📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 আল-কুরআন ও সুন্নাহ

📄 আল-কুরআন ও সুন্নাহ


কুরআনুল কারিম এবং নবীর পবিত্র সুন্নাহকে সাধারণভাবে ইসলামি সভ্যতার দুটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বিবেচনা করা হয়। এ দুটি ইসলামি সভ্যতার ভিত্তিগত মূলনীতি।
আল-কুরআন আল্লাহ তাআলার মহিমান্বিত কিতাব, যা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর এ কিতাব সম্পর্কে বলেছেন,
كِتَابٌ أُحْكِمَتْ آيَاتُهُ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ
এই কিতাব প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞের পক্ষ থেকে, এর আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট, সুবিন্যস্ত ও পরে বিশদভাবে বিবৃত। (৯০)
এই কিতাবের উদাহরণগুলো ও নির্দেশগুলো যে অনুধাবন করতে পারে তার জন্য শিক্ষাপূর্ণ ও পথপ্রদর্শকরূপে পর্যবসিত হয়। তাতে আল্লাহ তাআলা আবশ্যক বিধিবিধান বিবৃত করেছেন, হালাল ও হারামের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করে দিয়েছেন, অনুধাবনের জন্য উপদেশমালা ও ঘটনাবলির পুনরাবৃত্তি করেছেন। তাতে তিনি উদাহরণ পেশ করেছেন এবং অদৃশ্যের সংবাদ পরিবেশন করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ
কিতাবে (কুরআনে) আমি কোনোকিছুই বাদ দিইনি। (৯১), (৯২)
আল-কুরআন ইসলামি সমাজের সংবিধান। কুরআন প্রতিটি বড় ও ছোট বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছে, মানবজাতির জন্য যা-কিছুতে কল্যাণ ও সৌভাগ্য রয়েছে তা নিয়ে এসেছে। কুরআন মানবজাতির জন্য যা-কিছু বিধিবদ্ধ করেছে তা দ্ব্যর্থহীন ও ব্যাপক এবং প্রতিটি স্থান ও কালের জন্য উপযুক্ত। (৯৩)
আল্লাহ তাআলা কুরআন নাযিল করেছেন তাঁর দিক-নির্দেশনা দ্বারা জীবন ও মানবতার পথচলাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। কুরআনেই ইসলামি সভ্যতার রহস্য ও তার বিশালতা নিহিত রয়েছে। তা আল্লাহর কিতাব যা يَهْدِى لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ (হেদায়েত করে সেই পথের দিকে যা সুদৃঢ়।) (৯৪) অর্থাৎ, মানুষকে এমন পথে পরিচালিত করে যা অন্যসকল পথ থেকে শ্রেষ্ঠ, উত্তম ও যথার্থ। তা আল্লাহর এমন কিতাব যা لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ (কোনো মিথ্যা এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না-অগ্র থেকেও নয়, পশ্চাৎ থেকেও নয়। তা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসার্হ আল্লাহর নিকট থেকে অবতীর্ণ।) (৯৫) তা মানবজাতির জন্য আত্মিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, জ্ঞানগত, চিন্তাগত, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামরিক সর্বদিক থেকে শ্রেষ্ঠ ও কল্যাণকর। কুরআনের শিক্ষাতেই রয়েছে মানুষের সৌভাগ্য।
আল-কুরআনের অন্তর্গত সামগ্রিক নীতি ও বিভিন্ন বিধিবিধান আত্মার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, প্রতিপালকের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে সমাজের ও অন্য মানুষের সম্পর্ককে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছে। কুরআন আহ্বান জানিয়েছে একত্ববাদের প্রতি, স্বাধীনতার প্রতি, ভ্রাতৃত্ব ও সমতার প্রতি। একইভাবে কুরআন পারস্পরিক লেনদেন ও আচার-আচরণ শৃঙ্খলিত করেছে, সমাজকে প্রতিষ্ঠিত করেছে মজবুত ভিত্তিসমূহের ওপর যা সমাজের জন্য নিরাপত্তা, প্রাচুর্য ও সৌভাগ্য নিশ্চিত করে।
আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উদ্দেশে কুরআনের যা-কিছু সংক্ষিপ্ত তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন, যা-কিছু জটিল তার ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, যা-কিছু সম্ভাবনাপূর্ণ তা সুনিশ্চিত করেছেন। তা এ কারণে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি যেন কুরআনের সঙ্গে বিশিষ্টতা প্রকাশ পায় এবং তাঁর প্রতি দায়িত্বপ্রদানের মর্যাদা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِلَ إِلَيْهِ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
এবং আপনার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি, মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা করে। (৯৬)
সুতরাং আল্লাহর কিতাব হলো মূল এবং রাসুলের সুন্নাহ হলো তার ব্যাখ্যা। (৯৭)
ইসলামি সভ্যতার ভিত্তিসমূহ ও মূলনীতিসমূহের দ্বিতীয়টি হলো রাসুলের পবিত্র সুন্নাহ যা আল-কুরআনের পরে ইসলামের দ্বিতীয় উৎস। কুরআন এমন সংবিধান যাতে ইসলামের মৌলিক নীতিমালা ও আইনকানুন তথা ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস, আমল-ইবাদত, আখলাক ও শিষ্টাচার, লেনদেন এবং আদবকায়দা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুন্নাহ হলো এ সকল ক্ষেত্রে কুরআনের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং কর্মে বাস্তবায়ন।
ইসলামি শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন ও উম্মাহকে এর ওপর পরিচালনার ক্ষেত্রে রাসুলের বিস্তারিত কর্মপদ্ধতিই হলো সুন্নাহ। তা মূর্ত হয়ে উঠেছে আল্লাহ তাআলার এই বাণীতে,
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ ايتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُبِينٍ
আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের নিজেদের মধ্য থেকে তাদের নিকট রাসুল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাঁর আয়াতসমূহ তাদের কাছে তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন, যদিও তারা পূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল। (৯৮)
তা রূপ লাভ করেছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথায়, কাজে ও अनुमोদনে। (৯৯)
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সম্বোধন করে বলেন,
وَمَا آتَكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا
রাসুল তোমাদের যা দেন (যা-কিছুর নির্দেশ দেন) তা তোমরা গ্রহণ করো (পালন করো) এবং যা থেকে তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো। (১০০)
সুতরাং সুন্নাহ হলো কুরআনের পরিপূরক ও কুরআনের ব্যাখ্যা। ইমরান ইবনে হুসাইন রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, তারা রাসুলের হাদিস আলোচনা-পর্যালোচনা করতেন। একবার এক লোক বলল, এগুলো থেকে আমাদের মুক্তি দিন এবং আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব নিয়ে আসুন। তখন ইমরান ইবনে হুসাইন রা. তাকে বললেন, 'তুমি একটা নির্বোধ। তুমি কি আল্লাহর কিতাবে নামায বিস্তারিতরূপে পাবে? তুমি কি আল্লাহর কিতাবে রোযা বিস্তারিতরূপে পাবে? কুরআন এগুলো বিধিবদ্ধ করেছে এবং সুন্নাহ এগুলোর সবিস্তার ব্যাখ্যা দিয়েছে।' (১০১)
ঐশী প্রত্যাদেশ থেকে প্রাপ্ত এই দুটি উৎস একটি অভিজাত আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ করেছে। মানবজাতি এর কোনো নমুনা দেখেনি, যেমনটি আমরা দেখব এই কিতাবের যেকোনো এক অধ্যায়ে। আরবদের ইসলামপূর্ব অবস্থা ও ইসলাম-পরবর্তী অবস্থার প্রতি যিনি দৃষ্টিপাত করবেন এবং দুটি অবস্থাকে তুলনামূলকভাবে বিচার করবেন তিনি খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কাছে যে দ্বীন নিয়ে এসেছিলেন তা-ই একমাত্র অভিনব বিষয় ছিল যা তাদের মহান করেছিল। এই দ্বীনই তাদের চরিত্রকে মেরামত করেছিল, তাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছিল, তাদের একই কালিমাতলে একত্র করেছিল, তাদের সমাজ সংস্কার করেছিল, তাদের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিল। এই দ্বীনের ফলে তারা একটি মূর্খ জাতি থেকে শিক্ষিত, বিভ্রান্ত জাতি থেকে সুপথপ্রাপ্ত এবং একটি অপরিচিত জাতি থেকে বিখ্যাত জাতিতে পরিণত হয়েছে। (১০২)
কুরআনুল কারিম ও নবীর পবিত্র সুন্নাহই যেহেতু জ্ঞান ও বিশ্বাস, আখলাক ও শিষ্টাচার, নারী-পুরুষ সম্পর্ক, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং ইসলামি সভ্যতার অন্তর্গত অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও অনুশাসন জারি করে ইসলামের সভ্যতাকে বিনির্মাণ করেছে, সুতরাং এ দুটির মধ্য থেকেই মানুষের এবং সমগ্র মানবসমাজের সৌভাগ্য উৎসারিত হয়।

টিকাঃ
৯০. সুরা হুদ: আয়াত ১।
৯১. সুরা আনআম: আয়াত ৩৮।
৯২. কুরতুবি, আল-জামিউ লি-আহকামিল কুরআন, খ. ১, পৃ. ১।
৯৩. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৩৭।
৯৪. সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৯।
৯৫. সুরা হা মিম আস-সাজদা: আয়াত ৪২।
৯৬. সুরা নাহল: আয়াত ৪৪।
৯৭. কুরতুবি, আল-জামিউ লি-আহকামিল কুরআন, খ. ১, পৃ. ২।
৯৮. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১৬৪।
৯৯. ড. ইউসুফ কারযাবি, মাদখাল লি-মারিফাতিল ইসলাম, অধ্যায় : القرآن والسنة مصدرا الإسلام
১০০. সুরা হাশর: আয়াত ৭।
১০১. জালালুদ্দিন সুয়ুতি, মিফতাহুল জান্নাহ, পৃ. ৫৯; সামআনি, আদাবুল ইমলা ওয়াল-ইসতিমলা, পৃ. ১০।
১০২. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৬১।

কুরআনুল কারিম এবং নবীর পবিত্র সুন্নাহকে সাধারণভাবে ইসলামি সভ্যতার দুটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বিবেচনা করা হয়। এ দুটি ইসলামি সভ্যতার ভিত্তিগত মূলনীতি।
আল-কুরআন আল্লাহ তাআলার মহিমান্বিত কিতাব, যা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর এ কিতাব সম্পর্কে বলেছেন,
كِتَابٌ أُحْكِمَتْ آيَاتُهُ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ
এই কিতাব প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞের পক্ষ থেকে, এর আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট, সুবিন্যস্ত ও পরে বিশদভাবে বিবৃত। (৯০)
এই কিতাবের উদাহরণগুলো ও নির্দেশগুলো যে অনুধাবন করতে পারে তার জন্য শিক্ষাপূর্ণ ও পথপ্রদর্শকরূপে পর্যবসিত হয়। তাতে আল্লাহ তাআলা আবশ্যক বিধিবিধান বিবৃত করেছেন, হালাল ও হারামের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করে দিয়েছেন, অনুধাবনের জন্য উপদেশমালা ও ঘটনাবলির পুনরাবৃত্তি করেছেন। তাতে তিনি উদাহরণ পেশ করেছেন এবং অদৃশ্যের সংবাদ পরিবেশন করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ
কিতাবে (কুরআনে) আমি কোনোকিছুই বাদ দিইনি। (৯১), (৯২)
আল-কুরআন ইসলামি সমাজের সংবিধান। কুরআন প্রতিটি বড় ও ছোট বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছে, মানবজাতির জন্য যা-কিছুতে কল্যাণ ও সৌভাগ্য রয়েছে তা নিয়ে এসেছে। কুরআন মানবজাতির জন্য যা-কিছু বিধিবদ্ধ করেছে তা দ্ব্যর্থহীন ও ব্যাপক এবং প্রতিটি স্থান ও কালের জন্য উপযুক্ত। (৯৩)
আল্লাহ তাআলা কুরআন নাযিল করেছেন তাঁর দিক-নির্দেশনা দ্বারা জীবন ও মানবতার পথচলাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। কুরআনেই ইসলামি সভ্যতার রহস্য ও তার বিশালতা নিহিত রয়েছে। তা আল্লাহর কিতাব যা يَهْدِى لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ (হেদায়েত করে সেই পথের দিকে যা সুদৃঢ়।) (৯৪) অর্থাৎ, মানুষকে এমন পথে পরিচালিত করে যা অন্যসকল পথ থেকে শ্রেষ্ঠ, উত্তম ও যথার্থ। তা আল্লাহর এমন কিতাব যা لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ (কোনো মিথ্যা এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না-অগ্র থেকেও নয়, পশ্চাৎ থেকেও নয়। তা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসার্হ আল্লাহর নিকট থেকে অবতীর্ণ।) (৯৫) তা মানবজাতির জন্য আত্মিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, জ্ঞানগত, চিন্তাগত, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামরিক সর্বদিক থেকে শ্রেষ্ঠ ও কল্যাণকর। কুরআনের শিক্ষাতেই রয়েছে মানুষের সৌভাগ্য।
আল-কুরআনের অন্তর্গত সামগ্রিক নীতি ও বিভিন্ন বিধিবিধান আত্মার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, প্রতিপালকের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে সমাজের ও অন্য মানুষের সম্পর্ককে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছে। কুরআন আহ্বান জানিয়েছে একত্ববাদের প্রতি, স্বাধীনতার প্রতি, ভ্রাতৃত্ব ও সমতার প্রতি। একইভাবে কুরআন পারস্পরিক লেনদেন ও আচার-আচরণ শৃঙ্খলিত করেছে, সমাজকে প্রতিষ্ঠিত করেছে মজবুত ভিত্তিসমূহের ওপর যা সমাজের জন্য নিরাপত্তা, প্রাচুর্য ও সৌভাগ্য নিশ্চিত করে।
আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উদ্দেশে কুরআনের যা-কিছু সংক্ষিপ্ত তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন, যা-কিছু জটিল তার ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, যা-কিছু সম্ভাবনাপূর্ণ তা সুনিশ্চিত করেছেন। তা এ কারণে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি যেন কুরআনের সঙ্গে বিশিষ্টতা প্রকাশ পায় এবং তাঁর প্রতি দায়িত্বপ্রদানের মর্যাদা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِلَ إِلَيْهِ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
এবং আপনার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি, মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা করে। (৯৬)
সুতরাং আল্লাহর কিতাব হলো মূল এবং রাসুলের সুন্নাহ হলো তার ব্যাখ্যা। (৯৭)
ইসলামি সভ্যতার ভিত্তিসমূহ ও মূলনীতিসমূহের দ্বিতীয়টি হলো রাসুলের পবিত্র সুন্নাহ যা আল-কুরআনের পরে ইসলামের দ্বিতীয় উৎস। কুরআন এমন সংবিধান যাতে ইসলামের মৌলিক নীতিমালা ও আইনকানুন তথা ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস, আমল-ইবাদত, আখলাক ও শিষ্টাচার, লেনদেন এবং আদবকায়দা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুন্নাহ হলো এ সকল ক্ষেত্রে কুরআনের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং কর্মে বাস্তবায়ন।
ইসলামি শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন ও উম্মাহকে এর ওপর পরিচালনার ক্ষেত্রে রাসুলের বিস্তারিত কর্মপদ্ধতিই হলো সুন্নাহ। তা মূর্ত হয়ে উঠেছে আল্লাহ তাআলার এই বাণীতে,
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ ايتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُبِينٍ
আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের নিজেদের মধ্য থেকে তাদের নিকট রাসুল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাঁর আয়াতসমূহ তাদের কাছে তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন, যদিও তারা পূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল। (৯৮)
তা রূপ লাভ করেছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথায়, কাজে ও अनुमोদনে। (৯৯)
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সম্বোধন করে বলেন,
وَمَا آتَكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا
রাসুল তোমাদের যা দেন (যা-কিছুর নির্দেশ দেন) তা তোমরা গ্রহণ করো (পালন করো) এবং যা থেকে তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো। (১০০)
সুতরাং সুন্নাহ হলো কুরআনের পরিপূরক ও কুরআনের ব্যাখ্যা। ইমরান ইবনে হুসাইন রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, তারা রাসুলের হাদিস আলোচনা-পর্যালোচনা করতেন। একবার এক লোক বলল, এগুলো থেকে আমাদের মুক্তি দিন এবং আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব নিয়ে আসুন। তখন ইমরান ইবনে হুসাইন রা. তাকে বললেন, 'তুমি একটা নির্বোধ। তুমি কি আল্লাহর কিতাবে নামায বিস্তারিতরূপে পাবে? তুমি কি আল্লাহর কিতাবে রোযা বিস্তারিতরূপে পাবে? কুরআন এগুলো বিধিবদ্ধ করেছে এবং সুন্নাহ এগুলোর সবিস্তার ব্যাখ্যা দিয়েছে।' (১০১)
ঐশী প্রত্যাদেশ থেকে প্রাপ্ত এই দুটি উৎস একটি অভিজাত আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ করেছে। মানবজাতি এর কোনো নমুনা দেখেনি, যেমনটি আমরা দেখব এই কিতাবের যেকোনো এক অধ্যায়ে। আরবদের ইসলামপূর্ব অবস্থা ও ইসলাম-পরবর্তী অবস্থার প্রতি যিনি দৃষ্টিপাত করবেন এবং দুটি অবস্থাকে তুলনামূলকভাবে বিচার করবেন তিনি খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কাছে যে দ্বীন নিয়ে এসেছিলেন তা-ই একমাত্র অভিনব বিষয় ছিল যা তাদের মহান করেছিল। এই দ্বীনই তাদের চরিত্রকে মেরামত করেছিল, তাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছিল, তাদের একই কালিমাতলে একত্র করেছিল, তাদের সমাজ সংস্কার করেছিল, তাদের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিল। এই দ্বীনের ফলে তারা একটি মূর্খ জাতি থেকে শিক্ষিত, বিভ্রান্ত জাতি থেকে সুপথপ্রাপ্ত এবং একটি অপরিচিত জাতি থেকে বিখ্যাত জাতিতে পরিণত হয়েছে। (১০২)
কুরআনুল কারিম ও নবীর পবিত্র সুন্নাহই যেহেতু জ্ঞান ও বিশ্বাস, আখলাক ও শিষ্টাচার, নারী-পুরুষ সম্পর্ক, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং ইসলামি সভ্যতার অন্তর্গত অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও অনুশাসন জারি করে ইসলামের সভ্যতাকে বিনির্মাণ করেছে, সুতরাং এ দুটির মধ্য থেকেই মানুষের এবং সমগ্র মানবসমাজের সৌভাগ্য উৎসারিত হয়।

টিকাঃ
৯০. সুরা হুদ: আয়াত ১।
৯১. সুরা আনআম: আয়াত ৩৮।
৯২. কুরতুবি, আল-জামিউ লি-আহকামিল কুরআন, খ. ১, পৃ. ১।
৯৩. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৩৭।
৯৪. সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৯।
৯৫. সুরা হা মিম আস-সাজদা: আয়াত ৪২।
৯৬. সুরা নাহল: আয়াত ৪৪।
৯৭. কুরতুবি, আল-জামিউ লি-আহকামিল কুরআন, খ. ১, পৃ. ২।
৯৮. সুরা আলে ইমরান: আয়াত ১৬৪।
৯৯. ড. ইউসুফ কারযাবি, মাদখাল লি-মারিফাতিল ইসলাম, অধ্যায় : القرآن والسنة مصدرا الإسلام
১০০. সুরা হাশর: আয়াত ৭।
১০১. জালালুদ্দিন সুয়ুতি, মিফতাহুল জান্নাহ, পৃ. ৫৯; সামআনি, আদাবুল ইমলা ওয়াল-ইসতিমলা, পৃ. ১০।
১০২. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৬১।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ইসলামি জাতি-গোষ্ঠী

📄 ইসলামি জাতি-গোষ্ঠী


ইসলাম স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে সকল জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে বিশ্ব মানবসংহতি ঘোষণা করেছে। তা সত্য, কল্যাণ ও সৌজন্যবোধের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَابِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ)
হে মানুষ, তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকি। (১০৩)
এ কারণেই ইসলাম ইসলামি বিজয়গুলোর পর বিভিন্ন মুসলিম জাতির মধ্যে সম্প্রীতি সৃষ্টি করেছে, বিভিন্ন গোষ্ঠী ও বংশধারার মধ্যে মিলন সৃষ্টি করেছে। প্রতিটি জাতি ও গোষ্ঠীর সভ্যতার ঐতিহ্য ছিল, জ্ঞানগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা ছিল। আর এগুলো ছিল একটি অনন্য সভ্যতা নির্মাণের কার্যকারণ, যেখানে মানবিক ও স্বভাবগত শক্তি ও প্রতিভার বৈচিত্র্য ছিল। আর মুসলিম জাতি-গোষ্ঠী ও বংশের জ্ঞানগত সাংস্কৃতিক মানবিক শক্তি ও প্রতিভার বৈচিত্র্যের সমন্বিত রূপই হলো ইসলামি সভ্যতা।
শাস্ত্রীয়, সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানগত যে বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা, যা উপভোগ করছিল ইসলামি বিশ্বের পারসিক ও তুর্কির মতো কিছু জাতি, তা ইসলামি সভ্যতা বিনির্মাণে যুগপৎ সাহায্য করেছে এবং এক উৎকর্ষপূর্ণ বিশাল মানবসভ্যতা নির্মাণে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হয়েছে। এ কারণে ইসলামি বিশ্বের জাতি-গোষ্ঠীর বিচিত্রতা ও বহুরূপতা ইসলামি সভ্যতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি এবং সমৃদ্ধিকরণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিরূপে বিবেচিত হয়।
আমরা উদাহরণ হিসেবে পারস্যসাম্রাজ্যের কথা আলোচনা করতে পারি। আল্লাহ তাআলা যখন তা মুসলিমদের জন্য বিজিত করলেন, মুসলিমদের সঙ্গে পারস্যবাসীর সংমিশ্রণ ঘটল। তারা মুসলিমদের থেকে ইসলামধর্মের সৌন্দর্য, সৌজন্য ও মহানুভবতার অনেককিছু শিখল। তারা জানল যে ইসলাম হলো ভ্রাতৃত্ব, সমতা, ভালোবাসা, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহানুভূতি এবং একে অপরকে প্রাধান্য দেওয়ার ধর্ম। ফলে তারা আল্লাহর দ্বীন ইসলামে দলে দলে প্রবেশ করল। আরবি ভাষা শিক্ষা ও এ ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য আগ্রহী হয়ে উঠল। কারণ আরবি ভাষা তাদের ধর্মের ভাষা, যে ধর্মকে তারা ভালোবেসেছে, আলিঙ্গন করেছে। আরবি ভাষা তাদেরকে এই ধর্ম বুঝতে ও অনুধাবন করতে সাহায্য করেছে। (১০৪) এই ধর্ম ও তার ভাষার প্রতি তাদের ভালোবাসা এই দুটির ক্ষেত্রে অবদান রাখতে তাদেরকে উৎসাহিত করেছে। ফলে অনতিকাল পরেই তারা জ্ঞান-আন্দোলন ও গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে, বরং এ দুটির ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিয়েছে। ইসলামি সভ্যতা তা থেকে পর্যাপ্ত উপকার লাভ করেছে। যেমন:
এক. ইসলামি সভ্যতার কতিপয় দিক ব্যক্ত করার জন্য কিছু শব্দ রয়েছে। তার সমার্থক শব্দ আরবি ভাষায় ছিল না। তখন ওই শব্দগুলোকেই আরবি ভাষায় আত্তীকরণ করা হয়। ফলে শব্দগুলো আরবি ভাষার শরীরে প্রবেশ করে। এর মধ্যে রয়েছে দিওয়ান (دیوان) ও বিমারিস্তান (بیمارستان) তথা, দফতর ও হাসপাতাল।
দুই. আরবি ভাষাজ্ঞান ও ইসলামি জ্ঞানের ময়দানে পারস্য থেকে বহু ক্ষণজন্মা প্রতিভা ও মনীষার জন্ম হয়েছে। হাদিসশাস্ত্রে শিখরে পৌঁছেছেন হাসান বসরি রহ., মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন রহ., আবু আবদুল্লাহ বুখারি রহ. প্রমুখ। হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে তারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন। ফিকহশাস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন দুই ইমাম, ইমাম আবু হানিফা রহ. ও ইমাম লাইস ইবনে সাদ রহ.। তারা দুইজন এবং তাদের মতো আরও যারা রয়েছেন তাদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। সাহিত্যে দক্ষতা ও উৎকর্ষের পরিচয় দিয়েছেন আবদুল হামিদ আল-কাতিব এবং ইবনুল মুকাফফা প্রমুখ। কবিতায় বাশশার ইবনে বুরদ ও আবু নুওয়াস প্রমুখ। এ সকল কবি ও সাহিত্যিক কাব্য ও গদ্যে নতুন আঙ্গিক ও শৈলী, অভিব্যক্তি এবং প্রভূত কল্পনা ও চিন্তার বিস্তার ঘটিয়েছেন। আব্বাসি যুগে ইসলামি জ্ঞানের বিভিন্ন শাস্ত্রে জ্ঞানচর্চা ও গ্রন্থরচনার বিপ্লব ঘটেছে। একইভাবে ভিনদেশি ভাষা থেকে অজস্র গ্রন্থ আরবি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
পারসিক দেশগুলোর জাতি-গোষ্ঠীর অবদানের মতো প্রাচ্যীয় সভ্য জাতি- গোষ্ঠীর মধ্যে ভারতীয় ও অন্যদের অবদানও রয়েছে ইসলামি সভ্যতায়। তা-ও জ্ঞানগত বিপ্লবের পথ ধরেই এসেছে। (১০৫)
উল্লেখ্য যে, এ সকল নতুন ইসলামি জাতি-গোষ্ঠীর সন্তানদের বিকাশ, উৎকর্ষ ও অবদান কেবল ধর্মীয় জ্ঞান ও আরবি ভাষার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং জীবনঘনিষ্ঠ জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও তারা উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন এবং শিখর স্পর্শ করেছিলেন। যেমন চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, বীজগণিত, প্রকৌশল ইত্যাদি। যা ইসলামি সভ্যতার বিনির্মাণ ও গঠনে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে এবং ইসলামি সভ্যতাকে অভাবিতরূপে সমৃদ্ধ করেছে। এ সকল জ্ঞানী মনীষীদের মধ্যে রয়েছেন আল-খাওয়ারিজমি, ইবনে সিনা ও আল-বিরুনি।
ইমাম যুহরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হিশাম ইবনে আবদুল মালিক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, মক্কার নেতৃত্ব দেন কে? আমি বললাম, আতা ইবনে রাবাহ। তিনি বললেন, আর ইয়ামেনে কে? আমি বললাম, তাউস ইবনে কায়সান। তিনি বললেন, শামবাসীদের মধ্যে কে? আমি বললাম, মাকহুল। তিনি বললেন, আর মিশরবাসীদের মধ্যে কে? আমি বললাম, ইয়াযিদ ইবনে আবু হাবিব। তিনি বললেন, জাযিরাতুল আরবের বাসিন্দাদের মধ্যে কে? আমি বললাম, মাইমুন ইবনে মিহরান। তিনি বললেন, খুরাসানবাসীদের মধ্যে কে? আমি বললাম, দাহহাক ইবনে মুযাহিম। তিনি বললেন, আর বসরায় কে? আমি বললাম, হাসান ইবনে আবুল হাসান (হাসান বসরি)। তিনি বললেন, কুফায় কে নেতৃত্ব দেন? আমি বললাম, ইবরাহিম নাখয়ি।
ইমাম যুহরি উল্লেখ করেছেন যে, হিশাম ইবনে আবদুল মালিক প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে জিজ্ঞেস করেছেন, তিনি কি আরব না আযাদকৃত দাস? তিনি বলেছেন, তারা সবাই আযাদকৃত দাস। কথোপকথন শেষ হলে হিশাম বললেন, হে যুহরি, আল্লাহর কসম! আযাদকৃত দাসেরা আরবদের ওপর নেতৃত্ব দিচ্ছে। এমনকি তারা মিম্বরে বসে আরবদের উদ্দেশে বক্তৃতা করে, আর আরবরা নিচে বসে থাকে। ইমাম যুহরি বলেন, আমি বললাম, হে আমিরুল মুমিনিন! তা হলো আল্লাহর হুকুম ও তাঁর দ্বীন। যারা তাঁর হুকুম ও দ্বীনের হেফাজত করবে তারা নেতৃত্ব দেবে এবং যারা বিনষ্ট করবে তাদের পতন ঘটবে।
ইসলামি সভ্যতা হলো ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন জাতি অর্থাৎ পারসিক, রোমান, গ্রিক, ভারতীয়, তুর্কি, স্প্যানিশ জাতির সম্মিলিত ফসল। তারা ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হয়েছিল এবং তাদের ভূমিকা পালন করে এই বিশাল অবয়বের জন্য শক্তির উৎস নির্মাণ করেছিল। তারা কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার বিস্তার ঘটিয়েছিল, যা ছিলো মুসলিম উম্মাহ ও তার সভ্যতা এবং মুসলিম উম্মাহর বিপুল বিস্তৃত ইতিহাসের উত্তরাধিকার।
প্রত্যেক সভ্যতা একটিমাত্র জাতি ও একটিমাত্র মানবগোষ্ঠীর প্রতিভাবান সন্তানদের নিয়ে গর্ব করতে পেরেছে। ইসলামি সভ্যতার কথা ভিন্ন। যে-সকল জাতি ও গোষ্ঠীর ওপর ইসলামের পতাকা উড়েছে তাদের যে-সকল প্রতিভাবান ইসলামি সভ্যতার অট্টালিকাকে নির্মাণ করেছে তাদের সবাইকে নিয়ে মুসলিম উম্মাহ গর্ব করে। এখানে পারসিকদের পাশে আরবরা অবস্থান করেছে। একদিকে আমরা পাই ইমাম আবু হানিফা রহ., ইমাম মালিক রহ., ইমাম শাফিয়ি রহ., ইমাম আহমাদ রহ. (চার ফিকহি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতাগণ)-কে, অন্যদিকে পাই খলিল ও সিবওয়াইহ (ভাষার স্থপতিগণ) এবং আরও অনেককে, যাদের জাতিসত্তা ভিন্ন, দেশ ভিন্ন। তাদের পরিচয় একটাই, তারা মুসলিম মনীষী। তাদের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই মানবজাতি পেয়েছে ইসলামি সভ্যতা, যা মানুষের বিশুদ্ধ চিন্তার শ্রেষ্ঠ ফসল। (১০৬)
এমনই ইসলামি সভ্যতার স্বভাব ও প্রকৃতি, যা এক অনন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। তা জ্ঞান ও মহানুভবতার দ্বারা পৃথিবী আলোকিত করেছে।
ইসলামি সভ্যতার ছায়ায় যারা বসবাস করে তাদের সবাইকে তা আপন করে নিয়েছে, ফলে তাদের প্রত্যেকেই ইসলামি সভ্যতাকে নতুন নতুন দিক থেকে উপকৃত করেছে এবং তাকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলেছে।

টিকাঃ
১০৩. সুরা হুজুরাত: আয়াত ১৩।
১০৪. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৬৭।
১০৫. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৬৭, ৬৮।
১০৬. মুস্তাফা আস-সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ৩৬, ৩৭ (কিছু সংক্ষিপ্ত আকারে)।

ইসলাম স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে সকল জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে বিশ্ব মানবসংহতি ঘোষণা করেছে। তা সত্য, কল্যাণ ও সৌজন্যবোধের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَابِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ)
হে মানুষ, তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকি। (১০৩)
এ কারণেই ইসলাম ইসলামি বিজয়গুলোর পর বিভিন্ন মুসলিম জাতির মধ্যে সম্প্রীতি সৃষ্টি করেছে, বিভিন্ন গোষ্ঠী ও বংশধারার মধ্যে মিলন সৃষ্টি করেছে। প্রতিটি জাতি ও গোষ্ঠীর সভ্যতার ঐতিহ্য ছিল, জ্ঞানগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা ছিল। আর এগুলো ছিল একটি অনন্য সভ্যতা নির্মাণের কার্যকারণ, যেখানে মানবিক ও স্বভাবগত শক্তি ও প্রতিভার বৈচিত্র্য ছিল। আর মুসলিম জাতি-গোষ্ঠী ও বংশের জ্ঞানগত সাংস্কৃতিক মানবিক শক্তি ও প্রতিভার বৈচিত্র্যের সমন্বিত রূপই হলো ইসলামি সভ্যতা।
শাস্ত্রীয়, সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানগত যে বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা, যা উপভোগ করছিল ইসলামি বিশ্বের পারসিক ও তুর্কির মতো কিছু জাতি, তা ইসলামি সভ্যতা বিনির্মাণে যুগপৎ সাহায্য করেছে এবং এক উৎকর্ষপূর্ণ বিশাল মানবসভ্যতা নির্মাণে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হয়েছে। এ কারণে ইসলামি বিশ্বের জাতি-গোষ্ঠীর বিচিত্রতা ও বহুরূপতা ইসলামি সভ্যতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি এবং সমৃদ্ধিকরণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিরূপে বিবেচিত হয়।
আমরা উদাহরণ হিসেবে পারস্যসাম্রাজ্যের কথা আলোচনা করতে পারি। আল্লাহ তাআলা যখন তা মুসলিমদের জন্য বিজিত করলেন, মুসলিমদের সঙ্গে পারস্যবাসীর সংমিশ্রণ ঘটল। তারা মুসলিমদের থেকে ইসলামধর্মের সৌন্দর্য, সৌজন্য ও মহানুভবতার অনেককিছু শিখল। তারা জানল যে ইসলাম হলো ভ্রাতৃত্ব, সমতা, ভালোবাসা, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহানুভূতি এবং একে অপরকে প্রাধান্য দেওয়ার ধর্ম। ফলে তারা আল্লাহর দ্বীন ইসলামে দলে দলে প্রবেশ করল। আরবি ভাষা শিক্ষা ও এ ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য আগ্রহী হয়ে উঠল। কারণ আরবি ভাষা তাদের ধর্মের ভাষা, যে ধর্মকে তারা ভালোবেসেছে, আলিঙ্গন করেছে। আরবি ভাষা তাদেরকে এই ধর্ম বুঝতে ও অনুধাবন করতে সাহায্য করেছে। (১০৪) এই ধর্ম ও তার ভাষার প্রতি তাদের ভালোবাসা এই দুটির ক্ষেত্রে অবদান রাখতে তাদেরকে উৎসাহিত করেছে। ফলে অনতিকাল পরেই তারা জ্ঞান-আন্দোলন ও গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে, বরং এ দুটির ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিয়েছে। ইসলামি সভ্যতা তা থেকে পর্যাপ্ত উপকার লাভ করেছে। যেমন:
এক. ইসলামি সভ্যতার কতিপয় দিক ব্যক্ত করার জন্য কিছু শব্দ রয়েছে। তার সমার্থক শব্দ আরবি ভাষায় ছিল না। তখন ওই শব্দগুলোকেই আরবি ভাষায় আত্তীকরণ করা হয়। ফলে শব্দগুলো আরবি ভাষার শরীরে প্রবেশ করে। এর মধ্যে রয়েছে দিওয়ান (دیوان) ও বিমারিস্তান (بیمارستان) তথা, দফতর ও হাসপাতাল।
দুই. আরবি ভাষাজ্ঞান ও ইসলামি জ্ঞানের ময়দানে পারস্য থেকে বহু ক্ষণজন্মা প্রতিভা ও মনীষার জন্ম হয়েছে। হাদিসশাস্ত্রে শিখরে পৌঁছেছেন হাসান বসরি রহ., মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন রহ., আবু আবদুল্লাহ বুখারি রহ. প্রমুখ। হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে তারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন। ফিকহশাস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন দুই ইমাম, ইমাম আবু হানিফা রহ. ও ইমাম লাইস ইবনে সাদ রহ.। তারা দুইজন এবং তাদের মতো আরও যারা রয়েছেন তাদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। সাহিত্যে দক্ষতা ও উৎকর্ষের পরিচয় দিয়েছেন আবদুল হামিদ আল-কাতিব এবং ইবনুল মুকাফফা প্রমুখ। কবিতায় বাশশার ইবনে বুরদ ও আবু নুওয়াস প্রমুখ। এ সকল কবি ও সাহিত্যিক কাব্য ও গদ্যে নতুন আঙ্গিক ও শৈলী, অভিব্যক্তি এবং প্রভূত কল্পনা ও চিন্তার বিস্তার ঘটিয়েছেন। আব্বাসি যুগে ইসলামি জ্ঞানের বিভিন্ন শাস্ত্রে জ্ঞানচর্চা ও গ্রন্থরচনার বিপ্লব ঘটেছে। একইভাবে ভিনদেশি ভাষা থেকে অজস্র গ্রন্থ আরবি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
পারসিক দেশগুলোর জাতি-গোষ্ঠীর অবদানের মতো প্রাচ্যীয় সভ্য জাতি- গোষ্ঠীর মধ্যে ভারতীয় ও অন্যদের অবদানও রয়েছে ইসলামি সভ্যতায়। তা-ও জ্ঞানগত বিপ্লবের পথ ধরেই এসেছে। (১০৫)
উল্লেখ্য যে, এ সকল নতুন ইসলামি জাতি-গোষ্ঠীর সন্তানদের বিকাশ, উৎকর্ষ ও অবদান কেবল ধর্মীয় জ্ঞান ও আরবি ভাষার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং জীবনঘনিষ্ঠ জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও তারা উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন এবং শিখর স্পর্শ করেছিলেন। যেমন চিকিৎসা, জ্যোতির্বজ্ঞান, বীজগণিত, প্রকৌশল ইত্যাদি। যা ইসলামি সভ্যতার বিনির্মাণ ও গঠনে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে এবং ইসলামি সভ্যতাকে অভাবিতরূপে সমৃদ্ধ করেছে। এ সকল জ্ঞানী মনীষীদের মধ্যে রয়েছেন আল-খাওয়ারিজমি, ইবনে সিনা ও আল-বিরুনি।
ইমাম যুহরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হিশাম ইবনে আবদুল মালিক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, মক্কার নেতৃত্ব দেন কে? আমি বললাম, আতা ইবনে রাবাহ। তিনি বললেন, আর ইয়ামেনে কে? আমি বললাম, তাউস ইবনে কায়সান। তিনি বললেন, শামবাসীদের মধ্যে কে? আমি বললাম, মাকহুল। তিনি বললেন, আর মিশরবাসীদের মধ্যে কে? আমি বললাম, ইয়াযিদ ইবনে আবু হাবিব। তিনি বললেন, জাযিরাতুল আরবের বাসিন্দাদের মধ্যে কে? আমি বললাম, মাইমুন ইবনে মিহরান। তিনি বললেন, খুরাসানবাসীদের মধ্যে কে? আমি বললাম, দাহহাক ইবনে মুযাহিম। তিনি বললেন, আর বসরায় কে? আমি বললাম, হাসান ইবনে আবুল হাসান (হাসান বসরি)। তিনি বললেন, কুফায় কে নেতৃত্ব দেন? আমি বললাম, ইবরাহিম নাখয়ি।
ইমাম যুহরি উল্লেখ করেছেন যে, হিশাম ইবনে আবদুল মালিক প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে জিজ্ঞেস করেছেন, তিনি কি আরব না আযাদকৃত দাস? তিনি বলেছেন, তারা সবাই আযাদকৃত দাস। কথোপকথন শেষ হলে হিশাম বললেন, হে যুহরি, আল্লাহর কসম! আযাদকৃত দাসেরা আরবদের ওপর নেতৃত্ব দিচ্ছে। এমনকি তারা মিম্বরে বসে আরবদের উদ্দেশে বক্তৃতা করে, আর আরবরা নিচে বসে থাকে। ইমাম যুহরি বলেন, আমি বললাম, হে আমিরুল মুমিনিন! তা হলো আল্লাহর হুকুম ও তাঁর দ্বীন। যারা তাঁর হুকুম ও দ্বীনের হেফাজত করবে তারা নেতৃত্ব দেবে এবং যারা বিনষ্ট করবে তাদের পতন ঘটবে।
ইসলামি সভ্যতা হলো ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন জাতি অর্থাৎ পারসিক, রোমান, গ্রিক, ভারতীয়, তুর্কি, স্প্যানিশ জাতির সম্মিলিত ফসল। তারা ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হয়েছিল এবং তাদের ভূমিকা পালন করে এই বিশাল অবয়বের জন্য শক্তির উৎস নির্মাণ করেছিল। তারা কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার বিস্তার ঘটিয়েছিল, যা ছিলো মুসলিম উম্মাহ ও তার সভ্যতা এবং মুসলিম উম্মাহর বিপুল বিস্তৃত ইতিহাসের উত্তরাধিকার।
প্রত্যেক সভ্যতা একটিমাত্র জাতি ও একটিমাত্র মানবগোষ্ঠীর প্রতিভাবান সন্তানদের নিয়ে গর্ব করতে পেরেছে। ইসলামি সভ্যতার কথা ভিন্ন। যে-সকল জাতি ও গোষ্ঠীর ওপর ইসলামের পতাকা উড়েছে তাদের যে-সকল প্রতিভাবান ইসলামি সভ্যতার অট্টালিকাকে নির্মাণ করেছে তাদের সবাইকে নিয়ে মুসলিম উম্মাহ গর্ব করে। এখানে পারসিকদের পাশে আরবরা অবস্থান করেছে। একদিকে আমরা পাই ইমাম আবু হানিফা রহ., ইমাম মালিক রহ., ইমাম শাফিয়ি রহ., ইমাম আহমাদ রহ. (চার ফিকহি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতাগণ)-কে, অন্যদিকে পাই খলিল ও সিবওয়াইহ (ভাষার স্থপতিগণ) এবং আরও অনেককে, যাদের জাতিসত্তা ভিন্ন, দেশ ভিন্ন। তাদের পরিচয় একটাই, তারা মুসলিম মনীষী। তাদের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই মানবজাতি পেয়েছে ইসলামি সভ্যতা, যা মানুষের বিশুদ্ধ চিন্তার শ্রেষ্ঠ ফসল। (১০৬)
এমনই ইসলামি সভ্যতার স্বভাব ও প্রকৃতি, যা এক অনন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। তা জ্ঞান ও মহানুভবতার দ্বারা পৃথিবী আলোকিত করেছে।
ইসলামি সভ্যতার ছায়ায় যারা বসবাস করে তাদের সবাইকে তা আপন করে নিয়েছে, ফলে তাদের প্রত্যেকেই ইসলামি সভ্যতাকে নতুন নতুন দিক থেকে উপকৃত করেছে এবং তাকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলেছে।

টিকাঃ
১০৩. সুরা হুজুরাত: আয়াত ১৩।
১০৪. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৬৭।
১০৫. আবু যায়দ শালবি, তারিখুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা ওয়াল-ফিকরিল ইসলামি, পৃ. ৬৭, ৬৮।
১০৬. মুস্তাফা আস-সিবায়ি, মিন রাওয়ায়িয়ি হাদারাতিনা, পৃ. ৩৬, ৩৭ (কিছু সংক্ষিপ্ত আকারে)।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 অন্য জাতি-গোষ্ঠীর প্রতি উদারপন্থা অবলম্বন

📄 অন্য জাতি-গোষ্ঠীর প্রতি উদারপন্থা অবলম্বন


বিশ্বের যে-সকল জাতি-গোষ্ঠী ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হয়েছিল তারা ছিল মানবসভ্যতার সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ও উপাদান। একইভাবে অতীত যুগের জাতিগুলোর নির্মিত সভ্যতা-সংস্কৃতি ও তা থেকে উপকার লাভের ক্ষেত্রে মুসলিমদের উদারপন্থা গ্রহণও ছিল ইসলামি সভ্যতা ও তার বিপ্লবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ও সহায়ক।
মানবেতিহাসে প্রথমবারের মতো মুসলিমগণই অন্যান্য সভ্যতার প্রতি উদারপন্থা গ্রহণ এবং পূর্ববর্তী মানবমণ্ডলীর প্রচেষ্টাফল থেকে ঋণ গ্রহণের নীতিমালাগুলোর বাস্তবিক প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন এই উদারনীতির প্রবক্তা। এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সংকীর্ণতামুক্ত, পক্ষপাতিত্বহীন। তিনি সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-কে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য হারিস ইবনে কালাদাহ আস-সাকাফির কাছে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা ছিল কত চমৎকার! তিনি ছিলেন একজন মুশরিক ডাক্তার। এতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো দোষ মনে করেননি। কারণ চিকিৎসা একটি জীবনমুখী জ্ঞান, যা গোটা মনুষ্যজাতির উত্তরাধিকার। সাদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার শুশ্রূষার জন্য এলেন। তিনি আমার বুকের ওপর তাঁর হাত রাখলেন। এমনকি আমার হৃৎপিণ্ডে তাঁর হাতের শীতলতা অনুভব করলাম। তারপর তিনি বললেন,
إِنَّكَ رَجُلٌ مَفْتُودُ ائْتِ الْحَارِثُ بْنَ كَلَدَةَ أَخَا ثَقِيفٍ فَإِنَّهُ رَجُلٌ يَتَطَبَّبُ فَلْيَأْخُذُ سَبْعَ تَمَرَاتٍ مِنْ عَجْوَةِ الْمَدِينَةِ فَلْيَجَأْهُنَّ بِنَوَاهُنَّ ثُمَّ لِيَلُدَكَ بِهِنَّ
তুমি হৃদ্রোগে আক্রান্ত। তুমি সাকিফ গোত্রের হারিস ইবনে কালাদাহর কাছে যাও। সে একজন চিকিৎসক। (পরে আবার বললেন,) সে যেন মদিনার সাতটি আজওয়া খেজুর বিচিসহ পিষে তোমার মুখের মধ্যে ঢেলে দেয়। (১০৭)
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়দ ইবনে সাবিত রা.-কে সুরয়ানি ভাষা (Syriac language) শেখার জন্য যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা কত চমৎকার! তিনি ষাট দিনে সুরয়ানি ভাষা শিখেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি ফারসি ও রোমান (লাতিন) ভাষাও শিখেছিলেন।
এই ধারা পরবর্তী সময়ে মুসলিমদের ইতিহাসে স্পষ্টভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাদের দায়িত্ব ছিল পৃথিবীর পূর্বে ও পশ্চিমে ইসলামের পয়গাম পৌছে দেওয়া। তাই তারা এই পয়গাম ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য জাযিরাতুল আরব থেকে বেরিয়ে বিপুল বিশ্বের অভিমুখে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাদের সাক্ষাৎ ও পরিচয় ঘটেছিল নতুন নতুন সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে। তারা সেসব সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেননি বা বিলোপ ঘটাননি। বরং সেগুলোর পাঠ গ্রহণ করেছিলেন এবং উপকারিতা লাভ করেছেন। যা কল্যাণকর ছিল এবং তাদের সত্য দ্বীনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল তা গ্রহণ করেছিলেন। একটা সময় ছিল যখন গ্রিক সভ্যতা তার সন্তানদের ছাড়া অন্যকাউকে কিছু শিক্ষা দেয়নি এবং গ্রিক জ্ঞানী-মনীষী ছাড়া অন্যকারও থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি। পারসিক, ভারতীয় ও চৈনিক সভ্যতাও ছিল অনুরূপ। সম্ভবত কিছুকাল পর্যন্ত এসব সভ্যতার ক্ষেত্রে এই অবস্থা অবশিষ্ট ছিল। যেমন চৈনিক ও ভারতীয় সভ্যতা।
তবে মুসলিমগণ খুব দ্রুতই অন্যদের জ্ঞান ও চিন্তারাশি ভাষান্তরিত করার আন্দোলন সূচিত করেন। খালিদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে মুআবিয়া আল-উমাবি (১০৮) ছিলেন এই আন্দোলনের অগ্রপথিক। তিনি গ্রিক জ্ঞান ও চিন্তা আরবি ভাষায় রূপান্তরিত করার কাজ শুরু করেন। এ সকল জ্ঞান ও তাদের বিকশিত ধারা থেকে উপকৃত হন। বিশেষ করে ওষুধশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র ও রসায়নশাস্ত্র-সংক্রান্ত সমীকরণের জ্ঞান লাভ করেন।
উমাইয়া খেলাফত স্থায়িত্ব লাভ করল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করল। পারসিক ও রোমান রাজ্যগুলোর পতনের পর অনারবদের জ্ঞানের উত্তরাধিকার লাভ করল। তারপর মনোযোগ চিন্তার আন্দোলনের প্রতি নিবদ্ধ হলো। ফলে গ্রিক ও পারসিক সভ্যতাসহ পূর্ববর্তী সভ্যতাসমূহের বিপুল গ্রন্থ ও জ্ঞানভান্ডার আরবি ভাষায় রূপান্তরিত হলো। সভ্যতার প্রেক্ষিত বিবেচনায় তা ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ তা বিশাল বাতায়ন খুলে দিয়েছিল, যার মধ্য দিয়ে আরব ও মুসলিম জ্ঞানানুরাগীগণ প্রথমবারের মতো বাইরের জগতের জ্ঞানবিজ্ঞানের দিকে চোখ মেলে তাকান।
ভাষান্তরিত জ্ঞানরাশির মধ্যে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান বিশেষ সমাদর লাভ করে। এগুলোর শীর্ষস্থানে ছিল চিকিৎসাশাস্ত্র। এই যুগবিভাজনের আগে ইসলামি চিকিৎসাশাস্ত্র নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশনা ও ভেষজ ওষুধের ওপর নির্ভরশীল ছিল। যেমন সেঁক দেওয়া, রক্তমোক্ষণ (bloodletting) করা, শিঙা লাগানো, খতনা করা ও ছোট-বড় অস্ত্রোপচার করা। মুসলিম ও আরব চিকিৎসকগণ আলেকজান্দ্রিয়া মাদরাসা ও জুনদাইসাপুর (১০৯) মাদরাসার পাঠ্যসূচির সাহায্যে গ্রিক চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে পরিচিত হলেন এবং এর ফলে চিকিৎসাশাস্ত্রের গ্রন্থসমূহ আরবি ভাষায় রূপান্তরিত করার কাজে ব্রতী হলেন। (১১০) এই ক্ষেত্রে সে সময়ে তথা খলিফা মারওয়ান বিন হাকামের শাসনামলে (৬৪-৬৫ হিজরিতে) শ্রেষ্ঠ অনুবাদক ছিলেন মাসারজাওয়াইহ। (Masarjawaih)। তিনি ছিলেন ইহুদি ধর্মাবলম্বী এবং খলিফা মারওয়ান ইবনে হাকামের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। তিনি আল-কুন্নাশ (الكناش) নামে একটি গ্রিক চিকিৎসা বিশ্বকোষ আরবি ভাষায় রূপান্তরিত করেছিলেন। (১১১)
আব্বাসি খিলাফতকালে, বিশেষ করে পঞ্চম খলিফা হারুনুর রশিদের শাসনামলে (১৭০-১৯৪ হিজরি) অনুবাদ-কর্মকাণ্ড বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তিনি বাইতুল হিকমাহ নামে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিকট প্রাচ্য ও কনস্টান্টিনোপল থেকে আরবি ভাষায় অনূদিত গ্রন্থসমূহ দ্বারা তা সমৃদ্ধ করে তোলেন। সপ্তম আব্বাসি খলিফা মামুনও (১৯৮-২১৮ হিজরি) বাইতুল হিকমাহর ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বারোপ করেন এবং অনুবাদকদের ভাতা বাড়িয়ে দেন। তিনি বিভিন্ন শাখার জ্ঞানবিজ্ঞানের গ্রিক রচনাবলি যতদূর সম্ভব সংগ্রহ করার জন্য কনস্টান্টিনোপলে প্রতিনিধিদল পাঠাতে শুরু করেন। মুসলিম খলিফাগণ অন্যান্য রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যেসব চুক্তি করতেন তার অধিকাংশের ক্ষেত্রে এই শর্তারোপ করা হতো যে, মুসলিম জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরা গির্জায় ও বাইজান্টাইনীয় প্রাসাদসমূহে যে-সকল গ্রন্থাগার রয়েছে সেগুলোতে প্রবেশ করতে পারবেন এবং সেখানে সংরক্ষিত গ্রন্থরাশির অনুবাদ করতে পারবেন। এমনকি মাঝে মাঝে খলিফাগণ গ্রন্থের দ্বারা বন্দি বিনিময়ও করতেন। (১১২)
ইবনে নাদিম (মৃ. ৯৯৫/৯৯৬) তার আল-ফিহরিসত গ্রন্থে অনুবাদক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, প্রকৌশলী ও জ্যোতির্বিদদের জন্য প্রায় সত্তরটি ভুক্তি রচনা করেছেন। তাদের জীবৎকালের বিস্তৃতি ছিল হিজরি তৃতীয় ও চতুর্থ শতক। যাদের অধিকাংশ ছিলেন সুরয়ানি অথবা পারসিক ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম। এটা এই উদ্যোগ ও তার প্রভাবের গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে, তা হলো ইসলামি জ্ঞান-সভ্যতা বিনির্মাণ ও সমৃদ্ধিকরণে অমুসলিমদের ব্যাপারে এবং ইসলামপূর্ব যুগের প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উদার ও উন্মুক্ত নীতি গ্রহণ।
এখানে উল্লেখ্য যে, অন্যদের প্রতি মুসলিমদের এই উদারনীতি অন্ধ বা অজ্ঞতাপূর্ণ ছিল না। সিংহভাগ ক্ষেত্রে তা ছিল মুসলিমদের মূল্যবোধ ও নীতিনৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তাদের সত্যধর্মের অনুকূল। গ্রিক সভ্যতার ক্ষেত্রে তারা উদারনীতি গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তারা তাদের আইনকানুন গ্রহণ করেননি এবং গ্রিক মহাকাব্য ইলিয়াডের অনুবাদ করেননি। উচ্চাঙ্গের পৌত্তলিক গ্রিক সাহিত্যেরও অনুবাদ করেননি। বরং তারা তথ্য-পুস্তক নথিভুক্তকরণের জ্ঞানলাভ এবং পদার্থবিজ্ঞানের অনুবাদকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। তারা পারসিক সভ্যতার প্রতি উদারনীতি গ্রহণ করেছেন, কিন্তু সযত্নে তাদের ধ্বংসাত্মক ধর্মাদর্শ এড়িয়ে গেছেন। তবে পারসিক সাহিত্য ও তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জ্ঞান ঋণ করেছেন। তারা ভারতীয় সভ্যতার প্রতি উদারনীতি গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তাদের দর্শন ও ধর্মাদর্শকে পাশ কাটিয়ে গেছেন। তাদের গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যা গ্রহণ করেছেন; তারা এ সকল জ্ঞানের সংরক্ষণ করেছেন, উন্নতি ও বিকাশ ঘটিয়েছেন এবং অনেককিছু সংযুক্ত করেছেন।
তা ছাড়া মুসলিমগণ অন্য সভ্যতা থেকে যা গ্রহণ করেছেন তা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও সৌন্দর্য বলে বিবেচিত হয়েছে। কেউ এটাকে দোষ বলে গণ্য করেনি। অর্থাৎ, এতে মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ সাধিত হয়েছে এবং তাদের মন ও মগজ অন্যদের জ্ঞানবিজ্ঞান গ্রহণের জন্য উন্মুখ হয়েছে।
মানবসভ্যতায় অবদানের বিষয়টি যাদের দ্বারা শুরু হয় তাদের দ্বারা শেষ হয় না; একজন শুরু করে, চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় অন্যরা। তারপর নতুন নতুন জিনিসের উদ্ভাবন ঘটে এবং পূর্ববর্তী সভ্যতায় শুরু হওয়া অগ্রযাত্রা পূর্ণতা পায়। যা আমরা আগামী অধ্যায়গুলোতে দেখতে পাব ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
১০৭. হাদিসটি থেকে প্রথমত এটা প্রমাণিত হয় যে, রোগের চিকিৎসা করা বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। যদিও সে অমুসলিম হয়। কারণ, হারিস ইবনে কালাদাহ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কি না তা নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা নেই। দ্বিতীয়ত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দান করে নিজেই তার ওষুধ নির্ণয় করেছেন। আর অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় যে, এটাও এক প্রকারের মহৌষধ। তবে পদ্ধতিগতভাবে প্রস্তুত করা চিকিৎসকের কাজ।-অনুবাদক সুনানে আবু দাউদ, কিতাব চিকিৎসা, বাব তামারাতুল আজওয়া: ৩৮৭৫। ইবনে হাজার আসকালানি হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। হেদায়াতুর রুওয়াত, খ. ৪, পৃ. ১৫৯। আবদুল হক আল-ইলবিলি আল-আহকামুস সুগরা গ্রন্থের ভূমিকাতে এ দিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, হাদিসটির সনদ সহিহ। আল-আহকামুস সুগরা, পৃ. ৮৩৭।
১০৮. খালিদ ইবনে ইয়াযিদ: আবু হাশিম খালিদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান আল-উমাবি আল-কুরাশি। জ্ঞানশাস্ত্রের ক্ষেত্রে কুরাইশ বংশের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী ছিলেন। তার ওষুধ ও কিমিয়া প্রস্তুতপ্রণালি-সংক্রান্ত বক্তব্য ও মতামত গুরুত্ব বহন করে। তিনি ৯০ হিজরিতে (৭০৮ খ্রিষ্টাব্দে) দামেশকে মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল ওয়াফায়াত, খ. ১৩, পৃ. ১৬৪-১৬৬।
১০৯. খুরাসানের একটি শহর।
১১০. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রুউওয়াদু ইলমিত তিব্ব ফিল-হাদারাতিল আরাবিয়্যাতি ওয়াল-ইসলামিয়্যা, পৃ. ৬৮।
১১১. তিনি এটিকে সুরয়ানি ভাষা থেকে রূপান্তরিত করেছিলেন। দেখুন, ইবনে আবি উসাইবিআ, উত্তুন সালাম কি তারাকাতিল আতিব্বা, খ. ১, পৃ. ১৬৩; শামসুদ্দিন আশ-শাহারযুরি, তারীখুল হুকামা, পৃ. ৮০।
১১২. এসিও তাব মির্ধারিসত, পৃ. ২৪৩। মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদা মুসলিমিন।
১১৩. সুগম্মাদ ইবনে ইসহাক আল-বাগদাদি, মৃ. ৪৩৮ হিজরি/১০৪৭ খ্রিষ্টাব্দ। তথ্য-সংগ্রাহক সাহিত্যিক শিয়া ও মুতাজিলা মতাদর্শী। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, লিসানুল মিযান, খ. ৩, পৃ. ৭৭; খাইরুদ্দিন আয-নিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ২৯। এনসিক্লোপেডিয়াবাদী নাদিম তার উপাধি, তার পিতার নয়। তাই তাকে ইবনে নাদিম না বলে নাসির এলাইয়া সংগাতো। এ বিষয়ে জানতে দেখুন, শাইখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ.-এর বারাকাতুল লিসানুল মিযান। খ. ৯ পৃ. ২১৪। সম্পাদক

বিশ্বের যে-সকল জাতি-গোষ্ঠী ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হয়েছিল তারা ছিল মানবসভ্যতার সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ও উপাদান। একইভাবে অতীত যুগের জাতিগুলোর নির্মিত সভ্যতা-সংস্কৃতি ও তা থেকে উপকার লাভের ক্ষেত্রে মুসলিমদের উদারপন্থা গ্রহণও ছিল ইসলামি সভ্যতা ও তার বিপ্লবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ও সহায়ক।
মানবেতিহাসে প্রথমবারের মতো মুসলিমগণই অন্যান্য সভ্যতার প্রতি উদারপন্থা গ্রহণ এবং পূর্ববর্তী মানবমণ্ডলীর প্রচেষ্টাফল থেকে ঋণ গ্রহণের নীতিমালাগুলোর বাস্তবিক প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন এই উদারনীতির প্রবক্তা। এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সংকীর্ণতামুক্ত, পক্ষপাতিত্বহীন। তিনি সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-কে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য হারিস ইবনে কালাদাহ আস-সাকাফির কাছে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা ছিল কত চমৎকার! তিনি ছিলেন একজন মুশরিক ডাক্তার। এতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো দোষ মনে করেননি। কারণ চিকিৎসা একটি জীবনমুখী জ্ঞান, যা গোটা মনুষ্যজাতির উত্তরাধিকার। সাদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার শুশ্রূষার জন্য এলেন। তিনি আমার বুকের ওপর তাঁর হাত রাখলেন। এমনকি আমার হৃৎপিণ্ডে তাঁর হাতের শীতলতা অনুভব করলাম। তারপর তিনি বললেন,
إِنَّكَ رَجُلٌ مَفْتُودُ ائْتِ الْحَارِثُ بْنَ كَلَدَةَ أَخَا ثَقِيفٍ فَإِنَّهُ رَجُلٌ يَتَطَبَّبُ فَلْيَأْخُذُ سَبْعَ تَمَرَاتٍ مِنْ عَجْوَةِ الْمَدِينَةِ فَلْيَجَأْهُنَّ بِنَوَاهُنَّ ثُمَّ لِيَلُدَكَ بِهِنَّ
তুমি হৃদ্রোগে আক্রান্ত। তুমি সাকিফ গোত্রের হারিস ইবনে কালাদাহর কাছে যাও। সে একজন চিকিৎসক। (পরে আবার বললেন,) সে যেন মদিনার সাতটি আজওয়া খেজুর বিচিসহ পিষে তোমার মুখের মধ্যে ঢেলে দেয়। (১০৭)
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়দ ইবনে সাবিত রা.-কে সুরয়ানি ভাষা (Syriac language) শেখার জন্য যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা কত চমৎকার! তিনি ষাট দিনে সুরয়ানি ভাষা শিখেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি ফারসি ও রোমান (লাতিন) ভাষাও শিখেছিলেন।
এই ধারা পরবর্তী সময়ে মুসলিমদের ইতিহাসে স্পষ্টভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাদের দায়িত্ব ছিল পৃথিবীর পূর্বে ও পশ্চিমে ইসলামের পয়গাম পৌছে দেওয়া। তাই তারা এই পয়গাম ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য জাযিরাতুল আরব থেকে বেরিয়ে বিপুল বিশ্বের অভিমুখে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাদের সাক্ষাৎ ও পরিচয় ঘটেছিল নতুন নতুন সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে। তারা সেসব সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেননি বা বিলোপ ঘটাননি। বরং সেগুলোর পাঠ গ্রহণ করেছিলেন এবং উপকারিতা লাভ করেছেন। যা কল্যাণকর ছিল এবং তাদের সত্য দ্বীনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল তা গ্রহণ করেছিলেন। একটা সময় ছিল যখন গ্রিক সভ্যতা তার সন্তানদের ছাড়া অন্যকাউকে কিছু শিক্ষা দেয়নি এবং গ্রিক জ্ঞানী-মনীষী ছাড়া অন্যকারও থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি। পারসিক, ভারতীয় ও চৈনিক সভ্যতাও ছিল অনুরূপ। সম্ভবত কিছুকাল পর্যন্ত এসব সভ্যতার ক্ষেত্রে এই অবস্থা অবশিষ্ট ছিল। যেমন চৈনিক ও ভারতীয় সভ্যতা।
তবে মুসলিমগণ খুব দ্রুতই অন্যদের জ্ঞান ও চিন্তারাশি ভাষান্তরিত করার আন্দোলন সূচিত করেন। খালিদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে মুআবিয়া আল-উমাবি (১০৮) ছিলেন এই আন্দোলনের অগ্রপথিক। তিনি গ্রিক জ্ঞান ও চিন্তা আরবি ভাষায় রূপান্তরিত করার কাজ শুরু করেন। এ সকল জ্ঞান ও তাদের বিকশিত ধারা থেকে উপকৃত হন। বিশেষ করে ওষুধশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র ও রসায়নশাস্ত্র-সংক্রান্ত সমীকরণের জ্ঞান লাভ করেন।
উমাইয়া খেলাফত স্থায়িত্ব লাভ করল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করল। পারসিক ও রোমান রাজ্যগুলোর পতনের পর অনারবদের জ্ঞানের উত্তরাধিকার লাভ করল। তারপর মনোযোগ চিন্তার আন্দোলনের প্রতি নিবদ্ধ হলো। ফলে গ্রিক ও পারসিক সভ্যতাসহ পূর্ববর্তী সভ্যতাসমূহের বিপুল গ্রন্থ ও জ্ঞানভান্ডার আরবি ভাষায় রূপান্তরিত হলো। সভ্যতার প্রেক্ষিত বিবেচনায় তা ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ তা বিশাল বাতায়ন খুলে দিয়েছিল, যার মধ্য দিয়ে আরব ও মুসলিম জ্ঞানানুরাগীগণ প্রথমবারের মতো বাইরের জগতের জ্ঞানবিজ্ঞানের দিকে চোখ মেলে তাকান।
ভাষান্তরিত জ্ঞানরাশির মধ্যে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান বিশেষ সমাদর লাভ করে। এগুলোর শীর্ষস্থানে ছিল চিকিৎসাশাস্ত্র। এই যুগবিভাজনের আগে ইসলামি চিকিৎসাশাস্ত্র নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশনা ও ভেষজ ওষুধের ওপর নির্ভরশীল ছিল। যেমন সেঁক দেওয়া, রক্তমোক্ষণ (bloodletting) করা, শিঙা লাগানো, খতনা করা ও ছোট-বড় অস্ত্রোপচার করা। মুসলিম ও আরব চিকিৎসকগণ আলেকজান্দ্রিয়া মাদরাসা ও জুনদাইসাপুর (১০৯) মাদরাসার পাঠ্যসূচির সাহায্যে গ্রিক চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে পরিচিত হলেন এবং এর ফলে চিকিৎসাশাস্ত্রের গ্রন্থসমূহ আরবি ভাষায় রূপান্তরিত করার কাজে ব্রতী হলেন। (১১০) এই ক্ষেত্রে সে সময়ে তথা খলিফা মারওয়ান বিন হাকামের শাসনামলে (৬৪-৬৫ হিজরিতে) শ্রেষ্ঠ অনুবাদক ছিলেন মাসারজাওয়াইহ। (Masarjawaih)। তিনি ছিলেন ইহুদি ধর্মাবলম্বী এবং খলিফা মারওয়ান ইবনে হাকামের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। তিনি আল-কুন্নাশ (الكناش) নামে একটি গ্রিক চিকিৎসা বিশ্বকোষ আরবি ভাষায় রূপান্তরিত করেছিলেন। (১১১)
আব্বাসি খিলাফতকালে, বিশেষ করে পঞ্চম খলিফা হারুনুর রশিদের শাসনামলে (১৭০-১৯৪ হিজরি) অনুবাদ-কর্মকাণ্ড বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তিনি বাইতুল হিকমাহ নামে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিকট প্রাচ্য ও কনস্টান্টিনোপল থেকে আরবি ভাষায় অনূদিত গ্রন্থসমূহ দ্বারা তা সমৃদ্ধ করে তোলেন। সপ্তম আব্বাসি খলিফা মামুনও (১৯৮-২১৮ হিজরি) বাইতুল হিকমাহর ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বারোপ করেন এবং অনুবাদকদের ভাতা বাড়িয়ে দেন। তিনি বিভিন্ন শাখার জ্ঞানবিজ্ঞানের গ্রিক রচনাবলি যতদূর সম্ভব সংগ্রহ করার জন্য কনস্টান্টিনোপলে প্রতিনিধিদল পাঠাতে শুরু করেন। মুসলিম খলিফাগণ অন্যান্য রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যেসব চুক্তি করতেন তার অধিকাংশের ক্ষেত্রে এই শর্তারোপ করা হতো যে, মুসলিম জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরা গির্জায় ও বাইজান্টাইনীয় প্রাসাদসমূহে যে-সকল গ্রন্থাগার রয়েছে সেগুলোতে প্রবেশ করতে পারবেন এবং সেখানে সংরক্ষিত গ্রন্থরাশির অনুবাদ করতে পারবেন। এমনকি মাঝে মাঝে খলিফাগণ গ্রন্থের দ্বারা বন্দি বিনিময়ও করতেন। (১১২)
ইবনে নাদিম (মৃ. ৯৯৫/৯৯৬) তার আল-ফিহরিসত গ্রন্থে অনুবাদক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, প্রকৌশলী ও জ্যোতির্বিদদের জন্য প্রায় সত্তরটি ভুক্তি রচনা করেছেন। তাদের জীবৎকালের বিস্তৃতি ছিল হিজরি তৃতীয় ও চতুর্থ শতক। যাদের অধিকাংশ ছিলেন সুরয়ানি অথবা পারসিক ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম। এটা এই উদ্যোগ ও তার প্রভাবের গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে, তা হলো ইসলামি জ্ঞান-সভ্যতা বিনির্মাণ ও সমৃদ্ধিকরণে অমুসলিমদের ব্যাপারে এবং ইসলামপূর্ব যুগের প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উদার ও উন্মুক্ত নীতি গ্রহণ।
এখানে উল্লেখ্য যে, অন্যদের প্রতি মুসলিমদের এই উদারনীতি অন্ধ বা অজ্ঞতাপূর্ণ ছিল না। সিংহভাগ ক্ষেত্রে তা ছিল মুসলিমদের মূল্যবোধ ও নীতিনৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তাদের সত্যধর্মের অনুকূল। গ্রিক সভ্যতার ক্ষেত্রে তারা উদারনীতি গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তারা তাদের আইনকানুন গ্রহণ করেননি এবং গ্রিক মহাকাব্য ইলিয়াডের অনুবাদ করেননি। উচ্চাঙ্গের পৌত্তলিক গ্রিক সাহিত্যেরও অনুবাদ করেননি। বরং তারা তথ্য-পুস্তক নথিভুক্তকরণের জ্ঞানলাভ এবং পদার্থবিজ্ঞানের অনুবাদকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। তারা পারসিক সভ্যতার প্রতি উদারনীতি গ্রহণ করেছেন, কিন্তু সযত্নে তাদের ধ্বংসাত্মক ধর্মাদর্শ এড়িয়ে গেছেন। তবে পারসিক সাহিত্য ও তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জ্ঞান ঋণ করেছেন। তারা ভারতীয় সভ্যতার প্রতি উদারনীতি গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তাদের দর্শন ও ধর্মাদর্শকে পাশ কাটিয়ে গেছেন। তাদের গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যা গ্রহণ করেছেন; তারা এ সকল জ্ঞানের সংরক্ষণ করেছেন, উন্নতি ও বিকাশ ঘটিয়েছেন এবং অনেককিছু সংযুক্ত করেছেন।
তা ছাড়া মুসলিমগণ অন্য সভ্যতা থেকে যা গ্রহণ করেছেন তা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও সৌন্দর্য বলে বিবেচিত হয়েছে। কেউ এটাকে দোষ বলে গণ্য করেনি। অর্থাৎ, এতে মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ সাধিত হয়েছে এবং তাদের মন ও মগজ অন্যদের জ্ঞানবিজ্ঞান গ্রহণের জন্য উন্মুখ হয়েছে।
মানবসভ্যতায় অবদানের বিষয়টি যাদের দ্বারা শুরু হয় তাদের দ্বারা শেষ হয় না; একজন শুরু করে, চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় অন্যরা। তারপর নতুন নতুন জিনিসের উদ্ভাবন ঘটে এবং পূর্ববর্তী সভ্যতায় শুরু হওয়া অগ্রযাত্রা পূর্ণতা পায়। যা আমরা আগামী অধ্যায়গুলোতে দেখতে পাব ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
১০৭. হাদিসটি থেকে প্রথমত এটা প্রমাণিত হয় যে, রোগের চিকিৎসা করা বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। যদিও সে অমুসলিম হয়। কারণ, হারিস ইবনে কালাদাহ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কি না তা নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা নেই। দ্বিতীয়ত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দান করে নিজেই তার ওষুধ নির্ণয় করেছেন। আর অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় যে, এটাও এক প্রকারের মহৌষধ। তবে পদ্ধতিগতভাবে প্রস্তুত করা চিকিৎসকের কাজ।-অনুবাদক সুনানে আবু দাউদ, কিতাব চিকিৎসা, বাব তামারাতুল আজওয়া: ৩৮৭৫। ইবনে হাজার আসকালানি হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। হেদায়াতুর রুওয়াত, খ. ৪, পৃ. ১৫৯। আবদুল হক আল-ইলবিলি আল-আহকামুস সুগরা গ্রন্থের ভূমিকাতে এ দিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, হাদিসটির সনদ সহিহ। আল-আহকামুস সুগরা, পৃ. ৮৩৭।
১০৮. খালিদ ইবনে ইয়াযিদ: আবু হাশিম খালিদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান আল-উমাবি আল-কুরাশি। জ্ঞানশাস্ত্রের ক্ষেত্রে কুরাইশ বংশের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী ছিলেন। তার ওষুধ ও কিমিয়া প্রস্তুতপ্রণালি-সংক্রান্ত বক্তব্য ও মতামত গুরুত্ব বহন করে। তিনি ৯০ হিজরিতে (৭০৮ খ্রিষ্টাব্দে) দামেশকে মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল ওয়াফায়াত, খ. ১৩, পৃ. ১৬৪-১৬৬।
১০৯. খুরাসানের একটি শহর।
১১০. আলি ইবনে আবদুল্লাহ দাফফা, রুউওয়াদু ইলমিত তিব্ব ফিল-হাদারাতিল আরাবিয়্যাতি ওয়াল-ইসলামিয়্যা, পৃ. ৬৮।
১১১. তিনি এটিকে সুরয়ানি ভাষা থেকে রূপান্তরিত করেছিলেন। দেখুন, ইবনে আবি উসাইবিআ, উত্তুন সালাম কি তারাকাতিল আতিব্বা, খ. ১, পৃ. ১৬৩; শামসুদ্দিন আশ-শাহারযুরি, তারীখুল হুকামা, পৃ. ৮০।
১১২. এসিও তাব মির্ধারিসত, পৃ. ২৪৩। মুহাম্মাদ সাদিক আফিফি, তাতাওউরুল ফিকরিল ইলমি ইনদা মুসলিমিন।
১১৩. সুগম্মাদ ইবনে ইসহাক আল-বাগদাদি, মৃ. ৪৩৮ হিজরি/১০৪৭ খ্রিষ্টাব্দ। তথ্য-সংগ্রাহক সাহিত্যিক শিয়া ও মুতাজিলা মতাদর্শী। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, লিসানুল মিযান, খ. ৩, পৃ. ৭৭; খাইরুদ্দিন আয-নিরিকলি, আল-আ'লাম, খ. ৬, পৃ. ২৯। এনসিক্লোপেডিয়াবাদী নাদিম তার উপাধি, তার পিতার নয়। তাই তাকে ইবনে নাদিম না বলে নাসির এলাইয়া সংগাতো। এ বিষয়ে জানতে দেখুন, শাইখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ.-এর বারাকাতুল লিসানুল মিযান। খ. ৯ পৃ. ২১৪। সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00