📄 জ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে বিরোধ নেই
জিবরাইল আলাইহিস সালাম প্রথম যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নাযিল হলেন তখন যে সত্য প্রতিভাত হলো তা চূড়ান্তভাবে জানিয়ে দিলো যে, নতুন দ্বীন (ইসলাম)-এর ভিত্তি হলো জ্ঞান। এখানে কোনোভাবেই ভ্রান্তি ও সন্দেহের কোনো স্থান নেই। ওহিরূপে প্রথম নাযিল হলো পাঁচটি আয়াত। আয়াতগুলো মোটামুটি একটি বিষয় নিয়েই আলোচনা করল, তা হলো জ্ঞান। আল্লাহ তাআলা বলেন,
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ
পাঠ করুন আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিণ্ড (আলাক) থেকে। পাঠ করুন, আর আপনার প্রতিপালক মহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। (৪৯৭)
এই পন্থায় প্রথম কুরআনের আয়াত নাযিল হওয়া একটি বিস্ময়কর ব্যাপার। তার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা কুরআনের অন্তর্ভুক্ত হাজার হাজার বিষয় থেকে একটি বিষয় বেছে নিয়েছেন এবং তার দ্বারা কুরআন শুরু করেছেন। অথচ যাঁর প্রতি কুরআন নাযিল হচ্ছে সেই নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন উম্মি, পড়তেও জানতেন না এবং লিখতেও জানতেন না। তাহলে এটা স্পষ্ট যে, এই প্রথম বিষয়টিই (অর্থাৎ, জ্ঞান) এই দ্বীন বোঝার চাবিকাঠি, দুনিয়া বোঝারও চাবিকাঠি, এমনকি যে আখিরাতে সকল মানুষ প্রত্যাবর্তন করবে সেই আখিরাত বোঝারও চাবিকাঠি।
আরও বিস্ময়কর এ কারণে যে, কুরআন নাযিল হওয়ামাত্রই এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে যে ব্যাপারে সেই সময় আরবরা কোনো গুরুত্ব দিত না। বরং রূপকথা, কল্পকাহিনি ও কুসংস্কারই তাদের আগাগোড়া জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করত। তাই জ্ঞানের সব ক্ষেত্রে তারা ছিল ভিখিরি। তবে অলংকারশাস্ত্র ও কাব্যের কথা ভিন্ন। এই ময়দানে তারা ছিল শ্রেষ্ঠ। তাদের সমকক্ষ কেউ ছিল না। এ কারণে কুরআন নাযিল হয়ে-এবং এটি অতিশয় বিস্ময়কর ব্যাপার-তারা যে বিষয়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সে বিষয়ে তাদের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। তাদের উদ্দেশে ঘোষণা দিয়েছে যে, কুরআন সব ক্ষেত্রে জ্ঞানের ও জ্ঞানগত উৎকর্ষের আহ্বান জানায় সেই পন্থাতেই, তারা যাতে সিদ্ধহস্ত।
সেই যুগে ইসলামের আবির্ভাব ছিল বাস্তবিক অর্থেই জ্ঞান-বিপ্লব। সেই পরিবেশ জ্ঞানাত্মার অনুকূল ছিল না, উপযোগীও ছিল না। এমনকি কুরআনের প্রথম বাণী অবতীর্ণ হওয়ার আগের সময়টা পরিচিতি পেয়েছে 'জাহিলিয়া' নামে! ইসলামপূর্ব যুগ অজ্ঞতার বিশেষণেই বিশেষিত। তারপর জ্ঞানের সূচনা এবং দুনিয়াকে অলৌকিক হেদায়েতের আলোয় আলোকিত করার জন্য ইসলামের আবির্ভাব ঘটল। আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ
তবে কি তারা জাহিলি যুগের বিধিবিধান কামনা করে? নিশ্চিত বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য বিধানদানে আল্লাহ অপেক্ষা কে শ্রেষ্ঠতর? (৪৯৮)
সুতরাং এই ধর্মে অজ্ঞতা, ধারণা, সন্দেহ ও সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই।
এই অলৌকিক কিতাব (কুরআন)-এর কেবল সূচনাতেই জ্ঞান, জ্ঞানের মূল্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়নি, বরং এই অবিনশ্বর সংবিধানে জ্ঞানই সুদৃঢ় নীতি। কুরআনের কোনো সুরাই জ্ঞানের আলোচনামুক্ত নয়, সব সুরাতেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জানের কথা রয়েছে।
আল্লাহ তাআলার কিতাবে জ্ঞান শব্দটি বা জ্ঞানজাত শব্দ কতবার এসেছে তা গুনতে গিয়ে আমি বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছি। কুরআনে জ্ঞান শব্দটি এসেছে ৭৭৯ বার! এটি কোনো অতিরঞ্জন নয়, সত্যিই। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি সুরায় ইলম বা জ্ঞান শব্দটি প্রায় সাতবার এসেছে!
এই সংখ্যা ইলম (জ্ঞান) ও আইন-লাম-মিম ধাতুজাত শব্দের সমষ্টি। অন্যথায়, কুরআনে আরও অসংখ্য শব্দ রয়েছে যেগুলো জ্ঞান বোঝায় বা জ্ঞান নির্দেশ করে, যদিও তা ইলম শব্দের দ্বারা উল্লেখ করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ: ইয়াকিন (দৃঢ়বিশ্বাস), হুদা (পথনির্দেশ), আকল (বুদ্ধি, বিবেক), ফিকর (চিন্তা), নযর (দর্শন), হিকমাহ (প্রজ্ঞা), ফিকহ (উপলব্ধি), বুরহান (যুক্তি), দলিল (প্রমাণ), হুজ্জাহ (যুক্তি, প্রমাণ), আয়াত (নিদর্শন), বাইয়িনাহ (প্রমাণ, সাক্ষ্য) এবং অন্যান্য সমার্থবোধক শব্দ, যেগুলো জ্ঞান বোঝায় এবং জ্ঞানের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহে (হাদিসসমূহে) ইলম শব্দটি কতবার এসেছে তা গণনা করা দুঃসাধ্য।
আরও লক্ষণীয় যে, কুরআনের প্রথমবার নাযিল হওয়ার মুহূর্তেই যে জ্ঞানের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে তা নয়, বরং মানব-সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই জ্ঞানের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। কুরআনুল কারিমের আয়াতসমূহে তা বিবৃত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আদমকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে জমিনের প্রতিনিধি বানিয়েছেন। তিনি ফেরেশতাদের নির্দেশ দিয়েছেন আদমকে সিজদা করতে, এর মাধ্যমে তাকে সম্মানিত করেছেন ও তার মর্যাদা উঁচুতে তুলে ধরেছেন। আর আল্লাহ তাআলা এই সম্মান, মর্যাদা ও উচ্চগৌরবের কারণ আমাদের ও ফেরেশতাদের কাছে বর্ণনা করেছেন। সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তা হলো ইলম বা জ্ঞান। তা বিবৃত করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةٌ قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنْبِثُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاءِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ قَالَ يَا آدَمُ أَنْبِتُهُمْ بِأَسْمَابِهِمْ فَلَمَّا أَنْبَأَهُمْ بِأَسْمَابِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَأَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنْتُمْ تَكْتُمُونَ ) وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ
স্মরণ করুন, যখন আপনার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে (আমার) প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। তারা বলল, আপনি কি সেখানে এমন কাউকেও সৃষ্টি করবেন (এমন সৃষ্টিকে প্রতিনিধি বানাতে চাচ্ছেন) যে অশান্তি ঘটাবে এবং রক্তপাত করবে? আমরাই তো আপনার (জন্য) সপ্রশংস মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করি। (৪৯৯) তিনি বললেন, আমি জানি যা তোমরা জানো না। (সেই রহস্যের প্রতি আমার লক্ষ রয়েছে। সে সম্পর্কে তোমরা কোনো খবর রাখো না। এরপর আল্লাহ যা-কিছু ইচ্ছা করেছিলেন তা অস্তিত্বপ্রাপ্ত হলো এবং প্রকাশ পেল।) আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম (৫০০) শিক্ষা দিলেন। (এই অভ্যন্তরীণ উন্নতি লাভ করলেন যে তিনি আল্লাহর কাছ থেকে সৃষ্টিজগতের যাবতীয় বস্তুর নাম জেনে নিলেন।) তারপর তিনি ওই সমুদয় (বস্তুকে) ফেরেশতাদের সামনে পেশ করলেন এবং বললেন, যদি তোমরা (তোমাদের সন্দেহের ক্ষেত্রে) সত্যবাদী হয়ে থাকো তাহলে এই সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও। (৫০১) তারা বলল, আপনি মহান, পবিত্র। আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের তো কোনো জ্ঞানই নেই। বস্তুত আপনি জ্ঞানময় ও প্রজ্ঞাময়। (ফেরেশতারা যখন এভাবে নিজেদের অক্ষমতা ও অপারগতা স্বীকার করে নিলো) তখন তিনি বললেন, হে আদম, তাদেরকে এ সকল (বস্তুর) নাম বলে দাও। সে তাদেরকে এই সকলের নাম বলে দিলে তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে আকাশমণ্ডল এবং পৃথিবীর অদৃশ্য বস্তু সম্পর্কে আমি নিশ্চিতভাবে অবহিত এবং তোমরা যা ব্যক্ত করো বা (তোমাদের অন্তরে) গোপন রাখো তাও আমি জানি? আর (দেখুন,) যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, আদমকে সিজদা করো, তখন (সঙ্গে সঙ্গে) ইবলিস ব্যতীত সবাই সিজদা করল। সে নির্দেশ অমান্য করল ও অহংকার করল। (সিজদার জন্য ইবলিসের ঘাড় নত হলো না।) এবং সে কাফেরদের দলভুক্ত হয়ে গেল। (৫০২)
এসব কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেছেন তা অতিরঞ্জন গোছের কিছু নয়। তিনি একটি হাদিসে ইঙ্গিত করেছেন যে, এই গোটা দুনিয়ার কোনো মূল্য নেই, এমনকি তা অভিশপ্ত, যদি না তা ইলম ও আল্লাহর যিকির দ্বারা সজ্জিত হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ، مَلْعُونُ مَا فِيهَا إِلا ذِكْرَ الله وَمَا وَالاهُ، أَوْ عَالَمًا أَوْ مُتَعَلَّمًا»
আল্লাহর যিকির এবং তাঁর আদেশপালন ও নিষেধ পরিহারকরণ এবং আলেম ও তালিবুল ইলম ব্যতীত দুনিয়া অভিশপ্ত, দুনিয়াতে যা রয়েছে তাও অভিশপ্ত। (৫০৩)
ইসলামি রাষ্ট্রে এ সবকিছুর (জ্ঞানের প্রতি এমন গুরুত্বারোপ ও জ্ঞানকে মহিমাময় করে তোলার) সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল। জ্ঞান ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন ময়দানে ব্যাপক উদ্যোগ ও কর্মচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। ইতিহাসে এমন উদ্যোগ ও কর্মতৎপরতার নজির নেই। ফলে মুসলিম জ্ঞানী-বিজ্ঞানীদের হাতে সভ্যতার ব্যাপক বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। মানবজাতির উত্তরাধিকার শ্রেষ্ঠ জ্ঞানভান্ডারে সমৃদ্ধ হয়েছে। গোটা পৃথিবী তার কাছে ঋণী হয়েছে। আমরা ইসলামে জ্ঞানের অবস্থান ও বিকৃত খ্রিষ্টধর্মে জ্ঞানের অবস্থান কী তা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করতে পারি। আমরা দেখব যে মধ্যযুগে চার্চ সম্পূর্ণরূপে জ্ঞানের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রোমে খ্রিষ্টীয় চার্চের সূচনাকাল থেকেই তা নিজেকে গ্রিক ও রোমান সংস্কৃতি ও সভ্যতা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। গোথদের (৫০৪) আক্রমণের ফলে রোমান সভ্যতা মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিল। প্রাচ্যীয় ক্যাথলিক চার্চ তার পূর্ণ যৌবনে পৌছে পৌত্তলিক দার্শনিক ও জ্ঞানীদের ওপর প্রচণ্ড জুলুম ও অত্যাচার শুরু করেছিল। এথেন্সের শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়। আলেকজান্দ্রিয়ায় গ্রিক দর্শনের ওপর লৌহ দুরমুশ মেরেছিল। চার্চ মনে করল যে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার পথ একটিই, তা হলো ঈশ্বরের পথ। আর পবিত্র গ্রন্থের (বাইবেল) বাইরে সত্য খোঁজা এবং পার্থিব বিষয়ে চিন্তাভাবনা ও পরীক্ষানিরীক্ষা করা মানেই গোমরাহি ও পথভ্রষ্টতা। (৫০৫)
এ সত্যটিকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন জার্মান প্রাচ্যবিদ সিগরিড হুংকে (৫০৬)। তিনি ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞানের অবস্থান কী এবং মধ্যযুগে ইউরোপীয় পশ্চিমাঞ্চলে খ্রিষ্টধর্মের দৃষ্টিতে জ্ঞানের অবস্থান কী ছিল তার তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। তিনি বিবরণ দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কীভাবে প্রত্যেক মুমিনকে-সে পুরুষ হোক বা নারী-জ্ঞান অর্জন করতে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন। জ্ঞান অর্জনকে তিনি একটি ধর্মীয় অবশ্যকর্তব্য বলে স্থির করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর অনুসারীদের সৃষ্টিজগৎ ও তার বিস্ময়কর বস্তুরাশি নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা ও জ্ঞান অর্জনকে মহান স্রষ্টার কুদরত ও ক্ষমতাকে চেনার উপায় বিবেচনা করেছেন। তা ছাড়া তিনি তাঁর অনুসারীদের আর সব জাতির জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি দৃষ্টিপাত করতেও নির্দেশ দিয়েছেন। সিগরিড হুংকে তার এই আলোচনার শেষে বলেছেন, তাঁর সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে গিয়ে সেন্ট পল (Paul the Apostle) বলেছেন, ঈশ্বর কি পার্থিব জ্ঞানকে নির্বুদ্ধিতা ও আহাম্মকি বলে আখ্যায়িত করেননি? (৫০৭)
সেন্ট অগাস্টিন (৫০৮) জ্ঞানের বলয় নির্দেশ করতে গিয়ে বলেছেন, ঈশ্বর ও (পবিত্র) আত্মা সম্পর্কিত জ্ঞানই আমি চাই। সত্যের অনুসন্ধানের অর্থই হলো ঈশ্বর সম্পর্কে অনুসন্ধান। এর জন্য বাইরের কোনো সাহায্য বা উপকরণের দরকার পড়ে না। এই জ্ঞানের একমাত্র উৎস হলো পবিত্র কিতাব (বাইবেল)। (৫০৯)
সিগরিড হুংকে স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা দিয়েছেন, কীভাবে তারা (চার্চ-কর্তৃপক্ষ) এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে নতুন জ্ঞানগত চিন্তার অধিকারী বা দাবিদার যে-কাউকে পথভ্রষ্ট কাফের বলে আখ্যায়িত করত। যেমন পৃথিবীর গোলাকার হওয়া। হুংকে তার বক্তব্যের সপক্ষে চার্চের দীক্ষাগুরু লাকতানতিয়াসের (৫১০) বাণীর দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছেন। যে-কতিপয় বিজ্ঞানী দাবি করতেন যে পৃথিবী গোলাকার তাদের ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে লাকতানতিয়াস বলেন, এটা কি বোধগম্য? বিশ্বাসযোগ্য? এটা কি বোধগম্য যে মানুষ এই পর্যায়ের পাগল হয়ে যেতে পারে? তাদের মগজে কীভাবে এটা ঢুকল যে পৃথিবীর অন্যপাশে শহর-নগর ও গাছপালা ঝুলে আছে এবং মানুষের পা তাদের মাথার উপরে উঠে গেছে।(৫১১) যে-কেউ প্রাকৃতিক ঘটনাবলির জ্ঞানগত ব্যাখ্যা গ্রহণ করবে বা মেনে নেবে সে অভিশপ্ত। নক্ষত্রের আবির্ভাব ও নদীর জোয়ারভাটার প্রাকৃতিক কার্যকারণ ব্যাখ্যা করলে সে ঈশ্বরের আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাবে। এমনকি ভাঙা পায়ের চিকিৎসা এবং নারীর গর্ভপাতের বৈজ্ঞানিক কার্যকারণ ব্যাখ্যা করলে সেও ধর্মচ্যুত। এগুলো হলো ঈশ্বরের পক্ষ থেকে বা শয়তানের পক্ষ থেকে শান্তি অথবা এমন অলৌকিক ব্যাপার যা আমাদের বোধগম্যতার বাইরে!(৫১২)
এ কারণে ইউরোপে ধর্ম ও জ্ঞানের মধ্যে একটি দ্বন্দ্বযুদ্ধের সৃষ্টি হয়। খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে জ্ঞান্দোলন ও জ্ঞানচাঞ্চল্য পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ইউরোপীয় রেনেসাঁস ও জ্ঞানের জাগরণ এবং চার্চের বিরুদ্ধে বিপ্লব সূচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই অবস্থাই বিরাজমান থাকে।
কোপার্নিকাস(৫১৩) ১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পৃথিবী ঘোরে এবং সূর্যই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র, পৃথিবী নয়। অথচ ইতিপূর্বে এ ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, পৃথিবীই বিশ্বজগতের কেন্দ্র এবং ঘোরে না। কোপার্নিকাসের এই সিদ্ধান্ত ইউরোপে দুর্যোগের সৃষ্টি করে। ইনজিল-ভিত্তিক সত্যের মানদণ্ডের বিচারে চার্চ এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে। চার্চ-কর্তৃপক্ষ মনে করে এই সিদ্ধান্ত তাদের বিশ্বাস-বিরোধী। কারণ, পৃথিবীকে বিশ্বজগতের কেন্দ্র না ধরে তাকে বিশ্বজগতে একটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ড (গ্রহ) হিসেবে বিবেচনা করা কেবল বৈজ্ঞানিক উদ্ঘাটন নয়, খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের মূলে কঠিন আঘাতও। খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস অনুযায়ী ঈশ্বর পৃথিবীতে মানবমণ্ডলীর মুক্তির জন্য দেহলাভ করেছেন। এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না যে, এই পৃথিবী অন্য বড় বড় গ্রহনক্ষত্রের মাঝে একটি ছোট গ্রহ। আর এটা তো অকল্পনীয় যে পৃথিবী সূর্যের অনুগামী হয়ে তার চারপাশে ঘুরছে। এ কারণে পৃথিবীর কেন্দ্র হওয়ার ধারণা বোধগম্যভাবেই একজন ঈশ্বর বা দেবতার অনুকূলে ছিল, যিনি নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে যাবতীয় বস্তু মানুষের উপকারের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আর এখন এ সকল মানুষ অনুভব করছে যে তারা একটি ছোট গ্রহের ওপর টলমল করছে, যার ইতিবৃত্ত বিশ্বজগতের ইতিহাসের মধ্যে একটি ছোট্ট পরিচ্ছেদে সংকুচিত হয়ে পড়েছে...। মানুষ যখন নতুন চিন্তা ও সিদ্ধান্তের মর্মার্থ অনুধাবন করবে, তারা অবশ্যই এই বক্তব্যের সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন শুরু করবে যে, এই শৃঙ্খলিত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা তার পুত্রকে এই ছোট আকারের গ্রহে আত্মাহুতি দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন। তাদের প্রশ্ন উত্থাপন অনিবার্য।
সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের ধারণা প্রদানকারী জ্যোতির্বিজ্ঞানী মানুষকে স্রষ্টা সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য করলেন। খ্রিষ্টধর্মীয় ঈশ্বরত্ব ধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল! (৫১৪) কোপার্নিকাস নিপীড়ন ও নিগ্রহের শিকার হলেন এবং তীব্র জঘন্য বিরোধিতার মুখে টিকে থাকতে পারলেন না। এভাবে বহু বছর কেটে গেল। অবশেষে তার এক ভক্তের দুঃসাহসের ফলে তিনি তার বইটি (On the Revolutions of Heavenly Spheres) প্রকাশ করতে সক্ষম হন। এ বছরই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অবশ্য তিনি বইটিতে বেশ কিছু পরিমার্জন ও সংশোধন করেন এবং স্বীকার করেন যে, তার সিদ্ধান্ত অনুমানভিত্তিক এবং তা ভ্রান্তির সম্ভাবনা রাখে। (৫১৫) কিন্তু কোপার্নিকাসের মৃত্যুর আশি বছর পর ব্রুনো (৫১৬) তার সিদ্ধান্তকে সত্য ধরে নিয়ে তা মেনে নেন। তিনি কোপার্নিকাসের সিদ্ধান্তকে আরও বিকশিত ও উৎকর্ষমণ্ডিত করেন এবং তার সঙ্গে নিজের মত যুক্ত করেন। ফলে হইচই শুরু হয়ে যায় এবং ইনকুইজিশন (৫১৭) বিচারসভা কোপার্নিকাসের গ্রন্থটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে (৫১৮) এবং ব্রুনোকে খোলা মাঠে পুড়িয়ে হত্যা করে। (৫১৯)
কোপার্নিকাসের চিন্তারাশি গ্যালিলিও গ্যালিলির (৫২০) চিন্তারাশির সূচনা ও ভিত্তি ছিল। এ কারণে চার্চ কর্তৃক গ্যালিলিকে তার সত্তর বছর বয়সে বিচারের মুখোমুখি করে অপমান-অপদস্থ করা হয়, যাতে তিনি তার যাবতীয় চিন্তা ও সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ সময়ের জন্য তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং সাত বছরব্যাপী প্রতিদিন সাতটি Book of Psalms পড়তে বাধ্য করা হয়। (৫২১)
এটা হলো সিন্ধু থেকে বিন্দু। এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। চার্চ কর্তৃপক্ষ কেবল কোপার্নিকাস, ব্রুনো ও গ্যালিলির শাস্তিবিধান করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা সকল জ্ঞানী ব্যক্তিকে ইনকুইজিশন নামক বিচারসভার মুখোমুখি করে। ইনকুইজিশন তার দায়িত্ব যথার্থভাবেই পালন করে। এই বিচারসভা মাত্র ১৮ বছরে-১৪৮১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৪৯৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত-দশ হাজার দুইশ বিশ ব্যক্তিকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ দেয় এবং তাদের জীবন্তই পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ছয় হাজার আটশ ষাট ব্যক্তিকে শহরে চক্কর লাগানোর পর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তাদেরকে এভাবেই ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়। তা ছাড়া, সাতানব্বই হাজার তেইশ ব্যক্তিকে বিভিন্ন প্রকারের শাস্তিতে দণ্ডিত করা হয়। (৫২২) গ্যালিলিও, জিয়োর্দানো ব্রুনো ও নিউটনের (৫২৩) গ্রন্থাবলি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ফরমান জারি করা হয়। নিউটনের অপরাধ ছিল তিনি মাধ্যাকর্ষণ শক্তির (মহাকর্ষ সূত্র) কথা বলেছেন। বিচারসভা তাদের সব বই পুড়িয়ে ফেলতে নির্দেশ দেয়। কার্ডিনাল খিমনিস (৫২৪) গ্রানাডায় সত্যিই আট হাজার পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে দেন। কারণ এগুলোর বক্তব্য চার্চের মতামত ও সিদ্ধান্তের অনুকূলে ছিল না। (৫২৫)
ইউরোপ এই অন্ধকারাচ্ছন্ন ও ভয়ংকর অবস্থা দীর্ঘ কয়েক শতাব্দীব্যাপী যাপন করেছিল। একে অন্ধকার যুগ বলে আখ্যায়িত করা হয়, মধ্যযুগও বলা হয় একে। মধ্যযুগীয় বর্বরতা কথাটা এখান থেকেই এসেছে। এই যুগ প্রায় এক হাজার বছর পরিব্যাপ্ত ছিল। এই বাস্তবিকতা বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের (যেমন: দেকার্তে ও ভলতেয়ার) ও সাধারণ মানুষের মগজে একটি ধারণা বদ্ধমূল করে দিয়েছিল যে, চার্চের কর্তৃত্ব ধ্বংস করা ছাড়া অথবা অন্তর থেকে ধর্মবোধকে সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া ব্যতীত জ্ঞানচর্চা ও আবিষ্কার-উদ্ভাবনের কোনো আশা নেই। তা ছাড়া নাস্তিক্যবাদ বলতে যা বোঝায় তার সবকিছুকে বরণ করে নিতে হবে। বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা তাওরাত ও ইনজিলের মতো পবিত্র গ্রন্থাবলির বিরুদ্ধে তাদের বিরোধিতার প্রকাশ্য ঘোষণা দিলেন। কারণ, তাওরাত ও ইনজিল বৈজ্ঞানিক সত্য-বিরোধী বিষয়ে পরিপূর্ণ। তাদের এই বিশ্বাসও জন্মেছিল যে, ধর্ম মানেই-যেমন তারা দেখেছিলেন-জ্ঞান ও জ্ঞানীদের বিনাশ এবং বুদ্ধি ও চিন্তার বন্ধ্যাত্ব। তারা ঐশী দলিল-প্রমাণের বিরুদ্ধে বুদ্ধি ও যুক্তিকে শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করার আহ্বান জানাতে শুরু করলেন। তাদের বক্তব্যের ভিত্তি ছিল এই যে, বুদ্ধি ও যুক্তিই জ্ঞানগত সত্য উদ্ঘাটনে সক্ষম এবং কল্যাণ ও অকল্যাণের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ে পারঙ্গম।
ফরাসি বিপ্লবের পর ফ্রান্সের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি চিন্তার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের সমর্থন জোগায়। ১৭৯০ সালে তারা একটি ফরমান জারি করে। ফরমানটির উদ্দেশ্য ছিল চার্চ কর্তৃপক্ষের কোমর ভেঙে দেওয়া। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি যাজক-যাজিকাদের বরখাস্ত করে এবং চার্চ-কর্তৃপক্ষকে নাগরিক সংবিধান (Civil Constitution) মানতে বাধ্য করে। পোপের বদলে অ্যাসেম্বলি চার্চে কারা নিয়োগ পাবে তার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৯০৫ সালে ফরাসি সরকার রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণ পৃথক করার আইন পাস করে এবং রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ হবে বলে ঘোষণা দেয়।
এটি ছিল চার্চের বিরুদ্ধে চরম আঘাত। তা চার্চ-বিরোধীদের সাহস জোগায়, তারা পবিত্র গ্রন্থ (বাইবেল) ও চার্চের স্বাধীন সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, উপর্যুক্ত আইন চার্চ কর্তৃপক্ষকে জাতি, রাষ্ট্র ও নতুন নাগরিক সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করতে বাধ্য করে। ধীরে ধীরে এমন আইন ইউরোপের সব রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে রাজনীতি ও জ্ঞান বিষয়ে চার্চের যে কর্তৃত্ব ছিল তার মূলোৎপাটন ঘটে। চার্চের ক্ষমতা চার দেয়ালের অভ্যন্তরে বন্দি হয়ে পড়ে। উপদেশবর্ষণ ও প্রার্থনাসংগীতেই তাদের সময় কাটে। (৫২৬)
কিন্তু দ্বীনে ইসলাম কখনোই চার্চের মতো ছিল না। কখনোই তা জ্ঞানচর্চায় মুসলিমদের পথে শত্রু বা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়নি। চাই তা চিন্তা ও গবেষণার দিক থেকে হোক বা প্রায়োগিক ও কার্যকরী দিক থেকে হোক। ইসলাম বরং মানুষকে জ্ঞানচর্চার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এবং উৎসাহিত করেছে। বুদ্ধি ও যুক্তির লাগাম খুলে দিয়েছে। স্বাধীন চিন্তা, দর্শন ও উপলব্ধির অবারিত সুযোগ দিয়েছে। এখানে প্রথা, অন্ধানুকরণ, প্রবৃত্তি ও ঝোঁক-প্রবণতার কোনো দখল ছিল না। তা কেন নয়, আল্লাহ তাআলা তো বুদ্ধি ও বিবেককে সম্বোধনের দ্বারা সম্মানিত করেছেন এবং একে দায়িত্ব আরোপের হেতু বানিয়েছেন।
দেখা যাচ্ছে যে, ইসলামি চিন্তাধারা ও মধ্যযুগের খ্রিষ্টীয় চিন্তাধারার মধ্যে দীর্ঘতম ব্যবধান রয়েছে। ইসলামি চিন্তাধারা চিন্তাগত স্বাধীনতার ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং এখানে আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে কোনো ধরনের মধ্যস্থতা ব্যতীত সম্পর্ক বিদ্যমান। ইসলামি চিন্তাধারা বুদ্ধি ও যুক্তিকে মর্যাদা দিয়েছে। মধ্যযুগের খ্রিষ্টীয় চিন্তাধারা চিন্তার স্বাধীনতাকে বাজেয়াপ্ত করেছে এবং চার্চের পুরোহিতকে বান্দাদের ও তাদের প্রভুর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী স্থির করেছে। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, পশ্চিমে ইউরোপীয় সভ্যতার পর্যায়ক্রমিক বিকাশসূচনার আগে হাজার বছর সময়ের কেন প্রয়োজন পড়েছে। অথচ ইসলামি আরবি সভ্যতার দুই শতাব্দী বা তিন শতাব্দী পূর্বেই ইউরোপীয় সভ্যতার বিকশিত হওয়ার উপযুক্ত সুযোগ ছিল, তারপর সে তার বিপ্লব মুসলিমদের কাঁধের ওপর সংঘটিত করতে পারত। (৫২৭)
টিকাঃ
৪৯৭. সুরা আলাক: ১-৫
৪৯৮. সুরা মায়িদা: আয়াত ৫০।
৪৯৯. খলিফা বা প্রতিনিধি সৃষ্টির উদ্দেশ্য কী তা জানার জন্য ফেরেশতাগণ এ কথা বলেছিলেন।-অনুবাদক
৫০০. বস্তুজগতের জ্ঞান।-অনুবাদক
৫০১. সত্যবাদী হও তোমাদের বক্তব্যে।-অনুবাদক
৫০২. সুরা বাকারা: আয়াত ৩০-৩৪।
৫০৩. তিরমিযি, কিতাব: আয-যুহদ, বাব: হাওয়ানুদ-দুনিয়া আলা আল্লাহ, হাদিস নং ২৩২২, তিনি বলেছেন, এটি হাসান গরিব হাদিস। দারেমি, হাদিস নং ৩২২; তাবারানি, আল-আওসাত, হাদিস নং ৪০৭২; বাযযার, হাদিস নং ১৭৩৬; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস নং ১৭০৮।
৫০৪. গোথ: প্রথম দিকের জার্মান জনগোষ্ঠী। এরা দুটি শাখায় বিভক্ত ছিল, ভিজিগোথ (Visigoths) ও অস্ট্রোগোথ (Ostrogoths)। পশ্চিমা রোমান সাম্রাজ্যের পতনে ও মধ্যযুগীয় ইউরোপের বিকাশে তাদের ভূমিকা রয়েছে।-অনুবাদক
৫০৫. নাদিয়া হুসনি, আল-ইলম ওয়া মানাহিজুল-বাহস, পৃ. ১৩।
৫০৬. ড. সিগরিড হুংকে (Sigrid Hunke 1913-1999): জার্মান নারী প্রাচ্যবিদ। হামবুর্গে জন্মগ্রহণ করেন। ধর্মতত্ত্ব, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, মনোবিজ্ঞান ও সাংবাদিকতা অধ্যয়ন করেন। ১৯৪১ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বেশ কয়েকটি আরব রাষ্ট্র ভ্রমণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: Allahs Sonne über dem Abendland: Unser arabisches Erbe (1960). বইটির আরবি অনুবাদ: শামসুল আরব তাসতাউ আলাল গারব।
৫০৭. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ৩৬৯।
৫০৮. আউরেলিয়ুস আউগুন্তিনুস বা সেন্ট অগাস্টিন (Augustine of Hippo: জন্ম ১৩ নভেম্বর ৩৫৪ খ্রি., মৃত্যু ২৮ আগস্ট ৪৩০ খ্রি.) প্রাচীন যুগের খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্ববিদ, চার্চ পদ্ধতির লাতিন গুরুদের অন্যতম এবং সম্ভবত স্বয়ং যিশুর কথিত শিষ্য সেন্ট পলের পরেই খ্রিষ্টধর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ ও দার্শনিক। তিনি রোমান অধ্যুষিত উত্তর আফ্রিকাতে বড় হয়েছেন এবং সেখানকার হিপ্পো রেগিয়ুস (বর্তমানে আলজেরিয়ার আন্নাবা শহর) নামক নগরীর বিশপ ছিলেন। তার রচিত বহু বইয়ের মধ্যে বিখ্যাত হলো The City of God এবং Confessions. বই দুটি বাইবেলের ভাষ্য হিসেবে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ এবং মধ্যযুগীয় ও এমনকি আধুনিক খ্রিষ্টীয় চিন্তাধারারও ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
৫০৯. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ৩৭০।
৫১০. Lucius Caecilius Firmianus Lactantius (২৫০-৩২৫ খ্রি.): প্রাচীন খ্রিষ্টীয় লেখক এবং প্রথম খ্রিষ্টান রোম সম্রাট প্রথম কনস্টান্টাইন (বা মহান কনস্টান্টাইন)-এর উপদেষ্টা ছিলেন।
৫১১. পৃথিবীতে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে রয়েছে চিলি। বাংলাদেশ থেকে কল্পনা করলে বোঝা যায় চিলিতে ঘরবাড়ি ও গাছপালা যেন ঝুলে রয়েছে। আমাদের মাথা যেদিকে, সে দেশের মানুষের পা সেদিকে।-অনুবাদক
৫১২. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ৩৭০।
৫১৩. ইউরোপের রেনেসাঁস যুগের জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাস (Nicolaus Copernicus) পৃথিবীকে পরিক্রমণশীল গ্রহ হিসেবে দেখিয়ে সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের আধুনিক ধারণার বিস্তার করেন। কোপার্নিকাস ১৪৭৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫৪৩ সালের ২৪ মে তার মৃত্যু হয়।
৫১৪. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ২৭, পৃ. ১৩৮-১৩৯।
৫১৫. প্রাগুক্ত, খ. ২৭, পৃ. ১৩১-১৩৪।
৫১৬. জিয়োর্দানো ব্রুনো (Giordano Bruno): ১৫৪৮ সালে নেপলিসের নোলা শহরে (বর্তমানে ইতালি) জন্মগ্রহণ করেন। একাধারে তিনি ছিলেন দার্শনিক, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, জ্যোতিষী ও মহাবিশ্বতত্ত্ববিদ। তিনি নিখুঁতভাবে নির্ণয় করেন যে সূর্য একটি উজ্জ্বল তারকা ছাড়া কিছু নয় এবং তা নিজ কক্ষপথে প্রতিনিয়ত আবর্তিত হচ্ছে। তিনি দাবি করেন যে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে পৃথিবী ছাড়াও এমন আরও অসংখ্য গ্রহ আছে যেখানে বুদ্ধিমান প্রাণীরা বসবাস করছে। তার চিন্তা ও মতাদর্শের কারণে রোমান ক্যাথলিক চার্চ নিযুক্ত তদন্ত-আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়। ১৬০০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। তিনি ত্রিশটিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। ব্রুনোকে 'বিজ্ঞানের শহিদ' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
৫১৭. নির্দয় ধর্মীয় বিচার (The Inquisition): 'ইনকুইজিশন' শব্দের অর্থ 'বিচারের জন্য অনুসন্ধান' হলেও ইউরোপের ইতিহাসে ইনকুইজিশন বলতে ধর্মান্ধতার যুগে ধর্মীয় প্রতিপক্ষ অথবা ধর্মীয় গোঁড়া সংস্কার ও বিশ্বাসের ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপনকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও নির্দয় বিচারব্যবস্থাকে বোঝায়। ইনকুইজিশন বা ধর্মীয় বিচারের সূচনা ঘটে ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে। খ্রিষ্টান যাজকগণ যাদেরকে অবিশ্বাসী বা খ্রিষ্টীয় ধর্মবিরুদ্ধ বলে ঘোষণা করত তাদের বিচার করার জন্য তদন্তকারী ও বিচারক নিযুক্ত করত। খ্রিষ্টীয় যাজকদের এই বিচারব্যবস্থা বিভিন্ন রাষ্ট্রের খ্রিষ্টান সম্রাটগণ অনুমোদন করেন। যারা খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করে অন্যকোনো ধর্মীয় বিশ্বাস গ্রহণ করত তাদের বিরুদ্ধেও ইনকুইজিশন-ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হতো। গোড়ার দিকে ধর্মত্যাগী বা অবিশ্বাসীদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি ও ক্ষমা প্রার্থনা আদায় ছাড়া দৈহিকভাবে নিপীড়ন করা না হলেও ক্রমান্বয়ে কারাগারে বন্দি করে রাখা, নির্মম নির্যাতন ও অত্যাচার, অভিযুক্তকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পুড়িয়ে হত্যা করা 'ইনকুইজিশন'-এর অংশ হয়ে দাঁড়ায়। এ বিচারব্যবস্থায় অভিযোগ প্রমাণের জন্য কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণের প্রয়োজন হতো না। দুজন লোকের গোপনীয় অভিযোগের ভিত্তিতে যেকোনো নাগরিককে এই ধর্মীয় তদন্ত-আদালতের কাছে সোপর্দ করে তাকে দণ্ডিত করা যেত। 'ইনকুইজিশন' চরম রূপ গ্রহণ করে স্পেনে, পঞ্চদশ শতকে। স্পেনীয় 'ইনকুইজিশন'-এর প্রধান লক্ষ্য ছিল ওইসব ব্যক্তি যারা খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করে ইসলামধর্ম গ্রহণ করত বা ইহুদিধর্মে বিশ্বাস করত। স্পেনের রাজা ফার্ডিনান্ড ও রানি ইসাবেলা যাকে প্রথম ইনকুইজিটর বা প্রধান বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন সে তার কার্যকালে দুহাজার লোককে জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা করেছিল। 'ইনকুইজিশন'-এর আতঙ্কে মধ্যযুগের ইউরোপে জ্ঞানবিজ্ঞানের গবেষকগণ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে বা মতামত প্রকাশ করতে সাহস পেতেন না। এই সময়ে জ্ঞানবিজ্ঞানের বিকাশ স্তব্ধ হয়ে পড়ে। অনেক চিন্তাবিদ ও মুক্তবুদ্ধির মানুষকে এই ধর্মীয় বিচারের যূপকাষ্ঠে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়। তাদের মধ্যে ইউরোপীয় পুনর্জাগরণের অন্যতম পুরোধা জিয়োর্দানো ব্রুনোর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার যুক্তিবাদী ও স্বাধীন মতামতের জন্য তাকে ইনকুইজিশনের হুকুমে ১৬০০ সালে রোম শহরে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।- অনুবাদক
৫১৮. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ২৭, পৃ. ১৩৮।
৫১৯. প্রাগুক্ত, খ. ২৭, পৃ. ২৮৮-৩০০, ব্রুনো ভুক্তি।
৫২০. রেনেসাঁস যুগের ইতালীয় বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি (Galileo Galilei)-কে আধুনিক পরীক্ষণ-বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয়। তিনি ১৫৬৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির পিসা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। ২০ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকা অবস্থাতেই তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'দোলকের নিয়ম' আবিষ্কার করেন। শুরুতে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন করলেও শেষে গণিত ও পদার্থবিদ্যাই তার বিষয় হয় এবং ২৫ বছর বয়সে তিনি পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। প্রাচীন গ্রিক আমল থেকেই বদ্ধমূল ধারণা ছিল, একই উচ্চতা থেকে ফেললে হালকা বস্তুর আগে ভারী বস্তু মাটিতে পড়বে। গ্যালিলিও পড়ার গতির ত্বরণ সম্পর্কে তার নির্ভুল ধারণা থেকে দেখান যে নিচে পড়ার গতি ওজনের ওপর নির্ভর করে না। গ্যালিলিও জ্যোতির্বিদ্যায় ব্যাপক পরিবর্তন আনেন এবং বেশ কিছু উন্নত দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। বৃহস্পতির চারটি চাঁদ তিনি আবিষ্কার করেন এবং শনিগ্রহের অদ্ভুত আকৃতিও তিনি প্রথম লক্ষ করেন। অত্যন্ত ক্ষমতাশালী খ্রিষ্টান ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ তাকে নিজের মত প্রকাশ্যে প্রত্যাহার করতে বাধ্য করে এবং বাকি জীবন তাকে নিজ বাড়িতে নজরবন্দি হয়ে থাকতে হয়। শেষ জীবনে তিনি অন্ধ হয়ে যান এবং ১৬৪২ সালের ৮ জানুয়ারি তার মৃত্যু হয়। তিনি ফ্লোরেন্স নগরীতে সমাহিত হন।-অনুবাদক
৫২১. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ২৭, পৃ. ২৬৪-২৮০, গ্যালিলিও ভুক্তি।
৫২২. আল-ইমাম মুহাম্মাদ আবদুহু, আল-ইদতিহাদ ফিন-নাসরানিয়্যাহ ওয়াল-ইসলাম, আল-মানার সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রবন্ধ, ৫ম ভলিউম, পৃ. ৪০১।
৫২৩. স্যার আইজ্যাক নিউটন (১৬৪৩-১৭২৭ খ্রি.) প্রখ্যাত ইংরেজ পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, প্রাকৃতিক দার্শনিক এবং আলকেমিস্ট। ১৬৮৭ সালে তার বিশ্বনন্দিত গ্রন্থ ফিলসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা (লাতিন ভাষায়: Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica, ইংরেজি ভাষায়: Mathematical Principles of Natural Philosophy প্রকাশিত হয়।) এতে তিনি সর্বজনীন মহাকর্ষ এবং গতির তিনটি সূত্র বিধৃত করেন। এই সূত্র ও মৌল নীতিগুলোই চিরায়ত বলবিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। তার গবেষণার ফলে উদ্ভূত চিরায়ত বলবিজ্ঞান পরবর্তী তিন শতকজুড়ে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার জগতে একক আধিপত্য করেছে। তিনিই দেখিয়েছিলেন যে, পৃথিবী এবং মহাবিশ্বের সকল বস্তু একই প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। কেপলারের গ্রহীয় গতিসূত্রের সঙ্গে নিজের মহাকর্ষ-তত্ত্বের সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে সমর্থ হয়েছিলেন। তার গবেষণার ফলেই সৌরকেন্দ্রিক বিশ্বের ধারণার পেছনে সামান্যতম সন্দেহও দূরীভূত হয় এবং বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ত্বরান্বিত হয়।- অনুবাদক
৫২৪. Francisco Jiménez de Cisneros.
৫২৫. মানি ইবনে হাম্মাদ, আল-মাওসুউল মুইয়াসসারাহ ফিল-আদইয়ান ওয়াল-মাযাহিব ওয়াল-আহযাবিল মুআসিরাহ, খ. ২. পৃ. ৬০৪।
৫২৬. আল-মাওসুউল মুইয়াসসারাহ ফিল-আদইয়ান ওয়াল-মাযাহিব ওয়াল-আহযাবিল মুআসিরাহ, খ. ২, পৃ. ৬০৪-৬০৫।
৫২৭. সিগরিড হুংকে, শামসুল আরব তাসতাউ আলাল গারব, পৃ. ৩৭২-৩৭৩।
📄 জ্ঞান সবার জন্য
ইসলামপূর্ব যুগে জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ সাধারণ জনমানব থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতেন। তাদের ও জনগণের মধ্যে ব্যবধান ছিল অলঙ্ঘনীয়। পারস্য বলি, রোম বলি বা গ্রিস বলি-সব জায়গাতেই জ্ঞানীরা সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করতেন। তাদের নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক ও মুনাযারা অনুষ্ঠিত হতো এবং জ্ঞানের উত্তরাধিকার তাদের মধ্যেই বিরাজমান ছিল। অন্যদিকে সাধারণ জনগণ অজ্ঞতার অন্ধকারে বসবাস করত। জ্ঞানের কোনো শাখার সঙ্গে তাদের ন্যূনতম সংযোগ ছিল না। কিন্তু ইসলাম ভিন্ন জিনিস!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক বাক্যে ঘোষণা করেছেন,
«طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةُ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ»
জ্ঞান অন্বেষণ প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ। (৫২৮)
ফলে জ্ঞান অর্জন একটি ধর্মীয় অবশ্যকর্তব্যে পরিণত হয়। বরং এটি জাতিগত দায়িত্বও, যা সকলের জন্য আবশ্যক। সকলের জন্য জ্ঞান অর্জন আবশ্যক হলে সবাইকে অবশ্যই শিক্ষার্থী ও জ্ঞান-অন্বেষক হতে হবে, এই ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই নীতির বাস্তবিক অনুশীলন করেছেন। বদর যুদ্ধে মক্কার অনেক মুশরিক মুসলিমদের হাতে বন্দি হয়েছিল। তিনি তাদের অভিনব মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছিলেন। অর্থাৎ, বন্দিদের যে-কেউ মদিনার দশজন নারী-পুরুষকে পড়া ও লেখা শেখালে মুক্তি পেয়ে যাবে। এটা ছিল উন্নত সভ্যতার চিন্তা, যা সে সময়ে পৃথিবীর কেউ আদৌ কল্পনা করেনি, এমনকি তার পরের কয়েক শতাব্দীতেও তা ভাবেনি।
ইসলাম তার অনুসারীদের জ্ঞান-সাধনাকে তাদের জীবনে মৌলিক বিষয় হিসেবে নিতে নির্দেশ দিয়েছে। তাদেরকে আলেমদের বা জ্ঞানীদের এই পর্যায়ের মর্যাদা দিতে আদেশ দিয়েছে, যে ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَطْلُبُ فِيهِ عِلْمًا سَلَكَ اللَّهُ بِهِ طَرِيقًا مِنْ طُرُقِ الْجَنَّةِ وَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا رِضًا لِطَالِبِ الْعِلْمِ وَإِنَّ الْعَالِمَ لَيَسْتَغْفِرُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الأَرْضِ وَالْحِيتَانُ فِي جَوْفِ الْمَاءِ وَإِنَّ فَضْلَ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ عَلَى سَائِرِ الْكَوَاكِبِ وَإِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ وَإِنَّ الأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا وَلَا دِرْهَمًا وَرَّثُوا الْعِلْمَ فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظٍّ وَافِرٍ
যে ব্যক্তি ইলম তলব বা জ্ঞান-অন্বেষণের উদ্দেশ্যে কোনো পথ অবলম্বন করেছে, আল্লাহ তার দ্বারা তাকে বেহেশতের পথসমূহের একটি পথে পৌঁছে দেন এবং ফেরেশতারা ইলম তলবকারীর সন্তুষ্টির জন্য তাদের ডানা পেতে দেয়। তা ছাড়া যারা আলেম তাদের জন্য আসমানে ও জমিনে যারা রয়েছে তারা সবাই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও দোয়া করতে থাকে, এমনকি মাছসমূহ পানির মধ্যে থেকেও ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। আলেমদের ফজিলত (বে-ইলম) আবেদদের (সাধকদের) ওপর তেমনই যেমন পূর্ণচন্দ্রের ফজিলত তারকারাজির ওপর এবং আলেমরা হলেন নবীগণের উত্তরাধিকারী। নবীগণ কোনো দিনার বা দিরহাম মিরাস (উত্তরাধিকার) রেখে যান না, তারা মিরাসরূপে রেখে যান শুধু ইলম। সুতরাং যে ব্যক্তি ইলম গ্রহণ করেছে সে পূর্ণ অংশগ্রহণ করেছে। (৫২৯)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতেকালের পর জাতীয় জ্ঞান-আন্দোলন অব্যাহত ছিল। তার উজ্জ্বল ফল ও পরিণতি আমরা দেখতে পাই। ইউরোপীয়দের জন্য এসব ব্যাপার স্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়। জাতীয় জ্ঞান-আন্দোলনের তিনটি পরিণতির কথা উল্লেখ করব। ইসলামই এগুলোর ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল।
১. গণগ্রন্থাগার: দ্বীনের অন্তস্থল থেকে যে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা রয়েছে তাতে উদ্দীপিত হয়ে মুসলিমগণ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন। তারা সেখানে বিনামূল্যে পড়াশোনা করতেন, বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি থেকে যা খুশি অনুলিপি করে নিতেন। শুধু তা-ই নয়, বড় বড় খলিফা ও আমির নানান দেশ থেকে বিদ্যার্থীদের এসব গ্রন্থাগারে আমন্ত্রণ জানাতেন, তাদের আতিথেয়তার ব্যবস্থা করতেন এবং তাদের জন্য বিশেষ অর্থভান্ডার থেকে ব্যয় নির্বাহ করতেন। ইসলামি বিশ্বের সব শহরেই এসব গ্রন্থাগার অনেক ছিল। এগুলোর মধ্যে বিখ্যাত হলো বাগদাদ গ্রন্থাগার, কর্ডোভা গ্রন্থাগার, সেভিল (৫৩০) গ্রন্থাগার, কায়রো গ্রন্থাগার, কুদ্স বা বাইতুল মুকাদ্দাস গ্রন্থাগার, দামেশক গ্রন্থাগার, ত্রিপোলি গ্রন্থাগার, মদিনা গ্রন্থাগার, সানআ গ্রন্থাগার, ফেজ গ্রন্থাগার ও কায়রাওয়ান গ্রন্থাগার।
২. বড় বড় ইলমি মজলিস (জ্ঞানচর্চার আসর) : ইসলামপূর্ব যুগে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার মতো কোনো আলেম বা জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন না। এই মহান দ্বীনের আবির্ভাবের পর ইসলামি বিশ্বের সব অঞ্চলে ইলমি মজলিসের বিস্তার ঘটে। কখনো কখনো এসব মজলিসে এত বেশি সংখ্যক মানুষের সমাগম হতো যে তা কল্পনাও করা যেত না। উদাহরণ হিসেবে ইবনুল জাওযির (৫৩১) মজলিসের কথা বলা যায়। ইবনুল জাওযির মজলিসে এক লাখেরও বেশি মানুষ উপস্থিত হতেন। তারা সবাই ছিলেন সাধারণ মানুষ। হাসান আল-বসরি, আহমাদ ইবনে হাম্বল, শাফিয়ি, আবু হানিফা, ইমাম মালিক-তাদের প্রত্যেকের মজলিসেই বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত হতেন। কখনো কখনো একটি মসজিদে একই সময়ে একাধিক ইলমি মজলিস বসত। কোনোটা তাফসিরুল কুরআনের মজলিস, কোনোটা ফিকহের মজলিস, অন্যটা নবীজির হাদিসের মজলিস, চতুর্থটা আকিদার মজলিস হলে পঞ্চমটা চিকিৎসাবিদ্যার মজলিস।
জ্ঞানের জন্য ব্যয় করা সদকাও আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় বলে বিবেচিত হতো: এই চিন্তা ও অনুভূতি থেকে উম্মাহর ধনী মানুষেরা মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য তাদের সম্পদ ব্যয় করতেন। এমনকি তারা তালিবুল ইলম ও শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রন্থাগার নির্মাণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য বহু সম্পত্তি ওয়াকফ করেছেন। এভাবে জ্ঞানের জন্য ব্যয় করা কেবল বিদ্যার্থীদের জন্য নয়, অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষদের জন্যও কল্যাণের দ্বাররূপে উন্মোচিত হয়।
ইসলামি বিশ্বে জ্ঞান-সম্পৃক্ততা ছিল ব্যাপক। সকলের কাছেই জ্ঞানচর্চা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ ও অবশ্যকর্তব্য। এ কারণেই গ্রন্থাগারের বিস্তার ঘটে এবং বিপুল সংখ্যক ইলমি মজলিস ও জ্ঞানচর্চার আসর অনুষ্ঠিত হয়। অজ্ঞতা, মূর্খতা দূরীভূত হয়।
টিকাঃ
৫২৮. ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২২৪; আবু ইয়ালা, হাদিস নং ২৮৩৭; সুয়ুতি, আল-জামেউস- সাগির, হাদিস নং ৭৩৬০।
৫২৯. আবু দাউদ, কিতাব: আল-ইলম, বাব: আল-হাসসু আলা তালাবিল-ইলম, হাদিস নং ৩৬৪১; তিরমিযি, হাদিস নং ২৬৮২; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২২৩; আহমাদ, হাদিস নং ২১৭৬৩; ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৮৮। শুআইব আরনাউত বলেছেন, হাদিসটি হাসান।
৫৩০. স্পেনের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি শহর।-অনুবাদক
৫৩১. ইবনুল জাওযি: আবুল ফারাজ আবদুর রহমান ইবনে আলি ইবনে মুহাম্মাদ আল-কুরাশি আত-তাইমি (৫১০-৫৯২ হি.)। হাম্বলি মাযহাবপন্থী ফকিহ। ইতিহাসবিদ ও কোষগ্রন্থপ্রণেতা। জ্ঞানের বহু শাখায় তিনি গ্রন্থ রচনা করেছেন। বাগদাদেই তার জন্ম এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, যাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ. ২১, পৃ. ৩৬৫।