📄 একত্ববাদ
ইসলামি সভ্যতার অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো তা আসমান জমিনের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার নির্ভেজাল ও অবিমিশ্র একত্ববাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সত্যিকার অর্থে আল্লাহ তাআলা একমাত্র ইবাদতের উপযুক্ত ইলাহ। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কর্তৃত্বে কারও কোনো অংশীদারি নেই। তাঁর রাজত্ব ও সাম্রাজ্যে তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তিনিই সম্মানিত করেন, তিনি অপদস্থ করেন। যাকে ইচ্ছা অপরিসীম দান করেন। যাতে সৃষ্টিজীবের জন্য কল্যাণ ও উপযোগিতা রয়েছে তা-ই তিনি রীতিবদ্ধ করেছেন। সব মানুষ তাঁর দাস। তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা ও তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রে সবাই সমান। এতে কোনো মানবিক বা পিরের ওসিলার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করা, তাঁর আদেশ-নিষেধ মান্য করা এবং তাঁর নাযিলকৃত শরিয়া বাস্তবায়ন করা মানুষের জন্য আবশ্যক।
একত্ববাদের উপলব্ধির উচ্চমার্গীয়তা মানুষের ভেতর ব্যক্তিত্বের মর্যাদা এবং আল্লাহর সৃষ্টির কারও কাছে নতশির না হওয়ার চেতনা জাগ্রত রাখে। ফলে তার স্বাধীন চিন্তা ও কর্মের পরিমণ্ডল প্রস্তুত হয়।
আল্লামা সাইয়িদ সুলাইমান নদবি রহ. লিখেছেন, আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একত্ববাদের বিশ্বাসের যে প্রবর্তন ঘটিয়েছেন তা মানুষকে তার চেতনা ও বোধের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী ভয়ভীতি থেকে মুক্তি দেয়। এ বিশ্বাসের কল্যাণে মানুষ আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কাউকে ভয় করে না। কারণ ইতিপূর্বে যা-কিছুর উপাসনা করা হতো, সূর্য, পৃথিবী, নদী, সাগর, আগুন ইত্যাদি, তার সবকিছুকে আল্লাহ তাআলা মানুষের বশীভূত করে দিয়েছেন। মানুষের কাছে রাজাবাদশাদের প্রতাপ ও ভয়ভীতি অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। ব্যাবিলন ও মিশরের দেবতারা, ইরান ও ভারতের দেবতারা মানুষের খেদমতগার, তাদের কল্যাণের রক্ষক এবং তাদের রাজ্যের পাহারাদার প্রমাণিত হয়। দেবতারা রাজাবাদশাগণকে তাদের পদে আসীন করে না, বরং মানুষই রাজাবাদশাদের উপরের আসনে বসায় এবং টেনে নিচে নামায়। মনুষ্যসমাজ যে-সকল দেবতার কর্তৃত্বের অনুগত ছিল সেগুলো ছিল নষ্ট, ছিন্নবিচ্ছিন্ন ও বিভিন্ন স্তরে বিভাজিত। প্রচলিত কুসংস্কার মানুষকেও নানা স্তরে বিভাজিত করে রেখেছিল, মানুষের মধ্যে দুটি শ্রেণি নির্মাণ করেছিল, অভিজাত শ্রেণি ও নিম্নবর্গীয় শ্রেণি। প্রথম শ্রেণি অতি উঁচু স্তরের এবং দ্বিতীয় শ্রেণি অতি নিচু স্তরের। হিন্দু সম্প্রদায়েরর সবচেয়ে বড় দেবতা ব্রহ্ম। তার মাথা থেকে মানুষের এই শ্রেণিটাকে সৃষ্টি করেছেন, সুতরাং তারা অভিজাত ও মনিব; আর মানুষের ওই শ্রেণিটাকে তার পা থেকে সৃষ্টি করেছেন, সুতরাং তারা নীচ ও সেবাদাস। অবশিষ্ট সবাই বড় দেবতার হাতের সৃষ্টি, সুতরাং তারা মধ্যবর্তী স্তরের। স্বাভাবিকভাবেই এমন অপবিশ্বাসের পরিণতি ছিল মানুষের বংশ ও গোষ্ঠী অনুযায়ী নানা বর্ণে ও নানা স্তরে বিভক্ত সমাজ। মানুষের সমতার, মানবমণ্ডলীর শ্রেষ্ঠত্বের এবং সমানাধিকারের মূলনীতির কোনো অর্থই এখানে প্রযোজ্য নয়। দুনিয়া তখন বিভিন্ন গোষ্ঠী ও গোত্রের আভিজাত্য প্রদর্শনের কুরুক্ষেত্র ছিল। (১২২)
সাইয়িদ সুলাইমান নদবি রহ. তারপর ইসলামের মহত্ত্ব প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন, যখন ইসলামের আবির্ভাব ঘটল, অন্ধকার কেটে গেল। মানুষ প্রথমবারের মতো তাওহিদের বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে পারল। মানবিক ভ্রাতৃত্বের অর্থ তাদের বোধগম্য হলো, এ ভ্রাতৃত্ব মানুষের মধ্যে কোনো বিভাজন রাখে না এবং কৃত্রিম মানদণ্ডের বিনাশ ঘটায়। এই বিশ্বাসের কল্যাণে মানুষ সমতার ক্ষেত্রে তার লুণ্ঠিত অধিকারের কথা বুঝতে পারল। এই বিশ্বাসের কী ইতিবাচক কার্যকরী ফলপ্রাচুর্য রয়েছে তার ব্যাপারে ইতিহাস শ্রেষ্ঠ সাক্ষী। যে-সকল জাতি-গোষ্ঠী স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এই বিশ্বাসের কল্যাণ মেনে নিয়েছে তাদের চিন্তাধারায়ও এর প্রভাব রয়েছে। যদিও তারা এর যাবতীয় তাৎপর্য ও বিদ্যমান মান ও মানদণ্ডের পরিবর্তনে এর বাস্তবিক প্রয়োগের ব্যাপারে অজ্ঞ রয়েছে। অর্থাৎ, যে-সকল জাতি-গোষ্ঠী তাওহিদের মূলনীতিতে বিশ্বাসী নয় তারা আজও পর্যন্ত মানবসমাজে সমতাবিধানের জন্য উপযোগী এই মূলনীতির অভাবে রয়েছে। আপনি তাদের সমাজব্যবস্থা ও সংঘ-সমিতিতে এ অভাবের রূপ দেখতে পাবেন। এমনকি আপনি তাদের উপাসনালয়েও সমতা দেখতে পাবেন না, যেখানে তাদের নেতৃবৃন্দ মানুষকে তাদের অবস্থান অনুযায়ী মর্যাদা প্রদানের ভিত্তিগুলোর মুখোমুখি হয়ে থাকে। কোনো সন্দেহ নেই যে মুসলিমরা ভালো অবস্থায় রয়েছে। তেরো শতাব্দী ধরে তারা এই মূলনীতির সঙ্গে পরিচিত। সর্বোচ্চ ও সর্বশক্তিমান রবের একত্বের ওপর বিশ্বাসের কল্যাণ তাদের সঙ্গে রয়েছে। মানুষের মধ্যে স্তরবিন্যাসের কৃত্রিম মানদণ্ড ও মানবসৃষ্ট নীতি থেকে তারা মুক্তি পেয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ চিরুনির দাঁতের মতোই সমান ও সমকক্ষ। বর্ণ বা ভূমি তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে না। জাতীয়তা ও দেশাত্মবোধ তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করতে পারে না। যখন তারা তাদের রবের সামনে থাকে তখন তারা সিজদাবনত, বিনীত, রিক্ত ও দীন-হীন। আবার যখনই তাদের দৈনন্দিন জীবনের কর্মকাণ্ডে প্রবেশ করে তখন তারা সবাই সম্মানিত, সবাই সমান। ঈমান ও বিশ্বাস বাদে তাদের মধ্যে পার্থক্যের আর কোনো কারণ থাকতে পারে না। আমল ছাড়া তাদের কোনো শ্রেষ্ঠত্বও নেই। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকি। (১২৩), (১২৪)
এই একত্ববাদের দ্বারা মুসলিমগণ তাদের স্রষ্টা, বিশ্বজগতের স্রষ্টা ও তার নিয়ন্ত্রকের কাছে একক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। ফলে তাদের সভ্যতা ও মানবীয় জীবনযাত্রায় তাদের অবদানের ক্ষেত্রে এই একত্ববাদের স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়।
নিম্নবর্ণিত মূলনীতিগুলোর মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে :
১. শাসককে দেবতার আসনে আসীন না করা
শাসককে দেবতার মর্যাদা দেওয়ার চিন্তা পূর্ববর্তী সময় ও সভ্যতার একটি প্রধান অনুষঙ্গ ছিল। এ বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, শাসকরা মানুষের সাধারণ গঠন-উপাদানের চেয়ে উৎকৃষ্ট গঠন উপাদানে তৈরি। এমন চিন্তা দূরীভূত হওয়ার ফলে মুসলিমদের জন্য শাসকদের ভুলভ্রান্তি ও অপরাধের কারণে তাদেরকে জবাবদিহির মুখোমুখি করার সম্ভাবনা তৈরি হলো। মানুষ শাসকশ্রেণির ভয়ভীতি থেকে মুক্তি পেল। আল্লাহভীতি ছাড়া আর সব ভীতি দূরীভূত হলো। তিনি নিরঙ্কুশ ও একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী, তিনি মানুষের জন্য শরিয়ত ও আইনকানুন বিধিবদ্ধ করেছেন। মানবজাতির জন্য আবশ্যক হলো আল্লাহর হুকুম-আহকাম মেনে চলা এবং তাঁর নাযিলকৃত শরিয়া বাস্তবায়ন করা। এভাবে মানুষ তার ব্যক্তিত্বের মর্যাদা বোঝে এবং উপলব্ধি করে যে সে আল্লাহ ছাড়া তাঁর সৃষ্টির কারও কাছে নতশির নয়। সে স্বাধীনভাবে চিন্তা করে ও কাজ করে। তার চিন্তায় ও কর্মে উদ্দেশ্য থাকে প্রকৃত মনিবকে সন্তুষ্ট করা। ফলে সে কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত থাকে এবং অকল্যাণ ও অসৎকর্ম থেকে দূরে থাকে। কুরআনের প্রতিটি আয়াত এই তাওহিদ ও একত্ববাদের প্রতি আহ্বান জানায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ اذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَأَنَّى تُؤْفَكُونَ ﴾
হে মানুষ, তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো। আল্লাহ ব্যতীত কি কোনো স্রষ্টা আছে, যে তোমাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে রিযিক দান করে? তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং কোথায় তোমরা বিপথে চালিত হচ্ছ? (১২৫)
২. মানুষের মধ্যে সমতা
সুতরাং মানুষের মধ্যে কেউ অভিজাত নয় এবং কেউ নিকৃষ্ট নয়। কেউ উচ্চস্তরের নয় এবং কেউ নিম্নস্তরের নয়। এখানে কোনো মানবিক বা পিরত্বের উসিলাও নেই। সবাইকে একজন স্রষ্টাই সৃষ্টি করেছেন এবং সবাই একই রবের ইবাদত করে। সব মানুষ চিরুনির দাঁতের মতো সমান ও সমকক্ষ। বর্ণ, দেশ, জাতীয়তা বা অন্যকিছু তাদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে না। পার্থক্য নির্ণয়ের মাপকাঠি হলো ঈমান ও তাকওয়া। এ কারণে মানুষের সমতার মানদণ্ড ও স্বাধীনতা তার মানুষ ভাইয়ের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বিদায়ি ভাষণে এই শ্রেষ্ঠ মূলনীতি ঘোষণা করেছেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَلَا إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ وَإِنَّ أَبَاكُمْ وَاحِدٌ أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٌّ عَلَى أَعْجَمِيٌّ وَلَا لِعَجَمِيٌّ عَلَى عَرَبِيَّ وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى....
হে লোকসকল, জেনে রাখো, তোমাদের প্রতিপালক এক এবং তোমাদের পিতাও একজন। জেনে রাখো, কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের এবং কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোর ওপর গৌরবর্ণের এবং গৌরবর্ণের ওপর কালোর শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপিত হবে কেবল তাকওয়ার দ্বারা...। (১২৬)
৩. প্রতিমা ও পৌত্তলিকতা থেকে মুক্তি
তাওহিদ বা একত্ববাদের বিশ্বাসের ফলে সব ধরনের পৌত্তলিকতা থেকে মানুষ মুক্তি পেয়েছে। পৌত্তলিকতার পুরোনো রূপ, অর্থাৎ মূর্তিপূজা ও প্রতিমাপূজা থেকে যেমন মুক্তি পেয়েছে তেমনই আধুনিক পৌত্তলিকতা, অর্থাৎ শোষক রাষ্ট্রকে পবিত্র ঘোষণা করা ও ব্যক্তিপূজা থেকেও মুক্তি পেয়েছে। এ কারণে ইসলামি সভ্যতার কোনো মানুষ আল্লাহর সৃষ্টির কারও কাছে নতশির নয়। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই তাঁর আনুগত্য ও ইবাদত পেয়ে থাকেন।
৪. সৃষ্টিকর্তা, সৃষ্টিজগৎ ও পরকালীন হিসাবনিকাশের সঠিক ধারণা
এই প্রেক্ষিতেই দুনিয়ায় বসবাস হবে, পৃথিবী আবাদ হবে এবং চোখ থাকবে হিসাব ও পুরস্কারের স্থান আখিরাতের প্রতি।
এভাবেই একত্ববাদ ইসলামি সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তা মানুষের সমতার মানদণ্ডের উন্নতি এবং উৎপীড়ন-নিপীড়ন থেকে মানুষের মুক্তি সাধন করেছে। মানুষের দৃষ্টিকে এক আল্লাহ-বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা ও পরিচালকের প্রতি নিবদ্ধ করেছে।
টিকাঃ
১২২. সুলাইমান নদবি, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৫২৩; আবুল হাসান আলি নদবি, আল-ইসলাম ওয়া আসারুহু ফিল হাদারাতি ওয়া ফাদলুহু আলাল ইনসানিয়্যাহ, পৃ. ২৪-২৭।
১২৩. সুরা হুজুরাত: আয়াত ১৩।
১২৪. সুলাইমান নদবি, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৫২৩, ৫২৪; আবুল হাসান আলি নদবি, আল-ইসলাম ওয়া আসারুহু ফিল হাদারাতি ওয়া ফাদলুহু আলাল ইনসানিয়্যাহ, পৃ. ২৪-২৭ থেকে উদ্ধৃত।
১২৫. সুরা ফাতির : আয়াত ৩।
১২৬. আহমাদ, হাদিস নং ২৩৫৩৬; শুআইব আরনাউত বলেছেন, হাদিসটির সনদ সহিহ। তাবারানি, হাদিস নং ১৪৪৪৪; হাইসামি বলেছেন, এ হাদিসের বর্ণনাকারীরা সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারীদের শর্তে উত্তীর্ণ। মাজমাউয যাওয়ায়িদ, খ. ৩, পৃ. ২৬৬।
ইসলামি সভ্যতার অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো তা আসমান জমিনের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার নির্ভেজাল ও অবিমিশ্র একত্ববাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সত্যিকার অর্থে আল্লাহ তাআলা একমাত্র ইবাদতের উপযুক্ত ইলাহ। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কর্তৃত্বে কারও কোনো অংশীদারি নেই। তাঁর রাজত্ব ও সাম্রাজ্যে তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তিনিই সম্মানিত করেন, তিনি অপদস্থ করেন। যাকে ইচ্ছা অপরিসীম দান করেন। যাতে সৃষ্টিজীবের জন্য কল্যাণ ও উপযোগিতা রয়েছে তা-ই তিনি রীতিবদ্ধ করেছেন। সব মানুষ তাঁর দাস। তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা ও তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রে সবাই সমান। এতে কোনো মানবিক বা পিরের ওসিলার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করা, তাঁর আদেশ-নিষেধ মান্য করা এবং তাঁর নাযিলকৃত শরিয়া বাস্তবায়ন করা মানুষের জন্য আবশ্যক।
একত্ববাদের উপলব্ধির উচ্চমার্গীয়তা মানুষের ভেতর ব্যক্তিত্বের মর্যাদা এবং আল্লাহর সৃষ্টির কারও কাছে নতশির না হওয়ার চেতনা জাগ্রত রাখে। ফলে তার স্বাধীন চিন্তা ও কর্মের পরিমণ্ডল প্রস্তুত হয়।
আল্লামা সাইয়িদ সুলাইমান নদবি রহ. লিখেছেন, আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একত্ববাদের বিশ্বাসের যে প্রবর্তন ঘটিয়েছেন তা মানুষকে তার চেতনা ও বোধের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী ভয়ভীতি থেকে মুক্তি দেয়। এ বিশ্বাসের কল্যাণে মানুষ আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কাউকে ভয় করে না। কারণ ইতিপূর্বে যা-কিছুর উপাসনা করা হতো, সূর্য, পৃথিবী, নদী, সাগর, আগুন ইত্যাদি, তার সবকিছুকে আল্লাহ তাআলা মানুষের বশীভূত করে দিয়েছেন। মানুষের কাছে রাজাবাদশাদের প্রতাপ ও ভয়ভীতি অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। ব্যাবিলন ও মিশরের দেবতারা, ইরান ও ভারতের দেবতারা মানুষের খেদমতগার, তাদের কল্যাণের রক্ষক এবং তাদের রাজ্যের পাহারাদার প্রমাণিত হয়। দেবতারা রাজাবাদশাগণকে তাদের পদে আসীন করে না, বরং মানুষই রাজাবাদশাদের উপরের আসনে বসায় এবং টেনে নিচে নামায়। মনুষ্যসমাজ যে-সকল দেবতার কর্তৃত্বের অনুগত ছিল সেগুলো ছিল নষ্ট, ছিন্নবিচ্ছিন্ন ও বিভিন্ন স্তরে বিভাজিত। প্রচলিত কুসংস্কার মানুষকেও নানা স্তরে বিভাজিত করে রেখেছিল, মানুষের মধ্যে দুটি শ্রেণি নির্মাণ করেছিল, অভিজাত শ্রেণি ও নিম্নবর্গীয় শ্রেণি। প্রথম শ্রেণি অতি উঁচু স্তরের এবং দ্বিতীয় শ্রেণি অতি নিচু স্তরের। হিন্দু সম্প্রদায়েরর সবচেয়ে বড় দেবতা ব্রহ্ম। তার মাথা থেকে মানুষের এই শ্রেণিটাকে সৃষ্টি করেছেন, সুতরাং তারা অভিজাত ও মনিব; আর মানুষের ওই শ্রেণিটাকে তার পা থেকে সৃষ্টি করেছেন, সুতরাং তারা নীচ ও সেবাদাস। অবশিষ্ট সবাই বড় দেবতার হাতের সৃষ্টি, সুতরাং তারা মধ্যবর্তী স্তরের। স্বাভাবিকভাবেই এমন অপবিশ্বাসের পরিণতি ছিল মানুষের বংশ ও গোষ্ঠী অনুযায়ী নানা বর্ণে ও নানা স্তরে বিভক্ত সমাজ। মানুষের সমতার, মানবমণ্ডলীর শ্রেষ্ঠত্বের এবং সমানাধিকারের মূলনীতির কোনো অর্থই এখানে প্রযোজ্য নয়। দুনিয়া তখন বিভিন্ন গোষ্ঠী ও গোত্রের আভিজাত্য প্রদর্শনের কুরুক্ষেত্র ছিল। (১২২)
সাইয়িদ সুলাইমান নদবি রহ. তারপর ইসলামের মহত্ত্ব প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন, যখন ইসলামের আবির্ভাব ঘটল, অন্ধকার কেটে গেল। মানুষ প্রথমবারের মতো তাওহিদের বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে পারল। মানবিক ভ্রাতৃত্বের অর্থ তাদের বোধগম্য হলো, এ ভ্রাতৃত্ব মানুষের মধ্যে কোনো বিভাজন রাখে না এবং কৃত্রিম মানদণ্ডের বিনাশ ঘটায়। এই বিশ্বাসের কল্যাণে মানুষ সমতার ক্ষেত্রে তার লুণ্ঠিত অধিকারের কথা বুঝতে পারল। এই বিশ্বাসের কী ইতিবাচক কার্যকরী ফলপ্রাচুর্য রয়েছে তার ব্যাপারে ইতিহাস শ্রেষ্ঠ সাক্ষী। যে-সকল জাতি-গোষ্ঠী স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এই বিশ্বাসের কল্যাণ মেনে নিয়েছে তাদের চিন্তাধারায়ও এর প্রভাব রয়েছে। যদিও তারা এর যাবতীয় তাৎপর্য ও বিদ্যমান মান ও মানদণ্ডের পরিবর্তনে এর বাস্তবিক প্রয়োগের ব্যাপারে অজ্ঞ রয়েছে। অর্থাৎ, যে-সকল জাতি-গোষ্ঠী তাওহিদের মূলনীতিতে বিশ্বাসী নয় তারা আজও পর্যন্ত মানবসমাজে সমতাবিধানের জন্য উপযোগী এই মূলনীতির অভাবে রয়েছে। আপনি তাদের সমাজব্যবস্থা ও সংঘ-সমিতিতে এ অভাবের রূপ দেখতে পাবেন। এমনকি আপনি তাদের উপাসনালয়েও সমতা দেখতে পাবেন না, যেখানে তাদের নেতৃবৃন্দ মানুষকে তাদের অবস্থান অনুযায়ী মর্যাদা প্রদানের ভিত্তিগুলোর মুখোমুখি হয়ে থাকে। কোনো সন্দেহ নেই যে মুসলিমরা ভালো অবস্থায় রয়েছে। তেরো শতাব্দী ধরে তারা এই মূলনীতির সঙ্গে পরিচিত। সর্বোচ্চ ও সর্বশক্তিমান রবের একত্বের ওপর বিশ্বাসের কল্যাণ তাদের সঙ্গে রয়েছে। মানুষের মধ্যে স্তরবিন্যাসের কৃত্রিম মানদণ্ড ও মানবসৃষ্ট নীতি থেকে তারা মুক্তি পেয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ চিরুনির দাঁতের মতোই সমান ও সমকক্ষ। বর্ণ বা ভূমি তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে না। জাতীয়তা ও দেশাত্মবোধ তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করতে পারে না। যখন তারা তাদের রবের সামনে থাকে তখন তারা সিজদাবনত, বিনীত, রিক্ত ও দীন-হীন। আবার যখনই তাদের দৈনন্দিন জীবনের কর্মকাণ্ডে প্রবেশ করে তখন তারা সবাই সম্মানিত, সবাই সমান। ঈমান ও বিশ্বাস বাদে তাদের মধ্যে পার্থক্যের আর কোনো কারণ থাকতে পারে না। আমল ছাড়া তাদের কোনো শ্রেষ্ঠত্বও নেই। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকি। (১২৩), (১২৪)
এই একত্ববাদের দ্বারা মুসলিমগণ তাদের স্রষ্টা, বিশ্বজগতের স্রষ্টা ও তার নিয়ন্ত্রকের কাছে একক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। ফলে তাদের সভ্যতা ও মানবীয় জীবনযাত্রায় তাদের অবদানের ক্ষেত্রে এই একত্ববাদের স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়।
নিম্নবর্ণিত মূলনীতিগুলোর মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে :
১. শাসককে দেবতার আসনে আসীন না করা
শাসককে দেবতার মর্যাদা দেওয়ার চিন্তা পূর্ববর্তী সময় ও সভ্যতার একটি প্রধান অনুষঙ্গ ছিল। এ বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, শাসকরা মানুষের সাধারণ গঠন-উপাদানের চেয়ে উৎকৃষ্ট গঠন উপাদানে তৈরি। এমন চিন্তা দূরীভূত হওয়ার ফলে মুসলিমদের জন্য শাসকদের ভুলভ্রান্তি ও অপরাধের কারণে তাদেরকে জবাবদিহির মুখোমুখি করার সম্ভাবনা তৈরি হলো। মানুষ শাসকশ্রেণির ভয়ভীতি থেকে মুক্তি পেল। আল্লাহভীতি ছাড়া আর সব ভীতি দূরীভূত হলো। তিনি নিরঙ্কুশ ও একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী, তিনি মানুষের জন্য শরিয়ত ও আইনকানুন বিধিবদ্ধ করেছেন। মানবজাতির জন্য আবশ্যক হলো আল্লাহর হুকুম-আহকাম মেনে চলা এবং তাঁর নাযিলকৃত শরিয়া বাস্তবায়ন করা। এভাবে মানুষ তার ব্যক্তিত্বের মর্যাদা বোঝে এবং উপলব্ধি করে যে সে আল্লাহ ছাড়া তাঁর সৃষ্টির কারও কাছে নতশির নয়। সে স্বাধীনভাবে চিন্তা করে ও কাজ করে। তার চিন্তায় ও কর্মে উদ্দেশ্য থাকে প্রকৃত মনিবকে সন্তুষ্ট করা। ফলে সে কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত থাকে এবং অকল্যাণ ও অসৎকর্ম থেকে দূরে থাকে। কুরআনের প্রতিটি আয়াত এই তাওহিদ ও একত্ববাদের প্রতি আহ্বান জানায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ اذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَأَنَّى تُؤْفَكُونَ ﴾
হে মানুষ, তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো। আল্লাহ ব্যতীত কি কোনো স্রষ্টা আছে, যে তোমাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে রিযিক দান করে? তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং কোথায় তোমরা বিপথে চালিত হচ্ছ? (১২৫)
২. মানুষের মধ্যে সমতা
সুতরাং মানুষের মধ্যে কেউ অভিজাত নয় এবং কেউ নিকৃষ্ট নয়। কেউ উচ্চস্তরের নয় এবং কেউ নিম্নস্তরের নয়। এখানে কোনো মানবিক বা পিরত্বের উসিলাও নেই। সবাইকে একজন স্রষ্টাই সৃষ্টি করেছেন এবং সবাই একই রবের ইবাদত করে। সব মানুষ চিরুনির দাঁতের মতো সমান ও সমকক্ষ। বর্ণ, দেশ, জাতীয়তা বা অন্যকিছু তাদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে না। পার্থক্য নির্ণয়ের মাপকাঠি হলো ঈমান ও তাকওয়া। এ কারণে মানুষের সমতার মানদণ্ড ও স্বাধীনতা তার মানুষ ভাইয়ের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বিদায়ি ভাষণে এই শ্রেষ্ঠ মূলনীতি ঘোষণা করেছেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَلَا إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ وَإِنَّ أَبَاكُمْ وَاحِدٌ أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٌّ عَلَى أَعْجَمِيٌّ وَلَا لِعَجَمِيٌّ عَلَى عَرَبِيَّ وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى....
হে লোকসকল, জেনে রাখো, তোমাদের প্রতিপালক এক এবং তোমাদের পিতাও একজন। জেনে রাখো, কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের এবং কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোর ওপর গৌরবর্ণের এবং গৌরবর্ণের ওপর কালোর শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপিত হবে কেবল তাকওয়ার দ্বারা...। (১২৬)
৩. প্রতিমা ও পৌত্তলিকতা থেকে মুক্তি
তাওহিদ বা একত্ববাদের বিশ্বাসের ফলে সব ধরনের পৌত্তলিকতা থেকে মানুষ মুক্তি পেয়েছে। পৌত্তলিকতার পুরোনো রূপ, অর্থাৎ মূর্তিপূজা ও প্রতিমাপূজা থেকে যেমন মুক্তি পেয়েছে তেমনই আধুনিক পৌত্তলিকতা, অর্থাৎ শোষক রাষ্ট্রকে পবিত্র ঘোষণা করা ও ব্যক্তিপূজা থেকেও মুক্তি পেয়েছে। এ কারণে ইসলামি সভ্যতার কোনো মানুষ আল্লাহর সৃষ্টির কারও কাছে নতশির নয়। একমাত্র আল্লাহ তাআলাই তাঁর আনুগত্য ও ইবাদত পেয়ে থাকেন।
৪. সৃষ্টিকর্তা, সৃষ্টিজগৎ ও পরকালীন হিসাবনিকাশের সঠিক ধারণা
এই প্রেক্ষিতেই দুনিয়ায় বসবাস হবে, পৃথিবী আবাদ হবে এবং চোখ থাকবে হিসাব ও পুরস্কারের স্থান আখিরাতের প্রতি।
এভাবেই একত্ববাদ ইসলামি সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তা মানুষের সমতার মানদণ্ডের উন্নতি এবং উৎপীড়ন-নিপীড়ন থেকে মানুষের মুক্তি সাধন করেছে। মানুষের দৃষ্টিকে এক আল্লাহ-বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা ও পরিচালকের প্রতি নিবদ্ধ করেছে।
টিকাঃ
১২২. সুলাইমান নদবি, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৫২৩; আবুল হাসান আলি নদবি, আল-ইসলাম ওয়া আসারুহু ফিল হাদারাতি ওয়া ফাদলুহু আলাল ইনসানিয়্যাহ, পৃ. ২৪-২৭।
১২৩. সুরা হুজুরাত: আয়াত ১৩।
১২৪. সুলাইমান নদবি, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, খ. ৪, পৃ. ৫২৩, ৫২৪; আবুল হাসান আলি নদবি, আল-ইসলাম ওয়া আসারুহু ফিল হাদারাতি ওয়া ফাদলুহু আলাল ইনসানিয়্যাহ, পৃ. ২৪-২৭ থেকে উদ্ধৃত।
১২৫. সুরা ফাতির : আয়াত ৩।
১২৬. আহমাদ, হাদিস নং ২৩৫৩৬; শুআইব আরনাউত বলেছেন, হাদিসটির সনদ সহিহ। তাবারানি, হাদিস নং ১৪৪৪৪; হাইসামি বলেছেন, এ হাদিসের বর্ণনাকারীরা সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারীদের শর্তে উত্তীর্ণ। মাজমাউয যাওয়ায়িদ, খ. ৩, পৃ. ২৬৬।
📄 ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা
ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা ইসলামি সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্যের অর্থ হলো দুটি পরস্পর বিরোধী বা বৈপরীত্যপূর্ণ দিক বা পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। এমন নয় যে তার মধ্যে একটি প্রাধান্য পাবে, অপরটি বাদ যাবে। একপক্ষ তার সম্পূর্ণ অধিকার পাবে, অপরপক্ষ বৈষম্যের শিকার হবে ও তার অধিকার হারাবে। এরূপ ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা ইসলামের চিরস্থায়ী সর্বজনীন পয়গামেরই উপযুক্ত। এই পয়গাম সকল ভূখণ্ড ও সব যুগের জন্য প্রযোজ্য।
ইসলামি সভ্যতা আধ্যাত্মিকতা ও বস্তুবাদের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছে। আত্মার চাহিদা ও বস্তুর চাহিদাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছে। শরিয়তের জ্ঞান ও জীবনমুখী জ্ঞানের মধ্যে মিলন ঘটিয়েছে। দুনিয়ার প্রতিও গুরুত্বারোপ করেছে, যেমন আখিরাতের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। চিন্তা ও ধারণা এবং বাস্তবের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করেছে। তারপর, ইসলামি সভ্যতায় রয়েছে অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য। বৈপরীত্যপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার অর্থ হলো উভয় পক্ষকে পূর্ণ সুযোগ দেওয়া এবং ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে অধিকার প্রদান করা।
সুতরাং কোনো বাড়াবাড়ি নয়, সংকীর্ণতা ও অবহেলাও নয়, সীমালঙ্ঘন নয়, কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করাও নয়। আল্লাহ তাআলার কিতাব এ দিকেই ইঙ্গিত করেছে,
وَالسَّمَاءَ رَفَعَهَا وَوَضَعَ الْمِيزَانَ أَلَّا تَطْغَوْا فِي الْمِيزَانِ وَأَقِيمُوا الْوَزْنَ بِالْقِسْطِ وَلَا تُخْسِرُوا الْمِيزَانَ
তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড, যাতে তোমরা সীমালঙ্ঘন না করো। ওজনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত করো এবং ওজনে কম দিয়ো না। (১২৭)
আমরা ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা কী তা ব্যাখ্যা করতে চাই। পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর ইতিহাস থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, কেবল আধ্যাত্মিকতার দিকগুলো অথবা কেবল বস্তুগত দিকগুলো মানুষের সুখ-সৌভাগ্যের জন্য উপযুক্ত পন্থা নয়। আর এসব আধ্যাত্মিকতার পেছনে পড়ে নিজ ইচ্ছা, চিন্তা ও কর্মশক্তির বিনষ্টি ও সেকেলে মনোভাব ছাড়া আর কিছুই অর্জন হবে না। এতে মানুষের মনুষ্যত্বকে হত্যা করা হয় এবং বিশ্বজগতের উপকারিতা ও কল্যাণের বিনাশ ঘটানো হয়। একইভাবে কেবল বস্তুবাদিতার পথে সীমালঙ্ঘন, জুলুম, দাসত্ব ও অপদস্থতা ছাড়া কিছু নেই। এ পথ আত্মা, সম্পদ ও সম্ভ্রমের সঙ্গে উৎপীড়ক স্বেচ্ছাচারিতা ছাড়া কিছু নয়।
এ ক্ষেত্রে চিরন্তন ইসলামি সভ্যতা আত্মার দাবিসমূহ ও বস্তুগত দাবিসমূহের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেছে, বস্তুবাদ ও মানুষের চিত্তবৃত্তির মধ্যে ঐক্য সাধন করেছে। সুতরাং নির্ভেজাল অধ্যাত্মবাদ সুসভ্য বস্তুবাদের ভিত্তি রচনা করে। মানুষ ন্যায়পরায়ণতা, নিরাপত্তা, স্বস্তি, দয়া ও ভালোবাসার ওপর নির্মিত নৈতিকতা-শিষ্টাচার ও ঈমানের পরিমণ্ডলে আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতা, চিন্তা এবং প্রচেষ্টা ও কর্মের ফল লাভ করে থাকে।
এরূপ ভারসাম্যের কাজ হলো মানুষের স্বভাব ও বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্দেশ্যের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি ও সামঞ্জস্য বিধান করা, একইভাবে মানুষের চিন্তা ও ভাবনারাশি এবং তাদের আকাঙ্ক্ষা ও অভিপ্রায়ের মধ্যে সংশ্লেষ ও প্রভাবপ্রবণতা সৃষ্টি করা।
শরিয়ার জ্ঞান ও জীবনমুখী জ্ঞানের মধ্যে মিলন ঘটানোর প্রেক্ষিতে বলতে পারি, ইসলাম তার উন্নত সভ্যতাকে জ্ঞান, শিক্ষা ও যুক্তি এবং অনুসন্ধান, উদ্ঘাটন, অভিজ্ঞতা ও আবিষ্কারের ওপর নির্মাণ করেছে। কারণ সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের ক্ষেত্রে জ্ঞানরাশির প্রাণশক্তিই প্রধান ভূমিকা পালন করে। এই ক্ষেত্রে ইসলাম জ্ঞান ও জ্ঞানীদের সমৃদ্ধ করেছে বিশেষ বিশেষ বিষয়ে, যেখানে প্রতিটি প্রাপ্তি ও অর্জন মানবমণ্ডলীকে জীবনে ইসলামের পয়গাম বাস্তবায়নে সহায়তা করে। তা হলো, পৃথিবীকে আবাদ করা এবং তার কল্যাণকর বস্তুরাশি ও ধনভান্ডার থেকে উপকৃত হওয়া।
'ইলম' বা 'জ্ঞান' শব্দটি আল্লাহ তাআলার কিতাবে ও রাসুলের সুন্নাহে সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, এর সঙ্গে কোনো শর্ত বা ক্ষেত্র নির্দেশ করা হয়নি। সুতরাং জমিনের আবাদ ও পৃথিবীর কল্যাণে নিয়োজিত প্রতিটি উপকারী জ্ঞানই এর অন্তর্ভুক্ত..। যেসব জ্ঞানের উদ্দেশ্য মানবকল্যাণ এবং এই গ্রহে মানব-প্রতিনিধিত্বের দায়দায়িত্ব যথার্থভাবে পালন তা অধিকাংশ সময় জ্ঞানের দুটি শাখাকে বুঝিয়ে থাকে-শরয়ি জ্ঞান ও জীবনমুখী জ্ঞান..। জ্ঞানীদের জন্য যা-কিছু প্রশংসা করা হয়েছে তা প্রত্যেক জ্ঞানীর জন্যই প্রযোজ্য, যিনি তার জ্ঞানের দ্বারা মানবজাতির উপকার করেছেন। চাই তা শরয়ি জ্ঞান হোক, অথবা জীবনমুখী জ্ঞান। ইসলামি সভ্যতার ইতিহাস এ ব্যাপারে যথার্থ বিবরণ পেশ করেছে। আমি এই গ্রন্থের পরবর্তী অধ্যায়ে জীবনমুখী জ্ঞানবিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান ও উদ্ভাবন প্রসঙ্গে যা-কিছু বলব তা সম্ভবত এই ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ সাক্ষী ও উত্তম পরিচায়ক হবে।
মধ্যপন্থা ও ভারসাম্যের এই নীতি সেসব সভ্যতার জন্য এক বিরুদ্ধ ব্যাপার, যেখানে ধর্ম চিন্তাশক্তি ও কর্মসামর্থ্যের ওপর খড়গ উঁচিয়ে রেখেছে এবং জ্ঞান, চিন্তা ও যুক্তির প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রেক্ষিতে সম্ভবত সবচেয়ে স্পষ্ট দলিল হলো কুরআনের জুমার নামায-সংক্রান্ত আয়াতগুলো। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ﴾
হে মুমিনগণ, জুমার দিনে যখন নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ করো, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি করো। নামায শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করো ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও। (১২৮)
দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে মিলন ঘটানোর ক্ষেত্রে ইসলামি সভ্যতার কাজ এটিই। উপর্যুক্ত আয়াত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করছে যে তা (দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে মিলন-সাধন) এমনকি জুমার দিনেও পরিপালিত হবে: নামাযের আগে বেচাকেনা ও দুনিয়াবি কাজ করা; তারপর কেনাবেচা ও অনুরূপ দৈনন্দিন জীবনের কাজগুলো ত্যাগ করে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযের প্রতি ধাবিত হওয়া; তারপর নামায শেষে পুনরায় জমিনে ছড়িয়ে পড়া এবং রিযিক অন্বেষণ করা, সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির থেকে গাফেল না হওয়া। এটাই সফলতা ও মুক্তির মূল ভিত্তি। এখানে আল্লাহর অনুগ্রহের অর্থ হলো রিযিক ও জীবিকা।
আরেকটি আয়াত দৈনন্দিন জীবনের কর্মকাণ্ড ও আখিরাতের কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রতি ইঙ্গিত করেছে। সেখানে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَابْتَغِ فِيمَا أَتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا
আল্লাহ তোমাদের যা দিয়েছেন তার দ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। (১২৯)
ইসলাম কোনো মুসলিম থেকে এটা দাবি করে না যে সে কোনো আশ্রমে সন্ন্যাসী হোক অথবা একান্ত নির্জনতায় ইবাদত করুক, যে সারারাত নামায পড়বে এবং সারাদিন রোযা রাখবে; জীবনে তার কোনো অংশই থাকবে না এবং তার কাছে জীবনের কোনো অংশ থাকবে না। বরং ইসলাম মুসলিম থেকে দাবি করে যে সে হবে জীবনোপযোগী কর্মোদ্যগী, জীবনকে নির্মাণ করবে, পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়াবে এবং গোপনীয় ভান্ডার থেকে রিযিক অন্বেষণ করবে। ইসলামি সভ্যতার সন্তানেরা এমনই হয়ে থাকে, তারা আখিরাতের পাশাপাশি দুনিয়াও অন্বেষণ করে, উভয় জীবনে কল্যাণ আশা করে, উভয় জাহানে সৌভাগ্য প্রত্যাশা করে।
যে ভারসাম্য ইসলামি সভ্যতার বৈশিষ্ট্য তার আরেকটি দিক হলো উত্তম ও সংহত উপায়ে আদর্শবাদ ও বস্তুবাদের মধ্যে মিলন সাধন করা। ইসলাম একইসঙ্গে আদর্শবাদী ও বাস্তববাদী ধর্ম। ইসলাম তার অনুসারীদের সবসময় পূর্ণতা ও উন্নত আদর্শের সন্ধান দেয়, কিন্তু সে নিজের মতো করে তার উপায় ও উপকরণ অন্বেষণ করে এবং প্রচেষ্টা ব্যয় করে। ইসলাম কারও ওপর অন্যায়ভাবে কোনোকিছু চাপিয়ে দেয় না। এ কারণে ইসলামে চিন্তাকে বাস্তব থেকে এবং আদর্শবাদকে বাস্তববাদ থেকে পৃথক করা কঠিন। বরং এ দুটি মিলিয়ে মানুষের জন্য পরিপূর্ণ জীবনপদ্ধতি যা তাদের সামনে কল্যাণের পথকে আলোকিত করে তোলে এবং আচার-আচরণের নীতিমালা ও লেনদেনের আইনকানুনকে চিত্রিত করে তোলে।
আদর্শবাদের প্রেক্ষিতে ইসলামি সভ্যতা মানুষকে সহজতা ও স্বস্তি এবং সুখ ও প্রশান্তির সর্বোচ্চ মানদণ্ডের সম্ভবপর শিখরে পৌছে দিতে আকাঙ্ক্ষী। বাস্তববাদের প্রেক্ষিতে ইসলামি সভ্যতা মানুষের পারিপার্শ্বিক অবস্থা, তার স্বভাব ও গঠনপ্রকৃতি, তার শক্তি ও সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা এবং তার জীবনের বাস্তবিকতার প্রতি লক্ষ রাখে।
ইসলামি সভ্যতায় কল্পনাপ্রসূত আদর্শবাদের-স্বপ্নের জগৎ ছাড়া কোথাও যার অস্তিত্ব নেই-কোনো স্থান নেই। যেমন প্লেটো অভিজাত নগরের যে পরিকল্পনা প্রদান করেছেন, যা মানবীয় বাস্তবিকতা থেকে সহস্র মাইল দূরে, যা সহজাত প্রবৃত্তিপ্রসূত এবং যাতে রয়েছে ভ্রান্তি ও ত্রুটি।
একইভাবে ইসলামি সভ্যতায় বাস্তববাদিতা এমন নয় যে, বাস্তবিক ব্যাপারগুলোর অবস্থা ও অবস্থান যা-ই হোক না কেন তার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়। যেকোনোভাবে, যেকোনো রঙে-ঢঙে জীবনের সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য বা বাস্তবের সঙ্গে খাপ খাওয়ার জন্য ইসলামি সভ্যতা যে তার মূলনীতিগুলো সহনীয় ও নমনীয় করে নেবে তাও নয়। মানুষের প্রবৃত্তিপরায়ণতা ও প্রথাগুলো লালন করার জন্য অথবা তাদের পশ্চাৎপদ বিশৃঙ্খল অবস্থা ও ভ্রষ্টতাপূর্ণ অন্ধ অনুসরণের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার জন্য ইসলামি সভ্যতার আবির্ভাব ঘটেনি। জাহিলিয়াতের সমস্ত রূপ ও প্রথাকে নিরর্থক করা এবং নিজের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ব্যবস্থাকে প্রবর্তন করার জন্য ইসলামি সভ্যতা বিনির্মিত হয়েছে। এ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন ও গৌণ বিষয়গুলোতে মানুষের বাস্তবিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতেও পারে, নাও হতে পারে।
আদর্শবাদ ও বাস্তববাদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে ইসলামি সভ্যতা পূর্ণতা ও পূর্ণাঙ্গতার যে সর্বনিম্ন স্তর বা মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে তার থেকে বেরিয়ে যাওয়া বৈধ নয়। কারণ, মুসলিমের ব্যক্তিত্বকে একটি বোধগম্য পদ্ধতি ও পন্থায় গড়ে তোলার জন্য এরূপ মানদণ্ড আবশ্যক এবং তা মুসলিমরূপে গণ্য হওয়ার জন্য কোনো মুসলিম থেকে গ্রহণযোগ্য সর্বনিম্ন স্তর। এই মানদণ্ড যে পথ ও কর্মের নির্দেশ দেয়, কল্যাণকর কাজের জন্য সামান্য প্রস্তুতি যার আছে এবং যে অন্যায় থেকে সামান্য দূরত্ব বজায় রেখেছে সেও ওই পথে পৌছতে পারবে এবং ওই কর্ম আঞ্জাম দিতে পারবে। ফরয ও ওয়াজিবের মতো আবশ্যক দায়িত্ব-কর্তব্য এবং নিষিদ্ধ ও হারাম বিষয়াবলির ওপর ভিত্তি করে এই মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব ফরয দায়িত্ব ও হারাম কাজগুলো এমনভাবে স্থিরীকৃত হয়েছে যে যে-কেউ সেগুলোর দাবি ও চাহিদা পূর্ণ করতে পারে। প্রয়োজন ও জটিলতার সময়ে শরিয়ত ছাড় দিয়েছে এবং পরিমাণ ও পদ্ধতি বর্ণনা করে দিয়েছে।
এই যে, বাধ্যতামূলক মানদণ্ড-যেখানে পৌছা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক-এর পাশাপাশি শরিয়ত আরেকটি মানদণ্ড (স্তর) স্থির করেছে, যা আগেরটির চেয়ে উঁচু পর্যায়ের ও ব্যাপক। শরিয়ত এই মানুষকে মানদণ্ডের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে এবং এতে উপনীত হওয়ার ব্যাপারটি তাদের কাছে শোভনীয় করে তুলেছে। সকল নফল, মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় ও সুন্নাত কাজসমূহ এই মানদণ্ডের (স্তরের) অন্তর্ভুক্ত। শরিয়ত মানুষকে এগুলো পালন করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। একইভাবে মাকরুহ বা অপছন্দনীয় এবং সন্দেহযুক্ত কাজগুলোও এই মানদণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। এগুলোকে পরহেয করে চলা এবং এগুলো থেকে দূরত্ব বজায় রাখাই উচিত।
কিন্তু উচ্চতর স্তরে ও মানদণ্ডে পৌছা প্রচণ্ড পরিশ্রম-সাপেক্ষ ব্যাপার, প্রতিটি মানুষের জন্য তা সহজ নয়। বরং তা বিশেষ যোগ্যতা ও বিশেষ প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল, তা স্বল্প সংখ্যক মানুষেরই বৈশিষ্ট্য। এ কারণে ইসলাম উচ্চতর স্তরটিকে সকল মানুষের ওপর চূড়ান্তরূপে ফরয করে দেয়নি। বরং একে মানুষের সামনে চিত্রিত করে তুলে ধরেছে এবং শক্তিসামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সুযোগ দিয়েছে।
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا-'আল্লাহ তাআলা কারও ওপর তার সাধ্যাতীত কিছু চাপিয়ে দেন না। (১৩০) প্রত্যেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী যা-কিছু ভালো কাজ করবে তা তার থেকে গৃহীত হবে।
وَلِكُلِّ دَرَجَاتٌ مِمَّا عَمِلُوا'প্রত্যেকের স্তর নির্ধারিত হবে তার আমল অনুযায়ী। (১৩১)
সবশেষে যে ভারসাম্যের কথা বলতে চাই তা হলো অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য। ইসলামি সভ্যতা মনে করে যে, কোনো ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর অধিকার অন্যের দায়িত্ব ও কর্তব্য ছাড়া কিছু নয়। বিচারপ্রার্থীদের অধিকার মানে বিচারকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। শ্রমিকদের অধিকার মানে মালিকদের আবশ্যক কর্তব্যসমূহ। সন্তানসন্ততির অধিকার মানে মা-বাবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। এইভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়ে অধিকার আদায় করা হয়।
ইসলাম ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মাঝে অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রতি মনোযোগী রয়েছে। এতে ব্যক্তিগত প্রবণতা ও সামাজিক কল্যাণকামিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা হয়। একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন সমাজের অন্যান্য সদস্যের জীবনের চেয়ে পৃথক বা স্বাধীন নয়। বরং সে সামাজিক পরিমণ্ডলে বসবাস করতে, কল্যাণ ও উপকার বিনিময়ে এবং সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য। এ সকল অনুষঙ্গের ফলে পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং ইসলামি শরিয়া সেগুলোকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছে।
এভাবেই ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা ইসলামি সভ্যতার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।
টিকাঃ
১২৭. সুরা আর-রহমান: আয়াত ৭-৯।
১২৮. সুরা জুমুআ: আয়াত ৯-১০।
১২৯. সুরা কাসাস: আয়াত ৭৭।
১৩০. সুরা বাকারা: আয়াত ২৮৬।
১৩১. সুরা আনআম: আয়াত ১৩২ ও সুরা আহকাফ: আয়াত ১৯
ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা ইসলামি সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্যের অর্থ হলো দুটি পরস্পর বিরোধী বা বৈপরীত্যপূর্ণ দিক বা পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। এমন নয় যে তার মধ্যে একটি প্রাধান্য পাবে, অপরটি বাদ যাবে। একপক্ষ তার সম্পূর্ণ অধিকার পাবে, অপরপক্ষ বৈষম্যের শিকার হবে ও তার অধিকার হারাবে। এরূপ ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা ইসলামের চিরস্থায়ী সর্বজনীন পয়গামেরই উপযুক্ত। এই পয়গাম সকল ভূখণ্ড ও সব যুগের জন্য প্রযোজ্য।
ইসলামি সভ্যতা আধ্যাত্মিকতা ও বস্তুবাদের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছে। আত্মার চাহিদা ও বস্তুর চাহিদাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছে। শরিয়তের জ্ঞান ও জীবনমুখী জ্ঞানের মধ্যে মিলন ঘটিয়েছে। দুনিয়ার প্রতিও গুরুত্বারোপ করেছে, যেমন আখিরাতের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। চিন্তা ও ধারণা এবং বাস্তবের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করেছে। তারপর, ইসলামি সভ্যতায় রয়েছে অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য। বৈপরীত্যপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার অর্থ হলো উভয় পক্ষকে পূর্ণ সুযোগ দেওয়া এবং ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে অধিকার প্রদান করা।
সুতরাং কোনো বাড়াবাড়ি নয়, সংকীর্ণতা ও অবহেলাও নয়, সীমালঙ্ঘন নয়, কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করাও নয়। আল্লাহ তাআলার কিতাব এ দিকেই ইঙ্গিত করেছে,
وَالسَّمَاءَ رَفَعَهَا وَوَضَعَ الْمِيزَانَ أَلَّا تَطْغَوْا فِي الْمِيزَانِ وَأَقِيمُوا الْوَزْنَ بِالْقِسْطِ وَلَا تُخْسِرُوا الْمِيزَانَ
তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং স্থাপন করেছেন মানদণ্ড, যাতে তোমরা সীমালঙ্ঘন না করো। ওজনের ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত করো এবং ওজনে কম দিয়ো না। (১২৭)
আমরা ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা কী তা ব্যাখ্যা করতে চাই। পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর ইতিহাস থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, কেবল আধ্যাত্মিকতার দিকগুলো অথবা কেবল বস্তুগত দিকগুলো মানুষের সুখ-সৌভাগ্যের জন্য উপযুক্ত পন্থা নয়। আর এসব আধ্যাত্মিকতার পেছনে পড়ে নিজ ইচ্ছা, চিন্তা ও কর্মশক্তির বিনষ্টি ও সেকেলে মনোভাব ছাড়া আর কিছুই অর্জন হবে না। এতে মানুষের মনুষ্যত্বকে হত্যা করা হয় এবং বিশ্বজগতের উপকারিতা ও কল্যাণের বিনাশ ঘটানো হয়। একইভাবে কেবল বস্তুবাদিতার পথে সীমালঙ্ঘন, জুলুম, দাসত্ব ও অপদস্থতা ছাড়া কিছু নেই। এ পথ আত্মা, সম্পদ ও সম্ভ্রমের সঙ্গে উৎপীড়ক স্বেচ্ছাচারিতা ছাড়া কিছু নয়।
এ ক্ষেত্রে চিরন্তন ইসলামি সভ্যতা আত্মার দাবিসমূহ ও বস্তুগত দাবিসমূহের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেছে, বস্তুবাদ ও মানুষের চিত্তবৃত্তির মধ্যে ঐক্য সাধন করেছে। সুতরাং নির্ভেজাল অধ্যাত্মবাদ সুসভ্য বস্তুবাদের ভিত্তি রচনা করে। মানুষ ন্যায়পরায়ণতা, নিরাপত্তা, স্বস্তি, দয়া ও ভালোবাসার ওপর নির্মিত নৈতিকতা-শিষ্টাচার ও ঈমানের পরিমণ্ডলে আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতা, চিন্তা এবং প্রচেষ্টা ও কর্মের ফল লাভ করে থাকে।
এরূপ ভারসাম্যের কাজ হলো মানুষের স্বভাব ও বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্দেশ্যের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি ও সামঞ্জস্য বিধান করা, একইভাবে মানুষের চিন্তা ও ভাবনারাশি এবং তাদের আকাঙ্ক্ষা ও অভিপ্রায়ের মধ্যে সংশ্লেষ ও প্রভাবপ্রবণতা সৃষ্টি করা।
শরিয়ার জ্ঞান ও জীবনমুখী জ্ঞানের মধ্যে মিলন ঘটানোর প্রেক্ষিতে বলতে পারি, ইসলাম তার উন্নত সভ্যতাকে জ্ঞান, শিক্ষা ও যুক্তি এবং অনুসন্ধান, উদ্ঘাটন, অভিজ্ঞতা ও আবিষ্কারের ওপর নির্মাণ করেছে। কারণ সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের ক্ষেত্রে জ্ঞানরাশির প্রাণশক্তিই প্রধান ভূমিকা পালন করে। এই ক্ষেত্রে ইসলাম জ্ঞান ও জ্ঞানীদের সমৃদ্ধ করেছে বিশেষ বিশেষ বিষয়ে, যেখানে প্রতিটি প্রাপ্তি ও অর্জন মানবমণ্ডলীকে জীবনে ইসলামের পয়গাম বাস্তবায়নে সহায়তা করে। তা হলো, পৃথিবীকে আবাদ করা এবং তার কল্যাণকর বস্তুরাশি ও ধনভান্ডার থেকে উপকৃত হওয়া।
'ইলম' বা 'জ্ঞান' শব্দটি আল্লাহ তাআলার কিতাবে ও রাসুলের সুন্নাহে সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, এর সঙ্গে কোনো শর্ত বা ক্ষেত্র নির্দেশ করা হয়নি। সুতরাং জমিনের আবাদ ও পৃথিবীর কল্যাণে নিয়োজিত প্রতিটি উপকারী জ্ঞানই এর অন্তর্ভুক্ত..। যেসব জ্ঞানের উদ্দেশ্য মানবকল্যাণ এবং এই গ্রহে মানব-প্রতিনিধিত্বের দায়দায়িত্ব যথার্থভাবে পালন তা অধিকাংশ সময় জ্ঞানের দুটি শাখাকে বুঝিয়ে থাকে-শরয়ি জ্ঞান ও জীবনমুখী জ্ঞান..। জ্ঞানীদের জন্য যা-কিছু প্রশংসা করা হয়েছে তা প্রত্যেক জ্ঞানীর জন্যই প্রযোজ্য, যিনি তার জ্ঞানের দ্বারা মানবজাতির উপকার করেছেন। চাই তা শরয়ि জ্ঞান হোক, অথবা জীবনমুখী জ্ঞান। ইসলামি সভ্যতার ইতিহাস এ ব্যাপারে যথার্থ বিবরণ পেশ করেছে। আমি এই গ্রন্থের পরবর্তী অধ্যায়ে জীবনমুখী জ্ঞানবিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান ও উদ্ভাবন প্রসঙ্গে যা-কিছু বলব তা সম্ভবত এই ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ সাক্ষী ও উত্তম পরিচায়ক হবে।
মধ্যপন্থা ও ভারসাম্যের এই নীতি সেসব সভ্যতার জন্য এক বিরুদ্ধ ব্যাপার, যেখানে ধর্ম চিন্তাশক্তি ও কর্মসামর্থ্যের ওপর খড়গ উঁচিয়ে রেখেছে এবং জ্ঞান, চিন্তা ও যুক্তির প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রেক্ষিতে সম্ভবত সবচেয়ে স্পষ্ট দলিল হলো কুরআনের জুমার নামায-সংক্রান্ত আয়াতগুলো। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ﴾
হে মুমিনগণ, জুমার দিনে যখন নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ করো, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি করো। নামায শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করো ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও। (১২৮)
দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে মিলন ঘটানোর ক্ষেত্রে ইসলামি সভ্যতার কাজ এটিই। উপর্যুক্ত আয়াত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করছে যে তা (দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে মিলন-সাধন) এমনকি জুমার দিনেও পরিপালিত হবে: নামাযের আগে বেচাকেনা ও দুনিয়াবি কাজ করা; তারপর কেনাবেচা ও অনুরূপ দৈনন্দিন জীবনের কাজগুলো ত্যাগ করে আল্লাহর স্মরণ ও নামাযের প্রতি ধাবিত হওয়া; তারপর নামায শেষে পুনরায় জমিনে ছড়িয়ে পড়া এবং রিযিক অন্বেষণ করা, সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির থেকে গাফেল না হওয়া। এটাই সফলতা ও মুক্তির মূল ভিত্তি। এখানে আল্লাহর অনুগ্রহের অর্থ হলো রিযিক ও জীবিকা।
আরেকটি আয়াত দৈনন্দিন জীবনের কর্মকাণ্ড ও আখিরাতের কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রতি ইঙ্গিত করেছে। সেখানে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَابْتَغِ فِيمَا أَتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا
আল্লাহ তোমাদের যা দিয়েছেন তার দ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। (১২৯)
ইসলাম কোনো মুসলিম থেকে এটা দাবি করে না যে সে কোনো আশ্রমে সন্ন্যাসী হোক অথবা একান্ত নির্জনতায় ইবাদত করুক, যে সারারাত নামায পড়বে এবং সারাদিন রোযা রাখবে; জীবনে তার কোনো অংশই থাকবে না এবং তার কাছে জীবনের কোনো অংশ থাকবে না। বরং ইসলাম মুসলিম থেকে দাবি করে যে সে হবে জীবনোপযোগী কর্মোদ্যগী, জীবনকে নির্মাণ করবে, পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়াবে এবং গোপনীয় ভান্ডার থেকে রিযিক অন্বেষণ করবে। ইসলামি সভ্যতার সন্তানেরা এমনই হয়ে থাকে, তারা আখিরাতের পাশাপাশি দুনিয়াও অন্বেষণ করে, উভয় জীবনে কল্যাণ আশা করে, উভয় জাহানে সৌভাগ্য প্রত্যাশা করে।
যে ভারসাম্য ইসলামি সভ্যতার বৈশিষ্ট্য তার আরেকটি দিক হলো উত্তম ও সংহত উপায়ে আদর্শবাদ ও বস্তুবাদের মধ্যে মিলন সাধন করা। ইসলাম একইসঙ্গে আদর্শবাদী ও বাস্তববাদী ধর্ম। ইসলাম তার অনুসারীদের সবসময় পূর্ণতা ও উন্নত আদর্শের সন্ধান দেয়, কিন্তু সে নিজের মতো করে তার উপায় ও উপকরণ অন্বেষণ করে এবং প্রচেষ্টা ব্যয় করে। ইসলাম কারও ওপর অন্যায়ভাবে কোনোকিছু চাপিয়ে দেয় না। এ কারণে ইসলামে চিন্তাকে বাস্তব থেকে এবং আদর্শবাদকে বাস্তববাদ থেকে পৃথক করা কঠিন। বরং এ দুটি মিলিয়ে মানুষের জন্য পরিপূর্ণ জীবনপদ্ধতি যা তাদের সামনে কল্যাণের পথকে আলোকিত করে তোলে এবং আচার-আচরণের নীতিমালা ও লেনদেনের আইনকানুনকে চিত্রিত করে তোলে।
আদর্শবাদের প্রেক্ষিতে ইসলামি সভ্যতা মানুষকে সহজতা ও স্বস্তি এবং সুখ ও প্রশান্তির সর্বোচ্চ মানদণ্ডের সম্ভবপর শিখরে পৌছে দিতে আকাঙ্ক্ষী। বাস্তববাদের প্রেক্ষিতে ইসলামি সভ্যতা মানুষের পারিপার্শ্বিক অবস্থা, তার স্বভাব ও গঠনপ্রকৃতি, তার শক্তি ও সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা এবং তার জীবনের বাস্তবিকতার প্রতি লক্ষ রাখে।
ইসলামি সভ্যতায় কল্পনাপ্রসূত আদর্শবাদের-স্বপ্নের জগৎ ছাড়া কোথাও যার অস্তিত্ব নেই-কোনো স্থান নেই। যেমন প্লেটো অভিজাত নগরের যে পরিকল্পনা প্রদান করেছেন, যা মানবীয় বাস্তবিকতা থেকে সহস্র মাইল দূরে, যা সহজাত প্রবৃত্তিপ্রসূত এবং যাতে রয়েছে ভ্রান্তি ও ত্রুটি।
একইভাবে ইসলামি সভ্যতায় বাস্তববাদিতা এমন নয় যে, বাস্তবিক ব্যাপারগুলোর অবস্থা ও অবস্থান যা-ই হোক না কেন তার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়। যেকোনোভাবে, যেকোনো রঙে-ঢঙে জীবনের সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য বা বাস্তবের সঙ্গে খাপ খাওয়ার জন্য ইসলামি সভ্যতা যে তার মূলনীতিগুলো সহনীয় ও নমনীয় করে নেবে তাও নয়। মানুষের প্রবৃত্তিপরায়ণতা ও প্রথাগুলো লালন করার জন্য অথবা তাদের পশ্চাৎপদ বিশৃঙ্খল অবস্থা ও ভ্রষ্টতাপূর্ণ অন্ধ অনুসরণের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার জন্য ইসলামি সভ্যতার আবির্ভাব ঘটেনি। জাহিলিয়াতের সমস্ত রূপ ও প্রথাকে নিরর্থক করা এবং নিজের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ব্যবস্থাকে প্রবর্তন করার জন্য ইসলামি সভ্যতা বিনির্মিত হয়েছে। এ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন ও গৌণ বিষয়গুলোতে মানুষের বাস্তবিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতেও পারে, নাও হতে পারে।
আদর্শবাদ ও বাস্তববাদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে ইসলামি সভ্যতা পূর্ণতা ও পূর্ণাঙ্গতার যে সর্বনিম্ন স্তর বা মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে তার থেকে বেরিয়ে যাওয়া বৈধ নয়। কারণ, মুসলিমের ব্যক্তিত্বকে একটি বোধগম্য পদ্ধতি ও পন্থায় গড়ে তোলার জন্য এরূপ মানদণ্ড আবশ্যক এবং তা মুসলিমরূপে গণ্য হওয়ার জন্য কোনো মুসলিম থেকে গ্রহণযোগ্য সর্বনিম্ন স্তর। এই মানদণ্ড যে পথ ও কর্মের নির্দেশ দেয়, কল্যাণকর কাজের জন্য সামান্য প্রস্তুতি যার আছে এবং যে অন্যায় থেকে সামান্য দূরত্ব বজায় রেখেছে সেও ওই পথে পৌছতে পারবে এবং ওই কর্ম আঞ্জাম দিতে পারবে। ফরয ও ওয়াজিবের মতো আবশ্যক দায়িত্ব-কর্তব্য এবং নিষিদ্ধ ও হারাম বিষয়াবলির ওপর ভিত্তি করে এই মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব ফরয দায়িত্ব ও হারাম কাজগুলো এমনভাবে স্থিরীকৃত হয়েছে যে যে-কেউ সেগুলোর দাবি ও চাহিদা পূর্ণ করতে পারে। প্রয়োজন ও জটিলতার সময়ে শরিয়ত ছাড় দিয়েছে এবং পরিমাণ ও পদ্ধতি বর্ণনা করে দিয়েছে।
এই যে, বাধ্যতামূলক মানদণ্ড-যেখানে পৌছা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক-এর পাশাপাশি শরিয়ত আরেকটি মানদণ্ড (স্তর) স্থির করেছে, যা আগেরটির চেয়ে উঁচু পর্যায়ের ও ব্যাপক। শরিয়ত এই মানুষকে মানদণ্ডের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে এবং এতে উপনীত হওয়ার ব্যাপারটি তাদের কাছে শোভনীয় করে তুলেছে। সকল নফল, মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় ও সুন্নাত কাজসমূহ এই মানদণ্ডের (স্তরের) অন্তর্ভুক্ত। শরিয়ত মানুষকে এগুলো পালন করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। একইভাবে মাকরুহ বা অপছন্দনীয় এবং সন্দেহযুক্ত কাজগুলোও এই মানদণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। এগুলোকে পরহেয করে চলা এবং এগুলো থেকে দূরত্ব বজায় রাখাই উচিত।
কিন্তু উচ্চতর স্তরে ও মানদণ্ডে পৌছা প্রচণ্ড পরিশ্রম-সাপেক্ষ ব্যাপার, প্রতিটি মানুষের জন্য তা সহজ নয়। বরং তা বিশেষ যোগ্যতা ও বিশেষ প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল, তা স্বল্প সংখ্যক মানুষেরই বৈশিষ্ট্য। এ কারণে ইসলাম উচ্চতর স্তরটিকে সকল মানুষের ওপর চূড়ান্তরূপে ফরয করে দেয়নি। বরং একে মানুষের সামনে চিত্রিত করে তুলে ধরেছে এবং শক্তিসামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সুযোগ দিয়েছে।
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا-'আল্লাহ তাআলা কারও ওপর তার সাধ্যাতীত কিছু চাপিয়ে দেন না। (১৩০) প্রত্যেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী যা-কিছু ভালো কাজ করবে তা তার থেকে গৃহীত হবে।
وَلِكُلِّ دَرَجَاتٌ مِمَّا عَمِلُوا'প্রত্যেকের স্তর নির্ধারিত হবে তার আমল অনুযায়ী। (১৩১)
সবশেষে যে ভারসাম্যের কথা বলতে চাই তা হলো অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য। ইসলামি সভ্যতা মনে করে যে, কোনো ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর অধিকার অন্যের দায়িত্ব ও কর্তব্য ছাড়া কিছু নয়। বিচারপ্রার্থীদের অধিকার মানে বিচারকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। শ্রমিকদের অধিকার মানে মালিকদের আবশ্যক কর্তব্যসমূহ। সন্তানসন্ততির অধিকার মানে মা-বাবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। এইভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়ে অধিকার আদায় করা হয়।
ইসলাম ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মাঝে অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রতি মনোযোগী রয়েছে। এতে ব্যক্তিগত প্রবণতা ও সামাজিক কল্যাণকামিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা হয়। একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন সমাজের অন্যান্য সদস্যের জীবনের চেয়ে পৃথক বা স্বাধীন নয়। বরং সে সামাজিক পরিমণ্ডলে বসবাস করতে, কল্যাণ ও উপকার বিনিময়ে এবং সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য। এ সকল অনুষঙ্গের ফলে পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং ইসলামি শরিয়া সেগুলোকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছে।
এভাবেই ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা ইসলামি সভ্যতার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।
টিকাঃ
১২৭. সুরা আর-রহমান: আয়াত ৭-৯।
১২৮. সুরা জুমুআ: আয়াত ৯-১০।
১২৯. সুরা কাসাস: আয়াত ৭৭।
১৩০. সুরা বাকারা: আয়াত ২৮৬।
১৩১. সুরা আনআম: আয়াত ১৩২ ও সুরা আহকাফ: আয়াত ১৯
📄 নৈতিকতা
বাস্তবিক অর্থেই নৈতিকতা ইসলামি সভ্যতার প্রাচীরস্বরূপ। নৈতিকতার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে ইসলামি সভ্যতা। মূল্যবোধ ও নৈতিকতার মূলনীতিগুলো জীবনের সব ধরনের ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্নমুখী তৎপরতায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ব্যক্তির চালচলন, সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতিতে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিষ্টাচার ও নৈতিকতার পূর্ণতাদানের জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণ করা হয়েছে। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّمَا بُعِثْتُ لأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ»
সচ্চরিত্রতা ও নৈতিকতার পূর্ণতাদানের জন্য আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে। (১৩২)
এই কয়েকটি শব্দ দ্বারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে নবীরূপে প্রেরণের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছেন। তাঁর অভিপ্রায় ছিল তাঁর উম্মত ও সকল মানুষের অন্তরে নৈতিকতার চেতনাকে বদ্ধমূল করে দেওয়া। তিনি চেয়েছিলেন মানবমণ্ডলী উত্তম চরিত্রের নীতির আলোকে দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড আঞ্জাম দিক, কারণ, চারিত্রিক নীতির ঊর্ধ্বে আর কোনো নীতি নেই।
শাসন, জ্ঞান, বিধিবিধান, যুদ্ধ, শান্তি, অর্থনীতি, পরিবার.. অর্থাৎ ইসলামি সভ্যতার সব ক্ষেত্রে নৈতিক দিকগুলোকে আদর্শিক ও প্রায়োগিক দিক থেকে মান্য করা হয়। এই জায়গাটায় ইসলামি সভ্যতা এক অনন্য উচ্চতায় পৌছেছে যা আগে ও পরে আর কোনো সভ্যতার ভাগ্যে জোটেনি। নৈতিকতার ক্ষেত্রে ইসলামি সভ্যতার অনেক বিস্ময়কর নিদর্শন রয়েছে। এসব নিদর্শন ইসলামি সভ্যতাকে মানবজাতির জন্য অনন্য ও অবিমিশ্র সৌভাগ্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যদিও অন্যসব সভ্যতাও মানুষের সুখ-সৌভাগ্যের ঠিকাদারি নিয়েছে। (১৩৩)
গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, ইসলামি সভ্যতায় নৈতিকতার উৎস হলো ওহি (আল্লাহর প্রেরিত বাণী)। এ কারণে তা প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ এবং স্থান ও কাল, লিঙ্গ ও গোত্র নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জন্য উপযোগী উন্নত আদর্শ। কিন্তু তাত্ত্বিক নৈতিকতার উৎস ভিন্ন। তা হলো মানুষের সীমাবদ্ধ বিবেক ও বুদ্ধি অথবা যার ওপর সমাজের মানুষ ঐকমত্য পোষণ করে। একে প্রথা বলা হয়। তাই তো এক সমাজের তাত্ত্বিক নৈতিকতা আরেক সমাজ থেকে ভিন্ন এবং একেকজন চিন্তাবিদের কাছে একেক রকম।
ইসলামি নৈতিকতার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতার উৎস হলো আল্লাহর তত্ত্বাবধানের ব্যাপারে মানুষের অনুভূতি ও উপলব্ধি। তাত্ত্বিক নৈতিকতার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতার উৎস হলো কেবল বিবেক অথবা করণীয় সম্পর্কে উপলব্ধি অথবা রাষ্ট্রের অবশ্যপালনীয় আইন। এ নৈতিকতাই সভ্যতার চলমানতা ও স্থায়িত্বের রক্ষাকবচ বলে বিবেচিত হয় এবং একইসঙ্গে তা সভ্যতাকে বিকৃতি, হোঁচট ও অধঃপতন থেকে রক্ষা করে।
ইসলামি সভ্যতার ক্ষেত্রে নৈতিকতার প্রধান দিক হলো এর মানবিকতা। মানুষই ইসলামি সভ্যতায় মূল কেন্দ্রবিন্দু এবং মানবিক কল্যাণ ও সম্মান সুরক্ষায় দৃঢ় খুঁটি। কারণ, জীবন ও সভ্যতা বিনির্মাণের প্রেক্ষিতে মানুষকেই দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য করা হয়। পবিত্র কুরআনে মানুষের মর্যাদা ও সম্মানের ওপর গুরুত্বারোপ করে একের-পর-এক আয়াত এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
۞ وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا
আর নিঃসন্দেহে আমি আদমসন্তানদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদের আমি উত্তম রিযিক দান করেছি এবং আমি যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের সবার ওপর আমি মানুষকেই শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। (১৩৪)
আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে সমানভাবে মর্যাদা দিয়েছেন। কারণ, সৃষ্টির পর থেকে নিয়ে এখনো পর্যন্ত মানুষের গঠন-উপাদান একই এবং মানুষের অন্যান্য পার্থক্য তার গঠন-উপাদানের কোনোকিছুকে পরিবর্তন করে না। প্রতিটি মানুষকে একই ‘মূল’ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে এই মর্যাদার ক্ষেত্রে বিশিষ্টতা দান করেছেন। এই বিশিষ্টতা ও মর্যাদা অন্য সৃষ্টিকুলের নেই। এই মর্যাদা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য বিশেষ সুরক্ষা। এভাবে আল্লাহ তাআলা মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেচনা, অভিপ্রায় ও স্বাধীনতার সুরক্ষা দিয়েছেন এবং ব্যক্তিসত্তা, সম্পদ ও সন্তানসন্ততির ক্ষেত্রে তার অধিকারেরও সুরক্ষা দিয়েছেন।
এ সকল বৈশিষ্ট্যের কারণে ইসলামি সভ্যতা অনন্য ও অসাধারণ। ইসলামি সভ্যতা বিশ্বজনীন এবং বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার নিরঙ্কুশ একত্ববাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা অবলম্বনও ইসলামি সভ্যতার অনন্যতাকে ফুটিয়ে তোলে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বিবেচনায়ও ইসলামি সভ্যতা তুলনারহিত। এ সকল কারণে ইসলামি সভ্যতা কোনো জাতীয়তাবাদী সভ্যতা নয়, কোনো বর্ণবাদী সভ্যতা নয় এবং মানব-প্রকৃতির বিরুদ্ধও নয়।
যে-সকল বৈশিষ্ট্যে ইসলামি সভ্যতা বিশিষ্ট ও অনন্য তা সত্য-সরল দ্বীনে ইসলামের মূলনীতি থেকে স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতার চরিত্র লাভ করেছে। কারণ, ইসলামি সভ্যতা ইসলামের মূলনীতি থেকে উৎসারিত এবং তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ কারণে ইসলামি সভ্যতা এক স্বকীয় ও অনন্য মৌলবস্তুর রূপ পরিগ্রহ করেছে, যার পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটে না, যদিও কালের বিবর্তন সাধিত হয় এবং নতুন নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে।
টিকাঃ
১৩২. আল-হাকিম কর্তৃক আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, মুসতাদরাক, কিতাব তাওয়ারিখুল মুতাকাদ্দিমিন মিনাল আম্বিয়া ওয়াল-মুরসালিন এবং কিতাব: আয়াতু রাসুলিল্লাহিল লাতি হিয়া দালাইলুন নুবুওয়া, হাদিস নং ৪২২১। আল-হাকিম বলেছেন, হাদিসটি ইমাম মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহিহ, যদিও তিনি হাদিসটি সংকলন করেননি। যাহাবি তাকে সমর্থন করেছেন। বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস নং ২০৫৭১।
১৩৩. মুস্তাফা আস-সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ৩৭।
১৩৪. সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৭০।
বাস্তবিক অর্থেই নৈতিকতা ইসলামি সভ্যতার প্রাচীরস্বরূপ। নৈতিকতার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে ইসলামি সভ্যতা। মূল্যবোধ ও নৈতিকতার মূলনীতিগুলো জীবনের সব ধরনের ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্নমুখী তৎপরতায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ব্যক্তির চালচলন, সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতিতে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিষ্টাচার ও নৈতিকতার পূর্ণতাদানের জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণ করা হয়েছে। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّمَا بُعِثْتُ لأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ»
সচ্চরিত্রতা ও নৈতিকতার পূর্ণতাদানের জন্য আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে। (১৩২)
এই কয়েকটি শব্দ দ্বারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে নবীরূপে প্রেরণের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছেন। তাঁর অভিপ্রায় ছিল তাঁর উম্মত ও সকল মানুষের অন্তরে নৈতিকতার চেতনাকে বদ্ধমূল করে দেওয়া। তিনি চেয়েছিলেন মানবমণ্ডলী উত্তম চরিত্রের নীতির আলোকে দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড আঞ্জাম দিক, কারণ, চারিত্রিক নীতির ঊর্ধ্বে আর কোনো নীতি নেই।
শাসন, জ্ঞান, বিধিবিধান, যুদ্ধ, শান্তি, অর্থনীতি, পরিবার.. অর্থাৎ ইসলামি সভ্যতার সব ক্ষেত্রে নৈতিক দিকগুলোকে আদর্শিক ও প্রায়োগিক দিক থেকে মান্য করা হয়। এই জায়গাটায় ইসলামি সভ্যতা এক অনন্য উচ্চতায় পৌছেছে যা আগে ও পরে আর কোনো সভ্যতার ভাগ্যে জোটেনি। নৈতিকতার ক্ষেত্রে ইসলামি সভ্যতার অনেক বিস্ময়কর নিদর্শন রয়েছে। এসব নিদর্শন ইসলামি সভ্যতাকে মানবজাতির জন্য অনন্য ও অবিমিশ্র সৌভাগ্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যদিও অন্যসব সভ্যতাও মানুষের সুখ-সৌভাগ্যের ঠিকাদারি নিয়েছে। (১৩৩)
গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, ইসলামি সভ্যতায় নৈতিকতার উৎস হলো ওহি (আল্লাহর প্রেরিত বাণী)। এ কারণে তা প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ এবং স্থান ও কাল, লিঙ্গ ও গোত্র নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জন্য উপযোগী উন্নত আদর্শ। কিন্তু তাত্ত্বিক নৈতিকতার উৎস ভিন্ন। তা হলো মানুষের সীমাবদ্ধ বিবেক ও বুদ্ধি অথবা যার ওপর সমাজের মানুষ ঐকমত্য পোষণ করে। একে প্রথা বলা হয়। তাই তো এক সমাজের তাত্ত্বিক নৈতিকতা আরেক সমাজ থেকে ভিন্ন এবং একেকজন চিন্তাবিদের কাছে একেক রকম।
ইসলামি নৈতিকতার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতার উৎস হলো আল্লাহর তত্ত্বাবধানের ব্যাপারে মানুষের অনুভূতি ও উপলব্ধি। তাত্ত্বিক নৈতিকতার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতার উৎস হলো কেবল বিবেক অথবা করণীয় সম্পর্কে উপলব্ধি অথবা রাষ্ট্রের অবশ্যপালনীয় আইন। এ নৈতিকতাই সভ্যতার চলমানতা ও স্থায়িত্বের রক্ষাকবচ বলে বিবেচিত হয় এবং একইসঙ্গে তা সভ্যতাকে বিকৃতি, হোঁচট ও অধঃপতন থেকে রক্ষা করে।
ইসলামি সভ্যতার ক্ষেত্রে নৈতিকতার প্রধান দিক হলো এর মানবিকতা। মানুষই ইসলামি সভ্যতায় মূল কেন্দ্রবিন্দু এবং মানবিক কল্যাণ ও সম্মান সুরক্ষায় দৃঢ় খুঁটি। কারণ, জীবন ও সভ্যতা বিনির্মাণের প্রেক্ষিতে মানুষকেই দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য করা হয়। পবিত্র কুরআনে মানুষের মর্যাদা ও সম্মানের ওপর গুরুত্বারোপ করে একের-পর-এক আয়াত এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
۞ وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا
আর নিঃসন্দেহে আমি আদমসন্তানদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদের আমি উত্তম রিযিক দান করেছি এবং আমি যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের সবার ওপর আমি মানুষকেই শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। (১৩৪)
আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে সমানভাবে মর্যাদা দিয়েছেন। কারণ, সৃষ্টির পর থেকে নিয়ে এখনো পর্যন্ত মানুষের গঠন-উপাদান একই এবং মানুষের অন্যান্য পার্থক্য তার গঠন-উপাদানের কোনোকিছুকে পরিবর্তন করে না। প্রতিটি মানুষকে একই ‘মূল’ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে এই মর্যাদার ক্ষেত্রে বিশিষ্টতা দান করেছেন। এই বিশিষ্টতা ও মর্যাদা অন্য সৃষ্টিকুলের নেই। এই মর্যাদা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য বিশেষ সুরক্ষা। এভাবে আল্লাহ তাআলা মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেচনা, অভিপ্রায় ও স্বাধীনতার সুরক্ষা দিয়েছেন এবং ব্যক্তিসত্তা, সম্পদ ও সন্তানসন্ততির ক্ষেত্রে তার অধিকারেরও সুরক্ষা দিয়েছেন।
এ সকল বৈশিষ্ট্যের কারণে ইসলামি সভ্যতা অনন্য ও অসাধারণ। ইসলামি সভ্যতা বিশ্বজনীন এবং বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার নিরঙ্কুশ একত্ববাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা অবলম্বনও ইসলামি সভ্যতার অনন্যতাকে ফুটিয়ে তোলে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বিবেচনায়ও ইসলামি সভ্যতা তুলনারহিত। এ সকল কারণে ইসলামি সভ্যতা কোনো জাতীয়তাবাদী সভ্যতা নয়, কোনো বর্ণবাদী সভ্যতা নয় এবং মানব-প্রকৃতির বিরুদ্ধও নয়।
যে-সকল বৈশিষ্ট্যে ইসলামি সভ্যতা বিশিষ্ট ও অনন্য তা সত্য-সরল দ্বীনে ইসলামের মূলনীতি থেকে স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতার চরিত্র লাভ করেছে। কারণ, ইসলামি সভ্যতা ইসলামের মূলনীতি থেকে উৎসারিত এবং তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ কারণে ইসলামি সভ্যতা এক স্বকীয় ও অনন্য মৌলবস্তুর রূপ পরিগ্রহ করেছে, যার পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটে না, যদিও কালের বিবর্তন সাধিত হয় এবং নতুন নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে।
টিকাঃ
১৩২. আল-হাকিম কর্তৃক আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস, মুসতাদরাক, কিতাব তাওয়ারিখুল মুতাকাদ্দিমিন মিনাল আম্বিয়া ওয়াল-মুরসালিন এবং কিতাব: আয়াতু রাসুলিল্লাহিল লাতি হিয়া দালাইলুন নুবুওয়া, হাদিস নং ৪২২১। আল-হাকিম বলেছেন, হাদিসটি ইমাম মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহিহ, যদিও তিনি হাদিসটি সংকলন করেননি। যাহাবি তাকে সমর্থন করেছেন। বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস নং ২০৫৭১।
১৩৩. মুস্তাফা আস-সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ৩৭।
১৩৪. সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৭০।