📄 ভূগোলবিদ্যা
ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের রচনাবলি এখনো পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। এসব রচনায় যেসব তথ্য ও সংবাদ রয়েছে তা আমাদের ঐতিহাসিক ভূগোল-বিষয়ক জ্ঞানকে বৃদ্ধি করেছে। তাদের এসব রচনায় মূলত বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পরোক্ষভাবে তা আমাদের ওইসব দেশের ইতিহাস-সম্পর্কিত জ্ঞানকেও সমৃদ্ধ করেছে। এই ময়দানে ইসলামের উত্তরাধিকার বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।(৩৭৬)
এটা আমাদের কথা নয়, বরং তা জার্মান-ইসরাইলি গবেষক মার্টিন প্লেসনারের(৩৭৭) কথা।
ইসলামের আগমনের পূর্বেই ভূগোলবিদ্যার চর্চা শুরু হয়েছিল। কিন্তু আরবদের প্রাগ্রসরতা ও তাদের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জ্ঞানবিজ্ঞানের ফলে ভূগোলবিদ্যায়ও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ও উৎকর্ষ সাধিত হয়। এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই যে, আরবরা শুরুর দিকে গ্রিকদের বিজ্ঞান গ্রহণ করেছিল, বিশেষ করে টলেমির। ভূগোলবিদ্যায় গ্রিকরাই ছিল তাদের পথপ্রদর্শক। তবে এই ক্ষেত্রেও আরবরা তাদের গুরুদের ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যেমনটা ছিল তাদের অভ্যাস।(৩৭৮)
এটাও আমাদের বক্তব্য নয়, বরং বিখ্যাত ফরাসি চিন্তাবিদ গুস্তাভ লি বোঁর বক্তব্য।
ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের উদ্ভাবন ও অবদান
ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের উদ্ভাবন ও অবদানকে আমরা তিনটি বিভাগে চিহ্নিত করতে পারি:
• পূর্ববর্তী ভ্রান্তি-বিভ্রাটের সংশোধন
• দেশ ও নিদর্শনসমূহের যথার্থ বর্ণনা
• আবিষ্কার ও উদ্ভাবন
পৃথিবীর গোলকাকৃতির প্রমাণ
পৃথিবী যে গোলাকার তা প্রথম মুসলিমরাই প্রমাণ করেছিলেন। ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার যাত্রা শুরু হয় এভাবেই। গ্রিকরা বিশ্বাস করত যে, পৃথিবী হলো বৃত্তাকার সমতল চাকতি, যাকে সব দিক থেকে বেষ্টন করে রেখেছে সমুদ্রের জলরাশি।
হেকাটিয়াস (Hecataeus of Miletus 500 BC)—যাকে গ্রিক ভূগোলবিদ্যার জনক বিবেচনা করা হয়—তো পৃথিবীকে একটি বৃত্তাকার চাকতি ধরে নিয়ে তার মানচিত্র অঙ্কন করেছেন।(৩৭৯) পৃথিবী যে গোলাকার তার প্রথম তাত্ত্বিক ধারণা দেন প্লেটো (৩৪৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ), তবে তিনি তার পরবর্তী দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের থেকে যথার্থ সমর্থন পাননি। এমনকি রোমান সাম্রাজ্য তার এই চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে। রোমান ভূগোলবিদ্যার জনক কসমাস (Cosmas) ৫৪৭ খ্রিষ্টাব্দে লিখেছেন, পৃথিবী হলো চাকার সদৃশ, সমুদ্রের জলরাশি তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে...।' বিষয়টি জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যখন গির্জা ও গির্জার প্রথম সারির ফাদাররা—যাদের নেতৃত্বে ছিলেন লাকটানটিয়াস (Lactantius)—কসমাসের উপর্যুক্ত তত্ত্বকে বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং সিদ্ধান্ত দেন যে, পৃথিবী হলো সমতল এবং অন্যপাশ হলো অনাবাদিত, তা (পৃথিবী সমতল) না হলে মানুষ শূন্যে পতিত হতো!(৩৮০)
ইসলামি সভ্যতা আবির্ভাবের পর তা পৃথিবীর গোলকাকার তত্ত্বকে গ্রহণ করে এবং এই তত্ত্বের পুনর্জীবনদানে সচেষ্ট হয়। এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল এই যে, পবিত্র কুরআন বিভিন্নভাবে পৃথিবীর গোলকাকৃতির প্রতি ইঙ্গিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَاهَا
এবং পৃথিবীকে তারপর বিস্তৃত করেছেন।(৩৮১)
'দাহিয়্যা' শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো গোলক। পবিত্র কুরআনে আরও অনেক আয়াত রয়েছে যেগুলো এই গোলকটি যে তার নিজের চারপাশে (কক্ষপথে) ঘূর্ণায়মান তা নিয়ে আলোচনা করেছে। গোলকটির (পৃথিবীর) এমন আবর্তনের ফলেই দিবস ও রজনীর সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ
তিনি রাতের দ্বারা দিবসকে আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে আচ্ছাদিত করেন রাতের দ্বারা।(৩৮২)
ইবনে খুররাদাযবিহ(৩৮৩) বলেছেন, পৃথিবী বলের মতোই গোলাকার, ডিমের ভেতরে থাকা কুসুমের মতো।(৩৮৪) ইবনে রুসতাইও(৩৮৫) একই কথা বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আকাশকে বলের মতো গোলকাকার বানিয়েছেন, তা শূন্যগর্ভ ঘূর্ণনশীল; পৃথিবীও গোলাকার এবং আকাশের অভ্যন্তরে রয়েছে।(৩৮৬)
বিখ্যাত সাহিত্যিক ও আল-ইব্দুল ফারিদ গ্রন্থের প্রণেতা ইবনে আবদি রাব্বিহি(৩৮৭) কয়েকটি পঙ্ক্তি রচনা করেছেন, যেখানে তিনি আবু উবাইদা মুসলিম ইবনে আহমাদ আল-ফালাকির(৩৮৮) বক্তব্যের খণ্ডন করেছেন।
আমরা তার পঙ্ক্তিমালা থেকে জানতে পারি যে, আবু উবাইদা আল-ফালাকি পৃথিবী গোলকাকার বলে মত ব্যক্ত করতেন। কিন্তু ইবনে আবদি রাব্বিহি তার সঙ্গে একমত ছিলেন না। তাই তিনি বলেছেন,
أبا عبيدة ما المسؤول عن خبر تحكيه إلا سؤالاً للذي سألا أبيت إلا شذوذا عن جماعتنا ولم تعب رأي من أزجا ولا اعتزلا كذلك القبلة الأولى مُبدَّلة وقد أبيت فما تبغي بها بدلا زعمت بهرام أو بيدخت يرزقنا لا بل عطارد أو برجيس أو زُحَلا وقلت إن جميع الخلق في فلك بهم يحيط وفيهم يقسم الأجـلا والأرض كورية حق السماء بها فوقاً وتحتاً وصارت نقطة مثلا صيف الجنوب شتاء للشَّمَالِ بها قد صار بينهما هذا وذا دولا فإن كانون في صنعا وقرطبة برد وأيلول يُذكي فيهما الشعلا كما استمر ابن موسى في غوايته فوعر السهل حتى خِلْتَهُ جَبَلا أبلغ معاوية المصغي لقولهما أني كفرت بما قالا وما فعلا
আবু উবাইদা, আপনি যা বলেন সে বিষয়ে আপনি দায়িত্বশীল নন, বরং প্রশ্নকারীর জন্য রেখে যান প্রশ্ন।
আপনি আমাদের দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন এবং যে বিচ্ছিন্ন হয় বা পাশ কাটিয়ে যায় তার বক্তব্য সঠিক হয় না।
প্রথম কেবলার পরিবর্তন হয়েছিল; কিন্তু আপনি তা স্বীকার করেন না এবং এ ধরনের পরিবর্তন আশাও করেন না।
আপনি দাবি করেছেন, বাহরাম(৩৮৯) বা বায়দুগ্ধ(৩৯০) আমাদের রিযিক দান করে, না বরং বুধগ্রহ বা বৃহস্পতিগ্রহ বা শনিগ্রহ রিযিক দান করে।
আপনি বলেছেন, সমস্ত সৃষ্টি রয়েছে এক মহাকাশে, যা তাদের বেষ্টন করে আছে এবং তাদের মধ্যে মহাকাশই নির্ধারণ করে সময়।
আপনি আরও বলেছেন, পৃথিবী হলো গোলাকার, আকাশ তাকে উপর দিক ও নিচ দিক থেকে ঘিরে রেখেছে, যেন তা আকাশের মধ্যস্থলে একটি বিন্দু।
পৃথিবীর দক্ষিণে (দক্ষিণ মেরুতে) যখন গ্রীষ্ম, উত্তরে (উত্তর মেরুতে) তখন শীত, উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর মধ্যস্থলে রয়েছে পৃথিবীর সব দেশ।
সানআ ও কর্ডোভায় ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে থাকে শীত, আর সেপ্টেম্বর মাস এখানে জ্বালায় আগুন।
ইবনে মুসাও তার পথভ্রষ্টতায় রয়েছেন অটল; তিনি সমতলকে করে তোলেন এতটা অসমান যে (বা সহজ বিষয়কে করে তোলেন এতটা কঠিন যে) তাকে তোমার পাহাড় মনে হয়।
মুআবিয়াকে—যে তাদের দুইজনের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে—জানিয়ে দাও, তারা দুইজন (আবু উবায়দা ও ইবনে মুসা) যা বলেন ও করেন তা আমি স্বীকার করি না।
এখানে একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। এই আবু উবাইদার জীবনচরিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তার কাছে মিথ্যাচারের চেয়ে আকাশ থেকে পতনও সহজতর। এই বক্তব্য প্রথমত তার চারিত্রিক গুণাবলিকে নির্দেশ করলে তা থেকে এই বিশ্বাস জন্মে যে, তিনি ছিলেন সূক্ষ্ম অনুসন্ধানী, সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে খুঁটিয়ে দেখতেন, কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আগে দীর্ঘ অনুসন্ধান ও গবেষণা করতেন।
আবু উবাইদা হিজরি তৃতীয় শতকের (খ্রিস্টীয় নবম শতকের) একজন বিজ্ঞানী। আন্দালুসে যারা জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকেন তিনি ছিলেন তাদের প্রথম সারির অন্যতম ব্যক্তি। আমাদের জন্য আরও একটি ব্যাপার জানা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলামি বিশ্ব এসব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে — তা যতটাই অভিনব হোক—কখনো প্রত্যাখ্যান করেনি এবং বিরোধিতাও করেনি। তা ছাড়া যারা কিছুটা বিরোধিতা করতেন, তারাও স্বাভাবিক সীমারেখার বাইরে গিয়ে বিরোধিতা করতেন না। এখানে আমাদের সংগত কারণেই এ কথাও স্মরণে রাখতে হবে যে, এই সময় থেকে ইউরোপে পাঁচশ বছরব্যাপী জ্ঞানের বিকাশ ছিল রক্তে প্লাবিত, আগুনে দগ্ধ ও ইনকুইজিশনের নির্যাতনের শিকার।
ইবনে হাযম আল-আন্দালুসি ও পৃথিবীর গোলাকৃতি
এখানে আমাদের এ কথা বলে রাখাও সংগত যে, ইসলামি ধর্মীয় জ্ঞানীরা সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়াতে পারেন না। তারা ইসলামে এমন শিক্ষা পান যা জ্ঞানগত সত্যকে সমর্থন করে এবং সত্য অস্বীকারকারীদের বিরোধিতা করে। যেমন ইবনে হাযম আল-আন্দালুসি পৃথিবীর গোলাকৃতির ব্যাপারে মুসলিম ইমাম ও মনীষীদের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আলেমগণ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে, পৃথিবী যে গোলাকার সে ব্যাপারে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে এবং এই প্রমাণগুলো সঠিক। তবে এর বিপরীত ছিল সাধারণ মানুষের বক্তব্য। (সাধারণ মানুষের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে) আমাদের জবাব এই যে—আল্লাহ তাআলাই তাওফিকদাতা—মুসলিম মনীষীদের কেউই, যারা এমনকি ‘জ্ঞানের ইমাম’ উপাধি ধারণের হকদার, পৃথিবীর গোলকাকৃতিকে অস্বীকার করেননি। তাদের কেউই এই বক্তব্যের সমর্থনে নিজেদের পক্ষ থেকে একটি শব্দও খরচ করেননি। বরং কুরআন ও সুন্নাহ থেকেই পৃথিবীর গোলকাকৃতির ও ঘূর্ণনের ব্যাপারে বহু প্রমাণ এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ
তিনি রাতের দ্বারা দিবসকে আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে আচ্ছাদিত করেন রাতের দ্বারা।(৩৯১)
এদের একটি যে আরেকটিকে পেঁচিয়ে রয়েছে সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা এটি। كور العمامة (সে পাগড়ি পেঁচালো) ধাতু থেকে কথাটি এসেছে। পেঁচানোই পাগড়ি বাঁধার প্রক্রিয়া এবং গোলকাকার বস্তুতেই পেঁচানো হয়। পৃথিবীর গোলকাকৃতির ব্যাপারে এটা স্পষ্ট দলিল...।(৩৯২)
আল-ইদরিসি ও পৃথিবীর গোলাকৃতি
শরিফ আল-ইদরিসি যা বলেছেন, নিশ্চয় পৃথিবী বলের গোলকাকৃতির মতো গোলকাকার। পানি তার সঙ্গে এঁটে রয়েছে এবং প্রাকৃতিকভাবেই তার ওপর স্থির রয়েছে ও পড়ে যাচ্ছে না। জলসহ পৃথিবী রয়েছে মহাকাশের অভ্যন্তরীণ শূন্যতায়, যেমন ডিমের অভ্যন্তরে থাকে কুসুম। জলসহ পৃথিবীর অবস্থান মধ্যবর্তী এবং বাতাস (অর্থাৎ বায়ুমণ্ডল) তাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখেছে।(৩৯৩)
আল-ইদরিসি যেসব মানচিত্র এঁকেছিলেন তার সম্পর্কে উইল ডুরান্ট বলেছেন, এসব মানচিত্র মধ্যযুগে মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যার (cartography) শ্রেষ্ঠ ফসল। তার পূর্বে এর চেয়ে পূর্ণাঙ্গ, এর চেয়ে সূক্ষ্ম, এর চেয়ে বিস্তৃত ও ব্যাপক মানচিত্র কোথাও অঙ্কন করা হয়নি। অধিকাংশ মুসলিম বিজ্ঞানী যেমন পৃথিবীর গোলকাকৃতির বিষয়টিকে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন, আল-ইদরিসিও তা-ই করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, এটি বিশুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত সত্য।(৩৯৪)
এতকিছুর পরও বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, কিছু আরবি গ্রন্থ ও তথ্যসূত্র এখনো পশ্চিমা তথ্যসূত্র থেকে নকল করে প্রচার করে যাচ্ছে যে পৃথিবীর গোলকাকৃতির তত্ত্বের সঙ্গে মুসলিমদের পরিচয় ছিল না। বরং কোপার্নিকাসের কল্যাণেই এ তত্ত্বটি ঘোষিত হয়। আপনি এখন কোপার্নিকাসের মৃত্যুতারিখ (১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দ) আমাদের আলোচিত মুসলিম বিজ্ঞানীদের মৃত্যুতারিখের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন, কে কাদের থেকে এই তত্ত্ব গ্রহণ করেছে সেই সত্য প্রতিভাত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট!
খলিফা আল-মামুন এবং পৃথিবীর আয়তনের পরিমাপ
মুসলিমরা যে পৃথিবীর গোলকাকৃতির বিষয়টি প্রমাণ করেছিলেন তার কৃতিত্ব দেওয়া হয় আব্বাসি খলিফা আল-মামুনকে (মৃ. ২১৮ হি./৮৩৩ খ্রি.)। তিনিই প্রথম ভূ-গোলকের আয়তন (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, বেধ) পরিমাপের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এই কাজে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ও ভূগোলবিদদের দুটি দলকে নিযুক্ত করেন। একটি দলের নেতৃত্বে থাকে গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী সিন্দ ইবনে আলি(৩৯৫) এবং অপর দলটির নেতৃত্বে থাকেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ আলি ইবনে ঈসা আল-আঙ্গুরলাবি(৩৯৬)। (এ কথাও বলা হয়ে থাকে যে, দুটি দলের একটির নেতৃত্বে ছিলেন বানু মুসা ইবনে শাকির বা মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা।) খলিফা তাদের দুইজনের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, তারা দুইজন পৃথিবীর পরিধির মহাবৃত্তের পূর্ব ও পশ্চিমের দুটি ভিন্ন নির্দিষ্ট স্থানে যাবেন এবং উভয়েই দ্রাঘিমারেখার এক ডিগ্রি পরিমাণ পরিমাপ করবেন (যে দ্রাঘিমারেখা ৩৬০ ডিগ্রি হবে)। ইবনে খাল্লিকান বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যেক দলই একটি বিস্তৃত সমতল ভূখণ্ড বেছে নেয়, ভূখণ্ডের একটি স্থানে একটি কীলক স্থাপন করে। তারপর ধ্রুবতারাকে(৩৯৭) স্থির বিন্দু ধরে নিয়ে কীলক ও ধ্রুবতারা এবং ভূমির মধ্যে কোণ নির্ণয় করে। তারপর উত্তর দিকে এমন জায়গায় এগিয়ে যায় যেখানে ওই কোণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তারপর উভয় দল কীলক দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব পরিমাপ করে। তারা ভূমির ওপর দূরত্ব পরিমাপ করত কীলকের ওপর বাঁধা রশির দ্বারা।(৩৯৮)
বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, ভূ-গোলকের আয়তন পরিমাপের ফল ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং সামসময়িক বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের অধিকতর নিকটবর্তী। খলিফা আল-মামুন উভয় দলের নির্ণীত পরিমাণের গড় হিসাব গ্রহণ করেন এবং দেখেন যে এটা ৫,৬৬৬ মাইলের কাছাকাছি। আর সামসময়িক বিজ্ঞান সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে এটা ৫,৬৯৩ মাইল। আল-মামুনের এই পরিমাপ অনুযায়ী পৃথিবীর পরিধি হলো ২০,৪০০ মাইল, অর্থাৎ, প্রায় ৪১,২৪৮ কিলোমিটার। আধুনিক কালে স্যাটেলাইটের দ্বারা পরিমাপকৃত পৃথিবীর পরিধি হলো ৪০,০৭০ কিলোমিটার। আপনি আল-মামুনের নিযুক্ত দল দুটির পরিমাপ ও আধুনিক স্যাটেলাইটের পরিমাপ মিলিয়ে দেখুন, দেখবেন, উভয় পরিমাপের মধ্যে ভুলের পরিমাণ ৩%-এরও কম! নিশ্চয় এটি গৌরব করার মতো বিষয়।(৩৯৯)
টলেমির জিয়োগ্রাফি (Geography of Claudius Ptolemy) অন্যতম মৌলিক গ্রন্থ, যার ওপর মুসলিমরা তাদের ভৌগোলিক বিদ্যার ভিত্তিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বলতে গেলে এটিই একমাত্র গ্রন্থ যা মুসলিমরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্বসূরিদের উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। এর সঙ্গে অবশ্য আরেকটি গ্রন্থ ছিল, সেটির রচয়িতা হলেন মারিনুস অফ টায়ার(৪০০); তবে এই গ্রন্থটির গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত কম।(৪০১)
মুসলিমরা পূর্ববর্তীদের ভ্রান্তি সংশোধন করলেন
টলেমি তার মানচিত্রে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ নির্ধারণে যেসব ভুল করেছিলেন মুসলিম ভূগোলবিদেরা তার সংশোধন করেন। তার এসব ভ্রান্তির মধ্যে কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো। তিনি ভূমধ্যসাগরের দৈর্ঘ্যসীমা নির্ধারণে অনেক বেশি অতিরঞ্জিত করেন এবং তার পরিচিত পৃথিবীর আবাদিত অংশের বিস্তৃতি নির্ধারণেও বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যান। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে হ্রদ বলে চিহ্নিত করেন। অর্থাৎ যখন তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করেন তখন এই কাজটি করেন। সাইলোন দ্বীপের (শ্রীলংকার) আয়তন নির্ধারণেও তিনি অতিরঞ্জিত করেন। কাস্পিয়াস সাগর ও পারস্য উপসাগরের অবস্থান নির্ধারণে তিনি মারাত্মক ভুল করেন। মুসলিমরা এসব ভ্রান্তিসহ অন্যান্য ভ্রান্তিরও সংশোধন করেন। তারপর মুসলিমরা পৃথিবীকে তাদের বর্ণনামূলক মানচিত্র উপহার দেন, কমপক্ষে পাঁচ শতাব্দী ধরে ভূগোলবিদ ও পর্যটকদের বহু দল এটির চূড়ান্ত রূপদানে অংশগ্রহণ করেন। এই মানচিত্র অঙ্কনের মধ্য দিয়ে তারা এমন অনন্য কীর্তি রেখে যান, মধ্যযুগে যার কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়নি।(৪০২)
টলেমি যেসব শহরের ভৌগোলিক অবস্থান চিহ্নিত করেছিলেন তার অধিকাংশেরই বাস্তবিক অবস্থানের সঙ্গে মোটেই মিল ছিল না। কেবল ভূমধ্যসাগরের দৈর্ঘ্য নির্ধারণে তার ভ্রান্তির পরিমাণ হলো চারশ ফারসাখ (তিনি একে চারশ ফারসাখ বাড়িয়ে দেখান)।
আরবদের হাতে ভূগোলবিদ্যার কী পরিমাণ উন্নতি সাধিত হয়েছিল তা স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য গ্রিকদের নির্ণীত জায়গাগুলোর সঙ্গে আরবদের নির্ণীত জায়গাগুলোকে মিলিয়ে দেখাই যথেষ্ট।(৪০৩)
অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখা নির্ধারণ
মুসলিমরাই প্রথম ভূ-গোলকের মানচিত্রের ওপর অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখা নির্ধারণ ও অঙ্কন করেন। প্রথম যিনি দ্রাঘিমারেখা ও অক্ষরেখা নির্ধারণ করেন তিনি হলেন আবু আলি আল-মুররাকুশি(৪০৪)। তার এ কাজের পেছনে একটি মহৎ উদ্দেশ্য ছিল। যাতে মুসলিমরা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নামাযের জন্য সমান সময় নির্ধারণ করতে পারেন। আল-বিরুনিই প্রথম ভূ-গোলককে সমতলে রূপান্তরের (সমতলকরণের) গাণিতিক নীতি প্রস্তুত করেন। এটি হলো রেখা ও চিত্রকে গোলক থেকে সমতলে রূপান্তর করা এবং সমতল থেকে গোলকে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া। তিনি এই গাণিতিক নীতি অঙ্কনের মধ্য দিয়ে ভৌগোলিক মানচিত্র অঙ্কন সহজ করে তোলেন।(৪০৫)
পৃথিবীর ঘূর্ণায়মানতা সম্পর্কে গবেষণা
যে সময়টাতে বিশ্বে কেউ কল্পনাও করতে পারত না যে পৃথিবী হলো গোলকাকার এবং ভূ-গোলকের নিজ কক্ষপথে ঘূর্ণায়মানতার বিষয়ে কেউ আলোচনাও করত না, সেই সময়ে খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে (হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে) তিনজন মুসলিম বিজ্ঞানী পৃথিবীর ঘূর্ণায়মানতা ও আবর্তনের বিষয়টিকে আলোচনায় নিয়ে আসেন। তারা হলেন কাযভিনের আলি ইবনে উমর আল-কাতিবি(৪০৬), আন্দালুসের কুবুদ্দিন আশ-শিরাজি এবং সিরিয়ার আবুল ফারজ আলি। মানবেতিহাসে তারাই প্রথমবার পৃথিবী যে নিজ কক্ষপথে সূর্যের সামনে প্রতি দিনে-রাতে একবার ঘোরে সেই সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করেন। এই বিজ্ঞানীত্রয় সম্পর্কে জর্জ সার্টন বলেন, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এই তিনজন বিজ্ঞানী যে গবেষণা করেন তা বিফলে যায়নি। বরং তা নিকোলাস কোপার্নিকাসের গবেষণায় অন্যতম অনুঘটক হিসেবে প্রভাব রেখেছে। এই গবেষণা থেকেই কোপার্নিকাস ১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দে (পৃথিবীর ঘূর্ণায়মানতার) তাত্ত্বিক কাঠামো প্রকাশ করেন।(৪০৭)
ভৌগোলিক বিশ্বকোষ রচনা
ভূগোলবিদ্যায় ইসলামি সভ্যতার বিজ্ঞানীরা প্রকৃত অর্থেই বহু ভৌগোলিক বিশ্বকোষ রচনা করেন। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। ইয়াকুত হামাবির রচনা মুজামুল বুলদান। এই বিশ্বকোষ সম্পর্কে উইল ডুরান্ট বলেন, এটি একটি বৃহদাকার ভৌগোলিক বিশ্বকোষ; তিনি এতে মধ্যযুগের যাবতীয় পরিচিত ভৌগোলিক তথ্য সংগ্রহ করেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রকৃতিবিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব, মানব-ভূগোলবিদ্যা, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে মধ্যযুগে পরিচিত তথ্যের একটিকেও তিনি বাদ দেননি, বরং প্রতিটি তথ্যকে তার এই বিশ্বকোষে সংকলন করেছেন। এ ছাড়াও তিনি শহরগুলোর তুলনামূলক আয়তন এবং সেগুলোর গুরুত্ব, এসব শহরে বসবাসকারী বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবন ও কর্ম ইত্যাদিকে স্থান দিয়েছেন। এই মহান জ্ঞানী পৃথিবীকে যতটা ভালোবেসেছেন, অন্য কেউ ততটা ভালোবেসেছেন বলে আমাদের জানা নেই।(৪০৮)
গুস্তাভ লি বোঁ বলেছেন, ভূগোলবিদ্যার ওপর আরবদের রচিত যেসব গ্রন্থ আমরা পেয়েছি তার গুরুত্ব অপরিসীম। এসব গ্রন্থের কয়েকটি ইউরোপে বহু শতাব্দীব্যাপী ভূগোলবিদ্যার পঠনপাঠনের মৌলিক ভিত্তি ছিল।(৪০৯)
লি বোঁ আরও বলেন, শরিফ আল-ইদরিসি পৃথিবীর যে-মানচিত্র অঙ্কন করেন তার চিত্র আমি প্রকাশ করেছি। এই মানচিত্রে নীলনদ ও বড় বড় ট্রপিক্যাল লেকের উৎস সম্পর্কে বিবরণ দেওয়া আছে। এসব স্থান সম্পর্কে ইউরোপীয়রা এই আধুনিক কালের আগ পর্যন্ত কোনো সন্ধান পায়নি। আল-ইদরিসির এই মানচিত্র অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তার এই মানচিত্রে প্রমাণিত হয় যে, মহা-আফ্রিকার ভূগোল সম্পর্কে আরবদের জ্ঞান ছিল দীর্ঘকাল ধরে যা ধারণা করা হতো তার চেয়ে অনেক বেশি।(৪১০)
ইসলামি মানচিত্রাবলি এবং সমুদ্রবিজ্ঞানের ওপর মুসলিমদের রচনাবলি পাশ্চাত্য নৌ-চলাচলবিদ্যার অগ্রগতিতে পরিপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।(৪১১)
সামুদ্রিক অভিযান ও আমেরিকা আবিষ্কার
মুসলিমদের সামুদ্রিক অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি হলো আমেরিকা আবিষ্কার। যার কৃতিত্ব দেওয়া হয় ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে(৪১২) যে, তিনি ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন। মুসলিমরা পৃথিবীর গোলকাকৃতির বিষয়টি ঘোষণা করলেন এবং তা গাণিতিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দলিল-প্রমাণের দ্বারা সাব্যস্ত করলেন। তারপর তাদের রচনাসমূহে এমন ইঙ্গিত প্রকাশ পেতে শুরু করল যে, ভূ-গোলকের অপর পৃষ্ঠে অবশ্যই আবাদিত জনপদ রয়েছে, যা এখনো অনাবিষ্কৃত। এই তাত্ত্বিক ধারণার একটি ভিত্তি ছিল। তা এই যে, এটা কখনো বোধগম্য নয় যে পৃথিবীর একটি পৃষ্ঠ সম্পূর্ণরূপে স্থলভাগ এবং অপর পৃষ্ঠ সম্পূর্ণরূপে জলভাগ। কারণ তা পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করবে এবং তার ঘূর্ণায়মানতা ও আবর্তনের শৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটাবে।(৪১৩)
আল-বিরুনি প্রথম এই সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করেন এবং তার গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ভৌগোলিক আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু হয়। বড় বড় মুসলিম ভূগোলবিদদের রচনাবলিতে এসব অভিযান সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আল-মাসউদি(৪১৪) কর্তৃক রচিত 'মুরজুয-যাহাব ওয়া মাআদিনুল জাওহার' এবং শরিফ আল-ইদরিসি কর্তৃক রচিত 'নুযহাতুল মুশতাক ফি ইখতিরাকিল আফাক' ইত্যাদি।
বিদ্যমান তথ্য থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে যে, খাশখাশ ইবনে সাইদ আল-বাহরি নামের একজন আরব আন্দালুসীয় নাবিক ২৩৫ হিজরিতে (৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে) তার নৌযান চালিয়ে লিসবন থেকে পশ্চিম দিকে আটলান্টিক মহাসাগরে এগিয়ে যান। তিনি সাগরে একটি আবাদিত দ্বীপ আবিষ্কার করেন, যেখানে বহু বাসিন্দা রয়েছে। তিনি তাদের থেকে উপঢৌকন এনে আন্দালুসের শাসক দ্বিতীয় আবদুর রহমানের সামনে পেশ করেন। পুরস্কারস্বরূপ আবদুর রহমান খাশখাশকে ইসলামি নৌবহরের আমির নিযুক্ত করেন। এই নাবিক পরে ভাইকিংদের(৪১৫) সঙ্গে একটি সমুদ্রযুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন।(৪১৬) তিনিই আমেরিকার আবিষ্কারক হিসেবে প্রতীয়মান হন।
বিদ্যমান তথ্যে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে যে, পশ্চিম আফ্রিকার (মরক্কোর) আরবদের একটি দল আটলান্টিক মহাসাগরে বেরিয়ে ওই দ্বীপে যায়। এটা হিজরি চতুর্থ শতক এবং খ্রিষ্টীয় দশম শতকের ঘটনা। কিন্তু তাদের কেউই ফিরে আসে না এবং তাদের সম্পর্কে কোনো সংবাদও জানা যায় না। তারপর তাদের ঘিরে 'অভিযাত্রী যুবকেরা' (المُغَرَّرين قصة الفتية) নামে একটি গল্প তৈরি হয়। অভিযাত্রী যুবকদের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন আল-মাসউদি ও আল-ইদরিসি। এই গল্প থেকে জানা যায় যে, লিসবন শহরে আটজন আরব যুবক আটলান্টিক মহাসাগরে অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সবাই ছিল একটি নাবিক পরিবারের সদস্য। তারা ওই দ্বীপটি খুঁজে বের করতে চায় যেখানে তাদের পূর্বসূরিরা গিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং যাদের সম্পর্কে কোনো সংবাদ জানা যায়নি। ফলে শহরবাসী তাদের 'অভিযাত্রী তরুণদল' (الفتية المغررين) উপাধিতে আখ্যায়িত করে। এখানে المغرر শব্দটা এসেছে الغرة ধাতু থেকে, যার অর্থ অগ্রযাত্রা বা অভিযাত্রা। শব্দটি الغرور ধাতু নিষ্পন্ন (المغرورين) (আত্মপ্রবঞ্চিত) নয়, যদিও কোনো কোনো তথ্যসূত্রে এ শব্দটিই রয়েছে। আল-মাসউদি তার 'মুরুজুয-যাহাব' গ্রন্থে 'যারা আটলান্টিক মহাসাগর ভ্রমণে প্রাণের ঝুঁকি নিয়েছিল, তাদের মধ্যে যারা বেঁচে গিয়েছিল ও যারা ধ্বংস হয়েছিল এবং তারা যা দেখেছিল সেই সম্পর্কিত সংবাদ' (أخبار من خاطر بنفسه في ركوبه - أي المحيط الأطلسي ومن نجا منهم ومن تلف، وما شاهدوا منه وما رأوا) শিরোনামে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
আল-ইদরিসিও এই গল্পের অবতারণা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এই আটজন যুবক আন্দালুসে ফিরে এলে লিসবনের বাসিন্দারা তাদের ঘিরে ধরে। নানা ধরনের সাজসজ্জা ও আনন্দ-উল্লাসের সঙ্গে তাদের অভিনন্দন জানায়। এই যুবকেরা যে সড়কে বসবাস করত সেই সড়কের নাম দেয় 'অভিযাত্রী তরুণদের সড়ক'। এটা খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীর শেষ দিকের ঘটনা। তারপর লিসবনে এই নামটি কয়েকশ বছর ধরে পরিচিত ছিল। - অনুবাদক আবু উবাইদুল্লাহ আল-আন্দালুসি
আবু উবাইদুল্লাহ আল-বাকরি আল-আন্দালুসি (মৃ. ৪৮৭ হি.) তার 'আল-মাসালিক ওয়াল-মামালিক' গ্রন্থে লিসবনের আরব অভিযাত্রী যুবকদের কাহিনি উল্লেখ করেছেন, যারা আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিল। তিনি তাদের ফিরে আসার পরের কাহিনি উল্লেখ করেছেন। ফিরে এসে তারা জানায় যে, ওখানে তাদের সঙ্গে যাদের সাক্ষাৎ ঘটেছে তারা আরবিতে কথাবার্তা বলে। তারা ওই ভূমিখণ্ডের বর্ণনাও দেয়, সেটি ছিল ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের মতো। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কলম্বাসের আমেরিকায় পৌঁছার তিনশ বছর আগে থেকেই সেখানে মুসলিমরা ছিল।
শিহাবুদ্দিন আল-আরাবি আল-উমারি (১০০০-১৩৪৯ খ্রি.) খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে তার ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ 'মাসালিকুল আবসার ওয়া মামালিকুল আমসার' রচনা করেন। এটি মোট ২৭ খণ্ডে রচিত। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মালি সাম্রাজ্য ছিল ইসলামি শাসনাধীন, মানসা মুসা (মুসা অব মালি) তা শাসন করতেন। মানসা মুসা ঐতিহাসিক শিহাবুদ্দিন আল-উমারির সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তাকে মালির নবম সম্রাটের কাহিনি বর্ণনা করেন। তিনি ছিলেন মানসা মুসার বড় ভাই ও তার পূর্ববর্তী সম্রাট। তিনি আটলান্টিক মহাসাগরে অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্যে শাসনকার্যই ছেড়ে দেন। আটলান্টিকের ওপারে কী রয়েছে তা তিনি দেখতে চান। এই সংকল্পে তিনি ২০০ জাহাজ ও ২০০০ নৌকা প্রস্তুত করেন। এগুলোতে শুকনো খাবার ও স্বর্ণ বোঝাই করেন। এটা কলম্বাসের আমেরিকায় পৌঁছার ১০০ বছর আগের ঘটনা।
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, আমেরিকায় প্রকৃতপক্ষেই আফ্রিকান মুসলিমদের উপস্থিতি ছিল। কলম্বাসের নিজের একটি পাণ্ডুলিপিতে মার্কিন ভূখণ্ডে আফ্রিকানদের উপস্থিতির বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তারা সোনা গলাত।-অনুবাদক
আরবরাই যে আমেরিকা আবিষ্কারে এগিয়ে ছিলেন তা-ই আন্দালুসের ভূগোলবিদদের রচনা থেকে স্পষ্ট হয়। ঐতিহাসিক ও ভাষাবিজ্ঞানী আল-আব্ আনাসতাস মারি আল-কারমালির(৪১৭) বক্তব্য থেকে এ বিষয়টি আরও জোরালো হয়। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মুসলিমরা কলম্বাসের বহু পূর্বেই লিসবন থেকে আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন। কারণ তারা আটলান্টিক মহাসাগরে উষ্ণ গলফ স্ট্রিম (Gulf Stream red-hot) সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখতেন। তিনি বলেন, অন্যান্য সব জাতি থেকে আরব জাতিই এই স্ট্রিম ও তার বৈশিষ্ট্যাবলি জানার ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিল। তা মেক্সিকো থেকে কীভাবে আয়ারল্যান্ডে যায় এবং আয়ারল্যান্ড থেকে কীভাবে মেক্সিকোতে ফিরে আসে সেই সম্পর্কে তাদেরই সবচেয়ে বেশি জ্ঞান ছিল।(৪১৮)
মুসলিমগণ আমেরিকার আবিষ্কারক, এ ব্যাপারে যা বলা হলো তার চেয়েও স্পষ্ট, বিস্ময়কর ও প্রভাবসঞ্চারী হলো ওই মানচিত্র যা জার্মান প্রাচ্যবিদ পল আর্নেস্ট কাহলে(৪১৯) তুরস্কের তোপকাপি প্যালেস গ্রন্থাগার থেকে আবিষ্কার করেছেন। কয়েক বছরব্যাপী আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও পরীক্ষানিরীক্ষার পর ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এই মানচিত্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন। এই মানচিত্র বিজ্ঞানীদের মাথা খারাপ করে দেয়, গোটা বিশ্বকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে ফেলে। এই মানচিত্র ছিল তুর্কি মুসলিম ভূগোলবিদের রচিত, তিনি হলেন পিরি রেয়িস (Piri Reis)(৪২০)। তার পূর্ণনাম মুহিউদ্দিন ইবনে মুহাম্মাদ আর-রেয়িস। তিনি ছিলেন তুর্কি নৌবহরের অন্যতম নৌকমান্ডার। তিনি ছিলেন সেই সময়ের 'মাস্টার অফ দা সি'। তার মানচিত্রটি মূলত কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন মানচিত্রে বিভক্ত। এটি আটলান্টিক মহাসাগরের পূর্বাংশকে বর্ণনা করেছে, যেখানে রয়েছে স্প্যানিশ ও পশ্চিম আফ্রিকান উপকূলসমূহ। আপনি যদি এই মানচিত্রে আটলান্টিকের পশ্চিমাংশকে দেখেন তাহলে দেখবেন যে, সেখানে রয়েছে আমেরিকান ভূখণ্ড, তার উপকূলসমূহ ও দ্বীপসমূহ, বন্দর ও জীবজন্তু। আরও রয়েছে রেড ইন্ডিয়ানদের চিত্র, তাদেরকে তিনি চিত্রিত করেছেন নগ্ন অবস্থায় এবং তারা মেষ চরাচ্ছে।
রুশ-সোভিয়েত প্রাচ্যবিদ ও আরবি ভাষাবিদ ইগন্যাটি ইয়ুলিয়ানোভিচ ক্র্যাচকোঙ্কি (Ignaty Yulianovich Krachkovsky) তারিখ الأدب الجغرافي العربي গ্রন্থে এই মানচিত্রের বিচার-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, পিরি রেয়িস তার মানচিত্র কলম্বাসের মানচিত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন। তুর্কি নৌবহর ১৪৯৯ খ্রিষ্টাব্দে যখন ভেনেটিয়ান নৌবহরকে পরাজিত করে এবং তাদের কয়েকটি জাহাজ আটক করে তখন হয়তো কলম্বাসের মানচিত্র পিরি রেয়িসের হাতে এসে থাকবে।(৪২১)
কিন্তু অধিকাংশ গবেষকই ক্র্যাচকোস্কির এই মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তার বিরুদ্ধমত প্রকাশ করেছেন। কারণ পিরি রেয়িসের মানচিত্রে এমন সব জায়গার বর্ণনা ছিল যা কলম্বাস জানতেনই না এবং তার সেগুলো আবিষ্কারেরও প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু এ সকল গবেষক বিকল্প বিচার-বিশ্লেষণ করেননি যার দ্বারা এই রহস্যময় মানচিত্রের রহস্য উন্মোচিত হয়।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। তা এই যে, ১৯৫২ সালে ব্রাজিলীয় নিউজপেপারগুলো একটি বিবৃতি প্রকাশ করে, বিবৃতিটি দেন ড. জাগরিস, যিনি দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব দা উইটওয়াটারস্ট্যান্ড-এর সামাজিক প্রত্নতত্ত্ববিদ্যার (social archaeological sciences) অধ্যাপক। (অ্যারাবিয়ান বিজনেস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী) বিবৃতিতে বলা হয়, ইতিহাসের গ্রন্থাবলি আমেরিকা আবিষ্কারের বিষয়টিকে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বড় ভুল করেছে। তার কারণ, কলম্বাসের কয়েকশ বছর পূর্বে প্রকৃতপক্ষে আরবরাই(৪২২) (আরব মুসলিমরাই) আমেরিকা আবিষ্কার করেছে।(৪২৩) অধ্যাপক ড. জাগরিসের ছয় বছরব্যাপী পরিচালিত গবেষণার ভিত্তি ছিল মানব-কাঠামো পরীক্ষানিরীক্ষা, যা ব্রাজিলীয় গ্রেনাডায় (Grenada) আবিষ্কৃত হয়েছিল।(৪২৪)
দক্ষিণ মেরুতে ষষ্ঠ মহাদেশ আবিষ্কার
মুহিউদ্দিন আর-রেয়িস (পিরি রেয়িস)-এর মানচিত্রে বিস্ময়কর এমন কিছু ছিল, যার ফলে তা মহাকাশ ভ্রমণ ও স্যাটেলাইট থেকে পৃথিবীর ছবি উত্তোলনের যুগ শুরু হওয়ার পরও বিজ্ঞানীদের স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ত রেখেছে। বিংশ শতাব্দীতে আমেরিকা ও ইউরোপে মানচিত্রাঙ্কনবিদদের প্রথম বিশ্বাস ছিল যে পিরি রেয়িসের মানচিত্রগুলো ততটা সূক্ষ্ম ও যথার্থ নয়, বরং এর চিত্রাঙ্কনে বেশ ভুলত্রুটি রয়েছে। মার্কিন উপকূলীয় অঞ্চল সম্পর্কে তাদের সর্বশেষ সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এমনই ছিল বিশ্বাস। কিন্তু যখন প্রথমবার স্যাটেলাইট থেকে এসব অঞ্চলের ছবি তুলে তা প্রকাশ করা হয় তখন তারা বিমূঢ় হয়ে পড়েন। কারণ তারা এতদিন পর্যন্ত যা ভেবেছেন ও চিন্তা করেছেন মুহিউদ্দিন আর-রেয়িসের মানচিত্রই তার চেয়ে অধিকতর সূক্ষ্ম ও যথার্থ! তা পরিপূর্ণরূপেই স্যাটেলাইট থেকে ধারণকৃত ছবিগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ! বরং তাদের তথ্যাবলিই ভুল। এর ফলে নাসায় (ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) একদল বিজ্ঞানী মুহিউদ্দিন আর-রেয়িসের মানচিত্রগুলোর পুনর্নিরীক্ষণ করেন, সেগুলো বারবার বড় করে দেখেন। এবার তারা দ্বিতীয়বারের মতো বিমূঢ় হন। কারণ মুহিউদ্দিন আর-রেয়িস তার মানচিত্রে দক্ষিণ মেরুতে ষষ্ঠ মহাদেশ নির্দেশ করেছেন, যার নাম এন্টার্কটিকা (Antarctica)। এটি তাদের এন্টার্কটিকা আবিষ্কারের দুইশ বছরেরও আগের ঘটনা। মুহিউদ্দিন আর-রেয়িস এন্টার্কটিকার পাহাড়সমূহ ও উপত্যকাসমূহের বর্ণনাও দিয়েছেন, যেগুলো ১৯৫২ সালের আগ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।
পিরি রেয়িসের মানচিত্রের সূক্ষ্মতা ও যথার্থতা
সুইস লেখক এরিক ফন দানিকেন (Erich von Däniken) Zuvi Chariots of the Gods? Unsolved Mysteries of the Past নামক বইয়ে(৪২৫) বলেছেন, পিরি রেয়িসের মানচিত্রগুলো মার্কিন মানচিত্রাঙ্কনবিদ ও নাবিক আর্লিংটন ম্যালেরির (Arlington H. Mallery) কাছে পেশ করা হয়। তিনি মানচিত্রগুলোর সূক্ষ্ম পরীক্ষানিরীক্ষা ও বিচার-বিশ্লেষণের পর সিদ্ধান্ত দেন যে, এগুলো (আমেরিকা-সম্পর্কিত) যাবতীয় ভৌগোলিক তথ্য ও বাস্তবতাকে ধারণ করেছে। তবে তার সন্দেহ থেকে যায় যে, এখানে একটি ভুল থেকে গেছে অথবা কোনো কোনো স্থান-নির্দেশ যথার্থ হয়নি। ফলে তিনি মার্কিন নৌবহরের হাইড্রোগ্রাফিক ব্যুরোর মানচিত্রাঙ্কনবিদ মিস্টার ওয়ালটার্স (Mr. Walters)-এর শরণাপন্ন হন। তারা উভয়ে স্থান-নির্দেশক সংখ্যাঙ্কিত বর্গজালি তৈরি করেন এবং মানচিত্রগুলোকে একটি আধুনিক গ্লোবে রূপান্তরিত করেন। এভাবে তারা চাঞ্চল্যকর সব তথ্য আবিষ্কার করেন। মানচিত্রগুলো সম্পূর্ণরূপে নির্ভুল। কেবল ভূমধ্যসাগর ও মৃতসাগরই নয়, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল এবং এন্টার্কটিকা সংলগ্ন অঞ্চলগুলোও পিরি রেইসের মানচিত্রে যথাযথভাবে বর্ণিত হয়েছে। এগুলো মূলত ভূ-সংস্থানিক মানচিত্র (Topographic Map), এতে বিস্ময়কর সূক্ষ্মতায় অঞ্চলগুলোর অভ্যন্তরীণ ভূ-সংস্থানের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এতে পাহাড়-পর্বত, পর্বতশৃঙ্গ, নদীনালা, মালভূমি ইত্যাদির স্পষ্ট ও নির্ভুল বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যেন এগুলোর চিত্র মহাকাশ থেকে ধারণ করা হয়েছে!(৪২৬)
১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন গ্রেট অবজারভেটরি ও মার্কিন সমুদ্র-পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে একদল ভূগোলবিজ্ঞানী পিরি রেইসের মানচিত্রগুলোর ওপর অধিকতর পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান চালান। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষণার পর তারা দেখেন যে ষষ্ঠ মহাদেশ এন্টার্কটিকার চিত্র বিস্ময়কর পর্যায়ে বিশুদ্ধ ও যথার্থ। এমনকি আমাদের বর্তমান যুগেও যেসব স্থান পরিপূর্ণরূপে আবিষ্কৃত হয়নি তারও বর্ণনা রয়েছে পিরি রেইসের মানচিত্রগুলোতে! দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের পর্বতরাশির অস্তিত্ব ১৯৫২ সালের আগে আবিষ্কৃত হয়নি। এগুলো সবসময়ই পুরু বরফের স্তরে ঢাকা থাকে। আধুনিক মানচিত্রগুলোতে এসব পর্বত আবিষ্কার করা হয়েছে ইকো-সাউন্ডিং যন্ত্রপাতি (Echo-Sounding apparatus) ব্যবহার করে।
এখানে আরও উল্লেখ্য যে, মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা পিরি রেইসের মানচিত্রগুলোর ওপর অনুসন্ধান ও গবেষণা অব্যাহত রেখেছে। তাদের কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, দক্ষিণ মেরু অঞ্চল অর্থাৎ এন্টার্কটিকার উপর দিয়ে অতিক্রম করার সময় মহাকাশযান থেকে ভূ- গোলকের যেসব চিত্র ধারণ করা হয়েছে তার সঙ্গে এসব মানচিত্র সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মহাকাশযান থেকে পাঁচ হাজার মাইলব্যাপী অঞ্চলের চিত্র ধারণ করা হয়েছে। তা ছাড়া তারা স্যাটেলাইট থেকে ধারণকৃত চিত্রসমূহ ও পিরি রেয়িসের মানচিত্রগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস্য মিল খুঁজে পেয়েছেন!(৪২৭)
স্পেন থেকে ভারত পর্যন্ত নৌপথ আবিষ্কার
আবুল আব্বাস আল-কালকাশান্দি (মৃ. ১৪১৮) তার সুবহুল আ'শা গ্রন্থে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগের বিষয়টি যথার্থভাবে বর্ণনা করেছেন। তার এই বক্তব্য থেকে মুসলিমরা যে ভাস্কো দা গামার(৪২৮) আগেই এ বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন তা স্পষ্ট হয়। তিনি আটলান্টিক মহাসাগর সম্পর্কে বলেছেন, এই মহাসাগর মরোক্কান উপকূল থেকে জিব্রাল্টার প্রণালির-যা আন্দালুস ও মরক্কোকে বিভক্ত করেছে-পাশ দিয়ে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গিয়েছে এবং বার্বারদের অঞ্চল লামতুনা মরুভূমি অতিক্রম করেছে। আল-কালকাশান্দি তারপর সমুদ্রপথের বর্ণনা দিয়েছেন, তারপর তা জিবালুল কামারের (Dhofar Mountains) পেছন দিয়ে পূর্ব দিকে এগিয়েছে। জিবালুল কামার থেকে মিশরের নীলনদের উৎস শুরু হয়েছে। এর আলোচনা পরে আসবে। এভাবে আটলান্টিক মহাসাগর ভূমি থেকে দক্ষিণমুখী হয়েছে এবং আরদু খারাব (ওয়াস্টল্যান্ড)-এর ওপর দিয়ে ও যান্জ (Zanj) দেশের পেছন দিয়ে (সহিলি উপকূলকে বামে রেখে) পূর্বদিকে এগিয়েছে, তারপর পূর্বে ও উত্তরে বিস্তৃত হয়ে ভারত মহাসাগর ও চীন সাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।(৪২৯)
ইগন্যাটি ক্র্যাচকোস্কি উল্লেখ করেছেন যে, একজন আরব নাবিক ভাস্কো দা গামা যে ভ্রমণ করেছেন সেই একই ভ্রমণ করেছেন ১৪২০ খ্রিষ্টাব্দে, তবে উলটোপথে, তিনি ভারত মহাসাগরের একটি বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং আফ্রিকার চারপাশ ঘুরে আটলান্টিক মহাসাগরে মরক্কোর বন্দরে পৌছেন। এটি ভাস্কো দা গামার জন্মেরও ৪৭ বছর আগের ঘটনা।(৪৩০)
ভাস্কো দা গামা তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন যে, ভ্রমণকালে যে-সকল আরব নাবিকের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে তারা উন্নতমানের কম্পাস রাখতেন জাহাজের দিক-নির্দেশনার জন্য। তাদের সঙ্গে পর্যবেক্ষণযন্ত্রও থাকত, থাকত সামুদ্রিক মানচিত্রও। বিভিন্ন সময়ে তিনি তাদের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং তাদের সাহায্য গ্রহণ করেছেন। তিনি আরব নাবিকদের কিছু মানচিত্র পর্তুগালের সম্রাট ম্যানুয়েলের (Manuel I of Portugal) কাছে পাঠিয়ে দেন। আরেকজন মুসলিম নাবিকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার নাম মুআল্লিম কানা। তিনি মালিন্ডির বাসিন্দা ছিলেন। তিনিই ভাস্কো দা গামার জাহাজকে মালিন্ডি(৪৩১) থেকে ভারতের কালিকোট বন্দরে পৌঁছে দেন। অন্যান্য তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যিনি ভাস্কো দা গামার জাহাজ চালিয়ে নিয়ে আসেন তিনি হলেন আরব মুসলিম ভূগোলবিদ ও নাবিক ইবনে মাজেদ(৪৩২)। তিনিই কম্পাস আবিষ্কার করেছিলেন। আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে, পরবর্তী মুসলিমদের অঙ্কিত মানচিত্রগুলোতে-যেমন আল-মাসউদির মানচিত্র ও আল-ইদরিসির মানচিত্র-আফ্রিকাকে ঘিরে আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে ভারত মহাসাগরের সংযোগ-ব্যবস্থার স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। এসব সামুদ্রিক অঞ্চল আরব নৌবহরের দ্বারা আবাদিত ছিল। এসব নৌবহর ভারত ও পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যে যাওয়া-আসা করত।(৪৩৩)
ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের প্রচেষ্টা ও তাদের চারপাশের ভূ-অঞ্চল আবিষ্কারের যে কাহিনি তা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পড়লে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়। তাদের সেসব প্রচেষ্টার ফল কত-না উজ্জ্বল, কত-না চমৎকার!
আরবের গুরুত্বপূর্ণ ভূগোলবিদ ও তাদের রচিত গ্রন্থসমূহের পরিসংখ্যান ব্যাপক ও বিস্তৃত বর্ণনার দাবি রাখে। আবুল ফিদা(৪০৪) একাই ষাটজন ভূগোলবিদের নাম উল্লেখ করেছেন, যাদের আবির্ভাব ঘটেছিল তার পূর্বে।... ইউরোপীয়রা যদি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ইসলামের প্রতি (বিদ্বেষভাবাপন্ন) চিন্তাভাবনা আঁকড়ে ধরে লালন না করত, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে, তাহলে ইউরোপের ভূগোলবিদ্যার বড় বড় পণ্ডিতরা কেন মুসলিমদের অবদানকে অস্বীকার করে তার কারণ উদ্ঘাটন করা দুষ্কর হতো। তা সত্ত্বেও আরবরা যেসব বড় বড় কাজ করেছেন তা তাদের কদর ও মূল্য প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। কারণ আরবরাই প্রথম নিয়মতান্ত্রিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন করেছেন, যা মানচিত্রবিদ্যার প্রধান ভিত্তি।(৪০৫)
এগুলোও আমাদের কথা নয়, বরং গুস্তাভ লি বোঁর কথা।
টিকাঃ
৩৭৬. মার্টিন প্লেসনার, মাবহাসুল উলুম, যোসেফ শাস্ত্র (Joseph Franz Schacht) ও ক্লিফোর্ড এডমন্ড বসওয়র্থ (Clifford Edmund Bosworth) কর্তৃক সম্পাদিত The Legacy of Islam, আরবি অনুবাদ, تراث الاسلام খ. ২, পৃ. ১৫৪।
৩৭৭. মার্টিন প্লেসনার (Martin Plessner 1797-1883) জার্মান অর্থোডক্স ধর্মপ্রচারক এবং পণ্ডিত। বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ। বেলারুশে জন্মগ্রহণ করেন। ইসলামের ধ্রুপদি ঐতিহ্য এবং মধ্যযুগে ইহুদিধর্মের ওপর ইসলামের প্রভাব তার প্রধান আগ্রহের বিষয়।-অনুবাদক
৩৭৮. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৬৮।
৩৭৯. হেকাটিয়াস মূলত অ্যানাক্সিম্যান্ডারের (Anaximander 610-546 BC) অঙ্কিত মানচিত্রের উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন।- অনুবাদক।
৩৮০. প্রাগুক্ত এবং জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯৭-৩৯৮।
৩৮১. সুরা নাযিআত: আয়াত ৩০।
৩৮২. সুরা যুমার: আয়াত ৫।
৩৮৩. ইবনে খুররাদাযবিহ: আবুল কাসিম উবাইদুল্লাহ ইবনে আহমাদ ইবনে খুররাদাযবিহ (২০৪- ২৭২ হি./৮২০-৮৮৫ খ্রি.)। ভৌগোলিক ইতিহাসবিদ। বারমাকিদের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ المسالك والممالك। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল- ওয়াফায়াত, খ. ১৯, পৃ. ২২৯।
৩৮৪. ইবনে খুরাদাযবিহ, আল-মাসালিক ওয়াল-মামালিক, পৃ. ৪।
৩৮৫. ইবনে রুসতাহ: আবু আলি আহমাদ ইবনে উমর (মৃ. ৩০০ হি./৯১২ খ্রি.)। ভূগোলবিদ। ইরানের ইস্পাহানের অধিবাসী। الأعلاق النفيسة তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। দেখুন, যিরিকলি, আল- আ'লাম, খ. ১, পৃ. ১৮৫।
৩৮৬. ইবনে রুসতাহ, আল-আ'লাক আন-নাফিসাহ, পৃ. ৮।
৩৮৭. ইবনে আবদি রাব্বিহি: আবু উমর আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদি রাব্বিহি ইবনে হাবিব ইবনে হুদাইর ইবনে সালেম (২৪৬-৩২৮ হি./৮৬০-৯৪০ খ্রি.)। শীর্ষস্থানীয় সাহিত্যিক। আল-ইকদুল ফারিদ গ্রন্থের প্রণেতা। কর্ডোভার অধিবাসী। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২০৭।
৩৮৮. আবু উবাইদা আল-ফালাকি : আবু উবাইদা মুসলিম ইবনে আহমাদ (মৃ. ২৯৫ হি.)। গ্রহরাজির আবর্তন ও নক্ষত্রের সন্তরণ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন। জ্যোতির্বিদ্যায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল। ছিলেন ফকিহ ও হাদিস বিশারদ। ভাষা ও ব্যাকরণ এবং ছন্দশাস্ত্রেও দখল ছিল তার। দেখুন, আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ৩, পৃ. ৩৭৪।
৩৮৯. সাসানীয় সম্রাট; প্রথম বাহরাম, দ্বিতীয় বাহরাম ও পঞ্চম বাহরাম সাসানীয় সম্রাট ছিলেন।- অনুবাদক
৩৯০. ইরানের খুরাসান প্রদেশের গুরাবাদ জেলার একটি শহর।-অনুবাদক
৩৯১. সূরা যুমার: আয়াত ৫।
৩৯২. ইবনে হাযম আল-আন্দালুসি, الفصل في الملل والأهواء والنحل ২, পৃ. ৭৮।
৩৯৩. আল-ইদরিসি, نزهة المشتاق في اختراق الآفاق, পৃ. ৯১।
৩৯৪. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ৩৫৮।
৩৯৫. সিন্দ ইবনে আলি: আবু তাইয়িব সিন্দ ইবনে আলি আল-ইয়াহুদি (মৃ. ২৫০ হি./৮৬৪ খ্রি.)। প্রখ্যাত মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী, অনুবাদক, গণিতজ্ঞ ও প্রকৌশলী। খলিফা আল-মামুনের দরবারে আসেন এবং তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি তারকা-সারণি জিজ আল-সিন্দহিন্দ (Zij al-Sindhind) অনুবাদ ও সম্পাদনার জন্য পরিচিতি লাভ করেন। একজন গণিতবিদ হিসাবে সিন্দ ইবনে আলি আল-খাওরিজমির সহকর্মী ছিলেন। পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ كتاب المنفصلات والمتوسطات في النجوم والحساب। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৫, পৃ. ২৪২।
৩৯৬. আলি ইবনে ঈসা আল-আস্তুরলাবি ছিলেন বিখ্যাত গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ। বাগদাদে বসবাস করতেন। খলিফা আল-মামুনের বিজ্ঞান পরিষদে ছিলেন।
৩৯৭. ধ্রুবতারা (Pole star): পৃথিবীর উত্তর মেরুর অক্ষ বরাবর দৃশ্যমান তারা ধ্রুবতারা নামে পরিচিত। এই তারাটি পৃথিবীর অক্ষের উপর ঘূর্ণনের সঙ্গে প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে আবর্তিত হয়। প্রাচীন কালে দিনির্ণয়যন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে সমুদ্রে জাহাজ চালানোর সময় নাবিকেরা এই তারার অবস্থান দেখে দিনির্ণয় করত। সপ্তর্ষিমণ্ডলের প্রথম দুটি তারা, পুলহ এবং ক্রতুকে সরলরেখায় বাড়ালে তা এ তারাটিকে নির্দেশ করে। এটি লঘু সপ্তর্ষিমণ্ডলে দেখা যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশের দৃশ্যমান সকল তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। শুধু ধ্রুবতারাই মোটামুটি একই স্থানে দৃশ্যমান থাকে। এটি আকাশের একমাত্র তারা, যেটিকে এ অঞ্চল হতে বছরের যেকোনো সময়েই ঠিক এক জায়গায় দেখা যায়। পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ থেকে ধ্রুবতারাকে সারা বছরই আকাশের উত্তরে নির্দিষ্ট স্থানে দেখা যায়। দিনির্ণয়ে এই তারা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বাংলাদেশের আকাশে ধ্রুবতারাকে বেশি উঁচুতে দেখা যায় না। ঢাকা থেকে ধ্রুবতারার উচ্চতা ২৩ ডিগ্রি ৪৩ মিনিট। দিগ্বলয় থেকে আকাশের প্রায় চারভাগের একভাগ উঁচুতেই এই তারাটির মতো উজ্জ্বল আর কোনো তারা নেই বলে একে চিনতে বিশেষ অসুবিধা হয় না। তবে বাংলাদেশ থেকে যতই উত্তরে যাওয়া যাবে, ধ্রুবতারাকে ততই ওপরে দেখা যাবে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৩৯৮. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল-আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১৬২।
৩৯৯. এই বিষয়ে দেখুন, Johannes Willers, Schätze der Astronomie, আরবি অনুবাদ, كنوز علم الفلك, পৃ. ২৫।
৪০০. মারিনুস অফ টায়ার (Marinus of Tyre): টায়ার-এর আরবি নাম সুর। এটি ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত একটি শহর। সিরিয়ায় খ্রিষ্টপূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের সময়ে তিনি সুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার জীবৎকাল খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দীর শেষ থেকে নিয়ে দ্বিতীয় শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত (৭০-১৩০ খ্রিষ্টাব্দ)। টলেমি প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি মারিনুসের শিষ্য ছিলেন। মারিনুস অফ টায়ারের উল্লেখযোগ্য রচনা হলো 'তাসহিহুল জুগরাফিয়া'।
৪০১. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯০।
৪০২. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯০-৩৯৩।
৪০৩. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৬৮।
৪০৪. আবু আলি আল-হাসান ইবনে আলি ইবনে আল-মুররাকুশি (মৃ. ৬৬০ হি./১২৬২ খ্রি.)। মরোক্কান জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ, ভূগোলবিদ এবং সূর্যঘড়িনির্মাতা। ত্রিকোণমিতিতে সবিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ত্রিকোণমিতিতে তিনি নতুন রীতির প্রবর্তন করেন। তিনিই প্রথম সাইন, কোসাইন ইত্যাদি ব্যবহার করেন এবং সাইন-সারণি তৈরি করেন। বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করেন। ২৪০টিরও বেশি নক্ষত্র চিহ্নিত করে তাদের বর্ণনা দেন। সমান সময় নির্দেশ রেখা ব্যবহার করেন। বিভিন্ন ভৌগোলিক ত্রুটি সংশোধন করেন এবং মরক্কোর মানচিত্র নতুনভাবে অঙ্কন করেন। জর্জ সার্টন বলেছেন, আল-মুৱাকুশি প্রথম কোণের সাইন এবং ৯০ ডিগ্রির কম কোণ নির্দেশ করেন।-অনুবাদক
৪০৫. ড. আবদুর রহমান হামিদাহ, আলামুল জুগরাফিয়্যিনাল আরব, পৃ. ৪৫৯।
৪০৬. আলি ইবনে উমর আল-কাতিবি: নাজমুদ্দিন আলি ইবনে উমর ইবনে আলি আল-কাতিবি আল-কাযবিনি (৬০০-৬৭৫ হি./১২০৩-১২৭৭ খ্রি.)। প্রজ্ঞাবান ও যুক্তিবিদ। নাসিরুদ্দিন আত-তুসির শিষ্য। তার বহু রচনা রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো 'আশ-শাসিয়্যাহ' ও 'হিকমাতুল আইন'। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২১, পৃ. ২৪৪।
৪০৭. জর্জ সার্টন, Introduction to the History of Science, খ. ১, পৃ. ৪৬।
৪০৮. উইল ডুরান্ট, 'কিস্সাতুল হাদারাহ', খ. ১৩, পৃ. ৩৫৯।
৪০৯. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৬৯।
৪১০. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৭০।
৪১১. মার্টিন প্লেসনার, মাবহাসুল উলুম, যোসেফ শাফ্ত (Joseph Franz Schacht) ও ক্লিফোর্ড বসওর্থ (Clifford Edmund Bosworth) কর্তৃক সম্পাদিত The Legacy of Islam, আরবি অনুবাদ, تراث الاسلام , খ. ২, পৃ. ১৫৪।
৪১২. ক্রিস্টোফার কলম্বাস (১৪৫১-১৫০৬ খ্রি.) বিখ্যাত ইতালীয় পর্যটক ও উপনিবেশ প্রতিষ্ঠাতা। আমেরিকা, বাহামা দ্বীপপুঞ্জ ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কার করেছেন বলে দাবি করা হয়। তিনি প্রচণ্ড ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে স্পেনে মৃত্যুবরণ করেন।
৪১৩. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯৬-৩৯৭।
৪১৪. আল-মাসউদি: আবুল হাসান আলি ইবনুল হুসাইন ইবনে আলি (২৮৩-৩৪৬ হি./৮৯৬-৯৫৭ খ্রি.)। ইতিহাসবিদ, পর্যটক, অনুসন্ধানী। বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন, কায়রোতে বসবাস করতেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। مروج الذهب ومعادن الجوهر তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২১, পৃ. ৬-৭; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ২৭৭।
৪১৫. ভাইকিং (Viking) বলতে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সমুদ্রচারী ব্যবসায়ী, যোদ্ধা ও জলদস্যুদের একটি দলকে বোঝায়, যারা ৮ম শতক থেকে ১১শ শতক পর্যন্ত ইউরোপের এক বিরাট এলাকাজুড়ে লুটতরাজ চালায় ও বসতি স্থাপন করে। এদেরকে নর্সম্যান বা নর্থম্যানও বলা হয়। ভাইকিংরা পূর্ব দিকে রাশিয়া ও কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত পৌছেছিল।
৪১৬. আল-মাসউদি, মুরুজুয যাহাব ওয়া মাআদিনুল জাওহার, খ. ১, পৃ. ১১৯।
৪১৭. আল-আব্ আনাসতাস মারি আল-কারমালি (Al-Ab Anastas Mari Al-Karmali) : তিনি বুতরুস জিবরাইল ইউসুফ আওয়াদ (১২৮৩-১৩৬৬ হি./১৮৬৬-১৯৪৭ খ্রি.) লেবানিজ খ্রিষ্টান পুরোহিত ও আরবি ভাষাবিজ্ঞানী সাহিত্যিক। আরবের দর্শন ও ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ। আরবি ভাষাবিজ্ঞানে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আলাম, খ. ২, পৃ. ২৫।
৪১৮. الأب انستاس ماري الكرملي : عرف العرب أمريكا قبل أن يعرفها الغرب. الهلال প্রকাশিত, সংখ্যা ১০৬। আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ তার اثر العرب في الحضارة الأوروبية বইতে এ দিকে ইঙ্গিত করেছেন, পৃ ৪৭।
৪১৯. পল আর্নেস্ট কাহলে (Paul Ernst Kahle 1875-1964): বিখ্যাত জার্মান প্রাচ্যবিদ। মারবুর্গ ও বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্যের ভাষা শেখেন। প্রোটেস্ট্যান্ট যাজক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন রোমানিয়া ও কায়রোতে। কায়রোতে ভাষাতত্ত্বের ওপরও অধ্যয়ন করেন।
৪২০. পিরি রেয়িস: মুহিউদ্দিন ইবনে মুহাম্মাদ আর-রেয়িস (৮৭৭-৯৬২ হি./১৪৭০-১৫৫৫ খ্রি.)। উসমানি নৌসেনাপতি, নাবিক, ভূগোলবিদ ও মানচিত্রাঙ্কনবিদ। ১৫০০ সালে মাওদান সমুদ্রযুদ্ধে তিনি প্রধান সেনাপতি ছিলেন। তিনি বিশ্বের দুটি মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: কিতাবু বাহরিয়্যাহ।
৪২১. ক্র্যাচকোল্কি, তারিখুল আদাবিল জুগরাফিয়্যিল আরাবি, খ. ২, পৃ. ৫৬২।
৪২২. প্রফেসর ইভান ভান সারটিমা (Ivan Van Sertima) তার ১৯৭৬ সালে রচিত They Came Before Columbus: The African Presence in Ancient America গ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তিনি দলিল-প্রমাণ উপস্থিত করেছেন। কলম্বাসের নিজের কথা থেকেও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, আরবরাই প্রথম আমেরিকায় পৌছেছিল। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি বিশ্বাস করতেন ওই দ্বীপে যেসব রেড ইন্ডিয়ানদের দেখেছেন তারা মূলত আরব বংশোদ্ভূত, তার আগেই তারা ওখানে পৌঁছেছিল। আরবদের পাণ্ডুলিপি থেকেই তিনি এসব তথ্য জেনেছিলেন। ব্রিটিশ রয়াল জিয়োগ্রাফিক্যাল সোসাইটি The Discoverers নামে একটি ডকুমেন্টারি টিভি সিরিজ তৈরি করেছে। এখানে একটি পর্ব ছিল কেবল কলম্বাস ও তার আবিষ্কার সম্পর্কে। তা থেকে জানা যায় যে, তিনি আরবি ভাষা জানে এমন একজনকে তার সহযাত্রী মনোনীত করেছিলেন। অর্থাৎ লোকটা ছিল আরব বংশোদ্ভূত। তিনি এই লোককে দিয়ে রেড ইন্ডিয়ানদের সর্দারের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিটি ছিল আরবি ভাষায় লেখা। চিঠিতে কলম্বাস বলেন, হে মহামান্য, স্পেন ও ক্যাস্টাইল রাজ্যের রানি, রানি ইসবালে আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন। তিনি স্পেন ও ক্যাস্টাইল রাজ্য এবং আপনার দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী।-অনুবাদক
৪২৩. ড. আবদুর রহমান হামিদাহ, আলামুল জুগরাফিয়্যিনাল আরব, পৃ. ২২৫।
৪২৪. শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৫০০।
৪২৫. বইটির ইংরেজি অনুবাদ, Memories of the Future: Unsolved Mysteries of the Past. মূল জার্মান থেকে বইটির অনুবাদ করেছেন মাইকেল হেরন।
৪২৬. এরিক ফন দানিকেন, Chariots of the Gods?, আরবি অনুবাদ, عربات الامة, অনুবাদক, আদনান হাসান, পৃ. ২৯।
৪২৭. আহমাদ শাওকি আল-ফানজারি, http://www.islamset.com/arabic/asc/fangryl.html.
৪২৮. ভাস্কো দা গামা (১৪৬৯-১৫২৪ খ্রি.) ছিলেন পর্তুগিজ অনুসন্ধানকারী ও পর্যটক। তিনি পঞ্চদশ শতাব্দীতে সমুদ্রপথে ইউরোপ থেকে ভারত আসেন। তার এই সমুদ্রপথ আবিষ্কার বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদে নতুন মাত্রা যোগ করে। তিনি ভারতের কোচিতে মৃত্যুবরণ করেন।
৪২৯. আবুল আব্বাস আল-কালকাশান্দি, সুবহুল আশা, খ. ৩, পৃ. ২৩৭।
৪৩০. ক্র্যাচকোড্রিঙ্ক, তারিখুল আদাবিল জুগরাফিয়্যিল আরাবি, খ. ২, পৃ. ৫৬৩।
৪৩১. মালিন্ডি উপসাগরের তীরবর্তী গালানা নদীর মুখে অবস্থিত একটি শহর।
৪৩২. ইবনে মাজেদ: আহমাদ ইবনে মাজেদ ইবনে মুহাম্মাদ আন-নাজদি (১৪৩২-১৪৯৮ খ্রি.)। উপাধি: সমুদ্রসিংহ ও ধাবমান নক্ষত্র। আরবের শ্রেষ্ঠ নাবিকদের অন্যতম। মানচিত্রাঙ্কনবিদ। নৌবিজ্ঞানী ও নৌ-ইতিহাসবিদ। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২০০।
৪৩৩. বিস্তারিত দেখুন, হুসাইন মুনিস, আতলাসু তারিখিল ইসলাম, পৃ. ১২ ও তার পরবর্তী।
৪৩৪. আবুল ফিদা: ইসমাইল ইবনে আলি ইবনে মাহমুদ ইবনে শাহেনশাহ (৬৭২-৭৩২ হি./১২৭৩-১৩৩১ খ্রি.)। আল-মালিক আল-মুআইয়াদ, হামার অধিপতি। ভৌগোলিক ইতিহাসবিদ। দখল ছিল প্রকৃতিবিজ্ঞানেও। تقويم البلدان و المختصر في أخبار البشر তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৯, পৃ. ১০৪; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ৩১৯।
৪৩৫. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৭১।
ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের রচনাবলি এখনো পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। এসব রচনায় যেসব তথ্য ও সংবাদ রয়েছে তা আমাদের ঐতিহাসিক ভূগোল-বিষয়ক জ্ঞানকে বৃদ্ধি করেছে। তাদের এসব রচনায় মূলত বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পরোক্ষভাবে তা আমাদের ওইসব দেশের ইতিহাস-সম্পর্কিত জ্ঞানকেও সমৃদ্ধ করেছে। এই ময়দানে ইসলামের উত্তরাধিকার বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।(৩৭৬)
এটা আমাদের কথা নয়, বরং তা জার্মান-ইসরাইলি গবেষক মার্টিন প্লেসনারের(৩৭৭) কথা।
ইসলামের আগমনের পূর্বেই ভূগোলবিদ্যার চর্চা শুরু হয়েছিল। কিন্তু আরবদের প্রাগ্রসরতা ও তাদের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জ্ঞানবিজ্ঞানের ফলে ভূগোলবিদ্যায়ও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ও উৎকর্ষ সাধিত হয়। এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই যে, আরবরা শুরুর দিকে গ্রিকদের বিজ্ঞান গ্রহণ করেছিল, বিশেষ করে টলেমির। ভূগোলবিদ্যায় গ্রিকরাই ছিল তাদের পথপ্রদর্শক। তবে এই ক্ষেত্রেও আরবরা তাদের গুরুদের ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যেমনটা ছিল তাদের অভ্যাস।(৩৭৮)
এটাও আমাদের বক্তব্য নয়, বরং বিখ্যাত ফরাসি চিন্তাবিদ গুস্তাভ লি বোঁর বক্তব্য।
ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের উদ্ভাবন ও অবদান
ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের উদ্ভাবন ও অবদানকে আমরা তিনটি বিভাগে চিহ্নিত করতে পারি:
• পূর্ববর্তী ভ্রান্তি-বিভ্রাটের সংশোধন
• দেশ ও নিদর্শনসমূহের যথার্থ বর্ণনা
• আবিষ্কার ও উদ্ভাবন
পৃথিবীর গোলকাকৃতির প্রমাণ
পৃথিবী যে গোলাকার তা প্রথম মুসলিমরাই প্রমাণ করেছিলেন। ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার যাত্রা শুরু হয় এভাবেই। গ্রিকরা বিশ্বাস করত যে, পৃথিবী হলো বৃত্তাকার সমতল চাকতি, যাকে সব দিক থেকে বেষ্টন করে রেখেছে সমুদ্রের জলরাশি।
হেকাটিয়াস (Hecataeus of Miletus 500 BC)—যাকে গ্রিক ভূগোলবিদ্যার জনক বিবেচনা করা হয়—তো পৃথিবীকে একটি বৃত্তাকার চাকতি ধরে নিয়ে তার মানচিত্র অঙ্কন করেছেন।(৩৭৯) পৃথিবী যে গোলাকার তার প্রথম তাত্ত্বিক ধারণা দেন প্লেটো (৩৪৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ), তবে তিনি তার পরবর্তী দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের থেকে যথার্থ সমর্থন পাননি। এমনকি রোমান সাম্রাজ্য তার এই চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে। রোমান ভূগোলবিদ্যার জনক কসমাস (Cosmas) ৫৪৭ খ্রিষ্টাব্দে লিখেছেন, পৃথিবী হলো চাকার সদৃশ, সমুদ্রের জলরাশি তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে...।' বিষয়টি জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যখন গির্জা ও গির্জার প্রথম সারির ফাদাররা—যাদের নেতৃত্বে ছিলেন লাকটানটিয়াস (Lactantius)—কসমাসের উপর্যুক্ত তত্ত্বকে বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং সিদ্ধান্ত দেন যে, পৃথিবী হলো সমতল এবং অন্যপাশ হলো অনাবাদিত, তা (পৃথিবী সমতল) না হলে মানুষ শূন্যে পতিত হতো!(৩৮০)
ইসলামি সভ্যতা আবির্ভাবের পর তা পৃথিবীর গোলকাকার তত্ত্বকে গ্রহণ করে এবং এই তত্ত্বের পুনর্জীবনদানে সচেষ্ট হয়। এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল এই যে, পবিত্র কুরআন বিভিন্নভাবে পৃথিবীর গোলকাকৃতির প্রতি ইঙ্গিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَاهَا
এবং পৃথিবীকে তারপর বিস্তৃত করেছেন।(৩৮১)
'দাহিয়্যা' শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো গোলক। পবিত্র কুরআনে আরও অনেক আয়াত রয়েছে যেগুলো এই গোলকটি যে তার নিজের চারপাশে (কক্ষপথে) ঘূর্ণায়মান তা নিয়ে আলোচনা করেছে। গোলকটির (পৃথিবীর) এমন আবর্তনের ফলেই দিবস ও রজনীর সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ
তিনি রাতের দ্বারা দিবসকে আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে আচ্ছাদিত করেন রাতের দ্বারা।(৩৮২)
ইবনে খুররাদাযবিহ(৩৮৩) বলেছেন, পৃথিবী বলের মতোই গোলাকার, ডিমের ভেতরে থাকা কুসুমের মতো।(৩৮৪) ইবনে রুসতাইও(৩৮৫) একই কথা বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আকাশকে বলের মতো গোলকাকার বানিয়েছেন, তা শূন্যগর্ভ ঘূর্ণনশীল; পৃথিবীও গোলাকার এবং আকাশের অভ্যন্তরে রয়েছে।(৩৮৬)
বিখ্যাত সাহিত্যিক ও আল-ইব্দুল ফারিদ গ্রন্থের প্রণেতা ইবনে আবদি রাব্বিহি(৩৮৭) কয়েকটি পঙ্ক্তি রচনা করেছেন, যেখানে তিনি আবু উবাইদা মুসলিম ইবনে আহমাদ আল-ফালাকির(৩৮৮) বক্তব্যের খণ্ডন করেছেন।
আমরা তার পঙ্ক্তিমালা থেকে জানতে পারি যে, আবু উবাইদা আল-ফালাকি পৃথিবী গোলকাকার বলে মত ব্যক্ত করতেন। কিন্তু ইবনে আবদি রাব্বিহি তার সঙ্গে একমত ছিলেন না। তাই তিনি বলেছেন,
أبا عبيدة ما المسؤول عن خبر تحكيه إلا سؤالاً للذي سألا أبيت إلا شذوذا عن جماعتنا ولم تعب رأي من أزجا ولا اعتزلا كذلك القبلة الأولى مُبدَّلة وقد أبيت فما تبغي بها بدلا زعمت بهرام أو بيدخت يرزقنا لا بل عطارد أو برجيس أو زُحَلا وقلت إن جميع الخلق في فلك بهم يحيط وفيهم يقسم الأجـلا والأرض كورية حق السماء بها فوقاً وتحتاً وصارت نقطة مثلا صيف الجنوب شتاء للشَّمَالِ بها قد صار بينهما هذا وذا دولا فإن كانون في صنعا وقرطبة برد وأيلول يُذكي فيهما الشعلا كما استمر ابن موسى في غوايته فوعر السهل حتى خِلْتَهُ جَبَلا أبلغ معاوية المصغي لقولهما أني كفرت بما قالا وما فعلا
আবু উবাইদা, আপনি যা বলেন সে বিষয়ে আপনি দায়িত্বশীল নন, বরং প্রশ্নকারীর জন্য রেখে যান প্রশ্ন।
আপনি আমাদের দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন এবং যে বিচ্ছিন্ন হয় বা পাশ কাটিয়ে যায় তার বক্তব্য সঠিক হয় না।
প্রথম কেবলার পরিবর্তন হয়েছিল; কিন্তু আপনি তা স্বীকার করেন না এবং এ ধরনের পরিবর্তন আশাও করেন না।
আপনি দাবি করেছেন, বাহরাম(৩৮৯) বা বায়দুগ্ধ(৩৯০) আমাদের রিযিক দান করে, না বরং বুধগ্রহ বা বৃহস্পতিগ্রহ বা শনিগ্রহ রিযিক দান করে।
আপনি বলেছেন, সমস্ত সৃষ্টি রয়েছে এক মহাকাশে, যা তাদের বেষ্টন করে আছে এবং তাদের মধ্যে মহাকাশই নির্ধারণ করে সময়।
আপনি আরও বলেছেন, পৃথিবী হলো গোলাকার, আকাশ তাকে উপর দিক ও নিচ দিক থেকে ঘিরে রেখেছে, যেন তা আকাশের মধ্যস্থলে একটি বিন্দু।
পৃথিবীর দক্ষিণে (দক্ষিণ মেরুতে) যখন গ্রীষ্ম, উত্তরে (উত্তর মেরুতে) তখন শীত, উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর মধ্যস্থলে রয়েছে পৃথিবীর সব দেশ।
সানআ ও কর্ডোভায় ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে থাকে শীত, আর সেপ্টেম্বর মাস এখানে জ্বালায় আগুন।
ইবনে মুসাও তার পথভ্রষ্টতায় রয়েছেন অটল; তিনি সমতলকে করে তোলেন এতটা অসমান যে (বা সহজ বিষয়কে করে তোলেন এতটা কঠিন যে) তাকে তোমার পাহাড় মনে হয়।
মুআবিয়াকে—যে তাদের দুইজনের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে—জানিয়ে দাও, তারা দুইজন (আবু উবায়দা ও ইবনে মুসা) যা বলেন ও করেন তা আমি স্বীকার করি না।
এখানে একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। এই আবু উবাইদার জীবনচরিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তার কাছে মিথ্যাচারের চেয়ে আকাশ থেকে পতনও সহজতর। এই বক্তব্য প্রথমত তার চারিত্রিক গুণাবলিকে নির্দেশ করলে তা থেকে এই বিশ্বাস জন্মে যে, তিনি ছিলেন সূক্ষ্ম অনুসন্ধানী, সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে খুঁটিয়ে দেখতেন, কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আগে দীর্ঘ অনুসন্ধান ও গবেষণা করতেন।
আবু উবাইদা হিজরি তৃতীয় শতকের (খ্রিস্টীয় নবম শতকের) একজন বিজ্ঞানী। আন্দালুসে যারা জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকেন তিনি ছিলেন তাদের প্রথম সারির অন্যতম ব্যক্তি। আমাদের জন্য আরও একটি ব্যাপার জানা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলামি বিশ্ব এসব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে — তা যতটাই অভিনব হোক—কখনো প্রত্যাখ্যান করেনি এবং বিরোধিতাও করেনি। তা ছাড়া যারা কিছুটা বিরোধিতা করতেন, তারাও স্বাভাবিক সীমারেখার বাইরে গিয়ে বিরোধিতা করতেন না। এখানে আমাদের সংগত কারণেই এ কথাও স্মরণে রাখতে হবে যে, এই সময় থেকে ইউরোপে পাঁচশ বছরব্যাপী জ্ঞানের বিকাশ ছিল রক্তে প্লাবিত, আগুনে দগ্ধ ও ইনকুইজিশনের নির্যাতনের শিকার।
ইবনে হাযম আল-আন্দালুসি ও পৃথিবীর গোলাকৃতি
এখানে আমাদের এ কথা বলে রাখাও সংগত যে, ইসলামি ধর্মীয় জ্ঞানীরা সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়াতে পারেন না। তারা ইসলামে এমন শিক্ষা পান যা জ্ঞানগত সত্যকে সমর্থন করে এবং সত্য অস্বীকারকারীদের বিরোধিতা করে। যেমন ইবনে হাযম আল-আন্দালুসি পৃথিবীর গোলাকৃতির ব্যাপারে মুসলিম ইমাম ও মনীষীদের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আলেমগণ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে, পৃথিবী যে গোলাকার সে ব্যাপারে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে এবং এই প্রমাণগুলো সঠিক। তবে এর বিপরীত ছিল সাধারণ মানুষের বক্তব্য। (সাধারণ মানুষের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে) আমাদের জবাব এই যে—আল্লাহ তাআলাই তাওফিকদাতা—মুসলিম মনীষীদের কেউই, যারা এমনকি ‘জ্ঞানের ইমাম’ উপাধি ধারণের হকদার, পৃথিবীর গোলকাকৃতিকে অস্বীকার করেননি। তাদের কেউই এই বক্তব্যের সমর্থনে নিজেদের পক্ষ থেকে একটি শব্দও খরচ করেননি। বরং কুরআন ও সুন্নাহ থেকেই পৃথিবীর গোলকাকৃতির ও ঘূর্ণনের ব্যাপারে বহু প্রমাণ এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ
তিনি রাতের দ্বারা দিবসকে আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে আচ্ছাদিত করেন রাতের দ্বারা।(৩৯১)
এদের একটি যে আরেকটিকে পেঁচিয়ে রয়েছে সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা এটি। كور العمامة (সে পাগড়ি পেঁচালো) ধাতু থেকে কথাটি এসেছে। পেঁচানোই পাগড়ি বাঁধার প্রক্রিয়া এবং গোলকাকার বস্তুতেই পেঁচানো হয়। পৃথিবীর গোলকাকৃতির ব্যাপারে এটা স্পষ্ট দলিল...।(৩৯২)
আল-ইদরিসি ও পৃথিবীর গোলাকৃতি
শরিফ আল-ইদরিসি যা বলেছেন, নিশ্চয় পৃথিবী বলের গোলকাকৃতির মতো গোলকাকার। পানি তার সঙ্গে এঁটে রয়েছে এবং প্রাকৃতিকভাবেই তার ওপর স্থির রয়েছে ও পড়ে যাচ্ছে না। জলসহ পৃথিবী রয়েছে মহাকাশের অভ্যন্তরীণ শূন্যতায়, যেমন ডিমের অভ্যন্তরে থাকে কুসুম। জলসহ পৃথিবীর অবস্থান মধ্যবর্তী এবং বাতাস (অর্থাৎ বায়ুমণ্ডল) তাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখেছে।(৩৯৩)
আল-ইদরিসি যেসব মানচিত্র এঁকেছিলেন তার সম্পর্কে উইল ডুরান্ট বলেছেন, এসব মানচিত্র মধ্যযুগে মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যার (cartography) শ্রেষ্ঠ ফসল। তার পূর্বে এর চেয়ে পূর্ণাঙ্গ, এর চেয়ে সূক্ষ্ম, এর চেয়ে বিস্তৃত ও ব্যাপক মানচিত্র কোথাও অঙ্কন করা হয়নি। অধিকাংশ মুসলিম বিজ্ঞানী যেমন পৃথিবীর গোলকাকৃতির বিষয়টিকে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন, আল-ইদরিসিও তা-ই করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, এটি বিশুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত সত্য।(৩৯৪)
এতকিছুর পরও বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, কিছু আরবি গ্রন্থ ও তথ্যসূত্র এখনো পশ্চিমা তথ্যসূত্র থেকে নকল করে প্রচার করে যাচ্ছে যে পৃথিবীর গোলকাকৃতির তত্ত্বের সঙ্গে মুসলিমদের পরিচয় ছিল না। বরং কোপার্নিকাসের কল্যাণেই এ তত্ত্বটি ঘোষিত হয়। আপনি এখন কোপার্নিকাসের মৃত্যুতারিখ (১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দ) আমাদের আলোচিত মুসলিম বিজ্ঞানীদের মৃত্যুতারিখের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন, কে কাদের থেকে এই তত্ত্ব গ্রহণ করেছে সেই সত্য প্রতিভাত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট!
খলিফা আল-মামুন এবং পৃথিবীর আয়তনের পরিমাপ
মুসলিমরা যে পৃথিবীর গোলকাকৃতির বিষয়টি প্রমাণ করেছিলেন তার কৃতিত্ব দেওয়া হয় আব্বাসি খলিফা আল-মামুনকে (মৃ. ২১৮ হি./৮৩৩ খ্রি.)। তিনিই প্রথম ভূ-গোলকের আয়তন (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, বেধ) পরিমাপের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এই কাজে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ও ভূগোলবিদদের দুটি দলকে নিযুক্ত করেন। একটি দলের নেতৃত্বে থাকে গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী সিন্দ ইবনে আলি(৩৯৫) এবং অপর দলটির নেতৃত্বে থাকেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ আলি ইবনে ঈসা আল-আঙ্গুরলাবি(৩৯৬)। (এ কথাও বলা হয়ে থাকে যে, দুটি দলের একটির নেতৃত্বে ছিলেন বানু মুসা ইবনে শাকির বা মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা।) খলিফা তাদের দুইজনের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, তারা দুইজন পৃথিবীর পরিধির মহাবৃত্তের পূর্ব ও পশ্চিমের দুটি ভিন্ন নির্দিষ্ট স্থানে যাবেন এবং উভয়েই দ্রাঘিমারেখার এক ডিগ্রি পরিমাণ পরিমাপ করবেন (যে দ্রাঘিমারেখা ৩৬০ ডিগ্রি হবে)। ইবনে খাল্লিকান বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যেক দলই একটি বিস্তৃত সমতল ভূখণ্ড বেছে নেয়, ভূখণ্ডের একটি স্থানে একটি কীলক স্থাপন করে। তারপর ধ্রুবতারাকে(৩৯৭) স্থির বিন্দু ধরে নিয়ে কীলক ও ধ্রুবতারা এবং ভূমির মধ্যে কোণ নির্ণয় করে। তারপর উত্তর দিকে এমন জায়গায় এগিয়ে যায় যেখানে ওই কোণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তারপর উভয় দল কীলক দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব পরিমাপ করে। তারা ভূমির ওপর দূরত্ব পরিমাপ করত কীলকের ওপর বাঁধা রশির দ্বারা।(৩৯৮)
বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, ভূ-গোলকের আয়তন পরিমাপের ফল ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং সামসময়িক বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের অধিকতর নিকটবর্তী। খলিফা আল-মামুন উভয় দলের নির্ণীত পরিমাণের গড় হিসাব গ্রহণ করেন এবং দেখেন যে এটা ৫,৬৬৬ মাইলের কাছাকাছি। আর সামসময়িক বিজ্ঞান সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে এটা ৫,৬৯৩ মাইল। আল-মামুনের এই পরিমাপ অনুযায়ী পৃথিবীর পরিধি হলো ২০,৪০০ মাইল, অর্থাৎ, প্রায় ৪১,২৪৮ কিলোমিটার। আধুনিক কালে স্যাটেলাইটের দ্বারা পরিমাপকৃত পৃথিবীর পরিধি হলো ৪০,০৭০ কিলোমিটার। আপনি আল-মামুনের নিযুক্ত দল দুটির পরিমাপ ও আধুনিক স্যাটেলাইটের পরিমাপ মিলিয়ে দেখুন, দেখবেন, উভয় পরিমাপের মধ্যে ভুলের পরিমাণ ৩%-এরও কম! নিশ্চয় এটি গৌরব করার মতো বিষয়।(৩৯৯)
টলেমির জিয়োগ্রাফি (Geography of Claudius Ptolemy) অন্যতম মৌলিক গ্রন্থ, যার ওপর মুসলিমরা তাদের ভৌগোলিক বিদ্যার ভিত্তিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বলতে গেলে এটিই একমাত্র গ্রন্থ যা মুসলিমরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্বসূরিদের উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। এর সঙ্গে অবশ্য আরেকটি গ্রন্থ ছিল, সেটির রচয়িতা হলেন মারিনুস অফ টায়ার(৪০০); তবে এই গ্রন্থটির গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত কম।(৪০১)
মুসলিমরা পূর্ববর্তীদের ভ্রান্তি সংশোধন করলেন
টলেমি তার মানচিত্রে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ নির্ধারণে যেসব ভুল করেছিলেন মুসলিম ভূগোলবিদেরা তার সংশোধন করেন। তার এসব ভ্রান্তির মধ্যে কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো। তিনি ভূমধ্যসাগরের দৈর্ঘ্যসীমা নির্ধারণে অনেক বেশি অতিরঞ্জিত করেন এবং তার পরিচিত পৃথিবীর আবাদিত অংশের বিস্তৃতি নির্ধারণেও বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যান। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে হ্রদ বলে চিহ্নিত করেন। অর্থাৎ যখন তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করেন তখন এই কাজটি করেন। সাইলোন দ্বীপের (শ্রীলংকার) আয়তন নির্ধারণেও তিনি অতিরঞ্জিত করেন। কাস্পিয়াস সাগর ও পারস্য উপসাগরের অবস্থান নির্ধারণে তিনি মারাত্মক ভুল করেন। মুসলিমরা এসব ভ্রান্তিসহ অন্যান্য ভ্রান্তিরও সংশোধন করেন। তারপর মুসলিমরা পৃথিবীকে তাদের বর্ণনামূলক মানচিত্র উপহার দেন, কমপক্ষে পাঁচ শতাব্দী ধরে ভূগোলবিদ ও পর্যটকদের বহু দল এটির চূড়ান্ত রূপদানে অংশগ্রহণ করেন। এই মানচিত্র অঙ্কনের মধ্য দিয়ে তারা এমন অনন্য কীর্তি রেখে যান, মধ্যযুগে যার কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়নি।(৪০২)
টলেমি যেসব শহরের ভৌগোলিক অবস্থান চিহ্নিত করেছিলেন তার অধিকাংশেরই বাস্তবিক অবস্থানের সঙ্গে মোটেই মিল ছিল না। কেবল ভূমধ্যসাগরের দৈর্ঘ্য নির্ধারণে তার ভ্রান্তির পরিমাণ হলো চারশ ফারসাখ (তিনি একে চারশ ফারসাখ বাড়িয়ে দেখান)।
আরবদের হাতে ভূগোলবিদ্যার কী পরিমাণ উন্নতি সাধিত হয়েছিল তা স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য গ্রিকদের নির্ণীত জায়গাগুলোর সঙ্গে আরবদের নির্ণীত জায়গাগুলোকে মিলিয়ে দেখাই যথেষ্ট।(৪০৩)
অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখা নির্ধারণ
মুসলিমরাই প্রথম ভূ-গোলকের মানচিত্রের ওপর অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখা নির্ধারণ ও অঙ্কন করেন। প্রথম যিনি দ্রাঘিমারেখা ও অক্ষরেখা নির্ধারণ করেন তিনি হলেন আবু আলি আল-মুররাকুশি(৪০৪)। তার এ কাজের পেছনে একটি মহৎ উদ্দেশ্য ছিল। যাতে মুসলিমরা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নামাযের জন্য সমান সময় নির্ধারণ করতে পারেন। আল-বিরুনিই প্রথম ভূ-গোলককে সমতলে রূপান্তরের (সমতলকরণের) গাণিতিক নীতি প্রস্তুত করেন। এটি হলো রেখা ও চিত্রকে গোলক থেকে সমতলে রূপান্তর করা এবং সমতল থেকে গোলকে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া। তিনি এই গাণিতিক নীতি অঙ্কনের মধ্য দিয়ে ভৌগোলিক মানচিত্র অঙ্কন সহজ করে তোলেন।(৪০৫)
পৃথিবীর ঘূর্ণায়মানতা সম্পর্কে গবেষণা
যে সময়টাতে বিশ্বে কেউ কল্পনাও করতে পারত না যে পৃথিবী হলো গোলকাকার এবং ভূ-গোলকের নিজ কক্ষপথে ঘূর্ণায়মানতার বিষয়ে কেউ আলোচনাও করত না, সেই সময়ে খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে (হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে) তিনজন মুসলিম বিজ্ঞানী পৃথিবীর ঘূর্ণায়মানতা ও আবর্তনের বিষয়টিকে আলোচনায় নিয়ে আসেন। তারা হলেন কাযভিনের আলি ইবনে উমর আল-কাতিবি(৪০৬), আন্দালুসের কুবুদ্দিন আশ-শিরাজি এবং সিরিয়ার আবুল ফারজ আলি। মানবেতিহাসে তারাই প্রথমবার পৃথিবী যে নিজ কক্ষপথে সূর্যের সামনে প্রতি দিনে-রাতে একবার ঘোরে সেই সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করেন। এই বিজ্ঞানীত্রয় সম্পর্কে জর্জ সার্টন বলেন, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এই তিনজন বিজ্ঞানী যে গবেষণা করেন তা বিফলে যায়নি। বরং তা নিকোলাস কোপার্নিকাসের গবেষণায় অন্যতম অনুঘটক হিসেবে প্রভাব রেখেছে। এই গবেষণা থেকেই কোপার্নিকাস ১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দে (পৃথিবীর ঘূর্ণায়মানতার) তাত্ত্বিক কাঠামো প্রকাশ করেন।(৪০৭)
ভৌগোলিক বিশ্বকোষ রচনা
ভূগোলবিদ্যায় ইসলামি সভ্যতার বিজ্ঞানীরা প্রকৃত অর্থেই বহু ভৌগোলিক বিশ্বকোষ রচনা করেন। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। ইয়াকুত হামাবির রচনা মুজামুল বুলদান। এই বিশ্বকোষ সম্পর্কে উইল ডুরান্ট বলেন, এটি একটি বৃহদাকার ভৌগোলিক বিশ্বকোষ; তিনি এতে মধ্যযুগের যাবতীয় পরিচিত ভৌগোলিক তথ্য সংগ্রহ করেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রকৃতিবিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব, মানব-ভূগোলবিদ্যা, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে মধ্যযুগে পরিচিত তথ্যের একটিকেও তিনি বাদ দেননি, বরং প্রতিটি তথ্যকে তার এই বিশ্বকোষে সংকলন করেছেন। এ ছাড়াও তিনি শহরগুলোর তুলনামূলক আয়তন এবং সেগুলোর গুরুত্ব, এসব শহরে বসবাসকারী বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবন ও কর্ম ইত্যাদিকে স্থান দিয়েছেন। এই মহান জ্ঞানী পৃথিবীকে যতটা ভালোবেসেছেন, অন্য কেউ ততটা ভালোবেসেছেন বলে আমাদের জানা নেই।(৪০৮)
গুস্তাভ লি বোঁ বলেছেন, ভূগোলবিদ্যার ওপর আরবদের রচিত যেসব গ্রন্থ আমরা পেয়েছি তার গুরুত্ব অপরিসীম। এসব গ্রন্থের কয়েকটি ইউরোপে বহু শতাব্দীব্যাপী ভূগোলবিদ্যার পঠনপাঠনের মৌলিক ভিত্তি ছিল।(৪০৯)
লি বোঁ আরও বলেন, শরিফ আল-ইদরিসি পৃথিবীর যে-মানচিত্র অঙ্কন করেন তার চিত্র আমি প্রকাশ করেছি। এই মানচিত্রে নীলনদ ও বড় বড় ট্রপিক্যাল লেকের উৎস সম্পর্কে বিবরণ দেওয়া আছে। এসব স্থান সম্পর্কে ইউরোপীয়রা এই আধুনিক কালের আগ পর্যন্ত কোনো সন্ধান পায়নি। আল-ইদরিসির এই মানচিত্র অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তার এই মানচিত্রে প্রমাণিত হয় যে, মহা-আফ্রিকার ভূগোল সম্পর্কে আরবদের জ্ঞান ছিল দীর্ঘকাল ধরে যা ধারণা করা হতো তার চেয়ে অনেক বেশি।(৪১০)
ইসলামি মানচিত্রাবলি এবং সমুদ্রবিজ্ঞানের ওপর মুসলিমদের রচনাবলি পাশ্চাত্য নৌ-চলাচলবিদ্যার অগ্রগতিতে পরিপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।(৪১১)
সামুদ্রিক অভিযান ও আমেরিকা আবিষ্কার
মুসলিমদের সামুদ্রিক অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি হলো আমেরিকা আবিষ্কার। যার কৃতিত্ব দেওয়া হয় ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে(৪১২) যে, তিনি ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন। মুসলিমরা পৃথিবীর গোলকাকৃতির বিষয়টি ঘোষণা করলেন এবং তা গাণিতিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দলিল-প্রমাণের দ্বারা সাব্যস্ত করলেন। তারপর তাদের রচনাসমূহে এমন ইঙ্গিত প্রকাশ পেতে শুরু করল যে, ভূ-গোলকের অপর পৃষ্ঠে অবশ্যই আবাদিত জনপদ রয়েছে, যা এখনো অনাবিষ্কৃত। এই তাত্ত্বিক ধারণার একটি ভিত্তি ছিল। তা এই যে, এটা কখনো বোধগম্য নয় যে পৃথিবীর একটি পৃষ্ঠ সম্পূর্ণরূপে স্থলভাগ এবং অপর পৃষ্ঠ সম্পূর্ণরূপে জলভাগ। কারণ তা পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করবে এবং তার ঘূর্ণায়মানতা ও আবর্তনের শৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটাবে।(৪১৩)
আল-বিরুনি প্রথম এই সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করেন এবং তার গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ভৌগোলিক আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু হয়। বড় বড় মুসলিম ভূগোলবিদদের রচনাবলিতে এসব অভিযান সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আল-মাসউদি(৪১৪) কর্তৃক রচিত 'মুরজুয-যাহাব ওয়া মাআদিনুল জাওহার' এবং শরিফ আল-ইদরিসি কর্তৃক রচিত 'নুযহাতুল মুশতাক ফি ইখতিরাকিল আফাক' ইত্যাদি।
বিদ্যমান তথ্য থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে যে, খাশখাশ ইবনে সাইদ আল-বাহরি নামের একজন আরব আন্দালুসীয় নাবিক ২৩৫ হিজরিতে (৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে) তার নৌযান চালিয়ে লিসবন থেকে পশ্চিম দিকে আটলান্টিক মহাসাগরে এগিয়ে যান। তিনি সাগরে একটি আবাদিত দ্বীপ আবিষ্কার করেন, যেখানে বহু বাসিন্দা রয়েছে। তিনি তাদের থেকে উপঢৌকন এনে আন্দালুসের শাসক দ্বিতীয় আবদুর রহমানের সামনে পেশ করেন। পুরস্কারস্বরূপ আবদুর রহমান খাশখাশকে ইসলামি নৌবহরের আমির নিযুক্ত করেন। এই নাবিক পরে ভাইকিংদের(৪১৫) সঙ্গে একটি সমুদ্রযুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন।(৪১৬) তিনিই আমেরিকার আবিষ্কারক হিসেবে প্রতীয়মান হন।
বিদ্যমান তথ্যে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে যে, পশ্চিম আফ্রিকার (মরক্কোর) আরবদের একটি দল আটলান্টিক মহাসাগরে বেরিয়ে ওই দ্বীপে যায়। এটা হিজরি চতুর্থ শতক এবং খ্রিষ্টীয় দশম শতকের ঘটনা। কিন্তু তাদের কেউই ফিরে আসে না এবং তাদের সম্পর্কে কোনো সংবাদও জানা যায় না। তারপর তাদের ঘিরে 'অভিযাত্রী যুবকেরা' (المُغَرَّرين قصة الفتية) নামে একটি গল্প তৈরি হয়। অভিযাত্রী যুবকদের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন আল-মাসউদি ও আল-ইদরিসি। এই গল্প থেকে জানা যায় যে, লিসবন শহরে আটজন আরব যুবক আটলান্টিক মহাসাগরে অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সবাই ছিল একটি নাবিক পরিবারের সদস্য। তারা ওই দ্বীপটি খুঁজে বের করতে চায় যেখানে তাদের পূর্বসূরিরা গিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং যাদের সম্পর্কে কোনো সংবাদ জানা যায়নি। ফলে শহরবাসী তাদের 'অভিযাত্রী তরুণদল' (الفتية المغررين) উপাধিতে আখ্যায়িত করে। এখানে المغرر শব্দটা এসেছে الغرة ধাতু থেকে, যার অর্থ অগ্রযাত্রা বা অভিযাত্রা। শব্দটি الغرور ধাতু নিষ্পন্ন (المغرورين) (আত্মপ্রবঞ্চিত) নয়, যদিও কোনো কোনো তথ্যসূত্রে এ শব্দটিই রয়েছে। আল-মাসউদি তার 'মুরুজুয-যাহাব' গ্রন্থে 'যারা আটলান্টিক মহাসাগর ভ্রমণে প্রাণের ঝুঁকি নিয়েছিল, তাদের মধ্যে যারা বেঁচে গিয়েছিল ও যারা ধ্বংস হয়েছিল এবং তারা যা দেখেছিল সেই সম্পর্কিত সংবাদ' (أخبار من خاطر بنفسه في ركوبه - أي المحيط الأطلسي ومن نجا منهم ومن تلف، وما شاهدوا منه وما رأوا) শিরোনামে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
আল-ইদরিসিও এই গল্পের অবতারণা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এই আটজন যুবক আন্দালুসে ফিরে এলে লিসবনের বাসিন্দারা তাদের ঘিরে ধরে। নানা ধরনের সাজসজ্জা ও আনন্দ-উল্লাসের সঙ্গে তাদের অভিনন্দন জানায়। এই যুবকেরা যে সড়কে বসবাস করত সেই সড়কের নাম দেয় 'অভিযাত্রী তরুণদের সড়ক'। এটা খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীর শেষ দিকের ঘটনা। তারপর লিসবনে এই নামটি কয়েকশ বছর ধরে পরিচিত ছিল। - অনুবাদক আবু উবাইদুল্লাহ আল-আন্দালুসি
আবু উবাইদুল্লাহ আল-বাকরি আল-আন্দালুসি (মৃ. ৪৮৭ হি.) তার 'আল-মাসালিক ওয়াল-মামালিক' গ্রন্থে লিসবনের আরব অভিযাত্রী যুবকদের কাহিনি উল্লেখ করেছেন, যারা আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিল। তিনি তাদের ফিরে আসার পরের কাহিনি উল্লেখ করেছেন। ফিরে এসে তারা জানায় যে, ওখানে তাদের সঙ্গে যাদের সাক্ষাৎ ঘটেছে তারা আরবিতে কথাবার্তা বলে। তারা ওই ভূমিখণ্ডের বর্ণনাও দেয়, সেটি ছিল ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের মতো। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কলম্বাসের আমেরিকায় পৌঁছার তিনশ বছর আগে থেকেই সেখানে মুসলিমরা ছিল।
শিহাবুদ্দিন আল-আরাবি আল-উমারি (১০০০-১৩৪৯ খ্রি.) খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে তার ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ 'মাসালিকুল আবসার ওয়া মামালিকুল আমসার' রচনা করেন। এটি মোট ২৭ খণ্ডে রচিত। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মালি সাম্রাজ্য ছিল ইসলামি শাসনাধীন, মানসা মুসা (মুসা অব মালি) তা শাসন করতেন। মানসা মুসা ঐতিহাসিক শিহাবুদ্দিন আল-উমারির সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তাকে মালির নবম সম্রাটের কাহিনি বর্ণনা করেন। তিনি ছিলেন মানসা মুসার বড় ভাই ও তার পূর্ববর্তী সম্রাট। তিনি আটলান্টিক মহাসাগরে অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্যে শাসনকার্যই ছেড়ে দেন। আটলান্টিকের ওপারে কী রয়েছে তা তিনি দেখতে চান। এই সংকল্পে তিনি ২০০ জাহাজ ও ২০০০ নৌকা প্রস্তুত করেন। এগুলোতে শুকনো খাবার ও স্বর্ণ বোঝাই করেন। এটা কলম্বাসের আমেরিকায় পৌঁছার ১০০ বছর আগের ঘটনা।
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, আমেরিকায় প্রকৃতপক্ষেই আফ্রিকান মুসলিমদের উপস্থিতি ছিল। কলম্বাসের নিজের একটি পাণ্ডুলিপিতে মার্কিন ভূখণ্ডে আফ্রিকানদের উপস্থিতির বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তারা সোনা গলাত।-অনুবাদক
আরবরাই যে আমেরিকা আবিষ্কারে এগিয়ে ছিলেন তা-ই আন্দালুসের ভূগোলবিদদের রচনা থেকে স্পষ্ট হয়। ঐতিহাসিক ও ভাষাবিজ্ঞানী আল-আব্ আনাসতাস মারি আল-কারমালির(৪১৭) বক্তব্য থেকে এ বিষয়টি আরও জোরালো হয়। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মুসলিমরা কলম্বাসের বহু পূর্বেই লিসবন থেকে আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন। কারণ তারা আটলান্টিক মহাসাগরে উষ্ণ গলফ স্ট্রিম (Gulf Stream red-hot) সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখতেন। তিনি বলেন, অন্যান্য সব জাতি থেকে আরব জাতিই এই স্ট্রিম ও তার বৈশিষ্ট্যাবলি জানার ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিল। তা মেক্সিকো থেকে কীভাবে আয়ারল্যান্ডে যায় এবং আয়ারল্যান্ড থেকে কীভাবে মেক্সিকোতে ফিরে আসে সেই সম্পর্কে তাদেরই সবচেয়ে বেশি জ্ঞান ছিল।(৪১৮)
মুসলিমগণ আমেরিকার আবিষ্কারক, এ ব্যাপারে যা বলা হলো তার চেয়েও স্পষ্ট, বিস্ময়কর ও প্রভাবসঞ্চারী হলো ওই মানচিত্র যা জার্মান প্রাচ্যবিদ পল আর্নেস্ট কাহলে(৪১৯) তুরস্কের তোপকাপি প্যালেস গ্রন্থাগার থেকে আবিষ্কার করেছেন। কয়েক বছরব্যাপী আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও পরীক্ষানিরীক্ষার পর ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এই মানচিত্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন। এই মানচিত্র বিজ্ঞানীদের মাথা খারাপ করে দেয়, গোটা বিশ্বকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে ফেলে। এই মানচিত্র ছিল তুর্কি মুসলিম ভূগোলবিদের রচিত, তিনি হলেন পিরি রেয়িস (Piri Reis)(৪২০)। তার পূর্ণনাম মুহিউদ্দিন ইবনে মুহাম্মাদ আর-রেয়িস। তিনি ছিলেন তুর্কি নৌবহরের অন্যতম নৌকমান্ডার। তিনি ছিলেন সেই সময়ের 'মাস্টার অফ দা সি'। তার মানচিত্রটি মূলত কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন মানচিত্রে বিভক্ত। এটি আটলান্টিক মহাসাগরের পূর্বাংশকে বর্ণনা করেছে, যেখানে রয়েছে স্প্যানিশ ও পশ্চিম আফ্রিকান উপকূলসমূহ। আপনি যদি এই মানচিত্রে আটলান্টিকের পশ্চিমাংশকে দেখেন তাহলে দেখবেন যে, সেখানে রয়েছে আমেরিকান ভূখণ্ড, তার উপকূলসমূহ ও দ্বীপসমূহ, বন্দর ও জীবজন্তু। আরও রয়েছে রেড ইন্ডিয়ানদের চিত্র, তাদেরকে তিনি চিত্রিত করেছেন নগ্ন অবস্থায় এবং তারা মেষ চরাচ্ছে।
রুশ-সোভিয়েত প্রাচ্যবিদ ও আরবি ভাষাবিদ ইগন্যাটি ইয়ুলিয়ানোভিচ ক্র্যাচকোঙ্কি (Ignaty Yulianovich Krachkovsky) তারিখ الأدب الجغرافي العربي গ্রন্থে এই মানচিত্রের বিচার-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, পিরি রেয়িস তার মানচিত্র কলম্বাসের মানচিত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন। তুর্কি নৌবহর ১৪৯৯ খ্রিষ্টাব্দে যখন ভেনেটিয়ান নৌবহরকে পরাজিত করে এবং তাদের কয়েকটি জাহাজ আটক করে তখন হয়তো কলম্বাসের মানচিত্র পিরি রেয়িসের হাতে এসে থাকবে।(৪২১)
কিন্তু অধিকাংশ গবেষকই ক্র্যাচকোস্কির এই মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তার বিরুদ্ধমত প্রকাশ করেছেন। কারণ পিরি রেয়িসের মানচিত্রে এমন সব জায়গার বর্ণনা ছিল যা কলম্বাস জানতেনই না এবং তার সেগুলো আবিষ্কারেরও প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু এ সকল গবেষক বিকল্প বিচার-বিশ্লেষণ করেননি যার দ্বারা এই রহস্যময় মানচিত্রের রহস্য উন্মোচিত হয়।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। তা এই যে, ১৯৫২ সালে ব্রাজিলীয় নিউজপেপারগুলো একটি বিবৃতি প্রকাশ করে, বিবৃতিটি দেন ড. জাগরিস, যিনি দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব দা উইটওয়াটারস্ট্যান্ড-এর সামাজিক প্রত্নতত্ত্ববিদ্যার (social archaeological sciences) অধ্যাপক। (অ্যারাবিয়ান বিজনেস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী) বিবৃতিতে বলা হয়, ইতিহাসের গ্রন্থাবলি আমেরিকা আবিষ্কারের বিষয়টিকে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বড় ভুল করেছে। তার কারণ, কলম্বাসের কয়েকশ বছর পূর্বে প্রকৃতপক্ষে আরবরাই(৪২২) (আরব মুসলিমরাই) আমেরিকা আবিষ্কার করেছে।(৪২৩) অধ্যাপক ড. জাগরিসের ছয় বছরব্যাপী পরিচালিত গবেষণার ভিত্তি ছিল মানব-কাঠামো পরীক্ষানিরীক্ষা, যা ব্রাজিলীয় গ্রেনাডায় (Grenada) আবিষ্কৃত হয়েছিল।(৪২৪)
দক্ষিণ মেরুতে ষষ্ঠ মহাদেশ আবিষ্কার
মুহিউদ্দিন আর-রেয়িস (পিরি রেয়িস)-এর মানচিত্রে বিস্ময়কর এমন কিছু ছিল, যার ফলে তা মহাকাশ ভ্রমণ ও স্যাটেলাইট থেকে পৃথিবীর ছবি উত্তোলনের যুগ শুরু হওয়ার পরও বিজ্ঞানীদের স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ত রেখেছে। বিংশ শতাব্দীতে আমেরিকা ও ইউরোপে মানচিত্রাঙ্কনবিদদের প্রথম বিশ্বাস ছিল যে পিরি রেয়িসের মানচিত্রগুলো ততটা সূক্ষ্ম ও যথার্থ নয়, বরং এর চিত্রাঙ্কনে বেশ ভুলত্রুটি রয়েছে। মার্কিন উপকূলীয় অঞ্চল সম্পর্কে তাদের সর্বশেষ সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এমনই ছিল বিশ্বাস। কিন্তু যখন প্রথমবার স্যাটেলাইট থেকে এসব অঞ্চলের ছবি তুলে তা প্রকাশ করা হয় তখন তারা বিমূঢ় হয়ে পড়েন। কারণ তারা এতদিন পর্যন্ত যা ভেবেছেন ও চিন্তা করেছেন মুহিউদ্দিন আর-রেয়িসের মানচিত্রই তার চেয়ে অধিকতর সূক্ষ্ম ও যথার্থ! তা পরিপূর্ণরূপেই স্যাটেলাইট থেকে ধারণকৃত ছবিগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ! বরং তাদের তথ্যাবলিই ভুল। এর ফলে নাসায় (ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) একদল বিজ্ঞানী মুহিউদ্দিন আর-রেয়িসের মানচিত্রগুলোর পুনর্নিরীক্ষণ করেন, সেগুলো বারবার বড় করে দেখেন। এবার তারা দ্বিতীয়বারের মতো বিমূঢ় হন। কারণ মুহিউদ্দিন আর-রেয়িস তার মানচিত্রে দক্ষিণ মেরুতে ষষ্ঠ মহাদেশ নির্দেশ করেছেন, যার নাম এন্টার্কটিকা (Antarctica)। এটি তাদের এন্টার্কটিকা আবিষ্কারের দুইশ বছরেরও আগের ঘটনা। মুহিউদ্দিন আর-রেয়িস এন্টার্কটিকার পাহাড়সমূহ ও উপত্যকাসমূহের বর্ণনাও দিয়েছেন, যেগুলো ১৯৫২ সালের আগ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।
পিরি রেয়িসের মানচিত্রের সূক্ষ্মতা ও যথার্থতা
সুইস লেখক এরিক ফন দানিকেন (Erich von Däniken) Zuvi Chariots of the Gods? Unsolved Mysteries of the Past নামক বইয়ে(৪২৫) বলেছেন, পিরি রেয়িসের মানচিত্রগুলো মার্কিন মানচিত্রাঙ্কনবিদ ও নাবিক আর্লিংটন ম্যালেরির (Arlington H. Mallery) কাছে পেশ করা হয়। তিনি মানচিত্রগুলোর সূক্ষ্ম পরীক্ষানিরীক্ষা ও বিচার-বিশ্লেষণের পর সিদ্ধান্ত দেন যে, এগুলো (আমেরিকা-সম্পর্কিত) যাবতীয় ভৌগোলিক তথ্য ও বাস্তবতাকে ধারণ করেছে। তবে তার সন্দেহ থেকে যায় যে, এখানে একটি ভুল থেকে গেছে অথবা কোনো কোনো স্থান-নির্দেশ যথার্থ হয়নি। ফলে তিনি মার্কিন নৌবহরের হাইড্রোগ্রাফিক ব্যুরোর মানচিত্রাঙ্কনবিদ মিস্টার ওয়ালটার্স (Mr. Walters)-এর শরণাপন্ন হন। তারা উভয়ে স্থান-নির্দেশক সংখ্যাঙ্কিত বর্গজালি তৈরি করেন এবং মানচিত্রগুলোকে একটি আধুনিক গ্লোবে রূপান্তরিত করেন। এভাবে তারা চাঞ্চল্যকর সব তথ্য আবিষ্কার করেন। মানচিত্রগুলো সম্পূর্ণরূপে নির্ভুল। কেবল ভূমধ্যসাগর ও মৃতসাগরই নয়, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল এবং এন্টার্কটিকা সংলগ্ন অঞ্চলগুলোও পিরি রেইসের মানচিত্রে যথাযথভাবে বর্ণিত হয়েছে। এগুলো মূলত ভূ-সংস্থানিক মানচিত্র (Topographic Map), এতে বিস্ময়কর সূক্ষ্মতায় অঞ্চলগুলোর অভ্যন্তরীণ ভূ-সংস্থানের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এতে পাহাড়-পর্বত, পর্বতশৃঙ্গ, নদীনালা, মালভূমি ইত্যাদির স্পষ্ট ও নির্ভুল বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যেন এগুলোর চিত্র মহাকাশ থেকে ধারণ করা হয়েছে!(৪২৬)
১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন গ্রেট অবজারভেটরি ও মার্কিন সমুদ্র-পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে একদল ভূগোলবিজ্ঞানী পিরি রেইসের মানচিত্রগুলোর ওপর অধিকতর পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান চালান। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষণার পর তারা দেখেন যে ষষ্ঠ মহাদেশ এন্টার্কটিকার চিত্র বিস্ময়কর পর্যায়ে বিশুদ্ধ ও যথার্থ। এমনকি আমাদের বর্তমান যুগেও যেসব স্থান পরিপূর্ণরূপে আবিষ্কৃত হয়নি তারও বর্ণনা রয়েছে পিরি রেইসের মানচিত্রগুলোতে! দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের পর্বতরাশির অস্তিত্ব ১৯৫২ সালের আগে আবিষ্কৃত হয়নি। এগুলো সবসময়ই পুরু বরফের স্তরে ঢাকা থাকে। আধুনিক মানচিত্রগুলোতে এসব পর্বত আবিষ্কার করা হয়েছে ইকো-সাউন্ডিং যন্ত্রপাতি (Echo-Sounding apparatus) ব্যবহার করে।
এখানে আরও উল্লেখ্য যে, মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা পিরি রেইসের মানচিত্রগুলোর ওপর অনুসন্ধান ও গবেষণা অব্যাহত রেখেছে। তাদের কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, দক্ষিণ মেরু অঞ্চল অর্থাৎ এন্টার্কটিকার উপর দিয়ে অতিক্রম করার সময় মহাকাশযান থেকে ভূ- গোলকের যেসব চিত্র ধারণ করা হয়েছে তার সঙ্গে এসব মানচিত্র সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মহাকাশযান থেকে পাঁচ হাজার মাইলব্যাপী অঞ্চলের চিত্র ধারণ করা হয়েছে। তা ছাড়া তারা স্যাটেলাইট থেকে ধারণকৃত চিত্রসমূহ ও পিরি রেয়িসের মানচিত্রগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস্য মিল খুঁজে পেয়েছেন!(৪২৭)
স্পেন থেকে ভারত পর্যন্ত নৌপথ আবিষ্কার
আবুল আব্বাস আল-কালকাশান্দি (মৃ. ১৪১৮) তার সুবহুল আ'শা গ্রন্থে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগের বিষয়টি যথার্থভাবে বর্ণনা করেছেন। তার এই বক্তব্য থেকে মুসলিমরা যে ভাস্কো দা গামার(৪২৮) আগেই এ বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন তা স্পষ্ট হয়। তিনি আটলান্টিক মহাসাগর সম্পর্কে বলেছেন, এই মহাসাগর মরোক্কান উপকূল থেকে জিব্রাল্টার প্রণালির-যা আন্দালুস ও মরক্কোকে বিভক্ত করেছে-পাশ দিয়ে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গিয়েছে এবং বার্বারদের অঞ্চল লামতুনা মরুভূমি অতিক্রম করেছে। আল-কালকাশান্দি তারপর সমুদ্রপথের বর্ণনা দিয়েছেন, তারপর তা জিবালুল কামারের (Dhofar Mountains) পেছন দিয়ে পূর্ব দিকে এগিয়েছে। জিবালুল কামার থেকে মিশরের নীলনদের উৎস শুরু হয়েছে। এর আলোচনা পরে আসবে। এভাবে আটলান্টিক মহাসাগর ভূমি থেকে দক্ষিণমুখী হয়েছে এবং আরদু খারাব (ওয়াস্টল্যান্ড)-এর ওপর দিয়ে ও যান্জ (Zanj) দেশের পেছন দিয়ে (সহিলি উপকূলকে বামে রেখে) পূর্বদিকে এগিয়েছে, তারপর পূর্বে ও উত্তরে বিস্তৃত হয়ে ভারত মহাসাগর ও চীন সাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।(৪২৯)
ইগন্যাটি ক্র্যাচকোস্কি উল্লেখ করেছেন যে, একজন আরব নাবিক ভাস্কো দা গামা যে ভ্রমণ করেছেন সেই একই ভ্রমণ করেছেন ১৪২০ খ্রিষ্টাব্দে, তবে উলটোপথে, তিনি ভারত মহাসাগরের একটি বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং আফ্রিকার চারপাশ ঘুরে আটলান্টিক মহাসাগরে মরক্কোর বন্দরে পৌছেন। এটি ভাস্কো দা গামার জন্মেরও ৪৭ বছর আগের ঘটনা।(৪৩০)
ভাস্কো দা গামা তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন যে, ভ্রমণকালে যে-সকল আরব নাবিকের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে তারা উন্নতমানের কম্পাস রাখতেন জাহাজের দিক-নির্দেশনার জন্য। তাদের সঙ্গে পর্যবেক্ষণযন্ত্রও থাকত, থাকত সামুদ্রিক মানচিত্রও। বিভিন্ন সময়ে তিনি তাদের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং তাদের সাহায্য গ্রহণ করেছেন। তিনি আরব নাবিকদের কিছু মানচিত্র পর্তুগালের সম্রাট ম্যানুয়েলের (Manuel I of Portugal) কাছে পাঠিয়ে দেন। আরেকজন মুসলিম নাবিকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার নাম মুআল্লিম কানা। তিনি মালিন্ডির বাসিন্দা ছিলেন। তিনিই ভাস্কো দা গামার জাহাজকে মালিন্ডি(৪৩১) থেকে ভারতের কালিকোট বন্দরে পৌঁছে দেন। অন্যান্য তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যিনি ভাস্কো দা গামার জাহাজ চালিয়ে নিয়ে আসেন তিনি হলেন আরব মুসলিম ভূগোলবিদ ও নাবিক ইবনে মাজেদ(৪৩২)। তিনিই কম্পাস আবিষ্কার করেছিলেন। আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে, পরবর্তী মুসলিমদের অঙ্কিত মানচিত্রগুলোতে-যেমন আল-মাসউদির মানচিত্র ও আল-ইদরিসির মানচিত্র-আফ্রিকাকে ঘিরে আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে ভারত মহাসাগরের সংযোগ-ব্যবস্থার স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। এসব সামুদ্রিক অঞ্চল আরব নৌবহরের দ্বারা আবাদিত ছিল। এসব নৌবহর ভারত ও পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যে যাওয়া-আসা করত।(৪৩৩)
ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের প্রচেষ্টা ও তাদের চারপাশের ভূ-অঞ্চল আবিষ্কারের যে কাহিনি তা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পড়লে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়। তাদের সেসব প্রচেষ্টার ফল কত-না উজ্জ্বল, কত-না চমৎকার!
আরবের গুরুত্বপূর্ণ ভূগোলবিদ ও তাদের রচিত গ্রন্থসমূহের পরিসংখ্যান ব্যাপক ও বিস্তৃত বর্ণনার দাবি রাখে। আবুল ফিদা(৪০৪) একাই ষাটজন ভূগোলবিদের নাম উল্লেখ করেছেন, যাদের আবির্ভাব ঘটেছিল তার পূর্বে।... ইউরোপীয়রা যদি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ইসলামের প্রতি (বিদ্বেষভাবাপন্ন) চিন্তাভাবনা আঁকড়ে ধরে লালন না করত, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে, তাহলে ইউরোপের ভূগোলবিদ্যার বড় বড় পণ্ডিতরা কেন মুসলিমদের অবদানকে অস্বীকার করে তার কারণ উদ্ঘাটন করা দুষ্কর হতো। তা সত্ত্বেও আরবরা যেসব বড় বড় কাজ করেছেন তা তাদের কদর ও মূল্য প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। কারণ আরবরাই প্রথম নিয়মতান্ত্রিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন করেছেন, যা মানচিত্রবিদ্যার প্রধান ভিত্তি।(৪০৫)
এগুলোও আমাদের কথা নয়, বরং গুস্তাভ লি বোঁর কথা।
টিকাঃ
৩৭৬. মার্টিন প্লেসনার, মাবহাসুল উলুম, যোসেফ শাস্ত্র (Joseph Franz Schacht) ও ক্লিফোর্ড এডমন্ড বসওয়র্থ (Clifford Edmund Bosworth) কর্তৃক সম্পাদিত The Legacy of Islam, আরবি অনুবাদ, تراث الاسلام খ. ২, পৃ. ১৫৪।
৩৭৭. মার্টিন প্লেসনার (Martin Plessner 1797-1883) জার্মান অর্থোডক্স ধর্মপ্রচারক এবং পণ্ডিত। বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ। বেলারুশে জন্মগ্রহণ করেন। ইসলামের ধ্রুপদি ঐতিহ্য এবং মধ্যযুগে ইহুদিধর্মের ওপর ইসলামের প্রভাব তার প্রধান আগ্রহের বিষয়।-অনুবাদক
৩৭৮. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৬৮।
৩৭৯. হেকাটিয়াস মূলত অ্যানাক্সিম্যান্ডারের (Anaximander 610-546 BC) অঙ্কিত মানচিত্রের উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন।- অনুবাদক।
৩৮০. প্রাগুক্ত এবং জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯৭-৩৯৮।
৩৮১. সুরা নাযিআত: আয়াত ৩০।
৩৮২. সুরা যুমার: আয়াত ৫।
৩৮৩. ইবনে খুররাদাযবিহ: আবুল কাসিম উবাইদুল্লাহ ইবনে আহমাদ ইবনে খুররাদাযবিহ (২০৪- ২৭২ হি./৮২০-৮৮৫ খ্রি.)। ভৌগোলিক ইতিহাসবিদ। বারমাকিদের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ المسالك والممالك। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল- ওয়াফায়াত, খ. ১৯, পৃ. ২২৯।
৩৮৪. ইবনে খুরাদাযবিহ, আল-মাসালিক ওয়াল-মামালিক, পৃ. ৪।
৩৮৫. ইবনে রুসতাহ: আবু আলি আহমাদ ইবনে উমর (মৃ. ৩০০ হি./৯১২ খ্রি.)। ভূগোলবিদ। ইরানের ইস্পাহানের অধিবাসী। الأعلاق النفيسة তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। দেখুন, যিরিকলি, আল- আ'লাম, খ. ১, পৃ. ১৮৫।
৩৮৬. ইবনে রুসতাহ, আল-আ'লাক আন-নাফিসাহ, পৃ. ৮।
৩৮৭. ইবনে আবদি রাব্বিহি: আবু উমর আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদি রাব্বিহি ইবনে হাবিব ইবনে হুদাইর ইবনে সালেম (২৪৬-৩২৮ হি./৮৬০-৯৪০ খ্রি.)। শীর্ষস্থানীয় সাহিত্যিক। আল-ইকদুল ফারিদ গ্রন্থের প্রণেতা। কর্ডোভার অধিবাসী। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২০৭।
৩৮৮. আবু উবাইদা আল-ফালাকি : আবু উবাইদা মুসলিম ইবনে আহমাদ (মৃ. ২৯৫ হি.)। গ্রহরাজির আবর্তন ও নক্ষত্রের সন্তরণ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন। জ্যোতির্বিদ্যায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল। ছিলেন ফকিহ ও হাদিস বিশারদ। ভাষা ও ব্যাকরণ এবং ছন্দশাস্ত্রেও দখল ছিল তার। দেখুন, আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ৩, পৃ. ৩৭৪।
৩৮৯. সাসানীয় সম্রাট; প্রথম বাহরাম, দ্বিতীয় বাহরাম ও পঞ্চম বাহরাম সাসানীয় সম্রাট ছিলেন।- অনুবাদক
৩৯০. ইরানের খুরাসান প্রদেশের গুরাবাদ জেলার একটি শহর।-অনুবাদক
৩৯১. সূরা যুমার: আয়াত ৫।
৩৯২. ইবনে হাযম আল-আন্দালুসি, الفصل في الملل والأهواء والنحل ২, পৃ. ৭৮।
৩৯৩. আল-ইদরিসি, نزهة المشتاق في اختراق الآفاق, পৃ. ৯১।
৩৯৪. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ৩৫৮।
৩৯৫. সিন্দ ইবনে আলি: আবু তাইয়িব সিন্দ ইবনে আলি আল-ইয়াহুদি (মৃ. ২৫০ হি./৮৬৪ খ্রি.)। প্রখ্যাত মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী, অনুবাদক, গণিতজ্ঞ ও প্রকৌশলী। খলিফা আল-মামুনের দরবারে আসেন এবং তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি তারকা-সারণি জিজ আল-সিন্দহিন্দ (Zij al-Sindhind) অনুবাদ ও সম্পাদনার জন্য পরিচিতি লাভ করেন। একজন গণিতবিদ হিসাবে সিন্দ ইবনে আলি আল-খাওরিজমির সহকর্মী ছিলেন। পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ كتاب المنفصلات والمتوسطات في النجوم والحساب। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৫, পৃ. ২৪২।
৩৯৬. আলি ইবনে ঈসা আল-আস্তুরলাবি ছিলেন বিখ্যাত গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ। বাগদাদে বসবাস করতেন। খলিফা আল-মামুনের বিজ্ঞান পরিষদে ছিলেন।
৩৯৭. ধ্রুবতারা (Pole star): পৃথিবীর উত্তর মেরুর অক্ষ বরাবর দৃশ্যমান তারা ধ্রুবতারা নামে পরিচিত। এই তারাটি পৃথিবীর অক্ষের উপর ঘূর্ণনের সঙ্গে প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে আবর্তিত হয়। প্রাচীন কালে দিনির্ণয়যন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে সমুদ্রে জাহাজ চালানোর সময় নাবিকেরা এই তারার অবস্থান দেখে দিনির্ণয় করত। সপ্তর্ষিমণ্ডলের প্রথম দুটি তারা, পুলহ এবং ক্রতুকে সরলরেখায় বাড়ালে তা এ তারাটিকে নির্দেশ করে। এটি লঘু সপ্তর্ষিমণ্ডলে দেখা যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশের দৃশ্যমান সকল তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। শুধু ধ্রুবতারাই মোটামুটি একই স্থানে দৃশ্যমান থাকে। এটি আকাশের একমাত্র তারা, যেটিকে এ অঞ্চল হতে বছরের যেকোনো সময়েই ঠিক এক জায়গায় দেখা যায়। পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ থেকে ধ্রুবতারাকে সারা বছরই আকাশের উত্তরে নির্দিষ্ট স্থানে দেখা যায়। দিনির্ণয়ে এই তারা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বাংলাদেশের আকাশে ধ্রুবতারাকে বেশি উঁচুতে দেখা যায় না। ঢাকা থেকে ধ্রুবতারার উচ্চতা ২৩ ডিগ্রি ৪৩ মিনিট। দিগ্বলয় থেকে আকাশের প্রায় চারভাগের একভাগ উঁচুতেই এই তারাটির মতো উজ্জ্বল আর কোনো তারা নেই বলে একে চিনতে বিশেষ অসুবিধা হয় না। তবে বাংলাদেশ থেকে যতই উত্তরে যাওয়া যাবে, ধ্রুবতারাকে ততই ওপরে দেখা যাবে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৩৯৮. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল-আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১৬২।
৩৯৯. এই বিষয়ে দেখুন, Johannes Willers, Schätze der Astronomie, আরবি অনুবাদ, كنوز علم الفلك, পৃ. ২৫।
৪০০. মারিনুস অফ টায়ার (Marinus of Tyre): টায়ার-এর আরবি নাম সুর। এটি ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত একটি শহর। সিরিয়ায় খ্রিষ্টপূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের সময়ে তিনি সুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার জীবৎকাল খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দীর শেষ থেকে নিয়ে দ্বিতীয় শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত (৭০-১৩০ খ্রিষ্টাব্দ)। টলেমি প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি মারিনুসের শিষ্য ছিলেন। মারিনুস অফ টায়ারের উল্লেখযোগ্য রচনা হলো 'তাসহিহুল জুগরাফিয়া'।
৪০১. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯০।
৪০২. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯০-৩৯৩।
৪০৩. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৬৮।
৪০৪. আবু আলি আল-হাসান ইবনে আলি ইবনে আল-মুররাকুশি (মৃ. ৬৬০ হি./১২৬২ খ্রি.)। মরোক্কান জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ, ভূগোলবিদ এবং সূর্যঘড়িনির্মাতা। ত্রিকোণমিতিতে সবিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ত্রিকোণমিতিতে তিনি নতুন রীতির প্রবর্তন করেন। তিনিই প্রথম সাইন, কোসাইন ইত্যাদি ব্যবহার করেন এবং সাইন-সারণি তৈরি করেন। বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করেন। ২৪০টিরও বেশি নক্ষত্র চিহ্নিত করে তাদের বর্ণনা দেন। সমান সময় নির্দেশ রেখা ব্যবহার করেন। বিভিন্ন ভৌগোলিক ত্রুটি সংশোধন করেন এবং মরক্কোর মানচিত্র নতুনভাবে অঙ্কন করেন। জর্জ সার্টন বলেছেন, আল-মুৱাকুশি প্রথম কোণের সাইন এবং ৯০ ডিগ্রির কম কোণ নির্দেশ করেন।-অনুবাদক
৪০৫. ড. আবদুর রহমান হামিদাহ, আলামুল জুগরাফিয়্যিনাল আরব, পৃ. ৪৫৯।
৪০৬. আলি ইবনে উমর আল-কাতিবি: নাজমুদ্দিন আলি ইবনে উমর ইবনে আলি আল-কাতিবি আল-কাযবিনি (৬০০-৬৭৫ হি./১২০৩-১২৭৭ খ্রি.)। প্রজ্ঞাবান ও যুক্তিবিদ। নাসিরুদ্দিন আত-তুসির শিষ্য। তার বহু রচনা রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো 'আশ-শাসিয়্যাহ' ও 'হিকমাতুল আইন'। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২১, পৃ. ২৪৪।
৪০৭. জর্জ সার্টন, Introduction to the History of Science, খ. ১, পৃ. ৪৬।
৪০৮. উইল ডুরান্ট, 'কিস্সাতুল হাদারাহ', খ. ১৩, পৃ. ৩৫৯।
৪০৯. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৬৯।
৪১০. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৭০।
৪১১. মার্টিন প্লেসনার, মাবহাসুল উলুম, যোসেফ শাফ্ত (Joseph Franz Schacht) ও ক্লিফোর্ড বসওর্থ (Clifford Edmund Bosworth) কর্তৃক সম্পাদিত The Legacy of Islam, আরবি অনুবাদ, تراث الاسلام , খ. ২, পৃ. ১৫৪।
৪১২. ক্রিস্টোফার কলম্বাস (১৪৫১-১৫০৬ খ্রি.) বিখ্যাত ইতালীয় পর্যটক ও উপনিবেশ প্রতিষ্ঠাতা। আমেরিকা, বাহামা দ্বীপপুঞ্জ ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কার করেছেন বলে দাবি করা হয়। তিনি প্রচণ্ড ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে স্পেনে মৃত্যুবরণ করেন।
৪১৩. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯৬-৩৯৭।
৪১৪. আল-মাসউদি: আবুল হাসান আলি ইবনুল হুসাইন ইবনে আলি (২৮৩-৩৪৬ হি./৮৯৬-৯৫৭ খ্রি.)। ইতিহাসবিদ, পর্যটক, অনুসন্ধানী। বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন, কায়রোতে বসবাস করতেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। مروج الذهب ومعادن الجوهر তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২১, পৃ. ৬-৭; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ২৭৭।
৪১৫. ভাইকিং (Viking) বলতে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সমুদ্রচারী ব্যবসায়ী, যোদ্ধা ও জলদস্যুদের একটি দলকে বোঝায়, যারা ৮ম শতক থেকে ১১শ শতক পর্যন্ত ইউরোপের এক বিরাট এলাকাজুড়ে লুটতরাজ চালায় ও বসতি স্থাপন করে। এদেরকে নর্সম্যান বা নর্থম্যানও বলা হয়। ভাইকিংরা পূর্ব দিকে রাশিয়া ও কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত পৌছেছিল।
৪১৬. আল-মাসউদি, মুরুজুয যাহাব ওয়া মাআদিনুল জাওহার, খ. ১, পৃ. ১১৯।
৪১৭. আল-আব্ আনাসতাস মারি আল-কারমালি (Al-Ab Anastas Mari Al-Karmali) : তিনি বুতরুস জিবরাইল ইউসুফ আওয়াদ (১২৮৩-১৩৬৬ হি./১৮৬৬-১৯৪৭ খ্রি.) লেবানিজ খ্রিষ্টান পুরোহিত ও আরবি ভাষাবিজ্ঞানী সাহিত্যিক। আরবের দর্শন ও ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ। আরবি ভাষাবিজ্ঞানে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আলাম, খ. ২, পৃ. ২৫।
৪১৮. الأب انستاس ماري الكرملي : عرف العرب أمريكا قبل أن يعرفها الغرب. الهلال প্রকাশিত, সংখ্যা ১০৬। আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ তার اثر العرب في الحضارة الأوروبية বইতে এ দিকে ইঙ্গিত করেছেন, পৃ ৪৭।
৪১৯. পল আর্নেস্ট কাহলে (Paul Ernst Kahle 1875-1964): বিখ্যাত জার্মান প্রাচ্যবিদ। মারবুর্গ ও বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্যের ভাষা শেখেন। প্রোটেস্ট্যান্ট যাজক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন রোমানিয়া ও কায়রোতে। কায়রোতে ভাষাতত্ত্বের ওপরও অধ্যয়ন করেন।
৪২০. পিরি রেয়িস: মুহিউদ্দিন ইবনে মুহাম্মাদ আর-রেয়িস (৮৭৭-৯৬২ হি./১৪৭০-১৫৫৫ খ্রি.)। উসমানি নৌসেনাপতি, নাবিক, ভূগোলবিদ ও মানচিত্রাঙ্কনবিদ। ১৫০০ সালে মাওদান সমুদ্রযুদ্ধে তিনি প্রধান সেনাপতি ছিলেন। তিনি বিশ্বের দুটি মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: কিতাবু বাহরিয়্যাহ।
৪২১. ক্র্যাচকোল্কি, তারিখুল আদাবিল জুগরাফিয়্যিল আরাবি, খ. ২, পৃ. ৫৬২।
৪২২. প্রফেসর ইভান ভান সারটিমা (Ivan Van Sertima) তার ১৯৭৬ সালে রচিত They Came Before Columbus: The African Presence in Ancient America গ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তিনি দলিল-প্রমাণ উপস্থিত করেছেন। কলম্বাসের নিজের কথা থেকেও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, আরবরাই প্রথম আমেরিকায় পৌছেছিল। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি বিশ্বাস করতেন ওই দ্বীপে যেসব রেড ইন্ডিয়ানদের দেখেছেন তারা মূলত আরব বংশোদ্ভূত, তার আগেই তারা ওখানে পৌঁছেছিল। আরবদের পাণ্ডুলিপি থেকেই তিনি এসব তথ্য জেনেছিলেন। ব্রিটিশ রয়াল জিয়োগ্রাফিক্যাল সোসাইটি The Discoverers নামে একটি ডকুমেন্টারি টিভি সিরিজ তৈরি করেছে। এখানে একটি পর্ব ছিল কেবল কলম্বাস ও তার আবিষ্কার সম্পর্কে। তা থেকে জানা যায় যে, তিনি আরবি ভাষা জানে এমন একজনকে তার সহযাত্রী মনোনীত করেছিলেন। অর্থাৎ লোকটা ছিল আরব বংশোদ্ভূত। তিনি এই লোককে দিয়ে রেড ইন্ডিয়ানদের সর্দারের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিটি ছিল আরবি ভাষায় লেখা। চিঠিতে কলম্বাস বলেন, হে মহামান্য, স্পেন ও ক্যাস্টাইল রাজ্যের রানি, রানি ইসবালে আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন। তিনি স্পেন ও ক্যাস্টাইল রাজ্য এবং আপনার দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী।-অনুবাদক
৪২৩. ড. আবদুর রহমান হামিদাহ, আলামুল জুগরাফিয়্যিনাল আরব, পৃ. ২২৫।
৪২৪. শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৫০০।
৪২৫. বইটির ইংরেজি অনুবাদ, Memories of the Future: Unsolved Mysteries of the Past. মূল জার্মান থেকে বইটির অনুবাদ করেছেন মাইকেল হেরন।
৪২৬. এরিক ফন দানিকেন, Chariots of the Gods?, আরবি অনুবাদ, عربات الامة, অনুবাদক, আদনান হাসান, পৃ. ২৯।
৪২৭. আহমাদ শাওকি আল-ফানজারি, http://www.islamset.com/arabic/asc/fangryl.html.
৪২৮. ভাস্কো দা গামা (১৪৬৯-১৫২৪ খ্রি.) ছিলেন পর্তুগিজ অনুসন্ধানকারী ও পর্যটক। তিনি পঞ্চদশ শতাব্দীতে সমুদ্রপথে ইউরোপ থেকে ভারত আসেন। তার এই সমুদ্রপথ আবিষ্কার বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদে নতুন মাত্রা যোগ করে। তিনি ভারতের কোচিতে মৃত্যুবরণ করেন।
৪২৯. আবুল আব্বাস আল-কালকাশান্দি, সুবহুল আশা, খ. ৩, পৃ. ২৩৭।
৪৩০. ক্র্যাচকোড্রিঙ্ক, তারিখুল আদাবিল জুগরাফিয়্যিল আরাবি, খ. ২, পৃ. ৫৬৩।
৪৩১. মালিন্ডি উপসাগরের তীরবর্তী গালানা নদীর মুখে অবস্থিত একটি শহর।
৪৩২. ইবনে মাজেদ: আহমাদ ইবনে মাজেদ ইবনে মুহাম্মাদ আন-নাজদি (১৪৩২-১৪৯৮ খ্রি.)। উপাধি: সমুদ্রসিংহ ও ধাবমান নক্ষত্র। আরবের শ্রেষ্ঠ নাবিকদের অন্যতম। মানচিত্রাঙ্কনবিদ। নৌবিজ্ঞানী ও নৌ-ইতিহাসবিদ। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২০০।
৪৩৩. বিস্তারিত দেখুন, হুসাইন মুনিস, আতলাসু তারিখিল ইসলাম, পৃ. ১২ ও তার পরবর্তী।
৪৩৪. আবুল ফিদা: ইসমাইল ইবনে আলি ইবনে মাহমুদ ইবনে শাহেনশাহ (৬৭২-৭৩২ হি./১২৭৩-১৩৩১ খ্রি.)। আল-মালিক আল-মুআইয়াদ, হামার অধিপতি। ভৌগোলিক ইতিহাসবিদ। দখল ছিল প্রকৃতিবিজ্ঞানেও। تقويم البلدان و المختصر في أخبار البشر তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৯, পৃ. ১০৪; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ৩১৯।
৪৩৫. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৭১।
📄 জ্যোতির্বিজ্ঞান
জ্যোতির্বিজ্ঞান মুসলিমদের কাছে অনেকাংশে তাদের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। ভৌগোলিক অবস্থান ও ঋতুর ভিন্নতা অনুযায়ী নামাযের সময় নির্ধারণে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে। কেবলার দিক নির্ধারণেও জ্যোতির্বিজ্ঞানের শরণাপন্ন হতে হয়। রোযার সূচনা, হজ ও অন্যান্য বিষয়ের সময় নির্ধারণের জন্য চাঁদের চলাচলও পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়।
জ্যোতির্বিদ্যার ওপর কুরআনের গুরুত্বারোপ
কুরআনে অনেক আয়াত এসেছে যা মহাকাশ ও মানুষকে পরিবেষ্টনকারী মহাবিশ্ব সম্পর্কে গুরুত্বারোপ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যাবলি প্রদান করেছে। শুধু তাই নয়, কুরআন আকাশ ও জমিনে যা-কিছু রয়েছে তার ওপর অনুসন্ধান ও গবেষণা করতে মুসলিমদের উদ্বুদ্ধ করেছে। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি আয়াত এখানে উল্লেখ করা হলো। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَآيَةٌ لَهُمُ اللَّيْلُ نَسْلَخُ مِنْهُ النَّهَارَ فَإِذَا هُمْ مُّظْلِمُونَ وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍ لَّهَا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ وَالْقَمَرَ قَدَّرْنَاهُ مَنَازِلَ حَتَّى عَادَ كَالْعُرْجُونِ الْقَدِيمِ لَا الشَّمْسُ يَنْبَغِي لَهَا أَنْ تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ﴾
তাদের জন্য রাত এক নিদর্শন, তা থেকে আমি দিবালোককে অপসারিত করি, তখন তারা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আর সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, তা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। এবং চাঁদের জন্য আমি নির্দিষ্ট করেছি বিভিন্ন মনযিল।(৪৩৬) অবশেষে তা শুকনো বাঁকা পুরাতন খেজুরশাখার আকার ধারণ করে। সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া এবং রাতের পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।(৪৩৭)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
﴿هُوَ الَّذِي جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَاء وَالْقَمَرَ نُورًا وَقَدَّرَهُ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ مَا خَلَقَ اللهُ ذَلِكَ إِلَّا بِالْحَقِّ يُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ ) إِنَّ فِي اخْتِلافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَمَا خَلَقَ اللَّهُ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَّقُونَ﴾
তিনিই সূর্যকে তেজস্কর ও চাঁদকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং তার মনযিল নির্দিষ্ট করেছেন যাতে তোমরা বছর গণনা ও (মাসসমূহের) হিসাব জানতে পারো। আল্লাহ তা নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি এইসব নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন। নিশ্চয় দিবস ও রাতের পরিবর্তনে এবং আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা-কিছু সৃষ্টি করেছেন তাতে নিদর্শন রয়েছে মুত্তাকি সম্প্রদায়ের জন্য।(৪৩৮)
তারপর কুরআন আরও সামনে এগিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট তারকা ও নক্ষত্রের নাম ধরে তাদের উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَالسَّمَاءِ وَالطَّارِقِ وَمَا أَدْرَاكَ مَا الطَّارِقُ النَّجْمُ الثَّاقِبُ)
শপথ আকাশের এবং রাতে যা আবির্ভূত হয় তার, তুমি কি জানো রাতে যা আবির্ভূত হয় তা কী? তা উজ্জ্বল নক্ষত্র!(৪৩৯)
তিনি আরও বলেন,
وَأَنَّهُ هُوَ رَبُّ الشَّعْرَى
আর এই যে, তিনি শিরা(৪৪০) নক্ষত্রের মালিক।(৪৪১)
আরও ব্যাপার আছে। কুরআন যেসব বৈজ্ঞানিক সত্য তুলে ধরেছে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর অগাধ ও বিস্তৃত জ্ঞান থাকা ছাড়া কারও পক্ষে সেগুলো বোঝা বা সেগুলো ব্যাখ্যার চেষ্টা করা সম্ভব নয়। ফলে তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মুসলিম বিজ্ঞানীদের মনোযোগ ও প্রযত্ন আবশ্যক করে তোলে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানে মুসলিমদের মনোনিবেশ
মুসলিমরা তাদের মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটানোর শুরুতে পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর বিজ্ঞানীরা যে উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছিলেন তার ওপর নির্ভর করেছেন। প্রথমেই তারা গ্রিক, ক্যালডিয়ান (Chaldean), সুরয়ানি, পারসিক ও ভারতীয় বিজ্ঞানীরা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর যেসব গ্রন্থ রচনা করেছিলেন সেগুলোর অনুবাদ করেছেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরা প্রথম যে গ্রন্থটির অনুবাদ করেছেন সেটি হলো হার্মেস আল-হাকিম(৪৪২) কর্তৃক রচিত, অনূদিত গ্রন্থটির নাম 'মাফাতিহুন নুজুম'। তারা গ্রিক ভাষা থেকে আরবিতে অনুবাদ করেন। এটা উমাইয়া খিলাফতের শেষ দিকের ঘটনা। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর গ্রিক থেকে অনূদিত গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর মধ্যে আরও ছিল টলেমির আল-মাজেস্ট (Almagest)। আরবিতে এটির নাম হয় كتاب المجسطي । এটি জ্যোতির্বিদ্যা ও নক্ষত্ররাজির সঞ্চরণের ওপর রচিত। এই গ্রন্থের অনুবাদ হয়েছিল আব্বাসি খিলাফতকালে।(৪৪৩)
মুহাম্মাদ মুসা ইবনে শাকির
আব্বাসি যুগে তিনজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর আবির্ভাব ঘটে। তারা বানু মুসা ইবনে শাকির (মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা) নামে পরিচিত। এই মুসা ইবনে শাকির ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। খলিফা আল-মামুনের দরবারে থাকতেন। তিনি মারা গেলে আল-মামুন তার পুত্রদের লালনপালন ও শিক্ষাদীক্ষার দায়িত্ব নেন। তারা তখন ছোট ছিল। তিনি তাদেরকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইয়াহইয়া ইবনে মানসুরের কাছে ন্যস্ত করেন। এই ছোট ছেলেরা যখন বড় হয়ে উঠছিল তখন আল-খাওয়ারিজমি বাগদাদের বাইতুল হিকমায় বসে টলেমির ভ্রান্তিগুলোর সংশোধন করছিলেন। তিনি তখন বাইতুল হিকমায় বিজ্ঞানী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এই ছোট শিশুরা যুবকে পরিণত হলে তাদের মধ্যে একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। তিনি হলেন মুহাম্মাদ ইবনে মুসা ইবনে শাকির।
খলিফা আল-মামুন তার জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য বাগদাদের উপকণ্ঠে সবচেয়ে উঁচু স্থানে একটি মানমন্দির নির্মাণ করে দেন। বাব আশ-শামাসিয়্যার কাছাকাছিই ছিল এটির অবস্থান। বৈজ্ঞানিকভাবে ও সূক্ষ্মরূপে নক্ষত্র-পর্যবেক্ষণ ও বিস্ময়কর হিসাবনিকাশ তৈরির উদ্দেশ্যেই এই মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সে সময় গুনদেশাপুরেও (৮৮৮) একটি মানমন্দির ছিল। তিন বছর পর দামেশকের সন্নিকটে কাসিউন পাহাড়ের ওপর আরেকটি মানমন্দির স্থাপন করা হয়। বাগদাদের মানমন্দিরকে এ দুটির সঙ্গে তুলনা করা হতো এবং এদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত। জ্যোতির্বজ্ঞানীরা তারকা-সারণি তৈরির জন্য বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে কাজ করতেন। এসব তারকা-সারণির নাম হতো 'আল-মুজাররাবা' বা 'আল-মামুনিয়্যাহ'। এগুলো ছিল টলেমির প্রাচীন তারকা-সারণির সূক্ষ্ম ও যথার্থ সংস্কার।(৮৮৯)
খলিফা আল-মামুন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল নিযুক্ত করেন। তাদের অন্যতম ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনে মুসা ইবনে শাকির। বিজ্ঞানী দলটির কাজ ছিল মহাজাগতিক বস্তুরাশি পর্যবেক্ষণ করা ও এই পর্যবেক্ষণের ফলাফল লিপিবদ্ধ করা, টলেমির জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর পরীক্ষানিরীক্ষা করা এবং সৌর-কলঙ্ক (Sunspots) নিয়ে গবেষণা করা। তারা ভূ- গোলককে ভিত্তি ধরে নিয়ে একই সময়ে পালমিরা ও সিনজার থেকে সূর্যের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে পৃথিবীর (অক্ষাংশের ও দ্রাঘিমাংশের) ডিগ্রি পরিমাপ করতে শুরু করেন। তারা এই পর্যবেক্ষণ থেকে ডিগ্রি পরিমাপ করেন ৫৬.৭৫ মাইল। এটা আমাদের আধুনিক যুগের পরিমাপ থেকে আধা মাইল বেশি। এই ফলাফল থেকে তারা পৃথিবীর পরিধি পরিমাপ করেন প্রায় ২০,০০০ মাইল। আধুনিক যুগের হিসাব মতে তা ২১,৬০০ মাইল। এ সকল জ্যোতির্বিজ্ঞানী বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা ও অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রমাণিত না হলে কোনোকিছুই গ্রহণ করতেন না। তারা তাদের গবেষণায় বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক রীতি অনুসরণ করতেন।(৪৪৬)
প্রকৃত সফলতা হলো মুসলিমরা পূর্ববর্তী জাতিগুলোর জ্ঞান সংরক্ষণ করেছেন এবং তাতে যা ভুলভ্রান্তি ছিল তা সংশোধন করেছেন। তা ছাড়া ওই জ্ঞানকে তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে বের করে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা ও অভিজ্ঞতার ময়দানে নিয়ে এসেছেন। আরবরা জাহিলি যুগে যেসব কুসংস্কার ও মায়াবিদ্যায় বিশ্বাস করত তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনেককিছু থেকে এই জ্ঞানকে পবিত্র করেছেন। প্রাচীন জাতিগুলোর মধ্যে যখন জ্যোতিষতত্ত্বের উদ্ভব ঘটে তার সমকালে আরবেও কুসংস্কার ও মায়াবিদ্যায় বিস্তার ঘটে। ইসলামি শরিয়া জ্যোতিষতত্ত্বকে বাতিল করে দিয়েছে এবং একে অস্বীকার করেছে। বরং একে ইসলামি আকিদা- বিশ্বাসের বিরুদ্ধ বলে সাব্যস্ত করেছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে এটাই হলো ইসলামি সভ্যতার প্রকৃত অবদান।
মানমন্দির নির্মাণ
মুসলিমরা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষায় কতটা মনোযোগ ও গুরুত্ব দিয়েছিলেন তার জোরালো প্রমাণ মেলে এতেই যে, তারা বহু বড় বড় মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এসব মানমন্দির ছিল সব ধরনের যন্ত্রপাতিতে সুসজ্জিত এবং সার্বক্ষণিকভাবে নিযুক্ত (বেতনভুক্ত) বিজ্ঞানীরা এগুলোতে গবেষণা করতেন। ইসলামি বিশ্বের দূরদূরান্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল মানমন্দির। খলিফা আল-মামুন মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন দামেশকের সন্নিকটে কাসিয়ুন পাহাড়ের ওপর এবং বাগদাদের আশ-শামাসিয়্যাহ এলাকায়।(৪৪৭) এরই ধারাবাহিকতায় ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানমন্দির নির্মাণের কাজ চলতে থাকে। বানু মুসা ইবনে শাকির বাগদাদে একটি মানমন্দির নির্মাণ করেন। এখানে তারা পূর্ণচন্দ্রের হিসাব বের করেন। ইরানের মারাগিতে (মারাঘায়) একটি মানমন্দির ছিল। এটি নির্মাণ করেছিলেন নাসিরুদ্দিন আত-তুসি। মারাঘার মানমন্দির ছিল সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে বিখ্যাত। এটি সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিল। এই মানমন্দিরের পর্যবেক্ষণ ছিল সবচেয়ে নিখুঁত ও যথার্থ। ইউরোপের বিজ্ঞানীরা তাদের রেনেসাঁসের যুগে ও তার পরেও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই মানমন্দিরের পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করতেন। এগুলোর পাশাপাশি আরও মানমন্দির ছিল। যেমন সিরিয়ায় ইবনে শাতিরের(৪৪৮) মানমন্দির, ইস্পাহানে আদ-দিনাওয়ারির মানমন্দির, সমরকন্দে উলুগ বেগের(৪৪৯) মানমন্দির, ইরানে শারফুদ্দাওলার মানমন্দির (জ্যোতির্বিদ আবু সাহ্ আল-কুহি এ মানমন্দির থেকে সাতটি নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেছিলেন), কায়রোর দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত মুকাত্তাম পাহাড়ের ওপর নির্মিত আল-হাকিমি মানমন্দির এবং আরও অনেক মানমন্দির।(৪৫০)
মানমন্দিরের যন্ত্রপাতি
মুসলিম বিজ্ঞানীরা এসব মানমন্দিরে অসংখ্য যন্ত্রপাতি ও মেশিনারিজ ব্যবহার করেছেন, এগুলো যেমন ছিল সূক্ষ্ম তেমনই কারিগরি শৈলীতে ছিল অনন্য। এসব যন্ত্রপাতির সাহায্যে তারা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাবলি ও অবস্থাবলির ব্যাপারে অবগত হতেন। এসব যন্ত্রের অধিকাংশই ছিল মুসলিম বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত, যেগুলো ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। যেমন কীলকযুক্ত কল, আর্মিলারি স্ফেয়ার (Armillary sphere), সাইন কোয়াড্রেন্ট (Sine quadrant), আর্চেড কোয়াড্রেন্ট (Arched quadrant), হোরারি কোয়াড্রেন্ট (Horary quadrant), ফুইকুলা (Fuicula), দিগংশ ও সুবিন্দু পরিমাপযন্ত্র, ম্যারিডিয়ান কোয়াড্রেন্ট (Meridian quadrant), প্যারাল্যাকটিক রুলার (Parallactic ruler) এবং সময় পরিমাপের বিভিন্ন সূর্যঘড়ি ও অন্যান্য যন্ত্র।(৪৫১)
পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতির সাহায্যও গ্রহণ করেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা। এসব যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে অ্যাস্ট্রোল্যাব(৪৫২)। যন্ত্রটি তার গ্রিক নামই ধরে রেখেছে। মুসলিম বিজ্ঞানীরা অ্যাস্ট্রোল্যাবের উন্নতি সাধন করেন এবং নানা ধরনের নমুনা তৈরি করেন। যা তাদের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারেরই অনুষঙ্গ। যেমন তারা উদ্ভাবন করেছেন গোলকাকার অ্যাস্ট্রোল্যাব ও বোট অ্যাস্ট্রোল্যাব। বিশ্বের বিভিন্ন বিজ্ঞানজাদুঘরে এসব অ্যাস্ট্রোল্যাবের নমুনা সংরক্ষিত আছে। দিগ্বলয় থেকে নক্ষত্ররাজির উচ্চতা এবং সময় নির্ধারণে অ্যাস্ট্রোল্যাবের ব্যবহার জনপ্রিয় ছিল।(৪৫০)
জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপাত্ত-সারণি
মহাকাশের বস্তুরাশির হিসাবনিকাশের জন্য মুসলিমরা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উপাত্ত-সারণি বা তারকা-সারণি তৈরিতে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। নক্ষত্র-পর্যবেক্ষণের জন্য এটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারকা-সারণি বলতে বোঝায় গাণিতিক সংখ্যার তালিকাকে, যেখানে কক্ষপথে চলমান তারকারাজির অবস্থান নির্ধারণ, মাস ও দিন জানার সূত্রাবলি ও অতীতকালের ইতিহাস লিপিবদ্ধ থাকে। গ্রহমণ্ডলীর ঊর্ধ্ব-অবস্থান, নিম্ন-অবস্থান, হেলে বা ঝুঁকে পড়া ও অবস্থান পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ও জানা যায় তারকা-সারণি থেকে। এসব সারণি অতিশয় সূক্ষ্ম ও নির্ভুল গাণিতিক সূত্রাবলি ও সংখ্যাসূচক আইনকানুনের ওপর নির্ভরশীল। সবচেয়ে বিখ্যাত তারকা-সারণি হলো ইবনে ইউনুস আল-মিশরির(৪৫৪) (আলি ইবনে আবদুর রহমান ইবনে ইউনুস) তারকা-সারণি।(৪৫৫)
খ্যাতিমান কয়েকজন
মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেকেই বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তারা অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন এবং তাদের উত্তরসূরিদের জন্য নেতৃত্বের আসনে রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আহমাদ ইবনে ইউনুস আল-ফারগানি। পশ্চিমাবিশ্বে তিনি আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত। জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে তার রচিত গ্রন্থ کتاب في جوامع علم النجوم (A Compendium of the Science of the Stars or Elements of astronomy on the celestial motions) ইউরোপে ও পশ্চিম এশিয়ায় সাতশ বছর ধরে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিরাজমান থেকেছে।(৪৫৬) তার নামেই নামকরণ করা হয়েছে চাঁদের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ আলফ্রাগানুস-এর।
আল-বাত্তানি
বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছেন আল-বাত্তানি। তিনি বিখ্যাত আয়-যিজুস-সাবি এর (الزيج الصابئ) প্রণেতা। এই তারকা-সারণি জ্যোতির্বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি অনেক তারকার অবস্থান চিহ্নিত করেন। চাঁদের সন্তরণ ও গ্রহরাজির কক্ষপথে আবর্তন সম্পর্কে তিনি সঠিক ধারণা দেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে টলেমির কিছু ভুলও তিনি সংশোধন করে দেন। সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ-সম্পর্কিত টলেমি যে তত্ত্ব ব্যক্ত করেছিলেন, আল-বাত্তানি তা ভুল প্রমাণ করে নতুন প্রামাণিক তথ্য প্রদান করেন। সৌর-অপসূর(৪৫৭) নির্ধারণেও তিনি টলেমির বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং তার নিজের মত দেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে আল-বাত্তানির সর্বাধিক পরিচিত অর্জন হলো সৌরবর্ষ নির্ণয়। আল-বাত্তানিই প্রথম নির্ভুল পরিমাপ করে দেখিয়েছিলেন যে, এক সৌরবৎসরে ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ড হয়। এর সঙ্গে আধুনিক পরিমাপের পার্থক্য মাত্র ২ মিনিট ২২ সেকেন্ড কম। আল-বাত্তানি পৃথিবীর বিষুবরেখার মধ্য দিয়ে যাওয়া কাল্পনিক সমতলের সঙ্গে সূর্য ও পৃথিবীর কক্ষপথের মধ্যে যে সমতল, তা অসদৃশ বলে ব্যাখ্যা করেন। বিস্ময়করভাবে তিনি এই দুই কাল্পনিক সমতলের মধ্যকার কোণ পরিমাপ করেন। এই কোণকে বলা হয় 'সৌর অয়নবৃত্তের বাঁক'। আল-বাত্তানি এর পরিমাপ করেন ২৩ ডিগ্রি ৩৫ মিনিট, যা বর্তমানের আধুনিক পরিমাপ ২৩ ডিগ্রি ২৭ মিনিট ৮.২৬ সেকেন্ডের খুবই কাছাকাছি। তার এসব জ্যোতির্বিজ্ঞান-সম্পর্কিত তথ্য রেনেসাঁসের যুগে ইউরোপের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। তারা আল-বাত্তানির কাজের ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেন। কয়েক শতাব্দী পর কোপার্নিকাস কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন পরিমাপের চেয়ে আল বাত্তানির পরিমাপ অনেক বেশি নিখুঁত ছিল।(৪৫৮)
আবদুর রহমান আস-সুফি(৪৫৯)
তিনি পশ্চিমা বিশ্বে Azophi এবং Azophi Arabus নামে পরিচিত।
আবদুর রহমান আস-সুফি স্থির তারকারাজির সারণির প্রথম উদ্ভাবক। এ বিষয়ে তিনি একটি গ্রন্থও রচনা করেছেন যার আরবি নাম صُوَرُ الكَوَاكِبِ الثابتة এবং ইংরেজি নাম Book of Fixed Stars(৪৬০)। এটি তিনি ৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন। এতে তিনি ২৯৯ হিজরির/৯১১ খ্রিষ্টাব্দের স্থির তারকারাজির বিবরণ তুলে ধরেন। বিবরণের পাশাপাশি তিনি চিত্রও অঙ্কন করেছেন। এই সারণি এমনকি আধুনিক কালেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা কতিপয় তারকা এবং তাদের অবস্থান ও গতিময়তার ইতিহাস জানতে চান তাদের জন্য। এতে তিনি এক হাজারেরও বেশি তারকার চিত্র অঙ্কন করেছেন। আবদুর রহমান আস-সুফি ও তার অনন্য কীর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে চাঁদের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ 'আযোফি' ও গৌণ গ্রহ ১২৬২১ আল-সুফির নামকরণ করা হয়েছে তার নামেই।(৪৬১)
আবুল ওয়াফা আল-বুযজানি (আল-বুজানি)(৪৬২)
তিনি চন্দ্র পঞ্জিকা তৈরির জন্য একটি সমীকরণ উদ্ভাবন করেন যা গতি- সমীকরণ নামে পরিচিত। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো চাঁদের গতিময়তায় অসাম্য (lunar inequalities) আবিষ্কার। তার এই আবিষ্কার পরবর্তীকালে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও বলবিদ্যার পরিধি বিস্তৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই আবিষ্কারের মালিক ডেনিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী টাইকো ব্রাহে(৪৬৩) নাকি আল-বুযজানি তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তবে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানে সম্প্রতি প্রমাণিত হয়েছে যে, তৃতীয় অসাম্য (Third lunar inequality) হলো আল-বুযজানির অন্যতম আবিষ্কার। তার আল-মাজেস্ট (Kitāb al-Majisti) (كتاب المجسطي) তার মৃত্যুর পর কয়েক শতাব্দীব্যাপী আরব জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। তার এই গ্রন্থে গোলকাকার ত্রিকোণমিতি, গ্রহতত্ত্ব ও কিবলার দিক নির্ধারণে সমাধান প্রসঙ্গে অসংখ্য বিষয় আলোচিত হয়েছে।(৪৬৪)
আবু ইসহাক আন-নাক্কাশ আয-যারকালি(৪৬৫)
বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ। তিনি আয-যিজুত তুলাইতিলি (Toledan Tables or Tables of Toledo) প্রণেতাদের অন্যতম। এই যিজ বা তারকা-সারণির নামকরণ করা হয়েছে আন্দালুসের শহর তুলাইতিলাহ (Toledo)-এর নামে। টলেমিও আল-খাওয়ারিজমির মতো পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের থেকে আহরিত জ্ঞানের ভিত্তিতে তিনি এই তারকা-সারণি প্রস্তুত করেন। এই সারণিতে তিনি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের ফলাফল লিপিবদ্ধ করেন। তার একটি কিতাব রয়েছে الصحيفة الزيجية নামে, এতে তিনি অ্যাস্ট্রোল্যাব ব্যবহারের নতুন পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন। তিনি অ্যাস্ট্রোল্যাবের একটি উন্নত সংস্করণও উদ্ভাবন করেন। এটিকে আস-সাহিফাতুয যারকালিয়্যাহ বা আয-যারকালাহ বলা হয়। পশ্চিমাবিশ্বে এটি Saphaea নামে পরিচিত। তিনিই প্রথম প্রমাণ পেশ করেন যে, স্থির তারকারাজির তুলনায় সৌর-অপসূরের ঝুঁকে পড়ার পরিমাণ ১২০৫ মিনিটে পৌঁছে। আধুনিক নিরীক্ষায় যার পরিমাণ ১২০৮ মিনিট। আয-যারকালির নির্ণীত পরিমাণের চেয়ে মাত্র ৩ মিনিট বেশি।(৪৬৬) টলেমীয় মডেলের ডায়াগ্রাম (রেখাচিত্র) ব্যবহার করে গ্রহরাজির অবস্থান নির্ণয়ে একটি যন্ত্রও (equatorium) আবিষ্কার করেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি দুটি রচনা লেখেন, রচনা দুটি ক্যাসটাইলের রাজা আলফোনসোর (King Alfonso X) নির্দেশে স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়। এটি হিব্রু ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষাতেও অনূদিত হয়। আয-যারকালি তার کتاب الجدول (Book of Tables) গ্রন্থের জন্যও বিখ্যাত। এর একটি সারণি কিবতি (Coptic), রোমান, পারসিক ও চান্দ্রমাস শুরুর দিনটিকে নির্দেশ করে, অন্য একটি সারণি নির্দিষ্ট সময়ে গ্রহের অবস্থান নির্দেশ করে এবং অপর একটি সারণি সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের সম্ভাব্যতা নির্দেশ করে।
আবুল ইয়ুস্র বাহাউদ্দিন আল-খারাকি(৪৬৭)
ষষ্ঠ হিজরি শতকে যারা জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে মগ্ন হয়েছিলেন তিনি তাদের অন্যতম। গণিত ও ভূগোলবিদ্যায়ও তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো আত-তাবসিরাহ (التبصرة)(৪৬৮) এবং মুনতাহাল-ইদরাক ফি তাকসিমিল-আফলাক (منتهی الإدراك في تقاسيم الأفلاك)(৪৬৯)
আল-বাদি আল-আঙ্গুরলাবি(৪৭০)
তিনি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কারে অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দেন। এই ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন তার যুগের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তার উল্লেখযোগ্য কীর্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি তারকা-সারণি, যা তিনি বাগদাদের সালজুকি সুলতানের প্রাসাদে থেকে তৈরি করেছিলেন। তারকা-সারণিটি তার কিতাবে সন্নিবেশন করেন। সুলতান মাহমুদ আবুল কাসিম ইবনে মুহাম্মাদের নামে সারণিটির নামকরণ করা হয়েছে যিজ আল-মাহমুদি।(৪৭১)
ইবনে শাতির(মৃ. ৭৭৭ হি./১৩৭৫ খ্রি.) জ্যোতির্বিজ্ঞান-বিষয়ক রচনাবলিও অনেক মূল্যবান। তিনি যেসব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন তা কয়েক শতাব্দীব্যাপী প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে চালু ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার উল্লেখযোগ্য কীর্তি হলো: যিজ ইবনে শাতির ইদাহুল মুগাইয়াব ফিল-আমাল বিরল-মুজাইয়াব রিসালাহ ফিল-আঙ্গুরলাব, মুখতাসার ফিল-আমাল বিল-আঙ্গুরলাব, আন-নাফউল আম ফিল-আমাল বির-রুবইত তাম্ম, নুযহাতুস সামি ফিল-আমাল বির-রুবইল জামি, কিফায়াতুল কুনু ফিল-আমাল বির-রুবইল মাকতু, নিহায়াতুল গায়াত ফিল-আমালিল ফালাকিয়্যাত, আয-যিজুল জাদিদ। এই তারকা-সারণি তিনি উসমানি খলিফা প্রথম মুরাদের আহ্বানে প্রস্তুত করেছিলেন। ইবনে শাতির এতে যেসব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উদাহরণ, তত্ত্ব ও মত এবং পরিমাপ পেশ করেন তা ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। তবে তার এই সব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণা-ফলাফল পরবর্তীকালে নিকোলাস কোপার্নিকাসের নামে প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ইতিহাসবিদ ডেভিড এ. কিং(৪৯২) ১৩৯০ হিজরিতে/১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে আবিষ্কার করেন যে, পোলিশ গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাসের নামে চালু অধিকাংশ তত্ত্বই মূলত ইবনে শাতিরের। এর তিন বছর পর ১৩৯৩ হিজরিতে/১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে পোল্যান্ডে কিছু আরবি পাণ্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া যায়, এসব পাণ্ডুলিপি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে কোপার্নিকাস এগুলো অধ্যয়ন করেছিলেন।(৪৯৩)
উলুগ বেগ
উলুগ বেগ বিজ্ঞানীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, তাদের সব ধরনের প্রয়োজন পূরণ করে গবেষণার কাজে ভাবনাহীন রাখতেন। তিনি সমরকন্দে সেই সময়ের সবচেয়ে বড় মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন।
একজন প্রখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ লিখেছেন, উলুগ বেগ ছিলেন জ্ঞানী, ন্যায়পরায়ণ, চমৎকার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও উদ্যমী। জ্যোতির্বিজ্ঞানে ব্যাপক জ্ঞান তার দখলে ছিল। একইসঙ্গে তিনি অলংকারশাস্ত্রেরও অত্যন্ত নিপুণ পরীক্ষক ছিলেন। তার যুগে বিজ্ঞানীদের অবস্থান ছিল সবচেয়ে ঊর্ধ্বে। জ্যামিতিতে তিনি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। আর মহাবিশ্বের মানচিত্র রচনা (Cosmography)-এর ক্ষেত্রে তিনি টলেমির একটি গ্রন্থের ব্যাখ্যা লিখেছিলেন। তার মতো কোনো সম্রাট আজ পর্যন্ত সিংহাসনে বসেননি। তিনি প্রাথমিক যুগের বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় নক্ষত্রসমূহের টীকা লেখেন। তিনি সমরকন্দে একটি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সৌন্দর্যে ও মানে এবং শিক্ষাদীক্ষার উৎকর্ষে এমন মহাবিদ্যালয় সংলগ্ন সাতটি প্রদেশের কোথাও ছিল না।(৪৭৪)
উলুগ বেগ একটি আকাশ-পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে তার কার্যকালে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনে সক্ষম হন। ৭২৭ হি./১৩২৭ খ্রি. থেকে ৮৩৯ হি./১৪৩৫ খ্রি. পর্যন্ত তার আকাশ-পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকে। এই পর্যবেক্ষণ থেকে একটি সামগ্রিক সারণি তৈরি করেন। এই সারণির নাম যিজ উলুগ বেগ বা আয-যিজুস-সুলতানি। এতে তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সঙ্গে ও যথার্থভাবে নক্ষত্ররাজির অবস্থান নির্ণয় করেন। চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের সময়ও নির্ণয় করেন। উলুগ বেগ স্থির তারকারাজিরও একটি সারণি প্রস্তুত করেন। চাঁদ, সূর্য, গ্রহরাজির সন্তরণ এবং গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি শহরগুলোর দ্রাঘিমাংশ ও অক্ষাংশের সারণিও তিনি তৈরি করেন।(৪৭৫)
আর-রুদানি শামসুদ্দিন আল-ফাসি(৪৭৬)
তিনি হলেন পরবর্তীকালের মুসলিম বিজ্ঞানীদের অন্যতম, যারা জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে প্রথম যুগের মুসলিম বিজ্ঞানীদের অর্জিত কীর্তিগুলোর সাহায্য গ্রহণ করে সামনে এগিয়েছেন। আর-রুদানি সময় নির্দেশের জন্য একটি গোলকাকার যন্ত্র (গোলক অ্যাস্ট্রোল্যাব) উদ্ভাবন করেছিলেন। গোলকাকার যন্ত্রটির ওপরে ছিল কিছু বৃত্ত এবং তিসি তেলের প্রলেপযুক্ত সাদা রঙের নকশা। গোলকাকার যন্ত্রটির ওপর আরেকটি গোলক যুক্ত ছিল, যা ছিল দুটি অংশে বিভক্ত, এগুলোর ওপর ছিল সৌর-বন্ধনী ও অন্যান্য বস্তু নির্দেশক ছিদ্র। এগুলোও ছিল নিচেরটির মতো গোলকাকার ও সুবজ রঙে চিহ্নিত। আর-রুদানির এই গোলক অ্যাস্ট্রোল্যাবটি অতি সহজে ব্যবহার করা যেত এবং সব শহরের সময় নির্দেশের জন্যও ছিল যথোপযুক্ত। এ বিষয়ে তিনি 'বাহজাতুত তুল্লাব ফিল-আমাল বিল-আঙ্গুরলাব' নামে একটি পুস্তকও রচনা করেছেন, এতে তিনি অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ ও তার ব্যবহারের পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।(৪৭৭)
পরিশেষে আমরা যা আলোচনা করেছি তার প্রেক্ষিতে বলতে হয়, মুসলিম বিজ্ঞানীরা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ময়দানে-সেই সময়ে লব্ধ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির স্বল্পতা সত্ত্বেও-যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন ও অবদান রেখেছেন তা অবশ্যই সম্মানের যোগ্য, শ্রদ্ধার যোগ্য। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ময়দানে তারা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ এই যে, আকাশের বহু নক্ষত্র এখনো আরবি নাম বহন করে চলেছে। যেমন সুহাইল (Canopus), আল-মাজাররাহ (rogue star), আল-জাওযা (Betelgeuse), আদ-দাব্বুল আকবার (Ursa Major), আদ-দাব্বুল আসগার (Ursa Minor), আল-গাওল (Algol), আস-সাম্ভ এবং আরও অনেকে।
মারয়াম আল-আস্তুরলাবি(৪৭৮) দশম শতাব্দীর একজন মুসলিম নারী জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তার মূল নাম আল-ইজলিয়্যাহ বিনতে আল-ইজলি আল-আস্তুরলাবি। জ্যোতির্বিজ্ঞান ছাড়াও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় পারদর্শী ছিলেন। তার পিতা কুশিয়ার আল-জিলানি কয়েকটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গ্রন্থের রচয়িতা। যেমন 'মাজমালুল-উসুল ফি আহকামিন নুজুম', 'আল-যিজ আল-জামি' 'আল-মাদখাল ফি সানাআতি আহকামিন নুজুম' ও 'আস্তুরলাব'। তারা বসবাস করতেন সিরিয়ার আলেপ্পোতে। সেখানেই মারয়াম আল-আস্তুরলাবি তার বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক কাজ করতেন।
মারয়াম ও তার পিতা মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ নাগুলুসের শিষ্য ছিলেন। নাগুলুস ছিলেন প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী, যিনি ইতিহাসে প্রথম বিস্তৃত অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ করেছিলেন। নাগুলুসের কাছে শিক্ষাগ্রহণের পর মারয়াম 'উন্নত অ্যাস্ট্রোল্যাব' নির্মাণে ব্রতী হন। তার জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এটি ছিল একটি উৎকর্ষের প্রতীক। তিনি তার অ্যাস্ট্রোল্যাবে নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন, যাতে নির্দিষ্ট সময়ে মহাকাশের বস্তুরাশির নির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয় করা যায়।
হিজরি চতুর্দশ শতকে (খ্রিষ্টীয় দশম শতকে) মারয়াম আল-আস্তুরলাবি যখন আলেপ্পোতে বসবাস ও গবেষণা করতেন, সেই সময় সেখানকার গভর্নর ছিলেন সাইফুদ্দাওলাহ। তিনি আলেপ্পো স্টেট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা ছিল হামদানি সাম্রাজ্যের একটি প্রতীক। মারয়াম সাইফুদ্দাওলার রাজদরবারে ৯৪৪-৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মহাকাশ-গবেষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এই সময়ে তিনি একটি নয়, বিভিন্ন ধরনের একাধিক অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ করেছিলেন।
মারয়াম আল-আস্তুরলাবি যে অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ করেছিলেন তা অনেক আধুনিক নৌবৈজ্ঞানিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে বলে মনে করা হয়। যেমন কম্পাস, স্যাটেলাইট ও বিশ্বজনীন অবস্থান-নির্ণায়ক ব্যবস্থা, যা সংক্ষেপে জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) নামে পরিচিত।
মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হেনরি ই. হল্ট ১৯৯০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়াগোতে অবস্থিত পালোমার মানমন্দিরে গবেষণাকালে একটি গ্রহাণু-বেষ্টনী (asteroid belt) আবিষ্কার করেন। তিনি এটির নাম দেন 'মারয়াম আল-আস্তুরলাবি'।(৪৭৯)
টিকাঃ
৪৩৬. منازل শব্দটি منزل শব্দের বহুবচন। আরবি জ্যোতির্বিজ্ঞানে চান্দ্রমাসকে ২৮টি মনযিলে ভাগ করা হয়েছে। চান্দ্রমাসের এই মনযিলকে বাংলায় তিথি বলে।
৪৩৭. সুরা ইয়াসিন: আয়াত ৩৭-৪০।
৪৩৮. সুরা ইউনুস: আয়াত ৫-৬।
৪৩৯. সুরা তারিক: আয়াত ১-৩।
৪৪০. শিরা একটি নক্ষত্রের নাম, একে একটি সম্প্রদায় পূজা করত। বাংলায় 'লুব্ধক', ইংরেজিতে 'Sirius'.
৪৪১. সুরা নাজম: আয়াত ৪৯।
৪৪২. হার্মেস আল-হাকিম (Hermes Trismegistus): একজন গ্রিক ব্যক্তিত্ব। সত্য ও কল্পকাহিনির মিশ্রণে গড়ে উঠেছে তার ব্যক্তিত্ব।
৪৪৩. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ৩৪৮।
৪৪৬. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ১৮২।
৪৪৭. দামেশকে আরেকটি মানমন্দির ছিল, যেটি নির্মাণ করেছিলেন উমাইয়া খলিফারা।-অনুবাদক
৪৪৮. ইবনে শাতির: আবুল হাসান আলাউদ্দিন আলি ইবনে ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ আল-আনসারি আদ-দিমাশকি আল-মুআযযিন, ইবনে শাতির নামে পরিচিত (৭০৪-৭৭৭ হি./১৩০৪-১৩৭৫ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও প্রকৌশলী। ছিলেন দামেশকের প্রধান মুআযযিন। তিনি দামেশকের উমাইয়া জামে মসজিদে একটি ধর্মীয় সময়-নির্দেশক (religious timekeeper) বানিয়ে দিয়েছিলেন এবং মসজিদটির মিনারে তৈরি করে দিয়েছিলেন একটি সূর্যঘড়ি। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ে তার বহু পুস্তিকা রয়েছে। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, আদ-দুরারুল কামিনাহ, খ. ৪, পৃ. ৯।
৪৪৯. উলুগ বেগ: মির্যা মুহাম্মাদ তারাগাই ইবনে শাহরুখ ইবনে তৈমুর লং (৭৯৬-৮৫৩ হি./১৩৯৪-১৪৪৯ খ্রি.)। তৈমুরি পরিবারের চতুর্থ শাসক। উলুগ বেগ নামে সর্বাধিক পরিচিত। গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ। তিনি পাঁচটি ভাষা জানতেন আরবি, ফার্সি, তুর্কি, মঙ্গোলীয় ও চৈনিক। ত্রিকোণমিতি ও গোলীয় জ্যামিতিতে তিনি অসাধারণ দক্ষ ছিলেন। তিনি সেই যুগের সবচেয়ে বড় মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং বুখারা ও সমরকন্দে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহাবিদ্যালয়। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৭, পৃ. ৩২৮।
৪৫০. ডোনাল্ড আর, হিল, Islamic Science and Engineering, আরবি অনুবাদ, العلوم والهندسة في الحضارة الإسلامية, অনুবাদক, আহমাদ ফুয়াদ পাশা, পৃ. ৭৪-৮২; মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ৮১-৮২।
৪৫১. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৯২।
৪৫২. অ্যাস্ট্রোল্যাব (astrolabe) একটি বিস্তৃত নতি-পরিমাপক যন্ত্র (inclinometer)। একে এনালগ ক্যালকুলেটরও বলা যেতে পারে। এই যন্ত্র বিভিন্ন ধরনের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও নাবিকেরা মহাকাশীয় বা মহাজাগতিক বস্তুর দিগ্বলয়ের উপরের উচ্চতা, দিন বা রাত নির্ণয়ের জন্য এই যন্ত্র ব্যবহার করতেন। গ্রহ ও নক্ষত্র নির্ণয়ের জন্যও এই যন্ত্র ব্যবহার করা হতো। নির্দিষ্ট স্থানীয় সময়ে স্থানীয় অক্ষাংশ, জরিপ ও ত্রিভুজীকরণে (triangulation)-ও অ্যাস্ট্রোল্যাব ব্যবহৃত হতো। ধ্রুপদি সভ্যতায়, ইসলামি স্বর্ণযুগে, ইউরোপীয় মধ্যযুগে ও আবিষ্কারের যুগে উপরিউক্ত সব কাজের জন্য অ্যাস্ট্রোল্যাবের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। ইসলামি বিশ্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশকালে মুসলিম বিজ্ঞানীরা অ্যাস্ট্রোল্যাবের নকশার ক্ষেত্রে কৌণিক স্কেল প্রবর্তন করেন। দিগংশকে নির্দেশ করে এমন বৃত্ত যুক্ত করেন। কিবলা অনুসন্ধানের উপায় হিসেবেও যন্ত্রটির ব্যবহার ছিল। অষ্টম শতাব্দীর গণিতজ্ঞ মুহাম্মাদ আল-ফাযারি প্রথম অ্যাস্ট্রোল্যাব-নির্মাতা হিসেবে কৃতিত্ব অর্জন করেন।-অনুবাদক।
৪৫৪. ইবনে ইউনুস: আবুল হাসান আলি ইবনে আবদুর রহমান ইবনে ইউনুস (মৃ. ৩৯৯ হি./১০০৯ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী। উল্লেখযোগ্য রচনা: আয়-যিজুল হাকিমি, যা যিজ ইবনে ইউনুস নামে পরিচিত। মিশরের ফুসতাতে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন কায়রোতে। দশম শতাব্দীতে যিনি সময় পরিমাপের জন্য সরল দোলক ব্যবহার করেছিলেন তিনি হলেন ইবনে ইউনুস। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৩, পৃ. ৪২৯।
৪৫৫. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৫১।
৪৫৬. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ১৮২।
৪৫৭. সূর্যের চারদিকে কোনো গ্রহের কক্ষপথের নিকটতম বিন্দুকে অনুসূর (Perihelion) এবং দূরতম বিন্দুকে অপসূর (Aphelion) বলে। অনুসূর অবস্থান পাড়ি দেওয়ার সময় গ্রহরা জোরে এবং উলটোভাবে অপসূর দিয়ে যাওয়ার সময় ধীরে চলে। আমাদের সৌরজগতের গ্রহরা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। সূর্যের চারদিকে ঘূর্ণায়মান কোনো বস্তু সাধারণত বৃত্তাকার কক্ষপথে না ঘুরে অনেকটা উপবৃত্তাকার কক্ষপথ অনুসরণ করে। তাই সূর্য থেকে এর দূরত্বের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। সব গ্রহ এই নিয়ম মেনে চলে। কোনো গ্রহ থেকে সূর্যের ন্যূনতম দূরত্বকে ওই গ্রহের অনুসূর এবং এর বিপরীতকে অপসূর বলা হয়। যেদিন সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে কম থাকে, তাকে অনুসূর বলে। সাধারণত ১ থেকে ৩ জানুয়ারি সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব সবচেয়ে কম থাকে। যেদিন সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে, তাকে অপসূর বলে। সাধারণত ১ থেকে ৪ জুলাই সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৪৫৮. মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ১০৬; জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৬৪-৩৬৫; শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৫৪৩।
৪৫৯. আবদুর রহমান আস-সুফি: আবুল হুসাইন আবদুর রহমান ইবনে উমর ইবনে সাহল আর-রাযি (২৯১-৩৭৬ হি./৯০৩-৯৮৬ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী। পারস্যের (ইরানের) রায় শহরের অধিবাসী। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : رسالة العمل ،کتاب تطارح الشعاعات، کتاب التذکرة بالأسطرلاب، کتاب الکواکب الثابتة غیر المتحرکة। দেখুন, আল-কাফাতি, ইখবারুল-উলামা, পৃ. ১৫২-১৫৩।
৪৬০. গ্রন্থটির বহু পাণ্ডুলিপি ও অনুবাদ এখনো টিকে আছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বডলেইয়ান লাইব্রেরিতে গ্রন্থটির ১০০৯ খ্রিষ্টাব্দের একটি পাণ্ডুলিপি আছে। এটি মূলত লেখকের পুত্রের কাজ। ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে আছে গ্রন্থটির ত্রয়োদশ শতাব্দীর একটি অনুলিপি। -অনুবাদক
৪৬১. শাওকি আবু খলিল, দাওরুল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিন নাহদাতিল উরুব্বিয়া, প্রথম মুদ্রণ, দারুল ফিকর, দিমাশক, ১৪১৭ হি./১৯৯২ খ্রি., পৃ. ৭০।
৪৬২. আবুল ওয়াফা আল-বুযজানি : আবুল ওয়াফা মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে ইসমাইল (৩২৮-৩৮৮ হি./৯৪০-৯৯৮ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ ও যন্ত্রপ্রকৌশলী। খুরাসানের বুযজানে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন বাগদাদে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : كتاب في ما يحتاج إليه الكتاب والعمال من علم الحساب، كتاب في ما يحتاج إليه الصانع من الأعمال الهندسية، زيج الواضح، كتاب المجسطي। তিনি দাওফান্তাস (Diophantus of Alexandria) ও আল-खাওয়ারিজমির আলজেব্রা-বিষয়ক গ্রন্থের টীকা ও ব্যাখ্যা রচনা করেন এবং ইউক্লিডের এলিমেন্টস-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ লেখেন। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১৬৭।
৪৬৩. টাইকো ব্রাহে (Tycho Brahe) একজন প্রখ্যাত ডেনিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী (১৫৪৬-১৬০১ খ্রি.)। তিনি দুটি মানমন্দির নির্মাণ করেন। একটি হলো প্রাসাদ-মানমন্দির (Uraniborg) এবং তার পাশে অপরটি হলো ভূগর্ভস্থ মানমন্দির (Stjerneborg)। তিনি ডেনমার্কের সম্রাটের কাছ থেকে একটি দ্বীপ উপহার পেয়েছিলেন। ডেনমার্কের উপকূলের কাছে সেই ভেন দ্বীপেই তিনি মানমন্দির দুটি নির্মাণ করেন। তিনি অসংখ্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের উন্নতি সাধন করেন। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও গণনাকে আরও নিখুঁত করেন, নানান দেশের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তিনি যন্ত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত ব্যবহারিক ফল ও বিশেষ সারণির সাহায্যে প্রাপ্ত তাত্ত্বিক গণনা-এই দুইয়ের মধ্যে তুলনা করেও দেখতেন। দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের আগে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সর্বাধিক ও চূড়ান্ত বিকাশ ঘটেছিল তার হাতেই।
৪৬৪. কাদরি তাওকান, তুরাসুল আরাবিল ইলমি ফির-রিয়াদিয়্যাতি ওয়াল-ফালাক, পৃ. ২৩২; আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৩৫৫।
৪৬৫. আয-যারকালি: আবু ইসহাক ইবরাহিম ইবনে ইয়াহইয়া আত-তুজিবি আন-নাক্কাশ (৪২০-৪৮০ হি./১০২৯-১০৮৭ খ্রি.)। স্পেনের টলেডোয় জন্মগ্রহণ করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং একাধিক যন্ত্রের উদ্ভাবক। অ্যাস্ট্রোল্যাবের বেশ কয়েকটি সংস্কার সাধন করেন।
৪৬৬. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২০৯; শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৫৪৪।
৪৬৭. আল-খারাকি : বাহাউদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে আবু বকর আল-খারাকি (৪৬৯-৫৩৩ হি./১০৭৬-১১৩৯ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ। খাওয়ারিজমের শাহদের প্রিয়ভাজন ও তাদের রাজদরবারের জ্যোতির্বিদ ছিলেন। দেখুন, উমর রেজা কাহহালা, মুজামুল মুআল্লিফিন, খ. ৮, পৃ. ২৩৮।
৪৬৮. হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ২, পৃ. ৩৩৮; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২১৮।
৪৬৯. হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ২, পৃ. ১৮৫২।
৪৭০. আল-বাদি আল-আঙ্গুরলাবি : আবুল কাসিম হিবাতুল্লাহ ইবনুল হুসাইন ইবনে ইউসুফ আল-বাগদাদি (মৃ. ৫৩৪ হি./১১৩৯ খ্রি.)। দার্শনিক, চিকিৎসক ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী। যিজগ্রন্থ বা তারকা-সারণি বিষয়ে তার 'আল-মুআররাবুল মাহমুদি'। তিনি যেমন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নির্মাণ করেছিলেন, তেমনই পূর্ববর্তীদের তৈরিকৃত যন্ত্রপাতির সংস্কারও করেছিলেন। درة التاج من شعر ابن حجاج তার কবিতার বই। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২৯, পৃ. ১৬০।
৪৭১. ইসমাইল পাশা আল-বাবানি আল-বাগদাদি, হাদিয়্যাতুল আরিফিন আসমাউল মুআল্লিফিন ওয়া আসারুল মুসান্নিফিন, পৃ. ৭১৪।
৪৯২. ডেভিড এ. কিং জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে অবস্থিত গ্যোটে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: Mathematical Astronomy In Medieval Yemen (1983); A Survey Of The Scientific Manuscripts In The Egyptian National Library (1986); Islamic Mathematical Astronomy (1986/1993); Islamic Astronomical Instruments (1987/1995): Astronomy In The Service Of Islam (1993): The Ciphers Of The Monks: A Forgotten Number Notation Of The Middle Ages (2001).
৪৯৩. ইসমাইল পাশা আল-বাবানি, হাদিয়্যাতুল আরিফিন আসমাউল মুআল্লিফিন ওয়া আসারুল মুসান্নিফিন, পৃ. ৩৮৭; হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ১, পৃ. ৮১; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২৩৬-২৩৮।
৪৭৪. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ২৬, পৃ. ৫১।
৪৭৫. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ২৪৩-২৪৬।
৪৭৬. আর-রুদানি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান ইবনে আল-ফাসি (১০৩৭-১০৯৪ হি./১৬২৭-১৬৮৩ খ্রি.)। মালিকি মাযহাবপন্থী মরোক্কান মুহাদ্দিস, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পণ্ডিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : صلة الخلف بموصول السلف، جمع الفوائد من جامع الأصول ومجمع الزوائد في الجمع بين الكتب الخمسة والموطأ، مختصر تلخيص المفتاح في المعاني وشرحه، تحفة أولي الألباب في العمل بالأسطرلاب। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ১৫১।
৪৭৭. ইসমাইল পাশা আল-বাবানি, হাদিয়্যাতুল আরিফিন আসমাউল মুআল্লিফিন ওয়া আসারুল মুসান্নিফিন, পৃ. ৬০৭; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২৪৮-২৫০।
৪৭৮. অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত।
৪৭৯. ডেইলি সাবাহ, ইস্তাম্বুল, ১৬ জুলাই, ২০১৬ খ্রি.; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৬৭১।
জ্যোতির্বিজ্ঞান মুসলিমদের কাছে অনেকাংশে তাদের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। ভৌগোলিক অবস্থান ও ঋতুর ভিন্নতা অনুযায়ী নামাযের সময় নির্ধারণে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে। কেবলার দিক নির্ধারণেও জ্যোতির্বিজ্ঞানের শরণাপন্ন হতে হয়। রোযার সূচনা, হজ ও অন্যান্য বিষয়ের সময় নির্ধারণের জন্য চাঁদের চলাচলও পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়।
জ্যোতির্বিদ্যার ওপর কুরআনের গুরুত্বারোপ
কুরআনে অনেক আয়াত এসেছে যা মহাকাশ ও মানুষকে পরিবেষ্টনকারী মহাবিশ্ব সম্পর্কে গুরুত্বারোপ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যাবলি প্রদান করেছে। শুধু তাই নয়, কুরআন আকাশ ও জমিনে যা-কিছু রয়েছে তার ওপর অনুসন্ধান ও গবেষণা করতে মুসলিমদের উদ্বুদ্ধ করেছে। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি আয়াত এখানে উল্লেখ করা হলো। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَآيَةٌ لَهُمُ اللَّيْلُ نَسْلَخُ مِنْهُ النَّهَارَ فَإِذَا هُمْ مُّظْلِمُونَ وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍ لَّهَا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ وَالْقَمَرَ قَدَّرْنَاهُ مَنَازِلَ حَتَّى عَادَ كَالْعُرْجُونِ الْقَدِيمِ لَا الشَّمْسُ يَنْبَغِي لَهَا أَنْ تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ﴾
তাদের জন্য রাত এক নিদর্শন, তা থেকে আমি দিবালোককে অপসারিত করি, তখন তারা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আর সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, তা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। এবং চাঁদের জন্য আমি নির্দিষ্ট করেছি বিভিন্ন মনযিল।(৪৩৬) অবশেষে তা শুকনো বাঁকা পুরাতন খেজুরশাখার আকার ধারণ করে। সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া এবং রাতের পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে।(৪৩৭)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
﴿هُوَ الَّذِي جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَاء وَالْقَمَرَ نُورًا وَقَدَّرَهُ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ مَا خَلَقَ اللهُ ذَلِكَ إِلَّا بِالْحَقِّ يُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ ) إِنَّ فِي اخْتِلافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَمَا خَلَقَ اللَّهُ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَّقُونَ﴾
তিনিই সূর্যকে তেজস্কর ও চাঁদকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং তার মনযিল নির্দিষ্ট করেছেন যাতে তোমরা বছর গণনা ও (মাসসমূহের) হিসাব জানতে পারো। আল্লাহ তা নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি এইসব নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন। নিশ্চয় দিবস ও রাতের পরিবর্তনে এবং আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা-কিছু সৃষ্টি করেছেন তাতে নিদর্শন রয়েছে মুত্তাকি সম্প্রদায়ের জন্য।(৪৩৮)
তারপর কুরআন আরও সামনে এগিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট তারকা ও নক্ষত্রের নাম ধরে তাদের উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَالسَّمَاءِ وَالطَّارِقِ وَمَا أَدْرَاكَ مَا الطَّارِقُ النَّجْمُ الثَّاقِبُ)
শপথ আকাশের এবং রাতে যা আবির্ভূত হয় তার, তুমি কি জানো রাতে যা আবির্ভূত হয় তা কী? তা উজ্জ্বল নক্ষত্র!(৪৩৯)
তিনি আরও বলেন,
وَأَنَّهُ هُوَ رَبُّ الشَّعْرَى
আর এই যে, তিনি শিরা(৪৪০) নক্ষত্রের মালিক।(৪৪১)
আরও ব্যাপার আছে। কুরআন যেসব বৈজ্ঞানিক সত্য তুলে ধরেছে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর অগাধ ও বিস্তৃত জ্ঞান থাকা ছাড়া কারও পক্ষে সেগুলো বোঝা বা সেগুলো ব্যাখ্যার চেষ্টা করা সম্ভব নয়। ফলে তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মুসলিম বিজ্ঞানীদের মনোযোগ ও প্রযত্ন আবশ্যক করে তোলে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানে মুসলিমদের মনোনিবেশ
মুসলিমরা তাদের মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটানোর শুরুতে পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর বিজ্ঞানীরা যে উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছিলেন তার ওপর নির্ভর করেছেন। প্রথমেই তারা গ্রিক, ক্যালডিয়ান (Chaldean), সুরয়ানি, পারসিক ও ভারতীয় বিজ্ঞানীরা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর যেসব গ্রন্থ রচনা করেছিলেন সেগুলোর অনুবাদ করেছেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরা প্রথম যে গ্রন্থটির অনুবাদ করেছেন সেটি হলো হার্মেস আল-হাকিম(৪৪২) কর্তৃক রচিত, অনূদিত গ্রন্থটির নাম 'মাফাতিহুন নুজুম'। তারা গ্রিক ভাষা থেকে আরবিতে অনুবাদ করেন। এটা উমাইয়া খিলাফতের শেষ দিকের ঘটনা। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর গ্রিক থেকে অনূদিত গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর মধ্যে আরও ছিল টলেমির আল-মাজেস্ট (Almagest)। আরবিতে এটির নাম হয় كتاب المجسطي । এটি জ্যোতির্বিদ্যা ও নক্ষত্ররাজির সঞ্চরণের ওপর রচিত। এই গ্রন্থের অনুবাদ হয়েছিল আব্বাসি খিলাফতকালে।(৪৪৩)
মুহাম্মাদ মুসা ইবনে শাকির
আব্বাসি যুগে তিনজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর আবির্ভাব ঘটে। তারা বানু মুসা ইবনে শাকির (মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা) নামে পরিচিত। এই মুসা ইবনে শাকির ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। খলিফা আল-মামুনের দরবারে থাকতেন। তিনি মারা গেলে আল-মামুন তার পুত্রদের লালনপালন ও শিক্ষাদীক্ষার দায়িত্ব নেন। তারা তখন ছোট ছিল। তিনি তাদেরকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইয়াহইয়া ইবনে মানসুরের কাছে ন্যস্ত করেন। এই ছোট ছেলেরা যখন বড় হয়ে উঠছিল তখন আল-খাওয়ারিজমি বাগদাদের বাইতুল হিকমায় বসে টলেমির ভ্রান্তিগুলোর সংশোধন করছিলেন। তিনি তখন বাইতুল হিকমায় বিজ্ঞানী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এই ছোট শিশুরা যুবকে পরিণত হলে তাদের মধ্যে একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। তিনি হলেন মুহাম্মাদ ইবনে মুসা ইবনে শাকির।
খলিফা আল-মামুন তার জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য বাগদাদের উপকণ্ঠে সবচেয়ে উঁচু স্থানে একটি মানমন্দির নির্মাণ করে দেন। বাব আশ-শামাসিয়্যার কাছাকাছিই ছিল এটির অবস্থান। বৈজ্ঞানিকভাবে ও সূক্ষ্মরূপে নক্ষত্র-পর্যবেক্ষণ ও বিস্ময়কর হিসাবনিকাশ তৈরির উদ্দেশ্যেই এই মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সে সময় গুনদেশাপুরেও (৮৮৮) একটি মানমন্দির ছিল। তিন বছর পর দামেশকের সন্নিকটে কাসিউন পাহাড়ের ওপর আরেকটি মানমন্দির স্থাপন করা হয়। বাগদাদের মানমন্দিরকে এ দুটির সঙ্গে তুলনা করা হতো এবং এদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত। জ্যোতির্বজ্ঞানীরা তারকা-সারণি তৈরির জন্য বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে কাজ করতেন। এসব তারকা-সারণির নাম হতো 'আল-মুজাররাবা' বা 'আল-মামুনিয়্যাহ'। এগুলো ছিল টলেমির প্রাচীন তারকা-সারণির সূক্ষ্ম ও যথার্থ সংস্কার।(৮৮৯)
খলিফা আল-মামুন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল নিযুক্ত করেন। তাদের অন্যতম ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনে মুসা ইবনে শাকির। বিজ্ঞানী দলটির কাজ ছিল মহাজাগতিক বস্তুরাশি পর্যবেক্ষণ করা ও এই পর্যবেক্ষণের ফলাফল লিপিবদ্ধ করা, টলেমির জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর পরীক্ষানিরীক্ষা করা এবং সৌর-কলঙ্ক (Sunspots) নিয়ে গবেষণা করা। তারা ভূ- গোলককে ভিত্তি ধরে নিয়ে একই সময়ে পালমিরা ও সিনজার থেকে সূর্যের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে পৃথিবীর (অক্ষাংশের ও দ্রাঘিমাংশের) ডিগ্রি পরিমাপ করতে শুরু করেন। তারা এই পর্যবেক্ষণ থেকে ডিগ্রি পরিমাপ করেন ৫৬.৭৫ মাইল। এটা আমাদের আধুনিক যুগের পরিমাপ থেকে আধা মাইল বেশি। এই ফলাফল থেকে তারা পৃথিবীর পরিধি পরিমাপ করেন প্রায় ২০,০০০ মাইল। আধুনিক যুগের হিসাব মতে তা ২১,৬০০ মাইল। এ সকল জ্যোতির্বিজ্ঞানী বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা ও অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রমাণিত না হলে কোনোকিছুই গ্রহণ করতেন না। তারা তাদের গবেষণায় বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক রীতি অনুসরণ করতেন।(৪৪৬)
প্রকৃত সফলতা হলো মুসলিমরা পূর্ববর্তী জাতিগুলোর জ্ঞান সংরক্ষণ করেছেন এবং তাতে যা ভুলভ্রান্তি ছিল তা সংশোধন করেছেন। তা ছাড়া ওই জ্ঞানকে তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে বের করে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা ও অভিজ্ঞতার ময়দানে নিয়ে এসেছেন। আরবরা জাহিলি যুগে যেসব কুসংস্কার ও মায়াবিদ্যায় বিশ্বাস করত তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনেককিছু থেকে এই জ্ঞানকে পবিত্র করেছেন। প্রাচীন জাতিগুলোর মধ্যে যখন জ্যোতিষতত্ত্বের উদ্ভব ঘটে তার সমকালে আরবেও কুসংস্কার ও মায়াবিদ্যায় বিস্তার ঘটে। ইসলামি শরিয়া জ্যোতিষতত্ত্বকে বাতিল করে দিয়েছে এবং একে অস্বীকার করেছে। বরং একে ইসলামি আকিদা- বিশ্বাসের বিরুদ্ধ বলে সাব্যস্ত করেছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে এটাই হলো ইসলামি সভ্যতার প্রকৃত অবদান।
মানমন্দির নির্মাণ
মুসলিমরা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষায় কতটা মনোযোগ ও গুরুত্ব দিয়েছিলেন তার জোরালো প্রমাণ মেলে এতেই যে, তারা বহু বড় বড় মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এসব মানমন্দির ছিল সব ধরনের যন্ত্রপাতিতে সুসজ্জিত এবং সার্বক্ষণিকভাবে নিযুক্ত (বেতনভুক্ত) বিজ্ঞানীরা এগুলোতে গবেষণা করতেন। ইসলামি বিশ্বের দূরদূরান্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল মানমন্দির। খলিফা আল-মামুন মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন দামেশকের সন্নিকটে কাসিয়ুন পাহাড়ের ওপর এবং বাগদাদের আশ-শামাসিয়্যাহ এলাকায়।(৪৪৭) এরই ধারাবাহিকতায় ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানমন্দির নির্মাণের কাজ চলতে থাকে। বানু মুসা ইবনে শাকির বাগদাদে একটি মানমন্দির নির্মাণ করেন। এখানে তারা পূর্ণচন্দ্রের হিসাব বের করেন। ইরানের মারাগিতে (মারাঘায়) একটি মানমন্দির ছিল। এটি নির্মাণ করেছিলেন নাসিরুদ্দিন আত-তুসি। মারাঘার মানমন্দির ছিল সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে বিখ্যাত। এটি সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিল। এই মানমন্দিরের পর্যবেক্ষণ ছিল সবচেয়ে নিখুঁত ও যথার্থ। ইউরোপের বিজ্ঞানীরা তাদের রেনেসাঁসের যুগে ও তার পরেও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই মানমন্দিরের পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করতেন। এগুলোর পাশাপাশি আরও মানমন্দির ছিল। যেমন সিরিয়ায় ইবনে শাতিরের(৪৪৮) মানমন্দির, ইস্পাহানে আদ-দিনাওয়ারির মানমন্দির, সমরকন্দে উলুগ বেগের(৪৪৯) মানমন্দির, ইরানে শারফুদ্দাওলার মানমন্দির (জ্যোতির্বিদ আবু সাহ্ আল-কুহি এ মানমন্দির থেকে সাতটি নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেছিলেন), কায়রোর দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত মুকাত্তাম পাহাড়ের ওপর নির্মিত আল-হাকিমি মানমন্দির এবং আরও অনেক মানমন্দির।(৪৫০)
মানমন্দিরের যন্ত্রপাতি
মুসলিম বিজ্ঞানীরা এসব মানমন্দিরে অসংখ্য যন্ত্রপাতি ও মেশিনারিজ ব্যবহার করেছেন, এগুলো যেমন ছিল সূক্ষ্ম তেমনই কারিগরি শৈলীতে ছিল অনন্য। এসব যন্ত্রপাতির সাহায্যে তারা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাবলি ও অবস্থাবলির ব্যাপারে অবগত হতেন। এসব যন্ত্রের অধিকাংশই ছিল মুসলিম বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত, যেগুলো ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। যেমন কীলকযুক্ত কল, আর্মিলারি স্ফেয়ার (Armillary sphere), সাইন কোয়াড্রেন্ট (Sine quadrant), আর্চেড কোয়াড্রেন্ট (Arched quadrant), হোরারি কোয়াড্রেন্ট (Horary quadrant), ফুইকুলা (Fuicula), দিগংশ ও সুবিন্দু পরিমাপযন্ত্র, ম্যারিডিয়ান কোয়াড্রেন্ট (Meridian quadrant), প্যারাল্যাকটিক রুলার (Parallactic ruler) এবং সময় পরিমাপের বিভিন্ন সূর্যঘড়ি ও অন্যান্য যন্ত্র।(৪৫১)
পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতির সাহায্যও গ্রহণ করেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা। এসব যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে অ্যাস্ট্রোল্যাব(৪৫২)। যন্ত্রটি তার গ্রিক নামই ধরে রেখেছে। মুসলিম বিজ্ঞানীরা অ্যাস্ট্রোল্যাবের উন্নতি সাধন করেন এবং নানা ধরনের নমুনা তৈরি করেন। যা তাদের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারেরই অনুষঙ্গ। যেমন তারা উদ্ভাবন করেছেন গোলকাকার অ্যাস্ট্রোল্যাব ও বোট অ্যাস্ট্রোল্যাব। বিশ্বের বিভিন্ন বিজ্ঞানজাদুঘরে এসব অ্যাস্ট্রোল্যাবের নমুনা সংরক্ষিত আছে। দিগ্বলয় থেকে নক্ষত্ররাজির উচ্চতা এবং সময় নির্ধারণে অ্যাস্ট্রোল্যাবের ব্যবহার জনপ্রিয় ছিল।(৪৫০)
জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপাত্ত-সারণি
মহাকাশের বস্তুরাশির হিসাবনিকাশের জন্য মুসলিমরা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উপাত্ত-সারণি বা তারকা-সারণি তৈরিতে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। নক্ষত্র-পর্যবেক্ষণের জন্য এটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারকা-সারণি বলতে বোঝায় গাণিতিক সংখ্যার তালিকাকে, যেখানে কক্ষপথে চলমান তারকারাজির অবস্থান নির্ধারণ, মাস ও দিন জানার সূত্রাবলি ও অতীতকালের ইতিহাস লিপিবদ্ধ থাকে। গ্রহমণ্ডলীর ঊর্ধ্ব-অবস্থান, নিম্ন-অবস্থান, হেলে বা ঝুঁকে পড়া ও অবস্থান পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ও জানা যায় তারকা-সারণি থেকে। এসব সারণি অতিশয় সূক্ষ্ম ও নির্ভুল গাণিতিক সূত্রাবলি ও সংখ্যাসূচক আইনকানুনের ওপর নির্ভরশীল। সবচেয়ে বিখ্যাত তারকা-সারণি হলো ইবনে ইউনুস আল-মিশরির(৪৫৪) (আলি ইবনে আবদুর রহমান ইবনে ইউনুস) তারকা-সারণি।(৪৫৫)
খ্যাতিমান কয়েকজন
মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেকেই বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তারা অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন এবং তাদের উত্তরসূরিদের জন্য নেতৃত্বের আসনে রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আহমাদ ইবনে ইউনুস আল-ফারগানি। পশ্চিমাবিশ্বে তিনি আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত। জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে তার রচিত গ্রন্থ کتاب في جوامع علم النجوم (A Compendium of the Science of the Stars or Elements of astronomy on the celestial motions) ইউরোপে ও পশ্চিম এশিয়ায় সাতশ বছর ধরে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিরাজমান থেকেছে।(৪৫৬) তার নামেই নামকরণ করা হয়েছে চাঁদের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ আলফ্রাগানুস-এর।
আল-বাত্তানি
বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছেন আল-বাত্তানি। তিনি বিখ্যাত আয়-যিজুস-সাবি এর (الزيج الصابئ) প্রণেতা। এই তারকা-সারণি জ্যোতির্বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি অনেক তারকার অবস্থান চিহ্নিত করেন। চাঁদের সন্তরণ ও গ্রহরাজির কক্ষপথে আবর্তন সম্পর্কে তিনি সঠিক ধারণা দেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে টলেমির কিছু ভুলও তিনি সংশোধন করে দেন। সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ-সম্পর্কিত টলেমি যে তত্ত্ব ব্যক্ত করেছিলেন, আল-বাত্তানি তা ভুল প্রমাণ করে নতুন প্রামাণিক তথ্য প্রদান করেন। সৌর-অপসূর(৪৫৭) নির্ধারণেও তিনি টলেমির বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং তার নিজের মত দেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে আল-বাত্তানির সর্বাধিক পরিচিত অর্জন হলো সৌরবর্ষ নির্ণয়। আল-বাত্তানিই প্রথম নির্ভুল পরিমাপ করে দেখিয়েছিলেন যে, এক সৌরবৎসরে ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ড হয়। এর সঙ্গে আধুনিক পরিমাপের পার্থক্য মাত্র ২ মিনিট ২২ সেকেন্ড কম। আল-বাত্তানি পৃথিবীর বিষুবরেখার মধ্য দিয়ে যাওয়া কাল্পনিক সমতলের সঙ্গে সূর্য ও পৃথিবীর কক্ষপথের মধ্যে যে সমতল, তা অসদৃশ বলে ব্যাখ্যা করেন। বিস্ময়করভাবে তিনি এই দুই কাল্পনিক সমতলের মধ্যকার কোণ পরিমাপ করেন। এই কোণকে বলা হয় 'সৌর অয়নবৃত্তের বাঁক'। আল-বাত্তানি এর পরিমাপ করেন ২৩ ডিগ্রি ৩৫ মিনিট, যা বর্তমানের আধুনিক পরিমাপ ২৩ ডিগ্রি ২৭ মিনিট ৮.২৬ সেকেন্ডের খুবই কাছাকাছি। তার এসব জ্যোতির্বিজ্ঞান-সম্পর্কিত তথ্য রেনেসাঁসের যুগে ইউরোপের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। তারা আল-বাত্তানির কাজের ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেন। কয়েক শতাব্দী পর কোপার্নিকাস কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন পরিমাপের চেয়ে আল বাত্তানির পরিমাপ অনেক বেশি নিখুঁত ছিল।(৪৫৮)
আবদুর রহমান আস-সুফি(৪৫৯)
তিনি পশ্চিমা বিশ্বে Azophi এবং Azophi Arabus নামে পরিচিত।
আবদুর রহমান আস-সুফি স্থির তারকারাজির সারণির প্রথম উদ্ভাবক। এ বিষয়ে তিনি একটি গ্রন্থও রচনা করেছেন যার আরবি নাম صُوَرُ الكَوَاكِبِ الثابتة এবং ইংরেজি নাম Book of Fixed Stars(৪৬০)। এটি তিনি ৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন। এতে তিনি ২৯৯ হিজরির/৯১১ খ্রিষ্টাব্দের স্থির তারকারাজির বিবরণ তুলে ধরেন। বিবরণের পাশাপাশি তিনি চিত্রও অঙ্কন করেছেন। এই সারণি এমনকি আধুনিক কালেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা কতিপয় তারকা এবং তাদের অবস্থান ও গতিময়তার ইতিহাস জানতে চান তাদের জন্য। এতে তিনি এক হাজারেরও বেশি তারকার চিত্র অঙ্কন করেছেন। আবদুর রহমান আস-সুফি ও তার অনন্য কীর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে চাঁদের আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ 'আযোফি' ও গৌণ গ্রহ ১২৬২১ আল-সুফির নামকরণ করা হয়েছে তার নামেই।(৪৬১)
আবুল ওয়াফা আল-বুযজানি (আল-বুজানি)(৪৬২)
তিনি চন্দ্র পঞ্জিকা তৈরির জন্য একটি সমীকরণ উদ্ভাবন করেন যা গতি- সমীকরণ নামে পরিচিত। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো চাঁদের গতিময়তায় অসাম্য (lunar inequalities) আবিষ্কার। তার এই আবিষ্কার পরবর্তীকালে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও বলবিদ্যার পরিধি বিস্তৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই আবিষ্কারের মালিক ডেনিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী টাইকো ব্রাহে(৪৬৩) নাকি আল-বুযজানি তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তবে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানে সম্প্রতি প্রমাণিত হয়েছে যে, তৃতীয় অসাম্য (Third lunar inequality) হলো আল-বুযজানির অন্যতম আবিষ্কার। তার আল-মাজেস্ট (Kitāb al-Majisti) (كتاب المجسطي) তার মৃত্যুর পর কয়েক শতাব্দীব্যাপী আরব জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। তার এই গ্রন্থে গোলকাকার ত্রিকোণমিতি, গ্রহতত্ত্ব ও কিবলার দিক নির্ধারণে সমাধান প্রসঙ্গে অসংখ্য বিষয় আলোচিত হয়েছে।(৪৬৪)
আবু ইসহাক আন-নাক্কাশ আয-যারকালি(৪৬৫)
বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ। তিনি আয-যিজুত তুলাইতিলি (Toledan Tables or Tables of Toledo) প্রণেতাদের অন্যতম। এই যিজ বা তারকা-সারণির নামকরণ করা হয়েছে আন্দালুসের শহর তুলাইতিলাহ (Toledo)-এর নামে। টলেমিও আল-খাওয়ারিজমির মতো পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের থেকে আহরিত জ্ঞানের ভিত্তিতে তিনি এই তারকা-সারণি প্রস্তুত করেন। এই সারণিতে তিনি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের ফলাফল লিপিবদ্ধ করেন। তার একটি কিতাব রয়েছে الصحيفة الزيجية নামে, এতে তিনি অ্যাস্ট্রোল্যাব ব্যবহারের নতুন পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন। তিনি অ্যাস্ট্রোল্যাবের একটি উন্নত সংস্করণও উদ্ভাবন করেন। এটিকে আস-সাহিফাতুয যারকালিয়্যাহ বা আয-যারকালাহ বলা হয়। পশ্চিমাবিশ্বে এটি Saphaea নামে পরিচিত। তিনিই প্রথম প্রমাণ পেশ করেন যে, স্থির তারকারাজির তুলনায় সৌর-অপসূরের ঝুঁকে পড়ার পরিমাণ ১২০৫ মিনিটে পৌঁছে। আধুনিক নিরীক্ষায় যার পরিমাণ ১২০৮ মিনিট। আয-যারকালির নির্ণীত পরিমাণের চেয়ে মাত্র ৩ মিনিট বেশি।(৪৬৬) টলেমীয় মডেলের ডায়াগ্রাম (রেখাচিত্র) ব্যবহার করে গ্রহরাজির অবস্থান নির্ণয়ে একটি যন্ত্রও (equatorium) আবিষ্কার করেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি দুটি রচনা লেখেন, রচনা দুটি ক্যাসটাইলের রাজা আলফোনসোর (King Alfonso X) নির্দেশে স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়। এটি হিব্রু ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষাতেও অনূদিত হয়। আয-যারকালি তার کتاب الجدول (Book of Tables) গ্রন্থের জন্যও বিখ্যাত। এর একটি সারণি কিবতি (Coptic), রোমান, পারসিক ও চান্দ্রমাস শুরুর দিনটিকে নির্দেশ করে, অন্য একটি সারণি নির্দিষ্ট সময়ে গ্রহের অবস্থান নির্দেশ করে এবং অপর একটি সারণি সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের সম্ভাব্যতা নির্দেশ করে।
আবুল ইয়ুস্র বাহাউদ্দিন আল-খারাকি(৪৬৭)
ষষ্ঠ হিজরি শতকে যারা জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে মগ্ন হয়েছিলেন তিনি তাদের অন্যতম। গণিত ও ভূগোলবিদ্যায়ও তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো আত-তাবসিরাহ (التبصرة)(৪৬৮) এবং মুনতাহাল-ইদরাক ফি তাকসিমিল-আফলাক (منتهی الإدراك في تقاسيم الأفلاك)(৪৬৯)
আল-বাদি আল-আঙ্গুরলাবি(৪৭০)
তিনি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কারে অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দেন। এই ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন তার যুগের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তার উল্লেখযোগ্য কীর্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি তারকা-সারণি, যা তিনি বাগদাদের সালজুকি সুলতানের প্রাসাদে থেকে তৈরি করেছিলেন। তারকা-সারণিটি তার কিতাবে সন্নিবেশন করেন। সুলতান মাহমুদ আবুল কাসিম ইবনে মুহাম্মাদের নামে সারণিটির নামকরণ করা হয়েছে যিজ আল-মাহমুদি।(৪৭১)
ইবনে শাতির(মৃ. ৭৭৭ হি./১৩৭৫ খ্রি.) জ্যোতির্বিজ্ঞান-বিষয়ক রচনাবলিও অনেক মূল্যবান। তিনি যেসব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন তা কয়েক শতাব্দীব্যাপী প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে চালু ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার উল্লেখযোগ্য কীর্তি হলো: যিজ ইবনে শাতির ইদাহুল মুগাইয়াব ফিল-আমাল বিরল-মুজাইয়াব রিসালাহ ফিল-আঙ্গুরলাব, মুখতাসার ফিল-আমাল বিল-আঙ্গুরলাব, আন-নাফউল আম ফিল-আমাল বির-রুবইত তাম্ম, নুযহাতুস সামি ফিল-আমাল বির-রুবইল জামি, কিফায়াতুল কুনু ফিল-আমাল বির-রুবইল মাকতু, নিহায়াতুল গায়াত ফিল-আমালিল ফালাকিয়্যাত, আয-যিজুল জাদিদ। এই তারকা-সারণি তিনি উসমানি খলিফা প্রথম মুরাদের আহ্বানে প্রস্তুত করেছিলেন। ইবনে শাতির এতে যেসব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উদাহরণ, তত্ত্ব ও মত এবং পরিমাপ পেশ করেন তা ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি। তবে তার এই সব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণা-ফলাফল পরবর্তীকালে নিকোলাস কোপার্নিকাসের নামে প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ইতিহাসবিদ ডেভিড এ. কিং(৪৯২) ১৩৯০ হিজরিতে/১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে আবিষ্কার করেন যে, পোলিশ গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাসের নামে চালু অধিকাংশ তত্ত্বই মূলত ইবনে শাতিরের। এর তিন বছর পর ১৩৯৩ হিজরিতে/১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে পোল্যান্ডে কিছু আরবি পাণ্ডুলিপির সন্ধান পাওয়া যায়, এসব পাণ্ডুলিপি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে কোপার্নিকাস এগুলো অধ্যয়ন করেছিলেন।(৪৯৩)
উলুগ বেগ
উলুগ বেগ বিজ্ঞানীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, তাদের সব ধরনের প্রয়োজন পূরণ করে গবেষণার কাজে ভাবনাহীন রাখতেন। তিনি সমরকন্দে সেই সময়ের সবচেয়ে বড় মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন।
একজন প্রখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ লিখেছেন, উলুগ বেগ ছিলেন জ্ঞানী, ন্যায়পরায়ণ, চমৎকার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও উদ্যমী। জ্যোতির্বিজ্ঞানে ব্যাপক জ্ঞান তার দখলে ছিল। একইসঙ্গে তিনি অলংকারশাস্ত্রেরও অত্যন্ত নিপুণ পরীক্ষক ছিলেন। তার যুগে বিজ্ঞানীদের অবস্থান ছিল সবচেয়ে ঊর্ধ্বে। জ্যামিতিতে তিনি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। আর মহাবিশ্বের মানচিত্র রচনা (Cosmography)-এর ক্ষেত্রে তিনি টলেমির একটি গ্রন্থের ব্যাখ্যা লিখেছিলেন। তার মতো কোনো সম্রাট আজ পর্যন্ত সিংহাসনে বসেননি। তিনি প্রাথমিক যুগের বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় নক্ষত্রসমূহের টীকা লেখেন। তিনি সমরকন্দে একটি মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সৌন্দর্যে ও মানে এবং শিক্ষাদীক্ষার উৎকর্ষে এমন মহাবিদ্যালয় সংলগ্ন সাতটি প্রদেশের কোথাও ছিল না।(৪৭৪)
উলুগ বেগ একটি আকাশ-পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে তার কার্যকালে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনে সক্ষম হন। ৭২৭ হি./১৩২৭ খ্রি. থেকে ৮৩৯ হি./১৪৩৫ খ্রি. পর্যন্ত তার আকাশ-পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকে। এই পর্যবেক্ষণ থেকে একটি সামগ্রিক সারণি তৈরি করেন। এই সারণির নাম যিজ উলুগ বেগ বা আয-যিজুস-সুলতানি। এতে তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সঙ্গে ও যথার্থভাবে নক্ষত্ররাজির অবস্থান নির্ণয় করেন। চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের সময়ও নির্ণয় করেন। উলুগ বেগ স্থির তারকারাজিরও একটি সারণি প্রস্তুত করেন। চাঁদ, সূর্য, গ্রহরাজির সন্তরণ এবং গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি শহরগুলোর দ্রাঘিমাংশ ও অক্ষাংশের সারণিও তিনি তৈরি করেন।(৪৭৫)
আর-রুদানি শামসুদ্দিন আল-ফাসি(৪৭৬)
তিনি হলেন পরবর্তীকালের মুসলিম বিজ্ঞানীদের অন্যতম, যারা জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে প্রথম যুগের মুসলিম বিজ্ঞানীদের অর্জিত কীর্তিগুলোর সাহায্য গ্রহণ করে সামনে এগিয়েছেন। আর-রুদানি সময় নির্দেশের জন্য একটি গোলকাকার যন্ত্র (গোলক অ্যাস্ট্রোল্যাব) উদ্ভাবন করেছিলেন। গোলকাকার যন্ত্রটির ওপরে ছিল কিছু বৃত্ত এবং তিসি তেলের প্রলেপযুক্ত সাদা রঙের নকশা। গোলকাকার যন্ত্রটির ওপর আরেকটি গোলক যুক্ত ছিল, যা ছিল দুটি অংশে বিভক্ত, এগুলোর ওপর ছিল সৌর-বন্ধনী ও অন্যান্য বস্তু নির্দেশক ছিদ্র। এগুলোও ছিল নিচেরটির মতো গোলকাকার ও সুবজ রঙে চিহ্নিত। আর-রুদানির এই গোলক অ্যাস্ট্রোল্যাবটি অতি সহজে ব্যবহার করা যেত এবং সব শহরের সময় নির্দেশের জন্যও ছিল যথোপযুক্ত। এ বিষয়ে তিনি 'বাহজাতুত তুল্লাব ফিল-আমাল বিল-আঙ্গুরলাব' নামে একটি পুস্তকও রচনা করেছেন, এতে তিনি অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ ও তার ব্যবহারের পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।(৪৭৭)
পরিশেষে আমরা যা আলোচনা করেছি তার প্রেক্ষিতে বলতে হয়, মুসলিম বিজ্ঞানীরা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ময়দানে-সেই সময়ে লব্ধ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির স্বল্পতা সত্ত্বেও-যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন ও অবদান রেখেছেন তা অবশ্যই সম্মানের যোগ্য, শ্রদ্ধার যোগ্য। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ময়দানে তারা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ এই যে, আকাশের বহু নক্ষত্র এখনো আরবি নাম বহন করে চলেছে। যেমন সুহাইল (Canopus), আল-মাজাররাহ (rogue star), আল-জাওযা (Betelgeuse), আদ-দাব্বুল আকবার (Ursa Major), আদ-দাব্বুল আসগার (Ursa Minor), আল-গাওল (Algol), আস-সাম্ভ এবং আরও অনেকে।
মারয়াম আল-আস্তুরলাবি(৪৭৮) দশম শতাব্দীর একজন মুসলিম নারী জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তার মূল নাম আল-ইজলিয়্যাহ বিনতে আল-ইজলি আল-আস্তুরলাবি। জ্যোতির্বিজ্ঞান ছাড়াও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় পারদর্শী ছিলেন। তার পিতা কুশিয়ার আল-জিলানি কয়েকটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গ্রন্থের রচয়িতা। যেমন 'মাজমালুল-উসুল ফি আহকামিন নুজুম', 'আল-যিজ আল-জামি' 'আল-মাদখাল ফি সানাআতি আহকামিন নুজুম' ও 'আস্তুরলাব'। তারা বসবাস করতেন সিরিয়ার আলেপ্পোতে। সেখানেই মারয়াম আল-আস্তুরলাবি তার বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক কাজ করতেন।
মারয়াম ও তার পিতা মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ নাগুলুসের শিষ্য ছিলেন। নাগুলুস ছিলেন প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী, যিনি ইতিহাসে প্রথম বিস্তৃত অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ করেছিলেন। নাগুলুসের কাছে শিক্ষাগ্রহণের পর মারয়াম 'উন্নত অ্যাস্ট্রোল্যাব' নির্মাণে ব্রতী হন। তার জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এটি ছিল একটি উৎকর্ষের প্রতীক। তিনি তার অ্যাস্ট্রোল্যাবে নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন, যাতে নির্দিষ্ট সময়ে মহাকাশের বস্তুরাশির নির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয় করা যায়।
হিজরি চতুর্দশ শতকে (খ্রিষ্টীয় দশম শতকে) মারয়াম আল-আস্তুরলাবি যখন আলেপ্পোতে বসবাস ও গবেষণা করতেন, সেই সময় সেখানকার গভর্নর ছিলেন সাইফুদ্দাওলাহ। তিনি আলেপ্পো স্টেট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা ছিল হামদানি সাম্রাজ্যের একটি প্রতীক। মারয়াম সাইফুদ্দাওলার রাজদরবারে ৯৪৪-৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মহাকাশ-গবেষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এই সময়ে তিনি একটি নয়, বিভিন্ন ধরনের একাধিক অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ করেছিলেন।
মারয়াম আল-আস্তুরলাবি যে অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ করেছিলেন তা অনেক আধুনিক নৌবৈজ্ঞানিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে বলে মনে করা হয়। যেমন কম্পাস, স্যাটেলাইট ও বিশ্বজনীন অবস্থান-নির্ণায়ক ব্যবস্থা, যা সংক্ষেপে জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) নামে পরিচিত।
মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হেনরি ই. হল্ট ১৯৯০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়াগোতে অবস্থিত পালোমার মানমন্দিরে গবেষণাকালে একটি গ্রহাণু-বেষ্টনী (asteroid belt) আবিষ্কার করেন। তিনি এটির নাম দেন 'মারয়াম আল-আস্তুরলাবি'।(৪৭৯)
টিকাঃ
৪৩৬. منازل শব্দটি منزل শব্দের বহুবচন। আরবি জ্যোতির্বিজ্ঞানে চান্দ্রমাসকে ২৮টি মনযিলে ভাগ করা হয়েছে। চান্দ্রমাসের এই মনযিলকে বাংলায় তিথি বলে।
৪৩৭. সুরা ইয়াসিন: আয়াত ৩৭-৪০।
৪৩৮. সুরা ইউনুস: আয়াত ৫-৬।
৪৩৯. সুরা তারিক: আয়াত ১-৩।
৪৪০. শিরা একটি নক্ষত্রের নাম, একে একটি সম্প্রদায় পূজা করত। বাংলায় 'লুব্ধক', ইংরেজিতে 'Sirius'.
৪৪১. সুরা নাজম: আয়াত ৪৯।
৪৪২. হার্মেস আল-হাকিম (Hermes Trismegistus): একজন গ্রিক ব্যক্তিত্ব। সত্য ও কল্পকাহিনির মিশ্রণে গড়ে উঠেছে তার ব্যক্তিত্ব।
৪৪৩. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ৩৪৮।
৪৪৬. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ১৮২।
৪৪৭. দামেশকে আরেকটি মানমন্দির ছিল, যেটি নির্মাণ করেছিলেন উমাইয়া খলিফারা।-অনুবাদক
৪৪৮. ইবনে শাতির: আবুল হাসান আলাউদ্দিন আলি ইবনে ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ আল-আনসারি আদ-দিমাশকি আল-মুআযযিন, ইবনে শাতির নামে পরিচিত (৭০৪-৭৭৭ হি./১৩০৪-১৩৭৫ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও প্রকৌশলী। ছিলেন দামেশকের প্রধান মুআযযিন। তিনি দামেশকের উমাইয়া জামে মসজিদে একটি ধর্মীয় সময়-নির্দেশক (religious timekeeper) বানিয়ে দিয়েছিলেন এবং মসজিদটির মিনারে তৈরি করে দিয়েছিলেন একটি সূর্যঘড়ি। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ে তার বহু পুস্তিকা রয়েছে। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, আদ-দুরারুল কামিনাহ, খ. ৪, পৃ. ৯।
৪৪৯. উলুগ বেগ: মির্যা মুহাম্মাদ তারাগাই ইবনে শাহরুখ ইবনে তৈমুর লং (৭৯৬-৮৫৩ হি./১৩৯৪-১৪৪৯ খ্রি.)। তৈমুরি পরিবারের চতুর্থ শাসক। উলুগ বেগ নামে সর্বাধিক পরিচিত। গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ। তিনি পাঁচটি ভাষা জানতেন আরবি, ফার্সি, তুর্কি, মঙ্গোলীয় ও চৈনিক। ত্রিকোণমিতি ও গোলীয় জ্যামিতিতে তিনি অসাধারণ দক্ষ ছিলেন। তিনি সেই যুগের সবচেয়ে বড় মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং বুখারা ও সমরকন্দে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহাবিদ্যালয়। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৭, পৃ. ৩২৮।
৪৫০. ডোনাল্ড আর, হিল, Islamic Science and Engineering, আরবি অনুবাদ, العلوم والهندسة في الحضارة الإسلامية, অনুবাদক, আহমাদ ফুয়াদ পাশা, পৃ. ৭৪-৮২; মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ৮১-৮২।
৪৫১. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৯২।
৪৫২. অ্যাস্ট্রোল্যাব (astrolabe) একটি বিস্তৃত নতি-পরিমাপক যন্ত্র (inclinometer)। একে এনালগ ক্যালকুলেটরও বলা যেতে পারে। এই যন্ত্র বিভিন্ন ধরনের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও নাবিকেরা মহাকাশীয় বা মহাজাগতিক বস্তুর দিগ্বলয়ের উপরের উচ্চতা, দিন বা রাত নির্ণয়ের জন্য এই যন্ত্র ব্যবহার করতেন। গ্রহ ও নক্ষত্র নির্ণয়ের জন্যও এই যন্ত্র ব্যবহার করা হতো। নির্দিষ্ট স্থানীয় সময়ে স্থানীয় অক্ষাংশ, জরিপ ও ত্রিভুজীকরণে (triangulation)-ও অ্যাস্ট্রোল্যাব ব্যবহৃত হতো। ধ্রুপদি সভ্যতায়, ইসলামি স্বর্ণযুগে, ইউরোপীয় মধ্যযুগে ও আবিষ্কারের যুগে উপরিউক্ত সব কাজের জন্য অ্যাস্ট্রোল্যাবের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। ইসলামি বিশ্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশকালে মুসলিম বিজ্ঞানীরা অ্যাস্ট্রোল্যাবের নকশার ক্ষেত্রে কৌণিক স্কেল প্রবর্তন করেন। দিগংশকে নির্দেশ করে এমন বৃত্ত যুক্ত করেন। কিবলা অনুসন্ধানের উপায় হিসেবেও যন্ত্রটির ব্যবহার ছিল। অষ্টম শতাব্দীর গণিতজ্ঞ মুহাম্মাদ আল-ফাযারি প্রথম অ্যাস্ট্রোল্যাব-নির্মাতা হিসেবে কৃতিত্ব অর্জন করেন।-অনুবাদক।
৪৫৪. ইবনে ইউনুস: আবুল হাসান আলি ইবনে আবদুর রহমান ইবনে ইউনুস (মৃ. ৩৯৯ হি./১০০৯ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী। উল্লেখযোগ্য রচনা: আয়-যিজুল হাকিমি, যা যিজ ইবনে ইউনুস নামে পরিচিত। মিশরের ফুসতাতে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন কায়রোতে। দশম শতাব্দীতে যিনি সময় পরিমাপের জন্য সরল দোলক ব্যবহার করেছিলেন তিনি হলেন ইবনে ইউনুস। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৩, পৃ. ৪২৯।
৪৫৫. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ৫১।
৪৫৬. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ১৮২।
৪৫৭. সূর্যের চারদিকে কোনো গ্রহের কক্ষপথের নিকটতম বিন্দুকে অনুসূর (Perihelion) এবং দূরতম বিন্দুকে অপসূর (Aphelion) বলে। অনুসূর অবস্থান পাড়ি দেওয়ার সময় গ্রহরা জোরে এবং উলটোভাবে অপসূর দিয়ে যাওয়ার সময় ধীরে চলে। আমাদের সৌরজগতের গ্রহরা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। সূর্যের চারদিকে ঘূর্ণায়মান কোনো বস্তু সাধারণত বৃত্তাকার কক্ষপথে না ঘুরে অনেকটা উপবৃত্তাকার কক্ষপথ অনুসরণ করে। তাই সূর্য থেকে এর দূরত্বের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। সব গ্রহ এই নিয়ম মেনে চলে। কোনো গ্রহ থেকে সূর্যের ন্যূনতম দূরত্বকে ওই গ্রহের অনুসূর এবং এর বিপরীতকে অপসূর বলা হয়। যেদিন সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে কম থাকে, তাকে অনুসূর বলে। সাধারণত ১ থেকে ৩ জানুয়ারি সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব সবচেয়ে কম থাকে। যেদিন সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে, তাকে অপসূর বলে। সাধারণত ১ থেকে ৪ জুলাই সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৪৫৮. মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ১০৬; জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৬৪-৩৬৫; শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৫৪৩।
৪৫৯. আবদুর রহমান আস-সুফি: আবুল হুসাইন আবদুর রহমান ইবনে উমর ইবনে সাহল আর-রাযি (২৯১-৩৭৬ হি./৯০৩-৯৮৬ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী। পারস্যের (ইরানের) রায় শহরের অধিবাসী। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : رسالة العمل ،کتاب تطارح الشعاعات، کتاب التذکرة بالأسطرلاب، کتاب الکواکب الثابتة غیر المتحرکة। দেখুন, আল-কাফাতি, ইখবারুল-উলামা, পৃ. ১৫২-১৫৩।
৪৬০. গ্রন্থটির বহু পাণ্ডুলিপি ও অনুবাদ এখনো টিকে আছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বডলেইয়ান লাইব্রেরিতে গ্রন্থটির ১০০৯ খ্রিষ্টাব্দের একটি পাণ্ডুলিপি আছে। এটি মূলত লেখকের পুত্রের কাজ। ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে আছে গ্রন্থটির ত্রয়োদশ শতাব্দীর একটি অনুলিপি। -অনুবাদক
৪৬১. শাওকি আবু খলিল, দাওরুল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিন নাহদাতিল উরুব্বিয়া, প্রথম মুদ্রণ, দারুল ফিকর, দিমাশক, ১৪১৭ হি./১৯৯২ খ্রি., পৃ. ৭০।
৪৬২. আবুল ওয়াফা আল-বুযজানি : আবুল ওয়াফা মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে ইসমাইল (৩২৮-৩৮৮ হি./৯৪০-৯৯৮ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ ও যন্ত্রপ্রকৌশলী। খুরাসানের বুযজানে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন বাগদাদে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : كتاب في ما يحتاج إليه الكتاب والعمال من علم الحساب، كتاب في ما يحتاج إليه الصانع من الأعمال الهندسية، زيج الواضح، كتاب المجسطي। তিনি দাওফান্তাস (Diophantus of Alexandria) ও আল-खাওয়ারিজমির আলজেব্রা-বিষয়ক গ্রন্থের টীকা ও ব্যাখ্যা রচনা করেন এবং ইউক্লিডের এলিমেন্টস-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ লেখেন। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১৬৭।
৪৬৩. টাইকো ব্রাহে (Tycho Brahe) একজন প্রখ্যাত ডেনিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী (১৫৪৬-১৬০১ খ্রি.)। তিনি দুটি মানমন্দির নির্মাণ করেন। একটি হলো প্রাসাদ-মানমন্দির (Uraniborg) এবং তার পাশে অপরটি হলো ভূগর্ভস্থ মানমন্দির (Stjerneborg)। তিনি ডেনমার্কের সম্রাটের কাছ থেকে একটি দ্বীপ উপহার পেয়েছিলেন। ডেনমার্কের উপকূলের কাছে সেই ভেন দ্বীপেই তিনি মানমন্দির দুটি নির্মাণ করেন। তিনি অসংখ্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের উন্নতি সাধন করেন। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও গণনাকে আরও নিখুঁত করেন, নানান দেশের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তিনি যন্ত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত ব্যবহারিক ফল ও বিশেষ সারণির সাহায্যে প্রাপ্ত তাত্ত্বিক গণনা-এই দুইয়ের মধ্যে তুলনা করেও দেখতেন। দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের আগে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সর্বাধিক ও চূড়ান্ত বিকাশ ঘটেছিল তার হাতেই।
৪৬৪. কাদরি তাওকান, তুরাসুল আরাবিল ইলমি ফির-রিয়াদিয়্যাতি ওয়াল-ফালাক, পৃ. ২৩২; আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৩৫৫।
৪৬৫. আয-যারকালি: আবু ইসহাক ইবরাহিম ইবনে ইয়াহইয়া আত-তুজিবি আন-নাক্কাশ (৪২০-৪৮০ হি./১০২৯-১০৮৭ খ্রি.)। স্পেনের টলেডোয় জন্মগ্রহণ করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং একাধিক যন্ত্রের উদ্ভাবক। অ্যাস্ট্রোল্যাবের বেশ কয়েকটি সংস্কার সাধন করেন।
৪৬৬. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২০৯; শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৫৪৪।
৪৬৭. আল-খারাকি : বাহাউদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে আবু বকর আল-খারাকি (৪৬৯-৫৩৩ হি./১০৭৬-১১৩৯ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ। খাওয়ারিজমের শাহদের প্রিয়ভাজন ও তাদের রাজদরবারের জ্যোতির্বিদ ছিলেন। দেখুন, উমর রেজা কাহহালা, মুজামুল মুআল্লিফিন, খ. ৮, পৃ. ২৩৮।
৪৬৮. হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ২, পৃ. ৩৩৮; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২১৮।
৪৬৯. হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ২, পৃ. ১৮৫২।
৪৭০. আল-বাদি আল-আঙ্গুরলাবি : আবুল কাসিম হিবাতুল্লাহ ইবনুল হুসাইন ইবনে ইউসুফ আল-বাগদাদি (মৃ. ৫৩৪ হি./১১৩৯ খ্রি.)। দার্শনিক, চিকিৎসক ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী। যিজগ্রন্থ বা তারকা-সারণি বিষয়ে তার 'আল-মুআররাবুল মাহমুদি'। তিনি যেমন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নির্মাণ করেছিলেন, তেমনই পূর্ববর্তীদের তৈরিকৃত যন্ত্রপাতির সংস্কারও করেছিলেন। درة التاج من شعر ابن حجاج তার কবিতার বই। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২৯, পৃ. ১৬০।
৪৭১. ইসমাইল পাশা আল-বাবানি আল-বাগদাদি, হাদিয়্যাতুল আরিফিন আসমাউল মুআল্লিফিন ওয়া আসারুল মুসান্নিফিন, পৃ. ৭১৪।
৪৯২. ডেভিড এ. কিং জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে অবস্থিত গ্যোটে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: Mathematical Astronomy In Medieval Yemen (1983); A Survey Of The Scientific Manuscripts In The Egyptian National Library (1986); Islamic Mathematical Astronomy (1986/1993); Islamic Astronomical Instruments (1987/1995): Astronomy In The Service Of Islam (1993): The Ciphers Of The Monks: A Forgotten Number Notation Of The Middle Ages (2001).
৪৯৩. ইসমাইল পাশা আল-বাবানি, হাদিয়্যাতুল আরিফিন আসমাউল মুআল্লিফিন ওয়া আসারুল মুসান্নিফিন, পৃ. ৩৮৭; হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ১, পৃ. ৮১; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২৩৬-২৩৮।
৪৭৪. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ২৬, পৃ. ৫১।
৪৭৫. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ২৪৩-২৪৬।
৪৭৬. আর-রুদানি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে সুলাইমান ইবনে আল-ফাসি (১০৩৭-১০৯৪ হি./১৬২৭-১৬৮৩ খ্রি.)। মালিকি মাযহাবপন্থী মরোক্কান মুহাদ্দিস, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পণ্ডিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : صلة الخلف بموصول السلف، جمع الفوائد من جامع الأصول ومجمع الزوائد في الجمع بين الكتب الخمسة والموطأ، مختصر تلخيص المفتاح في المعاني وشرحه، تحفة أولي الألباب في العمل بالأسطرلاب। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ১৫১।
৪৭৭. ইসমাইল পাশা আল-বাবানি, হাদিয়্যাতুল আরিফিন আসমাউল মুআল্লিফিন ওয়া আসারুল মুসান্নিফিন, পৃ. ৬০৭; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ২৪৮-২৫০।
৪৭৮. অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত।
৪৭৯. ডেইলি সাবাহ, ইস্তাম্বুল, ১৬ জুলাই, ২০১৬ খ্রি.; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৬৭১।