📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ইসলামি সাম্রাজ্যে জ্ঞানী-গুণীদের অবস্থান

📄 ইসলামি সাম্রাজ্যে জ্ঞানী-গুণীদের অবস্থান


জ্ঞানী-সমাজের বিকাশে রাষ্ট্রের ভূমিকা পরিবারের ভূমিকার চেয়ে কম নয়। বরং রাষ্ট্র অধিকাংশ সময় পরিবারের চেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। ইসলামি সাম্রাজ্যের উত্থান ও বিস্তৃতি, প্রগতি ও স্বাধীনতার পথে যাত্রা এবং অধীনতার লাঞ্ছনা থেকে মুক্তির জন্য আবশ্যক ছিল আলেম-উলামা ও জ্ঞানীদের দায়িত্ব গ্রহণ ও তাদের প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং তাদের ভরণপোষণ ও সার্বিক অবস্থার খোঁজখবর রাখা।

সত্য এই যে, ইসলামি সাম্রাজ্য এই ক্ষেত্রে তার কেন্দ্রীয় দায়িত্ব একদিনের জন্যেও বিস্মৃত হয়নি, বরং অধিকাংশ সময় এটাই ছিল তার প্রধান দায়িত্ব। বরং আপনি দেখবেন যে, ইসলামি বিশ্বের দূরদূরান্তের শহরগুলোও মাদরাসায়, উচ্চতর শিক্ষাকেন্দ্রে, গণগ্রন্থাগার ও ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে সুসজ্জিত হয়ে উঠেছিল। এই ক্ষেত্রে যে অসংখ্য মুসলিম খলিফা ও আমিরের বিরাট অবদান রয়েছে এবং তারা যে আলেম-উলামা এবং বিদ্যার্থীদের দেখাশোনা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করেছেন তা ইতিহাস অত্যন্ত বিস্ময় ও মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ রেখেছে।

এ সকল খলিফার মধ্যে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছেন আব্বাসি খলিফা হারুনুর রশিদ। আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (২৪৯) তার সম্পর্কে বলেছেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ এবং খুলাফায়ে রাশেদিন ও সাহাবিদের যুগের পরে খলিফা হারুনুর রশিদের যুগে সবচেয়ে বেশি আলেম দেখেছি, সবচেয়ে বেশি কুরআনের কারি দেখেছি এবং কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতাকারী ও হালাল-হারাম মান্যকারী দেখেছি। আট বছরের বালকও কুরআন (কুরআনের ব্যাখ্যা) সংকলন করেছে। এগারো বছরের বালকও ফিকহ ও ইলমে গভীরতা অর্জন করেছে, হাদিস বর্ণনা করেছে, বিভিন্ন বিষয়ে গ্রন্থ সংকলন করেছে, শিক্ষকদের সঙ্গে তর্কবিতর্ক করেছে। (২৫০) এটা এ কারণেই সম্ভব হয়েছে যে, খলিফা হারুনুর রশিদ জ্ঞান ও জ্ঞান অর্জনকারীদের পেছনে অঢেল খরচ করেছেন, জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানীদের প্রতি মনোযোগী থেকেছেন এবং তালিবুল ইলমদের শৈশব থেকেই তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন!

ইসলামি সভ্যতা ও জাগরণের যুগে বিভিন্ন পর্যায়ের কী পরিমাণ মাদরাসা নির্মাণ করা হয়েছে এবং কী পরিমাণ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সেদিকে একবার দৃষ্টিপাত করলে আপনি জানতে পারবেন আলেম-উলামা ও জ্ঞানী-গুণীদের শৈশব থেকেই রাষ্ট্র তাদের প্রতি কী ভূমিকা পালন করেছে। কুরআনুল কারিমের পাঠদান ও তাফসির শেখার জন্য বহু মাদরাসা ছিল, হাদিস শেখার জন্যেও ছিল বহু মাদরাসা, ফিকহ শেখার জন্য যেমন বহু মাদরাসা ছিল, তেমনই চিকিৎসাবিদ্যা শেখার জন্যও ছিল বহু প্রতিষ্ঠান। এতিমদের জন্য বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। এই অধ্যায়ের তৃতীয় পরিচ্ছেদে আমরা এ প্রসঙ্গে আলোচনা করেছি।

শৈশবকাল পেরোনোর পর রাষ্ট্র তার জ্ঞানী-গুণী সন্তানদের জন্য উপযোগী ও যথার্থ ভূমিকা পালন করেছে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে, ভালো ভালো পদে নিযুক্ত করেছে। যা তাদের স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট ছিল। এগুলো ছাড়া তাদের বৈষয়িক প্রয়োজন পূরণের জন্য অন্যান্য ভাতাও দেওয়া হতো। এখানে শাইখ নাজমুদ্দিন আল-খাবুশানির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তাকে সুলতান সালাহুদ্দিন মাদরাসাতুস সালাহিয়্যায় শিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন। শিক্ষকতার জন্য তিনি মাসিক চল্লিশ দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) পেতেন এবং মাদরাসার ওয়াকফকৃত সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য পেতেন দশ দিনার। তা ছাড়া দৈনিক রুটি পেতেন ষাট মিশরীয় রিওল (২৫১) এবং নীলনদের পানি পেতেন দুই বাহন। (২৫২)

আল-আযহারের শাইখগণ মাসিক বেতন পেতেন। তার মধ্যে তাদের বাহন ঘোড়া-খচ্চরের খরচও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কারণ আল-আযহারের ওয়াকফকৃত সম্পত্তিতে একটি বিশেষ অংশ ছিল শাইখদের বাহনের খরচাদি বহনের জন্য। (২৫৩)

আলেম-উলামা ও জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের যাতে কোনো ধরনের বৈষয়িক চিন্তা করতে না হয় সেজন্যই এমন ব্যবস্থা ছিল। যাতে তারা গবেষণা, লেখালেখি ও নতুন নতুন জিনিস উদ্ভাবনে সম্পূর্ণরূপে নিয়োজিত হতে পারেন, মানুষদের জ্ঞান শিক্ষা দিতে পারেন, পার্থিব জীবন ও আখিরাত উভয় দিক থেকে জনগণের উপকার করতে পারেন। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ইসলামি সভ্যতার সেই সূচনার যুগে শিক্ষকদের একটি সমিতি ছিল। শিক্ষকেরাই এই সমিতির সভাপতি মনোনীত করতেন। সুলতান শিক্ষক সমিতিতে কোনোভাবেই নাক গলাতেন না, তবে সমিতির সদস্যদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে তিনি তা মীমাংসা করে দিতেন।

এ প্রসঙ্গে আবু শামা আল-মাকদিসি (২৫৪) আর-রাওদাতাইন গ্রন্থে মুকাল্লিদ আদ-দাওলায়ি থেকে যা বর্ণনা করেছেন তা এখানে উল্লেখ করছি। তিনি বলেছেন, হাফেয মুরাদি যখন মারা যান তখন আমরা, মানে ফকিহের দল দুইভাগে বিভক্ত ছিলাম। এক দল হলো আরব, আরেক দল হলো কুর্দি। আমাদের মধ্যে কারও কারও মাযহাবের প্রতি ঝোঁক ছিল, তারা শাইখ শারফুদ্দিন ইবনে আবু আসরুনকে (২৫৫) ডেকে আনতে চাইল। তিনি মসুলে থাকতেন। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার যুক্তিতর্ক ও মতবিরোধের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিল। তারা কুতবুদ্দিন আন-নিশাপুরিকে ডেকে আনতে চাইল। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস ভ্রমণ করতে এসেছিলেন। তারপর অনারবদের দেশে আসেন। এ কারণে আমাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। ফকিহদের মধ্যে একটা ফেতনা ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাপারটা সুলতান নুরুদ্দিন জিনকির কানে যায়। তিনি আলেপ্পোর দুর্গে ফকিহদের ডেকে পাঠান। তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে মাজদুদ্দিন ইবনে দাব্বা তাদের অভিনন্দন জানান। তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, মাদরাসা প্রতিষ্ঠার দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানের বিস্তার ঘটানো, বিদআতের মূলোৎপাটন করা, দ্বীনের বিজয় নিশ্চিত করা। কিন্তু আপনাদের মধ্যে যা শুরু হয়েছে তা শোভনীয় নয় এবং আপনাদের সঙ্গে তা যায় না। নুরুদ্দিন বললেন, আমরা উভয় দলকে খুশি করে দেবো। দুই দলের দুই শাইখকে ডেকে পাঠাব। তিনি শাইখ দুজনকে ডেকে পাঠান। শাইখ শারফুদ্দিনকে তার নামে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটির দায়িত্ব দেন এবং শাইখ কুতবুদ্দিনকে দেন মাদরাসাতুন নাফারির দায়িত্ব। (২৫৬)

যে-সকল জ্ঞানী-বিজ্ঞানী উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের প্রতিও রাষ্ট্র পর্যাপ্ত আনুকূল্য দেখিয়েছে, তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। তৃতীয় মুওয়াহহিদি খলিফা আল-মানসুর ইয়াকুব ইবনে ইউসুফ ইবনে আবদুল মুমিন মেধাবী বিদ্যার্থীদের জন্য 'বাইতুত তালাবা' প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেই এটির তত্ত্বাবধান করেন। এমনকি তার কিছু সহচর এই প্রতিষ্ঠানের বিদ্যার্থীদের প্রতি হিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। কারণ তারা খলিফার অত্যন্ত প্রিয় ছিল, তাঁর ঘনিষ্ঠ ছিল। খলিফা তাদের সঙ্গে একান্তে মিলিত হতেন এবং কথা বলতেন। সহচরদের হিংসার বিষয়টি তাঁর কানে গেল। তিনি আশঙ্কা বোধ করলেন এবং তাদের উদ্দেশে বললেন, হে মুওয়াহহিদি গোষ্ঠী, তোমাদের নিজ নিজ গোত্র রয়েছে। তোমরা কোনো সমস্যা বা বিপদের সম্মুখীন হলে তোমাদের গোত্রের কাছে আশ্রয় নাও। কিন্তু এই বিদ্যার্থীদের কোনো গোত্র নেই, আমি ছাড়া তাদের কেউ নেই। তারা কোনো সমস্যা বা বিপদের সম্মুখীন হলে আমিই তাদের আশ্রয়স্থল। তারা আমার কাছেই তাদের ভয় ও আশঙ্কার কথা প্রকাশ করতে পারে। তারা আমার ওপরই নির্ভর করে...। (২৫৭) এইভাবেই মুওয়াহহিদি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, বিস্তৃত হয় এবং নেতৃত্ব দেয়।

আবদুল্লাহ ইবনে তাহিরের (২৫৮) সঙ্গে আবু উবাইদ আল-কাসিম ইবনে সালামের (২৫৯) একটি চমৎকার ঘটনা ঘটেছিল। আমির-উমারা শ্রেণি জ্ঞানীদের মেধার প্রতি কতটা শ্রদ্ধা রাখতেন এবং কর্মতৎপর মেধাবীদের কতটা সম্মান করতেন তা এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়। আবু উবাইদ আল-কাসিম ইবনে সালাম তার 'গারিবুল হাদিস' গ্রন্থটি রচনা করার পর আবদুল্লাহ ইবনে তাহিরের কাছে পেশ করেন। তিনি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে তা গ্রহণ করেন এবং বলেন, যে মেধা তার বাহককে এই গ্রন্থ রচনা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে তার জীবিকা উপার্জনের মুখাপেক্ষী না হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। এই কথা বলে তিনি আবু উবাইদ আল-কাসিমের জন্য মাসিক দশ হাজার দিরহাম ভাতা জারি করেন। (২৬০)

বড় বড় উপঢৌকন ও মূল্যবান উপহার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল খুব প্রসিদ্ধ। খলিফা, গভর্নর ও প্রশাসকরা জ্ঞানী ব্যক্তিদের এসব উপঢৌকন ও উপহার দিতেন এবং তাদেরকে আরও বেশি জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করতেন। অকল্পনীয় মূল্যবান ছিল এসব উপঢৌকন। এসব উপঢৌকনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল অন্য ভাষা থেকে আরবি ভাষায় অনুবাদের জন্য অনুবাদককে অনূদিত বইয়ের সমওজনের স্বর্ণ প্রদান! (২৬১)

এ কারণে অনুবাদ-তৎপরতা অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং এর ফলে মুসলিমরা বিপুল জ্ঞানরাশিতে সমৃদ্ধ হয়েছে।

উসমানি খিলাফত এই ক্ষেত্রে চমৎকার কৃতিত্ব দেখিয়েছে। তারা সব শহর ও এলাকা থেকে সেরা মেধাবীদের সমবেত করতে সফল হয়েছিল এবং তাদের পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিল। ফলে তাদের প্রত্যেক সেরা মেধাবীই তার জ্ঞান ও বিদ্যাবত্তা উজাড় করে দিয়েছিলেন। এই ব্যাপারটি উসমানি সাম্রাজ্যকে সামরিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে উৎকর্ষের চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল এবং তা বিশ্বের প্রধান সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল।

ইসলামি সাম্রাজ্য কেবল নিজ দেশের জ্ঞানীদের পৃষ্ঠপোষকতা ও তত্ত্বাবধান করেই ক্ষান্ত থাকেনি, বরং শাসকেরা অন্যান্য দেশ ও শহরের জ্ঞানী-গুণীদেরও আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এসেছেন এবং তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হয়েছেন। তারা ভিনদেশি জ্ঞানীদের এভাবে সম্মানিত করতে পেরে নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করেছেন। আল-মুয়িয ইবনে বাডিস ছিলেন ইসলামি মরক্কোর সানহাজি রাজ্যের একজন আমির। (২৬২) তিনি যখনই কোনো শ্রদ্ধেয় জ্ঞানীর নাম শুনতেন, তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসতেন। শুধু তাই নয়, তাকে তার ঘনিষ্ঠ লোকদের অন্তর্ভুক্ত করে নিতেন। জ্ঞানী ব্যক্তির প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতেন, তার মতামতের ওপর নির্ভর করতেন এবং তার জন্য উচ্চ ভাতা নির্ধারণ করে দিতেন। (২৬৩)

সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ যখনই শুনেছেন যে, কোনো আলেম বা জ্ঞানী ব্যক্তি সংকটে বা অভাবে পড়েছেন, তিনি তাকে সাহায্য করতে ছুটে গিয়েছেন এবং পার্থিব প্রয়োজন পূরণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ টাকাপয়সা ব্যয় করেছেন। (২৬৪)

মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ মৃত্যুশয্যায় তার পুত্রকে যে ওসিয়ত বা বিশেষ নির্দেশ দিয়েছিলেন তা থেকে এ চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওসিয়তে তিনি বলেছিলেন, ...আলেম-উলামা ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা একটি রাজ্যের সুদৃঢ় শক্তি। তুমি তাদের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে এবং তাদের উৎসাহ দেবে। যখনই তুমি শুনবে অন্য দেশে কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি রয়েছেন, তাকে তুমি তোমার কাছে নিয়ে আসবে। ধনসম্পদ দিয়ে তাকে সম্মানিত করবে। (২৬৫)

জ্ঞানী ব্যক্তিদের সঙ্গে ইসলামি রাষ্ট্রের আচরণের ক্ষেত্রে আমরা যে ব্যাপারটি লক্ষ করি তা এই যে, মুসলিম জ্ঞানী-বিজ্ঞানী এবং অন্যান্য ধর্ম, মতাদর্শ ও জাতি-গোষ্ঠীর জ্ঞানী-বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোনো বৈষম্য করেনি।

বুখতিশু নাসতুরি পরিবার (২৬৬) এই ক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ। এই পরিবারের সন্তানেরা প্রায় সত্তর বছর আব্বাসি খলিফাদের পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন। খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর থেকে খলিফা আল- মু'তামিদ আলাল্লাহ পর্যন্ত বুখতিশু পরিবারই ছিল তাদের চিকিৎসক। রাজদরবারে তাদের মর্যাদা ছিল বেশ, বিশেষ খাতির-যত্নও ছিল। (২৬৭)

এই পরিবারের একজন চিকিৎসক হলেন জিবরিল ইবনে বুখতিশু ইবনে জর্জিস (মৃ. ২১৩ হি.)। তিনি খলিফা হারুনুর রশিদের চিকিৎসক ছিলেন এবং তার সহচর ও বন্ধু ছিলেন। এমনকি এ কথাও রটে গিয়েছিল যে, খলিফার কাছে তার অবস্থান দিন দিন দৃঢ়ই হচ্ছে। এমনকি হারুনুর রশিদ তার সঙ্গীসাথির উদ্দেশে একবার ঘোষণাও দিলেন, আমার কাছে তোমাদের কারও কোনো প্রয়োজন থাকলে তা জিবরিলকে বলো। (২৬৮)

একইভাবে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির কাছে ইহুদি ইবনে মাইমুন আল-আন্দালুসি বিশেষ গুরুত্ব ও খাতির-যত্ন পেতেন। তিনি সুলতানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন! (২৬৯)

শাসকেরা ও আমির-উমারা জ্ঞানী ব্যক্তিদের কাছে টানতে না পারলে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতেন। তা এই যে, তাদের কোনো গ্রন্থ রচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কিনে নিতেন।

উদাহরণ হিসেবে এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। আন্দালুসের উমাইয়া খলিফা আল-হাকাম আরবি সাহিত্যের বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-আগানি' রচনার কথা, শুনতে পেলেন। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি গ্রন্থটির রচয়িতা আবুল ফারাজ আল-ইস্পাহানির কাছে গ্রন্থটির একটি কপির মূল্য বাবদ এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা পাঠিয়ে দিলেন। যেন তিনি একটি কপি আন্দালুসে খলিফা আল-হাকামের কাছে পাঠিয়ে দেন। খলিফা যা চাইলেন তা-ই হলো। আবুল ফারাজ আল-আগানির একটি কপি পাঠিয়ে দিলেন। লেখকের জন্মভূমি ইরাকে গ্রন্থটি পঠিত হওয়ার পূর্বে তা পঠিত হলো আন্দালুসে!!

ইসলামি সভ্যতায় খলিফাবৃন্দ, আমির-উমারা, ধনাঢ্য ও অভিজাত শ্রেণি জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করেছেন, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন, তাদের কষ্ট ও যন্ত্রণা লাঘব করেছেন, জ্ঞানবিজ্ঞান প্রচারের জন্য তারা যেন নিরবচ্ছিন্ন অবকাশ পেতে পারেন সেই ব্যবস্থা করেছেন।
এসব বিষয় প্রমাণ করে যে, এই সভ্যতা জ্ঞানী-গুণীদের কতটা আগলে রেখেছে, কতটা যত্ন নিয়েছে। এটা-কোনো সন্দেহ নেই যে-ইউরোপে আমরা যা দেখেছি তার বিপরীত। সেখানে জ্ঞানী ব্যক্তিদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের রচনাবলি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কর্তৃত্বকারী সংস্থাগুলো জাতিকে তাদের ভিন্ন ভিন্ন গোত্রসহ গির্জার কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদতার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করেছে।

টিকাঃ
২৪৯. আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক : আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক আল-কুরাশি বিল-ওয়ালা (মৃ. ২৫৪ হি./৮৬৮ খ্রি.)। ইরাকের হালওয়ান শহরের বিচারক। হাফেযে হাদিস এবং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য। দেখুন, ইবনে মাকুলা, আল-ইকমাল, খ. ৭, পৃ. ২৩৯; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২২২।
২৫০. আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবনে মুসলিম ইবনে কুতাইবা আদ-দিনাওয়ারি, আল-ইমামাতু ওয়াস-সিয়াসাতু গ্রন্থটি তারিখুল খুলাফা নামে পরিচিত, খ. ২, পৃ. ১৫৭।
২৫১. এক মিশরীয় রিওল = ৪৪৯.২৮ গ্রাম।
২৫২. সুযুতি, হুসনুল মুহাদারাহ, খ. ২, পৃ. ৫৭।
২৫৩. মুস্তাফা আস-সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ১০২।
২৫৪. আবু শামা: আবদুর রহমান ইবনে ইসমাইল ইবনে ইবরাহিম (৫৯৯-৬৬৫ হি./১২০২-১২৬৬ খ্রি.)। মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফকিহ, মূলনীতি-বিশেষজ্ঞ ও কারি। দামেশকে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সেখানেই বড় হয়েছেন। দারুল হাদিস আল-আশরাফিয়্যার প্রধান শাইখ ছিলেন। দেখুন, ইবনে আসাকির, তারিখে দিমাশক, খ. ৬৬, পৃ. ৩; শাতিবি, ইবরাযুল মাআনি মিন হিরযিল আমানি, খ. ১, পৃ. ১।
২৫৫. ইবনে আবু আসরুন: আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে হিবাতুল্লাহ আত-তামিমি (৪৯২-৫৮৫ হি./১০৯৯-১১৮৯ খ্রি.)। শাফিয়ি ফকিহ। মসুলে জন্মগ্রহণ করেন, তারপর বাগদাদে চলে যান। দামেশকে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ৫৭৩ হিজরিতে দামেশকের বিচারক নিযুক্ত হন। দামেশকের আল-আসরুনিয়্যা মাদরাসাটির নামকরণ তার নামেই হয়েছে।
২৫৬. আবু শামা আল-মাকদিসি, আর-রাওযাতাইন ফি আখবারিদ দাওলাতাইন, পৃ. ১৭।
২৫৭. আবদুল ওয়াহিদ আল-মারাকেশি, আল-মুজিব ফি তালখিছি আখবারিল মাগরিব, পৃ. ৮১।
২৫৮. আবদুল্লাহ ইবনে তাহির : আবুল আব্বাস আবদুল্লাহ ইবনে তাহির ইবনুল হুসাইন আল-খুযায়ি আল-খুরাসানি (১৮২-২৩০ হি./৭৯৮-৮৪৪ খ্রি.)। আব্বাসি যুগের বিখ্যাত গভর্নরদের একজন। শাম (সিরিয়া), খুরাসান, মিশর, তাবারিস্তান, কিরমান ও রায়ের গভর্নর ছিলেন। নিশাপুরে মৃত্যুবরণ করেন। মারভে মৃত্যুবরণ করেছেন বলেও বর্ণনা রয়েছে।
২৫৯. আবু উবাইদ আল-কাসিম ইবনে সালাম : আবু উবাইদ আল-কাসিম ইবনে সালাম আল-হারাবি (১৫৭-২২৪ হি./৭৭৪-৮৩৮ খ্রি.)। হাদিস, আদব ও ফিকহের অন্যতম বড় আলেম। হিরাতে জন্মগ্রহণ করেন। এখানেই জ্ঞান অর্জন করেন। বাগদাদ ও মিশর ভ্রমণ করেছেন। মক্কা মুকাররমায় মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১০, পৃ. ৪৯০-৪৯২।
২৬০. খতিব বাগদাদি, তারিখে বাগদাদ, খ. ১২, পৃ. ৪০৬; ইবনে আসাকির, তারিখে দিমাশক, খ. ৪৯, পৃ. ৭৪; ইবনে হাজার আসকালানি, তাহযিবুত তাহযিব, খ. ৮, পৃ. ২৮৪।
২৬১. ইবনে সায়িদ আল-আন্দালুসি, তাবাকাতুল উমাম, পৃ. ৪৮-৪৯।
২৬২. বনু যিরির আমির। যিরি রাজবংশ (Zirid dynasty) সানহাজি রাজবংশের একটি শাখা।
২৬৩. ইবনে ইযারি, আল-বায়ানুল মুগরিব ফি ইখতেছারি আখবারি মুলুকিল আন্দালুসি ওয়াল মাগরিব, পৃ. ১২৯।
২৬৪. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি, দাওলাতুল উসমানিয়্যাহ আওয়ামিলুন নুহুদ ওয়া-আসবাবুস সুকুত, পৃ. ১৪০।
২৬৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৮।
২৬৬. নাসতুরি খ্রিষ্টান (Nestorian Christian) গোত্রের পরিবার। বনি বুখতিশু বা বনি আবদুল মাসিহ নামেও পরিচিত। বুস্ত শব্দের অর্থ বান্দা বা দাস এবং ইয়াশু শব্দের অর্থ ইসা মাসিহ আ.।
২৬৭. যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ২, পৃ. ৪৪-৪৫।
২৬৮. প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ১১১।
২৬৯. প্রাগুক্ত, খ. ৭, পৃ. ৩২৯।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ইজাযত

📄 ইজাযত


ইজাযত বলতে বোঝায় ফাতওয়া বা শিক্ষকতার অনুমতি দান। (২৭০) মুহাদ্দিসগণ ও অন্যদের কাছে ইজাযতের সংজ্ঞা হলো, হাদিস বা কিতাব বর্ণনার অনুমতি প্রদান। (২৭১)

আলেমগণ বেশ কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিলেন। এসব মানদণ্ড অতিক্রম করেই একজন তালিবুল ইলম বা শিক্ষার্থী শিক্ষার এই স্তরে উত্তীর্ণ হতে পারত। এই স্তরে এসে সে পাঠদান বা ফাতওয়া প্রদানের প্রবেশদ্বারে পৌঁছে যেত। এ কারণে ‘ইজাযত' ছিল প্রধান ও চূড়ান্ত মানদণ্ড, যেখানে শিক্ষক তার শিষ্যকে এই স্বীকৃতি দিতেন যে সে ভিন্ন মজলিসে বসে পাঠদানে সক্ষম হয়েছে এবং সে বিভিন্ন জ্ঞানের নির্দিষ্ট শাখায় পারদর্শী হয়েছে।

ইজাযতের বিষয়টি অন্যদের কাছে জ্ঞান (কিতাব, পাণ্ডুলিপি ইত্যাদি) পৌঁছে দেওয়ার অনুমতি দেওয়ার মধ্য দিয়েই রূপায়িত হতো। শাইখ তার পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপি বা কিছু অংশ তার ছাত্রকে বা কোনো আলেমকে দিতেন এই মর্মে যে এই পাণ্ডুলিপি তিনি নিজ হাতেই লিখেছেন। তা ছাড়া তিনি যে শাইখ থেকে এই জ্ঞান আহরণ করেছেন তার নামও তাদের জানিয়ে দিতেন। তারপর তাদেরকে তা অন্যদের প্রদান করার অনুমতি দিতেন। এভাবেই ইজাযতদানের বিষয়টি সম্পন্ন হতো। (২৭২)

ইসলামি সভ্যতার সূচনাকাল থেকেই ইজাযতদানের বিষয়টি সুপরিচিত। শুরুর দিকে ইজাযতদানের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসসমূহের মধ্যে যাতে মিশ্রণ না ঘটে এবং তা থেকে বেঁচে থাকা যায়। তাই হাদিস-বিশেষজ্ঞগণ ইজাযতদানের পদ্ধতি স্থির করেন। এটা ছিল শিক্ষক ও শিষ্যদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বস্ততা নিরূপণের একটি প্রকার।

বাস্তবিক পক্ষে 'ইজাযত' হাজার বছরের মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি সংযোজন। বস্তুত এটি ছিল বর্তমান সময়ে ছাত্ররা যে সত্যায়িত সনদ লাভ করে তারই নামান্তর।

এ কারণেই আমরা দেখি যে ইসলামের প্রত্যেক যুগে রাষ্ট্রের দৃশ্যমান পদে কোনো আলেমের নিযুক্তির জন্য 'ইজাযত' ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

আহলে সুন্নাহর ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. তার পুত্র আবদুল্লাহকে ইজাযত দিয়েছেন, এই মর্মে যে, তিনি তার থেকে মুসনাদের ত্রিশ হাজার হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং তার ব্যাখ্যাস্বরূপ এক লাখ বিশ হাজার হাদিস বর্ণনা করেছেন। (২৭৩) ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে শিহাব আয-যুহরি রহ. ইমাম ইবনে জুরাইজকে (২৭৪) ইজাযত দিয়েছেন। (২৭৫)

ইসলামি সভ্যতার নারীদের অন্যতম অধিকার ছিল জ্ঞান অর্জন করা এবং শিক্ষাদান করা। এই ক্ষেত্রে তারা ছিল পুরুষের মতোই, সমান সমান। কোনো নারী আলেমদের থেকে ইজাযত হাসিল করা ছাড়া শিক্ষাদান বা পাঠদানের জন্য বসতে পারতেন না। এখানে দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে যে, ইমাম যাহাবির (২৭৬) দুধমা ও ফুফু সিতুল আহলি বিনতে উসমান ইবনে কাইমায যাদের থেকে ইজাযত গ্রহণ করেছিলেন তারা হলেন ইবনে আবুল ইউস, জামালুদ্দিন ইবনে মালিক, যুহাইর ইবনে উমর আয-যারয়ি এবং আরও অনেক। তিনি উমর ইবনুল কাওয়াস প্রমুখ থেকে হাদিস শুনেছেন। ইমাম যাহাবি তার এই ফুফু থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। (২৭৭)

ইজাযতের ব্যাপারটি কেবল কুরআন ও হাদিস এবং শরয়ি জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং জীবনঘনিষ্ঠ সকল জ্ঞানই এর আওতাধীন ছিল। চিকিৎসাশাস্ত্রের পঠনপাঠনের জন্যও অনুমতির প্রয়োজন হতো। হিজরি চতুর্থ শতকে প্রধান চিকিৎসাবিদ সিনান ইবনে সাবিত (২৭৮) যারা চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে কাজ করতে চায় তাদের ইজাযত প্রদান করেন। তবে তাদের প্রত্যেককে বিশেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়, যে ব্যক্তি যে শাখায় কাজ করতে চায় সে ওই শাখায় বিশেষজ্ঞ কি না তা যাচাই করা হয়। (২৭৯)

একইভাবে দামেশকে আল-মাদরাসাতুল দাখওয়ারিয়‍্যাহর প্রতিষ্ঠাতা মুহাযযিবুদ্দিন আদ-দাখওয়ার ইজাযত দেন আল্লামা আলাউদ্দিন ইবনে নাফিসকে। তিনি এই ইজাযত লাভের পর তার যুগের সবচেয়ে বড় হাসপাতালে কাজ করার সুযোগ পান। এটি হলো দামেশকের আন-নুরি হাসপাতাল। (২৮০) চিকিৎসাবিদ আল-রাযি তার 'আল-হাবি' গ্রন্থে বলেছেন, চিকিৎসার জন্য অনুমোদনপ্রার্থীর প্রথম পরীক্ষা হবে অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ্যা (anatomy) বিষয়ে। সে যদি এটা না জানে বা অনুত্তীর্ণ হয় তাহলে তার বিদ্যা রোগীদের ওপর প্রয়োগ করে পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। (২৮১)

বড় আলেমদের থেকে ইজাযত ছিল ছাত্রদের জন্য গর্বের বিষয়। তারা তা জীবনভর মানুষের কাছে উল্লেখ করতেন। আবুল আব্বাস আল-কালকাশান্দি তার যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম সিরাজুদ্দিন ইবনে মুলকিন থেকে ফিকহে শাফেয়ির ইজাযত নিয়েছিলেন। তিনি তার কোষমূলক গ্রন্থ صبح الأَعْشَىٰ فِي كِتَابَةِ الْإِنْشَا (সুবহুল আ'শা ফি কিতাবাতিল ইনশা)-য় সেই 'ইজাযতবাণী' উল্লেখ করেছেন। এটা প্রমাণ করে যে, তিনি এই ইজাযত কতটা ভালোবাসেন, কতটা গর্ববোধ করেন এটা নিয়ে। তার ইজাযতবাণীর উল্লেখযোগ্য অংশ নিম্নরূপ:

আল্লাহ তাআলা আমাদের সাইয়িদ, আমাদের শাইখ, আমাদের বরকত, আল্লাহর মুখাপেক্ষী বান্দা, আশ-শাইখ আল-ইমাম আল-আল্লামা, পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞ, যুগশ্রেষ্ঠ ও অনন্য, জ্ঞানীদের সৌন্দর্য, শ্রেষ্ঠদের শ্রেষ্ঠ, ফকিহদের ও সৎ ব্যক্তিদের অবলম্বন সিরাজুদ্দিন মুফতিউল ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন আবু হাফস উমরকে কল্যাণ করুন। তিনি অমুককে (যার নাম আল-কালকাশান্দি)-আল্লাহ তার মর্যাদা সমুন্নত রাখুন-অনুমতি দিয়েছেন ও অনুমোদন করেছেন এই মর্মে যে, তিনি আল-ইমাম আল-মুজতাহিদ আল-আলিমুর রাব্বানি আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে ইদরিস আল-মাতলাবি আশ-শাফিয়ির মাযহাবের পাঠদান করতে পারবেন-আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে তার প্রত্যাবর্তনস্থল ও চিরস্থায়ী আবাস বানিয়ে দিন-এবং শাফিয়ি মাযহাব বিষয়ে লিখিত সব গ্রন্থ পাঠ করতে পারবেন এবং তার ছাত্রদের পড়াতে পারবেন; তিনি যতটা চান, যেখানে গমন করেন ও অবস্থান করেন সেখানেই, তার যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই এবং যখন যেখানে খুশি সেখানেই তা করতে পারবেন; কেউ তার কাছে ফাতওয়া চাইলে তিনি লিখিতভাবে ও মৌখিকভাবে ফাতওয়া দিতে পারবেন, তার পবিত্র মাযহাবের দাবি অনুযায়ী তার জ্ঞান ও দ্বীনদারি, আমানতদারি, অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি, উপযুক্ততা ও পর্যাপ্ত চিন্তাভাবনার ভিত্তিতে তিনি তা করবেন...। (২৮২)

উপরিউক্ত ঘটনাবলি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে গোটা মানবসভ্যতার অভিযাত্রায় 'ইজাযত' এক অনন্য ও অগ্রগামী ইসলামি সংযোজন। ইউরোপের বড় বড় মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়েরও দশ শতাব্দী পূর্বে ইজাযতের বিষয়টি ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। এই ক্ষেত্রে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে নতুন বিষয় সংযোজনের ক্ষেত্রে ইসলামি সভ্যতা কতটা অগ্রগামী ও শ্রেষ্ঠ তা সহজেই প্রমাণিত হয়। এই ইজাযত পদ্ধতি আজ গোটা বিশ্বের সব জাতিই অনুসরণ করছে।

টিকাঃ
২৭০. হাশিয়া ইবনে আবিদিন, খ. ১, পৃ. ১৪।
২৭১. মিশরীয় ওয়াক্‌ফ মন্ত্রণালয়, আল-মাউসুআতুল ইসলামিয়্যাতুল আম্মাহ, পৃ. ৪৩।
২৭২. কারাম হিলমি ফারহাত, আত-তুরাসুল ইলমি লিল-হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ফিশ শাম ওয়াল ইরাক খিলালাল কারনির রাবিয়িল হিজরি, পৃ. ৬৯।
২৭৩. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ, ১১, পৃ. ১০৯।
২৭৪. ইবনে জুরাইজ: আবদুল মালিক ইবনে আবদুল আযিয ইবনে জুরাইজ আর-রুমি (৭০-১৫০ হি.)। বনি উমাইয়ার আযাদকৃত দাস। ছিলেন অন্যতম জ্ঞানভান্ডার। হাদিসশাস্ত্রে তিনিই প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ১৬০; সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৯, পৃ. ১১৯-১২০।
২৭৫. যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ৬, পৃ. ৩৩২।
২৭৬. যাহাবি : আবু আবদুল্লাহ শামসুদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে উসমান ইবনে কাইমায (৬৭৩-৭৪৮ হি./১২৭৪-১৩৪৮ খ্রি.)। হাফিযে হাদিস, ঐতিহাসিক, আল্লামা, টীকা-ভাষ্যকার। তুর্কমান বংশোদ্ভূত। দামেশকে জন্ম ও মৃত্যু। তার রচনাবলি বিশাল ও ব্যাপক, প্রায় একশ। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ১৬০।
২৭৭. যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, সম্পাদনার ভূমিকা, খ. ১, পৃ. ১৭১।
২৭৮. সিনান ইবনে সাবিত: আবু সাইদ সিনান ইবনে সাবিত ইবনে কুররাহ আল-হাররানি (মৃ. ৩৩১ হি./৯৪৩ খ্রি.)। চিকিৎসাবিদ, বিজ্ঞানী। আব্বাসি খলিফা আল-মুকতাদিরের কাছে তার অবস্থান ছিল অত্যন্ত উঁচুতে। তিনি তাকে চিকিৎসকদের প্রধান নিযুক্ত করেছিলেন। বাগদাদে মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৫, পৃ. ১৫২।
২৭৯. ইবনে আবি উসাইবিআ, তাবাকাতুল আতিব্বা, খ. ২, পৃ. ২০৪।
২৮০. যাহাবি, তারিখুল ইসলাম, খ. ৫১, পৃ. ৩১২।
২৮১. আল-রাযি, আল-হাবি ফিত-তিব্বি, খ. ৭, পৃ. ৪২৬।
২৮২. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা, খ. ১৪, পৃ. ৩৬৬-৩৬৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00