📄 চতুর্থ পরিচ্ছেদ: যা খবীছ তা খবীছ ছাড়া আর কী দেবে?
বিভিন্ন ঐতিহাসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও স্বভাবগত অনিবার্য কারণে ইতিহাসের প্রাচীনতম সময় থেকেই জড়বাদ ও বস্তুবাদই হয়ে পড়েছিলো পাশ্চাত্যের জীবন ও সভ্যতার প্রতীক। ইউরোপের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নব-উত্থান সেটাকে নতুন গতি ও শক্তি দান করেছে মাত্র।
যা খবীছ তা খবীছ ছাড়া আর কী দেবে?
উপরে বর্ণিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এটা স্পষ্ট যে, ইউরোপীয় সভ্যতার বুনিয়াদ এখন নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। দিন দিন তার উচ্চতা যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা ও পতনঝুঁকি ততই বেড়ে চলেছে। আর এটাই স্বাভাবিক। কারণ এ সভ্যতার বীজ নষ্ট বীজ; সুতরাং তার বৃক্ষ যেমন ভালো হতে পারে না তেমনি তার ফলও উত্তম হতে পারে না।
وَالْبَلَدُ الطَّيِّبُ يَخْرُجُ نَبَاتُهُ بِإِذْنِ رَبِّهِ وَالَّذِي خَبُثَ لَا تَخْرُجُ إِلَّا نَكِدًا
'আর উত্তম শহর, তার উদ্ভিদ (উত্তমরূপে) অঙ্কুরিত হয়, কিন্তু যা নিকৃষ্ট তা তো নিকৃষ্ট ছাড়া আর কোনরূপে অঙ্কুরিত হতে পারে না।' (আল-আ'রাফ, ৭: ৫৮)
উপমহাদেশের প্রখ্যাত এক মুসলিম স্কলার সংক্ষেপে বিষয়টি এভাবে তুলে ধরছেন—
'যে ভূখণ্ড ও জনগোষ্ঠীতে পাশ্চাত্য সভ্যতার আত্মপ্রকাশ, সেখানে আসমানি হিকমত ও ঐশী প্রজ্ঞার কোন স্বচ্ছ ও সুমিষ্ট ঝর্ণাধারা ছিলো না (যা হৃদয় ও আত্মার পিপাসা নিবারণ করতে পারে, যার সম্পর্কে বলা যায়, 'একবার পান করে আর পিপাসা ধরে না')। সেখানে ধর্মনেতা কম ছিলেন না, কিন্তু তাদের কাছে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আসমানি শরী'আত ছিলো না; ছিলো ধর্মের কিছু আবছা ছায়া, যা চিন্তা ও কর্মের সরল পথে মানবজাতিকে পরিচালিত করতে যদি ইচ্ছাও করতো, পারতো না। তবে ধর্ম নামের ঐ বস্তুটির উচিত ছিলো না জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধক ও 'হোঁচটখাওয়া পাথর' হওয়া, কিন্তু তাই হয়েছিলো। ফলে, যারা বিজ্ঞানের অভিযাত্রায় বদ্ধপরিকর ছিলো তারা ধর্মের জোয়াল ছুঁড়ে ফেলে দিলো এবং একটি পথ ও পন্থা গ্রহণ করলো যেখানে অবলোকন ও পরীক্ষা এবং গবেষণ ও নীরিক্ষা ছাড়া তাদের আর কোন প্রমাণ ও প্রদর্শক ছিলো না। এই প্রমাণ ও প্রদর্শক-এর উপরই তারা নিঃশর্ত আস্থা স্থাপন করেছিলো, অথচ এগুলো নিজেই ছিলো প্রমাণসাপেক্ষ এবং হিদায়াত ও নূরের মুহতাজ। অবলোকন, নিরীক্ষণ ও পরীক্ষণ—এসব প্রমাণের ভিত্তিতেই তারা চিন্তা-গবেষণা, সন্ধান-অনুসন্ধান ও নির্মাণ-বিনির্মাণের পথে অগ্রসর হলো এবং চেষ্টা-সাধনায় আত্মনিয়োগ করলো। কিন্তু প্রতিটি দিকে, প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের প্রথম পদক্ষেপই ছিলো ভ্রান্ত। ফলে জ্ঞানসাধনার সর্বঅঙ্গনে তাদের অভূতপূর্ব সফলতা এবং চিন্তা-গবেষণার পথে তাদের সব প্রয়াস-প্রচেষ্টা তাদেরকে সঠিক লক্ষ্যে উপনীত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো।
তারা যাত্রা শুরু করলো জড়বাদ ও নাস্তিকতা, এই বিন্দু থেকে। বিশ্বজগতকে তারা দেখলো এই বিশ্বাস থেকে যে, এর কোন স্রষ্টা নেই এবং অবলোকন ও অনুভবের বাইরে কোন কিছুর উপস্থিতি নেই। এই যে দৃশ্য পর্দা, এর আড়ালে অদৃশ্য কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তারা প্রকৃতির নীতি ও সূত্র অনুধাবন করতে তো সক্ষম হলো, কিন্তু প্রকৃতির নিয়ন্তা-শক্তির পরিচয় অর্জনে ব্যর্থ হলো। বিদ্যমান বস্তু, পদার্থ ও ব্যবস্থাকে তারা 'নিয়ন্ত্রিত' দেখতে পেলো এবং বিভিন্ন কাজেও লাগালো, কিন্তু ভুলে গেলো যে, তারা এগুলোর মালিক নয়, প্রকৃত মালিকের প্রতিনিধিমাত্র। তাই তাদের মনেই হলো না যে, এ বিষয়ে তাদের কোন দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা আছে এবং কোন ঊর্ধ্বশক্তির কাছে তাদের জবাবদেহি করতে হবে। ফলে তাদের সভ্যতার ভিত্তিতেই গলদ রয়ে গেলো। স্রষ্টার উপাসনা ছেড়ে তারা মেতে উঠলো আত্মপূজায়। প্রবৃত্তিই হলো তাদের উপাস্য, যা তাদের নিক্ষেপ করলো এক মহাফিতনার আবর্তে, যা থেকে উদ্ধারের কোন উপায় থাকলো না। বরং মন-মনন ও চিন্তা-চেতনার সব ক্ষেত্রেই আপাত সুন্দর, কিন্তু বড় ভয়ঙ্কর পথে তারা এগিয়ে গেলো, যার পরিণতি ধ্বংস ছাড়া আর কিছু নয়।
এটাই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে বিকৃত ও বিনষ্ট করেছে। ফলে মানব-কল্যাণের মাধ্যম না হয়ে তা হয়ে পড়েছে মানবতার ধ্বংসের বাহন। এবং আখলাক ও চরিত্র হয়ে পড়েছে খাহেশাত ও প্রবৃত্তির অনুগামী এবং নগ্নতা ও স্বেচ্ছাচারের অপর নাম। সর্বোপরি জীবন ও জীবিকা এবং সমাজ ও সামাজিকতা, সবকিছুর উপর চেপে বসেছে কৃপণতা, স্বার্থপরতা, নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার শয়তান। শিরায় শিরায় প্রবাহিত হচ্ছে আত্মপূজা, আত্মকেন্দ্রিকতা, আত্মঅহমিকা ও ভোগ-লালসা। একারণেই রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতিতে চলছে বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের জিঘাংসা ও উন্মাদনা, চলছে শক্তিদেবতার পূজা ও বন্দনা, যা মানবতার জন্য আজ সবচে' বড় অভিশাপ।
মোটকথা, নবজাগরণের পর ইউরোপের মাটিতে যে দুষ্ট বীজ বপন করা হয়েছিলো, কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই তা এক বিরাট বিষবৃক্ষের রূপ ধারণ করে ফেলেছে এবং স্বাভাবিক ফল দিতে শুরু করেছে, যা বাইরে সুন্দর, কিন্তু ভিতরে তিতা ও বিষে ভরা, যার শাখা-প্রশাখা সবুজ পাতায় ছাওয়া, কিন্তু তা অক্সিজেন নির্গত করে না, বিষাক্ত গ্যাস ছড়ায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহের রক্তে গিয়ে মিশে যায়।
পাশ্চাত্য জাতি, যারা নিজেরাই এ দুষ্ট বৃক্ষ রোপণ করেছে, এর বিষাক্ততায় আজ অতিষ্ঠ ও দিশেহারা হয়ে পড়েছে। কেননা জীবনের সর্বক্ষেত্রে তা অসংখ্য সমস্যা ও সঙ্কট সৃষ্টি করেছে এবং করে চলেছে। হয়ত তারা একটি সমস্যার সমাধান করে, কিন্তু সেখান থেকে নতুন নতুন সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। একটি ডাল যদি বা কাটে, সেখান থেকে আরো অসংখ্য ডাল-কাঁটা গজিয়ে ওঠে। তাদের অবস্থা হয়েছে সেই হতভাগ্য চিকিৎসকের মত যে রোগ দিয়ে রোগের চিকিৎসা করে এবং কাঁটা দিয়ে কাঁটারের আঘাত সারাতে চায়। তারা যখন পূজিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো তখন কমিউনিজম জন্ম নিলো। যখন গণতন্ত্রের মূলোৎপাটন করতে চাইল তখন একনায়কত্ব আজদাহার মত মুখ হা করলো। যখন সামাজিক সঙ্কটের সমাধান করার চেষ্টা করলো, তখন সমাধান তো হলোই না, বরং দানা বেঁধে উঠলো নারীর পুরুষায়ণ ও জন্মনিরোধ আন্দোলন। নৈতিক অনাচার দূর করার জন্য যখন আইন ও বিধান তৈরী করলো তখন অপরাধ ও আইন অমান্যের প্রবণতা হলো সর্বগ্রাসী। ফলে একটি মন্দ আরেকটি মন্দকে এবং একটি ফাসাদ আরো বড় ফাসাদকেই শুধু ডেকে আনতে লাগলো। এভাবে এ বিষবৃক্ষ তাদের জীবনে বিষ ও বিষাক্ত কাঁটাই শুধু ছড়িয়ে চলেছে এবং নিত্য নতুন বিপদ ও বিপর্যয় ডেকে আনছে। ফলে পাশ্চাত্যের সমাজদেহ আজ তাদের চিন্তানায়ক ও বিদগ্ধ পণ্ডিতদের মতেও দগদগে ঘা ও পূজপূর্ণ ক্ষতে এমনভাবে ভরে গেছে যে, ক্ষত ধোয়া ও মলম লাগানোরও উপায় নেই—
'তান হামা দাগ দাগ শুদ, পুম্বা কুজা কুজা নিহাম'—সারা দেহে ক্ষত, তুলো ও মলম লাগাব কোথায়?
রোগ-ব্যাধি এখন চিকিৎসককেই যেন দিশেহারা করে ফেলেছে এবং ছেঁড়া-ফাড়া রিফুকারীকে হতভম্ব করে ফেলেছে। পাশ্চাত্য আজ রোগে, শোকে, ব্যথায়, যন্ত্রণায় কাতর। অস্থিরতায় শুধু ছটফট করছে, কিন্তু উপশমের উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। তার হৃদয় শান্তির জন্য ব্যাকুল এবং তার আত্মা অমৃতজলের জন্য পিপাসার্ত, কিন্তু জানা নেই কোথায় জল ও জলাশয়?! কোথায় অমৃত, কোথায় আবেহায়াত?!
পাশ্চাত্যের বিদগ্ধ সমাজের সাধারণ ধারণা, সমস্যার উৎস হচ্ছে গাছের ডাল-পালায়। তাই তারা ডাল-পালা কাটতেই ব্যস্ত এবং এতেই তাদের সময়, শ্রম ও মেধার অপচয় ঘটছে। তারা জানে না, কিংবা জানতে চায় না যে, ফাসাদ ও নষ্টতা ডাল-পালায় নয়, গাছের গোড়ায়। আর এটা কোন বিচক্ষণতা ও বুদ্ধি-মত্তার পরিচয় নয় যে, নষ্ট বীজ থেকে উত্তম বৃক্ষ এবং মন্দ মূল থেকে উত্তম শাখা আশা করা হবে।
কতিপয় জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি অবশ্য সত্য অনুধাবন করতে পেরেছে, কিন্তু যেহেতু তারা বহু শতাব্দী ধরে এই বিষবৃক্ষের বিষাক্ত ছায়ায় প্রতিপালিত হয়েছে এবং এর ফল দ্বারা তাদের অস্থি-মাংস তৈরী হয়েছে তাই তারা চাইলেও বিষবৃক্ষের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। দুর্বল চিন্তা ও অসুস্থ বুদ্ধি তাদের একথা ভাবারই সুযোগ দিচ্ছে না যে, জীবন ও সভ্যতার নতুন নির্মাণের জন্য নতুন কোন ভিত্তি ও বুনিয়াদ থাকতে পারে, কিংবা থাকতে পারে অন্য কোন সুস্থ বীজ যা থেকে জন্ম লাভ করবে একটি উত্তম বৃক্ষ, যার প্রতিটি শাখা-প্রশাখা হবে উত্তম, প্রতিটি ফল-পাতা হবে উত্তম। এজন্য উভয় পক্ষের পরিণামই হচ্ছে অভিন্ন। উভয় পক্ষই সন্ধান করছে রোগ নিরাময়ের সঠিক উপায়, কিন্তু কেউ জানে না, প্রকৃত আরোগ্য কোথায়?'¹
টিকাঃ
১. তানকীহাত, প্রবন্ধ 'যুগের ব্যাধিগ্রস্ত জাতিসমূহ', মাওলানা মওদূদী, পৃ. ২৪, ২৫, ২৬