📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 পদার্থবিজ্ঞান

📄 পদার্থবিজ্ঞান


বিভিন্ন জাতি ও সভ্যতার উত্তরাধিকারের ওপর ভিত্তি করেই জ্ঞানবিজ্ঞানের সব শাখার উন্নতি ও বিকাশ ঘটে, তেমনই মুসলিমদের পদার্থবিজ্ঞানচর্চাও শুরুর দিকে গ্রিক রচনারাশির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এসব রচনায় গ্রিক বিজ্ঞানীরা কেবল দর্শনের ওপর নির্ভরশীল থেকেছেন, দর্শনের মধ্য দিয়ে প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাদের প্রচেষ্টায় পরীক্ষানিরীক্ষার উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা ছিল না। মুসলিম বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে এই মৌলিক বিষয়টির বিকাশ ঘটিয়েছেন। তারা পদার্থবিজ্ঞানের ময়দানে অভূতপূর্ব যোগ্যতা ও মেধা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। যেন তারা বিজ্ঞানের একটি নতুন শাখার উদ্ভাবন ঘটিয়েছেন। কারণ মুসলিম বিজ্ঞানীরাই পদার্থবিজ্ঞানের ভিত পরীক্ষানিরীক্ষা ও এক্সপেরিমেন্টের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তারা শুধু দর্শন ও চিন্তাভাবনার ওপর নির্ভরশীল হননি।

মুসলিম বিজ্ঞানীরা নতুন থিউরি ও সূত্র প্রদান করেছেন এবং উদ্ভাবনমূলক গবেষণায় ব্রতী হয়েছেন। যেমন গতিসূত্র (laws of motion), জলসূত্র (water resources law), মহাকর্ষ নিয়ম (law of universal gravitation)। তা ছাড়া তারা খনিজ পদার্থ ও তরল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর (specific weight) নিয়ে গবেষণা করেছেন। তরল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর পরিমাপ করতে সক্ষম হয়েছেন। এটিকে বর্তমান যুগে বাস্তবধর্মী আধুনিক উপকরণ থাকা সত্ত্বেও কঠিন কাজ মনে করা হয়!

মুসলিম বিজ্ঞানীরা শুরুতে পূর্বসূরিদের গ্রন্থাবলির ওপর নির্ভর করেছেন। যেমন : ১. অ্যারিস্টটল কর্তৃক রচিত (كتاب الطبيعة)(৩০৪), এই গ্রন্থে তিনি গতিসূত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন। ২. আর্কিমিডিসের রচনাবলি, এসব রচনায় পানিতে ভাসমান বস্তু, কতিপয় পদার্থের নির্দিষ্ট ভর ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। ৩. তিসিবিওসের গ্রন্থাবলি, এসব গ্রন্থে পাম্প ও জলঘড়ির সূত্রাবলি রয়েছে। ৪. হেরন অব আলেকজান্দ্রিয়ার (৩০৫) গ্রন্থাবলি, যেখানে উত্তোলনযন্ত্র, চাকা ও কাজের সূত্র সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। (৩০৬)

মুসলিম বিজ্ঞানীরা অব্যাহতভাবে পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের পদার্থবৈজ্ঞানিক থিউরি ও সূত্রাবলির উন্নতি সাধন করেন, তারা এগুলোকে চিন্তাধারার পর্যায় থেকে প্রায়োগিক পরীক্ষানিরীক্ষার স্তরে নিয়ে আসেন। মূলত পরীক্ষানিরীক্ষাই পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি।

মুসলিম বিজ্ঞানীরা শব্দবিজ্ঞান, শব্দের সৃষ্টি ও স্থানান্তর নিয়ে গবেষণা করেন। তারাই প্রথম জানতে পারেন যে শব্দ-সৃষ্টিকারী বস্তুর কম্পন থেকে শব্দের (শব্দতরঙ্গের) সৃষ্টি হয় এবং গোলকাকৃতিতে ছড়িয়ে পড়া তরঙ্গরূপে বাতাসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। তারাই প্রথম শব্দকে কয়েক প্রকারে ভাগ করেন। বিভিন্ন প্রাণীর স্বর বা আওয়াজ কেন ভিন্ন হয় তারও কারণ বের করেন। গলার দীর্ঘতা, কণ্ঠনালির প্রশস্ততা ও স্বরযন্ত্রের গঠন ভিন্ন ভিন্ন হওয়ার কারণে স্বর বা আওয়াজেরও ভিন্নতা ঘটে। মুসলিম বিজ্ঞানীরাই প্রথম প্রতিধ্বনির কার্যকারণ ব্যাখ্যা করেন। তারা বলেন, তরঙ্গিত বায়ু (শব্দতরঙ্গ) উঁচু কোনো প্রতিবন্ধকের, যেমন পাহাড় বা দেয়ালের সঙ্গে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উলটে গেলে (ফিরে এলে) প্রতিধ্বনির সৃষ্টি হয়। (প্রতিবন্ধক বস্তুর) নৈকট্যের কারণে প্রতিধ্বনির শ্রুতি-অনুভূতি নাও হতে পারে, শব্দের ও তার উলটে যাওয়ার সময়ের ব্যবধানের কারণেও প্রতিধ্বনির শ্রুতি-অনুভূতি হয় না। (৩০৭)

তরল পদার্থ-সম্পর্কিত বিজ্ঞান সম্পর্কে বলতে গেলে বলা যায়, মুসলিম বিজ্ঞানীরা তরল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর পরিমাপের পদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষ গবেষণামূলক রচনাবলি লিখেছেন। তারা খনিজ পদার্থ উত্তোলনের বেশ কিছু পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, কিছু উপাদানের ঘনত্ব নিরূপণে সক্ষম হয়েছেন। তাদের হিসাব ও পরিমাপ ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং বর্তমান সময়ে যে পরিমাপ রয়েছে তার অনুরূপ অথবা কিছুটা ভিন্ন। (৩০৮)

মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে যারা পদার্থবিজ্ঞানে সুনাম কুড়িয়েছেন তাদের অন্যতম হলেন আবু রাইহান আল-বিরুনি। তিনি আঠারো প্রকারের বহুমূল্য পাথরের আপেক্ষিক গুরুত্ব (Specific Gravity) নিরূপণ করেন। তিনি এই সূত্র প্রদান করেন যে, বস্তুর আপেক্ষিক গুরুত্ব, তা যতটুকু পানি সরিয়ে দেয় তার আয়তনের সঙ্গে সমানুপাতিক। (৩০৯) আল-বিরুনি সংযোগযুক্ত পাত্রের (Communicating vessels) সূত্র থেকে প্রাকৃতিক ঝরনা এবং আর্তের্জীয় কূপ (Artesian aquifer) থেকে পানি-প্রবাহের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করেন। (৩১০)

আল-খাযিনি (৩১১) পদার্থবিজ্ঞানের ময়দানে নতুন কিছু উদ্ভাবন করেছেন। তিনি বিশেষ করে গতিবিদ্যা (Dynamics) ও জলস্থিতিবিদ্যায় (hydrostatics/তরল পদার্থের স্থিতিবিজ্ঞান) বিস্ময়কর অবদান রেখেছেন। যা তার পরবর্তী গবেষকদের হতবাক করে দিয়েছে। গতিবিদ্যার ময়দানে বর্তমান সময়েও তার থিউরিগুলো বিদ্যালয়ে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। এসব থিউরির মধ্যে অন্যতম হলো স্লোপ (Slope/gradient) (৩১২) থিউরি ও ইমপাল্স (Impulse/physics) থিউরি। এই দুটি থিউরি গতিবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অনেক ঐতিহাসিক আল-খাযিনিকে সকল যুগের পদার্থবিজ্ঞানের গুরু বলে গণ্য করেছেন। আল-খাযিনি তার অধিকাংশ সময় স্থির তরল পদার্থ বিষয়ে গবেষণা করে কাটিয়েছেন। তিনি তরল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর জানার জন্য একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন। কোনো কঠিন বস্তুকে তরল পদার্থে নিমজ্জিত করা হলে তা তার নিচ থেকে উপর পর্যন্ত কতটুকু তরলকে সরিয়ে দেবে তা নিয়ে তিনি তার গবেষণায় আলোচনা করেছেন। আল-খাযিনির মহান শিক্ষক আবু রাইহান আল-বিরুনি কতিপয় কঠিন ও তরল পদার্থের আপেক্ষিক গুরুত্ব নির্ধারণে যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, তিনিও ওই একই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। আল-খাযিনি আপেক্ষিক গুরুত্ব পরিমাপে নির্ভুলতার বা যথার্থতার একটি বড় পর্যায়ে পৌঁছেছেন, যা তার সামসময়িক বিজ্ঞানীদের ও তাদের অনুসারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। (৩১৩)

আমেরিকান পদার্থবিদ রবার্ট এন. হল বিজ্ঞানী চরিতাভিধানে আল-খাযিনি সম্পর্কিত একটি প্রবন্ধে কঠিন ও তরল পদার্থের আপেক্ষিক গুরুত্ব আবিষ্কারে আল-খাযিনির পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি যে বাতাসে ও পানিতে বস্তুর ভর নিরূপণের স্কেল আবিষ্কার করেছিলেন তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এটির পাঁচটি পাল্লা ছিল, যার একটি পর্যায়ক্রমিক বাহুর ওপর চলমান থাকত। হামিদ মুরানি ও আবদুল হালিম মুনতাসির উভয়ে তাদের রচিত গ্রন্থ فى تاريخ العلوم عند العرب - قراءات فى -এ বলেছেন, ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ টরিসেলি (Evangelista Torricelli)-এর বহু পূর্বেই আল-খাযিনি বায়ুর উপাদান ও ওজন নির্দেশ করেছেন। তিনি নির্দেশ করেছিলেন যে, বায়ুরও তরল পদার্থের মতো ওজন ও ঊর্ধ্বমুখী চাপ রয়েছে। বায়ুপূর্ণ স্থানে বস্তুর ভর তার প্রকৃত ভরের চেয়ে কম, প্রকৃত ভরের চেয়ে কতটুকু কম তা নির্ভর করে বায়ুর ঘনত্বের ওপর। আল-খাযিনি আরও ব্যাখ্যা করেছেন যে, আর্কিমিডিসের সূত্র কেবল তরল পদার্থের ক্ষেত্রে নয়, বরং তা গ্যাসীয় পদার্থের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ ধরনের গবেষণাই ব্যারোমিটার (৩১৪), শোষকল (air vacuums) (৩১৫) ও পাম্প আবিষ্কারের পথ সহজ করে দিয়েছিল। পদার্থবিজ্ঞানে এসব অবদান রাখার কারণেই আল-খাযিনি টরিসেলি, ব্লেইজ প্যাসকেল, রবার্ট বয়েল (৩১৬) ও অন্যান্য বিজ্ঞানীর অগ্রগামী মনীষী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় গতিসূত্রাবলিও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব সূত্র আবিষ্কারে মুসলিম বিজ্ঞানীদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। নিচে তা আলোচনা করছি।

### গতিসূত্র
গতিসূত্রসমূহ এতটাই গুরুত্ব রাখে যে তা আধুনিক সভ্যতার মেরুদণ্ড হিসেবে গণ্য হয়। বর্তমান যুগের প্রতিটি চলমান যন্ত্র-গাড়ি, রেলগাড়ি, উড়োজাহাজ থেকে শুরু করে স্পেস মিসাইল, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মিসাইল, বরং সব গতিশীল যন্ত্রের কার্যপ্রণালি গতিসূত্রের ওপর নির্ভরশীল। গতিসূত্রসমূহের ওপর ভিত্তি করেই মানুষ মহাশূন্যে অভিযান পরিচালনা করেছে এবং চাঁদের পৃষ্ঠে নামতে পেরেছে। তা ছাড়া গতিসূত্রাবলি গতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল পদার্থবিজ্ঞানের সব শাখার মূল ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়। আলোকবিজ্ঞান মানে আলোর সঞ্চরমান তরঙ্গ, স্বর বা আওয়াজ মানে প্রবহমান শব্দতরঙ্গ, বিদ্যুৎ বা ইলেকট্রিসিটি হলো ইলেকট্রনের তরঙ্গ ইত্যাদি।

পশ্চিমে ও প্রাচ্যে সকল মানুষের কাছে এটাই কিংবদন্তি যে, গতিসূত্রসমূহের আবিষ্কারক হলেন ইংরেজ পদার্থবিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন। তার ফিলসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা (লাতিন ভাষায় Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica, ইংরেজি ভাষায় Mathematical Principles of Natural Philosophy) গ্রন্থটি প্রকাশের পর থেকেই এই কিংবদন্তির সূচনা হয়।
এটিই গোটা বিশ্বে সুবিদিত সত্যে পরিণত হয়। বিজ্ঞানের গ্রন্থাবলিতেও এ তথ্য ব্যবহৃত হয়। স্বাভাবিকভাবেই মুসলিমদের বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ও বাদ যায় না। বিংশ শতাব্দীর সূচনাকাল পর্যন্ত এই কিংবদন্তিই চালু ছিল। এই সময় সামসময়িক কতিপয় মুসলিম পদার্থবিজ্ঞানী বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। তাদের মধ্যে অগ্রগামী ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মুস্তাফা নাজিফ, যন্ত্র-প্রকৌশলের অধ্যাপক ড. জালাল শাওকি, গণিতের অধ্যাপক ড. আলি আবদুল্লাহ দাফফা প্রমুখ। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইসলামি পাণ্ডুলিপিসমূহে যা-কিছু ছিল তা তারা পর্যাপ্ত অধ্যয়ন করেন। তারা আবিষ্কার করেন যে গতিসূত্রাবলি আবিষ্কারের প্রকৃত কৃতিত্ব মুসলিম বিজ্ঞানীদেরই। এই ক্ষেত্রে নিউটনের ভূমিকা ও কৃতিত্ব এই যে, তিনি এসব নিয়মের উপাদান সংগ্রহ করেন, সেগুলোকে সূত্রাবদ্ধ করেন এবং গাণিতিক কাঠামোতে সংজ্ঞায়িত করেন।

আবেগ ও তাত্ত্বিক বক্তৃতা বাদ দিয়ে বলা যায়, গতিসূত্রের ক্ষেত্রে মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টা স্পষ্ট ও দ্বিধাহীন। তাদের পাণ্ডুলিপিতে অসংখ্য নির্ভরযোগ্য ও অকাট্য বক্তব্য রয়েছে যা এই সত্যকে প্রতিভাত করে। এসব পাণ্ডুলিপি তারা রচনা করেছেন নিউটনের আবির্ভাবের সাতশ বছর আগে। ওইসব অকাট্য বক্তব্যের আলোকেই আমরা উপর্যুক্ত সত্যের মীমাংসা করব।

*প্রথম গতিসূত্র
পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম গতিসূত্রটি বোঝায় যে, কোনো (স্থির) বস্তুর ওপর আঘাতকারী বলের (শক্তির) গোটা পরিমাণ যদি শূন্য হয় তাহলে ওই বস্তু স্থিরই থাকবে। অর্থাৎ, কোনো ধরনের আঘাতকারী বল না থাকা অবস্থায় গতিশীল বস্তু সমবেগে (সরলরেখায়) গতিশীলই থাকবে। যেমন ঘর্ষণশক্তি (friction forces)। নিউটন গাণিতিক কাঠামোতে নিয়মটি সূত্রাবদ্ধ করেছেন এভাবে, বাহ্যিক কোনো বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকবে এবং গতিশীল বস্তু চিরকাল সুষম গতিতে সরল পথে চলতে থাকবে। (৩১৭)

এখন প্রথম গতিসূত্রের ক্ষেত্রে মুসলিম বিজ্ঞানীদের ভূমিকা কী সেই প্রসঙ্গে আসি। মহান মনীষী ইবনে সিনা তার আল-ইশারাত ওয়াত তানবিহাত গ্রন্থে বলেছেন, তোমরা অবশ্য জানো যে, বস্তুকে তার অবস্থায় ছেড়ে দিলে, তার ওপর বাইরে থেকে কোনো বল (শক্তি) প্রয়োগ করা না হলে, তা নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট অবস্থাতেই থাকবে। কারণ, বস্তুর প্রকৃতির মধ্যেই গতি বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার ধর্ম বিদ্যমান। বস্তুর সংরোধ (Impedance) এ কারণে নয় যে তা বস্তু, বরং এই অর্থে যে তা তার নিজের অবস্থায় অপরিবর্তনশীল থাকতে চায়) (৩১৮)

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি থেকে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয় যে, প্রথম গতিসূত্র সম্পর্কে ইবনে সিনা যা বলেছেন তা আইজ্যাক নিউটন যা বলেছেন তার থেকে অনন্য, যদিও নিউটন ইবনে সিনার ছয়শ বছর পরে এসেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, বস্তু স্থির অবস্থায় থাকবে অথবা সুষম গতিতে সরলরেখায় চলমান থাকবে, যতক্ষণ বাহ্যিক কোনো বল (শক্তি) এই অবস্থার পরিবর্তনে বস্তুকে বাধ্য না করবে। অর্থাৎ, ইবনে সিনাই প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রথম গতিসূত্র আবিষ্কার করেছেন!

* দ্বিতীয় গতিসূত্র
এই নিয়ম বস্তুর ওপর প্রযুক্ত বল ও বস্তুর গতির ওপর প্রযুক্ত বলের প্রভাবকে বোঝায়। যখনই কোনো বস্তুর ওপর বল প্রয়োগ করা হবে তা ওই বস্তুর গতির পরিবর্তন ঘটাবে। হয় গতি বাড়াবে, না হয় কমাবে, অন্তত গতি দিক পরিবর্তন করবে। এটি ত্বরণ নামে পরিচিত। দ্বিতীয় নিয়মটিকে এভাবে লেখা যেতে পারে, বল = ভর × ত্বরণ। কোনো বস্তুর ত্বরণ সেই বস্তুর ওপর প্রযুক্ত বলের সঙ্গে সমানুপাতিক ও বল যেদিকে ক্রিয়া করে বস্তুর বেগের পরিবর্তন সেদিকেই ঘটে।

নিউটন গাণিতিক আকারে উপর্যুক্ত নিয়মটিকে সূত্রাবদ্ধ করেছেন এভাবে, বস্তুর গতির পরিবর্তনের জন্য প্রযুক্ত বল ওই বস্তুর ভর ও ত্বরণের সঙ্গে সমানুপাতিক। তাই ওই বলকে পরিমাপ করা হয় এভাবে, বল = ভরের সঙ্গে ত্বরণের গুণফল। অর্থাৎ, বস্তুর ওপর বলের প্রয়োগ (ক্রিয়া বা ঝোঁক) যেদিকে ঘটে ওই বস্তুর ত্বরণ বা গতিবেগের পরিবর্তনও সেদিকে ঘটে।
মুসলিম বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে কী বলেছেন সে কথায় আসি। উদাহরণত, হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা আল-বাগদাদি (৪৮০-৫৬০ হি./১০৮৭-১১৬৪ খ্রি.) কী বলেছেন তা লক্ষ করুন। তিনি তার আল-মুতাবার ফিল-হিকমা কিতাবে বলেছেন, বস্তুর গতিবেগের প্রতিটি পরিবর্তন ঘটে অবশ্যই একটি সময়খণ্ডে, তীব্রতর বল বস্তুর গতিবেগের পরিবর্তন ঘটায় তীব্রভাবে এবং সংকুচিত সময়ে। বল যত তীব্র হবে বস্তুর গতিও (ত্বরণও) তত তীব্র হবে এবং সময় হবে সংকুচিত। বলের তীব্রতা না কমলে ত্বরণের তীব্রতাও কমবে না (ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে)। তখন বস্তুর গতিবেগের পরিবর্তন ঘটবে তীব্র সময়হীনতায়। কারণ গতির পরিবর্তন বা ত্বরণের ক্ষেত্রে সময়ের সংকোচন যারপরনাই হতে পারে। হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকার গ্রন্থের চতুর্দশ অধ্যায়ের নাম ‘শূন্যস্থান’। এই অধ্যায়ে তিনি বলেছেন, বলের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ত্বরণও বৃদ্ধি পায়। তাই বস্তুর ওপর প্রযুক্ত বল যত বাড়বে গতিশীল বস্তুর ত্বরণও তত বাড়বে এবং সুনির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রমণের ফলে সময় সংকুচিত হয়ে পড়বে। আইজ্যাক নিউটন এই বক্তব্যকেই তার গাণিতিক কাঠামোতে সাজিয়েছেন এবং তার নাম দিয়েছেন গতির দ্বিতীয় সূত্র!

* তৃতীয় গতিসূত্র
এই সূত্র বোঝায় যে, যদি দুটি কণা (বস্তু) মিথস্ক্রিয়া বা পারস্পরিক ক্রিয়া করে, তাহলে প্রথম কণাটি দ্বিতীয় কণার ওপর যে বলের দ্বারা ক্রিয়া করবে তাকে ক্রিয়া (Action Force) বলে এবং তা পরম মানের (absolute value) সমান এবং বিপরীত দিকে দ্বিতীয় কণা প্রথম কণার ওপর যে বলের দ্বারা ক্রিয়া করবে তাকে প্রতিক্রিয়া (Reaction Force) বলে। নিউটন এই নিয়মকে তার গাণিতিক কাঠামোতে সূত্রাবদ্ধ করেছেন এভাবে, সকল ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

নিউটনের কয়েক শতাব্দী পূর্বে আবুল বারাকাত হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা তার আল-মুতাবার ফিল-হিকমা গ্রন্থে যা বলেছেন, একটি গোলাকার রিং ধরে দুইজন প্রতিযোগী দুইপাশ থেকে টানছে, অর্থাৎ, দুইজন প্রতিযোগীর মধ্যে টানাটানিযুক্ত রিং রয়েছে। এখানে প্রত্যেক প্রতিযোগীর রিং টানার ক্ষেত্রে অপর প্রতিযোগীর শক্তির প্রতিরোধমূলক শক্তি রয়েছে। টানাটানিতে একজন প্রতিযোগী বিজয়ী হলে এবং রিংটিকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসতে পারলে তার অর্থ এটা দাঁড়ায় না যে, রিংটি অপর প্রতিযোগীর টানশক্তি থেকে মুক্ত। বরং ওই শক্তি পরাজিতরূপে বিদ্যমান। ওই শক্তি যদি না-ই থাকত তাহলে বিজয়ী প্রতিযোগীর রিং টানার প্রয়োজনই পড়ত না।

ইমাম ফখরুদ্দিন আল-রাযির রচনাবলিতেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। তিনি তার আল-মাবাহিসুল মাশরিকিয়্যা ফি ইলমিল ইলাহিয়্যাতি ওয়াত তাবিইয়্যাত গ্রন্থে বলেছেন, যে রিংটিকে দুইজন সমান শক্তিশালী প্রতিযোগী নিজের দিকে টানে তা মধ্যবর্তী স্থানে স্থির থাকে। কোনো সন্দেহ নেই যে, রিংয়ের ওপর প্রত্যেক প্রতিযোগী অপর প্রতিযোগীর বিপরীতমুখী বল বা শক্তি প্রয়োগ করে তাকে অকেজো করে দিচ্ছে।

বরং হাসান ইবনুল হাইসামেরও এই ক্ষেত্রে অবদান রয়েছে। তিনি তার ‘আল-মানাযির’ গ্রন্থের চতুর্থ মাকালার (প্রবন্ধের) তৃতীয় অধ্যায়ে বলেছেন, যদি গতিশীল বস্তু বাহ্যিক প্রতিবন্ধক দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয় এবং বাধাগ্রস্ত হওয়ার সময়ে তার চালক-বল (Driving Force) তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলে তা যেখান থেকে গতিশীল হয়েছিল সেদিকেই ফিরে আসবে। ফিরে আসার ক্ষেত্রে বস্তুটির ভরবেগ (Momentum) তার প্রথমবারের চালক-বল ও প্রতিবন্ধক বল অনুসারে কাজ করবে।

সুতরাং, কোনো সন্দেহ নেই যে, মুসলিম বিজ্ঞানীরা এসব উদ্ধৃতিতে যা বলেছেন তা-ই তৃতীয় গতিসূত্রের মূল ভিত্তি। নিউটন সূত্রটির এসব উপাদান আয়ত্ত করে তা নিজের ভাষায় প্রকাশ করেছেন মাত্র।

# মহাকর্ষ সূত্র
পদার্থবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব (থিউরি) অর্থাৎ গতিসূত্রসমূহ আবিষ্কারে মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টা ও অর্জনের কথা উল্লেখ করা হলো। এগুলোর পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞানে মুসলিম বিজ্ঞানীদের আরও সব চমৎকার আবিষ্কার রয়েছে, যেগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এসব আবিষ্কার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরবর্তীকালের অন্য বিজ্ঞানীদের নামে চালু রয়েছে...। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মহাকর্ষ সূত্র। মহাকর্ষ সূত্রের গুরুত্ব এখানে নিহিত যে, এটি মহাজাগতিক বস্তুরাশি (তারকা ও নক্ষত্রপুঞ্জ)-কে একটি বন্ধনে আবদ্ধ রেখেছে এবং মহাকর্ষ বলের ফলেই সেগুলো নিজ নিজ কক্ষপথে সংগতি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করে চলমান রয়েছে। মহাকর্ষ আবিষ্কারের ফলেই বিজ্ঞানীরা বস্তু কেন জমিনের দিকে পতিত হয় তার রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে পেরেছেন। পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহ যে সূর্যের চারপাশে প্রায় বৃত্তাকার কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান রয়েছে তাও যথার্থভাবে বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। অর্থাৎ, ধরে নেওয়া হয়েছে যে, সূর্য ও গ্রহগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণই সূর্যকেন্দ্রিক ঘূর্ণনের কারণ।

প্রাচ্যে ও পশ্চিমে সাধারণ মানুষের কাছে এ কথা প্রচলিত এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এটা পড়েও থাকে যে, মহাকর্ষ সূত্রের আবিষ্কারক হলেন আইজ্যাক নিউটন। তিনি একদিন একটি আপেল গাছের নিচে বসে ছিলেন। তখন একটি আপেল তার গায়ের ওপর পড়ল। তখনই তিনি চিন্তা করতে শুরু করলেন আপেলটি কেন জমিনের দিকে পড়ল, কেন অন্যদিকে পড়ল না। এভাবে তিনি মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কার করেন এবং তার ফর্মুলা প্রস্তুত করেন। (মহাকর্ষের একটি বিশেষ উদাহরণ হলো মাধ্যাকর্ষণ বা অভিকর্ষ।) এই সূত্রের মূলকথা এই যে, প্রত্যেক বস্তু অপর বস্তুকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে এবং বস্তুর ভর ও দূরত্ব অনুযায়ী আকর্ষণ-বলে তারতম্য হয়ে থাকে।

কিন্তু এটাই কি সত্য? এটাই কি বাস্তবিক? বরং বিজ্ঞানের ক্রমসমৃদ্ধ ইতিহাস থেকে দৃঢ়ভাবে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, নিউটনের পক্ষে তার বিখ্যাত মহাকর্ষসূত্র আবিষ্কার করা সম্ভব হতো না—যেমনটা গতিসূত্র তিনটির ক্ষেত্রে হয়েছে—যদি না তিনি পূর্ববর্তী মহান বিজ্ঞানীদের কাঁধে ভর করতেন এবং দীর্ঘ সময়যাত্রা তাকে সহায়তা না করত। কারণ, এ ব্যাপারে কেউ সন্দেহ পোষণ করে না যে, পূর্ববর্তী মানুষেরা যেমন বস্তুর উপর থেকে নিচ দিকে পতন পর্যবেক্ষণ করেছেন তেমনই নিউটনও গাছ থেকে আপেলের পতন পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারপর তিনি বিদ্যমান তত্ত্বগুলো কাজে লাগিয়ে তা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা তার আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি গ্রন্থে এ বিষয়ে যে আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিয়েছেন তা থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বস্তুর বাধাহীন পতনের ব্যাখ্যায় তাত্ত্বিক প্রসার চালিয়েছিলেন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল। ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা এদিকে ইঙ্গিত করার পর বলেছেন, মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাদের সত্যধর্মের পথপ্রদর্শনের কল্যাণে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনে বিশুদ্ধ জ্ঞানগত পন্থা ও পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তাই তারা যেসব তত্ত্বের সত্যাসত্য বা শুদ্ধ্যশুদ্ধি পরীক্ষালব্ধ অভিজ্ঞতার দ্বারা যাচাই করা যায় সেগুলোর দার্শনিক প্রমাণাদি একেবারেই গ্রহণ করেননি। তারা উপলব্ধি করেছিলেন যে, মহাজাগতিক বস্তুরাশির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কতটা যথার্থ তা নিরূপিত হবে এসব বস্তুর আচরণের অন্তর্নিহিত বৈজ্ঞানিক সত্যের উন্মোচন কতটা ঘটেছে তার ওপর ভিত্তি করে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে মুসলিম বিজ্ঞানীরাই প্রথমবারের মতো অভিকর্ষের প্রভাবে বস্তুর অবাধ পতনের ব্যাখ্যার জন্য একটি গ্রহণযোগ্য ভিত্তি দাঁড় করিয়েছিলেন। (৩১৯)

আল-হামদানি (الجوهـرتين العتيقتين المائعتين من الصفراء والبيضاء) গ্রন্থে একটি বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এই বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনা করেছেন। তিনি ভূমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠে যে জলরাশি ও বায়ু রয়েছে তার সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, যারা পৃথিবীর নিচে (পৃথিবীর অপর পৃষ্ঠে) রয়েছে তারাও পৃথিবীর উপরে (এ পৃষ্ঠে) যারা রয়েছে তাদের মতো স্থির (ছিটকে যাচ্ছে না)। পৃথিবীর নিচের পৃষ্ঠে তাদের পতন ও স্থিরতা তাদের পৃথিবীর এ পৃষ্ঠে পতন এবং স্থিরতার মতোই, পৃথিবী যেন একটি ম্যাগনেটিক পাথর, তার শক্তি যেমন তার চারপাশের লোহাকে নিজ দিকে টানছে তেমনই পৃথিবীও তার চারপাশের সবকিছুকে নিজ দিকে টানছে... (৩২০)

এই ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে আল-হামদানি প্রথমবারের মতো পদার্থবিজ্ঞানে মহাকর্ষসূত্রের আংশিক সত্য প্রতিষ্ঠা করেন। এটা বিভব শক্তি বা পটেনশিয়াল এনার্জি (طاقة الموضع أو طاقة الكمون) নামে পরিচিত। যেমনটা ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা বলেছেন। ভূপৃষ্ঠ থেকে বস্তুর উচ্চতার ফলে বিভব শক্তির সৃষ্টি হয়। (৩২১) যদিও তিনি তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বলেননি। যে, বস্তুরাশি পরস্পরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে, তারপরও আল-হামদানির বক্তব্যই নিউটনের মহাকর্ষসূত্রের সামগ্রিক মৌল ভিত্তি।

চিত্র নং-৮ 'মিযানুল হিকমা'

আল-হামদানির পর এলেন আবু রাইহান আল-বিরুনি (৯৭৩-১০৫০ খ্রি.) এবং তিনি আল-হামদানির বক্তব্যকেই জোরালোভাবে সমর্থন করলেন যে, পৃথিবী তার উপরে যা-কিছু রয়েছে তার সবকিছুকে নিজের কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করছে। আবু রাইহান আল-বিরুনি তার القانون المسعودي গ্রন্থে এসব কথা বলেছেন। আল-খাযিনি তার 'মিযানুল হিকমা' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বস্তু তার নিজের শক্তিবলে অনবরত পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে আকর্ষিত হচ্ছে। একইভাবে আল-রাযিও বিশ্বনিখিলে উপস্থিত সকল বস্তুর আকর্ষণবলের বিষয়টি কাঠামোগতভাবেই চিন্তা করতে পেরেছিলেন।

তারপর আরও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল। হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা আল-বাগদাদি অ্যারিস্টটল যে ভ্রান্তিতে পতিত হয়েছিলেন তা সংশোধন করতে সক্ষম হলেন। অ্যারিস্টটল সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে, ভারী বস্তু হালকা বস্তুর চেয়ে দ্রুত পতিত হয়। কিন্তু তার এ সিদ্ধান্তটি ছিল ভুল। যদিও পরবর্তীকালে গ্যালিলিও এই গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সত্য প্রমাণ করেছিলেন। যে, মাধ্যাকর্ষণের প্রভাববলয়ে অবাধ (৩২২) পতনশীল বস্তুর ত্বরণ তার ভরের তারতম্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। (৩২৩) অর্থাৎ, যখন বস্তুর পতন যেকোনো বাহ্যিক বাধা থেকে মুক্ত থাকবে। (বাধামুক্ত অবস্থায় সব বস্তুই মাধ্যাকর্ষণের ফলে একইসঙ্গে ভূমিতে পতিত হবে।) হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা আল-মুতাবার ফিল-হিকমা গ্রন্থে তার নিজের ভাষায় এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে উন্মোচিত করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি শূন্যস্থানে (বায়ুহীন স্থানে) বস্তুর পতন ঘটে তাহলে ভারী ও হালকা বস্তুর পতন, বড় ও ছোট বস্তুর পতন, মোচাকৃতি বস্তুর চৌকো মাথায় পতন ও প্রশস্ত মাথায় পতন একইভাবে (একই সময়ে) ঘটবে। (এগুলোর ত্বরণে কোনো পার্থক্য ঘটবে না।) (বায়ুর বা জলের) বাধাযুক্ত স্থানে এসব বস্তুর পতনে তারতম্য ঘটে, কারণ বিদ্যমান প্রতিবন্ধকের বাধা পেরিয়ে এগুলোর পতন ঘটে। যেমন পানি, বায়ু বা অন্যকিছু বাধা তৈরি করে। (৩২৪) (ভারী বস্তু যত দ্রুত বাধা পেরোতে পারে, হালকা বস্তু তা পারে না।)

অন্যদিকে, হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা আল-বাগদাদি নিক্ষিপ্ত বস্তুর পতন নিয়ে গবেষণা করে মাধ্যাকর্ষণ বিষয়ে নতুন তথ্য সংযোজন করেছেন। অর্থাৎ, (উপর দিকে নিক্ষিপ্ত) বস্তুরাশির ঊর্ধ্বগমন মাধ্যাকর্ষণের বিপরীত কাজ করে অথবা যে বলের দ্বারা বস্তুকে উপর দিকে নিক্ষেপ করা হয়েছে তা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে বিপরীতমুখী ক্রিয়া করেছে। তিনি বলছেন, ...নিক্ষিপ্ত পাথরের মধ্যে যে আকর্ষণ রয়েছে তা নিক্ষেপকারী আকর্ষণের বিপরীত আকর্ষণ, তবে তা নিক্ষেপকারীর (প্রযুক্ত) বলের দ্বারা পরাভূত। বস্তুর ওপর প্রযুক্ত বল দুর্বল হয়ে পড়ে বস্তুর (ভূমির প্রতি) আকর্ষণ ও পারিপার্শ্বিক বাধার কারণে...। তাই প্রযুক্ত বল শুরুতে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক আর্কষণের বিরুদ্ধে শক্তিশালী থাকে, কিন্তু তা একটু একটু করে দুর্বল হয়ে পড়ে, স্থির হয়ে যায় এবং অবশেষে তা প্রাকৃতিক আকর্ষণের বিপরীতে শক্তিহীন হয়ে পড়ে। প্রাকৃতিক আকর্ষণ প্রযুক্ত বলের বিপরীতে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং বস্তু এ আকর্ষণের দিকেই ফিরে আসে। (৩২৫)

ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা টীকায় বলেছেন, এখানে একটি বিষয়ে ইঙ্গিত করা সংগত যে, হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা আল-বাগদাদি 'আল-মাইল' (الميل) বা আকর্ষণ/ঝোঁকের বিষয়টিকে একটি সুপ্ত শক্তি বা নবজাতকের মায়ের কোলের দিকে ধাবিত হওয়ার অপত্যশক্তি হিসেবে বিবেচনা করেননি। যেমনটি অ্যারিস্টটল বলেছেন। বরং এর দ্বারা তিনি বস্তুগত শক্তি বুঝিয়েছেন, যা নিক্ষিপ্ত বস্তুর মাধ্যাকর্ষণ-বিরুদ্ধ ঊর্ধ্বগামী ত্বরণের মধ্যে ও ভূমির দিকে নিম্নগামী ত্বরণের মধ্যে বৈজ্ঞানিকভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা আল-বাগদাদি এ বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে প্রশ্নটি ছুড়ে দিয়েছেন তা হলো, নিক্ষিপ্ত পাথর কি তার ঊর্ধ্বগামী ত্বরণের সর্বোচ্চ বিন্দুতে স্থির হয়ে পড়ে, যখন সে ভূপৃষ্ঠের দিকে পড়তে শুরু করে? এই প্রশ্নের জবাব তিনি নিজেই দিয়েছেন স্পষ্ট ভাষায়, কেউ যদি মনে করে যে প্রযুক্ত বলের কারণে ঘটিত পাথরের ঊর্ধ্বগামী ত্বরণ এবং (স্বাভাবিক) নিম্নগামী ত্বরণের মধ্যে (মধ্যবর্তী মুহূর্তে) সামান্যতম স্থিরতা রয়েছে তাহলে সে ভুল করবে। কারণ, পাথরের ওপর প্রযুক্ত বল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পাথরের ভর শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তখন ঊর্ধ্বগামী ত্বরণ ক্ষীণ হয়ে যায় এবং বিপরীতমুখী (নিম্নগামী) তরণ শুরু হয়। ফলে মনে হয় যে পাথরটি স্থির ছিল।

ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা ধারাবাহিক আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, আল-खাযিন ভূমির ওপর পতনশীল বস্তুর ত্বরণ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তার 'মিযানুল হিকমা' গ্রন্থে এ ব্যাপারে বক্তব্য রয়েছে। এই বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল-খাযিন ভূপৃষ্ঠের ওপর পতনশীল বস্তুর দ্রুতি এবং ওই বস্তু (কোনো একক সময়ে) যে দূরত্ব অতিক্রম করছে ও দূরত্ব অতিক্রম করতে যে সময় নিচ্ছে তার মধ্যে সঠিক সম্পর্ক কী তা জানতেন। এই সম্পর্ককে গাণিতিক কাঠামোতে ব্যক্ত করতেই সপ্তদশ খ্রিষ্টাব্দে গ্যালিলিওর সঙ্গে সম্পৃক্ত সমীকরণটি প্রকাশিত হয়।

এভাবেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ইসলামি সভ্যতার বিজ্ঞানীরা প্রাচীন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দূরে সরে এসে মহাকর্ষ বিষয়ে মানবিক উপলব্ধির পূর্ণতার পথে অংশত সত্যে উপনীত হয়েছিলেন। জ্ঞানের ক্ষেত্রে গবেষণার রীতি- পদ্ধতি যে জ্ঞানের বিষয়বস্তুর প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে তা তারা প্রমাণ করেছিলেন। সত্যে উপনীত হতে তারা এ বিষয়টির ওপরও নির্ভরশীল ছিলেন। তারা চিন্তাপদ্ধতি ও বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক গবেষণারীতির ক্ষেত্রে যে মহাবিপ্লব সাধন করেছিলেন তা না হলে আমাদের সময় পর্যন্তও প্রাচীন কালের অজ্ঞতা ও কুসংস্কার প্রতিষ্ঠিত থাকত। আইজ্যাক নিউটন তার সামনে এমন মহান বিজ্ঞানীদের পেয়েছিলেন যাদের কাঁধের ওপর ভর করে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন এবং এভাবে খ্যাতি ও সম্মান কুড়িয়ে নিয়েছিলেন। (৩২৬)

শেষে কিছু যদি বলতেই হয় তবে তা এই যে, গতিসূত্রের ইতিহাসের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে এবং মহাকর্ষসূত্রের ইতিহাসও জানতে হবে। প্রাপ্য অধিকার তাদের প্রাপকদের ফিরিয়ে দিতে হবে।

### ব্যক্তি-পরিচিতি (৩২৭)
তিসিবিওস : (Ctesibius or Ktesibios or Tesibius) ২৮৫ থেকে ২২২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সক্রিয় গ্রিক পদার্থবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক। প্রাচীন মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় বসবাস করতেন। তিনি প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়ার প্রকৌশল-যুগের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। তিসিবিওস ছিলেন একজন নাপিতের সন্তান। ধারণা করা হয় তিনিই প্রথম বাতাসের স্থিতিস্থাপকতা আবিষ্কার করেন। এ ছাড়া তিনি ঘনীভূত বাতাস ব্যবহার করে বেশ কিছু যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। ঘনীভূত বাতাসের শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরের বিদ্যাকে Pneumatics বা বায়ুবিদ্যা বলা হয়। এজন্য অনেকে তাকে বায়ুবিদ্যার জনক বলেন। বাতাসের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি ফোর্স পাম্প এবং এক ধরনের গুলতি বানিয়েছিলেন। তিসিবিওসের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ জলঘড়ির উন্নতি সাধন। জলঘড়ি তার অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। সবচেয়ে সাধারণ জলঘড়ি দুটি পাত্রের মাধ্যমে কাজ করে। একটি পানিপূর্ণ পাত্র আরেকটি শূন্য পাত্রের একটু উপরে রাখা হয়, পানিপূর্ণ পাত্রের নিচের দিকে একটি ছিদ্র থাকে যা দিয়ে নিচের পাত্রে পানি পড়ে। নিচের পাত্রে পানির স্তর কতটুকু বৃদ্ধি পাচ্ছে তার মাধ্যমে সময় গণনা করা হয়। কিন্তু এটি কোনো ধ্রুব সময় গণক ছিল না। কারণ উপরের পাত্রে পানি বেশি থাকলে চাপ বেশি হবে এবং সে কারণে পানির বেগও বেশি হবে। কিন্তু উপরের পাত্রের পানির স্তর যত কমতে থাকবে পানির বেগও তত কমতে থাকবে। এ কারণে জলঘড়ির পানিকে সময়ের পরিমাপক হিসেবে ব্যবহার করলে বলতে হবে, সময় শুরুর দিকে বেশি দ্রুত চলে। এখান থেকেই বোধহয় 'সময় গড়িয়ে যাচ্ছে' বা 'সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে' বাগধারার উদ্ভব। পানির মাধ্যমে ধ্রুব সময় পরিমাপের জন্য তিসিবিওস উপরের পাত্রে পানির স্তর সর্বদা সমান রাখার কৌশল উদ্ভাবন করেন এবং এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে জটিল থেকে জটিলতর জলঘড়ি নির্মাণ করেন। নিচের পাত্রের গায়ে পানির স্তর নির্দেশক কাঁটা জুড়ে দিয়ে তিনি সময় (ঘণ্টা, দিন, মাস, বছর) প্রদর্শনেরও ব্যবস্থা করেন।

হেরন অফ আলেকজান্দ্রিয়া: (হিরো অফ আলেকজান্দ্রিয়া, ১০-৭০ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন গণিতজ্ঞ ও যন্ত্রবিদ। প্রাচীন মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসী ছিলেন এবং এখানেই তার কর্মতৎপরতা অব্যাহত রেখেছিলেন। খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে মিশরের রাজধানী আলেকজান্দ্রিয়া গ্রিক প্রভাবিত বিজ্ঞান ও শিল্পকলার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। এখানকার বিজ্ঞান কেন্দ্রটি উৎসর্গ করা হয়েছিল সংগীতের দেবীদের নামে। এই কেন্দ্রে ছিল বিরাট পাঠাগার, জাদুঘর ও সভাগৃহ। হেরন এই কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে মনে করা হয়। হেরনের প্রধান খ্যাতি বাষ্পীয় ইঞ্জিনের নির্মাতা হিসেবে যা তখন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়নি এবং তার প্রায় ১৮০০ বছর পর এই ধরনের টারবাইনের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে তিনি চারটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রেখে গেছেন, যার মধ্যে মেট্রিকা, মেকানিক্স ও নিউম্যাটিক্স সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এসব গ্রন্থে তিনি আলোচনা করেছেন সংখ্যা এবং ত্রিভুজ তল শঙ্কু ও ধরাকৃতি প্রসঙ্গে, বেগসামান্তরিক ভারকেন্দ্র, বায়ুর ঘনত্ব ও সংনমন এবং লিভার ও গিয়ার সম্পর্কে। আলোচনা করেছেন পাম্প সাইফন টারবাইন ও বিবিধ স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র বিষয়েও। তার এসব গ্রন্থ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছিল।

ব্লেইজ প্যাসকেল: (Blaise Pascal 1623-1662) একজন ফরাসি গণিতজ্ঞ, পদার্থবিদ, উদ্ভাবক ও দার্শনিক। প্রথাগত কোনো বিজ্ঞানশিক্ষা না পেলেও গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় তার অত্যন্ত মৌলিক অবদান রয়েছে। তিনি বায়ুর ওজন ও চাপের এবং শূন্যস্থানের অস্তিত্বের পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেন। তরল পদার্থের সুস্থিতি নিয়ে অনুশীলন করে তিনি এই সূত্র রচনা করেন যে, স্থির কোনো তরলের অভ্যন্তরে যেকোনো বিন্দুতে তরলের চাপ প্রতিটি অভিমুখেই সমান হয়ে থাকে, যা প্যাসকেলের সূত্র নামে পরিচিত। যন্ত্রগণকসহ নানা প্রকারের যন্ত্রও তিনি উদ্ভাবন করেছিলেন। দর্শনের আলোচনায় তিনি ব্যক্তি-প্রবণতাকে গাণিতিক ও স্বজ্ঞাত এই দুই ভাগে ভাগ করেন এবং একই ব্যক্তি বা আধারে এই দুইয়ের সহাবস্থান নিতান্ত বিরল বলে মত দেন।

১৬৪৬ সালে ব্লেইজ প্যাসকেল এবং তার বোন জ্যাকুইলিন ক্যাথলিক ধর্মীয় আন্দোলনে যুক্ত হন এবং সেন্ট অগাস্টিনের কথিত শিক্ষাকে ভিত্তি করে জেসুইট-বিরোধী এক ধর্মীয় শাখা প্রতিষ্ঠায় তৎপর হন। ১৬৫১ সালে তার পিতা মারা যান। ১৬৫৪ সালের শেষের দিকে তিনি রহস্যময় কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তার বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে শুরু করেন জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়, নিজেকে নিয়োজিত করেন দর্শন ও ধর্মতত্ত্বে। এই সময় তিনি পাটিগাণিতিক ত্রিভুজের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ লেখেন। ১৬৫৮ ও ১৬৫৯ সালের মধ্যে তিনি বৃত্ত নিয়ে লেখেন এবং বিভিন্ন কঠিন বস্তুর আয়তন নির্ণয়ে তার প্রয়োগ আলোচনা করেন।

প্যাসকেলের জন্ম হয়েছিল এক অত্যন্ত অভিজাত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারে। শৈশব থেকেই তার স্বাস্থ্য খারাপ ছিল এবং তার বিস্ময়কর প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছিল। তার কোনো কোনো গবেষণার ফল প্রায় দেড়শ বছর পরও ব্যবহারিক প্রয়োগ পেয়েছে। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার অসমাপ্ত সাহিত্যকর্ম Pensées ১৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। তরলের চাপের আন্তর্জাতিক একককে তার নামানুসারে নামাঙ্কিত করা হয়েছে।

আল-হামদানি : আবু মুহাম্মাদ আল-হাসান ইবনে আহমাদ ইবনে ইয়াকুব আল-হামদানি (২৮০-৩৩৪ হি./৮৯৫-৯৪৫ খ্রি.) ছিলেন পশ্চিম আমরান/ইয়ামেনের বনু হামদান গোত্রের মানুষ। তিনি একাধারে ভূগোলবিদ, কবি, রসায়নবিদ, ব্যাকরণবিদ, ঐতিহাসিক, ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি ছিলেন আব্বাসি খিলাফতের শেষ সময়কার ইসলামি সংস্কৃতির একজন শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। তার যথেষ্ট পরিমাণ বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড থাকা সত্ত্বেও আল-হামদানির জীবনকাহিনি সম্বন্ধে খুব কমই জানা যায়। তিনি ব্যাকরণবিদ হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন বেশি, তা ছাড়া তিনি অনেক কবিতা লিখে গেছেন, জ্যোতির্বিদ্যার ছক প্রণয়ন করেছেন এবং তার জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আরবের প্রাচীন ইতিহাস এবং ভূগোল সম্পর্কে জানতে অতিবাহিত করেছেন। তার জন্মের পূর্বে তার পরিবার আল-মারশিতে বসবাস করত। সেখান থেকে তারা সানআয় চলে আসে, এখানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন পরিব্রাজক এবং তিনি কুফা, বাগদাদ, বসরা, ওমান ও মিশর ভ্রমণ করেন। সাত বছর বয়স থেকেই আল-হামদানি ভ্রমণের কথা বলতেন। পরে প্রথমে তিনি মক্কায় ভ্রমণ করেন এবং সেখানে ছয় বছর পড়াশোনা করে কাটান। তারপর মক্কা ত্যাগ করে সাদাহর উদ্দেশে যাত্রা করেন। এখানে তিনি খাওলান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। পরবর্তীকালে আল-হামদানি সানআয় ফিরে আসেন এবং হিময়ার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। এ সময় তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তাকে দুই বছর কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। কারামুক্তির পর তার গোত্রের প্রতিরক্ষার জন্য তিনি রাইদাতে যান। এখানেই তিনি তার বেশিরভাগ গ্রন্থ সংকলন করেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এখানেই বসবাস করেন।
তার সম্পাদিত আরব উপদ্বীপের ভূগোল (সিফাতু জাযিরাতিল আরব) হচ্ছে এই বিষয়ের ওপর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি।
অস্ট্রিয়ান প্রাচ্যবিদ আলয়েস স্প্রেঙ্গার তার গবেষণাগ্রন্থ Post-und Reiserouten des Orients (লাইপ্‌সিশ, ১৮৬৪)-এ এবং Alte Geographie Arabiens (বের্ন, ১৮৭৫) নামে আরেকটি গ্রন্থে আল-হামদানির পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছেন।
আল-হামদানির অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কর্মের মধ্যে রয়েছে 'ইকলিল' (মুকুট)। এটি হিময়ারিদের বংশবৃত্তান্ত ও তাদের রাজাদের যুদ্ধবিগ্রহ নিয়ে দশ খণ্ডে রচিত। গ্রন্থটির অষ্টম খণ্ড দক্ষিণ আরবের নগরদুর্গ ও প্রাসাদসমূহের ওপর লিখিত। এটি ডি. এইচ. মুলার কর্তৃক জার্মান ভাষায় Die Burgen und Schlösser Sudarabiens (ভিয়েনা, ১৮৮১) নামে অনূদিত ও সম্পাদিত। আল-হামদানির রচিত অন্যান্য গ্রন্থের তালিকা গুস্তাভ লেবারেষ্ট ফুগেলের Die grammatischen Schulen der Araber (লাইপ্‌সিশ, ১৮৬২) পৃ. ২২০-২২১-এ পাওয়া যাবে।

টিকাঃ
৩০৪. মূল গ্রিক থেকে আরবিতে অনুবাদ করেছেন ইসহাক ইবনে হুনাইন।
৩০৫. হেরন আলেকজান্দ্রিয়া: একজন গ্রিক মিশরীয় গণিতবিদ, প্রকৌশলী।
৩০৬. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ১১৫।
৩০৭. রিহাব খিদির আকাবি, মাওসুআতুল আবাকিরাতুল ইসলাম, খ. ৪, পৃ. ৫৭।
৩০৮. আল-মওসুআতুল আরাবিয়্যাতুল আলামিয়্যা, http://www.alargam.com/general/arabsince/7.htm
৩০৯. আপেক্ষিক গুরুত্ব: আপেক্ষিক গুরুত্ব কোনো বস্তুর ঘনত্ব এবং অন্য একটি প্রসঙ্গ-বস্তুর ঘনত্বের অনুপাত অথবা কোনো বস্তুর ভর এবং একই আয়তনের অন্য একটি প্রসঙ্গ-বস্তুর ভরের অনুপাতকে বোঝায়। আপাত আপেক্ষিক গুরুত্ব হচ্ছে কোনো বস্তুর ওজন এবং সমান আয়তনের অন্য একটি প্রসঙ্গ-বস্তুর ওজনের অনুপাত। তরল পদার্থের ক্ষেত্রে প্রায় সবসময় প্রসঙ্গ-বস্তু হিসেবে সবচেয়ে ভারী অবস্থার পানি (৪° সে. অথবা ৩৯.২° ফা.) এবং গ্যাসীয় পদার্থের ক্ষেত্রে কক্ষ তাপমাত্রার বাতাস নেওয়া হয় (২০° সে. অথবা ৬৮° ফা.)। দুটি উপাদানের জন্যই তাপমাত্রা ও চাপ নির্দিষ্ট থাকতে হবে।
৩১০. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ১৮৬; মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ১৩৩।
৩১১. আল-খাযিনি: আবুল ফাতহ আবদুর রহমান আল-খাযিন অথবা আল-খাযিনি। জ্যোতির্বিদ, প্রকৌশলী। সেলজুক সুলতান আহমাদ সানজার (১০৮৫-১১৫৭ খ্রি.)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি যে জ্যোতিষ্কসারণি (Ephemeris) তৈরি করেছিলেন তা গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্যায় এক মহান কীর্তি। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ الزيج السنجري، رسالة الفعلات، ميزان الحكمة ل। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ৩০৫।
৩১২. স্লোপ: ভূপৃষ্ঠ বা অন্য কোনো সমতলপৃষ্ঠ বরাবর ৯০° ডিগ্রি অপেক্ষা কম কৌণিক অবস্থান বা দিক; ঢাল।-অনুবাদক।
৩১৩. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, আল-উলুমুল বাহতাতি ফিল-হাদারাতিল আরাবিয়্যা ওয়াল-ইসলামিয়্যা, পৃ. ৩৩১।
৩১৪. আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদান এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে আবহমণ্ডলের চাপ মাপার যন্ত্রবিশেষ; আবহমানযন্ত্র।
৩১৫. যে যন্ত্র ধূলি-ময়লা ইত্যাদি শুষে নেয়।
৩১৬. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, আল-উলুমুল বাহতাতি ফিল-হাদারাতিল আরাবিয়্যা ওয়াল-ইসলামিয়‍্যা, পৃ. ৩৩১।
৩১৭. First law: In an inertial frame of reference, an object either remains at rest or continues to move at a constant velocity, unless acted upon by a force.
৩১৮. দেখুন, আল-ইশারাত ওয়াত তানবিহাত, সম্পাদনা, সুলাইমান দিনা, দারুল মাআরিফ, মিশর, পৃ. ২৮৩-২৮৪।-অনুবাদক।
৩১৯. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৯০।
৩২০. হাসান ইবনে আহমাদ আল-হামদানি, الجوهرتين العتيقتين المائعتين من الصفراء والبيضاء, অনুবাদক, আহমাদ ফুয়াদ পাশা। উদ্ধৃতি, আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৯০।-অনুবাদক
৩২১. বিভব শক্তির পরিমাণ ভূপৃষ্ঠ থেকে বস্তুর উচ্চতার ওপর নির্ভর করে। উচ্চতা যত বেশি, বিভব শক্তি তত বেশি। একইভাবে বস্তুর ভরের ওপরও নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, কোনো ২ কেজি ভরের বস্তুকে অভিকর্ষ বলের বিরুদ্ধে যদি ভূমি থেকে ৫ মিটার উচ্চতায় তোলা হয় তবে বস্তুটিকে ওই উচ্চতায় ওঠানোর ফলে ৯৮ জুল পরিমাণ বিভব শক্তি জমা হবে। যার ব্যাখ্যা নিম্নরূপ: সম্পাদিত কাজ=বল × সরণ = ভর × ত্বরণ × সরণ; অভিকর্ষজ ত্বরণ = ৯.৮ মিটার/বর্গসেকেন্ড; ভর=২ কেজি; সরণ=৫ মিটার; সুতরাং, সম্পাদিত কাজ = ২ × ৫ × ৯.৮ = ৯৮ জুল। অর্থাৎ, বস্তুটিতে ৯৮ জুল পরিমাণ বিভব শক্তি জমা হবে। এখন বস্তুটিকে অভিকর্ষের প্রভাবে মুক্তভাবে পড়তে দেওয়া হলে এর বিভব শক্তি ভূমিস্পর্শের আগেই অন্যান্য শক্তিতে রূপান্তরিত হতে থাকবে। বিভব শক্তি গতিশক্তি, আলো, তাপ, শব্দ, তড়িৎ ইত্যাদি শক্তিতে রূপান্তরযোগ্য। জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে পানির বিভব শক্তিকে গতিশক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়। গতিশক্তির সাহায্যে টারবাইনে ঘূর্ণন গতিশক্তির সৃষ্টি করা হয় এবং তা থেকে ডায়নামোর সাহায্যে তড়িৎশক্তি উৎপাদন করা হয়। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৩২২. বায়ুর বাধাহীন বা বায়ুশূন্য স্থানে।
৩২৩. বস্তুর ভর বেশি হলে তা দ্রুত পড়বে এবং ভর কম হলে হালকাভাবে পড়বে এমন নয়।
৩২৪. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৯১।
৩২৫. আকাশের দিকে একটি ঢিল ছুড়ে এ বিষয়টি পরীক্ষা করা যায়।
৩২৬. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৯২।
৩২৭. অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত (উইকিপিডিয়া)।

বিভিন্ন জাতি ও সভ্যতার উত্তরাধিকারের ওপর ভিত্তি করেই জ্ঞানবিজ্ঞানের সব শাখার উন্নতি ও বিকাশ ঘটে, তেমনই মুসলিমদের পদার্থবিজ্ঞানচর্চাও শুরুর দিকে গ্রিক রচনারাশির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এসব রচনায় গ্রিক বিজ্ঞানীরা কেবল দর্শনের ওপর নির্ভরশীল থেকেছেন, দর্শনের মধ্য দিয়ে প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাদের প্রচেষ্টায় পরীক্ষানিরীক্ষার উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা ছিল না। মুসলিম বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে এই মৌলিক বিষয়টির বিকাশ ঘটিয়েছেন। তারা পদার্থবিজ্ঞানের ময়দানে অভূতপূর্ব যোগ্যতা ও মেধা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। যেন তারা বিজ্ঞানের একটি নতুন শাখার উদ্ভাবন ঘটিয়েছেন। কারণ মুসলিম বিজ্ঞানীরাই পদার্থবিজ্ঞানের ভিত পরীক্ষানিরীক্ষা ও এক্সপেরিমেন্টের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তারা শুধু দর্শন ও চিন্তাভাবনার ওপর নির্ভরশীল হননি।

মুসলিম বিজ্ঞানীরা নতুন থিউরি ও সূত্র প্রদান করেছেন এবং উদ্ভাবনমূলক গবেষণায় ব্রতী হয়েছেন। যেমন গতিসূত্র (laws of motion), জলসূত্র (water resources law), মহাকর্ষ নিয়ম (law of universal gravitation)। তা ছাড়া তারা খনিজ পদার্থ ও তরল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর (specific weight) নিয়ে গবেষণা করেছেন। তরল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর পরিমাপ করতে সক্ষম হয়েছেন। এটিকে বর্তমান যুগে বাস্তবধর্মী আধুনিক উপকরণ থাকা সত্ত্বেও কঠিন কাজ মনে করা হয়!

মুসলিম বিজ্ঞানীরা শুরুতে পূর্বসূরিদের গ্রন্থাবলির ওপর নির্ভর করেছেন। যেমন : ১. অ্যারিস্টটল কর্তৃক রচিত (كتاب الطبيعة)(৩০৪), এই গ্রন্থে তিনি গতিসূত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন। ২. আর্কিমিডিসের রচনাবলি, এসব রচনায় পানিতে ভাসমান বস্তু, কতিপয় পদার্থের নির্দিষ্ট ভর ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। ৩. তিসিবিওসের গ্রন্থাবলি, এসব গ্রন্থে পাম্প ও জলঘড়ির সূত্রাবলি রয়েছে। ৪. হেরন অব আলেকজান্দ্রিয়ার (৩০৫) গ্রন্থাবলি, যেখানে উত্তোলনযন্ত্র, চাকা ও কাজের সূত্র সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। (৩০৬)

মুসলিম বিজ্ঞানীরা অব্যাহতভাবে পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের পদার্থবৈজ্ঞানিক থিউরি ও সূত্রাবলির উন্নতি সাধন করেন, তারা এগুলোকে চিন্তাধারার পর্যায় থেকে প্রায়োগিক পরীক্ষানিরীক্ষার স্তরে নিয়ে আসেন। মূলত পরীক্ষানিরীক্ষাই পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি।

মুসলিম বিজ্ঞানীরা শব্দবিজ্ঞান, শব্দের সৃষ্টি ও স্থানান্তর নিয়ে গবেষণা করেন। তারাই প্রথম জানতে পারেন যে শব্দ-সৃষ্টিকারী বস্তুর কম্পন থেকে শব্দের (শব্দতরঙ্গের) সৃষ্টি হয় এবং গোলকাকৃতিতে ছড়িয়ে পড়া তরঙ্গরূপে বাতাসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। তারাই প্রথম শব্দকে কয়েক প্রকারে ভাগ করেন। বিভিন্ন প্রাণীর স্বর বা আওয়াজ কেন ভিন্ন হয় তারও কারণ বের করেন। গলার দীর্ঘতা, কণ্ঠনালির প্রশস্ততা ও স্বরযন্ত্রের গঠন ভিন্ন ভিন্ন হওয়ার কারণে স্বর বা আওয়াজেরও ভিন্নতা ঘটে। মুসলিম বিজ্ঞানীরাই প্রথম প্রতিধ্বনির কার্যকারণ ব্যাখ্যা করেন। তারা বলেন, তরঙ্গিত বায়ু (শব্দতরঙ্গ) উঁচু কোনো প্রতিবন্ধকের, যেমন পাহাড় বা দেয়ালের সঙ্গে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উলটে গেলে (ফিরে এলে) প্রতিধ্বনির সৃষ্টি হয়। (প্রতিবন্ধক বস্তুর) নৈকট্যের কারণে প্রতিধ্বনির শ্রুতি-অনুভূতি নাও হতে পারে, শব্দের ও তার উলটে যাওয়ার সময়ের ব্যবধানের কারণেও প্রতিধ্বনির শ্রুতি-অনুভূতি হয় না। (৩০৭)

তরল পদার্থ-সম্পর্কিত বিজ্ঞান সম্পর্কে বলতে গেলে বলা যায়, মুসলিম বিজ্ঞানীরা তরল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর পরিমাপের পদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষ গবেষণামূলক রচনাবলি লিখেছেন। তারা খনিজ পদার্থ উত্তোলনের বেশ কিছু পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, কিছু উপাদানের ঘনত্ব নিরূপণে সক্ষম হয়েছেন। তাদের হিসাব ও পরিমাপ ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং বর্তমান সময়ে যে পরিমাপ রয়েছে তার অনুরূপ অথবা কিছুটা ভিন্ন। (৩০৮)

মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে যারা পদার্থবিজ্ঞানে সুনাম কুড়িয়েছেন তাদের অন্যতম হলেন আবু রাইহান আল-বিরুনি। তিনি আঠারো প্রকারের বহুমূল্য পাথরের আপেক্ষিক গুরুত্ব (Specific Gravity) নিরূপণ করেন। তিনি এই সূত্র প্রদান করেন যে, বস্তুর আপেক্ষিক গুরুত্ব, তা যতটুকু পানি সরিয়ে দেয় তার আয়তনের সঙ্গে সমানুপাতিক। (৩০৯) আল-বিরুনি সংযোগযুক্ত পাত্রের (Communicating vessels) সূত্র থেকে প্রাকৃতিক ঝরনা এবং আর্তের্জীয় কূপ (Artesian aquifer) থেকে পানি-প্রবাহের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করেন। (৩১০)

আল-খাযিনি (৩১১) পদার্থবিজ্ঞানের ময়দানে নতুন কিছু উদ্ভাবন করেছেন। তিনি বিশেষ করে গতিবিদ্যা (Dynamics) ও জলস্থিতিবিদ্যায় (hydrostatics/তরল পদার্থের স্থিতিবিজ্ঞান) বিস্ময়কর অবদান রেখেছেন। যা তার পরবর্তী গবেষকদের হতবাক করে দিয়েছে। গতিবিদ্যার ময়দানে বর্তমান সময়েও তার থিউরিগুলো বিদ্যালয়ে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। এসব থিউরির মধ্যে অন্যতম হলো স্লোপ (Slope/gradient) (৩১২) থিউরি ও ইমপাল্স (Impulse/physics) থিউরি। এই দুটি থিউরি গতিবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অনেক ঐতিহাসিক আল-খাযিনিকে সকল যুগের পদার্থবিজ্ঞানের গুরু বলে গণ্য করেছেন। আল-খাযিনি তার অধিকাংশ সময় স্থির তরল পদার্থ বিষয়ে গবেষণা করে কাটিয়েছেন। তিনি তরল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর জানার জন্য একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন। কোনো কঠিন বস্তুকে তরল পদার্থে নিমজ্জিত করা হলে তা তার নিচ থেকে উপর পর্যন্ত কতটুকু তরলকে সরিয়ে দেবে তা নিয়ে তিনি তার গবেষণায় আলোচনা করেছেন। আল-খাযিনির মহান শিক্ষক আবু রাইহান আল-বিরুনি কতিপয় কঠিন ও তরল পদার্থের আপেক্ষিক গুরুত্ব নির্ধারণে যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, তিনিও ওই একই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। আল-খাযিনি আপেক্ষিক গুরুত্ব পরিমাপে নির্ভুলতার বা যথার্থতার একটি বড় পর্যায়ে পৌঁছেছেন, যা তার সামসময়িক বিজ্ঞানীদের ও তাদের অনুসারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। (৩১৩)

আমেরিকান পদার্থবিদ রবার্ট এন. হল বিজ্ঞানী চরিতাভিধানে আল-খাযিনি সম্পর্কিত একটি প্রবন্ধে কঠিন ও তরল পদার্থের আপেক্ষিক গুরুত্ব আবিষ্কারে আল-খাযিনির পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি যে বাতাসে ও পানিতে বস্তুর ভর নিরূপণের স্কেল আবিষ্কার করেছিলেন তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এটির পাঁচটি পাল্লা ছিল, যার একটি পর্যায়ক্রমিক বাহুর ওপর চলমান থাকত। হামিদ মুরানি ও আবদুল হালিম মুনতাসির উভয়ে তাদের রচিত গ্রন্থ فى تاريخ العلوم عند العرب - قراءات فى -এ বলেছেন, ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ টরিসেলি (Evangelista Torricelli)-এর বহু পূর্বেই আল-খাযিনি বায়ুর উপাদান ও ওজন নির্দেশ করেছেন। তিনি নির্দেশ করেছিলেন যে, বায়ুরও তরল পদার্থের মতো ওজন ও ঊর্ধ্বমুখী চাপ রয়েছে। বায়ুপূর্ণ স্থানে বস্তুর ভর তার প্রকৃত ভরের চেয়ে কম, প্রকৃত ভরের চেয়ে কতটুকু কম তা নির্ভর করে বায়ুর ঘনত্বের ওপর। আল-খাযিনি আরও ব্যাখ্যা করেছেন যে, আর্কিমিডিসের সূত্র কেবল তরল পদার্থের ক্ষেত্রে নয়, বরং তা গ্যাসীয় পদার্থের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ ধরনের গবেষণাই ব্যারোমিটার (৩১৪), শোষকল (air vacuums) (৩১৫) ও পাম্প আবিষ্কারের পথ সহজ করে দিয়েছিল। পদার্থবিজ্ঞানে এসব অবদান রাখার কারণেই আল-খাযিনি টরিসেলি, ব্লেইজ প্যাসকেল, রবার্ট বয়েল (৩১৬) ও অন্যান্য বিজ্ঞানীর অগ্রগামী মনীষী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় গতিসূত্রাবলিও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব সূত্র আবিষ্কারে মুসলিম বিজ্ঞানীদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। নিচে তা আলোচনা করছি।

### গতিসূত্র
গতিসূত্রসমূহ এতটাই গুরুত্ব রাখে যে তা আধুনিক সভ্যতার মেরুদণ্ড হিসেবে গণ্য হয়। বর্তমান যুগের প্রতিটি চলমান যন্ত্র-গাড়ি, রেলগাড়ি, উড়োজাহাজ থেকে শুরু করে স্পেস মিসাইল, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মিসাইল, বরং সব গতিশীল যন্ত্রের কার্যপ্রণালি গতিসূত্রের ওপর নির্ভরশীল। গতিসূত্রসমূহের ওপর ভিত্তি করেই মানুষ মহাশূন্যে অভিযান পরিচালনা করেছে এবং চাঁদের পৃষ্ঠে নামতে পেরেছে। তা ছাড়া গতিসূত্রাবলি গতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল পদার্থবিজ্ঞানের সব শাখার মূল ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়। আলোকবিজ্ঞান মানে আলোর সঞ্চরমান তরঙ্গ, স্বর বা আওয়াজ মানে প্রবহমান শব্দতরঙ্গ, বিদ্যুৎ বা ইলেকট্রিসিটি হলো ইলেকট্রনের তরঙ্গ ইত্যাদি।

পশ্চিমে ও প্রাচ্যে সকল মানুষের কাছে এটাই কিংবদন্তি যে, গতিসূত্রসমূহের আবিষ্কারক হলেন ইংরেজ পদার্থবিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন। তার ফিলসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা (লাতিন ভাষায় Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica, ইংরেজি ভাষায় Mathematical Principles of Natural Philosophy) গ্রন্থটি প্রকাশের পর থেকেই এই কিংবদন্তির সূচনা হয়।
এটিই গোটা বিশ্বে সুবিদিত সত্যে পরিণত হয়। বিজ্ঞানের গ্রন্থাবলিতেও এ তথ্য ব্যবহৃত হয়। স্বাভাবিকভাবেই মুসলিমদের বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ও বাদ যায় না। বিংশ শতাব্দীর সূচনাকাল পর্যন্ত এই কিংবদন্তিই চালু ছিল। এই সময় সামসময়িক কতিপয় মুসলিম পদার্থবিজ্ঞানী বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। তাদের মধ্যে অগ্রগামী ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মুস্তাফা নাজিফ, যন্ত্র-প্রকৌশলের অধ্যাপক ড. জালাল শাওকি, গণিতের অধ্যাপক ড. আলি আবদুল্লাহ দাফফা প্রমুখ। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইসলামি পাণ্ডুলিপিসমূহে যা-কিছু ছিল তা তারা পর্যাপ্ত অধ্যয়ন করেন। তারা আবিষ্কার করেন যে গতিসূত্রাবলি আবিষ্কারের প্রকৃত কৃতিত্ব মুসলিম বিজ্ঞানীদেরই। এই ক্ষেত্রে নিউটনের ভূমিকা ও কৃতিত্ব এই যে, তিনি এসব নিয়মের উপাদান সংগ্রহ করেন, সেগুলোকে সূত্রাবদ্ধ করেন এবং গাণিতিক কাঠামোতে সংজ্ঞায়িত করেন।

আবেগ ও তাত্ত্বিক বক্তৃতা বাদ দিয়ে বলা যায়, গতিসূত্রের ক্ষেত্রে মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টা স্পষ্ট ও দ্বিধাহীন। তাদের পাণ্ডুলিপিতে অসংখ্য নির্ভরযোগ্য ও অকাট্য বক্তব্য রয়েছে যা এই সত্যকে প্রতিভাত করে। এসব পাণ্ডুলিপি তারা রচনা করেছেন নিউটনের আবির্ভাবের সাতশ বছর আগে। ওইসব অকাট্য বক্তব্যের আলোকেই আমরা উপর্যুক্ত সত্যের মীমাংসা করব।

*প্রথম গতিসূত্র
পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম গতিসূত্রটি বোঝায় যে, কোনো (স্থির) বস্তুর ওপর আঘাতকারী বলের (শক্তির) গোটা পরিমাণ যদি শূন্য হয় তাহলে ওই বস্তু স্থিরই থাকবে। অর্থাৎ, কোনো ধরনের আঘাতকারী বল না থাকা অবস্থায় গতিশীল বস্তু সমবেগে (সরলরেখায়) গতিশীলই থাকবে। যেমন ঘর্ষণশক্তি (friction forces)। নিউটন গাণিতিক কাঠামোতে নিয়মটি সূত্রাবদ্ধ করেছেন এভাবে, বাহ্যিক কোনো বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকবে এবং গতিশীল বস্তু চিরকাল সুষম গতিতে সরল পথে চলতে থাকবে। (৩১৭)

এখন প্রথম গতিসূত্রের ক্ষেত্রে মুসলিম বিজ্ঞানীদের ভূমিকা কী সেই প্রসঙ্গে আসি। মহান মনীষী ইবনে সিনা তার আল-ইশারাত ওয়াত তানবিহাত গ্রন্থে বলেছেন, তোমরা অবশ্য জানো যে, বস্তুকে তার অবস্থায় ছেড়ে দিলে, তার ওপর বাইরে থেকে কোনো বল (শক্তি) প্রয়োগ করা না হলে, তা নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট অবস্থাতেই থাকবে। কারণ, বস্তুর প্রকৃতির মধ্যেই গতি বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার ধর্ম বিদ্যমান। বস্তুর সংরোধ (Impedance) এ কারণে নয় যে তা বস্তু, বরং এই অর্থে যে তা তার নিজের অবস্থায় অপরিবর্তনশীল থাকতে চায়) (৩১৮)

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি থেকে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয় যে, প্রথম গতিসূত্র সম্পর্কে ইবনে সিনা যা বলেছেন তা আইজ্যাক নিউটন যা বলেছেন তার থেকে অনন্য, যদিও নিউটন ইবনে সিনার ছয়শ বছর পরে এসেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, বস্তু স্থির অবস্থায় থাকবে অথবা সুষম গতিতে সরলরেখায় চলমান থাকবে, যতক্ষণ বাহ্যিক কোনো বল (শক্তি) এই অবস্থার পরিবর্তনে বস্তুকে বাধ্য না করবে। অর্থাৎ, ইবনে সিনাই প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রথম গতিসূত্র আবিষ্কার করেছেন!

* দ্বিতীয় গতিসূত্র
এই নিয়ম বস্তুর ওপর প্রযুক্ত বল ও বস্তুর গতির ওপর প্রযুক্ত বলের প্রভাবকে বোঝায়। যখনই কোনো বস্তুর ওপর বল প্রয়োগ করা হবে তা ওই বস্তুর গতির পরিবর্তন ঘটাবে। হয় গতি বাড়াবে, না হয় কমাবে, অন্তত গতি দিক পরিবর্তন করবে। এটি ত্বরণ নামে পরিচিত। দ্বিতীয় নিয়মটিকে এভাবে লেখা যেতে পারে, বল = ভর × ত্বরণ। কোনো বস্তুর ত্বরণ সেই বস্তুর ওপর প্রযুক্ত বলের সঙ্গে সমানুপাতিক ও বল যেদিকে ক্রিয়া করে বস্তুর বেগের পরিবর্তন সেদিকেই ঘটে।

নিউটন গাণিতিক আকারে উপর্যুক্ত নিয়মটিকে সূত্রাবদ্ধ করেছেন এভাবে, বস্তুর গতির পরিবর্তনের জন্য প্রযুক্ত বল ওই বস্তুর ভর ও ত্বরণের সঙ্গে সমানুপাতিক। তাই ওই বলকে পরিমাপ করা হয় এভাবে, বল = ভরের সঙ্গে ত্বরণের গুণফল। অর্থাৎ, বস্তুর ওপর বলের প্রয়োগ (ক্রিয়া বা ঝোঁক) যেদিকে ঘটে ওই বস্তুর ত্বরণ বা গতিবেগের পরিবর্তনও সেদিকে ঘটে।
মুসলিম বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে কী বলেছেন সে কথায় আসি। উদাহরণত, হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা আল-বাগদাদি (৪৮০-৫৬০ হি./১০৮৭-১১৬৪ খ্রি.) কী বলেছেন তা লক্ষ করুন। তিনি তার আল-মুতাবার ফিল-হিকমা কিতাবে বলেছেন, বস্তুর গতিবেগের প্রতিটি পরিবর্তন ঘটে অবশ্যই একটি সময়খণ্ডে, তীব্রতর বল বস্তুর গতিবেগের পরিবর্তন ঘটায় তীব্রভাবে এবং সংকুচিত সময়ে। বল যত তীব্র হবে বস্তুর গতিও (ত্বরণও) তত তীব্র হবে এবং সময় হবে সংকুচিত। বলের তীব্রতা না কমলে ত্বরণের তীব্রতাও কমবে না (ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে)। তখন বস্তুর গতিবেগের পরিবর্তন ঘটবে তীব্র সময়হীনতায়। কারণ গতির পরিবর্তন বা ত্বরণের ক্ষেত্রে সময়ের সংকোচন যারপরনাই হতে পারে। হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকার গ্রন্থের চতুর্দশ অধ্যায়ের নাম ‘শূন্যস্থান’। এই অধ্যায়ে তিনি বলেছেন, বলের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ত্বরণও বৃদ্ধি পায়। তাই বস্তুর ওপর প্রযুক্ত বল যত বাড়বে গতিশীল বস্তুর ত্বরণও তত বাড়বে এবং সুনির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রমণের ফলে সময় সংকুচিত হয়ে পড়বে। আইজ্যাক নিউটন এই বক্তব্যকেই তার গাণিতিক কাঠামোতে সাজিয়েছেন এবং তার নাম দিয়েছেন গতির দ্বিতীয় সূত্র!

* তৃতীয় গতিসূত্র
এই সূত্র বোঝায় যে, যদি দুটি কণা (বস্তু) মিথস্ক্রিয়া বা পারস্পরিক ক্রিয়া করে, তাহলে প্রথম কণাটি দ্বিতীয় কণার ওপর যে বলের দ্বারা ক্রিয়া করবে তাকে ক্রিয়া (Action Force) বলে এবং তা পরম মানের (absolute value) সমান এবং বিপরীত দিকে দ্বিতীয় কণা প্রথম কণার ওপর যে বলের দ্বারা ক্রিয়া করবে তাকে প্রতিক্রিয়া (Reaction Force) বলে। নিউটন এই নিয়মকে তার গাণিতিক কাঠামোতে সূত্রাবদ্ধ করেছেন এভাবে, সকল ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

নিউটনের কয়েক শতাব্দী পূর্বে আবুল বারাকাত হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা তার আল-মুতাবার ফিল-হিকমা গ্রন্থে যা বলেছেন, একটি গোলাকার রিং ধরে দুইজন প্রতিযোগী দুইপাশ থেকে টানছে, অর্থাৎ, দুইজন প্রতিযোগীর মধ্যে টানাটানিযুক্ত রিং রয়েছে। এখানে প্রত্যেক প্রতিযোগীর রিং টানার ক্ষেত্রে অপর প্রতিযোগীর শক্তির প্রতিরোধমূলক শক্তি রয়েছে। টানাটানিতে একজন প্রতিযোগী বিজয়ী হলে এবং রিংটিকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসতে পারলে তার অর্থ এটা দাঁড়ায় না যে, রিংটি অপর প্রতিযোগীর টানশক্তি থেকে মুক্ত। বরং ওই শক্তি পরাজিতরূপে বিদ্যমান। ওই শক্তি যদি না-ই থাকত তাহলে বিজয়ী প্রতিযোগীর রিং টানার প্রয়োজনই পড়ত না।

ইমাম ফখরুদ্দিন আল-রাযির রচনাবলিতেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। তিনি তার আল-মাবাহিসুল মাশরিকিয়্যা ফি ইলমিল ইলাহিয়্যাতি ওয়াত তাবিইয়্যাত গ্রন্থে বলেছেন, যে রিংটিকে দুইজন সমান শক্তিশালী প্রতিযোগী নিজের দিকে টানে তা মধ্যবর্তী স্থানে স্থির থাকে। কোনো সন্দেহ নেই যে, রিংয়ের ওপর প্রত্যেক প্রতিযোগী অপর প্রতিযোগীর বিপরীতমুখী বল বা শক্তি প্রয়োগ করে তাকে অকেজো করে দিচ্ছে।

বরং হাসান ইবনুল হাইসামেরও এই ক্ষেত্রে অবদান রয়েছে। তিনি তার ‘আল-মানাযির’ গ্রন্থের চতুর্থ মাকালার (প্রবন্ধের) তৃতীয় অধ্যায়ে বলেছেন, যদি গতিশীল বস্তু বাহ্যিক প্রতিবন্ধক দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয় এবং বাধাগ্রস্ত হওয়ার সময়ে তার চালক-বল (Driving Force) তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলে তা যেখান থেকে গতিশীল হয়েছিল সেদিকেই ফিরে আসবে। ফিরে আসার ক্ষেত্রে বস্তুটির ভরবেগ (Momentum) তার প্রথমবারের চালক-বল ও প্রতিবন্ধক বল অনুসারে কাজ করবে।

সুতরাং, কোনো সন্দেহ নেই যে, মুসলিম বিজ্ঞানীরা এসব উদ্ধৃতিতে যা বলেছেন তা-ই তৃতীয় গতিসূত্রের মূল ভিত্তি। নিউটন সূত্রটির এসব উপাদান আয়ত্ত করে তা নিজের ভাষায় প্রকাশ করেছেন মাত্র।

# মহাকর্ষ সূত্র
পদার্থবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব (থিউরি) অর্থাৎ গতিসূত্রসমূহ আবিষ্কারে মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টা ও অর্জনের কথা উল্লেখ করা হলো। এগুলোর পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞানে মুসলিম বিজ্ঞানীদের আরও সব চমৎকার আবিষ্কার রয়েছে, যেগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এসব আবিষ্কার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরবর্তীকালের অন্য বিজ্ঞানীদের নামে চালু রয়েছে...। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মহাকর্ষ সূত্র। মহাকর্ষ সূত্রের গুরুত্ব এখানে নিহিত যে, এটি মহাজাগতিক বস্তুরাশি (তারকা ও নক্ষত্রপুঞ্জ)-কে একটি বন্ধনে আবদ্ধ রেখেছে এবং মহাকর্ষ বলের ফলেই সেগুলো নিজ নিজ কক্ষপথে সংগতি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করে চলমান রয়েছে। মহাকর্ষ আবিষ্কারের ফলেই বিজ্ঞানীরা বস্তু কেন জমিনের দিকে পতিত হয় তার রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে পেরেছেন। পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহ যে সূর্যের চারপাশে প্রায় বৃত্তাকার কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান রয়েছে তাও যথার্থভাবে বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। অর্থাৎ, ধরে নেওয়া হয়েছে যে, সূর্য ও গ্রহগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণই সূর্যকেন্দ্রিক ঘূর্ণনের কারণ।

প্রাচ্যে ও পশ্চিমে সাধারণ মানুষের কাছে এ কথা প্রচলিত এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এটা পড়েও থাকে যে, মহাকর্ষ সূত্রের আবিষ্কারক হলেন আইজ্যাক নিউটন। তিনি একদিন একটি আপেল গাছের নিচে বসে ছিলেন। তখন একটি আপেল তার গায়ের ওপর পড়ল। তখনই তিনি চিন্তা করতে শুরু করলেন আপেলটি কেন জমিনের দিকে পড়ল, কেন অন্যদিকে পড়ল না। এভাবে তিনি মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কার করেন এবং তার ফর্মুলা প্রস্তুত করেন। (মহাকর্ষের একটি বিশেষ উদাহরণ হলো মাধ্যাকর্ষণ বা অভিকর্ষ।) এই সূত্রের মূলকথা এই যে, প্রত্যেক বস্তু অপর বস্তুকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে এবং বস্তুর ভর ও দূরত্ব অনুযায়ী আকর্ষণ-বলে তারতম্য হয়ে থাকে।

কিন্তু এটাই কি সত্য? এটাই কি বাস্তবিক? বরং বিজ্ঞানের ক্রমসমৃদ্ধ ইতিহাস থেকে দৃঢ়ভাবে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, নিউটনের পক্ষে তার বিখ্যাত মহাকর্ষসূত্র আবিষ্কার করা সম্ভব হতো না—যেমনটা গতিসূত্র তিনটির ক্ষেত্রে হয়েছে—যদি না তিনি পূর্ববর্তী মহান বিজ্ঞানীদের কাঁধে ভর করতেন এবং দীর্ঘ সময়যাত্রা তাকে সহায়তা না করত। কারণ, এ ব্যাপারে কেউ সন্দেহ পোষণ করে না যে, পূর্ববর্তী মানুষেরা যেমন বস্তুর উপর থেকে নিচ দিকে পতন পর্যবেক্ষণ করেছেন তেমনই নিউটনও গাছ থেকে আপেলের পতন পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারপর তিনি বিদ্যমান তত্ত্বগুলো কাজে লাগিয়ে তা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা তার আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি গ্রন্থে এ বিষয়ে যে আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিয়েছেন তা থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বস্তুর বাধাহীন পতনের ব্যাখ্যায় তাত্ত্বিক প্রসার চালিয়েছিলেন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল। ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা এদিকে ইঙ্গিত করার পর বলেছেন, মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাদের সত্যধর্মের পথপ্রদর্শনের কল্যাণে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনে বিশুদ্ধ জ্ঞানগত পন্থা ও পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তাই তারা যেসব তত্ত্বের সত্যাসত্য বা শুদ্ধ্যশুদ্ধি পরীক্ষালব্ধ অভিজ্ঞতার দ্বারা যাচাই করা যায় সেগুলোর দার্শনিক প্রমাণাদি একেবারেই গ্রহণ করেননি। তারা উপলব্ধি করেছিলেন যে, মহাজাগতিক বস্তুরাশির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কতটা যথার্থ তা নিরূপিত হবে এসব বস্তুর আচরণের অন্তর্নিহিত বৈজ্ঞানিক সত্যের উন্মোচন কতটা ঘটেছে তার ওপর ভিত্তি করে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে মুসলিম বিজ্ঞানীরাই প্রথমবারের মতো অভিকর্ষের প্রভাবে বস্তুর অবাধ পতনের ব্যাখ্যার জন্য একটি গ্রহণযোগ্য ভিত্তি দাঁড় করিয়েছিলেন। (৩১৯)

আল-হামদানি (الجوهـرتين العتيقتين المائعتين من الصفراء والبيضاء) গ্রন্থে একটি বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এই বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূচনা করেছেন। তিনি ভূমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠে যে জলরাশি ও বায়ু রয়েছে তার সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, যারা পৃথিবীর নিচে (পৃথিবীর অপর পৃষ্ঠে) রয়েছে তারাও পৃথিবীর উপরে (এ পৃষ্ঠে) যারা রয়েছে তাদের মতো স্থির (ছিটকে যাচ্ছে না)। পৃথিবীর নিচের পৃষ্ঠে তাদের পতন ও স্থিরতা তাদের পৃথিবীর এ পৃষ্ঠে পতন এবং স্থিরতার মতোই, পৃথিবী যেন একটি ম্যাগনেটিক পাথর, তার শক্তি যেমন তার চারপাশের লোহাকে নিজ দিকে টানছে তেমনই পৃথিবীও তার চারপাশের সবকিছুকে নিজ দিকে টানছে... (৩২০)

এই ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে আল-হামদানি প্রথমবারের মতো পদার্থবিজ্ঞানে মহাকর্ষসূত্রের আংশিক সত্য প্রতিষ্ঠা করেন। এটা বিভব শক্তি বা পটেনশিয়াল এনার্জি (طاقة الموضع أو طاقة الكمون) নামে পরিচিত। যেমনটা ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা বলেছেন। ভূপৃষ্ঠ থেকে বস্তুর উচ্চতার ফলে বিভব শক্তির সৃষ্টি হয়। (৩২১) যদিও তিনি তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বলেননি। যে, বস্তুরাশি পরস্পরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে, তারপরও আল-হামদানির বক্তব্যই নিউটনের মহাকর্ষসূত্রের সামগ্রিক মৌল ভিত্তি।

চিত্র নং-৮ 'মিযানুল হিকমা'

আল-হামদানির পর এলেন আবু রাইহান আল-বিরুনি (৯৭৩-১০৫০ খ্রি.) এবং তিনি আল-হামদানির বক্তব্যকেই জোরালোভাবে সমর্থন করলেন যে, পৃথিবী তার উপরে যা-কিছু রয়েছে তার সবকিছুকে নিজের কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করছে। আবু রাইহান আল-বিরুনি তার القانون المسعودي গ্রন্থে এসব কথা বলেছেন। আল-খাযিনি তার 'মিযানুল হিকমা' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বস্তু তার নিজের শক্তিবলে অনবরত পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে আকর্ষিত হচ্ছে। একইভাবে আল-রাযিও বিশ্বনিখিলে উপস্থিত সকল বস্তুর আকর্ষণবলের বিষয়টি কাঠামোগতভাবেই চিন্তা করতে পেরেছিলেন।

তারপর আরও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল। হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা আল-বাগদাদি অ্যারিস্টটল যে ভ্রান্তিতে পতিত হয়েছিলেন তা সংশোধন করতে সক্ষম হলেন। অ্যারিস্টটল সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে, ভারী বস্তু হালকা বস্তুর চেয়ে দ্রুত পতিত হয়। কিন্তু তার এ সিদ্ধান্তটি ছিল ভুল। যদিও পরবর্তীকালে গ্যালিলিও এই গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সত্য প্রমাণ করেছিলেন। যে, মাধ্যাকর্ষণের প্রভাববলয়ে অবাধ (৩২২) পতনশীল বস্তুর ত্বরণ তার ভরের তারতম্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। (৩২৩) অর্থাৎ, যখন বস্তুর পতন যেকোনো বাহ্যিক বাধা থেকে মুক্ত থাকবে। (বাধামুক্ত অবস্থায় সব বস্তুই মাধ্যাকর্ষণের ফলে একইসঙ্গে ভূমিতে পতিত হবে।) হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা আল-মুতাবার ফিল-হিকমা গ্রন্থে তার নিজের ভাষায় এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে উন্মোচিত করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি শূন্যস্থানে (বায়ুহীন স্থানে) বস্তুর পতন ঘটে তাহলে ভারী ও হালকা বস্তুর পতন, বড় ও ছোট বস্তুর পতন, মোচাকৃতি বস্তুর চৌকো মাথায় পতন ও প্রশস্ত মাথায় পতন একইভাবে (একই সময়ে) ঘটবে। (এগুলোর ত্বরণে কোনো পার্থক্য ঘটবে না।) (বায়ুর বা জলের) বাধাযুক্ত স্থানে এসব বস্তুর পতনে তারতম্য ঘটে, কারণ বিদ্যমান প্রতিবন্ধকের বাধা পেরিয়ে এগুলোর পতন ঘটে। যেমন পানি, বায়ু বা অন্যকিছু বাধা তৈরি করে। (৩২৪) (ভারী বস্তু যত দ্রুত বাধা পেরোতে পারে, হালকা বস্তু তা পারে না।)

অন্যদিকে, হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা আল-বাগদাদি নিক্ষিপ্ত বস্তুর পতন নিয়ে গবেষণা করে মাধ্যাকর্ষণ বিষয়ে নতুন তথ্য সংযোজন করেছেন। অর্থাৎ, (উপর দিকে নিক্ষিপ্ত) বস্তুরাশির ঊর্ধ্বগমন মাধ্যাকর্ষণের বিপরীত কাজ করে অথবা যে বলের দ্বারা বস্তুকে উপর দিকে নিক্ষেপ করা হয়েছে তা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে বিপরীতমুখী ক্রিয়া করেছে। তিনি বলছেন, ...নিক্ষিপ্ত পাথরের মধ্যে যে আকর্ষণ রয়েছে তা নিক্ষেপকারী আকর্ষণের বিপরীত আকর্ষণ, তবে তা নিক্ষেপকারীর (প্রযুক্ত) বলের দ্বারা পরাভূত। বস্তুর ওপর প্রযুক্ত বল দুর্বল হয়ে পড়ে বস্তুর (ভূমির প্রতি) আকর্ষণ ও পারিপার্শ্বিক বাধার কারণে...। তাই প্রযুক্ত বল শুরুতে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক আর্কষণের বিরুদ্ধে শক্তিশালী থাকে, কিন্তু তা একটু একটু করে দুর্বল হয়ে পড়ে, স্থির হয়ে যায় এবং অবশেষে তা প্রাকৃতিক আকর্ষণের বিপরীতে শক্তিহীন হয়ে পড়ে। প্রাকৃতিক আকর্ষণ প্রযুক্ত বলের বিপরীতে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং বস্তু এ আকর্ষণের দিকেই ফিরে আসে। (৩২৫)

ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা টীকায় বলেছেন, এখানে একটি বিষয়ে ইঙ্গিত করা সংগত যে, হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা আল-বাগদাদি 'আল-মাইল' (الميل) বা আকর্ষণ/ঝোঁকের বিষয়টিকে একটি সুপ্ত শক্তি বা নবজাতকের মায়ের কোলের দিকে ধাবিত হওয়ার অপত্যশক্তি হিসেবে বিবেচনা করেননি। যেমনটি অ্যারিস্টটল বলেছেন। বরং এর দ্বারা তিনি বস্তুগত শক্তি বুঝিয়েছেন, যা নিক্ষিপ্ত বস্তুর মাধ্যাকর্ষণ-বিরুদ্ধ ঊর্ধ্বগামী ত্বরণের মধ্যে ও ভূমির দিকে নিম্নগামী ত্বরণের মধ্যে বৈজ্ঞানিকভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা আল-বাগদাদি এ বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে প্রশ্নটি ছুড়ে দিয়েছেন তা হলো, নিক্ষিপ্ত পাথর কি তার ঊর্ধ্বগামী ত্বরণের সর্বোচ্চ বিন্দুতে স্থির হয়ে পড়ে, যখন সে ভূপৃষ্ঠের দিকে পড়তে শুরু করে? এই প্রশ্নের জবাব তিনি নিজেই দিয়েছেন স্পষ্ট ভাষায়, কেউ যদি মনে করে যে প্রযুক্ত বলের কারণে ঘটিত পাথরের ঊর্ধ্বগামী ত্বরণ এবং (স্বাভাবিক) নিম্নগামী ত্বরণের মধ্যে (মধ্যবর্তী মুহূর্তে) সামান্যতম স্থিরতা রয়েছে তাহলে সে ভুল করবে। কারণ, পাথরের ওপর প্রযুক্ত বল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পাথরের ভর শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তখন ঊর্ধ্বগামী ত্বরণ ক্ষীণ হয়ে যায় এবং বিপরীতমুখী (নিম্নগামী) তরণ শুরু হয়। ফলে মনে হয় যে পাথরটি স্থির ছিল।

ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা ধারাবাহিক আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, আল-खাযিন ভূমির ওপর পতনশীল বস্তুর ত্বরণ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তার 'মিযানুল হিকমা' গ্রন্থে এ ব্যাপারে বক্তব্য রয়েছে। এই বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল-খাযিন ভূপৃষ্ঠের ওপর পতনশীল বস্তুর দ্রুতি এবং ওই বস্তু (কোনো একক সময়ে) যে দূরত্ব অতিক্রম করছে ও দূরত্ব অতিক্রম করতে যে সময় নিচ্ছে তার মধ্যে সঠিক সম্পর্ক কী তা জানতেন। এই সম্পর্ককে গাণিতিক কাঠামোতে ব্যক্ত করতেই সপ্তদশ খ্রিষ্টাব্দে গ্যালিলিওর সঙ্গে সম্পৃক্ত সমীকরণটি প্রকাশিত হয়।

এভাবেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ইসলামি সভ্যতার বিজ্ঞানীরা প্রাচীন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দূরে সরে এসে মহাকর্ষ বিষয়ে মানবিক উপলব্ধির পূর্ণতার পথে অংশত সত্যে উপনীত হয়েছিলেন। জ্ঞানের ক্ষেত্রে গবেষণার রীতি- পদ্ধতি যে জ্ঞানের বিষয়বস্তুর প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে তা তারা প্রমাণ করেছিলেন। সত্যে উপনীত হতে তারা এ বিষয়টির ওপরও নির্ভরশীল ছিলেন। তারা চিন্তাপদ্ধতি ও বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক গবেষণারীতির ক্ষেত্রে যে মহাবিপ্লব সাধন করেছিলেন তা না হলে আমাদের সময় পর্যন্তও প্রাচীন কালের অজ্ঞতা ও কুসংস্কার প্রতিষ্ঠিত থাকত। আইজ্যাক নিউটন তার সামনে এমন মহান বিজ্ঞানীদের পেয়েছিলেন যাদের কাঁধের ওপর ভর করে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন এবং এভাবে খ্যাতি ও সম্মান কুড়িয়ে নিয়েছিলেন। (৩২৬)

শেষে কিছু যদি বলতেই হয় তবে তা এই যে, গতিসূত্রের ইতিহাসের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে এবং মহাকর্ষসূত্রের ইতিহাসও জানতে হবে। প্রাপ্য অধিকার তাদের প্রাপকদের ফিরিয়ে দিতে হবে।

### ব্যক্তি-পরিচিতি (৩২৭)
তিসিবিওস : (Ctesibius or Ktesibios or Tesibius) ২৮৫ থেকে ২২২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সক্রিয় গ্রিক পদার্থবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক। প্রাচীন মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় বসবাস করতেন। তিনি প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়ার প্রকৌশল-যুগের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। তিসিবিওস ছিলেন একজন নাপিতের সন্তান। ধারণা করা হয় তিনিই প্রথম বাতাসের স্থিতিস্থাপকতা আবিষ্কার করেন। এ ছাড়া তিনি ঘনীভূত বাতাস ব্যবহার করে বেশ কিছু যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। ঘনীভূত বাতাসের শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরের বিদ্যাকে Pneumatics বা বায়ুবিদ্যা বলা হয়। এজন্য অনেকে তাকে বায়ুবিদ্যার জনক বলেন। বাতাসের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি ফোর্স পাম্প এবং এক ধরনের গুলতি বানিয়েছিলেন। তিসিবিওসের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ জলঘড়ির উন্নতি সাধন। জলঘড়ি তার অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। সবচেয়ে সাধারণ জলঘড়ি দুটি পাত্রের মাধ্যমে কাজ করে। একটি পানিপূর্ণ পাত্র আরেকটি শূন্য পাত্রের একটু উপরে রাখা হয়, পানিপূর্ণ পাত্রের নিচের দিকে একটি ছিদ্র থাকে যা দিয়ে নিচের পাত্রে পানি পড়ে। নিচের পাত্রে পানির স্তর কতটুকু বৃদ্ধি পাচ্ছে তার মাধ্যমে সময় গণনা করা হয়। কিন্তু এটি কোনো ধ্রুব সময় গণক ছিল না। কারণ উপরের পাত্রে পানি বেশি থাকলে চাপ বেশি হবে এবং সে কারণে পানির বেগও বেশি হবে। কিন্তু উপরের পাত্রের পানির স্তর যত কমতে থাকবে পানির বেগও তত কমতে থাকবে। এ কারণে জলঘড়ির পানিকে সময়ের পরিমাপক হিসেবে ব্যবহার করলে বলতে হবে, সময় শুরুর দিকে বেশি দ্রুত চলে। এখান থেকেই বোধহয় 'সময় গড়িয়ে যাচ্ছে' বা 'সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে' বাগধারার উদ্ভব। পানির মাধ্যমে ধ্রুব সময় পরিমাপের জন্য তিসিবিওস উপরের পাত্রে পানির স্তর সর্বদা সমান রাখার কৌশল উদ্ভাবন করেন এবং এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে জটিল থেকে জটিলতর জলঘড়ি নির্মাণ করেন। নিচের পাত্রের গায়ে পানির স্তর নির্দেশক কাঁটা জুড়ে দিয়ে তিনি সময় (ঘণ্টা, দিন, মাস, বছর) প্রদর্শনেরও ব্যবস্থা করেন।

হেরন অফ আলেকজান্দ্রিয়া: (হিরো অফ আলেকজান্দ্রিয়া, ১০-৭০ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন গণিতজ্ঞ ও যন্ত্রবিদ। প্রাচীন মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসী ছিলেন এবং এখানেই তার কর্মতৎপরতা অব্যাহত রেখেছিলেন। খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে মিশরের রাজধানী আলেকজান্দ্রিয়া গ্রিক প্রভাবিত বিজ্ঞান ও শিল্পকলার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। এখানকার বিজ্ঞান কেন্দ্রটি উৎসর্গ করা হয়েছিল সংগীতের দেবীদের নামে। এই কেন্দ্রে ছিল বিরাট পাঠাগার, জাদুঘর ও সভাগৃহ। হেরন এই কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে মনে করা হয়। হেরনের প্রধান খ্যাতি বাষ্পীয় ইঞ্জিনের নির্মাতা হিসেবে যা তখন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়নি এবং তার প্রায় ১৮০০ বছর পর এই ধরনের টারবাইনের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে তিনি চারটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রেখে গেছেন, যার মধ্যে মেট্রিকা, মেকানিক্স ও নিউম্যাটিক্স সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এসব গ্রন্থে তিনি আলোচনা করেছেন সংখ্যা এবং ত্রিভুজ তল শঙ্কু ও ধরাকৃতি প্রসঙ্গে, বেগসামান্তরিক ভারকেন্দ্র, বায়ুর ঘনত্ব ও সংনমন এবং লিভার ও গিয়ার সম্পর্কে। আলোচনা করেছেন পাম্প সাইফন টারবাইন ও বিবিধ স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র বিষয়েও। তার এসব গ্রন্থ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছিল।

ব্লেইজ প্যাসকেল: (Blaise Pascal 1623-1662) একজন ফরাসি গণিতজ্ঞ, পদার্থবিদ, উদ্ভাবক ও দার্শনিক। প্রথাগত কোনো বিজ্ঞানশিক্ষা না পেলেও গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় তার অত্যন্ত মৌলিক অবদান রয়েছে। তিনি বায়ুর ওজন ও চাপের এবং শূন্যস্থানের অস্তিত্বের পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেন। তরল পদার্থের সুস্থিতি নিয়ে অনুশীলন করে তিনি এই সূত্র রচনা করেন যে, স্থির কোনো তরলের অভ্যন্তরে যেকোনো বিন্দুতে তরলের চাপ প্রতিটি অভিমুখেই সমান হয়ে থাকে, যা প্যাসকেলের সূত্র নামে পরিচিত। যন্ত্রগণকসহ নানা প্রকারের যন্ত্রও তিনি উদ্ভাবন করেছিলেন। দর্শনের আলোচনায় তিনি ব্যক্তি-প্রবণতাকে গাণিতিক ও স্বজ্ঞাত এই দুই ভাগে ভাগ করেন এবং একই ব্যক্তি বা আধারে এই দুইয়ের সহাবস্থান নিতান্ত বিরল বলে মত দেন।

১৬৪৬ সালে ব্লেইজ প্যাসকেল এবং তার বোন জ্যাকুইলিন ক্যাথলিক ধর্মীয় আন্দোলনে যুক্ত হন এবং সেন্ট অগাস্টিনের কথিত শিক্ষাকে ভিত্তি করে জেসুইট-বিরোধী এক ধর্মীয় শাখা প্রতিষ্ঠায় তৎপর হন। ১৬৫১ সালে তার পিতা মারা যান। ১৬৫৪ সালের শেষের দিকে তিনি রহস্যময় কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তার বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে শুরু করেন জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়, নিজেকে নিয়োজিত করেন দর্শন ও ধর্মতত্ত্বে। এই সময় তিনি পাটিগাণিতিক ত্রিভুজের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ লেখেন। ১৬৫৮ ও ১৬৫৯ সালের মধ্যে তিনি বৃত্ত নিয়ে লেখেন এবং বিভিন্ন কঠিন বস্তুর আয়তন নির্ণয়ে তার প্রয়োগ আলোচনা করেন।

প্যাসকেলের জন্ম হয়েছিল এক অত্যন্ত অভিজাত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারে। শৈশব থেকেই তার স্বাস্থ্য খারাপ ছিল এবং তার বিস্ময়কর প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছিল। তার কোনো কোনো গবেষণার ফল প্রায় দেড়শ বছর পরও ব্যবহারিক প্রয়োগ পেয়েছে। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার অসমাপ্ত সাহিত্যকর্ম Pensées ১৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। তরলের চাপের আন্তর্জাতিক একককে তার নামানুসারে নামাঙ্কিত করা হয়েছে।

আল-হামদানি : আবু মুহাম্মাদ আল-হাসান ইবনে আহমাদ ইবনে ইয়াকুব আল-হামদানি (২৮০-৩৩৪ হি./৮৯৫-৯৪৫ খ্রি.) ছিলেন পশ্চিম আমরান/ইয়ামেনের বনু হামদান গোত্রের মানুষ। তিনি একাধারে ভূগোলবিদ, কবি, রসায়নবিদ, ব্যাকরণবিদ, ঐতিহাসিক, ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি ছিলেন আব্বাসি খিলাফতের শেষ সময়কার ইসলামি সংস্কৃতির একজন শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। তার যথেষ্ট পরিমাণ বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড থাকা সত্ত্বেও আল-হামদানির জীবনকাহিনি সম্বন্ধে খুব কমই জানা যায়। তিনি ব্যাকরণবিদ হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন বেশি, তা ছাড়া তিনি অনেক কবিতা লিখে গেছেন, জ্যোতির্বিদ্যার ছক প্রণয়ন করেছেন এবং তার জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আরবের প্রাচীন ইতিহাস এবং ভূগোল সম্পর্কে জানতে অতিবাহিত করেছেন। তার জন্মের পূর্বে তার পরিবার আল-মারশিতে বসবাস করত। সেখান থেকে তারা সানআয় চলে আসে, এখানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন পরিব্রাজক এবং তিনি কুফা, বাগদাদ, বসরা, ওমান ও মিশর ভ্রমণ করেন। সাত বছর বয়স থেকেই আল-হামদানি ভ্রমণের কথা বলতেন। পরে প্রথমে তিনি মক্কায় ভ্রমণ করেন এবং সেখানে ছয় বছর পড়াশোনা করে কাটান। তারপর মক্কা ত্যাগ করে সাদাহর উদ্দেশে যাত্রা করেন। এখানে তিনি খাওলান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। পরবর্তীকালে আল-হামদানি সানআয় ফিরে আসেন এবং হিময়ার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। এ সময় তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তাকে দুই বছর কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। কারামুক্তির পর তার গোত্রের প্রতিরক্ষার জন্য তিনি রাইদাতে যান। এখানেই তিনি তার বেশিরভাগ গ্রন্থ সংকলন করেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এখানেই বসবাস করেন।
তার সম্পাদিত আরব উপদ্বীপের ভূগোল (সিফাতু জাযিরাতিল আরব) হচ্ছে এই বিষয়ের ওপর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি।
অস্ট্রিয়ান প্রাচ্যবিদ আলয়েস স্প্রেঙ্গার তার গবেষণাগ্রন্থ Post-und Reiserouten des Orients (লাইপ্‌সিশ, ১৮৬৪)-এ এবং Alte Geographie Arabiens (বের্ন, ১৮৭৫) নামে আরেকটি গ্রন্থে আল-হামদানির পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছেন।
আল-হামদানির অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কর্মের মধ্যে রয়েছে 'ইকলিল' (মুকুট)। এটি হিময়ারিদের বংশবৃত্তান্ত ও তাদের রাজাদের যুদ্ধবিগ্রহ নিয়ে দশ খণ্ডে রচিত। গ্রন্থটির অষ্টম খণ্ড দক্ষিণ আরবের নগরদুর্গ ও প্রাসাদসমূহের ওপর লিখিত। এটি ডি. এইচ. মুলার কর্তৃক জার্মান ভাষায় Die Burgen und Schlösser Sudarabiens (ভিয়েনা, ১৮৮১) নামে অনূদিত ও সম্পাদিত। আল-হামদানির রচিত অন্যান্য গ্রন্থের তালিকা গুস্তাভ লেবারেষ্ট ফুগেলের Die grammatischen Schulen der Araber (লাইপ্‌সিশ, ১৮৬২) পৃ. ২২০-২২১-এ পাওয়া যাবে।

টিকাঃ
৩০৪. মূল গ্রিক থেকে আরবিতে অনুবাদ করেছেন ইসহাক ইবনে হুনাইন।
৩০৫. হেরন আলেকজান্দ্রিয়া: একজন গ্রিক মিশরীয় গণিতবিদ, প্রকৌশলী।
৩০৬. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ১১৫।
৩০৭. রিহাব খিদির আকাবি, মাওসুআতুল আবাকিরাতুল ইসলাম, খ. ৪, পৃ. ৫৭।
৩০৮. আল-মওসুআতুল আরাবিয়্যাতুল আলামিয়্যা, http://www.alargam.com/general/arabsince/7.htm
৩০৯. আপেক্ষিক গুরুত্ব: আপেক্ষিক গুরুত্ব কোনো বস্তুর ঘনত্ব এবং অন্য একটি প্রসঙ্গ-বস্তুর ঘনত্বের অনুপাত অথবা কোনো বস্তুর ভর এবং একই আয়তনের অন্য একটি প্রসঙ্গ-বস্তুর ভরের অনুপাতকে বোঝায়। আপাত আপেক্ষিক গুরুত্ব হচ্ছে কোনো বস্তুর ওজন এবং সমান আয়তনের অন্য একটি প্রসঙ্গ-বস্তুর ওজনের অনুপাত। তরল পদার্থের ক্ষেত্রে প্রায় সবসময় প্রসঙ্গ-বস্তু হিসেবে সবচেয়ে ভারী অবস্থার পানি (৪° সে. অথবা ৩৯.২° ফা.) এবং গ্যাসীয় পদার্থের ক্ষেত্রে কক্ষ তাপমাত্রার বাতাস নেওয়া হয় (২০° সে. অথবা ৬৮° ফা.)। দুটি উপাদানের জন্যই তাপমাত্রা ও চাপ নির্দিষ্ট থাকতে হবে।
৩১০. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ১৮৬; মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ১৩৩।
৩১১. আল-খাযিনি: আবুল ফাতহ আবদুর রহমান আল-খাযিন অথবা আল-খাযিনি। জ্যোতির্বিদ, প্রকৌশলী। সেলজুক সুলতান আহমাদ সানজার (১০৮৫-১১৫৭ খ্রি.)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি যে জ্যোতিষ্কসারণি (Ephemeris) তৈরি করেছিলেন তা গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্যায় এক মহান কীর্তি। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ الزيج السنجري، رسالة الفعلات، ميزان الحكمة ل। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ৩০৫।
৩১২. স্লোপ: ভূপৃষ্ঠ বা অন্য কোনো সমতলপৃষ্ঠ বরাবর ৯০° ডিগ্রি অপেক্ষা কম কৌণিক অবস্থান বা দিক; ঢাল।-অনুবাদক।
৩১৩. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, আল-উলুমুল বাহতাতি ফিল-হাদারাতিল আরাবিয়্যা ওয়াল-ইসলামিয়্যা, পৃ. ৩৩১।
৩১৪. আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদান এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে আবহমণ্ডলের চাপ মাপার যন্ত্রবিশেষ; আবহমানযন্ত্র।
৩১৫. যে যন্ত্র ধূলি-ময়লা ইত্যাদি শুষে নেয়।
৩১৬. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, আল-উলুমুল বাহতাতি ফিল-হাদারাতিল আরাবিয়্যা ওয়াল-ইসলামিয়‍্যা, পৃ. ৩৩১।
৩১৭. First law: In an inertial frame of reference, an object either remains at rest or continues to move at a constant velocity, unless acted upon by a force.
৩১৮. দেখুন, আল-ইশারাত ওয়াত তানবিহাত, সম্পাদনা, সুলাইমান দিনা, দারুল মাআরিফ, মিশর, পৃ. ২৮৩-২৮৪।-অনুবাদক।
৩১৯. ড. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৯০।
৩২০. হাসান ইবনে আহমাদ আল-হামদানি, الجوهرتين العتيقتين المائعتين من الصفراء والبيضاء, অনুবাদক, আহমাদ ফুয়াদ পাশা। উদ্ধৃতি, আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৯০।-অনুবাদক
৩২১. বিভব শক্তির পরিমাণ ভূপৃষ্ঠ থেকে বস্তুর উচ্চতার ওপর নির্ভর করে। উচ্চতা যত বেশি, বিভব শক্তি তত বেশি। একইভাবে বস্তুর ভরের ওপরও নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, কোনো ২ কেজি ভরের বস্তুকে অভিকর্ষ বলের বিরুদ্ধে যদি ভূমি থেকে ৫ মিটার উচ্চতায় তোলা হয় তবে বস্তুটিকে ওই উচ্চতায় ওঠানোর ফলে ৯৮ জুল পরিমাণ বিভব শক্তি জমা হবে। যার ব্যাখ্যা নিম্নরূপ: সম্পাদিত কাজ=বল × সরণ = ভর × ত্বরণ × সরণ; অভিকর্ষজ ত্বরণ = ৯.৮ মিটার/বর্গসেকেন্ড; ভর=২ কেজি; সরণ=৫ মিটার; সুতরাং, সম্পাদিত কাজ = ২ × ৫ × ৯.৮ = ৯৮ জুল। অর্থাৎ, বস্তুটিতে ৯৮ জুল পরিমাণ বিভব শক্তি জমা হবে। এখন বস্তুটিকে অভিকর্ষের প্রভাবে মুক্তভাবে পড়তে দেওয়া হলে এর বিভব শক্তি ভূমিস্পর্শের আগেই অন্যান্য শক্তিতে রূপান্তরিত হতে থাকবে। বিভব শক্তি গতিশক্তি, আলো, তাপ, শব্দ, তড়িৎ ইত্যাদি শক্তিতে রূপান্তরযোগ্য। জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে পানির বিভব শক্তিকে গতিশক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়। গতিশক্তির সাহায্যে টারবাইনে ঘূর্ণন গতিশক্তির সৃষ্টি করা হয় এবং তা থেকে ডায়নামোর সাহায্যে তড়িৎশক্তি উৎপাদন করা হয়। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৩২২. বায়ুর বাধাহীন বা বায়ুশূন্য স্থানে।
৩২৩. বস্তুর ভর বেশি হলে তা দ্রুত পড়বে এবং ভর কম হলে হালকাভাবে পড়বে এমন নয়।
৩২৪. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৯১।
৩২৫. আকাশের দিকে একটি ঢিল ছুড়ে এ বিষয়টি পরীক্ষা করা যায়।
৩২৬. আহমাদ ফুয়াদ পাশা, আত-তুরাসুল ইলমিয়্যিল ইসলামিয়্যি.. শাইউন মিনাল মাযি আম যাদুন লিল-আতি, পৃ. ৯২।
৩২৭. অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত (উইকিপিডিয়া)।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 আলোকবিজ্ঞান

📄 আলোকবিজ্ঞান


ইসলামি সভ্যতার পূর্বেই আলোকবিজ্ঞানের সূচনা ঘটেছিল। গ্রিক ও অন্যান্য প্রাচীন জাতি আলোকবিজ্ঞানের প্রতি বেশ গুরুত্ব প্রদান করেছিল। এই বিজ্ঞানশাখায় তাদের ভালো ভালো কীর্তি ও অবদান রয়েছে। মুসলিমরা আলোকবিজ্ঞানের চর্চার শুরুতে ওইসব অবদান ও কীর্তির ওপর নির্ভর করেছেন। আলোর প্রতিসরণ, প্রজ্জ্বলক আয়না (বার্নিং মিরর) ও অন্যান্য বিষয়ে তারা গ্রিক বিজ্ঞানীদের মতামত গ্রহণ করেছেন। তবে তারা কেবল গ্রহণ করেই ক্ষান্ত থাকেননি, বরং এই বিজ্ঞানশাখার বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন, নতুন নতুন অবিস্মরণীয় আবিষ্কারে একে সমৃদ্ধ করেছেন। তারা আলোকবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছেন।

### গ্রিক সভ্যতায় আলোকবিজ্ঞান
গ্রিক আলোকবিজ্ঞান দুটি বিপরীতধর্মী তত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। ১. প্রবেশন তত্ত্ব (Intromission theory), অর্থাৎ (দুই চোখে) এমন কিছুর প্রবেশ যা দুই চোখে বস্তুকে দৃশ্যমান করে তোলে বা দর্শনানুভূতির সৃষ্টি করে। ২. নিঃসরণ তত্ত্ব (Emission theory or extramission theory), অর্থাৎ দর্শনের ঘটনাটি ঘটে তখনই যখন চোখ থেকে আলো নিঃসৃত হয়ে দৃশ্যমান বস্তুর পৃষ্ঠদেশে প্রতিফলিত হয়। ৩২৮ গ্রিক সভ্যতা এই দুটি সিদ্ধান্তকে গ্রহণ ও বর্জনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অ্যারিস্টটলের প্রচেষ্টাগুলো অনিবার্যভাবে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। ইউক্লিডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যদিও তার প্রচেষ্টা অনেকটা বাস্তবিক। তবে তার তত্ত্বসমূহ ও তাত্ত্বিক বক্তব্য 'দর্শন'-এর পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা উপস্থাপনে ছিল সীমাবদ্ধ। কারণ তাতে 'দৃষ্টিসংক্রান্ত ঘটনা' (Optical phenomena)-এর শারীরিক, শারীরবৃত্তীয় ও মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো গুরুত্ব পায়নি। তিনি এই মত ব্যক্ত করেছিলেন যে, চোখ তার ও দর্শনযোগ্য বস্তুর মধ্যবর্তী স্বচ্ছ মাধ্যমে রশ্মি ফেলে, এই রশ্মি চোখের অভ্যন্তর থেকেই নিঃসৃত হয়। যেসব বস্তুর ওপর এই রশ্মি পড়ে তা দৃষ্টিগোচর হয় এবং যেসব বস্তুর ওপর পড়ে না তা দৃষ্টিগোচর হয় না। যেসব বস্তু বৃহৎ কোণ থেকে দৃষ্টিগোচর হয় সেগুলোকে বড় দেখায় এবং যেসব বস্তু ক্ষুদ্র কোণ থেকে দৃষ্টিগোচর হয় সেগুলোকে ছোট দেখায়।

অন্যদিকে টলেমি জ্যামিতিক নীতি ও ভৌতিক নীতির মধ্যে সামঞ্জস্যবিধানের চেষ্টা করেন। আলোকবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি পরীক্ষামূলক পদ্ধতিরও প্রবর্তন করেন। এটি ছিল মূল্যবান নতুন ধারা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কারণ এটির ব্যবহার এমনসব সিদ্ধান্তের সমর্থনে সীমাবদ্ধ ছিল, যেগুলোতে বিজ্ঞানীরা ইতিপূর্বে উপনীত হয়েছিলেন। কখনো কখনো পরীক্ষামূলক ফলাফল এসব সিদ্ধান্তকে সুরক্ষাদানের জন্যও ব্যবহৃত হয়েছিল। (৩২৯)

### মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান
আলোকবিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণা অতীতকালের এই ধারাতেই চলতে থাকে, কোনো অগ্রগতি বা উন্নতি দেখা যায় না। ইসলামি সভ্যতার সূচনাকাল পর্যন্ত তার অবস্থা থাকে এমনই। মুসলিম বিজ্ঞানীরা আলোকবিজ্ঞানে যে অবদান রাখেন তাতে এক বিকশিত ও অনন্য ধারার সৃষ্টি হয়। তার কারণ তারা আলোকবিজ্ঞানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি বিজ্ঞানশাখায় অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। যেমন জ্যোতির্বিজ্ঞান, যন্ত্রকৌশল ইত্যাদি। কারণ তাদের আবিষ্কারে ও উদ্ভাবনে এসব বিজ্ঞানশাখার সবগুলোই অন্তর্ভুক্ত ছিল।

### আবু ইউসুফ আল-কিন্দি (৩৩০)
দার্শনিক আবু ইউসুফ আল-কিন্দির আবির্ভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রাথমিক পর্যায়ের যে-সকল মুসলিম বিজ্ঞানী পদার্থবিজ্ঞান ও আলোকবিজ্ঞানের ময়দানে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন আল-কিন্দি তাদের অন্যতম। তিনি তার বিখ্যাত কিতাব 'ইল্যুল মানাযির'-এ আলো-সম্পর্কিত ঘটনাবলির ওপর আলোকপাত করেছেন এবং সেগুলোর পর্যালোচনা করেছেন। তিনি 'গ্রিক নির্গমন তত্ত্ব' গ্রহণ করেছেন। তবে তিনি চোখের রশ্মির বিচ্ছুরণ সম্পর্কে সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যাবলি বর্ণনা করেছেন। এসবের মধ্য দিয়ে তিনি একটি নতুন 'বিম্বিতকরণ পদ্ধতি' (ইমেজিং সিস্টেম)-এর মূলনীতি সূত্রবদ্ধ করেন। যা শেষ বিচারে নির্গমন-তত্ত্বেরই নামান্তর। কিন্তু তার 'ইল্যুল মানাযির' গ্রন্থটি মধ্যযুগে আরবের বিজ্ঞানজগতে তো বটেই, ইউরোপেও বেশ সাড়া ফেলেছিল। (৩৩১)

### হাসান ইবনুল হাইসাম: আলোকবিজ্ঞানের পথিকৃৎ
আবু ইউসুফ আল-কিন্দির পর এলেন হাসান ইবনুল হাইসাম। আলোকবিজ্ঞান ও 'দর্শন'-এর শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপের জগতে ইবনুল হাইসামের অবদান ও কীর্তি এক নতুন বিজয় ও দুঃসাহসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তার কাজগুলোই ছিল মূল ভিত্তি, যার ওপর পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীরা তাদের আলোকবিজ্ঞান-সংক্রান্ত যাবতীয় তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যে-সকল ভিনদেশি বিজ্ঞানী ইবনুল হাইসামের তত্ত্ব ও মতবাদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন তাদের পুরোভাগে রয়েছেন রজার বেকন ও ভিটেলো (Vitello) (৩৩২) এবং অন্য বিজ্ঞানীরা। শুধু তাই নয়, তারা তার তত্ত্ব চুরিও করেছেন এবং নিজেদের নামে চালিয়েও দিয়েছেন। বিশেষ করে অণুবীক্ষণযন্ত্র (মাইক্রোস্কোপ), দূরবীক্ষণযন্ত্র (টেলিস্কোপ) ও আতশি কাচ (ম্যাগনিফাইং গ্লাস) নিয়ে তারা যেসব গবেষণা করেছেন তাতে এই ব্যাপারটি বেশি ঘটেছে। (৩৩৩)

ইবনুল হাইসাম প্রথমে আলোকবিজ্ঞান ও 'দর্শন'-এর ক্ষেত্রে ইউক্লিড ও টলেমির তত্ত্বগুলোর পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করেন এবং দেখান যে এসব তত্ত্বের কিছু দিক সম্পূর্ণ গলদ। এই সময়ের মধ্যেই তিনি চোখ, লেন্স ও দুই চোখের দ্বারা দর্শন বিষয়ে সূক্ষ্ম ও যথার্থ বর্ণনা প্রদান করেন। তিনি পরীক্ষানিরীক্ষার সাহায্যে প্রমাণ করেন যে, বাহ্যিক বস্তু থেকে আলো এসে আমাদের চোখে পড়লেই দেখতে পাই। আলোকরশ্মি যখন সাধারণভাবে ভূগোলকে পরিব্যাপ্ত বায়ুর মধ্যে প্রবেশ করে তখন তার প্রতিসরণের পর্যায়ক্রম কীভাবে ঘটে তার বিবরণ প্রদান করেন। বিশেষ করে যখন তা স্বচ্ছ মাধ্যম যেমন বায়ু, পানি, বায়ুমণ্ডলের কণারাশি ভেদ করে (অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে) প্রবেশ করে। তখন আলোকরশ্মি সোজা না গিয়ে দিক পরিবর্তন করে। এই দিক পরিবর্তনের ঘটনাই হলো আলোর প্রতিসরণ। ইবনুল হাইসাম আলোর প্রতিফলন এবং প্রতিফলিত রশ্মি যে কোণ (প্রতিফলন-কোণ) উৎপন্ন করে সে সম্পর্কেও আলোচনা করেন। তিনি আরও জানান যে, মহাজাগতিক বস্তুরাশি সূর্যোদয়ের সময় দিগন্তে প্রকাশ পায় মূলত তা সেখানে পৌঁছার আগেই এবং সূর্যাস্তের সময় এর বিপরীত কাণ্ড ঘটে, তখন তা দিগন্তে দৃশ্যমান থাকে দিগন্ত-রেখার নিচে মিলিয়ে যাওয়ার পরও। তিনিই প্রথম ডার্করুমের ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা দেন, যা আলোকচিত্রের (ফটোগ্রাফির) মূল বিষয় হিসেবে বিবেচিত। (৩৩৪)

যে গ্রন্থ ইবনুল হাইসাম নামটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অমর করে রেখেছে তা হলো 'কিতাবুল মানাযির' (Book of Optics)। এই গ্রন্থ 'দর্শন'-এর প্রাথমিক তত্ত্ব হিসেবে আলোকবিজ্ঞানের ধারণা বিশ্লেষণ করে। ইউক্লিড থেকে শুরু করে, এমনকি আল-কিন্দি পর্যন্ত গাণিতিক ঐতিহ্য যে অনুমিত দৃশ্যমান (চোখ থেকে নির্গত) রশ্মির তত্ত্বকে আঁকড়ে রেখেছিল, ইবনুল হাইসামের উপর্যুক্ত তত্ত্ব ছিল তার থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। শুধু তাই নয়, ইবনুল হাইসাম 'দর্শন-প্রক্রিয়া'-র এই ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নতুন মেথোডলজি (নিয়মবিষয়ক বিজ্ঞান)-এরও প্রবর্তন করেন। তার এই কাজের ফলে চোখ থেকে নির্গত রশ্মির তত্ত্ব (নিঃসরণ তত্ত্ব) অনুসারে যেসব বিষয় অবোধগম্য ছিল সেগুলোর স্পষ্টীকরণ সম্ভব হয়। যে-সকল দার্শনিকের মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল 'অবলোকন'-এর সারবস্তুটা কী সেটাই ব্যাখ্যা করা এবং যারা 'অবলোকন'-এর ঘটনা কীভাবে ঘটে তা বিশ্লেষণ করতে ততটা মনোযোগ দেননি তাদের উভয়ের পক্ষ থেকে কিছু বিষয় অবহেলিত থেকে গিয়েছিল। ইবনুল হাইসামের নতুন মেথোডলজি প্রবর্তনের ফলে সেগুলোরও ব্যাখ্যাদান সম্ভব হয়। (৩৩৫)

ইবনুল হাইসাম কেবল আলোকবিজ্ঞান নিয়েই প্রায় চব্বিশটি বিষয় লিখেছেন। গ্রন্থাকারে, পুস্তিকাকারে ও প্রবন্ধ-আকারে এসব রচনা লিখেছেন তিনি। আমাদের জ্ঞানভান্ডার থেকে যা-কিছু হারিয়ে গেছে তার সঙ্গে ইবনুল হাইসামের এসব রচনার অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। যেগুলো বেঁচে গেছে সেগুলো ইস্তাম্বুল গ্রন্থাগার, লন্ডন গ্রন্থাগার ও অন্যান্য গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। তার মহাগ্রন্থ 'আল-মানাযির' ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। তার এই গ্রন্থে আলোকবিজ্ঞানের নব-উদ্ভাবিত তত্ত্বগুলো রয়েছে। গ্রন্থটি ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হওয়ার পর থেকে খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত আলোকবিজ্ঞানের প্রধান উৎস হিসেবে বিরাজমান ছিল। (৩৩৬)

'আল-মানাযির' গ্রন্থটি আলোকবিজ্ঞানের জগতে এক মহৈশ্বর্য। ইবনুল হাইসাম এই গ্রন্থে টলেমির তত্ত্বগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পরীক্ষানিরীক্ষা, সেগুলোর পরিবর্তন ও পরিমার্জন করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি টলেমির আলোকবিজ্ঞান-সম্পর্কিত কতিপয় তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ তিনি নতুন নতুন তত্ত্ব ও সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তার এসব তত্ত্ব ও সিদ্ধান্ত আধুনিক আলোকবিজ্ঞানের অস্থিমজ্জারূপে এখনো বিদ্যমান।

টলেমি দাবি করতেন যে-আমরা ইতিপূর্বে যেমন উল্লেখ করেছি-চোখ থেকে নিঃসৃত আলোকরশ্মি দর্শনযোগ্য বস্তুর ওপর পতিত হওয়ার মাধ্যমে দর্শন-প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তার পরবর্তী বিজ্ঞানীরাও এই তত্ত্বই গ্রহণ করেছেন। ইবনুল হাইসাম এসে এই তত্ত্বকে বাতিল করে দেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, দর্শন-প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় দৃষ্টিগ্রাহ্য বস্তু থেকে নির্গত আলোকরশ্মি চোখে এসে পড়ার ফলে। বহু পরীক্ষানিরীক্ষা ও এক্সপেরিমেন্টের পর ইবনুল হাইসাম দেখান যে, আলোকরশ্মি সমজাতীয় বা সমপ্রকৃতির মাধ্যমে সরল রেখায় প্রসারিত হয়। তিনি 'আল-মানাযির' গ্রন্থে তা প্রমাণ করে দেখান। (৩৩৭)

একটি বস্তুকে দুটি দেখার দ্বারা জোড়-দর্শন (ডিপ্লোপিয়া বা ডাবল ভিশন) ঘটা ব্যতিরেকেই দুই চোখের মাধ্যমে একইসঙ্গে একইসময়ে বস্তুরাশি দেখার পদ্ধতিটি কীরূপ তা গাণিতিক ও জ্যামিতিকভাবে প্রতিপাদন করেন ইবনুল হাইসাম। (৩৩৮) তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, দৃষ্টিগোচর বস্তুর দুটি প্রতিকৃতি চোখের রেটিনায় অভিন্নরূপে প্রতিভাত হয়। ইবনুল হাইসাম উপর্যুক্ত প্রতিপাদন ও এই ব্যাখ্যার দ্বারা বর্তমানে যে জিনিসটা স্টেরিওস্কোপ(৩৩৯) নামে পরিচিত তার প্রথম ভিত্তি স্থাপন করেন।

ইবনুল হাইসামই প্রথম ব্যক্তি যিনি চোখের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তিনি চক্ষু-ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে চোখের অংশগুলোর পরিচয় প্রদান করেন, সেগুলোর ব্যাখ্যা দেন এবং চিত্র অঙ্কন করে দেখান। তিনিই প্রথম চোখের বিভিন্ন অংশের নামকরণ করেন। পাশ্চাত্যজগৎ সরাসরি এসব নামই গ্রহণ করেছে অথবা তাদের ভাষায় সেগুলোর অনুবাদ করে নিয়েছে। এসব নামের মধ্যে রয়েছে কর্নিয়া, রেটিনা, ভিট্রিয়াস হিউমার, অ্যাকুয়াস হিউমার ইত্যাদি। (৩৪০)

### আলোকবিজ্ঞানে ইবনুল হাইসামের গুরুত্বপূর্ণ অবদান
তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি পিন-হোল বা ডার্করুম বা ডার্ককেবিনেট ব্যবহার করে পরীক্ষানিরীক্ষা চালান। এসব পরীক্ষানিরীক্ষা থেকে তিনি আবিষ্কার করেন যে, ডার্করুমের বা ডার্ককেবিনেটের অভ্যন্তরে বস্তুর ছবি উলটোভাবে প্রকাশ পায়। এভাবে তিনি ক্যামেরা আবিষ্কারের পথ সুগম করে তোলেন। এমন চিন্তাভাবনা ও পরীক্ষানিরীক্ষার কারণে ইবনুল হাইসাম দুজন ইতালীয় বিজ্ঞানী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (৩৪১) ও গিয়ামবাতিস্তা ডেলা পোর্টা (৩৪২) থেকে পাঁচশ বছর এগিয়ে রয়েছেন। (৩৪২)

চিত্র নং-৯ ইবনে হাইসাম রচিত ‘তাশরিহুল আইন’

ইবনুল হাইসামই প্রথমবারের মতো আলোকবিজ্ঞানের ময়দানে আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণের নিয়মাবলি প্রণয়ন করেন। আলোর গতিপথে আলোর প্রতিসরণ কীভাবে ঘটে তা তিনি কার্যকারণসহ ব্যাখ্যা করে বোঝান। অর্থাৎ বিভিন্ন মাধ্যম যেমন পানি, কাচ ও বায়ু ইত্যাদির মধ্য দিয়ে গমনকালে আলোর প্রতিসরণ ঘটে। ইবনুল হাইসাম তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইংরেজ বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন থেকে এগিয়ে রয়েছেন। (৩৪৪)

উপর্যুক্ত গ্রন্থে ইবনুল হাইসামের অন্যতম অর্জন হলো ডার্কবক্সের পরীক্ষানিরীক্ষা। এটিকে ক্যামেরা আবিষ্কারের প্রথম পদক্ষেপ বিবেচনা করা হয়। সাইন্টিফিক এনসাইক্লোপিডিয়ায় যেমন বলা হয়েছে, ইবনুল হাইসাম প্রথম ক্যামেরা-আবিষ্কারক হিসেবে বিবেচিত হন। এটি কার্যত ক্যামেরা অবস্কিউরা নামে পরিচিত। ক্যামেরা অবস্কিউরা ফটোগ্রাফিক ক্যামেরার অগ্রদূত। (৩৪২)

যে-কেউ 'কিতাবুল মানাযির' ও আলো-সম্পর্কিত বিষয়গুলো এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় অধ্যয়ন করবেন, তিনি অবশ্যই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে, ইবনুল হাইসাম একটি নতুন ধারা ও স্বভাব নিয়ে আলোকবিজ্ঞানের ওপর গবেষণা করেছেন, যা তার পূর্বে কেউই করেননি। ৪১১ হিজরি/১০২১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তিনি 'কিতাবুল মানাযির রচনা করেন। এতে তিনি তার গাণিতিক প্রতিভা, চিকিৎসা-অভিজ্ঞতা ও তার যাবতীয় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। ফলে তিনি এমন পরিণতিতে পৌঁছেছেন যা তাকে বিজ্ঞানজগতে শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি এমনসব বিজ্ঞানশাখার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, যা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বহু বিষয়ে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি পালটে দিয়েছে। (৩৪৬)

আলোকবিজ্ঞানে ইবনুল হাইসামের অসামান্য অবদান এবং নতুন ধারার উদ্ভাবনী গবেষণা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন অনালোচিত, অনেক মানুষের কাছেই অপরিচিত। অবশেষে আল্লাহ তাআলা এমন এক ব্যক্তিকে নিয়োজিত করে দেন যিনি তার যাবতীয় কর্মের সুলুক সন্ধান করেন, তার কীর্তি ও অবদানের ওপর আলো ফেলেন, সেগুলোকে মানুষের সামনে তুলে ধরেন। এই ব্যক্তি হলেন মিশরীয় বিজ্ঞানী মুস্তাফা নাজিফ। তিনি ইবনুল হাইসাম ও তার কর্মের ওপর দীর্ঘ গবেষণালব্ধ একটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থটি দুই খণ্ডে প্রকাশ করে। তিনি ইবনুল হাইসামের বিদ্যমান সব পাণ্ডুলিপি এবং অন্য শত শত উৎসগ্রন্থ পাঠে বিপুল প্রচেষ্টা ও শ্রম ব্যয় করেন। এভাবে তিনি এক বাস্তবিক সত্যে উপনীত হন। তা এই যে, ইবনুল হাইসাম এমন ব্যক্তিত্ব, যিনি ছিলেন একাদশ শতাব্দীর সূচনাকালে আলোকবিজ্ঞানের পথিকৃৎ।(৩৪৭)

আমরা যা-কিছু উল্লেখ করলাম তা আলোকবিজ্ঞানে মুসলিমদের বিপুল অবদানের নামমাত্র অংশ ছাড়া কিছু নয়। তাহলে আরও কী পরিমাণ বিস্ময়কর অবদান রয়েছে!

টিকাঃ
৩২৮. গণিতবিদ ইউক্লিড ও টলেমি ছিলেন এই তত্ত্বের প্রবক্তা।-অনুবাদক।
৩২৯. ডোনাল্ড আর. হিল, Islamic Science and Engineering, আরবি অনুবাদ, আল-উলুম ওয়াল-হানদাসা ফিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, অনুবাদক, আহমাদ ফুয়াদ পাশা, পৃ. ১০২।
৩৩০. আল-কিন্দি: আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক ইবনে আস-সাবাহ আল-কিন্দি (১৮৫-২৫৬ হি./৮০৫-৮৭৩ খ্রি.)। তার যুগের শ্রেষ্ঠ আরব ও ইসলামি দার্শনিক। কিন্দাহর রাজপুত্র। বসরায় বেড়ে ওঠেন, তারপর বাগদাদে চলে যান। চিকিৎসা, দর্শন, সংগীত, প্রকৌশল ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন এবং এসব বিষয়ে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। দেখুন, ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা, খ. ২, পৃ. ১৭২-১৭৭; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩১৫।
৩৩১. ডোনাল্ড আর. হিল, প্রাগুক্ত; মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ১৩৮।
৩৩২. আলোকবিজ্ঞানের ওপর ভিটেলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, Perspectiva। গ্রন্থটির রচনাকাল ১২৭০-১২৭৮ খ্রি.। এটি রচনা করতে গিয়ে তিনি সম্পূর্ণরূপে হাসান ইবনুল হাইসামের ওপর নির্ভর করেছেন।
৩৩৩. মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ১৩৮।
৩৩৪. প্রাগুক্ত।
৩৩৫. ডোনাল্ড আর. হিল, Islamic Science and Engineering, আরবি অনুবাদ, আল-উলুম ওয়াল-হানদাসা ফিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, অনুবাদক, আহমাদ ফুয়াদ পাশা, পৃ. ১০২।
৩৩৬. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, আল-উলুমুল বাহতাতি ফিল-হাদারাতিল আরাবিয়্যা ওয়াল-ইসলামিয়্যা, পৃ. ৩২৫, ইবনুল হাইসামের রচনাবলি প্রসঙ্গে।
৩৩৭. ইবনুল হাইসাম, কিতাবুল মানাযির, পৃ. ১৩৩।
৩৩৮. চোখ কীভাবে কাজ করে তা জানার জন্য দেখুন, ১. বাংলা একাডেমি বিজ্ঞান বিশ্বকোষ, ২য় খণ্ড, Eye (চোখ) ভুক্তি, পৃ. ১৫৫-১৫৮। ২. 'আমাদের চোখ যেভাবে দেখে', https://bit.ly/3mx5Yr5। ৩. 'মানুষের চোখ কিভাবে কাজ করে', https://www.deho.tv/ -অনুবাদক।
৩৩৯. স্টেরিওস্কোপ (Stereoscope): যে যন্ত্রের সাহায্যে সামান্য ব্যবধানের দুটি ভিন্ন চিত্রকে একক এবং ঘন বলে মনে হয়।-অনুবাদক।
৩৪০. হেনরি ক্রু, The Rise of Modern Physics; a Popular Sketch, পৃ. ৫৯; জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩০৫ থেকে উদ্ধৃত। আরও দেখুন, ডোনাল্ড আর. হিল, আল-উলুম ওয়াল-হানদাসা ফিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, অনুবাদক, আহমাদ ফুয়াদ পাশা, পৃ. ১০৪ ও তার পরবর্তী।
৩৪১. লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯ খ্রি.) : ইতালীয় শিল্পী, বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। ইতালীয় রেনেসাঁসের কালজয়ী চিত্রশিল্পী। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী লিওনার্দো দা ভিঞ্চির অন্যান্য পরিচয়ও সুবিদিত-ভাস্কর, স্থপতি, সংগীতজ্ঞ, সমরযন্ত্রশিল্পী এবং বিংশ শতাব্দীর বহু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের নেপথ্য জনক। তার বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে মোনালিসা, দা লাস্ট সাপার অন্যতম। তার শৈল্পিক মেধার বিকাশ ঘটে অল্প বয়স থেকেই। আনুমানিক ১৪৬৯ সালে রেনেসাঁসের অপর বিশিষ্ট শিল্পী ও ভাস্কর আন্দ্রেয়া ভেরোচ্চিয়োর কাছে ছবি আঁকায় ভিঞ্চির শিক্ষানবিশ জীবনের সূচনা। এই শিক্ষাগুরুর কাছেই তিনি ১৪৭৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে, বিশেষত চিত্রাঙ্কনে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। ১৪৭২ সালে তিনি চিত্রশিল্পীদের গিল্ডে ভর্তি হন এবং এই সময় থেকেই তার চিত্রকর জীবনের সূচনা হয়। গির্জা ও রাজপ্রাসাদের দেয়ালে চিত্রাঙ্কন এবং রাজকীয় ব্যক্তিবর্গের ভাস্কর্য নির্মাণের পাশাপাশি বেসামরিক এবং সামরিক প্রকৌশলী হিসাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান জ্ঞানের প্রয়োগ, অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ্যা, জীববিদ্যা, গণিত ও পদার্থবিদ্যার মতো বিচিত্র সব বিষয়ে তিনি গভীর অনুসন্ধিৎসা প্রদর্শন করেন এবং মৌলিক উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দেন। আনুমানিক ১৪৮২ সালে তিনি মিলান গমন করেন এবং সেখানে অবস্থানকালে তার বিখ্যাত দেয়ালচিত্র দা লাস্ট সাপার অঙ্কন করেন। ১৫০০ সালের দিকে তিনি ফ্লোরেন্স ফিরে আসেন এবং সামরিক বিভাগে প্রকৌশলী পদে নিয়োগ লাভ করেন। এই সময়েই তিনি তার বিশ্বখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা অঙ্কন করেন। জীবনের শেষকাল তিনি ফ্রান্সে কাটান।- অনুবাদক (উইকিপিডিয়া থেকে)
৩৪২. গিয়ামবাতিস্তা ডেলা পোর্টা (১৫৩৫-১৬১৫ খ্রি.): ইতালীয় পণ্ডিত ও বহুবিদ্যাজ্ঞ। তার রচিত গ্রন্থাবলির বিষয়বস্তু হলো ঐন্দ্রজালিক দর্শন, জ্যোতিষতত্ত্ব, রসায়ন, গণিত, আবহবিদ্যা ও প্রাকৃতিক দর্শন।-অনুবাদক।
৩৪৩. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩০৪।
৩৪৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৩।
৩৪৫. জর্জ সার্টন, Introduction to the History of Science, খ. ১, পৃ. ৭২১।
৩৪৬. জর্জ সার্টন, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৮৪ ও তার পরবর্তী।
৩৪৭. ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর কায়রোতে অনুষ্ঠিত হাসান ইবনুল হাইসামের স্মরণে অনুষ্ঠিত বিজ্ঞান-সভায় প্রদত্ত মুস্তাফা নাজিফের ভাষণ। আল-জামইয়্যাহ আল-মিসরিয়্যাহ লিল উলুম আর-রিয়াদিয়্যাহ ওয়াত-তবিয়িয়্যাহ (ইজিপশিয়ান এসোসিয়েশন ফর ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড ন্যাচারাল সাইন্স) কর্তৃক ইবনুল হাইসামের ৯০০তম মৃত্যুবার্ষিক উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সভা ছিল এটি। ইবনুল হাইসাম ১০৪০ সালে কায়রোতে মৃত্যুবরণ করেন।

ইসলামি সভ্যতার পূর্বেই আলোকবিজ্ঞানের সূচনা ঘটেছিল। গ্রিক ও অন্যান্য প্রাচীন জাতি আলোকবিজ্ঞানের প্রতি বেশ গুরুত্ব প্রদান করেছিল। এই বিজ্ঞানশাখায় তাদের ভালো ভালো কীর্তি ও অবদান রয়েছে। মুসলিমরা আলোকবিজ্ঞানের চর্চার শুরুতে ওইসব অবদান ও কীর্তির ওপর নির্ভর করেছেন। আলোর প্রতিসরণ, প্রজ্জ্বলক আয়না (বার্নিং মিরর) ও অন্যান্য বিষয়ে তারা গ্রিক বিজ্ঞানীদের মতামত গ্রহণ করেছেন। তবে তারা কেবল গ্রহণ করেই ক্ষান্ত থাকেননি, বরং এই বিজ্ঞানশাখার বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন, নতুন নতুন অবিস্মরণীয় আবিষ্কারে একে সমৃদ্ধ করেছেন। তারা আলোকবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছেন।

### গ্রিক সভ্যতায় আলোকবিজ্ঞান
গ্রিক আলোকবিজ্ঞান দুটি বিপরীতধর্মী তত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। ১. প্রবেশন তত্ত্ব (Intromission theory), অর্থাৎ (দুই চোখে) এমন কিছুর প্রবেশ যা দুই চোখে বস্তুকে দৃশ্যমান করে তোলে বা দর্শনানুভূতির সৃষ্টি করে। ২. নিঃসরণ তত্ত্ব (Emission theory or extramission theory), অর্থাৎ দর্শনের ঘটনাটি ঘটে তখনই যখন চোখ থেকে আলো নিঃসৃত হয়ে দৃশ্যমান বস্তুর পৃষ্ঠদেশে প্রতিফলিত হয়। ৩২৮ গ্রিক সভ্যতা এই দুটি সিদ্ধান্তকে গ্রহণ ও বর্জনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অ্যারিস্টটলের প্রচেষ্টাগুলো অনিবার্যভাবে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। ইউক্লিডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যদিও তার প্রচেষ্টা অনেকটা বাস্তবিক। তবে তার তত্ত্বসমূহ ও তাত্ত্বিক বক্তব্য 'দর্শন'-এর পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা উপস্থাপনে ছিল সীমাবদ্ধ। কারণ তাতে 'দৃষ্টিসংক্রান্ত ঘটনা' (Optical phenomena)-এর শারীরিক, শারীরবৃত্তীয় ও মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো গুরুত্ব পায়নি। তিনি এই মত ব্যক্ত করেছিলেন যে, চোখ তার ও দর্শনযোগ্য বস্তুর মধ্যবর্তী স্বচ্ছ মাধ্যমে রশ্মি ফেলে, এই রশ্মি চোখের অভ্যন্তর থেকেই নিঃসৃত হয়। যেসব বস্তুর ওপর এই রশ্মি পড়ে তা দৃষ্টিগোচর হয় এবং যেসব বস্তুর ওপর পড়ে না তা দৃষ্টিগোচর হয় না। যেসব বস্তু বৃহৎ কোণ থেকে দৃষ্টিগোচর হয় সেগুলোকে বড় দেখায় এবং যেসব বস্তু ক্ষুদ্র কোণ থেকে দৃষ্টিগোচর হয় সেগুলোকে ছোট দেখায়।

অন্যদিকে টলেমি জ্যামিতিক নীতি ও ভৌতিক নীতির মধ্যে সামঞ্জস্যবিধানের চেষ্টা করেন। আলোকবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি পরীক্ষামূলক পদ্ধতিরও প্রবর্তন করেন। এটি ছিল মূল্যবান নতুন ধারা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কারণ এটির ব্যবহার এমনসব সিদ্ধান্তের সমর্থনে সীমাবদ্ধ ছিল, যেগুলোতে বিজ্ঞানীরা ইতিপূর্বে উপনীত হয়েছিলেন। কখনো কখনো পরীক্ষামূলক ফলাফল এসব সিদ্ধান্তকে সুরক্ষাদানের জন্যও ব্যবহৃত হয়েছিল। (৩২৯)

### মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান
আলোকবিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণা অতীতকালের এই ধারাতেই চলতে থাকে, কোনো অগ্রগতি বা উন্নতি দেখা যায় না। ইসলামি সভ্যতার সূচনাকাল পর্যন্ত তার অবস্থা থাকে এমনই। মুসলিম বিজ্ঞানীরা আলোকবিজ্ঞানে যে অবদান রাখেন তাতে এক বিকশিত ও অনন্য ধারার সৃষ্টি হয়। তার কারণ তারা আলোকবিজ্ঞানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি বিজ্ঞানশাখায় অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। যেমন জ্যোতির্বিজ্ঞান, যন্ত্রকৌশল ইত্যাদি। কারণ তাদের আবিষ্কারে ও উদ্ভাবনে এসব বিজ্ঞানশাখার সবগুলোই অন্তর্ভুক্ত ছিল।

### আবু ইউসুফ আল-কিন্দি (৩৩০)
দার্শনিক আবু ইউসুফ আল-কিন্দির আবির্ভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রাথমিক পর্যায়ের যে-সকল মুসলিম বিজ্ঞানী পদার্থবিজ্ঞান ও আলোকবিজ্ঞানের ময়দানে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন আল-কিন্দি তাদের অন্যতম। তিনি তার বিখ্যাত কিতাব 'ইল্যুল মানাযির'-এ আলো-সম্পর্কিত ঘটনাবলির ওপর আলোকপাত করেছেন এবং সেগুলোর পর্যালোচনা করেছেন। তিনি 'গ্রিক নির্গমন তত্ত্ব' গ্রহণ করেছেন। তবে তিনি চোখের রশ্মির বিচ্ছুরণ সম্পর্কে সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যাবলি বর্ণনা করেছেন। এসবের মধ্য দিয়ে তিনি একটি নতুন 'বিম্বিতকরণ পদ্ধতি' (ইমেজিং সিস্টেম)-এর মূলনীতি সূত্রবদ্ধ করেন। যা শেষ বিচারে নির্গমন-তত্ত্বেরই নামান্তর। কিন্তু তার 'ইল্যুল মানাযির' গ্রন্থটি মধ্যযুগে আরবের বিজ্ঞানজগতে তো বটেই, ইউরোপেও বেশ সাড়া ফেলেছিল। (৩৩১)

### হাসান ইবনুল হাইসাম: আলোকবিজ্ঞানের পথিকৃৎ
আবু ইউসুফ আল-কিন্দির পর এলেন হাসান ইবনুল হাইসাম। আলোকবিজ্ঞান ও 'দর্শন'-এর শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপের জগতে ইবনুল হাইসামের অবদান ও কীর্তি এক নতুন বিজয় ও দুঃসাহসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তার কাজগুলোই ছিল মূল ভিত্তি, যার ওপর পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীরা তাদের আলোকবিজ্ঞান-সংক্রান্ত যাবতীয় তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যে-সকল ভিনদেশি বিজ্ঞানী ইবনুল হাইসামের তত্ত্ব ও মতবাদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন তাদের পুরোভাগে রয়েছেন রজার বেকন ও ভিটেলো (Vitello) (৩৩২) এবং অন্য বিজ্ঞানীরা। শুধু তাই নয়, তারা তার তত্ত্ব চুরিও করেছেন এবং নিজেদের নামে চালিয়েও দিয়েছেন। বিশেষ করে অণুবীক্ষণযন্ত্র (মাইক্রোস্কোপ), দূরবীক্ষণযন্ত্র (টেলিস্কোপ) ও আতশি কাচ (ম্যাগনিফাইং গ্লাস) নিয়ে তারা যেসব গবেষণা করেছেন তাতে এই ব্যাপারটি বেশি ঘটেছে। (৩৩৩)

ইবনুল হাইসাম প্রথমে আলোকবিজ্ঞান ও 'দর্শন'-এর ক্ষেত্রে ইউক্লিড ও টলেমির তত্ত্বগুলোর পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করেন এবং দেখান যে এসব তত্ত্বের কিছু দিক সম্পূর্ণ গলদ। এই সময়ের মধ্যেই তিনি চোখ, লেন্স ও দুই চোখের দ্বারা দর্শন বিষয়ে সূক্ষ্ম ও যথার্থ বর্ণনা প্রদান করেন। তিনি পরীক্ষানিরীক্ষার সাহায্যে প্রমাণ করেন যে, বাহ্যিক বস্তু থেকে আলো এসে আমাদের চোখে পড়লেই দেখতে পাই। আলোকরশ্মি যখন সাধারণভাবে ভূগোলকে পরিব্যাপ্ত বায়ুর মধ্যে প্রবেশ করে তখন তার প্রতিসরণের পর্যায়ক্রম কীভাবে ঘটে তার বিবরণ প্রদান করেন। বিশেষ করে যখন তা স্বচ্ছ মাধ্যম যেমন বায়ু, পানি, বায়ুমণ্ডলের কণারাশি ভেদ করে (অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে) প্রবেশ করে। তখন আলোকরশ্মি সোজা না গিয়ে দিক পরিবর্তন করে। এই দিক পরিবর্তনের ঘটনাই হলো আলোর প্রতিসরণ। ইবনুল হাইসাম আলোর প্রতিফলন এবং প্রতিফলিত রশ্মি যে কোণ (প্রতিফলন-কোণ) উৎপন্ন করে সে সম্পর্কেও আলোচনা করেন। তিনি আরও জানান যে, মহাজাগতিক বস্তুরাশি সূর্যোদয়ের সময় দিগন্তে প্রকাশ পায় মূলত তা সেখানে পৌঁছার আগেই এবং সূর্যাস্তের সময় এর বিপরীত কাণ্ড ঘটে, তখন তা দিগন্তে দৃশ্যমান থাকে দিগন্ত-রেখার নিচে মিলিয়ে যাওয়ার পরও। তিনিই প্রথম ডার্করুমের ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা দেন, যা আলোকচিত্রের (ফটোগ্রাফির) মূল বিষয় হিসেবে বিবেচিত। (৩৩৪)

যে গ্রন্থ ইবনুল হাইসাম নামটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অমর করে রেখেছে তা হলো 'কিতাবুল মানাযির' (Book of Optics)। এই গ্রন্থ 'দর্শন'-এর প্রাথমিক তত্ত্ব হিসেবে আলোকবিজ্ঞানের ধারণা বিশ্লেষণ করে। ইউক্লিড থেকে শুরু করে, এমনকি আল-কিন্দি পর্যন্ত গাণিতিক ঐতিহ্য যে অনুমিত দৃশ্যমান (চোখ থেকে নির্গত) রশ্মির তত্ত্বকে আঁকড়ে রেখেছিল, ইবনুল হাইসামের উপর্যুক্ত তত্ত্ব ছিল তার থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। শুধু তাই নয়, ইবনুল হাইসাম 'দর্শন-প্রক্রিয়া'-র এই ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নতুন মেথোডলজি (নিয়মবিষয়ক বিজ্ঞান)-এরও প্রবর্তন করেন। তার এই কাজের ফলে চোখ থেকে নির্গত রশ্মির তত্ত্ব (নিঃসরণ তত্ত্ব) অনুসারে যেসব বিষয় অবোধগম্য ছিল সেগুলোর স্পষ্টীকরণ সম্ভব হয়। যে-সকল দার্শনিকের মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল 'অবলোকন'-এর সারবস্তুটা কী সেটাই ব্যাখ্যা করা এবং যারা 'অবলোকন'-এর ঘটনা কীভাবে ঘটে তা বিশ্লেষণ করতে ততটা মনোযোগ দেননি তাদের উভয়ের পক্ষ থেকে কিছু বিষয় অবহেলিত থেকে গিয়েছিল। ইবনুল হাইসামের নতুন মেথোডলজি প্রবর্তনের ফলে সেগুলোরও ব্যাখ্যাদান সম্ভব হয়। (৩৩৫)

ইবনুল হাইসাম কেবল আলোকবিজ্ঞান নিয়েই প্রায় চব্বিশটি বিষয় লিখেছেন। গ্রন্থাকারে, পুস্তিকাকারে ও প্রবন্ধ-আকারে এসব রচনা লিখেছেন তিনি। আমাদের জ্ঞানভান্ডার থেকে যা-কিছু হারিয়ে গেছে তার সঙ্গে ইবনুল হাইসামের এসব রচনার অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। যেগুলো বেঁচে গেছে সেগুলো ইস্তাম্বুল গ্রন্থাগার, লন্ডন গ্রন্থাগার ও অন্যান্য গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। তার মহাগ্রন্থ 'আল-মানাযির' ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। তার এই গ্রন্থে আলোকবিজ্ঞানের নব-উদ্ভাবিত তত্ত্বগুলো রয়েছে। গ্রন্থটি ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হওয়ার পর থেকে খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত আলোকবিজ্ঞানের প্রধান উৎস হিসেবে বিরাজমান ছিল। (৩৩৬)

'আল-মানাযির' গ্রন্থটি আলোকবিজ্ঞানের জগতে এক মহৈশ্বর্য। ইবনুল হাইসাম এই গ্রন্থে টলেমির তত্ত্বগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পরীক্ষানিরীক্ষা, সেগুলোর পরিবর্তন ও পরিমার্জন করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি টলেমির আলোকবিজ্ঞান-সম্পর্কিত কতিপয় তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ তিনি নতুন নতুন তত্ত্ব ও সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তার এসব তত্ত্ব ও সিদ্ধান্ত আধুনিক আলোকবিজ্ঞানের অস্থিমজ্জারূপে এখনো বিদ্যমান।

টলেমি দাবি করতেন যে-আমরা ইতিপূর্বে যেমন উল্লেখ করেছি-চোখ থেকে নিঃসৃত আলোকরশ্মি দর্শনযোগ্য বস্তুর ওপর পতিত হওয়ার মাধ্যমে দর্শন-প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তার পরবর্তী বিজ্ঞানীরাও এই তত্ত্বই গ্রহণ করেছেন। ইবনুল হাইসাম এসে এই তত্ত্বকে বাতিল করে দেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, দর্শন-প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় দৃষ্টিগ্রাহ্য বস্তু থেকে নির্গত আলোকরশ্মি চোখে এসে পড়ার ফলে। বহু পরীক্ষানিরীক্ষা ও এক্সপেরিমেন্টের পর ইবনুল হাইসাম দেখান যে, আলোকরশ্মি সমজাতীয় বা সমপ্রকৃতির মাধ্যমে সরল রেখায় প্রসারিত হয়। তিনি 'আল-মানাযির' গ্রন্থে তা প্রমাণ করে দেখান। (৩৩৭)

একটি বস্তুকে দুটি দেখার দ্বারা জোড়-দর্শন (ডিপ্লোপিয়া বা ডাবল ভিশন) ঘটা ব্যতিরেকেই দুই চোখের মাধ্যমে একইসঙ্গে একইসময়ে বস্তুরাশি দেখার পদ্ধতিটি কীরূপ তা গাণিতিক ও জ্যামিতিকভাবে প্রতিপাদন করেন ইবনুল হাইসাম। (৩৩৮) তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, দৃষ্টিগোচর বস্তুর দুটি প্রতিকৃতি চোখের রেটিনায় অভিন্নরূপে প্রতিভাত হয়। ইবনুল হাইসাম উপর্যুক্ত প্রতিপাদন ও এই ব্যাখ্যার দ্বারা বর্তমানে যে জিনিসটা স্টেরিওস্কোপ(৩৩৯) নামে পরিচিত তার প্রথম ভিত্তি স্থাপন করেন।

ইবনুল হাইসামই প্রথম ব্যক্তি যিনি চোখের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তিনি চক্ষু-ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে চোখের অংশগুলোর পরিচয় প্রদান করেন, সেগুলোর ব্যাখ্যা দেন এবং চিত্র অঙ্কন করে দেখান। তিনিই প্রথম চোখের বিভিন্ন অংশের নামকরণ করেন। পাশ্চাত্যজগৎ সরাসরি এসব নামই গ্রহণ করেছে অথবা তাদের ভাষায় সেগুলোর অনুবাদ করে নিয়েছে। এসব নামের মধ্যে রয়েছে কর্নিয়া, রেটিনা, ভিট্রিয়াস হিউমার, অ্যাকুয়াস হিউমার ইত্যাদি। (৩৪০)

### আলোকবিজ্ঞানে ইবনুল হাইসামের গুরুত্বপূর্ণ অবদান
তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি পিন-হোল বা ডার্করুম বা ডার্ককেবিনেট ব্যবহার করে পরীক্ষানিরীক্ষা চালান। এসব পরীক্ষানিরীক্ষা থেকে তিনি আবিষ্কার করেন যে, ডার্করুমের বা ডার্ককেবিনেটের অভ্যন্তরে বস্তুর ছবি উলটোভাবে প্রকাশ পায়। এভাবে তিনি ক্যামেরা আবিষ্কারের পথ সুগম করে তোলেন। এমন চিন্তাভাবনা ও পরীক্ষানিরীক্ষার কারণে ইবনুল হাইসাম দুজন ইতালীয় বিজ্ঞানী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (৩৪১) ও গিয়ামবাতিস্তা ডেলা পোর্টা (৩৪২) থেকে পাঁচশ বছর এগিয়ে রয়েছেন। (৩৪২)

চিত্র নং-৯ ইবনে হাইসাম রচিত ‘তাশরিহুল আইন’

ইবনুল হাইসামই প্রথমবারের মতো আলোকবিজ্ঞানের ময়দানে আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণের নিয়মাবলি প্রণয়ন করেন। আলোর গতিপথে আলোর প্রতিসরণ কীভাবে ঘটে তা তিনি কার্যকারণসহ ব্যাখ্যা করে বোঝান। অর্থাৎ বিভিন্ন মাধ্যম যেমন পানি, কাচ ও বায়ু ইত্যাদির মধ্য দিয়ে গমনকালে আলোর প্রতিসরণ ঘটে। ইবনুল হাইসাম তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইংরেজ বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন থেকে এগিয়ে রয়েছেন। (৩৪৪)

উপর্যুক্ত গ্রন্থে ইবনুল হাইসামের অন্যতম অর্জন হলো ডার্কবক্সের পরীক্ষানিরীক্ষা। এটিকে ক্যামেরা আবিষ্কারের প্রথম পদক্ষেপ বিবেচনা করা হয়। সাইন্টিফিক এনসাইক্লোপিডিয়ায় যেমন বলা হয়েছে, ইবনুল হাইসাম প্রথম ক্যামেরা-আবিষ্কারক হিসেবে বিবেচিত হন। এটি কার্যত ক্যামেরা অবস্কিউরা নামে পরিচিত। ক্যামেরা অবস্কিউরা ফটোগ্রাফিক ক্যামেরার অগ্রদূত। (৩৪২)

যে-কেউ 'কিতাবুল মানাযির' ও আলো-সম্পর্কিত বিষয়গুলো এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় অধ্যয়ন করবেন, তিনি অবশ্যই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে, ইবনুল হাইসাম একটি নতুন ধারা ও স্বভাব নিয়ে আলোকবিজ্ঞানের ওপর গবেষণা করেছেন, যা তার পূর্বে কেউই করেননি। ৪১১ হিজরি/১০২১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তিনি 'কিতাবুল মানাযির রচনা করেন। এতে তিনি তার গাণিতিক প্রতিভা, চিকিৎসা-অভিজ্ঞতা ও তার যাবতীয় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। ফলে তিনি এমন পরিণতিতে পৌঁছেছেন যা তাকে বিজ্ঞানজগতে শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি এমনসব বিজ্ঞানশাখার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, যা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বহু বিষয়ে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি পালটে দিয়েছে। (৩৪৬)

আলোকবিজ্ঞানে ইবনুল হাইসামের অসামান্য অবদান এবং নতুন ধারার উদ্ভাবনী গবেষণা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন অনালোচিত, অনেক মানুষের কাছেই অপরিচিত। অবশেষে আল্লাহ তাআলা এমন এক ব্যক্তিকে নিয়োজিত করে দেন যিনি তার যাবতীয় কর্মের সুলুক সন্ধান করেন, তার কীর্তি ও অবদানের ওপর আলো ফেলেন, সেগুলোকে মানুষের সামনে তুলে ধরেন। এই ব্যক্তি হলেন মিশরীয় বিজ্ঞানী মুস্তাফা নাজিফ। তিনি ইবনুল হাইসাম ও তার কর্মের ওপর দীর্ঘ গবেষণালব্ধ একটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থটি দুই খণ্ডে প্রকাশ করে। তিনি ইবনুল হাইসামের বিদ্যমান সব পাণ্ডুলিপি এবং অন্য শত শত উৎসগ্রন্থ পাঠে বিপুল প্রচেষ্টা ও শ্রম ব্যয় করেন। এভাবে তিনি এক বাস্তবিক সত্যে উপনীত হন। তা এই যে, ইবনুল হাইসাম এমন ব্যক্তিত্ব, যিনি ছিলেন একাদশ শতাব্দীর সূচনাকালে আলোকবিজ্ঞানের পথিকৃৎ।(৩৪৭)

আমরা যা-কিছু উল্লেখ করলাম তা আলোকবিজ্ঞানে মুসলিমদের বিপুল অবদানের নামমাত্র অংশ ছাড়া কিছু নয়। তাহলে আরও কী পরিমাণ বিস্ময়কর অবদান রয়েছে!

টিকাঃ
৩২৮. গণিতবিদ ইউক্লিড ও টলেমি ছিলেন এই তত্ত্বের প্রবক্তা।-অনুবাদক।
৩২৯. ডোনাল্ড আর. হিল, Islamic Science and Engineering, আরবি অনুবাদ, আল-উলুম ওয়াল-হানদাসা ফিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, অনুবাদক, আহমাদ ফুয়াদ পাশা, পৃ. ১০২।
৩৩০. আল-কিন্দি: আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক ইবনে আস-সাবাহ আল-কিন্দি (১৮৫-২৫৬ হি./৮০৫-৮৭৩ খ্রি.)। তার যুগের শ্রেষ্ঠ আরব ও ইসলামি দার্শনিক। কিন্দাহর রাজপুত্র। বসরায় বেড়ে ওঠেন, তারপর বাগদাদে চলে যান। চিকিৎসা, দর্শন, সংগীত, প্রকৌশল ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন এবং এসব বিষয়ে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। দেখুন, ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা, খ. ২, পৃ. ১৭২-১৭৭; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩১৫।
৩৩১. ডোনাল্ড আর. হিল, প্রাগুক্ত; মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ১৩৮।
৩৩২. আলোকবিজ্ঞানের ওপর ভিটেলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, Perspectiva। গ্রন্থটির রচনাকাল ১২৭০-১২৭৮ খ্রি.। এটি রচনা করতে গিয়ে তিনি সম্পূর্ণরূপে হাসান ইবনুল হাইসামের ওপর নির্ভর করেছেন।
৩৩৩. মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ১৩৮।
৩৩৪. প্রাগুক্ত।
৩৩৫. ডোনাল্ড আর. হিল, Islamic Science and Engineering, আরবি অনুবাদ, আল-উলুম ওয়াল-হানদাসা ফিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, অনুবাদক, আহমাদ ফুয়াদ পাশা, পৃ. ১০২।
৩৩৬. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, আল-উলুমুল বাহতাতি ফিল-হাদারাতিল আরাবিয়্যা ওয়াল-ইসলামিয়্যা, পৃ. ৩২৫, ইবনুল হাইসামের রচনাবলি প্রসঙ্গে।
৩৩৭. ইবনুল হাইসাম, কিতাবুল মানাযির, পৃ. ১৩৩।
৩৩৮. চোখ কীভাবে কাজ করে তা জানার জন্য দেখুন, ১. বাংলা একাডেমি বিজ্ঞান বিশ্বকোষ, ২য় খণ্ড, Eye (চোখ) ভুক্তি, পৃ. ১৫৫-১৫৮। ২. 'আমাদের চোখ যেভাবে দেখে', https://bit.ly/3mx5Yr5। ৩. 'মানুষের চোখ কিভাবে কাজ করে', https://www.deho.tv/ -অনুবাদক।
৩৩৯. স্টেরিওস্কোপ (Stereoscope): যে যন্ত্রের সাহায্যে সামান্য ব্যবধানের দুটি ভিন্ন চিত্রকে একক এবং ঘন বলে মনে হয়।-অনুবাদক।
৩৪০. হেনরি ক্রু, The Rise of Modern Physics; a Popular Sketch, পৃ. ৫৯; জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩০৫ থেকে উদ্ধৃত। আরও দেখুন, ডোনাল্ড আর. হিল, আল-উলুম ওয়াল-হানদাসা ফিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, অনুবাদক, আহমাদ ফুয়াদ পাশা, পৃ. ১০৪ ও তার পরবর্তী।
৩৪১. লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯ খ্রি.) : ইতালীয় শিল্পী, বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। ইতালীয় রেনেসাঁসের কালজয়ী চিত্রশিল্পী। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী লিওনার্দো দা ভিঞ্চির অন্যান্য পরিচয়ও সুবিদিত-ভাস্কর, স্থপতি, সংগীতজ্ঞ, সমরযন্ত্রশিল্পী এবং বিংশ শতাব্দীর বহু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের নেপথ্য জনক। তার বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে মোনালিসা, দা লাস্ট সাপার অন্যতম। তার শৈল্পিক মেধার বিকাশ ঘটে অল্প বয়স থেকেই। আনুমানিক ১৪৬৯ সালে রেনেসাঁসের অপর বিশিষ্ট শিল্পী ও ভাস্কর আন্দ্রেয়া ভেরোচ্চিয়োর কাছে ছবি আঁকায় ভিঞ্চির শিক্ষানবিশ জীবনের সূচনা। এই শিক্ষাগুরুর কাছেই তিনি ১৪৭৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে, বিশেষত চিত্রাঙ্কনে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। ১৪৭২ সালে তিনি চিত্রশিল্পীদের গিল্ডে ভর্তি হন এবং এই সময় থেকেই তার চিত্রকর জীবনের সূচনা হয়। গির্জা ও রাজপ্রাসাদের দেয়ালে চিত্রাঙ্কন এবং রাজকীয় ব্যক্তিবর্গের ভাস্কর্য নির্মাণের পাশাপাশি বেসামরিক এবং সামরিক প্রকৌশলী হিসাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান জ্ঞানের প্রয়োগ, অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ্যা, জীববিদ্যা, গণিত ও পদার্থবিদ্যার মতো বিচিত্র সব বিষয়ে তিনি গভীর অনুসন্ধিৎসা প্রদর্শন করেন এবং মৌলিক উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দেন। আনুমানিক ১৪৮২ সালে তিনি মিলান গমন করেন এবং সেখানে অবস্থানকালে তার বিখ্যাত দেয়ালচিত্র দা লাস্ট সাপার অঙ্কন করেন। ১৫০০ সালের দিকে তিনি ফ্লোরেন্স ফিরে আসেন এবং সামরিক বিভাগে প্রকৌশলী পদে নিয়োগ লাভ করেন। এই সময়েই তিনি তার বিশ্বখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা অঙ্কন করেন। জীবনের শেষকাল তিনি ফ্রান্সে কাটান।- অনুবাদক (উইকিপিডিয়া থেকে)
৩৪২. গিয়ামবাতিস্তা ডেলা পোর্টা (১৫৩৫-১৬১৫ খ্রি.): ইতালীয় পণ্ডিত ও বহুবিদ্যাজ্ঞ। তার রচিত গ্রন্থাবলির বিষয়বস্তু হলো ঐন্দ্রজালিক দর্শন, জ্যোতিষতত্ত্ব, রসায়ন, গণিত, আবহবিদ্যা ও প্রাকৃতিক দর্শন।-অনুবাদক।
৩৪৩. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩০৪।
৩৪৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৩।
৩৪৫. জর্জ সার্টন, Introduction to the History of Science, খ. ১, পৃ. ৭২১।
৩৪৬. জর্জ সার্টন, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৮৪ ও তার পরবর্তী।
৩৪৭. ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ডিসেম্বর কায়রোতে অনুষ্ঠিত হাসান ইবনুল হাইসামের স্মরণে অনুষ্ঠিত বিজ্ঞান-সভায় প্রদত্ত মুস্তাফা নাজিফের ভাষণ। আল-জামইয়্যাহ আল-মিসরিয়্যাহ লিল উলুম আর-রিয়াদিয়্যাহ ওয়াত-তবিয়িয়্যাহ (ইজিপশিয়ান এসোসিয়েশন ফর ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড ন্যাচারাল সাইন্স) কর্তৃক ইবনুল হাইসামের ৯০০তম মৃত্যুবার্ষিক উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সভা ছিল এটি। ইবনুল হাইসাম ১০৪০ সালে কায়রোতে মৃত্যুবরণ করেন।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 জ্যামিতি

📄 জ্যামিতি


প্রাচীন মানুষ তাদের প্রাকৃতিক প্রয়োজনেই জ্যামিতিবিদ্যা রপ্ত করেছিল। বিভিন্ন আয়তন ও ক্ষেত্রফলের পরিমাপ ও বাড়িঘর নির্মাণের জন্য জ্যামিতি আয়ত্ত করার প্রয়োজন হয়েছিল। বরং অনেকে এটাও বলে থাকেন যে, জ্যামিতি হলো সহজাত বিজ্ঞান। কারণ প্রাণীরাও জানে যে দুটি বিন্দুর মধ্যে হ্রস্বতম পথ হলো সরলরেখা।(৩৪৮)

প্রাচীন মিশরীয়দের দিয়ে আমরা জ্যামিতি বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে পারি। তারা যেসব জ্যামিতিক সূত্রের প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন সেগুলো পরবর্তীকালে পিথাগোরাসের সূত্র নামে প্রতিষ্ঠা পায়। তাদের কীর্তিগুলোই তাদের উৎকর্ষের সাক্ষ্য বহন করে। মিশরীয় রাজা আহমসের (Ahmose I) যুগের অর্থাৎ ৪০০০ বছর আগেকার যেসব দলিল-দস্তাবেজ পাওয়া গেছে তাতে পরিমাপ ও বিভিন্ন বস্তুর আকার ও আয়তন সম্পর্কে জ্যামিতিক চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। তারপর ব্যাবিলনের অধিবাসীরা প্রকৌশলবিদ্যায় নতুন অনেককিছু সংযোজন করে। গ্রিকরা ব্যাবিলনবাসী থেকে এই বিদ্যা আহরণ করে। জ্যামিতিবিজ্ঞানে গ্রিকরা প্রভূত উৎকর্ষ সাধন করে। প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইউক্লিড। তিনি জ্যামিতির মূলনীতি বিষয়ে Elements (Euclid's Elements) গ্রন্থটি রচনা করেন। এটি ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর অন্যতম। গ্রন্থটি প্রথমে আরবিতে অনূদিত হয়, তারপর তা ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়।(৩৪৯)

জ্যামিতিবিদ্যা আরবে আসে গ্রিক রচনাবলির আরবি অনুবাদের মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে Euclid's Elements গ্রন্থটির অনুবাদ এই ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। ডোনাল্ড আর. হিল(৩৫০) ইসলামি সভ্যতায় জ্যামিতিবিদ্যার বিকাশের ধারাগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, অনুবাদের ধারা শেষ হওয়ার পরপরই নতুন চিন্তাভাবনা ও উদ্ভাবনের ধারা শুরু হয়। ইউক্লিড, পেরগার অ্যাপোলোনিয়াস (Apollonius of Perga) ও আর্কিমিডিসের মতো মহান মনীষীরা যথেষ্ট সম্মান ও মর্যাদা লাভ করা সত্ত্বেও আরবের বিজ্ঞানীরা তাদের তত্ত্ব ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে কুণ্ঠিত হননি, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেগুলোর সংশোধন করেছেন। এভাবে আরব বিজ্ঞানীরা তাত্ত্বিক জ্যামিতিবিদ্যার ময়দানে অসাধারণ অবদান রেখেছেন।(৩৫১)

আমাদের বিস্ময়ভাব আরও বেড়ে যায় যখন আমরা জানি যে, তাদের এসব 'অসাধারণ অবদান' ছিল তাত্ত্বিক জ্যামিতিবিদ্যার ময়দানে, যেখানে মুসলিমরা তেমন মনোযোগ ও গুরুত্ব দেননি।

মুসলিম বিজ্ঞানীরা জ্যামিতিবিদ্যাকে দুটি ভাগে ভাগ করেছিলেন: এক. যৌক্তিক বা বৌদ্ধিক জ্যামিতি এবং দুই. অনুভূতিগ্রাহ্য জ্যামিতি। যৌক্তিক জ্যামিতি হলো তাত্ত্বিক জ্যামিতি এবং অনুভূতিগ্রাহ্য জ্যামিতি হলো প্রায়োগিক ও বাস্তবিক জ্যামিতি। বৌদ্ধিক ও তাত্ত্বিক প্রকৌশলবিদ্যায় মুসলিমরা তত বেশি কাজ করেননি, যদিও তারা এগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন এবং টীকা ও মন্তব্য সংযোজন করেছেন। তাদের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ ও গুরুত্ব ছিল প্রায়োগিক ও বাস্তবিক জ্যামিতিবিদ্যায়। কারিগরিশিল্প, স্থাপত্যশিল্প, নগরশিল্প ও অন্যান্য বিষয়ে তারা তার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন।(৩৫২) তাদের কর্মকাণ্ড ছিল এতটাই বিশাল ও বিস্তৃত যে, একসময় যেখানে 'জ্যামিতি' শব্দটা মৌলিকভাবে কেবল তাত্ত্বিক জ্যামিতিবিদ্যাকে বোঝাত, সেখানে আধুনিক আরবি ভাষায় শব্দটি এখন স্বাভাবিকভাবে প্রায়োগিক জ্যামিতিকেই বোঝায়।(৩৫৩)

আমরা আল-বিরুনির কতিপয় রচনায় জ্যামিতি-সম্পর্কিত তত্ত্ব ও দাবি দেখতে পাই। সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর প্রমাণের পদ্ধতিও রয়েছে। এসব প্রমাণ-পদ্ধতি নতুন ধারার ও গভীরতাসম্পন্ন। আল-বিরুনির এসব পদ্ধতি গ্রিক দার্শনিক ও গণিতবিদেরা যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করে আসছিলেন তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মুসলিম বিজ্ঞানীরা, বিশেষ করে ইবনুল হাইসাম জ্যামিতির দুটি ধারাই-সমতল জ্যামিতি (Plane geometry) ও ঘন জ্যামিতি (Solid geometry) আয়ত্ত করেন। আলো-সম্পর্কিত গবেষণায় এবং গোলক আয়না (Spherical mirror), নলাকার আয়না (Cylindrical mirror), শঙ্কু আয়না (Conical mirror), উত্তল আয়না (Convex mirror) ও অবতল আয়নায় (Concave mirror) বিভিন্ন অবস্থায় আলোর প্রতিফলন-বিন্দু নির্ধারণে তিনি জ্যামিতির প্রয়োগ ঘটান।(৩৫৪) এসবের জন্য সাধারণ সমাধান তৈরি করেন এবং এই ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে পৌঁছেন।(৩৫৫)

মুসলিম গণিতবিদেরা বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত নির্ধারণের পদ্ধতি বর্ণনা করেন এবং সমতল জ্যামিতির ক্ষেত্রে উৎকর্ষের পরিচয় দেন। বিশেষ করে সমান্তরাল জ্যামিতিক রেখা সম্পর্কিত কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে প্রথমত নাসিরুদ্দিন আত-তুসি সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। তিনি সমান্তরাল রেখার ক্ষেত্রে ইউক্লিডের তত্ত্বকে ত্রুটিপূর্ণ আখ্যায়িত করেন এবং তার কিতাবে হাইপোথিসিস-ভিত্তিক দলিল-প্রমাণ উপস্থিত করেন। তার এই কিতাবটির নাম ‘আর-রিসালাতুশ শাফিয়া আনিশ শাক্কি ফিল-খুতুতিল মুতাওয়াযিয়াহ’।

নাসিরুদ্দিন তুসি জ্যোতির্বিদ্যা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে ত্রিকোণমিতির ওপর বই লিখেছেন। তিনি জ্যোতির্বিদ্যার সাহায্য না নিয়েই গোলাকার ত্রিকোণমিতির বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। তিনিই প্রথম গোলাকার ত্রিকোণমিতিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা নির্ণয় করেন। তার অবদানের ফলে ত্রিকোণমিতি স্বতন্ত্র শাস্ত্রের মর্যাদা লাভ করে।

মুসলিম গণিতবিদেরা গোলকের সমতলকরণ-সম্পর্কিত বিদ্যার সঙ্গেও সকলের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।(৩৫৬) হাজি খলিফা এই বিদ্যার সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, এটা এমন জ্ঞান যার দ্বারা গোলককে সমতলে রূপান্তরিত করার পদ্ধতি জানা যায়, যেখানে রেখাগুলো এবং গোলকের অঙ্কিত বৃত্তগুলো অপরিবর্তিত থাকে এবং ওইসব বৃত্তকে বৃত্তাকৃতি থেকে রেখায় রূপান্তরিত করার পদ্ধতিও জানা যায়।(৩৫৭)

এই জ্ঞানের উপকারিতা কী? এই জ্ঞানের দ্বারা আলোকরশ্মি-সংক্রান্ত যন্ত্রের উদ্ভাবনের পদ্ধতি জানা যায়। সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি যেমন বলেছেন, এসব যন্ত্র ও তাদের কাজ, কীভাবে এগুলোর চিন্তাগত অবস্থাকে বাস্তবিক অবস্থা অনুযায়ী রূপদান করা যায়, এগুলোর দ্বারা কীভাবে জ্যোতির্বিদ্যার খুঁটিনাটি বিষয় জানা যায় এসব নিয়ে অনুশীলন ও চর্চা করাই এই জ্ঞানের উপকারিতা। জ্যামিতির এই শাখায় মুসলিম মনীষীদের রচনাবলির মধ্যে রয়েছে, আহমাদ ইবনে কাসির আল-ফারগানি রচিত 'আল-কামিল', আল-বিরুনি রচিত 'আল-ইসতিআব' এবং তাকিউদ্দিন আদ-দিমাশকি আশ-শামি(৩৫৮) রচিত 'দাসতুরুত-তারজিহ ফি কাওয়ায়িদিত-তাসতিহ'। আল্লাহ তাদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।(৩৫৯) এ বিষয়ে টলেমির একটি গ্রন্থ হলো Ptolemy's Planisphere। এটি আরবিতে 'তাসতিহুল কুরাহ' নামে অনূদিত হয়েছে।

মুসলিমগণ জ্যামিতির বিভিন্ন বিষয়, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, জ্যামিতিক সমস্যার সমাধান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। যেমন কোণের বণ্টন বা ত্রিখণ্ডন (Angle trisection), সুষম বহুভুজ (Regular polygon) অঙ্কন এবং বীজগণিতীয় সমীকরণের সঙ্গে একে মেলানো ইত্যাদি। বলা হয়ে থাকে যে, সাবিত ইবনে কুররা(৩৬০) কোণকে তিনটি সমান অংশে ভাগ করেন। তিনি এমন পদ্ধতি ব্যবহার করে কাজটি করেন যা ছিল গ্রিক বিজ্ঞানীদের অনুসৃত পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রফেসর কাদরি তাওকান বলেন, তৃতীয় হিজরির শুরুতেই অতিভুজের বদলে সাইন (Sine) ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কে এই কাজটির সূচনা করেছিলেন তা নির্ণয় করা কঠিন। তবে এটা প্রমাণিত সত্য যে, সাবিত ইবনে কুররাই মেনেলাউসের (Menelaus of Alexandria) তত্ত্বকে প্রমাণ করেছিলেন এবং তাকে বর্তমান রূপে উপস্থিত করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি জ্যামিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে কতিপয় ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধানও প্রদান করেছিলেন। খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে কয়েকজন পশ্চিমা বিজ্ঞানী তাদের গাণিতিক গবেষণায় এসব পদ্ধতি থেকে সাহায্য গ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন জিরোলামো কার্ডানো ও অন্যান্য বড় গণিতবিদ।(৩৬১)

প্রফেসর তাওকান আরও বলেন, গাণিতিক বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত কেউ কেউ স্বীকার করেননি যে, সাবিত ইবনে কুররা তাদের অন্যতম যারা ক্যালকুলাস (Calculus) উদ্ভাবনের পথ প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন।

উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের ক্ষেত্রে ক্যালকুলাসের ভূমিকা কী তা অজ্ঞাত নয়। যদি গণিতের এই শাখা না থাকত এবং অসংখ্য জটিল ও কঠিন গাণিতিক সমস্যার সমাধানে সাবিত যে সহজীকরণ-পদ্ধতিগুলো উদ্ভাবন করেছেন সেগুলো না হতো তাহলে প্রাকৃতিক নিয়মাবলি থেকে উপকারগ্রহণ অসম্ভব হতো এবং তা মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো যেত না। সাবিত তাদের অন্যতম যারা বিশ্লেষণমূলক জ্যামিতিতে মনোযোগ দিয়েছেন এবং সিদ্ধি লাভ করেছেন। বিশ্লেষণমূলক জ্যামিতিতে তিনি বহু নতুন বিষয় সংযোজন করেছেন যা তার আগে কেউ করতে পারেননি। তিনি বীজগণিতের ওপর একটি বই লিখেছেন, তাতে জ্যামিতির সঙ্গে বীজগণিতের সম্পর্ক এবং দুটিকে একত্রীকরণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।(৩৬২)

ফরাসি প্রাচ্যবিদ ব্যারন কারা ডি ভো(৩৬৩) ইসলামি সভ্যতার অবদান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আরবরা কার্যত অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কীর্তি অর্জন করেছে, তারা আমাদের শূন্য (০)-এর ব্যবহার শিখিয়েছে, যদিও তারা শূন্য (০)-এর উদ্ভাবক ছিল না। দৈনন্দিন জীবনের গণিতও তারাই শুরু করেছে। তারা বীজগণিতকে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞানশাখার রূপ দিয়েছে এবং এতে উৎকর্ষ সাধন করেছে। তারা বিশ্লেষণাত্মক জ্যামিতির ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা কোনো ধরনের বিতর্ক ব্যতিরেকেই সমতল ত্রিভুজ ও গোলাকার ত্রিভুজ এই দুটি জ্ঞানশাখার উদ্‌দ্গাতা এবং এই দুটির আবিষ্কারে গ্রিকদের কোনো অবদান নেই, সূক্ষ্ম বিচার ও ইনসাফ করতে চাইলে আমাদেরকে এ কথা বলতেই হবে।(৩৬৪)

বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়টিকে একটি উল্লম্ফন হিসেবে বিবেচনা করা যায় তা হলো আরবদের ভারতীয় সংখ্যা, বিশেষ করে শূন্য (০)-এর ব্যবহার। কে প্রথম শূন্য (০)-এর সংজ্ঞা বা পরিচয় দিয়েছিলেন তার বিতর্ক চলমান থাকলেও আরবরাই যে শূন্য (০)-এর প্রয়োগ ও ব্যবহার করেছিলেন তা নিয়ে কোনো মতবিরোধ নেই। তারা একে খালি জায়গা বা শূন্যস্থানের 'প্রকাশক' হিসেবে বিবেচনা করেছেন। শূন্য (০)-এর দ্বারাই দশকীয় সংখ্যাভিত্তিক হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন একক স্থানীয় সংখ্যা, দশক স্থানীয় সংখ্যা, শতক স্থানীয় সংখ্যা...। এভাবে বড় বড় সংখ্যা লেখা এবং বড় বড় অঙ্ক কষা সম্ভব হয়েছে। যা সেই লাতিন সংখ্যা ব্যবহার করে সম্পন্ন করা অসম্ভব ছিল।(৩৬৫)

জার্মান প্রাচ্যবিদ সিগরিড হুংকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে, এসব সংখ্যার ব্যবহার কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না অথবা আরবদের কোনো হস্তলিপিশৈলীও ছিল না। বরং তারা তাদের অসাধারণ প্রতিভার ফলেই ভারতবর্ষীয় পণ্যদ্রব্য ও উপঢৌকনের স্তূপ থেকে এই সংখ্যাগুলো কুড়িয়ে নিয়েছিলেন। কারণ, তারা যে অন্যান্য বিস্ময়কর ব্যাপারে মনোযোগ না দিয়ে এই ছোট ছোট সংখ্যাগুলোর মাহাত্ম্য আবিষ্কার করেছিলেন, তাতেই তারা প্রমাণ করেছিলেন যে তাদের রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা ও ব্যাপক অনুধাবনশক্তি। এই সংখ্যাগুলো ছিল মূলত ভারতবর্ষীয় উপঢৌকনের অলংকার। এই সংখ্যাগুলো কি আলেকজান্দ্রিয়ায় ও সিরিয়ার যেসব নগরীতে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা ছিল সেখানে পরিচিত ছিল না? ছিল। কিন্তু সংখ্যাগুলো আরবদের হাতে না আসা পর্যন্ত তাদের উজ্জ্বল আলো ছড়াতে পারেনি।(৩৬৬)

গণিতবিদেরা মনে করেন যে, মানবসভ্যতায় শূন্য (০) একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। বস্তুত শূন্য (০) ছাড়া ধনাত্মক পরিমাণ ও ঋণাত্মক পরিমাণের অস্তিত্বই (যেমন তড়িৎবিজ্ঞানে) অসম্ভব হতো এবং বীজগণিতে ধনাত্মক রাশি ও ঋণাত্মক রাশি বলে কিছু থাকত না।(৩৬৭)

তারপর আল-খাওয়ারিজমি কর্তৃক 'ইল্যুল জাব্র ওয়াল-মুকাবালা' প্রণয়নের ঘটনায় জ্যামিতিবিজ্ঞান আরেকটি উল্লম্ফন, আরেকটি বড় ধাপ অতিক্রম করে। বিজ্ঞানের এই শাখা সম্পর্কে আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে, মানববিদ্যায় মুসলিমদের অবদান প্রসঙ্গে আলোচনার সময় বিস্তারিত আলোচনা করব।

বস্তুর আয়তনের ক্ষেত্রে আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ পাই মুসা ইবনে শাকিরের পুত্রদের কাছ থেকে। জ্যামিতিবিদ্যায় তাদের মহৎ কাজ হলো معرفة مساحة الاشكال البسيطة والكرية (সরল ও গোলকার বস্তুর আয়তন প্রসঙ্গে) গ্রন্থ প্রণয়ন। এই গ্রন্থে তারা বর্ণনা করেছেন যে, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা বা বেধ-এই তিনটি পরিমাপ প্রত্যেক ঘনবস্তুর আয়তন ও প্রত্যেক সমতল বস্তুর ক্ষেত্রফলকে সীমাবদ্ধ করে। তাদের (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার) পরিমাণ নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি একটি সমতল বস্তু ও একটি ঘনবস্তুর সঙ্গে এবং একটি সমতল বস্তুর-যার দ্বারা তল বা পৃষ্ঠদেশকে পরিমাপ করা হয়-সঙ্গে তুলনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়। প্রতিটি বহুভুজ একটি বৃত্তকে বেষ্টন করে থাকে, তাই ওই বহুভুজের সকল ভুজের (বাহুর) অর্ধেকে ওই বৃত্তের ব্যাসার্ধ-পরিমাণ তল বা পৃষ্ঠদেশই তার ক্ষেত্রফল।(৩৬৮)

আর্কিমিডিসের Measurement of a Circle or Dimension of the Circle (বৃত্তের আয়তনের পরিমাপ) ও On the Sphere and Cylinder (গোলাকার ও বেলনাকার বস্তুর পরিমাপ) বিষয়ে দুটি বই রয়েছে। বানু মুসা ইবনে শাকিরের উপর্যুক্ত গ্রন্থটি আর্কিমিডিসের এই দুটি বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ সাধন করেছে। তারা তিন ভাই যে দুটি বিষয়ের সুবিধা কাজে লাগান তা হলো ইউডক্সাসের(৩৬৯) Method of exhaustion এবং আর্কিমিডিসের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তু (infinitesimals) সম্পর্কিত ধারণা। তাদের এই গ্রন্থ ইসলামি প্রাচ্যে ও লাতিনীয় পশ্চিমে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করেছিল।(৩৭০)

ক্ষেত্রফল প্রসঙ্গে মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাদের গণিত-বিষয়ক রচনাবলিতে আলোচনা করেছেন। কারণ ক্ষেত্রফল জ্যামিতিরই একটি শাখা। আমরা দেখি যে, বাহাউদ্দিন আল-আমিলি(৩৭১) তার আল-খুলাসাতু ফিল-হিসাব (الخلاصة في الحساب)(৩৭২) গ্রন্থে ষষ্ঠ অধ্যায়ের প্রথম তিনটি পরিচ্ছেদে কেবল ক্ষেত্রফল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এই অধ্যায়ের ভূমিকায় তিনি সমতল এবং ঘনবস্তুর আয়তন এবং ক্ষেত্রফলের ক্ষেত্রে কতিপয় প্রাথমিক সংজ্ঞার ওপর আলোকপাত করেছেন। প্রথম অনুচ্ছেদে তিনি সরল বাহুবদ্ধ তলের (সমতলের) ক্ষেত্রফল সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন। যেমন: ত্রিভুজ, বর্গক্ষেত্র, আয়তক্ষেত্র, রম্বস, চতুর্ভুজ, ষড়ভুজ, অষ্টভুজ এবং অন্যান্য সুষম বাহুর বস্তু। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অনুচ্ছেদে আলোচনা করেছেন বৃত্ত ও বক্রতল, যেমন সিলিন্ডার, পূর্ণাঙ্গ কোণ, অপূর্ণাঙ্গ কোণ, গোলাকার বস্তু ইত্যাদির ক্ষেত্রফল কীভাবে পাওয়া যায় তার পদ্ধতি নিয়ে। সপ্তম অধ্যায়ে ভূপৃষ্ঠে বিভিন্ন ক্ষেত্রফল ও পরিমাপ-সম্পর্কিত কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন। জলপথ তৈরির জন্য জরিপ পরিচালনা, বিভিন্ন পর্যায়ের উচ্চতা পরিমাপ এবং নদীর প্রস্থ ও কূপের গভীরতা জানার জন্য এসব বিষয় সংযোজন করেছেন।

মুসলিমরা তাদের জ্যামিতিক জ্ঞানকে বাস্তবিক রূপ দিয়েছেন এবং তা তাদের স্থাপত্যশিল্পে প্রয়োগ করেছেন। এটা ছিল একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। মসজিদ, অট্টালিকা, প্রাসাদ ও শহর নির্মাণে তার যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের মনোযোগ ও গুরুত্ব ছিল জ্যামিতিক কারুকার্যের প্রতিও, যা ছিল বিন্যাসে ও সূক্ষ্মতায় অনন্য। যদিও ইসলামি শিল্প (ইসলামিক আর্ট) সম্পর্কিত আলোচনা-পর্যালোচনায় এ বিষয়টি (ইসলামি স্থাপত্যকলা) যথেষ্ট জায়গা দখল করে নিয়েছে, কিন্তু তা তো স্থাপত্যপ্রকৌশলের একটি মৌলিক দিক বলেই বিবেচিত। ইসলামি স্থাপত্যকলার মৌলিকতা ও অনন্যতার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ প্রাচ্যবিদ মার্টিন এস. ব্রিপ্স(৩৭৩)। তিনি বলেছেন, সাম্রাজ্য বিস্তারের শুরুর দিকে স্থাপত্যপ্রকৌশল-সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি আরবদের অজানা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বটে, তবে ইসলামি স্থাপত্যকলা সম্পর্কে এটা জাজ্বল্যমান সত্য যে, ইসলাম তার পতাকা উড়িয়েছে যত দেশে, যত যুগ অতিবাহিত করেছে সেখানে, তার সব জায়গায় ও সবসময়ই ইসলামি স্থাপত্যকলাই নির্মাণশৈলী হিসেবে আধিপত্য ধরে রেখেছে। অথচ ইসলামি স্থাপত্যকলার নীতিমালা অত্যন্ত জটিল (অর্থাৎ প্রভাব-বিস্তারক)। এমন কিছু ব্যাপার আছে যা ইসলামি স্থাপত্যশিল্পকে স্থানীয় সব ধরনের স্থাপত্য- ঘরানার কীর্তিকলাপ থেকে পৃথক রেখেছে। যদিও স্থানীয় স্থাপত্য- ঘরানাগুলো নিজেদের জায়গায় ছিল নির্মাণশিল্পের হাতিয়ার।(৩৭৪)

জ্যামিতিবিজ্ঞানে মুসলিমদের শ্রেষ্ঠত্ব ইসলামি সভ্যতার একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। এই ক্ষেত্রে তাদের অবদানকে কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। তবে কেউ ইচ্ছা করে স্বীকার না করলে ভিন্ন কথা। মুহাম্মাদ কুদ আলি লুইস সিডিও (Louis-Amélie Sédillot)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, আরবদের (আরব মুসলিমদের) স্থাপত্যপ্রকৌশলে যে সৃজনশীলতা ও উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে সে ব্যাপারে যারা জানে সবাই তাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। এই ক্ষেত্রে তাদের কোনো প্রতিযোগী বা প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আরবরা তাদের নিজস্ব স্টাইলের ভবন উদ্ভাবন করেনি বটে, তবে তাদের স্থাপত্যকলায় কারুকার্য ও কমনীয়তার প্রতি তাদের ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। তারা খিলানযুক্ত তোরণ ও কম্পাসীয় নকশা অঙ্কনে সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের মসজিদ ও অট্টালিকার জন্য ফুল ও লতাপাতাযুক্ত গম্বুজ, ছাদ ও আসন নির্মাণে তারা যে স্থাপত্য নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছে তা যুগ যুগ ধরে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। এসব ব্যাপার নকশা ও কারুকার্যের প্রতি তাদের যে প্রগাঢ় ভালোবাসা তা-ই প্রমাণ করে। তাদের অট্টালিকাসমূহ ও নির্মাণশিল্পগুলো যেন প্রাচ্যের এক থান কাপড়, যার নকশায় ও অলংকরণে তাঁতি চরম শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছে। একজন ফিরিঙ্গি প্রাজ্ঞ ব্যক্তির স্বীকৃতি এমনই।(৩৭৫)

জ্যামিতিবিজ্ঞানের বিকাশে মুসলিমদের অবদানের কিছুমাত্র অংশ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। তাদের অবদানের ফলে জ্যামিতির ব্যবহার ও প্রয়োগে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছিল। অবশ্য তার আগে তারা পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর উত্তরাধিকার নিজেদের আয়ত্ত করেও নিয়েছিলেন।

টিকাঃ
৩৪৮. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ৬৭।
৩৪৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৭-৬৯।
৩৫০. ডোনাল্ড আর, হিল (Donald Routledge Hill 1922-1994): ব্রিটিশ প্রকৌশলী এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাস-বিশেষজ্ঞ। মুসলিম প্রকৌশলী বদিউযযামান আল-জাযারির كتاب فى معرفة الحيل الهندسية গ্রন্থটি অনুবাদের জন্য তিনি সমধিক পরিচিত। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৯ সালে প্রকৌশলে স্নাতক হন। ১৯৬৪ সালে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামি ইতিহাসে এম. লিট (মাস্টার্স অফ লেটার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ: ১. Islamic Technology: An Illustrated History (আহমাদ ইউসুফ আল-হাসানের সঙ্গে যৌথভাবে); ২. Islamic Science and Engineering; ৩. On The Construction of Water-Clocks-Kitab Arshimidas Fi'amal Al- Binkamat; ৪. The Book of Knowledge of Ingenious Mechanical Devices: Kitáb fi ma'rifat al-hiyal al-handasiyya (অনুবাদ); ৫. The Book of Ingenious Devices (অনুবাদ)।
৩৫১. ডোনাল্ড আর. হিল, আল-উলুম ওয়াল-হানদাসা ফিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৪৬।
৩৫২. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ৭০-৭১।
৩৫৩. ডোনাল্ড আর. হিল, আল-উলুম ওয়াল-হানদাসা ফিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৪৭।
৩৫৪. একে দর্পণ আলোকবিজ্ঞান (Mirror optics) বলা হয়। প্রতিবিম্ব সৃষ্টি এবং তা বিশেষ কোনো দিকে চালিত করা অথবা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে সমতল অথবা বক্র প্রতিফলক পৃষ্ঠদেশের ব্যবহার-সম্পর্কিত বিদ্যাই দর্পণ আলোকবিজ্ঞান।-অনুবাদক।
৩৫৫. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৫৮।
৩৫৬. গোলাকার সমতলকরণ (Flattening) ব্যাসের সঙ্গে একটি বৃত্তের বা গোলকের সংকোচনের পরিমাপ; যথাক্রমে উপবৃত্ত বা উপগোলক গঠন করতে এটি করা হয়।- অনুবাদক
৩৫৭. হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, পৃ. ৪০৩।
৩৫৮. তাকিউদ্দিন আদ-দিমাশকি : মুহাম্মাদ ইবনে মারুফ আর-রাসিদ আশ-শামি (৯২৭-৯৯৩ হি./১৫২১-১৫৮৫ খ্রি.)। দার্শনিক, জ্যোতির্বিদ, গণিতজ্ঞ, পদার্থবিদ, রসায়নবিদ, ওষুধবিজ্ঞানী, কৃষিবিজ্ঞানী ও যন্ত্রপ্রকৌশলী। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তার নব্বইটিরও বেশি গ্রন্থ রয়েছে।
৩৫৯. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ১৩৭-১৩৮।
৩৬০. সাবিত ইবনে কুররা : আবুল হাসান সাবিত ইবনে কুররা ইবনে মারওয়ান ইবনে সাবিত (২২১-২৮৮ হি./৮৩৬-৯০১ খ্রি.)। গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ, চিকিৎসক ও অনুবাদক। আব্বাসি খলিফা মু'তাদিদ বিল্লাহর ঘনিষ্ঠভাজন ছিলেন। টলেমির Almagest গ্রন্থের যেসব অনুবাদ আরবি ভাষায় বেরিয়েছিল সেগুলোর মধ্যে তার অনুবাদই সবচেয়ে সম্পূর্ণ। টলেমির 'প্ল্যানেটারি হাইপোথেসিস' গ্রন্থটির খুব সম্ভবত তিনিই অনুবাদ করেছিলেন। অনুবাদের সময় তিনি মূল লেখকের গণনা ও পর্যবেক্ষণকে পরীক্ষা করে দেখতেন এবং প্রয়োজনমতো সংশোধন করে নিতেন। জ্যোতির্বিদ্যার গবেষণায় তার অন্যতম মৌলিক অবদান হলো অয়নচলনের (precession) পরিমাণের ক্ষেত্রে এক আপাত ব্যত্যয়ের অনুমান, যা trepidation নামে পরিচিত। যা পরবর্তী কয়েক শতাব্দীব্যাপী জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণিকে প্রভাবিত করে রেখেছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে তার বিভিন্ন রচনার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
৩৬১. কাদরি তাওকান, তুরাসুল আরাবিল ইলমি ফির-রিয়াদিয়্যাতি ওয়াল-ফালাক, পৃ. ৮৪ ও তার পরবর্তী; জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৫৯ থেকে উদ্ধৃত।
৩৬২. প্রাগুক্ত।
৩৬৩. ব্যারন বার্নার্ড কারা ডি ভো (Baron Bernard Carra De Vaux): ফরাসি প্রাচ্যবিদ। ফরাসি ভাষাতেই লিখেছেন। তার আগ্রহের বিষয় ছিল আরবের জ্ঞানভান্ডার। মুসলিম বিজ্ঞানীদের কয়েকটি রচনা তিনি পুনর্নিরীক্ষণ ও সম্পাদনা করেছেন।
৩৬৪. The Legacy of Islam, থমাস ওয়াকার আর্নল্ড কর্তৃক সম্পাদিত, আরবি অনুবাদ, তুরাসুল ইসলাম (১৯৫৪), অনুবাদ ও টীকা সংযোজন, জার্জিস ফাতহুল্লাহ, পৃ. ৫৬৩-৫৬৪।
৩৬৫. আবদুল হালিম মুনতাসির, তারিখুল ইল্ল্ম ওয়া দাওরুল উলামা আল-আরাব ফি তাকাদ্দুমিহি, পৃ. ৬৪।
৩৬৬. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ১৫৭।
৩৬৭. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ৫৬।
৩৬৮. বানু মুসা ইবনে শাকির, কিতাবু মারিফাতি মাসাহাতিল আশকাল, সম্পাদনা, নাসিরুদ্দিন আত-তুসি, পৃ. ২; খালিদ আহমাদ হারবি, উলুমু হাদারাতিল ইসলাম ওয়া দাওরুহা ফিল-হাদারাতিল ইনসানিয়্যা, পৃ. ১৫৪ থেকে উদ্ধৃতি।
৩৬৯. ইউডক্সাস (Eudoxus of Cnidus 390-337 BC): গ্রিক গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ। দরিদ্র পরিবারের সন্তান ইউডক্সাস একাডেমিতে অধ্যয়ন করেন। প্লেটোর কাছেও তিনি শিক্ষাগ্রহণ করেন। তারপর উচ্চ শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে মিশরে যান। তিনি তুর্কিস্তানে ও পরে এথেন্স নগরীতে দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেছেন। তার বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গ্রন্থের কোনোটিই মূল অবস্থায় পাওয়া যায়নি। হিপ্পারচুস, ইউক্লিড ও আর্কিমিডিসের লেখা থেকে তার বৈজ্ঞানিক অবদানের কথা জানা যায়। তিনিই হলেন প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞানী যার খগোল বা মহাজাগতিক গোলক সম্পর্কে সঠিক বৈজ্ঞানিক ধারণা ছিল। তিনি প্রথম গ্রিক বিজ্ঞানী যিনি জানতেন এক বছর ঠিক ৩৬৫ দিন নয়, তার চেয়ে ঘণ্টা ছয়েক বেশি। তিনি পৃথিবীর একটি মানচিত্র এঁকেছিলেন এবং মহাকাশকে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশে ভাগ করে নক্ষত্ররাজির একটা মানচিত্র অঙ্কনেও হাত দিয়েছিলেন। গণিতে তিনি অনুপাতের তত্ত্বকে মূলদ ও অমূলদ উভয় রাশির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করে তোলেন। বক্ররেখার দ্বারা আবদ্ধ কোনো ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করার জন্য এক যথোপযুক্ত গাণিতিক পদ্ধতিও (Method of exhaustion) উদ্ভাবন করেছিলেন। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে তিনি বৃত্তের ক্ষেত্রফল যে তার ব্যাসার্ধের বর্গমূলের আনুপাতিক হয় এবং এর আয়তন তার ব্যাসার্ধের ঘনমূলের আনুপাতিক হয় তা প্রমাণ করেছিলেন।
৩৭০. আবদুল হামিদ সাবরাহ, বানু মুসা ইবনে শাকির, The Genius of Arab Civilization Source of Renaissance, সম্পাদক, আর. বি. উইন্ডার, আরবি অনুবাদ, عبقرية الحضارة العربية منبع النهضة الأوروبية, অনুবাদক, আবদুল কারিম মাহফুজ, পৃ. ২৫; উলুমু হাদারাতিল ইসলাম ওয়া দাওরুহা ফিল-হাদারাতিল ইনসানিয়‍্যা, পৃ. ১৫৫ থেকে উদ্ধৃতি।
৩৭১. বাহাউদ্দিন আল-আমিলি: বাহাউদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে হুসাইন ইবনে আবদুস সামাদ আল-হারিসি, শাইখ বাহায়ি বা বাহাউদ্দিন আল-আমিলি নামে সমধিক পরিচিত (৯৫৩-১০৩১ হি./১৫৪৭-১৬২২ খ্রি.)। ফকিহ, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। বা'লাবাক্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ইস্পাহানে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : تشريح الأفلاك - في علم الهيئة، رسالة في حل إشكالي عطارد والقمر، الصحيفة في الأعمال الاسطرلابية، رسالة في تضاريس الأرض، المخلاة، الكشكول, حديقة السالكين، بداية الهداية، الزبدة في الأصول، هداية الأمة إلى أحكام الأئمة। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ১০২।
৩৭২. বইটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন G. H. F. Nesselmann, যা ১৮৪৩ সালে প্রকাশিত হয়।-অনুবাদক
৩৭৩. মার্টিন এস. ব্রিগ্‌স (Martin Shaw Briggs 1882-1977): ব্রিটিশ স্থাপত্য-ইতিহাসবিদ, বারোক পিরিয়ডে বিশেষজ্ঞ এবং রয়াল ইন্সটিটিউট অফ ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস-এর ভাইস- প্রেসিডেন্ট। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: Muhammadan architecture in Egypt and Palestine (1974), Baroque Architecture (1913), The architect in History (1927).-অনুবাদক
৩৭৪. থমাস ওয়াকার আর্নল্ড কর্তৃক সম্পাদিত তুরাসুল ইসলাম (১৯৫৪), পৃ. ২৩২।
৩৭৫. মুহাম্মাদ কুরূদ আলি, আল-ইসলাম ওয়াল-হাদারাহ আল-আরাবিয়‍্যাহ, খ. ১, পৃ. ২৩৮।

প্রাচীন মানুষ তাদের প্রাকৃতিক প্রয়োজনেই জ্যামিতিবিদ্যা রপ্ত করেছিল। বিভিন্ন আয়তন ও ক্ষেত্রফলের পরিমাপ ও বাড়িঘর নির্মাণের জন্য জ্যামিতি আয়ত্ত করার প্রয়োজন হয়েছিল। বরং অনেকে এটাও বলে থাকেন যে, জ্যামিতি হলো সহজাত বিজ্ঞান। কারণ প্রাণীরাও জানে যে দুটি বিন্দুর মধ্যে হ্রস্বতম পথ হলো সরলরেখা।(৩৪৮)

প্রাচীন মিশরীয়দের দিয়ে আমরা জ্যামিতি বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে পারি। তারা যেসব জ্যামিতিক সূত্রের প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন সেগুলো পরবর্তীকালে পিথাগোরাসের সূত্র নামে প্রতিষ্ঠা পায়। তাদের কীর্তিগুলোই তাদের উৎকর্ষের সাক্ষ্য বহন করে। মিশরীয় রাজা আহমসের (Ahmose I) যুগের অর্থাৎ ৪০০০ বছর আগেকার যেসব দলিল-দস্তাবেজ পাওয়া গেছে তাতে পরিমাপ ও বিভিন্ন বস্তুর আকার ও আয়তন সম্পর্কে জ্যামিতিক চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। তারপর ব্যাবিলনের অধিবাসীরা প্রকৌশলবিদ্যায় নতুন অনেককিছু সংযোজন করে। গ্রিকরা ব্যাবিলনবাসী থেকে এই বিদ্যা আহরণ করে। জ্যামিতিবিজ্ঞানে গ্রিকরা প্রভূত উৎকর্ষ সাধন করে। প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইউক্লিড। তিনি জ্যামিতির মূলনীতি বিষয়ে Elements (Euclid's Elements) গ্রন্থটি রচনা করেন। এটি ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর অন্যতম। গ্রন্থটি প্রথমে আরবিতে অনূদিত হয়, তারপর তা ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়।(৩৪৯)

জ্যামিতিবিদ্যা আরবে আসে গ্রিক রচনাবলির আরবি অনুবাদের মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে Euclid's Elements গ্রন্থটির অনুবাদ এই ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। ডোনাল্ড আর. হিল(৩৫০) ইসলামি সভ্যতায় জ্যামিতিবিদ্যার বিকাশের ধারাগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, অনুবাদের ধারা শেষ হওয়ার পরপরই নতুন চিন্তাভাবনা ও উদ্ভাবনের ধারা শুরু হয়। ইউক্লিড, পেরগার অ্যাপোলোনিয়াস (Apollonius of Perga) ও আর্কিমিডিসের মতো মহান মনীষীরা যথেষ্ট সম্মান ও মর্যাদা লাভ করা সত্ত্বেও আরবের বিজ্ঞানীরা তাদের তত্ত্ব ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে কুণ্ঠিত হননি, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেগুলোর সংশোধন করেছেন। এভাবে আরব বিজ্ঞানীরা তাত্ত্বিক জ্যামিতিবিদ্যার ময়দানে অসাধারণ অবদান রেখেছেন।(৩৫১)

আমাদের বিস্ময়ভাব আরও বেড়ে যায় যখন আমরা জানি যে, তাদের এসব 'অসাধারণ অবদান' ছিল তাত্ত্বিক জ্যামিতিবিদ্যার ময়দানে, যেখানে মুসলিমরা তেমন মনোযোগ ও গুরুত্ব দেননি।

মুসলিম বিজ্ঞানীরা জ্যামিতিবিদ্যাকে দুটি ভাগে ভাগ করেছিলেন: এক. যৌক্তিক বা বৌদ্ধিক জ্যামিতি এবং দুই. অনুভূতিগ্রাহ্য জ্যামিতি। যৌক্তিক জ্যামিতি হলো তাত্ত্বিক জ্যামিতি এবং অনুভূতিগ্রাহ্য জ্যামিতি হলো প্রায়োগিক ও বাস্তবিক জ্যামিতি। বৌদ্ধিক ও তাত্ত্বিক প্রকৌশলবিদ্যায় মুসলিমরা তত বেশি কাজ করেননি, যদিও তারা এগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন এবং টীকা ও মন্তব্য সংযোজন করেছেন। তাদের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ ও গুরুত্ব ছিল প্রায়োগিক ও বাস্তবিক জ্যামিতিবিদ্যায়। কারিগরিশিল্প, স্থাপত্যশিল্প, নগরশিল্প ও অন্যান্য বিষয়ে তারা তার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন।(৩৫২) তাদের কর্মকাণ্ড ছিল এতটাই বিশাল ও বিস্তৃত যে, একসময় যেখানে 'জ্যামিতি' শব্দটা মৌলিকভাবে কেবল তাত্ত্বিক জ্যামিতিবিদ্যাকে বোঝাত, সেখানে আধুনিক আরবি ভাষায় শব্দটি এখন স্বাভাবিকভাবে প্রায়োগিক জ্যামিতিকেই বোঝায়।(৩৫৩)

আমরা আল-বিরুনির কতিপয় রচনায় জ্যামিতি-সম্পর্কিত তত্ত্ব ও দাবি দেখতে পাই। সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর প্রমাণের পদ্ধতিও রয়েছে। এসব প্রমাণ-পদ্ধতি নতুন ধারার ও গভীরতাসম্পন্ন। আল-বিরুনির এসব পদ্ধতি গ্রিক দার্শনিক ও গণিতবিদেরা যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করে আসছিলেন তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মুসলিম বিজ্ঞানীরা, বিশেষ করে ইবনুল হাইসাম জ্যামিতির দুটি ধারাই-সমতল জ্যামিতি (Plane geometry) ও ঘন জ্যামিতি (Solid geometry) আয়ত্ত করেন। আলো-সম্পর্কিত গবেষণায় এবং গোলক আয়না (Spherical mirror), নলাকার আয়না (Cylindrical mirror), শঙ্কু আয়না (Conical mirror), উত্তল আয়না (Convex mirror) ও অবতল আয়নায় (Concave mirror) বিভিন্ন অবস্থায় আলোর প্রতিফলন-বিন্দু নির্ধারণে তিনি জ্যামিতির প্রয়োগ ঘটান।(৩৫৪) এসবের জন্য সাধারণ সমাধান তৈরি করেন এবং এই ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে পৌঁছেন।(৩৫৫)

মুসলিম গণিতবিদেরা বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত নির্ধারণের পদ্ধতি বর্ণনা করেন এবং সমতল জ্যামিতির ক্ষেত্রে উৎকর্ষের পরিচয় দেন। বিশেষ করে সমান্তরাল জ্যামিতিক রেখা সম্পর্কিত কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে প্রথমত নাসিরুদ্দিন আত-তুসি সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। তিনি সমান্তরাল রেখার ক্ষেত্রে ইউক্লিডের তত্ত্বকে ত্রুটিপূর্ণ আখ্যায়িত করেন এবং তার কিতাবে হাইপোথিসিস-ভিত্তিক দলিল-প্রমাণ উপস্থিত করেন। তার এই কিতাবটির নাম ‘আর-রিসালাতুশ শাফিয়া আনিশ শাক্কি ফিল-খুতুতিল মুতাওয়াযিয়াহ’।

নাসিরুদ্দিন তুসি জ্যোতির্বিদ্যা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে ত্রিকোণমিতির ওপর বই লিখেছেন। তিনি জ্যোতির্বিদ্যার সাহায্য না নিয়েই গোলাকার ত্রিকোণমিতির বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। তিনিই প্রথম গোলাকার ত্রিকোণমিতিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা নির্ণয় করেন। তার অবদানের ফলে ত্রিকোণমিতি স্বতন্ত্র শাস্ত্রের মর্যাদা লাভ করে।

মুসলিম গণিতবিদেরা গোলকের সমতলকরণ-সম্পর্কিত বিদ্যার সঙ্গেও সকলের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।(৩৫৬) হাজি খলিফা এই বিদ্যার সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, এটা এমন জ্ঞান যার দ্বারা গোলককে সমতলে রূপান্তরিত করার পদ্ধতি জানা যায়, যেখানে রেখাগুলো এবং গোলকের অঙ্কিত বৃত্তগুলো অপরিবর্তিত থাকে এবং ওইসব বৃত্তকে বৃত্তাকৃতি থেকে রেখায় রূপান্তরিত করার পদ্ধতিও জানা যায়।(৩৫৭)

এই জ্ঞানের উপকারিতা কী? এই জ্ঞানের দ্বারা আলোকরশ্মি-সংক্রান্ত যন্ত্রের উদ্ভাবনের পদ্ধতি জানা যায়। সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি যেমন বলেছেন, এসব যন্ত্র ও তাদের কাজ, কীভাবে এগুলোর চিন্তাগত অবস্থাকে বাস্তবিক অবস্থা অনুযায়ী রূপদান করা যায়, এগুলোর দ্বারা কীভাবে জ্যোতির্বিদ্যার খুঁটিনাটি বিষয় জানা যায় এসব নিয়ে অনুশীলন ও চর্চা করাই এই জ্ঞানের উপকারিতা। জ্যামিতির এই শাখায় মুসলিম মনীষীদের রচনাবলির মধ্যে রয়েছে, আহমাদ ইবনে কাসির আল-ফারগানি রচিত 'আল-কামিল', আল-বিরুনি রচিত 'আল-ইসতিআব' এবং তাকিউদ্দিন আদ-দিমাশকি আশ-শামি(৩৫৮) রচিত 'দাসতুরুত-তারজিহ ফি কাওয়ায়িদিত-তাসতিহ'। আল্লাহ তাদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।(৩৫৯) এ বিষয়ে টলেমির একটি গ্রন্থ হলো Ptolemy's Planisphere। এটি আরবিতে 'তাসতিহুল কুরাহ' নামে অনূদিত হয়েছে।

মুসলিমগণ জ্যামিতির বিভিন্ন বিষয়, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, জ্যামিতিক সমস্যার সমাধান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। যেমন কোণের বণ্টন বা ত্রিখণ্ডন (Angle trisection), সুষম বহুভুজ (Regular polygon) অঙ্কন এবং বীজগণিতীয় সমীকরণের সঙ্গে একে মেলানো ইত্যাদি। বলা হয়ে থাকে যে, সাবিত ইবনে কুররা(৩৬০) কোণকে তিনটি সমান অংশে ভাগ করেন। তিনি এমন পদ্ধতি ব্যবহার করে কাজটি করেন যা ছিল গ্রিক বিজ্ঞানীদের অনুসৃত পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রফেসর কাদরি তাওকান বলেন, তৃতীয় হিজরির শুরুতেই অতিভুজের বদলে সাইন (Sine) ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কে এই কাজটির সূচনা করেছিলেন তা নির্ণয় করা কঠিন। তবে এটা প্রমাণিত সত্য যে, সাবিত ইবনে কুররাই মেনেলাউসের (Menelaus of Alexandria) তত্ত্বকে প্রমাণ করেছিলেন এবং তাকে বর্তমান রূপে উপস্থিত করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি জ্যামিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে কতিপয় ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধানও প্রদান করেছিলেন। খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে কয়েকজন পশ্চিমা বিজ্ঞানী তাদের গাণিতিক গবেষণায় এসব পদ্ধতি থেকে সাহায্য গ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন জিরোলামো কার্ডানো ও অন্যান্য বড় গণিতবিদ।(৩৬১)

প্রফেসর তাওকান আরও বলেন, গাণিতিক বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত কেউ কেউ স্বীকার করেননি যে, সাবিত ইবনে কুররা তাদের অন্যতম যারা ক্যালকুলাস (Calculus) উদ্ভাবনের পথ প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন।

উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের ক্ষেত্রে ক্যালকুলাসের ভূমিকা কী তা অজ্ঞাত নয়। যদি গণিতের এই শাখা না থাকত এবং অসংখ্য জটিল ও কঠিন গাণিতিক সমস্যার সমাধানে সাবিত যে সহজীকরণ-পদ্ধতিগুলো উদ্ভাবন করেছেন সেগুলো না হতো তাহলে প্রাকৃতিক নিয়মাবলি থেকে উপকারগ্রহণ অসম্ভব হতো এবং তা মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো যেত না। সাবিত তাদের অন্যতম যারা বিশ্লেষণমূলক জ্যামিতিতে মনোযোগ দিয়েছেন এবং সিদ্ধি লাভ করেছেন। বিশ্লেষণমূলক জ্যামিতিতে তিনি বহু নতুন বিষয় সংযোজন করেছেন যা তার আগে কেউ করতে পারেননি। তিনি বীজগণিতের ওপর একটি বই লিখেছেন, তাতে জ্যামিতির সঙ্গে বীজগণিতের সম্পর্ক এবং দুটিকে একত্রীকরণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।(৩৬২)

ফরাসি প্রাচ্যবিদ ব্যারন কারা ডি ভো(৩৬৩) ইসলামি সভ্যতার অবদান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আরবরা কার্যত অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কীর্তি অর্জন করেছে, তারা আমাদের শূন্য (০)-এর ব্যবহার শিখিয়েছে, যদিও তারা শূন্য (০)-এর উদ্ভাবক ছিল না। দৈনন্দিন জীবনের গণিতও তারাই শুরু করেছে। তারা বীজগণিতকে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞানশাখার রূপ দিয়েছে এবং এতে উৎকর্ষ সাধন করেছে। তারা বিশ্লেষণাত্মক জ্যামিতির ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা কোনো ধরনের বিতর্ক ব্যতিরেকেই সমতল ত্রিভুজ ও গোলাকার ত্রিভুজ এই দুটি জ্ঞানশাখার উদ্‌দ্গাতা এবং এই দুটির আবিষ্কারে গ্রিকদের কোনো অবদান নেই, সূক্ষ্ম বিচার ও ইনসাফ করতে চাইলে আমাদেরকে এ কথা বলতেই হবে।(৩৬৪)

বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়টিকে একটি উল্লম্ফন হিসেবে বিবেচনা করা যায় তা হলো আরবদের ভারতীয় সংখ্যা, বিশেষ করে শূন্য (০)-এর ব্যবহার। কে প্রথম শূন্য (০)-এর সংজ্ঞা বা পরিচয় দিয়েছিলেন তার বিতর্ক চলমান থাকলেও আরবরাই যে শূন্য (০)-এর প্রয়োগ ও ব্যবহার করেছিলেন তা নিয়ে কোনো মতবিরোধ নেই। তারা একে খালি জায়গা বা শূন্যস্থানের 'প্রকাশক' হিসেবে বিবেচনা করেছেন। শূন্য (০)-এর দ্বারাই দশকীয় সংখ্যাভিত্তিক হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন একক স্থানীয় সংখ্যা, দশক স্থানীয় সংখ্যা, শতক স্থানীয় সংখ্যা...। এভাবে বড় বড় সংখ্যা লেখা এবং বড় বড় অঙ্ক কষা সম্ভব হয়েছে। যা সেই লাতিন সংখ্যা ব্যবহার করে সম্পন্ন করা অসম্ভব ছিল।(৩৬৫)

জার্মান প্রাচ্যবিদ সিগরিড হুংকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে, এসব সংখ্যার ব্যবহার কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না অথবা আরবদের কোনো হস্তলিপিশৈলীও ছিল না। বরং তারা তাদের অসাধারণ প্রতিভার ফলেই ভারতবর্ষীয় পণ্যদ্রব্য ও উপঢৌকনের স্তূপ থেকে এই সংখ্যাগুলো কুড়িয়ে নিয়েছিলেন। কারণ, তারা যে অন্যান্য বিস্ময়কর ব্যাপারে মনোযোগ না দিয়ে এই ছোট ছোট সংখ্যাগুলোর মাহাত্ম্য আবিষ্কার করেছিলেন, তাতেই তারা প্রমাণ করেছিলেন যে তাদের রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা ও ব্যাপক অনুধাবনশক্তি। এই সংখ্যাগুলো ছিল মূলত ভারতবর্ষীয় উপঢৌকনের অলংকার। এই সংখ্যাগুলো কি আলেকজান্দ্রিয়ায় ও সিরিয়ার যেসব নগরীতে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা ছিল সেখানে পরিচিত ছিল না? ছিল। কিন্তু সংখ্যাগুলো আরবদের হাতে না আসা পর্যন্ত তাদের উজ্জ্বল আলো ছড়াতে পারেনি।(৩৬৬)

গণিতবিদেরা মনে করেন যে, মানবসভ্যতায় শূন্য (০) একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। বস্তুত শূন্য (০) ছাড়া ধনাত্মক পরিমাণ ও ঋণাত্মক পরিমাণের অস্তিত্বই (যেমন তড়িৎবিজ্ঞানে) অসম্ভব হতো এবং বীজগণিতে ধনাত্মক রাশি ও ঋণাত্মক রাশি বলে কিছু থাকত না।(৩৬৭)

তারপর আল-খাওয়ারিজমি কর্তৃক 'ইল্যুল জাব্র ওয়াল-মুকাবালা' প্রণয়নের ঘটনায় জ্যামিতিবিজ্ঞান আরেকটি উল্লম্ফন, আরেকটি বড় ধাপ অতিক্রম করে। বিজ্ঞানের এই শাখা সম্পর্কে আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে, মানববিদ্যায় মুসলিমদের অবদান প্রসঙ্গে আলোচনার সময় বিস্তারিত আলোচনা করব।

বস্তুর আয়তনের ক্ষেত্রে আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ পাই মুসা ইবনে শাকিরের পুত্রদের কাছ থেকে। জ্যামিতিবিদ্যায় তাদের মহৎ কাজ হলো معرفة مساحة الاشكال البسيطة والكرية (সরল ও গোলকার বস্তুর আয়তন প্রসঙ্গে) গ্রন্থ প্রণয়ন। এই গ্রন্থে তারা বর্ণনা করেছেন যে, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা বা বেধ-এই তিনটি পরিমাপ প্রত্যেক ঘনবস্তুর আয়তন ও প্রত্যেক সমতল বস্তুর ক্ষেত্রফলকে সীমাবদ্ধ করে। তাদের (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার) পরিমাণ নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি একটি সমতল বস্তু ও একটি ঘনবস্তুর সঙ্গে এবং একটি সমতল বস্তুর-যার দ্বারা তল বা পৃষ্ঠদেশকে পরিমাপ করা হয়-সঙ্গে তুলনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়। প্রতিটি বহুভুজ একটি বৃত্তকে বেষ্টন করে থাকে, তাই ওই বহুভুজের সকল ভুজের (বাহুর) অর্ধেকে ওই বৃত্তের ব্যাসার্ধ-পরিমাণ তল বা পৃষ্ঠদেশই তার ক্ষেত্রফল।(৩৬৮)

আর্কিমিডিসের Measurement of a Circle or Dimension of the Circle (বৃত্তের আয়তনের পরিমাপ) ও On the Sphere and Cylinder (গোলাকার ও বেলনাকার বস্তুর পরিমাপ) বিষয়ে দুটি বই রয়েছে। বানু মুসা ইবনে শাকিরের উপর্যুক্ত গ্রন্থটি আর্কিমিডিসের এই দুটি বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ সাধন করেছে। তারা তিন ভাই যে দুটি বিষয়ের সুবিধা কাজে লাগান তা হলো ইউডক্সাসের(৩৬৯) Method of exhaustion এবং আর্কিমিডিসের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তু (infinitesimals) সম্পর্কিত ধারণা। তাদের এই গ্রন্থ ইসলামি প্রাচ্যে ও লাতিনীয় পশ্চিমে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করেছিল।(৩৭০)

ক্ষেত্রফল প্রসঙ্গে মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাদের গণিত-বিষয়ক রচনাবলিতে আলোচনা করেছেন। কারণ ক্ষেত্রফল জ্যামিতিরই একটি শাখা। আমরা দেখি যে, বাহাউদ্দিন আল-আমিলি(৩৭১) তার আল-খুলাসাতু ফিল-হিসাব (الخلاصة في الحساب)(৩৭২) গ্রন্থে ষষ্ঠ অধ্যায়ের প্রথম তিনটি পরিচ্ছেদে কেবল ক্ষেত্রফল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এই অধ্যায়ের ভূমিকায় তিনি সমতল এবং ঘনবস্তুর আয়তন এবং ক্ষেত্রফলের ক্ষেত্রে কতিপয় প্রাথমিক সংজ্ঞার ওপর আলোকপাত করেছেন। প্রথম অনুচ্ছেদে তিনি সরল বাহুবদ্ধ তলের (সমতলের) ক্ষেত্রফল সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন। যেমন: ত্রিভুজ, বর্গক্ষেত্র, আয়তক্ষেত্র, রম্বস, চতুর্ভুজ, ষড়ভুজ, অষ্টভুজ এবং অন্যান্য সুষম বাহুর বস্তু। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অনুচ্ছেদে আলোচনা করেছেন বৃত্ত ও বক্রতল, যেমন সিলিন্ডার, পূর্ণাঙ্গ কোণ, অপূর্ণাঙ্গ কোণ, গোলাকার বস্তু ইত্যাদির ক্ষেত্রফল কীভাবে পাওয়া যায় তার পদ্ধতি নিয়ে। সপ্তম অধ্যায়ে ভূপৃষ্ঠে বিভিন্ন ক্ষেত্রফল ও পরিমাপ-সম্পর্কিত কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন। জলপথ তৈরির জন্য জরিপ পরিচালনা, বিভিন্ন পর্যায়ের উচ্চতা পরিমাপ এবং নদীর প্রস্থ ও কূপের গভীরতা জানার জন্য এসব বিষয় সংযোজন করেছেন।

মুসলিমরা তাদের জ্যামিতিক জ্ঞানকে বাস্তবিক রূপ দিয়েছেন এবং তা তাদের স্থাপত্যশিল্পে প্রয়োগ করেছেন। এটা ছিল একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। মসজিদ, অট্টালিকা, প্রাসাদ ও শহর নির্মাণে তার যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের মনোযোগ ও গুরুত্ব ছিল জ্যামিতিক কারুকার্যের প্রতিও, যা ছিল বিন্যাসে ও সূক্ষ্মতায় অনন্য। যদিও ইসলামি শিল্প (ইসলামিক আর্ট) সম্পর্কিত আলোচনা-পর্যালোচনায় এ বিষয়টি (ইসলামি স্থাপত্যকলা) যথেষ্ট জায়গা দখল করে নিয়েছে, কিন্তু তা তো স্থাপত্যপ্রকৌশলের একটি মৌলিক দিক বলেই বিবেচিত। ইসলামি স্থাপত্যকলার মৌলিকতা ও অনন্যতার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ প্রাচ্যবিদ মার্টিন এস. ব্রিপ্স(৩৭৩)। তিনি বলেছেন, সাম্রাজ্য বিস্তারের শুরুর দিকে স্থাপত্যপ্রকৌশল-সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি আরবদের অজানা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বটে, তবে ইসলামি স্থাপত্যকলা সম্পর্কে এটা জাজ্বল্যমান সত্য যে, ইসলাম তার পতাকা উড়িয়েছে যত দেশে, যত যুগ অতিবাহিত করেছে সেখানে, তার সব জায়গায় ও সবসময়ই ইসলামি স্থাপত্যকলাই নির্মাণশৈলী হিসেবে আধিপত্য ধরে রেখেছে। অথচ ইসলামি স্থাপত্যকলার নীতিমালা অত্যন্ত জটিল (অর্থাৎ প্রভাব-বিস্তারক)। এমন কিছু ব্যাপার আছে যা ইসলামি স্থাপত্যশিল্পকে স্থানীয় সব ধরনের স্থাপত্য- ঘরানার কীর্তিকলাপ থেকে পৃথক রেখেছে। যদিও স্থানীয় স্থাপত্য- ঘরানাগুলো নিজেদের জায়গায় ছিল নির্মাণশিল্পের হাতিয়ার।(৩৭৪)

জ্যামিতিবিজ্ঞানে মুসলিমদের শ্রেষ্ঠত্ব ইসলামি সভ্যতার একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। এই ক্ষেত্রে তাদের অবদানকে কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। তবে কেউ ইচ্ছা করে স্বীকার না করলে ভিন্ন কথা। মুহাম্মাদ কুদ আলি লুইস সিডিও (Louis-Amélie Sédillot)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, আরবদের (আরব মুসলিমদের) স্থাপত্যপ্রকৌশলে যে সৃজনশীলতা ও উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে সে ব্যাপারে যারা জানে সবাই তাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। এই ক্ষেত্রে তাদের কোনো প্রতিযোগী বা প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আরবরা তাদের নিজস্ব স্টাইলের ভবন উদ্ভাবন করেনি বটে, তবে তাদের স্থাপত্যকলায় কারুকার্য ও কমনীয়তার প্রতি তাদের ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। তারা খিলানযুক্ত তোরণ ও কম্পাসীয় নকশা অঙ্কনে সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের মসজিদ ও অট্টালিকার জন্য ফুল ও লতাপাতাযুক্ত গম্বুজ, ছাদ ও আসন নির্মাণে তারা যে স্থাপত্য নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছে তা যুগ যুগ ধরে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। এসব ব্যাপার নকশা ও কারুকার্যের প্রতি তাদের যে প্রগাঢ় ভালোবাসা তা-ই প্রমাণ করে। তাদের অট্টালিকাসমূহ ও নির্মাণশিল্পগুলো যেন প্রাচ্যের এক থান কাপড়, যার নকশায় ও অলংকরণে তাঁতি চরম শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছে। একজন ফিরিঙ্গি প্রাজ্ঞ ব্যক্তির স্বীকৃতি এমনই।(৩৭৫)

জ্যামিতিবিজ্ঞানের বিকাশে মুসলিমদের অবদানের কিছুমাত্র অংশ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। তাদের অবদানের ফলে জ্যামিতির ব্যবহার ও প্রয়োগে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছিল। অবশ্য তার আগে তারা পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর উত্তরাধিকার নিজেদের আয়ত্ত করেও নিয়েছিলেন।

টিকাঃ
৩৪৮. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ৬৭।
৩৪৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৭-৬৯।
৩৫০. ডোনাল্ড আর, হিল (Donald Routledge Hill 1922-1994): ব্রিটিশ প্রকৌশলী এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাস-বিশেষজ্ঞ। মুসলিম প্রকৌশলী বদিউযযামান আল-জাযারির كتاب فى معرفة الحيل الهندسية গ্রন্থটি অনুবাদের জন্য তিনি সমধিক পরিচিত। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৯ সালে প্রকৌশলে স্নাতক হন। ১৯৬৪ সালে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামি ইতিহাসে এম. লিট (মাস্টার্স অফ লেটার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ: ১. Islamic Technology: An Illustrated History (আহমাদ ইউসুফ আল-হাসানের সঙ্গে যৌথভাবে); ২. Islamic Science and Engineering; ৩. On The Construction of Water-Clocks-Kitab Arshimidas Fi'amal Al- Binkamat; ৪. The Book of Knowledge of Ingenious Mechanical Devices: Kitáb fi ma'rifat al-hiyal al-handasiyya (অনুবাদ); ৫. The Book of Ingenious Devices (অনুবাদ)।
৩৫১. ডোনাল্ড আর. হিল, আল-উলুম ওয়াল-হানদাসা ফিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৪৬।
৩৫২. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল- উলুম, পৃ. ৭০-৭১।
৩৫৩. ডোনাল্ড আর. হিল, আল-উলুম ওয়াল-হানদাসা ফিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৪৭।
৩৫৪. একে দর্পণ আলোকবিজ্ঞান (Mirror optics) বলা হয়। প্রতিবিম্ব সৃষ্টি এবং তা বিশেষ কোনো দিকে চালিত করা অথবা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে সমতল অথবা বক্র প্রতিফলক পৃষ্ঠদেশের ব্যবহার-সম্পর্কিত বিদ্যাই দর্পণ আলোকবিজ্ঞান।-অনুবাদক।
৩৫৫. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৫৮।
৩৫৬. গোলাকার সমতলকরণ (Flattening) ব্যাসের সঙ্গে একটি বৃত্তের বা গোলকের সংকোচনের পরিমাপ; যথাক্রমে উপবৃত্ত বা উপগোলক গঠন করতে এটি করা হয়।- অনুবাদক
৩৫৭. হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, পৃ. ৪০৩।
৩৫৮. তাকিউদ্দিন আদ-দিমাশকি : মুহাম্মাদ ইবনে মারুফ আর-রাসিদ আশ-শামি (৯২৭-৯৯৩ হি./১৫২১-১৫৮৫ খ্রি.)। দার্শনিক, জ্যোতির্বিদ, গণিতজ্ঞ, পদার্থবিদ, রসায়নবিদ, ওষুধবিজ্ঞানী, কৃষিবিজ্ঞানী ও যন্ত্রপ্রকৌশলী। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তার নব্বইটিরও বেশি গ্রন্থ রয়েছে।
৩৫৯. সিদ্দিক হাসান খান আল-কনৌজি, আবজাদুল উলুম, খ. ২, পৃ. ১৩৭-১৩৮।
৩৬০. সাবিত ইবনে কুররা : আবুল হাসান সাবিত ইবনে কুররা ইবনে মারওয়ান ইবনে সাবিত (২২১-২৮৮ হি./৮৩৬-৯০১ খ্রি.)। গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ, চিকিৎসক ও অনুবাদক। আব্বাসি খলিফা মু'তাদিদ বিল্লাহর ঘনিষ্ঠভাজন ছিলেন। টলেমির Almagest গ্রন্থের যেসব অনুবাদ আরবি ভাষায় বেরিয়েছিল সেগুলোর মধ্যে তার অনুবাদই সবচেয়ে সম্পূর্ণ। টলেমির 'প্ল্যানেটারি হাইপোথেসিস' গ্রন্থটির খুব সম্ভবত তিনিই অনুবাদ করেছিলেন। অনুবাদের সময় তিনি মূল লেখকের গণনা ও পর্যবেক্ষণকে পরীক্ষা করে দেখতেন এবং প্রয়োজনমতো সংশোধন করে নিতেন। জ্যোতির্বিদ্যার গবেষণায় তার অন্যতম মৌলিক অবদান হলো অয়নচলনের (precession) পরিমাণের ক্ষেত্রে এক আপাত ব্যত্যয়ের অনুমান, যা trepidation নামে পরিচিত। যা পরবর্তী কয়েক শতাব্দীব্যাপী জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণিকে প্রভাবিত করে রেখেছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে তার বিভিন্ন রচনার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
৩৬১. কাদরি তাওকান, তুরাসুল আরাবিল ইলমি ফির-রিয়াদিয়্যাতি ওয়াল-ফালাক, পৃ. ৮৪ ও তার পরবর্তী; জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৫৯ থেকে উদ্ধৃত।
৩৬২. প্রাগুক্ত।
৩৬৩. ব্যারন বার্নার্ড কারা ডি ভো (Baron Bernard Carra De Vaux): ফরাসি প্রাচ্যবিদ। ফরাসি ভাষাতেই লিখেছেন। তার আগ্রহের বিষয় ছিল আরবের জ্ঞানভান্ডার। মুসলিম বিজ্ঞানীদের কয়েকটি রচনা তিনি পুনর্নিরীক্ষণ ও সম্পাদনা করেছেন।
৩৬৪. The Legacy of Islam, থমাস ওয়াকার আর্নল্ড কর্তৃক সম্পাদিত, আরবি অনুবাদ, তুরাসুল ইসলাম (১৯৫৪), অনুবাদ ও টীকা সংযোজন, জার্জিস ফাতহুল্লাহ, পৃ. ৫৬৩-৫৬৪।
৩৬৫. আবদুল হালিম মুনতাসির, তারিখুল ইল্ল্ম ওয়া দাওরুল উলামা আল-আরাব ফি তাকাদ্দুমিহি, পৃ. ৬৪।
৩৬৬. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ১৫৭।
৩৬৭. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রাওয়ায়িউল হাদারাতিল আরাবিয়্যাতিল ইসলামিয়্যা ফিল-উলুম, পৃ. ৫৬।
৩৬৮. বানু মুসা ইবনে শাকির, কিতাবু মারিফাতি মাসাহাতিল আশকাল, সম্পাদনা, নাসিরুদ্দিন আত-তুসি, পৃ. ২; খালিদ আহমাদ হারবি, উলুমু হাদারাতিল ইসলাম ওয়া দাওরুহা ফিল-হাদারাতিল ইনসানিয়্যা, পৃ. ১৫৪ থেকে উদ্ধৃতি।
৩৬৯. ইউডক্সাস (Eudoxus of Cnidus 390-337 BC): গ্রিক গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ। দরিদ্র পরিবারের সন্তান ইউডক্সাস একাডেমিতে অধ্যয়ন করেন। প্লেটোর কাছেও তিনি শিক্ষাগ্রহণ করেন। তারপর উচ্চ শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে মিশরে যান। তিনি তুর্কিস্তানে ও পরে এথেন্স নগরীতে দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেছেন। তার বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গ্রন্থের কোনোটিই মূল অবস্থায় পাওয়া যায়নি। হিপ্পারচুস, ইউক্লিড ও আর্কিমিডিসের লেখা থেকে তার বৈজ্ঞানিক অবদানের কথা জানা যায়। তিনিই হলেন প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞানী যার খগোল বা মহাজাগতিক গোলক সম্পর্কে সঠিক বৈজ্ঞানিক ধারণা ছিল। তিনি প্রথম গ্রিক বিজ্ঞানী যিনি জানতেন এক বছর ঠিক ৩৬৫ দিন নয়, তার চেয়ে ঘণ্টা ছয়েক বেশি। তিনি পৃথিবীর একটি মানচিত্র এঁকেছিলেন এবং মহাকাশকে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশে ভাগ করে নক্ষত্ররাজির একটা মানচিত্র অঙ্কনেও হাত দিয়েছিলেন। গণিতে তিনি অনুপাতের তত্ত্বকে মূলদ ও অমূলদ উভয় রাশির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করে তোলেন। বক্ররেখার দ্বারা আবদ্ধ কোনো ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল নির্ণয় করার জন্য এক যথোপযুক্ত গাণিতিক পদ্ধতিও (Method of exhaustion) উদ্ভাবন করেছিলেন। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে তিনি বৃত্তের ক্ষেত্রফল যে তার ব্যাসার্ধের বর্গমূলের আনুপাতিক হয় এবং এর আয়তন তার ব্যাসার্ধের ঘনমূলের আনুপাতিক হয় তা প্রমাণ করেছিলেন।
৩৭০. আবদুল হামিদ সাবরাহ, বানু মুসা ইবনে শাকির, The Genius of Arab Civilization Source of Renaissance, সম্পাদক, আর. বি. উইন্ডার, আরবি অনুবাদ, عبقرية الحضارة العربية منبع النهضة الأوروبية, অনুবাদক, আবদুল কারিম মাহফুজ, পৃ. ২৫; উলুমু হাদারাতিল ইসলাম ওয়া দাওরুহা ফিল-হাদারাতিল ইনসানিয়‍্যা, পৃ. ১৫৫ থেকে উদ্ধৃতি।
৩৭১. বাহাউদ্দিন আল-আমিলি: বাহাউদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে হুসাইন ইবনে আবদুস সামাদ আল-হারিসি, শাইখ বাহায়ি বা বাহাউদ্দিন আল-আমিলি নামে সমধিক পরিচিত (৯৫৩-১০৩১ হি./১৫৪৭-১৬২২ খ্রি.)। ফকিহ, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। বা'লাবাক্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ইস্পাহানে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : تشريح الأفلاك - في علم الهيئة، رسالة في حل إشكالي عطارد والقمر، الصحيفة في الأعمال الاسطرلابية، رسالة في تضاريس الأرض، المخلاة، الكشكول, حديقة السالكين، بداية الهداية، الزبدة في الأصول، هداية الأمة إلى أحكام الأئمة। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ১০২।
৩৭২. বইটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন G. H. F. Nesselmann, যা ১৮৪৩ সালে প্রকাশিত হয়।-অনুবাদক
৩৭৩. মার্টিন এস. ব্রিগ্‌স (Martin Shaw Briggs 1882-1977): ব্রিটিশ স্থাপত্য-ইতিহাসবিদ, বারোক পিরিয়ডে বিশেষজ্ঞ এবং রয়াল ইন্সটিটিউট অফ ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস-এর ভাইস- প্রেসিডেন্ট। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: Muhammadan architecture in Egypt and Palestine (1974), Baroque Architecture (1913), The architect in History (1927).-অনুবাদক
৩৭৪. থমাস ওয়াকার আর্নল্ড কর্তৃক সম্পাদিত তুরাসুল ইসলাম (১৯৫৪), পৃ. ২৩২।
৩৭৫. মুহাম্মাদ কুরূদ আলি, আল-ইসলাম ওয়াল-হাদারাহ আল-আরাবিয়‍্যাহ, খ. ১, পৃ. ২৩৮।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ভূগোলবিদ্যা

📄 ভূগোলবিদ্যা


ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের রচনাবলি এখনো পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। এসব রচনায় যেসব তথ্য ও সংবাদ রয়েছে তা আমাদের ঐতিহাসিক ভূগোল-বিষয়ক জ্ঞানকে বৃদ্ধি করেছে। তাদের এসব রচনায় মূলত বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পরোক্ষভাবে তা আমাদের ওইসব দেশের ইতিহাস-সম্পর্কিত জ্ঞানকেও সমৃদ্ধ করেছে। এই ময়দানে ইসলামের উত্তরাধিকার বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।(৩৭৬)

এটা আমাদের কথা নয়, বরং তা জার্মান-ইসরাইলি গবেষক মার্টিন প্লেসনারের(৩৭৭) কথা।

ইসলামের আগমনের পূর্বেই ভূগোলবিদ্যার চর্চা শুরু হয়েছিল। কিন্তু আরবদের প্রাগ্রসরতা ও তাদের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জ্ঞানবিজ্ঞানের ফলে ভূগোলবিদ্যায়ও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ও উৎকর্ষ সাধিত হয়। এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই যে, আরবরা শুরুর দিকে গ্রিকদের বিজ্ঞান গ্রহণ করেছিল, বিশেষ করে টলেমির। ভূগোলবিদ্যায় গ্রিকরাই ছিল তাদের পথপ্রদর্শক। তবে এই ক্ষেত্রেও আরবরা তাদের গুরুদের ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যেমনটা ছিল তাদের অভ্যাস।(৩৭৮)

এটাও আমাদের বক্তব্য নয়, বরং বিখ্যাত ফরাসি চিন্তাবিদ গুস্তাভ লি বোঁর বক্তব্য।

ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের উদ্ভাবন ও অবদান
ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের উদ্ভাবন ও অবদানকে আমরা তিনটি বিভাগে চিহ্নিত করতে পারি:
• পূর্ববর্তী ভ্রান্তি-বিভ্রাটের সংশোধন
• দেশ ও নিদর্শনসমূহের যথার্থ বর্ণনা
• আবিষ্কার ও উদ্ভাবন

পৃথিবীর গোলকাকৃতির প্রমাণ
পৃথিবী যে গোলাকার তা প্রথম মুসলিমরাই প্রমাণ করেছিলেন। ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার যাত্রা শুরু হয় এভাবেই। গ্রিকরা বিশ্বাস করত যে, পৃথিবী হলো বৃত্তাকার সমতল চাকতি, যাকে সব দিক থেকে বেষ্টন করে রেখেছে সমুদ্রের জলরাশি।

হেকাটিয়াস (Hecataeus of Miletus 500 BC)—যাকে গ্রিক ভূগোলবিদ্যার জনক বিবেচনা করা হয়—তো পৃথিবীকে একটি বৃত্তাকার চাকতি ধরে নিয়ে তার মানচিত্র অঙ্কন করেছেন।(৩৭৯) পৃথিবী যে গোলাকার তার প্রথম তাত্ত্বিক ধারণা দেন প্লেটো (৩৪৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ), তবে তিনি তার পরবর্তী দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের থেকে যথার্থ সমর্থন পাননি। এমনকি রোমান সাম্রাজ্য তার এই চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে। রোমান ভূগোলবিদ্যার জনক কসমাস (Cosmas) ৫৪৭ খ্রিষ্টাব্দে লিখেছেন, পৃথিবী হলো চাকার সদৃশ, সমুদ্রের জলরাশি তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে...।' বিষয়টি জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যখন গির্জা ও গির্জার প্রথম সারির ফাদাররা—যাদের নেতৃত্বে ছিলেন লাকটানটিয়াস (Lactantius)—কসমাসের উপর্যুক্ত তত্ত্বকে বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং সিদ্ধান্ত দেন যে, পৃথিবী হলো সমতল এবং অন্যপাশ হলো অনাবাদিত, তা (পৃথিবী সমতল) না হলে মানুষ শূন্যে পতিত হতো!(৩৮০)

ইসলামি সভ্যতা আবির্ভাবের পর তা পৃথিবীর গোলকাকার তত্ত্বকে গ্রহণ করে এবং এই তত্ত্বের পুনর্জীবনদানে সচেষ্ট হয়। এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল এই যে, পবিত্র কুরআন বিভিন্নভাবে পৃথিবীর গোলকাকৃতির প্রতি ইঙ্গিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَاهَا
এবং পৃথিবীকে তারপর বিস্তৃত করেছেন।(৩৮১)

'দাহিয়্যা' শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো গোলক। পবিত্র কুরআনে আরও অনেক আয়াত রয়েছে যেগুলো এই গোলকটি যে তার নিজের চারপাশে (কক্ষপথে) ঘূর্ণায়মান তা নিয়ে আলোচনা করেছে। গোলকটির (পৃথিবীর) এমন আবর্তনের ফলেই দিবস ও রজনীর সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ
তিনি রাতের দ্বারা দিবসকে আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে আচ্ছাদিত করেন রাতের দ্বারা।(৩৮২)

ইবনে খুররাদাযবিহ(৩৮৩) বলেছেন, পৃথিবী বলের মতোই গোলাকার, ডিমের ভেতরে থাকা কুসুমের মতো।(৩৮৪) ইবনে রুসতাইও(৩৮৫) একই কথা বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আকাশকে বলের মতো গোলকাকার বানিয়েছেন, তা শূন্যগর্ভ ঘূর্ণনশীল; পৃথিবীও গোলাকার এবং আকাশের অভ্যন্তরে রয়েছে।(৩৮৬)

বিখ্যাত সাহিত্যিক ও আল-ইব্দুল ফারিদ গ্রন্থের প্রণেতা ইবনে আবদি রাব্বিহি(৩৮৭) কয়েকটি পঙ্ক্তি রচনা করেছেন, যেখানে তিনি আবু উবাইদা মুসলিম ইবনে আহমাদ আল-ফালাকির(৩৮৮) বক্তব্যের খণ্ডন করেছেন।

আমরা তার পঙ্ক্তিমালা থেকে জানতে পারি যে, আবু উবাইদা আল-ফালাকি পৃথিবী গোলকাকার বলে মত ব্যক্ত করতেন। কিন্তু ইবনে আবদি রাব্বিহি তার সঙ্গে একমত ছিলেন না। তাই তিনি বলেছেন,
أبا عبيدة ما المسؤول عن خبر تحكيه إلا سؤالاً للذي سألا أبيت إلا شذوذا عن جماعتنا ولم تعب رأي من أزجا ولا اعتزلا كذلك القبلة الأولى مُبدَّلة وقد أبيت فما تبغي بها بدلا زعمت بهرام أو بيدخت يرزقنا لا بل عطارد أو برجيس أو زُحَلا وقلت إن جميع الخلق في فلك بهم يحيط وفيهم يقسم الأجـلا والأرض كورية حق السماء بها فوقاً وتحتاً وصارت نقطة مثلا صيف الجنوب شتاء للشَّمَالِ بها قد صار بينهما هذا وذا دولا فإن كانون في صنعا وقرطبة برد وأيلول يُذكي فيهما الشعلا كما استمر ابن موسى في غوايته فوعر السهل حتى خِلْتَهُ جَبَلا أبلغ معاوية المصغي لقولهما أني كفرت بما قالا وما فعلا
আবু উবাইদা, আপনি যা বলেন সে বিষয়ে আপনি দায়িত্বশীল নন, বরং প্রশ্নকারীর জন্য রেখে যান প্রশ্ন।
আপনি আমাদের দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন এবং যে বিচ্ছিন্ন হয় বা পাশ কাটিয়ে যায় তার বক্তব্য সঠিক হয় না।

প্রথম কেবলার পরিবর্তন হয়েছিল; কিন্তু আপনি তা স্বীকার করেন না এবং এ ধরনের পরিবর্তন আশাও করেন না।

আপনি দাবি করেছেন, বাহরাম(৩৮৯) বা বায়দুগ্ধ(৩৯০) আমাদের রিযিক দান করে, না বরং বুধগ্রহ বা বৃহস্পতিগ্রহ বা শনিগ্রহ রিযিক দান করে।

আপনি বলেছেন, সমস্ত সৃষ্টি রয়েছে এক মহাকাশে, যা তাদের বেষ্টন করে আছে এবং তাদের মধ্যে মহাকাশই নির্ধারণ করে সময়।

আপনি আরও বলেছেন, পৃথিবী হলো গোলাকার, আকাশ তাকে উপর দিক ও নিচ দিক থেকে ঘিরে রেখেছে, যেন তা আকাশের মধ্যস্থলে একটি বিন্দু।

পৃথিবীর দক্ষিণে (দক্ষিণ মেরুতে) যখন গ্রীষ্ম, উত্তরে (উত্তর মেরুতে) তখন শীত, উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর মধ্যস্থলে রয়েছে পৃথিবীর সব দেশ।

সানআ ও কর্ডোভায় ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে থাকে শীত, আর সেপ্টেম্বর মাস এখানে জ্বালায় আগুন।

ইবনে মুসাও তার পথভ্রষ্টতায় রয়েছেন অটল; তিনি সমতলকে করে তোলেন এতটা অসমান যে (বা সহজ বিষয়কে করে তোলেন এতটা কঠিন যে) তাকে তোমার পাহাড় মনে হয়।

মুআবিয়াকে—যে তাদের দুইজনের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে—জানিয়ে দাও, তারা দুইজন (আবু উবায়দা ও ইবনে মুসা) যা বলেন ও করেন তা আমি স্বীকার করি না।

এখানে একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। এই আবু উবাইদার জীবনচরিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তার কাছে মিথ্যাচারের চেয়ে আকাশ থেকে পতনও সহজতর। এই বক্তব্য প্রথমত তার চারিত্রিক গুণাবলিকে নির্দেশ করলে তা থেকে এই বিশ্বাস জন্মে যে, তিনি ছিলেন সূক্ষ্ম অনুসন্ধানী, সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে খুঁটিয়ে দেখতেন, কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আগে দীর্ঘ অনুসন্ধান ও গবেষণা করতেন।

আবু উবাইদা হিজরি তৃতীয় শতকের (খ্রিস্টীয় নবম শতকের) একজন বিজ্ঞানী। আন্দালুসে যারা জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকেন তিনি ছিলেন তাদের প্রথম সারির অন্যতম ব্যক্তি। আমাদের জন্য আরও একটি ব্যাপার জানা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলামি বিশ্ব এসব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে — তা যতটাই অভিনব হোক—কখনো প্রত্যাখ্যান করেনি এবং বিরোধিতাও করেনি। তা ছাড়া যারা কিছুটা বিরোধিতা করতেন, তারাও স্বাভাবিক সীমারেখার বাইরে গিয়ে বিরোধিতা করতেন না। এখানে আমাদের সংগত কারণেই এ কথাও স্মরণে রাখতে হবে যে, এই সময় থেকে ইউরোপে পাঁচশ বছরব্যাপী জ্ঞানের বিকাশ ছিল রক্তে প্লাবিত, আগুনে দগ্ধ ও ইনকুইজিশনের নির্যাতনের শিকার।

ইবনে হাযম আল-আন্দালুসি ও পৃথিবীর গোলাকৃতি
এখানে আমাদের এ কথা বলে রাখাও সংগত যে, ইসলামি ধর্মীয় জ্ঞানীরা সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়াতে পারেন না। তারা ইসলামে এমন শিক্ষা পান যা জ্ঞানগত সত্যকে সমর্থন করে এবং সত্য অস্বীকারকারীদের বিরোধিতা করে। যেমন ইবনে হাযম আল-আন্দালুসি পৃথিবীর গোলাকৃতির ব্যাপারে মুসলিম ইমাম ও মনীষীদের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আলেমগণ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে, পৃথিবী যে গোলাকার সে ব্যাপারে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে এবং এই প্রমাণগুলো সঠিক। তবে এর বিপরীত ছিল সাধারণ মানুষের বক্তব্য। (সাধারণ মানুষের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে) আমাদের জবাব এই যে—আল্লাহ তাআলাই তাওফিকদাতা—মুসলিম মনীষীদের কেউই, যারা এমনকি ‘জ্ঞানের ইমাম’ উপাধি ধারণের হকদার, পৃথিবীর গোলকাকৃতিকে অস্বীকার করেননি। তাদের কেউই এই বক্তব্যের সমর্থনে নিজেদের পক্ষ থেকে একটি শব্দও খরচ করেননি। বরং কুরআন ও সুন্নাহ থেকেই পৃথিবীর গোলকাকৃতির ও ঘূর্ণনের ব্যাপারে বহু প্রমাণ এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ

তিনি রাতের দ্বারা দিবসকে আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে আচ্ছাদিত করেন রাতের দ্বারা।(৩৯১)

এদের একটি যে আরেকটিকে পেঁচিয়ে রয়েছে সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা এটি। كور العمامة (সে পাগড়ি পেঁচালো) ধাতু থেকে কথাটি এসেছে। পেঁচানোই পাগড়ি বাঁধার প্রক্রিয়া এবং গোলকাকার বস্তুতেই পেঁচানো হয়। পৃথিবীর গোলকাকৃতির ব্যাপারে এটা স্পষ্ট দলিল...।(৩৯২)

আল-ইদরিসি ও পৃথিবীর গোলাকৃতি
শরিফ আল-ইদরিসি যা বলেছেন, নিশ্চয় পৃথিবী বলের গোলকাকৃতির মতো গোলকাকার। পানি তার সঙ্গে এঁটে রয়েছে এবং প্রাকৃতিকভাবেই তার ওপর স্থির রয়েছে ও পড়ে যাচ্ছে না। জলসহ পৃথিবী রয়েছে মহাকাশের অভ্যন্তরীণ শূন্যতায়, যেমন ডিমের অভ্যন্তরে থাকে কুসুম। জলসহ পৃথিবীর অবস্থান মধ্যবর্তী এবং বাতাস (অর্থাৎ বায়ুমণ্ডল) তাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখেছে।(৩৯৩)

আল-ইদরিসি যেসব মানচিত্র এঁকেছিলেন তার সম্পর্কে উইল ডুরান্ট বলেছেন, এসব মানচিত্র মধ্যযুগে মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যার (cartography) শ্রেষ্ঠ ফসল। তার পূর্বে এর চেয়ে পূর্ণাঙ্গ, এর চেয়ে সূক্ষ্ম, এর চেয়ে বিস্তৃত ও ব্যাপক মানচিত্র কোথাও অঙ্কন করা হয়নি। অধিকাংশ মুসলিম বিজ্ঞানী যেমন পৃথিবীর গোলকাকৃতির বিষয়টিকে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন, আল-ইদরিসিও তা-ই করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, এটি বিশুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত সত্য।(৩৯৪)

এতকিছুর পরও বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, কিছু আরবি গ্রন্থ ও তথ্যসূত্র এখনো পশ্চিমা তথ্যসূত্র থেকে নকল করে প্রচার করে যাচ্ছে যে পৃথিবীর গোলকাকৃতির তত্ত্বের সঙ্গে মুসলিমদের পরিচয় ছিল না। বরং কোপার্নিকাসের কল্যাণেই এ তত্ত্বটি ঘোষিত হয়। আপনি এখন কোপার্নিকাসের মৃত্যুতারিখ (১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দ) আমাদের আলোচিত মুসলিম বিজ্ঞানীদের মৃত্যুতারিখের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন, কে কাদের থেকে এই তত্ত্ব গ্রহণ করেছে সেই সত্য প্রতিভাত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট!

খলিফা আল-মামুন এবং পৃথিবীর আয়তনের পরিমাপ
মুসলিমরা যে পৃথিবীর গোলকাকৃতির বিষয়টি প্রমাণ করেছিলেন তার কৃতিত্ব দেওয়া হয় আব্বাসি খলিফা আল-মামুনকে (মৃ. ২১৮ হি./৮৩৩ খ্রি.)। তিনিই প্রথম ভূ-গোলকের আয়তন (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, বেধ) পরিমাপের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এই কাজে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ও ভূগোলবিদদের দুটি দলকে নিযুক্ত করেন। একটি দলের নেতৃত্বে থাকে গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী সিন্দ ইবনে আলি(৩৯৫) এবং অপর দলটির নেতৃত্বে থাকেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ আলি ইবনে ঈসা আল-আঙ্গুরলাবি(৩৯৬)। (এ কথাও বলা হয়ে থাকে যে, দুটি দলের একটির নেতৃত্বে ছিলেন বানু মুসা ইবনে শাকির বা মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা।) খলিফা তাদের দুইজনের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, তারা দুইজন পৃথিবীর পরিধির মহাবৃত্তের পূর্ব ও পশ্চিমের দুটি ভিন্ন নির্দিষ্ট স্থানে যাবেন এবং উভয়েই দ্রাঘিমারেখার এক ডিগ্রি পরিমাণ পরিমাপ করবেন (যে দ্রাঘিমারেখা ৩৬০ ডিগ্রি হবে)। ইবনে খাল্লিকান বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যেক দলই একটি বিস্তৃত সমতল ভূখণ্ড বেছে নেয়, ভূখণ্ডের একটি স্থানে একটি কীলক স্থাপন করে। তারপর ধ্রুবতারাকে(৩৯৭) স্থির বিন্দু ধরে নিয়ে কীলক ও ধ্রুবতারা এবং ভূমির মধ্যে কোণ নির্ণয় করে। তারপর উত্তর দিকে এমন জায়গায় এগিয়ে যায় যেখানে ওই কোণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তারপর উভয় দল কীলক দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব পরিমাপ করে। তারা ভূমির ওপর দূরত্ব পরিমাপ করত কীলকের ওপর বাঁধা রশির দ্বারা।(৩৯৮)

বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, ভূ-গোলকের আয়তন পরিমাপের ফল ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং সামসময়িক বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের অধিকতর নিকটবর্তী। খলিফা আল-মামুন উভয় দলের নির্ণীত পরিমাণের গড় হিসাব গ্রহণ করেন এবং দেখেন যে এটা ৫,৬৬৬ মাইলের কাছাকাছি। আর সামসময়িক বিজ্ঞান সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে এটা ৫,৬৯৩ মাইল। আল-মামুনের এই পরিমাপ অনুযায়ী পৃথিবীর পরিধি হলো ২০,৪০০ মাইল, অর্থাৎ, প্রায় ৪১,২৪৮ কিলোমিটার। আধুনিক কালে স্যাটেলাইটের দ্বারা পরিমাপকৃত পৃথিবীর পরিধি হলো ৪০,০৭০ কিলোমিটার। আপনি আল-মামুনের নিযুক্ত দল দুটির পরিমাপ ও আধুনিক স্যাটেলাইটের পরিমাপ মিলিয়ে দেখুন, দেখবেন, উভয় পরিমাপের মধ্যে ভুলের পরিমাণ ৩%-এরও কম! নিশ্চয় এটি গৌরব করার মতো বিষয়।(৩৯৯)

টলেমির জিয়োগ্রাফি (Geography of Claudius Ptolemy) অন্যতম মৌলিক গ্রন্থ, যার ওপর মুসলিমরা তাদের ভৌগোলিক বিদ্যার ভিত্তিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বলতে গেলে এটিই একমাত্র গ্রন্থ যা মুসলিমরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্বসূরিদের উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। এর সঙ্গে অবশ্য আরেকটি গ্রন্থ ছিল, সেটির রচয়িতা হলেন মারিনুস অফ টায়ার(৪০০); তবে এই গ্রন্থটির গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত কম।(৪০১)

মুসলিমরা পূর্ববর্তীদের ভ্রান্তি সংশোধন করলেন
টলেমি তার মানচিত্রে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ নির্ধারণে যেসব ভুল করেছিলেন মুসলিম ভূগোলবিদেরা তার সংশোধন করেন। তার এসব ভ্রান্তির মধ্যে কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো। তিনি ভূমধ্যসাগরের দৈর্ঘ্যসীমা নির্ধারণে অনেক বেশি অতিরঞ্জিত করেন এবং তার পরিচিত পৃথিবীর আবাদিত অংশের বিস্তৃতি নির্ধারণেও বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যান। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে হ্রদ বলে চিহ্নিত করেন। অর্থাৎ যখন তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করেন তখন এই কাজটি করেন। সাইলোন দ্বীপের (শ্রীলংকার) আয়তন নির্ধারণেও তিনি অতিরঞ্জিত করেন। কাস্পিয়াস সাগর ও পারস্য উপসাগরের অবস্থান নির্ধারণে তিনি মারাত্মক ভুল করেন। মুসলিমরা এসব ভ্রান্তিসহ অন্যান্য ভ্রান্তিরও সংশোধন করেন। তারপর মুসলিমরা পৃথিবীকে তাদের বর্ণনামূলক মানচিত্র উপহার দেন, কমপক্ষে পাঁচ শতাব্দী ধরে ভূগোলবিদ ও পর্যটকদের বহু দল এটির চূড়ান্ত রূপদানে অংশগ্রহণ করেন। এই মানচিত্র অঙ্কনের মধ্য দিয়ে তারা এমন অনন্য কীর্তি রেখে যান, মধ্যযুগে যার কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়নি।(৪০২)

টলেমি যেসব শহরের ভৌগোলিক অবস্থান চিহ্নিত করেছিলেন তার অধিকাংশেরই বাস্তবিক অবস্থানের সঙ্গে মোটেই মিল ছিল না। কেবল ভূমধ্যসাগরের দৈর্ঘ্য নির্ধারণে তার ভ্রান্তির পরিমাণ হলো চারশ ফারসাখ (তিনি একে চারশ ফারসাখ বাড়িয়ে দেখান)।
আরবদের হাতে ভূগোলবিদ্যার কী পরিমাণ উন্নতি সাধিত হয়েছিল তা স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য গ্রিকদের নির্ণীত জায়গাগুলোর সঙ্গে আরবদের নির্ণীত জায়গাগুলোকে মিলিয়ে দেখাই যথেষ্ট।(৪০৩)

অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখা নির্ধারণ
মুসলিমরাই প্রথম ভূ-গোলকের মানচিত্রের ওপর অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখা নির্ধারণ ও অঙ্কন করেন। প্রথম যিনি দ্রাঘিমারেখা ও অক্ষরেখা নির্ধারণ করেন তিনি হলেন আবু আলি আল-মুররাকুশি(৪০৪)। তার এ কাজের পেছনে একটি মহৎ উদ্দেশ্য ছিল। যাতে মুসলিমরা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নামাযের জন্য সমান সময় নির্ধারণ করতে পারেন। আল-বিরুনিই প্রথম ভূ-গোলককে সমতলে রূপান্তরের (সমতলকরণের) গাণিতিক নীতি প্রস্তুত করেন। এটি হলো রেখা ও চিত্রকে গোলক থেকে সমতলে রূপান্তর করা এবং সমতল থেকে গোলকে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া। তিনি এই গাণিতিক নীতি অঙ্কনের মধ্য দিয়ে ভৌগোলিক মানচিত্র অঙ্কন সহজ করে তোলেন।(৪০৫)

পৃথিবীর ঘূর্ণায়মানতা সম্পর্কে গবেষণা
যে সময়টাতে বিশ্বে কেউ কল্পনাও করতে পারত না যে পৃথিবী হলো গোলকাকার এবং ভূ-গোলকের নিজ কক্ষপথে ঘূর্ণায়মানতার বিষয়ে কেউ আলোচনাও করত না, সেই সময়ে খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে (হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে) তিনজন মুসলিম বিজ্ঞানী পৃথিবীর ঘূর্ণায়মানতা ও আবর্তনের বিষয়টিকে আলোচনায় নিয়ে আসেন। তারা হলেন কাযভিনের আলি ইবনে উমর আল-কাতিবি(৪০৬), আন্দালুসের কুবুদ্দিন আশ-শিরাজি এবং সিরিয়ার আবুল ফারজ আলি। মানবেতিহাসে তারাই প্রথমবার পৃথিবী যে নিজ কক্ষপথে সূর্যের সামনে প্রতি দিনে-রাতে একবার ঘোরে সেই সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করেন। এই বিজ্ঞানীত্রয় সম্পর্কে জর্জ সার্টন বলেন, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এই তিনজন বিজ্ঞানী যে গবেষণা করেন তা বিফলে যায়নি। বরং তা নিকোলাস কোপার্নিকাসের গবেষণায় অন্যতম অনুঘটক হিসেবে প্রভাব রেখেছে। এই গবেষণা থেকেই কোপার্নিকাস ১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দে (পৃথিবীর ঘূর্ণায়মানতার) তাত্ত্বিক কাঠামো প্রকাশ করেন।(৪০৭)

ভৌগোলিক বিশ্বকোষ রচনা
ভূগোলবিদ্যায় ইসলামি সভ্যতার বিজ্ঞানীরা প্রকৃত অর্থেই বহু ভৌগোলিক বিশ্বকোষ রচনা করেন। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। ইয়াকুত হামাবির রচনা মুজামুল বুলদান। এই বিশ্বকোষ সম্পর্কে উইল ডুরান্ট বলেন, এটি একটি বৃহদাকার ভৌগোলিক বিশ্বকোষ; তিনি এতে মধ্যযুগের যাবতীয় পরিচিত ভৌগোলিক তথ্য সংগ্রহ করেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রকৃতিবিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব, মানব-ভূগোলবিদ্যা, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে মধ্যযুগে পরিচিত তথ্যের একটিকেও তিনি বাদ দেননি, বরং প্রতিটি তথ্যকে তার এই বিশ্বকোষে সংকলন করেছেন। এ ছাড়াও তিনি শহরগুলোর তুলনামূলক আয়তন এবং সেগুলোর গুরুত্ব, এসব শহরে বসবাসকারী বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবন ও কর্ম ইত্যাদিকে স্থান দিয়েছেন। এই মহান জ্ঞানী পৃথিবীকে যতটা ভালোবেসেছেন, অন্য কেউ ততটা ভালোবেসেছেন বলে আমাদের জানা নেই।(৪০৮)

গুস্তাভ লি বোঁ বলেছেন, ভূগোলবিদ্যার ওপর আরবদের রচিত যেসব গ্রন্থ আমরা পেয়েছি তার গুরুত্ব অপরিসীম। এসব গ্রন্থের কয়েকটি ইউরোপে বহু শতাব্দীব্যাপী ভূগোলবিদ্যার পঠনপাঠনের মৌলিক ভিত্তি ছিল।(৪০৯)

লি বোঁ আরও বলেন, শরিফ আল-ইদরিসি পৃথিবীর যে-মানচিত্র অঙ্কন করেন তার চিত্র আমি প্রকাশ করেছি। এই মানচিত্রে নীলনদ ও বড় বড় ট্রপিক্যাল লেকের উৎস সম্পর্কে বিবরণ দেওয়া আছে। এসব স্থান সম্পর্কে ইউরোপীয়রা এই আধুনিক কালের আগ পর্যন্ত কোনো সন্ধান পায়নি। আল-ইদরিসির এই মানচিত্র অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তার এই মানচিত্রে প্রমাণিত হয় যে, মহা-আফ্রিকার ভূগোল সম্পর্কে আরবদের জ্ঞান ছিল দীর্ঘকাল ধরে যা ধারণা করা হতো তার চেয়ে অনেক বেশি।(৪১০)

ইসলামি মানচিত্রাবলি এবং সমুদ্রবিজ্ঞানের ওপর মুসলিমদের রচনাবলি পাশ্চাত্য নৌ-চলাচলবিদ্যার অগ্রগতিতে পরিপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।(৪১১)

সামুদ্রিক অভিযান ও আমেরিকা আবিষ্কার
মুসলিমদের সামুদ্রিক অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি হলো আমেরিকা আবিষ্কার। যার কৃতিত্ব দেওয়া হয় ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে(৪১২) যে, তিনি ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন। মুসলিমরা পৃথিবীর গোলকাকৃতির বিষয়টি ঘোষণা করলেন এবং তা গাণিতিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দলিল-প্রমাণের দ্বারা সাব্যস্ত করলেন। তারপর তাদের রচনাসমূহে এমন ইঙ্গিত প্রকাশ পেতে শুরু করল যে, ভূ-গোলকের অপর পৃষ্ঠে অবশ্যই আবাদিত জনপদ রয়েছে, যা এখনো অনাবিষ্কৃত। এই তাত্ত্বিক ধারণার একটি ভিত্তি ছিল। তা এই যে, এটা কখনো বোধগম্য নয় যে পৃথিবীর একটি পৃষ্ঠ সম্পূর্ণরূপে স্থলভাগ এবং অপর পৃষ্ঠ সম্পূর্ণরূপে জলভাগ। কারণ তা পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করবে এবং তার ঘূর্ণায়মানতা ও আবর্তনের শৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটাবে।(৪১৩)

আল-বিরুনি প্রথম এই সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করেন এবং তার গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ভৌগোলিক আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু হয়। বড় বড় মুসলিম ভূগোলবিদদের রচনাবলিতে এসব অভিযান সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আল-মাসউদি(৪১৪) কর্তৃক রচিত 'মুরজুয-যাহাব ওয়া মাআদিনুল জাওহার' এবং শরিফ আল-ইদরিসি কর্তৃক রচিত 'নুযহাতুল মুশতাক ফি ইখতিরাকিল আফাক' ইত্যাদি।

বিদ্যমান তথ্য থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে যে, খাশখাশ ইবনে সাইদ আল-বাহরি নামের একজন আরব আন্দালুসীয় নাবিক ২৩৫ হিজরিতে (৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে) তার নৌযান চালিয়ে লিসবন থেকে পশ্চিম দিকে আটলান্টিক মহাসাগরে এগিয়ে যান। তিনি সাগরে একটি আবাদিত দ্বীপ আবিষ্কার করেন, যেখানে বহু বাসিন্দা রয়েছে। তিনি তাদের থেকে উপঢৌকন এনে আন্দালুসের শাসক দ্বিতীয় আবদুর রহমানের সামনে পেশ করেন। পুরস্কারস্বরূপ আবদুর রহমান খাশখাশকে ইসলামি নৌবহরের আমির নিযুক্ত করেন। এই নাবিক পরে ভাইকিংদের(৪১৫) সঙ্গে একটি সমুদ্রযুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন।(৪১৬) তিনিই আমেরিকার আবিষ্কারক হিসেবে প্রতীয়মান হন।

বিদ্যমান তথ্যে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে যে, পশ্চিম আফ্রিকার (মরক্কোর) আরবদের একটি দল আটলান্টিক মহাসাগরে বেরিয়ে ওই দ্বীপে যায়। এটা হিজরি চতুর্থ শতক এবং খ্রিষ্টীয় দশম শতকের ঘটনা। কিন্তু তাদের কেউই ফিরে আসে না এবং তাদের সম্পর্কে কোনো সংবাদও জানা যায় না। তারপর তাদের ঘিরে 'অভিযাত্রী যুবকেরা' (المُغَرَّرين قصة الفتية) নামে একটি গল্প তৈরি হয়। অভিযাত্রী যুবকদের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন আল-মাসউদি ও আল-ইদরিসি। এই গল্প থেকে জানা যায় যে, লিসবন শহরে আটজন আরব যুবক আটলান্টিক মহাসাগরে অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সবাই ছিল একটি নাবিক পরিবারের সদস্য। তারা ওই দ্বীপটি খুঁজে বের করতে চায় যেখানে তাদের পূর্বসূরিরা গিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং যাদের সম্পর্কে কোনো সংবাদ জানা যায়নি। ফলে শহরবাসী তাদের 'অভিযাত্রী তরুণদল' (الفتية المغررين) উপাধিতে আখ্যায়িত করে। এখানে المغرر শব্দটা এসেছে الغرة ধাতু থেকে, যার অর্থ অগ্রযাত্রা বা অভিযাত্রা। শব্দটি الغرور ধাতু নিষ্পন্ন (المغرورين) (আত্মপ্রবঞ্চিত) নয়, যদিও কোনো কোনো তথ্যসূত্রে এ শব্দটিই রয়েছে। আল-মাসউদি তার 'মুরুজুয-যাহাব' গ্রন্থে 'যারা আটলান্টিক মহাসাগর ভ্রমণে প্রাণের ঝুঁকি নিয়েছিল, তাদের মধ্যে যারা বেঁচে গিয়েছিল ও যারা ধ্বংস হয়েছিল এবং তারা যা দেখেছিল সেই সম্পর্কিত সংবাদ' (أخبار من خاطر بنفسه في ركوبه - أي المحيط الأطلسي ومن نجا منهم ومن تلف، وما شاهدوا منه وما رأوا) শিরোনামে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

আল-ইদরিসিও এই গল্পের অবতারণা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এই আটজন যুবক আন্দালুসে ফিরে এলে লিসবনের বাসিন্দারা তাদের ঘিরে ধরে। নানা ধরনের সাজসজ্জা ও আনন্দ-উল্লাসের সঙ্গে তাদের অভিনন্দন জানায়। এই যুবকেরা যে সড়কে বসবাস করত সেই সড়কের নাম দেয় 'অভিযাত্রী তরুণদের সড়ক'। এটা খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীর শেষ দিকের ঘটনা। তারপর লিসবনে এই নামটি কয়েকশ বছর ধরে পরিচিত ছিল। - অনুবাদক আবু উবাইদুল্লাহ আল-আন্দালুসি

আবু উবাইদুল্লাহ আল-বাকরি আল-আন্দালুসি (মৃ. ৪৮৭ হি.) তার 'আল-মাসালিক ওয়াল-মামালিক' গ্রন্থে লিসবনের আরব অভিযাত্রী যুবকদের কাহিনি উল্লেখ করেছেন, যারা আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিল। তিনি তাদের ফিরে আসার পরের কাহিনি উল্লেখ করেছেন। ফিরে এসে তারা জানায় যে, ওখানে তাদের সঙ্গে যাদের সাক্ষাৎ ঘটেছে তারা আরবিতে কথাবার্তা বলে। তারা ওই ভূমিখণ্ডের বর্ণনাও দেয়, সেটি ছিল ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের মতো। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কলম্বাসের আমেরিকায় পৌঁছার তিনশ বছর আগে থেকেই সেখানে মুসলিমরা ছিল।

শিহাবুদ্দিন আল-আরাবি আল-উমারি (১০০০-১৩৪৯ খ্রি.) খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে তার ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ 'মাসালিকুল আবসার ওয়া মামালিকুল আমসার' রচনা করেন। এটি মোট ২৭ খণ্ডে রচিত। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মালি সাম্রাজ্য ছিল ইসলামি শাসনাধীন, মানসা মুসা (মুসা অব মালি) তা শাসন করতেন। মানসা মুসা ঐতিহাসিক শিহাবুদ্দিন আল-উমারির সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তাকে মালির নবম সম্রাটের কাহিনি বর্ণনা করেন। তিনি ছিলেন মানসা মুসার বড় ভাই ও তার পূর্ববর্তী সম্রাট। তিনি আটলান্টিক মহাসাগরে অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্যে শাসনকার্যই ছেড়ে দেন। আটলান্টিকের ওপারে কী রয়েছে তা তিনি দেখতে চান। এই সংকল্পে তিনি ২০০ জাহাজ ও ২০০০ নৌকা প্রস্তুত করেন। এগুলোতে শুকনো খাবার ও স্বর্ণ বোঝাই করেন। এটা কলম্বাসের আমেরিকায় পৌঁছার ১০০ বছর আগের ঘটনা।

এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, আমেরিকায় প্রকৃতপক্ষেই আফ্রিকান মুসলিমদের উপস্থিতি ছিল। কলম্বাসের নিজের একটি পাণ্ডুলিপিতে মার্কিন ভূখণ্ডে আফ্রিকানদের উপস্থিতির বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তারা সোনা গলাত।-অনুবাদক

আরবরাই যে আমেরিকা আবিষ্কারে এগিয়ে ছিলেন তা-ই আন্দালুসের ভূগোলবিদদের রচনা থেকে স্পষ্ট হয়। ঐতিহাসিক ও ভাষাবিজ্ঞানী আল-আব্ আনাসতাস মারি আল-কারমালির(৪১৭) বক্তব্য থেকে এ বিষয়টি আরও জোরালো হয়। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মুসলিমরা কলম্বাসের বহু পূর্বেই লিসবন থেকে আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন। কারণ তারা আটলান্টিক মহাসাগরে উষ্ণ গলফ স্ট্রিম (Gulf Stream red-hot) সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখতেন। তিনি বলেন, অন্যান্য সব জাতি থেকে আরব জাতিই এই স্ট্রিম ও তার বৈশিষ্ট্যাবলি জানার ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিল। তা মেক্সিকো থেকে কীভাবে আয়ারল্যান্ডে যায় এবং আয়ারল্যান্ড থেকে কীভাবে মেক্সিকোতে ফিরে আসে সেই সম্পর্কে তাদেরই সবচেয়ে বেশি জ্ঞান ছিল।(৪১৮)

মুসলিমগণ আমেরিকার আবিষ্কারক, এ ব্যাপারে যা বলা হলো তার চেয়েও স্পষ্ট, বিস্ময়কর ও প্রভাবসঞ্চারী হলো ওই মানচিত্র যা জার্মান প্রাচ্যবিদ পল আর্নেস্ট কাহলে(৪১৯) তুরস্কের তোপকাপি প্যালেস গ্রন্থাগার থেকে আবিষ্কার করেছেন। কয়েক বছরব্যাপী আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও পরীক্ষানিরীক্ষার পর ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এই মানচিত্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন। এই মানচিত্র বিজ্ঞানীদের মাথা খারাপ করে দেয়, গোটা বিশ্বকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে ফেলে। এই মানচিত্র ছিল তুর্কি মুসলিম ভূগোলবিদের রচিত, তিনি হলেন পিরি রেয়িস (Piri Reis)(৪২০)। তার পূর্ণনাম মুহিউদ্দিন ইবনে মুহাম্মাদ আর-রেয়িস। তিনি ছিলেন তুর্কি নৌবহরের অন্যতম নৌকমান্ডার। তিনি ছিলেন সেই সময়ের 'মাস্টার অফ দা সি'। তার মানচিত্রটি মূলত কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন মানচিত্রে বিভক্ত। এটি আটলান্টিক মহাসাগরের পূর্বাংশকে বর্ণনা করেছে, যেখানে রয়েছে স্প্যানিশ ও পশ্চিম আফ্রিকান উপকূলসমূহ। আপনি যদি এই মানচিত্রে আটলান্টিকের পশ্চিমাংশকে দেখেন তাহলে দেখবেন যে, সেখানে রয়েছে আমেরিকান ভূখণ্ড, তার উপকূলসমূহ ও দ্বীপসমূহ, বন্দর ও জীবজন্তু। আরও রয়েছে রেড ইন্ডিয়ানদের চিত্র, তাদেরকে তিনি চিত্রিত করেছেন নগ্ন অবস্থায় এবং তারা মেষ চরাচ্ছে।

রুশ-সোভিয়েত প্রাচ্যবিদ ও আরবি ভাষাবিদ ইগন্যাটি ইয়ুলিয়ানোভিচ ক্র্যাচকোঙ্কি (Ignaty Yulianovich Krachkovsky) তারিখ الأدب الجغرافي العربي গ্রন্থে এই মানচিত্রের বিচার-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, পিরি রেয়িস তার মানচিত্র কলম্বাসের মানচিত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন। তুর্কি নৌবহর ১৪৯৯ খ্রিষ্টাব্দে যখন ভেনেটিয়ান নৌবহরকে পরাজিত করে এবং তাদের কয়েকটি জাহাজ আটক করে তখন হয়তো কলম্বাসের মানচিত্র পিরি রেয়িসের হাতে এসে থাকবে।(৪২১)

কিন্তু অধিকাংশ গবেষকই ক্র্যাচকোস্কির এই মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তার বিরুদ্ধমত প্রকাশ করেছেন। কারণ পিরি রেয়িসের মানচিত্রে এমন সব জায়গার বর্ণনা ছিল যা কলম্বাস জানতেনই না এবং তার সেগুলো আবিষ্কারেরও প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু এ সকল গবেষক বিকল্প বিচার-বিশ্লেষণ করেননি যার দ্বারা এই রহস্যময় মানচিত্রের রহস্য উন্মোচিত হয়।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। তা এই যে, ১৯৫২ সালে ব্রাজিলীয় নিউজপেপারগুলো একটি বিবৃতি প্রকাশ করে, বিবৃতিটি দেন ড. জাগরিস, যিনি দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব দা উইটওয়াটারস্ট্যান্ড-এর সামাজিক প্রত্নতত্ত্ববিদ্যার (social archaeological sciences) অধ্যাপক। (অ্যারাবিয়ান বিজনেস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী) বিবৃতিতে বলা হয়, ইতিহাসের গ্রন্থাবলি আমেরিকা আবিষ্কারের বিষয়টিকে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বড় ভুল করেছে। তার কারণ, কলম্বাসের কয়েকশ বছর পূর্বে প্রকৃতপক্ষে আরবরাই(৪২২) (আরব মুসলিমরাই) আমেরিকা আবিষ্কার করেছে।(৪২৩) অধ্যাপক ড. জাগরিসের ছয় বছরব্যাপী পরিচালিত গবেষণার ভিত্তি ছিল মানব-কাঠামো পরীক্ষানিরীক্ষা, যা ব্রাজিলীয় গ্রেনাডায় (Grenada) আবিষ্কৃত হয়েছিল।(৪২৪)

দক্ষিণ মেরুতে ষষ্ঠ মহাদেশ আবিষ্কার
মুহিউদ্দিন আর-রেয়িস (পিরি রেয়িস)-এর মানচিত্রে বিস্ময়কর এমন কিছু ছিল, যার ফলে তা মহাকাশ ভ্রমণ ও স্যাটেলাইট থেকে পৃথিবীর ছবি উত্তোলনের যুগ শুরু হওয়ার পরও বিজ্ঞানীদের স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ত রেখেছে। বিংশ শতাব্দীতে আমেরিকা ও ইউরোপে মানচিত্রাঙ্কনবিদদের প্রথম বিশ্বাস ছিল যে পিরি রেয়িসের মানচিত্রগুলো ততটা সূক্ষ্ম ও যথার্থ নয়, বরং এর চিত্রাঙ্কনে বেশ ভুলত্রুটি রয়েছে। মার্কিন উপকূলীয় অঞ্চল সম্পর্কে তাদের সর্বশেষ সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এমনই ছিল বিশ্বাস। কিন্তু যখন প্রথমবার স্যাটেলাইট থেকে এসব অঞ্চলের ছবি তুলে তা প্রকাশ করা হয় তখন তারা বিমূঢ় হয়ে পড়েন। কারণ তারা এতদিন পর্যন্ত যা ভেবেছেন ও চিন্তা করেছেন মুহিউদ্দিন আর-রেয়িসের মানচিত্রই তার চেয়ে অধিকতর সূক্ষ্ম ও যথার্থ! তা পরিপূর্ণরূপেই স্যাটেলাইট থেকে ধারণকৃত ছবিগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ! বরং তাদের তথ্যাবলিই ভুল। এর ফলে নাসায় (ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) একদল বিজ্ঞানী মুহিউদ্দিন আর-রেয়িসের মানচিত্রগুলোর পুনর্নিরীক্ষণ করেন, সেগুলো বারবার বড় করে দেখেন। এবার তারা দ্বিতীয়বারের মতো বিমূঢ় হন। কারণ মুহিউদ্দিন আর-রেয়িস তার মানচিত্রে দক্ষিণ মেরুতে ষষ্ঠ মহাদেশ নির্দেশ করেছেন, যার নাম এন্টার্কটিকা (Antarctica)। এটি তাদের এন্টার্কটিকা আবিষ্কারের দুইশ বছরেরও আগের ঘটনা। মুহিউদ্দিন আর-রেয়িস এন্টার্কটিকার পাহাড়সমূহ ও উপত্যকাসমূহের বর্ণনাও দিয়েছেন, যেগুলো ১৯৫২ সালের আগ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।

পিরি রেয়িসের মানচিত্রের সূক্ষ্মতা ও যথার্থতা
সুইস লেখক এরিক ফন দানিকেন (Erich von Däniken) Zuvi Chariots of the Gods? Unsolved Mysteries of the Past নামক বইয়ে(৪২৫) বলেছেন, পিরি রেয়িসের মানচিত্রগুলো মার্কিন মানচিত্রাঙ্কনবিদ ও নাবিক আর্লিংটন ম্যালেরির (Arlington H. Mallery) কাছে পেশ করা হয়। তিনি মানচিত্রগুলোর সূক্ষ্ম পরীক্ষানিরীক্ষা ও বিচার-বিশ্লেষণের পর সিদ্ধান্ত দেন যে, এগুলো (আমেরিকা-সম্পর্কিত) যাবতীয় ভৌগোলিক তথ্য ও বাস্তবতাকে ধারণ করেছে। তবে তার সন্দেহ থেকে যায় যে, এখানে একটি ভুল থেকে গেছে অথবা কোনো কোনো স্থান-নির্দেশ যথার্থ হয়নি। ফলে তিনি মার্কিন নৌবহরের হাইড্রোগ্রাফিক ব্যুরোর মানচিত্রাঙ্কনবিদ মিস্টার ওয়ালটার্স (Mr. Walters)-এর শরণাপন্ন হন। তারা উভয়ে স্থান-নির্দেশক সংখ্যাঙ্কিত বর্গজালি তৈরি করেন এবং মানচিত্রগুলোকে একটি আধুনিক গ্লোবে রূপান্তরিত করেন। এভাবে তারা চাঞ্চল্যকর সব তথ্য আবিষ্কার করেন। মানচিত্রগুলো সম্পূর্ণরূপে নির্ভুল। কেবল ভূমধ্যসাগর ও মৃতসাগরই নয়, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল এবং এন্টার্কটিকা সংলগ্ন অঞ্চলগুলোও পিরি রেইসের মানচিত্রে যথাযথভাবে বর্ণিত হয়েছে। এগুলো মূলত ভূ-সংস্থানিক মানচিত্র (Topographic Map), এতে বিস্ময়কর সূক্ষ্মতায় অঞ্চলগুলোর অভ্যন্তরীণ ভূ-সংস্থানের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এতে পাহাড়-পর্বত, পর্বতশৃঙ্গ, নদীনালা, মালভূমি ইত্যাদির স্পষ্ট ও নির্ভুল বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যেন এগুলোর চিত্র মহাকাশ থেকে ধারণ করা হয়েছে!(৪২৬)

১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন গ্রেট অবজারভেটরি ও মার্কিন সমুদ্র-পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে একদল ভূগোলবিজ্ঞানী পিরি রেইসের মানচিত্রগুলোর ওপর অধিকতর পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান চালান। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষণার পর তারা দেখেন যে ষষ্ঠ মহাদেশ এন্টার্কটিকার চিত্র বিস্ময়কর পর্যায়ে বিশুদ্ধ ও যথার্থ। এমনকি আমাদের বর্তমান যুগেও যেসব স্থান পরিপূর্ণরূপে আবিষ্কৃত হয়নি তারও বর্ণনা রয়েছে পিরি রেইসের মানচিত্রগুলোতে! দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের পর্বতরাশির অস্তিত্ব ১৯৫২ সালের আগে আবিষ্কৃত হয়নি। এগুলো সবসময়ই পুরু বরফের স্তরে ঢাকা থাকে। আধুনিক মানচিত্রগুলোতে এসব পর্বত আবিষ্কার করা হয়েছে ইকো-সাউন্ডিং যন্ত্রপাতি (Echo-Sounding apparatus) ব্যবহার করে।

এখানে আরও উল্লেখ্য যে, মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা পিরি রেইসের মানচিত্রগুলোর ওপর অনুসন্ধান ও গবেষণা অব্যাহত রেখেছে। তাদের কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, দক্ষিণ মেরু অঞ্চল অর্থাৎ এন্টার্কটিকার উপর দিয়ে অতিক্রম করার সময় মহাকাশযান থেকে ভূ- গোলকের যেসব চিত্র ধারণ করা হয়েছে তার সঙ্গে এসব মানচিত্র সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মহাকাশযান থেকে পাঁচ হাজার মাইলব্যাপী অঞ্চলের চিত্র ধারণ করা হয়েছে। তা ছাড়া তারা স্যাটেলাইট থেকে ধারণকৃত চিত্রসমূহ ও পিরি রেয়িসের মানচিত্রগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস্য মিল খুঁজে পেয়েছেন!(৪২৭)

স্পেন থেকে ভারত পর্যন্ত নৌপথ আবিষ্কার
আবুল আব্বাস আল-কালকাশান্দি (মৃ. ১৪১৮) তার সুবহুল আ'শা গ্রন্থে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগের বিষয়টি যথার্থভাবে বর্ণনা করেছেন। তার এই বক্তব্য থেকে মুসলিমরা যে ভাস্কো দা গামার(৪২৮) আগেই এ বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন তা স্পষ্ট হয়। তিনি আটলান্টিক মহাসাগর সম্পর্কে বলেছেন, এই মহাসাগর মরোক্কান উপকূল থেকে জিব্রাল্টার প্রণালির-যা আন্দালুস ও মরক্কোকে বিভক্ত করেছে-পাশ দিয়ে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গিয়েছে এবং বার্বারদের অঞ্চল লামতুনা মরুভূমি অতিক্রম করেছে। আল-কালকাশান্দি তারপর সমুদ্রপথের বর্ণনা দিয়েছেন, তারপর তা জিবালুল কামারের (Dhofar Mountains) পেছন দিয়ে পূর্ব দিকে এগিয়েছে। জিবালুল কামার থেকে মিশরের নীলনদের উৎস শুরু হয়েছে। এর আলোচনা পরে আসবে। এভাবে আটলান্টিক মহাসাগর ভূমি থেকে দক্ষিণমুখী হয়েছে এবং আরদু খারাব (ওয়াস্টল্যান্ড)-এর ওপর দিয়ে ও যান্জ (Zanj) দেশের পেছন দিয়ে (সহিলি উপকূলকে বামে রেখে) পূর্বদিকে এগিয়েছে, তারপর পূর্বে ও উত্তরে বিস্তৃত হয়ে ভারত মহাসাগর ও চীন সাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।(৪২৯)

ইগন্যাটি ক্র্যাচকোস্কি উল্লেখ করেছেন যে, একজন আরব নাবিক ভাস্কো দা গামা যে ভ্রমণ করেছেন সেই একই ভ্রমণ করেছেন ১৪২০ খ্রিষ্টাব্দে, তবে উলটোপথে, তিনি ভারত মহাসাগরের একটি বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং আফ্রিকার চারপাশ ঘুরে আটলান্টিক মহাসাগরে মরক্কোর বন্দরে পৌছেন। এটি ভাস্কো দা গামার জন্মেরও ৪৭ বছর আগের ঘটনা।(৪৩০)

ভাস্কো দা গামা তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন যে, ভ্রমণকালে যে-সকল আরব নাবিকের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে তারা উন্নতমানের কম্পাস রাখতেন জাহাজের দিক-নির্দেশনার জন্য। তাদের সঙ্গে পর্যবেক্ষণযন্ত্রও থাকত, থাকত সামুদ্রিক মানচিত্রও। বিভিন্ন সময়ে তিনি তাদের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং তাদের সাহায্য গ্রহণ করেছেন। তিনি আরব নাবিকদের কিছু মানচিত্র পর্তুগালের সম্রাট ম্যানুয়েলের (Manuel I of Portugal) কাছে পাঠিয়ে দেন। আরেকজন মুসলিম নাবিকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার নাম মুআল্লিম কানা। তিনি মালিন্ডির বাসিন্দা ছিলেন। তিনিই ভাস্কো দা গামার জাহাজকে মালিন্ডি(৪৩১) থেকে ভারতের কালিকোট বন্দরে পৌঁছে দেন। অন্যান্য তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যিনি ভাস্কো দা গামার জাহাজ চালিয়ে নিয়ে আসেন তিনি হলেন আরব মুসলিম ভূগোলবিদ ও নাবিক ইবনে মাজেদ(৪৩২)। তিনিই কম্পাস আবিষ্কার করেছিলেন। আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে, পরবর্তী মুসলিমদের অঙ্কিত মানচিত্রগুলোতে-যেমন আল-মাসউদির মানচিত্র ও আল-ইদরিসির মানচিত্র-আফ্রিকাকে ঘিরে আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে ভারত মহাসাগরের সংযোগ-ব্যবস্থার স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। এসব সামুদ্রিক অঞ্চল আরব নৌবহরের দ্বারা আবাদিত ছিল। এসব নৌবহর ভারত ও পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যে যাওয়া-আসা করত।(৪৩৩)

ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের প্রচেষ্টা ও তাদের চারপাশের ভূ-অঞ্চল আবিষ্কারের যে কাহিনি তা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পড়লে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়। তাদের সেসব প্রচেষ্টার ফল কত-না উজ্জ্বল, কত-না চমৎকার!

আরবের গুরুত্বপূর্ণ ভূগোলবিদ ও তাদের রচিত গ্রন্থসমূহের পরিসংখ্যান ব্যাপক ও বিস্তৃত বর্ণনার দাবি রাখে। আবুল ফিদা(৪০৪) একাই ষাটজন ভূগোলবিদের নাম উল্লেখ করেছেন, যাদের আবির্ভাব ঘটেছিল তার পূর্বে।... ইউরোপীয়রা যদি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ইসলামের প্রতি (বিদ্বেষভাবাপন্ন) চিন্তাভাবনা আঁকড়ে ধরে লালন না করত, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে, তাহলে ইউরোপের ভূগোলবিদ্যার বড় বড় পণ্ডিতরা কেন মুসলিমদের অবদানকে অস্বীকার করে তার কারণ উদ্‌ঘাটন করা দুষ্কর হতো। তা সত্ত্বেও আরবরা যেসব বড় বড় কাজ করেছেন তা তাদের কদর ও মূল্য প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। কারণ আরবরাই প্রথম নিয়মতান্ত্রিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন করেছেন, যা মানচিত্রবিদ্যার প্রধান ভিত্তি।(৪০৫)

এগুলোও আমাদের কথা নয়, বরং গুস্তাভ লি বোঁর কথা।

টিকাঃ
৩৭৬. মার্টিন প্লেসনার, মাবহাসুল উলুম, যোসেফ শাস্ত্র (Joseph Franz Schacht) ও ক্লিফোর্ড এডমন্ড বসওয়র্থ (Clifford Edmund Bosworth) কর্তৃক সম্পাদিত The Legacy of Islam, আরবি অনুবাদ, تراث الاسلام খ. ২, পৃ. ১৫৪।
৩৭৭. মার্টিন প্লেসনার (Martin Plessner 1797-1883) জার্মান অর্থোডক্স ধর্মপ্রচারক এবং পণ্ডিত। বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ। বেলারুশে জন্মগ্রহণ করেন। ইসলামের ধ্রুপদি ঐতিহ্য এবং মধ্যযুগে ইহুদিধর্মের ওপর ইসলামের প্রভাব তার প্রধান আগ্রহের বিষয়।-অনুবাদক
৩৭৮. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৬৮।
৩৭৯. হেকাটিয়াস মূলত অ্যানাক্সিম্যান্ডারের (Anaximander 610-546 BC) অঙ্কিত মানচিত্রের উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন।- অনুবাদক।
৩৮০. প্রাগুক্ত এবং জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯৭-৩৯৮।
৩৮১. সুরা নাযিআত: আয়াত ৩০।
৩৮২. সুরা যুমার: আয়াত ৫।
৩৮৩. ইবনে খুররাদাযবিহ: আবুল কাসিম উবাইদুল্লাহ ইবনে আহমাদ ইবনে খুররাদাযবিহ (২০৪- ২৭২ হি./৮২০-৮৮৫ খ্রি.)। ভৌগোলিক ইতিহাসবিদ। বারমাকিদের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ المسالك والممالك। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল- ওয়াফায়াত, খ. ১৯, পৃ. ২২৯।
৩৮৪. ইবনে খুরাদাযবিহ, আল-মাসালিক ওয়াল-মামালিক, পৃ. ৪।
৩৮৫. ইবনে রুসতাহ: আবু আলি আহমাদ ইবনে উমর (মৃ. ৩০০ হি./৯১২ খ্রি.)। ভূগোলবিদ। ইরানের ইস্পাহানের অধিবাসী। الأعلاق النفيسة তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। দেখুন, যিরিকলি, আল- আ'লাম, খ. ১, পৃ. ১৮৫।
৩৮৬. ইবনে রুসতাহ, আল-আ'লাক আন-নাফিসাহ, পৃ. ৮।
৩৮৭. ইবনে আবদি রাব্বিহি: আবু উমর আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদি রাব্বিহি ইবনে হাবিব ইবনে হুদাইর ইবনে সালেম (২৪৬-৩২৮ হি./৮৬০-৯৪০ খ্রি.)। শীর্ষস্থানীয় সাহিত্যিক। আল-ইকদুল ফারিদ গ্রন্থের প্রণেতা। কর্ডোভার অধিবাসী। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২০৭।
৩৮৮. আবু উবাইদা আল-ফালাকি : আবু উবাইদা মুসলিম ইবনে আহমাদ (মৃ. ২৯৫ হি.)। গ্রহরাজির আবর্তন ও নক্ষত্রের সন্তরণ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন। জ্যোতির্বিদ্যায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল। ছিলেন ফকিহ ও হাদিস বিশারদ। ভাষা ও ব্যাকরণ এবং ছন্দশাস্ত্রেও দখল ছিল তার। দেখুন, আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ৩, পৃ. ৩৭৪।
৩৮৯. সাসানীয় সম্রাট; প্রথম বাহরাম, দ্বিতীয় বাহরাম ও পঞ্চম বাহরাম সাসানীয় সম্রাট ছিলেন।- অনুবাদক
৩৯০. ইরানের খুরাসান প্রদেশের গুরাবাদ জেলার একটি শহর।-অনুবাদক
৩৯১. সূরা যুমার: আয়াত ৫।
৩৯২. ইবনে হাযম আল-আন্দালুসি, الفصل في الملل والأهواء والنحل ২, পৃ. ৭৮।
৩৯৩. আল-ইদরিসি, نزهة المشتاق في اختراق الآفاق, পৃ. ৯১।
৩৯৪. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ৩৫৮।
৩৯৫. সিন্দ ইবনে আলি: আবু তাইয়িব সিন্দ ইবনে আলি আল-ইয়াহুদি (মৃ. ২৫০ হি./৮৬৪ খ্রি.)। প্রখ্যাত মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী, অনুবাদক, গণিতজ্ঞ ও প্রকৌশলী। খলিফা আল-মামুনের দরবারে আসেন এবং তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি তারকা-সারণি জিজ আল-সিন্দহিন্দ (Zij al-Sindhind) অনুবাদ ও সম্পাদনার জন্য পরিচিতি লাভ করেন। একজন গণিতবিদ হিসাবে সিন্দ ইবনে আলি আল-খাওরিজমির সহকর্মী ছিলেন। পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ كتاب المنفصلات والمتوسطات في النجوم والحساب। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৫, পৃ. ২৪২।
৩৯৬. আলি ইবনে ঈসা আল-আস্তুরলাবি ছিলেন বিখ্যাত গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ। বাগদাদে বসবাস করতেন। খলিফা আল-মামুনের বিজ্ঞান পরিষদে ছিলেন।
৩৯৭. ধ্রুবতারা (Pole star): পৃথিবীর উত্তর মেরুর অক্ষ বরাবর দৃশ্যমান তারা ধ্রুবতারা নামে পরিচিত। এই তারাটি পৃথিবীর অক্ষের উপর ঘূর্ণনের সঙ্গে প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে আবর্তিত হয়। প্রাচীন কালে দিনির্ণয়যন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে সমুদ্রে জাহাজ চালানোর সময় নাবিকেরা এই তারার অবস্থান দেখে দিনির্ণয় করত। সপ্তর্ষিমণ্ডলের প্রথম দুটি তারা, পুলহ এবং ক্রতুকে সরলরেখায় বাড়ালে তা এ তারাটিকে নির্দেশ করে। এটি লঘু সপ্তর্ষিমণ্ডলে দেখা যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশের দৃশ্যমান সকল তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। শুধু ধ্রুবতারাই মোটামুটি একই স্থানে দৃশ্যমান থাকে। এটি আকাশের একমাত্র তারা, যেটিকে এ অঞ্চল হতে বছরের যেকোনো সময়েই ঠিক এক জায়গায় দেখা যায়। পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ থেকে ধ্রুবতারাকে সারা বছরই আকাশের উত্তরে নির্দিষ্ট স্থানে দেখা যায়। দিনির্ণয়ে এই তারা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বাংলাদেশের আকাশে ধ্রুবতারাকে বেশি উঁচুতে দেখা যায় না। ঢাকা থেকে ধ্রুবতারার উচ্চতা ২৩ ডিগ্রি ৪৩ মিনিট। দিগ্বলয় থেকে আকাশের প্রায় চারভাগের একভাগ উঁচুতেই এই তারাটির মতো উজ্জ্বল আর কোনো তারা নেই বলে একে চিনতে বিশেষ অসুবিধা হয় না। তবে বাংলাদেশ থেকে যতই উত্তরে যাওয়া যাবে, ধ্রুবতারাকে ততই ওপরে দেখা যাবে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৩৯৮. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল-আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১৬২।
৩৯৯. এই বিষয়ে দেখুন, Johannes Willers, Schätze der Astronomie, আরবি অনুবাদ, كنوز علم الفلك, পৃ. ২৫।
৪০০. মারিনুস অফ টায়ার (Marinus of Tyre): টায়ার-এর আরবি নাম সুর। এটি ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত একটি শহর। সিরিয়ায় খ্রিষ্টপূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের সময়ে তিনি সুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার জীবৎকাল খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দীর শেষ থেকে নিয়ে দ্বিতীয় শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত (৭০-১৩০ খ্রিষ্টাব্দ)। টলেমি প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি মারিনুসের শিষ্য ছিলেন। মারিনুস অফ টায়ারের উল্লেখযোগ্য রচনা হলো 'তাসহিহুল জুগরাফিয়া'।
৪০১. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯০।
৪০২. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯০-৩৯৩।
৪০৩. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৬৮।
৪০৪. আবু আলি আল-হাসান ইবনে আলি ইবনে আল-মুররাকুশি (মৃ. ৬৬০ হি./১২৬২ খ্রি.)। মরোক্কান জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ, ভূগোলবিদ এবং সূর্যঘড়িনির্মাতা। ত্রিকোণমিতিতে সবিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ত্রিকোণমিতিতে তিনি নতুন রীতির প্রবর্তন করেন। তিনিই প্রথম সাইন, কোসাইন ইত্যাদি ব্যবহার করেন এবং সাইন-সারণি তৈরি করেন। বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করেন। ২৪০টিরও বেশি নক্ষত্র চিহ্নিত করে তাদের বর্ণনা দেন। সমান সময় নির্দেশ রেখা ব্যবহার করেন। বিভিন্ন ভৌগোলিক ত্রুটি সংশোধন করেন এবং মরক্কোর মানচিত্র নতুনভাবে অঙ্কন করেন। জর্জ সার্টন বলেছেন, আল-মুৱাকুশি প্রথম কোণের সাইন এবং ৯০ ডিগ্রির কম কোণ নির্দেশ করেন।-অনুবাদক
৪০৫. ড. আবদুর রহমান হামিদাহ, আলামুল জুগরাফিয়্যিনাল আরব, পৃ. ৪৫৯।
৪০৬. আলি ইবনে উমর আল-কাতিবি: নাজমুদ্দিন আলি ইবনে উমর ইবনে আলি আল-কাতিবি আল-কাযবিনি (৬০০-৬৭৫ হি./১২০৩-১২৭৭ খ্রি.)। প্রজ্ঞাবান ও যুক্তিবিদ। নাসিরুদ্দিন আত-তুসির শিষ্য। তার বহু রচনা রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো 'আশ-শাসিয়্যাহ' ও 'হিকমাতুল আইন'। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২১, পৃ. ২৪৪।
৪০৭. জর্জ সার্টন, Introduction to the History of Science, খ. ১, পৃ. ৪৬।
৪০৮. উইল ডুরান্ট, 'কিস্সাতুল হাদারাহ', খ. ১৩, পৃ. ৩৫৯।
৪০৯. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৬৯।
৪১০. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৭০।
৪১১. মার্টিন প্লেসনার, মাবহাসুল উলুম, যোসেফ শাফ্‌ত (Joseph Franz Schacht) ও ক্লিফোর্ড বসওর্থ (Clifford Edmund Bosworth) কর্তৃক সম্পাদিত The Legacy of Islam, আরবি অনুবাদ, تراث الاسلام , খ. ২, পৃ. ১৫৪।
৪১২. ক্রিস্টোফার কলম্বাস (১৪৫১-১৫০৬ খ্রি.) বিখ্যাত ইতালীয় পর্যটক ও উপনিবেশ প্রতিষ্ঠাতা। আমেরিকা, বাহামা দ্বীপপুঞ্জ ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কার করেছেন বলে দাবি করা হয়। তিনি প্রচণ্ড ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে স্পেনে মৃত্যুবরণ করেন।
৪১৩. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯৬-৩৯৭।
৪১৪. আল-মাসউদি: আবুল হাসান আলি ইবনুল হুসাইন ইবনে আলি (২৮৩-৩৪৬ হি./৮৯৬-৯৫৭ খ্রি.)। ইতিহাসবিদ, পর্যটক, অনুসন্ধানী। বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন, কায়রোতে বসবাস করতেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। مروج الذهب ومعادن الجوهر তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২১, পৃ. ৬-৭; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ২৭৭।
৪১৫. ভাইকিং (Viking) বলতে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সমুদ্রচারী ব্যবসায়ী, যোদ্ধা ও জলদস্যুদের একটি দলকে বোঝায়, যারা ৮ম শতক থেকে ১১শ শতক পর্যন্ত ইউরোপের এক বিরাট এলাকাজুড়ে লুটতরাজ চালায় ও বসতি স্থাপন করে। এদেরকে নর্সম্যান বা নর্থম্যানও বলা হয়। ভাইকিংরা পূর্ব দিকে রাশিয়া ও কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত পৌছেছিল।
৪১৬. আল-মাসউদি, মুরুজুয যাহাব ওয়া মাআদিনুল জাওহার, খ. ১, পৃ. ১১৯।
৪১৭. আল-আব্ আনাসতাস মারি আল-কারমালি (Al-Ab Anastas Mari Al-Karmali) : তিনি বুতরুস জিবরাইল ইউসুফ আওয়াদ (১২৮৩-১৩৬৬ হি./১৮৬৬-১৯৪৭ খ্রি.) লেবানিজ খ্রিষ্টান পুরোহিত ও আরবি ভাষাবিজ্ঞানী সাহিত্যিক। আরবের দর্শন ও ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ। আরবি ভাষাবিজ্ঞানে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আলাম, খ. ২, পৃ. ২৫।
৪১৮. الأب انستاس ماري الكرملي : عرف العرب أمريكا قبل أن يعرفها الغرب. الهلال প্রকাশিত, সংখ্যা ১০৬। আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ তার اثر العرب في الحضارة الأوروبية বইতে এ দিকে ইঙ্গিত করেছেন, পৃ ৪৭।
৪১৯. পল আর্নেস্ট কাহলে (Paul Ernst Kahle 1875-1964): বিখ্যাত জার্মান প্রাচ্যবিদ। মারবুর্গ ও বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্যের ভাষা শেখেন। প্রোটেস্ট্যান্ট যাজক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন রোমানিয়া ও কায়রোতে। কায়রোতে ভাষাতত্ত্বের ওপরও অধ্যয়ন করেন।
৪২০. পিরি রেয়িস: মুহিউদ্দিন ইবনে মুহাম্মাদ আর-রেয়িস (৮৭৭-৯৬২ হি./১৪৭০-১৫৫৫ খ্রি.)। উসমানি নৌসেনাপতি, নাবিক, ভূগোলবিদ ও মানচিত্রাঙ্কনবিদ। ১৫০০ সালে মাওদান সমুদ্রযুদ্ধে তিনি প্রধান সেনাপতি ছিলেন। তিনি বিশ্বের দুটি মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: কিতাবু বাহরিয়‍্যাহ।
৪২১. ক্র্যাচকোল্কি, তারিখুল আদাবিল জুগরাফিয়্যিল আরাবি, খ. ২, পৃ. ৫৬২।
৪২২. প্রফেসর ইভান ভান সারটিমা (Ivan Van Sertima) তার ১৯৭৬ সালে রচিত They Came Before Columbus: The African Presence in Ancient America গ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তিনি দলিল-প্রমাণ উপস্থিত করেছেন। কলম্বাসের নিজের কথা থেকেও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, আরবরাই প্রথম আমেরিকায় পৌছেছিল। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি বিশ্বাস করতেন ওই দ্বীপে যেসব রেড ইন্ডিয়ানদের দেখেছেন তারা মূলত আরব বংশোদ্ভূত, তার আগেই তারা ওখানে পৌঁছেছিল। আরবদের পাণ্ডুলিপি থেকেই তিনি এসব তথ্য জেনেছিলেন। ব্রিটিশ রয়াল জিয়োগ্রাফিক্যাল সোসাইটি The Discoverers নামে একটি ডকুমেন্টারি টিভি সিরিজ তৈরি করেছে। এখানে একটি পর্ব ছিল কেবল কলম্বাস ও তার আবিষ্কার সম্পর্কে। তা থেকে জানা যায় যে, তিনি আরবি ভাষা জানে এমন একজনকে তার সহযাত্রী মনোনীত করেছিলেন। অর্থাৎ লোকটা ছিল আরব বংশোদ্ভূত। তিনি এই লোককে দিয়ে রেড ইন্ডিয়ানদের সর্দারের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিটি ছিল আরবি ভাষায় লেখা। চিঠিতে কলম্বাস বলেন, হে মহামান্য, স্পেন ও ক্যাস্টাইল রাজ্যের রানি, রানি ইসবালে আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন। তিনি স্পেন ও ক্যাস্টাইল রাজ্য এবং আপনার দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী।-অনুবাদক
৪২৩. ড. আবদুর রহমান হামিদাহ, আলামুল জুগরাফিয়্যিনাল আরব, পৃ. ২২৫।
৪২৪. শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৫০০।
৪২৫. বইটির ইংরেজি অনুবাদ, Memories of the Future: Unsolved Mysteries of the Past. মূল জার্মান থেকে বইটির অনুবাদ করেছেন মাইকেল হেরন।
৪২৬. এরিক ফন দানিকেন, Chariots of the Gods?, আরবি অনুবাদ, عربات الامة, অনুবাদক, আদনান হাসান, পৃ. ২৯।
৪২৭. আহমাদ শাওকি আল-ফানজারি, http://www.islamset.com/arabic/asc/fangryl.html.
৪২৮. ভাস্কো দা গামা (১৪৬৯-১৫২৪ খ্রি.) ছিলেন পর্তুগিজ অনুসন্ধানকারী ও পর্যটক। তিনি পঞ্চদশ শতাব্দীতে সমুদ্রপথে ইউরোপ থেকে ভারত আসেন। তার এই সমুদ্রপথ আবিষ্কার বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদে নতুন মাত্রা যোগ করে। তিনি ভারতের কোচিতে মৃত্যুবরণ করেন।
৪২৯. আবুল আব্বাস আল-কালকাশান্দি, সুবহুল আশা, খ. ৩, পৃ. ২৩৭।
৪৩০. ক্র্যাচকোড্রিঙ্ক, তারিখুল আদাবিল জুগরাফিয়্যিল আরাবি, খ. ২, পৃ. ৫৬৩।
৪৩১. মালিন্ডি উপসাগরের তীরবর্তী গালানা নদীর মুখে অবস্থিত একটি শহর।
৪৩২. ইবনে মাজেদ: আহমাদ ইবনে মাজেদ ইবনে মুহাম্মাদ আন-নাজদি (১৪৩২-১৪৯৮ খ্রি.)। উপাধি: সমুদ্রসিংহ ও ধাবমান নক্ষত্র। আরবের শ্রেষ্ঠ নাবিকদের অন্যতম। মানচিত্রাঙ্কনবিদ। নৌবিজ্ঞানী ও নৌ-ইতিহাসবিদ। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২০০।
৪৩৩. বিস্তারিত দেখুন, হুসাইন মুনিস, আতলাসু তারিখিল ইসলাম, পৃ. ১২ ও তার পরবর্তী।
৪৩৪. আবুল ফিদা: ইসমাইল ইবনে আলি ইবনে মাহমুদ ইবনে শাহেনশাহ (৬৭২-৭৩২ হি./১২৭৩-১৩৩১ খ্রি.)। আল-মালিক আল-মুআইয়াদ, হামার অধিপতি। ভৌগোলিক ইতিহাসবিদ। দখল ছিল প্রকৃতিবিজ্ঞানেও। تقويم البلدان و المختصر في أخبار البشر তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৯, পৃ. ১০৪; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ৩১৯।
৪৩৫. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৭১।

ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের রচনাবলি এখনো পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। এসব রচনায় যেসব তথ্য ও সংবাদ রয়েছে তা আমাদের ঐতিহাসিক ভূগোল-বিষয়ক জ্ঞানকে বৃদ্ধি করেছে। তাদের এসব রচনায় মূলত বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পরোক্ষভাবে তা আমাদের ওইসব দেশের ইতিহাস-সম্পর্কিত জ্ঞানকেও সমৃদ্ধ করেছে। এই ময়দানে ইসলামের উত্তরাধিকার বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।(৩৭৬)

এটা আমাদের কথা নয়, বরং তা জার্মান-ইসরাইলি গবেষক মার্টিন প্লেসনারের(৩৭৭) কথা।

ইসলামের আগমনের পূর্বেই ভূগোলবিদ্যার চর্চা শুরু হয়েছিল। কিন্তু আরবদের প্রাগ্রসরতা ও তাদের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জ্ঞানবিজ্ঞানের ফলে ভূগোলবিদ্যায়ও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ও উৎকর্ষ সাধিত হয়। এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই যে, আরবরা শুরুর দিকে গ্রিকদের বিজ্ঞান গ্রহণ করেছিল, বিশেষ করে টলেমির। ভূগোলবিদ্যায় গ্রিকরাই ছিল তাদের পথপ্রদর্শক। তবে এই ক্ষেত্রেও আরবরা তাদের গুরুদের ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যেমনটা ছিল তাদের অভ্যাস।(৩৭৮)

এটাও আমাদের বক্তব্য নয়, বরং বিখ্যাত ফরাসি চিন্তাবিদ গুস্তাভ লি বোঁর বক্তব্য।

ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের উদ্ভাবন ও অবদান
ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের উদ্ভাবন ও অবদানকে আমরা তিনটি বিভাগে চিহ্নিত করতে পারি:
• পূর্ববর্তী ভ্রান্তি-বিভ্রাটের সংশোধন
• দেশ ও নিদর্শনসমূহের যথার্থ বর্ণনা
• আবিষ্কার ও উদ্ভাবন

পৃথিবীর গোলকাকৃতির প্রমাণ
পৃথিবী যে গোলাকার তা প্রথম মুসলিমরাই প্রমাণ করেছিলেন। ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার যাত্রা শুরু হয় এভাবেই। গ্রিকরা বিশ্বাস করত যে, পৃথিবী হলো বৃত্তাকার সমতল চাকতি, যাকে সব দিক থেকে বেষ্টন করে রেখেছে সমুদ্রের জলরাশি।

হেকাটিয়াস (Hecataeus of Miletus 500 BC)—যাকে গ্রিক ভূগোলবিদ্যার জনক বিবেচনা করা হয়—তো পৃথিবীকে একটি বৃত্তাকার চাকতি ধরে নিয়ে তার মানচিত্র অঙ্কন করেছেন।(৩৭৯) পৃথিবী যে গোলাকার তার প্রথম তাত্ত্বিক ধারণা দেন প্লেটো (৩৪৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ), তবে তিনি তার পরবর্তী দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের থেকে যথার্থ সমর্থন পাননি। এমনকি রোমান সাম্রাজ্য তার এই চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে। রোমান ভূগোলবিদ্যার জনক কসমাস (Cosmas) ৫৪৭ খ্রিষ্টাব্দে লিখেছেন, পৃথিবী হলো চাকার সদৃশ, সমুদ্রের জলরাশি তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে...।' বিষয়টি জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যখন গির্জা ও গির্জার প্রথম সারির ফাদাররা—যাদের নেতৃত্বে ছিলেন লাকটানটিয়াস (Lactantius)—কসমাসের উপর্যুক্ত তত্ত্বকে বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং সিদ্ধান্ত দেন যে, পৃথিবী হলো সমতল এবং অন্যপাশ হলো অনাবাদিত, তা (পৃথিবী সমতল) না হলে মানুষ শূন্যে পতিত হতো!(৩৮০)

ইসলামি সভ্যতা আবির্ভাবের পর তা পৃথিবীর গোলকাকার তত্ত্বকে গ্রহণ করে এবং এই তত্ত্বের পুনর্জীবনদানে সচেষ্ট হয়। এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল এই যে, পবিত্র কুরআন বিভিন্নভাবে পৃথিবীর গোলকাকৃতির প্রতি ইঙ্গিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَاهَا
এবং পৃথিবীকে তারপর বিস্তৃত করেছেন।(৩৮১)

'দাহিয়্যা' শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো গোলক। পবিত্র কুরআনে আরও অনেক আয়াত রয়েছে যেগুলো এই গোলকটি যে তার নিজের চারপাশে (কক্ষপথে) ঘূর্ণায়মান তা নিয়ে আলোচনা করেছে। গোলকটির (পৃথিবীর) এমন আবর্তনের ফলেই দিবস ও রজনীর সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ
তিনি রাতের দ্বারা দিবসকে আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে আচ্ছাদিত করেন রাতের দ্বারা।(৩৮২)

ইবনে খুররাদাযবিহ(৩৮৩) বলেছেন, পৃথিবী বলের মতোই গোলাকার, ডিমের ভেতরে থাকা কুসুমের মতো।(৩৮৪) ইবনে রুসতাইও(৩৮৫) একই কথা বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আকাশকে বলের মতো গোলকাকার বানিয়েছেন, তা শূন্যগর্ভ ঘূর্ণনশীল; পৃথিবীও গোলাকার এবং আকাশের অভ্যন্তরে রয়েছে।(৩৮৬)

বিখ্যাত সাহিত্যিক ও আল-ইব্দুল ফারিদ গ্রন্থের প্রণেতা ইবনে আবদি রাব্বিহি(৩৮৭) কয়েকটি পঙ্ক্তি রচনা করেছেন, যেখানে তিনি আবু উবাইদা মুসলিম ইবনে আহমাদ আল-ফালাকির(৩৮৮) বক্তব্যের খণ্ডন করেছেন।

আমরা তার পঙ্ক্তিমালা থেকে জানতে পারি যে, আবু উবাইদা আল-ফালাকি পৃথিবী গোলকাকার বলে মত ব্যক্ত করতেন। কিন্তু ইবনে আবদি রাব্বিহি তার সঙ্গে একমত ছিলেন না। তাই তিনি বলেছেন,
أبا عبيدة ما المسؤول عن خبر تحكيه إلا سؤالاً للذي سألا أبيت إلا شذوذا عن جماعتنا ولم تعب رأي من أزجا ولا اعتزلا كذلك القبلة الأولى مُبدَّلة وقد أبيت فما تبغي بها بدلا زعمت بهرام أو بيدخت يرزقنا لا بل عطارد أو برجيس أو زُحَلا وقلت إن جميع الخلق في فلك بهم يحيط وفيهم يقسم الأجـلا والأرض كورية حق السماء بها فوقاً وتحتاً وصارت نقطة مثلا صيف الجنوب شتاء للشَّمَالِ بها قد صار بينهما هذا وذا دولا فإن كانون في صنعا وقرطبة برد وأيلول يُذكي فيهما الشعلا كما استمر ابن موسى في غوايته فوعر السهل حتى خِلْتَهُ جَبَلا أبلغ معاوية المصغي لقولهما أني كفرت بما قالا وما فعلا
আবু উবাইদা, আপনি যা বলেন সে বিষয়ে আপনি দায়িত্বশীল নন, বরং প্রশ্নকারীর জন্য রেখে যান প্রশ্ন।
আপনি আমাদের দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন এবং যে বিচ্ছিন্ন হয় বা পাশ কাটিয়ে যায় তার বক্তব্য সঠিক হয় না।

প্রথম কেবলার পরিবর্তন হয়েছিল; কিন্তু আপনি তা স্বীকার করেন না এবং এ ধরনের পরিবর্তন আশাও করেন না।

আপনি দাবি করেছেন, বাহরাম(৩৮৯) বা বায়দুগ্ধ(৩৯০) আমাদের রিযিক দান করে, না বরং বুধগ্রহ বা বৃহস্পতিগ্রহ বা শনিগ্রহ রিযিক দান করে।

আপনি বলেছেন, সমস্ত সৃষ্টি রয়েছে এক মহাকাশে, যা তাদের বেষ্টন করে আছে এবং তাদের মধ্যে মহাকাশই নির্ধারণ করে সময়।

আপনি আরও বলেছেন, পৃথিবী হলো গোলাকার, আকাশ তাকে উপর দিক ও নিচ দিক থেকে ঘিরে রেখেছে, যেন তা আকাশের মধ্যস্থলে একটি বিন্দু।

পৃথিবীর দক্ষিণে (দক্ষিণ মেরুতে) যখন গ্রীষ্ম, উত্তরে (উত্তর মেরুতে) তখন শীত, উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর মধ্যস্থলে রয়েছে পৃথিবীর সব দেশ।

সানআ ও কর্ডোভায় ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে থাকে শীত, আর সেপ্টেম্বর মাস এখানে জ্বালায় আগুন।

ইবনে মুসাও তার পথভ্রষ্টতায় রয়েছেন অটল; তিনি সমতলকে করে তোলেন এতটা অসমান যে (বা সহজ বিষয়কে করে তোলেন এতটা কঠিন যে) তাকে তোমার পাহাড় মনে হয়।

মুআবিয়াকে—যে তাদের দুইজনের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে—জানিয়ে দাও, তারা দুইজন (আবু উবায়দা ও ইবনে মুসা) যা বলেন ও করেন তা আমি স্বীকার করি না।

এখানে একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। এই আবু উবাইদার জীবনচরিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তার কাছে মিথ্যাচারের চেয়ে আকাশ থেকে পতনও সহজতর। এই বক্তব্য প্রথমত তার চারিত্রিক গুণাবলিকে নির্দেশ করলে তা থেকে এই বিশ্বাস জন্মে যে, তিনি ছিলেন সূক্ষ্ম অনুসন্ধানী, সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে খুঁটিয়ে দেখতেন, কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আগে দীর্ঘ অনুসন্ধান ও গবেষণা করতেন।

আবু উবাইদা হিজরি তৃতীয় শতকের (খ্রিস্টীয় নবম শতকের) একজন বিজ্ঞানী। আন্দালুসে যারা জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকেন তিনি ছিলেন তাদের প্রথম সারির অন্যতম ব্যক্তি। আমাদের জন্য আরও একটি ব্যাপার জানা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলামি বিশ্ব এসব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে — তা যতটাই অভিনব হোক—কখনো প্রত্যাখ্যান করেনি এবং বিরোধিতাও করেনি। তা ছাড়া যারা কিছুটা বিরোধিতা করতেন, তারাও স্বাভাবিক সীমারেখার বাইরে গিয়ে বিরোধিতা করতেন না। এখানে আমাদের সংগত কারণেই এ কথাও স্মরণে রাখতে হবে যে, এই সময় থেকে ইউরোপে পাঁচশ বছরব্যাপী জ্ঞানের বিকাশ ছিল রক্তে প্লাবিত, আগুনে দগ্ধ ও ইনকুইজিশনের নির্যাতনের শিকার।

ইবনে হাযম আল-আন্দালুসি ও পৃথিবীর গোলাকৃতি
এখানে আমাদের এ কথা বলে রাখাও সংগত যে, ইসলামি ধর্মীয় জ্ঞানীরা সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়াতে পারেন না। তারা ইসলামে এমন শিক্ষা পান যা জ্ঞানগত সত্যকে সমর্থন করে এবং সত্য অস্বীকারকারীদের বিরোধিতা করে। যেমন ইবনে হাযম আল-আন্দালুসি পৃথিবীর গোলাকৃতির ব্যাপারে মুসলিম ইমাম ও মনীষীদের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আলেমগণ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে, পৃথিবী যে গোলাকার সে ব্যাপারে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে এবং এই প্রমাণগুলো সঠিক। তবে এর বিপরীত ছিল সাধারণ মানুষের বক্তব্য। (সাধারণ মানুষের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে) আমাদের জবাব এই যে—আল্লাহ তাআলাই তাওফিকদাতা—মুসলিম মনীষীদের কেউই, যারা এমনকি ‘জ্ঞানের ইমাম’ উপাধি ধারণের হকদার, পৃথিবীর গোলকাকৃতিকে অস্বীকার করেননি। তাদের কেউই এই বক্তব্যের সমর্থনে নিজেদের পক্ষ থেকে একটি শব্দও খরচ করেননি। বরং কুরআন ও সুন্নাহ থেকেই পৃথিবীর গোলকাকৃতির ও ঘূর্ণনের ব্যাপারে বহু প্রমাণ এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ

তিনি রাতের দ্বারা দিবসকে আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে আচ্ছাদিত করেন রাতের দ্বারা।(৩৯১)

এদের একটি যে আরেকটিকে পেঁচিয়ে রয়েছে সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট বর্ণনা এটি। كور العمامة (সে পাগড়ি পেঁচালো) ধাতু থেকে কথাটি এসেছে। পেঁচানোই পাগড়ি বাঁধার প্রক্রিয়া এবং গোলকাকার বস্তুতেই পেঁচানো হয়। পৃথিবীর গোলকাকৃতির ব্যাপারে এটা স্পষ্ট দলিল...।(৩৯২)

আল-ইদরিসি ও পৃথিবীর গোলাকৃতি
শরিফ আল-ইদরিসি যা বলেছেন, নিশ্চয় পৃথিবী বলের গোলকাকৃতির মতো গোলকাকার। পানি তার সঙ্গে এঁটে রয়েছে এবং প্রাকৃতিকভাবেই তার ওপর স্থির রয়েছে ও পড়ে যাচ্ছে না। জলসহ পৃথিবী রয়েছে মহাকাশের অভ্যন্তরীণ শূন্যতায়, যেমন ডিমের অভ্যন্তরে থাকে কুসুম। জলসহ পৃথিবীর অবস্থান মধ্যবর্তী এবং বাতাস (অর্থাৎ বায়ুমণ্ডল) তাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখেছে।(৩৯৩)

আল-ইদরিসি যেসব মানচিত্র এঁকেছিলেন তার সম্পর্কে উইল ডুরান্ট বলেছেন, এসব মানচিত্র মধ্যযুগে মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যার (cartography) শ্রেষ্ঠ ফসল। তার পূর্বে এর চেয়ে পূর্ণাঙ্গ, এর চেয়ে সূক্ষ্ম, এর চেয়ে বিস্তৃত ও ব্যাপক মানচিত্র কোথাও অঙ্কন করা হয়নি। অধিকাংশ মুসলিম বিজ্ঞানী যেমন পৃথিবীর গোলকাকৃতির বিষয়টিকে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন, আল-ইদরিসিও তা-ই করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, এটি বিশুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত সত্য।(৩৯৪)

এতকিছুর পরও বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, কিছু আরবি গ্রন্থ ও তথ্যসূত্র এখনো পশ্চিমা তথ্যসূত্র থেকে নকল করে প্রচার করে যাচ্ছে যে পৃথিবীর গোলকাকৃতির তত্ত্বের সঙ্গে মুসলিমদের পরিচয় ছিল না। বরং কোপার্নিকাসের কল্যাণেই এ তত্ত্বটি ঘোষিত হয়। আপনি এখন কোপার্নিকাসের মৃত্যুতারিখ (১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দ) আমাদের আলোচিত মুসলিম বিজ্ঞানীদের মৃত্যুতারিখের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন, কে কাদের থেকে এই তত্ত্ব গ্রহণ করেছে সেই সত্য প্রতিভাত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট!

খলিফা আল-মামুন এবং পৃথিবীর আয়তনের পরিমাপ
মুসলিমরা যে পৃথিবীর গোলকাকৃতির বিষয়টি প্রমাণ করেছিলেন তার কৃতিত্ব দেওয়া হয় আব্বাসি খলিফা আল-মামুনকে (মৃ. ২১৮ হি./৮৩৩ খ্রি.)। তিনিই প্রথম ভূ-গোলকের আয়তন (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, বেধ) পরিমাপের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এই কাজে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ও ভূগোলবিদদের দুটি দলকে নিযুক্ত করেন। একটি দলের নেতৃত্বে থাকে গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী সিন্দ ইবনে আলি(৩৯৫) এবং অপর দলটির নেতৃত্বে থাকেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ আলি ইবনে ঈসা আল-আঙ্গুরলাবি(৩৯৬)। (এ কথাও বলা হয়ে থাকে যে, দুটি দলের একটির নেতৃত্বে ছিলেন বানু মুসা ইবনে শাকির বা মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা।) খলিফা তাদের দুইজনের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, তারা দুইজন পৃথিবীর পরিধির মহাবৃত্তের পূর্ব ও পশ্চিমের দুটি ভিন্ন নির্দিষ্ট স্থানে যাবেন এবং উভয়েই দ্রাঘিমারেখার এক ডিগ্রি পরিমাণ পরিমাপ করবেন (যে দ্রাঘিমারেখা ৩৬০ ডিগ্রি হবে)। ইবনে খাল্লিকান বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যেক দলই একটি বিস্তৃত সমতল ভূখণ্ড বেছে নেয়, ভূখণ্ডের একটি স্থানে একটি কীলক স্থাপন করে। তারপর ধ্রুবতারাকে(৩৯৭) স্থির বিন্দু ধরে নিয়ে কীলক ও ধ্রুবতারা এবং ভূমির মধ্যে কোণ নির্ণয় করে। তারপর উত্তর দিকে এমন জায়গায় এগিয়ে যায় যেখানে ওই কোণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তারপর উভয় দল কীলক দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব পরিমাপ করে। তারা ভূমির ওপর দূরত্ব পরিমাপ করত কীলকের ওপর বাঁধা রশির দ্বারা।(৩৯৮)

বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, ভূ-গোলকের আয়তন পরিমাপের ফল ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং সামসময়িক বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের অধিকতর নিকটবর্তী। খলিফা আল-মামুন উভয় দলের নির্ণীত পরিমাণের গড় হিসাব গ্রহণ করেন এবং দেখেন যে এটা ৫,৬৬৬ মাইলের কাছাকাছি। আর সামসময়িক বিজ্ঞান সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে এটা ৫,৬৯৩ মাইল। আল-মামুনের এই পরিমাপ অনুযায়ী পৃথিবীর পরিধি হলো ২০,৪০০ মাইল, অর্থাৎ, প্রায় ৪১,২৪৮ কিলোমিটার। আধুনিক কালে স্যাটেলাইটের দ্বারা পরিমাপকৃত পৃথিবীর পরিধি হলো ৪০,০৭০ কিলোমিটার। আপনি আল-মামুনের নিযুক্ত দল দুটির পরিমাপ ও আধুনিক স্যাটেলাইটের পরিমাপ মিলিয়ে দেখুন, দেখবেন, উভয় পরিমাপের মধ্যে ভুলের পরিমাণ ৩%-এরও কম! নিশ্চয় এটি গৌরব করার মতো বিষয়।(৩৯৯)

টলেমির জিয়োগ্রাফি (Geography of Claudius Ptolemy) অন্যতম মৌলিক গ্রন্থ, যার ওপর মুসলিমরা তাদের ভৌগোলিক বিদ্যার ভিত্তিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বলতে গেলে এটিই একমাত্র গ্রন্থ যা মুসলিমরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্বসূরিদের উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। এর সঙ্গে অবশ্য আরেকটি গ্রন্থ ছিল, সেটির রচয়িতা হলেন মারিনুস অফ টায়ার(৪০০); তবে এই গ্রন্থটির গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত কম।(৪০১)

মুসলিমরা পূর্ববর্তীদের ভ্রান্তি সংশোধন করলেন
টলেমি তার মানচিত্রে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ নির্ধারণে যেসব ভুল করেছিলেন মুসলিম ভূগোলবিদেরা তার সংশোধন করেন। তার এসব ভ্রান্তির মধ্যে কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো। তিনি ভূমধ্যসাগরের দৈর্ঘ্যসীমা নির্ধারণে অনেক বেশি অতিরঞ্জিত করেন এবং তার পরিচিত পৃথিবীর আবাদিত অংশের বিস্তৃতি নির্ধারণেও বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যান। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে হ্রদ বলে চিহ্নিত করেন। অর্থাৎ যখন তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করেন তখন এই কাজটি করেন। সাইলোন দ্বীপের (শ্রীলংকার) আয়তন নির্ধারণেও তিনি অতিরঞ্জিত করেন। কাস্পিয়াস সাগর ও পারস্য উপসাগরের অবস্থান নির্ধারণে তিনি মারাত্মক ভুল করেন। মুসলিমরা এসব ভ্রান্তিসহ অন্যান্য ভ্রান্তিরও সংশোধন করেন। তারপর মুসলিমরা পৃথিবীকে তাদের বর্ণনামূলক মানচিত্র উপহার দেন, কমপক্ষে পাঁচ শতাব্দী ধরে ভূগোলবিদ ও পর্যটকদের বহু দল এটির চূড়ান্ত রূপদানে অংশগ্রহণ করেন। এই মানচিত্র অঙ্কনের মধ্য দিয়ে তারা এমন অনন্য কীর্তি রেখে যান, মধ্যযুগে যার কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়নি।(৪০২)

টলেমি যেসব শহরের ভৌগোলিক অবস্থান চিহ্নিত করেছিলেন তার অধিকাংশেরই বাস্তবিক অবস্থানের সঙ্গে মোটেই মিল ছিল না। কেবল ভূমধ্যসাগরের দৈর্ঘ্য নির্ধারণে তার ভ্রান্তির পরিমাণ হলো চারশ ফারসাখ (তিনি একে চারশ ফারসাখ বাড়িয়ে দেখান)।
আরবদের হাতে ভূগোলবিদ্যার কী পরিমাণ উন্নতি সাধিত হয়েছিল তা স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য গ্রিকদের নির্ণীত জায়গাগুলোর সঙ্গে আরবদের নির্ণীত জায়গাগুলোকে মিলিয়ে দেখাই যথেষ্ট।(৪০৩)

অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখা নির্ধারণ
মুসলিমরাই প্রথম ভূ-গোলকের মানচিত্রের ওপর অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখা নির্ধারণ ও অঙ্কন করেন। প্রথম যিনি দ্রাঘিমারেখা ও অক্ষরেখা নির্ধারণ করেন তিনি হলেন আবু আলি আল-মুররাকুশি(৪০৪)। তার এ কাজের পেছনে একটি মহৎ উদ্দেশ্য ছিল। যাতে মুসলিমরা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নামাযের জন্য সমান সময় নির্ধারণ করতে পারেন। আল-বিরুনিই প্রথম ভূ-গোলককে সমতলে রূপান্তরের (সমতলকরণের) গাণিতিক নীতি প্রস্তুত করেন। এটি হলো রেখা ও চিত্রকে গোলক থেকে সমতলে রূপান্তর করা এবং সমতল থেকে গোলকে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া। তিনি এই গাণিতিক নীতি অঙ্কনের মধ্য দিয়ে ভৌগোলিক মানচিত্র অঙ্কন সহজ করে তোলেন।(৪০৫)

পৃথিবীর ঘূর্ণায়মানতা সম্পর্কে গবেষণা
যে সময়টাতে বিশ্বে কেউ কল্পনাও করতে পারত না যে পৃথিবী হলো গোলকাকার এবং ভূ-গোলকের নিজ কক্ষপথে ঘূর্ণায়মানতার বিষয়ে কেউ আলোচনাও করত না, সেই সময়ে খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে (হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে) তিনজন মুসলিম বিজ্ঞানী পৃথিবীর ঘূর্ণায়মানতা ও আবর্তনের বিষয়টিকে আলোচনায় নিয়ে আসেন। তারা হলেন কাযভিনের আলি ইবনে উমর আল-কাতিবি(৪০৬), আন্দালুসের কুবুদ্দিন আশ-শিরাজি এবং সিরিয়ার আবুল ফারজ আলি। মানবেতিহাসে তারাই প্রথমবার পৃথিবী যে নিজ কক্ষপথে সূর্যের সামনে প্রতি দিনে-রাতে একবার ঘোরে সেই সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করেন। এই বিজ্ঞানীত্রয় সম্পর্কে জর্জ সার্টন বলেন, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এই তিনজন বিজ্ঞানী যে গবেষণা করেন তা বিফলে যায়নি। বরং তা নিকোলাস কোপার্নিকাসের গবেষণায় অন্যতম অনুঘটক হিসেবে প্রভাব রেখেছে। এই গবেষণা থেকেই কোপার্নিকাস ১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দে (পৃথিবীর ঘূর্ণায়মানতার) তাত্ত্বিক কাঠামো প্রকাশ করেন।(৪০৭)

ভৌগোলিক বিশ্বকোষ রচনা
ভূগোলবিদ্যায় ইসলামি সভ্যতার বিজ্ঞানীরা প্রকৃত অর্থেই বহু ভৌগোলিক বিশ্বকোষ রচনা করেন। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। ইয়াকুত হামাবির রচনা মুজামুল বুলদান। এই বিশ্বকোষ সম্পর্কে উইল ডুরান্ট বলেন, এটি একটি বৃহদাকার ভৌগোলিক বিশ্বকোষ; তিনি এতে মধ্যযুগের যাবতীয় পরিচিত ভৌগোলিক তথ্য সংগ্রহ করেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রকৃতিবিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব, মানব-ভূগোলবিদ্যা, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে মধ্যযুগে পরিচিত তথ্যের একটিকেও তিনি বাদ দেননি, বরং প্রতিটি তথ্যকে তার এই বিশ্বকোষে সংকলন করেছেন। এ ছাড়াও তিনি শহরগুলোর তুলনামূলক আয়তন এবং সেগুলোর গুরুত্ব, এসব শহরে বসবাসকারী বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবন ও কর্ম ইত্যাদিকে স্থান দিয়েছেন। এই মহান জ্ঞানী পৃথিবীকে যতটা ভালোবেসেছেন, অন্য কেউ ততটা ভালোবেসেছেন বলে আমাদের জানা নেই।(৪০৮)

গুস্তাভ লি বোঁ বলেছেন, ভূগোলবিদ্যার ওপর আরবদের রচিত যেসব গ্রন্থ আমরা পেয়েছি তার গুরুত্ব অপরিসীম। এসব গ্রন্থের কয়েকটি ইউরোপে বহু শতাব্দীব্যাপী ভূগোলবিদ্যার পঠনপাঠনের মৌলিক ভিত্তি ছিল।(৪০৯)

লি বোঁ আরও বলেন, শরিফ আল-ইদরিসি পৃথিবীর যে-মানচিত্র অঙ্কন করেন তার চিত্র আমি প্রকাশ করেছি। এই মানচিত্রে নীলনদ ও বড় বড় ট্রপিক্যাল লেকের উৎস সম্পর্কে বিবরণ দেওয়া আছে। এসব স্থান সম্পর্কে ইউরোপীয়রা এই আধুনিক কালের আগ পর্যন্ত কোনো সন্ধান পায়নি। আল-ইদরিসির এই মানচিত্র অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তার এই মানচিত্রে প্রমাণিত হয় যে, মহা-আফ্রিকার ভূগোল সম্পর্কে আরবদের জ্ঞান ছিল দীর্ঘকাল ধরে যা ধারণা করা হতো তার চেয়ে অনেক বেশি।(৪১০)

ইসলামি মানচিত্রাবলি এবং সমুদ্রবিজ্ঞানের ওপর মুসলিমদের রচনাবলি পাশ্চাত্য নৌ-চলাচলবিদ্যার অগ্রগতিতে পরিপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।(৪১১)

সামুদ্রিক অভিযান ও আমেরিকা আবিষ্কার
মুসলিমদের সামুদ্রিক অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি হলো আমেরিকা আবিষ্কার। যার কৃতিত্ব দেওয়া হয় ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে(৪১২) যে, তিনি ১৪৯২ সালে আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন। মুসলিমরা পৃথিবীর গোলকাকৃতির বিষয়টি ঘোষণা করলেন এবং তা গাণিতিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দলিল-প্রমাণের দ্বারা সাব্যস্ত করলেন। তারপর তাদের রচনাসমূহে এমন ইঙ্গিত প্রকাশ পেতে শুরু করল যে, ভূ-গোলকের অপর পৃষ্ঠে অবশ্যই আবাদিত জনপদ রয়েছে, যা এখনো অনাবিষ্কৃত। এই তাত্ত্বিক ধারণার একটি ভিত্তি ছিল। তা এই যে, এটা কখনো বোধগম্য নয় যে পৃথিবীর একটি পৃষ্ঠ সম্পূর্ণরূপে স্থলভাগ এবং অপর পৃষ্ঠ সম্পূর্ণরূপে জলভাগ। কারণ তা পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করবে এবং তার ঘূর্ণায়মানতা ও আবর্তনের শৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটাবে।(৪১৩)

আল-বিরুনি প্রথম এই সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করেন এবং তার গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ভৌগোলিক আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু হয়। বড় বড় মুসলিম ভূগোলবিদদের রচনাবলিতে এসব অভিযান সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আল-মাসউদি(৪১৪) কর্তৃক রচিত 'মুরজুয-যাহাব ওয়া মাআদিনুল জাওহার' এবং শরিফ আল-ইদরিসি কর্তৃক রচিত 'নুযহাতুল মুশতাক ফি ইখতিরাকিল আফাক' ইত্যাদি।

বিদ্যমান তথ্য থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে যে, খাশখাশ ইবনে সাইদ আল-বাহরি নামের একজন আরব আন্দালুসীয় নাবিক ২৩৫ হিজরিতে (৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে) তার নৌযান চালিয়ে লিসবন থেকে পশ্চিম দিকে আটলান্টিক মহাসাগরে এগিয়ে যান। তিনি সাগরে একটি আবাদিত দ্বীপ আবিষ্কার করেন, যেখানে বহু বাসিন্দা রয়েছে। তিনি তাদের থেকে উপঢৌকন এনে আন্দালুসের শাসক দ্বিতীয় আবদুর রহমানের সামনে পেশ করেন। পুরস্কারস্বরূপ আবদুর রহমান খাশখাশকে ইসলামি নৌবহরের আমির নিযুক্ত করেন। এই নাবিক পরে ভাইকিংদের(৪১৫) সঙ্গে একটি সমুদ্রযুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন।(৪১৬) তিনিই আমেরিকার আবিষ্কারক হিসেবে প্রতীয়মান হন।

বিদ্যমান তথ্যে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে যে, পশ্চিম আফ্রিকার (মরক্কোর) আরবদের একটি দল আটলান্টিক মহাসাগরে বেরিয়ে ওই দ্বীপে যায়। এটা হিজরি চতুর্থ শতক এবং খ্রিষ্টীয় দশম শতকের ঘটনা। কিন্তু তাদের কেউই ফিরে আসে না এবং তাদের সম্পর্কে কোনো সংবাদও জানা যায় না। তারপর তাদের ঘিরে 'অভিযাত্রী যুবকেরা' (المُغَرَّرين قصة الفتية) নামে একটি গল্প তৈরি হয়। অভিযাত্রী যুবকদের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন আল-মাসউদি ও আল-ইদরিসি। এই গল্প থেকে জানা যায় যে, লিসবন শহরে আটজন আরব যুবক আটলান্টিক মহাসাগরে অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সবাই ছিল একটি নাবিক পরিবারের সদস্য। তারা ওই দ্বীপটি খুঁজে বের করতে চায় যেখানে তাদের পূর্বসূরিরা গিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং যাদের সম্পর্কে কোনো সংবাদ জানা যায়নি। ফলে শহরবাসী তাদের 'অভিযাত্রী তরুণদল' (الفتية المغررين) উপাধিতে আখ্যায়িত করে। এখানে المغرر শব্দটা এসেছে الغرة ধাতু থেকে, যার অর্থ অগ্রযাত্রা বা অভিযাত্রা। শব্দটি الغرور ধাতু নিষ্পন্ন (المغرورين) (আত্মপ্রবঞ্চিত) নয়, যদিও কোনো কোনো তথ্যসূত্রে এ শব্দটিই রয়েছে। আল-মাসউদি তার 'মুরুজুয-যাহাব' গ্রন্থে 'যারা আটলান্টিক মহাসাগর ভ্রমণে প্রাণের ঝুঁকি নিয়েছিল, তাদের মধ্যে যারা বেঁচে গিয়েছিল ও যারা ধ্বংস হয়েছিল এবং তারা যা দেখেছিল সেই সম্পর্কিত সংবাদ' (أخبار من خاطر بنفسه في ركوبه - أي المحيط الأطلسي ومن نجا منهم ومن تلف، وما شاهدوا منه وما رأوا) শিরোনামে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

আল-ইদরিসিও এই গল্পের অবতারণা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এই আটজন যুবক আন্দালুসে ফিরে এলে লিসবনের বাসিন্দারা তাদের ঘিরে ধরে। নানা ধরনের সাজসজ্জা ও আনন্দ-উল্লাসের সঙ্গে তাদের অভিনন্দন জানায়। এই যুবকেরা যে সড়কে বসবাস করত সেই সড়কের নাম দেয় 'অভিযাত্রী তরুণদের সড়ক'। এটা খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীর শেষ দিকের ঘটনা। তারপর লিসবনে এই নামটি কয়েকশ বছর ধরে পরিচিত ছিল। - অনুবাদক আবু উবাইদুল্লাহ আল-আন্দালুসি

আবু উবাইদুল্লাহ আল-বাকরি আল-আন্দালুসি (মৃ. ৪৮৭ হি.) তার 'আল-মাসালিক ওয়াল-মামালিক' গ্রন্থে লিসবনের আরব অভিযাত্রী যুবকদের কাহিনি উল্লেখ করেছেন, যারা আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিল। তিনি তাদের ফিরে আসার পরের কাহিনি উল্লেখ করেছেন। ফিরে এসে তারা জানায় যে, ওখানে তাদের সঙ্গে যাদের সাক্ষাৎ ঘটেছে তারা আরবিতে কথাবার্তা বলে। তারা ওই ভূমিখণ্ডের বর্ণনাও দেয়, সেটি ছিল ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের মতো। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কলম্বাসের আমেরিকায় পৌঁছার তিনশ বছর আগে থেকেই সেখানে মুসলিমরা ছিল।

শিহাবুদ্দিন আল-আরাবি আল-উমারি (১০০০-১৩৪৯ খ্রি.) খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে তার ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ 'মাসালিকুল আবসার ওয়া মামালিকুল আমসার' রচনা করেন। এটি মোট ২৭ খণ্ডে রচিত। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মালি সাম্রাজ্য ছিল ইসলামি শাসনাধীন, মানসা মুসা (মুসা অব মালি) তা শাসন করতেন। মানসা মুসা ঐতিহাসিক শিহাবুদ্দিন আল-উমারির সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তাকে মালির নবম সম্রাটের কাহিনি বর্ণনা করেন। তিনি ছিলেন মানসা মুসার বড় ভাই ও তার পূর্ববর্তী সম্রাট। তিনি আটলান্টিক মহাসাগরে অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্যে শাসনকার্যই ছেড়ে দেন। আটলান্টিকের ওপারে কী রয়েছে তা তিনি দেখতে চান। এই সংকল্পে তিনি ২০০ জাহাজ ও ২০০০ নৌকা প্রস্তুত করেন। এগুলোতে শুকনো খাবার ও স্বর্ণ বোঝাই করেন। এটা কলম্বাসের আমেরিকায় পৌঁছার ১০০ বছর আগের ঘটনা।

এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, আমেরিকায় প্রকৃতপক্ষেই আফ্রিকান মুসলিমদের উপস্থিতি ছিল। কলম্বাসের নিজের একটি পাণ্ডুলিপিতে মার্কিন ভূখণ্ডে আফ্রিকানদের উপস্থিতির বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তারা সোনা গলাত।-অনুবাদক

আরবরাই যে আমেরিকা আবিষ্কারে এগিয়ে ছিলেন তা-ই আন্দালুসের ভূগোলবিদদের রচনা থেকে স্পষ্ট হয়। ঐতিহাসিক ও ভাষাবিজ্ঞানী আল-আব্ আনাসতাস মারি আল-কারমালির(৪১৭) বক্তব্য থেকে এ বিষয়টি আরও জোরালো হয়। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মুসলিমরা কলম্বাসের বহু পূর্বেই লিসবন থেকে আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন। কারণ তারা আটলান্টিক মহাসাগরে উষ্ণ গলফ স্ট্রিম (Gulf Stream red-hot) সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখতেন। তিনি বলেন, অন্যান্য সব জাতি থেকে আরব জাতিই এই স্ট্রিম ও তার বৈশিষ্ট্যাবলি জানার ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিল। তা মেক্সিকো থেকে কীভাবে আয়ারল্যান্ডে যায় এবং আয়ারল্যান্ড থেকে কীভাবে মেক্সিকোতে ফিরে আসে সেই সম্পর্কে তাদেরই সবচেয়ে বেশি জ্ঞান ছিল।(৪১৮)

মুসলিমগণ আমেরিকার আবিষ্কারক, এ ব্যাপারে যা বলা হলো তার চেয়েও স্পষ্ট, বিস্ময়কর ও প্রভাবসঞ্চারী হলো ওই মানচিত্র যা জার্মান প্রাচ্যবিদ পল আর্নেস্ট কাহলে(৪১৯) তুরস্কের তোপকাপি প্যালেস গ্রন্থাগার থেকে আবিষ্কার করেছেন। কয়েক বছরব্যাপী আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও পরীক্ষানিরীক্ষার পর ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এই মানচিত্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন। এই মানচিত্র বিজ্ঞানীদের মাথা খারাপ করে দেয়, গোটা বিশ্বকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে ফেলে। এই মানচিত্র ছিল তুর্কি মুসলিম ভূগোলবিদের রচিত, তিনি হলেন পিরি রেয়িস (Piri Reis)(৪২০)। তার পূর্ণনাম মুহিউদ্দিন ইবনে মুহাম্মাদ আর-রেয়িস। তিনি ছিলেন তুর্কি নৌবহরের অন্যতম নৌকমান্ডার। তিনি ছিলেন সেই সময়ের 'মাস্টার অফ দা সি'। তার মানচিত্রটি মূলত কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন মানচিত্রে বিভক্ত। এটি আটলান্টিক মহাসাগরের পূর্বাংশকে বর্ণনা করেছে, যেখানে রয়েছে স্প্যানিশ ও পশ্চিম আফ্রিকান উপকূলসমূহ। আপনি যদি এই মানচিত্রে আটলান্টিকের পশ্চিমাংশকে দেখেন তাহলে দেখবেন যে, সেখানে রয়েছে আমেরিকান ভূখণ্ড, তার উপকূলসমূহ ও দ্বীপসমূহ, বন্দর ও জীবজন্তু। আরও রয়েছে রেড ইন্ডিয়ানদের চিত্র, তাদেরকে তিনি চিত্রিত করেছেন নগ্ন অবস্থায় এবং তারা মেষ চরাচ্ছে।

রুশ-সোভিয়েত প্রাচ্যবিদ ও আরবি ভাষাবিদ ইগন্যাটি ইয়ুলিয়ানোভিচ ক্র্যাচকোঙ্কি (Ignaty Yulianovich Krachkovsky) তারিখ الأدب الجغرافي العربي গ্রন্থে এই মানচিত্রের বিচার-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, পিরি রেয়িস তার মানচিত্র কলম্বাসের মানচিত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন। তুর্কি নৌবহর ১৪৯৯ খ্রিষ্টাব্দে যখন ভেনেটিয়ান নৌবহরকে পরাজিত করে এবং তাদের কয়েকটি জাহাজ আটক করে তখন হয়তো কলম্বাসের মানচিত্র পিরি রেয়িসের হাতে এসে থাকবে।(৪২১)

কিন্তু অধিকাংশ গবেষকই ক্র্যাচকোস্কির এই মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তার বিরুদ্ধমত প্রকাশ করেছেন। কারণ পিরি রেয়িসের মানচিত্রে এমন সব জায়গার বর্ণনা ছিল যা কলম্বাস জানতেনই না এবং তার সেগুলো আবিষ্কারেরও প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু এ সকল গবেষক বিকল্প বিচার-বিশ্লেষণ করেননি যার দ্বারা এই রহস্যময় মানচিত্রের রহস্য উন্মোচিত হয়।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। তা এই যে, ১৯৫২ সালে ব্রাজিলীয় নিউজপেপারগুলো একটি বিবৃতি প্রকাশ করে, বিবৃতিটি দেন ড. জাগরিস, যিনি দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব দা উইটওয়াটারস্ট্যান্ড-এর সামাজিক প্রত্নতত্ত্ববিদ্যার (social archaeological sciences) অধ্যাপক। (অ্যারাবিয়ান বিজনেস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী) বিবৃতিতে বলা হয়, ইতিহাসের গ্রন্থাবলি আমেরিকা আবিষ্কারের বিষয়টিকে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বড় ভুল করেছে। তার কারণ, কলম্বাসের কয়েকশ বছর পূর্বে প্রকৃতপক্ষে আরবরাই(৪২২) (আরব মুসলিমরাই) আমেরিকা আবিষ্কার করেছে।(৪২৩) অধ্যাপক ড. জাগরিসের ছয় বছরব্যাপী পরিচালিত গবেষণার ভিত্তি ছিল মানব-কাঠামো পরীক্ষানিরীক্ষা, যা ব্রাজিলীয় গ্রেনাডায় (Grenada) আবিষ্কৃত হয়েছিল।(৪২৪)

দক্ষিণ মেরুতে ষষ্ঠ মহাদেশ আবিষ্কার
মুহিউদ্দিন আর-রেয়িস (পিরি রেয়িস)-এর মানচিত্রে বিস্ময়কর এমন কিছু ছিল, যার ফলে তা মহাকাশ ভ্রমণ ও স্যাটেলাইট থেকে পৃথিবীর ছবি উত্তোলনের যুগ শুরু হওয়ার পরও বিজ্ঞানীদের স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ত রেখেছে। বিংশ শতাব্দীতে আমেরিকা ও ইউরোপে মানচিত্রাঙ্কনবিদদের প্রথম বিশ্বাস ছিল যে পিরি রেয়িসের মানচিত্রগুলো ততটা সূক্ষ্ম ও যথার্থ নয়, বরং এর চিত্রাঙ্কনে বেশ ভুলত্রুটি রয়েছে। মার্কিন উপকূলীয় অঞ্চল সম্পর্কে তাদের সর্বশেষ সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এমনই ছিল বিশ্বাস। কিন্তু যখন প্রথমবার স্যাটেলাইট থেকে এসব অঞ্চলের ছবি তুলে তা প্রকাশ করা হয় তখন তারা বিমূঢ় হয়ে পড়েন। কারণ তারা এতদিন পর্যন্ত যা ভেবেছেন ও চিন্তা করেছেন মুহিউদ্দিন আর-রেয়িসের মানচিত্রই তার চেয়ে অধিকতর সূক্ষ্ম ও যথার্থ! তা পরিপূর্ণরূপেই স্যাটেলাইট থেকে ধারণকৃত ছবিগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ! বরং তাদের তথ্যাবলিই ভুল। এর ফলে নাসায় (ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) একদল বিজ্ঞানী মুহিউদ্দিন আর-রেয়িসের মানচিত্রগুলোর পুনর্নিরীক্ষণ করেন, সেগুলো বারবার বড় করে দেখেন। এবার তারা দ্বিতীয়বারের মতো বিমূঢ় হন। কারণ মুহিউদ্দিন আর-রেয়িস তার মানচিত্রে দক্ষিণ মেরুতে ষষ্ঠ মহাদেশ নির্দেশ করেছেন, যার নাম এন্টার্কটিকা (Antarctica)। এটি তাদের এন্টার্কটিকা আবিষ্কারের দুইশ বছরেরও আগের ঘটনা। মুহিউদ্দিন আর-রেয়িস এন্টার্কটিকার পাহাড়সমূহ ও উপত্যকাসমূহের বর্ণনাও দিয়েছেন, যেগুলো ১৯৫২ সালের আগ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।

পিরি রেয়িসের মানচিত্রের সূক্ষ্মতা ও যথার্থতা
সুইস লেখক এরিক ফন দানিকেন (Erich von Däniken) Zuvi Chariots of the Gods? Unsolved Mysteries of the Past নামক বইয়ে(৪২৫) বলেছেন, পিরি রেয়িসের মানচিত্রগুলো মার্কিন মানচিত্রাঙ্কনবিদ ও নাবিক আর্লিংটন ম্যালেরির (Arlington H. Mallery) কাছে পেশ করা হয়। তিনি মানচিত্রগুলোর সূক্ষ্ম পরীক্ষানিরীক্ষা ও বিচার-বিশ্লেষণের পর সিদ্ধান্ত দেন যে, এগুলো (আমেরিকা-সম্পর্কিত) যাবতীয় ভৌগোলিক তথ্য ও বাস্তবতাকে ধারণ করেছে। তবে তার সন্দেহ থেকে যায় যে, এখানে একটি ভুল থেকে গেছে অথবা কোনো কোনো স্থান-নির্দেশ যথার্থ হয়নি। ফলে তিনি মার্কিন নৌবহরের হাইড্রোগ্রাফিক ব্যুরোর মানচিত্রাঙ্কনবিদ মিস্টার ওয়ালটার্স (Mr. Walters)-এর শরণাপন্ন হন। তারা উভয়ে স্থান-নির্দেশক সংখ্যাঙ্কিত বর্গজালি তৈরি করেন এবং মানচিত্রগুলোকে একটি আধুনিক গ্লোবে রূপান্তরিত করেন। এভাবে তারা চাঞ্চল্যকর সব তথ্য আবিষ্কার করেন। মানচিত্রগুলো সম্পূর্ণরূপে নির্ভুল। কেবল ভূমধ্যসাগর ও মৃতসাগরই নয়, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল এবং এন্টার্কটিকা সংলগ্ন অঞ্চলগুলোও পিরি রেইসের মানচিত্রে যথাযথভাবে বর্ণিত হয়েছে। এগুলো মূলত ভূ-সংস্থানিক মানচিত্র (Topographic Map), এতে বিস্ময়কর সূক্ষ্মতায় অঞ্চলগুলোর অভ্যন্তরীণ ভূ-সংস্থানের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এতে পাহাড়-পর্বত, পর্বতশৃঙ্গ, নদীনালা, মালভূমি ইত্যাদির স্পষ্ট ও নির্ভুল বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যেন এগুলোর চিত্র মহাকাশ থেকে ধারণ করা হয়েছে!(৪২৬)

১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন গ্রেট অবজারভেটরি ও মার্কিন সমুদ্র-পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে একদল ভূগোলবিজ্ঞানী পিরি রেইসের মানচিত্রগুলোর ওপর অধিকতর পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান চালান। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষণার পর তারা দেখেন যে ষষ্ঠ মহাদেশ এন্টার্কটিকার চিত্র বিস্ময়কর পর্যায়ে বিশুদ্ধ ও যথার্থ। এমনকি আমাদের বর্তমান যুগেও যেসব স্থান পরিপূর্ণরূপে আবিষ্কৃত হয়নি তারও বর্ণনা রয়েছে পিরি রেইসের মানচিত্রগুলোতে! দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের পর্বতরাশির অস্তিত্ব ১৯৫২ সালের আগে আবিষ্কৃত হয়নি। এগুলো সবসময়ই পুরু বরফের স্তরে ঢাকা থাকে। আধুনিক মানচিত্রগুলোতে এসব পর্বত আবিষ্কার করা হয়েছে ইকো-সাউন্ডিং যন্ত্রপাতি (Echo-Sounding apparatus) ব্যবহার করে।

এখানে আরও উল্লেখ্য যে, মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা পিরি রেইসের মানচিত্রগুলোর ওপর অনুসন্ধান ও গবেষণা অব্যাহত রেখেছে। তাদের কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, দক্ষিণ মেরু অঞ্চল অর্থাৎ এন্টার্কটিকার উপর দিয়ে অতিক্রম করার সময় মহাকাশযান থেকে ভূ- গোলকের যেসব চিত্র ধারণ করা হয়েছে তার সঙ্গে এসব মানচিত্র সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মহাকাশযান থেকে পাঁচ হাজার মাইলব্যাপী অঞ্চলের চিত্র ধারণ করা হয়েছে। তা ছাড়া তারা স্যাটেলাইট থেকে ধারণকৃত চিত্রসমূহ ও পিরি রেয়িসের মানচিত্রগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস্য মিল খুঁজে পেয়েছেন!(৪২৭)

স্পেন থেকে ভারত পর্যন্ত নৌপথ আবিষ্কার
আবুল আব্বাস আল-কালকাশান্দি (মৃ. ১৪১৮) তার সুবহুল আ'শা গ্রন্থে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগের বিষয়টি যথার্থভাবে বর্ণনা করেছেন। তার এই বক্তব্য থেকে মুসলিমরা যে ভাস্কো দা গামার(৪২৮) আগেই এ বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন তা স্পষ্ট হয়। তিনি আটলান্টিক মহাসাগর সম্পর্কে বলেছেন, এই মহাসাগর মরোক্কান উপকূল থেকে জিব্রাল্টার প্রণালির-যা আন্দালুস ও মরক্কোকে বিভক্ত করেছে-পাশ দিয়ে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গিয়েছে এবং বার্বারদের অঞ্চল লামতুনা মরুভূমি অতিক্রম করেছে। আল-কালকাশান্দি তারপর সমুদ্রপথের বর্ণনা দিয়েছেন, তারপর তা জিবালুল কামারের (Dhofar Mountains) পেছন দিয়ে পূর্ব দিকে এগিয়েছে। জিবালুল কামার থেকে মিশরের নীলনদের উৎস শুরু হয়েছে। এর আলোচনা পরে আসবে। এভাবে আটলান্টিক মহাসাগর ভূমি থেকে দক্ষিণমুখী হয়েছে এবং আরদু খারাব (ওয়াস্টল্যান্ড)-এর ওপর দিয়ে ও যান্জ (Zanj) দেশের পেছন দিয়ে (সহিলি উপকূলকে বামে রেখে) পূর্বদিকে এগিয়েছে, তারপর পূর্বে ও উত্তরে বিস্তৃত হয়ে ভারত মহাসাগর ও চীন সাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।(৪২৯)

ইগন্যাটি ক্র্যাচকোস্কি উল্লেখ করেছেন যে, একজন আরব নাবিক ভাস্কো দা গামা যে ভ্রমণ করেছেন সেই একই ভ্রমণ করেছেন ১৪২০ খ্রিষ্টাব্দে, তবে উলটোপথে, তিনি ভারত মহাসাগরের একটি বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং আফ্রিকার চারপাশ ঘুরে আটলান্টিক মহাসাগরে মরক্কোর বন্দরে পৌছেন। এটি ভাস্কো দা গামার জন্মেরও ৪৭ বছর আগের ঘটনা।(৪৩০)

ভাস্কো দা গামা তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন যে, ভ্রমণকালে যে-সকল আরব নাবিকের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে তারা উন্নতমানের কম্পাস রাখতেন জাহাজের দিক-নির্দেশনার জন্য। তাদের সঙ্গে পর্যবেক্ষণযন্ত্রও থাকত, থাকত সামুদ্রিক মানচিত্রও। বিভিন্ন সময়ে তিনি তাদের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং তাদের সাহায্য গ্রহণ করেছেন। তিনি আরব নাবিকদের কিছু মানচিত্র পর্তুগালের সম্রাট ম্যানুয়েলের (Manuel I of Portugal) কাছে পাঠিয়ে দেন। আরেকজন মুসলিম নাবিকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার নাম মুআল্লিম কানা। তিনি মালিন্ডির বাসিন্দা ছিলেন। তিনিই ভাস্কো দা গামার জাহাজকে মালিন্ডি(৪৩১) থেকে ভারতের কালিকোট বন্দরে পৌঁছে দেন। অন্যান্য তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যিনি ভাস্কো দা গামার জাহাজ চালিয়ে নিয়ে আসেন তিনি হলেন আরব মুসলিম ভূগোলবিদ ও নাবিক ইবনে মাজেদ(৪৩২)। তিনিই কম্পাস আবিষ্কার করেছিলেন। আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে, পরবর্তী মুসলিমদের অঙ্কিত মানচিত্রগুলোতে-যেমন আল-মাসউদির মানচিত্র ও আল-ইদরিসির মানচিত্র-আফ্রিকাকে ঘিরে আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে ভারত মহাসাগরের সংযোগ-ব্যবস্থার স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। এসব সামুদ্রিক অঞ্চল আরব নৌবহরের দ্বারা আবাদিত ছিল। এসব নৌবহর ভারত ও পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যে যাওয়া-আসা করত।(৪৩৩)

ভূগোলবিদ্যায় মুসলিমদের প্রচেষ্টা ও তাদের চারপাশের ভূ-অঞ্চল আবিষ্কারের যে কাহিনি তা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পড়লে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়। তাদের সেসব প্রচেষ্টার ফল কত-না উজ্জ্বল, কত-না চমৎকার!

আরবের গুরুত্বপূর্ণ ভূগোলবিদ ও তাদের রচিত গ্রন্থসমূহের পরিসংখ্যান ব্যাপক ও বিস্তৃত বর্ণনার দাবি রাখে। আবুল ফিদা(৪০৪) একাই ষাটজন ভূগোলবিদের নাম উল্লেখ করেছেন, যাদের আবির্ভাব ঘটেছিল তার পূর্বে।... ইউরোপীয়রা যদি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ইসলামের প্রতি (বিদ্বেষভাবাপন্ন) চিন্তাভাবনা আঁকড়ে ধরে লালন না করত, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে, তাহলে ইউরোপের ভূগোলবিদ্যার বড় বড় পণ্ডিতরা কেন মুসলিমদের অবদানকে অস্বীকার করে তার কারণ উদ্‌ঘাটন করা দুষ্কর হতো। তা সত্ত্বেও আরবরা যেসব বড় বড় কাজ করেছেন তা তাদের কদর ও মূল্য প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। কারণ আরবরাই প্রথম নিয়মতান্ত্রিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন করেছেন, যা মানচিত্রবিদ্যার প্রধান ভিত্তি।(৪০৫)

এগুলোও আমাদের কথা নয়, বরং গুস্তাভ লি বোঁর কথা।

টিকাঃ
৩৭৬. মার্টিন প্লেসনার, মাবহাসুল উলুম, যোসেফ শাস্ত্র (Joseph Franz Schacht) ও ক্লিফোর্ড এডমন্ড বসওয়র্থ (Clifford Edmund Bosworth) কর্তৃক সম্পাদিত The Legacy of Islam, আরবি অনুবাদ, تراث الاسلام খ. ২, পৃ. ১৫৪।
৩৭৭. মার্টিন প্লেসনার (Martin Plessner 1797-1883) জার্মান অর্থোডক্স ধর্মপ্রচারক এবং পণ্ডিত। বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ। বেলারুশে জন্মগ্রহণ করেন। ইসলামের ধ্রুপদি ঐতিহ্য এবং মধ্যযুগে ইহুদিধর্মের ওপর ইসলামের প্রভাব তার প্রধান আগ্রহের বিষয়।-অনুবাদক
৩৭৮. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৬৮।
৩৭৯. হেকাটিয়াস মূলত অ্যানাক্সিম্যান্ডারের (Anaximander 610-546 BC) অঙ্কিত মানচিত্রের উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন।- অনুবাদক।
৩৮০. প্রাগুক্ত এবং জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯৭-৩৯৮।
৩৮১. সুরা নাযিআত: আয়াত ৩০।
৩৮২. সুরা যুমার: আয়াত ৫।
৩৮৩. ইবনে খুররাদাযবিহ: আবুল কাসিম উবাইদুল্লাহ ইবনে আহমাদ ইবনে খুররাদাযবিহ (২০৪- ২৭২ হি./৮২০-৮৮৫ খ্রি.)। ভৌগোলিক ইতিহাসবিদ। বারমাকিদের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ المسالك والممالك। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল- ওয়াফায়াত, খ. ১৯, পৃ. ২২৯।
৩৮৪. ইবনে খুরাদাযবিহ, আল-মাসালিক ওয়াল-মামালিক, পৃ. ৪।
৩৮৫. ইবনে রুসতাহ: আবু আলি আহমাদ ইবনে উমর (মৃ. ৩০০ হি./৯১২ খ্রি.)। ভূগোলবিদ। ইরানের ইস্পাহানের অধিবাসী। الأعلاق النفيسة তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। দেখুন, যিরিকলি, আল- আ'লাম, খ. ১, পৃ. ১৮৫।
৩৮৬. ইবনে রুসতাহ, আল-আ'লাক আন-নাফিসাহ, পৃ. ৮।
৩৮৭. ইবনে আবদি রাব্বিহি: আবু উমর আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদি রাব্বিহি ইবনে হাবিব ইবনে হুদাইর ইবনে সালেম (২৪৬-৩২৮ হি./৮৬০-৯৪০ খ্রি.)। শীর্ষস্থানীয় সাহিত্যিক। আল-ইকদুল ফারিদ গ্রন্থের প্রণেতা। কর্ডোভার অধিবাসী। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২০৭।
৩৮৮. আবু উবাইদা আল-ফালাকি : আবু উবাইদা মুসলিম ইবনে আহমাদ (মৃ. ২৯৫ হি.)। গ্রহরাজির আবর্তন ও নক্ষত্রের সন্তরণ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন। জ্যোতির্বিদ্যায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল। ছিলেন ফকিহ ও হাদিস বিশারদ। ভাষা ও ব্যাকরণ এবং ছন্দশাস্ত্রেও দখল ছিল তার। দেখুন, আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ৩, পৃ. ৩৭৪।
৩৮৯. সাসানীয় সম্রাট; প্রথম বাহরাম, দ্বিতীয় বাহরাম ও পঞ্চম বাহরাম সাসানীয় সম্রাট ছিলেন।- অনুবাদক
৩৯০. ইরানের খুরাসান প্রদেশের গুরাবাদ জেলার একটি শহর।-অনুবাদক
৩৯১. সূরা যুমার: আয়াত ৫।
৩৯২. ইবনে হাযম আল-আন্দালুসি, الفصل في الملل والأهواء والنحل ২, পৃ. ৭৮।
৩৯৩. আল-ইদরিসি, نزهة المشتاق في اختراق الآفاق, পৃ. ৯১।
৩৯৪. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ৩৫৮।
৩৯৫. সিন্দ ইবনে আলি: আবু তাইয়িব সিন্দ ইবনে আলি আল-ইয়াহুদি (মৃ. ২৫০ হি./৮৬৪ খ্রি.)। প্রখ্যাত মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী, অনুবাদক, গণিতজ্ঞ ও প্রকৌশলী। খলিফা আল-মামুনের দরবারে আসেন এবং তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি তারকা-সারণি জিজ আল-সিন্দহিন্দ (Zij al-Sindhind) অনুবাদ ও সম্পাদনার জন্য পরিচিতি লাভ করেন। একজন গণিতবিদ হিসাবে সিন্দ ইবনে আলি আল-খাওরিজমির সহকর্মী ছিলেন। পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ كتاب المنفصلات والمتوسطات في النجوم والحساب। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৫, পৃ. ২৪২।
৩৯৬. আলি ইবনে ঈসা আল-আস্তুরলাবি ছিলেন বিখ্যাত গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ। বাগদাদে বসবাস করতেন। খলিফা আল-মামুনের বিজ্ঞান পরিষদে ছিলেন।
৩৯৭. ধ্রুবতারা (Pole star): পৃথিবীর উত্তর মেরুর অক্ষ বরাবর দৃশ্যমান তারা ধ্রুবতারা নামে পরিচিত। এই তারাটি পৃথিবীর অক্ষের উপর ঘূর্ণনের সঙ্গে প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে আবর্তিত হয়। প্রাচীন কালে দিনির্ণয়যন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে সমুদ্রে জাহাজ চালানোর সময় নাবিকেরা এই তারার অবস্থান দেখে দিনির্ণয় করত। সপ্তর্ষিমণ্ডলের প্রথম দুটি তারা, পুলহ এবং ক্রতুকে সরলরেখায় বাড়ালে তা এ তারাটিকে নির্দেশ করে। এটি লঘু সপ্তর্ষিমণ্ডলে দেখা যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশের দৃশ্যমান সকল তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। শুধু ধ্রুবতারাই মোটামুটি একই স্থানে দৃশ্যমান থাকে। এটি আকাশের একমাত্র তারা, যেটিকে এ অঞ্চল হতে বছরের যেকোনো সময়েই ঠিক এক জায়গায় দেখা যায়। পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ থেকে ধ্রুবতারাকে সারা বছরই আকাশের উত্তরে নির্দিষ্ট স্থানে দেখা যায়। দিনির্ণয়ে এই তারা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বাংলাদেশের আকাশে ধ্রুবতারাকে বেশি উঁচুতে দেখা যায় না। ঢাকা থেকে ধ্রুবতারার উচ্চতা ২৩ ডিগ্রি ৪৩ মিনিট। দিগ্বলয় থেকে আকাশের প্রায় চারভাগের একভাগ উঁচুতেই এই তারাটির মতো উজ্জ্বল আর কোনো তারা নেই বলে একে চিনতে বিশেষ অসুবিধা হয় না। তবে বাংলাদেশ থেকে যতই উত্তরে যাওয়া যাবে, ধ্রুবতারাকে ততই ওপরে দেখা যাবে। (উইকিপিডিয়া)-অনুবাদক
৩৯৮. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল-আ'য়ান, খ. ৫, পৃ. ১৬২।
৩৯৯. এই বিষয়ে দেখুন, Johannes Willers, Schätze der Astronomie, আরবি অনুবাদ, كنوز علم الفلك, পৃ. ২৫।
৪০০. মারিনুস অফ টায়ার (Marinus of Tyre): টায়ার-এর আরবি নাম সুর। এটি ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত একটি শহর। সিরিয়ায় খ্রিষ্টপূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের সময়ে তিনি সুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার জীবৎকাল খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দীর শেষ থেকে নিয়ে দ্বিতীয় শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যন্ত (৭০-১৩০ খ্রিষ্টাব্দ)। টলেমি প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি মারিনুসের শিষ্য ছিলেন। মারিনুস অফ টায়ারের উল্লেখযোগ্য রচনা হলো 'তাসহিহুল জুগরাফিয়া'।
৪০১. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯০।
৪০২. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯০-৩৯৩।
৪০৩. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৬৮।
৪০৪. আবু আলি আল-হাসান ইবনে আলি ইবনে আল-মুররাকুশি (মৃ. ৬৬০ হি./১২৬২ খ্রি.)। মরোক্কান জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ, ভূগোলবিদ এবং সূর্যঘড়িনির্মাতা। ত্রিকোণমিতিতে সবিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ত্রিকোণমিতিতে তিনি নতুন রীতির প্রবর্তন করেন। তিনিই প্রথম সাইন, কোসাইন ইত্যাদি ব্যবহার করেন এবং সাইন-সারণি তৈরি করেন। বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করেন। ২৪০টিরও বেশি নক্ষত্র চিহ্নিত করে তাদের বর্ণনা দেন। সমান সময় নির্দেশ রেখা ব্যবহার করেন। বিভিন্ন ভৌগোলিক ত্রুটি সংশোধন করেন এবং মরক্কোর মানচিত্র নতুনভাবে অঙ্কন করেন। জর্জ সার্টন বলেছেন, আল-মুৱাকুশি প্রথম কোণের সাইন এবং ৯০ ডিগ্রির কম কোণ নির্দেশ করেন।-অনুবাদক
৪০৫. ড. আবদুর রহমান হামিদাহ, আলামুল জুগরাফিয়্যিনাল আরব, পৃ. ৪৫৯।
৪০৬. আলি ইবনে উমর আল-কাতিবি: নাজমুদ্দিন আলি ইবনে উমর ইবনে আলি আল-কাতিবি আল-কাযবিনি (৬০০-৬৭৫ হি./১২০৩-১২৭৭ খ্রি.)। প্রজ্ঞাবান ও যুক্তিবিদ। নাসিরুদ্দিন আত-তুসির শিষ্য। তার বহু রচনা রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো 'আশ-শাসিয়্যাহ' ও 'হিকমাতুল আইন'। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২১, পৃ. ২৪৪।
৪০৭. জর্জ সার্টন, Introduction to the History of Science, খ. ১, পৃ. ৪৬।
৪০৮. উইল ডুরান্ট, 'কিস্সাতুল হাদারাহ', খ. ১৩, পৃ. ৩৫৯।
৪০৯. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৬৯।
৪১০. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৭০।
৪১১. মার্টিন প্লেসনার, মাবহাসুল উলুম, যোসেফ শাফ্‌ত (Joseph Franz Schacht) ও ক্লিফোর্ড বসওর্থ (Clifford Edmund Bosworth) কর্তৃক সম্পাদিত The Legacy of Islam, আরবি অনুবাদ, تراث الاسلام , খ. ২, পৃ. ১৫৪।
৪১২. ক্রিস্টোফার কলম্বাস (১৪৫১-১৫০৬ খ্রি.) বিখ্যাত ইতালীয় পর্যটক ও উপনিবেশ প্রতিষ্ঠাতা। আমেরিকা, বাহামা দ্বীপপুঞ্জ ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কার করেছেন বলে দাবি করা হয়। তিনি প্রচণ্ড ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে স্পেনে মৃত্যুবরণ করেন।
৪১৩. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৯৬-৩৯৭।
৪১৪. আল-মাসউদি: আবুল হাসান আলি ইবনুল হুসাইন ইবনে আলি (২৮৩-৩৪৬ হি./৮৯৬-৯৫৭ খ্রি.)। ইতিহাসবিদ, পর্যটক, অনুসন্ধানী। বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন, কায়রোতে বসবাস করতেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। مروج الذهب ومعادن الجوهر তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২১, পৃ. ৬-৭; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ২৭৭।
৪১৫. ভাইকিং (Viking) বলতে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সমুদ্রচারী ব্যবসায়ী, যোদ্ধা ও জলদস্যুদের একটি দলকে বোঝায়, যারা ৮ম শতক থেকে ১১শ শতক পর্যন্ত ইউরোপের এক বিরাট এলাকাজুড়ে লুটতরাজ চালায় ও বসতি স্থাপন করে। এদেরকে নর্সম্যান বা নর্থম্যানও বলা হয়। ভাইকিংরা পূর্ব দিকে রাশিয়া ও কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত পৌছেছিল।
৪১৬. আল-মাসউদি, মুরুজুয যাহাব ওয়া মাআদিনুল জাওহার, খ. ১, পৃ. ১১৯।
৪১৭. আল-আব্ আনাসতাস মারি আল-কারমালি (Al-Ab Anastas Mari Al-Karmali) : তিনি বুতরুস জিবরাইল ইউসুফ আওয়াদ (১২৮৩-১৩৬৬ হি./১৮৬৬-১৯৪৭ খ্রি.) লেবানিজ খ্রিষ্টান পুরোহিত ও আরবি ভাষাবিজ্ঞানী সাহিত্যিক। আরবের দর্শন ও ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ। আরবি ভাষাবিজ্ঞানে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আলাম, খ. ২, পৃ. ২৫।
৪১৮. الأب انستاس ماري الكرملي : عرف العرب أمريكا قبل أن يعرفها الغرب. الهلال প্রকাশিত, সংখ্যা ১০৬। আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ তার اثر العرب في الحضارة الأوروبية বইতে এ দিকে ইঙ্গিত করেছেন, পৃ ৪৭।
৪১৯. পল আর্নেস্ট কাহলে (Paul Ernst Kahle 1875-1964): বিখ্যাত জার্মান প্রাচ্যবিদ। মারবুর্গ ও বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্যের ভাষা শেখেন। প্রোটেস্ট্যান্ট যাজক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন রোমানিয়া ও কায়রোতে। কায়রোতে ভাষাতত্ত্বের ওপরও অধ্যয়ন করেন।
৪২০. পিরি রেয়িস: মুহিউদ্দিন ইবনে মুহাম্মাদ আর-রেয়িস (৮৭৭-৯৬২ হি./১৪৭০-১৫৫৫ খ্রি.)। উসমানি নৌসেনাপতি, নাবিক, ভূগোলবিদ ও মানচিত্রাঙ্কনবিদ। ১৫০০ সালে মাওদান সমুদ্রযুদ্ধে তিনি প্রধান সেনাপতি ছিলেন। তিনি বিশ্বের দুটি মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: কিতাবু বাহরিয়‍্যাহ।
৪২১. ক্র্যাচকোল্কি, তারিখুল আদাবিল জুগরাফিয়্যিল আরাবি, খ. ২, পৃ. ৫৬২।
৪২২. প্রফেসর ইভান ভান সারটিমা (Ivan Van Sertima) তার ১৯৭৬ সালে রচিত They Came Before Columbus: The African Presence in Ancient America গ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তিনি দলিল-প্রমাণ উপস্থিত করেছেন। কলম্বাসের নিজের কথা থেকেও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, আরবরাই প্রথম আমেরিকায় পৌছেছিল। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি বিশ্বাস করতেন ওই দ্বীপে যেসব রেড ইন্ডিয়ানদের দেখেছেন তারা মূলত আরব বংশোদ্ভূত, তার আগেই তারা ওখানে পৌঁছেছিল। আরবদের পাণ্ডুলিপি থেকেই তিনি এসব তথ্য জেনেছিলেন। ব্রিটিশ রয়াল জিয়োগ্রাফিক্যাল সোসাইটি The Discoverers নামে একটি ডকুমেন্টারি টিভি সিরিজ তৈরি করেছে। এখানে একটি পর্ব ছিল কেবল কলম্বাস ও তার আবিষ্কার সম্পর্কে। তা থেকে জানা যায় যে, তিনি আরবি ভাষা জানে এমন একজনকে তার সহযাত্রী মনোনীত করেছিলেন। অর্থাৎ লোকটা ছিল আরব বংশোদ্ভূত। তিনি এই লোককে দিয়ে রেড ইন্ডিয়ানদের সর্দারের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিটি ছিল আরবি ভাষায় লেখা। চিঠিতে কলম্বাস বলেন, হে মহামান্য, স্পেন ও ক্যাস্টাইল রাজ্যের রানি, রানি ইসবালে আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন। তিনি স্পেন ও ক্যাস্টাইল রাজ্য এবং আপনার দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী।-অনুবাদক
৪২৩. ড. আবদুর রহমান হামিদাহ, আলামুল জুগরাফিয়্যিনাল আরব, পৃ. ২২৫।
৪২৪. শাওকি আবু খলিল, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা ওয়া মুজাযুন আনিল হাদারাতিস সাবিকা, পৃ. ৫০০।
৪২৫. বইটির ইংরেজি অনুবাদ, Memories of the Future: Unsolved Mysteries of the Past. মূল জার্মান থেকে বইটির অনুবাদ করেছেন মাইকেল হেরন।
৪২৬. এরিক ফন দানিকেন, Chariots of the Gods?, আরবি অনুবাদ, عربات الامة, অনুবাদক, আদনান হাসান, পৃ. ২৯।
৪২৭. আহমাদ শাওকি আল-ফানজারি, http://www.islamset.com/arabic/asc/fangryl.html.
৪২৮. ভাস্কো দা গামা (১৪৬৯-১৫২৪ খ্রি.) ছিলেন পর্তুগিজ অনুসন্ধানকারী ও পর্যটক। তিনি পঞ্চদশ শতাব্দীতে সমুদ্রপথে ইউরোপ থেকে ভারত আসেন। তার এই সমুদ্রপথ আবিষ্কার বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদে নতুন মাত্রা যোগ করে। তিনি ভারতের কোচিতে মৃত্যুবরণ করেন।
৪২৯. আবুল আব্বাস আল-কালকাশান্দি, সুবহুল আশা, খ. ৩, পৃ. ২৩৭।
৪৩০. ক্র্যাচকোড্রিঙ্ক, তারিখুল আদাবিল জুগরাফিয়্যিল আরাবি, খ. ২, পৃ. ৫৬৩।
৪৩১. মালিন্ডি উপসাগরের তীরবর্তী গালানা নদীর মুখে অবস্থিত একটি শহর।
৪৩২. ইবনে মাজেদ: আহমাদ ইবনে মাজেদ ইবনে মুহাম্মাদ আন-নাজদি (১৪৩২-১৪৯৮ খ্রি.)। উপাধি: সমুদ্রসিংহ ও ধাবমান নক্ষত্র। আরবের শ্রেষ্ঠ নাবিকদের অন্যতম। মানচিত্রাঙ্কনবিদ। নৌবিজ্ঞানী ও নৌ-ইতিহাসবিদ। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২০০।
৪৩৩. বিস্তারিত দেখুন, হুসাইন মুনিস, আতলাসু তারিখিল ইসলাম, পৃ. ১২ ও তার পরবর্তী।
৪৩৪. আবুল ফিদা: ইসমাইল ইবনে আলি ইবনে মাহমুদ ইবনে শাহেনশাহ (৬৭২-৭৩২ হি./১২৭৩-১৩৩১ খ্রি.)। আল-মালিক আল-মুআইয়াদ, হামার অধিপতি। ভৌগোলিক ইতিহাসবিদ। দখল ছিল প্রকৃতিবিজ্ঞানেও। تقويم البلدان و المختصر في أخبار البشر তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৯, পৃ. ১০৪; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ৩১৯।
৪৩৫. গুস্তাভ লি বোঁ: The World of Islamic Civilization (1974), পৃ. ৪৭১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00