📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 মকতব

📄 মকতব


মক্তব মুসলিমদের কাছে সবচেয়ে প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কথিত আছে, আরবরা ইসলামপূর্ব কাল থেকেই মক্তবের সঙ্গে পরিচিত ছিল। তবে তা ছিল অত্যন্ত গণ্ডিবদ্ধ। হিজরি প্রথম শতকগুলোতে মক্তবের অবস্থান ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। কারণ মক্তবেই উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি সম্পন্ন হতো। মক্তব ছিল আমাদের আধুনিক যুগের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো এবং সংখ্যায় ছিল প্রচুর। ইবনে হাওকাল(৩) জরিপ করেছেন যে, সিসিলির একটিমাত্র শহরেই তিনশ মক্তব ছিল।(৪)

মক্তব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম শিশুদেরকে পড়া ও লেখা শেখানো এবং তাদের কুরআন হিফয করানো। এই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশু-কিশোরদের শিক্ষাদানে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। বদর যুদ্ধের পরে তিনি মুশরিক বন্দিদের নির্দেশ দেন যে, তাদের প্রত্যেকে দশজন বালককে লেখা শেখাবে। এই বিনিময়ে তাদের মুক্ত করে দেওয়া হবে। এই সময় একদল আনসারি বালকের সঙ্গে যায়দ ইবনে সাবিতও লেখা শেখেন।(৫)

মক্তবে শিশুরা আরবি ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান শিখত। বিশেষ করে যখন তারা প্লেটে কুরআনুল কারিমের আয়াত বা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস লিখত। মহান সাহাবি আনাস ইবনে মালিক রা.-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, খুলাফায়ে রাশেদিন আবু বকর, উমর, উসমান ও আলির (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) যুগে মক্তবের শিক্ষকগণ (আদব শিক্ষাদাতারা) কেমন ছিলেন? তিনি বললেন, মক্তবের শিক্ষকের একটি পাত্র থাকত। প্রত্যেক শিশু পালাক্রমে প্রতিদিন পরিষ্কার পানি নিয়ে আসত এবং ওই পাত্রে রাখত। এই পানি দিয়ে তারা প্লেট মুছত। শিশুরা মাটিতে একটি গর্ত খুঁড়ত এবং ওই পানি গর্তে ঢাললে তা শুকিয়ে যেত। লেখার কালি কি হাত-পায়ে লেগে যেত না? জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই। লেখার কালি তারা পা দিয়ে মুছত না, বরং রুমাল দিয়ে বা এরকম কিছু দিয়ে মুছত। (৬)

সেই যুগের শিশুদের অন্তরে আরবি হরফের প্রতি যে কী সম্মান ছিল তা উপর্যুক্ত উজ্জ্বল চিত্র থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যখন তারা ইলাহি ওহি (কুরআনের আয়াত) লিখত। তারা তা মোছার জন্য পবিত্র পানি আনত, মাটিতে গর্ত খনন করত এবং শুকিয়ে যাওয়ার জন্য তাতে ওই পানি ঢেলে দিত। (৭)

মক্তবের বহু শিক্ষক প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন এবং তাদের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আস-সাকাফি (৮) একটি মক্তবে শিক্ষক ছিলেন। শিশুদের পড়াতেন এবং বিনিময়ে তারা তাকে রুটি দিত। (৯) দাহহাক ইবনে মুযাহিমের ব্যাপারে এটা বিদিত যে, তিনি কুফার একটি মক্তবে শিশুদের আদব শিক্ষাদাতা ছিলেন। তার কাছে ছিল তিন হাজার শিশু। (১০)

ইয়াকুত হামাবি(১১) 'মুজামুল উদাবা' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, আবুল কাসিম বালখির মক্তবে তিন হাজার ছাত্র ছিল। তার মক্তবটি ছিল বিশাল, তিন হাজার ছাত্রের জায়গা সংকুলান হতো। এ কারণে মক্তবের এ প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ঘোরা এবং সব ছাত্রের তদারকির জন্য বালখির গাধায় চড়ার প্রয়োজন পড়ত (১২)।

বড় বড় ফকিহ ও আলেমগণের অনেকেই শৈশবে মক্তবে পড়াশোনা করেছেন। ইমাম শাফিয়ি রহ. তার শৈশবে মক্তবে পড়াশোনার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি মায়ের কোলে থাকতেই এতিম হয়েছিলাম। তিনি আমাকে মক্তবে পাঠালেন। মক্তবে কুরআন খতমের (হিফযের) পর মসজিদে দরসে বসতে শুরু করলাম। আমি আলেমদের সঙ্গে ওঠাবসা করতাম। (১৩)

শাম বিজিত হওয়ার পর সেখানে দ্রুত মক্তবের বিস্তার ঘটে। বিজয়ীদের সন্তানেরা সেখানে পড়াশোনা করে। আদহাম ইবনে মুহরিয বাহিলি হিমসি(১৪) বলেন, আমি হিমসে জন্মগ্রহণকারী মুসলিমদের প্রথম সন্তান। আমিই প্রথম সন্তান যে কুরআনের লিখিত কপি বহন করে নিয়ে যেত। আমি বিভিন্ন মক্তবে গিয়েছি এবং কুরআন শিখেছি। (১৫) তখন মক্তবে আরও যারা পড়তেন তাদের মধ্যে ছিলেন বসরার বিখ্যাত কাজি ইয়াস ইবনে মুআবিয়া আল-মুযানির শিশুপুত্র। (১৬)

পিতারা সবসময় চাইতেন যে তাদের সন্তানেরা ভালো শিক্ষকের কাছে যাক। শিশুদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে যাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ রকম শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন মুসলিম ইবনুল হুসাইন ইবনুল হাসান আবুল গানাইম (মৃ. ৫৪৪ হি.)। তার সম্পর্কে ইবনে আসাকির বলেছেন, তিনি শিশুদের শিষ্টাচার শিক্ষাদানে ব্রতী হন। এই ক্ষেত্রে তার উত্তম প্রভাব লক্ষ করা যায়। ভালো শিক্ষকতা ও গণিতে পারদর্শিতার কারণে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তার ছাত্রসংখ্যা বেড়ে যায়। (১৭)

আমির ও খলিফাগণ শিক্ষকদের ও শিষ্টাচার শিক্ষাদানকারীদের সম্মান করতেন। তাদের দেখে সম্মানার্থে বাহন থেকে নেমে পড়তেন। এই কারণে শিক্ষকেরা সর্বস্তরের মানুষ থেকে প্রচুর সম্মান পেতেন। একবার খলিফা হারুনুর রশিদ ইমাম মালিক রহ.-কে ডেকে লোক পাঠালেন। যাতে খলিফার দুই ছেলে আমিন ও মামুন তার থেকে হাদিস শুনতে পারে। ইমাম মালিক অস্বীকৃতি জানালেন। তিনি বললেন, ইলমের কাছে সবাই আসে, ইলম কারও কাছে যায় না। খলিফা হারুন দ্বিতীয়বার লোক পাঠালেন। বললেন, আমি আপনার কাছে আমার দুই ছেলেকে পাঠিয়ে দেবো, তারা আপনার ছাত্রদের সঙ্গে হাদিস শুনবে। ইমাম মালিক বললেন, তাহলে শর্ত এই যে, তারা মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনে এসে বসবে না। বরং মজলিসে যেখানে জায়গা পাবে সেখানেই বসবে। খলিফা-পুত্রদ্বয় বর্ণিত শর্ত মেনে হাদিসের দরসে উপস্থিত হতো। (১৮)

মক্তবের শিক্ষাবিস্তারে প্রাথমিক যুগ থেকেই নারীরা অংশগ্রহণ করেছেন। তাবিয়ি আবদু রাব্বিহি ইবনে সুলাইমান বলেছেন, উম্মুদ দারদা রা. যে প্লেটে আমাকে পড়ালেখা শেখাতেন তাতে লিখে দিলেন, তোমরা শৈশবে জ্ঞান শেখো এবং বড় হয়ে সেই জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করো। তিনি আরও বলেছেন, প্রত্যেকে ভালো বা মন্দ যে বীজ বপন করে তারই ফসল সংগ্রহ করে। (১৯)

ইসলামি বিশ্বে মক্তবে শিক্ষার বিষয় ও পাঠ্যসূচি একইরকম ছিল না। বিভিন্ন স্থানে তা ভিন্ন ভিন্ন ছিল। যদিও সব জায়গায় পাঠ্যসূচিতে কুরআনুল কারিম, পাঠ ও লেখা, ইতিহাস ও কাহিনি, প্রাথমিক দ্বীনি হুকুম-আহকাম, কবিতা, প্রাথমিক গণিত, আরবি ভাষার ব্যাকরণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। মক্তবে শিশুদের বড়জোর পাঁচ-ছয় বছর পড়ালেখা করতে হতো। তারা পাঁচ বা ছয় বছর বয়সে মক্তবে ভর্তি হতো। শিশুরা এই সময়ের মধ্যে পুরো কুরআন হিফয করত। কেউ কেউ অধিকাংশ সুরা বা কিছু সুরা হিফয করত। মক্তবে শিশুদের শিক্ষাবর্ষ শেষ হলে এবং কুরআন হিফয সমাপ্ত হলে শিক্ষকেরা তাদের পরীক্ষা নিতেন এবং যাচাই-বাছাই করতেন। পরীক্ষা শেষ হলে সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। (২০)

শিশুদের শিক্ষাদান ও শিষ্টাচার শেখানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের বড় বড় ফকিহ ও লেখক শিশুদের শিক্ষাদানের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা শিক্ষাদানের সেসব নীতি প্রতিষ্ঠার কথাও বলেছেন যেগুলো শিক্ষকদের ও পিতাদের তাদের সন্তানদের শিক্ষাদান করতে সহায়ক হবে। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামিদ গাযালি রহ.(২১) তার অতি মূল্যবান গ্রন্থ ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন’-এ بيان الطريق في رياضة الصبيان في أول نشوئهم ووجه تأديبهم وتحسين أخلاقهم (প্রাথমিক বেড়ে-ওঠার সময়ে শিশুদের প্রশিক্ষণ-পদ্ধতি এবং তাদের শিষ্টাচার ও চরিত্র গঠনের উপায়) শীর্ষক একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রচনা করেছেন। তাতে তিনি বলেছেন, জেনে রাখো, শিশুদের প্রশিক্ষণ-পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়।
শিশুরা তাদের মা-বাবার কাছে আমানত। তাদের অন্তর স্বচ্ছ নির্মল মুক্তোর মতো, তাতে কোনো দাগ নেই, কোনো চিহ্ন নেই। তাদের অন্তরে যা অঙ্কন করা হবে তারই জন্য প্রস্তুত। তাদের অন্তরকে যেদিকে ঝোঁকানো হবে সেদিকেই ঝুঁকবে। তাদের যদি যা-কিছু ভালো তার ওপর অভ্যস্ত করে তোলা হয় এবং ভালো শিক্ষা দেওয়া হয়, তারা তারই ওপর বেড়ে উঠবে। এতে দুনিয়াতেও সৌভাগ্যবান হবে, আখিরাতেও হবে। তাদের সওয়াবের অংশীদার যেমন তাদের মা-বাবারা হবে, তেমনই তাদের প্রত্যেক শিক্ষক ও শিষ্টাচার শিক্ষাদানকারীও অংশীদার হবে। কিন্তু তাদের মন্দের ওপর অভ্যস্ত করে তোলা হলে এবং জন্তুজানোয়ারের মতো অবহেলা দেখানো হলে তারা দুর্ভাগ্যের শিকার হবে এবং ধ্বংস হবে। এই পাপ তাদের অভিভাবক ও দায়িত্বশীল সবাইকে বহন করতে হবে। (২২)

মক্তবের এ সকল শিক্ষক ও শিষ্টাচার শিক্ষাদানকারীদের মধ্যে কেউ কেউ অত্যন্ত দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। তার ফলও তারা পেয়েছিলেন। রাষ্ট্রের বড় বড় পদে আসীন হয়েছিলেন, এমনকি মন্ত্রীও হয়েছিলেন। ইসমাইল ইবনে আবদুল হামিদ শিশুদের পড়াতেন। পরে তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটল এবং তিনি মারওয়ান ইবনে মুহাম্মাদের মন্ত্রী মনোনীত হলেন। (২৩) হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আস-সাকাফিও মক্তবের শিক্ষক ছিলেন। পরে তিনি আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের প্রভাবশালী মন্ত্রী হন।

মক্তবের অধিকাংশ শিক্ষক শিশুদের শিক্ষাদানের অনুরূপ পারিশ্রমিক গ্রহণ করেছেন। কিন্তু শাইখ আবু আবদুল্লাহ আত-তাওয়াদি (মৃ. ৫৮০ হি.) যা করতেন তা অত্যন্ত বিস্ময়কর। তিনি মরক্কোর ফাস শহরের অধিবাসী ছিলেন। তিনি শিশুদের শিক্ষাদান করতেন। ধনী শিশুদের থেকে পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন এবং দরিদ্র শিশুদের তা দিয়ে দিতেন! (২৪)

মক্তবের কর্মঘণ্টা বা পাঠদানের সময়সীমা প্রাকৃতিক উপায়ে নির্ণীত হতো। সূর্যোদয়ের পর থেকে পাঠদান শুরু হতো এবং আসরের আজান পর্যন্ত চলত। সূর্যোদয়ের সময়ের কমবেশির ফলে পাঠদানের সময়েরও কমবেশি হতো। (২৫)

শিশুরা মসজিদেও শিক্ষাগ্রহণ করত। তবে সেটা সুশৃঙ্খলভাবে হয়নি। শিশুদের কারণে মসজিদে হইচই-চিৎকার বেড়ে গিয়েছিল। ফলে ৪৮৩ হিজরিতে শিশুদের শিক্ষকদের ব্যাপারে এই ফতোয়া চাওয়া হলো যে তারা যেন মসজিদে শিশুদের শিক্ষাদান থেকে বিরত থাকেন। এতে মসজিদ সুরক্ষিত থাকবে। ফলে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ফতোয়া জারি করা হলো। (২৬)

মক্তবে পাঠদানের মাঝে মাঝে বিশ্রাম এবং ছুটির ব্যবস্থাও ছিল। পড়াশোনায় ক্লান্তি এসে গেলে শিশুদের বিশ্রামদানের ব্যাপারে মুসলিমরা গুরুত্ব দিতেন। এমনটাই পরিলক্ষিত হয়। ইবনুল হাজ আল-আবদারি (মৃ. ৭০৭) মরক্কোর ফাস শহরের অধিবাসী ও মালেকি মাযহাবপন্থী আলেম ছিলেন। তিনি বলেছেন, শিশুদের বিশ্রামদান মুস্তাহাব। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, «رَوْحُوا القُلُوبَ سَاعَةً بَعْدَ سَاعَةٍ» তোমরা আত্মাকে কিছুক্ষণ পরপর বিশ্রাম দাও। (২৭)

তাই মক্তবের শিশুরা প্রতি জুমআয় (প্রতি সপ্তাহে) দুই দিন বিশ্রাম পেত, যাতে তারা সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে উদ্যমের সঙ্গে পড়াশোনা করতে পারে। (২৮) তা ছাড়া দুই ঈদের দিনগুলোতে ছুটি থাকত, কেউ অসুস্থ হলেও ছুটি পেত। শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন ছুটি ছিল। বৃষ্টিবাদল ও ঝড়তুফানের সময়ও ছুটি হতো।

মক্তবের শিক্ষকের হঠাৎ কোনো ব্যস্ততা চলে এলে বা ছুটির প্রয়োজন হলে তাকে তার সমকক্ষ একজন ব্যক্তিকে রেখে যেতে হতো, যিনি তার অনুপস্থিতিতে শিশুদের পাঠদান করতেন। অনুপস্থিতি দীর্ঘ সময়ের জন্য না হলে এটা করা যেত...। শিক্ষক কোনো সফরে গেলে তার স্থলাভিষিক্ত একজনকে রেখে যেতে হতো, যিনি তার পরিবর্তে সব দায়িত্ব পালন করতেন। অর্থাৎ, কাছাকাছি জায়গায় একদিন বা দুইদিন বা এরকম কয়েকদিনের আবশ্যক সফর হলে এটা করা যেত। আল্লাহ চাহে তো শিক্ষকের এই অনুপস্থিতি মক্তবের শিশুদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলত না। কিন্তু দূরবর্তী স্থানের সফর হলে অথবা নানা কারণে সফর বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা করলে শিক্ষক তা করতে পারতেন না। (২৯)

দামেশকে শিশুশিক্ষা কতটা পদ্ধতিগত উৎকর্ষ লাভ করেছিল তার বর্ণনা দিয়েছেন ইবনে জুবায়ের (৩০)। তিনি তার ভ্রমণকাহিনিতে তা বিস্তারিত বলেছেন, এই সকল প্রাচ্যীয় দেশে শিশুদের কুরআনশিক্ষা পুরোটাই তালকিন(৩১) ভিত্তিক। কবিতা ও অন্যান্য বিষয় লিখিয়ে তারা হস্তাক্ষর শিখিয়ে থাকেন। কিন্তু কুরআনের আয়াত লিখিয়ে শিশুদের হস্তাক্ষর শেখান না, কারণ তা রেখে দিতে হয় অথবা মুছে ফেলতে হয়। অধিকাংশ এলাকায় তালকিনকারী এবং হস্তাক্ষর শিক্ষাদানকারী আলাদাভাবে শিশুদের শিখিয়ে থাকেন। ফলে তালকিন (কুরআন শেখানো) ও হস্তাক্ষর শেখানোর আলাদা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এই ক্ষেত্রে তাদের চমৎকার পদ্ধতি রয়েছে। এ কারণে শিশুরা সুন্দর হস্তাক্ষর শিখে থাকে। কারণ, যে শিক্ষক হস্তাক্ষর শিখিয়ে থাকেন তিনি আর কিছুতে ব্যস্ত হন না। হস্তাক্ষর শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেই তারা সব শ্রম ব্যয় করেন। শিশুরা পড়াশোনাতেই ব্যস্ত থাকে। এটা তাদের জন্য সহজও বটে। কারণ তারা আক্ষরিক অর্থে শিক্ষকদের অনুসরণ করে থাকে। (৩২)

সুতরাং মক্তবে শিশুশিক্ষা একটি উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। পাঠ্য বিষয়বস্তুর বিভাজন মুসলিমদের জানাই ছিল। তারা প্রতিটি বিষয়ের জন্য ওই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ শিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন। বরং প্রাচ্যবাসীরা তাদের সন্তানদের হস্তাক্ষর সুন্দর করার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। এ দিকেই ইবনে জুবায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং একে ইসলামি প্রাচ্যের শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বলে চিহ্নিত করেছেন।

ইবনে জুবায়ের শিশুশিক্ষার যে পদ্ধতি ও রীতির উল্লেখ করেছেন প্রাচ্যে শিশুশিক্ষা সেই পদ্ধতি ও রীতি অনুসরণ করেই এগিয়ে চলছিল। ইবনে জুবায়ের যে মন্তব্য করেছেন, ইবনে বতুতাও (৩৩) দেড়শ বছরের বেশি পরে তার বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনিতে প্রাচ্যের শিক্ষা সম্পর্কে একই মন্তব্য করেন। তিনি দামেশকের মসজিদে উমাইয়ার শিক্ষকদের সম্পর্কে বলেছেন, এই মসজিদে একদল শিক্ষক রয়েছেন যারা আল্লাহর কিতাব শিক্ষা দেন। তাদের এক-একজন মসজিদের এক-একটি খুঁটির সঙ্গে হেলান দিয়ে বসেন এবং শিশুদের কুরআন তালকিন করান, তাদের থেকে কুরআন পাঠ শোনেন। শিশুরা আল্লাহর কিতাবের সম্মানার্থে তাদের প্লেটে কুরআনের আয়াত লেখে না। শিক্ষক কুরআন পাঠ করেন, শিশুরা তা শুনে শুনে পড়ে। (৩৪) হস্তাক্ষরের শিক্ষক ও কুরআনের শিক্ষক ভিন্ন। যিনি হস্তাক্ষর শেখান তিনি কুরআন শেখান না। কবিতা ও অন্যান্য বাক্য দিয়ে তাদের হস্তাক্ষর শেখান। শিশুরা কুরআন শেখার পর হস্তাক্ষর শিখতে যায়। এতে তাদের হস্তাক্ষর অতি সুন্দর হয়। কারণ, যিনি হস্তাক্ষর শেখান তিনি আর কিছু শেখান না। (৩৫)

লক্ষণীয় যে, শিশুরা মসজিদে কুরআনুল কারিম শিখত। তারপর তারা হস্তাক্ষর ও লেখার দরসে যেত। হস্তাক্ষর-শিক্ষকের কাছে শুদ্ধ লেখা ও পাঠ শিখত।

প্রহার ও মারধর করে শিশুদের শিষ্টাচার শিক্ষাদানের ব্যাপারে ফকিহগণ বিশেষ নীতি ও নির্দেশনা দিয়েছেন। মুসলিমরা সূচনাকাল থেকে শিশুদের শিক্ষা ও শিষ্টাচার শেখানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ইবনে মুফলিহ আল-মাকদিসি (মৃ. ৭৬৩ হি.) 'আল-আদাবুশ শারইয়্যাহ' গ্রন্থে বলেছেন, আবু আবদুল্লাহকে (ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল) শিক্ষক কর্তৃক শিশুদের প্রহার প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি বললেন, তাদের অপরাধের মাত্রা অনুপাতে প্রহার করা যেতে পারে। শিক্ষক যতটা সম্ভব চেষ্টা করবেন প্রহার না করতে এবং যে শিশুরা ছোট ও অবুঝ তাদের প্রহার করবেন না। (৩৬)

অসংখ্য ফকিহ ও আলেম শিশুদের প্রহারের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন না করতে শিক্ষকদের সতর্ক করেছেন। শিশুদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করতে নিষেধ করেছেন। আল-আবদারি বলেছেন, এই যুগে (হিজরি অষ্টম শতক) কিছু শিক্ষক যা করছেন তা সম্পূর্ণ পরিহার করা উচিত। তারা শিশুদের প্রহার করতে বিভিন্ন জিনিস ব্যবহারে লিপ্ত হয়ে পড়েছেন। যেমন শুকনো কাঠবাদামের লাঠি, খেজুরগাছের পাতাহীন ডাল, নুওবি (৩৭) চাবুক, দুই মাথায় রশিযুক্ত মোটা লাঠি ইত্যাদি। তারা নিজেরাও নতুন জিনিস উদ্ভাবন করেছেন। আরও অনেক কিছু। অথচ যারা পবিত্র কুরআন বহন করে তাদের জন্য কিছুতেই এগুলো উপযোগী নয়। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ حَفِظَ الْقُرْآنَ فَكَأَنما أُدْرِجَتِ النُّبُوَةُ بَيْنَ كَيْفَيْهِ، غَيْرَ أَنَّهُ لَا يُوْحَى إِلَيْهِ
যে কুরআন হিফয করেছে তার দুই কাঁধের মাঝখানে যেন নবুয়ত প্রবিষ্ট করিয়ে দেওয়া হয়েছে, যদিও তার নিকট ওহি প্রেরিত হয় না। (৩৮)
শিক্ষক তাদেরকে কুরআন হিফয যেমন করাবেন, তেমনই তাদের হস্তাক্ষর ও আয়াত বের করাও শেখাবেন। এতে তাদের হিফয ও বোধগম্যতার ওপর দখল বাড়বে। গ্রন্থ পাঠ ও মাসআলা-মাসায়েল বোঝার ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত সহায়ক উপায়। (৩৯)

মক্তবের দায়দায়িত্ব কেবল শিশুদের পরিচর্যা ও শিক্ষাদানেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ভূমিকাও পালন করত। মক্তব ও সমাজের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বা প্রতিবন্ধকতার কোনো সুযোগ রাখেননি মুসলিমরা। সমাজের সঙ্গে মক্তবের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল এবং মক্তব সমাজের দৈনন্দিন জীবনে অংশগ্রহণ করত।

জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়ে মানুষের উপকার সাধনকারী কোনো বড় আলেম বা কর্মে ও চিন্তায় দেশের কল্যাণকারী কোনো রাষ্ট্রপ্রধান অথবা ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী কোনো আমির মারা গেলে মক্তবগুলো ছুটি ঘোষণা করত এবং তাদের দাফনের দিন কোনো পড়ালেখা হতো না। মক্তবগুলো এভাবে সাধারণ শোকে অংশগ্রহণ করত, সমবেদনা প্রকাশ করত এবং সৎ মানুষের কীর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করত। (৪০)

মিশরের গভর্নর আহমাদ ইবনে তুলুনের (৪১) অসুস্থতা তীব্র হয়ে উঠলে এবং জ্বালা-যন্ত্রণা বেড়ে গেলে শিক্ষকেরা শিশুদের নিয়ে মরুভূমিতে বেরিয়ে পড়েন এবং তার আরোগ্যের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করেন। (৪২)

সমাজের সাধারণ সমস্যায় এবং বিপদে-দুর্যোগে মক্তবের শিশুরাও অংশগ্রহণ করুক তা আন্তরিকভাবে চাইতেন শিক্ষকেরা। ইবনে সাহনুন(৪৩) বলেছেন, মানুষ খরায় আক্রান্ত হলে এবং ইমাম বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করলে মক্তবের শিক্ষকেরা যেসব শিশু নামায জানে তাদের নিয়ে আগ্রহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করতেন। আল্লাহর কাছে কাকুতিমিনতি করে বৃষ্টি চাইতেন। আমার কাছে এই ঘটনা বিবৃত হয়েছে যে, হযরত ইউনুস (সাল্লাল্লাহু আলা নাবিয়্যিনা ওয়া আলাইহিস সালাম)-এর কওম শান্তির মুখোমুখি হলে তারা শিশুদের নিয়ে ময়দানে বেরিয়ে পড়ে এবং তাদের নিয়ে আল্লাহর কাছে অনুনয় করে কেঁদেকেটে প্রার্থনা করে। (৪৪)

মক্তবের শিশুদের স্বাস্থ্য-সুরক্ষার ব্যাপারে ফুকাহায়ে কেরাম যে গুরুত্ব দিয়েছেন তা দৃষ্টি এড়ায় না। তারা অসুস্থ শিশুকে তার সহপাঠীদের থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। যাতে অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে না পড়ে। ইবনুল হাজ আল-আবদারি বলেছেন, মক্তবে থাকা অবস্থায় কোনো শিশু যদি চোখের যন্ত্রণা বা শারীরিক সমস্যা ও অসুস্থতার কথা জানায় এবং জানা যায় যে সে সত্যই বলছে, তাহলে শিক্ষক তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন। তাকে মক্তবে বসিয়ে রাখবেন না। (৪৫) এতে শিশুটির পরিবার তার সেবাযত্নের সুযোগ পাবে এবং চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তুলবে। তা ছাড়া সে মক্তবে থেকে গেলে শিশুদের মধ্যে রোগের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মক্তবের শিক্ষকেরা শিশুদেরকে ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে খোলা খাবার বা মিষ্টান্ন খেতে দিতেন না। কোনো ফেরিওয়ালাকে মক্তবের সামনে শিক্ষকেরা দাঁড়াতে দিতেন না এবং শিশুদের কাছে কিছু বিক্রি করতেও দিতেন না। কারণ, ফেরিওয়ালাদের থেকে কিছু কিনে খেলে শারীরিক সমস্যা হতে পারে। (৪৬) বরং তারা শিশুদের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে এতটাই যত্নশীল ছিলেন যে, প্রতি মাসে একজন ডাক্তার এসে মক্তবের শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতেন। (৪৭)

ইসলামি সভ্যতা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকেই শিশুদের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ এই সভ্যতা বড় ও ছোটর মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। বরং ছোটদের প্রতিই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এটা জানা কথা যে, আজকের শিশুরা আগামী দিনের নেতা। তাই তাদের সুন্দর ও সভাবে বেড়ে ওঠার ব্যবস্থা করেছে। অগুনতি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেছে, যা আমাদের বর্তমান যুগের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমপর্যায়ের ছিল। এসব মক্তব থেকে বড় বড় আলেম ও জ্ঞানী ব্যক্তি তৈরি হয়েছে যারা মানবসভ্যতাকে উজ্জ্বল করেছেন কেবল উপকারী জ্ঞানের দ্বারা নয়, উৎকর্ষ ও অগ্রগতির দ্বারাও।

টিকাঃ
৩. ইবনে হাওকাল: আবুল কাসিম মুহাম্মাদ ইবনে হাওকাল (মৃত্যু: ৩৫০ হিজরি)। পর্যটক, ভূগোলবিশারদ, ইতিহাসবিদ। তার উল্লেখযোগ্য কাজ হলো আবু ইসহাক আল-ইসতাখরির 'আল-মাসালিক ওয়াল-মামালিক' গ্রন্থের সম্পাদনা, পরিমার্জন ও টীকা সংযোজন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ১১১।
৪. মুস্তাফা আস-সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ১০০।
৫. সুহাইলি, আর-রওযুল উনুফ, খ. ৩, পৃ. ১৩৫।
৬. ইবনে সাহনুন, আদাবুল মুআল্লিমিন, পৃ. ৪০-৪১।
৭. আকরাম উমারি, আসরুল খিলাফাতির রাশিদাহ, পৃ. ২৮১।
৮. হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আস-সাকাফি: আবু মুহাম্মাদ আল-হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ ইবনুল হাকাম আস-সাকাফি (৪০-৯৫ হি./৬৬০-৭১৪ খ্রি.)। সেনাপতি, খতিব। খলিফা আবদুল মালিক তাকে প্রথমে মক্কা, মদিনা ও তায়েফের গভর্নর এবং পরে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি তায়েফে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন। মৃত্যুবরণ করেন ওয়াসিতে (কুফা ও বসরার মধ্যবর্তী জায়গায়)। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১১, পৃ. ২৩৬-২৪১; যিরিকলি, আল-আলাম, খ. ২, পৃ. ১৬৮।
৯. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ২, পৃ. ৩০।
১০. যাহাবি, আল-ইবার ফি খাবারি মান গাবার, খ. ১, পৃ. ৯৪।
১১. ইয়াকুত হামাবি: আবদুল্লাহ ইবনে শিহাবুদ্দিন ইয়াকুত ইবনে আবদুল্লাহ আর-রুমি (৫৭৪-৬২৬ হি./১১৭৮-১২২৯ খ্রি.)। গ্রহণযোগ্য ইতিহাসবিদ। ভূগোলবিদদের অন্যতম পথিকৃৎ। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: معجم الأدباء، إرشاد الأريب، معجم البلدان.
১২. দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ৬, পৃ. ১২৮।
১৩. ইয়াকুত হামাবি, মুজামুল উদাবা, খ. ১, পৃ. ৪৯১।
১৪. ইবনে আবদুল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম ওয়া ফাদলিহ, খ. ১, পৃ. ৪৭০।
১৫. আদহাম ইবনে মুহরিয ইবনে উসাইদ আল-বাহিলি (১০০ হি./৭১৮ খ্রি.)। তাবিয়ি, অশ্বারোহী যোদ্ধা, বিশিষ্ট সেনাপতি। হিমসের কবি। শামের অধিবাসীদের মধ্যে অন্যতম অশ্বারোহী ও পদাতিক যোদ্ধা। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ১, পৃ. ২৮২।
১৬. ইবনে বাদরান, তাহযিবু তারিখি দিমাশক লি-ইবনি আসাকির, খ. ২, পৃ. ৩৬৭।
১৭. প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১৮০।
১৮. ইবনে আসাকির, তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, খ. ৫৮, পৃ. ৭৪।
১৯. ইবনে আসাকির, তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, খ. ৮, পৃ. ২৬৯।
২০. ইবনে আসাকির, তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, খ. ৭০, পৃ. ১৫৮।
২১. রহিম কাযিম আল-হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আল-আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, ১৪৭-১৪৯।
২২. আবু হামিদ মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-গাযালি আত-তুসি (৪৫০-৫০৫ হি./১০৫৮-১১১১ খ্রি.)। উপাধি: হুজ্জাতুল ইসলাম। শাফিয়িপন্থী ফকিহ। সুফিবাদী দার্শনিক। খুরাসানের তাবুরানে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আয়ান, খ. ৪, পৃ. ২১৬-২১৮; আস-সুবকি, তাবাকাত আশ-শাফিয়িয়‍্যাহ, খ. ৬, পৃ. ১৯১-২১১।
২৩. ইমাম গাযালি, إحياء علوم الدين, খ. ৩, পৃ. ৭২।
২৪. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১০, পৃ. ৬০১।
২৫. আবুল আব্বাস আন-নাসিরি, আল-ইসতেকসা লি-আখবারি দুওয়ালিল মাগরিবিল আকসা, খ. ২, পৃ. ২১০।
২৬. হাসান আবদুল আল, আত-তারবিয়াতুল ইসলামিয়্যা ফিল-কারনির রাবিয়িল হিজরি, পৃ. ১৮৫।
২৭. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১২, পৃ. ১৬৮।
২৮. মুসনাদুশ শিহাব কুদায়ি, হাদিস নং ৬২৯; আল-ইসফাহানি, হিলয়াতুল আওলিয়া, খ. ৩, পৃ. ১০৪। মুসলিমে বর্ণিত, يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وَسَاعَةُ ‘হে হানযালা, কিছুক্ষণ পরপর নিজেকে বিশ্রাম দাও।' হাদিসটি এই হাদিসের সমার্থক। কিতাব: আত-তাওবা, বাব: ফালু দাওয়ামিয যিক্র ওয়াল-ফিক্ ফি উমুরিল আখিরাহ, হাদিস নং ২৭৫০।
২৯. ইবনুল হাজ আল-আবদারি, আল-মাদখাল, খ. ২, পৃ. ৩২১।
৩০. হাসান হাসানি আবদুল ওয়াহহাব, মুকাদ্দিমাতু কিতাবি আদাবিল মুআল্লিমিন, পৃ. ৫৭; আলি ইবনু নায়িফ শাহুদ, আল-হাদারাতুল ইসলামিয়্যা বাইনা আসালাতিল মাযি ওয়া-আমালিল মুসতাকবাল, পৃ. ৩৮।
৩১. ইবনে জুবায়ের: আবুল হুসাইন মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে জুবায়ের আল-উন্দুলুসি (৫৪০-৬১৪ হি./ ১১৪৫-১২১৭ খ্রি.)। সাহিত্যিক, পর্যটক। তিন দফা প্রাচ্য ভ্রমণ করেছেন। সেই অভিজ্ঞার ওপর ভিত্তি করে 'রিহলাহ ইবনে জুবায়ের' গ্রন্থটি রচনা করেছেন। তিনি স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং আলেকজান্দ্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৫, পৃ. ৩১৯-৩২০।
৩২. তালকিন: শিক্ষক উচ্চৈঃস্বরে পড়েন, ছাত্ররা তা শুনে শুনে পড়ে।
৩৩. ইবনে জুবায়ের: রিহলাহ ইবনে জুবায়ের, পৃ. ২৪৫।
৩৪. ইবনে বতুতা: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ আত-তানজি (৭০৩- ৭৭৯ হি./১৩০৪-১৩৭৭ খ্রি.)। পর্যটক, ইতিহাসবিদ। মরক্কোর তাঞ্জিয়ারে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন। মারাকেশে মৃত্যুবরণ করেন। ইবনে বতুতা সারা জীবন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। পৃথিবী ভ্রমণের জন্যই তিনি মূলত বিখ্যাত হয়ে আছেন। একুশ বছর বয়স থেকে শুরু করে জীবনের পরবর্তী ৩০ বছরে তিনি প্রায় ৭৫,০০০ মাইল (১,২১,০০০ কি.মি.) পথ পরিভ্রমণ করেছেন। তিনিই একমাত্র পরিব্রাজক যিনি তার সময়কার সমগ্র মুসলিমবিশ্ব ভ্রমণ করেছেন এবং তৎকালীন সুলতানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। বর্তমান পশ্চিম আফ্রিকা থেকে শুরু করে মিশর, সৌদি আরব, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, কাজাকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীন ভ্রমণ করেছেন তিনি।- অনুবাদক। যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ২৩৫।
৩৫. অর্থাৎ, তালকিনের দ্বারা কুরআন শেখে।
৩৬. ইবনে বতুতা, রিহলাহ ইবনে বতুতা, পৃ. ৮৭।
৩৭. ইবনে মুফলিহ, আল-আদাবুশ শারইয়্যা, খ. ২, পৃ. ৬১।
৩৮. নুওবাহ: মিশরের দক্ষিণে অবস্থিত একটি এলাকা।
৩৯. হাদিসটি এই বাক্যে বর্ণিত হয়েছে : من قرأ القرآن فقد استدرج النبوة بين جنبيه غير أنه لا يوحى إليه মুসনাদে হাকিম, হাদিস নং ২০২৮। তিনি বলেছেন, এটা সহিহ, যদিও ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম তা সংকলন করেননি।
৪০. ইবনুল হাজ আল-আবদারি, আল-মাদখাল, খ. ২, পৃ. ৩১৭।
৪১. হাসান হাসানি আবদুল ওয়াহহাব, মুকাদ্দিমাতু কিতাবি আদাবিল মুআল্লিমিন, পৃ. ৫৭।
৪২. আহমাদ ইবনে তুলুন (মৃ. ২৭০ হিজরি) ছিলেন শাম, উপকূলীয় এলাকা ও মিশরের গভর্নর। আল-মু'তায বিল্লাহ তাকে মিশরের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। ইবনে তুলুন ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, বদান্য, সাহসী, বিনয়ী ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী। সব কাজ তিনি নিজে আঞ্জাম দিতেন, প্রজাদের খোঁজখবর করতেন, জ্ঞানীদের ভালোবাসতেন। দেশে সমৃদ্ধিসাধন করেছিলেন। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১, পৃ. ৮৭০।
৪৩. ইবনুল জাওযি, আল-মুনতাযাম, খ. ৫, পৃ. ৭৩।
৪৪. ইবনে সাহনুন: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আবদুস সালাম (সাহনুন) ইবনে সাইদ ইবনে হাবিব আত-তানুখি (২০২-২৫৬ হি./৮১৭-৮৭০ খ্রি.)। মালিকি ঘরানার ফকিহ, তার্কিক। বহু গ্রন্থ প্রণেতা। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ২০৪।
৪৫. ইবনে সাহনুন, আদাবুল মুআল্লিমিন, পৃ. ১১১।
৪৬. ইবনুল হাজ আল-আবদারি, আল-মাদখাল, খ. ২, পৃ. ৩২২।
৪৭. প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ৩১৩।
৪৮. আবদুল গনি মাহমুদ আবদুল আতি, আত-তালিমু ফি মিসর যামানাল আইয়ুবিয়্যিনা ওয়াল-মামালিক, পৃ. ১৪৫; ড. মুহাম্মাদ মুনির সাদুদ্দিন, দাওরুল কুত্তাব ওয়াল মাসাজিদ ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ৩।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 মসজিদ

📄 মসজিদ


ইসলামি সমাজে শিক্ষার ইতিহাস মসজিদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। মসজিদ ছিল ইসলামি সংস্কৃতির বিকাশে কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান। একইসঙ্গে তা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও।

নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনার মসজিদকে শিক্ষাদানকেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সেখানে সাহাবিরা সমবেত হতেন এবং তিনি যতটুকু কুরআন নাযিল হতো তা তাদের তিলাওয়াত করে শোনাতেন। বক্তব্য ও কর্মের দ্বারা তাদের দ্বীনের হুকুম-আহকাম শেখাতেন। খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগেও এই মসজিদ তার দায়িত্ব পালন করেছে। উমাইয়া ও আব্বাসি খলিফাদের যুগে ও তার পরেও মসজিদ তার ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে। আলেমগণ মসজিদটিতে সমবেত হতেন এবং হাদিসের আলোচনা করতেন ও কুরআনের আয়াতের তাফসির করতেন। বহু মুহাদ্দিস এই মসজিদে বসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইমাম মালিক ইবনে আনাস রহ.। দামেশকের জামে মসজিদও মসজিদে নববির অনুরূপ ভূমিকা পালন করেছে। এটি ছিল ইসলামি সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এতে জ্ঞানচর্চার বেশ কয়েকটি আসর বসত। (৪৮) মসজিদের কয়েকটি কোণে ছাত্ররা পাঠ গ্রহণ করত এবং পাণ্ডুলিপি কপি করত। এই মসজিদে খতিব বাগদাদির একটি বড় আসর ছিল। তিনি সেখানে দরস দিতেন। প্রতিদিনই তার কাছে লোকজন সমবেত হতো। (৪৯)

মসজিদে নববিতে সাহাবিদের কয়েকটি আসর বসত, তারা জ্ঞানচর্চা করতেন। মাকহুল এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমরা মদিনার মসজিদে উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর আসরে বসে ছিলাম এবং ফাজায়েলে কুরআনের আলোচনা করছিলাম। এ সময় بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ -এর চমৎকারিত্ব-সম্পর্কিত হাদিস উল্লেখ করা হলো। (৫০)

মসজিদে নববিতে আবু হুরাইরা রা.-এর একটি আসর ছিল। এতে তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস শিক্ষা দিতেন। এই আসরটি আবু হুরাইরা রা.-এর হিফযুল হাদিসের ব্যাপকতার প্রতিবিম্ব ছিল। তিনি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি আবেগে উদ্বেলিত হয়ে উঠতেন এবং ক্রন্দন করতেন। মুআবিয়া রা.-এর কাছে এক লোক এলো এবং বলল, আমি মদিনায় গিয়েছিলাম। আবু হুরাইরাকে মসজিদে বসে থাকতে দেখলাম। তার চারপাশে লোকজনের জটলা। তিনি তাদের হাদিস বর্ণনা করছেন। বললেন, 'আমার প্রাণপ্রিয় আবুল কাসিম আমাকে বর্ণনা করেছেন,' বলে কেঁদে উঠলেন। তারপর শান্ত হলেন। বললেন, 'আমার প্রাণপ্রিয় আল্লাহর নবী আবুল কাসিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,' বলে কেঁদে উঠলেন। তারপর দাঁড়িয়ে গেলেন! (৫১)

আবু ইসহাক সাবিয়ি বারা ইবনে আযিব রা.-এর মজলিসে ইলমি হালকার শৃঙ্খলা সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা এক সারির পেছনে আরেক সারি করে বারা ইবনে আযিবের কাছে বসতাম। (৫২) তার এই কথা থেকে আসরটি যে বড় ছিল তা বোঝা যায়। মসজিদে নববিতে সে সময় আরও যেসব আসর পরিচিত ছিল তার অন্যতম হলো সাহাবি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ আনসারি রা.-এর আসর। (৫৩)

দামেশকের জামে মসজিদে মুআয ইবনে জাবাল রা.-এরও একটি বিখ্যাত হালকা বা আসর ছিল। আবু ইদরিস আল-খাওলানি তার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি দামেশকের মসজিদে প্রবেশ করে একজন যুবককে দেখতে পেলাম। তার দাঁতগুলো উজ্জ্বল। শান্ত স্বভাব। তার চারপাশে লোকজন রয়েছে, তারা আলোচনা করছে। কোনো বিষয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ হলে তার কাছে উত্থাপন করছে এবং তার মত জানতে চাচ্ছে। আমি তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। বলা হলো, তিনি হলেন মুআয ইবনে জাবাল রা.। (৫৪)

এ কারণে মসজিদের জ্ঞানচর্চার আসরগুলো আমাদের বর্তমান যুগের উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থার সমপর্যায়ের ছিল। ইসলামি সমাজের সর্বস্তরের মানুষ জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী ছিল। মুজতাহিদ, আলেম ও সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এই সকল আসরে আগ্রহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করতেন। ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেন, আলি ইবনে হুসাইন মসজিদে প্রবেশ করে লোকদের অতিক্রম করে এগিয়ে যেতেন এবং যায়দ ইবনে আসলাম রা.-এর আসরে বসতেন। নাফে ইবনে জুবায়ের ইবনে মুতয়িম তাকে বললেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন! আপনি কুরাইশের নেতা তো বটেই, সাধারণ মানুষেরও নেতা। আপনি মসজিদে এসে বড় বড় জ্ঞানীদের আসর ডিঙিয়ে এই কালো দাসের (৫৫) সঙ্গে বসে পড়েন?! আলি ইবনে হুসাইন বললেন, মানুষ সেখানেই বসে যেখানে সে উপকৃত হয় এবং ইলম যেখানেই থাকুক অবশ্যই তা কাঙ্ক্ষিত। (৫৬)

ইসলামের ইতিহাসে অনেক ইলমি হালকা বা জ্ঞানচর্চার আসর বিখ্যাত হয়ে আছে। মসজিদে হারামে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল হিবরুল উম্মাহ (উম্মাহর জ্ঞানী) আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর আসর। তার ইন্তেকালের পর এই আসরে যোগ দিয়েছিলেন আতা ইবনে আবু রাবাহ রহ.। (৫৭)

এসব আসরে শিক্ষকের বয়স বেশি নাকি কম তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাত না, বরং জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আল্লাহভীরুতাই বিবেচ্য বিষয় ছিল। বয়সে ছোট না বড় সেটা কোনো কথা নয়। ইতিহাসবেত্তা হাফিজ আল-ফাসাবি (মৃ. ২৮০ হি.) মসজিদে ইলমি হালকার একজন পথিকৃতের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি এই মসজিদটি দেখেছি, এখানে কেবল মুসলিম ইবনে ইয়াসারের মজলিসেই ফিকহি আলোচনা হতো। এই মজলিসে তার চেয়ে বয়সে বড় অনেক ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তার নামেই ছিল মজলিসটির নাম। (৫৮)

ইলমি হালকার শিক্ষকেরা কখনো কখনো অভিজ্ঞ ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিদের অনুরোধ জানাতেন। ইবনে আসাকির(৫৯) বর্ণনা করেছেন, একজন লোক আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের যুগে আবু ইদরিস আয়িযুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ খাওলানিকে (৬০) দামেশকের মসজিদে দেখতে পান, তিনি একটি খুঁটির সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে আছেন। মসজিদের সব হালকাই কুরআন তিলাওয়াত করছে, কুরআন অধ্যয়ন করছে। যখনই কোনো হালকার সিজদার আয়াত পাঠের সময় হয়েছে, তারা আবু ইদরিসকে ওই আয়াতটি পাঠের জন্য অনুরোধ জানাচ্ছিল। তিনি তা পাঠ করেছেন, সবাই তন্ময় হয়ে শুনেছে; তিনি সিজদা করেছেন, সবাই তার সঙ্গে সিজদা করেছে। কখনো কখনো তিনি তাদের সঙ্গে নিয়ে বারোটি পর্যন্ত সিজদা দিয়েছেন। তাদের সবার কুরআন পাঠ শেষ হলে তিনি কাহিনি শোনাতে দাঁড়িয়েছেন। (৬১)

এই ঘটনায় বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। আমরা তো জানিই, আবু ইদরিস খাওলানি দামেশকে ইলমুল কিরাআত (কুরআন পাঠবিদ্যা) সম্পর্কে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। এই কারণে দামেশকের মসজিদে শিক্ষকেরা তাকে পাশে রেখে নিজেরা সিজদার আয়াত পাঠ করতে অপারগ বোধ করতেন। বরং তারা তাকে (সিজদার আয়াত পাঠের ক্ষেত্রে) তাদের হালকায় শরিক করে নিতেন। এভাবে তাকে সম্মান জানাতেন, তার গভীর জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতেন এবং তার থেকে ফায়দা হাসিল করতেন।

কোনো কোনো ইলমি হালকার পরিচিতি ও খ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। ইসলামি বিশ্বের সব অঞ্চল থেকে ছাত্ররা এসে এসব হালকায় জড়ো হয়েছিল। সেই সময়ে মসজিদে নববিতে নাফে ইবনে আবদুর রহমান আল-কারির (৬২) হালকাটি ছিল আল্লাহর কিতাব (কুরআন) শেখার জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত। সব জায়গা থেকে ছাত্ররা তার কাছে পড়তে আসত। ইমাম ওয়াশ মিশরি (৬৩) মসজিদে নববিতে ইমাম নাফে ইবনে আবদুর রহমানের হালকায় তার কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল তার বর্ণনা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, আমি নাফেকে কুরআন তিলাওয়াত শোনানোর জন্য মিশর থেকে বের হয়ে পড়লাম। মদিনায় পৌছে নাফের মসজিদে (মসজিদে নববিতে) গেলাম। কিন্তু ছাত্রদের ভিড়ের কারণে তাকে তিলাওয়াত শোনানোর কোনো সুযোগই পেলাম না। তিনি ত্রিশজনকে পড়াচ্ছিলেন। আমি মজলিসের পেছনে বসলাম। একজন লোককে জিজ্ঞেস করলাম, নাফের কাছে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি কে? লোকটি বলল, বড় জাফারি। আমি বললাম, কীভাবে তার কাছে যাব? লোকটি বলল, আমি তোমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যাব। আমরা তার বাড়িতে পৌঁছলাম। একজন শাইখ বেরিয়ে এলেন। আমি বললাম, আমি মিশর থেকে এসেছি। নাফেকে কুরআন তিলাওয়াত শোনাতে চাই। কিন্তু কোনো সুযোগই পাচ্ছি না। আপনি তার ঘনিষ্ঠজন বলে জেনেছি। আপনি আমার জন্য কিছু করুন, যাতে নাফের কাছে যেতে পারি। শাইখ বললেন, অবশ্যই। তিনি তার তায়লাসান (৬৪) নিলেন। আমাদের নিয়ে নাফের কাছে চললেন। নাফের দুটি উপনাম ছিল, আবু রুওয়াইম ও আবু আবদুল্লাহ। যেকোনো একটি নামে ডাকলেই তিনি সাড়া দিতেন। জাফারি আমাকে দেখিয়ে তাকে বললেন, আমি এর জন্য তোমার কাছে সুপারিশ করছি। সে মিশর থেকে এসেছে। ব্যবসার জন্যও আসেনি, হজের জন্যও নয়। সে কেবল কেরাত শেখার জন্য এসেছে। নাফে বললেন, মুহাজির ও আনসারদের সন্তানদের যে কী ভিড় তা তো তোমাদের চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছ। তার বন্ধু বললেন, তুমি তার জন্য একটি উপায় বের করে নেবে। নাফে আমাকে বললেন, তোমার পক্ষে কি মসজিদে রাত যাপন করা সম্ভব হবে? আমি বললাম, জি। আমি মসজিদেই রাত যাপন করলাম। ফজরের সময় নাফে এলেন। বললেন, আগন্তুক লোকটি কোথায়? আমি বললাম, আমি এখানেই আছি। আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। তিনি বললেন, তুমিই কুরআন তিলাওয়াত করার অধিক হকদার। ওয়াশ বলেন, তা ছাড়া আমার কণ্ঠস্বর ছিল সুন্দর, হৃদয়কাড়া। আমি কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলাম। আমার আওয়াজে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদ ভরে উঠল। আমি ত্রিশ আয়াত তিলাওয়াত করলাম। তিনি ইশারায় আমাকে চুপ করতে বললেন, আমি চুপ হয়ে গেলাম। হালকা থেকে একজন যুবক উঠে এলো। বলল, উস্তাদজি, আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করুন, আমরা তো আপনার সঙ্গেই থাকি। তিনি তো বিদেশি মানুষ। আপনাকে কুরআন তিলাওয়াত শোনানোর জন্যই এত দূর সফর করে এসেছেন। আপনি তাকে এক দশমাংশ পড়তে বলেছেন, তিনি দুই দশমাংশ পড়েই থেমে গেছেন। তিনি আমাকে বললেন, ঠিক আছে, তুমি পড়ো। আমি এক দশমাংশ পড়লাম। তারপর আরেকজন যুবক উঠে এলো এবং তার সহপাঠীর মতো আমার জন্য সুপারিশ করল। আমি আরও এক দশমাংশ পড়লাম, তারপর বসলাম। তাকে তিলাওয়াত শোনানোর মতো কোনো ছাত্র থাকল না। তিনি আমাকে বললেন, পড়ো। এভাবে আমাকে পঞ্চাশ আয়াত পড়ালেন। পরে আমি প্রত্যেকবারই পঞ্চাশ আয়াত করে পড়তে থাকলাম। মদিনা থেকে বেরিয়ে আসার আগে তাকে কয়েক খতম শোনালাম। (৬৫)

এই বর্ণনা হলো পরিশ্রমী ছাত্র ইমাম ওয়াশ আল-মিশরির, হিজরি দ্বিতীয় শতকে ইলমি হালকার স্পষ্ট চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন। তিনি অনেক কষ্ট ও পথশ্রম ব্যয় করে মিশর থেকে মদিনায় গিয়েছেন। তার উদ্দেশ্য ছিল একটিই, মদিনার ইমাম, ইমাম নাফে থেকে ইলমে কেরাত শেখা। শিক্ষক ও তার ছাত্রদের মধ্যে যে শ্রদ্ধা ও প্রীতির সম্পর্ক ছিল তাও তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তার বর্ণনা থেকে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়, ইমাম নাফের হালকায় ফজরের পরপরই পাঠ-দিবস শুরু হতো।

ইলমি হালকা ছিল অসংখ্য। কারণ এক-এক হালকায় এক-এক বিষয়ে পাঠদান করা হতো। কিছু কিছু হালকায় ছাত্র ছিল প্রচুর। এসব হালকা ভিনদেশি ছাত্রদের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। ইমাম আবু হানিফা আন-নুমানের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছিল। তিনি বলেছেন, আমি ৮০ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেছি। ৯৬ হিজরিতে আমার বাবার সঙ্গে হজ করেছি। তখন আমার বয়স ১৬ বছর। মসজিদুল হারামে প্রবেশ করে দেখি এক বিশাল হালকা। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, এই হালকাটি কার? বাবা বললেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে জুআয-যুবাইদির হালকা এটি। আমি এগিয়ে গেলাম। শুনলাম, তিনি বলছেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি,
«من تفقه في دين الله كفاه الله همه ورزقه من حيث لا يحتسب»
যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীন (দ্বীনের জ্ঞান) অন্বেষণ করে, আল্লাহই তার দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য যথেষ্ট। তিনি তাকে এমনভাবে রিযিক দান করেন যে সে তা ধারণাও করতে পারে না। (৬৬)

বাগদাদের মসজিদে চল্লিশটিরও বেশি ইলমি হালকা (জ্ঞানশিক্ষার আসর) ছিল। এ সমস্ত হালকা ইমাম শাফিয়ির অগাধ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের কারণে তার হালকায় এসে মিশে গিয়েছিল। বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ আবু ইসহাক আয-যাজ্জাজ (৬৭) এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইমাম শাফিয়ি যখন বাগদাদে এলেন তখন বাগদাদের জামে মসজিদে চল্লিশটিরও বেশি বা পঞ্চাশটি ইলমি হালকা ছিল। তিনি এক-একটি হালকায় যেতে লাগলেন এবং তাদের বলতে লাগলেন, আল্লাহ বলেছেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন। অথচ তারা বলছিল, আমাদের সঙ্গীরা বলেছে। অবশেষে এই মসজিদে ইমাম শাফিয়ির হালকা ছাড়া আর কোনো হালকা ই থাকল না। (৬৮)

মিশরেও অনুরূপ অবস্থা বিরাজমান ছিল। আমর ইবনুল আস রা. মসজিদে ইমাম শাফিয়ি রহ. তালিবুল ইলমদের সঙ্গে মিলিত হতেন। কিছু কিছু জামে মসজিদ জ্ঞানের নানান শাখায় পঠনপাঠনের ফলে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। এসব মসজিদে বহু বিশেষজ্ঞ শিক্ষকও ছিলেন। তা ছাড়া গভর্নরগণ অভিজ্ঞ শিক্ষকদের নিযুক্ত করতেন।

যেসব ইলমি হালকা ও মজলিস সমাজের অবস্থার সঙ্গে সমকাতারে থাকত না এবং সমাজের বিপদ-আপদ ও সমস্যা-সংকটে মাথা ঘামাত না সেগুলোর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ আপত্তি জানাতে পারতেন। এটা ছিল তাদের নাগরিক অধিকার। কারণ, মানুষকে তাদের বাস্তবিক অবস্থা সম্পর্কে সতর্ক করা এবং বিদ্যমান অবস্থায় কোন জিনিসটি তাদের জন্য উপকারী তা তাদের জানানো সবচেয়ে অগ্রগণ্য বিষয়।

আহমাদ ইবনে সাইদ উমাবি বর্ণনা করেছেন, মক্কায় আমার একটি ইলমি হালকা ছিল। আমি মসজিদুল হারামে বসতাম এবং আমার কাছে বিদ্যার্থীরা সমবেত হতো। আমরা একদিন ব্যাকরণের কিছু বিষয় ও ছন্দ নিয়ে তর্কবিতর্ক করছিলাম। একসময় আমাদের আওয়াজ উচ্চকিত হয়ে উঠল। ঘটনাটি ছিল খলিফা আল-মুহতা (মৃ. ২৫৬ হি.)-এর শাসনামলের। হঠাৎ এক পাগল কাছে এসে দাঁড়াল এবং আমাদের দিকে ভালো করে তাকাল। তারপর সে এই কবিতা আবৃত্তি করল,
أما تستحون الله يا معدن الجهل * شغلتم بذا والناس في أعظم الشغل
إمامكم أضحى قتيلا مجدلا * وقد أصبح الإسلام مفترق الشمل
وأنتم على الأشعار والنحو عكفا * تصيحون بالأصوات في است ام ذا العقل

হে মূর্খতার খনি, তোমরা কি আল্লাহকে লজ্জা পাও না? তোমরা এগুলো নিয়ে ব্যস্ত রয়েছ, অথচ মানুষ ভয়াবহ সংকটে। তোমাদের নেতা তো পরাভূত-পরাজিত হয়ে পড়েছে, আর ইসলাম হয়ে পড়েছে ছিন্নবিচ্ছিন্ন। তোমরা কবিতা-ছন্দ-ব্যাকরণের সঙ্গে লেপটে আছ, হইহল্লা-চেঁচামেচি করছ, তোমরা তো বুদ্ধিমান নও।
এই কবিতা বলে পাগল লোকটা চলে গেল। আমরাও জায়গা ছেড়ে উঠে পড়লাম। লোকটার বলা কথা আমাদের ভয় ধরিয়ে দেয়। আমরা কবিতাটি মনে রাখি। (৬৯)

উপর্যুক্ত কবিতা আবৃত্তির কারণ ছিল এই যে, লোকটি আলেমদের ও মজলিসে সমবেত লোকদের সতর্ক করতে চেয়েছে। তারা মজলিসে অহেতুক তর্কবিতর্কে লিপ্ত ছিল, অথচ রাজধানী বাগদাদে ভয়াবহ বিপর্যয় চলছে। তুর্কি সেনাপতি ও খলিফা আল-মুহতাদির সৈন্যদের মধ্যে যুদ্ধ অব্যাহত আছে। লোকটি চাচ্ছে যে, এখানে মজলিসে যারা আছে তারাও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী চারপাশের লোকদের সঙ্গে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করুক।

ইমাম আবুল ওয়ালিদ আল-বাজির (৭০) ইলমি হালকার খ্যাতি আন্দালুসের চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি প্রাচ্যে ভ্রমণ করেছিলেন। হাফেয মুহাদ্দিসের অনন্য ব্যক্তিত্ব তার ছিল। আন্দালুসে মুহাদ্দিসদের ইমাম হওয়ার অধিকারও তিনি আয়ত্ত করেছিলেন। আল-বাজির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে তাকে পালমা (৭১) শহরে এসে মালিকি মাযহাব অনুসরণের ব্যাপারে ইবনে হাযমের (৭২) সঙ্গে তর্কবিতর্ক করতে আহ্বান জানানো হয়। তিনি পালমায় আসেন এবং শিক্ষাদানে ব্রতী হন। সেভিলেও (৭৩) যান এবং শিক্ষাদান করেন। মুরসিয়া (৭৪) শহরে গিয়ে মুআত্তার পাঠদান করেন। এ ব্যাপারে তিনি নিজের সম্পর্কে বলেছেন, আমি যেখানে থাকতাম সেখানকার মসজিদে আমার একটি ইলমি হালকা ছিল। মুআত্তার প্রসঙ্গে আলোচনা শুনতে লোকজন আমার কাছে সমবেত হতো। তিনি দানিয়া (৭৫) শহরেও গমন করেন এবং সেখানে অসংখ্য মানুষ তার কাছ থেকে সহিহুল বুখারি শ্রবণ করে। ৪৬৩ হিজরির রজব মাসে তিনি সারকাসতাহ (৭৬) শহর সফর করেন এবং ৪৬৮ হিজরিতে সফর করেন ভ্যালেন্সিয়ার (৭৭) রাহবাহ আল-কাজি মসজিদ। এ ছাড়াও তিনি অন্যান্য শহর সফর করেন। হাফিজ আবুল ওয়ালিদের অনন্য ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভার কারণে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য থেকে ছাত্ররা ছুটে আসত এবং তার থেকে ইলম অর্জনে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো। কাছাকাছি এলাকা তো বটেই, অধিকাংশ ছাত্র দূরদূরান্ত থেকে তার কাছে পড়তে এসেছে। দেশের ভেতরের ছাত্ররা যেমন এসেছে, দেশের বাইরের ছাত্ররাও এসেছে। যেমন : উরিইউলা(৭৮), সেভিল, শাবুনা (সুদান), রান্দা (জিবুতি), ভ্যালেন্সিয়া, বাগদাদ, তুতিলা (তুদেলা) (৭৯), আলেপ্পো, দানিয়া, তারতুসা (৮০) (স্পেন), তুলাইতালা (টলেডো) (৮১), লুরকা (৮২) (স্পেন), মালাগা(৮৩) (স্পেন), মুরবাতার(৮৪), মুরজিক ও মুরসিয়া...। (৮৫)

মসজিদের হালকাগুলোতে শিক্ষাদানে নারীদের যে ভূমিকা ও অবদান তা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। ইতিহাসের পাতায় বহু নারী শিক্ষকের নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে যারা মসজিদে পাঠদান করেছেন। নারীদের ছিল বিশেষ ইলমি হালকা। উম্মুদ দারদা রা. দামেশকের জামে মসজিদে একটি ইলমি হালকা পরিচালনা করতেন। তার আসল নাম হুজাইমা বিনতে হুওয়াই রা.। তিনি আবুদ দারদা রা., সালমান আল-ফারসি রা. এবং ফুযালা ইবনে উবাইদা রা. থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য যে, আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান উম্মুদ দারদা রা. থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। তিনি উম্মুদ দারদার দরসে নিয়মিত উপস্থিত হতেন, এমনকি আমিরুল মুমিনিন হওয়ার পরও তার দরসে উপস্থিত হতেন। তিনি দামেশকের মসজিদে শেষ প্রান্তে বসে ছিলেন। উম্মুদ দারদা রা. তাকে দেখে বললেন, শুনলাম আপনি ইবাদত-বন্দেগির পর এখন মদ পান করেছেন?
আবদুল মালিক বললেন, হ্যাঁ, তাই। রক্তও আমি পান করেছি। এ সময় তার একটি চাকর এসে উপস্থিত হলো। চাকরটিকে তিনি কোনো কাজে পাঠিয়েছিলেন। তিনি বললেন, এত দেরি কেন? তোর ওপর আল্লাহর লানত। উম্মুদ দারদা রা. বললেন, হে আমিরুল মুনিনিন, আপনি এভাবে অভিশাপ দেবেন না। আমি আবুদ দারদাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, لا يدخل الجنة لعان অভিসম্পাতকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না...।(৮৬)

ইবনে বতুতা তার ভ্রমণকাহিনিতে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি দামেশকের উমাবি জামে মসজিদে শিক্ষিকা শাইখা যাইনাব বিনতে আহমাদ ইবনে আবদুর রহিমের কাছ থেকে সহিহ মুসলিম শুনেছেন। যাইনাব ৭৪০ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। একইভাবে ইবনে বতুতাকে হাদিস বর্ণনার অনুমতি দেন বিশিষ্ট শাইখা আয়িশা বিনতে মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম আল-হুররানি (মৃ. ৭৩৬ হিজরি)। তিনি ইমাম বাইহাকি রহ.-এর 'ফাযায়িলুল আওকাত' (পুস্তিকাটি) বর্ণনা করেছেন (৮৭)

সব এলাকা ও গোত্র থেকে শিক্ষার্থীরা এসব মসজিদে পড়তে আসত। তাদের জন্য সব ধরনের উপকরণ সরবরাহ করা হতো। যাতে তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং এতে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে। তাদের খাবার ও পোশাক সরবরাহ করা হতো, থাকার জন্য আলাদা বাসস্থান ছিল। তাদেরকে ভাতাও দেওয়া হতো। (৮৮) এ সকল জামে মসজিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নরূপ :
* জামে আল-উমাবি : এটি দামেশকে অবস্থিত। খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক এটি নির্মাণ করেছেন। এই মসজিদে ইলমি হালকা ছিল ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। মালিকি মাযহাবপন্থীদের জন্য মসজিদের একটি কর্নার নির্ধারিত ছিল, একইভাবে শাফিয়ি মাযহাবপন্থীদের জন্যও। খতিব আল-বাগদাদিরও একটি হালকা ছিল। ছাত্ররা তার কাছে সমবেত হতো। তিনি তাদের হাদিসের দরস দিতেন। এই মসজিদের হালকাগুলো শুধু দ্বীনি ইলমের শিক্ষাব্যবস্থায়ই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ভাষাবিজ্ঞান, সাহিত্য, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যাও শিক্ষা দেওয়া হতো।

চিত্র নং-১ আল-উমাবি জামে মসজিদ

* জামে আমর ইবনুল আস রা. : এটি মিশরের ফুসতাত-এ অবস্থিত। এই মসজিদে চল্লিশটিরও বেশি পাঠদানের আসর ছিল। শিক্ষার্থী ও যারা গবেষণায় ব্রতী ছিল তারা এসব আসর পরিচালনা করত। এগুলোর মধ্যে একটি ছিল ইমাম শাফিয়ি রহ.-এর আসর। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে এই মসজিদে পাঠদানের আসরের সংখ্যা একশ দশে পৌঁছায়। কয়েকটি হালকা ছিল মহিলাদের জন্য খাস। তারপর অনুমোদনদানের (হাদিস পাঠদানের ইজাযত বা উচ্চ সনদপত্রের) প্রথা চালু হয়। ইজাযত পাওয়ার পর ছাত্ররা তাদের উস্তাদের কিতাবপত্র ব্যবহার করতে পারত এবং তার থেকে হাদিস বর্ণনা করতে পারত। (৮৯)

চিত্র নং-২ আমর ইবনুল আস রা. জামে মসজিদ

* জামে আল-আযহার: ৩৬১ হিজরিতে জামে আল-আযহারের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়। ইসলামি বিশ্বের ছাত্রদের জন্য এটি একটি তীর্থস্থানে পরিণত হয়। খলিফাগণ জামে আল-আযহারের জন্য বহু সম্পত্তি ওয়াক্‌ফ্ করেছেন। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার জন্য বিশেষজ্ঞ শিক্ষক নিযুক্ত করেছেন। জামে আল-আযহারের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং এখানে শিক্ষার্থীরা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেত। ফলে মুসলিমবিশ্বের সব এলাকা থেকে এখানে ছাত্ররা পড়তে আসত। এমনকি ৮১৮ হিজরিতে (১৪১৫ খ্রিষ্টাব্দে) জামে আল-আযহারের ছাত্র-শিক্ষক ছিল মাকরিযির (৯০) বর্ণনামতে সাতশ পঞ্চাশজন। এখানে অনারব শিক্ষার্থী ছিল, সোমালিয়ার যাইলাআ (Zeila) অঞ্চলের শিক্ষার্থীও ছিল। (৯১) মিশরের গ্রামীণ এলাকার শিক্ষার্থী যেমন ছিল, তেমনই মাগরিবের (মরক্কোর) শিক্ষার্থীও ছিল। প্রত্যেক গোত্রের আলাদা তাঁবু ছিল, তাঁবু দেখে তাদের চেনা যেত।

চিত্র নং-৩ আল-আযহার জামে মসজিদ

জামে আল-আযহার যুগ যুগ ধরে জ্ঞানের কেন্দ্র ও আলোকবর্তিকা হিসেবে ধারাবাহিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি অসংখ্য মনীষীর জন্ম দিয়েছে, অজস্র গ্রন্থ এখানে রচিত হয়েছে। সত্যিকার অর্থেই জামে আল-আযহার এমন এক শিক্ষালয় যা জ্ঞান ও জ্ঞানার্থীর যুগপৎ মিলনস্থল। (৯২)

* জামে আয-যাইতুনা: এই মসজিদ তিউনিসিয়ায় অবস্থিত। বনি উমাইয়ার খলিফাদের শাসনামলে (৭৯ হিজরিতে) এটির নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়। জামে আয-যাইতুনার প্রথম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ইফ্রিকিয়ার গভর্নর আমির উবাইদুল্লাহ ইবনে হাবহাব। তিনি খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিক কর্তৃক নিয়োজিত ছিলেন। ২৫০ হিজরিতে (৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে) কয়েকবার মসজিদটি সম্প্রসারণ করা হয়। যিয়াদাতুল্লাহ ইবনুল আগলাব-আগালিব রাজবংশের শাসনামলে-মসজিদটি সম্প্রসারণ করেন। এ মসজিদটিতে ইলমের বিভিন্ন শাখায় পাঠদানের কারণে এটির অবস্থান অনেক উঁচু। বহু বড় বড় আলেম এই মসজিদে পাঠদান করেছেন। যেমন আবদুর রহমান ইবনে যিয়াদ আল-মাআফিরি (৯৩)। তিনি বিখ্যাত মুহাদ্দিস (হাদিসবিশারদ) ছিলেন। আবু সাইদ সাহনুন আত-তানুখিও এখানে শিক্ষকতা করতেন। এখানে শিক্ষকদের মধ্যে আরও ছিলেন ইমাম আল- মাযিরি (৯৪) ও অন্যরা।

চিত্র নং-৪ আয-যাইতুনা জামে মসজিদ

জামে আয-যাইতুনায় সব এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জন করতে আসত। এখানে তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও ভাষাবিজ্ঞান-বিষয়ক গ্রন্থাবলির পাঠদান করা হতো। আল-হাশাইশি(৯৫) জামে আয-যাইতুনায় জ্ঞানচর্চা ও পঠনপাঠনের যে অবস্থা ছিল তার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জামে আয-যাইতুনা ছিল একটি জ্ঞানসমুদ্র। সব ধরনের জ্ঞানের সমাবেশ ঘটেছিল এখানে। এমনকি বলা হয়ে থাকে যে, এই মসজিদের প্রায় প্রত্যেক খুঁটির সামনে একজন করে শিক্ষক বসতেন। মসজিদটির ভান্ডারে ছিল দুই লাখেরও বেশি খণ্ডের কিতাব।(৯৬)

* জামে আল-কারাউইন: মরক্কোর ফেজ শহরে জামে আল-কারাউইন প্রতিষ্ঠিত হয় ২৪৫ হিজরিতে/৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে। ইদরিসি রাজবংশের(৯৭) শাসনামলে এটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। যানাতি আমির আহমাদ ইবনে আবু বকর আয-যানাতি (৩২২ হিজরি/৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) মসজিদটি সমৃদ্ধ করেন এবং অনেকাংশে বর্ধিত করেন। হিজরি ষষ্ঠ শতকের শুরুতে জামে আল-কারাউইনের সম্প্রসারণকাজ সম্পন্ন হয় এবং এটির সীমানা বিস্তৃত করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি বিপুল খ্যাতি অর্জন করে। শিক্ষাদীক্ষায় উচ্চ অবস্থানের কারণে জামে আল-কারাউইন ছিল অনন্য ও অসাধারণ। বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসত। প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে তারা সব ধরনের খরচাদি পেত। জামে আল-কারাউইনের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ছিল। কারণ ওয়াকফকৃত সম্পত্তির পাশাপাশি যুক্ত হয়েছিল আমির-উমারার অনুদান। তা ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির খ্যাতি ছিল বিপুল, এ কারণেও অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হতো। অন্যান্য দেশ থেকেও শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসত। এমনকি ইউরোপের শিক্ষার্থীরাও এই জ্ঞানকেন্দ্রে আসতে শুরু করেছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, বিশপ জার্বার্টাস (Gerbertus) (৯৮) কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার পর জামে আল-কারাউইনে পড়াশোনা করেছেন। পরবর্তীকালে তিনি ৯৯৯ খ্রি. থেকে ১০০৩ খ্রি. পর্যন্ত রোমের পোপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তখন তার নাম হয়েছিল দ্বিতীয় সিলভেসটার (Sylvester II)। তিনি Gerbert of Aurillac নামেও পরিচিত। (৯৯)

চিত্র নং-৫ আল-কারাউইন জামে মসজিদ

টিকাঃ
৪৮. আবদুল্লাহ মাশুখি, মাওকিফুল ইসলাম ওয়াল-কানিসাহ মিনাল ইলম, পৃ. ৫৪।
৪৯. আহমাদ শালবি, তারিখুত তারবিয়াতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ৯১।
৫০. ইবনে আসাকির, তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, খ. ৭, পৃ. ২১৬।
৫১. যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ২, পৃ. ৬১১।
৫২. খতিব বাগদাদি, আল-জামি লি-আখলাকির রাবি ওয়া আদাবিস সামি, খ. ১, পৃ. ১৭৪।
৫৩. আকরাম উমারি, আসরুল খিলাফাতির রাশিদা, পৃ. ২৭৮।
৫৪. ইয়াকুব আল-ফাসাবি, আল-মারিফা ওয়াত-তারিখ, খ. ২, পৃ. ১৮৫।
৫৫. যায়দের পিতা আসলাম ছিলেন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর আযাদকৃত দাস।
৫৬. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ৯, পৃ. ১২৪।
৫৭. প্রাগুক্ত, খ. ৯, পৃ. ৩৩৭।
৫৮. ইয়াকুব আল-ফাসাবি, আল-মারিফা ওয়াত-তারিখ, খ. ২, পৃ. ৪৯।
৫৯. ইবনে আসাকির: আবু কাসিম আলি ইবনে হাসান ইবনে হিবাতুল্লাহ আদ-দিমাশকি (৪৯৯-৫৭১ হি./১১০৫-১১৭৬ খ্রি.)। ইতিহাসবিদ, হাফেয, পরিব্রাজক। তিনি দিয়ারে শামিয়ার মুহাদ্দিস ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
تاريخ دمشق الكبير، الإشراف على معرفة الأطراف، تبيين كذب المفتري في ما نسب إلى أبي الحسن الأشعري، معجم الصحابة : দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ২১, পৃ. ৪০৫।
৬০. আবু ইদরিস আয়িযুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আমর আল-খাওলানি আল-উযি আদ-দিমাশকি (৮-৮০ হি./৬৩০-৭০০ খ্রি.)। তাবিয়ি, ফকিহ। দামেশকের বাসিন্দাদের ওয়ায়েজ ছিলেন। আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের সময় তিনি তাদের শিক্ষামূলক গল্প-কাহিনি বলতেন। বিচারকও হয়েছিলেন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ২৩৯।
৬১. ইবনে আসাকির, তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, খ. ২৬, পৃ. ১৬৩।
৬২. নাফে আল-কারি: নাফে ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আবু নাইম আল-মাদানি আল-কারি (৭০-১৬৯ হি./৬৮৯-৭৮৫ খ্রি.)। নাফে আল-মাদানি নামে পরিচিত ছিলেন। বিখ্যাত সাত কারির অন্যতম এবং মদিনায় কারিদের ইমাম। তিনি ইস্পাহানি বংশোদ্ভূত।
৬৩. ওয়ারশ: উসমান ইবনে সাইদ ইবনে আদি আল-মিশরি (১১০-১৯৭ হি./৭২৮-৮১২ খ্রি.)। একজন বিখ্যাত কারি। তার শারীরিক শুভ্রতার কারণে 'ওয়ারশ' নামে খ্যাতি পেয়েছেন। কায়রাওয়ানি বংশোদ্ভূত। জন্ম ও মৃত্যু মিশরে। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ২০৫।
৬৪. তায়লাসান: বুযুর্গ ব্যক্তিদের পরিধেয় সবুজ রঙের পোশাকবিশেষ।
৬৫. যাহাবি, মারিফাতুল কুররায়িল কিবার আলাত তাবাকাতি ওয়াল আছার, খ. ১, পৃ. ১৫৪-১৫৫।
৬৬. ইবনু আন-নাজ্জার আল-বাগদাদি, যায়লু তারিখি বাগদাদ, খ. ১, পৃ. ৪৯।
৬৭. আয-যাজ্জাজ: আবু ইসহাক ইবরাহিম ইবনে আস-সারি ইবনে সাহল (২৪১-৩১১ হি./৮৫৫-৯২৩ খ্রি.)। ভাষাবিদ ও ব্যাকরণ-পণ্ডিত। বাগদাদে জন্ম ও মৃত্যু। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: تفسير أسماء الله الحسنى، معاني القرآن وإعرابه، ما ينصرف وما لا ينصرف، العروض القوافي أو الكافي في أسماء القوافي ! দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৫, পৃ. ২২৮।
৬৮. আল-মিযযি, তাহযিবুল কামাল ফি আসমায়ির রিজাল, খ. ২৪, পৃ. ৩৭৫।
৬৯. খতিব আল-বাগদাদি, তারিখু বাগদাদ, খ. ৪, পৃ. ৫৫৭-৫৫৮।
৭০. আবুল ওয়ালিদ আল-বাজি : সুলাইমান ইবনে খালফ ইবনে সাদ আত-তুজিবি আল-কুরতুবি (৪০৩-৪৭৪ হি./১০১২-১০৮১ হি.)। প্রখ্যাত মালিকি ফকিহ, মুহাদ্দিস, বিচারক ও কবি। তিনি আন্দালুসের বিতলিউস (Badajoz) শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তারপর তার দাদা পরিবারসহ বাজায় চলে যান। সেখানেই তিনি বেড়ে ওঠেন। এ কারণেই তাকে আল-বাজি বলা হয়। এটি বর্তমানে পর্তুগালের বেজা (Beja) শহর। তিনি বাজার কাজি বা বিচারক ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য রচনা: الاستيفاء في شرح الموطأ، السراج في علم الحجاج ومسائل الخلاف المهذب في اختصار المدونة، إحكام الفصول في أحكام الأصول، تبيين المنهاج والتسديد إلى معرفة طريق التوحيد، فرق الفقهاء التعديل والتجريح لمن خرج عنه البخاري في الصحيح. দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ১২৫।
৭১. Palma de Mallorca.
৭২. আবু মুহাম্মাদ আলি ইবনে হাযম আল-উন্দুলুসি (৩৮৪-৪৫৪ হি.)।
৭৩. اشبيلية Seville. আন্দালুসিয়ার সেভিল প্রদেশের রাজধানী ও প্রধান শহর।
৭৪. Murcia.
৭৫. Dénia.
৭৬. سرقسطة : Zaragoza.
৭৭. بلنسية : Valencia.
৭৮. أوريولة : Orihuela
৭৯. تطيلة : Tudela.
৮০. طرطوشة : Tortosa.
৮১. طليطلة : Toledo.
৮২. لورقة : Lorca.
৮৩. مالقة : Málaga.
৮৪. Sagunto. মুরবাতার প্রাচীন নাম।
৮৫. সুলাইমান ইবনে খালফ আল-বাজি, আত-তা'দিল ওয়াত-তাজরিহ, খ. ১, পৃ. ১০৬।
৮৬. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ৯, পৃ. ৬৬।
৮৭. ইবনে বতুতা, রিহলাহ ইবনে বতুতা, পৃ. ৭০; সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ১৬, পৃ. ৩৪৮।
৮৮. আবদুল্লাহ মাশুখি, মাওকিফুল ইসলাম ওয়াল-কানিসাহ মিনাল ইলম, পৃ. ৪৫।
৮৯. রহিম কাযিম আল-হাশিমি ও আওয়াতিফ মুহাম্মাদ আল-আরাবি, আল-হাদারাতুল আরাবিয়্যাতুল ইসলামিয়্যা, ১৫০।
৯০. মাকরিযি: তাকিউদ্দিন আহমাদ ইবনে আলি আল-মাকরিযি (৭৬৬-৮৪৫ হি.)। মিশরীয় ইতিহাসবিদদের গুরু। মামলুকদের শাসনামলে জীবৎকাল অতিবাহিত করেছেন। তার কয়েকটি বিখ্যাত গ্রন্থ : السلوك لمعرفة دول الملوك، اتعاظ الحنفاء بأخبار الأئمة الفاطميين الخلفاء المواعظ والاعتبار بذكر الخطط والآثار
৯১. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১১, পৃ. ৩১০।
৯২. আবদুল্লাহ মাশুখি, মাওকিফুল ইসলাম ওয়াল-কানিসাহ মিনাল ইলম, পৃ. ৫৭।
৯৩. আবদুর রহমান ইবনে যিয়াদ: আবদুর রহমান ইবনে যিয়াদ ইবনে আনউম আল-মুআফিরি আল-ইফ্রিকি (৭৫-১৬১ হি./৬৯৪-৭৭৮ খ্রি.)। তিনি শাসকদের সবসময় হুমকি-ধমকির ওপর রাখতেন। কড়া ভাষায় তাদের অন্যায়-অত্যাচার থেকে বিরত থাকতে বলতেন। এ ব্যাপারে তিনি বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। বারকায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সেখানেই বেড়ে উঠেছেন। দুইবার কায়রাওয়ানের বিচারক নিযুক্ত হয়েছেন।
৯৪. আল-মাযিরি: আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আলি ইবনে উমর আল-মাযিরি (৪৫৩-৫৩৬ হি./১০৬১-১১৪১ খ্রি.)। মুহাদ্দিস, হাফিয, ফকিহ, আদিব। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : نظم الفرائد أمالي على رسائل إخوان في علم العقائد، إيضاح المحصول من برهان الأصول، المعين على التلقين، المعلم بفوائد مسلم الكشف والإنباء عن المترجم بالإحياء، في نقد كتاب إحياء علوم الدين للغزالي الصفاء তাযকিরাতুল হুফফায, খ. ১, পৃ. ৫২; উমর রেজা কাহহালা, মুজামুল মুআল্লিফিন, খ. ১১, পৃ. ৩২।
৯৫. আল-হাশাইশি: মুহাম্মাদ ইবনে উসমান আল-হাশাইশি আশ-শারিফ ফাদিল (১২৭১-১৩৩০ হি./১৮৫৫-১৯১২ খ্রি.)। তিউনিসের অধিবাসী। জামে আয-যাইতুনার গ্রন্থভান্ডার ঘাঁটাঘাঁটি করাই ছিল তার কাজ। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ২৬৩।
৯৬. আবদুল্লাহ মাশুখি, মাওকিফুল ইসলাম ওয়াল-কানিসাহ মিনাল ইলম, পৃ. ৫৫।
৯৭. ইদরিসি রাজবংশ (الأدارسة): ৭৮৮ খ্রি. থেকে ৯৭৪ খ্রি. পর্যন্ত মরক্কোর একটি রাজবংশ। হাসান ইবনে আলি রা.-এর প্রপৌত্র ইদরিস এই রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। ইদরিসিদেরকে সাধারণত মরক্কো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা গণ্য করা হয়। তারা ছিল শিয়া মতবাদের যায়েদি শাখার অনুসারী।
৯৮. বিস্তারিত দেখুন, আবদুল হাদি আত-তাযি, আহাদু আশারা কারনান ফি জামিআতি কাযবিন, পৃ. ১৯।
৯৯. আবদুল্লাহ মাশুখি, মাওকিফুল ইসলাম ওয়াল-কানিসাহ মিনাল ইলম, পৃ. ৫৬।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 মাদরাসা বা বিদ্যালয়

📄 মাদরাসা বা বিদ্যালয়


হিজরি পঞ্চম শতাব্দী থেকে ইসলামি সভ্যতায় মাদরাসা পরিচিত হয়ে উঠেছিল। তার কারণ, মসজিদগুলোতে ইলমি হালকা অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল। প্রথম যে মসজিদটি মাদরাসায় রূপান্তরিত করা হয় তা হলো জামে আল-আযহার। ৩৭৮ হিজরিতে এটিকে মাদরাসা বা বিদ্যালয়ের রূপ দেওয়া হয়। পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত ইসলামি বিশ্বের শহরগুলো মাদরাসায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওয়াকফকৃত সম্পত্তির ওপর এ সকল মাদরাসার ভিত প্রতিষ্ঠিত হয়। ধনী নেতৃবৃন্দ, আলেম-উলামা, ব্যবসায়ী, আমির-উমারা ও বাদশাহ-উজিরদের ওয়াকফকৃত সম্পত্তিতে এসব মাদরাসা পরিচালিত হতো।

সত্যি বলতে, ইসলামি সভ্যতায় মাদরাসা এই সভ্যতার মতোই প্রাচীন। ইবনে কাসির ৩৮৩ হিজরি সালের ঘটনাবলি বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, উজির আবু নাসর সাবুর ইবনে আরদাশির (১০০) কারখে (১০১) একটি বাড়ি কিনলেন। বাড়িটির ইমারত নতুনভাবে সংস্কার করলেন। অসংখ্য বইপত্র এনে এতে জমা করলেন। তারপর বাড়িটি ফকিহদের জন্য ওয়াকফ করে দিলেন। বাড়িটির নাম রাখলেন দারুল ইলম। আমি ধারণা করি এটিই প্রথম মাদরাসা যা ফকিহদের জন্য ওয়াকফ করা হয়। এটি বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠার বহু পূর্বের ঘটনা। (১০২)

মাদরাসা-প্রতিষ্ঠা ব্যাপকতা লাভ করে এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। দামেশকে প্রথম মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয় ৩৯১ হিজরিতে। এটি নির্মাণ করেন শুজা উদ-দাওলা সাদির ইবনে আবদুল্লাহ (১০৩)। মাদরাসাটির নাম রাখা হয় আল-মাদরাসাতুস সাদিরিয়‍্যাহ (১০৪)। তারপর তাকে অনুসরণ করেন দামেশকের কারি রাশা ইবনে নাযিফ(১০৫)। তিনি প্রায় চারশর মতো রাশায়ি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদে যেসব ইলমি হালকা বসত সেগুলো থেকে বেরিয়ে ছাত্ররা এসব মাদরাসায় ভর্তি হয়। বিশেষ শাখার জ্ঞান অর্জনের জন্য তারা নির্ধারিত স্থান পায়। ফলে এখানে ছাত্রদের জন্য এবং শাইখ ও শিক্ষকদের জন্য সম্পত্তি ওয়াকফ করা হয়। তাদের সকলের জন্য জ্ঞানচর্চার অবারিত উপকরণ মেলে। (১০৬)

প্রথম দিকে এসব মাদরাসা ছিল পারিবারিক বা ব্যক্তিগত। তারপর খিলাফত ও সরকারি প্রতিষ্ঠান মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় অংশগ্রহণ করে। এ কাজটি শুরু হয় (সেলজুক সাম্রাজ্যের) প্রখ্যাত উজির নিজামুল মুলক আত-তুসির(১০৭) কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। তিনি তার শাসনকালে মাদরাসাগুলোকে সরকারীকরণ করেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানই মাদরাসার ব্যয়ভার বহন করতে শুরু করে এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে শিক্ষক নিয়ে আসে।

তিনি বেশ কয়েকটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে ইসলামি সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে যে অবদান রেখেছেন তা তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মাবলির মধ্যে শ্রেষ্ঠ কর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এবং তা তাকে অমরত্ব দিয়েছে। তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তার নামে এগুলোর নামকরণ করা হয়েছে। যেমন আল-মাদারিসুন নিযামিয়্যাহ। এসব মাদরাসাকে ইসলামের ইতিহাসে প্রথম প্রকারের জ্ঞান-সংস্থা ও নিযামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিবেচনা করা হয়। এসব মাদরাসার ছাত্রদের জন্য শিক্ষা ও জীবনযাপনের সব রকমের উপকরণ সরবরাহ করা হতো। নিযামি মাদরাসাগুলো ছিল হাদিস ও ফিকহ পঠনপাঠনের জন্য বিশেষায়িত। এসব মাদরাসার ছাত্ররা খাবার ও আবাসন পেত, তাদের অনেককে মাসিক ভাতাও প্রদান করা হতো।

নিযামুল মুলকের উৎসাহ ও উদ্যম এবং বিভিন্ন অঞ্চলে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ফলে যা ঘটল তা অভাবনীয়। ডজন ডজন মাদরাসায় ইরাক ও খোরাসান ভরে গেল। এমনকি এ ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে যে, ইরাক ও খোরাসানের প্রতিটি শহরে ও নগরে একটি করে মাদরাসা ছিল। নিযামুল মুলক শহরে তো বটেই, প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি যে অঞ্চলেই কোনো আলেম পেয়েছেন এবং তাকে জ্ঞান-বিদ্যায় দক্ষ ও অনন্য দেখেছেন, তার জন্য একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছেন। মাদরাসাটির জন্য সম্পত্তি ওয়াকফ করেছেন এবং গ্রন্থাগারও নির্মাণ করেছেন। এ সকল মাদরাসায় ছাত্ররা বিনা পয়সায় পড়াশোনা করত। তা ছাড়া দরিদ্র ছাত্রদেরকে তাদের জন্য গঠিত বিশেষ তহবিল/বরাদ্দ থেকে নির্ধারিত পরিমাণে ভাতা দেওয়া হতো। (১০৮)

নিযামুল মুলক যেসব মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাগদাদের আল-মাদরাসাতুন নিযামিয়্যাহ (নিযামিয়া মাদরাসা)। ৪৫৭ হিজরিতে মাদরাসাটির নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং তা শেষ হয় ৪৫৯ হিজরিতে। (১০৯) আব্বাসি খলিফা মাদরাসাটির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন এবং তিনি নিজে শিক্ষকমণ্ডলী নিযুক্ত করেন। নিযামিয়া মাদরাসায় হাদিস ও ফিকহ পড়ানো হতো, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়েরও পাঠদান করা হতো। জ্ঞান ও চিন্তার জগতে যে-সকল মনীষী তখন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছিলেন তারা নিযামিয়া মাদরাসায় পাঠদান করেছেন। যেমন 'ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন'-এর লেখক হুজ্জাতুল ইসলাম আবু হামিদ আল-গাযালি। (১১০) এই সময়ে নিশাপুরের নিযামিয়া মাদরাসায় আরেকজন মনীষী পাঠদান করতেন, তিনি হলেন ইমামুল হারামাইন আবুল মাআলি আল-জুওয়াইনি(১১১)।(১১২)

বাগদাদ, ইস্পাহান, নিশাপুর ও মারভে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মাদরাসাগুলো সুন্নি মাযহাবের নীতিমালার সুরক্ষা ও দৃঢ়ীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল এবং সে সময়ে যে নানা প্রকারের বিদআত ও বিকৃত মাযহাবের সয়লাব ঘটেছিল সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছিল। নিযামুল মুলক প্রতি বছর মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক, ফকিহ ও আলেমদের জন্য যে টাকা ব্যয় করতেন তার পরিমাণ ছিল তিন লাখ দিনার। সেলজুকি সুলতান জালালুদ দাওলা মালিক শাহ (ইবনে মুহাম্মাদ আলপ আরসালান) তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে এবং আপনার মাধ্যমে আমাকে যা দিয়েছেন তা আর কাউকে দেননি। আমরা কি তার বিনিময়ে আল্লাহর দ্বীনের ধারকবাহক ও তার কিতাবের হেফাজতকারীদের জন্য তিন লাখ দিনার ব্যয় করব না? (১১৩)

চিত্র নং-৬ আল-মাদরাসাতুল মুসতানসিরিয়‍্যাহ

হিজরি চতুর্থ ও খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দী থেকে ইসলামি সভ্যতায় মাদরাসার বিস্তৃতি ঘটে। তা প্রমাণ করে যে, সমাজের বিভিন্ন স্তরে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর ক্ষেত্রে ইসলামি সভ্যতা কতটা অগ্রগামী। জ্ঞানের এমন বিস্তৃতির সঙ্গে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যসভ্যতা তখনও পরিচিত ছিল না। উল্লেখ্য সে সময়ে ইউরোপ জ্ঞানের যৎসামান্য অংশেরই অধিকারী ছিল। বরং সে সময় চার্চ জ্ঞানের সকল উপকরণ নিজেদের একচেটিয়া করে নিয়েছিল। তার পরিণাম ছিল এই যে, ইউরোপীয়রা যুগের পর যুগ অন্ধকার, অজ্ঞতা ও পশ্চাৎপদতায় কাটিয়েছে এবং বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বিরাজমান থেকেছে। বিশেষ করে জার্মান গোত্রগুলো একসময় রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং অন্যান্য সময় অন্যান্য গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। তা ছাড়া বর্ণপ্রথা একটি পবিত্র রূপ নিয়ে তখন ইউরোপে জেঁকে বসেছিল। তার ফলে ইউরোপীয় শিক্ষাব্যবস্থা অবজ্ঞা ও উপেক্ষার শিকার হয়েছে। (১১৪)

বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, ইসলামি সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক অবক্ষয়ের দিনেও জ্ঞান-আন্দোলন প্রভাবিত হয়নি। বরং তার বিপরীত ঘটনা ঘটেছে। ৬৩১ হিজরিতে/১২৩৩ খ্রিষ্টাব্দে আল-মাদরাসাতুল মুসতানসিরিয়‍্যাহ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় তাতাররা ইসলামি বিশ্বের পূর্বাঞ্চলকে তছনছ করে দিচ্ছিল। আব্বাসি খেলাফতকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিল। সবচেয়ে দুর্বল পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল আব্বাসি খেলাফত। তারপরও এই অবিনশ্বর মাদরাসাটির প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হয়েছে।

ইবনে কাসির রহ. মাদরাসাটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, মাদরাসাটি অভূতপূর্ব। এর আগে এমন মাদরাসা নির্মিত হয়নি। চার মাযহাবের প্রত্যেকটির জন্য ৬২ জন ফকিহ এবং চারজন সহকারী (পুনরাবৃত্তিকারী) আছেন। প্রত্যেক মাযহাবের একজন মুদাররিস, একজন শাইখুল হাদিস, দুইজন কারি এবং দশজন শ্রোতা আছেন। চিকিৎসা-বিশেষজ্ঞ আছেন একজন। চিকিৎসা-বিদ্যার চর্চায় ব্রত আছেন দশজন মুসলিম। তাদের জন্য মাদরাসাটি ওয়াকফ করা হয়। এতিমদের জন্য আছে একটি মক্তব। মাদরাসাটির সকলের জন্য রুটি, গোশত ও মিষ্টান্নের ব্যবস্থা আছে।
প্রত্যেকের জন্য পর্যাপ্ত খরচাদি নির্ধারিত রয়েছে। ৫ রজব বৃহস্পতিবার মাদরাসাটিতে দরস অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে খলিফা আল-মুসতানসির বিল্লাহ নিজেও উপস্থিত হন। তার রাজ্যের আমির-উমারা, উজিরবৃন্দ, বিচারকবৃন্দ, ফকিহগণ, সুফিগণ ও কবিরাও উপস্থিত হন। তাদের কেউই বাদ পড়েননি। মাদরাসায় বিশাল দস্তরখানে ভোজের আয়োজন করা হয়।
উপস্থিত সকলেই খাদ্য গ্রহণ করেন। বাগদাদের প্রত্যেক গলিতে বিশেষ ও সাধারণ সকল মানুষের ঘরে এই দস্তরখান থেকে খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়। মাদরাসার শিক্ষকদের, ফকিহদের ও সহকারীদের সবাইকে মূল্যবান বস্তু উপহার দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে যারা উপস্থিত ছিলেন তারাও মূল্যবান উপহার পান। দিনটি ছিল স্মরণীয়। কবিরা খলিফার প্রশস্তি ও স্তব বর্ণনা করে উৎকৃষ্ট মানের কবিতা আবৃত্তি করেন। ইবনুস সায়ি (১১৫) তার ইতিহাসগ্রন্থে এই ঘটনার বিস্তারিত ও মনোজ্ঞ বিবরণ দিয়েছেন। মাদরাসাটিতে শাফিয়ি মাযহাবের পাঠদানের জন্য নিযুক্ত করা হয় ইমাম মুহিউদ্দিন আবু আবদুল্লাহ ইবনে ফাদলানকে (১১৬), হানাফি মাযহাবের পাঠদানের জন্য নিযুক্ত করা হয় ইমাম আল্লামা রশিদুদ্দিন আবু হাফস উমর ইবনে মুহাম্মাদ আল-ফারগানিকে (১১৭) এবং ইমাম মুহিউদ্দিন ইউসুফ ইবনে শাইখ আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযিকে(১১৮) নিযুক্ত করা হয় হাম্বলি মাযহাবের পাঠদানের জন্য। সেদিন তার অনুপস্থিতিতে তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে দরস দান করেন তার পুত্র আবদুর রহমান (১১৯)। মুহিউদ্দিন ইউসুফ কোনো সম্রাটের কাছে পয়গাম পৌঁছানোর দায়িত্বে ছিলেন। মালিকি মাযহাবের পক্ষে দরস দান করেন আশ-শাইখ আস-সালেহ আবুল হাসান আল-মাগরিবি আল-মালিকি। তিনিও অন্যের স্থলাভিষিক্ত হয়ে দরস দান করেন। মালিকি মাযহাবের দরস দানের জন্য অন্য একজন শাইখকে নিযুক্ত করা হয়। গ্রন্থাগারও ওয়াকফ করা হয়। এটির গ্রন্থ-সমৃদ্ধি অভূতপূর্ব, কপিগুলোও চমৎকার, ওয়াকফকৃত গ্রন্থাবলিও অসাধারণ। (১২০)

আইয়ুবীয় সাম্রাজ্যে এত বেশি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে তা আমাদের মনোযোগ দাবি করে। এসব মাদরাসা-প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল শিয়া মতাদর্শের মূলোৎপাটন, যা আইয়ুবি শাসনের পূর্বে উবাইদিয়া রাজবংশের শাসনামল থেকে মিশরে শেকড় বিস্তার করে ছিল।
এ কারণে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ মিশরের সকল প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মাদরাসা-প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বারোপ করে। বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি এসব মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করছিলেন মানুষের মধ্যে ন্যায় ও ইনসাফ এবং নিরাপত্তা বিস্তারের উদ্দেশ্যে। ইবনুল আসির(১২১) ৫৬৬ হিজরির ঘটনাবলির বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, মিশরে দারুল মাউনা নামে একটি পুলিশ-কেন্দ্র ছিল। তারা যাকে চাইত তাকেই এতে বন্দি করে রাখত। সালাহুদ্দিন এটি গুঁড়িয়ে দেন এবং এটিকে শাফিয়ি মাযহাবের মাদ্রাসায় রূপান্তরিত করেন। এখানে যেসব জোরজুলুম ও অন্যায়-অবিচার হতো সেগুলোর অবসান ঘটান। (১২২)

ইসলামি মিশরের ইতিহাসে মাদরাসা-নির্মাণে যিনি প্রথম গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি হলেন সালাহুদ্দিন। তিনি আল-মাদরাসাতুস সালাহিয়্যা, আল-মাদরাসাতুন নাসিরিয়‍্যাহ ও আল-মাদরাসাতুল কামহিয়্যাহ (১২৩) প্রতিষ্ঠা করেন। (১২৪)

আমির-উমারা, ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ এবং ব্যবসায়ীরাও মাদরাসা-প্রতিষ্ঠায় প্রতিযোগিতা করতেন। মাদরাসাগুলো যাতে চালু থাকে এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে ছাত্ররা এসে অবৈতনিকভাবে পড়াশোনা করতে পারে তার জন্য সম্পত্তি ওয়াকফ করতেন। অসংখ্য মানুষ তাদের বাড়িকে মাদ্রাসায় রূপান্তরিত করেছিলেন। তারা তাদের সংগৃহীত গ্রন্থাবলি ও সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য ওয়াকফও করেছিলেন। এ কারণে প্রাচ্যে মাদরাসার সংখ্যা এত পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিল যে তা ছিল আশ্চর্যজনক ও হতবুদ্ধিকর। এমনকি আন্দালুসীয় পর্যটক ইবনে জুবায়ের প্রাচ্যে মাদরাসার আধিক্য ও মাদরাসার জন্য ওয়াকফকৃত সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত আয়ের প্রাচুর্য দেখে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি পশ্চিমের লোকদেরকে জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রাচ্যে আগমনের আহ্বান জানান। এ ব্যাপারে তিনি যা বলেছেন, তাতে এ কথাও ছিল, প্রাচ্যের সব দেশেই শিক্ষার্থীদের জন্য প্রচুর সম্পত্তি ওয়াকফ করা হয়। বিশেষ করে দামেশকে সবচেয়ে বেশি...। আমাদের পশ্চিমের (মাগরিবের) সন্তানদের মধ্যে যারা সফলকাম হতে চায় তারা যেন এসব দেশে ভ্রমণ করে। তারা তালিবুল ইলমদের জন্য সহায়ক বস্তুরাশির প্রাচুর্য এখানে পাবে। তার প্রথমটি হলো জ্ঞানচর্চার জন্য রুটিরুজির চিন্তামুক্ত হওয়া। (১২৫)

সুলতানগণ এবং আমির-উমারা যে মাদরাসা-নির্মাণ ও মাদরাসায় সাহায্য-সহযোগিতায় প্রতিযোগিতা করতেন তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। গজনি ও ভারতবর্ষের অন্যান্য অংশের সুলতান ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মাসউদ নিজের জন্য কোনো ঘরও নির্মাণ করেননি, কিন্তু তিনি মাদরাসা-নির্মাণ ও সাহায্য-সহযোগিতায় সবার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। (১২৬)

ইসলামি সভ্যতায় নারীদেরও এই সভ্যতার ছেলে-মেয়েদের জন্য হিতকর মাদরাসা নির্মাণের অধিকার ছিল। সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির বোন সাইয়িদা রাবিয়া খাতুন বিনতে আইয়ুব হাম্বলি মাযহাবের পাঠদানের জন্য দামেশকের কাসিয়ুন পাহাড়ের পাদদেশে আল-মাদরাসাতুস সাহিবিয়্যাহ (মাদরাসাতুস সাহিবাহ) প্রতিষ্ঠা করেছেন। (১২৭)

বাগদাদে অবস্থিত মাদরাসাগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে ইবনে জুবায়ের বলছেন, বাগদাদে প্রায় ত্রিশটি মাদরাসা রয়েছে। সবগুলোই বাগদাদের পূর্বাংশে। প্রত্যেকটি মাদরাসার নির্মাণশৈলীর কাছে সুরম্য অট্টালিকাও তুচ্ছ। এসব মাদরাসার মধ্যে সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত হলো নিযামিয়া মাদরাসা। এটি নির্মাণ করেছেন নিযামুল মুলক। ৫০৪ হিজরিতে মাদরাসাটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। এই মাদরাসার জন্য ওয়াকফের পরিমাণ বিপুল, ভূসম্পত্তিও প্রচুর। ওয়াকফকৃত সম্পত্তি থেকে মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ফকিহদের ব্যয়নির্বাহ করা হয় এবং অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা হয়। (১২৮)

মিশরে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাগুলো সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন বিশ্বপর্যটক ইবনে বতুতা। তিনি বলছেন, মিশরে মাদরাসার সংখ্যা এত বেশি যে কেউ তার সংখ্যা সঠিকভাবে নিরূপণ করতে পারবে না। (১২৯) আল-মাকরিযি উল্লেখ করেছেন যে, মিশরে সত্তরটিরও বেশি মাদরাসা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। (১৩০)

সেই সময়ে ইসলামি বিশ্বে মাদরাসার অবস্থা কীরূপ ছিল তার বিবরণ পাওয়া যায় বুতরুস আল-বুস্তানি(১৩১) যে বক্তব্য উদ্ধৃত করেছে তা থেকে। তাতে বলা হয়েছে, আরবদের মাদরাসাগুলো ছিল জ্ঞানে উজ্জ্বল, বাগদাদ থেকে কর্ডোভা পর্যন্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল সেগুলো। তাদের মহাবিদ্যালয় ছিল সতেরোটি। কর্ডোভার মহাবিদ্যালয়টি ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত। বলা হয়ে থাকে, এই মহাবিদ্যালয়ে যে গ্রন্থাগার ছিল তাতে ৬ লাখ কপি বই ছিল। তারা রূপমূলতত্ত্ব (ইলমুস সারফ), ব্যাকরণ, ছন্দতত্ত্ব, ইতিহাস, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়ন, গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র ইত্যাদি অধ্যয়ন করত। তাদের প্রত্যেক মসজিদের পাশে প্রাথমিক মাদরাসা ছিল। এতে তারা পাঠ ও হস্তলিপি শিক্ষা দিত। (১৩২)

এখানে আরও উল্লেখ্য যে, এসব মাদরাসায় পঠনপাঠন কেবল ধর্মীয় জ্ঞানে সীমাবদ্ধ ছিল না। ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি প্রকৃতিবিজ্ঞানও শিক্ষা দেওয়া হতো। যেমন প্রকৌশল, চিকিৎসা, গণিত ইত্যাদি। বরং কিছু কিছু মাদরাসা এসব প্রকৃতিবিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়ায় বিশেষায়িত ছিল। প্রকৃতিবিজ্ঞানের জন্য কয়েকটি বিশেষ মাদরাসা ছিল। হাসপাতালগুলোতে তারা চিকিৎসাশাস্ত্র শেখাত। (১৩৩)

আন্দালুসে প্রাথমিক মাদরাসা ছিল অসংখ্য। তবে এসব মাদরাসায় শিক্ষার বিনিময়ে পারিশ্রমিক দেওয়ার রীতি ছিল। এ কারণে উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় হাকাম (মৃ. ৩৬৬ হি.) দরিদ্র মানুষের সন্তানদের বিনা পয়সায় শিক্ষাদানের জন্য সাতাশটি মাদরাসা বৃদ্ধি করেছিলেন। মেয়েরাও ছেলেদের মতো মাদরাসায় যেত, সমানভাবেই।

উচ্চশিক্ষার দায়িত্বে ছিলেন স্বতন্ত্র পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ। তারা এসব মাদরাসায় বক্তৃতা দিতেন। কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরুদণ্ডরূপে যে শিক্ষাকাঠামো রয়েছে তা আন্দালুসে উমাইয়া খেলাফতের সময় গঠিত হয়েছে। একইভাবে গ্রানাডা, তুলাইতালা (টলেডো), সেভিল, মুরসিয়া (Murcia), আলমেরিয়া, ভ্যালেন্সিয়া ও কাদিজে মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (১৩৪)

মাগরিবের আমির-উমারা ও সুলতানগণ মাদরাসা-নির্মাণে গুরুত্ব দিয়েছেন। মুরাবিত রাজন্যবর্গ নগরীতে ও প্রত্যন্ত এলাকায় বিশেষ করে সুস অঞ্চলে (১৩৫) বহু মাদরাসা নির্মাণ করেছেন। এসব মাদরাসা বিভিন্ন শাস্ত্রে পারদর্শী ও বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতের জন্ম দিয়েছে। এমন জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির সংখ্যা অনেক। তাদের জ্ঞান তাদেরকে ইসলামি বিশ্বের চিন্তাশীল মানুষদের কাতারে জায়গা করে দিয়েছে। সুস অঞ্চলে মাদরাসা ছিল প্রায় চারশ। মুহাম্মাদ আল-মুখতার আস-সুসি(১৩৬) তার রচিত গ্রন্থ 'সুস আল-আলিমা'-য় সুসের পঞ্চাশটি মাদরাসা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন (১৩৭) এবং 'মাদারিস সুস আল-আতিকা' গ্রন্থে আলোচনা করেছেন একটি মাদরাসা সম্পর্কে। (১৩৮)

মুসলিম গোত্রগুলোই এসব মাদরাসার অর্থায়ন করত। তাদের ভূমিতে উৎপন্ন ফসলের এক দশমাংশের কিয়দংশ এসব মাদরাসার জন্য নির্ধারিত ছিল। মাদরাসার সুরক্ষা ও খরচাদির জন্য তারা মালিকানাধীন অনেক সম্পত্তি ওয়াকফও করে দিয়েছিল। মাদরাসার যাবতীয় ব্যয়ভার তারা বহন করত। সুস অঞ্চলের মুসলিম গোত্রগুলো পাহাড়ে ও সমতলভূমিতে মাদরাসা-নির্মাণের প্রতিযোগিতা করত। প্রত্যেক গোত্রেরই মাদরাসা থাকত একটি বা দুটি বা তিনটি। মুরাবিত রাজন্যবর্গের শাসনামলে যেসব মাদরাসা নির্মিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো-ইতিপূর্বে যেগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো ছাড়াও-'মাদারিসে সাবতা' (১৩৯)। এ ছাড়া তানজা (১৪০), আগমাত (১৪১), সিজিলমাসা (১৪২), তিলিমসান (১৪৩) ও মারাকেশে কয়েকটি বিখ্যাত মাদরাসা রয়েছে। এসব মাদরাসা কায়রাওয়ানের জ্ঞানসম্ভার এবং আন্দালুসের বিখ্যাত সংস্কৃতির আশ্রয়ে গড়ে উঠেছিল। বড় বড় মনীষীর জন্ম হয়েছে এসব মাদরাসা থেকে। তাদের মধ্যে রয়েছেন কাজি ইয়ায (১৪৪) এবং আবুল ওয়ালিদ ইবনে রুশদ (১৪৫)। তিনি কিতাবুল মুকাদ্দিমাতিল আওয়ায়িলি লিল-মুদাওয়ানাতি, আল-বায়ান ওয়াত-তাহসিল ওয়াত-তাওজিহ ওয়াত-তালিল ও অন্যান্য মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। (১৪৬)

যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার তা এই যে, প্রাচ্যের ও মাগরিবের (মরক্কোর) এসব শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত ভরণপোষণ পেত। খাদ্য, পানীয়, বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় অর্থ-সবই পেত তারা। এ কারণেই ইসলামি সভ্যতার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক শহরের পরিচয় ঘটেছে পাশ্চাত্যের চেয়ে কয়েকশ বছর আগে। ৭২১ হিজরিতে মরক্কোয় মারিনীয় (১৪৭) সাম্রাজ্যের সুলতান আবু সাইদ উসমান ইবনে ইয়াকুব (মৃ. ৭৩১ হি.) (১৪৮) নতুন ফাসে (নিউ ফেজ) যে মাদরাসাটি রয়েছে তা নির্মাণের নির্দেশ দেন। একটি মজবুত ও সুরম্য অট্টালিকা নির্মাণ করা হয়। কুরআন অধ্যয়নের জন্য শিক্ষার্থীদের ভর্তি করেন এবং শিক্ষকতার জন্য ফকিহদের নিযুক্ত করেন। তাদের জন্য মাসিক ভাতা, বেতন ও অন্যান্য খরচাদি নির্ধারণ করে দেন। মাদরাসাটির জন্য বাড়ি ও ভূসম্পত্তি ওয়াকফ করেন। শিক্ষার প্রতি অনুরাগ ও আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান লাভের আশাতেই তিনি এসব কাজ সম্পাদন করেন। (১৪৯)

মরক্কোর মারিনীয় যেসব সুলতান মাদরাসা-নির্মাণের ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে বিখ্যাত হলেন সুলতান আবু সাইদ। ৭২৩ হিজরির শাবান মাসের শুরুতে সুলতান আবু সাইদ ফাসে জামে আল-কারয়িয়িয়নের পাশে (উত্তরে) সবচেয়ে বড় মাদরাসাটি নির্মাণের নির্দেশ দেন। সেটি আজ মাদরাসাতুল আত্তারিন নামে পরিচিত। মাদরাসাটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন শাইখ আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবনে কাসিম আল-মিযওয়ার এবং একদল ফকিহ ও কল্যাণকামী ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে সুলতান আবু সাইদ নিজেও উপস্থিত থাকেন। মাদরাসাটির নির্মাণকাজ সুলতানের উপস্থিতিতেই শুরু হয়। নির্মাণকাজ শেষ হলে এই মাদরাসা মারিনীয় সাম্রাজ্যের আশ্চর্যজনক স্থাপত্যে পরিণত হয়। তার আগে কোনো সুলতান এমন মাদরাসা নির্মাণ করেননি। মাদরাসার প্রাঙ্গণে সেখানকার ঝরনা থেকে প্রবহমান পানি আনার জন্য নালা তৈরি করা হয়। শিক্ষার্থীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠানটি মুখরিত হয়ে ওঠে। সুলতান মাদরাসাটির জন্য একজন ইমাম, দুজন মুয়াজ্জিন ও একদল কর্মচারী নিয়োগ দেন। শিক্ষকতার জন্য ফকিহদের নিযুক্ত করেন। মাদরাসার প্রত্যেকের জন্য নির্ধারণ করেন পর্যাপ্তেরও বেশি ভাতা, বেতন ও খোরপোশ। কয়েকটি তালুক কিনে তা মাদরাসার জন্য ওয়াকফ করেন এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই। (১৫০)

অসংখ্য মাদরাসা নির্মিত হয়েছে বলে মামলুক শাসনামলের খ্যাতি রয়েছে। মামলুক আমির-উমারা ও সুলতানরা ধর্মীয় ও সাধারণ মাদরাসা নির্মাণে প্রতিযোগিতা করেছেন এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ অট্টালিকা ও ভবন নির্মাণ করেছেন। এসব মাদরাসায় তারা শ্রেষ্ঠ ও বড় বড় আলেমদের নিযুক্ত করেছেন। শাইখ ইযযুদ্দিন আবদুল আযিয ইবনে আবদুস সালাম (১৫১) ৬৫০ হিজরিতে বাইনাল কাসরাইন (১৫২)-এ অবস্থিত আল-মাদরাসাতুস সালাহিয়্যায় পাঠদান করেছেন। (১৫৩) এই মাদরাসায় ৬৮০ হিজরিতে পাঠদান করেছেন তাকিউদ্দিন ইবনে বিন্ত আল-আ'আয(১৫৪)। ৭৭৯ হিজরিতে আল-মাদরাসাতুন নাসিরিয়‍্যায় পাঠদান করেছেন সিরাজুদ্দিন আল-বুলকিনি (১৫৫)। বিখ্যাত ঐতিহাসিক আবদুর রহমান ইবনে খালদুন ৭৮৬ হিজরিতে পাঠদান করেছেন আল-মাদরাসাতুল কামহিয়্যায় এবং মামলুক রাজবংশের ইতিহাসজুড়ে প্রখ্যাত আলেম-উলামা এসব মাদরাসায় পাঠদান করেছেন। (১৫৬)

আলেম-উলামা, ফকিহগণ, সাধারণ মানুষ এবং তাদের সঙ্গে সুলতানরাও কোনো মাদরাসা উদ্বোধনের সময় বড় ধরনের মাহফিল ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। ৬৬১ হিজরিতে আল-মালিক আয-যাহির বাইবার্স আল-মাদরাসাতুয যাহিরিয়‍্যাহ উদ্বোধন করেন। বাইনাল কাসরাইন-এ মাদরাসা-ভবনের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হলে এখানে আলেম-উলামা সবাই সমবেত হন। কারিরা উপস্থিত হন এবং প্রত্যেক মাযহাবের অনুসারীরা তাদের জন্য নির্ধারিত হলঘরে বসেন। হানাফি মাযহাবের পাঠদানের সূচনা করেন মাজদুদ্দিন আবদুর রহমান ইবনুস সাহিব কামালুদ্দিন ইবনুল আদিম, শাফিয়ি মাযহাবের পাঠদানের সূচনা করেন শাইখ তাকিউদ্দিন মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ইবনে রাযিন। কুরআনের দরসদানের সূচনা করার জন্য মনোনীত করা হয় ফকিহ কামালুদ্দিন আল-মাহাল্লিকে এবং হাদিসে নববির পাঠদানের সূচনা করার জন্য শাইখ শারফুদ্দিন আবদুল মুমিন ইবনে খাল্‌ল্ফ আল-দিময়াতিকে মনোনীত করা হয়। তারা সবাই দরসদান করেন। দস্তরখানা বিছানো হয়। জামালুদ্দিন আবুল হাসান আল-জাযযার (১৫৭) কবিতা আবৃত্তি করেন ...। আরও কয়েকজন কবি কবিতা পাঠ করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সিরাজ আল-ওয়াররাক, শাইখ জামালুদ্দিন ইউসুফ ইবনুল খাশশাব। তাদের সবাইকে সম্মানসূচক পোশাক পরিধান করানো হয়। দিনটি ছিল স্মরণীয়। সুলতান এই মাদরাসাকে অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থের ভান্ডারে পরিণত করেন। মাদরাসার পাশেই এতিমদের জন্য একটি মক্তব নির্মাণ করেন। মক্তবের এতিম শিশুদের জন্য প্রতিদিন রুটি এবং প্রত্যেক শীতে ও গ্রীষ্মে পোশাক বরাদ্দ দেওয়ার নির্দেশ দেন। (১৫৮)

অসংখ্য মামলুক আমির ছিল যারা তাদের বাড়ির পাশে মাদরাসা নির্মাণ করেছেন। মাদরাসার প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার আগ্রহ থেকেই তারা এ কাজটি করেছেন। ৭৩০ হিজরিতে আমির আলাউদ্দিন মুগলতাই আল-জামালি (১৫৯) তার বাড়ির পাশে একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন। মাদরাসাটি কায়রোর দারব-মুলুখিয়ার কাছেই। তিনি এই মাদরাসার জন্য বহু সম্পত্তি ওয়াকফ করেন। (১৬০)

মামলুক শাসনামলে কিছু মাদরাসা পাঠদানের পাশাপাশি আরও একটি ভূমিকা পালন করত। এসব মাদরাসা বিচারালয় ও আদালত হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বড় বড় অপরাধের বিচার-মীমাংসা হতো। ইবনে সাবআ নামের এক লোক ছিল ভয়ংকর অপরাধী। তার বিচার হয়েছিল এমন একটি মাদরাসা-আদালতে। শাফিয়ি মাযহাবপন্থী ফকিহগণ তাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং তাকে বন্দি করেন। অন্যদিকে মালিকি মাযহাবপন্থী ফকিহগণ তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং হত্যা করার নির্দেশ দেন। বাইনাল কাসরাইন-এ অবস্থিত আল-মাদরাসাতুস সালাহিয়্যায় ৭৯১ হিজরিতে এই বিচারকার্য সম্পন্ন হয়।

পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান (Experimental science) ও প্রায়োগিক বিজ্ঞানের (Applied Science) জন্য বিশেষায়িত কিছু মাদরাসাও ছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়নের জন্য কিছু বিশেষ মাদরাসা। যেমন দামেশকের আল-মাদরাসাতুয যাহিরিয়‍্যাহ আল-বারানিয়‍্যাহ। এই মাদরাসায় মুসলিমবিশ্বের প্রখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের সমাবেশ ঘটেছিল। ৭২৪ হিজরিতে সে যুগের বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী নাজমুদ্দিন আবদুর রহিম ইবনে আশ-শাহহাম আল-মাওসিলি (১৬১) অতিথি শিক্ষক হিসেবে আল-মাদরাসাতুয যাহিরিয়‍্যাহ আল-বারানিয়‍্যাহতে যোগদান করেন। তার আগে তিনি উজবেকের (উজবেকিস্তানের) বিভিন্ন দেশে কয়েক বছরব্যাপী ভ্রমণ করে চিকিৎসাশাস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। (১৬২) দামেশকে আল-মাদরাসাতুদ দাখওয়ারিয়‍্যাহ প্রতিষ্ঠিত হয় জামে আল-উমায়ির প্রতিষ্ঠার পূর্বেই। এটি ছিল সিরিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত মাদরাসা ও চিকিৎসামহাবিদ্যালয়। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ৬২১ হিজরিতে। (১৬৩) মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন প্রখ্যাত শামীয় (সিরিয়ান) চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদ আদ-দাখওয়ার আবদুর রহিম ইবনে আলি হামিদ(১৬৪)। তিনি ছিলেন এই মাদরাসার ওয়াকফকারী (মুতাওয়াল্লি) ও চিকিৎসা-বিভাগের প্রধান (শাইখুত তিব্ব)। বিখ্যাত চিকিৎসক ইবনে আবি উসাইবিআ(১৬৫) তার প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি ছিলেন অনন্য ও যুগশ্রেষ্ঠ, সমকালে তার মতো কেউ ছিল না। তিনি ছিলেন চিকিৎসাশাস্ত্রের শীর্ষগুরু এবং তিনি এর উপযুক্তও ছিলেন। চিকিৎসা-গবেষণায় নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন। অবশেষে যুগশ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিদে পরিণত হয়েছেন এবং রাজাবাদশাদের কাছে মূল্যায়ন পেয়েছেন। (১৬৬)

মিশরে কিছু মাদরাসা ছিল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের। এগুলোতে বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগ ছিল। যেমন আল-মাদরাসাতুল মানসুরিয়‍্যাহ। কায়রোর বাইনাল কাসরাইনে এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মিশরের সুলতান আল-মানসুর সাইফুদ্দিন কালাউন আল-আলফি। তাতে ফিকহি মাযহাবভিত্তিক পাঠদানের আলাদা আলাদা বিভাগ ছিল। প্রত্যেক মাযহাবের বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ও নির্ধারিত স্থান ছিল। একইভাবে চিকিৎসাশাস্ত্রের পাঠদানের জন্য আলাদা বিভাগ ছিল। হাদিস বিভাগ ছিল, তাফসিরুল কুরআন বিভাগ ছিল। সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য শ্রেষ্ঠ ফকিহ ও পণ্ডিতগণ এসব বিভাগে পাঠদান করতেন। (১৬৭)

কতিপয় ঐতিহাসিক রচনায় প্রত্যেক শহরে অবস্থিত উপরিউক্ত মাদরাসাগুলোর হাল-হাকিকত বর্ণনার ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেমন আবদুল কাদির ইবনে মুহাম্মাদ আন-নুয়াইমি আদ-দিমাশকি (মৃ. ৯২৭ হি.) (الدارس في تاريخ المدارس ) আদ-দারিস ফি তারিখিল মাদারিস নামে তার বিখ্যাত গ্রন্থটি রচনা করেছেন। এই গ্রন্থে নিম্নবর্ণিত অধ্যায়গুলো রয়েছে:
فصل : دور القرآن الكريم (অধ্যায়: কুরআন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ)
فصل : دور الحديث الشريف (অধ্যায়: হাদিস শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ)
فصل : دور القرآن والحديث معا (অধ্যায়: কুরআন ও হাদিস শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ)
فصل : مدارس الطب (অধ্যায়: চিকিৎসা-বিদ্যালয়সমূহ)
فصل : الخوانق (অধ্যায়: খানকা)
فصل : الرباطات (অধ্যায়: রাবাত বা সুফিগৃহসমূহ)
فصل : الزوايا (অধ্যায় : যাবিয়াসমূহ) (১৬৮)
فصل : الترب (অধ্যায়: কবরস্থানসমূহ)
فصل : المساجد والجوامع (অধ্যায় : ছোট মসজিদ ও জামে মসজিদসমূহ)

এসব অধ্যায় ছাড়া তিনি একটি পরিশিষ্ট যুক্ত করেছেন। তার বর্ণনাশৈলী এরূপ : প্রথমে তিনি মাদরাসা বা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করেছেন, সেটির অবস্থান কোথায় তার যথার্থ বর্ণনা দিয়েছেন, তারপর প্রতিষ্ঠাতার সংক্ষিপ্ত জীবনী উল্লেখ করেছেন। মাদরাসার জন্য ওয়াকফকৃত সম্পত্তির সংখ্যা বর্ণনা করেছেন। তারপর লেখকের জীবদ্দশা পর্যন্ত মাদরাসায় যে-সকল শিক্ষক পাঠদান করেছেন তাদের নাম ও সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত উল্লেখ করেছেন। জ্ঞাতব্য যে, এই গ্রন্থে কেবল দামেশকের মাদরাসা ও মসজিদের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, অন্যকোনো শহরের নয়।

আল-মাকরিযিও তার রচিত বিখ্যাত বিশ্বকোষ আল-মাওয়ায়িয ওয়াল- ইতিবারি বিযিকরিল খুতাতি ওয়াল-আসার-এ মাদরাসার অনুরূপ বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জ্ঞানপিপাসুদের জন্য এক বিরাট কীর্তি রেখে গেছেন। আইয়ুবি শাসনামল ও মামলুকি শাসনামলে কায়রোতে যত মাদরাসা ছিল তার সবগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন। (১৬৯)

মুসলিমরা ইসলামি সমাজের সর্বস্তরে মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দিয়েছেন। এটা থেকে প্রমাণিত হয় যে, এই সভ্যতা জ্ঞানকে যাবতীয় প্রগতি ও উন্নতির ভিত্তি বলে স্থির করেছে এবং ধনী ও দরিদ্র, বড় ও ছোট, পুরুষ ও নারী সকলের মধ্যে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বের সামনে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ফলে ইসলামি সভ্যতা কয়েক শতাব্দীব্যাপী জ্ঞানগত উৎকর্ষের চূড়ায় অবস্থান করেছে।

টিকাঃ
১০০. সাবুর ইবনে আরদাশির : আবু নাসর সাবুর ইবনে আরদাশির (মৃ. ৪১৬) বাহাউদ দাওলা আবু নাসর ইবনে আদুদ দাওলার উজির (মন্ত্রী) ছিলেন। শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রীদের অন্যতম ছিলেন। সাবুর ছিলেন দুঃসাহসী, তাকে দেখলেই সবার সমীহ জাগত। ছিলেন বদান্য ও সৌজন্যশীল এবং প্রশংসাভাজন। বাগদাদে দারুল ইলম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৭, পৃ. ৩৮৭; ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ২, পৃ. ৩৫৪।
১০১. বাগদাদের পশ্চিম অর্ধাংশের ঐতিহাসিক নাম কারখ।
১০২. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১১, পৃ. ৩১২।
১০৩. সাদির ইবনে আবদুল্লাহ: আল-মাদরাসাতুস সাদিরিয়্যাহর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি দামেশকের জামে উমাবির (উমাবি জামে মসজিদের) পশ্চিম ফটকের সামনে বাবুল বারিদে ৪৯১ হিজরিতে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। দেখুন, ইবনে আসাকির, তারিখে দিমাশক, খ. ৫২, পৃ. ৪৬।
১০৪. আবদুল কাদির আন-নাইমি, আদ-দারিস ফি তারিখিল মাদারিস, খ. ১, পৃ. ৪১৩।
১০৫. রাশা ইবনে নাযিফ: আবুল হাসান রাশা ইবনে নাযিফ ইবনে মাশাআল্লাহ আদ-দিমাশকি (৩৭০-৪৪৪ হি./৯৮০-১০৫২ খ্রি.)। কারি ও প্রখ্যাত আলেম। তিনি সিরিয়ার মাআররায় জন্মগ্রহণ করেন এবং শিক্ষা অর্জন করেন সিরিয়া, মিশর ও ইরাকে। দামেশকেই জীবন অতিবাহিত করেন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ২১।
১০৬. আরিফ আবদুল গনি, নুযুমুত তালিম ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ৮৯।
১০৭. নিযামুল মুলক আত-তুসি: আবু আলি আল-হাসান ইবনে আলি আত-তুসি, উপাধি, নিযামুল মুলক (৪০৮-৪৮৫ হি./১০১৮-১০৯২ খ্রি.)। তুসের নুকান এলাকায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত হন। সুলতান মুহাম্মাদ আলপ আরসালানের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে এবং তিনি তাকে উজির নিযুক্ত করেন। বাগদাদের সবচেয়ে বড় মাদরাসা এবং অন্যান্য মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ১৯, পৃ. ৯৪; ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, খ. ২, পৃ. ২০২।
১০৮. মুস্তাফা আস-সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ১০৩-১০৪।
১০৯. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১২, পৃ. ৯২।
১১০. প্রাগুক্ত, খ. ১২, পৃ. ১৬৯।
১১১. আবুল মাআলি আল-জুওয়াইনি : আবদুল মালিক ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ আল-জুওয়াইনি (৪১৯-৪৭৮ হি./১০২৮-১০৮৫ খ্রি.)। উপাধি, ইমামুল হারামাইন, ফাখরুল ইসলাম। ইমামদের ইমাম। শাফিয়ি মাযহাবপন্থী বিখ্যাত ফকিহ। ইমাম গাযালির উস্তাদ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: নিহায়াতুল মাতলাব ফি দিরায়াতিল মাযহাব। দেখুন, তাকিউদ্দিন আস-সিরফিনি রচিত আল-মুনতাখাব মিন কিতাবিস সিয়াক লি-তারিখি নিসাবুর, খ. ১, পৃ. ৩৬১।
১১২. ইবনুল জাওযি, আল-মুনতাযাম, খ. ৯, পৃ. ১৬৭।
১১৩. আবদুল হাদি মুহাম্মাদ রেজা, নিযামুল মুলক, পৃ. ৬৫১।
১১৪. জোহান হুইজিঙ্গা, The Waning of the Middle Ages (১৯২৪), আরবি অনুবাদ, اضمحلال العصور الوسطى , পৃ. ১৭৫।
১১৫. ইবনুস সায়ি: আবু তালিব আলি ইবনে আনজাব ইবনে উসমান ইবনে আবদুল্লাহ (৫৯৩-৬৭৪ হি./১১৯৭-১২৭৫ খ্রি.)। বিখ্যাত ইতিহাসলেখক। বাগদাদে জন্ম ও মৃত্যু। আল-মাদরাসাতুল মুসতানসিরিয়্যাহর গ্রন্থাগারের জিম্মাদার ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো পঁচিশ খণ্ডে রচিত আল-জামিউল মুখতাছার ফি উনওয়ানিত তাওয়ারিখি ওয়া উয়ুনিস সিয়ার। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ২৬৫।
১১৬. ইবনে ফাদলান: মুহিউদ্দিন আবু আবদুল্লাহ ইবনে ফাদলান আল-বাগদাদি আশ-শাফিয়ি (মৃ. ৬৩১ হি./১২৩৩ খ্রি.)। আল-মাদরাসাতুল মুসতানসিরিয়্যাহর শিক্ষক, প্রধান বিচারক। শাফিয়ি মাযহাবের উঁচু স্তরের আলেম। খোরাসান ভ্রমণ করেছেন এবং সেখানকার আলেমদের সঙ্গে আলোচনা-পর্যালোচনায় অংশ নিয়েছেন। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল-ওয়াফায়াত, খ. ৫, পৃ. ১৩২।
১১৭. আল-ফারগানি: উমর ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে হুসাইন ইবনে আবু উমর ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবু নাসর আল-আন্দাকানি ৬৩২ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, ইবনে আবুল ওয়াফা আল-কুরাশি, আল-জাওয়াহিরুল মুদিয়্যা ফি তবাকাতিল হানাফিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৬৬২-৬৬৩।
১১৮. ইউসুফ আল-জাওযি: মুহিউদ্দিন ইউসুফ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আলি ইবনুল জাওযি আল-কুরাশি আল-বাগদাদি (৫৮০-৬৫৬ হি./১১৮৫-১২৫৮ খ্রি.)। 'আস-সাহিব ইবনুল জাওযি' নামে পরিচিত। আল্লামা আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযি নামে পরিচিত। তার পিতা ও অন্যদের কাছে জ্ঞান অর্জন করেছেন। বাগদাদের অন্যায়-প্রতিরোধ প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করেছেন। ওয়াকফ-পরিদর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন। তাতার ঘাতকরা তাকে হত্যা করে। তাদের প্রতিহত করতে গিয়ে তিনি ও তার তিন পুত্র শহিদ হন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৮, পৃ. ২৩৬।
১১৯. আবদুর রহমান ইবনে ইউসুফ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আলি ইবনুল জাওযি। তার পিতার সঙ্গে শহিদ হন। বাগদাদে হালাকুখানের অনুপ্রবেশের সময় (৬৫৬ হি./১২৫৮ খ্রি.) নিহত হন। তিনি তখন মাত্র পঞ্চাশ পেরিয়েছেন। তার একটি কাব্যসংকলন আছে। দেখুন, উমর রেজা কাহহালা, মুজামুল মুআল্লিফিন, খ. ৫, পৃ. ২০০।
১২০. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১৩, পৃ. ১৩৯-১৪০।
১২১. ইবনুল আসির, আবুল হাসান আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল কারিম আল-জাযারি (৫৫৫-৬৩০ হি./১১৬০-১২৩৩ খ্রি.)। বিখ্যাত ও বিদগ্ধ ঐতিহাসিক। জাযিরা ইবনে উমরে জন্মগ্রহণ করেন এবং মসুলে মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : التاريخ الباهر في الكامل في التاريخ , اللباب في تهذيب الأنساب أسد الغابة في معرفة الصحابة والدولة الأتابكية আলামিন নুবালা, খ. ২২, পৃ. ৩৫৪-৩৫৬।
১২২. ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, খ. ১০, পৃ. ৩১-৩২।
১২৩. আল-মাদরাসাতুল কামহিয়্যাহ নামকরণের কারণ হলো এই মাদরাসায় নিযুক্ত ফকিহদের জন্য গমের (কামহ) চাষ করা হতো। মাদরাসাটির জন্য মধ্য মিশরের ফাইয়ুম এলাকায় এক বিশাল ভূমি ওয়াকফ করেছিলেন সালাহুদ্দিন। এখানে গমের চাষ হতো। দেখুন, ইবনে ওয়াসিল, মুফাররিজ আল-কুরুব, খ. ১, পৃ. ১৯৭-১৯৮।
১২৪. মাকরিযি, আল-মাওয়ায়িয ওয়াল-ইতিবারী বিযিকরিল খুতাতি ওয়াল-আসার, খ. ৫, পৃ. ১৩৭।
১২৫. ইবনে জুবায়ের: রিহলাহ ইবনে জুবায়ের, পৃ. ২৫৮।
১২৬. ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১২, পৃ. ১৫৭।
১২৭. প্রাগুক্ত, খ. ১২, পৃ. ৩১৭।
১২৮. ইবনে জুবায়ের, রিহলাহ ইবনে জুবায়ের, পৃ. ২০৫।
১২৯. রিহলাহ ইবনে বতুতা, পৃ. ২০।
১৩০. মাকরিযি, আল-মাওয়ায়িয ওয়াল-ইতিবারি বিযিকরিল খুতাতি ওয়াল-আসার, খ. ২, পৃ. ৩৬২-৪০০।
১৩১. বুতরুস আল-বুস্তানি (১৮১৯-১৮৮৩ খ্রি.): বুতরুস ইবনে পল ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে কারাম আল-বুস্তানি। বিভিন্ন শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি লেবাননের খারুব প্রদেশের দিব্বিয়ায় একটি ম্যারোনাইট খ্রিষ্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দেখুন, উমর রেজা কাহহালা, মুজামুল মুআল্লিফিন, খ. ৩, পৃ. ৪৮।
১৩২. বুস আল-বুস্তানি, দাইরাতুল মাআরিফ, খ. ৬, পৃ. ১৬১-১৬২; আবদুল্লাহ মাশুখি, মাওকিফুল ইসলাম ওয়াল-কানিসাহ মিনাল ইলম, পৃ. ৫৯ থেকে উদ্ধৃত।
১৩৩. প্রাগুক্ত।
১৩৪. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১৩, পৃ. ৩০৬।
১৩৫. Souss-Massa-Drâa.
১৩৬. আল-মুখতার আস-সুসি: মুহাম্মাদ আল-মুখতার ইবনে আলি ইবনে আহমাদ আল-ইলগি আস-সুসি (১৩১৮-১৩৮৩ হি./১৯০০-১৯৬৩ খ্রি.) ছিলেন ইতিহাসবিদ, ফকিহ, আদিব। তিনি মুখে মুখে কবিতা বলতেন। ওয়াজির আত-তাজ হিসেবে পরিচিত। তার আরও কয়েকটি গ্রন্থ: رجال العلوم العربية في سوس ، خلال جزولة في أربعة أجزاء المعسول في عشرين جزءا
দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৭, পৃ. ৯৩।
১৩৭. মুহাম্মাদ আল-মুখতার আস-সুসি, সুস আল-আলিমা, পৃ. ১৫৪-১৬৭।
১৩৮. মুহাম্মাদ আল-মুখতার আস-সুসি, মাদারিস সুস আল-আতিকা, পৃ. ৯৩-১৩৪।
১৩৯. সাবতা: Ceuta, Spain.
১৪০. তানজা: Tangier, Morocco.
১৪১. আগমাত: Aghmat, Morocco.
১৪২. সিজিলমাসা: Sijilmassa, Morocco.
১৪৩. তিলিমসান: Tlemcen, Algeria.
১৪৪. কাজি ইয়ায: আবুল ফযল ইয়ায ইবনে মুসা ইবনে ইয়ায আল-ইয়াহসুবি আস-সাবতি (৪৭৬-৫৪৪ হি./১০৮৩-১১৪৯ খ্রি.)। হাদিস, ইলমুল হাদিস, ব্যাকরণ, ভাষা, আরবদের কথা, ইতিহাস ও বংশতালিকাবিদ্যা ইত্যাদিতে তার যুগের ইমাম ছিলেন। তার জন্ম সাবতায় এবং তিনি এখানকার বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তারপর তিনি গ্রানাডার বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন। মারাকেশে মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আয়ান, খ. ৩, পৃ. ৪৮৩-৪৮৫।
১৪৫. ইবনে রুশদ: আবুল ওয়ালিদ মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে আহমাদ ইবনে রুশদ আল-কুরতুবি (৫২০-৫৯৫ হি./১১২৬-১১৯৮ খ্রি.)। ইবনে রুশদ আল-হাফেয (নাতি ইবনে রুশদ) নামে বিখ্যাত। তিনি দার্শনিক ইবনে রুশদের নাতি। কাজি ইয়াযের শিক্ষক। কর্ডোভায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং কর্ডোভার প্রধান বিচারক ছিলেন। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ২১, পৃ. ৩০৭-৩০৯; ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি, শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব, খ. ৪, পৃ. ৩৬৭।
১৪৬. হাসান আস-সায়িহ, আল-হাদারাতুল মাগরিবিয়্যা, খ. ২, পৃ. ৬৪।
১৪৭. المرينيون / The Marinid Sultanate.
১৪৮. আবু সাইদ উসমান ইবনে ইয়াকুব ইবনে আবদুল হক (৬৭৫-৭৩১ হি./১২৭৫-১৩৩১ খ্রি.) ছিলেন মরক্কোর দশম মারিনীয় সুলতান। তিনি একুশ বছর চারমাস রাজত্ব পরিচালনা করেন। তিনি ১৩২৩-২৫ খ্রিষ্টাব্দে মাদরাসাতুল আত্তারিন নির্মাণ করেন। এটি মরক্কোয় নির্মিত অন্যতম সুন্দর মাদরাসা। বিস্তারিত জানতে দেখুন, আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে খালিদ আন-নাসিরি, আল-ইসতেকসা লি-আখবারি দুওয়ালিল মাগরিবিল আকসা, খ. ৩, পৃ. ১০৩-১১৬; ইসমাইল ইবনুল আহমার, রাওযাতুন নিসরিন فی দাওলাতি বানি মারিন, পৃ. ২৩-২৪।
১৪৯. আবুল আব্বাস আন-নাসিরি, আল-ইসতেকসা লি-আখবারি দুওয়ালিল মাগরিবিল আকসা, খ. ৩, পৃ. ১১১-১১২।
১৫০. প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১১২।
১৫১. আল-ইয ইবনে আবদুস সালাম: আবদুল আযিয ইবনে আবদুস সালাম আদ-দিমাশকি (৫৭৭-৬৬০ হি./১১৮১-১২৬২ খ্রি.)। তার লকব বা উপাধি হলো ইযযুদ্দিন। তিনি সুলতানুল উলামা (আলেমদের সম্রাট) হিসেবে পরিচিত। শাফিয়ি মাযহাবপন্থী ফকিহ, মুজতাহিদ পর্যায়ের আলেম। দামেশকে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সেখানেই বেড়ে উঠেছেন। মিশরের বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: আত-তাফসিরুল কাবির। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৪, পৃ. ২১।
১৫২. এটি ফাতেমীয় রাজবংশের শাসনামলের দুটি প্রাসাদের মধ্যবর্তী এলাকা বা ময়দান বা সড়ক। ময়দানের পুব পাশের বড় প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন খলিফা আল-মুইয লি-দ্বীনিল্লাহ এবং পশ্চিম পাশের ছোট প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন আল-মুইয লি-দ্বীনিল্লাহর পুত্র খলিফা আল-আযিয বিল্লাহ। এই ময়দানে দশ হাজার সৈন্য কুচকাওয়াজ করতে পারত।-অনুবাদক।
১৫৩. মাকরিযি, আস-সুলুক লি-মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, খ. ৫, পৃ. ৪৮৫।
১৫৪. তাকিউদ্দিন ইবনে বিন্ত আল-আ'আয: মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব ইবনে খাল্‌ল্ফ আল-আলায়ি (মৃ. ৬৯৫ হি./১২৯৬ খ্রি.), কাজি শিহাবুদ্দিন ইবনে কাজি আলাউদ্দিন ইবনে কাজিউল কুযাত তাজুদ্দিন, ইবনে বিন্ত আল-আ'আয আল-মিশরি আশ-শাফিয়ি নামে পরিচিত। দেখুন, আল-ফাসি, যাইলুত তাকলিদ ফি রুওয়াতিস সুনান ওয়াল আসানিদ, খ. ১, পৃ. ৫২।
১৫৫. সিরাজুদ্দিন আল-বুলকিনি : আবু হাম্স উমর ইবনে রাসলান ইবনে নাসির ইবনে সালিহ আল-কিনানি (৭২৪-৮০৫ হি./১৩২৪-১৪০৩ খ্রি.)। মুজতাহিদ, হাফেযে হাদিস, শাফিয়ি মাযহাবের শীর্ষস্থানীয় আলেম। মিশরের পশ্চিমাঞ্চল বুলকিনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং কায়রোতে শিক্ষাগ্রহণ করেন। ৭৬৯ হিজরিতে শামের (সিরিয়ার) বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। জামে ইবনে তুলুন ও আল-মাদরাসাতুয যাহিরিয়্যাতে তাফসিরের পাঠদান করেন। তার রচিত কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে। তিনি কায়রোতে মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৫, পৃ. ৪৬।
১৫৬. মাকরিযি, আস-সুলুক লি-মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, খ. ৪, পৃ. ৩৪৭: খ. ৫, পৃ. ১৬৩।
১৫৭. আল-জাযযার : ইয়াহইয়া ইবনে আবদুল আযিম ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে মুহাম্মাদ (৬০১-৬৭৯ হি./১২০৪-১২৮০ খ্রি.)। মিশরের প্রখ্যাত কবি। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৮, পৃ. ১৫৩।
১৫৮. মাকরিযি, আস-সুলুক লি-মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, খ. ২, পৃ. ৩।
১৫৯. মুগলতাই: আবু আবদুল্লাহ আলাউদ্দিন মুগলতাই ইবনে কালিজ ইবনে আবদুল্লাহ আল-মিসরি আল-হানাফি (৬৮৯-৭৬২ হি./১২৯০-১৩৬১ খ্রি.)। তুর্কি বংশোদ্ভূত আরব। হাফেযে হাদিস, মুহাদ্দিস, ইতিহাসবিদ, বংশতালিকাবিশেষজ্ঞ। হানাফি মাযহাবের শীর্ষস্থানীয় আলেম। মিশরের আল-মাদরাসাতুল মুযাফফারিয়্যায় হাদিসের দরসদান করেন। তিনি শাস্ত্রীয় সমালোচক ছিলেন। বহু মুহাদ্দিস ও ভাষাবিদের বিপক্ষে তার সমালোচনামূলক বক্তব্য রয়েছে। একশরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। উল্লেখযোগ্য হলো বিশ খণ্ডে মুদ্রিত সহিহুল বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থ। দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৭, পৃ. ২৭৫।
১৬০. মাকরিযি, আস-সুলুক লি-মারিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, খ. ৩, পৃ. ১৩৩।
১৬১. আবদুর রহিম ইবনে আশ-শাহহাম আল-মাওসিলি : নাজমুদ্দিন ইবনে আশ-শাহহাম আশ-শাফিয়ি (৬৫৩-৭৩০ হি.) প্রাথমিক জীবনে ফিকহে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ৭২৪ হিজরিতে দামেশকে আসেন। খানকাহ আল-কাসরাইনের প্রধান শাইখরূপে বরিত হন। শাফিয়ি মাযহাবের স্বনামধন্য ফকিহ ছিলেন। ছিলেন চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, الدرر الكامنة في أعيان المائة الثامنةখ. ৩, পৃ. ১৫০।
১৬২. আবদুল কাদির আন-নুয়াইমি, আদ-দারিস ফি তারিখিল মাদারিস, খ. ১, পৃ. ২৬১।
১৬৩. অন্যদিকে জামে আল-উমায়ির নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয় ৭১৫ হিজরিতে।
১৬৪. মুহাযযাবুদ্দিন আদ-দাখওয়ার : আবদুর রহিম ইবনে আলি ইবনে হামিদ আদ-দাখওয়ার (৫৬৫-৬২৮ হি./১১৭০-১২৩০ খ্রি.)। দামেশকে জন্মগ্রহণ করেন ও বেড়ে ওঠেন। আইয়ুবীয় সুলতান আল-মালিক আল-আদিলের সঙ্গে দেখা করেন। তার চিকিৎসা-বিষয়ক গ্রন্থ الجنينة )The Embryo( ও مختصر الحاوي للرازي দেখুন, যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৩, পৃ. ৩৪৭।
১৬৫. ইবনে আবি উসাইবিআ: আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনুল কাসিম ইবনে খলিফা (৫৯৬-৬৬৮ হি./১২০০-১২৭০ খ্রি.)। চিকিৎসক, ইতিহাসবিদ। উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা গ্রন্থের রচয়িতা। তিনি সিরিয়ার সারখাদে মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, মুহাম্মাদ আল-খলিলি, উদাউল আতিব্বা, খ. ১, পৃ. ৫২।
১৬৬. ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, খ. ৪, পৃ. ৩১৮।
১৬৭. মাকরিযি, আল-মাওয়ায়িয ওয়াল-ইতিবারি বিযিকরিল খুতাতি ওয়াল-আসার, খ. ৩, পৃ. ৪৮০।
১৬৮. الزاوية এর বহুবচন الزوايا। এখানে এর অর্থ জামে মসজিদ নয় এমন ছোট মসজিদ, যাতে মিম্বার নেই। অথবা, সুফি ও আবেদদের আশ্রয়স্থল। এগুলোতে জ্ঞানের চর্চা হতো।
১৬৯. ড. ফাতহিয়্যাহ আন-নাবরাবি, তারিখুন নুযুমি ওয়াল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, পৃ. ২২৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00