📄 জ্ঞান সবার জন্য
ইসলামপূর্ব যুগে জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ সাধারণ জনমানব থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতেন। তাদের ও জনগণের মধ্যে ব্যবধান ছিল অলঙ্ঘনীয়। পারস্য বলি, রোম বলি বা গ্রিস বলি-সব জায়গাতেই জ্ঞানীরা সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করতেন। তাদের নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক ও মুনাযারা অনুষ্ঠিত হতো এবং জ্ঞানের উত্তরাধিকার তাদের মধ্যেই বিরাজমান ছিল। অন্যদিকে সাধারণ জনগণ অজ্ঞতার অন্ধকারে বসবাস করত। জ্ঞানের কোনো শাখার সঙ্গে তাদের ন্যূনতম সংযোগ ছিল না। কিন্তু ইসলাম ভিন্ন জিনিস!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক বাক্যে ঘোষণা করেছেন,
«طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةُ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ»
জ্ঞান অন্বেষণ প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ। (৫২৮)
ফলে জ্ঞান অর্জন একটি ধর্মীয় অবশ্যকর্তব্যে পরিণত হয়। বরং এটি জাতিগত দায়িত্বও, যা সকলের জন্য আবশ্যক। সকলের জন্য জ্ঞান অর্জন আবশ্যক হলে সবাইকে অবশ্যই শিক্ষার্থী ও জ্ঞান-অন্বেষক হতে হবে, এই ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই নীতির বাস্তবিক অনুশীলন করেছেন। বদর যুদ্ধে মক্কার অনেক মুশরিক মুসলিমদের হাতে বন্দি হয়েছিল। তিনি তাদের অভিনব মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছিলেন। অর্থাৎ, বন্দিদের যে-কেউ মদিনার দশজন নারী-পুরুষকে পড়া ও লেখা শেখালে মুক্তি পেয়ে যাবে। এটা ছিল উন্নত সভ্যতার চিন্তা, যা সে সময়ে পৃথিবীর কেউ আদৌ কল্পনা করেনি, এমনকি তার পরের কয়েক শতাব্দীতেও তা ভাবেনি।
ইসলাম তার অনুসারীদের জ্ঞান-সাধনাকে তাদের জীবনে মৌলিক বিষয় হিসেবে নিতে নির্দেশ দিয়েছে। তাদেরকে আলেমদের বা জ্ঞানীদের এই পর্যায়ের মর্যাদা দিতে আদেশ দিয়েছে, যে ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَطْلُبُ فِيهِ عِلْمًا سَلَكَ اللَّهُ بِهِ طَرِيقًا مِنْ طُرُقِ الْجَنَّةِ وَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا رِضًا لِطَالِبِ الْعِلْمِ وَإِنَّ الْعَالِمَ لَيَسْتَغْفِرُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الأَرْضِ وَالْحِيتَانُ فِي جَوْفِ الْمَاءِ وَإِنَّ فَضْلَ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ عَلَى سَائِرِ الْكَوَاكِبِ وَإِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ وَإِنَّ الأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا وَلَا دِرْهَمًا وَرَّثُوا الْعِلْمَ فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظٍّ وَافِرٍ
যে ব্যক্তি ইলম তলব বা জ্ঞান-অন্বেষণের উদ্দেশ্যে কোনো পথ অবলম্বন করেছে, আল্লাহ তার দ্বারা তাকে বেহেশতের পথসমূহের একটি পথে পৌঁছে দেন এবং ফেরেশতারা ইলম তলবকারীর সন্তুষ্টির জন্য তাদের ডানা পেতে দেয়। তা ছাড়া যারা আলেম তাদের জন্য আসমানে ও জমিনে যারা রয়েছে তারা সবাই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও দোয়া করতে থাকে, এমনকি মাছসমূহ পানির মধ্যে থেকেও ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। আলেমদের ফজিলত (বে-ইলম) আবেদদের (সাধকদের) ওপর তেমনই যেমন পূর্ণচন্দ্রের ফজিলত তারকারাজির ওপর এবং আলেমরা হলেন নবীগণের উত্তরাধিকারী। নবীগণ কোনো দিনার বা দিরহাম মিরাস (উত্তরাধিকার) রেখে যান না, তারা মিরাসরূপে রেখে যান শুধু ইলম। সুতরাং যে ব্যক্তি ইলম গ্রহণ করেছে সে পূর্ণ অংশগ্রহণ করেছে। (৫২৯)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতেকালের পর জাতীয় জ্ঞান-আন্দোলন অব্যাহত ছিল। তার উজ্জ্বল ফল ও পরিণতি আমরা দেখতে পাই। ইউরোপীয়দের জন্য এসব ব্যাপার স্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়। জাতীয় জ্ঞান-আন্দোলনের তিনটি পরিণতির কথা উল্লেখ করব। ইসলামই এগুলোর ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল।
১. গণগ্রন্থাগার: দ্বীনের অন্তস্থল থেকে যে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা রয়েছে তাতে উদ্দীপিত হয়ে মুসলিমগণ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন। তারা সেখানে বিনামূল্যে পড়াশোনা করতেন, বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি থেকে যা খুশি অনুলিপি করে নিতেন। শুধু তা-ই নয়, বড় বড় খলিফা ও আমির নানান দেশ থেকে বিদ্যার্থীদের এসব গ্রন্থাগারে আমন্ত্রণ জানাতেন, তাদের আতিথেয়তার ব্যবস্থা করতেন এবং তাদের জন্য বিশেষ অর্থভান্ডার থেকে ব্যয় নির্বাহ করতেন। ইসলামি বিশ্বের সব শহরেই এসব গ্রন্থাগার অনেক ছিল। এগুলোর মধ্যে বিখ্যাত হলো বাগদাদ গ্রন্থাগার, কর্ডোভা গ্রন্থাগার, সেভিল (৫৩০) গ্রন্থাগার, কায়রো গ্রন্থাগার, কুদ্স বা বাইতুল মুকাদ্দাস গ্রন্থাগার, দামেশক গ্রন্থাগার, ত্রিপোলি গ্রন্থাগার, মদিনা গ্রন্থাগার, সানআ গ্রন্থাগার, ফেজ গ্রন্থাগার ও কায়রাওয়ান গ্রন্থাগার।
২. বড় বড় ইলমি মজলিস (জ্ঞানচর্চার আসর) : ইসলামপূর্ব যুগে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার মতো কোনো আলেম বা জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন না। এই মহান দ্বীনের আবির্ভাবের পর ইসলামি বিশ্বের সব অঞ্চলে ইলমি মজলিসের বিস্তার ঘটে। কখনো কখনো এসব মজলিসে এত বেশি সংখ্যক মানুষের সমাগম হতো যে তা কল্পনাও করা যেত না। উদাহরণ হিসেবে ইবনুল জাওযির (৫৩১) মজলিসের কথা বলা যায়। ইবনুল জাওযির মজলিসে এক লাখেরও বেশি মানুষ উপস্থিত হতেন। তারা সবাই ছিলেন সাধারণ মানুষ। হাসান আল-বসরি, আহমাদ ইবনে হাম্বল, শাফিয়ি, আবু হানিফা, ইমাম মালিক-তাদের প্রত্যেকের মজলিসেই বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত হতেন। কখনো কখনো একটি মসজিদে একই সময়ে একাধিক ইলমি মজলিস বসত। কোনোটা তাফসিরুল কুরআনের মজলিস, কোনোটা ফিকহের মজলিস, অন্যটা নবীজির হাদিসের মজলিস, চতুর্থটা আকিদার মজলিস হলে পঞ্চমটা চিকিৎসাবিদ্যার মজলিস।
জ্ঞানের জন্য ব্যয় করা সদকাও আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় বলে বিবেচিত হতো: এই চিন্তা ও অনুভূতি থেকে উম্মাহর ধনী মানুষেরা মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য তাদের সম্পদ ব্যয় করতেন। এমনকি তারা তালিবুল ইলম ও শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রন্থাগার নির্মাণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য বহু সম্পত্তি ওয়াকফ করেছেন। এভাবে জ্ঞানের জন্য ব্যয় করা কেবল বিদ্যার্থীদের জন্য নয়, অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষদের জন্যও কল্যাণের দ্বাররূপে উন্মোচিত হয়।
ইসলামি বিশ্বে জ্ঞান-সম্পৃক্ততা ছিল ব্যাপক। সকলের কাছেই জ্ঞানচর্চা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ ও অবশ্যকর্তব্য। এ কারণেই গ্রন্থাগারের বিস্তার ঘটে এবং বিপুল সংখ্যক ইলমি মজলিস ও জ্ঞানচর্চার আসর অনুষ্ঠিত হয়। অজ্ঞতা, মূর্খতা দূরীভূত হয়।
টিকাঃ
৫২৮. ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২২৪; আবু ইয়ালা, হাদিস নং ২৮৩৭; সুয়ুতি, আল-জামেউস- সাগির, হাদিস নং ৭৩৬০।
৫২৯. আবু দাউদ, কিতাব: আল-ইলম, বাব: আল-হাসসু আলা তালাবিল-ইলম, হাদিস নং ৩৬৪১; তিরমিযি, হাদিস নং ২৬৮২; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২২৩; আহমাদ, হাদিস নং ২১৭৬৩; ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৮৮। শুআইব আরনাউত বলেছেন, হাদিসটি হাসান।
৫৩০. স্পেনের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি শহর।-অনুবাদক
৫৩১. ইবনুল জাওযি: আবুল ফারাজ আবদুর রহমান ইবনে আলি ইবনে মুহাম্মাদ আল-কুরাশি আত-তাইমি (৫১০-৫৯২ হি.)। হাম্বলি মাযহাবপন্থী ফকিহ। ইতিহাসবিদ ও কোষগ্রন্থপ্রণেতা। জ্ঞানের বহু শাখায় তিনি গ্রন্থ রচনা করেছেন। বাগদাদেই তার জন্ম এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ২১, পৃ. ৩৬৫।