📄 একনজরে ইসলামপূর্ব বিশ্ব
আমরা ইসলামপূর্ব বিশ্বের কয়েকটি বৃহৎ সভ্যতার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছি। এখন আমরা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বে বিশ্ব, মানবমণ্ডলী ও মানবতার কী অবস্থা ছিল তার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করব। তার থেকে যে সারমর্ম আমরা পাই তা এই যে, স্তূপীকৃত গভীর অমানিশা চূর্ণবিচূর্ণ করার এবং মানবতার স্কন্ধমূলে আটকে পড়া যন্ত্রণা-দুর্দশাকে দূরীভূত করার জন্য ইসলামের আলো ও ইসলামি সভ্যতার প্রয়োজন প্রকট ছিল।
ইসলামপূর্ব বিশ্বের মোটামুটি অবস্থার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস উদ্ধৃত করছি। ইয়ায ইবনে হিমার রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ نَظَرَ إِلَى أَهْلِ الْأَرْضِ فَمَقَتَهُمْ عَرَبَهُمْ وَعَجَمَهُمْ إِلَّا بَقَايَا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
আল্লাহ তাআলা জমিনের মানবমণ্ডলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন, তখন (তাদের চরম পথভ্রষ্টতার কারণে) কতিপয় আহলে কিতাব ব্যতীত আরব ও অনারব সকলের ওপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। (৮৫)
মানুষের অবস্থা অধঃপতনের এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তা তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার ঘৃণা ও ক্রোধকে আবশ্যক করে তুলেছিল। হাদিসে ব্যবহৃত (مقت) 'মাক্ত' শব্দটি প্রচণ্ড ঘৃণা বোঝায়। কতিপয় আহলে কিতাবের কথা বলতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক (بقايا) 'বাকায়া' শব্দের ব্যবহার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রতি ইঙ্গিত করে। যেন তারা বহু প্রাচীন যুগের নিদর্শন, বাস্তবিক মানবমণ্ডলীর মধ্যে তাদের কোনো মূল্য নেই। অন্যদিকে এই কতিপয় আহলে কিতাব কখনোই পরিপূর্ণ সমাজ গঠন করতে পারেননি, বরং তারা সমাজের মুষ্টিমেয় সদস্য বলেই গণ্য ছিলেন।
সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ. এ বিষয়ে সবিস্তার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীর বুকে না ছিল কোনো বোধসম্পন্ন বিবেকবান জাতি, না ছিল নীতিনৈতিকতা ও মর্যাদাবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সমাজ। দয়া ও ইনসাফের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো শাসনব্যবস্থা ছিল না, জ্ঞানসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান শাসকও ছিল না, নেতাও ছিল না। আর নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) আনীত বিশুদ্ধ ধর্ম একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল। (৮৬)
গোটা মানববিশ্বে পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, অধঃপতিত, বিনাশ-কবলিত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয়-জীবনের সব দিকে, সব ক্ষেত্রে সমানভাবে ফ্যাসাদ ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। দুনিয়াকে গ্রাস করেছিল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, মূর্খতা ও অজ্ঞতা দুনিয়ার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল, যা দুনিয়াকে কুসংস্কার, অলিক ধ্যানধারণার সংঘর্ষপূর্ণ সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছিল। মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও রিপুই ছিল দুনিয়ার পরিচালক। তাই মানুষ পাথরের, সূর্যের, চন্দ্রের, আগুনের, এমনকি পশুর পূজা করত। গোটা মানবগোষ্ঠী বিভক্ত হয়ে পড়েছিল দুইভাগে, শাসক শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। তারা এতিম ও অসহায়দের সম্পদ আত্মসাৎ করত, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করত। তাদের পারস্পরিক লেনদেনই ছিল হানাহানি, লুণ্ঠন, ছিনতাই, রাহাজানি। শুধু তাই নয়, অপরাধ, পাপাচার ও গর্হিত কাজ করে তারা গৌরববোধ করত। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো নিয়মনীতি বা আইন ছিল না, ছিল কেবল মাৎস্যন্যায়, পাশবিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং জোর যার মুলুক তার নীতি। শক্তিমানরা দুর্বলদের শোষণ ও উৎপীড়ন করত, ধনীরা গরিবদের দাস বানিয়ে রাখত। সবাই বন্দি ছিল দুর্ভেদ্য অন্ধকারে, যার কোনো শেষ ছিল না, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না।
এসব পরিস্থিতি মানবমণ্ডলীকে উদ্ভ্রান্ত, হতাশ, রিক্ত-নিঃস্ব বানিয়ে দিয়েছিল। তাদের অন্তরে ভীতি ও আশঙ্কা ছাড়া কিছুই ছিল না। তাদের জ্ঞান ও চিন্তায় ছিল কেবল শূন্যতা, অলিক জল্পনাকল্পনা। ইসলামি সভ্যতার পূর্বে এটাই ছিল বিশ্বের মানবমণ্ডলীর অবস্থা!
ইসলামপূর্ব বিশ্বে এটাই ছিল অবস্থা, বিশেষ করে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। বিশ্বসভ্যতাগুলো গুটিয়ে গিয়েছিল। সবকিছু ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়।
অধ্যাপক ডেনিসন এই অবস্থার চিত্রায়ণ করেছেন এভাবে,
খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে সভ্য পৃথিবী ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়, কারণ যেসব বিশ্বাস সভ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে সহায়ক ছিল সেগুলোর বিনাশ ঘটে। এসব বিশ্বাসের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো উপযোগী কিছুই ছিল না। চারহাজার বছরের চেষ্টার ফলে যে বৃহৎ নগর-সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তা ভেঙে পড়ার উপক্রম ছিল। মানবতা যে বর্বরতা ও অসভ্যতা থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেদিকেই ফিরে যেতে চাইছিল। গোত্রগুলো পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ করছিল, রক্তপাত ঘটাচ্ছিল। কোনো আইন ছিল না, কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। খ্রিষ্টীয় মতবাদের ফলে যেসব শাসনব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছিল সেগুলো ঐক্য ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বদলে বিচ্ছিন্নতা ও ভাঙনের আগুনে ঘি ঢালছিল। ফলে যে সভ্যতা বিপুল ডালপালাসমৃদ্ধ বিশাল বৃক্ষের মতো ছিল, যার ছায়া ছড়িয়ে ছিল গোটা বিশ্বের ওপর তা শীর্ণকায় হয়ে হেলছিল। এতে তার দিকে ধেয়ে আসে ধ্বংস, এমনকি তার মজ্জাটুকুও শেষ হয়ে যায়। (৮৭)
ইসলামি সভ্যতার উষার উন্মেষ ও আলো ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত এরূপ अवस्थাই বিরাজমান ছিল। ইসলামি সভ্যতা মানবতার একটি উপহার, মনুষ্য কুলের জন্য পথনির্দেশনা।
টিকাঃ
৮৫. মুসলিম, কিতাব : আল-জান্নাহ ওয়া সিফাতু নাইমিহা ওয়া আহলিহা, হাদিস নং ২৮৬৫।
৮৬. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৯১।
৮৭. জন হপকিন্স ডেনিসন, Emotion as the Basis of Civilization; আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ৬, পৃ. ৩৬-৩৭।
আমরা ইসলামপূর্ব বিশ্বের কয়েকটি বৃহৎ সভ্যতার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছি। এখন আমরা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বে বিশ্ব, মানবমণ্ডলী ও মানবতার কী অবস্থা ছিল তার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করব। তার থেকে যে সারমর্ম আমরা পাই তা এই যে, স্তূপীকৃত গভীর অমানিশা চূর্ণবিচূর্ণ করার এবং মানবতার স্কন্ধমূলে আটকে পড়া যন্ত্রণা-দুর্দশাকে দূরীভূত করার জন্য ইসলামের আলো ও ইসলামি সভ্যতার প্রয়োজন প্রকট ছিল।
ইসলামপূর্ব বিশ্বের মোটামুটি অবস্থার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস উদ্ধৃত করছি। ইয়ায ইবনে হিমার রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ نَظَرَ إِلَى أَهْلِ الْأَرْضِ فَمَقَتَهُمْ عَرَبَهُمْ وَعَجَمَهُمْ إِلَّا بَقَايَا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
আল্লাহ তাআলা জমিনের মানবমণ্ডলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন, তখন (তাদের চরম পথভ্রষ্টতার কারণে) কতিপয় আহলে কিতাব ব্যতীত আরব ও অনারব সকলের ওপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। (৮৫)
মানুষের অবস্থা অধঃপতনের এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তা তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার ঘৃণা ও ক্রোধকে আবশ্যক করে তুলেছিল। হাদিসে ব্যবহৃত (مقت) 'মাক্ত' শব্দটি প্রচণ্ড ঘৃণা বোঝায়। কতিপয় আহলে কিতাবের কথা বলতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক (بقايا) 'বাকায়া' শব্দের ব্যবহার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রতি ইঙ্গিত করে। যেন তারা বহু প্রাচীন যুগের নিদর্শন, বাস্তবিক মানবমণ্ডলীর মধ্যে তাদের কোনো মূল্য নেই। অন্যদিকে এই কতিপয় আহলে কিতাব কখনোই পরিপূর্ণ সমাজ গঠন করতে পারেননি, বরং তারা সমাজের মুষ্টিমেয় সদস্য বলেই গণ্য ছিলেন।
সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ. এ বিষয়ে সবিস্তার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীর বুকে না ছিল কোনো বোধসম্পন্ন বিবেকবান জাতি, না ছিল নীতিনৈতিকতা ও মর্যাদাবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সমাজ। দয়া ও ইনসাফের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো শাসনব্যবস্থা ছিল না, জ্ঞানসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান শাসকও ছিল না, নেতাও ছিল না। আর নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) আনীত বিশুদ্ধ ধর্ম একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল। (৮৬)
গোটা মানববিশ্বে পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, অধঃপতিত, বিনাশ-কবলিত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয়-জীবনের সব দিকে, সব ক্ষেত্রে সমানভাবে ফ্যাসাদ ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। দুনিয়াকে গ্রাস করেছিল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, মূর্খতা ও অজ্ঞতা দুনিয়ার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল, যা দুনিয়াকে কুসংস্কার, অলিক ধ্যানধারণার সংঘর্ষপূর্ণ সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছিল। মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও রিপুই ছিল দুনিয়ার পরিচালক। তাই মানুষ পাথরের, সূর্যের, চন্দ্রের, আগুনের, এমনকি পশুর পূজা করত। গোটা মানবগোষ্ঠী বিভক্ত হয়ে পড়েছিল দুইভাগে, শাসক শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। তারা এতিম ও অসহায়দের সম্পদ আত্মসাৎ করত, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করত। তাদের পারস্পরিক লেনদেনই ছিল হানাহানি, লুণ্ঠন, ছিনতাই, রাহাজানি। শুধু তাই নয়, অপরাধ, পাপাচার ও গর্হিত কাজ করে তারা গৌরববোধ করত। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো নিয়মনীতি বা আইন ছিল না, ছিল কেবল মাৎস্যন্যায়, পাশবিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং জোর যার মুলুক তার নীতি। শক্তিমানরা দুর্বলদের শোষণ ও উৎপীড়ন করত, ধনীরা গরিবদের দাস বানিয়ে রাখত। সবাই বন্দি ছিল দুর্ভেদ্য অন্ধকারে, যার কোনো শেষ ছিল না, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না।
এসব পরিস্থিতি মানবমণ্ডলীকে উদ্ভ্রান্ত, হতাশ, রিক্ত-নিঃস্ব বানিয়ে দিয়েছিল। তাদের অন্তরে ভীতি ও আশঙ্কা ছাড়া কিছুই ছিল না। তাদের জ্ঞান ও চিন্তায় ছিল কেবল শূন্যতা, অলিক জল্পনাকল্পনা। ইসলামি সভ্যতার পূর্বে এটাই ছিল বিশ্বের মানবমণ্ডলীর অবস্থা!
ইসলামপূর্ব বিশ্বে এটাই ছিল অবস্থা, বিশেষ করে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। বিশ্বসভ্যতাগুলো গুটিয়ে গিয়েছিল। সবকিছু ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়।
অধ্যাপক ডেনিসন এই অবস্থার চিত্রায়ণ করেছেন এভাবে,
খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে সভ্য পৃথিবী ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়, কারণ যেসব বিশ্বাস সভ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে সহায়ক ছিল সেগুলোর বিনাশ ঘটে। এসব বিশ্বাসের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো উপযোগী কিছুই ছিল না। চারহাজার বছরের চেষ্টার ফলে যে বৃহৎ নগর-সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তা ভেঙে পড়ার উপক্রম ছিল। মানবতা যে বর্বরতা ও অসভ্যতা থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেদিকেই ফিরে যেতে চাইছিল। গোত্রগুলো পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ করছিল, রক্তপাত ঘটাচ্ছিল। কোনো আইন ছিল না, কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। খ্রিষ্টীয় মতবাদের ফলে যেসব শাসনব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছিল সেগুলো ঐক্য ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বদলে বিচ্ছিন্নতা ও ভাঙনের আগুনে ঘি ঢালছিল। ফলে যে সভ্যতা বিপুল ডালপালাসমৃদ্ধ বিশাল বৃক্ষের মতো ছিল, যার ছায়া ছড়িয়ে ছিল গোটা বিশ্বের ওপর তা শীর্ণকায় হয়ে হেলছিল। এতে তার দিকে ধেয়ে আসে ধ্বংস, এমনকি তার মজ্জাটুকুও শেষ হয়ে যায়। (৮৭)
ইসলামি সভ্যতার উষার উন্মেষ ও আলো ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত এরূপ अवस्थাই বিরাজমান ছিল। ইসলামি সভ্যতা মানবতার একটি উপহার, মনুষ্য কুলের জন্য পথনির্দেশনা।
টিকাঃ
৮৫. মুসলিম, কিতাব : আল-জান্নাহ ওয়া সিফাতু নাইমিহা ওয়া আহলিহা, হাদিস নং ২৮৬৫।
৮৬. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৯১।
৮৭. জন হপকিন্স ডেনিসন, Emotion as the Basis of Civilization; আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ৬, পৃ. ৩৬-৩৭।
আমরা ইসলামপূর্ব বিশ্বের কয়েকটি বৃহৎ সভ্যতার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছি। এখন আমরা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বে বিশ্ব, মানবমণ্ডলী ও মানবতার কী অবস্থা ছিল তার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করব। তার থেকে যে সারমর্ম আমরা পাই তা এই যে, স্তূপীকৃত গভীর অমানিশা চূর্ণবিচূর্ণ করার এবং মানবতার স্কন্ধমূলে আটকে পড়া যন্ত্রণা-দুর্দশাকে দূরীভূত করার জন্য ইসলামের আলো ও ইসলামি সভ্যতার প্রয়োজন প্রকট ছিল।
ইসলামপূর্ব বিশ্বের মোটামুটি অবস্থার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস উদ্ধৃত করছি। ইয়ায ইবনে হিমার রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ نَظَرَ إِلَى أَهْلِ الْأَرْضِ فَمَقَتَهُمْ عَرَبَهُمْ وَعَجَمَهُمْ إِلَّا بَقَايَا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
আল্লাহ তাআলা জমিনের মানবমণ্ডলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন, তখন (তাদের চরম পথভ্রষ্টতার কারণে) কতিপয় আহলে কিতাব ব্যতীত আরব ও অনারব সকলের ওপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। (৮৫)
মানুষের অবস্থা অধঃপতনের এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তা তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার ঘৃণা ও ক্রোধকে আবশ্যক করে তুলেছিল। হাদিসে ব্যবহৃত (مقت) 'মাক্ত' শব্দটি প্রচণ্ড ঘৃণা বোঝায়। কতিপয় আহলে কিতাবের কথা বলতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক (بقايا) 'বাকায়া' শব্দের ব্যবহার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রতি ইঙ্গিত করে। যেন তারা বহু প্রাচীন যুগের নিদর্শন, বাস্তবিক মানবমণ্ডলীর মধ্যে তাদের কোনো মূল্য নেই। অন্যদিকে এই কতিপয় আহলে কিতাব কখনোই পরিপূর্ণ সমাজ গঠন করতে পারেননি, বরং তারা সমাজের মুষ্টিমেয় সদস্য বলেই গণ্য ছিলেন।
সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ. এ বিষয়ে সবিস্তার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীর বুকে না ছিল কোনো বোধসম্পন্ন বিবেকবান জাতি, না ছিল নীতিনৈতিকতা ও মর্যাদাবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সমাজ। দয়া ও ইনসাফের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো শাসনব্যবস্থা ছিল না, জ্ঞানসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান শাসকও ছিল না, নেতাও ছিল না। আর নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) আনীত বিশুদ্ধ ধর্ম একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল। (৮৬)
গোটা মানববিশ্বে পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, অধঃপতিত, বিনাশ-কবলিত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয়-জীবনের সব দিকে, সব ক্ষেত্রে সমানভাবে ফ্যাসাদ ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। দুনিয়াকে গ্রাস করেছিল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, মূর্খতা ও অজ্ঞতা দুনিয়ার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল, যা দুনিয়াকে কুসংস্কার, অলিক ধ্যানধারণার সংঘর্ষপূর্ণ সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছিল। মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও রিপুই ছিল দুনিয়ার পরিচালক। তাই মানুষ পাথরের, সূর্যের, চন্দ্রের, আগুনের, এমনকি পশুর পূজা করত। গোটা মানবগোষ্ঠী বিভক্ত হয়ে পড়েছিল দুইভাগে, শাসক শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। তারা এতিম ও অসহায়দের সম্পদ আত্মসাৎ করত, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করত। তাদের পারস্পরিক লেনদেনই ছিল হানাহানি, লুণ্ঠন, ছিনতাই, রাহাজানি। শুধু তাই নয়, অপরাধ, পাপাচার ও গর্হিত কাজ করে তারা গৌরববোধ করত। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো নিয়মনীতি বা আইন ছিল না, ছিল কেবল মাৎস্যন্যায়, পাশবিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং জোর যার মুলুক তার নীতি। শক্তিমানরা দুর্বলদের শোষণ ও উৎপীড়ন করত, ধনীরা গরিবদের দাস বানিয়ে রাখত। সবাই বন্দি ছিল দুর্ভেদ্য অন্ধকারে, যার কোনো শেষ ছিল না, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না।
এসব পরিস্থিতি মানবমণ্ডলীকে উদ্ভ্রান্ত, হতাশ, রিক্ত-নিঃস্ব বানিয়ে দিয়েছিল। তাদের অন্তরে ভীতি ও আশঙ্কা ছাড়া কিছুই ছিল না। তাদের জ্ঞান ও চিন্তায় ছিল কেবল শূন্যতা, অলিক জল্পনাকল্পনা। ইসলামি সভ্যতার পূর্বে এটাই ছিল বিশ্বের মানবমণ্ডলীর অবস্থা!
ইসলামপূর্ব বিশ্বে এটাই ছিল অবস্থা, বিশেষ করে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। বিশ্বসভ্যতাগুলো গুটিয়ে গিয়েছিল। সবকিছু ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়।
অধ্যাপক ডেনিসন এই অবস্থার চিত্রায়ণ করেছেন এভাবে,
খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে সভ্য পৃথিবী ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়, কারণ যেসব বিশ্বাস সভ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে সহায়ক ছিল সেগুলোর বিনাশ ঘটে। এসব বিশ্বাসের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো উপযোগী কিছুই ছিল না। চারহাজার বছরের চেষ্টার ফলে যে বৃহৎ নগর-সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তা ভেঙে পড়ার উপক্রম ছিল। মানবতা যে বর্বরতা ও অসভ্যতা থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেদিকেই ফিরে যেতে চাইছিল। গোত্রগুলো পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ করছিল, রক্তপাত ঘটাচ্ছিল। কোনো আইন ছিল না, কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। খ্রিষ্টীয় মতবাদের ফলে যেসব শাসনব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছিল সেগুলো ঐক্য ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বদলে বিচ্ছিন্নতা ও ভাঙনের আগুনে ঘি ঢালছিল। ফলে যে সভ্যতা বিপুল ডালপালাসমৃদ্ধ বিশাল বৃক্ষের মতো ছিল, যার ছায়া ছড়িয়ে ছিল গোটা বিশ্বের ওপর তা শীর্ণকায় হয়ে হেলছিল। এতে তার দিকে ধেয়ে আসে ধ্বংস, এমনকি তার মজ্জাটুকুও শেষ হয়ে যায়। (৮৭)
ইসলামি সভ্যতার উষার উন্মেষ ও আলো ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত এরূপ अवस्थাই বিরাজমান ছিল। ইসলামি সভ্যতা মানবতার একটি উপহার, মনুষ্য কুলের জন্য পথনির্দেশনা।
টিকাঃ
৮৫. মুসলিম, কিতাব : আল-জান্নাহ ওয়া সিফাতু নাইমিহা ওয়া আহলিহা, হাদিস নং ২৮৬৫।
৮৬. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৯১।
৮৭. জন হপকিন্স ডেনিসন, Emotion as the Basis of Civilization; আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ৬, পৃ. ৩৬-৩৭।