📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 বাগদাদ গ্রন্থাগার (ক্রমবিকশিত ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়)

📄 বাগদাদ গ্রন্থাগার (ক্রমবিকশিত ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়)


মানবসভ্যতার উন্নতি ও বিকাশে ইসলামি গ্রন্থাগারসমূহের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এর ফলেই মানবসভ্যতা বর্তমান রূপ লাভ করেছে। কিন্তু সেসব গ্রন্থাগারের মধ্যে-কোনো সন্দেহ নেই যে-সবচেয়ে বিখ্যাত হলো বাগদাদের বাইতুল হিকমা গ্রন্থাগার। এটিকে পৃথিবীর বুকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানকেন্দ্র বিবেচনা করা হয়। না, এতে কোনো অতিরঞ্জন নেই। শুধু তাই নয়, এটি ইসলামি চিন্তাধারার ফলে সৃষ্ট প্রাচীন জ্ঞানভান্ডারগুলোর মধ্যে অন্যতম। যদিও ইসলামি চিন্তাধারার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামি বিশ্বের সব অঞ্চলেই গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মানুষ বাইতুল হিকমার ভূমিকা ভুলে গেছে, অথচ এটি ছিল একটি আন্তর্জাতিক বিদ্যাপীঠের সমপর্যায়ের। বর্ণ ও ধর্ম নির্বিশেষে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য থেকে বিদ্যার্থীরা এখানে ছুটে এসেছে। তারা বিভিন্ন শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন করেছে, নানা ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছে। বাইতুল হিকমার আলোকবর্তিকা প্রায় পাঁচ শতাব্দীব্যাপী মানবতাকে তার পথ দেখিয়েছে। তাতারদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তা আলো ছড়িয়েছে।

আব্বাসি খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর খিলাফতের সময় রাজধানী বাগদাদে এই গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কিছু ভবন নির্দিষ্ট করে সেখানে অতি মূল্যবান ও দুর্লভ গ্রন্থাবলির সমাবেশ ঘটান। আরবি ভাষায় রচিত গ্রন্থাবলি যেমন ছিল, তেমনই অন্যান্য ভাষা থেকে অনূদিত গ্রন্থরাজিও ছিল। ১৭০ হিজরিতে খলিফা হারুনুর রশিদ খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। (১৯৩ হিজরি পর্যন্ত তিনি খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন।) তিনি ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ আব্বাসি খলিফা এবং ইতিহাসের পাতায় তিনিই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত ও নন্দিত। খলিফা হওয়ার পর তিনি খিলাফত-প্রাসাদে সুরক্ষিত অসংখ্য মূল ও অনুবাদকৃত গ্রন্থাবলি ও পাণ্ডুলিপি বের করে আনতে মনোযোগী হন। খিলাফত-প্রাসাদে ছিল গ্রন্থরাজির বিপুল ভান্ডার। এখানে অসংখ্য সংকলনমূলক পাণ্ডুলিপির পাশাপাশি ছিল মৌলিক ও অনূদিত পাণ্ডুলিপি। তিনি বাগদাদ গ্রন্থাগারের একটি বিশেষ ভবনে আলাদাভাবে এসব গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করেন। ভবনটি ছিল বিপুল পরিমাণ গ্রন্থ সংরক্ষণের উপযোগী। সকল ছাত্র ও শিক্ষার্থীর জন্য উন্মুক্ত ছিল এই ভবন।
তিনি গ্রন্থাগারের জন্য একটি বিশাল ভবন নির্মাণ করেন এবং সমস্ত গ্রন্থভান্ডার এখানে স্থানান্তরিত করেন। তিনি এটির নামকরণ করেন বাইতুল হিকমা (House of Wisdom)। সংগৃহীত গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপির অপরিসীম মূল্য ও গুরুত্বের কারণে তিনি এই নামকরণ করেন। পরবর্তীকালে এই গ্রন্থাগার ক্রমবিকশিত হতে থাকে ও উৎকর্ষ লাভ করতে থাকে এবং অবশেষে বিখ্যাত একাডেমিক জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হয়, যা ইতিহাসে সুপরিচিত। (১৮১) খলিফা আল-মামুনের যুগে গ্রন্থাগারটির সর্বাধিক উন্নতি হয়। তিনি বিখ্যাত অনুবাদক, অনুলিপিকারী ও লেখক জ্ঞানী-গুণীদের সমবেত করতে সক্ষম হন। এমনকি তিনি রোম সাম্রাজ্যের বিভিন্ন দেশে গবেষক ও অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করেন। তাঁর এসব কাজ এই জ্ঞানসুলভ অনন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির উন্নতি ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। (১৮২)

বাইতুল হিকমার প্রাথমিক বিকাশ ঘটে একটি বিশেষ গ্রন্থাগার হিসেবে, তারপর তা অনুবাদকেন্দ্রের রূপ পায়, তারপর তা পরিণত হয় গবেষণা ও সংকলনকেন্দ্রে, অবশেষে তা একটি শিক্ষাকেন্দ্রে হয়ে ওঠে। এখানে পাঠদান ও ইজাযতদানের কার্যক্রম চালু হয়। তারপর এতে যুক্ত করা হয় একটি মানমন্দির (Astronomical observatory)। এভাবে বাইতুল হিকমা কয়েকটি বিভাগে রূপান্তরিত হয়েছিল। তা নিম্নরূপ:

### গ্রন্থাগার
গ্রন্থাগার বিভাগের প্রধান কাজ ছিল সম্ভাব্য সব এলাকা থেকে গ্রন্থ সংগ্রহ করা, সেগুলোকে তাকে তাকে সাজানো এবং যারা পড়তে চায় তাদের সরবরাহ করা। এই বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিল অনুলিপি ও বাঁধাইকরণ অনুবিভাগ। এখানে অবস্থা অনুযায়ী গ্রন্থাবলির অনুলিপি তৈরি ও বাঁধাইয়ের ফরমায়েশ দেওয়া হতো। রক্ষিত গ্রন্থাবলির মধ্যে যেগুলো নষ্ট হওয়ার উপক্রম করত সেগুলোকে মেরামত করার দায়িত্বও ছিল এই অনুবিভাগের। বাইতুল হিকমায় গ্রন্থ সংগ্রহের পন্থা ছিল অনেক। তার মধ্যে একটি হলো ক্রয় করা। খলিফা আল-মামুন কনস্টান্টিনোপলে সংগ্রাহক দল প্রেরণ করতেন এবং তাদেরকে যেকোনো প্রকারের গ্রন্থ সংগ্রহের নির্দেশ দিতেন। মাঝে মাঝে তিনি নিজেও সফরে বের হতেন এবং গ্রন্থাবলি ক্রয় করে তা বাইতুল হিকমায় পাঠাতেন। আরেকটি পন্থা ছিল উপঢৌকন গ্রহণ। খলিফাগণ বহির্দেশীয় রাষ্ট্রগুলোতে ইসলামি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করতেন, ওইসব দেশের রাজাবাদশারা তাদেরকে গ্রন্থ উপহার দিতেন। কখনো কখনো যাদের ওপর জিযিয়া দেওয়ার আবশ্যকতা ছিল তাদের থেকে বইপুস্তক গ্রহণ করা হতো। এটাও ছিল গ্রন্থ সংগ্রহের একটি পন্থা। খলিফা আল-মামুন শত শত অনুলিপিকারী, ব্যাখ্যাদাতা, বিভিন্ন ভাষার অনুবাদক নিযুক্ত করেছিলেন। অন্যান্য ভাষার গ্রন্থাবলি আরবি ভাষায় রূপান্তরিত করা হতো। সংকলন ও নতুন গ্রন্থ রচনাও ছিল আরেকটি পন্থা। এগুলো তো বটেই, গ্রন্থ সংগ্রহের আরও পন্থা ছিল। এ কারণে বাইতুল হিকমার গ্রন্থাবলি সংখ্যায় ও প্রকারে ছিল অভূতপূর্ব।

খলিফা আল-মামুন রোমান সম্রাটের কাছে চিঠি পাঠিয়ে আবেদন জানান যে, তার কাছে গ্রিকদের থেকে প্রাপ্ত যে প্রাচীন জ্ঞানভান্ডার রয়েছে তা যেন পাঠানোর অনুমতি দেন। রোমান ঐতিহ্যে তখন সেসব গ্রন্থের পাঠ অনুমোদিত ছিল না। সম্রাট কিছুকাল নীরব থেকে চিঠির জবাব দেন। আল-মামুন একটি জ্ঞান-অনুসন্ধানী দল প্রস্তুত করেন। এই দলে কয়েকজন অনুবাদককেও যুক্ত করেন। বাইতুল হিকমার গ্রন্থাগারিককে সেই দলের প্রধানের দায়িত্ব প্রদান করেন। এই অনুসন্ধানী দল রোমে গিয়ে বিভিন্ন রকমের বহু স্থানে ঘুরে। যেখানে মনে হয়েছে প্রাচীন গ্রিক গ্রন্থভান্ডার রয়েছে সেখানেই দলটি গিয়েছে। অনুসন্ধান শেষে তারা দুর্লভ ও অতি মূল্যবান গ্রন্থের ভান্ডার নিয়ে ফিরে আসে। দর্শন, প্রকৌশল, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা ও অন্যান্য শাস্ত্রের অসংখ্য গ্রন্থ তাদের হস্তগত হয়। খলিফা আল-মামুন তার শাসনামলে অন্যান্য রাজাবাদশার কাছেও প্রাচীন গ্রন্থভান্ডার অনুসন্ধান ও খোঁজাখুঁজির জন্য অনুসন্ধানী দল প্রেরণের অনুমতি চেয়ে চিঠি পাঠান। একবার এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। একটি অনুসন্ধানী দল পারস্যে যায় এবং একটি প্রাচীন দুর্গের নিচে কয়েকটি সিন্দুকের দেখা মেলে। এসব সিন্দুকে ছিল অসংখ্য গ্রন্থ। গ্রন্থগুলো পচে গিয়েছিল এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। অনুসন্ধানী দল এগুলো উদ্ধার করে এবং বাগদাদে নিয়ে আসে। এগুলো শুকাতে এক বছর লাগে। শুকিয়ে গেলে এগুলোতে পরিবর্তন ঘটে এবং দুর্গন্ধ দূর হয়ে যায়। তারপর তারা গ্রন্থগুলোর পাঠোদ্ধারে উঠেপড়ে লাগে।(১৮৩)

### অনুবাদকেন্দ্র
খলিফা আল-মামুনের কাছে প্রাচীন গ্রন্থাবলির বিশাল সম্ভারের সমাবেশ ঘটে। তিনি দক্ষ অনুবাদক, ব্যাখ্যাতা ও অনুলিপিকারীর সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। গ্রন্থাবলির মেরামত ও আরবিতে ভাষান্তরই ছিল এই কমিটির দায়িত্ব। তিনি প্রত্যেক অনারব ভাষার জন্য একজন দায়িত্বশীল নিযুক্ত করেন যিনি ওই ভাষা থেকে আরবিতে অনুবাদকারীদের তত্ত্বাবধান করবেন। তাদের সবার জন্য বিরাট অঙ্কের বেতন নির্ধারণ করেন। কারও-কারও জন্য মাসিক বেতন নির্ধারণ করেন পাঁচশ দিনার। (১৮৪) (যা দুই কেজি সোনার চেয়েও বেশি!)

অনুবাদ বিভাগের প্রধান দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন ভাষার গ্রন্থাবলি আরবিতে রূপান্তরিত করা এবং মাঝে মাঝে আরবি থেকে অন্যান্য ভাষায় রূপান্তরিত করা। এই বিভাগে যেসব অনুলিপিকারী বা নকলনবিশকে নিযুক্ত করা হতো তারা ছিল গ্রন্থাগার বিভাগে নিযুক্ত কর্মচারীদের থেকে জ্ঞান ও যোগ্যতার দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনুবাদ বিভাগে যারা কাজ করতেন তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন ইউহান্না ইবনে মাসাওয়াইহ, জিবরিল ইবনে বুখতিশু এবং হুনাইন ইবনে ইসহাক। গ্রিক ভাষায় দক্ষতা অর্জনের জন্য হুনাইনকে রোমান দেশে ভ্রমণে পাঠানো হয়েছিল। ভিনদেশি গ্রন্থাবলি বাইতুল হিকমায় নিয়ে আসা হতো এবং সেখানেই অনুবাদ করা হতো। কতিপয় অনুবাদক বাইতুল হিকমার বাইরে থেকেও অনুবাদ করতেন এবং অনূদিত গ্রন্থ এখানে জমা দিতেন। খলিফা আল-মামুন অনুবাদকদের বড় হাতে সম্মানী দিতেন, এমনকি তিনি অনূদিত গ্রন্থের সমপরিমাণ ওজনের স্বর্ণও দিতেন!(১৮৫)

ইবনে নাদিম তার 'আল-ফিহরিসত' গ্রন্থে কয়েক ডজন অনুবাদকের নাম উল্লেখ করেছেন, যারা ভারতীয় ভাষা, গ্রিক ভাষা, ফারসি ভাষা, সুরয়ানি ভাষা (Syriac language), নাবাতি ভাষা থেকে আরবিতে অনুবাদ করতেন। তারা কেবল আরবিতে অনুবাদ করেই ক্ষান্ত থাকেননি, বরং ইসলামি সমাজে যেসব ভাষা জীবন্ত ও ব্যাপ্ত ছিল সেগুলোতেও অনুবাদ করেছেন। যাতে ইসলামি সমাজে বসবাসকারী ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সকলেই এসব গ্রন্থ থেকে উপকৃত হতে পারে। অনুবাদকদের কেউ মূল গ্রন্থটিকে তার মাতৃভাষায় অনুবাদ করতেন, তারপর অন্য একজন অনুবাদক তা আরবিতে ও অন্য ভাষায় অনুবাদ করতেন। যেমন ইউহান্না ইবনে মাসাওয়াইহ মূল গ্রন্থকে সুরয়ানি ভাষায় অনুবাদ করতেন, তারপর অন্যজন ওই অনুবাদকে আরবিতে রূপান্তর করতেন। সঙ্গে সঙ্গে মূল গ্রন্থও বাঁধাই করে সংরক্ষণ করা হতো।(১৮৬)

বাইতুল হিকমা থেকে সংরক্ষিত গ্রন্থতালিকা নিরীক্ষণ করলে যে-কেউ এ ব্যাপারে অসংখ্য ইঙ্গিত পাবে যে এখানে বিপুল পরিমাণ গ্রন্থের নাবাতি কপি (নুসখা), কিবতি কপি, সুরয়ানি কপি, ফারসি কপি, ভারতীয় কপি, গ্রিক কপি ছিল। (কারণ, একেকটি গ্রন্থ বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছিল।) মুসলিম জ্ঞানী-মনীষীরা অনুবাদের মধ্য দিয়ে সমগ্র মানবজাতির জন্য বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। তারা এমনসব জ্ঞানভান্ডারের অনুবাদ করেছেন যা ধ্বংসই হতে যাচ্ছিল। তারা না থাকলে আধুনিক যুগের মানুষ প্রাচীন গ্রিক ও ভারতীয় মূল্যবান রচনাবলি সম্পর্কে কিছুই জানতে পারত না। কারণ, এসব মূল্যবান জ্ঞানভান্ডার আহরণ করা হয়েছে যেসব দেশ থেকে তার অধিকাংশতেই এগুলোর পাঠ নিষিদ্ধ ছিল। যেসব গ্রন্থ শাসকদের বা কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ত সেগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হতো। যেমন রোমান রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ একবার পনেরো বোঝা গ্রন্থ জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তার মধ্যে বিখ্যাত বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের গ্রন্থাবলিও ছিল।(১৮৭)

এই সকল আলেমের ভূমিকা কেবল অনুবাদে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা অনূদিত গ্রন্থাবলিতে টীকাও সংযোজন করেছেন। সেগুলোতে যেসব বিষয়ের ব্যাখ্যার প্রয়োজন ছিল সেগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেগুলোকে প্রায়োগিক উপযোগিতার পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। অসম্পূর্ণ বিষয়গুলোর পূর্ণরূপ দিয়েছেন। ভ্রান্তি-বিভ্রাটের সংশোধন করেছেন। বর্তমান যুগে যাকে ‘সম্পাদনা’ বলা হয় তাদের কাজ ছিল তারই অনুরূপ। ওইসব গ্রন্থের কয়েকটিতে ইবনে নাদিম যে টীকাবলি সংযোজন করেছেন তা থেকে এটাই বোঝা যায়। (১৮৮)

কাজি সায়িদ আল-আন্দালুসি তার ‘তাবাকাতুল উমাম’ গ্রন্থে বাইতুল হিকমায় অনুবাদ-পদ্ধতি কী ছিল সে ব্যাপারে আলোকপাত করেছেন। খলিফা আল-মামুন এই শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাগারের প্রতি কতটা গুরুত্ব দিতেন সেটাও উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, খিলাফতের দায়িত্ব যখন তাদের (আব্বাসিদের) সপ্তম খলিফা আবদুল্লাহ আল-মামুন ইবনে হারুনুর রশিদের হাতে এলো... তিনি তার পিতামহ আল-মানসুর যেসব কাজ শুরু করেছিলেন সেগুলো সম্পন্ন করতে থাকলেন। যেখানে জ্ঞান রয়েছে বলে মনে করলেন সেখান থেকেই তা সংগ্রহ করতে শুরু করলেন। জ্ঞানের খনি থেকে জ্ঞান আহরণ করতে থাকলেন। তার ছিল দৃঢ় সংকল্প, উচ্চাকাঙ্ক্ষা; আত্মশক্তিও ছিল প্রবল। তিনি রোম সাম্রাজ্যের সম্রাট ও শাসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তাদের জন্য মূল্যবান উপহার-উপঢৌকন পাঠালেন। তাদের কাছে দর্শনশাস্ত্রের যেসব গ্রন্থ রয়েছে সেগুলো তার কাছে পাঠিয়ে দিতে অনুরোধ জানালেন। তারা তা-ই করলেন। তাদের কাছে প্লেটো, অ্যারিস্টটল, সক্রেটিস, গ্যালেন (১৮৯), ইউক্লিড, টলেমি ও অন্যান্য দার্শনিক-বিজ্ঞানীর যেসব গ্রন্থ ছিল তা তারা পাঠিয়ে দিলেন। আল-মামুন এসব গ্রন্থের আরবি অনুবাদের জন্য দক্ষ অনুবাদকদল নির্বাচন করলেন। তাদেরকে এসব গ্রন্থের অনুবাদের নির্দেশ দিলেন। সাধ্যের সবটুকু দিয়ে এসব গ্রন্থের অনুবাদ করা হলো। আল-মামুন এসব গ্রন্থ পাঠের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করলেন, এগুলোর পঠনপাঠনের জন্য তাদেরকে উৎসাহিত করে তুললেন। ফলে তার যুগে জ্ঞানের বাজার রমরমা হয়ে উঠল। জ্ঞান-রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলো। জ্ঞান অর্জন ও বিকাশে মেধাবীরা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলেন। কারণ তারা দেখলেন যে, খলিফা আল-মামুন জ্ঞান অর্জনকারীদের বিশেষভাবে গণ্য করেন, যারা জ্ঞানচর্চায় নিযুক্ত তাদের খাস লোক হিসেবে কাছে টেনে আনেন। নেন। তাদের সঙ্গে একান্তে আলাপ-আলোচনা করেন, তর্কবিতর্ক করে আনন্দ পান, নানা বিষয়ে কথাবার্তা বলে সুখ পান। তারা খলিফার কাছে উচ্চ মর্যাদা লাভ করেন, উচ্চ পদ-পদবি ও বেতন-ভাতা পান। (১৯০)

কাজি সায়িদ আল-আন্দালুসির উপর্যুক্ত বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, খলিফা আল-মামুন বিভিন্ন শাখার জ্ঞানের অনুবাদের জন্য বিশেষ একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সেই একাডেমির জন্য বিশ্বের সব অঞ্চল থেকে বড় বড় অনুবাদকদের এখানে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। গ্রিক বংশোদ্ভূত মনীষী আবু ইয়াহইয়া ইবনে আল-বিতরিক এখানে যোগ দিয়েছিলেন, আরও যোগ দিয়েছিলেন নাসতুরিয়ান খ্রিষ্টান বংশোদ্ভূত হুনাইন ইবনে ইসহাক। অনুবাদকদের মধ্যে আরও ছিলেন বিখ্যাত মনীষী ইউহান্না ইবনে মাসাওয়াইহ। (১৯১)

খলিফা আল-মামুনের শাসনামল শেষ হতে না হতে দেখা গেল যে, ইউনানি (গ্রিক), পারসিক ও অন্যান্য দেশের অধিকাংশ প্রাচীন গ্রন্থ যথা, গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র, রসায়ন ও প্রকৌশলবিদ্যা আরবিতে অনূদিত হয়ে নতুনরূপে বাইতুল হিকমার গ্রন্থাগারে উপস্থিত হলো। এ প্রসঙ্গে স্টোরি অফ সিভিলাইজেশন গ্রন্থের প্রণেতা উইল ডুরান্ট বলেছেন, মুসলিমরা পূর্ববর্তীদের থেকে জ্ঞানের যে উত্তরাধিকার লাভ করেছেন তার অধিকাংশ করেছেন ইউনান (গ্রিকদের) থেকে। ইউনানের পরে দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে ভারত। (১৯২)

### সংকলন ও গবেষণাকেন্দ্র
বাইতুল হিকমা গ্রন্থাগারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিল সংকলন ও গবেষণাকেন্দ্র। রচয়িতারা এই গ্রন্থাগারের জন্য বিশেষ বিশেষ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এ সকল রচয়িতা সংকলন ও গবেষণাকেন্দ্রের অভ্যন্তরে বসেই তাদের কাজ আঞ্জাম দিতেন। কেউ কেউ গ্রন্থাগারের বাইরেও কাজ করতেন। তারপর তাদের রচিত বা সংকলিত গ্রন্থ এখানে পেশ করতেন। খলিফার পক্ষ থেকে প্রত্যেক লেখক ও রচয়িতাকে উদার হস্তে বড় ধরনের সম্মানী দেওয়া হতো। (১৯৩) বাইতুল হিকমার অনুলিপিকারদের মূলত বিশেষ কিছু মানদণ্ডের ভিত্তিতে বাছাই করা হতো। যাতে অনুলিপিকারদের পক্ষ থেকে মূল রচনায় কিছু মিশে না যায় সেজন্য সতর্কতাবশতই এই ব্যবস্থা চালু ছিল। এই কারণে আমরা দেখি যে, হিজরি তৃতীয় শতকের বিখ্যাত মনীষী আল্লান আশ-শাওবি খলিফা হারুনুর রশিদ ও খলিফা আল-মামুনের যুগে বাইতুল হিকমায় অনুলিপিকারের কাজ করতেন। (১৯৪)

### জ্যোতির্বিজ্ঞান-বিষয়ক মানমন্দির
খলিফা আল-মামুন বাগদাদের কাছাকাছি আশ-শামাসিয়্যাহ মহল্লায় এই মানমন্দির নির্মাণ করেন। এটি ছিল বাইতুল হিকমারই অধিভুক্ত। তার এই মানমন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল বাইতুল হিকমায় প্রায়োগিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা। ছাত্ররা যেসব থিউরি ও তাত্ত্বিক বিষয় শিখছে তা যেন এখানে প্রয়োগ করে বাস্তবিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। এই মানমন্দিরে কাজ করতেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, ভূগোলবিদেরা ও গণিতজ্ঞরা। (১৯৫) তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আল-খাওয়ারিজমি, মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা ও আল-বিরুনি। খলিফা আল-মামুন এই মানমন্দিরে বিজ্ঞানীদের দুটি দলের গবেষণার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর পরিধি ও ব্যাস নির্ণয় করতে সক্ষম হন। (১৯৬)

### মাদরাসা
খলিফা হারুনুর রশিদের পরে যারা খলিফা হয়েছেন তারা তাদের যুগের খ্যাতিমান ও প্রসিদ্ধ আলেমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছেন। তারা নিজেদের সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষার জন্য এ সকল আলেমকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তাদেরকে উদার হস্তে উপঢৌকন দিয়েছেন। তাদের অন্যতম ছিলেন আল-কিসায়ি আলি ইবনে হামযাহ (১৯৭)। তিনি খলিফা আল- মামুনের (১৯৮) কাছে যথেষ্ট সমাদর লাভ করেছিলেন। তিনি খলিফার দুই পুত্রকে ভাষা ও ব্যাকরণ শেখানোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ব্যাকরণ ও ভাষা বিষয়ে তার বেশ কিছু মূল্যবান গ্রন্থ রয়েছে। আরেকজন হলেন ইয়াকুব ইবনে আস-সিক্কিত (১৯৯)। তিনি জাফর আল-মুতাওয়াক্কিলের পুত্রের শিক্ষাগুরু ছিলেন। (২০০)

অনেক আলেমেরই জ্ঞানের পরিধি ছিল অনেক বিস্তৃত এবং জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাদের পারদর্শিতা ছিল। ফলে তাদের নাম ফকিহদের সঙ্গেও লিপিবদ্ধ হয়েছে। তাদের কেউ কেউ সব শ্রেণির জন্য নির্ধারিত ভাতা গ্রহণ করতেন। যেমন আবু ইসহাক আয-যুজাজ। তার নাম ফকিহদের সঙ্গেও ছিল, আলেমদের সঙ্গেও ছিল। উভয় শ্রেণির জন্য নির্ধারিত ভাতা তিনি গ্রহণ করতেন। ফলে প্রতি মাসে তিনি দুইশ দিনার ভাতা পেতেন। (২০১) ইবনে দুরাইদ (২০২) যখন কপর্দকশূন্য অবস্থায় বাগদাদে এসে উপস্থিত হন, খলিফা আল-মুকতাদির বিল্লাহ তার জন্য মাসিক পঞ্চাশ দিনার ভাতা নির্ধারণ করে দেন। (২০৩)

মাদরাসা নির্মাণের পর শিক্ষকমণ্ডলী নিয়োগ দেওয়া হলো। সিদ্ধান্ত হলো যে, তাদেরকে সাধারণ তহবিল থেকে মাসিক বেতন-ভাতা দেওয়া হবে, অথবা ওয়াকফকৃত সম্পত্তির প্রাপ্ত আয় থেকে তা দেওয়া হবে। অর্থাৎ, যেসব ওয়াকফকৃত সম্পত্তির আয় এসব খাতে ব্যয়ের জন্য সাধারণভাবে নির্ধারিত ছিল। শিক্ষকদের পদের ভিন্নতা এবং ওয়াকফকৃত সম্পত্তির আয়ের তারতম্যের কারণে তাদের বেতন-ভাতাও ভিন্ন ভিন্ন হতো। কিন্তু তার দ্বারা অবশ্যই সচ্ছল ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন করা যেত। (২০৪)

খলিফা হারুনুর রশিদ ও আল-মামুন উভয়ে বাইতুল হিকমায় ছাত্রদের জন্য যেমন, তেমনই শিক্ষকদের জন্য বাসভবন নির্মাণ করেছেন। (২০৫)

বাইতুল হিকমার শিক্ষাক্ষেত্রে অনুসৃত শিক্ষণব্যবস্থা দুটি পদ্ধতিতে সম্পন্ন হতো : ১. শিক্ষক বক্তৃতা দিতেন, ছাত্ররা তা শুনত এবং ২. শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা, তর্কবিতর্ক ও প্রশ্নোত্তর হতো। শিক্ষক কখনো উচ্চতর জ্ঞানবিজ্ঞান বিষয়ে বড় হলঘরে বক্তৃতা দিতেন। সহকারী তাকে সাহায্য করতেন। এসব বক্তৃতা শুনতে শত শত ছাত্র সমবেত হতো। তাদেরকে বক্তৃতার কঠিন কঠিন অংশগুলো ব্যাখ্যা করে দিতেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের প্রশ্ন করতেন। কিন্তু শাইখ বা শিক্ষকই চূড়ান্ত জবাব ও সিদ্ধান্ত দিতেন। ছাত্ররা, এক হালকা থেকে অন্য হালকায় যেত। এভাবে তারা জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অনুশীলন ও চর্চা করত। (২০৬)

বাইতুল হিকমার মাদরাসায় জ্ঞানের উল্লেখযোগ্য সব শাখারই পাঠদান করা হতো। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, গণিত, বিভিন্ন ভাষা, যেমন আরবি ভাষার পাশাপাশি গ্রিক, ফারসি, ভারতীয় ও অন্যান্য ভাষা।

বাইতুল হিকমা থেকে যারা কোনো বিষয়ের বা শাস্ত্রের শিক্ষা সমাপ্ত করতেন শিক্ষক তাদেরকে ইজাযত বা অনুমতি দিতেন। অনুমতিপত্রে তিনি বলতেন যে, এই শিক্ষার্থী জ্ঞানের সংশ্লিষ্ট শাখায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছে। যারা মুমতায হতেন বা প্রথম বিভাগে পাশ করতেন তাদের সনদপত্রে উল্লেখ থাকত যে, এই সনদধারীকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হলো। কেবল শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের অনুমোদন দিতে পারতেন। শিক্ষক ছাড়া অন্য কারও এই অধিকার ছিল না। অনুমোদনদানের পদ্ধতি এরূপ : শিক্ষক শিক্ষা সমাপনকারী শিক্ষার্থীর জন্য একটি অনুমোদনপত্র বা সনদপত্র লিখতেন, তাতে শিক্ষার্থীর নাম, তার শাইখের নাম, তার ফিকহি মাযহাব ও অনুমোদনদানের তারিখ উল্লেখ করতেন। (২০৭)

### বাইতুল হিকমার পরিচালনাপর্ষদ বা প্রশাসন
বাগদাদের বাইতুল হিকমার প্রশাসনে কয়েকজন আলেম পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিচালকের পদবি-নাম ছিল 'সাহিব'। তাই বাইতুল হিকমার পরিচালককে বলা হতো 'সাহিবু বাইতিল হিকমা'। বাইতুল হিকমার প্রথম পরিচালক ছিলেন সাহল ইবনে হারুন আল- ফারিসি (মৃ. ২১৫ হি./৮৩০ খ্রি.)। বাইতুল হিকমার গ্রন্থভান্ডার তত্ত্বাবধানের জন্য খলিফা হারুনুর রশিদ তাকে নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি যত পারসিক তত্ত্বজ্ঞান পেয়েছিলেন তা ফারসি থেকে আরবিতে অনুবাদ করেছিলেন। আবদুল্লাহ আল-মামুন খলিফা হওয়ার পর সাহল ইবনে হারুনকে বাইতুল হিকমার পরিচালক নিযুক্ত করেন। (২০৮) এই পদে তাকে আরেকজন ব্যক্তি সাহায্য করতেন। তিনি হলেন সাইদ ইবনে হারুন। তিনি ইবনে হুরাইম নামে পরিচিত ছিলেন। (২০৯) বাইতুল হিকমার প্রশাসকদের মধ্যে আরেকজন ছিলেন হাসান ইবনে মাররার আদ- দাব্বি। (২১০)

এই তো গেল মোটামুটি কথা। আবুল আব্বাস আল-কালকাশান্দি বাগদাদ গ্রন্থাগারের বৈশিষ্ট্যাবলি উল্লেখ করে বলেন, ইসলামে সবচেয়ে বিশাল ও সমৃদ্ধ গ্রন্থভান্ডার তিনটি: ১. বাগদাদে আব্বাসি খলিফাদের গ্রন্থভান্ডার। এই গ্রন্থভান্ডারে এত বেশি গ্রন্থ ছিল, তা গুনে শেষ করা যায়নি। শ্রেষ্ঠত্বের বিচারেও গ্রন্থভান্ডারটি ছিল অনন্য। (২১১) দ্বিতীয় গ্রন্থভান্ডারটি ছিল কায়রোতে, কর্ডোভায় ছিল তৃতীয়টি।

ইসলামি বিশ্বে আরও অনেক গ্রন্থাগার ছিল যেগুলো সমৃদ্ধিতে ও সমৃদ্ধ ভূমিকা পালনে বাগদাদ গ্রন্থাগার থেকে কোনো অংশে কম ছিল না। তার কারণ এই যে, মুসলিম খলিফারা ও গভর্নররা গ্রন্থ সংগ্রহে ও সংরক্ষণে প্রতিযোগিতা করতেন। এমনকি আন্দালুসের খলিফা আল-হাকাম ইবনে আবদুর রহমান আন-নাসির প্রাচ্যের সব দেশে লোক পাঠিয়ে গ্রন্থ সংগ্রহ করতেন। তারা প্রথম প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে গ্রন্থাবলি ক্রয় করে নিতেন। (২১২)

অন্যান্য অসংখ্য ইসলামি গ্রন্থাগারের সঙ্গে বাগদাদ গ্রন্থাগার শুরুর যুগের মুসলিমদের সব ক্ষেত্রে জ্ঞানগত জাগরণ সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। অন্যান্য জাতির সন্তানদের মধ্যে যারা এ সকল মুসলিমের শিষ্যত্ব করেছেন তারাও এতে আলোকিত হয়েছেন। জ্ঞানের এই জাগরণ ছিল অভূতপূর্ব। আধুনিক যুগের আগে ইতিহাস কখনো এমন জাগরণ দেখেনি। গোটা মানবসভ্যতার ওপর এই জ্ঞান-জাগরণের বিপুল প্রভাব পড়েছিল। অথচ সেই সময়ে ইউরোপ ছিল চরম গ্রাম্য ও পশ্চাৎপদ অবস্থায়। (২১৩)

এখানে আমাদের অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে যে, বাগদাদ গ্রন্থাগার বহু জ্ঞানী-বিজ্ঞানীর উৎকর্ষ ও পরিপক্বতালাভে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এসব জ্ঞানী-বিজ্ঞানী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের মধ্যে আল-খাওয়ারিজমির নাম উল্লেখ করতে পারি। তিনি ছিলেন গণিতের আলজেবরা শাখার উদ্ভাবক। ইবনে নাদিম আল-খাওয়ারিজমির এই উদ্ভাবন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার বিস্তৃত অবদান সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেছেন, আল-খাওয়ারিজমি খলিফা আল-মামুনের গ্রন্থাগারে নিরবচ্ছিন্ন সাধনায় মগ্ন ছিলেন। তিনি ছিলেন অন্যতম জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তখনকার মানুষ নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের যন্ত্রপাতি (Astronomical monitoring machines) আবিষ্কারের আগে ও পরে তার প্রদত্ত প্রথম ও দ্বিতীয় তারকা-সারণির (২১৪) ওপর নির্ভর করেছেন। এ দুটি 'যিজুস সিন্দহিন্দ' (السندهند) নামে পরিচিত। (২১৫)

বাইতুল হিকমা বা বাগদাদ গ্রন্থাগারে অবস্থান করে গবেষণা করেছেন এমন কয়েকজন হলেন আল-রাযি, ইবনে সিনা, আল-বিরুনি, আল-বাত্তানি (২১৬), ইবনে নাফিস, আল-ইদরিস (২১৭)। এমন আরও শত শত জ্ঞানী-বিজ্ঞানী রয়েছেন ইসলামি চিন্তাধারা যাদেরকে পরিপক্বতা দিয়েছে। আর এই চিন্তার ভিত গড়ে দিয়েছে বাগদাদ গ্রন্থাগার ও অন্যান্য ইসলামি গ্রন্থাগার।

কিন্তু যে কারণে চিত্ত ব্যথিত হয় এবং কপাল ঘেমে ওঠে তা এই যে, সভ্যতার এই নিদর্শন ও মিনার তাতারদের একের পর এক আক্রমণের ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। বর্বরতা ও নৃশংসতাই ছিল তাদের চালিকাশক্তি। তাতাররা মূল্যবান গ্রন্থাবলি-লাখ লাখ মূল্যবান গ্রন্থ বহন করে নিয়ে গিয়েছিল এবং অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে সেসব গ্রন্থ দজলা নদীতে নিক্ষেপ করেছিল! কোনো সন্দেহ নেই যে, তারা চরম নির্বুদ্ধিতা ও আহাম্মকির পরিচয় দিয়েছিল।

ধারণা করা গিয়েছিল যে, তাতাররা এসব মূল্যবান গ্রন্থ মোঙ্গল সাম্রাজ্যের রাজধানী কারাকোরামে নিয়ে যাবে এবং তারা যেহেতু সভ্যতার শৈশবকালে রয়েছে তাই এসব গ্রন্থ ও মূল্যবান জ্ঞানরাশির দ্বারা উপকৃত হবে। কিন্তু তাতাররা একটি বর্বর-অসভ্য জাতি... তারা কিছু পড়েনি এবং শিখতেও চায়নি কিছু... যেন কেবল কামচরিতার্থ, সুখভোগ ও বিলাস ব্যসনের জন্যই বেঁচে ছিল। তারা মুসলিমদের কয়েক শতাব্দীর প্রচেষ্টা ও সাধনার ফসল দজলা নদীতে নিক্ষেপ করে। গ্রন্থাবলির কালিতে দজলা নদীর পানি কালো বর্ণ ধারণ করে। এমনকি এ কথাও প্রচলিত ছিল যে, তাতার ঘোড়সওয়ার গ্রন্থাবলির স্তূপের ওপর দিয়ে নদীর এ তীর থেকে ও-তীরে যেতে পারত। এটা ছিল গোটা মানবতার বিরুদ্ধেই বড় অপরাধ।(২১৮)

বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, এসব তাতার ও অন্য আক্রমণকারীদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে যে মুষ্টিমেয় গ্রন্থ ও রচনাবলি বেঁচে গিয়েছিল তা ইউরোপের আধুনিক রেনেসাঁস ও জ্ঞানের জাগরণের কার্যকারণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পাশ্চাত্যের বহু ন্যায়পরায়ণ বুদ্ধিজীবী এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

এভাবে বাগদাদের বাইতুল হিকমা মানবসভ্যতায় মহৎ অবদান রেখেছে এবং সভ্যতার অসংখ্য জ্ঞানকেন্দ্রের মধ্যে এটি তার যথাযথ ভূমিকা পালন করেছে।

টিকাঃ
১৮১. খিদির আহমাদ আতাউল্লাহ, বাইতুল হিকমা ফি আসর আল-আব্বাসিন, পৃ. ২৯।
১৮২. সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৪, পৃ. ৩৩৬।
১৮৩. ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩০৪; ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা فی তাবাকাতিল আতিব্বা, পৃ. ১৭২।
১৮৪. ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, খ. ২, পৃ. ১৩৩।
১৮৫. ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, পৃ. ১৭২।
১৮৬. ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩০৪ ও পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ।
১৮৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৩।
১৮৮. প্রাগুক্ত, ৩৩৯ ও তার পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ।
১৮৯. Aelius Galenus or Claudius Galenus.
১৯০. কাজি সাইদ আল-আন্দালুসি, তাবাকাতুল উমাম, পৃ. ৪৯।
১৯১. মানসুর সারহান, আল-মাকতাবাত ফিল-উসুর আল-ইসলামিয়্যা, পৃ. ৫৬।
১৯২. উইল ডুরান্ট, স্টোরি অফ সিভিলাইজেশন, খ. ১৪, পৃ. ৪০।
১৯৩. সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৩, পৃ. ১৩১।
১৯৪. সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৯, পৃ. ৩৬৭।
১৯৫. ইবনুল আবারি, মুখতাসারু তারিখিদ-দুওয়াল, পৃ. ৭৫।
১৯৬. কর্নেলিয়াস ভ্যান অ্যালেন ড্যান ডাইক (Cornelius Van Alen Van Dyck), ইকতিফাউল কানুয়ি বিমা হুয়া মাতবুউন, পৃ. ২৩৫। গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন ও টীকা সংযুক্ত করেছেন সাইয়িদ মুহাম্মাদ আলি বিবলাবি।
১৯৭. আল-কিসায়ি: আবুল হাসান আলি ইবনে হামযাহ ইবনে আবদুল্লাহ আল-কুফি ছিলেন ভাষা ও ব্যাকরণের ইমাম। প্রখ্যাত সাত কারির অন্যতম। তিনি হারুনুর রশিদের পুত্র আল-আমিনের শিক্ষাগুরু ছিলেন। কুফায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ইরানের রাইয়ে ১৮৯ হিজরিতে/৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে। দেখুন, হামাবি, মুজামুল উদাবা, খ. ৪, পৃ. ১৭৩৭-১৭৫২; ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ২, পৃ. ২৯৫-২৯৬।
১৯৮. সঠিক তথ্য: খলিফা হারুনুর রশিদের কাছে।
১৯৯. ইবনে আস-সিক্কিত: আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক (১৮৬-২৪৪ হি./৮০২-৮৫৮ খ্রি.)। ভাষা ও সাহিত্যের ইমাম। আব্বাসি খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে। খলিফা তার সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষার দায়িত্ব দেন তাকে। শুধু তাই নয়, তাকে তার অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবেও গ্রহণ করেন। পরে অবশ্য তাকে হত্যা করেন। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৬, পৃ. ৩৯৫-৪০১।
২০০. সুয়ুতি, বুগয়াতুল উআত ফি তাবাকাতিল লুগাবিয়্যিন ওয়ান-নুহাত, খ. ৩, পৃ. ৩৪৯।
২০১. যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৪, পৃ. ৩৬০।
২০২. ইবনে দুরাইদ আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ইবনে দুরাইদ আল-বসরি (২২৩-৩২১ হি./৮৩৮-৯৩৩ খ্রি.)। ভাষা ও সাহিত্যের যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম। বসরায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন বাগদাদে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: الأشربة، الأمالي، الجمهرة في علم اللغة، السرج | واللجام كتاب الخيل الكبير، كتاب الخيل الصغير، كتاب السلاح، كتاب الأنواء মুজামুল উদাবা, খ. ৬, পৃ. ২৪৮৯-২৪৯৬; ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৪, পৃ. ৩২৩-৩২৮।
২০৩. যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ৮০।
২০৪. আবদুল কাদির আন-নুয়াইমি, আদ-দারিস ফি তারিখিল মাদারিস, খ. ১, পৃ. ৪১৮; খ. ২, পৃ. ১৮, ৫২, ৩০৬।
২০৫. উইল ডুরান্ট, স্টোরি অব সিভিলাইজেশন, খ. ৪, পৃ. ৩১৯; আহমাদ শালবি, তারিখুত তারবিয়াতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ১৮৪; খিদির আহমাদ আতাউল্লাহ, বাইতুল হিকমা ফি আসর আল-আব্বাসিন, পৃ. ২৪৬।
২০৬. খিদির আহমাদ আতাউল্লাহ, বাইতুল হিকমা ফি আসর আল-আব্বাসিন, পৃ. ১৪০।
২০৭. উইল ডুরান্ট, স্টোরি অব সিভিলাইজেশন, খ. ১৪, পৃ. ৩৬।
২০৮. যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ১৪৪।
২০৯. সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৫, পৃ. ৮৬।
২১০. মুহাম্মাদ ইবনে শাকির কুতুবি, ফাওয়াতুল ওয়াফায়াত, খ. ১, পৃ. ১২২।
২১১. কালকাশান্দি, সুবহুল আ'শা ফি কিতাবাতিল ইনশা, খ. ১, পৃ. ৫৩৭।
২১২. ইবনুল আব্বার, আত-তাকমিলাতু লি-কিতাবিস সিলাতি, খ. ১, পৃ. ২২৬।
২১৩. কাদরি তাওকান, তুরাসুল আরাবিল ইলমি ফির-রিয়াদিয়্যাতি ওয়াল-ফালাক, পৃ. ২৫০।
২১৪. আরবিতে একে الزيج الأول والزيج الثاني للخوارزي বলা হয়। - অনুবাদক
২১৫. ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩৩৩।
২১৬. বাত্তানি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে জাবির ইবনে সিনান আল-হাররানি (জন্ম ৮৫৪ খ্রি. এবং মৃত্যু ৩১৭ হি./৯২৯ খ্রি.)। জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও যন্ত্রপ্রকৌশলী। বাত্তানি মেসোপটেমিয়ার উচ্চভূমির অন্তর্গত হাররান নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। জায়গাটি এখন তুরস্কে অবস্থিত। তার বাবা ছিলেন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির বিখ্যাত নির্মাতা। তার উপাধি 'আস-সাবি' হওয়ায় অনেকে ধারণা করেন যে তার পূর্বপুরুষ সাবিয়িন গোত্রভুক্ত হতে পারে, তবে তার পুরো নাম পড়ে বোঝা যায় তিনি ছিলেন একজন মুসলিম। কতিপয় পশ্চিমা ঐতিহাসিকের মতে তার পূর্বপুরুষ ছিল আরব রাজাদের মতো উচ্চবংশের। তিনি উত্তর সিরিয়ার অন্তর্গত রাক্কা শহরে বসবাস করতেন। জ্যোতির্বিদ্যায় বাত্তানির সর্বাধিক পরিচিত অর্জন হলো সৌরবর্ষ নির্ণয়। বাত্তানিই প্রথম নির্ভুল পরিমাপ করে দেখিয়েছিলেন যে, এক সৌরবৎসরে ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ড হয়, যার সাথে আধুনিক পরিমাপের পার্থক্য মাত্র ২ মিনিট ২২ সেকেন্ড কম। জ্যোতির্বিজ্ঞানে টলেমির আগের কিছু বিজ্ঞানীর ভুলও তিনি সংশোধন করে দেন। সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কিত টলেমি যে মতবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, বাত্তানি তা ভুল প্রমাণ করে নতুন প্রামাণিক তথ্য প্রদান করেন। অনেক শতাব্দী পরে কোপার্নিকাস কর্তৃক আবিষ্কৃত বিভিন্ন পরিমাপের চেয়ে বাত্তানির পরিমাপ অনেক বেশি নিখুঁত ছিল। তিনি ত্রিকোণমিতি নিয়ে বিস্তর কাজ করেন এবং সাইন, কোসাইন, ট্যানজেন্ট, কোট্যানজেন্ট ইত্যাদি ধারণা নিয়ে কাজ করেন। বাত্তানি সামাররায় মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ২, পৃ. ২০৯; জামালুদ্দিন আল-কিফতি, ইখবারুল উলামা বি-আখবারিল হুকামা, পৃ. ১৮৪-১৮৫।-অনুবাদক
২১৭. আল-ইদরিস: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ইদরিস (৪৯৩-৫৬০ হি./১১০০-১১৬৫ খ্রি.)। ভূগোলবিদ। তিনি সিসিলিতে গমন করেন এবং সিসিলির নরমান সম্রাট দ্বিতীয় রজারের (Roger II of Sicily) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সম্রাটের তত্ত্বাবধানে نزهة المشتاق في اختراق الآفاق গ্রন্থটি রচনা করেন। গ্রন্থটি Tabula Rogeriana (The Map of Roger) নামেও পরিচিত। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১, পৃ. ১৩৮।
২১৮. রাগিব সারজানি, কিসসাতুত তাতার মিনাল বিদায়াতি ইলা আইনি জালুত, পৃ. ১৬১-১৬২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00