📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 রোমান সভ্যতা

📄 রোমান সভ্যতা


গ্রিক সভ্যতার পর রোমান সভ্যতাকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় সভ্যতা মনে করা হয়। এই সভ্যতা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নতুন নগরকেন্দ্রিতার সঙ্গে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে একটি হলো তাদের প্রণীত শাসনবিধি। এ শাসনবিধি আমাদের কাছে স্পষ্ট করে তোলে রোমান চিন্তাবিদ ও দার্শনিকগণ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। তাদের Legal status of persons (ব্যক্তির আইনগত অবস্থা)-য় আমরা সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কের প্রকৃতি, ব্যক্তির অধিকার ও দায়দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের চিন্তাধারা পেয়ে যাই।
রোমানরা সভ্যতা ও অগ্রগতির সংহত পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং শক্তি ও প্রতাপের সঙ্গে সভ্য পৃথিবীকে শাসন করার ক্ষেত্রে তারা পারসিকদের অংশীদার হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তের পূর্বে তা গভীর খাদে পৌঁছে গিয়েছিল। সভ্যতার প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা নৈরাজ্যের নিম্নতম স্তরে পতনোন্মুখ ছিল।
ড. আহমাদ শালবি রোমান সভ্যতার পরিস্থিতি ও অবস্থার সারসংক্ষেপ দাঁড় করিয়েছেন এবং বলেছেন, রোমানরা খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে আক্রমণ চালিয়ে ইউরোপে আধিপত্য বিস্তার করে। তারপর ৬৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিরিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করে এবং ৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশর দখল করে নেয়। ফলে ইউরোপের ও প্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাঞ্চলগুলো রোমানদের কর্তৃত্বাধীনে চলে যায়। এই অঞ্চলগুলো রোমান শাসনাধীন থেকে উৎপীড়ন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়, উদ্ভাবন ও চিন্তার শক্তি পর্যুদস্ত হয়। রোমানদের অত্যাচার ও জুলুমের জোয়ালের নিচে উৎকর্ষের অগ্নিশিখা নির্বাপিত হয়। রোমান সাম্রাজ্য তাদের আধিপত্যাধীন এলাকাগুলোতে সভ্যতার মশাল বহন করে নিয়ে যেতে পারেনি। কারণ রোম কোনো কালেই চিন্তার কোনো কেন্দ্রভূমি ছিল না, যেমন প্রাচীন মিশরের কেন্দ্র ছিল আইনে শামস, বা গ্রিক সভ্যতার উত্থানের সময় কেন্দ্র ছিল এথেন্স ও আলেকজান্দ্রিয়া। এ কারণে সভ্যতার উদ্যম ও বিকাশ থেমে গিয়েছিল। (৬৩)
হযরত ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালামের আবির্ভাবের পরও সম্রাট কনস্টান্টাইনের (২৭২-৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) শাসনকাল পর্যন্ত দীর্ঘকাল রোমানদের রাষ্ট্রীয় নীতিতে পৌত্তলিকতা থেকে গিয়েছিল। সম্রাট কনস্টান্টাইন ৩০৬ থেকে ৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্য শাসন করেছেন। এই সম্রাট কিছু নীতি ও কার্যাবলী গ্রহণ করেছিলেন যার দ্বারা মাসিহি ধর্মের (খ্রিষ্টধর্মের) কোমর মজবুত হয়েছিল। এরপর খ্রিষ্টধর্মের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল। সম্রাট কনস্টান্টাইন তখন মৃত্যুশয্যায়। কিন্তু তিনি খ্রিষ্টধর্মের জন্য যা-কিছু করেছেন সেটাকে গির্জার কর্ণধারেরা তার পক্ষ থেকে যথেষ্ট মনে করেনি। তারা এই সম্রাটের নামে Donation of Constantine নাম দিয়ে একটি দলিল তৈরি করে। এই দলিল ঘোষণা করে যে, সম্রাট পোপকে পোপতন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রভৃত পার্থিব ক্ষমতা দিয়েছেন। এই পোপতন্ত্র ছিল মূলত পোপদেরই তৈরি। সমালোচকগণ সমালোচনার সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে এই দলিলের অসারতা প্রমাণ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, খ্রিষ্টধর্মের ব্যাপারে কনস্টান্টাইনের অবস্থান ধর্মগুরুদের অধিকতর কর্তৃত্বপরায়ণ হতে প্রলুব্ধ করেছিল। যা ধর্মের বিষয়াবলি অতিক্রম করে গিয়ে পার্থিব বিষয়ে পর্যবসিত হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে গির্জার কর্ণধারেরা সফল হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকের শেষের দিকে মিলানের বিশপ সম্রাট থিওডোসিয়াস (Theodosius I)-এর কতিপয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন এবং অবশেষে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। ৩৯৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট থিওডোসিয়াস মৃত্যুবরণ করেন। (৬৪)
খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের শুরু থেকে গির্জা কর্তৃপক্ষ রোমান সাম্রাজ্যে বহুবিধ বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করে, প্রধানত চিন্তাগত বিভিন্ন ধারায়। এ সকল চিন্তাধারার শেকড় ও ভিত্তি ছিল মিশরীয় অথবা ফিনিশীয়। এসব চিন্তাধারা ও শিক্ষাধারার ক্ষেত্রে গির্জার অবস্থান কী ছিল? নিম্নলিখিত কয়েকটি বিবেচনায় তাদের অবস্থান নির্ণয় করা যায়:
ক. দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের জন্য যা-কিছু প্রয়োজন তার সব পবিত্র গ্রন্থের (বাইবেলের) দুই মলাটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুতরাং এ পবিত্র গ্রন্থই সমস্ত বিশ্বাস ও চিন্তাধারার ভিত্তি এবং কেবল গির্জার ধর্মগুরুরাই এ গ্রন্থের বাণীসমূহ ব্যাখ্যার অধিকার রাখেন। শুধু তাই নয়, জনমণ্ডলীকেও এই ব্যাখ্যা কোনো ধরনের চিন্তা ও বোঝাপড়া ব্যতীত মেনে নিতে হবে।
খ. উল্লিখিত বক্তব্য অনুসারে লোকদের প্রধান বিশ্বাস ছিল এই যে, পবিত্র কিতাব (বাইবেল) ব্যতীত সবকিছু সম্পূর্ণরূপে বাতিল। সুতরাং ভিন্নকিছুর সমর্থন ও পঠনপাঠন বৈধ নয়।
গ. গির্জার ধর্মগুরুরা এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি ও তাঁর আইন বাস্তবায়নকারী। সুতরাং যারা তাদের চিন্তাধারার বিরোধিতা করবে তাদের শাস্তি প্রদান এবং যারা তাদের আনুগত্য করবে তাদের পুরস্কার প্রদানের অধিকার গির্জার ধর্মগুরুদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। যেমন আল্লাহ তাআলার মানুষের ক্ষেত্রে এই দুটি কাজ সম্পূর্ণরূপে করে থাকেন।
ঘ. খ্রিষ্টধর্ম মাসিহ আলাইহিস সালাম কর্তৃক আনীত মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। স্বাভাবিকভাবেই মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলি প্রাকৃতিক নিয়মনীতি ও জ্ঞানগত মৌলিকতার বিপরীত ও বিরোধী হয়ে থাকে। আর খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা যেহেতু মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলি একনিষ্ঠভাবে বিশ্বাস করত, সেহেতু তারা এর পক্ষ নিয়ে জ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কেননা, জ্ঞান অলৌকিকতার বিপরীত বিষয়।
ঙ. খ্রিষ্টধর্মের দলিলগুলো ছিল দেহ, সম্পদ ও ভোগসামগ্রীর প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন দুনিয়াবিমুখতা এবং আসমানি রাজ্যের প্রতীক্ষার পক্ষে, আর প্রাচ্যে বিকশিত অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানরাশি ছিল পার্থিব জগতের সেবায় নিবেদিত, তাই খ্রিষ্টীয় ধর্মগুরুদের চিন্তাধারা এ সকল জ্ঞানের বিরোধী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। (৬৫)
এ কারণে গির্জা বহুবিধ জ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল, যেভাবে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল জ্ঞানী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। তা ছাড়া গির্জা কর্তৃপক্ষ কতিপয় চিন্তাধারাকে পবিত্র গ্রন্থের লাগাম পরিয়ে দেয় এবং সেগুলোকে নিজেরা কুক্ষিগত করে নেয়। তারা অসংখ্য চিন্তাধারার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, এমনকি চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যার বিরোধী ছিল। তাই গির্জা এসব জ্ঞানধারার কিছু গ্রন্থকে পুড়িয়ে ফেলে এবং অবশিষ্ট গ্রন্থরাশিকে মাটির গর্ভে সমাধিস্থ করে। ফলে কেউ তার খোঁজ পায়নি, সবই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। (৬৬)
গির্জা দীর্ঘ সময় ধরে এই রাজনীতি চালায়। যখন স্বাধীনতার যুগ শুরু হলো এবং গ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলা ও জব্দ করার বিষয়টি তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে গেল, তখন তারা কিছু সিদ্ধান্ত প্রকাশ করল, যা খ্রিষ্টানদের জন্য ওইসব গ্রন্থপাঠ নিষিদ্ধ করে, যে গ্রন্থগুলো ছিল তাদের ধর্মবিরোধী, ধর্মের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং গির্জার গুমোর ফাঁসকারী। পৃথিবী ঘুরছে এই মত যারা ব্যক্ত করেছিল তারা তাদেরকেও একইভাবে 'ধর্মচ্যুত' ঘোষণা করে। এভাবেই খ্রিষ্টধর্মের কর্ণধারেরা পৃথিবীতে দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে বিশাল সভ্যতার যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল তা ধ্বংস করে দেয়। অধিকন্তু এ সকল লোক ধর্মকে পুঁজিরূপে খাটায় এবং ধর্মের বিকৃতি সাধন করে। ধর্মকে আলোকবর্তিকা বানানোর বদলে তারা এটিকে মূর্খতা ও অন্ধকারের অবলম্বন বানিয়ে ফেলে। (৬৭)
অন্যদিকে খ্রিষ্টধর্মের পার্শ্বিক বিষয়াবলিতে, এমনকি মৌলিক বিষয়সমূহে কূটতর্ক, গভীর বিবাদবিসংবাদের ঝড় শুরু হয়েছিল। তা জাতির চিন্তাকে বিমূঢ় করে দিয়েছিল, জাতির সন্তানদের বুদ্ধি-বিবেচনাকে বিনষ্ট করে দিয়েছিল এবং তার জ্ঞানগত শক্তিকে গিলে ফেলেছিল। এসব বিষয় অনেক সময় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, হত্যা, বিনাশ, উৎপীড়ন, আক্রমণ, লুণ্ঠন ও গুপ্তহত্যার রূপ নিয়েছিল। শিক্ষালয়, উপাসনালয়, বাড়িঘর সবকিছু ধর্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমরশিবিরে পরিণত হয়েছিল। গোটা দেশ গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই ধর্মীয় বিরোধের ভয়াবহ প্রকাশ ঘটেছিল সিরিয়া ও রোমান সাম্রাজ্যের খ্রিষ্টানগোষ্ঠী এবং মিশরের খ্রিষ্টানগোষ্ঠীর মধ্যে। আরও সূক্ষ্মভাবে বললে এটি ছিল মুলকানিয়‍্যা (Melkite/রাজধর্ম) ও মানুফিসিয়্যা (Manichaeism/মানিবাদ) ধর্মাদর্শের বিরোধ।
মুলকানিয়‍্যার মূলনীতি ছিল যিশুখ্রিষ্টের মানবিক সত্তা ও ঐশ্বরিক সত্তার মিলনে (দ্বৈতসত্তায়) বিশ্বাসস্থাপন এবং মানিবাদীরা বিশ্বাস করত যে, যিশুখ্রিষ্টের একটিমাত্র সত্তা রয়েছে, তা হলো ঐশ্বরিক সত্তা, তার ঐশ্বরিক সত্তায় তার মানবিক সত্তা বিলীন হয়ে গেছে। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে এই গোষ্ঠী দুটির বিরোধ ও সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌছেছিল। এমনকি তা যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দুটি ভিন্ন ধর্মের মধ্যে তুমুল লড়াই অথবা ইহুদি ও নাসারাদের মধ্যকার বিবাদ। যেখানে ইহুদিদের দাবি নাসারারা কোনো ধর্মের ওপর নেই এবং নাসারাদের দাবি ইহুদিরা কোনো ধর্মের ওপর নেই। (৬৮)
সামাজিক দিক বিবেচনা করতে গেলে রোমান সমাজ দুটি স্তরে বিভক্ত ছিল, অভিজাত শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। যাবতীয় অধিকার ছিল অভিজাত শ্রেণির জন্য। আর দাস শ্রেণির জন্য কোনো ধরনের নাগরিক অধিকার ছিল না। সত্য এই যে, রোমান আইনকানুন দাস শ্রেণির ক্ষেত্রে 'ব্যক্তি' শব্দটি প্রয়োগ করতে দ্বিধান্বিত ছিল। অবশেষে তার 'ব্যক্তিত্বহীন ব্যক্তি' নামকরণ করে এই জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসে। রোমান অভিজাত শ্রেণির লোকেরা দাসদেরকে 'পণ্য' গণ্য করত। তাই তাদের মালিকানার অধিকার ছিল না, তারা কারও উত্তরাধিকারী হতে পারত না, তাদেরও কেউ উত্তরাধিকারী হতো না, তারা বৈধভাবে স্ত্রী গ্রহণ করতে পারত না। তাদের সব সন্তানসন্ততিকে অবৈধ সন্তান বলে গণ্য করা হতো। একইভাবে তারা দাসীদের সন্তানদেরকে দাস বিবেচনা করত, তাদের পিতা স্বাধীন ও অভিজাত শ্রেণির হলেও। অভিজাত শ্রেণির লোকদের জন্য আইনগত বন্দোবস্ত বা ক্ষতিপূরণ ব্যতিরেকেই দাস ও দাসীদের সঙ্গে গর্হিত কাজ করার অধিকার ছিল। অন্যদিকে দাসদের জন্য জুলুম ও নির্যাতনের বিচার চাওয়ার অধিকার বা শক্তি ছিল না। দাসদের নির্যাতন করা হলে নির্যাতককে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য অধিকার প্রদানের বিষয়টি ছিল মনিবের হাতে। উপরন্তু মনিবই দাসদের প্রহার করত, বন্দি করে রাখত, বনেজঙ্গলে হিংস্র জন্তুজানোয়ারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশ দিত, ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য করত, কোনো অজুহাতে বা অজুহাত ছাড়াই তাদের হত্যা করত। দাসদের মালিকদের পক্ষ থেকে গৃহীত সাধারণ মতামতের বাইরে দাস শ্রেণির তত্ত্বাবধানের জন্য আর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কোনো দাস পালিয়ে যাওয়ার পর তাকে আটক করতে পারলে মনিবের অধিকার ছিল ওই দাসকে আগুনে ঝলসানোর অথবা শূলবিদ্ধ করে হত্যা করার। সম্রাট অগাস্টাস গর্ববোধ করতেন যে তিনি ত্রিশ হাজার পলাতক দাসকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছিলেন এবং দাবি করার মতো মালিক না পেয়ে তাদের শূলবিদ্ধ করে হত্যা করেছিলেন। উল্লিখিত নির্যাতনের ভয়ে বা অন্যকোনো কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত কোনো দাস যদি তার মনিবকে হত্যা করত তবে রোমান আইন ওই মনিবের সকল দাসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দিত। ৬১ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সিনেটর পেডানিয়াস সেকানদাস (Lucius Pedanius Secundus) তার এক দাস কর্তৃক নিহত হন। এ ঘটনার পর রোমান সিনেটররা রোমান আইন অনুযায়ী তার সকল দাসের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন। ফলে তার চারশ দাসকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিছু সংখ্যক সিনেটর এই নির্দেশের বিরোধিতা করেছিলেন এবং একটি বিক্ষুব্ধ দল রাস্তায় নেমে ক্ষমা ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সিনেটর সভা এই আইন বাস্তবায়নে জোরজবরদস্তি করে। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এমন নির্মম সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করলে মনিবরা তাদের দাসদের ব্যাপারে নিরাপত্তা বোধ করবেন না। (৬৯)
শুধু এটাই নয়, রোমান আইন মনিবকে এ অধিকার দিয়েছিল যে, সে তার দাসকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে অথবা জীবনদান করতে পারবে। ওই যুগে দাসের সংখ্যা খুব বেশি বেড়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন যে, রোমান রাজ্যগুলোতে দাসের সংখ্যা স্বাধীন মানুষের চেয়ে তিনগুণ বেশি ছিল। (৭০)
রোমান সমাজে নারীদের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। ওই যুগের নারীদের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন এমন সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, নারী ছিল আত্মাহীন কাঠামো। এ কারণে নারীর পরকালীন জীবন বলতে কিছু নেই। নারী ছিল অপবিত্র। তাই তাদের গোশত খাওয়ার অধিকার ছিল না, হাসারও অধিকার ছিল না। এমনকি কথা বলার অধিকারও ছিল না। তারা নারীর মুখে লোহার তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। (৭১)
আমরা যা-কিছু উল্লেখ করেছি তার পরিণতি ছিল ভয়াবহ। রোমান সভ্যতার নক্ষত্র অস্তমিত হতে শুরু করেছিল। মানবিক গুণাবলির ভিত্তিসমূহ ধসে গিয়েছিল। চরিত্র ও নৈতিকতার অবলম্বনগুলো ধ্বংস হয়ে পড়েছিল। এডওয়ার্ড গিবন তার লেখায় এসব বিষয় চিত্রায়িত করেছেন এবং বলেছেন, ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে রোমান সাম্রাজ্য তার বিনাশ ও অধঃপতনের শেষ ধাপে পৌঁছে গিয়েছিল। (৭২)

টিকাঃ
৬৩. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৬।
৬৪. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৬-৫৭।
৬৫. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৭-৫৮।
৬৬. ইবনে নুবাতা আল-মিসরি, সাহরুল উয়ুন ফি শরহি রিসালাত ইবনে যায়দুন, পৃ. ৩৬; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩০৩।
৬৭. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৭-৬০।
৬৮. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৪৩।
৬৯. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১০, পৃ. ৩৭০-৩৭১।
৭০. আহমাদ আমিন, ফাজরুল ইসলাম, পৃ. ৮৮।
৭১. আহমাদ শালবি, মুকারানাতুল আদইয়ান, খ. ২, পৃ. ১৮৮; আফিফ তাইয়ারাহ, আদ-দ্বীনুল ইসলামি, পৃ. ২৭১।
৭২. এডওয়ার্ড গিবন, The History of the Decline and Fall of the Roman Empire, খ. ৫. পৃ. ৩৩, সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৪৬।

গ্রিক সভ্যতার পর রোমান সভ্যতাকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় সভ্যতা মনে করা হয়। এই সভ্যতা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নতুন নগরকেন্দ্রিতার সঙ্গে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে একটি হলো তাদের প্রণীত শাসনবিধি। এ শাসনবিধি আমাদের কাছে স্পষ্ট করে তোলে রোমান চিন্তাবিদ ও দার্শনিকগণ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। তাদের Legal status of persons (ব্যক্তির আইনগত অবস্থা)-য় আমরা সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কের প্রকৃতি, ব্যক্তির অধিকার ও দায়দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের চিন্তাধারা পেয়ে যাই।
রোমানরা সভ্যতা ও অগ্রগতির সংহত পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং শক্তি ও প্রতাপের সঙ্গে সভ্য পৃথিবীকে শাসন করার ক্ষেত্রে তারা পারসিকদের অংশীদার হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তের পূর্বে তা গভীর খাদে পৌঁছে গিয়েছিল। সভ্যতার প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা নৈরাজ্যের নিম্নতম স্তরে পতনোন্মুখ ছিল।
ড. আহমাদ শালবি রোমান সভ্যতার পরিস্থিতি ও অবস্থার সারসংক্ষেপ দাঁড় করিয়েছেন এবং বলেছেন, রোমানরা খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে আক্রমণ চালিয়ে ইউরোপে আধিপত্য বিস্তার করে। তারপর ৬৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিরিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করে এবং ৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশর দখল করে নেয়। ফলে ইউরোপের ও প্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাঞ্চলগুলো রোমানদের কর্তৃত্বাধীনে চলে যায়। এই অঞ্চলগুলো রোমান শাসনাধীন থেকে উৎপীড়ন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়, উদ্ভাবন ও চিন্তার শক্তি পর্যুদস্ত হয়। রোমানদের অত্যাচার ও জুলুমের জোয়ালের নিচে উৎকর্ষের অগ্নিশিখা নির্বাপিত হয়। রোমান সাম্রাজ্য তাদের আধিপত্যাধীন এলাকাগুলোতে সভ্যতার মশাল বহন করে নিয়ে যেতে পারেনি। কারণ রোম কোনো কালেই চিন্তার কোনো কেন্দ্রভূমি ছিল না, যেমন প্রাচীন মিশরের কেন্দ্র ছিল আইনে শামস, বা গ্রিক সভ্যতার উত্থানের সময় কেন্দ্র ছিল এথেন্স ও আলেকজান্দ্রিয়া। এ কারণে সভ্যতার উদ্যম ও বিকাশ থেমে গিয়েছিল। (৬৩)
হযরত ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালামের আবির্ভাবের পরও সম্রাট কনস্টান্টাইনের (২৭২-৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) শাসনকাল পর্যন্ত দীর্ঘকাল রোমানদের রাষ্ট্রীয় নীতিতে পৌত্তলিকতা থেকে গিয়েছিল। সম্রাট কনস্টান্টাইন ৩০৬ থেকে ৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্য শাসন করেছেন। এই সম্রাট কিছু নীতি ও কার্যাবলী গ্রহণ করেছিলেন যার দ্বারা মাসিহি ধর্মের (খ্রিষ্টধর্মের) কোমর মজবুত হয়েছিল। এরপর খ্রিষ্টধর্মের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল। সম্রাট কনস্টান্টাইন তখন মৃত্যুশয্যায়। কিন্তু তিনি খ্রিষ্টধর্মের জন্য যা-কিছু করেছেন সেটাকে গির্জার কর্ণধারেরা তার পক্ষ থেকে যথেষ্ট মনে করেনি। তারা এই সম্রাটের নামে Donation of Constantine নাম দিয়ে একটি দলিল তৈরি করে। এই দলিল ঘোষণা করে যে, সম্রাট পোপকে পোপতন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রভৃত পার্থিব ক্ষমতা দিয়েছেন। এই পোপতন্ত্র ছিল মূলত পোপদেরই তৈরি। সমালোচকগণ সমালোচনার সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে এই দলিলের অসারতা প্রমাণ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, খ্রিষ্টধর্মের ব্যাপারে কনস্টান্টাইনের অবস্থান ধর্মগুরুদের অধিকতর কর্তৃত্বপরায়ণ হতে প্রলুব্ধ করেছিল। যা ধর্মের বিষয়াবলি অতিক্রম করে গিয়ে পার্থিব বিষয়ে পর্যবসিত হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে গির্জার কর্ণধারেরা সফল হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকের শেষের দিকে মিলানের বিশপ সম্রাট থিওডোসিয়াস (Theodosius I)-এর কতিপয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন এবং অবশেষে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। ৩৯৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট থিওডোসিয়াস মৃত্যুবরণ করেন। (৬৪)
খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের শুরু থেকে গির্জা কর্তৃপক্ষ রোমান সাম্রাজ্যে বহুবিধ বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করে, প্রধানত চিন্তাগত বিভিন্ন ধারায়। এ সকল চিন্তাধারার শেকড় ও ভিত্তি ছিল মিশরীয় অথবা ফিনিশীয়। এসব চিন্তাধারা ও শিক্ষাধারার ক্ষেত্রে গির্জার অবস্থান কী ছিল? নিম্নলিখিত কয়েকটি বিবেচনায় তাদের অবস্থান নির্ণয় করা যায়:
ক. দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের জন্য যা-কিছু প্রয়োজন তার সব পবিত্র গ্রন্থের (বাইবেলের) দুই মলাটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুতরাং এ পবিত্র গ্রন্থই সমস্ত বিশ্বাস ও চিন্তাধারার ভিত্তি এবং কেবল গির্জার ধর্মগুরুরাই এ গ্রন্থের বাণীসমূহ ব্যাখ্যার অধিকার রাখেন। শুধু তাই নয়, জনমণ্ডলীকেও এই ব্যাখ্যা কোনো ধরনের চিন্তা ও বোঝাপড়া ব্যতীত মেনে নিতে হবে।
খ. উল্লিখিত বক্তব্য অনুসারে লোকদের প্রধান বিশ্বাস ছিল এই যে, পবিত্র কিতাব (বাইবেল) ব্যতীত সবকিছু সম্পূর্ণরূপে বাতিল। সুতরাং ভিন্নকিছুর সমর্থন ও পঠনপাঠন বৈধ নয়।
গ. গির্জার ধর্মগুরুরা এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি ও তাঁর আইন বাস্তবায়নকারী। সুতরাং যারা তাদের চিন্তাধারার বিরোধিতা করবে তাদের শাস্তি প্রদান এবং যারা তাদের আনুগত্য করবে তাদের পুরস্কার প্রদানের অধিকার গির্জার ধর্মগুরুদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। যেমন আল্লাহ তাআলার মানুষের ক্ষেত্রে এই দুটি কাজ সম্পূর্ণরূপে করে থাকেন।
ঘ. খ্রিষ্টধর্ম মাসিহ আলাইহিস সালাম কর্তৃক আনীত মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। স্বাভাবিকভাবেই মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলি প্রাকৃতিক নিয়মনীতি ও জ্ঞানগত মৌলিকতার বিপরীত ও বিরোধী হয়ে থাকে। আর খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা যেহেতু মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলি একনিষ্ঠভাবে বিশ্বাস করত, সেহেতু তারা এর পক্ষ নিয়ে জ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কেননা, জ্ঞান অলৌকিকতার বিপরীত বিষয়।
ঙ. খ্রিষ্টধর্মের দলিলগুলো ছিল দেহ, সম্পদ ও ভোগসামগ্রীর প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন দুনিয়াবিমুখতা এবং আসমানি রাজ্যের প্রতীক্ষার পক্ষে, আর প্রাচ্যে বিকশিত অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানরাশি ছিল পার্থিব জগতের সেবায় নিবেদিত, তাই খ্রিষ্টীয় ধর্মগুরুদের চিন্তাধারা এ সকল জ্ঞানের বিরোধী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। (৬৫)
এ কারণে গির্জা বহুবিধ জ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল, যেভাবে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল জ্ঞানী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। তা ছাড়া গির্জা কর্তৃপক্ষ কতিপয় চিন্তাধারাকে পবিত্র গ্রন্থের লাগাম পরিয়ে দেয় এবং সেগুলোকে নিজেরা কুক্ষিগত করে নেয়। তারা অসংখ্য চিন্তাধারার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, এমনকি চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যার বিরোধী ছিল। তাই গির্জা এসব জ্ঞানধারার কিছু গ্রন্থকে পুড়িয়ে ফেলে এবং অবশিষ্ট গ্রন্থরাশিকে মাটির গর্ভে সমাধিস্থ করে। ফলে কেউ তার খোঁজ পায়নি, সবই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। (৬৬)
গির্জা দীর্ঘ সময় ধরে এই রাজনীতি চালায়। যখন স্বাধীনতার যুগ শুরু হলো এবং গ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলা ও জব্দ করার বিষয়টি তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে গেল, তখন তারা কিছু সিদ্ধান্ত প্রকাশ করল, যা খ্রিষ্টানদের জন্য ওইসব গ্রন্থপাঠ নিষিদ্ধ করে, যে গ্রন্থগুলো ছিল তাদের ধর্মবিরোধী, ধর্মের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং গির্জার গুমোর ফাঁসকারী। পৃথিবী ঘুরছে এই মত যারা ব্যক্ত করেছিল তারা তাদেরকেও একইভাবে 'ধর্মচ্যুত' ঘোষণা করে। এভাবেই খ্রিষ্টধর্মের কর্ণধারেরা পৃথিবীতে দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে বিশাল সভ্যতার যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল তা ধ্বংস করে দেয়। অধিকন্তু এ সকল লোক ধর্মকে পুঁজিরূপে খাটায় এবং ধর্মের বিকৃতি সাধন করে। ধর্মকে আলোকবর্তিকা বানানোর বদলে তারা এটিকে মূর্খতা ও অন্ধকারের অবলম্বন বানিয়ে ফেলে। (৬৭)
অন্যদিকে খ্রিষ্টধর্মের পার্শ্বিক বিষয়াবলিতে, এমনকি মৌলিক বিষয়সমূহে কূটতর্ক, গভীর বিবাদবিসংবাদের ঝড় শুরু হয়েছিল। তা জাতির চিন্তাকে বিমূঢ় করে দিয়েছিল, জাতির সন্তানদের বুদ্ধি-বিবেচনাকে বিনষ্ট করে দিয়েছিল এবং তার জ্ঞানগত শক্তিকে গিলে ফেলেছিল। এসব বিষয় অনেক সময় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, হত্যা, বিনাশ, উৎপীড়ন, আক্রমণ, লুণ্ঠন ও গুপ্তহত্যার রূপ নিয়েছিল। শিক্ষালয়, উপাসনালয়, বাড়িঘর সবকিছু ধর্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমরশিবিরে পরিণত হয়েছিল। গোটা দেশ গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই ধর্মীয় বিরোধের ভয়াবহ প্রকাশ ঘটেছিল সিরিয়া ও রোমান সাম্রাজ্যের খ্রিষ্টানগোষ্ঠী এবং মিশরের খ্রিষ্টানগোষ্ঠীর মধ্যে। আরও সূক্ষ্মভাবে বললে এটি ছিল মুলকানিয়‍্যা (Melkite/রাজধর্ম) ও মানুফিসিয়্যা (Manichaeism/মানিবাদ) ধর্মাদর্শের বিরোধ।
মুলকানিয়‍্যার মূলনীতি ছিল যিশুখ্রিষ্টের মানবিক সত্তা ও ঐশ্বরিক সত্তার মিলনে (দ্বৈতসত্তায়) বিশ্বাসস্থাপন এবং মানিবাদীরা বিশ্বাস করত যে, যিশুখ্রিষ্টের একটিমাত্র সত্তা রয়েছে, তা হলো ঐশ্বরিক সত্তা, তার ঐশ্বরিক সত্তায় তার মানবিক সত্তা বিলীন হয়ে গেছে। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে এই গোষ্ঠী দুটির বিরোধ ও সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌছেছিল। এমনকি তা যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দুটি ভিন্ন ধর্মের মধ্যে তুমুল লড়াই অথবা ইহুদি ও নাসারাদের মধ্যকার বিবাদ। যেখানে ইহুদিদের দাবি নাসারারা কোনো ধর্মের ওপর নেই এবং নাসারাদের দাবি ইহুদিরা কোনো ধর্মের ওপর নেই। (৬৮)
সামাজিক দিক বিবেচনা করতে গেলে রোমান সমাজ দুটি স্তরে বিভক্ত ছিল, অভিজাত শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। যাবতীয় অধিকার ছিল অভিজাত শ্রেণির জন্য। আর দাস শ্রেণির জন্য কোনো ধরনের নাগরিক অধিকার ছিল না। সত্য এই যে, রোমান আইনকানুন দাস শ্রেণির ক্ষেত্রে 'ব্যক্তি' শব্দটি প্রয়োগ করতে দ্বিধান্বিত ছিল। অবশেষে তার 'ব্যক্তিত্বহীন ব্যক্তি' নামকরণ করে এই জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসে। রোমান অভিজাত শ্রেণির লোকেরা দাসদেরকে 'পণ্য' গণ্য করত। তাই তাদের মালিকানার অধিকার ছিল না, তারা কারও উত্তরাধিকারী হতে পারত না, তাদেরও কেউ উত্তরাধিকারী হতো না, তারা বৈধভাবে স্ত্রী গ্রহণ করতে পারত না। তাদের সব সন্তানসন্ততিকে অবৈধ সন্তান বলে গণ্য করা হতো। একইভাবে তারা দাসীদের সন্তানদেরকে দাস বিবেচনা করত, তাদের পিতা স্বাধীন ও অভিজাত শ্রেণির হলেও। অভিজাত শ্রেণির লোকদের জন্য আইনগত বন্দোবস্ত বা ক্ষতিপূরণ ব্যতিরেকেই দাস ও দাসীদের সঙ্গে গর্হিত কাজ করার অধিকার ছিল। অন্যদিকে দাসদের জন্য জুলুম ও নির্যাতনের বিচার চাওয়ার অধিকার বা শক্তি ছিল না। দাসদের নির্যাতন করা হলে নির্যাতককে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য অধিকার প্রদানের বিষয়টি ছিল মনিবের হাতে। উপরন্তু মনিবই দাসদের প্রহার করত, বন্দি করে রাখত, বনেজঙ্গলে হিংস্র জন্তুজানোয়ারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশ দিত, ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য করত, কোনো অজুহাতে বা অজুহাত ছাড়াই তাদের হত্যা করত। দাসদের মালিকদের পক্ষ থেকে গৃহীত সাধারণ মতামতের বাইরে দাস শ্রেণির তত্ত্বাবধানের জন্য আর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কোনো দাস পালিয়ে যাওয়ার পর তাকে আটক করতে পারলে মনিবের অধিকার ছিল ওই দাসকে আগুনে ঝলসানোর অথবা শূলবিদ্ধ করে হত্যা করার। সম্রাট অগাস্টাস গর্ববোধ করতেন যে তিনি ত্রিশ হাজার পলাতক দাসকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছিলেন এবং দাবি করার মতো মালিক না পেয়ে তাদের শূলবিদ্ধ করে হত্যা করেছিলেন। উল্লিখিত নির্যাতনের ভয়ে বা অন্যকোনো কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত কোনো দাস যদি তার মনিবকে হত্যা করত তবে রোমান আইন ওই মনিবের সকল দাসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দিত। ৬১ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সিনেটর পেডানিয়াস সেকানদাস (Lucius Pedanius Secundus) তার এক দাস কর্তৃক নিহত হন। এ ঘটনার পর রোমান সিনেটররা রোমান আইন অনুযায়ী তার সকল দাসের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন। ফলে তার চারশ দাসকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিছু সংখ্যক সিনেটর এই নির্দেশের বিরোধিতা করেছিলেন এবং একটি বিক্ষুব্ধ দল রাস্তায় নেমে ক্ষমা ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সিনেটর সভা এই আইন বাস্তবায়নে জোরজবরদস্তি করে। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এমন নির্মম সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করলে মনিবরা তাদের দাসদের ব্যাপারে নিরাপত্তা বোধ করবেন না। (৬৯)
শুধু এটাই নয়, রোমান আইন মনিবকে এ অধিকার দিয়েছিল যে, সে তার দাসকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে অথবা জীবনদান করতে পারবে। ওই যুগে দাসের সংখ্যা খুব বেশি বেড়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন যে, রোমান রাজ্যগুলোতে দাসের সংখ্যা স্বাধীন মানুষের চেয়ে তিনগুণ বেশি ছিল। (৭০)
রোমান সমাজে নারীদের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। ওই যুগের নারীদের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন এমন সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, নারী ছিল আত্মাহীন কাঠামো। এ কারণে নারীর পরকালীন জীবন বলতে কিছু নেই। নারী ছিল অপবিত্র। তাই তাদের গোশত খাওয়ার অধিকার ছিল না, হাসারও অধিকার ছিল না। এমনকি কথা বলার অধিকারও ছিল না। তারা নারীর মুখে লোহার তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। (৭১)
আমরা যা-কিছু উল্লেখ করেছি তার পরিণতি ছিল ভয়াবহ। রোমান সভ্যতার নক্ষত্র অস্তমিত হতে শুরু করেছিল। মানবিক গুণাবলির ভিত্তিসমূহ ধসে গিয়েছিল। চরিত্র ও নৈতিকতার অবলম্বনগুলো ধ্বংস হয়ে পড়েছিল। এডওয়ার্ড গিবন তার লেখায় এসব বিষয় চিত্রায়িত করেছেন এবং বলেছেন, ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে রোমান সাম্রাজ্য তার বিনাশ ও অধঃপতনের শেষ ধাপে পৌঁছে গিয়েছিল। (৭২)

টিকাঃ
৬৩. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৬।
৬৪. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৬-৫৭।
৬৫. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৭-৫৮।
৬৬. ইবনে নুবাতা আল-মিসরি, সাহরুল উয়ুন ফি শরহি রিসালাত ইবনে যায়দুন, পৃ. ৩৬; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩০৩।
৬৭. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৭-৬০।
৬৮. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৪৩।
৬৯. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১০, পৃ. ৩৭০-৩৭১।
৭০. আহমাদ আমিন, ফাজরুল ইসলাম, পৃ. ৮৮।
৭১. আহমাদ শালবি, মুকারানাতুল আদইয়ান, খ. ২, পৃ. ১৮৮; আফিফ তাইয়ারাহ, আদ-দ্বীনুল ইসলামি, পৃ. ২৭১।
৭২. এডওয়ার্ড গিবন, The History of the Decline and Fall of the Roman Empire, খ. ৫. পৃ. ৩৩, সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৪৬।

গ্রিক সভ্যতার পর রোমান সভ্যতাকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় সভ্যতা মনে করা হয়। এই সভ্যতা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নতুন নগরকেন্দ্রিতার সঙ্গে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে একটি হলো তাদের প্রণীত শাসনবিধি। এ শাসনবিধি আমাদের কাছে স্পষ্ট করে তোলে রোমান চিন্তাবিদ ও দার্শনিকগণ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। তাদের Legal status of persons (ব্যক্তির আইনগত অবস্থা)-য় আমরা সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কের প্রকৃতি, ব্যক্তির অধিকার ও দায়দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের চিন্তাধারা পেয়ে যাই।
রোমানরা সভ্যতা ও অগ্রগতির সংহত পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং শক্তি ও প্রতাপের সঙ্গে সভ্য পৃথিবীকে শাসন করার ক্ষেত্রে তারা পারসিকদের অংশীদার হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তের পূর্বে তা গভীর খাদে পৌঁছে গিয়েছিল। সভ্যতার প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা নৈরাজ্যের নিম্নতম স্তরে পতনোন্মুখ ছিল।
ড. আহমাদ শালবি রোমান সভ্যতার পরিস্থিতি ও অবস্থার সারসংক্ষেপ দাঁড় করিয়েছেন এবং বলেছেন, রোমানরা খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে আক্রমণ চালিয়ে ইউরোপে আধিপত্য বিস্তার করে। তারপর ৬৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিরিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করে এবং ৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশর দখল করে নেয়। ফলে ইউরোপের ও প্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাঞ্চলগুলো রোমানদের কর্তৃত্বাধীনে চলে যায়। এই অঞ্চলগুলো রোমান শাসনাধীন থেকে উৎপীড়ন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়, উদ্ভাবন ও চিন্তার শক্তি পর্যুদস্ত হয়। রোমানদের অত্যাচার ও জুলুমের জোয়ালের নিচে উৎকর্ষের অগ্নিশিখা নির্বাপিত হয়। রোমান সাম্রাজ্য তাদের আধিপত্যাধীন এলাকাগুলোতে সভ্যতার মশাল বহন করে নিয়ে যেতে পারেনি। কারণ রোম কোনো কালেই চিন্তার কোনো কেন্দ্রভূমি ছিল না, যেমন প্রাচীন মিশরের কেন্দ্র ছিল আইনে শামস, বা গ্রিক সভ্যতার উত্থানের সময় কেন্দ্র ছিল এথেন্স ও আলেকজান্দ্রিয়া। এ কারণে সভ্যতার উদ্যম ও বিকাশ থেমে গিয়েছিল। (৬৩)
হযরত ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালামের আবির্ভাবের পরও সম্রাট কনস্টান্টাইনের (২৭২-৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) শাসনকাল পর্যন্ত দীর্ঘকাল রোমানদের রাষ্ট্রীয় নীতিতে পৌত্তলিকতা থেকে গিয়েছিল। সম্রাট কনস্টান্টাইন ৩০৬ থেকে ৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্য শাসন করেছেন। এই সম্রাট কিছু নীতি ও কার্যাবলী গ্রহণ করেছিলেন যার দ্বারা মাসিহি ধর্মের (খ্রিষ্টধর্মের) কোমর মজবুত হয়েছিল। এরপর খ্রিষ্টধর্মের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল। সম্রাট কনস্টান্টাইন তখন মৃত্যুশয্যায়। কিন্তু তিনি খ্রিষ্টধর্মের জন্য যা-কিছু করেছেন সেটাকে গির্জার কর্ণধারেরা তার পক্ষ থেকে যথেষ্ট মনে করেনি। তারা এই সম্রাটের নামে Donation of Constantine নাম দিয়ে একটি দলিল তৈরি করে। এই দলিল ঘোষণা করে যে, সম্রাট পোপকে পোপতন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রভৃত পার্থিব ক্ষমতা দিয়েছেন। এই পোপতন্ত্র ছিল মূলত পোপদেরই তৈরি। সমালোচকগণ সমালোচনার সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে এই দলিলের অসারতা প্রমাণ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, খ্রিষ্টধর্মের ব্যাপারে কনস্টান্টাইনের অবস্থান ধর্মগুরুদের অধিকতর কর্তৃত্বপরায়ণ হতে প্রলুব্ধ করেছিল। যা ধর্মের বিষয়াবলি অতিক্রম করে গিয়ে পার্থিব বিষয়ে পর্যবসিত হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে গির্জার কর্ণধারেরা সফল হয়েছিল। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকের শেষের দিকে মিলানের বিশপ সম্রাট থিওডোসিয়াস (Theodosius I)-এর কতিপয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন এবং অবশেষে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। ৩৯৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট থিওডোসিয়াস মৃত্যুবরণ করেন। (৬৪)
খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের শুরু থেকে গির্জা কর্তৃপক্ষ রোমান সাম্রাজ্যে বহুবিধ বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করে, প্রধানত চিন্তাগত বিভিন্ন ধারায়। এ সকল চিন্তাধারার শেকড় ও ভিত্তি ছিল মিশরীয় অথবা ফিনিশীয়। এসব চিন্তাধারা ও শিক্ষাধারার ক্ষেত্রে গির্জার অবস্থান কী ছিল? নিম্নলিখিত কয়েকটি বিবেচনায় তাদের অবস্থান নির্ণয় করা যায়:
ক. দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের জন্য যা-কিছু প্রয়োজন তার সব পবিত্র গ্রন্থের (বাইবেলের) দুই মলাটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সুতরাং এ পবিত্র গ্রন্থই সমস্ত বিশ্বাস ও চিন্তাধারার ভিত্তি এবং কেবল গির্জার ধর্মগুরুরাই এ গ্রন্থের বাণীসমূহ ব্যাখ্যার অধিকার রাখেন। শুধু তাই নয়, জনমণ্ডলীকেও এই ব্যাখ্যা কোনো ধরনের চিন্তা ও বোঝাপড়া ব্যতীত মেনে নিতে হবে।
খ. উল্লিখিত বক্তব্য অনুসারে লোকদের প্রধান বিশ্বাস ছিল এই যে, পবিত্র কিতাব (বাইবেল) ব্যতীত সবকিছু সম্পূর্ণরূপে বাতিল। সুতরাং ভিন্নকিছুর সমর্থন ও পঠনপাঠন বৈধ নয়।
গ. গির্জার ধর্মগুরুরা এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি ও তাঁর আইন বাস্তবায়নকারী। সুতরাং যারা তাদের চিন্তাধারার বিরোধিতা করবে তাদের শাস্তি প্রদান এবং যারা তাদের আনুগত্য করবে তাদের পুরস্কার প্রদানের অধিকার গির্জার ধর্মগুরুদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। যেমন আল্লাহ তাআলার মানুষের ক্ষেত্রে এই দুটি কাজ সম্পূর্ণরূপে করে থাকেন।
ঘ. খ্রিষ্টধর্ম মাসিহ আলাইহিস সালাম কর্তৃক আনীত মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। স্বাভাবিকভাবেই মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলি প্রাকৃতিক নিয়মনীতি ও জ্ঞানগত মৌলিকতার বিপরীত ও বিরোধী হয়ে থাকে। আর খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা যেহেতু মুজিযা ও অলৌকিক বিষয়াবলি একনিষ্ঠভাবে বিশ্বাস করত, সেহেতু তারা এর পক্ষ নিয়ে জ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কেননা, জ্ঞান অলৌকিকতার বিপরীত বিষয়।
ঙ. খ্রিষ্টধর্মের দলিলগুলো ছিল দেহ, সম্পদ ও ভোগসামগ্রীর প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন দুনিয়াবিমুখতা এবং আসমানি রাজ্যের প্রতীক্ষার পক্ষে, আর প্রাচ্যে বিকশিত অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানরাশি ছিল পার্থিব জগতের সেবায় নিবেদিত, তাই খ্রিষ্টীয় ধর্মগুরুদের চিন্তাধারা এ সকল জ্ঞানের বিরোধী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। (৬৫)
এ কারণে গির্জা বহুবিধ জ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল, যেভাবে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল জ্ঞানী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। তা ছাড়া গির্জা কর্তৃপক্ষ কতিপয় চিন্তাধারাকে পবিত্র গ্রন্থের লাগাম পরিয়ে দেয় এবং সেগুলোকে নিজেরা কুক্ষিগত করে নেয়। তারা অসংখ্য চিন্তাধারার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, এমনকি চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যার বিরোধী ছিল। তাই গির্জা এসব জ্ঞানধারার কিছু গ্রন্থকে পুড়িয়ে ফেলে এবং অবশিষ্ট গ্রন্থরাশিকে মাটির গর্ভে সমাধিস্থ করে। ফলে কেউ তার খোঁজ পায়নি, সবই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। (৬৬)
গির্জা দীর্ঘ সময় ধরে এই রাজনীতি চালায়। যখন স্বাধীনতার যুগ শুরু হলো এবং গ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলা ও জব্দ করার বিষয়টি তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে গেল, তখন তারা কিছু সিদ্ধান্ত প্রকাশ করল, যা খ্রিষ্টানদের জন্য ওইসব গ্রন্থপাঠ নিষিদ্ধ করে, যে গ্রন্থগুলো ছিল তাদের ধর্মবিরোধী, ধর্মের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং গির্জার গুমোর ফাঁসকারী। পৃথিবী ঘুরছে এই মত যারা ব্যক্ত করেছিল তারা তাদেরকেও একইভাবে 'ধর্মচ্যুত' ঘোষণা করে। এভাবেই খ্রিষ্টধর্মের কর্ণধারেরা পৃথিবীতে দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে বিশাল সভ্যতার যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল তা ধ্বংস করে দেয়। অধিকন্তু এ সকল লোক ধর্মকে পুঁজিরূপে খাটায় এবং ধর্মের বিকৃতি সাধন করে। ধর্মকে আলোকবর্তিকা বানানোর বদলে তারা এটিকে মূর্খতা ও অন্ধকারের অবলম্বন বানিয়ে ফেলে। (৬৭)
অন্যদিকে খ্রিষ্টধর্মের পার্শ্বিক বিষয়াবলিতে, এমনকি মৌলিক বিষয়সমূহে কূটতর্ক, গভীর বিবাদবিসংবাদের ঝড় শুরু হয়েছিল। তা জাতির চিন্তাকে বিমূঢ় করে দিয়েছিল, জাতির সন্তানদের বুদ্ধি-বিবেচনাকে বিনষ্ট করে দিয়েছিল এবং তার জ্ঞানগত শক্তিকে গিলে ফেলেছিল। এসব বিষয় অনেক সময় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, হত্যা, বিনাশ, উৎপীড়ন, আক্রমণ, লুণ্ঠন ও গুপ্তহত্যার রূপ নিয়েছিল। শিক্ষালয়, উপাসনালয়, বাড়িঘর সবকিছু ধর্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমরশিবিরে পরিণত হয়েছিল। গোটা দেশ গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই ধর্মীয় বিরোধের ভয়াবহ প্রকাশ ঘটেছিল সিরিয়া ও রোমান সাম্রাজ্যের খ্রিষ্টানগোষ্ঠী এবং মিশরের খ্রিষ্টানগোষ্ঠীর মধ্যে। আরও সূক্ষ্মভাবে বললে এটি ছিল মুলকানিয়‍্যা (Melkite/রাজধর্ম) ও মানুফিসিয়্যা (Manichaeism/মানিবাদ) ধর্মাদর্শের বিরোধ।
মুলকানিয়‍্যার মূলনীতি ছিল যিশুখ্রিষ্টের মানবিক সত্তা ও ঐশ্বরিক সত্তার মিলনে (দ্বৈতসত্তায়) বিশ্বাসস্থাপন এবং মানিবাদীরা বিশ্বাস করত যে, যিশুখ্রিষ্টের একটিমাত্র সত্তা রয়েছে, তা হলো ঐশ্বরিক সত্তা, তার ঐশ্বরিক সত্তায় তার মানবিক সত্তা বিলীন হয়ে গেছে। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে এই গোষ্ঠী দুটির বিরোধ ও সংঘাত চরম পর্যায়ে পৌছেছিল। এমনকি তা যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দুটি ভিন্ন ধর্মের মধ্যে তুমুল লড়াই অথবা ইহুদি ও নাসারাদের মধ্যকার বিবাদ। যেখানে ইহুদিদের দাবি নাসারারা কোনো ধর্মের ওপর নেই এবং নাসারাদের দাবি ইহুদিরা কোনো ধর্মের ওপর নেই। (৬৮)
সামাজিক দিক বিবেচনা করতে গেলে রোমান সমাজ দুটি স্তরে বিভক্ত ছিল, অভিজাত শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। যাবতীয় অধিকার ছিল অভিজাত শ্রেণির জন্য। আর দাস শ্রেণির জন্য কোনো ধরনের নাগরিক অধিকার ছিল না। সত্য এই যে, রোমান আইনকানুন দাস শ্রেণির ক্ষেত্রে 'ব্যক্তি' শব্দটি প্রয়োগ করতে দ্বিধান্বিত ছিল। অবশেষে তার 'ব্যক্তিত্বহীন ব্যক্তি' নামকরণ করে এই জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসে। রোমান অভিজাত শ্রেণির লোকেরা দাসদেরকে 'পণ্য' গণ্য করত। তাই তাদের মালিকানার অধিকার ছিল না, তারা কারও উত্তরাধিকারী হতে পারত না, তাদেরও কেউ উত্তরাধিকারী হতো না, তারা বৈধভাবে স্ত্রী গ্রহণ করতে পারত না। তাদের সব সন্তানসন্ততিকে অবৈধ সন্তান বলে গণ্য করা হতো। একইভাবে তারা দাসীদের সন্তানদেরকে দাস বিবেচনা করত, তাদের পিতা স্বাধীন ও অভিজাত শ্রেণির হলেও। অভিজাত শ্রেণির লোকদের জন্য আইনগত বন্দোবস্ত বা ক্ষতিপূরণ ব্যতিরেকেই দাস ও দাসীদের সঙ্গে গর্হিত কাজ করার অধিকার ছিল। অন্যদিকে দাসদের জন্য জুলুম ও নির্যাতনের বিচার চাওয়ার অধিকার বা শক্তি ছিল না। দাসদের নির্যাতন করা হলে নির্যাতককে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য অধিকার প্রদানের বিষয়টি ছিল মনিবের হাতে। উপরন্তু মনিবই দাসদের প্রহার করত, বন্দি করে রাখত, বনেজঙ্গলে হিংস্র জন্তুজানোয়ারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশ দিত, ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য করত, কোনো অজুহাতে বা অজুহাত ছাড়াই তাদের হত্যা করত। দাসদের মালিকদের পক্ষ থেকে গৃহীত সাধারণ মতামতের বাইরে দাস শ্রেণির তত্ত্বাবধানের জন্য আর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কোনো দাস পালিয়ে যাওয়ার পর তাকে আটক করতে পারলে মনিবের অধিকার ছিল ওই দাসকে আগুনে ঝলসানোর অথবা শূলবিদ্ধ করে হত্যা করার। সম্রাট অগাস্টাস গর্ববোধ করতেন যে তিনি ত্রিশ হাজার পলাতক দাসকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছিলেন এবং দাবি করার মতো মালিক না পেয়ে তাদের শূলবিদ্ধ করে হত্যা করেছিলেন। উল্লিখিত নির্যাতনের ভয়ে বা অন্যকোনো কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত কোনো দাস যদি তার মনিবকে হত্যা করত তবে রোমান আইন ওই মনিবের সকল দাসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দিত। ৬১ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সিনেটর পেডানিয়াস সেকানদাস (Lucius Pedanius Secundus) তার এক দাস কর্তৃক নিহত হন। এ ঘটনার পর রোমান সিনেটররা রোমান আইন অনুযায়ী তার সকল দাসের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন। ফলে তার চারশ দাসকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিছু সংখ্যক সিনেটর এই নির্দেশের বিরোধিতা করেছিলেন এবং একটি বিক্ষুব্ধ দল রাস্তায় নেমে ক্ষমা ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সিনেটর সভা এই আইন বাস্তবায়নে জোরজবরদস্তি করে। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এমন নির্মম সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করলে মনিবরা তাদের দাসদের ব্যাপারে নিরাপত্তা বোধ করবেন না। (৬৯)
শুধু এটাই নয়, রোমান আইন মনিবকে এ অধিকার দিয়েছিল যে, সে তার দাসকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে অথবা জীবনদান করতে পারবে। ওই যুগে দাসের সংখ্যা খুব বেশি বেড়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন যে, রোমান রাজ্যগুলোতে দাসের সংখ্যা স্বাধীন মানুষের চেয়ে তিনগুণ বেশি ছিল। (৭০)
রোমান সমাজে নারীদের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। ওই যুগের নারীদের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন এমন সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, নারী ছিল আত্মাহীন কাঠামো। এ কারণে নারীর পরকালীন জীবন বলতে কিছু নেই। নারী ছিল অপবিত্র। তাই তাদের গোশত খাওয়ার অধিকার ছিল না, হাসারও অধিকার ছিল না। এমনকি কথা বলার অধিকারও ছিল না। তারা নারীর মুখে লোহার তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। (৭১)
আমরা যা-কিছু উল্লেখ করেছি তার পরিণতি ছিল ভয়াবহ। রোমান সভ্যতার নক্ষত্র অস্তমিত হতে শুরু করেছিল। মানবিক গুণাবলির ভিত্তিসমূহ ধসে গিয়েছিল। চরিত্র ও নৈতিকতার অবলম্বনগুলো ধ্বংস হয়ে পড়েছিল। এডওয়ার্ড গিবন তার লেখায় এসব বিষয় চিত্রায়িত করেছেন এবং বলেছেন, ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে রোমান সাম্রাজ্য তার বিনাশ ও অধঃপতনের শেষ ধাপে পৌঁছে গিয়েছিল। (৭২)

টিকাঃ
৬৩. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৬।
৬৪. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৬-৫৭।
৬৫. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৭-৫৮।
৬৬. ইবনে নুবাতা আল-মিসরি, সাহরুল উয়ুন ফি শরহি রিসালাত ইবনে যায়দুন, পৃ. ৩৬; ইবনে নাদিম, আল-ফিহরিসত, পৃ. ৩০৩।
৬৭. আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ১, পৃ. ৫৭-৬০।
৬৮. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৪৩।
৬৯. উইল ডুরান্ট, কিসসাতুল হাদারাহ, খ. ১০, পৃ. ৩৭০-৩৭১।
৭০. আহমাদ আমিন, ফাজরুল ইসলাম, পৃ. ৮৮।
৭১. আহমাদ শালবি, মুকারানাতুল আদইয়ান, খ. ২, পৃ. ১৮৮; আফিফ তাইয়ারাহ, আদ-দ্বীনুল ইসলামি, পৃ. ২৭১।
৭২. এডওয়ার্ড গিবন, The History of the Decline and Fall of the Roman Empire, খ. ৫. পৃ. ৩৩, সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি, মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৪৬।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 ইসলামপূর্ব আরব

📄 ইসলামপূর্ব আরব


ইসলামের আবির্ভাবের পর আরব যে অবস্থায় উন্নীত হয়েছিল তার শ্রেষ্ঠত্ব ও ভিন্নতা স্বীকার করে নিয়েও আরবের ইসলামপূর্ব যুগ 'জাহিলিয়্যা' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তাই ইসলামপূর্ব আরবের ইতিহাসকে 'আত-তারিখুল জাহিলি' বা 'তারিখুল জাহিলিয়্যা' (অজ্ঞতার যুগের ইতিহাস/অন্ধকার যুগের ইতিহাস) বলা হয়। 'জাহিলিয়্যা' শব্দটি অন্ধকার ও অজ্ঞতা বোঝানোর পাশাপাশি যাযাবর জীবন ও পশ্চাৎপদতাও বোঝায়। যেমন আরবরা সভ্যতার ক্ষেত্রে তাদের চারপাশের মানুষদের চেয়ে পিছিয়ে ছিল। তাদের অধিকাংশই মূর্খতা ও উদাসীনতায় নিমজ্জিত গোত্রসমূহের জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। বহির্বিশ্বেরও তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না। তারা ছিল নিরক্ষর মূর্তিপূজারি, তাদের জ্ঞানগত পূর্ণতার কোনো ইতিহাস নেই। (৭৩)
জাহিলি যুগে বিশ্বের সমস্ত জাতি ও গোষ্ঠীর তুলনায় আরবরা ছিল কিছু অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবগত যোগ্যতার অধিকারী। যেমন ভাষানৈপুণ্য ও বাগ্মিতা, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতি অনুরাগ, সাহসিকতা ও বীরত্ব, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে উৎসাহ ও উদ্দীপনা, স্পষ্ট ভাষণ, অনন্যসাধারণ স্মৃতিশক্তি, সমতাপ্রেম ও ইচ্ছাশক্তি, প্রতিশ্রুতিপূরণ ও আমানত রক্ষা। কিন্তু নবুয়ত ও নবীগণের শিক্ষা থেকে তাদের কালগত দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন এক আরব উপদ্বীপে আবদ্ধ ছিল এবং বাপদাদাদের ধর্ম ও জাতীয় আচার-সংস্কারকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে ছিল। এসব কারণে শেষদিকে (খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে) তারা ভীষণ ধর্মীয় অবক্ষয়ের শিকার হয়েছিল এবং চরম পর্যায়ের পৌত্তলিকতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। সামসময়িক কোনো জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে যার দৃষ্টান্ত পাওয়া ছিল ভার। তা ছাড়া তারা নৈতিক ও সামাজিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিল। ফলে তারা নৈতিকভাবে চরম অধঃপতিত হয়ে পড়েছিল, তাদের সমাজ হয়ে পড়েছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, তাদের অবকাঠামো ছিল ভঙ্গুর ও পতনোন্মুখ। কারণ জাহিলি জীবনের নিকৃষ্ট দোষ-ব্যাধি তাদের মধ্যে জেঁকে বসেছিল এবং তারা আসমানি ধর্মসমূহের গুণাবলি ও সৌন্দর্য থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। (৭৪)
ধর্মীয় দিক বিবেচনা করতে গেলে, গোটা আরব উপদ্বীপে প্রতিমাপূজা ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি প্রতিটি গোত্রে, তারপর প্রতিটি বাড়িতে প্রতিমা স্থান পেয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবি আবু রাজা আল-উতারিদি রা. বর্ণনা করেন,
«كُنَّا نَعْبُدُ الْحَجَرَ فَإِذَا وَجَدْنَا حَجَرًا هُوَ أَخْيَرُ مِنْهُ أَلْقَيْنَاهُ وَأَخَذْنَا الْآخَرُ فَإِذَا لَمْ نَجِدْ حَجَرًا جَمَعْنَا جُثْوَةً مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ جِئْنَا بِالشَّاةِ فَحَلَبْنَاهُ عَلَيْهِ ثُمَّ طُفْنَا بِهِ»
(ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমরা) পাথরের পূজা করতাম। যখন এটি অপেক্ষা অন্য একটি ভালো পাথর পেয়ে যেতাম তখন এটিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে অন্যটি গ্রহণ করতাম (অন্যটির পূজা শুরু করতাম)। যখন কোনো পাথর পেতাম না, কিছু মাটি একত্র করে স্তূপ বানিয়ে নিতাম। তারপর একটি ছাগী নিয়ে আসতাম এবং ওই স্তূপের ওপর ছাগীটিকে দোহন করতাম। (যাতে তা কৃত্রিম পাথরের মতো দেখায়।) তারপর স্তূপটির চারপাশে তাওয়াফ করতাম। (৭৫)
প্রতিমা ছাড়াও আরবদের আরও দেবতা ছিল। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ফেরেশতা, জিন ও নক্ষত্র। তারা বিশ্বাস করত যে, ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার কন্যা। তাই তারা আল্লাহ তাআলার কাছে ফেরেশতাদের সুপারিশকারীরূপে গ্রহণ করে। এমনকি প্রার্থনা কবুলের মাধ্যম হিসেবেও ফেরেশতাদের গ্রহণ করে। একইভাবে তারা জিনদেরকেও আল্লাহর তাআলার শরিক বানিয়ে তাদের অলৌকিক শক্তি ও প্রভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের পূজা করতে শুরু করে। (৭৬)
আরও একটি কারণ এই যে, ইহুদিরা তখন গোটা আরবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। ইহুদিধর্মের নেতারা আল্লাহ তাআলাকে ব্যতিরেকে নিজেরাই প্রভুর আসনে সমাসীন হয়েছিল। তারা জনমণ্ডলীর ওপর খড়গ ঝুলিয়ে রেখেছিল এবং তাদের কাছে এমনকি মনের চিন্তা ও ঠোঁটের ফিসফিসানির জন্যও মানুষকে জবাবদিহি করতে হতো। তারা তাদের সমস্ত চিন্তাভাবনা সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের পেছনে নিয়োজিত করেছিল। যদিও এতে ধর্মের বিনাশ ঘটেছিল এবং ধর্মহীনতা, অবিশ্বাস ও কুফরি ছড়িয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে খ্রিষ্টধর্ম এক ভীষণ দুর্বোধ্য পৌত্তলিকতায় পর্যবসিত হয়েছিল। তা (ত্রিত্ববাদের ধারণার ফলে) আল্লাহ তাআলা ও মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত সংমিশ্রণের উদ্ভব ঘটিয়েছিল। আরবের খ্রিষ্টধর্ম অনুসারীদের অন্তরে এই ধর্মের কোনোরূপ সত্যিকার প্রভাব ছিল না। (৭৭)
নৈতিক ও চারিত্রিক দিক বিবেচনায় তারা চরম অবক্ষয় ও অধঃপতনের শিকার হয়েছিল। মদ্যপান মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সমাজের গভীরতায় তার কঠিন শেকড় বিস্তার করেছিল। এ কারণে তখনকার কাব্যকলা, ইতিহাস ও সাহিত্যের একটি বিরাট অংশই ছিল মদের দখলে। একইভাবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জুয়া তার থাবা ছড়িয়ে দিয়েছিল। কাতাদা (৭৮) বলেন, জাহিলি যুগে মানুষ তার স্ত্রী ও সম্পদের ওপরও জুয়া খেলত, বাজি ধরত। তারপর রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে বেদনার্ত চোখে দেখত যে, তার স্ত্রী ও সম্পদ অন্যের হাতে চলে গেছে। এর ফলে তাদের মধ্যে ভয়াবহ শত্রুতা ও কলহবিবাদ শুরু হতো। (৭৯)
একইভাবে আরবদের ও ইহুদিদের মধ্যে সুদি কারবার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। সুদি কারবারের শেকড় অনেকদূর পর্যন্ত প্রোথিত ছিল। এমনকি তারা বলেছিল, বেচাকেনা তো সুদের মতোই। একইভাবে নারী-পুরুষের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল। ব্যভিচার একটি প্রচলিত প্রথার রূপ ধারণ করেছিল। পুরুষ ইচ্ছে করলেই কয়েকজন উপপত্নী বা রক্ষিতা গ্রহণ করতে পারত, নারীরাও মনে ধরলে কয়েকজন উপপতি বা প্রণয়সঙ্গী গ্রহণ করতে পারত। এতে কোনো বৈধ বন্ধন বা চুক্তির প্রয়োজন হতো না। ওই যুগে কী ধরনের বিবাহ প্রচলিত ছিল তার প্রকারভেদ উল্লেখ করে সাইয়িদা আয়িশা রা. বলেন,
«إِنَّ النَّكَاحَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ كَانَ عَلَى أَرْبَعَةِ أَنْحَاءٍ فَنِكَاحُ مِنْهَا نِكَاحُ النَّاسِ الْيَوْمَ يَخْطُبُ الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ وَلِيَّتَهُ أَوْ ابْنَتَهُ فَيُصْدِقُهَا ثُمَّ يَنْكِحُهَا وَنِكَاحَ آخَرُ كَانَ الرَّجُلُ يَقُولُ لِامْرَأَتِهِ إِذَا طَهُرَتْ مِنْ طَمْثِهَا أَرْسِلِي إِلَى فُلَانٍ فَاسْتَبْضِعِي مِنْهُ وَيَعْتَزِلُهَا زَوْجُهَا وَلَا يَمَسُّهَا أَبَدًا حَتَّى يَتَبَيَّنَ حَمْلُهَا مِنْ ذُلِكَ الرَّجُلِ الَّذِي تَسْتَبْضِعُ مِنْهُ فَإِذَا تَبَيَّنَ حَمْلُهَا أَصَابَهَا زَوْجُهَا إِذَا أَحَبَّ وَإِنَّمَا يَفْعَلُ ذَلِكَ رَغْبَةً فِي نَجَابَةِ الْوَلَدِ فَكَانَ هَذَا النِّكَاحُ نِكَاحَ الاسْتِبْضَاعِ وَنِكَاحُ آخَرُ يَجْتَمِعُ الرَّهْطُ مَا دُونَ الْعَشَرَةِ فَيَدْخُلُونَ عَلَى الْمَرْأَةِ كُلُّهُمْ يُصِيبُهَا فَإِذَا حَمَلَتْ وَوَضَعَتْ وَمَرَّ عَلَيْهَا لَيَالٍ بَعْدَ أَنْ تَضَعَ حَمْلَهَا أَرْسَلَتْ إِلَيْهِمْ فَلَمْ يَسْتَطِعْ رَجُلٌ مِنْهُمْ أَنْ يَمْتَنِعَ حَتَّى يَجْتَمِعُوا عِنْدَهَا تَقُولُ لَهُمْ قَدْ عَرَفْتُمْ الَّذِي كَانَ مِنْ أَمْرِكُمْ وَقَدْ وَلَدْتُ فَهُوَ ابْنُكَ يَا فُلَانُ تُسَمِّي مَنْ أَحَبَّتْ بِاسْمِهِ فَيَلْحَقُ بِهِ وَلَدُهَا لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يَمْتَنِعَ بِهِ الرَّجُلُ وَنِكَاحُ الرَّابِعِ يَجْتَمِعُ النَّاسُ الْكَثِيرُ فَيَدْخُلُونَ عَلَى الْمَرْأَةِ لَا تَمْتَنِعُ مِمَّنْ جَاءَهَا وَهُنَّ الْبَغَايَا كُنَّ يَنْصِبْنَ عَلَى أَبْوَابِهِنَّ رَايَاتٍ تَكُونُ عَلَمًا فَمَنْ أَرَادَهُنَّ دَخَلَ عَلَيْهِنَّ فَإِذَا حَمَلَتْ إِحْدَاهُنَّ وَوَضَعَتْ حَمْلَهَا جمِعُوا لَهَا وَدَعَوْا لَهُمُ الْقَافَةَ ثُمَّ أَلْحَقُوا وَلَدَهَا بِالَّذِي يَرَوْنَ فَالْتَاطَ بِهِ وَدُعِيَ ابْنَهُ لَا يَمْتَنِعُ مِنْ ذَلِكَ
জাহিলি যুগে চার প্রকারের বিবাহ প্রচলিত ছিল। প্রথম প্রকার : বর্তমান যে ব্যবস্থা চলছে অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি কোনো নারীর অভিভাবকের কাছে তার অধীনে থাকা নারী অথবা তার কন্যার জন্য বিবাহের প্রস্তাব দেবে এবং তার মোহর নির্ধারণের পর বিবাহ করবে। দ্বিতীয় প্রকার : কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তার মাসিক (ঋতুস্রাব) থেকে মুক্ত হওয়ার পর এই কথা বলত যে, তুমি অমুক ব্যক্তির কাছে যাও এবং তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম করো। এরপর স্বামী তার এই স্ত্রী থেকে পৃথক থাকত এবং কখনো স্ত্রীসহবাস করত না, যতক্ষণ না তার এই স্ত্রী যে লোকটার সঙ্গে যৌনসঙ্গমে মিলিত হচ্ছে তার দ্বারা গর্ভবতী হতো। যখন তার গর্ভ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হতো তখন ইচ্ছা করলে স্বামী তার এই স্ত্রীর সাথে সহবাস করত। স্বামী উন্নত ধরনের সন্তান প্রজননের আশায় এই কাজ করত। এ ধরনের বিবাহকে ‘নিকাহুল ইসতিবদা’ বলা হতো। তৃতীয় প্রকার বিবাহ: দশজনের কম সংখ্যক ব্যক্তি একত্র হয়ে পালাক্রমে একই নারীর সাথে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতো। যদি নারীটি গর্ভবতী হতো, তারপর সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কিছুদিন অতিবাহিত হতো, সেই নারী তার সঙ্গে সঙ্গমকারী সব পুরুষকে ডেকে পাঠাত এবং কেউই আসতে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না। তারা সবাই নারীটির সামনে সমবেত হওয়ার পর সে তাদেরকে বলত, তোমরা সকলেই জানো তোমরা কী করেছ! এখন আমি সন্তান প্রসব করেছি। সুতরাং হে অমুক! এটা তোমারই সন্তান। ওই নারী যাকে খুশি তার নাম ধরে ডাকত, তখন ওই পুরুষ নবজাতক শিশুটিকে গ্রহণ করতে বাধ্য থাকত এবং সে তা অস্বীকার করতে পারত না। চতুর্থ প্রকারের বিবাহ : বহু পুরুষ একজনমাত্র নারীর সঙ্গে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতো এবং ওই নারী তার কাছে যত পুরুষ আসত, কাউকে রমণসঙ্গী করতে অস্বীকার করত না। তারা ছিল বারবনিতা। বারবনিতারা তাদের চিহ্নরূপে নিজ নিজ ঘরের সামনে পতাকা উড়িয়ে রাখত। যে কেউ ইচ্ছা করলে অবাধে তাদের সঙ্গে যৌনসম্ভোগে লিপ্ত হতে পারত। যদি এসব নারীর মধ্যে কেউ গর্ভবতী হতো এবং সন্তান প্রসব করত তাহলে যৌনসঙ্গমকারী সকল পুরুষ সমবেত হতো এবং 'কায়িফ'(৮০)-কে ডেকে আনত। এ সকল ব্যক্তি সন্তানটির সঙ্গে যে লোকটির সাদৃশ্য পেত তাকে বলত, এটি তোমার সন্তান। তখন ওই পুরুষটি নবজাতক সন্তানকে নিজের নয় বলে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না।(৮১)
নারীদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে বলতে গেলে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. সারমর্মরূপে যে কথা বলেছেন সেটা উল্লেখ করাই সমীচীন। তিনি বলেছেন, 'আল্লাহর কসম! আমরা জাহিলি যুগে নারীদের কোনোকিছুরূপে গণ্য করতাম না। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে যা নাযিল করলেন তা তো সবার সামনেই রয়েছে।'(৮২)
নারীদের কোনো উত্তরাধিকার ছিল না। উত্তরাধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আরবরা বলত, আমাদের মধ্যে যারা তরবারি ধারণ করতে পারে এবং সম্পদ ও ভূখণ্ড রক্ষা করতে পারে তারাই কেবল উত্তরাধিকার পাবে। তাই কোনো লোক মারা গেলে তার পুত্রসন্তান উত্তরাধিকার পেত। পুত্রসন্তান না থাকলে তার নিকটাত্মীয় অভিভাবক তা পেত। পিতা বা ভাই বা চাচা, যে-ই হোক না কেন। আর মৃত ব্যক্তির স্ত্রী ও কন্যাদেরকে যে লোকটি উত্তরাধিকার পেয়েছে তার স্ত্রী ও কন্যাদের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হতো। তারা যা পেত, এরাও তা-ই পেত; তাদের ওপর যে দায়িত্ব বর্তাত এদের ওপরও একই দায়িত্ব বর্তাত। নারীর জন্য তার স্বামীর ওপর আদতেই কোনোরূপ অধিকার ছিল না। তালাকের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। পুরুষরা ইচ্ছামতো যে-কয়জন খুশি স্ত্রী গ্রহণ করতে পারত, নির্ধারিত কোনো সংখ্যা ছিল না। আরবদের একটি জঘন্য প্রথা ছিল এমন, কোনো লোক তার স্ত্রী এবং এই স্ত্রী ব্যতীত অন্য স্ত্রীদের সন্তান রেখে মারা গেলে তার বড় পুত্রসন্তান তার পিতার স্ত্রীর ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় অগ্রাধিকার পেত। সে তার পিতার অন্যান্য সম্পদের মতো স্ত্রীকেও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ মনে করত।(৮৩)
মেয়েদের প্রতি আরবদের ঘৃণা এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তারা মেয়েদের জীবন্ত পুঁতে ফেলতে শুরু করল। মেয়েদের পুঁতে ফেলা ছিল জাহিলি যুগের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্য প্রথা। আরবের কোনো কন্যাসন্তান যদি মাটির গর্ভে প্রোথিত হওয়া থেকে কোনোক্রমে বেঁচে যেত, তবে তাকে এক অন্ধকারপূর্ণ দুর্বিষহ জীবনের অপেক্ষায় থাকতে হতো। আল-কুরআনুল কারিম এই অবস্থাকে বর্ণনা করেছে এভাবে,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأُنْثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ كَظِيمٌ ( يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُونٍ أَمْ يَدُسُهُ فِي التُّرَابِ أَلَا ساءَ مَا يَحْكُمُونَ
তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয় তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয় তার গ্লানির কারণে সে নিজ সম্প্রদায় থেকে আত্মগোপনে চলে যায়। সে চিন্তা করে, হীনতাসত্ত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, নাকি মাটিতে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! তারা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা অতি নিকৃষ্ট!(৮৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে জাযিরাতুল আরবের পরিস্থিতি এমনই ছিল।

টিকাঃ
৭৩. জাওয়াদ আলি, আল-মুফাসসাল ফি তারিখিল আরব কাবলাল ইসলাম, খ. ১, পৃ. ৩৭১।
৭৪. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৭৬-৭৭।
৭৫. বুখারি, হাদিস নং ৪১১৭।
৭৬. আবুল মুনযির হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব আল-কালবি, কিতাবুল আসনাম, পৃ. ৪৪।
৭৭. সফিউদ্দিন মুবারকপুরি, আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪৭।
৭৮. কাতাদা আস-সাদুদি (৬০-১১৭/১১৮ হিজরি): বিশিষ্ট তাবেয়ি ও উঁচুস্তরের আলেম। আবু উবাইদা বলেন, প্রতিদিন বনু উমাইয়া এলাকা থেকে কোনো-না-কোনো ব্যক্তি কাতাদা আস-সাদুসির দরজায় কড়া নাড়তেন এবং তার কাছে হাদিস, বংশধারা বা কবিতা জানতে চাইতেন। তিনি ইরাকের ওয়াসিত জেলায় মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, ৪/৮৫-৮৬; যাহাবি, তাযকিরাতুল হুফফায, খ. ১,পৃ. ১২২-১২৩।
৭৯. তাবারি, জামিউল বায়ান ফি তাবিলিল কুরআন, খ. ১০, পৃ. ৫৭৩; আযিমাবাদি, আওনুল মাবুদ, খ. ১০, পৃ. ৭৯।
৮০. যে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি সন্তানের গোপন চিহ্ন দেখে তার পিতার সঙ্গে সাদৃশ্য নির্ণয় করতে পারতেন। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, খ. ৯, পৃ. ১৮৫।
৮১. বুখারি, কিতাব: বিবাহ, বাব: মান কালা লা নিকাহা ইল্লা বি-ওয়ালিয়্যিন, হাদিস নং ৪৮৩৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২২৭২।
৮২. বুখারি, কিতাব: আত-তাফসির, বাব: তাফসিরু সুরাতিত তালাক, হাদিস নং ৪৬২৯; মুসলিম, কিতাব: তালাক, বাব: ইলা ও ইতিযালুন নিসা ওয়া তাখইরিহিন্না, হাদিস নং ১৪৭৯।
৮৩. ড. মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইসমাইল আল-মুকাদ্দাম, আল-মারআতু বায়না তাকরিমিল ইসলাম ওয়া ইহানাতুল জাহিলিয়্যা, পৃ. ৫৭।
৮৪. সুরা নাহল: আয়াত ৫৮-৫৯।

ইসলামের আবির্ভাবের পর আরব যে অবস্থায় উন্নীত হয়েছিল তার শ্রেষ্ঠত্ব ও ভিন্নতা স্বীকার করে নিয়েও আরবের ইসলামপূর্ব যুগ 'জাহিলিয়্যা' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তাই ইসলামপূর্ব আরবের ইতিহাসকে 'আত-তারিখুল জাহিলি' বা 'তারিখুল জাহিলিয়্যা' (অজ্ঞতার যুগের ইতিহাস/অন্ধকার যুগের ইতিহাস) বলা হয়। 'জাহিলিয়্যা' শব্দটি অন্ধকার ও অজ্ঞতা বোঝানোর পাশাপাশি যাযাবর জীবন ও পশ্চাৎপদতাও বোঝায়। যেমন আরবরা সভ্যতার ক্ষেত্রে তাদের চারপাশের মানুষদের চেয়ে পিছিয়ে ছিল। তাদের অধিকাংশই মূর্খতা ও উদাসীনতায় নিমজ্জিত গোত্রসমূহের জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। বহির্বিশ্বেরও তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না। তারা ছিল নিরক্ষর মূর্তিপূজারি, তাদের জ্ঞানগত পূর্ণতার কোনো ইতিহাস নেই। (৭৩)
জাহিলি যুগে বিশ্বের সমস্ত জাতি ও গোষ্ঠীর তুলনায় আরবরা ছিল কিছু অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবগত যোগ্যতার অধিকারী। যেমন ভাষানৈপুণ্য ও বাগ্মিতা, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতি অনুরাগ, সাহসিকতা ও বীরত্ব, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে উৎসাহ ও উদ্দীপনা, স্পষ্ট ভাষণ, অনন্যসাধারণ স্মৃতিশক্তি, সমতাপ্রেম ও ইচ্ছাশক্তি, প্রতিশ্রুতিপূরণ ও আমানত রক্ষা। কিন্তু নবুয়ত ও নবীগণের শিক্ষা থেকে তাদের কালগত দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন এক আরব উপদ্বীপে আবদ্ধ ছিল এবং বাপদাদাদের ধর্ম ও জাতীয় আচার-সংস্কারকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে ছিল। এসব কারণে শেষদিকে (খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে) তারা ভীষণ ধর্মীয় অবক্ষয়ের শিকার হয়েছিল এবং চরম পর্যায়ের পৌত্তলিকতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। সামসময়িক কোনো জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে যার দৃষ্টান্ত পাওয়া ছিল ভার। তা ছাড়া তারা নৈতিক ও সামাজিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিল। ফলে তারা নৈতিকভাবে চরম অধঃপতিত হয়ে পড়েছিল, তাদের সমাজ হয়ে পড়েছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, তাদের অবকাঠামো ছিল ভঙ্গুর ও পতনোন্মুখ। কারণ জাহিলি জীবনের নিকৃষ্ট দোষ-ব্যাধি তাদের মধ্যে জেঁকে বসেছিল এবং তারা আসমানি ধর্মসমূহের গুণাবলি ও সৌন্দর্য থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। (৭৪)
ধর্মীয় দিক বিবেচনা করতে গেলে, গোটা আরব উপদ্বীপে প্রতিমাপূজা ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি প্রতিটি গোত্রে, তারপর প্রতিটি বাড়িতে প্রতিমা স্থান পেয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবি আবু রাজা আল-উতারিদি রা. বর্ণনা করেন,
«كُنَّا نَعْبُدُ الْحَجَرَ فَإِذَا وَجَدْنَا حَجَرًا هُوَ أَخْيَرُ مِنْهُ أَلْقَيْنَاهُ وَأَخَذْنَا الْآخَرُ فَإِذَا لَمْ نَجِدْ حَجَرًا جَمَعْنَا جُثْوَةً مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ جِئْنَا بِالشَّاةِ فَحَلَبْنَاهُ عَلَيْهِ ثُمَّ طُفْنَا بِهِ»
(ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমরা) পাথরের পূজা করতাম। যখন এটি অপেক্ষা অন্য একটি ভালো পাথর পেয়ে যেতাম তখন এটিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে অন্যটি গ্রহণ করতাম (অন্যটির পূজা শুরু করতাম)। যখন কোনো পাথর পেতাম না, কিছু মাটি একত্র করে স্তূপ বানিয়ে নিতাম। তারপর একটি ছাগী নিয়ে আসতাম এবং ওই স্তূপের ওপর ছাগীটিকে দোহন করতাম। (যাতে তা কৃত্রিম পাথরের মতো দেখায়।) তারপর স্তূপটির চারপাশে তাওয়াফ করতাম। (৭৫)
প্রতিমা ছাড়াও আরবদের আরও দেবতা ছিল। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ফেরেশতা, জিন ও নক্ষত্র। তারা বিশ্বাস করত যে, ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার কন্যা। তাই তারা আল্লাহ তাআলার কাছে ফেরেশতাদের সুপারিশকারীরূপে গ্রহণ করে। এমনকি প্রার্থনা কবুলের মাধ্যম হিসেবেও ফেরেশতাদের গ্রহণ করে। একইভাবে তারা জিনদেরকেও আল্লাহর তাআলার শরিক বানিয়ে তাদের অলৌকিক শক্তি ও প্রভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের পূজা করতে শুরু করে। (৭৬)
আরও একটি কারণ এই যে, ইহুদিরা তখন গোটা আরবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। ইহুদিধর্মের নেতারা আল্লাহ তাআলাকে ব্যতিরেকে নিজেরাই প্রভুর আসনে সমাসীন হয়েছিল। তারা জনমণ্ডলীর ওপর খড়গ ঝুলিয়ে রেখেছিল এবং তাদের কাছে এমনকি মনের চিন্তা ও ঠোঁটের ফিসফিসানির জন্যও মানুষকে জবাবদিহি করতে হতো। তারা তাদের সমস্ত চিন্তাভাবনা সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের পেছনে নিয়োজিত করেছিল। যদিও এতে ধর্মের বিনাশ ঘটেছিল এবং ধর্মহীনতা, অবিশ্বাস ও কুফরি ছড়িয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে খ্রিষ্টধর্ম এক ভীষণ দুর্বোধ্য পৌত্তলিকতায় পর্যবসিত হয়েছিল। তা (ত্রিত্ববাদের ধারণার ফলে) আল্লাহ তাআলা ও মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত সংমিশ্রণের উদ্ভব ঘটিয়েছিল। আরবের খ্রিষ্টধর্ম অনুসারীদের অন্তরে এই ধর্মের কোনোরূপ সত্যিকার প্রভাব ছিল না। (৭৭)
নৈতিক ও চারিত্রিক দিক বিবেচনায় তারা চরম অবক্ষয় ও অধঃপতনের শিকার হয়েছিল। মদ্যপান মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সমাজের গভীরতায় তার কঠিন শেকড় বিস্তার করেছিল। এ কারণে তখনকার কাব্যকলা, ইতিহাস ও সাহিত্যের একটি বিরাট অংশই ছিল মদের দখলে। একইভাবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জুয়া তার থাবা ছড়িয়ে দিয়েছিল। কাতাদা (৭৮) বলেন, জাহিলি যুগে মানুষ তার স্ত্রী ও সম্পদের ওপরও জুয়া খেলত, বাজি ধরত। তারপর রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে বেদনার্ত চোখে দেখত যে, তার স্ত্রী ও সম্পদ অন্যের হাতে চলে গেছে। এর ফলে তাদের মধ্যে ভয়াবহ শত্রুতা ও কলহবিবাদ শুরু হতো। (৭৯)
একইভাবে আরবদের ও ইহুদিদের মধ্যে সুদি কারবার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। সুদি কারবারের শেকড় অনেকদূর পর্যন্ত প্রোথিত ছিল। এমনকি তারা বলেছিল, বেচাকেনা তো সুদের মতোই। একইভাবে নারী-পুরুষের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল। ব্যভিচার একটি প্রচলিত প্রথার রূপ ধারণ করেছিল। পুরুষ ইচ্ছে করলেই কয়েকজন উপপত্নী বা রক্ষিতা গ্রহণ করতে পারত, নারীরাও মনে ধরলে কয়েকজন উপপতি বা প্রণয়সঙ্গী গ্রহণ করতে পারত। এতে কোনো বৈধ বন্ধন বা চুক্তির প্রয়োজন হতো না। ওই যুগে কী ধরনের বিবাহ প্রচলিত ছিল তার প্রকারভেদ উল্লেখ করে সাইয়িদা আয়িশা রা. বলেন,
«إِنَّ النَّكَاحَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ كَانَ عَلَى أَرْبَعَةِ أَنْحَاءٍ فَنِكَاحُ مِنْهَا نِكَاحُ النَّاسِ الْيَوْمَ يَخْطُبُ الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ وَلِيَّتَهُ أَوْ ابْنَتَهُ فَيُصْدِقُهَا ثُمَّ يَنْكِحُهَا وَنِكَاحَ آخَرُ كَانَ الرَّجُلُ يَقُولُ لِامْرَأَتِهِ إِذَا طَهُرَتْ مِنْ طَمْثِهَا أَرْسِلِي إِلَى فُلَانٍ فَاسْتَبْضِعِي مِنْهُ وَيَعْتَزِلُهَا زَوْجُهَا وَلَا يَمَسُّهَا أَبَدًا حَتَّى يَتَبَيَّنَ حَمْلُهَا مِنْ ذُلِكَ الرَّجُلِ الَّذِي تَسْتَبْضِعُ مِنْهُ فَإِذَا تَبَيَّنَ حَمْلُهَا أَصَابَهَا زَوْجُهَا إِذَا أَحَبَّ وَإِنَّمَا يَفْعَلُ ذَلِكَ رَغْبَةً فِي نَجَابَةِ الْوَلَدِ فَكَانَ هَذَا النِّكَاحُ نِكَاحَ الاسْتِبْضَاعِ وَنِكَاحُ آخَرُ يَجْتَمِعُ الرَّهْطُ مَا دُونَ الْعَشَرَةِ فَيَدْخُلُونَ عَلَى الْمَرْأَةِ كُلُّهُمْ يُصِيبُهَا فَإِذَا حَمَلَتْ وَوَضَعَتْ وَمَرَّ عَلَيْهَا لَيَالٍ بَعْدَ أَنْ تَضَعَ حَمْلَهَا أَرْسَلَتْ إِلَيْهِمْ فَلَمْ يَسْتَطِعْ رَجُلٌ مِنْهُمْ أَنْ يَمْتَنِعَ حَتَّى يَجْتَمِعُوا عِنْدَهَا تَقُولُ لَهُمْ قَدْ عَرَفْتُمْ الَّذِي كَانَ مِنْ أَمْرِكُمْ وَقَدْ وَلَدْتُ فَهُوَ ابْنُكَ يَا فُلَانُ تُسَمِّي مَنْ أَحَبَّتْ بِاسْمِهِ فَيَلْحَقُ بِهِ وَلَدُهَا لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يَمْتَنِعَ بِهِ الرَّجُلُ وَنِكَاحُ الرَّابِعِ يَجْتَمِعُ النَّاسُ الْكَثِيرُ فَيَدْخُلُونَ عَلَى الْمَرْأَةِ لَا تَمْتَنِعُ مِمَّنْ جَاءَهَا وَهُنَّ الْبَغَايَا كُنَّ يَنْصِبْنَ عَلَى أَبْوَابِهِنَّ رَايَاتٍ تَكُونُ عَلَمًا فَمَنْ أَرَادَهُنَّ دَخَلَ عَلَيْهِنَّ فَإِذَا حَمَلَتْ إِحْدَاهُنَّ وَوَضَعَتْ حَمْلَهَا جمِعُوا لَهَا وَدَعَوْا لَهُمُ الْقَافَةَ ثُمَّ أَلْحَقُوا وَلَدَهَا بِالَّذِي يَرَوْنَ فَالْتَاطَ بِهِ وَدُعِيَ ابْنَهُ لَا يَمْتَنِعُ مِنْ ذَلِكَ
জাহিলি যুগে চার প্রকারের বিবাহ প্রচলিত ছিল। প্রথম প্রকার : বর্তমান যে ব্যবস্থা চলছে অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি কোনো নারীর অভিভাবকের কাছে তার অধীনে থাকা নারী অথবা তার কন্যার জন্য বিবাহের প্রস্তাব দেবে এবং তার মোহর নির্ধারণের পর বিবাহ করবে। দ্বিতীয় প্রকার : কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তার মাসিক (ঋতুস্রাব) থেকে মুক্ত হওয়ার পর এই কথা বলত যে, তুমি অমুক ব্যক্তির কাছে যাও এবং তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম করো। এরপর স্বামী তার এই স্ত্রী থেকে পৃথক থাকত এবং কখনো স্ত্রীসহবাস করত না, যতক্ষণ না তার এই স্ত্রী যে লোকটার সঙ্গে যৌনসঙ্গমে মিলিত হচ্ছে তার দ্বারা গর্ভবতী হতো। যখন তার গর্ভ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হতো তখন ইচ্ছা করলে স্বামী তার এই স্ত্রীর সাথে সহবাস করত। স্বামী উন্নত ধরনের সন্তান প্রজননের আশায় এই কাজ করত। এ ধরনের বিবাহকে ‘নিকাহুল ইসতিবদা’ বলা হতো। তৃতীয় প্রকার বিবাহ: দশজনের কম সংখ্যক ব্যক্তি একত্র হয়ে পালাক্রমে একই নারীর সাথে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতো। যদি নারীটি গর্ভবতী হতো, তারপর সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কিছুদিন অতিবাহিত হতো, সেই নারী তার সঙ্গে সঙ্গমকারী সব পুরুষকে ডেকে পাঠাত এবং কেউই আসতে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না। তারা সবাই নারীটির সামনে সমবেত হওয়ার পর সে তাদেরকে বলত, তোমরা সকলেই জানো তোমরা কী করেছ! এখন আমি সন্তান প্রসব করেছি। সুতরাং হে অমুক! এটা তোমারই সন্তান। ওই নারী যাকে খুশি তার নাম ধরে ডাকত, তখন ওই পুরুষ নবজাতক শিশুটিকে গ্রহণ করতে বাধ্য থাকত এবং সে তা অস্বীকার করতে পারত না। চতুর্থ প্রকারের বিবাহ : বহু পুরুষ একজনমাত্র নারীর সঙ্গে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতো এবং ওই নারী তার কাছে যত পুরুষ আসত, কাউকে রমণসঙ্গী করতে অস্বীকার করত না। তারা ছিল বারবনিতা। বারবনিতারা তাদের চিহ্নরূপে নিজ নিজ ঘরের সামনে পতাকা উড়িয়ে রাখত। যে কেউ ইচ্ছা করলে অবাধে তাদের সঙ্গে যৌনসম্ভোগে লিপ্ত হতে পারত। যদি এসব নারীর মধ্যে কেউ গর্ভবতী হতো এবং সন্তান প্রসব করত তাহলে যৌনসঙ্গমকারী সকল পুরুষ সমবেত হতো এবং 'কায়িফ'(৮০)-কে ডেকে আনত। এ সকল ব্যক্তি সন্তানটির সঙ্গে যে লোকটির সাদৃশ্য পেত তাকে বলত, এটি তোমার সন্তান। তখন ওই পুরুষটি নবজাতক সন্তানকে নিজের নয় বলে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না।(৮১)
নারীদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে বলতে গেলে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. সারমর্মরূপে যে কথা বলেছেন সেটা উল্লেখ করাই সমীচীন। তিনি বলেছেন, 'আল্লাহর কসম! আমরা জাহিলি যুগে নারীদের কোনোকিছুরূপে গণ্য করতাম না। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে যা নাযিল করলেন তা তো সবার সামনেই রয়েছে।'(৮২)
নারীদের কোনো উত্তরাধিকার ছিল না। উত্তরাধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আরবরা বলত, আমাদের মধ্যে যারা তরবারি ধারণ করতে পারে এবং সম্পদ ও ভূখণ্ড রক্ষা করতে পারে তারাই কেবল উত্তরাধিকার পাবে। তাই কোনো লোক মারা গেলে তার পুত্রসন্তান উত্তরাধিকার পেত। পুত্রসন্তান না থাকলে তার নিকটাত্মীয় অভিভাবক তা পেত। পিতা বা ভাই বা চাচা, যে-ই হোক না কেন। আর মৃত ব্যক্তির স্ত্রী ও কন্যাদেরকে যে লোকটি উত্তরাধিকার পেয়েছে তার স্ত্রী ও কন্যাদের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হতো। তারা যা পেত, এরাও তা-ই পেত; তাদের ওপর যে দায়িত্ব বর্তাত এদের ওপরও একই দায়িত্ব বর্তাত। নারীর জন্য তার স্বামীর ওপর আদতেই কোনোরূপ অধিকার ছিল না। তালাকের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। পুরুষরা ইচ্ছামতো যে-কয়জন খুশি স্ত্রী গ্রহণ করতে পারত, নির্ধারিত কোনো সংখ্যা ছিল না। আরবদের একটি জঘন্য প্রথা ছিল এমন, কোনো লোক তার স্ত্রী এবং এই স্ত্রী ব্যতীত অন্য স্ত্রীদের সন্তান রেখে মারা গেলে তার বড় পুত্রসন্তান তার পিতার স্ত্রীর ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় অগ্রাধিকার পেত। সে তার পিতার অন্যান্য সম্পদের মতো স্ত্রীকেও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ মনে করত।(৮৩)
মেয়েদের প্রতি আরবদের ঘৃণা এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তারা মেয়েদের জীবন্ত পুঁতে ফেলতে শুরু করল। মেয়েদের পুঁতে ফেলা ছিল জাহিলি যুগের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্য প্রথা। আরবের কোনো কন্যাসন্তান যদি মাটির গর্ভে প্রোথিত হওয়া থেকে কোনোক্রমে বেঁচে যেত, তবে তাকে এক অন্ধকারপূর্ণ দুর্বিষহ জীবনের অপেক্ষায় থাকতে হতো। আল-কুরআনুল কারিম এই অবস্থাকে বর্ণনা করেছে এভাবে,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأُنْثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ كَظِيمٌ ( يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُونٍ أَمْ يَدُسُهُ فِي التُّرَابِ أَلَا ساءَ مَا يَحْكُمُونَ
তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয় তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয় তার গ্লানির কারণে সে নিজ সম্প্রদায় থেকে আত্মগোপনে চলে যায়। সে চিন্তা করে, হীনতাসত্ত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, নাকি মাটিতে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! তারা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা অতি নিকৃষ্ট!(৮৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে জাযিরাতুল আরবের পরিস্থিতি এমনই ছিল।

টিকাঃ
৭৩. জাওয়াদ আলি, আল-মুফাসসাল ফি তারিখিল আরব কাবলাল ইসলাম, খ. ১, পৃ. ৩৭১।
৭৪. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৭৬-৭৭।
৭৫. বুখারি, হাদিস নং ৪১১৭।
৭৬. আবুল মুনযির হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব আল-কালবি, কিতাবুল আসনাম, পৃ. ৪৪।
৭৭. সফিউদ্দিন মুবারকপুরি, আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪৭।
৭৮. কাতাদা আস-সাদুদি (৬০-১১৭/১১৮ হিজরি): বিশিষ্ট তাবেয়ি ও উঁচুস্তরের আলেম। আবু উবাইদা বলেন, প্রতিদিন বনু উমাইয়া এলাকা থেকে কোনো-না-কোনো ব্যক্তি কাতাদা আস-সাদুসির দরজায় কড়া নাড়তেন এবং তার কাছে হাদিস, বংশধারা বা কবিতা জানতে চাইতেন। তিনি ইরাকের ওয়াসিত জেলায় মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, ৪/৮৫-৮৬; যাহাবি, তাযকিরাতুল হুফফায, খ. ১,পৃ. ১২২-১২৩।
৭৯. তাবারি, জামিউল বায়ান ফি তাবিলিল কুরআন, খ. ১০, পৃ. ৫৭৩; আযিমাবাদি, আওনুল মাবুদ, খ. ১০, পৃ. ৭৯।
৮০. যে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি সন্তানের গোপন চিহ্ন দেখে তার পিতার সঙ্গে সাদৃশ্য নির্ণয় করতে পারতেন। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, খ. ৯, পৃ. ১৮৫।
৮১. বুখারি, কিতাব: বিবাহ, বাব: মান কালা লা নিকাহা ইল্লা বি-ওয়ালিয়্যিন, হাদিস নং ৪৮৩৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২২৭২।
৮২. বুখারি, কিতাব: আত-তাফসির, বাব: তাফসিরু সুরাতিত তালাক, হাদিস নং ৪৬২৯; মুসলিম, কিতাব: তালাক, বাব: ইলা ও ইতিযালুন নিসা ওয়া তাখইরিহিন্না, হাদিস নং ১৪৭৯।
৮৩. ড. মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইসমাইল আল-মুকাদ্দাম, আল-মারআতু বায়না তাকরিমিল ইসলাম ওয়া ইহানাতুল জাহিলিয়্যা, পৃ. ৫৭।
৮৪. সুরা নাহল: আয়াত ৫৮-৫৯।

ইসলামের আবির্ভাবের পর আরব যে অবস্থায় উন্নীত হয়েছিল তার শ্রেষ্ঠত্ব ও ভিন্নতা স্বীকার করে নিয়েও আরবের ইসলামপূর্ব যুগ 'জাহিলিয়্যা' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তাই ইসলামপূর্ব আরবের ইতিহাসকে 'আত-তারিখুল জাহিলি' বা 'তারিখুল জাহিলিয়্যা' (অজ্ঞতার যুগের ইতিহাস/অন্ধকার যুগের ইতিহাস) বলা হয়। 'জাহিলিয়্যা' শব্দটি অন্ধকার ও অজ্ঞতা বোঝানোর পাশাপাশি যাযাবর জীবন ও পশ্চাৎপদতাও বোঝায়। যেমন আরবরা সভ্যতার ক্ষেত্রে তাদের চারপাশের মানুষদের চেয়ে পিছিয়ে ছিল। তাদের অধিকাংশই মূর্খতা ও উদাসীনতায় নিমজ্জিত গোত্রসমূহের জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। বহির্বিশ্বেরও তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না। তারা ছিল নিরক্ষর মূর্তিপূজারি, তাদের জ্ঞানগত পূর্ণতার কোনো ইতিহাস নেই। (৭৩)
জাহিলি যুগে বিশ্বের সমস্ত জাতি ও গোষ্ঠীর তুলনায় আরবরা ছিল কিছু অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবগত যোগ্যতার অধিকারী। যেমন ভাষানৈপুণ্য ও বাগ্মিতা, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতি অনুরাগ, সাহসিকতা ও বীরত্ব, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে উৎসাহ ও উদ্দীপনা, স্পষ্ট ভাষণ, অনন্যসাধারণ স্মৃতিশক্তি, সমতাপ্রেম ও ইচ্ছাশক্তি, প্রতিশ্রুতিপূরণ ও আমানত রক্ষা। কিন্তু নবুয়ত ও নবীগণের শিক্ষা থেকে তাদের কালগত দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন এক আরব উপদ্বীপে আবদ্ধ ছিল এবং বাপদাদাদের ধর্ম ও জাতীয় আচার-সংস্কারকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে ছিল। এসব কারণে শেষদিকে (খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকে) তারা ভীষণ ধর্মীয় অবক্ষয়ের শিকার হয়েছিল এবং চরম পর্যায়ের পৌত্তলিকতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। সামসময়িক কোনো জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে যার দৃষ্টান্ত পাওয়া ছিল ভার। তা ছাড়া তারা নৈতিক ও সামাজিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিল। ফলে তারা নৈতিকভাবে চরম অধঃপতিত হয়ে পড়েছিল, তাদের সমাজ হয়ে পড়েছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, তাদের অবকাঠামো ছিল ভঙ্গুর ও পতনোন্মুখ। কারণ জাহিলি জীবনের নিকৃষ্ট দোষ-ব্যাধি তাদের মধ্যে জেঁকে বসেছিল এবং তারা আসমানি ধর্মসমূহের গুণাবলি ও সৌন্দর্য থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। (৭৪)
ধর্মীয় দিক বিবেচনা করতে গেলে, গোটা আরব উপদ্বীপে প্রতিমাপূজা ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি প্রতিটি গোত্রে, তারপর প্রতিটি বাড়িতে প্রতিমা স্থান পেয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবি আবু রাজা আল-উতারিদি রা. বর্ণনা করেন,
«كُنَّا نَعْبُدُ الْحَجَرَ فَإِذَا وَجَدْنَا حَجَرًا هُوَ أَخْيَرُ مِنْهُ أَلْقَيْنَاهُ وَأَخَذْنَا الْآخَرُ فَإِذَا لَمْ نَجِدْ حَجَرًا جَمَعْنَا جُثْوَةً مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ جِئْنَا بِالشَّاةِ فَحَلَبْنَاهُ عَلَيْهِ ثُمَّ طُفْنَا بِهِ»
(ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমরা) পাথরের পূজা করতাম। যখন এটি অপেক্ষা অন্য একটি ভালো পাথর পেয়ে যেতাম তখন এটিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে অন্যটি গ্রহণ করতাম (অন্যটির পূজা শুরু করতাম)। যখন কোনো পাথর পেতাম না, কিছু মাটি একত্র করে স্তূপ বানিয়ে নিতাম। তারপর একটি ছাগী নিয়ে আসতাম এবং ওই স্তূপের ওপর ছাগীটিকে দোহন করতাম। (যাতে তা কৃত্রিম পাথরের মতো দেখায়।) তারপর স্তূপটির চারপাশে তাওয়াফ করতাম। (৭৫)
প্রতিমা ছাড়াও আরবদের আরও দেবতা ছিল। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ফেরেশতা, জিন ও নক্ষত্র। তারা বিশ্বাস করত যে, ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার কন্যা। তাই তারা আল্লাহ তাআলার কাছে ফেরেশতাদের সুপারিশকারীরূপে গ্রহণ করে। এমনকি প্রার্থনা কবুলের মাধ্যম হিসেবেও ফেরেশতাদের গ্রহণ করে। একইভাবে তারা জিনদেরকেও আল্লাহর তাআলার শরিক বানিয়ে তাদের অলৌকিক শক্তি ও প্রভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের পূজা করতে শুরু করে। (৭৬)
আরও একটি কারণ এই যে, ইহুদিরা তখন গোটা আরবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। ইহুদিধর্মের নেতারা আল্লাহ তাআলাকে ব্যতিরেকে নিজেরাই প্রভুর আসনে সমাসীন হয়েছিল। তারা জনমণ্ডলীর ওপর খড়গ ঝুলিয়ে রেখেছিল এবং তাদের কাছে এমনকি মনের চিন্তা ও ঠোঁটের ফিসফিসানির জন্যও মানুষকে জবাবদিহি করতে হতো। তারা তাদের সমস্ত চিন্তাভাবনা সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের পেছনে নিয়োজিত করেছিল। যদিও এতে ধর্মের বিনাশ ঘটেছিল এবং ধর্মহীনতা, অবিশ্বাস ও কুফরি ছড়িয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে খ্রিষ্টধর্ম এক ভীষণ দুর্বোধ্য পৌত্তলিকতায় পর্যবসিত হয়েছিল। তা (ত্রিত্ববাদের ধারণার ফলে) আল্লাহ তাআলা ও মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত সংমিশ্রণের উদ্ভব ঘটিয়েছিল। আরবের খ্রিষ্টধর্ম অনুসারীদের অন্তরে এই ধর্মের কোনোরূপ সত্যিকার প্রভাব ছিল না। (৭৭)
নৈতিক ও চারিত্রিক দিক বিবেচনায় তারা চরম অবক্ষয় ও অধঃপতনের শিকার হয়েছিল। মদ্যপান মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সমাজের গভীরতায় তার কঠিন শেকড় বিস্তার করেছিল। এ কারণে তখনকার কাব্যকলা, ইতিহাস ও সাহিত্যের একটি বিরাট অংশই ছিল মদের দখলে। একইভাবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জুয়া তার থাবা ছড়িয়ে দিয়েছিল। কাতাদা (৭৮) বলেন, জাহিলি যুগে মানুষ তার স্ত্রী ও সম্পদের ওপরও জুয়া খেলত, বাজি ধরত। তারপর রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে বেদনার্ত চোখে দেখত যে, তার স্ত্রী ও সম্পদ অন্যের হাতে চলে গেছে। এর ফলে তাদের মধ্যে ভয়াবহ শত্রুতা ও কলহবিবাদ শুরু হতো। (৭৯)
একইভাবে আরবদের ও ইহুদিদের মধ্যে সুদি কারবার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। সুদি কারবারের শেকড় অনেকদূর পর্যন্ত প্রোথিত ছিল। এমনকি তারা বলেছিল, বেচাকেনা তো সুদের মতোই। একইভাবে নারী-পুরুষের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল। ব্যভিচার একটি প্রচলিত প্রথার রূপ ধারণ করেছিল। পুরুষ ইচ্ছে করলেই কয়েকজন উপপত্নী বা রক্ষিতা গ্রহণ করতে পারত, নারীরাও মনে ধরলে কয়েকজন উপপতি বা প্রণয়সঙ্গী গ্রহণ করতে পারত। এতে কোনো বৈধ বন্ধন বা চুক্তির প্রয়োজন হতো না। ওই যুগে কী ধরনের বিবাহ প্রচলিত ছিল তার প্রকারভেদ উল্লেখ করে সাইয়িদা আয়িশা রা. বলেন,
«إِنَّ النَّكَاحَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ كَانَ عَلَى أَرْبَعَةِ أَنْحَاءٍ فَنِكَاحُ مِنْهَا نِكَاحُ النَّاسِ الْيَوْمَ يَخْطُبُ الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ وَلِيَّتَهُ أَوْ ابْنَتَهُ فَيُصْدِقُهَا ثُمَّ يَنْكِحُهَا وَنِكَاحَ آخَرُ كَانَ الرَّجُلُ يَقُولُ لِامْرَأَتِهِ إِذَا طَهُرَتْ مِنْ طَمْثِهَا أَرْسِلِي إِلَى فُلَانٍ فَاسْتَبْضِعِي مِنْهُ وَيَعْتَزِلُهَا زَوْجُهَا وَلَا يَمَسُّهَا أَبَدًا حَتَّى يَتَبَيَّنَ حَمْلُهَا مِنْ ذُلِكَ الرَّجُلِ الَّذِي تَسْتَبْضِعُ مِنْهُ فَإِذَا تَبَيَّنَ حَمْلُهَا أَصَابَهَا زَوْجُهَا إِذَا أَحَبَّ وَإِنَّمَا يَفْعَلُ ذَلِكَ رَغْبَةً فِي نَجَابَةِ الْوَلَدِ فَكَانَ هَذَا النِّكَاحُ نِكَاحَ الاسْتِبْضَاعِ وَنِكَاحُ آخَرُ يَجْتَمِعُ الرَّهْطُ مَا دُونَ الْعَشَرَةِ فَيَدْخُلُونَ عَلَى الْمَرْأَةِ كُلُّهُمْ يُصِيبُهَا فَإِذَا حَمَلَتْ وَوَضَعَتْ وَمَرَّ عَلَيْهَا لَيَالٍ بَعْدَ أَنْ تَضَعَ حَمْلَهَا أَرْسَلَتْ إِلَيْهِمْ فَلَمْ يَسْتَطِعْ رَجُلٌ مِنْهُمْ أَنْ يَمْتَنِعَ حَتَّى يَجْتَمِعُوا عِنْدَهَا تَقُولُ لَهُمْ قَدْ عَرَفْتُمْ الَّذِي كَانَ مِنْ أَمْرِكُمْ وَقَدْ وَلَدْتُ فَهُوَ ابْنُكَ يَا فُلَانُ تُسَمِّي مَنْ أَحَبَّتْ بِاسْمِهِ فَيَلْحَقُ بِهِ وَلَدُهَا لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يَمْتَنِعَ بِهِ الرَّجُلُ وَنِكَاحُ الرَّابِعِ يَجْتَمِعُ النَّاسُ الْكَثِيرُ فَيَدْخُلُونَ عَلَى الْمَرْأَةِ لَا تَمْتَنِعُ مِمَّنْ جَاءَهَا وَهُنَّ الْبَغَايَا كُنَّ يَنْصِبْنَ عَلَى أَبْوَابِهِنَّ رَايَاتٍ تَكُونُ عَلَمًا فَمَنْ أَرَادَهُنَّ دَخَلَ عَلَيْهِنَّ فَإِذَا حَمَلَتْ إِحْدَاهُنَّ وَوَضَعَتْ حَمْلَهَا جمِعُوا لَهَا وَدَعَوْا لَهُمُ الْقَافَةَ ثُمَّ أَلْحَقُوا وَلَدَهَا بِالَّذِي يَرَوْنَ فَالْتَاطَ بِهِ وَدُعِيَ ابْنَهُ لَا يَمْتَنِعُ مِنْ ذَلِكَ
জাহিলি যুগে চার প্রকারের বিবাহ প্রচলিত ছিল। প্রথম প্রকার : বর্তমান যে ব্যবস্থা চলছে অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি কোনো নারীর অভিভাবকের কাছে তার অধীনে থাকা নারী অথবা তার কন্যার জন্য বিবাহের প্রস্তাব দেবে এবং তার মোহর নির্ধারণের পর বিবাহ করবে। দ্বিতীয় প্রকার : কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তার মাসিক (ঋতুস্রাব) থেকে মুক্ত হওয়ার পর এই কথা বলত যে, তুমি অমুক ব্যক্তির কাছে যাও এবং তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম করো। এরপর স্বামী তার এই স্ত্রী থেকে পৃথক থাকত এবং কখনো স্ত্রীসহবাস করত না, যতক্ষণ না তার এই স্ত্রী যে লোকটার সঙ্গে যৌনসঙ্গমে মিলিত হচ্ছে তার দ্বারা গর্ভবতী হতো। যখন তার গর্ভ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হতো তখন ইচ্ছা করলে স্বামী তার এই স্ত্রীর সাথে সহবাস করত। স্বামী উন্নত ধরনের সন্তান প্রজননের আশায় এই কাজ করত। এ ধরনের বিবাহকে ‘নিকাহুল ইসতিবদা’ বলা হতো। তৃতীয় প্রকার বিবাহ: দশজনের কম সংখ্যক ব্যক্তি একত্র হয়ে পালাক্রমে একই নারীর সাথে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতো। যদি নারীটি গর্ভবতী হতো, তারপর সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কিছুদিন অতিবাহিত হতো, সেই নারী তার সঙ্গে সঙ্গমকারী সব পুরুষকে ডেকে পাঠাত এবং কেউই আসতে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না। তারা সবাই নারীটির সামনে সমবেত হওয়ার পর সে তাদেরকে বলত, তোমরা সকলেই জানো তোমরা কী করেছ! এখন আমি সন্তান প্রসব করেছি। সুতরাং হে অমুক! এটা তোমারই সন্তান। ওই নারী যাকে খুশি তার নাম ধরে ডাকত, তখন ওই পুরুষ নবজাতক শিশুটিকে গ্রহণ করতে বাধ্য থাকত এবং সে তা অস্বীকার করতে পারত না। চতুর্থ প্রকারের বিবাহ : বহু পুরুষ একজনমাত্র নারীর সঙ্গে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতো এবং ওই নারী তার কাছে যত পুরুষ আসত, কাউকে রমণসঙ্গী করতে অস্বীকার করত না। তারা ছিল বারবনিতা। বারবনিতারা তাদের চিহ্নরূপে নিজ নিজ ঘরের সামনে পতাকা উড়িয়ে রাখত। যে কেউ ইচ্ছা করলে অবাধে তাদের সঙ্গে যৌনসম্ভোগে লিপ্ত হতে পারত। যদি এসব নারীর মধ্যে কেউ গর্ভবতী হতো এবং সন্তান প্রসব করত তাহলে যৌনসঙ্গমকারী সকল পুরুষ সমবেত হতো এবং 'কায়িফ'(৮০)-কে ডেকে আনত। এ সকল ব্যক্তি সন্তানটির সঙ্গে যে লোকটির সাদৃশ্য পেত তাকে বলত, এটি তোমার সন্তান। তখন ওই পুরুষটি নবজাতক সন্তানকে নিজের নয় বলে অস্বীকৃতি জানাতে পারত না।(৮১)
নারীদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে বলতে গেলে উমর ইবনুল খাত্তাব রা. সারমর্মরূপে যে কথা বলেছেন সেটা উল্লেখ করাই সমীচীন। তিনি বলেছেন, 'আল্লাহর কসম! আমরা জাহিলি যুগে নারীদের কোনোকিছুরূপে গণ্য করতাম না। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে যা নাযিল করলেন তা তো সবার সামনেই রয়েছে।'(৮২)
নারীদের কোনো উত্তরাধিকার ছিল না। উত্তরাধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আরবরা বলত, আমাদের মধ্যে যারা তরবারি ধারণ করতে পারে এবং সম্পদ ও ভূখণ্ড রক্ষা করতে পারে তারাই কেবল উত্তরাধিকার পাবে। তাই কোনো লোক মারা গেলে তার পুত্রসন্তান উত্তরাধিকার পেত। পুত্রসন্তান না থাকলে তার নিকটাত্মীয় অভিভাবক তা পেত। পিতা বা ভাই বা চাচা, যে-ই হোক না কেন। আর মৃত ব্যক্তির স্ত্রী ও কন্যাদেরকে যে লোকটি উত্তরাধিকার পেয়েছে তার স্ত্রী ও কন্যাদের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হতো। তারা যা পেত, এরাও তা-ই পেত; তাদের ওপর যে দায়িত্ব বর্তাত এদের ওপরও একই দায়িত্ব বর্তাত। নারীর জন্য তার স্বামীর ওপর আদতেই কোনোরূপ অধিকার ছিল না। তালাকের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। পুরুষরা ইচ্ছামতো যে-কয়জন খুশি স্ত্রী গ্রহণ করতে পারত, নির্ধারিত কোনো সংখ্যা ছিল না। আরবদের একটি জঘন্য প্রথা ছিল এমন, কোনো লোক তার স্ত্রী এবং এই স্ত্রী ব্যতীত অন্য স্ত্রীদের সন্তান রেখে মারা গেলে তার বড় পুত্রসন্তান তার পিতার স্ত্রীর ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় অগ্রাধিকার পেত। সে তার পিতার অন্যান্য সম্পদের মতো স্ত্রীকেও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ মনে করত।(৮৩)
মেয়েদের প্রতি আরবদের ঘৃণা এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তারা মেয়েদের জীবন্ত পুঁতে ফেলতে শুরু করল। মেয়েদের পুঁতে ফেলা ছিল জাহিলি যুগের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্য প্রথা। আরবের কোনো কন্যাসন্তান যদি মাটির গর্ভে প্রোথিত হওয়া থেকে কোনোক্রমে বেঁচে যেত, তবে তাকে এক অন্ধকারপূর্ণ দুর্বিষহ জীবনের অপেক্ষায় থাকতে হতো। আল-কুরআনুল কারিম এই অবস্থাকে বর্ণনা করেছে এভাবে,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأُنْثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ كَظِيمٌ ( يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُونٍ أَمْ يَدُسُهُ فِي التُّرَابِ أَلَا ساءَ مَا يَحْكُمُونَ
তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয় তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেওয়া হয় তার গ্লানির কারণে সে নিজ সম্প্রদায় থেকে আত্মগোপনে চলে যায়। সে চিন্তা করে, হীনতাসত্ত্বেও সে তাকে রেখে দেবে, নাকি মাটিতে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! তারা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা অতি নিকৃষ্ট!(৮৪)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে জাযিরাতুল আরবের পরিস্থিতি এমনই ছিল।

টিকাঃ
৭৩. জাওয়াদ আলি, আল-মুফাসসাল ফি তারিখিল আরব কাবলাল ইসলাম, খ. ১, পৃ. ৩৭১।
৭৪. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৭৬-৭৭।
৭৫. বুখারি, হাদিস নং ৪১১৭।
৭৬. আবুল মুনযির হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব আল-কালবি, কিতাবুল আসনাম, পৃ. ৪৪।
৭৭. সফিউদ্দিন মুবারকপুরি, আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃ. ৪৭।
৭৮. কাতাদা আস-সাদুদি (৬০-১১৭/১১৮ হিজরি): বিশিষ্ট তাবেয়ি ও উঁচুস্তরের আলেম। আবু উবাইদা বলেন, প্রতিদিন বনু উমাইয়া এলাকা থেকে কোনো-না-কোনো ব্যক্তি কাতাদা আস-সাদুসির দরজায় কড়া নাড়তেন এবং তার কাছে হাদিস, বংশধারা বা কবিতা জানতে চাইতেন। তিনি ইরাকের ওয়াসিত জেলায় মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ'য়ান, ৪/৮৫-৮৬; যাহাবি, তাযকিরাতুল হুফফায, খ. ১,পৃ. ১২২-১২৩।
৭৯. তাবারি, জামিউল বায়ান ফি তাবিলিল কুরআন, খ. ১০, পৃ. ৫৭৩; আযিমাবাদি, আওনুল মাবুদ, খ. ১০, পৃ. ৭৯।
৮০. যে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি সন্তানের গোপন চিহ্ন দেখে তার পিতার সঙ্গে সাদৃশ্য নির্ণয় করতে পারতেন। দেখুন, ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, খ. ৯, পৃ. ১৮৫।
৮১. বুখারি, কিতাব: বিবাহ, বাব: মান কালা লা নিকাহা ইল্লা বি-ওয়ালিয়্যিন, হাদিস নং ৪৮৩৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২২৭২।
৮২. বুখারি, কিতাব: আত-তাফসির, বাব: তাফসিরু সুরাতিত তালাক, হাদিস নং ৪৬২৯; মুসলিম, কিতাব: তালাক, বাব: ইলা ও ইতিযালুন নিসা ওয়া তাখইরিহিন্না, হাদিস নং ১৪৭৯।
৮৩. ড. মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইসমাইল আল-মুকাদ্দাম, আল-মারআতু বায়না তাকরিমিল ইসলাম ওয়া ইহানাতুল জাহিলিয়্যা, পৃ. ৫৭।
৮৪. সুরা নাহল: আয়াত ৫৮-৫৯।

📘 মুসলিমজাতি বিশ্বকে কী দিয়েছে > 📄 একনজরে ইসলামপূর্ব বিশ্ব

📄 একনজরে ইসলামপূর্ব বিশ্ব


আমরা ইসলামপূর্ব বিশ্বের কয়েকটি বৃহৎ সভ্যতার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছি। এখন আমরা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বে বিশ্ব, মানবমণ্ডলী ও মানবতার কী অবস্থা ছিল তার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করব। তার থেকে যে সারমর্ম আমরা পাই তা এই যে, স্তূপীকৃত গভীর অমানিশা চূর্ণবিচূর্ণ করার এবং মানবতার স্কন্ধমূলে আটকে পড়া যন্ত্রণা-দুর্দশাকে দূরীভূত করার জন্য ইসলামের আলো ও ইসলামি সভ্যতার প্রয়োজন প্রকট ছিল।
ইসলামপূর্ব বিশ্বের মোটামুটি অবস্থার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস উদ্ধৃত করছি। ইয়ায ইবনে হিমার রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ نَظَرَ إِلَى أَهْلِ الْأَرْضِ فَمَقَتَهُمْ عَرَبَهُمْ وَعَجَمَهُمْ إِلَّا بَقَايَا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
আল্লাহ তাআলা জমিনের মানবমণ্ডলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন, তখন (তাদের চরম পথভ্রষ্টতার কারণে) কতিপয় আহলে কিতাব ব্যতীত আরব ও অনারব সকলের ওপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। (৮৫)
মানুষের অবস্থা অধঃপতনের এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তা তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার ঘৃণা ও ক্রোধকে আবশ্যক করে তুলেছিল। হাদিসে ব্যবহৃত (مقت) 'মাক্ত' শব্দটি প্রচণ্ড ঘৃণা বোঝায়। কতিপয় আহলে কিতাবের কথা বলতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক (بقايا) 'বাকায়া' শব্দের ব্যবহার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রতি ইঙ্গিত করে। যেন তারা বহু প্রাচীন যুগের নিদর্শন, বাস্তবিক মানবমণ্ডলীর মধ্যে তাদের কোনো মূল্য নেই। অন্যদিকে এই কতিপয় আহলে কিতাব কখনোই পরিপূর্ণ সমাজ গঠন করতে পারেননি, বরং তারা সমাজের মুষ্টিমেয় সদস্য বলেই গণ্য ছিলেন।
সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ. এ বিষয়ে সবিস্তার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীর বুকে না ছিল কোনো বোধসম্পন্ন বিবেকবান জাতি, না ছিল নীতিনৈতিকতা ও মর্যাদাবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সমাজ। দয়া ও ইনসাফের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো শাসনব্যবস্থা ছিল না, জ্ঞানসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান শাসকও ছিল না, নেতাও ছিল না। আর নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) আনীত বিশুদ্ধ ধর্ম একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল। (৮৬)
গোটা মানববিশ্বে পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, অধঃপতিত, বিনাশ-কবলিত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয়-জীবনের সব দিকে, সব ক্ষেত্রে সমানভাবে ফ্যাসাদ ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। দুনিয়াকে গ্রাস করেছিল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, মূর্খতা ও অজ্ঞতা দুনিয়ার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল, যা দুনিয়াকে কুসংস্কার, অলিক ধ্যানধারণার সংঘর্ষপূর্ণ সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছিল। মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও রিপুই ছিল দুনিয়ার পরিচালক। তাই মানুষ পাথরের, সূর্যের, চন্দ্রের, আগুনের, এমনকি পশুর পূজা করত। গোটা মানবগোষ্ঠী বিভক্ত হয়ে পড়েছিল দুইভাগে, শাসক শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। তারা এতিম ও অসহায়দের সম্পদ আত্মসাৎ করত, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করত। তাদের পারস্পরিক লেনদেনই ছিল হানাহানি, লুণ্ঠন, ছিনতাই, রাহাজানি। শুধু তাই নয়, অপরাধ, পাপাচার ও গর্হিত কাজ করে তারা গৌরববোধ করত। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো নিয়মনীতি বা আইন ছিল না, ছিল কেবল মাৎস্যন্যায়, পাশবিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং জোর যার মুলুক তার নীতি। শক্তিমানরা দুর্বলদের শোষণ ও উৎপীড়ন করত, ধনীরা গরিবদের দাস বানিয়ে রাখত। সবাই বন্দি ছিল দুর্ভেদ্য অন্ধকারে, যার কোনো শেষ ছিল না, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না।
এসব পরিস্থিতি মানবমণ্ডলীকে উদ্‌ভ্রান্ত, হতাশ, রিক্ত-নিঃস্ব বানিয়ে দিয়েছিল। তাদের অন্তরে ভীতি ও আশঙ্কা ছাড়া কিছুই ছিল না। তাদের জ্ঞান ও চিন্তায় ছিল কেবল শূন্যতা, অলিক জল্পনাকল্পনা। ইসলামি সভ্যতার পূর্বে এটাই ছিল বিশ্বের মানবমণ্ডলীর অবস্থা!
ইসলামপূর্ব বিশ্বে এটাই ছিল অবস্থা, বিশেষ করে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। বিশ্বসভ্যতাগুলো গুটিয়ে গিয়েছিল। সবকিছু ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়।
অধ্যাপক ডেনিসন এই অবস্থার চিত্রায়ণ করেছেন এভাবে,
খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে সভ্য পৃথিবী ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়, কারণ যেসব বিশ্বাস সভ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে সহায়ক ছিল সেগুলোর বিনাশ ঘটে। এসব বিশ্বাসের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো উপযোগী কিছুই ছিল না। চারহাজার বছরের চেষ্টার ফলে যে বৃহৎ নগর-সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তা ভেঙে পড়ার উপক্রম ছিল। মানবতা যে বর্বরতা ও অসভ্যতা থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেদিকেই ফিরে যেতে চাইছিল। গোত্রগুলো পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ করছিল, রক্তপাত ঘটাচ্ছিল। কোনো আইন ছিল না, কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। খ্রিষ্টীয় মতবাদের ফলে যেসব শাসনব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছিল সেগুলো ঐক্য ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বদলে বিচ্ছিন্নতা ও ভাঙনের আগুনে ঘি ঢালছিল। ফলে যে সভ্যতা বিপুল ডালপালাসমৃদ্ধ বিশাল বৃক্ষের মতো ছিল, যার ছায়া ছড়িয়ে ছিল গোটা বিশ্বের ওপর তা শীর্ণকায় হয়ে হেলছিল। এতে তার দিকে ধেয়ে আসে ধ্বংস, এমনকি তার মজ্জাটুকুও শেষ হয়ে যায়। (৮৭)
ইসলামি সভ্যতার উষার উন্মেষ ও আলো ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত এরূপ अवस्थাই বিরাজমান ছিল। ইসলামি সভ্যতা মানবতার একটি উপহার, মনুষ্য কুলের জন্য পথনির্দেশনা।

টিকাঃ
৮৫. মুসলিম, কিতাব : আল-জান্নাহ ওয়া সিফাতু নাইমিহা ওয়া আহলিহা, হাদিস নং ২৮৬৫।
৮৬. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৯১।
৮৭. জন হপকিন্স ডেনিসন, Emotion as the Basis of Civilization; আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ৬, পৃ. ৩৬-৩৭।

আমরা ইসলামপূর্ব বিশ্বের কয়েকটি বৃহৎ সভ্যতার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছি। এখন আমরা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বে বিশ্ব, মানবমণ্ডলী ও মানবতার কী অবস্থা ছিল তার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করব। তার থেকে যে সারমর্ম আমরা পাই তা এই যে, স্তূপীকৃত গভীর অমানিশা চূর্ণবিচূর্ণ করার এবং মানবতার স্কন্ধমূলে আটকে পড়া যন্ত্রণা-দুর্দশাকে দূরীভূত করার জন্য ইসলামের আলো ও ইসলামি সভ্যতার প্রয়োজন প্রকট ছিল।
ইসলামপূর্ব বিশ্বের মোটামুটি অবস্থার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস উদ্ধৃত করছি। ইয়ায ইবনে হিমার রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ نَظَرَ إِلَى أَهْلِ الْأَرْضِ فَمَقَتَهُمْ عَرَبَهُمْ وَعَجَمَهُمْ إِلَّا بَقَايَا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
আল্লাহ তাআলা জমিনের মানবমণ্ডলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন, তখন (তাদের চরম পথভ্রষ্টতার কারণে) কতিপয় আহলে কিতাব ব্যতীত আরব ও অনারব সকলের ওপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। (৮৫)
মানুষের অবস্থা অধঃপতনের এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তা তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার ঘৃণা ও ক্রোধকে আবশ্যক করে তুলেছিল। হাদিসে ব্যবহৃত (مقت) 'মাক্ত' শব্দটি প্রচণ্ড ঘৃণা বোঝায়। কতিপয় আহলে কিতাবের কথা বলতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক (بقايا) 'বাকায়া' শব্দের ব্যবহার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রতি ইঙ্গিত করে। যেন তারা বহু প্রাচীন যুগের নিদর্শন, বাস্তবিক মানবমণ্ডলীর মধ্যে তাদের কোনো মূল্য নেই। অন্যদিকে এই কতিপয় আহলে কিতাব কখনোই পরিপূর্ণ সমাজ গঠন করতে পারেননি, বরং তারা সমাজের মুষ্টিমেয় সদস্য বলেই গণ্য ছিলেন।
সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ. এ বিষয়ে সবিস্তার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীর বুকে না ছিল কোনো বোধসম্পন্ন বিবেকবান জাতি, না ছিল নীতিনৈতিকতা ও মর্যাদাবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সমাজ। দয়া ও ইনসাফের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো শাসনব্যবস্থা ছিল না, জ্ঞানসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান শাসকও ছিল না, নেতাও ছিল না। আর নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) আনীত বিশুদ্ধ ধর্ম একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল। (৮৬)
গোটা মানববিশ্বে পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, অধঃপতিত, বিনাশ-কবলিত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয়-জীবনের সব দিকে, সব ক্ষেত্রে সমানভাবে ফ্যাসাদ ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। দুনিয়াকে গ্রাস করেছিল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, মূর্খতা ও অজ্ঞতা দুনিয়ার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল, যা দুনিয়াকে কুসংস্কার, অলিক ধ্যানধারণার সংঘর্ষপূর্ণ সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছিল। মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও রিপুই ছিল দুনিয়ার পরিচালক। তাই মানুষ পাথরের, সূর্যের, চন্দ্রের, আগুনের, এমনকি পশুর পূজা করত। গোটা মানবগোষ্ঠী বিভক্ত হয়ে পড়েছিল দুইভাগে, শাসক শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। তারা এতিম ও অসহায়দের সম্পদ আত্মসাৎ করত, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করত। তাদের পারস্পরিক লেনদেনই ছিল হানাহানি, লুণ্ঠন, ছিনতাই, রাহাজানি। শুধু তাই নয়, অপরাধ, পাপাচার ও গর্হিত কাজ করে তারা গৌরববোধ করত। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো নিয়মনীতি বা আইন ছিল না, ছিল কেবল মাৎস্যন্যায়, পাশবিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং জোর যার মুলুক তার নীতি। শক্তিমানরা দুর্বলদের শোষণ ও উৎপীড়ন করত, ধনীরা গরিবদের দাস বানিয়ে রাখত। সবাই বন্দি ছিল দুর্ভেদ্য অন্ধকারে, যার কোনো শেষ ছিল না, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না।
এসব পরিস্থিতি মানবমণ্ডলীকে উদ্‌ভ্রান্ত, হতাশ, রিক্ত-নিঃস্ব বানিয়ে দিয়েছিল। তাদের অন্তরে ভীতি ও আশঙ্কা ছাড়া কিছুই ছিল না। তাদের জ্ঞান ও চিন্তায় ছিল কেবল শূন্যতা, অলিক জল্পনাকল্পনা। ইসলামি সভ্যতার পূর্বে এটাই ছিল বিশ্বের মানবমণ্ডলীর অবস্থা!
ইসলামপূর্ব বিশ্বে এটাই ছিল অবস্থা, বিশেষ করে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। বিশ্বসভ্যতাগুলো গুটিয়ে গিয়েছিল। সবকিছু ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়।
অধ্যাপক ডেনিসন এই অবস্থার চিত্রায়ণ করেছেন এভাবে,
খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে সভ্য পৃথিবী ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়, কারণ যেসব বিশ্বাস সভ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে সহায়ক ছিল সেগুলোর বিনাশ ঘটে। এসব বিশ্বাসের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো উপযোগী কিছুই ছিল না। চারহাজার বছরের চেষ্টার ফলে যে বৃহৎ নগর-সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তা ভেঙে পড়ার উপক্রম ছিল। মানবতা যে বর্বরতা ও অসভ্যতা থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেদিকেই ফিরে যেতে চাইছিল। গোত্রগুলো পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ করছিল, রক্তপাত ঘটাচ্ছিল। কোনো আইন ছিল না, কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। খ্রিষ্টীয় মতবাদের ফলে যেসব শাসনব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছিল সেগুলো ঐক্য ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বদলে বিচ্ছিন্নতা ও ভাঙনের আগুনে ঘি ঢালছিল। ফলে যে সভ্যতা বিপুল ডালপালাসমৃদ্ধ বিশাল বৃক্ষের মতো ছিল, যার ছায়া ছড়িয়ে ছিল গোটা বিশ্বের ওপর তা শীর্ণকায় হয়ে হেলছিল। এতে তার দিকে ধেয়ে আসে ধ্বংস, এমনকি তার মজ্জাটুকুও শেষ হয়ে যায়। (৮৭)
ইসলামি সভ্যতার উষার উন্মেষ ও আলো ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত এরূপ अवस्थাই বিরাজমান ছিল। ইসলামি সভ্যতা মানবতার একটি উপহার, মনুষ্য কুলের জন্য পথনির্দেশনা।

টিকাঃ
৮৫. মুসলিম, কিতাব : আল-জান্নাহ ওয়া সিফাতু নাইমিহা ওয়া আহলিহা, হাদিস নং ২৮৬৫।
৮৬. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৯১।
৮৭. জন হপকিন্স ডেনিসন, Emotion as the Basis of Civilization; আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ৬, পৃ. ৩৬-৩৭।

আমরা ইসলামপূর্ব বিশ্বের কয়েকটি বৃহৎ সভ্যতার বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছি। এখন আমরা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বে বিশ্ব, মানবমণ্ডলী ও মানবতার কী অবস্থা ছিল তার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করব। তার থেকে যে সারমর্ম আমরা পাই তা এই যে, স্তূপীকৃত গভীর অমানিশা চূর্ণবিচূর্ণ করার এবং মানবতার স্কন্ধমূলে আটকে পড়া যন্ত্রণা-দুর্দশাকে দূরীভূত করার জন্য ইসলামের আলো ও ইসলামি সভ্যতার প্রয়োজন প্রকট ছিল।
ইসলামপূর্ব বিশ্বের মোটামুটি অবস্থার প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টিপাত করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস উদ্ধৃত করছি। ইয়ায ইবনে হিমার রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ اللَّهَ نَظَرَ إِلَى أَهْلِ الْأَرْضِ فَمَقَتَهُمْ عَرَبَهُمْ وَعَجَمَهُمْ إِلَّا بَقَايَا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
আল্লাহ তাআলা জমিনের মানবমণ্ডলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন, তখন (তাদের চরম পথভ্রষ্টতার কারণে) কতিপয় আহলে কিতাব ব্যতীত আরব ও অনারব সকলের ওপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। (৮৫)
মানুষের অবস্থা অধঃপতনের এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তা তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার ঘৃণা ও ক্রোধকে আবশ্যক করে তুলেছিল। হাদিসে ব্যবহৃত (مقت) 'মাক্ত' শব্দটি প্রচণ্ড ঘৃণা বোঝায়। কতিপয় আহলে কিতাবের কথা বলতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক (بقايا) 'বাকায়া' শব্দের ব্যবহার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রতি ইঙ্গিত করে। যেন তারা বহু প্রাচীন যুগের নিদর্শন, বাস্তবিক মানবমণ্ডলীর মধ্যে তাদের কোনো মূল্য নেই। অন্যদিকে এই কতিপয় আহলে কিতাব কখনোই পরিপূর্ণ সমাজ গঠন করতে পারেননি, বরং তারা সমাজের মুষ্টিমেয় সদস্য বলেই গণ্য ছিলেন।
সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ. এ বিষয়ে সবিস্তার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীর বুকে না ছিল কোনো বোধসম্পন্ন বিবেকবান জাতি, না ছিল নীতিনৈতিকতা ও মর্যাদাবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো সমাজ। দয়া ও ইনসাফের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো শাসনব্যবস্থা ছিল না, জ্ঞানসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান শাসকও ছিল না, নেতাও ছিল না। আর নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) আনীত বিশুদ্ধ ধর্ম একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে পড়েছিল। (৮৬)
গোটা মানববিশ্বে পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল নষ্ট-ভ্রষ্ট, অধঃপতিত, বিনাশ-কবলিত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয়-জীবনের সব দিকে, সব ক্ষেত্রে সমানভাবে ফ্যাসাদ ও গোলযোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। দুনিয়াকে গ্রাস করেছিল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, মূর্খতা ও অজ্ঞতা দুনিয়ার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল, যা দুনিয়াকে কুসংস্কার, অলিক ধ্যানধারণার সংঘর্ষপূর্ণ সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছিল। মানুষের কুপ্রবৃত্তি ও রিপুই ছিল দুনিয়ার পরিচালক। তাই মানুষ পাথরের, সূর্যের, চন্দ্রের, আগুনের, এমনকি পশুর পূজা করত। গোটা মানবগোষ্ঠী বিভক্ত হয়ে পড়েছিল দুইভাগে, শাসক শ্রেণি ও দাস শ্রেণি। তারা এতিম ও অসহায়দের সম্পদ আত্মসাৎ করত, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করত। তাদের পারস্পরিক লেনদেনই ছিল হানাহানি, লুণ্ঠন, ছিনতাই, রাহাজানি। শুধু তাই নয়, অপরাধ, পাপাচার ও গর্হিত কাজ করে তারা গৌরববোধ করত। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো নিয়মনীতি বা আইন ছিল না, ছিল কেবল মাৎস্যন্যায়, পাশবিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং জোর যার মুলুক তার নীতি। শক্তিমানরা দুর্বলদের শোষণ ও উৎপীড়ন করত, ধনীরা গরিবদের দাস বানিয়ে রাখত। সবাই বন্দি ছিল দুর্ভেদ্য অন্ধকারে, যার কোনো শেষ ছিল না, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না।
এসব পরিস্থিতি মানবমণ্ডলীকে উদ্‌ভ্রান্ত, হতাশ, রিক্ত-নিঃস্ব বানিয়ে দিয়েছিল। তাদের অন্তরে ভীতি ও আশঙ্কা ছাড়া কিছুই ছিল না। তাদের জ্ঞান ও চিন্তায় ছিল কেবল শূন্যতা, অলিক জল্পনাকল্পনা। ইসলামি সভ্যতার পূর্বে এটাই ছিল বিশ্বের মানবমণ্ডলীর অবস্থা!
ইসলামপূর্ব বিশ্বে এটাই ছিল অবস্থা, বিশেষ করে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। বিশ্বসভ্যতাগুলো গুটিয়ে গিয়েছিল। সবকিছু ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়।
অধ্যাপক ডেনিসন এই অবস্থার চিত্রায়ণ করেছেন এভাবে,
খ্রিষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে সভ্য পৃথিবী ছিল অরাজকতার ধসোন্মুখ কিনারায়, কারণ যেসব বিশ্বাস সভ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে সহায়ক ছিল সেগুলোর বিনাশ ঘটে। এসব বিশ্বাসের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো উপযোগী কিছুই ছিল না। চারহাজার বছরের চেষ্টার ফলে যে বৃহৎ নগর-সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তা ভেঙে পড়ার উপক্রম ছিল। মানবতা যে বর্বরতা ও অসভ্যতা থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেদিকেই ফিরে যেতে চাইছিল। গোত্রগুলো পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ করছিল, রক্তপাত ঘটাচ্ছিল। কোনো আইন ছিল না, কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। খ্রিষ্টীয় মতবাদের ফলে যেসব শাসনব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছিল সেগুলো ঐক্য ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বদলে বিচ্ছিন্নতা ও ভাঙনের আগুনে ঘি ঢালছিল। ফলে যে সভ্যতা বিপুল ডালপালাসমৃদ্ধ বিশাল বৃক্ষের মতো ছিল, যার ছায়া ছড়িয়ে ছিল গোটা বিশ্বের ওপর তা শীর্ণকায় হয়ে হেলছিল। এতে তার দিকে ধেয়ে আসে ধ্বংস, এমনকি তার মজ্জাটুকুও শেষ হয়ে যায়। (৮৭)
ইসলামি সভ্যতার উষার উন্মেষ ও আলো ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত এরূপ अवस्थাই বিরাজমান ছিল। ইসলামি সভ্যতা মানবতার একটি উপহার, মনুষ্য কুলের জন্য পথনির্দেশনা।

টিকাঃ
৮৫. মুসলিম, কিতাব : আল-জান্নাহ ওয়া সিফাতু নাইমিহা ওয়া আহলিহা, হাদিস নং ২৮৬৫।
৮৬. সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ., মা-যা খাসিরাল আলামু বিনহিতাতিল মুসলিমিন, পৃ. ৯১।
৮৭. জন হপকিন্স ডেনিসন, Emotion as the Basis of Civilization; আহমাদ শালবি, মাওসুআতুল হাদারাতিল ইসলামিয়্যা, খ. ৬, পৃ. ৩৬-৩৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00