📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 পরীক্ষিত পদ্ধতি

📄 পরীক্ষিত পদ্ধতি


গবেষণার নিরিখে পরীক্ষাভিত্তিক জ্ঞান-পদ্ধতি বিশ্বের জ্ঞানযাত্রায় বিরাট ইসলামি সংযোজন বলে বিবেচিত হয়। এই জ্ঞান-পদ্ধতির ভিত্তি হলো অনুমান ও অনুসন্ধান, প্রমাণ, অভিজ্ঞতা ও উদাহরণ।
গ্রিক বা ভারতীয় বা অন্যদের যে জ্ঞান-পদ্ধতি ছিল মুসলিমদের জ্ঞান-পদ্ধতি তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এসব সভ্যতা অধিকাংশ সময়ই কিছু তত্ত্বসমূহ নির্ধারণ করে নিয়ে তাতেই ক্ষান্ত থেকেছে। সেগুলোকে প্রায়োগিকভাবে পরীক্ষা করে দেখার বা প্রমাণ করার চেষ্টা করেনি। এসবের সিংহভাগ ছিল তাত্ত্বিক দর্শন, সঠিক হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলোর কোনো প্রয়োগ ছিল না। ফলে শুদ্ধ তত্ত্ব ও ভ্রান্ত তত্ত্বের মধ্যে বিপজ্জনক সংমিশ্রণ ঘটে। মুসলিমগণ জ্ঞানগত দানসমূহ ও চারপাশের জাগতিক তথ্যসমূহ গ্রহণে পরীক্ষাভিত্তিক পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। এই প্রচেষ্টা থেকেই পরীক্ষামূলক জ্ঞান-পদ্ধতির নীতিমালার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। সমকালীন জ্ঞানযাত্রাও সেই নির্দেশনা অনুযায়ী অব্যাহত রয়েছে।
মুসলিমগণ পূর্ববর্তী তত্ত্বসমূহের ওপর পরীক্ষামূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। তত্ত্বের প্রবক্তা যতই বিখ্যাত হোক তারা তা বিবেচনায় আনেননি। এই পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে অসংখ্য ভ্রান্তি উন্মোচিত হয়। অথচ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানী সম্প্রদায় এসব ভ্রান্তি যাপন করে আসছিলেন।
মুসলিম বিজ্ঞানীগণ পূর্ববর্তী তত্ত্বসমূহের সমালোচনা ও পরীক্ষানিরীক্ষা করেই ক্ষান্ত হননি, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নতুন অনুমান স্থির করেছেন এবং সেগুলোকে পরীক্ষা করেছেন। সত্য ও বাস্তবের সঙ্গে অনুমানের নৈকট্য প্রমাণিত হলে তা তত্ত্বে রূপান্তরিত হয়েছে। তারপর তারা এই তত্ত্বের পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। অবশেষে প্রমাণিত হয়েছে যে এটি সত্য ও বাস্তব, কোনো তত্ত্ব নয়। এই পন্থায় তারা ক্লান্তিহীনভাবে অসংখ্য পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন।
মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে এই ক্ষেত্রে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি তারা হলেন জাবির ইবনে হাইয়ান, আল-খাওয়ারিজমি, আল-রাযি, হাসান ইবনুল হাইসাম, ইবনে নাফিস এবং আরও অনেকে।
রসায়নবিদদের গুরু জাবির ইবনে হাইয়ান বলেছেন, এই শিল্পের মূল উৎকর্ষ হলো প্রয়োগ ও পরীক্ষা (এক্সপেরিমেন্ট)। কেউ (বৈজ্ঞানিক নীতি) প্রয়োগ ও পরীক্ষা না করলে সে কোনোকিছুতেই সফল হতে পারবে না। (৫৩২)
আল-খাওয়াসুল কাবির গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে তিনি বলেছেন, এই গ্রন্থে আমরা বস্তুর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছি। আমরা কেবল এগুলো দেখেছি ও শুনেছি তা নয়, অথবা আমাদের বলা হয়েছে বা আমরা পড়েছি তাও নয়, বরং আমরা এগুলোর পরীক্ষা করেছি, অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। (যা সঠিক প্রমাণিত হয়েছে তা উপস্থাপন করেছি এবং যা ভ্রান্ত সাব্যস্ত হয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করেছি)। যে সিদ্ধান্ত বা ফলাফলে উপনীত হয়েছি সেটাও এই জাতির সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে মূল্যায়ন করেছি। (৫৩৩)
বৈজ্ঞানিক গবেষণা-পদ্ধতিতে প্রায়োগিক পরীক্ষামূলক অভিজ্ঞতার কথা যিনি প্রথম বলেন তিনি হলেন জাবির ইবনে হাইয়ান। এ থেকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা-পদ্ধতির নীতিমালার ভিত প্রস্তুত হয়। একে 'পরীক্ষামূলক অভিজ্ঞতা' নামেও আখ্যায়িত করা হয়। জাবির বলতেন, যে বিজ্ঞানী পরীক্ষানিরীক্ষা (এক্সপেরিমেন্ট) করে অভিজ্ঞতা অর্জন করে সেই প্রকৃত বিজ্ঞানী। যে বিজ্ঞানী পরীক্ষানিরীক্ষা (এক্সপেরিমেন্ট) করে না সে কোনো বিজ্ঞানী নয়। প্রতিটি আবিষ্কারককে পরীক্ষানিরীক্ষা করে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। অভিজ্ঞতা অর্জনকারী আবিষ্কর্তা সফল হয় এবং অন্যরা ব্যর্থ হয়! (৫৩৪)
জাবির ইবনে হাইয়ান পরীক্ষা (এক্সপেরিমেন্ট) ও অভিজ্ঞতাকে বৈজ্ঞানিক কর্মের ভিত্তি স্থির করেছেন এবং এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কার্যপ্রণালি প্রদান করেন, যা তার পূর্বে গ্রিক বিজ্ঞানীরা পারেননি। তিনি কেবল চিন্তার ওপর নির্ভরশীল থাকেননি। কাদরি তাওকান বলেছেন, জাবির অন্যান্য বিজ্ঞানী থেকে অনন্য। কারণ তিনি যারা বৈজ্ঞানিক মূলনীতির আলোকে অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। এই বৈজ্ঞানিক মূলনীতির ভিত্তিতেই আমরা ল্যাবরেটরিজ ও পরীক্ষাগারে কাজ করে থাকি। তিনি যেমন তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে পরীক্ষানিরীক্ষা, অনুশীলন ও অভিজ্ঞতার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, উদ্বুদ্ধ করেছেন, তেমনই ধীরতা-স্থিরতার সঙ্গে কাজ করতে, তাড়াহুড়া ও অস্থিরতা ত্যাগ করতেও আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রসায়নশাস্ত্রে নিযুক্ত বিজ্ঞানীর অবশ্যকর্তব্য হলো তত্ত্ব প্রয়োগ করা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করা। এ ছাড়া যথার্থ জ্ঞান অর্জন করা যাবে না। (৫৩৫)
সম্ভবত আল-রাযিই বিশ্বে প্রথম চিকিৎসক যিনি এই পরীক্ষামূলক পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়েছেন। তিনি প্রাণীদের ওপর বিশেষ করে বানরের ওপর পরীক্ষানিরীক্ষা করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি আবিষ্কার করে তা মানুষের ওপর প্রয়োগ করার আগে প্রাণীদের ওপর প্রয়োগ করেছেন এবং এভাবে কল্যাণকর চিকিৎসাপদ্ধতি নির্বাচন করেছেন। এটি উন্নততর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। ইদানীংকালে এই পদ্ধতির স্বীকৃতি মিলেছে, এর আগে বিশ্ব তার স্বীকৃতি দেয়নি। আল-রাযি চিকিৎসাবিজ্ঞানে যে গবেষণা-পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন সে ব্যাপারে তিনি বলেছেন, আমরা যে ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি তা যদি প্রচলিত তত্ত্বের বিপরীত হয় তাহলে ঘটনাটি মেনে নেওয়াই জরুরি, এমনকি প্রখ্যাত বিজ্ঞানীদের সমর্থন করতে গিয়ে সবাই প্রচলিত তত্ত্বকে গ্রহণ করে নিলেও। (৫৩৬) তিনি স্বীকারই করছেন যে, প্রখ্যাত বিজ্ঞানীদের মতামতের দ্বারা সকলেই বিভ্রমের শিকার হতে পারে এবং তারা তাদের তত্ত্ব গ্রহণ করে নিতে পারে। কিন্তু পরীক্ষানিরীক্ষার ফল (অভিজ্ঞতা) অনেক সময় তত্ত্বের বিপরীত হয়। এ কারণেই আমাদের জন্য আবশ্যক হলো তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করা-তা বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের হলেও-এবং অভিজ্ঞতা ও বাস্তবিক ঘটনাকে গ্রহণ করা এবং সেই ঘটনা বা অভিজ্ঞতার বিচার-বিশ্লেষণ করা ও তা থেকে উপকার লাভ করা।
বিজ্ঞানে পরীক্ষামূলক (এক্সপেরিমেন্টাল) পদ্ধতি অবলম্বনের ফলেই ইবনুল হাইসামের গ্রন্থগুলোতে ইউক্লিড ও টলেমির তত্ত্বসমূহের প্রচুর সমালোচনা রয়েছে। যদিও প্রাচীন বিজ্ঞানে এই দুইজন সেরাদের অন্তর্ভুক্ত। ইবনুল হাইসামের বৈজ্ঞানিক গবেষণা-পদ্ধতি তার আল-মানাযির গ্রন্থের (Book of Optics) ভূমিকা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার চিন্তালব্ধ আদর্শ গবেষণা-পদ্ধতির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। ইবনুল হাইসাম বলেছেন, আমরা গবেষণার শুরুতে উপস্থিত বস্তুরাশি পরীক্ষানিরীক্ষা করি, স্পষ্ট দলিল-প্রমাণের অবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করি, আনুষঙ্গিক বিষয়াবলির বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করি। দৃশ্যমান অবস্থায় বিশেষ কিছু চোখে পড়লে তা চয়ন করি, অর্থাৎ যা সাধারণ ও অপরিবর্তনশীল এবং স্পষ্ট অনুভবযোগ্য। তারপর পর্যায়ক্রমিক গবেষণায় ও পরিমাপ ব্যবহারে ধাপে ধাপে অগ্রসর হই, বস্তুর ভূমিকা পরীক্ষা করি, ফলাফল সংরক্ষণ করি। আমাদের সকল অনুসন্ধান, পরীক্ষানিরীক্ষা ও ফলাফল বিচারে ন্যায্যতা অবলম্বন করি, পক্ষপাত বা খেয়ালখুশির স্থান দিই না। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ও পরীক্ষিত সবকিছুতে সত্যকে খোঁজার চেষ্টা করি, প্রচলিত মতামতকে প্রাধান্য দিই না। (৫৩৭)
ইবনুল হাইসাম তার গবেষণায় অনুসন্ধান, অনুমান ও পরীক্ষানিরীক্ষার পন্থা অবলম্বন করেছেন। তার কোনো কোনোটির উদাহরণসহ বিবরণ দিয়েছেন তিনি। এগুলোই হলো আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার মূল উপাদান। যে-সকল মুসলিম বিজ্ঞানী পরীক্ষামূলক পদ্ধতির ভিত রচনা করেছেন ইবনুল হাইসাম তাদের অন্যতম। তিনি ফ্রান্সিস বেকন থেকে পরীক্ষামূলক পদ্ধতির ক্ষেত্রে কেবল এগিয়েই নন, বরং তার চেয়ে অনেক বেশি উঁচু আসনে রয়েছেন। তার বোধশক্তি ফ্রান্সিস বেকনের চেয়ে ব্যাপক ছিল এবং চিন্তাও ছিল গভীর। যদিও ইবনুল হাইসাম ফ্রান্সিস বেকনের মতো তাত্ত্বিক দর্শনকে তেমন গুরুত্ব দেননি।
অধ্যাপক মুস্তাফা নাজিফ এর চেয়েও এগিয়ে গিয়ে বলেন, বরং ইবনুল হাইসাম প্রথমবার যা ধারণা করতেন তাতেই চিন্তার এতটাই গভীরতায় পৌছে যেতেন যে ওই বিষয়ের প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করতে পারতেন। বিংশ শতাব্দীতে ম্যাক ও কার্ল পিয়ার্সন এবং অন্য আধুনিক বিজ্ঞানী-দার্শনিকেরা যা বলেছেন তা তিনি আগেই অনুধাবন করেছিলেন। বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সঠিক প্রয়োগ এবং আধুনিক অর্থে ওই তত্ত্বের ক্রিয়াকাণ্ড সম্পর্কে অবগত ছিলেন। (৫৩৮)
বরং কতিপয় মুসলিম বিজ্ঞানী পরীক্ষানিরীক্ষাহীন অনভিজ্ঞতাপূর্ণ রচনাকে অযথার্থ গণ্য করেছেন। হিজরি অষ্টম শতাব্দীর (খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীর) বিশিষ্ট রসায়নবিদ ছিলেন জালদাকি। তিনি প্রখ্যাত রসায়নজ্ঞ তুগরায়ি (মৃ. ৫১৩ হিজরি) সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, তুগরায়ি ছিলেন প্রচণ্ড প্রতিভাবান বিজ্ঞানী। কিন্তু তিনি সামান্যই পরীক্ষানিরীক্ষা (এক্সপেরিমেন্ট) করেছেন। এই কারণে তার রচনাবলি অযথার্থ ও অসূক্ষ্ম থেকে গেছে। (৫৩৯)
এভাবে মুসলিমগণ পরীক্ষামূলক (এক্সপেরিমেন্টাল) জ্ঞানপদ্ধতিতে উপনীত হয়েছিলেন। এর ফলেই বিশ্বমানবমণ্ডলী জানতে পেরেছে কীভাবে নির্ভরতা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে জ্ঞানগত বাস্তবতায় পৌছানো যায়। যেখানে কল্পনা, ধারণা ও খেয়ালখুশির কোনো মূল্য নেই।
বিজ্ঞানী-পরিচিতি (৫৪০)
জাবির ইবনে হাইয়ান : আবু মুসা জাবির ইবনে হাইয়ান ইবনে আবদুল্লাহ আল-কুফি (মৃ. ২০০ হিজরি/৮১৫ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন রসায়নবিদ ও দার্শনিক। সুফি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। কুফার বাসিন্দা হলেও খুরাসানি বংশোদ্ভূত। আরবের রসায়নবিদদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বিখ্যাত ও শ্রেষ্ঠ। তিনি রসায়নবিদ্যা সম্পর্কে যে গ্রন্থ রচনা করেছিলেন তাতে রসায়ন ছাড়াও গণিত, জ্যোতিষ, দর্শন, সংগীত ও সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা ছিল। (৫৪১)
আল-খাওয়ারিজমি : আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি (১৬০-২৩২ হি./৭৭৬-৮৪৭ খ্রি.) ছিলেন গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ ও ইতিহাসবিদ। তিনি সংখ্যাকে পাটিগাণিতিক চরিত্র থেকে বীজগাণিতিক সমীকরণে এনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ভূগোল ও জ্যোতির্বিজ্ঞানেও তার যথেষ্ট অবদান রয়েছে। বীজগণিত হলো ইসলামি সভ্যতায় তার শ্রেষ্ঠ অবদান। বীজগণিতকে আল-খাওয়ারিজমিই প্রথম গণিতশাস্ত্রের মধ্যে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তোলেন এবং এর প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বীজগণিতের ভিত্তি স্থাপন করে আধুনিক গণিতের পথকে অনেকটাই সহজ করে তোলেন। তাকে গণিতের অন্যতম জনক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। আল-খাওয়ারিজমিই প্রথম ইসলামি জগতে দশমিক পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। আরবি ভাষায় তার রচিত গ্রন্থাবলি প্রথমে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। পাশ্চাত্যসভ্যতায় ল্যাটিন ভাষার মাধ্যমেই তার গবেষণার বিকাশ ঘটে। অ্যালগরিদমের উৎপত্তিই এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। পাটিগণিতে আল-খাওয়ারিজমির অবদানের অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। তবে যে ল্যাটিন পাণ্ডুলিপিটি পাওয়া যায় তাতে তার পাটিগণিত-বিষয়ক অধিকাংশ কাজই রয়েছে বলে মনে করা হয়। ১১২৬ সালে 'যিজ আস-সিন্দহিন্দ'-এর স্প্যানিশ অনুবাদও করেন দার্শনিক। অ্যাডিলার্ড অব বাথ। এই অনুবাদের চারটি কপির দুটি ফ্রান্সে, একটি মাদ্রিদে ও একটি অক্সফোর্ডে সংরক্ষিত আছে।
যিজ আস-সিন্দহিন্দে মোট ৩৭টি অধ্যায় এবং ১১৬টি 'অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল টেবিল' বা জ্যোতির্বিজ্ঞান-সম্বন্ধীয় ছক রয়েছে। এসব সারণিতে জ্যোতির্বিজ্ঞান ছাড়াও বর্ষপঞ্জিকা-সম্পর্কিত তথ্যও রয়েছে। মূলত তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত জ্যোতির্বিজ্ঞান-বিষয়ক সারণি তৈরি করার পদ্ধতিকে বলা হতো 'সিন্দহিন্দ'। এই সিন্দহিন্দের ওপর ভিত্তি করেই মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাদের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণি তৈরি করেছিলেন। আল-খাওয়ারিজমি তার ছকগুলোতে চন্দ্র-সূর্যের গতি ছাড়াও তখনকার সময়ে আবিষ্কৃত পাঁচটি গ্রহের গতি নিয়ে আলোচনা করেন। আল-খাওয়ারিজমির জ্যোতির্বিজ্ঞান-বিষয়ক কাজগুলোই পরবর্তীকালে মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য পথিকৃৎ হয়ে থাকে।
ত্রিকোণমিতি নিয়ে আল-খাওয়ারিজমির কাজ কম হলেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ত্রিকোণমিতিক ফাংশন সাইন ও কোসাইন-এর অনুপাত নির্ণয় করেন এবং তার জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণিতে সেগুলো সংযুক্ত করেন। গোলকাকার ত্রিকোণমিতি সম্পর্কে একটি বইও লেখেন।
আল-খাওয়ারিজমি 'কিতাব সুরাতুল-আরদ' বা পৃথিবীর চিত্র গ্রন্থটি লেখেন ৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে। 'জিয়োগ্রাফি' নামে পরিচিত এই বইটি টলেমির 'জিয়োগ্রাফি'-র ওপর ভিত্তি করে রচিত। বইটিতে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের ভিত্তিতে আবহাওয়া অঞ্চল ভাগ করা হয়েছে। টলেমির তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে রচনা করলেও তিনি টলেমির ভ্রান্তিগুলো সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। আল-খাওয়ারিজমি ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক এবং ভারত মহাসাগর-সম্পর্কিত টলেমির ভুলগুলো সংশোধন করেন। 'কিতাব সুরাতুল-আরদ'-এর একটি কপি বর্তমানে ফ্রান্সের স্ট্র্যাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে।
আল-রাযি: আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে যাকারিয়া আল-রাযি (২৫১-৩১৩ হি./৮৬৫-৯২৫ খ্রি.) ছিলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানী। দুইশটির মতো গ্রন্থ তিনি রচনা করেছিলেন, যার প্রায় অর্ধেক চিকিৎসাশাস্ত্র-বিষয়ক। তার বহু গ্রন্থ লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়ে মধ্যযুগের বিজ্ঞানকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। তার লেখাতেই প্রথম বসন্ত রোগের আনুপূর্বিক চিকিৎসা-বৈজ্ঞানিক বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন বাগদাদ শহরের প্রধান হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক। প্লাস্টার অব প্যারিস জাতীয় পদার্থ তৈরি করে তার সাহায্যে ভাঙা হাড় জোড়া দেওয়ার পদ্ধতির আবিষ্কর্তাও তিনি। রসায়নশাস্ত্রেও তার বিশেষ আগ্রহ ছিল, রসায়নবিদ্যার গোপন কথা নিয়ে তিনি বইও লিখেছিলেন। সংগীত-বিষয়েও তিনি একটি কোষগ্রন্থ রচনা করেন। তার জন্ম রায় শহরে এবং মৃত্যুবরণ করেন বাগদাদে।
আল-হাসান ইবনুল হাইসাম: আবু আলি আল-হাসান ইবনে আল-হাসান ইবনুল হাইসাম (৩৫৪-৪৩• হি./৯৬৫-১০৩৯ খ্রি.) পশ্চিমা বিশ্বে তিনি আল-হাজেন নামে সমধিক পরিচিত। ইসলামি স্বর্ণযুগের তিনি ছিলেন একাধারে পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক। তাকে আধুনিক আলোকবিজ্ঞানের জনক বলে আখ্যায়িত করা হয়।
আবহাওয়াবিজ্ঞান ও চক্ষুবিজ্ঞানে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। মূলত কায়রোতে বসে তিনি তার গবেষণার কাজ করছিলেন। ইবনুল হাইসাম ইউক্লিডের জ্যামিতির বিস্তৃত পর্যালোচনা করে দুটি উল্লেখযোগ্য গবেষণাপত্র লেখেন। এই পত্রে তিনি ইউক্লিডের 'এলিমেন্টস' গ্রন্থের বিভিন্ন সংজ্ঞা, স্বতঃসিদ্ধ এবং সমান্তরাল রেখার তত্ত্ব ও স্বীকার্য নিয়ে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করেন। তার শঙ্কুচ্ছেদের ক্ষেত্রফল ও ঘূর্ণায়মান বস্তুর আয়তন-সংক্রান্ত গবেষণাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা ও দর্শনেও তার যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তিনি তার রচনায় আলোকবিজ্ঞানের যে পরিচিতি দিয়েছেন তা সেই সময়ের পক্ষে সবচেয়ে সম্পূর্ণ ও সমৃদ্ধ বিবরণী। চোখের গঠন ও কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে তিনি যে আলোচনা করেছেন তাও যথেষ্ট আধুনিক। বিজ্ঞানের ইতিহাসেও তার আগ্রহ ছিল।
তার লেখায় এমন একটি যন্ত্রের আলোচনা করা হয়েছে যার সাহায্যে আলোকিত বস্তুর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়। তিনি তুলাপাত্রসহ এমন একটি তুলারও বর্ণনা দিয়েছেন যা শতকরা ৯৯.৯ ভাগ নিখুঁত পরিমাপ দিতে পারত। যন্ত্রটি ব্যবহার করা হতো বিভিন্ন পদার্থের ঘনত্ব নির্ণয় করার জন্য। আল-হাইসামের দার্শনিক রচনা থেকে তার নিজের যে পরিচয় পাওয়া যায় তা জ্ঞানপিপাসু, ধর্মপ্রাণ ও জীবনমুখী এক মানুষের।
ইবনে নাফিস (১২১৩-১২৮৮ খ্রি.): আবুল হাসান আলাউদ্দিন আলি ইবনে আবুল হাযম আল-খালিদি আল-কারশি আদ-দিমাশকি। বিখ্যাত আরব বিজ্ঞানী ও চিকিৎসাবিদ। দামেশকে জন্মগ্রহণ করেন এবং মিশরের কায়রোতে কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। তিনি প্রথম রক্ত-সঞ্চালন সম্পর্কে সঠিক বর্ণনা প্রদান করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান ছাড়াও ব্যাকরণ, ফিকহ ও যুক্তিবিদ্যায় বিশেষ ব্যুৎপত্তির অধিকারী ছিলেন তিনি।
ইবনে সিনার চিকিৎসাবিশ্বকোষ আল-কানুনের Anatomy অংশের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবনে নাফিস লেখেন 'শারহু তাশরিহি কানুন ( شرح تشريح القانون)। এতে তিনি হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের ভেতর দিয়ে রক্ত চলাচল সম্পর্কে গ্যালেন ও ইবনে সিনার তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং ভ্রান্ত বলে প্রমাণ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বিপ্লবের সৃষ্টি করেন। মানবদেহে বায়ু ও রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত ছিলেন ইবনে নাফিস। তিনি মানবদেহে রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতি, ফুসফুসের গঠনপদ্ধতি, শ্বাসনালি, হৃৎপিণ্ড, শরীরের শিরা-উপশিরায় বায়ু ও রক্তের প্রবাহ ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য দেন। ইবনে নাফিস 'আশ-শামিল ফিস-সানাআ আতিত-তিব্বিয়‍্যাহ' নামে ৩০০ খণ্ডের এক বিশাল বিশ্বকোষ রচনার পরিকল্পনা করেন এবং খসড়াও তৈরি করেন। তিনি তার জীবদ্দশায় মাত্র ৮০ খণ্ড সমাপ্ত করে যেতে পেরেছিলেন। ইবনে নাফিস তার বিশ্বকোষের পাণ্ডুলিপি ও অন্যান্য পাণ্ডুলিপি এবং সংগৃহীত সব গ্রন্থ আল-মানসুরি বিমারিস্তানে (হাসপাতালে) জমা দেন। এটি বর্তমানে 'কালাউন হাসপাতাল' নামে পরিচিত। ৮০ খণ্ডের মধ্যে মাত্র দুই খণ্ড এখন এই হাসপাতালে আছে, বাকি খণ্ডগুলো বিশ্বের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তার আরেকটি গ্রন্থ হলো 'বুগয়াতুত তালিবিন ওয়া হুজ্জাতুল মুতাতাব্বিন'। এটি কয়েক শতাব্দীব্যাপী চিকিৎসাবিজ্ঞানের রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর তার আরেকটি কোষগ্রন্থ হলো 'আল-মুহাযযাব ফিল-কাহলিল মুজাররাব'।
ফ্রান্সিস বেকন (Francis Bacon 1561-1626) ইংরেজ আইনজ্ঞ, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ ও নীতিজ্ঞ। বিজ্ঞানে বিপ্লবের কালে যাদের হাত দিয়ে বিজ্ঞানের পরীক্ষামূলক প্রায়োগিক দিকটির সমৃদ্ধি ঘটেছে বেকন তাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন ব্যবহারিক বিজ্ঞানের প্রবক্তা। বেকন নিজেকে বিজ্ঞানী হিসেবে যতটা, তার চেয়ে বেশি সংস্কারের প্রবক্তারূপে দাবি করতেন। তিনি তার দার্শনিক সংস্কারের ঘোষণায় চারটি আদর্শের উল্লেখ করেন। তার প্রতি অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি তার লেখায় বিভিন্ন তত্ত্বের উৎস অকথিত রেখে নিজের মৌলিকতা অতিরঞ্জিত করেছেন। বেকনের জন্ম হয়েছিল অভিজাত পরিবারে। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে অধ্যয়ন করেন এবং তখনই অ্যারিস্টটলের দর্শনের প্রতি তার বীতস্পৃহা জন্মে। ফ্রান্সে কিছুকাল কাটিয়ে তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে যোগ দেন ও নাইট উপাধি পান। তিনি ইংল্যান্ডের সলিসিটর জেনারেল, অ্যাটর্নি জেনারেল ও লর্ড চ্যান্সেলররূপে কাজ করেন এবং স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ব্যারন উপাধি দেওয়া হয়। তার রচিত গ্রন্থ: The Advancement and Proficience of Learning Divine and Human (1605), New Atlantis (1626)।
মুস্তাফা নাজিফ (১৮৯৩-১৯৭১ খ্রি.) মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রকৃতিবিজ্ঞানের ওপর তার লেখা গ্রন্থ (علم الطبيعة) ইলমুত তাবিআ ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয়।
প্রকৃতিবিজ্ঞানের ওপর আরবিভাষায় লেখা এটি প্রথম গ্রন্থ। ১৯৩০ সালে তার আলোকবিজ্ঞানের ওপর ৮০০ পৃষ্ঠা সংবলিত বই প্রকাশিত হয়। এটিও আলোকবিজ্ঞানের ওপর আরবি ভাষায় প্রথম বই। মুস্তাফা নাজিফ ইবনুল হাইসামের রচনাবলি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন এবং রচনা (الحسن بن الهيثم بحوثه وكشوفه البصرية) করেন তার অবিস্মরণীয় গ্রন্থ আল-হাসান ইবনুল হাইসাম : বুহুসুহু ওয়া কুশুফুহুল বাসারিয়‍্যা। তিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মিশরীয় বিজ্ঞানী। তার আগ্রহ ও গুরুত্বের বিষয় ছিল ইসলামি সভ্যতায় বৈজ্ঞানিক পুনর্জাগরণ। তিনি আরবি ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ।
কার্ল পিয়ারসন (Karl Pearson 1857-1936) ইংরেজ গণিতবিদ, জীববিজ্ঞানী ও দার্শনিক। তিনি প্রথমে ফলিত গণিত ও বলবিদ্যার এবং পরে ইজেনিক্সের অধ্যাপক হিসেবে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তিনি হলেন জীবমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। 'বায়োমেট্রিকা' নামে তিনি একটি পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করতেন। তার রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে: Mathematical Contributions To The Theory of Evolution, Tables For Statisticians And Biometricians, The Grammar of Science। জালদাকি: ইযযুদ্দিন আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আইদামির আল-জালদাকি ছিলেন রসায়নবিদ ও দার্শনিক। তখনকার যুগে প্রখ্যাত রসায়নবিদদের অন্যতম। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: كنز الاختصاص في معرفة الخواص البرهان في أسرار علم الميزان كتاب المصباح في علم المفتاح نهاية الطلب في شرح المكتسب وزراعة الذهب، لتقريب في أسرار التركيب في الكيمياء |
তার অধিকাংশ গ্রন্থই বিশ্বের একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি খুরাসানের জালদাকে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৭৪২ হিজরি/১৩৪১ খ্রিষ্টাব্দের পরে মৃত্যুবরণ করেন। (৫৪২)
তুগরায়ি : আবু ইসমাইল আল-হুসাইন ইবনে আলি ইবনে মুহাম্মাদ আল-ইস্পাহানি (৪৫৩-৫১৩ হিজরি/১০৬১-১১১৯ হিজরি), তুগরায়ি নামে পরিচিত। কবি ও রসায়নবিদ। ইস্পাহানে জন্মগ্রহণ করেন। খলিফার প্রশাসনিক সচিব ছিলেন। রসায়ন ও জ্যোতির্বিদ্যা প্রসঙ্গে গ্রন্থ রচনা করেছেন। (৫৪৩)

টিকাঃ
৫৩২. জাবির ইবনে হাইয়ান, কিতাব আত-তাজরিদ, এরিক জন হোলমিয়ার্ড (Eric John Holmyard) কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত সংকলনগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। সংকলনগ্রন্থের নাম The Alchemical Works of Geber, অনুবাদক, রিচার্ড রাসেল, ১৬৭৮ সালে অনূদিত হলেও ১৯২৮ সালে প্যারিস থেকে মুদ্রিত হয়েছে। এটির ভূমিকা লিখেছেন টড প্রাটাম (Todd Pratum)।-অনুবাদক
৫৩৩. জাবির ইবনে হাইয়ান, কিতাব আল-খাওয়াস, পৃ. ২৩২।
৫৩৪. জাবির ইবনে হাইয়ান, কিতাব আস-সাবয়িন, পৃ. ৪৬৪।
৫৩৫. কাদরি তাওকান, মাকামুল আকলি ইনদাল আরাব, পৃ. ২১৭-২১৮।
৫৩৬. ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, খ. ১, পৃ. ৭৭-৭৮।
৫৩৭. ইবনুল হাইসাম, আল-মানাযির, টীকা: আবদুল হামিদ সাবরাহ, পৃ. ৬২।
৫৩৮. কাদরি তাওকান, মাকামুল আকলি ইনদাল আরাব, পৃ. ২২৩।
৫৩৯. ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, পৃ. ২১৮।
৫৪০. অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত।
৫৪১. দেখুন, ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৪৯৮-৫০৩; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ২, পৃ. ১০৩।
৫৪২. দেখুন, হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ২, পৃ. ১৫১২; যিরিকলি, আল-আলাম, খ. ৫, পৃ. ৫।
৫৪৩. দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আয়ান, খ. ২, পৃ. ১৮৫-১৯০; সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল ওয়াফায়াত, খ. ১২, পৃ. ২৬৮-২৬৯।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 প্রায়োগিক দিক

📄 প্রায়োগিক দিক


'প্রায়োগিক দিক'-ও একটি নতুন পন্থা বলে পরিগণিত। মুসলিমদের যুগেই এই দিকটির বিকাশ ঘটেছে। বিশেষ করে যখন গ্রিক ও ইউনানীয় সভ্যতার সঙ্গে মুসলিম সভ্যতার তুলনামূলক বিচার করা হয়েছে তখন এ দিকটি স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে।
ইসলামপূর্ব প্রাচীন বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের তত্ত্বের উদ্ভাবন ঘটিয়েছিলেন। এগুলোর মধ্যে অনেক তত্ত্ব কেবল সঠিকই ছিল না, বরং প্রতিভাদীপ্তও ছিল। তা সত্ত্বেও, এসব তত্ত্বের অধিকাংশই-শুদ্ধ ও যথার্থ হলেও-খণ্ডের পর খণ্ড শুধু কাগজের পৃষ্ঠাই ভরিয়ে তুলেছে, মানবজীবনের বাস্তবিকতায় তার কার্যকরী কোনো প্রয়োগ ঘটেনি। জ্ঞানবিজ্ঞানে এই দিকটিকেই আমরা প্রায়োগিক দিক বুঝিয়েছি। যার ফলে তত্ত্বগুলো বাস্তবিক রূপ নিয়ে মানুষের কাজে লাগে, তাদের উপকার সাধন করে। এমনকি তা তাদের বিনোদনের উপাদান হলেও।
মুসলিমদের আবির্ভাব ও বিশ্বজুড়ে তাদের রাজ্যপ্রতিষ্ঠা ও সংস্কারকর্মের পর মুসলিম বিজ্ঞানীরা প্রতিটি সঠিক তত্ত্বকে উপকারী কার্যে রূপান্তরিত করেন। এতে মানুষের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হয়।
এই ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো মুসা ইবনে শাকিরের পুত্রদের উদ্ভাবনসমূহ। তারা সেচযন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন, পাহাড়ের উপরে পানি উত্তোলনের যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন এবং সূক্ষ্ম সময়দায়ক ঘড়ি আবিষ্কার করেছিলেন। অথচ তারা প্রাচীন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ওপরই নির্ভরশীল ছিলেন। তা ছাড়া তারা নিজেরাই অনেক তত্ত্ব সৃষ্টি করেছিলেন। অবশেষে এসব তত্ত্বের তাড়নাতে কেবল চিন্তাভাবনাতেই ক্ষান্ত না থেকে তারা সমাজের বরং গোটা মানববিশ্বের উপকার সাধনে সর্বতোভাবে ব্রতী হয়েছিলেন!
আয-যাহরাবিও মানবকল্যাণসাধনে ব্রতী হয়েছিলেন। তিনি শল্যচিকিৎসার (অস্ত্রোপচারের) অসংখ্য যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করেছিলেন। উদাহরণত, তিনি তাত্ত্বিকভাবে জানতেন যে ওষুধ যখন সরাসরি রক্তের সঙ্গে মেশে তা অতি দ্রুত ক্রিয়া করে। এ ব্যাপারটিই তাকে ইনজেকশন আবিষ্কারে উদ্বুদ্ধ করে। যাতে কার্যতই ওষুধ দ্রুততার সঙ্গে রক্তে পৌঁছানো যায়। (৫৪৪)
ইবনুল বাইতারও তত্ত্বের বেড়াজালে বন্দি না থেকে মানবকল্যাণে কাজ করেছিলেন। তিনি আশিটিরও বেশি ওষুধ আবিষ্কার করে চিকিৎসাশাস্ত্রের ময়দানে বিশাল অবদান রেখেছিলেন। (৫৪৫)
জাবির ইবনে হাইয়ান কয়েকটি রাসায়নিক সমীকরণ (যৌগ) ব্যবহার করে বৃষ্টি-নিরোধক কোট (রেইন কোট) আবিষ্কার করেছিলেন। একইভাবে অগ্নি-নিরোধক কাগজও তৈরি করেছিলেন। এই কাগজ আগুনে জ্বলত না। অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এতে লেখা হতো। (৫৪৬)
আমরা অব্যবহিত পরেই মুসলিম বিজ্ঞানীদের প্রায়োগিক গবেষণার মূল্য বুঝতে পারি। যখন দেখি যে, গ্রিক ও ইউনানীয় জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরা অসংখ্য দার্শনিক তত্ত্ব লিপিবদ্ধ করেছে, কিন্তু তারা তা বাস্তবিকতার বিচারে পরীক্ষানিরীক্ষা করেনি। ফলে এসব তত্ত্ব থেকে তারা নিজেরা যেমন উপকৃত হয়নি, মানুষও কোনো উপকার পায়নি।
বিজ্ঞানী-পরিচিতি (৫৪৭)
মুসা ইবনে শাকির: বানু মুসা নামে বিখ্যাত তিন প্রকৌশলীর পিতা। যৌবনে তিনি দস্যু ছিলেন। তারপর তওবা করে ফিরে আসেন এবং খলিফা মামুনের সেবাজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। জ্যোতির্বিদ্যা অধ্যয়ন করেন এবং ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি ২০০ হিজরি/৮১৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মৃত্যুবরণ করেন। তখন তার ছেলেরা ছিল ছোট। তাদেরকে বাইতুল হিকমায় ভর্তি করানো হয়। তার তিন পুত্র:
১. আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবনে মুসা ইবনে শাকির: জ্যোতির্বিদ, প্রকৌশলী, ভূগোলবিদ ও শারীরবৃত্তবিদ।
২. আহমাদ ইবনে মুসা ইবনে শাকির: যন্ত্রপ্রকৌশলী।
৩. হাসান ইবনে মুসা ইবনে শাকির: প্রকৌশলী ও ভূগোলবিদ। (৫৪৮)
আয-যাহরাবি: আবুল আব্বাস খাল্‌ল্ফ ইবনে আব্বাস আয-যাহরাবি আল-উন্দুলুসি (মৃ. ৪২৮ হি./১০৩৬ খ্রি.) ছিলেন চিকিৎসক, বিজ্ঞানী। ইসলামি যুগের শ্রেষ্ঠ শল্যচিকিৎসক। তাকে শল্যচিকিৎসার জনক বলে আখ্যায়িত করা হয়। ত্রিশ খণ্ডে রচিত (التصريف لمن عجز عن التأليف) আত-তাসরিফু লি-মান আজাযা আনিত তালিফ তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। শল্যচিকিৎসা বিষয়ে তিনিই প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন। তিনিই প্রথম রক্তক্ষরণ বা রক্তক্ষরণপ্রবণতার (হিমোফিলিয়া) পরম্পরীণ প্রকৃতি আবিষ্কার করেন। (৫৪৯)
ইবনুল বাইতার: জিয়াউদ্দিন আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবনে আহমাদ আল-মাকালি (৫৯৩-৬৪৬ হি./১১৯৭-১২৪৮ খ্রি.) ইবনুল বাইতার নামে পরিচিত ছিলেন। আন্দালুসীয় উদ্ভিদবিজ্ঞানী। তাকে উদ্ভিদতত্ত্ববিদদের গুরু মনে করা হয়। ফার্মাসিস্ট, ভেষজবিজ্ঞানী। মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের অন্যতম। উদ্ভিদতত্ত্ব বিষয়ে তার রচনাবলির সংকলন الجامع في الأدوية المفردة । الجامع في الأدوية المفردة ও لمفردات الأدوية والأغذية জার্মান ও অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি আন্দালুসের মাকালা শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং দামেশকে মৃত্যুবরণ করেন। (৫৫০)

টিকাঃ
৫৪৪. জালাল মাযহার, হাদারাতুল ইসলাম ওয়া আছারুহা ফিত-তারাক্কিল আলামি, পৃ. ৩৩১-৩৩২।
৫৪৫. মাক্কারি, নাফহুত তিব, খ. ২, পৃ.৬৯২।
৫৪৬. গুস্তাভ লি বোঁ, হাদারাতুল আরাব, পৃ. ৪৭৫-৪৭৬।
৫৪৭. অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত।
৫৪৮. দেখুন, ইবনুল আবারি, মুখতাসারুদ দুওয়াল, পৃ. ২৬৪; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৭, পৃ. ৩২৩।
৫৪৯. দেখুন, ইবনে বাশকুওয়াল, আস-সিলাতু ফি তারিখিল উন্দুলুস, খ. ১, পৃ. ২৬৪; যিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ২, পৃ. ৩১০।
৫৫০. দেখুন, ইবনে শাকির কুতুবি, ফাওয়াতুল ওয়াফায়াত, খ. ২, পৃ. ১৫৯-১৬০।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 বিজ্ঞানী দল

📄 বিজ্ঞানী দল


বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানী দলও একটি নতুন মৌলিক বিষয়। মুসলিমগণ বিজ্ঞানী দল গঠনের মধ্য দিয়ে পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের চিন্তাপদ্ধতি ও গবেষণারীতিতে পরিবর্তন এনেছেন। ইতিহাসে মুসলিমরাই প্রথমবার পরিপূর্ণ বিজ্ঞানী দল গঠন করেছেন। এই দলে ছিলেন বিভিন্ন বিষয়ের একাধিক বিজ্ঞানী। তারা অবশেষে আমাদের জন্য উপকারী আবিষ্কার ও যন্ত্রপাতি উপহার দিয়েছেন। একাধিক বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীর সমন্বিত প্রচেষ্টা ব্যতিরেকে এসব কাজ সম্ভব হতো না।
চিত্র নং-১ মুসা ইবনে শাকিরের পুত্রত্রয় রচিত 'আল-হিয়াল'
মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা (মুহাম্মাদ, হাসান ও আহমাদ) ইতিহাস বিখ্যাত প্রথম বিজ্ঞানী দল। তাদের মধ্যে মুহাম্মাদ ছিলেন প্রকৌশল-বিজ্ঞানী, আহমাদ ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং হাসান ছিলেন যন্ত্রবিজ্ঞানী। তারা যৌথভাবে 'আল-হিয়াল' (কৌশল) গ্রন্থটি (৫৫১) রচনা করেন। এতে আক্ষরিকভাবেই বিজ্ঞানী দলের আত্মার স্ফুরণ ঘটেছে এবং দলভিত্তিক সমন্বিত যৌথ কার্যাবলির নীতি বাস্তবিক রূপ লাভ করেছে। বইটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দলবদ্ধ কাজের সাক্ষ্য বহন করেছে। উপর্যুক্ত গ্রন্থ থেকে কিছু উদাহরণ পেশ করা হলো।
মুহাম্মাদ, হাসান ও আহমাদ বলেছেন:
মডেল-১ : আমরা কীভাবে (কা'স) বিকার (৫৫২) প্রস্তুত করা হয় তা ব্যাখ্যা করতে চাই। এতে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানীয় বা পানি ঢালা হয়। তারপর যদি এতে অতিরিক্ত সামান্য (মিসকাল) পরিমাণ পানীয় বা পানি ঢালা হয় তাহলে এতে যতটুকু আছে পুরোটাই উপচে পড়ে যায়। (৫৫৩)
মডেল-২: খোলা নির্গমদ্বারযুক্ত পাত্র নির্মাণ করা হয় কীভাবে তা ব্যাখ্যা করতে চাই। এটিতে যতক্ষণ পানি ঢালা হয় ততক্ষণ নির্গমদ্বার দিয়ে কিছু বের হয় না, ঢালা বন্ধ করামাত্রই নির্গমদ্বার দিয়ে পানি বেরুতে শুরু করে, আবার ঢালা শুরু করলে পানি বেরুনো বন্ধ হয়ে যায়, ঢালা বন্ধ করে দিলে পানি বেরুতে শুরু করে, আবার ঢালতে শুরু করলে পানি বেরুনো বন্ধ হয়ে যায়। (৫৫৪) এভাবে চলতেই থাকে..।
মডেল-৩ : দুটি ফোয়ারা একইসঙ্গে কীভাবে কাজ করে তা ব্যাখ্যা করছি। এর একটি ফোয়ারা থেকে বর্শার মতো পানি নির্গত হয় এবং অপরটি থেকে আইরিস ফুলের মতো। এভাবে কতক্ষণ চলে। তারপর পরিবর্তন ঘটে। যে ফোয়ারা থেকে বর্শার মতো পানি বেরুচ্ছিল তা থেকে আইরিস ফুলের মতো পানি বেরোয় এবং যে ফোয়ারা থেকে আইরিস ফুলের মতো পানি বেরুচ্ছিল তা থেকে বর্শার মতো পানি বেরোয়। ঠিক আগের সময়ের অনুরূপ। যতক্ষণ পানির প্রবাহ থাকে ততক্ষণ এভাবে চলতে থাকে।
এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। এগুলো একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞানী দল হিসেবে মুসা ইবনে শাকিরের পুত্রদের মেধা ও বুদ্ধিমত্তার বৈদগ্ধ্য প্রমাণ করে। জ্ঞানের ময়দানে যূথবদ্ধতা বা যৌথ ও সমন্বিত কর্মের মূল্য ও গুরুত্বও বোঝা যায় এ থেকে।
কোনো সন্দেহ নেই যে, এই ভ্রাতৃত্রয়ের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ দক্ষতার সম্মিলন ও পূর্ণাঙ্গতা বৈজ্ঞানিক সত্য আবিষ্কারে সহায়ক হয়েছে। একাধিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একাধিক বিজ্ঞানী ছাড়া এসব আবিষ্কার সহজ হতো না। যেমন: পৃথিবীর ব্যাসের সূক্ষ্ম অনুমান অথবা বিশাল আকার অ্যাস্ট্রোল্যাব(৫৫৫) প্রস্তুত করা, যার দ্বারা অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সঙ্গে গ্রহনক্ষত্রের চলাচলের হিসাব করা যায়।
এমন যৌথ গবেষণা কেবল এই অনন্য বিজ্ঞান-শাখাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাতেও তা বিস্তৃত ছিল। আমরা দেখতে পাই, চিকিৎসাবিজ্ঞান, ভেষজবিজ্ঞান, ওষুধবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও সহযোগিতামূলক সমন্বয়ের ভিত্তিতে গবেষণা হয়েছে। ভূতত্ত্ববিদ, ভূগোলবিদ ও জ্যোতির্বিদেরাও সমন্বিত গবেষণা করেছেন।
বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী আল-রাযি ও তার শিষ্যদের মধ্যে যৌথ গবেষণার কাজ হয়েছে। ইবনে নাদিম(৫৫৬) তা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, আল-রাযি ছিলেন তার যুগের অনন্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিত্ব। তিনি পূর্ববর্তীদের জ্ঞান, বিশেষ করে চিকিৎসা-বিষয়ক জ্ঞান সংকলন করেছেন। তিনি দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াতেন...। তিনি মজলিসে বসতেন, তার সামনে তার ছাত্ররা থাকত। তার ছাত্রদের পেছনে তাদের ছাত্ররা থাকত। তাদের পেছনে থাকত অন্য ছাত্ররা। কোনো একজন অসুস্থ লোক এসে প্রথমে যাদের পেত তাদের কাছে রোগ-লক্ষণ বর্ণনা করত। তাদের কাছে সমাধান থাকলে তারা বলে দিত। অন্যথায় অসুস্থ লোকটি তাদের ডিঙিয়ে অন্যদের কাছে আসত। তারা সঠিক সমাধান দিলে তো ভালোই, অন্যথায় আল-রাযি সে ব্যাপারে কথা বলতেন। তিনি ছিলেন অমায়িক, সহানুভূতিশীল, দয়ালু। দরিদ্র ও রোগীদের প্রতি অত্যন্ত মমতাময় ছিলেন। প্রয়োজনে তিনি রোগীদের অস্ত্রোপচার করতেন এবং তাদের সুস্থ করে তুলতেন। (৫৫৭)
আল-রাযির ছাত্ররা ছিলেন অসংখ্য বিজ্ঞানী দলের মতো। প্রত্যেক দল উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে তার মত পেশ করত এবং অবশেষে তারা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছত। তাদের সবার শিরোভূষণ হয়ে বসে থাকতেন আল-রাযি, তিনি তাদের বক্তব্য শুনতেন, পর্যালোচনা করতেন এবং ভুল হলে ঠিক করে দিতেন। জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে তিনি তাদের সঙ্গে থাকতেন এবং তাদের সবকিছু বিস্তারিত বুঝিয়ে দিতেন।
জীববিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই যে কেবল বিজ্ঞানী দল ছিল তা নয়, শরিয়তের বিভিন্ন শাস্ত্রের ক্ষেত্রেও জ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন দল ছিল। আমরা দেখতে পাই যে, কুরআন ও সুন্নাহ, হাদিস, ফিকহ ও আকিদার নানা ধরনের সমস্যার সমাধানে আলেমদের বড় বড় দল একত্র হতেন এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হতেন। ফলে জ্ঞান-আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং তা দ্রুতই পরিণতিতে পৌঁছে।

টিকাঃ
৫৫১. গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ: Book of Ingenious Devices.
৫৫২. বিকার (Beaker): ঠোঁটওয়ালা বড় কাচের পাত্র। সাধারণত রাসায়নিক পরীক্ষায় ব্যবহৃত।
৫৫৩. বানু মুসা ইবনে শাকির, কিতাব আল-হিয়াল, ঢাকা : আহমাদ ইউসুফ হাসান ও অন্যরা, মা'হাদুত ত্বরাসিল ইলমিল আরাবি, ১৯৮১, টাকাকারের ভূমিকা, পৃ. ৫৭।
৫৫৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯।
৫৫৫. গ্রহনক্ষত্রের উন্নতি নির্ণয়ের জন্য মধ্যযুগীয় যন্ত্রবিশেষ।
৫৫৬. যেমনটি পূর্বে গিয়েছে, বিশুদ্ধ মতানুসারে তার নাম নাদিম, ইবনে নাদিম নয়। দেখুন, লিসানুল মিযান, খ. ৯, পৃ. ২১৪।
৫৫৭. ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩৫৬।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 জ্ঞানের আমানত

📄 জ্ঞানের আমানত


জ্ঞানের আমানত সুরক্ষার যে নীতি তাও একটি নতুন নীতি। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে এই নীতির কথা জানা ছিল না। কারণ ধর্মাদর্শ ও নৈতিকতার অনুপস্থিতিতে যে-কেউ মুনাফা ও খ্যাতির আশায় বিভিন্ন আবিষ্কার নিজের নামে চালিয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করেনি।
জ্ঞানগত আমানতের দাবি হলো চিন্তার ও জ্ঞানের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান। গবেষণা ও আবিষ্কার তার কর্তার নামেই যুক্ত হবে এবং তার নামেই পরিচিতি পাবে। কিন্তু মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণা ও আবিষ্কার চুরি যাওয়ার ফলে বেশ দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। তাদের আবিষ্কার ও গবেষণা পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, অথচ তারা মুসলিম বিজ্ঞানীদের কয়েক দশক বা কয়েক শতাব্দী পরে জন্মগ্রহণ করেছেন।
আমাদের মহান বিজ্ঞানী ইবনে নাফিসের ক্ষেত্রে যে জঘন্য চুরির ঘটনাটি ঘটেছে তা কারও অজানা থাকার কথা নয়। তিনি ফুসফুসীয় (রক্ত) সংবহন (pulmonary circulation) আবিষ্কার করেন এবং তা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ‘শারহু তাশরিহিল কানুন’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন। কিন্তু তাঁর এই আবিষ্কার কয়েক শতাব্দীব্যাপী অগোচরেই থেকে যায়। পরবর্তীকালে এই আবিষ্কার ভুলবশত ব্রিটিশ চিকিৎসাবিজ্ঞানী উইলিয়াম হার্ভের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়। তিনি ইবনে নাফিসের মৃত্যুর তিন শতাব্দীরও বেশি পরে রক্ত সংবহন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেন। মানুষ যুগের পর যুগ এই ভ্রান্তির মধ্যেই থেকে যায়, অবশেষে মিশরীয় চিকিৎসক মহিউদ্দিন তাতাবি এই সত্য উদ্‌ঘাটন করেন।
ইতালীয় চিকিৎসক আলাপ্যাগো ৯৫৪ হিজরিতে/১৫৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ইবনে নাফিসের ‘শারহু তাশরিহিল কানুন’ গ্রন্থের কিছু অংশ লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেন। এই চিকিৎসক ত্রিশ বছরের বেশি সময় রুহায় অবস্থান করেন এবং আরবি ভাষা আয়ত্ত করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আরবি থেকে লাতিনে অনুবাদ করা। তিনি যে অংশগুলো অনুবাদ করেন তাতে ফুসফুসীয় রক্ত সংবহন-সংক্রান্ত অধ্যায়টিও ছিল। তবে তার এই অনুবাদ হারিয়ে যায়।
চিত্র নং-২ ইবনে নাফিস রচিত 'আশ-শিফা'
মাইকেল সারভেটাস (Michael Servetus 1511-1553) নামের একজন স্প্যানিশ বিজ্ঞানী-যিনি চিকিৎসক ছিলেন না-প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। তিনি আলাপ্যাগো কর্তৃক অনূদিত ইবনে নাফিসের কিতাবের সন্ধান পান। সারভেটাস খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাস করতেন না এবং ত্রিত্ববাদের সমালোচনা করতেন। তিনি ভিন্নধর্মী চিন্তাভাবনা লালন করতেন। ফলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি বিভিন্ন শহরে নির্বাসিত জীবনযাপন করেন। ১০৬৫ হিজরিতে/১৫৫৩ খ্রিষ্টাব্দে সারভেটাসকে পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তার অধিকাংশ পুস্তকও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আল্লাহর ইচ্ছায় তার কিছু গ্রন্থ পুড়ে যাওয়া থেকে বেঁচে যায়। তার মধ্যে আলাপ্যাগো কর্তৃক অনূদিত ইবনে নাফিসের রক্ত সংবহন-সংক্রান্ত পাণ্ডুলিপিটিও ছিল। গবেষকেরা বিশ্বাস করে বসলেন যে রক্ত সংবহন পদ্ধতি আবিষ্কারের কৃতিত্ব প্রথমত এই স্প্যানিশ বিজ্ঞানী সারভেটাসের এবং দ্বিতীয়ত ব্রিটিশ চিকিৎসক উইলিয়াম হার্ভের। ১৩৪৩ হিজরি/১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই ধারণা চালু থাকল। অবশেষে মিশরীয় চিকিৎসক ড. মহিউদ্দিন তাতাবি এই ভুল ধারণা দূর করেন এবং প্রাপ্য অধিকার তার প্রাপককে ফিরিয়ে দেন। তিনি বার্লিনের গ্রন্থাগারে ইবনে নাফিসের ‘শারহি তাশরিহিল কানুন’ গ্রন্থের একটি পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন এবং এ বিষয়ে তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভ প্রস্তুত করেন। তিনি এই মহাগ্রন্থের একটি বিশেষ দিকের প্রতি সযত্ন আলোকপাত করেন। তা হলো ফুসফুসীয় রক্ত সংবহন পদ্ধতি। এটা ১৩৪৩ হিজরির/১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ঘটনা।
তাতাবির গবেষণাপত্র দেখে তার শিক্ষক ও পর্যবেক্ষকগণ বিমূঢ় হয়ে পড়েন। এতে যে তথ্য রয়েছে তা জেনে তারা হতচকিত হয়ে যান, যেন তারা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। আরবি ভাষা তাদের জানা না থাকায় গবেষণাপত্রের একটি কপি জার্মান প্রাচ্যবিদ ম্যাক্স মেয়েরহোফের কাছে পাঠান। মেয়েরহোফ তখন কায়রোতে ছিলেন। তারা তার কাছে গবেষক তাতাবি যা লিখেছেন সে সম্পর্কে অভিমত চান। মেয়েরহোফ ড. তাতা বিকেই জোরালো সমর্থন করেন।
ড. তাতাবি তার একটি গবেষণায় লিখেছেন, আমাকে যে বিষয়টি বিস্ময়াভিভূত করে তা এই যে, সারভেটাসের বক্তব্যের কিছু কথা হুবহু ইবনে নাফিসের বক্তব্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, বরং তার অনুরূপ ছিল, যার আক্ষরিক অনুবাদ করা হয়েছে...। সারভেটাস স্বাধীন চিন্তার মানুষ ছিলেন, চিকিৎসক ছিলেন না। তিনি ইবনে নাফিসের ভাষাতেই ফুসফুসীয় রক্ত সংবহন পদ্ধতির উল্লেখ করেন, অথচ ইবনে নাফিস তার দেড় শতাব্দীরও বেশি আগে মৃত্যুবরণ করেছেন।
মেয়েরহোফ ইবনে নাফিসের প্রচেষ্টার যে সত্য আবিষ্কৃত হলো তা ঐতিহাসিক জর্জ সার্টনের কাছে পাঠিয়ে দেন। সার্টন তা তার বিখ্যাত গ্রন্থ হিস্ট্রি অব সাইন্সের (History of Science) শেষ খণ্ডে (৫৫৮) প্রকাশ করেন। (৫৯)
আলদো মিলি (৫৬০) উভয়ের মূল বক্তব্য পর্যবেক্ষণ করেন এবং বলেন, ইবনে নাফিস ফুসফুসীয় সংবহনের যে বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন তা আক্ষরিকভাবে সারভেটাসের বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। সুতরাং স্পষ্ট সত্য এই যে, ফুসফুসীয় রক্ত সংবহন পদ্ধতির আবিষ্কার ইবনে নাফিসেরই, সারভেটাস বা হার্ভের নয়। (৫৬১)
মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের ক্ষেত্রে জ্ঞানগত নিরাপত্তাহীনতা ও এমন সব চৌর্যবৃত্তির ঘটনা কম নয়। আমরা এখানে সেসবের প্রতি সংক্ষেপে কিছু ইঙ্গিত দিয়ে যাব:
• ফরাসি ইহুদি ডুরখেইমকে সমাজবিজ্ঞানের জনক অভিহিত করা হয়। অথচ যিনি এই বিজ্ঞানের আবিষ্কর্তা ও ভিত্তি প্রতিষ্ঠাতা তিনি হলেন মুসলিম মনীষী ইবনে খালদুন। এই বিষয়ে আলোচনা আসছে।
• গতিসূত্রসমূহের (Laws of Motion) আবিষ্কর্তা বলা হয় আইজ্যাক নিউটনকে, অথচ দুই মুসলিম বিজ্ঞানী এসব সূত্র আবিষ্কার করেন। তারা হলেন ইবনে সিনা ও হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা। পরবর্তী আলোচনায় এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
• আমরা রজার বেকনের (৫৬২) বিখ্যাত গ্রন্থ Opus Majus-এ একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় পাই-সেটি পঞ্চম অধ্যায়-যা ইবনে হাইসামের 'আল-মানাযির' গ্রন্থের আক্ষরিক অনুবাদ ছাড়া কিছু নয়। অথচ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মূল লেখকের প্রতি কোনো ইঙ্গিতও করা হয়নি।
এ সবকিছু মুসলিমদের সঙ্গেই ঘটেছে। অন্যদিকে মুসলিমদের নীতি ছিল ভিন্ন। তা হলো জ্ঞানের আমানত সুরক্ষা এবং গবেষণা ও কৃতিত্ব তার প্রাপককে প্রদানের নীতি। এই নীতির ফলে কোনো মুসলিম বিজ্ঞানীই অন্যান্য সভ্যতার বিজ্ঞানীদের কারও কোনো আবিষ্কার বা কোনো তত্ত্ব নিজের বলে দাবি করেননি। বরং তারা যাদের তত্ত্ব উদ্ধৃত করেছেন তাদের নাম উল্লেখ করেছেন, ঋণ স্বীকার করেছেন। ওইসব জ্ঞানী-বিজ্ঞানীর নামে তাদের গ্রন্থাবলি ভরপুর। যেমন: হিপোক্রেটিস, গ্যালেন, সক্রেটিস, অ্যারিস্টটল প্রমুখ। মুসলিম বিজ্ঞানীরা তাদের যথার্থ মূল্যায়ন করেছেন, তাদের প্রাপ্য হক দিয়েছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। গ্রন্থ রচনায় কিছুটা অবদান থাকলেও এবং সামান্য তথ্য নিলেও তাদের কারও নামই অনুল্লেখ থাকেনি।
উদাহরণস্বরূপ মুসা ইবনে শাকিরের পুত্ররা (বানু মুসা) তাদের معرفة (The Book of the Measurement of مساحة الأشكال البسيطة والكروية Plane and Spherical Figures) গ্রন্থে যা বলেছেন তা প্রণিধানযোগ্য। তারা বলেছেন, আমাদের গ্রন্থে আমরা যা-কিছুর বর্ণনা দিয়েছি তা আমাদেরই গবেষণা। তবে ব্যাসের পরিধি নির্ণয়ের সূত্র আমাদের নয়। এটি আমরা আর্কিমিডিস থেকে নিয়েছি। (ত্রিভুজে অঙ্কিত বিভিন্ন পয়েন্টের) দুটি পয়েন্টের মধ্যে অঙ্কিত যেকোনো পরিমাণ একটি অনুপাত তৈরি করবে (৫৬৩)-এই সূত্র আমরা মেনেলাউস (৫৬৪) থেকে নিয়েছি। (৫৬৫)
মুসলিম মনীষী বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে কালজয়ী গ্রন্থ (الحاوي في الطب) আল-হাবি ফিত-তিব্ব-এর রচয়িতা আবু বকর আল-রাযি কী বলেছেন তা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তিনি বলেছেন, আমি এই গ্রন্থে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানাবিধ অসংখ্য বিষয় সংকলন করেছি। আমি প্রাচীন চিকিৎসক-দার্শনিকদের মধ্যে হিপোক্রেটিস, গ্যালেন, আরমাসুস ও অন্যদের গ্রন্থাবলি থেকে তথ্য নিয়েছি এবং পরবর্তীদের মধ্য থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন নতুন বিষয় সংযোজনকারী, যেমন পল(৫৬৬), আহারোন, হুনাইন ইবনে ইসহাক, ইয়াহইয়া ইবনে মাসাওয়াইহ প্রমুখ। (৫৬৭)
আমরা ইসলামি গ্রন্থাগারগুলোতে ভিনদেশি বিজ্ঞানীদের অসংখ্য অনূদিত গ্রন্থ দেখতে পাই। সেগুলো তাদের নামেই অনূদিত হয়েছে। মুসলিম বিজ্ঞানীরা সেসব গ্রন্থে টীকা ও বিশ্লেষণ যুক্ত করেছেন, অথচ মূল বক্তব্যে হাত দেননি। যাতে মূল লেখকের চিন্তাভাবনা অবিকৃতরূপে সুরক্ষিত থাকে। যেমন মুসলিম বিজ্ঞানী আল-ফারাবি অ্যারিস্টটলের ‘মেটাফিজিক্স (Metaphysics)’ গ্রন্থে টীকা সংযুক্ত করেছেন।
জ্ঞানের সম্মানজনক আমানত সুরক্ষা কার্যতই মুসলিম বিজ্ঞানীদের সুকীর্তি। যেসব মৌলিক নীতি অনুসরণ করে মুসলিমগণ পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের চিন্তার রীতি ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন সাধন করেছিলেন তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্ঞানের আমানত সুরক্ষা। বিশেষ করে যখন অন্যান্য জাতির সামসময়িক প্রজন্ম তাদের পিতৃপুরুষদের ইতিহাস জানতে আগ্রহী ছিল না, তখন তাদের গবেষণা ও আবিষ্কার চুরি করাটা সহজ ব্যাপারই ছিল। কিন্তু মুসলিম বিজ্ঞানীরা ছিলেন গভীর নীতিবোধ ও সততার ওপর অধিষ্ঠিত।
ব্যক্তি-পরিচিতি (৫৬৮)
উইলিয়াম হার্ভে (১৫৭৮-১৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দ): ইংরেজ চিকিৎসক ও শারীরবিজ্ঞানী। রক্ত সংবহন বিষয়ে হার্ভের বিখ্যাত গ্রন্থ 'De Motu Cordis' প্রকাশিত হয় ১৬২৮ সালে। ইউরোপে তিনি ফুসফুসীয় রক্ত সংবহন ও হৃৎপিণ্ড যে পাম্পের মতো কাজ করে তার আবিষ্কর্তা বলে পরিচিত।
মহিউদ্দিন আত-তাতাবি: তিনি জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইবনে নাফিসের ওপর অভিসন্দর্ভ রচনা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ইবনে নাফিস সম্পর্কে অজানা সব তথ্য তিনি আবিষ্কার করেন। তার জন্ম ১৮৯৬ সালে এবং ১৯৪৫ সালে তিনি টাইফাস রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
ম্যাক্স মেয়েরহোফ ১২৯১-১৩৬৪ হিজরি (Max Meyerhof 1874-1945): জার্মান চক্ষু-চিকিৎসক ও প্রাচ্যবিদ। ইউরোপের বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদদের অন্যতম। আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। ১৯০৩ সালে মিশর ভ্রমণ করেন এবং কায়রোতে অবস্থান করেন। কায়রোতেই মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ইসলামি সভ্যতায় চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ভেষজবিজ্ঞানের ইতিহাসের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
জর্জ সার্টন (George Sarton 1884-1956): বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসবেত্তাদের অন্যতম। বেলজিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান। রসায়নবিদ, প্রকৃতিবিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ। ১৯১৯ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি কার্নেগি ইনস্টিটিউট অব ওয়াশিংটনে গবেষণা সহকারী ছিলেন। আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন, বৈরুতের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়েও বক্তৃতা দিয়েছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ হিস্ট্রি অব সাইন্স।
এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim 1858-1917): University of Bordeaux-এ এবং প্যারিসের সর্বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি সমাজবিজ্ঞানকে একটি বিধিবদ্ধ বিদ্যায়তনিক বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। করেন। পাশ্চাত্যে তিনি ম্যাক্স ওয়েবার, কার্ল মার্ক্সের সঙ্গে একত্রে সমাজবিজ্ঞানের জনক হিসেবে পরিচিত।
হিবাতুল্লাহ ইবনে মালকা: আবুল বারাকাত হিবাতুল্লাহ ইবনে আলি ইবনে মালকা আল-বালাদি আল-বাগদাদি (৪৮০-৫৬০ হি./১০৮৬-১১৬৫ খ্রি.)। 'আওহাদুয যামান' (যুগের অনন্য) উপাধিতে ভূষিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও দার্শনিক। বসরায় জন্মগ্রহণ করেন ও বেড়ে ওঠেন। পরে বাগদাদ ভ্রমণ করেন। ইহুদি ছিলেন, শেষ বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আব্বাসি খলিফা মুসতানজিদ বিল্লাহ ও অন্য খলিফাদের প্রাসাদে কাজ করেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
المعتبر في الحكمة، اختصار التشريح من كلام جالينوس، كتاب الأقراباذين، رسالة في العقل وماهيته، كتاب التفسيرا (৫৬৯)
হিপোক্রেটিস Hippocrates of Kos or Hippocrates of Cos II. (৪৬০-৩৭০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ): তার পিতার নাম Heraclides Ponticus এবং মায়ের নাম Praxitela। কোস দ্বীপের এক পুরোহিত-বৈদ্য পরিবারে তার জন্ম এবং পিতার কাছ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে হাতেখড়ি। তারপর নানা স্থানে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করে তিনি রোগ ও চিকিৎসা সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ-নির্ভর তথ্যকে একটি নিয়মাবদ্ধ তাত্ত্বিক কাঠামোয় রূপ দিতে সচেষ্ট হন। এইভাবে তিনি হলেন বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসাবিদ্যার প্রতিষ্ঠাতা। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে 'দা প্রশ্নস্টিকস', 'অন এয়ারস ওয়াটারস অ্যান্ড প্লেসেস', 'অন ফ্র্যাকচারস', 'অন সার্জারি' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তার ছাত্র ও শিষ্যদের লেখা বহু গ্রন্থও তার নামে নামাঙ্কিত হয়েছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে কার্যকারণ ফলাফল, পারিবেশিক অবস্থার বিশ্লেষণ ও নিদানিক পর্যবেক্ষণের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। তার আরেক কালজয়ী কীর্তি হলো চিকিৎসকদের জন্য রচিত শপথবাক্য, যা হিপোক্রেটীয় অনুজ্ঞা নামে পরিচিত এবং ডাক্তাররা আজও পেশায় প্রবেশ করার আগে এই শপথবাক্য পাঠ করে থাকেন। এই অনুজ্ঞা থেকে দায়িত্বসচেতনতা, নীতিবোধ ও মানবিকতার এক চমৎকার উদ্ভাস ঘটে। সব মিলিয়ে পরবর্তী বিজ্ঞান ও বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর তার প্রভাব অনস্বীকার্য।
গ্যালেন (Galen Aelius Galenus or Claudius Galenus 129-200): গ্রিক চিকিৎসাবিজ্ঞানী, শল্যচিকিৎসক ও প্রকৃতিবিজ্ঞানী। অঙ্গব্যবচ্ছেদবিজ্ঞান, শারীরবিজ্ঞান, রোগবিজ্ঞান, ওষুধবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বিকাশ ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। তিনি দর্শন ও চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ে প্রভূত জ্ঞান লাভ করেন এবং আলেকজান্দ্রিয়া ও করিন্থ পরিভ্রমণ করে ১৬৪ খ্রিষ্টাব্দে রোমে চলে এসে রোমান সম্রাটের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হন। দর্শন ও চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে তিনি প্রায় চারশটি পাণ্ডুলিপি রচনা করেন।
আর্কিমিডিস (২৮৭-২১২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) : একজন গ্রিক গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক। যদিও তার জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা গেছে, তবুও তাকে ক্ল্যাসিক্যাল যুগের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পদার্থবিদ্যায় তার উল্লেখযোগ্য অবদানের মধ্যে রয়েছে স্থিতিবিদ্যা আর প্রবাহী স্থিতিবিদ্যার ভিত্তি স্থাপন ও লিভারের কার্যনীতির বিস্তারিত ব্যাখ্যাপ্রদান। পানি তোলার জন্য আর্কিমিডিসের ক্রু পাম্প, যুদ্ধকালীন আক্রমণের জন্য সিজ ইঞ্জিন ইত্যাদি মৌলিক যন্ত্রপাতির ডিজাইনের জন্যও তিনি বিখ্যাত। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় তার নকশাকৃত আক্রমণকারী জাহাজকে পানি থেকে তুলে ফেলার যন্ত্র বা পাশাপাশি রাখা একগুচ্ছ আয়নার সাহায্যে জাহাজে অগ্নিসংযোগের পদ্ধতি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে।
হুনাইন ইবনে ইসহাক: আবু যায়দ হুনাইন ইবনে ইসহাক আল-ইবাদি (৮১০-৮৭৩ খ্রি.)। আরব নেস্টোরিয়ান খ্রিষ্টান। বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, অনুবাদক, ঐতিহাসিক। ইরাকের হিরার অধিবাসী। খলিফা মামুনের সময়ে অনুবাদ বিভাগের প্রধান ছিলেন। গ্রিক ও ফারসি গ্রন্থাবলি আরবি ও সুরয়ানি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। (৫৭০)
ইয়াহইয়া ইবনে মাসাওয়াইহ: আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে মাসাওয়াইহ বা ইউহান্না ইবনে মাসাওয়াইহ (৭৭৭-৮৫৭ খ্রি.)। আসিরিয়ান নেস্টোরিয়ান খ্রিষ্টান, চিকিৎসক। ভেষজবিজ্ঞানে অভিজ্ঞ। সুরয়ানি বংশোদ্ভূত ও আরবে বেড়ে ওঠা। খলিফা হারুনুর রশিদ ও মামুনের চিকিৎসক ছিলেন। মুতাওয়াক্কিলের যুগেও চিকিৎসা করেছেন। ইরাকের সামাররায় ৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে/২৪৩ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। (৫৭১)

টিকাঃ
৫৫৮. গ্রন্থটি ৯ খণ্ডে প্রকাশিত।- অনুবাদক
৫৯. মুহাম্মাদ আস-সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদাল মুসলিমিন, পৃ. ২০৮; আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রুউওয়াদু ইলমিত তিব্ব ফিল-হাদারাতিল আরাবিয়্যাতি ওয়াল-ইসলামিয়া, পৃ. ৪৫১।
৫৬০. Aldo Mieli (১৮৭৯-১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ): ইতালীয় প্রাচ্যবিদ। La science arabe et son role dans l'evolution scientifique mondiale )العلم عند العرب وأثره في تطور العلم العالى( গ্রন্থের রচয়িতা।
৫৬১. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রুউওয়াদু ইলমিত তিব্ব ফিল-হাদারাতিল আরাবিয়্যাতি ওয়াল ইসলামিয়া, পৃ. ৪৫১।
৫৬২. Roger Bacon (১২১৪-১২৯২ খ্রি.): ইংরেজ বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। মধ্যযুগে বিজ্ঞানের বিকাশে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। নিরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা বলে পরিচিত। দৃষ্টিবিজ্ঞানের পথিকৃৎদের অন্যতম।
৫৬৩. এই সূত্র বুঝতে হলে মেনেলাউস কর্তৃক প্রদত্ত ত্রিভুজের সূত্র (Theorem of Menelaus) জানতে হবে।
৫৬৪. Menelaus of Alexandria (৭০-১৪০ খ্রি.): গ্রিক গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ। মুসলিমগণ গোলাকার কাঠামো মাপতে ও ল্যাবরেটরিতে তাঁর রচনাবলি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। দেখুন, হাজি খলিফা, কাশফুয যুনুন, খ. ১, পৃ. ১৪২।
৫৬৫. বানু মুসা ইবনে শাকির, কিতাবু মারিফাতি মাসাহাতিল আশকাল, সম্পাদনা: নাসিরুদ্দিন তুসি, পৃ. ২৫।
৫৬৬. Paul of Aegina (৬২৫-৬৯০ খ্রি.): বাইজান্টীয় গ্রিক চিকিৎসাবিজ্ঞানী। Medical Compendium in Seven Books তাঁর রচিত চিকিৎসা-বিশ্বকোষ।
৫৬৭. ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, খ. ১, পৃ. ৭০।
৫৬৮. অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত।
৫৬৯. দেখুন, ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, খ. ২, পৃ. ৩১৩-৩১৬; যিরিকলি, আল-আলাম, খ. ৪, পৃ. ৭৪।
৫৭০. দেখুন, ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, খ. ২, পৃ. ১২৮-১৩৭; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৪০৯।
৫৭১. দেখুন, ইবনে আবি উসাইবিআ, উয়ুনুল আনবা ফি তাবাকাতিল আতিব্বা, খ. ২, পৃ. ১০৯-১২২; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৪১১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00