📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 জ্ঞানের আমানত

📄 জ্ঞানের আমানত


জ্ঞানের আমানত সুরক্ষার যে নীতি তাও একটি নতুন নীতি। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে এই নীতির কথা জানা ছিল না। কারণ ধর্মাদর্শ ও নৈতিকতার অনুপস্থিতিতে যে-কেউ মুনাফা ও খ্যাতির আশায় বিভিন্ন আবিষ্কার নিজের নামে চালিয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করেনি।
জ্ঞানগত আমানতের দাবি হলো চিন্তার ও জ্ঞানের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান। গবেষণা ও আবিষ্কার তার কর্তার নামেই যুক্ত হবে এবং তার নামেই পরিচিতি পাবে। কিন্তু মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণা ও আবিষ্কার চুরি যাওয়ার ফলে বেশ দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। তাদের আবিষ্কার ও গবেষণা পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, অথচ তারা মুসলিম বিজ্ঞানীদের কয়েক দশক বা কয়েক শতাব্দী পরে জন্মগ্রহণ করেছেন।
আমাদের মহান বিজ্ঞানী ইবনে নাফিসের ক্ষেত্রে যে জঘন্য চুরির ঘটনাটি ঘটেছে তা কারও অজানা থাকার কথা নয়। তিনি ফুসফুসীয় (রক্ত) সংবহন (pulmonary circulation) আবিষ্কার করেন এবং তা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ‘শারহু তাশরিহিল কানুন’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন। কিন্তু তাঁর এই আবিষ্কার কয়েক শতাব্দীব্যাপী অগোচরেই থেকে যায়। পরবর্তীকালে এই আবিষ্কার ভুলবশত ব্রিটিশ চিকিৎসাবিজ্ঞানী উইলিয়াম হার্ভের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়। তিনি ইবনে নাফিসের মৃত্যুর তিন শতাব্দীরও বেশি পরে রক্ত সংবহন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেন। মানুষ যুগের পর যুগ এই ভ্রান্তির মধ্যেই থেকে যায়, অবশেষে মিশরীয় চিকিৎসক মহিউদ্দিন তাতাবি এই সত্য উদ্‌ঘাটন করেন।
ইতালীয় চিকিৎসক আলাপ্যাগো ৯৫৪ হিজরিতে/১৫৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ইবনে নাফিসের ‘শারহু তাশরিহিল কানুন’ গ্রন্থের কিছু অংশ লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেন। এই চিকিৎসক ত্রিশ বছরের বেশি সময় রুহায় অবস্থান করেন এবং আরবি ভাষা আয়ত্ত করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আরবি থেকে লাতিনে অনুবাদ করা। তিনি যে অংশগুলো অনুবাদ করেন তাতে ফুসফুসীয় রক্ত সংবহন-সংক্রান্ত অধ্যায়টিও ছিল। তবে তার এই অনুবাদ হারিয়ে যায়।
চিত্র নং-২ ইবনে নাফিস রচিত 'আশ-শিফা'
মাইকেল সারভেটাস (Michael Servetus 1511-1553) নামের একজন স্প্যানিশ বিজ্ঞানী-যিনি চিকিৎসক ছিলেন না-প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। তিনি আলাপ্যাগো কর্তৃক অনূদিত ইবনে নাফিসের কিতাবের সন্ধান পান। সারভেটাস খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাস করতেন না এবং ত্রিত্ববাদের সমালোচনা করতেন। তিনি ভিন্নধর্মী চিন্তাভাবনা লালন করতেন। ফলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি বিভিন্ন শহরে নির্বাসিত জীবনযাপন করেন। ১০৬৫ হিজরিতে/১৫৫৩ খ্রিষ্টাব্দে সারভেটাসকে পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তার অধিকাংশ পুস্তকও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আল্লাহর ইচ্ছায় তার কিছু গ্রন্থ পুড়ে যাওয়া থেকে বেঁচে যায়। তার মধ্যে আলাপ্যাগো কর্তৃক অনূদিত ইবনে নাফিসের রক্ত সংবহন-সংক্রান্ত পাণ্ডুলিপিটিও ছিল। গবেষকেরা বিশ্বাস করে বসলেন যে রক্ত সংবহন পদ্ধতি আবিষ্কারের কৃতিত্ব প্রথমত এই স্প্যানিশ বিজ্ঞানী সারভেটাসের এবং দ্বিতীয়ত ব্রিটিশ চিকিৎসক উইলিয়াম হার্ভের। ১৩৪৩ হিজরি/১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই ধারণা চালু থাকল। অবশেষে মিশরীয় চিকিৎসক ড. মহিউদ্দিন তাতাবি এই ভুল ধারণা দূর করেন এবং প্রাপ্য অধিকার তার প্রাপককে ফিরিয়ে দেন। তিনি বার্লিনের গ্রন্থাগারে ইবনে নাফিসের ‘শারহি তাশরিহিল কানুন’ গ্রন্থের একটি পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন এবং এ বিষয়ে তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভ প্রস্তুত করেন। তিনি এই মহাগ্রন্থের একটি বিশেষ দিকের প্রতি সযত্ন আলোকপাত করেন। তা হলো ফুসফুসীয় রক্ত সংবহন পদ্ধতি। এটা ১৩৪৩ হিজরির/১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ঘটনা।
তাতাবির গবেষণাপত্র দেখে তার শিক্ষক ও পর্যবেক্ষকগণ বিমূঢ় হয়ে পড়েন। এতে যে তথ্য রয়েছে তা জেনে তারা হতচকিত হয়ে যান, যেন তারা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। আরবি ভাষা তাদের জানা না থাকায় গবেষণাপত্রের একটি কপি জার্মান প্রাচ্যবিদ ম্যাক্স মেয়েরহোফের কাছে পাঠান। মেয়েরহোফ তখন কায়রোতে ছিলেন। তারা তার কাছে গবেষক তাতাবি যা লিখেছেন সে সম্পর্কে অভিমত চান। মেয়েরহোফ ড. তাতা বিকেই জোরালো সমর্থন করেন।
ড. তাতাবি তার একটি গবেষণায় লিখেছেন, আমাকে যে বিষয়টি বিস্ময়াভিভূত করে তা এই যে, সারভেটাসের বক্তব্যের কিছু কথা হুবহু ইবনে নাফিসের বক্তব্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, বরং তার অনুরূপ ছিল, যার আক্ষরিক অনুবাদ করা হয়েছে...। সারভেটাস স্বাধীন চিন্তার মানুষ ছিলেন, চিকিৎসক ছিলেন না। তিনি ইবনে নাফিসের ভাষাতেই ফুসফুসীয় রক্ত সংবহন পদ্ধতির উল্লেখ করেন, অথচ ইবনে নাফিস তার দেড় শতাব্দীরও বেশি আগে মৃত্যুবরণ করেছেন।
মেয়েরহোফ ইবনে নাফিসের প্রচেষ্টার যে সত্য আবিষ্কৃত হলো তা ঐতিহাসিক জর্জ সার্টনের কাছে পাঠিয়ে দেন। সার্টন তা তার বিখ্যাত গ্রন্থ হিস্ট্রি অব সাইন্সের (History of Science) শেষ খণ্ডে (৫৫৮) প্রকাশ করেন। (৫৯)
আলদো মিলি (৫৬০) উভয়ের মূল বক্তব্য পর্যবেক্ষণ করেন এবং বলেন, ইবনে নাফিস ফুসফুসীয় সংবহনের যে বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন তা আক্ষরিকভাবে সারভেটাসের বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। সুতরাং স্পষ্ট সত্য এই যে, ফুসফুসীয় রক্ত সংবহন পদ্ধতির আবিষ্কার ইবনে নাফিসেরই, সারভেটাস বা হার্ভের নয়। (৫৬১)
মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের ক্ষেত্রে জ্ঞানগত নিরাপত্তাহীনতা ও এমন সব চৌর্যবৃত্তির ঘটনা কম নয়। আমরা এখানে সেসবের প্রতি সংক্ষেপে কিছু ইঙ্গিত দিয়ে যাব:
• ফরাসি ইহুদি ডুরখেইমকে সমাজবিজ্ঞানের জনক অভিহিত করা হয়। অথচ যিনি এই বিজ্ঞানের আবিষ্কর্তা ও ভিত্তি প্রতিষ্ঠাতা তিনি হলেন মুসলিম মনীষী ইবনে খালদুন। এই বিষয়ে আলোচনা আসছে।
• গতিসূত্রসমূহের (Laws of Motion) আবিষ্কর্তা বলা হয় আইজ্যাক নিউটনকে, অথচ দুই মুসলিম বিজ্ঞানী এসব সূত্র আবিষ্কার করেন। তারা হলেন ইবনে সিনা ও হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা। পরবর্তী আলোচনায় এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
• আমরা রজার বেকনের (৫৬২) বিখ্যাত গ্রন্থ Opus Majus-এ একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় পাই-সেটি পঞ্চম অধ্যায়-যা ইবনে হাইসামের 'আল-মানাযির' গ্রন্থের আক্ষরিক অনুবাদ ছাড়া কিছু নয়। অথচ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মূল লেখকের প্রতি কোনো ইঙ্গিতও করা হয়নি।
এ সবকিছু মুসলিমদের সঙ্গেই ঘটেছে। অন্যদিকে মুসলিমদের নীতি ছিল ভিন্ন। তা হলো জ্ঞানের আমানত সুরক্ষা এবং গবেষণা ও কৃতিত্ব তার প্রাপককে প্রদানের নীতি। এই নীতির ফলে কোনো মুসলিম বিজ্ঞানীই অন্যান্য সভ্যতার বিজ্ঞানীদের কারও কোনো আবিষ্কার বা কোনো তত্ত্ব নিজের বলে দাবি করেননি। বরং তারা যাদের তত্ত্ব উদ্ধৃত করেছেন তাদের নাম উল্লেখ করেছেন, ঋণ স্বীকার করেছেন। ওইসব জ্ঞানী-বিজ্ঞানীর নামে তাদের গ্রন্থাবলি ভরপুর। যেমন: হিপোক্রেটিস, গ্যালেন, সক্রেটিস, অ্যারিস্টটল প্রমুখ। মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাদের যথার্থ মূল্যায়ন করেছেন, তাদের প্রাপ্য হক দিয়েছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। গ্রন্থ রচনায় কিছুটা অবদান থাকলেও এবং সামান্য তথ্য নিলেও তাদের কারও নামই অনুল্লেখ থাকেনি।
উদাহরণস্বরূপ মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা (বানু মুসা) তাদের معرفة (The Book of the Measurement of مساحة الأشكال البسيطة والكروية Plane and Spherical Figures) গ্রন্থে যা বলেছেন তা প্রণিধানযোগ্য। তারা বলেছেন, আমাদের গ্রন্থে আমরা যা-কিছুর বর্ণনা দিয়েছি তা আমাদেরই গবেষণা। তবে ব্যাসের পরিধি নির্ণয়ের সূত্র আমাদের নয়। এটি আমরা আর্কিমিডিস থেকে নিয়েছি। (ত্রিভুজে অঙ্কিত বিভিন্ন পয়েন্টের) দুটি পয়েন্টের মধ্যে অঙ্কিত যেকোনো পরিমাণ একটি অনুপাত তৈরি করবে (৫৬৩)-এই সূত্র আমরা মেনেলাউস (৫৬৪) থেকে নিয়েছি। (৫৬৫)
মুসলিম মনীষী বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে কালজয়ী গ্রন্থ (الحاوي في الطب) আল-হাবি ফিত-তিব্ব-এর রচয়িতা আবু বকর আল-রাযি কী বলেছেন তা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তিনি বলেছেন, আমি এই গ্রন্থে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানাবিধ অসংখ্য বিষয় সংকলন করেছি। আমি প্রাচীন চিকিৎসক-দার্শনিকদের মধ্যে হিপোক্রেটিস, গ্যালেন, আরমাসুস ও অন্যদের গ্রন্থাবলি থেকে তথ্য নিয়েছি এবং পরবর্তীদের মধ্য থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন নতুন বিষয় সংযোজনকারী, যেমন পল(৫৬৬), আহারোন, হুনাইন ইবনে ইসহাক, ইয়াহইয়া ইবনে মাসাওয়াইহ প্রমুখ। (৫৬৭)
আমরা ইসলামি গ্রন্থাগারগুলোতে ভিনদেশি বিজ্ঞানীদের অসংখ্য অনূদিত গ্রন্থ দেখতে পাই। সেগুলো তাদের নামেই অনূদিত হয়েছে। মুসলিম বিজ্ঞানীরা সেসব গ্রন্থে টীকা ও বিশ্লেষণ যুক্ত করেছেন, অথচ মূল বক্তব্যে হাত দেননি। যাতে মূল লেখকের চিন্তাভাবনা অবিকৃতরূপে সুরক্ষিত থাকে। যেমন মুসলিম বিজ্ঞানী আল-ফারাবি অ্যারিস্টটলের ‘মেটাফিজিক্স (Metaphysics)’ গ্রন্থে টীকা সংযুক্ত করেছেন।
জ্ঞানের সম্মানজনক আমানত সুরক্ষা কার্যতই মুসলিম বিজ্ঞানীদের সুকীর্তি। যেসব মৌলিক নীতি অনুসরণ করে মুসলিমগণ পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের চিন্তার রীতি ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন সাধন করেছিলেন তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্ঞানের আমানত সুরক্ষা। বিশেষ করে যখন অন্যান্য জাতির সামসময়িক প্রজন্ম তাদের পিতৃপুরুষদের ইতিহাস জানতে আগ্রহী ছিল না, তখন তাদের গবেষণা ও আবিষ্কার চুরি করাটা সহজ ব্যাপারই ছিল। কিন্তু মুসলিম বিজ্ঞানীরা ছিলেন গভীর নীতিবোধ ও সততার ওপর অধিষ্ঠিত।
ব্যক্তি-পরিচিতি (৫৬৮)
উইলিয়াম হার্ভে (১৫৭৮-১৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দ): ইংরেজ চিকিৎসক ও শারীরবিজ্ঞানী। রক্ত সংবহন বিষয়ে হার্ভের বিখ্যাত গ্রন্থ 'De Motu Cordis' প্রকাশিত হয় ১৬২৮ সালে। ইউরোপে তিনি ফুসফুসীয় রক্ত সংবহন ও হৃৎপিণ্ড যে পাম্পের মতো কাজ করে তার আবিষ্কর্তা বলে পরিচিত।
মহিউদ্দিন আত-তাতাবি: তিনি জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইবনে নাফিসের ওপর অভিসন্দর্ভ রচনা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ইবনে নাফিস সম্পর্কে অজানা সব তথ্য তিনি আবিষ্কার করেন। তার জন্ম ১৮৯৬ সালে এবং ১৯৪৫ সালে তিনি টাইফাস রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
ম্যাক্স মেয়েরহোফ ১২৯১-১৩৬৪ হিজরি (Max Meyerhof 1874-1945): জার্মান চক্ষু-চিকিৎসক ও প্রাচ্যবিদ। ইউরোপের বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদদের অন্যতম। আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। ১৯০৩ সালে মিশর ভ্রমণ করেন এবং কায়রোতে অবস্থান করেন। কায়রোতেই মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ইসলামি সভ্যতায় চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ভেষজবিজ্ঞানের ইতিহাসের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
জর্জ সার্টন (George Sarton 1884-1956): বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসবেত্তাদের অন্যতম। বেলজিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান। রসায়নবিদ, প্রকৃতিবিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ। ১৯১৯ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি কার্নেগি ইনস্টিটিউট অব ওয়াশিংটনে গবেষণা সহকারী ছিলেন। আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন, বৈরুতের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়েও বক্তৃতা দিয়েছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ হিস্ট্রি অব সাইন্স।
এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim 1858-1917): University of Bordeaux-এ এবং প্যারিসের সর্বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি সমাজবিজ্ঞানকে একটি বিধিবদ্ধ বিদ্যায়তনিক বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। করেন। পাশ্চাত্যে তিনি ম্যাক্স ওয়েবার, কার্ল মার্ক্সের সঙ্গে একত্রে সমাজবিজ্ঞানের জনক হিসেবে পরিচিত।
হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা: আবুল বারাকাত হিবাতুল্লাহ ইবনে আলি ইবনে মালকা আল-বালাদি আল-বাগদাদি (৪৮০-৫৬০ হি./১০৮৬-১১৬৫ খ্রি.)। 'আওহাদুয যামান' (যুগের অনন্য) উপাধিতে ভূষিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও দার্শনিক। বসরায় জন্মগ্রহণ করেন ও বেড়ে ওঠেন। পরে বাগদাদ ভ্রমণ করেন। ইহুদি ছিলেন, শেষ বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আব্বাসি খলিফা মুসতানজিদ বিল্লাহ ও অন্য খলিফাদের প্রাসাদে কাজ করেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
المعتبر في الحكمة، اختصار التشريح من كلام جالينوس، كتاب الأقراباذين، رسالة في العقل وماهيته، كتاب التفسيرا (৫৬৯)
হিপোক্রেটিস Hippocrates of Kos or Hippocrates of Cos II. (৪৬০-৩৭০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ): তার পিতার নাম Heraclides Ponticus এবং মায়ের নাম Praxitela। কোস দ্বীপের এক পুরোহিত-বৈদ্য পরিবারে তার জন্ম এবং পিতার কাছ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে হাতেখড়ি। তারপর নানা স্থানে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করে তিনি রোগ ও চিকিৎসা সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ-নির্ভর তথ্যকে একটি নিয়মাবদ্ধ তাত্ত্বিক কাঠামোয় রূপ দিতে সচেষ্ট হন। এইভাবে তিনি হলেন বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসাবিদ্যার প্রতিষ্ঠাতা। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে 'দা প্রশ্নস্টিকস', 'অন এয়ারস ওয়াটারস অ্যান্ড প্লেসেস', 'অন ফ্র্যাকচারস', 'অন সার্জারি' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তার ছাত্র ও শিষ্যদের লেখা বহু গ্রন্থও তার নামে নামাঙ্কিত হয়েছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে কার্যকারণ ফলাফল, পারিবেশিক অবস্থার বিশ্লেষণ ও নিদানিক পর্যবেক্ষণের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। তার আরেক কালজয়ী কীর্তি হলো চিকিৎসকদের জন্য রচিত শপথবাক্য, যা হিপোক্রেটীয় অনুজ্ঞা নামে পরিচিত এবং ডাক্তাররা আজও পেশায় প্রবেশ করার আগে এই শপথবাক্য পাঠ করে থাকেন। এই অনুজ্ঞা থেকে দায়িত্বসচেতনতা, নীতিবোধ ও মানবিকতার এক চমৎকার উদ্ভাস ঘটে। সব মিলিয়ে পরবর্তী বিজ্ঞান ও বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর তার প্রভাব অনস্বীকার্য।
গ্যালেন (Galen Aelius Galenus or Claudius Galenus 129-200): গ্রিক চিকিৎসাবিজ্ঞানী, শল্যচিকিৎসক ও প্রকৃতিবিজ্ঞানী। অঙ্গব্যবচ্ছেদবিজ্ঞান, শারীরবিজ্ঞান, রোগবিজ্ঞান, ওষুধবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বিকাশ ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। তিনি দর্শন ও চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ে প্রভূত জ্ঞান লাভ করেন এবং আলেকজান্দ্রিয়া ও করিন্থ পরিভ্রমণ করে ১৬৪ খ্রিষ্টাব্দে রোমে চলে এসে রোমান সম্রাটের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হন। দর্শন ও চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে তিনি প্রায় চারশটি পাণ্ডুলিপি রচনা করেন।
আর্কিমিডিস (২৮৭-২১২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) : একজন গ্রিক গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক। যদিও তার জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা গেছে, তবুও তাকে ক্ল্যাসিক্যাল যুগের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পদার্থবিদ্যায় তার উল্লেখযোগ্য অবদানের মধ্যে রয়েছে স্থিতিবিদ্যা আর প্রবাহী স্থিতিবিদ্যার ভিত্তি স্থাপন ও লিভারের কার্যনীতির বিস্তারিত ব্যাখ্যাপ্রদান। পানি তোলার জন্য আর্কিমিডিসের ক্রু পাম্প, যুদ্ধকালীন আক্রমণের জন্য সিজ ইঞ্জিন ইত্যাদি মৌলিক যন্ত্রপাতির ডিজাইনের জন্যও তিনি বিখ্যাত। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় তার নকশাকৃত আক্রমণকারী জাহাজকে পানি থেকে তুলে ফেলার যন্ত্র বা পাশাপাশি রাখা একগুচ্ছ আয়নার সাহায্যে জাহাজে অগ্নিসংযোগের পদ্ধতি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে।
হুনাইন ইবনে ইসহাক: আবু যায়দ হুনাইন ইবনে ইসহাক আল-ইবাদি (৮১০-৮৭৩ খ্রি.)। আরব নেস্টোরিয়ান খ্রিষ্টান। বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, অনুবাদক, ঐতিহাসিক। ইরাকের হিরার অধিবাসী। খলিফা মামুনের সময়ে অনুবাদ বিভাগের প্রধান ছিলেন। গ্রিক ও ফারসি গ্রন্থাবলি আরবি ও সুরয়ানি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। (৫৭০)
ইয়াহইয়া ইবনে মাসাওয়াইহ: আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে মাসাওয়াইহ বা ইউহান্না ইবনে মাসাওয়াইহ (৭৭৭-৮৫৭ খ্রি.)। আসিরিয়ান নেস্টোরিয়ান খ্রিষ্টান, চিকিৎসক। ভেষজবিজ্ঞানে অভিজ্ঞ। সুরয়ানি বংশোদ্ভূত ও আরবে বেড়ে ওঠা। খলিফা হারুনুর রশিদ ও মামুনের চিকিৎসক ছিলেন। মুতাওয়াক্কিলের যুগেও চিকিৎসা করেছেন। ইরাকের সামাররায় ৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে/২৪৩ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। (৫৭১)

টিকাঃ
৫৫৮. গ্রন্থটি ৯ খণ্ডে প্রকাশিত।- অনুবাদক
৫৯. মুহাম্মাদ আস-সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ২০৮; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রুউওয়াদু ইলমিত তিব্ব ফিল-হাদারাতিল আরাবিয়্যাতি ওয়াল-ইসলামিয়া, পৃ. ৪৫১।
৫৬০. Aldo Mieli (১৮৭৯-১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ): ইতালীয় প্রাচ্যবিদ। La science arabe et son role dans l'evolution scientifique mondiale )العلم عند العرب وأثره في تطور العلم العالى( গ্রন্থের রচয়িতা।
৫৬১. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রুউওয়াদু ইলমিত তিব্ব ফিল-হাদারাতিল আরাবিয়্যাতি ওয়াল ইসলামিয়া, পৃ. ৪৫১।
৫৬২. Roger Bacon (১২১৪-১২৯২ খ্রি.): ইংরেজ বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। মধ্যযুগে বিজ্ঞানের বিকাশে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। নিরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা বলে পরিচিত। দৃষ্টিবিজ্ঞানের পথিকৃৎদের অন্যতম।
৫৬৩. এই সূত্র বুঝতে হলে মেনেলাউস কর্তৃক প্রদত্ত ত্রিভুজের সূত্র (Theorem of Menelaus) জানতে হবে।
৫৬৪. Menelaus of Alexandria (৭০-১৪০ খ্রি.): গ্রিক গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ। মুসলিমগণ গোলাকার কাঠামো মাপতে ও ল্যাবরেটরিতে তাঁর রচনাবলি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। দেখুন, হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ১, পৃ. ১৪২।
৫৬৫. বানু মুসা ইবনে শাকির, কিতাবু মারিফাতি মাসাহাতিল আশকাল, সম্পাদনা: নাসিরুদ্দিন তুসি, পৃ. ২৫।
৫৬৬. Paul of Aegina (৬২৫-৬৯০ খ্রি.): বাইজান্টীয় গ্রিক চিকিৎসাবিজ্ঞানী। Medical Compendium in Seven Books তাঁর রচিত চিকিৎসা-বিশ্বকোষ।
৫৬৭. ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, খ. ১, পৃ. ৭০।
৫৬৮. অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত।
৫৬৯. দেখুন, ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, খ. ২, পৃ. ৩১৩-৩১৬; যিরিকলি, আল-আলাম, খ. ৪, পৃ. ৭৪।
৫৭০. দেখুন, ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, খ. ২, পৃ. ১২৮-১৩৭; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৪০৯।
৫৭১. দেখুন, ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, খ. ২, পৃ. ১০৯-১২২; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৪১১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00