📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ইজাযত

📄 ইজাযত


ইজাযত বলতে বোঝায় ফাতওয়া বা শিক্ষকতার অনুমতি দান। (২৭০) মুহাদ্দিসগণ ও অন্যদের কাছে ইজাযতের সংজ্ঞা হলো, হাদিস বা কিতাব বর্ণনার অনুমতি প্রদান। (২৭১)

আলেমগণ বেশ কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিলেন। এসব মানদণ্ড অতিক্রম করেই একজন তালিবুল ইলম বা শিক্ষার্থী শিক্ষার এই স্তরে উত্তীর্ণ হতে পারত। এই স্তরে এসে সে পাঠদান বা ফাতওয়া প্রদানের প্রবেশদ্বারে পৌঁছে যেত। এ কারণে ‘ইজাযত' ছিল প্রধান ও চূড়ান্ত মানদণ্ড, যেখানে শিক্ষক তার শিষ্যকে এই স্বীকৃতি দিতেন যে সে ভিন্ন মজলিসে বসে পাঠদানে সক্ষম হয়েছে এবং সে বিভিন্ন জ্ঞানের নির্দিষ্ট শাখায় পারদর্শী হয়েছে।

ইজাযতের বিষয়টি অন্যদের কাছে জ্ঞান (কিতাব, পাণ্ডুলিপি ইত্যাদি) পৌঁছে দেওয়ার অনুমতি দেওয়ার মধ্য দিয়েই রূপায়িত হতো। শাইখ তার পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপি বা কিছু অংশ তার ছাত্রকে বা কোনো আলেমকে দিতেন এই মর্মে যে এই পাণ্ডুলিপি তিনি নিজ হাতেই লিখেছেন। তা ছাড়া তিনি যে শাইখ থেকে এই জ্ঞান আহরণ করেছেন তার নামও তাদের জানিয়ে দিতেন। তারপর তাদেরকে তা অন্যদের প্রদান করার অনুমতি দিতেন। এভাবেই ইজাযতদানের বিষয়টি সম্পন্ন হতো। (২৭২)

ইসলামি সভ্যতার সূচনাকাল থেকেই ইজাযতদানের বিষয়টি সুপরিচিত। শুরুর দিকে ইজাযতদানের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসসমূহের মধ্যে যাতে মিশ্রণ না ঘটে এবং তা থেকে বেঁচে থাকা যায়। তাই হাদিস-বিশেষজ্ঞগণ ইজাযতদানের পদ্ধতি স্থির করেন। এটা ছিল শিক্ষক ও শিষ্যদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বস্ততা নিরূপণের একটি প্রকার।

বাস্তবিক পক্ষে 'ইজাযত' হাজার বছরের মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি সংযোজন। বস্তুত এটি ছিল বর্তমান সময়ে ছাত্ররা যে সত্যায়িত সনদ লাভ করে তারই নামান্তর।

এ কারণেই আমরা দেখি যে ইসলামের প্রত্যেক যুগে রাষ্ট্রের দৃশ্যমান পদে কোনো আলেমের নিযুক্তির জন্য 'ইজাযত' ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

আহলে সুন্নাহর ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. তার পুত্র আবদুল্লাহকে ইজাযত দিয়েছেন, এই মর্মে যে, তিনি তার থেকে মুসনাদের ত্রিশ হাজার হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং তার ব্যাখ্যাস্বরূপ এক লাখ বিশ হাজার হাদিস বর্ণনা করেছেন। (২৭৩) ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে শিহাব আয-যুহরি রহ. ইমাম ইবনে জুরাইজকে (২৭৪) ইজাযত দিয়েছেন। (২৭৫)

ইসলামি সভ্যতার নারীদের অন্যতম অধিকার ছিল জ্ঞান অর্জন করা এবং শিক্ষাদান করা। এই ক্ষেত্রে তারা ছিল পুরুষের মতোই, সমান সমান। কোনো নারী আলেমদের থেকে ইজাযত হাসিল করা ছাড়া শিক্ষাদান বা পাঠদানের জন্য বসতে পারতেন না। এখানে দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে যে, ইমাম যাহাবির (২৭৬) দুধমা ও ফুফু সিতুল আহলি বিনতে উসমান ইবনে কাইমায যাদের থেকে ইজাযত গ্রহণ করেছিলেন তারা হলেন ইবনে আবুল ইউস, জামালুদ্দিন ইবনে মালিক, যুহাইর ইবনে উমর আয-যারয়ি এবং আরও অনেক। তিনি উমর ইবনুল কাওয়াস প্রমুখ থেকে হাদিস শুনেছেন। ইমাম যাহাবি তার এই ফুফু থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। (২৭৭)

ইজাযতের ব্যাপারটি কেবল কুরআন ও হাদিস এবং শরয়ি জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং জীবনঘনিষ্ঠ সকল জ্ঞানই এর আওতাধীন ছিল। চিকিৎসাশাস্ত্রের পঠনপাঠনের জন্যও অনুমতির প্রয়োজন হতো। হিজরি চতুর্থ শতকে প্রধান চিকিৎসাবিদ সিনান ইবনে সাবিত (২৭৮) যারা চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে কাজ করতে চায় তাদের ইজাযত প্রদান করেন। তবে তাদের প্রত্যেককে বিশেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়, যে ব্যক্তি যে শাখায় কাজ করতে চায় সে ওই শাখায় বিশেষজ্ঞ কি না তা যাচাই করা হয়। (২৭৯)

একইভাবে দামেশকে আল-মাদরাসাতুল দাখওয়ারিয়‍্যাহর প্রতিষ্ঠাতা মুহাযযিবুদ্দিন আদ-দাখওয়ার ইজাযত দেন আল্লামা আলাউদ্দিন ইবনে নাফিসকে। তিনি এই ইজাযত লাভের পর তার যুগের সবচেয়ে বড় হাসপাতালে কাজ করার সুযোগ পান। এটি হলো দামেশকের আন-নুরি হাসপাতাল। (২৮০) চিকিৎসাবিদ আল-রাযি তার 'আল-হাবি' গ্রন্থে বলেছেন, চিকিৎসার জন্য অনুমোদনপ্রার্থীর প্রথম পরীক্ষা হবে অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ্যা (anatomy) বিষয়ে। সে যদি এটা না জানে বা অনুত্তীর্ণ হয় তাহলে তার বিদ্যা রোগীদের ওপর প্রয়োগ করে পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। (২৮১)

বড় আলেমদের থেকে ইজাযত ছিল ছাত্রদের জন্য গর্বের বিষয়। তারা তা জীবনভর মানুষের কাছে উল্লেখ করতেন। আবুল আব্বাস আল-কালকাশান্দি তার যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম সিরাজুদ্দিন ইবনে মুলকিন থেকে ফিকহে শাফেয়ির ইজাযত নিয়েছিলেন। তিনি তার কোষমূলক গ্রন্থ صبح الأَعْشَىٰ فِي كِتَابَةِ الْإِنْشَا (সুবহুল আ'শা ফি কিতাবাতিল ইনশা)-য় সেই 'ইজাযতবাণী' উল্লেখ করেছেন। এটা প্রমাণ করে যে, তিনি এই ইজাযত কতটা ভালোবাসেন, কতটা গর্ববোধ করেন এটা নিয়ে। তার ইজাযতবাণীর উল্লেখযোগ্য অংশ নিম্নরূপ:

আল্লাহ তাআলা আমাদের সাইয়িদ, আমাদের শাইখ, আমাদের বরকত, আল্লাহর মুখাপেক্ষী বান্দা, আশ-শাইখ আল-ইমাম আল-আল্লামা, পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞ, যুগশ্রেষ্ঠ ও অনন্য, জ্ঞানীদের সৌন্দর্য, শ্রেষ্ঠদের শ্রেষ্ঠ, ফকিহদের ও সৎ ব্যক্তিদের অবলম্বন সিরাজুদ্দিন মুফতিউল ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন আবু হাফস উমরকে কল্যাণ করুন। তিনি অমুককে (যার নাম আল-কালকাশান্দি)-আল্লাহ তার মর্যাদা সমুন্নত রাখুন-অনুমতি দিয়েছেন ও অনুমোদন করেছেন এই মর্মে যে, তিনি আল-ইমাম আল-মুজতাহিদ আল-আলিমুর রাব্বানি আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে ইদরিস আল-মাতলাবি আশ-শাফিয়ির মাযহাবের পাঠদান করতে পারবেন-আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে তার প্রত্যাবর্তনস্থল ও চিরস্থায়ী আবাস বানিয়ে দিন-এবং শাফিয়ি মাযহাব বিষয়ে লিখিত সব গ্রন্থ পাঠ করতে পারবেন এবং তার ছাত্রদের পড়াতে পারবেন; তিনি যতটা চান, যেখানে গমন করেন ও অবস্থান করেন সেখানেই, তার যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই এবং যখন যেখানে খুশি সেখানেই তা করতে পারবেন; কেউ তার কাছে ফাতওয়া চাইলে তিনি লিখিতভাবে ও মৌখিকভাবে ফাতওয়া দিতে পারবেন, তার পবিত্র মাযহাবের দাবি অনুযায়ী তার জ্ঞান ও দ্বীনদারি, আমানতদারি, অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি, উপযুক্ততা ও পর্যাপ্ত চিন্তাভাবনার ভিত্তিতে তিনি তা করবেন...। (২৮২)

উপরিউক্ত ঘটনাবলি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে গোটা মানবসভ্যতার অভিযাত্রায় 'ইজাযত' এক অনন্য ও অগ্রগামী ইসলামি সংযোজন। ইউরোপের বড় বড় মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়েরও দশ শতাব্দী পূর্বে ইজাযতের বিষয়টি ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। এই ক্ষেত্রে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে নতুন বিষয় সংযোজনের ক্ষেত্রে ইসলামি সভ্যতা কতটা অগ্রগামী ও শ্রেষ্ঠ তা সহজেই প্রমাণিত হয়। এই ইজাযত পদ্ধতি আজ গোটা বিশ্বের সব জাতিই অনুসরণ করছে।

টিকাঃ
২৭০. হাশিয়া ইবনে আবিদিন, খ. ১, পৃ. ১৪।
২৭১. মিশরীয় ওয়াক্‌ফ মন্ত্রণালয়, আল-মাউসুআতুল ইসলামিয়্যাতুল আম্মাহ, পৃ. ৪৩।
২৭২. কারাম হিলমি ফারহাত, আত-তুরাসুল ইলমি লিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিশ শাম ওয়াল ইরাক খিলালাল কারনির রাবিয়িল হিজরি, পৃ. ৬৯।
২৭৩. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ, ১১, পৃ. ১০৯।
২৭৪. ইবনে জুরাইজ: আবদুল মালিক ইবনে আবদুল আযিয ইবনে জুরাইজ আর-রুমি (৭০-১৫০ হি.)। বনি উমাইয়ার আযাদকৃত দাস। ছিলেন অন্যতম জ্ঞানভান্ডার। হাদিসশাস্ত্রে তিনিই প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ১৬০; সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৯, পৃ. ১১৯-১২০।
২৭৫. যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৬, পৃ. ৩৩২।
২৭৬. যাহাবি : আবু আবদুল্লাহ শামসুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে উসমান ইবনে কাইমায (৬৭৩-৭৪৮ হি./১২৭৪-১৩৪৮ খ্রি.)। হাফিযে হাদিস, ঐতিহাসিক, আল্লামা, টীকা-ভাষ্যকার। তুর্কমান বংশোদ্ভূত। দামেশকে জন্ম ও মৃত্যু। তার রচনাবলি বিশাল ও ব্যাপক, প্রায় একশ। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ১৬০।
২৭৭. যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, সম্পাদনার ভূমিকা, খ. ১, পৃ. ১৭১।
২৭৮. সিনান ইবনে সাবিত: আবু সাইদ সিনান ইবনে সাবিত ইবনে কুররাহ আল-হাররানি (মৃ. ৩৩১ হি./৯৪৩ খ্রি.)। চিকিৎসাবিদ, বিজ্ঞানী। আব্বাসি খলিফা আল-মুকতাদিরের কাছে তার অবস্থান ছিল অত্যন্ত উঁচুতে। তিনি তাকে চিকিৎসকদের প্রধান নিযুক্ত করেছিলেন। বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৫, পৃ. ১৫২।
২৭৯. ইবনে আবি উসাইবিআ, তাবাকাতুল আতিব্বা, খ. ২, পৃ. ২০৪।
২৮০. যাহাবি, তারিখুল ইসলাম, খ. ৫১, পৃ. ৩১২।
২৮১. আল-রাযি, আল-হাবি ফিত-তিব্বি, খ. ৭, পৃ. ৪২৬।
২৮২. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ১৪, পৃ. ৩৬৬-৩৬৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00