📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ইসলামপূর্ব আরব

📄 ইসলামপূর্ব আরব


ইসলামের আবির্ভাবের পর আরব যে অবস্থায় উন্নীত হয়েছিল তার শ্রেষ্ঠত্ব ও ভিন্নতা স্বীকার করে নিয়েও আরবের ইসলামপূর্ব যুগ 'জাহিলিয়্যা' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তাই ইসলামপূর্ব আরবের ইতিহাসকে 'আত-তারিখুল জাহিলি' বা 'তারিখুল জাহিলিয়্যা' (অজ্ঞতার যুগের ইতিহাস/অন্ধকার যুগের ইতিহাস) বলা হয়। 'জাহিলিয়্যা' শব্দটি অন্ধকার ও অজ্ঞতা বোঝানোর পাশাপাশি যাযাবর জীবন ও পশ্চাৎপদতাও বোঝায়। যেমন আরবরা সভ্যতার ক্ষেত্রে তাদের চারপাশের মানুষদের চেয়ে পিছিয়ে ছিল। তাদের অধিকাংশই মূর্খতা ও উদাসীনতায় নিমজ্জিত গোত্রসমূহের জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। বহির্বিশ্বেরও তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না। তারা ছিল নিরক্ষর মূর্তিপূজারি, তাদের জ্ঞানগত পূর্ণতার কোনো ইতিহাস নেই। (৭৩)
জাহিলি যুগে বিশ্বের সমস্ত জাতি ও গোষ্ঠীর তুলনায় আরবরা ছিল কিছু অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবগত যোগ্যতার অধিকারী। যেমন ভাষানৈপুণ্য ও বাগ্মিতা, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতি অনুরাগ, সাহসিকতা ও বীরত্ব, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে উৎসাহ ও উদ্দীপনা, স্পষ্ট ভাষণ, অনন্যসাধারণ স্মৃতিশক্তি, সমতাপ্রেম ও ইচ্ছাশক্তি, প্রতিশ্রুতিপূরণ ও আমানত রক্ষা। কিন্তু নবুয়ত ও নবীগণের শিক্ষা থেকে তাদের কালগত দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন এক আরব উপদ্বীপে আবদ্ধ ছিল এবং বাপদাদাদের ধর্ম ও জাতীয় আচার-সংস্কারকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে ছিল। এসব কারণে শেষদিকে (খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে) তারা ভীষণ ধর্মীয় অবক্ষয়ের শিকার হয়েছিল এবং চরম পর্যায়ের পৌত্তলিকতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। সামসময়িক কোনো জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে যার দৃষ্টান্ত পাওয়া ছিল ভার। তা ছাড়া তারা নৈতিক ও সামাজিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিল। ফলে তারা নৈতিকভাবে চরম অধঃপতিত হয়ে পড়েছিল, তাদের সমাজ হয়ে পড়েছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, তাদের অবকাঠামো ছিল ভঙ্গুর ও পতনোন্মুখ। কারণ জাহিলি জীবনের নিকৃষ্ট দোষ-ব্যাধি তাদের মধ্যে জেঁকে বসেছিল এবং তারা আসমানি ধর্মসমূহের গুণাবলি ও সৌন্দর্য থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। (৭৪)
ধর্মীয় দিক বিবেচনা করতে গেলে, গোটা আরব উপদ্বীপে প্রতিমাপূজা ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি প্রতিটি গোত্রে, তারপর প্রতিটি বাড়িতে প্রতিমা স্থান পেয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবি আবু রাজা আল-উতারিদি রা. বর্ণনা করেন,
«كُنَّا نَعْبُدُ الْحَجَرَ فَإِذَا وَجَدْنَا حَجَرًا هُوَ أَخْيَرُ مِنْهُ أَلْقَيْنَاهُ وَأَخَذْنَا الْآخَرُ فَإِذَا لَمْ نَجِدْ حَجَرًا جَمَعْنَا جُثْوَةً مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ جِئْنَا بِالشَّاةِ فَحَلَبْنَاهُ عَلَيْهِ ثُمَّ طُفْنَا بِهِ»
(ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমরা) পাথরের পূজা করতাম। যখন এটি অপেক্ষা অন্য একটি ভালো পাথর পেয়ে যেতাম তখন এটিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে অন্যটি গ্রহণ করতাম (অন্যটির পূজা শুরু করতাম)। যখন কোনো পাথর পেতাম না, কিছু মাটি একত্র করে স্তূপ বানিয়ে নিতাম। তারপর একটি ছাগী নিয়ে আসতাম এবং ওই স্তূপের ওপর ছাগীটিকে দোহন করতাম। (যাতে তা কৃত্রিম পাথরের মতো দেখায়।) তারপর স্তূপটির চারপাশে তাওয়াফ করতাম। (৭৫)
প্রতিমা ছাড়াও আরবদের আরও দেবতা ছিল। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ফেরেশতা, জিন ও নক্ষত্র। তারা বিশ্বাস করত যে, ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার কন্যা। তাই তারা আল্লাহ তাআলার কাছে ফেরেশতাদের সুপারিশকারীরূপে গ্রহণ করে। এমনকি প্রার্থনা কবুলের মাধ্যম হিসেবেও ফেরেশতাদের গ্রহণ করে। একইভাবে তারা জিনদেরকেও আল্লাহর তাআলার শরিক বানিয়ে তাদের অলৌকিক শক্তি ও প্রভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের পূজা করতে শুরু করে। (৭৬)
আরও একটি কারণ এই যে, ইহুদিরা তখন গোটা আরবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। ইহুদিধর্মের নেতারা আল্লাহ তাআলাকে ব্যতিরেকে নিজেরাই প্রভুর আসনে সমাসীন হয়েছিল। তারা জনমণ্ডলীর ওপর খড়গ ঝুলিয়ে রেখেছিল এবং তাদের কাছে এমনকি মনের চিন্তা ও ঠোঁটের ফিসফিসানির জন্যও মানুষকে জবাবদিহি করতে হতো। তারা তাদের সমস্ত চিন্তাভাবনা সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের পেছনে নিয়োজিত করেছিল। যদিও এতে ধর্মের বিনাশ ঘটেছিল এবং ধর্মহীনতা, অবিশ্বাস ও কুফরি ছড়িয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে খ্রিষ্টধর্ম এক ভীষণ দুর্বোধ্য পৌত্তলিকতায় পর্যবসিত হয়েছিল। তা (ত্রিত্ববাদের ধারণার ফলে) আল্লাহ তাআলা ও মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত সংমিশ্রণের উদ্ভব ঘটিয়েছিল। আরবের খ্রিষ্টধর্ম অনুসারীদের অন্তরে এই ধর্মের কোনোরূপ সত্যিকার প্রভাব ছিল না। (৭৭)
নৈতিক ও চারিত্রিক দিক বিবেচনায় তারা চরম অবক্ষয় ও অধঃপতনের শিকার হয়েছিল। মদ্যপান মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সমাজের গভীরতায় তার কঠিন শেকড় বিস্তার করেছিল। এ কারণে তখনকার কাব্যকলা, ইতিহাস ও সাহিত্যের একটি বিরাট অংশই ছিল মদের দখলে। একইভাবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জুয়া তার থাবা ছড়িয়ে দিয়েছিল। কাতাদা (৭৮) বলেন, জাহিলি যুগে মানুষ তার স্ত্রী ও সম্পদের ওপরও জুয়া খেলত, বাজি ধরত। তারপর রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে বেদনার্ত চোখে দেখত যে, তার স্ত্রী ও সম্পদ অন্যের হাতে চলে গেছে। এর ফলে তাদের মধ্যে ভয়াবহ শত্রুতা ও কলহবিবাদ শুরু হতো। (৭৯)
একইভাবে আরবদের ও ইহুদিদের মধ্যে সুদি কারবার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। সুদি কারবারের শেকড় অনেকদূর পর্যন্ত প্রোথিত ছিল। এমনকি তারা বলেছিল, বেচাকেনা তো সুদের মতোই। একইভাবে নারী-পুরুষের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল। ব্যভিচার একটি প্রচলিত প্রথার রূপ ধারণ করেছিল। পুরুষ ইচ্ছে করলেই কয়েকজন উপপত্নী বা রক্ষিতা গ্রহণ করতে পারত, নারীরাও মনে ধরলে কয়েকজন উপপতি বা প্রণয়সঙ্গী গ্রহণ করতে পারত। এতে কোনো বৈধ বন্ধন বা চুক্তির প্রয়োজন হতো না। ওই যুগে কী ধরনের বিবাহ প্রচলিত ছিল তার প্রকারভেদ উল্লেখ করে সাইয়িদা আয়িশা রা. বলেন,
«إِنَّ النَّكَاحَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ كَانَ عَلَى أَرْبَعَةِ أَنْحَاءٍ فَنِكَاحُ مِنْهَا نِكَاحُ النَّاسِ الْيَوْمَ يَخْطُبُ الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ وَلِيَّتَهُ أَوْ ابْنَتَهُ فَيُصْدِقُهَا ثُمَّ يَنْكِحُهَا وَنِكَاحَ آخَرُ كَانَ الرَّجُلُ يَقُولُ لِامْرَأَتِهِ إِذَا طَهُرَتْ مِنْ طَمْثِهَا أَرْسِلِي إِلَى فُلَانٍ فَاسْتَبْضِعِي مِنْهُ وَيَعْتَزِلُهَا زَوْجُهَا وَلَا يَمَسُّهَا أَبَدًا حَتَّى يَتَبَيَّنَ حَمْلُهَا مِنْ ذُلِكَ الرَّجُلِ الَّذِي تَسْتَبْضِعُ مِنْهُ فَإِذَا تَبَيَّنَ حَمْلُهَا أَصَابَهَا زَوْجُهَا إِذَا أَحَبَّ وَإِنَّمَا يَفْعَلُ ذَلِكَ رَغْبَةً فِي نَجَابَةِ الْوَلَدِ فَكَانَ هَذَا النِّكَاحُ نِكَاحَ الاسْتِبْضَاعِ وَنِكَاحُ آخَرُ يَجْتَمِعُ الرَّهْطُ مَا دُونَ الْعَشَرَةِ فَيَدْخُلُونَ عَلَى الْمَرْأَةِ كُلُّهُمْ يُصِيبُهَا فَإِذَا حَمَلَتْ وَوَضَعَتْ وَمَرَّ عَلَيْهَا لَيَالٍ بَعْدَ أَنْ تَضَعَ حَمْلَهَا أَرْسَلَتْ إِلَيْهِمْ فَلَمْ يَسْتَطِعْ رَجُلٌ مِنْهُمْ أَنْ يَمْتَنِعَ حَتَّى يَجْتَمِعُوا عِنْدَهَا تَقُولُ لَهُمْ قَدْ عَرَفْتُمْ الَّذِي كَانَ مِنْ أَمْرِكُمْ وَقَدْ وَلَدْتُ فَهُوَ ابْنُكَ يَا فُلَانُ تُسَمِّي مَنْ أَحَبَّتْ بِاسْمِهِ فَيَلْحَقُ بِهِ وَلَدُهَا لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يَمْتَنِعَ بِهِ الرَّجُلُ وَنِكَاحُ الرَّابِعِ يَجْتَمِعُ النَّاسُ الْكَثِيرُ فَيَدْخُلُونَ عَلَى الْمَرْأَةِ لَا تَمْتَنِعُ مِمَّنْ جَاءَهَا وَهُنَّ الْبَغَايَا كُنَّ يَنْصِبْنَ عَلَى أَبْوَابِهِنَّ رَايَاتٍ تَكُونُ عَلَمًا فَمَنْ أَرَادَهُنَّ دَخَلَ عَلَيْهِنَّ فَإِذَا حَمَلَتْ إِحْدَاهُنَّ وَوَضَعَتْ حَمْلَهَا جمِعُوا لَهَا وَدَعَوْا لَهُمُ الْقَافَةَ ثُمَّ أَلْحَقُوا وَلَدَهَا بِالَّذِي يَرَوْنَ فَالْتَاطَ بِهِ وَدُعِيَ ابْنَهُ لَا يَمْتَنِعُ مِنْ ذَلِكَ
জাহিলি যুগে চার প্রকারের বিবাহ প্রচলিত ছিল। প্রথম প্রকার : বর্তমান যে ব্যবস্থা চলছে অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি কোনো নারীর অভিভাবকের কাছে তার অধীনে থাকা নারী অথবা তার কন্যার জন্য বিবাহের প্রস্তাব দেবে এবং তার মোহর নির্ধারণের পর বিবাহ করবে। দ্বিতীয় প্রকার : কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তার মাসিক (ঋতুস্রাব) থেকে মুক্ত হওয়ার পর এই কথা বলত যে, তুমি অমুক ব্যক্তির কাছে যাও এবং তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম করো। এরপর স্বামী তার এই স্ত্রী থেকে পৃথক থাকত এবং কখনো স্ত্রীসহবাস করত না, যতক্ষণ না তার এই স্ত্রী যে লোকটার সঙ্গে যৌনসঙ্গমে মিলিত হচ্ছে তার দ্বারা গর্ভবতী হতো। যখন তার গর্ভ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হতো তখন ইচ্ছা করলে স্বামী তার এই স্ত্রীর সাথে সহবাস করত। স্বামী উন্নত ধরনের সন্তান প্রজননের আশায় এই কাজ করত। এ ধরনের বিবাহকে ‘নিকাহুল ইসতিবদা’ বলা হতো। তৃতীয় প্রকার বিবাহ: দশজনের কম সংখ্যক ব্যক্তি একত্র হয়ে পালাক্রমে একই নারীর সাথে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতো। যদি নারীটি গর্ভবতী হতো, তারপর সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কিছুদিন অতিবাহিত হতো, সেই নারী তার সঙ্গে সঙ্গমকারী সব পুরুষকে ডেকে পাঠাত এবং কেউই আসতে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না। তারা সবাই নারীটির সামনে সমবেত হওয়ার পর সে তাদেরকে বলত, তোমরা সকলেই জানো তোমরা কী করেছ! এখন আমি সন্তান প্রসব করেছি। সুতরাং হে অমুক! এটা তোমারই সন্তান। ওই নারী যাকে খুশি তার নাম ধরে ডাকত, তখন ওই পুরুষ নবজাতক শিশুটিকে গ্রহণ করতে বাধ্য থাকত এবং সে তা অস্বীকার করতে পারত না। চতুর্থ প্রকারের বিবাহ : বহু পুরুষ একজনমাত্র নারীর সঙ্গে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতো এবং ওই নারী তার কাছে যত পুরুষ আসত, কাউকে রমণসঙ্গী করতে অস্বীকার করত না। তারা ছিল বারবনিতা। বারবনিতারা তাদের চিহ্নরূপে নিজ নিজ ঘরের সামনে পতাকা উড়িয়ে রাখত। যে কেউ ইচ্ছা করলে অবাধে তাদের সঙ্গে যৌনসম্ভোগে লিপ্ত হতে পারত। যদি এসব নারীর মধ্যে কেউ গর্ভবতী হতো এবং সন্তান প্রসব করত তাহলে যৌনসঙ্গমকারী সকল পুরুষ সমবেত হতো এবং 'কায়িফ'(৮০)-কে ডেকে আনত। এ সকল ব্যক্তি সন্তানটির সঙ্গে যে লোকটির সাদৃশ্য পেত তাকে বলত, এটি তোমার সন্তান। তখন ওই পুরুষটি নবজাতক সন্তানকে নিজের নয় বলে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না।(৮১)
নারীদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে বলতে গেলে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. সারমর্মরূপে যে কথা বলেছেন সেটা উল্লেখ করাই সমীচীন। তিনি বলেছেন, 'আল্লাহর কসম! আমরা জাহিলি যুগে নারীদের কোনোকিছুরূপে গণ্য করতাম না। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে যা নাযিল করলেন তা তো সবার সামনেই রয়েছে।'(৮২)
নারীদের কোনো উত্তরাধিকার ছিল না। উত্তরাধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আরবরা বলত, আমাদের মধ্যে যারা তরবারি ধারণ করতে পারে এবং সম্পদ ও ভূখণ্ড রক্ষা করতে পারে তারাই কেবল উত্তরাধিকার পাবে। তাই কোনো লোক মারা গেলে তার পুত্রসন্তান উত্তরাধিকার পেত। পুত্রসন্তান না থাকলে তার নিকটাত্মীয় অভিভাবক তা পেত। পিতা বা ভাই বা চাচা, যে-ই হোক না কেন। আর মৃত ব্যক্তির স্ত্রী ও কন্যাদেরকে যে লোকটি উত্তরাধিকার পেয়েছে তার স্ত্রী ও কন্যাদের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হতো। তারা যা পেত, এরাও তা-ই পেত; তাদের ওপর যে দায়িত্ব বর্তাত এদের ওপরও একই দায়িত্ব বর্তাত। নারীর জন্য তার স্বামীর ওপর আদতেই কোনোরূপ অধিকার ছিল না। তালাকের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। পুরুষরা ইচ্ছামতো যে-কয়জন খুশি স্ত্রী গ্রহণ করতে পারত, নির্ধারিত কোনো সংখ্যা ছিল না। আরবদের একটি জঘন্য প্রথা ছিল এমন, কোনো লোক তার স্ত্রী এবং এই স্ত্রী ব্যতীত অন্য স্ত্রীদের সন্তান রেখে মারা গেলে তার বড় পুত্রসন্তান তার পিতার স্ত্রীর ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় অগ্রাধিকার পেত। সে তার পিতার অন্যান্য সম্পদের মতো স্ত্রীকেও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ মনে করত।(৮৩)
মেয়েদের প্রতি আরবদের ঘৃণা এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তারা মেয়েদের জীবন্ত পুঁতে ফেলতে শুরু করল। মেয়েদের পুঁতে ফেলা ছিল জাহিলি যুগের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্য প্রথা। আরবের কোনো কন্যাসন্তান যদি মাটির গর্ভে প্রোথিত হওয়া থেকে কোনোক্রমে বেঁচে যেত, তবে তাকে এক অন্ধকারপূর্ণ দুর্বিষহ জীবনের অপেক্ষায় থাকতে হতো। আল-কুরআনুল কারিম এই অবস্থাকে বর্ণনা করেছে এভাবে,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأُنْثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ كَظِيمٌ ( يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُونٍ أَمْ يَدُسُهُ فِي التُّرَابِ أَلَا ساءَ مَا يَحْكُمُونَ
তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয় তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয় তার গ্লানির কারণে সে নিজ সম্প্রদায় থেকে আত্মগোপনে চলে যায়। সে চিন্তা করে, হীনতাসত্ত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, নাকি মাটিতে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! তারা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা অতি নিকৃষ্ট!(৮৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে জাযিরাতুল আরবের পরিস্থিতি এমনই ছিল।

টিকাঃ
৭৩. জাওয়াদ আলি, আল-মুফাসসাল ফি তারিখিল আরব কাবলাল ইসলাম, খ. ১, পৃ. ৩৭১।
৭৪. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৭৬-৭৭।
৭৫. বুখারি, হাদিস নং ৪১১৭।
৭৬. আবুল মুনযির হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব আল-কালবি, কিতাবুল আসনাম, পৃ. ৪৪।
৭৭. সফিউদ্দিন মুবারকপুরি, আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪৭।
৭৮. কাতাদা আস-সাদুদি (৬০-১১৭/১১৮ হিজরি): বিশিষ্ট তাবেয়ি ও উঁচুস্তরের আলেম। আবু উবাইদা বলেন, প্রতিদিন বনু উমাইয়া এলাকা থেকে কোনো-না-কোনো ব্যক্তি কাতাদা আস-সাদুসির দরজায় কড়া নাড়তেন এবং তার কাছে হাদিস, বংশধারা বা কবিতা জানতে চাইতেন। তিনি ইরাকের ওয়াসিত জেলায় মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, ৪/৮৫-৮৬; যাহাবি, তাযকিরাতুল হুফফায, খ. ১,পৃ. ১২২-১২৩।
৭৯. তাবারি, জামিউল বায়ান ফি তাবিলিল কুরআন, খ. ১০, পৃ. ৫৭৩; আযিমাবাদি, আওনুল মাবুদ, খ. ১০, পৃ. ৭৯।
৮০. যে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি সন্তানের গোপন চিহ্ন দেখে তার পিতার সঙ্গে সাদৃশ্য নির্ণয় করতে পারতেন। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, খ. ৯, পৃ. ১৮৫।
৮১. বুখারি, কিতাব: বিবাহ, বাব: মান কালা লা নিকাহা ইল্লা বি-ওয়ালিয়্যিন, হাদিস নং ৪৮৩৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২২৭২।
৮২. বুখারি, কিতাব: আত-তাফসির, বাব: তাফসিরু সুরাতিত তালাক, হাদিস নং ৪৬২৯; মুসলিম, কিতাব: তালাক, বাব: ইলা ও ইতিযালুন নিসা ওয়া তাখইরিহিন্না, হাদিস নং ১৪৭৯।
৮৩. ড. মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইসমাইল আল-মুকাদ্দাম, আল-মারআতু বায়না তাকরিমিল ইসলাম ওয়া ইহানাতুল জাহিলিয়্যা, পৃ. ৫৭।
৮৪. সুরা নাহল: আয়াত ৫৮-৫৯।

ইসলামের আবির্ভাবের পর আরব যে অবস্থায় উন্নীত হয়েছিল তার শ্রেষ্ঠত্ব ও ভিন্নতা স্বীকার করে নিয়েও আরবের ইসলামপূর্ব যুগ 'জাহিলিয়্যা' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তাই ইসলামপূর্ব আরবের ইতিহাসকে 'আত-তারিখুল জাহিলি' বা 'তারিখুল জাহিলিয়্যা' (অজ্ঞতার যুগের ইতিহাস/অন্ধকার যুগের ইতিহাস) বলা হয়। 'জাহিলিয়্যা' শব্দটি অন্ধকার ও অজ্ঞতা বোঝানোর পাশাপাশি যাযাবর জীবন ও পশ্চাৎপদতাও বোঝায়। যেমন আরবরা সভ্যতার ক্ষেত্রে তাদের চারপাশের মানুষদের চেয়ে পিছিয়ে ছিল। তাদের অধিকাংশই মূর্খতা ও উদাসীনতায় নিমজ্জিত গোত্রসমূহের জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। বহির্বিশ্বেরও তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না। তারা ছিল নিরক্ষর মূর্তিপূজারি, তাদের জ্ঞানগত পূর্ণতার কোনো ইতিহাস নেই। (৭৩)
জাহিলি যুগে বিশ্বের সমস্ত জাতি ও গোষ্ঠীর তুলনায় আরবরা ছিল কিছু অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবগত যোগ্যতার অধিকারী। যেমন ভাষানৈপুণ্য ও বাগ্মিতা, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতি অনুরাগ, সাহসিকতা ও বীরত্ব, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে উৎসাহ ও উদ্দীপনা, স্পষ্ট ভাষণ, অনন্যসাধারণ স্মৃতিশক্তি, সমতাপ্রেম ও ইচ্ছাশক্তি, প্রতিশ্রুতিপূরণ ও আমানত রক্ষা। কিন্তু নবুয়ত ও নবীগণের শিক্ষা থেকে তাদের কালগত দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন এক আরব উপদ্বীপে আবদ্ধ ছিল এবং বাপদাদাদের ধর্ম ও জাতীয় আচার-সংস্কারকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে ছিল। এসব কারণে শেষদিকে (খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে) তারা ভীষণ ধর্মীয় অবক্ষয়ের শিকার হয়েছিল এবং চরম পর্যায়ের পৌত্তলিকতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। সামসময়িক কোনো জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে যার দৃষ্টান্ত পাওয়া ছিল ভার। তা ছাড়া তারা নৈতিক ও সামাজিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিল। ফলে তারা নৈতিকভাবে চরম অধঃপতিত হয়ে পড়েছিল, তাদের সমাজ হয়ে পড়েছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, তাদের অবকাঠামো ছিল ভঙ্গুর ও পতনোন্মুখ। কারণ জাহিলি জীবনের নিকৃষ্ট দোষ-ব্যাধি তাদের মধ্যে জেঁকে বসেছিল এবং তারা আসমানি ধর্মসমূহের গুণাবলি ও সৌন্দর্য থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। (৭৪)
ধর্মীয় দিক বিবেচনা করতে গেলে, গোটা আরব উপদ্বীপে প্রতিমাপূজা ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি প্রতিটি গোত্রে, তারপর প্রতিটি বাড়িতে প্রতিমা স্থান পেয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবি আবু রাজা আল-উতারিদি রা. বর্ণনা করেন,
«كُنَّا نَعْبُدُ الْحَجَرَ فَإِذَا وَجَدْنَا حَجَرًا هُوَ أَخْيَرُ مِنْهُ أَلْقَيْنَاهُ وَأَخَذْنَا الْآخَرُ فَإِذَا لَمْ نَجِدْ حَجَرًا جَمَعْنَا جُثْوَةً مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ جِئْنَا بِالشَّاةِ فَحَلَبْنَاهُ عَلَيْهِ ثُمَّ طُفْنَا بِهِ»
(ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমরা) পাথরের পূজা করতাম। যখন এটি অপেক্ষা অন্য একটি ভালো পাথর পেয়ে যেতাম তখন এটিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে অন্যটি গ্রহণ করতাম (অন্যটির পূজা শুরু করতাম)। যখন কোনো পাথর পেতাম না, কিছু মাটি একত্র করে স্তূপ বানিয়ে নিতাম। তারপর একটি ছাগী নিয়ে আসতাম এবং ওই স্তূপের ওপর ছাগীটিকে দোহন করতাম। (যাতে তা কৃত্রিম পাথরের মতো দেখায়।) তারপর স্তূপটির চারপাশে তাওয়াফ করতাম। (৭৫)
প্রতিমা ছাড়াও আরবদের আরও দেবতা ছিল। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ফেরেশতা, জিন ও নক্ষত্র। তারা বিশ্বাস করত যে, ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার কন্যা। তাই তারা আল্লাহ তাআলার কাছে ফেরেশতাদের সুপারিশকারীরূপে গ্রহণ করে। এমনকি প্রার্থনা কবুলের মাধ্যম হিসেবেও ফেরেশতাদের গ্রহণ করে। একইভাবে তারা জিনদেরকেও আল্লাহর তাআলার শরিক বানিয়ে তাদের অলৌকিক শক্তি ও প্রভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের পূজা করতে শুরু করে। (৭৬)
আরও একটি কারণ এই যে, ইহুদিরা তখন গোটা আরবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। ইহুদিধর্মের নেতারা আল্লাহ তাআলাকে ব্যতিরেকে নিজেরাই প্রভুর আসনে সমাসীন হয়েছিল। তারা জনমণ্ডলীর ওপর খড়গ ঝুলিয়ে রেখেছিল এবং তাদের কাছে এমনকি মনের চিন্তা ও ঠোঁটের ফিসফিসানির জন্যও মানুষকে জবাবদিহি করতে হতো। তারা তাদের সমস্ত চিন্তাভাবনা সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের পেছনে নিয়োজিত করেছিল। যদিও এতে ধর্মের বিনাশ ঘটেছিল এবং ধর্মহীনতা, অবিশ্বাস ও কুফরি ছড়িয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে খ্রিষ্টধর্ম এক ভীষণ দুর্বোধ্য পৌত্তলিকতায় পর্যবসিত হয়েছিল। তা (ত্রিত্ববাদের ধারণার ফলে) আল্লাহ তাআলা ও মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত সংমিশ্রণের উদ্ভব ঘটিয়েছিল। আরবের খ্রিষ্টধর্ম অনুসারীদের অন্তরে এই ধর্মের কোনোরূপ সত্যিকার প্রভাব ছিল না। (৭৭)
নৈতিক ও চারিত্রিক দিক বিবেচনায় তারা চরম অবক্ষয় ও অধঃপতনের শিকার হয়েছিল। মদ্যপান মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সমাজের গভীরতায় তার কঠিন শেকড় বিস্তার করেছিল। এ কারণে তখনকার কাব্যকলা, ইতিহাস ও সাহিত্যের একটি বিরাট অংশই ছিল মদের দখলে। একইভাবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জুয়া তার থাবা ছড়িয়ে দিয়েছিল। কাতাদা (৭৮) বলেন, জাহিলি যুগে মানুষ তার স্ত্রী ও সম্পদের ওপরও জুয়া খেলত, বাজি ধরত। তারপর রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে বেদনার্ত চোখে দেখত যে, তার স্ত্রী ও সম্পদ অন্যের হাতে চলে গেছে। এর ফলে তাদের মধ্যে ভয়াবহ শত্রুতা ও কলহবিবাদ শুরু হতো। (৭৯)
একইভাবে আরবদের ও ইহুদিদের মধ্যে সুদি কারবার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। সুদি কারবারের শেকড় অনেকদূর পর্যন্ত প্রোথিত ছিল। এমনকি তারা বলেছিল, বেচাকেনা তো সুদের মতোই। একইভাবে নারী-পুরুষের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল। ব্যভিচার একটি প্রচলিত প্রথার রূপ ধারণ করেছিল। পুরুষ ইচ্ছে করলেই কয়েকজন উপপত্নী বা রক্ষিতা গ্রহণ করতে পারত, নারীরাও মনে ধরলে কয়েকজন উপপতি বা প্রণয়সঙ্গী গ্রহণ করতে পারত। এতে কোনো বৈধ বন্ধন বা চুক্তির প্রয়োজন হতো না। ওই যুগে কী ধরনের বিবাহ প্রচলিত ছিল তার প্রকারভেদ উল্লেখ করে সাইয়িদা আয়িশা রা. বলেন,
«إِنَّ النَّكَاحَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ كَانَ عَلَى أَرْبَعَةِ أَنْحَاءٍ فَنِكَاحُ مِنْهَا نِكَاحُ النَّاسِ الْيَوْمَ يَخْطُبُ الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ وَلِيَّتَهُ أَوْ ابْنَتَهُ فَيُصْدِقُهَا ثُمَّ يَنْكِحُهَا وَنِكَاحَ آخَرُ كَانَ الرَّجُلُ يَقُولُ لِامْرَأَتِهِ إِذَا طَهُرَتْ مِنْ طَمْثِهَا أَرْسِلِي إِلَى فُلَانٍ فَاسْتَبْضِعِي مِنْهُ وَيَعْتَزِلُهَا زَوْجُهَا وَلَا يَمَسُّهَا أَبَدًا حَتَّى يَتَبَيَّنَ حَمْلُهَا مِنْ ذُلِكَ الرَّجُلِ الَّذِي تَسْتَبْضِعُ مِنْهُ فَإِذَا تَبَيَّنَ حَمْلُهَا أَصَابَهَا زَوْجُهَا إِذَا أَحَبَّ وَإِنَّمَا يَفْعَلُ ذَلِكَ رَغْبَةً فِي نَجَابَةِ الْوَلَدِ فَكَانَ هَذَا النِّكَاحُ نِكَاحَ الاسْتِبْضَاعِ وَنِكَاحُ آخَرُ يَجْتَمِعُ الرَّهْطُ مَا دُونَ الْعَشَرَةِ فَيَدْخُلُونَ عَلَى الْمَرْأَةِ كُلُّهُمْ يُصِيبُهَا فَإِذَا حَمَلَتْ وَوَضَعَتْ وَمَرَّ عَلَيْهَا لَيَالٍ بَعْدَ أَنْ تَضَعَ حَمْلَهَا أَرْسَلَتْ إِلَيْهِمْ فَلَمْ يَسْتَطِعْ رَجُلٌ مِنْهُمْ أَنْ يَمْتَنِعَ حَتَّى يَجْتَمِعُوا عِنْدَهَا تَقُولُ لَهُمْ قَدْ عَرَفْتُمْ الَّذِي كَانَ مِنْ أَمْرِكُمْ وَقَدْ وَلَدْتُ فَهُوَ ابْنُكَ يَا فُلَانُ تُسَمِّي مَنْ أَحَبَّتْ بِاسْمِهِ فَيَلْحَقُ بِهِ وَلَدُهَا لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يَمْتَنِعَ بِهِ الرَّجُلُ وَنِكَاحُ الرَّابِعِ يَجْتَمِعُ النَّاسُ الْكَثِيرُ فَيَدْخُلُونَ عَلَى الْمَرْأَةِ لَا تَمْتَنِعُ مِمَّنْ جَاءَهَا وَهُنَّ الْبَغَايَا كُنَّ يَنْصِبْنَ عَلَى أَبْوَابِهِنَّ رَايَاتٍ تَكُونُ عَلَمًا فَمَنْ أَرَادَهُنَّ دَخَلَ عَلَيْهِنَّ فَإِذَا حَمَلَتْ إِحْدَاهُنَّ وَوَضَعَتْ حَمْلَهَا جمِعُوا لَهَا وَدَعَوْا لَهُمُ الْقَافَةَ ثُمَّ أَلْحَقُوا وَلَدَهَا بِالَّذِي يَرَوْنَ فَالْتَاطَ بِهِ وَدُعِيَ ابْنَهُ لَا يَمْتَنِعُ مِنْ ذَلِكَ
জাহিলি যুগে চার প্রকারের বিবাহ প্রচলিত ছিল। প্রথম প্রকার : বর্তমান যে ব্যবস্থা চলছে অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি কোনো নারীর অভিভাবকের কাছে তার অধীনে থাকা নারী অথবা তার কন্যার জন্য বিবাহের প্রস্তাব দেবে এবং তার মোহর নির্ধারণের পর বিবাহ করবে। দ্বিতীয় প্রকার : কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তার মাসিক (ঋতুস্রাব) থেকে মুক্ত হওয়ার পর এই কথা বলত যে, তুমি অমুক ব্যক্তির কাছে যাও এবং তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম করো। এরপর স্বামী তার এই স্ত্রী থেকে পৃথক থাকত এবং কখনো স্ত্রীসহবাস করত না, যতক্ষণ না তার এই স্ত্রী যে লোকটার সঙ্গে যৌনসঙ্গমে মিলিত হচ্ছে তার দ্বারা গর্ভবতী হতো। যখন তার গর্ভ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হতো তখন ইচ্ছা করলে স্বামী তার এই স্ত্রীর সাথে সহবাস করত। স্বামী উন্নত ধরনের সন্তান প্রজননের আশায় এই কাজ করত। এ ধরনের বিবাহকে ‘নিকাহুল ইসতিবদা’ বলা হতো। তৃতীয় প্রকার বিবাহ: দশজনের কম সংখ্যক ব্যক্তি একত্র হয়ে পালাক্রমে একই নারীর সাথে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতো। যদি নারীটি গর্ভবতী হতো, তারপর সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কিছুদিন অতিবাহিত হতো, সেই নারী তার সঙ্গে সঙ্গমকারী সব পুরুষকে ডেকে পাঠাত এবং কেউই আসতে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না। তারা সবাই নারীটির সামনে সমবেত হওয়ার পর সে তাদেরকে বলত, তোমরা সকলেই জানো তোমরা কী করেছ! এখন আমি সন্তান প্রসব করেছি। সুতরাং হে অমুক! এটা তোমারই সন্তান। ওই নারী যাকে খুশি তার নাম ধরে ডাকত, তখন ওই পুরুষ নবজাতক শিশুটিকে গ্রহণ করতে বাধ্য থাকত এবং সে তা অস্বীকার করতে পারত না। চতুর্থ প্রকারের বিবাহ : বহু পুরুষ একজনমাত্র নারীর সঙ্গে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতো এবং ওই নারী তার কাছে যত পুরুষ আসত, কাউকে রমণসঙ্গী করতে অস্বীকার করত না। তারা ছিল বারবনিতা। বারবনিতারা তাদের চিহ্নরূপে নিজ নিজ ঘরের সামনে পতাকা উড়িয়ে রাখত। যে কেউ ইচ্ছা করলে অবাধে তাদের সঙ্গে যৌনসম্ভোগে লিপ্ত হতে পারত। যদি এসব নারীর মধ্যে কেউ গর্ভবতী হতো এবং সন্তান প্রসব করত তাহলে যৌনসঙ্গমকারী সকল পুরুষ সমবেত হতো এবং 'কায়িফ'(৮০)-কে ডেকে আনত। এ সকল ব্যক্তি সন্তানটির সঙ্গে যে লোকটির সাদৃশ্য পেত তাকে বলত, এটি তোমার সন্তান। তখন ওই পুরুষটি নবজাতক সন্তানকে নিজের নয় বলে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না।(৮১)
নারীদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে বলতে গেলে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. সারমর্মরূপে যে কথা বলেছেন সেটা উল্লেখ করাই সমীচীন। তিনি বলেছেন, 'আল্লাহর কসম! আমরা জাহিলি যুগে নারীদের কোনোকিছুরূপে গণ্য করতাম না। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে যা নাযিল করলেন তা তো সবার সামনেই রয়েছে।'(৮২)
নারীদের কোনো উত্তরাধিকার ছিল না। উত্তরাধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আরবরা বলত, আমাদের মধ্যে যারা তরবারি ধারণ করতে পারে এবং সম্পদ ও ভূখণ্ড রক্ষা করতে পারে তারাই কেবল উত্তরাধিকার পাবে। তাই কোনো লোক মারা গেলে তার পুত্রসন্তান উত্তরাধিকার পেত। পুত্রসন্তান না থাকলে তার নিকটাত্মীয় অভিভাবক তা পেত। পিতা বা ভাই বা চাচা, যে-ই হোক না কেন। আর মৃত ব্যক্তির স্ত্রী ও কন্যাদেরকে যে লোকটি উত্তরাধিকার পেয়েছে তার স্ত্রী ও কন্যাদের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হতো। তারা যা পেত, এরাও তা-ই পেত; তাদের ওপর যে দায়িত্ব বর্তাত এদের ওপরও একই দায়িত্ব বর্তাত। নারীর জন্য তার স্বামীর ওপর আদতেই কোনোরূপ অধিকার ছিল না। তালাকের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। পুরুষরা ইচ্ছামতো যে-কয়জন খুশি স্ত্রী গ্রহণ করতে পারত, নির্ধারিত কোনো সংখ্যা ছিল না। আরবদের একটি জঘন্য প্রথা ছিল এমন, কোনো লোক তার স্ত্রী এবং এই স্ত্রী ব্যতীত অন্য স্ত্রীদের সন্তান রেখে মারা গেলে তার বড় পুত্রসন্তান তার পিতার স্ত্রীর ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় অগ্রাধিকার পেত। সে তার পিতার অন্যান্য সম্পদের মতো স্ত্রীকেও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ মনে করত।(৮৩)
মেয়েদের প্রতি আরবদের ঘৃণা এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তারা মেয়েদের জীবন্ত পুঁতে ফেলতে শুরু করল। মেয়েদের পুঁতে ফেলা ছিল জাহিলি যুগের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্য প্রথা। আরবের কোনো কন্যাসন্তান যদি মাটির গর্ভে প্রোথিত হওয়া থেকে কোনোক্রমে বেঁচে যেত, তবে তাকে এক অন্ধকারপূর্ণ দুর্বিষহ জীবনের অপেক্ষায় থাকতে হতো। আল-কুরআনুল কারিম এই অবস্থাকে বর্ণনা করেছে এভাবে,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأُنْثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ كَظِيمٌ ( يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُونٍ أَمْ يَدُسُهُ فِي التُّرَابِ أَلَا ساءَ مَا يَحْكُمُونَ
তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয় তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয় তার গ্লানির কারণে সে নিজ সম্প্রদায় থেকে আত্মগোপনে চলে যায়। সে চিন্তা করে, হীনতাসত্ত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, নাকি মাটিতে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! তারা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা অতি নিকৃষ্ট!(৮৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে জাযিরাতুল আরবের পরিস্থিতি এমনই ছিল।

টিকাঃ
৭৩. জাওয়াদ আলি, আল-মুফাসসাল ফি তারিখিল আরব কাবলাল ইসলাম, খ. ১, পৃ. ৩৭১।
৭৪. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৭৬-৭৭।
৭৫. বুখারি, হাদিস নং ৪১১৭।
৭৬. আবুল মুনযির হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব আল-কালবি, কিতাবুল আসনাম, পৃ. ৪৪।
৭৭. সফিউদ্দিন মুবারকপুরি, আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪৭।
৭৮. কাতাদা আস-সাদুদি (৬০-১১৭/১১৮ হিজরি): বিশিষ্ট তাবেয়ি ও উঁচুস্তরের আলেম। আবু উবাইদা বলেন, প্রতিদিন বনু উমাইয়া এলাকা থেকে কোনো-না-কোনো ব্যক্তি কাতাদা আস-সাদুসির দরজায় কড়া নাড়তেন এবং তার কাছে হাদিস, বংশধারা বা কবিতা জানতে চাইতেন। তিনি ইরাকের ওয়াসিত জেলায় মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, ৪/৮৫-৮৬; যাহাবি, তাযকিরাতুল হুফফায, খ. ১,পৃ. ১২২-১২৩।
৭৯. তাবারি, জামিউল বায়ান ফি তাবিলিল কুরআন, খ. ১০, পৃ. ৫৭৩; আযিমাবাদি, আওনুল মাবুদ, খ. ১০, পৃ. ৭৯।
৮০. যে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি সন্তানের গোপন চিহ্ন দেখে তার পিতার সঙ্গে সাদৃশ্য নির্ণয় করতে পারতেন। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, খ. ৯, পৃ. ১৮৫।
৮১. বুখারি, কিতাব: বিবাহ, বাব: মান কালা লা নিকাহা ইল্লা বি-ওয়ালিয়্যিন, হাদিস নং ৪৮৩৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২২৭২।
৮২. বুখারি, কিতাব: আত-তাফসির, বাব: তাফসিরু সুরাতিত তালাক, হাদিস নং ৪৬২৯; মুসলিম, কিতাব: তালাক, বাব: ইলা ও ইতিযালুন নিসা ওয়া তাখইরিহিন্না, হাদিস নং ১৪৭৯।
৮৩. ড. মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইসমাইল আল-মুকাদ্দাম, আল-মারআতু বায়না তাকরিমিল ইসলাম ওয়া ইহানাতুল জাহিলিয়্যা, পৃ. ৫৭।
৮৪. সুরা নাহল: আয়াত ৫৮-৫৯।

ইসলামের আবির্ভাবের পর আরব যে অবস্থায় উন্নীত হয়েছিল তার শ্রেষ্ঠত্ব ও ভিন্নতা স্বীকার করে নিয়েও আরবের ইসলামপূর্ব যুগ 'জাহিলিয়্যা' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তাই ইসলামপূর্ব আরবের ইতিহাসকে 'আত-তারিখুল জাহিলি' বা 'তারিখুল জাহিলিয়্যা' (অজ্ঞতার যুগের ইতিহাস/অন্ধকার যুগের ইতিহাস) বলা হয়। 'জাহিলিয়্যা' শব্দটি অন্ধকার ও অজ্ঞতা বোঝানোর পাশাপাশি যাযাবর জীবন ও পশ্চাৎপদতাও বোঝায়। যেমন আরবরা সভ্যতার ক্ষেত্রে তাদের চারপাশের মানুষদের চেয়ে পিছিয়ে ছিল। তাদের অধিকাংশই মূর্খতা ও উদাসীনতায় নিমজ্জিত গোত্রসমূহের জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। বহির্বিশ্বেরও তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না। তারা ছিল নিরক্ষর মূর্তিপূজারি, তাদের জ্ঞানগত পূর্ণতার কোনো ইতিহাস নেই। (৭৩)
জাহিলি যুগে বিশ্বের সমস্ত জাতি ও গোষ্ঠীর তুলনায় আরবরা ছিল কিছু অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবগত যোগ্যতার অধিকারী। যেমন ভাষানৈপুণ্য ও বাগ্মিতা, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতি অনুরাগ, সাহসিকতা ও বীরত্ব, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে উৎসাহ ও উদ্দীপনা, স্পষ্ট ভাষণ, অনন্যসাধারণ স্মৃতিশক্তি, সমতাপ্রেম ও ইচ্ছাশক্তি, প্রতিশ্রুতিপূরণ ও আমানত রক্ষা। কিন্তু নবুয়ত ও নবীগণের শিক্ষা থেকে তাদের কালগত দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন এক আরব উপদ্বীপে আবদ্ধ ছিল এবং বাপদাদাদের ধর্ম ও জাতীয় আচার-সংস্কারকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে ছিল। এসব কারণে শেষদিকে (খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে) তারা ভীষণ ধর্মীয় অবক্ষয়ের শিকার হয়েছিল এবং চরম পর্যায়ের পৌত্তলিকতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। সামসময়িক কোনো জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে যার দৃষ্টান্ত পাওয়া ছিল ভার। তা ছাড়া তারা নৈতিক ও সামাজিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিল। ফলে তারা নৈতিকভাবে চরম অধঃপতিত হয়ে পড়েছিল, তাদের সমাজ হয়ে পড়েছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, তাদের অবকাঠামো ছিল ভঙ্গুর ও পতনোন্মুখ। কারণ জাহিলি জীবনের নিকৃষ্ট দোষ-ব্যাধি তাদের মধ্যে জেঁকে বসেছিল এবং তারা আসমানি ধর্মসমূহের গুণাবলি ও সৌন্দর্য থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। (৭৪)
ধর্মীয় দিক বিবেচনা করতে গেলে, গোটা আরব উপদ্বীপে প্রতিমাপূজা ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি প্রতিটি গোত্রে, তারপর প্রতিটি বাড়িতে প্রতিমা স্থান পেয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবি আবু রাজা আল-উতারিদি রা. বর্ণনা করেন,
«كُنَّا نَعْبُدُ الْحَجَرَ فَإِذَا وَجَدْنَا حَجَرًا هُوَ أَخْيَرُ مِنْهُ أَلْقَيْنَاهُ وَأَخَذْنَا الْآخَرُ فَإِذَا لَمْ نَجِدْ حَجَرًا جَمَعْنَا جُثْوَةً مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ جِئْنَا بِالشَّاةِ فَحَلَبْنَاهُ عَلَيْهِ ثُمَّ طُفْنَا بِهِ»
(ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমরা) পাথরের পূজা করতাম। যখন এটি অপেক্ষা অন্য একটি ভালো পাথর পেয়ে যেতাম তখন এটিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে অন্যটি গ্রহণ করতাম (অন্যটির পূজা শুরু করতাম)। যখন কোনো পাথর পেতাম না, কিছু মাটি একত্র করে স্তূপ বানিয়ে নিতাম। তারপর একটি ছাগী নিয়ে আসতাম এবং ওই স্তূপের ওপর ছাগীটিকে দোহন করতাম। (যাতে তা কৃত্রিম পাথরের মতো দেখায়।) তারপর স্তূপটির চারপাশে তাওয়াফ করতাম। (৭৫)
প্রতিমা ছাড়াও আরবদের আরও দেবতা ছিল। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ফেরেশতা, জিন ও নক্ষত্র। তারা বিশ্বাস করত যে, ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার কন্যা। তাই তারা আল্লাহ তাআলার কাছে ফেরেশতাদের সুপারিশকারীরূপে গ্রহণ করে। এমনকি প্রার্থনা কবুলের মাধ্যম হিসেবেও ফেরেশতাদের গ্রহণ করে। একইভাবে তারা জিনদেরকেও আল্লাহর তাআলার শরিক বানিয়ে তাদের অলৌকিক শক্তি ও প্রভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের পূজা করতে শুরু করে। (৭৬)
আরও একটি কারণ এই যে, ইহুদিরা তখন গোটা আরবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। ইহুদিধর্মের নেতারা আল্লাহ তাআলাকে ব্যতিরেকে নিজেরাই প্রভুর আসনে সমাসীন হয়েছিল। তারা জনমণ্ডলীর ওপর খড়গ ঝুলিয়ে রেখেছিল এবং তাদের কাছে এমনকি মনের চিন্তা ও ঠোঁটের ফিসফিসানির জন্যও মানুষকে জবাবদিহি করতে হতো। তারা তাদের সমস্ত চিন্তাভাবনা সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের পেছনে নিয়োজিত করেছিল। যদিও এতে ধর্মের বিনাশ ঘটেছিল এবং ধর্মহীনতা, অবিশ্বাস ও কুফরি ছড়িয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে খ্রিষ্টধর্ম এক ভীষণ দুর্বোধ্য পৌত্তলিকতায় পর্যবসিত হয়েছিল। তা (ত্রিত্ববাদের ধারণার ফলে) আল্লাহ তাআলা ও মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত সংমিশ্রণের উদ্ভব ঘটিয়েছিল। আরবের খ্রিষ্টধর্ম অনুসারীদের অন্তরে এই ধর্মের কোনোরূপ সত্যিকার প্রভাব ছিল না। (৭৭)
নৈতিক ও চারিত্রিক দিক বিবেচনায় তারা চরম অবক্ষয় ও অধঃপতনের শিকার হয়েছিল। মদ্যপান মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সমাজের গভীরতায় তার কঠিন শেকড় বিস্তার করেছিল। এ কারণে তখনকার কাব্যকলা, ইতিহাস ও সাহিত্যের একটি বিরাট অংশই ছিল মদের দখলে। একইভাবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জুয়া তার থাবা ছড়িয়ে দিয়েছিল। কাতাদা (৭৮) বলেন, জাহিলি যুগে মানুষ তার স্ত্রী ও সম্পদের ওপরও জুয়া খেলত, বাজি ধরত। তারপর রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে বেদনার্ত চোখে দেখত যে, তার স্ত্রী ও সম্পদ অন্যের হাতে চলে গেছে। এর ফলে তাদের মধ্যে ভয়াবহ শত্রুতা ও কলহবিবাদ শুরু হতো। (৭৯)
একইভাবে আরবদের ও ইহুদিদের মধ্যে সুদি কারবার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। সুদি কারবারের শেকড় অনেকদূর পর্যন্ত প্রোথিত ছিল। এমনকি তারা বলেছিল, বেচাকেনা তো সুদের মতোই। একইভাবে নারী-পুরুষের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল। ব্যভিচার একটি প্রচলিত প্রথার রূপ ধারণ করেছিল। পুরুষ ইচ্ছে করলেই কয়েকজন উপপত্নী বা রক্ষিতা গ্রহণ করতে পারত, নারীরাও মনে ধরলে কয়েকজন উপপতি বা প্রণয়সঙ্গী গ্রহণ করতে পারত। এতে কোনো বৈধ বন্ধন বা চুক্তির প্রয়োজন হতো না। ওই যুগে কী ধরনের বিবাহ প্রচলিত ছিল তার প্রকারভেদ উল্লেখ করে সাইয়িদা আয়িশা রা. বলেন,
«إِنَّ النَّكَاحَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ كَانَ عَلَى أَرْبَعَةِ أَنْحَاءٍ فَنِكَاحُ مِنْهَا نِكَاحُ النَّاسِ الْيَوْمَ يَخْطُبُ الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ وَلِيَّتَهُ أَوْ ابْنَتَهُ فَيُصْدِقُهَا ثُمَّ يَنْكِحُهَا وَنِكَاحَ آخَرُ كَانَ الرَّجُلُ يَقُولُ لِامْرَأَتِهِ إِذَا طَهُرَتْ مِنْ طَمْثِهَا أَرْسِلِي إِلَى فُلَانٍ فَاسْتَبْضِعِي مِنْهُ وَيَعْتَزِلُهَا زَوْجُهَا وَلَا يَمَسُّهَا أَبَدًا حَتَّى يَتَبَيَّنَ حَمْلُهَا مِنْ ذُلِكَ الرَّجُلِ الَّذِي تَسْتَبْضِعُ مِنْهُ فَإِذَا تَبَيَّنَ حَمْلُهَا أَصَابَهَا زَوْجُهَا إِذَا أَحَبَّ وَإِنَّمَا يَفْعَلُ ذَلِكَ رَغْبَةً فِي نَجَابَةِ الْوَلَدِ فَكَانَ هَذَا النِّكَاحُ نِكَاحَ الاسْتِبْضَاعِ وَنِكَاحُ آخَرُ يَجْتَمِعُ الرَّهْطُ مَا دُونَ الْعَشَرَةِ فَيَدْخُلُونَ عَلَى الْمَرْأَةِ كُلُّهُمْ يُصِيبُهَا فَإِذَا حَمَلَتْ وَوَضَعَتْ وَمَرَّ عَلَيْهَا لَيَالٍ بَعْدَ أَنْ تَضَعَ حَمْلَهَا أَرْسَلَتْ إِلَيْهِمْ فَلَمْ يَسْتَطِعْ رَجُلٌ مِنْهُمْ أَنْ يَمْتَنِعَ حَتَّى يَجْتَمِعُوا عِنْدَهَا تَقُولُ لَهُمْ قَدْ عَرَفْتُمْ الَّذِي كَانَ مِنْ أَمْرِكُمْ وَقَدْ وَلَدْتُ فَهُوَ ابْنُكَ يَا فُلَانُ تُسَمِّي مَنْ أَحَبَّتْ بِاسْمِهِ فَيَلْحَقُ بِهِ وَلَدُهَا لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يَمْتَنِعَ بِهِ الرَّجُلُ وَنِكَاحُ الرَّابِعِ يَجْتَمِعُ النَّاسُ الْكَثِيرُ فَيَدْخُلُونَ عَلَى الْمَرْأَةِ لَا تَمْتَنِعُ مِمَّنْ جَاءَهَا وَهُنَّ الْبَغَايَا كُنَّ يَنْصِبْنَ عَلَى أَبْوَابِهِنَّ رَايَاتٍ تَكُونُ عَلَمًا فَمَنْ أَرَادَهُنَّ دَخَلَ عَلَيْهِنَّ فَإِذَا حَمَلَتْ إِحْدَاهُنَّ وَوَضَعَتْ حَمْلَهَا جمِعُوا لَهَا وَدَعَوْا لَهُمُ الْقَافَةَ ثُمَّ أَلْحَقُوا وَلَدَهَا بِالَّذِي يَرَوْنَ فَالْتَاطَ بِهِ وَدُعِيَ ابْنَهُ لَا يَمْتَنِعُ مِنْ ذَلِكَ
জাহিলি যুগে চার প্রকারের বিবাহ প্রচলিত ছিল। প্রথম প্রকার : বর্তমান যে ব্যবস্থা চলছে অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি কোনো নারীর অভিভাবকের কাছে তার অধীনে থাকা নারী অথবা তার কন্যার জন্য বিবাহের প্রস্তাব দেবে এবং তার মোহর নির্ধারণের পর বিবাহ করবে। দ্বিতীয় প্রকার : কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তার মাসিক (ঋতুস্রাব) থেকে মুক্ত হওয়ার পর এই কথা বলত যে, তুমি অমুক ব্যক্তির কাছে যাও এবং তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম করো। এরপর স্বামী তার এই স্ত্রী থেকে পৃথক থাকত এবং কখনো স্ত্রীসহবাস করত না, যতক্ষণ না তার এই স্ত্রী যে লোকটার সঙ্গে যৌনসঙ্গমে মিলিত হচ্ছে তার দ্বারা গর্ভবতী হতো। যখন তার গর্ভ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হতো তখন ইচ্ছা করলে স্বামী তার এই স্ত্রীর সাথে সহবাস করত। স্বামী উন্নত ধরনের সন্তান প্রজননের আশায় এই কাজ করত। এ ধরনের বিবাহকে ‘নিকাহুল ইসতিবদা’ বলা হতো। তৃতীয় প্রকার বিবাহ: দশজনের কম সংখ্যক ব্যক্তি একত্র হয়ে পালাক্রমে একই নারীর সাথে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতো। যদি নারীটি গর্ভবতী হতো, তারপর সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কিছুদিন অতিবাহিত হতো, সেই নারী তার সঙ্গে সঙ্গমকারী সব পুরুষকে ডেকে পাঠাত এবং কেউই আসতে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না। তারা সবাই নারীটির সামনে সমবেত হওয়ার পর সে তাদেরকে বলত, তোমরা সকলেই জানো তোমরা কী করেছ! এখন আমি সন্তান প্রসব করেছি। সুতরাং হে অমুক! এটা তোমারই সন্তান। ওই নারী যাকে খুশি তার নাম ধরে ডাকত, তখন ওই পুরুষ নবজাতক শিশুটিকে গ্রহণ করতে বাধ্য থাকত এবং সে তা অস্বীকার করতে পারত না। চতুর্থ প্রকারের বিবাহ : বহু পুরুষ একজনমাত্র নারীর সঙ্গে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতো এবং ওই নারী তার কাছে যত পুরুষ আসত, কাউকে রমণসঙ্গী করতে অস্বীকার করত না। তারা ছিল বারবনিতা। বারবনিতারা তাদের চিহ্নরূপে নিজ নিজ ঘরের সামনে পতাকা উড়িয়ে রাখত। যে কেউ ইচ্ছা করলে অবাধে তাদের সঙ্গে যৌনসম্ভোগে লিপ্ত হতে পারত। যদি এসব নারীর মধ্যে কেউ গর্ভবতী হতো এবং সন্তান প্রসব করত তাহলে যৌনসঙ্গমকারী সকল পুরুষ সমবেত হতো এবং 'কায়িফ'(৮০)-কে ডেকে আনত। এ সকল ব্যক্তি সন্তানটির সঙ্গে যে লোকটির সাদৃশ্য পেত তাকে বলত, এটি তোমার সন্তান। তখন ওই পুরুষটি নবজাতক সন্তানকে নিজের নয় বলে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না।(৮১)
নারীদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে বলতে গেলে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. সারমর্মরূপে যে কথা বলেছেন সেটা উল্লেখ করাই সমীচীন। তিনি বলেছেন, 'আল্লাহর কসম! আমরা জাহিলি যুগে নারীদের কোনোকিছুরূপে গণ্য করতাম না। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে যা নাযিল করলেন তা তো সবার সামনেই রয়েছে।'(৮২)
নারীদের কোনো উত্তরাধিকার ছিল না। উত্তরাধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আরবরা বলত, আমাদের মধ্যে যারা তরবারি ধারণ করতে পারে এবং সম্পদ ও ভূখণ্ড রক্ষা করতে পারে তারাই কেবল উত্তরাধিকার পাবে। তাই কোনো লোক মারা গেলে তার পুত্রসন্তান উত্তরাধিকার পেত। পুত্রসন্তান না থাকলে তার নিকটাত্মীয় অভিভাবক তা পেত। পিতা বা ভাই বা চাচা, যে-ই হোক না কেন। আর মৃত ব্যক্তির স্ত্রী ও কন্যাদেরকে যে লোকটি উত্তরাধিকার পেয়েছে তার স্ত্রী ও কন্যাদের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হতো। তারা যা পেত, এরাও তা-ই পেত; তাদের ওপর যে দায়িত্ব বর্তাত এদের ওপরও একই দায়িত্ব বর্তাত। নারীর জন্য তার স্বামীর ওপর আদতেই কোনোরূপ অধিকার ছিল না। তালাকের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। পুরুষরা ইচ্ছামতো যে-কয়জন খুশি স্ত্রী গ্রহণ করতে পারত, নির্ধারিত কোনো সংখ্যা ছিল না। আরবদের একটি জঘন্য প্রথা ছিল এমন, কোনো লোক তার স্ত্রী এবং এই স্ত্রী ব্যতীত অন্য স্ত্রীদের সন্তান রেখে মারা গেলে তার বড় পুত্রসন্তান তার পিতার স্ত্রীর ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় অগ্রাধিকার পেত। সে তার পিতার অন্যান্য সম্পদের মতো স্ত্রীকেও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ মনে করত।(৮৩)
মেয়েদের প্রতি আরবদের ঘৃণা এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তারা মেয়েদের জীবন্ত পুঁতে ফেলতে শুরু করল। মেয়েদের পুঁতে ফেলা ছিল জাহিলি যুগের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্য প্রথা। আরবের কোনো কন্যাসন্তান যদি মাটির গর্ভে প্রোথিত হওয়া থেকে কোনোক্রমে বেঁচে যেত, তবে তাকে এক অন্ধকারপূর্ণ দুর্বিষহ জীবনের অপেক্ষায় থাকতে হতো। আল-কুরআনুল কারিম এই অবস্থাকে বর্ণনা করেছে এভাবে,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأُنْثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ كَظِيمٌ ( يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُونٍ أَمْ يَدُسُهُ فِي التُّرَابِ أَلَا ساءَ مَا يَحْكُمُونَ
তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয় তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয় তার গ্লানির কারণে সে নিজ সম্প্রদায় থেকে আত্মগোপনে চলে যায়। সে চিন্তা করে, হীনতাসত্ত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, নাকি মাটিতে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! তারা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা অতি নিকৃষ্ট!(৮৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে জাযিরাতুল আরবের পরিস্থিতি এমনই ছিল।

টিকাঃ
৭৩. জাওয়াদ আলি, আল-মুফাসসাল ফি তারিখিল আরব কাবলাল ইসলাম, খ. ১, পৃ. ৩৭১।
৭৪. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৭৬-৭৭।
৭৫. বুখারি, হাদিস নং ৪১১৭।
৭৬. আবুল মুনযির হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব আল-কালবি, কিতাবুল আসনাম, পৃ. ৪৪।
৭৭. সফিউদ্দিন মুবারকপুরি, আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪৭।
৭৮. কাতাদা আস-সাদুদি (৬০-১১৭/১১৮ হিজরি): বিশিষ্ট তাবেয়ি ও উঁচুস্তরের আলেম। আবু উবাইদা বলেন, প্রতিদিন বনু উমাইয়া এলাকা থেকে কোনো-না-কোনো ব্যক্তি কাতাদা আস-সাদুসির দরজায় কড়া নাড়তেন এবং তার কাছে হাদিস, বংশধারা বা কবিতা জানতে চাইতেন। তিনি ইরাকের ওয়াসিত জেলায় মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, ৪/৮৫-৮৬; যাহাবি, তাযকিরাতুল হুফফায, খ. ১,পৃ. ১২২-১২৩।
৭৯. তাবারি, জামিউল বায়ান ফি তাবিলিল কুরআন, খ. ১০, পৃ. ৫৭৩; আযিমাবাদি, আওনুল মাবুদ, খ. ১০, পৃ. ৭৯।
৮০. যে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি সন্তানের গোপন চিহ্ন দেখে তার পিতার সঙ্গে সাদৃশ্য নির্ণয় করতে পারতেন। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, খ. ৯, পৃ. ১৮৫।
৮১. বুখারি, কিতাব: বিবাহ, বাব: মান কালা লা নিকাহা ইল্লা বি-ওয়ালিয়্যিন, হাদিস নং ৪৮৩৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২২৭২।
৮২. বুখারি, কিতাব: আত-তাফসির, বাব: তাফসিরু সুরাতিত তালাক, হাদিস নং ৪৬২৯; মুসলিম, কিতাব: তালাক, বাব: ইলা ও ইতিযালুন নিসা ওয়া তাখইরিহিন্না, হাদিস নং ১৪৭৯।
৮৩. ড. মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইসমাইল আল-মুকাদ্দাম, আল-মারআতু বায়না তাকরিমিল ইসলাম ওয়া ইহানাতুল জাহিলিয়্যা, পৃ. ৫৭।
৮৪. সুরা নাহল: আয়াত ৫৮-৫৯।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 একনজরে ইসলামপূর্ব বিশ্ব

📄 একনজরে ইসলামপূর্ব বিশ্ব


আমরা ইসলামপূর্ব বিশ্বের কয়েকটি বৃহৎ সভ্যতার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছি। এখন আমরা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বে বিশ্ব, মানবমণ্ডলী ও মানবতার কী অবস্থা ছিল তার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করব। তার থেকে যে সারমর্ম আমরা পাই তা এই যে, স্তূপীকৃত গভীর অমানিশা চূর্ণবিচূর্ণ করার এবং মানবতার স্কন্ধমূলে আটকে পড়া যন্ত্রণা-দুর্দশাকে দূরীভূত করার জন্য ইসলামের আলো ও ইসলামি সভ্যতার প্রয়োজন প্রকট ছিল।
ইসলামপূর্ব বিশ্বের মোটামুটি অবস্থার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস উদ্ধৃত করছি। ইয়ায ইবনে হিমার রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ نَظَرَ إِلَى أَهْلِ الْأَرْضِ فَمَقَتَهُمْ عَرَبَهُمْ وَعَجَمَهُمْ إِلَّا بَقَايَا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
আল্লাহ তাআলা জমিনের মানবমণ্ডলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন, তখন (তাদের চরম পথভ্রষ্টতার কারণে) কতিপয় আহলে কিতাব ব্যতীত আরব ও অনারব সকলের ওপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। (৮৫)
মানুষের অবস্থা অধঃপতনের এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তা তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার ঘৃণা ও ক্রোধকে আবশ্যক করে তুলেছিল। হাদিসে ব্যবহৃত (مقت) 'মাক্ত' শব্দটি প্রচণ্ড ঘৃণা বোঝায়। কতিপয় আহলে কিতাবের কথা বলতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক (بقايا) 'বাকায়া' শব্দের ব্যবহার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রতি ইঙ্গিত করে। যেন তারা বহু প্রাচীন যুগের নিদর্শন, বাস্তবিক মানবমণ্ডলীর মধ্যে তাদের কোনো মূল্য নেই। অন্যদিকে এই কতিপয় আহলে কিতাব কখনোই পরিপূর্ণ সমাজ গঠন করতে পারেননি, বরং তারা সমাজের মুষ্টিমেয় সদস্য বলেই গণ্য ছিলেন।
সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ. এ বিষয়ে সবিস্তার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীর বুকে না ছিল কোনো বোধসম্পন্ন বিবেকবান জাতি, না ছিল নীতিনৈতিকতা ও মর্যাদাবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সমাজ। দয়া ও ইনসাফের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো শাসনব্যবস্থা ছিল না, জ্ঞানসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান শাসকও ছিল না, নেতাও ছিল না। আর নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) আনীত বিশুদ্ধ ধর্ম একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল। (৮৬)
গোটা মানববিশ্বে পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, অধঃপতিত, বিনাশ-কবলিত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয়-জীবনের সব দিকে, সব ক্ষেত্রে সমানভাবে ফ্যাসাদ ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। দুনিয়াকে গ্রাস করেছিল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, মূর্খতা ও অজ্ঞতা দুনিয়ার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল, যা দুনিয়াকে কুসংস্কার, অলিক ধ্যানধারণার সংঘর্ষপূর্ণ সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছিল। মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও রিপুই ছিল দুনিয়ার পরিচালক। তাই মানুষ পাথরের, সূর্যের, চন্দ্রের, আগুনের, এমনকি পশুর পূজা করত। গোটা মানবগোষ্ঠী বিভক্ত হয়ে পড়েছিল দুইভাগে, শাসক শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। তারা এতিম ও অসহায়দের সম্পদ আত্মসাৎ করত, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করত। তাদের পারস্পরিক লেনদেনই ছিল হানাহানি, লুণ্ঠন, ছিনতাই, রাহাজানি। শুধু তাই নয়, অপরাধ, পাপাচার ও গর্হিত কাজ করে তারা গৌরববোধ করত। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো নিয়মনীতি বা আইন ছিল না, ছিল কেবল মাৎস্যন্যায়, পাশবিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং জোর যার মুলুক তার নীতি। শক্তিমানরা দুর্বলদের শোষণ ও উৎপীড়ন করত, ধনীরা গরিবদের দাস বানিয়ে রাখত। সবাই বন্দি ছিল দুর্ভেদ্য অন্ধকারে, যার কোনো শেষ ছিল না, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না।
এসব পরিস্থিতি মানবমণ্ডলীকে উদ্‌ভ্রান্ত, হতাশ, রিক্ত-নিঃস্ব বানিয়ে দিয়েছিল। তাদের অন্তরে ভীতি ও আশঙ্কা ছাড়া কিছুই ছিল না। তাদের জ্ঞান ও চিন্তায় ছিল কেবল শূন্যতা, অলিক জল্পনাকল্পনা। ইসলামি সভ্যতার পূর্বে এটাই ছিল বিশ্বের মানবমণ্ডলীর অবস্থা!
ইসলামপূর্ব বিশ্বে এটাই ছিল অবস্থা, বিশেষ করে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। বিশ্বসভ্যতাগুলো গুটিয়ে গিয়েছিল। সবকিছু ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়।
অধ্যাপক ডেনিসন এই অবস্থার চিত্রায়ণ করেছেন এভাবে,
খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে সভ্য পৃথিবী ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়, কারণ যেসব বিশ্বাস সভ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে সহায়ক ছিল সেগুলোর বিনাশ ঘটে। এসব বিশ্বাসের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো উপযোগী কিছুই ছিল না। চারহাজার বছরের চেষ্টার ফলে যে বৃহৎ নগর-সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তা ভেঙে পড়ার উপক্রম ছিল। মানবতা যে বর্বরতা ও অসভ্যতা থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেদিকেই ফিরে যেতে চাইছিল। গোত্রগুলো পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ করছিল, রক্তপাত ঘটাচ্ছিল। কোনো আইন ছিল না, কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। খ্রিষ্টীয় মতবাদের ফলে যেসব শাসনব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছিল সেগুলো ঐক্য ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বদলে বিচ্ছিন্নতা ও ভাঙনের আগুনে ঘি ঢালছিল। ফলে যে সভ্যতা বিপুল ডালপালাসমৃদ্ধ বিশাল বৃক্ষের মতো ছিল, যার ছায়া ছড়িয়ে ছিল গোটা বিশ্বের ওপর তা শীর্ণকায় হয়ে হেলছিল। এতে তার দিকে ধেয়ে আসে ধ্বংস, এমনকি তার মজ্জাটুকুও শেষ হয়ে যায়। (৮৭)
ইসলামি সভ্যতার উষার উন্মেষ ও আলো ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত এরূপ अवस्थাই বিরাজমান ছিল। ইসলামি সভ্যতা মানবতার একটি উপহার, মনুষ্য কুলের জন্য পথনির্দেশনা।

টিকাঃ
৮৫. মুসলিম, কিতাব : আল-জান্নাহ ওয়া সিফাতু নাইমিহা ওয়া আহলিহা, হাদিস নং ২৮৬৫।
৮৬. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৯১।
৮৭. জন হপকিন্স ডেনিসন, Emotion as the Basis of Civilization; আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ৬, পৃ. ৩৬-৩৭।

আমরা ইসলামপূর্ব বিশ্বের কয়েকটি বৃহৎ সভ্যতার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছি। এখন আমরা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বে বিশ্ব, মানবমণ্ডলী ও মানবতার কী অবস্থা ছিল তার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করব। তার থেকে যে সারমর্ম আমরা পাই তা এই যে, স্তূপীকৃত গভীর অমানিশা চূর্ণবিচূর্ণ করার এবং মানবতার স্কন্ধমূলে আটকে পড়া যন্ত্রণা-দুর্দশাকে দূরীভূত করার জন্য ইসলামের আলো ও ইসলামি সভ্যতার প্রয়োজন প্রকট ছিল।
ইসলামপূর্ব বিশ্বের মোটামুটি অবস্থার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস উদ্ধৃত করছি। ইয়ায ইবনে হিমার রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ نَظَرَ إِلَى أَهْلِ الْأَرْضِ فَمَقَتَهُمْ عَرَبَهُمْ وَعَجَمَهُمْ إِلَّا بَقَايَا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
আল্লাহ তাআলা জমিনের মানবমণ্ডলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন, তখন (তাদের চরম পথভ্রষ্টতার কারণে) কতিপয় আহলে কিতাব ব্যতীত আরব ও অনারব সকলের ওপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। (৮৫)
মানুষের অবস্থা অধঃপতনের এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তা তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার ঘৃণা ও ক্রোধকে আবশ্যক করে তুলেছিল। হাদিসে ব্যবহৃত (مقت) 'মাক্ত' শব্দটি প্রচণ্ড ঘৃণা বোঝায়। কতিপয় আহলে কিতাবের কথা বলতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক (بقايا) 'বাকায়া' শব্দের ব্যবহার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রতি ইঙ্গিত করে। যেন তারা বহু প্রাচীন যুগের নিদর্শন, বাস্তবিক মানবমণ্ডলীর মধ্যে তাদের কোনো মূল্য নেই। অন্যদিকে এই কতিপয় আহলে কিতাব কখনোই পরিপূর্ণ সমাজ গঠন করতে পারেননি, বরং তারা সমাজের মুষ্টিমেয় সদস্য বলেই গণ্য ছিলেন।
সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ. এ বিষয়ে সবিস্তার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীর বুকে না ছিল কোনো বোধসম্পন্ন বিবেকবান জাতি, না ছিল নীতিনৈতিকতা ও মর্যাদাবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সমাজ। দয়া ও ইনসাফের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো শাসনব্যবস্থা ছিল না, জ্ঞানসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান শাসকও ছিল না, নেতাও ছিল না। আর নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) আনীত বিশুদ্ধ ধর্ম একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল। (৮৬)
গোটা মানববিশ্বে পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, অধঃপতিত, বিনাশ-কবলিত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয়-জীবনের সব দিকে, সব ক্ষেত্রে সমানভাবে ফ্যাসাদ ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। দুনিয়াকে গ্রাস করেছিল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, মূর্খতা ও অজ্ঞতা দুনিয়ার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল, যা দুনিয়াকে কুসংস্কার, অলিক ধ্যানধারণার সংঘর্ষপূর্ণ সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছিল। মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও রিপুই ছিল দুনিয়ার পরিচালক। তাই মানুষ পাথরের, সূর্যের, চন্দ্রের, আগুনের, এমনকি পশুর পূজা করত। গোটা মানবগোষ্ঠী বিভক্ত হয়ে পড়েছিল দুইভাগে, শাসক শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। তারা এতিম ও অসহায়দের সম্পদ আত্মসাৎ করত, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করত। তাদের পারস্পরিক লেনদেনই ছিল হানাহানি, লুণ্ঠন, ছিনতাই, রাহাজানি। শুধু তাই নয়, অপরাধ, পাপাচার ও গর্হিত কাজ করে তারা গৌরববোধ করত। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো নিয়মনীতি বা আইন ছিল না, ছিল কেবল মাৎস্যন্যায়, পাশবিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং জোর যার মুলুক তার নীতি। শক্তিমানরা দুর্বলদের শোষণ ও উৎপীড়ন করত, ধনীরা গরিবদের দাস বানিয়ে রাখত। সবাই বন্দি ছিল দুর্ভেদ্য অন্ধকারে, যার কোনো শেষ ছিল না, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না।
এসব পরিস্থিতি মানবমণ্ডলীকে উদ্‌ভ্রান্ত, হতাশ, রিক্ত-নিঃস্ব বানিয়ে দিয়েছিল। তাদের অন্তরে ভীতি ও আশঙ্কা ছাড়া কিছুই ছিল না। তাদের জ্ঞান ও চিন্তায় ছিল কেবল শূন্যতা, অলিক জল্পনাকল্পনা। ইসলামি সভ্যতার পূর্বে এটাই ছিল বিশ্বের মানবমণ্ডলীর অবস্থা!
ইসলামপূর্ব বিশ্বে এটাই ছিল অবস্থা, বিশেষ করে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। বিশ্বসভ্যতাগুলো গুটিয়ে গিয়েছিল। সবকিছু ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়।
অধ্যাপক ডেনিসন এই অবস্থার চিত্রায়ণ করেছেন এভাবে,
খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে সভ্য পৃথিবী ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়, কারণ যেসব বিশ্বাস সভ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে সহায়ক ছিল সেগুলোর বিনাশ ঘটে। এসব বিশ্বাসের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো উপযোগী কিছুই ছিল না। চারহাজার বছরের চেষ্টার ফলে যে বৃহৎ নগর-সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তা ভেঙে পড়ার উপক্রম ছিল। মানবতা যে বর্বরতা ও অসভ্যতা থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেদিকেই ফিরে যেতে চাইছিল। গোত্রগুলো পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ করছিল, রক্তপাত ঘটাচ্ছিল। কোনো আইন ছিল না, কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। খ্রিষ্টীয় মতবাদের ফলে যেসব শাসনব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছিল সেগুলো ঐক্য ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বদলে বিচ্ছিন্নতা ও ভাঙনের আগুনে ঘি ঢালছিল। ফলে যে সভ্যতা বিপুল ডালপালাসমৃদ্ধ বিশাল বৃক্ষের মতো ছিল, যার ছায়া ছড়িয়ে ছিল গোটা বিশ্বের ওপর তা শীর্ণকায় হয়ে হেলছিল। এতে তার দিকে ধেয়ে আসে ধ্বংস, এমনকি তার মজ্জাটুকুও শেষ হয়ে যায়। (৮৭)
ইসলামি সভ্যতার উষার উন্মেষ ও আলো ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত এরূপ अवस्थাই বিরাজমান ছিল। ইসলামি সভ্যতা মানবতার একটি উপহার, মনুষ্য কুলের জন্য পথনির্দেশনা।

টিকাঃ
৮৫. মুসলিম, কিতাব : আল-জান্নাহ ওয়া সিফাতু নাইমিহা ওয়া আহলিহা, হাদিস নং ২৮৬৫।
৮৬. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৯১।
৮৭. জন হপকিন্স ডেনিসন, Emotion as the Basis of Civilization; আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ৬, পৃ. ৩৬-৩৭।

আমরা ইসলামপূর্ব বিশ্বের কয়েকটি বৃহৎ সভ্যতার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছি। এখন আমরা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বে বিশ্ব, মানবমণ্ডলী ও মানবতার কী অবস্থা ছিল তার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করব। তার থেকে যে সারমর্ম আমরা পাই তা এই যে, স্তূপীকৃত গভীর অমানিশা চূর্ণবিচূর্ণ করার এবং মানবতার স্কন্ধমূলে আটকে পড়া যন্ত্রণা-দুর্দশাকে দূরীভূত করার জন্য ইসলামের আলো ও ইসলামি সভ্যতার প্রয়োজন প্রকট ছিল।
ইসলামপূর্ব বিশ্বের মোটামুটি অবস্থার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস উদ্ধৃত করছি। ইয়ায ইবনে হিমার রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ نَظَرَ إِلَى أَهْلِ الْأَرْضِ فَمَقَتَهُمْ عَرَبَهُمْ وَعَجَمَهُمْ إِلَّا بَقَايَا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
আল্লাহ তাআলা জমিনের মানবমণ্ডলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন, তখন (তাদের চরম পথভ্রষ্টতার কারণে) কতিপয় আহলে কিতাব ব্যতীত আরব ও অনারব সকলের ওপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। (৮৫)
মানুষের অবস্থা অধঃপতনের এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তা তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার ঘৃণা ও ক্রোধকে আবশ্যক করে তুলেছিল। হাদিসে ব্যবহৃত (مقت) 'মাক্ত' শব্দটি প্রচণ্ড ঘৃণা বোঝায়। কতিপয় আহলে কিতাবের কথা বলতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক (بقايا) 'বাকায়া' শব্দের ব্যবহার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রতি ইঙ্গিত করে। যেন তারা বহু প্রাচীন যুগের নিদর্শন, বাস্তবিক মানবমণ্ডলীর মধ্যে তাদের কোনো মূল্য নেই। অন্যদিকে এই কতিপয় আহলে কিতাব কখনোই পরিপূর্ণ সমাজ গঠন করতে পারেননি, বরং তারা সমাজের মুষ্টিমেয় সদস্য বলেই গণ্য ছিলেন।
সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ. এ বিষয়ে সবিস্তার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীর বুকে না ছিল কোনো বোধসম্পন্ন বিবেকবান জাতি, না ছিল নীতিনৈতিকতা ও মর্যাদাবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সমাজ। দয়া ও ইনসাফের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো শাসনব্যবস্থা ছিল না, জ্ঞানসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান শাসকও ছিল না, নেতাও ছিল না। আর নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) আনীত বিশুদ্ধ ধর্ম একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল। (৮৬)
গোটা মানববিশ্বে পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, অধঃপতিত, বিনাশ-কবলিত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয়-জীবনের সব দিকে, সব ক্ষেত্রে সমানভাবে ফ্যাসাদ ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। দুনিয়াকে গ্রাস করেছিল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, মূর্খতা ও অজ্ঞতা দুনিয়ার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল, যা দুনিয়াকে কুসংস্কার, অলিক ধ্যানধারণার সংঘর্ষপূর্ণ সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছিল। মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও রিপুই ছিল দুনিয়ার পরিচালক। তাই মানুষ পাথরের, সূর্যের, চন্দ্রের, আগুনের, এমনকি পশুর পূজা করত। গোটা মানবগোষ্ঠী বিভক্ত হয়ে পড়েছিল দুইভাগে, শাসক শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। তারা এতিম ও অসহায়দের সম্পদ আত্মসাৎ করত, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করত। তাদের পারস্পরিক লেনদেনই ছিল হানাহানি, লুণ্ঠন, ছিনতাই, রাহাজানি। শুধু তাই নয়, অপরাধ, পাপাচার ও গর্হিত কাজ করে তারা গৌরববোধ করত। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো নিয়মনীতি বা আইন ছিল না, ছিল কেবল মাৎস্যন্যায়, পাশবিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং জোর যার মুলুক তার নীতি। শক্তিমানরা দুর্বলদের শোষণ ও উৎপীড়ন করত, ধনীরা গরিবদের দাস বানিয়ে রাখত। সবাই বন্দি ছিল দুর্ভেদ্য অন্ধকারে, যার কোনো শেষ ছিল না, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না।
এসব পরিস্থিতি মানবমণ্ডলীকে উদ্‌ভ্রান্ত, হতাশ, রিক্ত-নিঃস্ব বানিয়ে দিয়েছিল। তাদের অন্তরে ভীতি ও আশঙ্কা ছাড়া কিছুই ছিল না। তাদের জ্ঞান ও চিন্তায় ছিল কেবল শূন্যতা, অলিক জল্পনাকল্পনা। ইসলামি সভ্যতার পূর্বে এটাই ছিল বিশ্বের মানবমণ্ডলীর অবস্থা!
ইসলামপূর্ব বিশ্বে এটাই ছিল অবস্থা, বিশেষ করে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। বিশ্বসভ্যতাগুলো গুটিয়ে গিয়েছিল। সবকিছু ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়।
অধ্যাপক ডেনিসন এই অবস্থার চিত্রায়ণ করেছেন এভাবে,
খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে সভ্য পৃথিবী ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়, কারণ যেসব বিশ্বাস সভ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে সহায়ক ছিল সেগুলোর বিনাশ ঘটে। এসব বিশ্বাসের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো উপযোগী কিছুই ছিল না। চারহাজার বছরের চেষ্টার ফলে যে বৃহৎ নগর-সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তা ভেঙে পড়ার উপক্রম ছিল। মানবতা যে বর্বরতা ও অসভ্যতা থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেদিকেই ফিরে যেতে চাইছিল। গোত্রগুলো পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ করছিল, রক্তপাত ঘটাচ্ছিল। কোনো আইন ছিল না, কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। খ্রিষ্টীয় মতবাদের ফলে যেসব শাসনব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছিল সেগুলো ঐক্য ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বদলে বিচ্ছিন্নতা ও ভাঙনের আগুনে ঘি ঢালছিল। ফলে যে সভ্যতা বিপুল ডালপালাসমৃদ্ধ বিশাল বৃক্ষের মতো ছিল, যার ছায়া ছড়িয়ে ছিল গোটা বিশ্বের ওপর তা শীর্ণকায় হয়ে হেলছিল। এতে তার দিকে ধেয়ে আসে ধ্বংস, এমনকি তার মজ্জাটুকুও শেষ হয়ে যায়। (৮৭)
ইসলামি সভ্যতার উষার উন্মেষ ও আলো ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত এরূপ अवस्थাই বিরাজমান ছিল। ইসলামি সভ্যতা মানবতার একটি উপহার, মনুষ্য কুলের জন্য পথনির্দেশনা।

টিকাঃ
৮৫. মুসলিম, কিতাব : আল-জান্নাহ ওয়া সিফাতু নাইমিহা ওয়া আহলিহা, হাদিস নং ২৮৬৫।
৮৬. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৯১।
৮৭. জন হপকিন্স ডেনিসন, Emotion as the Basis of Civilization; আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ৬, পৃ. ৩৬-৩৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00