থেকে এর দূরত্বের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। সব গ্রহ এই নিয়ম মেনে চলে। কোনো গ্রহ থেকে সূর্যের ন্যূনতম দূরত্বকে ওই গ্রহের অনুসূর এবং এর বিপরীতকে অপসূর বলা হয়। যেদিন সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে কম থাকে, তাকে অনুসূর বলে। সাধারণত ১ থেকে ৩ জানুয়ারি সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব সবচেয়ে কম থাকে। যেদিন সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে, তাকে অপসূর বলে। সাধারণত ১ থেকে ৪ জুলাই সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৪৫৮. মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ১০৬; জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৬৪-৩৬৫; শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৫৪৩।
৪৫৯. আবদুর রহমান আস-সুফি: আবুল হুসাইন আবদুর রহমান ইবনে উমর ইবনে সাহল আর-রাযি (২৯১-৩৭৬ হি./৯০৩-৯৮৬ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী। পারস্যের (ইরানের) রায় শহরের অধিবাসী। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : رسالة العمل ،کتاب تطارح الشعاعات، کتاب التذکرة بالأسطرلاب، کتاب الکواکب الثابتة غیر المتحرکة। দেখুন, আল-কাফাতি, ইখবারুল-উলামা, পৃ. ১৫২-১৫৩।
৪৬০. গ্রন্থটির বহু পাণ্ডুলিপি ও অনুবাদ এখনো টিকে আছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বডলেইয়ান লাইব্রেরিতে গ্রন্থটির ১০০৯ খ্রিষ্টাব্দের একটি পাণ্ডুলিপি আছে। এটি মূলত লেখকের পুত্রের কাজ। ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে আছে গ্রন্থটির ত্রয়োদশ শতাব্দীর একটি অনুলিপি। -অনুবাদক
৪৬১. শাওকি আবু খলিল, দাওরুল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিন নাহদাতিল উরুব্বিয়া, প্রথম মুদ্রণ, দারুল ফিকর, দিমাশক, ১৪১৭ হি./১৯৯২ খ্রি., পৃ. ৭০।
৪৬২. আবুল ওয়াফা আল-বুযজানি : আবুল ওয়াফা মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে ইসমাইল (৩২৮-৩৮৮ হি./৯৪০-৯৯৮ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ ও যন্ত্রপ্রকৌশলী। খুরাসানের বুযজানে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন বাগদাদে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : كتاب في ما يحتاج إليه الكتاب والعمال من علم الحساب، كتاب في ما يحتاج إليه الصانع من الأعمال الهندسية، زيج الواضح، كتاب المجسطي। তিনি দাওফান্তাস (Diophantus of Alexandria) ও আল-खাওয়ারিজমির আলজেব্রা-বিষয়ক গ্রন্থের টীকা ও ব্যাখ্যা রচনা করেন এবং ইউক্লিডের এলিমেন্টস-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ লেখেন। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১৬৭।
৪৬৩. টাইকো ব্রাহে (Tycho Brahe) একজন প্রখ্যাত ডেনিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী (১৫৪৬-১৬০১ খ্রি.)। তিনি দুটি মানমন্দির নির্মাণ করেন। একটি হলো প্রাসাদ-মানমন্দির (Uraniborg) এবং তার পাশে অপরটি হলো ভূগর্ভস্থ মানমন্দির (Stjerneborg)। তিনি ডেনমার্কের সম্রাটের কাছ থেকে একটি দ্বীপ উপহার পেয়েছিলেন। ডেনমার্কের উপকূলের কাছে সেই ভেন দ্বীপেই তিনি মানমন্দির দুটি নির্মাণ করেন। তিনি অসংখ্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের উন্নতি সাধন করেন। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও গণনাকে আরও নিখুঁত করেন, নানান দেশের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তিনি যন্ত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত ব্যবহারিক ফল ও বিশেষ সারণির সাহায্যে প্রাপ্ত তাত্ত্বিক গণনা-এই দুইয়ের মধ্যে তুলনা করেও দেখতেন। দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের আগে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সর্বাধিক ও চূড়ান্ত বিকাশ ঘটেছিল তার হাতেই।
৪৬৪. কাদরি তাওকান, তুরাসুল আরাবিল ইলমি ফির-রিয়াদিয়্যাতি ওয়াল-ফালাক, পৃ. ২৩২; আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৩৫৫।
৪৬৫. আয-যারকালি: আবু ইসহাক ইবরাহিম ইবনে ইয়াহইয়া আত-তুজিবি আন-নাক্কাশ (৪২০-৪৮০ হি./১০২৯-১০৮৭ খ্রি.)। স্পেনের টলেডোয় জন্মগ্রহণ করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং একাধিক যন্ত্রের উদ্ভাবক। অ্যাস্ট্রোল্যাবের বেশ কয়েকটি সংস্কার সাধন করেন।
৪৬৬. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২০৯; শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৫৪৪।
৪৬৭. আল-খারাকি : বাহাউদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে আবু বকর আল-খারাকি (৪৬৯-৫৩৩ হি./১০৭৬-১১৩৯ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ। খাওয়ারিজমের শাহদের প্রিয়ভাজন ও তাদের রাজদরবারের জ্যোতির্বিদ ছিলেন। দেখুন, উমর রেজা কাহহালা, মুজামুল মুআল্লিফিন, খ. ৮, পৃ. ২৩৮।
৪৬৮. হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ২, পৃ. ৩৩৮; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২১৮।
৪৬৯. হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ২, পৃ. ১৮৫২।
৪৭০. আল-বাদি আল-আঙ্গুরলাবি : আবুল কাসিম হিবাতুল্লাহ ইবনুল হুসাইন ইবনে ইউসুফ আল-বাগদাদি (মৃ. ৫৩৪ হি./১১৩৯ খ্রি.)। দার্শনিক, চিকিৎসক ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী। যিজগ্রন্থ বা তারকা-সারণি বিষয়ে তার 'আল-মুআররাবুল মাহমুদি'। তিনি যেমন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নির্মাণ করেছিলেন, তেমনই পূর্ববর্তীদের তৈরিকৃত যন্ত্রপাতির সংস্কারও করেছিলেন। درة التاج من شعر ابن حجاج তার কবিতার বই। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২৯, পৃ. ১৬০।
৪৭১. ইসমাইল পাশা আল-বাবানি আল-বাগদাদি, হাদিয়্যাতুল আরিফিন আসমাউল মুআল্লিফিন ওয়া আসারুল মুসান্নিফিন, পৃ. ৭১৪।
৪৯২. ডেভিড এ. কিং জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে অবস্থিত গ্যোটে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: Mathematical Astronomy In Medieval Yemen (1983); A Survey Of The Scientific Manuscripts In The Egyptian National Library (1986); Islamic Mathematical Astronomy (1986/1993); Islamic Astronomical Instruments (1987/1995): Astronomy In The Service Of Islam (1993): The Ciphers Of The Monks: A Forgotten Number Notation Of The Middle Ages (2001).
৪৯৩. ইসমাইল পাশা আল-বাবানি, হাদিয়‍্যাতুল আরিফিন আসমাউল মুআল্লিফিন ওয়া আসারুল মুসান্নিফিন, পৃ. ৩৮৭; হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ১, পৃ. ৮১; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২৩৬-২৩৮।
৪৭৪. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ২৬, পৃ. ৫১।
৪৭৫. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ২৪৩-২৪৬।
৪৭৬. আর-রুদানি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান ইবনে আল-ফাসি (১০৩৭-১০৯৪ হি./১৬২৭-১৬৮৩ খ্রি.)। মালিকি মাযহাবপন্থী মরোক্কান মুহাদ্দিস, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পণ্ডিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : صلة الخلف بموصول السلف، جمع الفوائد من جامع الأصول ومجمع الزوائد في الجمع بين الكتب الخمسة والموطأ، مختصر تلخيص المفتاح في المعاني وشرحه، تحفة أولي الألباب في العمل بالأسطرلاب। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ১৫১।
৪৭৭. ইসমাইল পাশা আল-বাবানি, হাদিয়্যাতুল আরিফিন আসমাউল মুআল্লিফিন ওয়া আসারুল মুসান্নিফিন, পৃ. ৬০৭; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২৪৮-২৫০।
৪৭৮. অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত।
৪৭৯. ডেইলি সাবাহ, ইস্তাম্বুল, ১৬ জুলাই, ২০১৬ খ্রি.; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৬৭১।

জ্যোতির্বিজ্ঞান মুসলিমদের কাছে অনেকাংশে তাদের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। ভৌগোলিক অবস্থান ও ঋতুর ভিন্নতা অনুযায়ী নামাযের সময় নির্ধারণে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে। কেবলার দিক নির্ধারণেও জ্যোতির্বিজ্ঞানের শরণাপন্ন হতে হয়। রোযার সূচনা, হজ ও অন্যান্য বিষয়ের সময় নির্ধারণের জন্য চাঁদের চলাচলও পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়।

জ্যোতির্বিদ্যার ওপর কুরআনের গুরুত্বারোপ
কুরআনে অনেক আয়াত এসেছে যা মহাকাশ ও মানুষকে পরিবেষ্টনকারী মহাবিশ্ব সম্পর্কে গুরুত্বারোপ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যাবলি প্রদান করেছে। শুধু তাই নয়, কুরআন আকাশ ও জমিনে যা-কিছু রয়েছে তার ওপর অনুসন্ধান ও গবেষণা করতে মুসলিমদের উদ্বুদ্ধ করেছে। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি আয়াত এখানে উল্লেখ করা হলো। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَآيَةٌ لَهُمُ اللَّيْلُ نَسْلَخُ مِنْهُ النَّهَارَ فَإِذَا هُمْ مُّظْلِمُونَ وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍ لَّهَا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ وَالْقَمَرَ قَدَّرْنَاهُ مَنَازِلَ حَتَّى عَادَ كَالْعُرْجُونِ الْقَدِيمِ لَا الشَّمْسُ يَنْبَغِي لَهَا أَنْ تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ﴾
তাদের জন্য রাত এক নিদর্শন, তা থেকে আমি দিবালোককে অপসারিত করি, তখন তারা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আর সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, তা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। এবং চাঁদের জন্য আমি নির্দিষ্ট করেছি বিভিন্ন মনযিল।(৪৩৬) অবশেষে তা শুকনো বাঁকা পুরাতন খেজুরশাখার আকার ধারণ করে। সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া এবং রাতের পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।(৪৩৭)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
﴿هُوَ الَّذِي جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَاء وَالْقَمَرَ نُورًا وَقَدَّرَهُ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ مَا خَلَقَ اللهُ ذَلِكَ إِلَّا بِالْحَقِّ يُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ ) إِنَّ فِي اخْتِلافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَمَا خَلَقَ اللَّهُ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَّقُونَ﴾
তিনিই সূর্যকে তেজস্কর ও চাঁদকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং তার মনযিল নির্দিষ্ট করেছেন যাতে তোমরা বছর গণনা ও (মাসসমূহের) হিসাব জানতে পারো। আল্লাহ তা নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি এইসব নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন। নিশ্চয় দিবস ও রাতের পরিবর্তনে এবং আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা-কিছু সৃষ্টি করেছেন তাতে নিদর্শন রয়েছে মুত্তাকি সম্প্রদায়ের জন্য।(৪৩৮)

তারপর কুরআন আরও সামনে এগিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট তারকা ও নক্ষত্রের নাম ধরে তাদের উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَالسَّمَاءِ وَالطَّارِقِ وَمَا أَدْرَاكَ مَا الطَّارِقُ النَّجْمُ الثَّاقِبُ)
শপথ আকাশের এবং রাতে যা আবির্ভূত হয় তার, তুমি কি জানো রাতে যা আবির্ভূত হয় তা কী? তা উজ্জ্বল নক্ষত্র!(৪৩৯)

তিনি আরও বলেন,
وَأَنَّهُ هُوَ رَبُّ الشَّعْرَى

আর এই যে, তিনি শিরা(৪৪০) নক্ষত্রের মালিক।(৪৪১)

আরও ব্যাপার আছে। কুরআন যেসব বৈজ্ঞানিক সত্য তুলে ধরেছে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর অগাধ ও বিস্তৃত জ্ঞান থাকা ছাড়া কারও পক্ষে সেগুলো বোঝা বা সেগুলো ব্যাখ্যার চেষ্টা করা সম্ভব নয়। ফলে তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মুসলিম বিজ্ঞানীদের মনোযোগ ও প্রযত্ন আবশ্যক করে তোলে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে মুসলিমদের মনোনিবেশ
মুসলিমরা তাদের মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটানোর শুরুতে পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর বিজ্ঞানীরা যে উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছিলেন তার ওপর নির্ভর করেছেন। প্রথমেই তারা গ্রিক, ক্যালডিয়ান (Chaldean), সুরয়ানি, পারসিক ও ভারতীয় বিজ্ঞানীরা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর যেসব গ্রন্থ রচনা করেছিলেন সেগুলোর অনুবাদ করেছেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরা প্রথম যে গ্রন্থটির অনুবাদ করেছেন সেটি হলো হার্মেস আল-হাকিম(৪৪২) কর্তৃক রচিত, অনূদিত গ্রন্থটির নাম 'মাফাতিহুন নুজুম'। তারা গ্রিক ভাষা থেকে আরবিতে অনুবাদ করেন। এটা উমাইয়া খিলাফতের শেষ দিকের ঘটনা। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর গ্রিক থেকে অনূদিত গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর মধ্যে আরও ছিল টলেমির আল-মাজেস্ট (Almagest)। আরবিতে এটির নাম হয় كتاب المجسطي । এটি জ্যোতির্বিদ্যা ও নক্ষত্ররাজির সঞ্চরণের ওপর রচিত। এই গ্রন্থের অনুবাদ হয়েছিল আব্বাসি খিলাফতকালে।(৪৪৩)

মুহাম্মাদ মুসা ইবনে শাকির
আব্বাসি যুগে তিনজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর আবির্ভাব ঘটে। তারা বানু মুসা ইবনে শাকির (মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা) নামে পরিচিত। এই মুসা ইবনে শাকির ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। খলিফা আল-মামুনের দরবারে থাকতেন। তিনি মারা গেলে আল-মামুন তার পুত্রদের লালনপালন ও শিক্ষাদীক্ষার দায়িত্ব নেন। তারা তখন ছোট ছিল। তিনি তাদেরকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইয়াহইয়া ইবনে মানসুরের কাছে ন্যস্ত করেন। এই ছোট ছেলেরা যখন বড় হয়ে উঠছিল তখন আল-খাওয়ারিজমি বাগদাদের বাইতুল হিকমায় বসে টলেমির ভ্রান্তিগুলোর সংশোধন করছিলেন। তিনি তখন বাইতুল হিকমায় বিজ্ঞানী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এই ছোট শিশুরা যুবকে পরিণত হলে তাদের মধ্যে একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। তিনি হলেন মুহাম্মাদ ইবনে মুসা ইবনে শাকির।

খলিফা আল-মামুন তার জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য বাগদাদের উপকণ্ঠে সবচেয়ে উঁচু স্থানে একটি মানমন্দির নির্মাণ করে দেন। বাব আশ-শামাসিয়্যার কাছাকাছিই ছিল এটির অবস্থান। বৈজ্ঞানিকভাবে ও সূক্ষ্মরূপে নক্ষত্র-পর্যবেক্ষণ ও বিস্ময়কর হিসাবনিকাশ তৈরির উদ্দেশ্যেই এই মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সে সময় গুনদেশাপুরেও (৮৮৮) একটি মানমন্দির ছিল। তিন বছর পর দামেশকের সন্নিকটে কাসিউন পাহাড়ের ওপর আরেকটি মানমন্দির স্থাপন করা হয়। বাগদাদের মানমন্দিরকে এ দুটির সঙ্গে তুলনা করা হতো এবং এদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত। জ্যোতির্বজ্ঞানীরা তারকা-সারণি তৈরির জন্য বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে কাজ করতেন। এসব তারকা-সারণির নাম হতো 'আল-মুজাররাবা' বা 'আল-মামুনিয়্যাহ'। এগুলো ছিল টলেমির প্রাচীন তারকা-সারণির সূক্ষ্ম ও যথার্থ সংস্কার।(৮৮৯)

খলিফা আল-মামুন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল নিযুক্ত করেন। তাদের অন্যতম ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনে মুসা ইবনে শাকির। বিজ্ঞানী দলটির কাজ ছিল মহাজাগতিক বস্তুরাশি পর্যবেক্ষণ করা ও এই পর্যবেক্ষণের ফলাফল লিপিবদ্ধ করা, টলেমির জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর পরীক্ষানিরীক্ষা করা এবং সৌর-কলঙ্ক (Sunspots) নিয়ে গবেষণা করা। তারা ভূ- গোলককে ভিত্তি ধরে নিয়ে একই সময়ে পালমিরা ও সিনজার থেকে সূর্যের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে পৃথিবীর (অক্ষাংশের ও দ্রাঘিমাংশের) ডিগ্রি পরিমাপ করতে শুরু করেন। তারা এই পর্যবেক্ষণ থেকে ডিগ্রি পরিমাপ করেন ৫৬.৭৫ মাইল। এটা আমাদের আধুনিক যুগের পরিমাপ থেকে আধা মাইল বেশি। এই ফলাফল থেকে তারা পৃথিবীর পরিধি পরিমাপ করেন প্রায় ২০,০০০ মাইল। আধুনিক যুগের হিসাব মতে তা ২১,৬০০ মাইল। এ সকল জ্যোতির্বিজ্ঞানী বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা ও অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রমাণিত না হলে কোনোকিছুই গ্রহণ করতেন না। তারা তাদের গবেষণায় বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক রীতি অনুসরণ করতেন।(৪৪৬)

প্রকৃত সফলতা হলো মুসলিমরা পূর্ববর্তী জাতিগুলোর জ্ঞান সংরক্ষণ করেছেন এবং তাতে যা ভুলভ্রান্তি ছিল তা সংশোধন করেছেন। তা ছাড়া ওই জ্ঞানকে তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে বের করে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা ও অভিজ্ঞতার ময়দানে নিয়ে এসেছেন। আরবরা জাহিলি যুগে যেসব কুসংস্কার ও মায়াবিদ্যায় বিশ্বাস করত তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনেককিছু থেকে এই জ্ঞানকে পবিত্র করেছেন। প্রাচীন জাতিগুলোর মধ্যে যখন জ্যোতিষতত্ত্বের উদ্ভব ঘটে তার সমকালে আরবেও কুসংস্কার ও মায়াবিদ্যায় বিস্তার ঘটে। ইসলামি শরিয়া জ্যোতিষতত্ত্বকে বাতিল করে দিয়েছে এবং একে অস্বীকার করেছে। বরং একে ইসলামি আকিদা- বিশ্বাসের বিরুদ্ধ বলে সাব্যস্ত করেছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে এটাই হলো ইসলামি সভ্যতার প্রকৃত অবদান।

মানমন্দির নির্মাণ
মুসলিমরা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষায় কতটা মনোযোগ ও গুরুত্ব দিয়েছিলেন তার জোরালো প্রমাণ মেলে এতেই যে, তারা বহু বড় বড় মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এসব মানমন্দির ছিল সব ধরনের যন্ত্রপাতিতে সুসজ্জিত এবং সার্বক্ষণিকভাবে নিযুক্ত (বেতনভুক্ত) বিজ্ঞানীরা এগুলোতে গবেষণা করতেন। ইসলামি বিশ্বের দূরদূরান্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল মানমন্দির। খলিফা আল-মামুন মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন দামেশকের সন্নিকটে কাসিয়ুন পাহাড়ের ওপর এবং বাগদাদের আশ-শামাসিয়্যাহ এলাকায়।(৪৪৭) এরই ধারাবাহিকতায় ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানমন্দির নির্মাণের কাজ চলতে থাকে। বানু মুসা ইবনে শাকির বাগদাদে একটি মানমন্দির নির্মাণ করেন। এখানে তারা পূর্ণচন্দ্রের হিসাব বের করেন। ইরানের মারাগিতে (মারাঘায়) একটি মানমন্দির ছিল। এটি নির্মাণ করেছিলেন নাসিরুদ্দিন আত-তুসি। মারাঘার মানমন্দির ছিল সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে বিখ্যাত। এটি সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিল। এই মানমন্দিরের পর্যবেক্ষণ ছিল সবচেয়ে নিখুঁত ও যথার্থ। ইউরোপের বিজ্ঞানীরা তাদের রেনেসাঁসের যুগে ও তার পরেও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই মানমন্দিরের পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করতেন। এগুলোর পাশাপাশি আরও মানমন্দির ছিল। যেমন সিরিয়ায় ইবনে শাতিরের(৪৪৮) মানমন্দির, ইস্পাহানে আদ-দিনাওয়ারির মানমন্দির, সমরকন্দে উলুগ বেগের(৪৪৯) মানমন্দির, ইরানে শারফুদ্দাওলার মানমন্দির (জ্যোতির্বিদ আবু সাহ্ আল-কুহি এ মানমন্দির থেকে সাতটি নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেছিলেন), কায়রোর দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত মুকাত্তাম পাহাড়ের ওপর নির্মিত আল-হাকিমি মানমন্দির এবং আরও অনেক মানমন্দির।(৪৫০)

মানমন্দিরের যন্ত্রপাতি
মুসলিম বিজ্ঞানীরা এসব মানমন্দিরে অসংখ্য যন্ত্রপাতি ও মেশিনারিজ ব্যবহার করেছেন, এগুলো যেমন ছিল সূক্ষ্ম তেমনই কারিগরি শৈলীতে ছিল অনন্য। এসব যন্ত্রপাতির সাহায্যে তারা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাবলি ও অবস্থাবলির ব্যাপারে অবগত হতেন। এসব যন্ত্রের অধিকাংশই ছিল মুসলিম বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত, যেগুলো ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। যেমন কীলকযুক্ত কল, আর্মিলারি স্ফেয়ার (Armillary sphere), সাইন কোয়াড্রেন্ট (Sine quadrant), আর্চেড কোয়াড্রেন্ট (Arched quadrant), হোরারি কোয়াড্রেন্ট (Horary quadrant), ফুইকুলা (Fuicula), দিগংশ ও সুবিন্দু পরিমাপযন্ত্র, ম্যারিডিয়ান কোয়াড্রেন্ট (Meridian quadrant), প্যারাল্যাকটিক রুলার (Parallactic ruler) এবং সময় পরিমাপের বিভিন্ন সূর্যঘড়ি ও অন্যান্য যন্ত্র।(৪৫১)

পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতির সাহায্যও গ্রহণ করেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা। এসব যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে অ্যাস্ট্রোল্যাব(৪৫২)। যন্ত্রটি তার গ্রিক নামই ধরে রেখেছে। মুসলিম বিজ্ঞানীরা অ্যাস্ট্রোল্যাবের উন্নতি সাধন করেন এবং নানা ধরনের নমুনা তৈরি করেন। যা তাদের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারেরই অনুষঙ্গ। যেমন তারা উদ্ভাবন করেছেন গোলকাকার অ্যাস্ট্রোল্যাব ও বোট অ্যাস্ট্রোল্যাব। বিশ্বের বিভিন্ন বিজ্ঞানজাদুঘরে এসব অ্যাস্ট্রোল্যাবের নমুনা সংরক্ষিত আছে। দিগ্বলয় থেকে নক্ষত্ররাজির উচ্চতা এবং সময় নির্ধারণে অ্যাস্ট্রোল্যাবের ব্যবহার জনপ্রিয় ছিল।(৪৫০)

জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপাত্ত-সারণি
মহাকাশের বস্তুরাশির হিসাবনিকাশের জন্য মুসলিমরা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উপাত্ত-সারণি বা তারকা-সারণি তৈরিতে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। নক্ষত্র-পর্যবেক্ষণের জন্য এটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারকা-সারণি বলতে বোঝায় গাণিতিক সংখ্যার তালিকাকে, যেখানে কক্ষপথে চলমান তারকারাজির অবস্থান নির্ধারণ, মাস ও দিন জানার সূত্রাবলি ও অতীতকালের ইতিহাস লিপিবদ্ধ থাকে। গ্রহমণ্ডলীর ঊর্ধ্ব-অবস্থান, নিম্ন-অবস্থান, হেলে বা ঝুঁকে পড়া ও অবস্থান পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ও জানা যায় তারকা-সারণি থেকে। এসব সারণি অতিশয় সূক্ষ্ম ও নির্ভুল গাণিতিক সূত্রাবলি ও সংখ্যাসূচক আইনকানুনের ওপর নির্ভরশীল। সবচেয়ে বিখ্যাত তারকা-সারণি হলো ইবনে ইউনুস আল-মিশরির(৪৫৪) (আলি ইবনে আবদুর রহমান ইবনে ইউনুস) তারকা-সারণি।(৪৫৫)

খ্যাতিমান কয়েকজন
মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেকেই বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তারা অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন এবং তাদের উত্তরসূরিদের জন্য নেতৃত্বের আসনে রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আহমাদ ইবনে ইউনুস আল-ফারগানি। পশ্চিমাবিশ্বে তিনি আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত। জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে তার রচিত গ্রন্থ کتاب في جوامع علم النجوم (A Compendium of the Science of the Stars or Elements of astronomy on the celestial motions) ইউরোপে ও পশ্চিম এশিয়ায় সাতশ বছর ধরে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিরাজমান থেকেছে।(৪৫৬) তার নামেই নামকরণ করা হয়েছে চাঁদের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ আলফ্রাগানুস-এর।

আল-বাত্তানি
বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছেন আল-বাত্তানি। তিনি বিখ্যাত আয়-যিজুস-সাবি এর (الزيج الصابئ) প্রণেতা। এই তারকা-সারণি জ্যোতির্বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি অনেক তারকার অবস্থান চিহ্নিত করেন। চাঁদের সন্তরণ ও গ্রহরাজির কক্ষপথে আবর্তন সম্পর্কে তিনি সঠিক ধারণা দেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে টলেমির কিছু ভুলও তিনি সংশোধন করে দেন। সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ-সম্পর্কিত টলেমি যে তত্ত্ব ব্যক্ত করেছিলেন, আল-বাত্তানি তা ভুল প্রমাণ করে নতুন প্রামাণিক তথ্য প্রদান করেন। সৌর-অপসূর(৪৫৭) নির্ধারণেও তিনি টলেমির বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং তার নিজের মত দেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে আল-বাত্তানির সর্বাধিক পরিচিত অর্জন হলো সৌরবর্ষ নির্ণয়। আল-বাত্তানিই প্রথম নির্ভুল পরিমাপ করে দেখিয়েছিলেন যে, এক সৌরবৎসরে ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ড হয়। এর সঙ্গে আধুনিক পরিমাপের পার্থক্য মাত্র ২ মিনিট ২২ সেকেন্ড কম। আল-বাত্তানি পৃথিবীর বিষুবরেখার মধ্য দিয়ে যাওয়া কাল্পনিক সমতলের সঙ্গে সূর্য ও পৃথিবীর কক্ষপথের মধ্যে যে সমতল, তা অসদৃশ বলে ব্যাখ্যা করেন। বিস্ময়করভাবে তিনি এই দুই কাল্পনিক সমতলের মধ্যকার কোণ পরিমাপ করেন। এই কোণকে বলা হয় 'সৌর অয়নবৃত্তের বাঁক'। আল-বাত্তানি এর পরিমাপ করেন ২৩ ডিগ্রি ৩৫ মিনিট, যা বর্তমানের আধুনিক পরিমাপ ২৩ ডিগ্রি ২৭ মিনিট ৮.২৬ সেকেন্ডের খুবই কাছাকাছি। তার এসব জ্যোতির্বিজ্ঞান-সম্পর্কিত তথ্য রেনেসাঁসের যুগে ইউরোপের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। তারা আল-বাত্তানির কাজের ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেন। কয়েক শতাব্দী পর কোপার্নিকাস কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন পরিমাপের চেয়ে আল বাত্তানির পরিমাপ অনেক বেশি নিখুঁত ছিল।(৪৫৮)

আবদুর রহমান আস-সুফি(৪৫৯)
তিনি পশ্চিমা বিশ্বে Azophi এবং Azophi Arabus নামে পরিচিত।

আবদুর রহমান আস-সুফি স্থির তারকারাজির সারণির প্রথম উদ্ভাবক। এ বিষয়ে তিনি একটি গ্রন্থও রচনা করেছেন যার আরবি নাম صُوَرُ الكَوَاكِبِ الثابتة এবং ইংরেজি নাম Book of Fixed Stars(৪৬০)। এটি তিনি ৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন। এতে তিনি ২৯৯ হিজরির/৯১১ খ্রিষ্টাব্দের স্থির তারকারাজির বিবরণ তুলে ধরেন। বিবরণের পাশাপাশি তিনি চিত্রও অঙ্কন করেছেন। এই সারণি এমনকি আধুনিক কালেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা কতিপয় তারকা এবং তাদের অবস্থান ও গতিময়তার ইতিহাস জানতে চান তাদের জন্য। এতে তিনি এক হাজারেরও বেশি তারকার চিত্র অঙ্কন করেছেন। আবদুর রহমান আস-সুফি ও তার অনন্য কীর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে চাঁদের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ 'আযোফি' ও গৌণ গ্রহ ১২৬২১ আল-সুফির নামকরণ করা হয়েছে তার নামেই।(৪৬১)

আবুল ওয়াফা আল-বুযজানি (আল-বুজানি)(৪৬২)
তিনি চন্দ্র পঞ্জিকা তৈরির জন্য একটি সমীকরণ উদ্ভাবন করেন যা গতি- সমীকরণ নামে পরিচিত। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো চাঁদের গতিময়তায় অসাম্য (lunar inequalities) আবিষ্কার। তার এই আবিষ্কার পরবর্তীকালে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও বলবিদ্যার পরিধি বিস্তৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই আবিষ্কারের মালিক ডেনিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী টাইকো ব্রাহে(৪৬৩) নাকি আল-বুযজানি তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তবে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানে সম্প্রতি প্রমাণিত হয়েছে যে, তৃতীয় অসাম্য (Third lunar inequality) হলো আল-বুযজানির অন্যতম আবিষ্কার। তার আল-মাজেস্ট (Kitāb al-Majisti) (كتاب المجسطي) তার মৃত্যুর পর কয়েক শতাব্দীব্যাপী আরব জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। তার এই গ্রন্থে গোলকাকার ত্রিকোণমিতি, গ্রহতত্ত্ব ও কিবলার দিক নির্ধারণে সমাধান প্রসঙ্গে অসংখ্য বিষয় আলোচিত হয়েছে।(৪৬৪)

আবু ইসহাক আন-নাক্কাশ আয-যারকালি(৪৬৫)
বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ। তিনি আয-যিজুত তুলাইতিলি (Toledan Tables or Tables of Toledo) প্রণেতাদের অন্যতম। এই যিজ বা তারকা-সারণির নামকরণ করা হয়েছে আন্দালুসের শহর তুলাইতিলাহ (Toledo)-এর নামে। টলেমিও আল-খাওয়ারিজমির মতো পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের থেকে আহরিত জ্ঞানের ভিত্তিতে তিনি এই তারকা-সারণি প্রস্তুত করেন। এই সারণিতে তিনি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের ফলাফল লিপিবদ্ধ করেন। তার একটি কিতাব রয়েছে الصحيفة الزيجية নামে, এতে তিনি অ্যাস্ট্রোল্যাব ব্যবহারের নতুন পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন। তিনি অ্যাস্ট্রোল্যাবের একটি উন্নত সংস্করণও উদ্ভাবন করেন। এটিকে আস-সাহিফাতুয যারকালিয়্যাহ বা আয-যারকালাহ বলা হয়। পশ্চিমাবিশ্বে এটি Saphaea নামে পরিচিত। তিনিই প্রথম প্রমাণ পেশ করেন যে, স্থির তারকারাজির তুলনায় সৌর-অপসূরের ঝুঁকে পড়ার পরিমাণ ১২০৫ মিনিটে পৌঁছে। আধুনিক নিরীক্ষায় যার পরিমাণ ১২০৮ মিনিট। আয-যারকালির নির্ণীত পরিমাণের চেয়ে মাত্র ৩ মিনিট বেশি।(৪৬৬) টলেমীয় মডেলের ডায়াগ্রাম (রেখাচিত্র) ব্যবহার করে গ্রহরাজির অবস্থান নির্ণয়ে একটি যন্ত্রও (equatorium) আবিষ্কার করেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি দুটি রচনা লেখেন, রচনা দুটি ক্যাসটাইলের রাজা আলফোনসোর (King Alfonso X) নির্দেশে স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়। এটি হিব্রু ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষাতেও অনূদিত হয়। আয-যারকালি তার کتاب الجدول (Book of Tables) গ্রন্থের জন্যও বিখ্যাত। এর একটি সারণি কিবতি (Coptic), রোমান, পারসিক ও চান্দ্রমাস শুরুর দিনটিকে নির্দেশ করে, অন্য একটি সারণি নির্দিষ্ট সময়ে গ্রহের অবস্থান নির্দেশ করে এবং অপর একটি সারণি সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের সম্ভাব্যতা নির্দেশ করে।

আবুল ইয়ুস্র বাহাউদ্দিন আল-খারাকি(৪৬৭)
ষষ্ঠ হিজরি শতকে যারা জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে মগ্ন হয়েছিলেন তিনি তাদের অন্যতম। গণিত ও ভূগোলবিদ্যায়ও তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো আত-তাবসিরাহ (التبصرة)(৪৬৮) এবং মুনতাহাল-ইদরাক ফি তাকসিমিল-আফলাক (منتهی الإدراك في تقاسيم الأفلاك)(৪৬৯)

আল-বাদি আল-আঙ্গুরলাবি(৪৭০)
তিনি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কারে অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দেন। এই ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন তার যুগের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তার উল্লেখযোগ্য কীর্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি তারকা-সারণি, যা তিনি বাগদাদের সালজুকি সুলতানের প্রাসাদে থেকে তৈরি করেছিলেন। তারকা-সারণিটি তার কিতাবে সন্নিবেশন করেন। সুলতান মাহমুদ আবুল কাসিম ইবনে মুহাম্মাদের নামে সারণিটির নামকরণ করা হয়েছে যিজ আল-মাহমুদি।(৪৭১)

ইবনে শাতির(মৃ. ৭৭৭ হি./১৩৭৫ খ্রি.) জ্যোতির্বিজ্ঞান-বিষয়ক রচনাবলিও অনেক মূল্যবান। তিনি যেসব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন তা কয়েক শতাব্দীব্যাপী প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে চালু ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার উল্লেখযোগ্য কীর্তি হলো: যিজ ইবনে শাতির ইদাহুল মুগাইয়াব ফিল-আমাল বিরল-মুজাইয়াব রিসালাহ ফিল-আঙ্গুরলাব, মুখতাসার ফিল-আমাল বিল-আঙ্গুরলাব, আন-নাফউল আম ফিল-আমাল বির-রুবইত তাম্ম, নুযহাতুস সামি ফিল-আমাল বির-রুবইল জামি, কিফায়াতুল কুনু ফিল-আমাল বির-রুবইল মাকতু, নিহায়াতুল গায়াত ফিল-আমালিল ফালাকিয়্যাত, আয-যিজুল জাদিদ। এই তারকা-সারণি তিনি উসমানি খলিফা প্রথম মুরাদের আহ্বানে প্রস্তুত করেছিলেন। ইবনে শাতির এতে যেসব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উদাহরণ, তত্ত্ব ও মত এবং পরিমাপ পেশ করেন তা ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। তবে তার এই সব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণা-ফলাফল পরবর্তীকালে নিকোলাস কোপার্নিকাসের নামে প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ইতিহাসবিদ ডেভিড এ. কিং(৪৯২) ১৩৯০ হিজরিতে/১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে আবিষ্কার করেন যে, পোলিশ গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাসের নামে চালু অধিকাংশ তত্ত্বই মূলত ইবনে শাতিরের। এর তিন বছর পর ১৩৯৩ হিজরিতে/১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে পোল্যান্ডে কিছু আরবি পাণ্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া যায়, এসব পাণ্ডুলিপি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে কোপার্নিকাস এগুলো অধ্যয়ন করেছিলেন।(৪৯৩)

উলুগ বেগ
উলুগ বেগ বিজ্ঞানীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, তাদের সব ধরনের প্রয়োজন পূরণ করে গবেষণার কাজে ভাবনাহীন রাখতেন। তিনি সমরকন্দে সেই সময়ের সবচেয়ে বড় মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন।

একজন প্রখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ লিখেছেন, উলুগ বেগ ছিলেন জ্ঞানী, ন্যায়পরায়ণ, চমৎকার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও উদ্যমী। জ্যোতির্বিজ্ঞানে ব্যাপক জ্ঞান তার দখলে ছিল। একইসঙ্গে তিনি অলংকারশাস্ত্রেরও অত্যন্ত নিপুণ পরীক্ষক ছিলেন। তার যুগে বিজ্ঞানীদের অবস্থান ছিল সবচেয়ে ঊর্ধ্বে। জ্যামিতিতে তিনি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। আর মহাবিশ্বের মানচিত্র রচনা (Cosmography)-এর ক্ষেত্রে তিনি টলেমির একটি গ্রন্থের ব্যাখ্যা লিখেছিলেন। তার মতো কোনো সম্রাট আজ পর্যন্ত সিংহাসনে বসেননি। তিনি প্রাথমিক যুগের বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় নক্ষত্রসমূহের টীকা লেখেন। তিনি সমরকন্দে একটি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সৌন্দর্যে ও মানে এবং শিক্ষাদীক্ষার উৎকর্ষে এমন মহাবিদ্যালয় সংলগ্ন সাতটি প্রদেশের কোথাও ছিল না।(৪৭৪)

উলুগ বেগ একটি আকাশ-পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে তার কার্যকালে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনে সক্ষম হন। ৭২৭ হি./১৩২৭ খ্রি. থেকে ৮৩৯ হি./১৪৩৫ খ্রি. পর্যন্ত তার আকাশ-পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকে। এই পর্যবেক্ষণ থেকে একটি সামগ্রিক সারণি তৈরি করেন। এই সারণির নাম যিজ উলুগ বেগ বা আয-যিজুস-সুলতানি। এতে তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সঙ্গে ও যথার্থভাবে নক্ষত্ররাজির অবস্থান নির্ণয় করেন। চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের সময়ও নির্ণয় করেন। উলুগ বেগ স্থির তারকারাজিরও একটি সারণি প্রস্তুত করেন। চাঁদ, সূর্য, গ্রহরাজির সন্তরণ এবং গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি শহরগুলোর দ্রাঘিমাংশ ও অক্ষাংশের সারণিও তিনি তৈরি করেন।(৪৭৫)

আর-রুদানি শামসুদ্দিন আল-ফাসি(৪৭৬)
তিনি হলেন পরবর্তীকালের মুসলিম বিজ্ঞানীদের অন্যতম, যারা জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে প্রথম যুগের মুসলিম বিজ্ঞানীদের অর্জিত কীর্তিগুলোর সাহায্য গ্রহণ করে সামনে এগিয়েছেন। আর-রুদানি সময় নির্দেশের জন্য একটি গোলকাকার যন্ত্র (গোলক অ্যাস্ট্রোল্যাব) উদ্ভাবন করেছিলেন। গোলকাকার যন্ত্রটির ওপরে ছিল কিছু বৃত্ত এবং তিসি তেলের প্রলেপযুক্ত সাদা রঙের নকশা। গোলকাকার যন্ত্রটির ওপর আরেকটি গোলক যুক্ত ছিল, যা ছিল দুটি অংশে বিভক্ত, এগুলোর ওপর ছিল সৌর-বন্ধনী ও অন্যান্য বস্তু নির্দেশক ছিদ্র। এগুলোও ছিল নিচেরটির মতো গোলকাকার ও সুবজ রঙে চিহ্নিত। আর-রুদানির এই গোলক অ্যাস্ট্রোল্যাবটি অতি সহজে ব্যবহার করা যেত এবং সব শহরের সময় নির্দেশের জন্যও ছিল যথোপযুক্ত। এ বিষয়ে তিনি 'বাহজাতুত তুল্লাব ফিল-আমাল বিল-আঙ্গুরলাব' নামে একটি পুস্তকও রচনা করেছেন, এতে তিনি অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ ও তার ব্যবহারের পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।(৪৭৭)

পরিশেষে আমরা যা আলোচনা করেছি তার প্রেক্ষিতে বলতে হয়, মুসলিম বিজ্ঞানীরা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ময়দানে-সেই সময়ে লব্ধ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির স্বল্পতা সত্ত্বেও-যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন ও অবদান রেখেছেন তা অবশ্যই সম্মানের যোগ্য, শ্রদ্ধার যোগ্য। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ময়দানে তারা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ এই যে, আকাশের বহু নক্ষত্র এখনো আরবি নাম বহন করে চলেছে। যেমন সুহাইল (Canopus), আল-মাজাররাহ (rogue star), আল-জাওযা (Betelgeuse), আদ-দাব্বুল আকবার (Ursa Major), আদ-দাব্বুল আসগার (Ursa Minor), আল-গাওল (Algol), আস-সাম্ভ এবং আরও অনেকে।

মারয়াম আল-আস্তুরলাবি(৪৭৮) দশম শতাব্দীর একজন মুসলিম নারী জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তার মূল নাম আল-ইজলিয়্যাহ বিনতে আল-ইজলি আল-আস্তুরলাবি। জ্যোতির্বিজ্ঞান ছাড়াও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় পারদর্শী ছিলেন। তার পিতা কুশিয়ার আল-জিলানি কয়েকটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গ্রন্থের রচয়িতা। যেমন 'মাজমালুল-উসুল ফি আহকামিন নুজুম', 'আল-যিজ আল-জামি' 'আল-মাদখাল ফি সানাআতি আহকামিন নুজুম' ও 'আস্তুরলাব'। তারা বসবাস করতেন সিরিয়ার আলেপ্পোতে। সেখানেই মারয়াম আল-আস্তুরলাবি তার বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক কাজ করতেন।

মারয়াম ও তার পিতা মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ নাগুলুসের শিষ্য ছিলেন। নাগুলুস ছিলেন প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী, যিনি ইতিহাসে প্রথম বিস্তৃত অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ করেছিলেন। নাগুলুসের কাছে শিক্ষাগ্রহণের পর মারয়াম 'উন্নত অ্যাস্ট্রোল্যাব' নির্মাণে ব্রতী হন। তার জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এটি ছিল একটি উৎকর্ষের প্রতীক। তিনি তার অ্যাস্ট্রোল্যাবে নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন, যাতে নির্দিষ্ট সময়ে মহাকাশের বস্তুরাশির নির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয় করা যায়।

হিজরি চতুর্দশ শতকে (খ্রিষ্টীয় দশম শতকে) মারয়াম আল-আস্তুরলাবি যখন আলেপ্পোতে বসবাস ও গবেষণা করতেন, সেই সময় সেখানকার গভর্নর ছিলেন সাইফুদ্দাওলাহ। তিনি আলেপ্পো স্টেট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা ছিল হামদানি সাম্রাজ্যের একটি প্রতীক। মারয়াম সাইফুদ্দাওলার রাজদরবারে ৯৪৪-৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মহাকাশ-গবেষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এই সময়ে তিনি একটি নয়, বিভিন্ন ধরনের একাধিক অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ করেছিলেন।

মারয়াম আল-আস্তুরলাবি যে অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ করেছিলেন তা অনেক আধুনিক নৌবৈজ্ঞানিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে বলে মনে করা হয়। যেমন কম্পাস, স্যাটেলাইট ও বিশ্বজনীন অবস্থান-নির্ণায়ক ব্যবস্থা, যা সংক্ষেপে জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) নামে পরিচিত।

মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হেনরি ই. হল্ট ১৯৯০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়াগোতে অবস্থিত পালোমার মানমন্দিরে গবেষণাকালে একটি গ্রহাণু-বেষ্টনী (asteroid belt) আবিষ্কার করেন। তিনি এটির নাম দেন 'মারয়াম আল-আস্তুরলাবি'।(৪৭৯)

টিকাঃ
৪৩৬. منازل শব্দটি منزل শব্দের বহুবচন। আরবি জ্যোতির্বিজ্ঞানে চান্দ্রমাসকে ২৮টি মনযিলে ভাগ করা হয়েছে। চান্দ্রমাসের এই মনযিলকে বাংলায় তিথি বলে।
৪৩৭. সুরা ইয়াসিন: আয়াত ৩৭-৪০।
৪৩৮. সুরা ইউনুস: আয়াত ৫-৬।
৪৩৯. সুরা তারিক: আয়াত ১-৩।
৪৪০. শিরা একটি নক্ষত্রের নাম, একে একটি সম্প্রদায় পূজা করত। বাংলায় 'লুব্ধক', ইংরেজিতে 'Sirius'.
৪৪১. সুরা নাজম: আয়াত ৪৯।
৪৪২. হার্মেস আল-হাকিম (Hermes Trismegistus): একজন গ্রিক ব্যক্তিত্ব। সত্য ও কল্পকাহিনির মিশ্রণে গড়ে উঠেছে তার ব্যক্তিত্ব।
৪৪৩. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ৩৪৮।
৪৪৬. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ১৮২।
৪৪৭. দামেশকে আরেকটি মানমন্দির ছিল, যেটি নির্মাণ করেছিলেন উমাইয়া খলিফারা।-অনুবাদক
৪৪৮. ইবনে শাতির: আবুল হাসান আলাউদ্দিন আলি ইবনে ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ আল-আনসারি আদ-দিমাশকি আল-মুআযযিন, ইবনে শাতির নামে পরিচিত (৭০৪-৭৭৭ হি./১৩০৪-১৩৭৫ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও প্রকৌশলী। ছিলেন দামেশকের প্রধান মুআযযিন। তিনি দামেশকের উমাইয়া জামে মসজিদে একটি ধর্মীয় সময়-নির্দেশক (religious timekeeper) বানিয়ে দিয়েছিলেন এবং মসজিদটির মিনারে তৈরি করে দিয়েছিলেন একটি সূর্যঘড়ি। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ে তার বহু পুস্তিকা রয়েছে। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, আদ-দুরারুল কামিনাহ, খ. ৪, পৃ. ৯।
৪৪৯. উলুগ বেগ: মির্যা মুহাম্মাদ তারাগাই ইবনে শাহরুখ ইবনে তৈমুর লং (৭৯৬-৮৫৩ হি./১৩৯৪-১৪৪৯ খ্রি.)। তৈমুরি পরিবারের চতুর্থ শাসক। উলুগ বেগ নামে সর্বাধিক পরিচিত। গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ। তিনি পাঁচটি ভাষা জানতেন আরবি, ফার্সি, তুর্কি, মঙ্গোলীয় ও চৈনিক। ত্রিকোণমিতি ও গোলীয় জ্যামিতিতে তিনি অসাধারণ দক্ষ ছিলেন। তিনি সেই যুগের সবচেয়ে বড় মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং বুখারা ও সমরকন্দে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহাবিদ্যালয়। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৭, পৃ. ৩২৮।
৪৫০. ডোনাল্ড আর, হিল, Islamic Science and Engineering, আরবি অনুবাদ, العلوم والهندسة في الحضارة الإسلامية, অনুবাদক, আহমাদ ফুয়াদ পাশা, পৃ. ৭৪-৮২; মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ৮১-৮২।
৪৫১. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৯২।
৪৫২. অ্যাস্ট্রোল্যাব (astrolabe) একটি বিস্তৃত নতি-পরিমাপক যন্ত্র (inclinometer)। একে এনালগ ক্যালকুলেটরও বলা যেতে পারে। এই যন্ত্র বিভিন্ন ধরনের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও নাবিকেরা মহাকাশীয় বা মহাজাগতিক বস্তুর দিগ্বলয়ের উপরের উচ্চতা, দিন বা রাত নির্ণয়ের জন্য এই যন্ত্র ব্যবহার করতেন। গ্রহ ও নক্ষত্র নির্ণয়ের জন্যও এই যন্ত্র ব্যবহার করা হতো। নির্দিষ্ট স্থানীয় সময়ে স্থানীয় অক্ষাংশ, জরিপ ও ত্রিভুজীকরণে (triangulation)-ও অ্যাস্ট্রোল্যাব ব্যবহৃত হতো। ধ্রুপদি সভ্যতায়, ইসলামি স্বর্ণযুগে, ইউরোপীয় মধ্যযুগে ও আবিষ্কারের যুগে উপরিউক্ত সব কাজের জন্য অ্যাস্ট্রোল্যাবের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। ইসলামি বিশ্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশকালে মুসলিম বিজ্ঞানীরা অ্যাস্ট্রোল্যাবের নকশার ক্ষেত্রে কৌণিক স্কেল প্রবর্তন করেন। দিগংশকে নির্দেশ করে এমন বৃত্ত যুক্ত করেন। কিবলা অনুসন্ধানের উপায় হিসেবেও যন্ত্রটির ব্যবহার ছিল। অষ্টম শতাব্দীর গণিতজ্ঞ মুহাম্মাদ আল-ফাযারি প্রথম অ্যাস্ট্রোল্যাব-নির্মাতা হিসেবে কৃতিত্ব অর্জন করেন।-অনুবাদক।
৪৫৪. ইবনে ইউনুস: আবুল হাসান আলি ইবনে আবদুর রহমান ইবনে ইউনুস (মৃ. ৩৯৯ হি./১০০৯ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী। উল্লেখযোগ্য রচনা: আয়-যিজুল হাকিমি, যা যিজ ইবনে ইউনুস নামে পরিচিত। মিশরের ফুসতাতে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন কায়রোতে। দশম শতাব্দীতে যিনি সময় পরিমাপের জন্য সরল দোলক ব্যবহার করেছিলেন তিনি হলেন ইবনে ইউনুস। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৩, পৃ. ৪২৯।
৪৫৫. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৫১।
৪৫৬. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ১৮২।
৪৫৭. সূর্যের চারদিকে কোনো গ্রহের কক্ষপথের নিকটতম বিন্দুকে অনুসূর (Perihelion) এবং দূরতম বিন্দুকে অপসূর (Aphelion) বলে। অনুসূর অবস্থান পাড়ি দেওয়ার সময় গ্রহরা জোরে এবং উলটোভাবে অপসূর দিয়ে যাওয়ার সময় ধীরে চলে। আমাদের সৌরজগতের গ্রহরা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। সূর্যের চারদিকে ঘূর্ণায়মান কোনো বস্তু সাধারণত বৃত্তাকার কক্ষপথে না ঘুরে অনেকটা উপবৃত্তাকার কক্ষপথ অনুসরণ করে। তাই সূর্য থেকে এর দূরত্বের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। সব গ্রহ এই নিয়ম মেনে চলে। কোনো গ্রহ থেকে সূর্যের ন্যূনতম দূরত্বকে ওই গ্রহের অনুসূর এবং এর বিপরীতকে অপসূর বলা হয়। যেদিন সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে কম থাকে, তাকে অনুসূর বলে। সাধারণত ১ থেকে ৩ জানুয়ারি সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব সবচেয়ে কম থাকে। যেদিন সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে, তাকে অপসূর বলে। সাধারণত ১ থেকে ৪ জুলাই সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৪৫৮. মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ১০৬; জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৬৪-৩৬৫; শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৫৪৩।
৪৫৯. আবদুর রহমান আস-সুফি: আবুল হুসাইন আবদুর রহমান ইবনে উমর ইবনে সাহল আর-রাযি (২৯১-৩৭৬ হি./৯০৩-৯৮৬ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী। পারস্যের (ইরানের) রায় শহরের অধিবাসী। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : رسالة العمل ،کتاب تطارح الشعاعات، کتاب التذکرة بالأسطرلاب، کتاب الکواکب الثابتة غیر المتحرکة। দেখুন, আল-কাফাতি, ইখবারুল-উলামা, পৃ. ১৫২-১৫৩।
৪৬০. গ্রন্থটির বহু পাণ্ডুলিপি ও অনুবাদ এখনো টিকে আছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বডলেইয়ান লাইব্রেরিতে গ্রন্থটির ১০০৯ খ্রিষ্টাব্দের একটি পাণ্ডুলিপি আছে। এটি মূলত লেখকের পুত্রের কাজ। ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে আছে গ্রন্থটির ত্রয়োদশ শতাব্দীর একটি অনুলিপি। -অনুবাদক
৪৬১. শাওকি আবু খলিল, দাওরুল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিন নাহদাতিল উরুব্বিয়া, প্রথম মুদ্রণ, দারুল ফিকর, দিমাশক, ১৪১৭ হি./১৯৯২ খ্রি., পৃ. ৭০।
৪৬২. আবুল ওয়াফা আল-বুযজানি : আবুল ওয়াফা মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে ইসমাইল (৩২৮-৩৮৮ হি./৯৪০-৯৯৮ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ ও যন্ত্রপ্রকৌশলী। খুরাসানের বুযজানে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন বাগদাদে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : كتاب في ما يحتاج إليه الكتاب والعمال من علم الحساب، كتاب في ما يحتاج إليه الصانع من الأعمال الهندسية، زيج الواضح، كتاب المجسطي। তিনি দাওফান্তাস (Diophantus of Alexandria) ও আল-खাওয়ারিজমির আলজেব্রা-বিষয়ক গ্রন্থের টীকা ও ব্যাখ্যা রচনা করেন এবং ইউক্লিডের এলিমেন্টস-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ লেখেন। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১৬৭।
৪৬৩. টাইকো ব্রাহে (Tycho Brahe) একজন প্রখ্যাত ডেনিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী (১৫৪৬-১৬০১ খ্রি.)। তিনি দুটি মানমন্দির নির্মাণ করেন। একটি হলো প্রাসাদ-মানমন্দির (Uraniborg) এবং তার পাশে অপরটি হলো ভূগর্ভস্থ মানমন্দির (Stjerneborg)। তিনি ডেনমার্কের সম্রাটের কাছ থেকে একটি দ্বীপ উপহার পেয়েছিলেন। ডেনমার্কের উপকূলের কাছে সেই ভেন দ্বীপেই তিনি মানমন্দির দুটি নির্মাণ করেন। তিনি অসংখ্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের উন্নতি সাধন করেন। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও গণনাকে আরও নিখুঁত করেন, নানান দেশের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তিনি যন্ত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত ব্যবহারিক ফল ও বিশেষ সারণির সাহায্যে প্রাপ্ত তাত্ত্বিক গণনা-এই দুইয়ের মধ্যে তুলনা করেও দেখতেন। দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের আগে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সর্বাধিক ও চূড়ান্ত বিকাশ ঘটেছিল তার হাতেই।
৪৬৪. কাদরি তাওকান, তুরাসুল আরাবিল ইলমি ফির-রিয়াদিয়্যাতি ওয়াল-ফালাক, পৃ. ২৩২; আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৩৫৫।
৪৬৫. আয-যারকালি: আবু ইসহাক ইবরাহিম ইবনে ইয়াহইয়া আত-তুজিবি আন-নাক্কাশ (৪২০-৪৮০ হি./১০২৯-১০৮৭ খ্রি.)। স্পেনের টলেডোয় জন্মগ্রহণ করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং একাধিক যন্ত্রের উদ্ভাবক। অ্যাস্ট্রোল্যাবের বেশ কয়েকটি সংস্কার সাধন করেন।
৪৬৬. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২০৯; শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৫৪৪।
৪৬৭. আল-খারাকি : বাহাউদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে আবু বকর আল-খারাকি (৪৬৯-৫৩৩ হি./১০৭৬-১১৩৯ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ। খাওয়ারিজমের শাহদের প্রিয়ভাজন ও তাদের রাজদরবারের জ্যোতির্বিদ ছিলেন। দেখুন, উমর রেজা কাহহালা, মুজামুল মুআল্লিফিন, খ. ৮, পৃ. ২৩৮।
৪৬৮. হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ২, পৃ. ৩৩৮; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২১৮।
৪৬৯. হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ২, পৃ. ১৮৫২।
৪৭০. আল-বাদি আল-আঙ্গুরলাবি : আবুল কাসিম হিবাতুল্লাহ ইবনুল হুসাইন ইবনে ইউসুফ আল-বাগদাদি (মৃ. ৫৩৪ হি./১১৩৯ খ্রি.)। দার্শনিক, চিকিৎসক ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী। যিজগ্রন্থ বা তারকা-সারণি বিষয়ে তার 'আল-মুআররাবুল মাহমুদি'। তিনি যেমন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নির্মাণ করেছিলেন, তেমনই পূর্ববর্তীদের তৈরিকৃত যন্ত্রপাতির সংস্কারও করেছিলেন। درة التاج من شعر ابن حجاج তার কবিতার বই। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২৯, পৃ. ১৬০।
৪৭১. ইসমাইল পাশা আল-বাবানি আল-বাগদাদি, হাদিয়্যাতুল আরিফিন আসমাউল মুআল্লিফিন ওয়া আসারুল মুসান্নিফিন, পৃ. ৭১৪।
৪৯২. ডেভিড এ. কিং জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে অবস্থিত গ্যোটে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: Mathematical Astronomy In Medieval Yemen (1983); A Survey Of The Scientific Manuscripts In The Egyptian National Library (1986); Islamic Mathematical Astronomy (1986/1993); Islamic Astronomical Instruments (1987/1995): Astronomy In The Service Of Islam (1993): The Ciphers Of The Monks: A Forgotten Number Notation Of The Middle Ages (2001).
৪৯৩. ইসমাইল পাশা আল-বাবানি, হাদিয়‍্যাতুল আরিফিন আসমাউল মুআল্লিফিন ওয়া আসারুল মুসান্নিফিন, পৃ. ৩৮৭; হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ১, পৃ. ৮১; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২৩৬-২৩৮।
৪৭৪. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ২৬, পৃ. ৫১।
৪৭৫. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ২৪৩-২৪৬।
৪৭৬. আর-রুদানি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান ইবনে আল-ফাসি (১০৩৭-১০৯৪ হি./১৬২৭-১৬৮৩ খ্রি.)। মালিকি মাযহাবপন্থী মরোক্কান মুহাদ্দিস, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পণ্ডিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : صلة الخلف بموصول السلف، جمع الفوائد من جامع الأصول ومجمع الزوائد في الجمع بين الكتب الخمسة والموطأ، مختصر تلخيص المفتاح في المعاني وشرحه، تحفة أولي الألباب في العمل بالأسطرلاب। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ১৫১।
৪৭৭. ইসমাইল পাশা আল-বাবানি, হাদিয়্যাতুল আরিফিন আসমাউল মুআল্লিফিন ওয়া আসারুল মুসান্নিফিন, পৃ. ৬০৭; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২৪৮-২৫০।
৪৭৮. অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত।
৪৭৯. ডেইলি সাবাহ, ইস্তাম্বুল, ১৬ জুলাই, ২০১৬ খ্রি.; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৬৭১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00