📘 মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো 📄 প্রথম পরিচ্ছেদ: ইউরোপীয় যুগ

📄 প্রথম পরিচ্ছেদ: ইউরোপীয় যুগ


পাশ্চাত্য সভ্যতার স্বভাব-প্রকৃতি ও ইতিহাস

তুর্কী সালতানাতের পতনের পর ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে বিশ্বের শাসনক্ষমতা এবং চিন্তানৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব মুসলিম জাতির হাত থেকে ইউরোপের অমুসলিম জাতিবর্গের হাতে চলে গিয়েছিল; কারণ এর জন্য তাদের দীর্ঘকালের প্রস্তুতি ছিল। তাছাড়া জীবনের 'কর্মমঞ্চে' তখন তাদের সমকক্ষের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি ছিল না। শেষে অবস্থা এই হলো যে, পূর্ব থেকে পশ্চিম কোন দেশ ও জনপদ তাদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত ছিল না। হয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শাসন-শোষণের শিকার ছিল, না হয় সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের শিকার; এমনকি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও তারা হয়ে পড়েছিল ইউরোপের উচ্ছিষ্টভোজী।

ক্ষমতা ও নেতৃত্বের এই যে হাতবদল, এর ফলে সমকালীন পৃথিবীর চিন্তা-চেতনায়, সমাজ-সভ্যতায়, বিভিন্ন জাতির চরিত্র ও নৈতিকতায়, রুচি, চাহিদা ও প্রবণতায় কী প্রভাব পড়েছিল? এবং এই বিপ্লব ও পরিবর্তন দ্বারা মানবজাতি ও মানবসভ্যতা উপকৃত হয়েছে না ক্ষতিগ্রস্ত? এসম্পর্কে বিচার-পর্যালোচনার পূর্বে আমরা দেখতে চাই পাশ্চাত্য সভ্যতার স্বভাব ও প্রকৃতি এবং তার গঠনকাঠামো কী? এবং এই সভ্যতার কোলে প্রতিপালিত জাতিসমূহের জীবনদর্শনই বা কী এবং কীভাবে তার বিকাশ ঘটেছে?

অনেকের ধারণা, বিশ শতকের পাশ্চাত্য সভ্যতা হচ্ছে ইউরোপের অন্ধকারাচ্ছন্ন মধ্যযুগের পরবর্তী 'জাগরণযুগে' সৃষ্ট একটি অল্পবয়স্ক সভ্যতা। আসলে তা নয়, বরং এ সভ্যতার ইতিহাসের শিকড় বহু হাজার বছর অতীতের মাটিতে প্রোথিত। অর্থাৎ এটি গ্রীক ও রোমান উভয় সভ্যতার সন্তান। উভয় সভ্যতা যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সমাজদর্শন এবং চিন্তানৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ফল ও ফসল রেখে গেছে, পাশ্চাত্য সভ্যতা উত্তরাধিকারসূত্রেই সেগুলো ধারণ করেছে এবং উভয় সভ্যতার স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য এবং ঝোঁক ও প্রবণতার সুগভীর ছাপ প্রজন্মপরম্পরায় রক্ত-সূত্রেই তাতে প্রতিফলিত হয়েছে।

গ্রীকসভ্যতাই হলো ইউরোপীয় চিন্তা-চেতনা ও স্বভাব-প্রবণতার প্রথম সর্বোত্তম প্রকাশক্ষেত্র, যা ইতিহাস আমাদের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছে। এটাই হলো প্রথম সভ্যতা যা ইউরোপীয় দর্শনের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে ইউরোপীয় মনস্তত্ত্বের পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে। পরবর্তীকালে গ্রীকসভ্যতার ধ্বংসাবশেষেরই উপর রোমান সভ্যতার সৌধ গড়ে উঠেছে এবং এরও প্রাণ-প্রেরণা ছিলো অভিন্ন, অর্থাৎ ইউরোপীয় প্রাণ-প্রেরণা। ইউরোপীয় জাতিগোষ্ঠীগুলো বহু শতাব্দীর পথপরিক্রমায় তাদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য, রীতি-নীতি, চিন্তা-চেতনা, দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তি সযত্নে নিজেদের মধ্যে লালন-প্রতিপালন করে এসেছে। অবশেষে উনিশ শতকে এক নতুন ঝলমলে ও জাঁকজমকপূর্ণ পোশাকে তা আত্মপ্রকাশ করেছে। পোশাকের চোখধাঁধানো চাকচিক্য ও মনকাড়া ফুল নকশার কারণে আপনার মনে হতে পারে, এটা বুঝি আলাদা বুননের নতুন পোশাক, অথচ প্রকৃতপক্ষে, প্রাচীন গ্রীক-রোমান সভ্যতাই হচ্ছে এর 'তানা-বানা'র উৎস। সুতরাং আমাদের জন্য ভালো হবে প্রথমে গ্রীক ও রোমান সভ্যতার পরিচয়, স্বভাব-বৈশিষ্ট্য ও প্রাণ-প্রেরণা সম্পর্কে সম্যক অবগতি অর্জন করা, যাতে আমরা পূর্ণ অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে বিশ শতকের পাশ্চাত্য সভ্যতার বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করতে পারি এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি।

গ্রীকসভ্যতার বৈশিষ্ট্য

এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মানব-ইতিহাসের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় গ্রীকজাতি হচ্ছে এক স্বর্ণপ্রসবা জাতি। জ্ঞান, শিল্প ও সাহিত্যের যোগ্যতায়; চিন্তা, চেতনা ও বুদ্ধির উর্বরতায় এবং দর্শনে, মননে ও অবদানে তাদের শীর্ষ অবস্থান সর্বস্বীকৃত। বিরল প্রতিভার অধিকারী বহু জ্ঞানী, বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের আবির্ভাব ঘটেছে তাদের মধ্যে, যাদের অবদানে বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডার যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়েছে।

আমরা জানি, গ্রীকদর্শন ও সাহিত্য বিশ্ব-ইতিহাসে দীর্ঘকাল যথেষ্ট অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু সেটা এখানে আমাদের আলোচ্যবিষয় নয়। আমরা এখানে শুধু দেখতে চাইবো, গ্রীকরা যে সভ্যতা জন্মদান করেছে তার স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য এবং প্রাণ ও প্রেরণা কী ছিলো?

এখনকার বিচার-পর্যালোচনায় আমরা ঐসব বিষয় এড়িয়ে যাবো, যা গ্রীক-সভ্যতার মূল উপাদান নয়, বরং পার্শ্ব-উপাদান, কিংবা যা সকল সভ্যতারই সাধারণ উপাদান। আমরা শুধু ঐসব বিষয়ের উপর আলোকপাত করবো, যা গ্রীকসভ্যতার মূল বৈশিষ্ট্য এবং যা তাকে অন্যান্য সভ্যতা থেকে, বিশেষত প্রাচ্য সভ্যতা থেকে পৃথক করে। বিষয়গুলো এই—
(ক) যা কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তাতে বিশ্বাস এবং যা কিছু ইন্দ্রিয়াতীত তাতে অবিশ্বাস ও সংশয়।
(খ) ধার্মিকতা ও আধ্যাত্মিকতায় নিরাসক্তি এবং পার্থিব জীবন ও ভোগবিলাসে অতিআসক্তি।
(গ) উগ্র জাতীয়তাবাদী মানসিকতা।

গ্রীকসভ্যতার এই যে বিভিন্ন মৌলিক উপাদান, এগুলোকে আমরা যদি এক শব্দে প্রকাশ করতে চাই তাহলে 'বস্তুবাদিতা' হলো সবচে' যথার্থ শব্দ এবং এটাই হচ্ছে গ্রীকসভ্যতার মূল পরিচয়।

গ্রীকদের যা কিছু জ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, সংস্কৃতি, এমনকি তাদের ধর্ম, সর্বত্র বস্তুবাদিতার ছাপ ও প্রভাব অতি প্রকট। আল্লাহ তা'আলার ছিফাত ও গুণাবলীকে তারা দেবদেবীর আকার ছাড়া কল্পনা করতে পারেনি। যেমন খাদ্যের দেবতা, দয়া ও করুণার দেবতা, ক্রোধ ও শাস্তির দেবতা। এভাবে তারা বহু দেবদেবীর মূর্তি তৈরী করে বিভিন্ন মন্দিরে সেগুলোর অধিষ্ঠান করেছে। তারা তাদের দেব-দেবীর প্রতি জড়দেহের যাবতীয় স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য আরোপ করেছে এবং সেগুলোকে কেন্দ্র করে রূপকথার এক দীর্ঘ জাল বিস্তার করেছে। সৌন্দর্য ও ভালোবাসার মত বস্তুনিরপেক্ষ ভাব ও মর্মকেও তারা স্থূল আকার দান করেছে। তাই তাদের রয়েছে সৌন্দর্যের দেবী ও ভালোবাসার দেবী। এরিস্টেটলীয় দর্শনে এই যে, 'দশবুদ্ধি ও নয় আকাশ'-এর ধারণা, তাও মূলত এই বস্তুবাদিতারই কারিশমা, যার প্রভাব থেকে গ্রীকমানস কখনো মুক্ত হতে পারে না।

ইউরোপের বুদ্ধিজীবী ও চিন্তানায়কগণও গ্রীকসভ্যতায় বস্তুবাদের প্রাধান্যের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন এবং বিভিন্ন গ্রন্থ ও গবেষণাপত্রে সেদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করেছেন। জার্মান পণ্ডিত ডক্টর হ্যাস জেনেভায় 'ইউরোপীয় সভ্যতার স্বরূপ' শিরোনামে তিনটি ভাষণ প্রদান করেছেন। তিনি বলেন—
'প্রাচীন গ্রীক সভ্যতাই হলো বর্তমান ইউরোপীয় সভ্যতার মূল উৎস। গ্রীক-সভ্যতার কর্ণধার যারা তাদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যই ছিলো মানুষের সকল শক্তির সুসঙ্গত ও সুসমন্বিত বিকাশ। এক্ষেত্রে একটি সুদর্শন ও সুঠাম দেহকেই মনে করা হতো আদর্শ উদাহরণ। বলাবাহুল্য যে, এ চিন্তাধারায় ইন্দিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলোই ছিলো মুখ্য। তাই শরীরচর্চা, শারীরিক খেলাধূলা, নৃত্যকলা ইত্যাদির গুরুত্ব ছিলো সবচে' বেশী। পক্ষান্তরে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিপালন তথা গান, কবিতা, সাহিত্য ও নাটক, এমনকি দর্শন ও বিজ্ঞানচর্চাও একটি নির্ধারিত সীমা থেকে অগ্রসর হতে পারেনি। এদিকে তাদের বেশ সতর্ক দৃষ্টি ছিলো যে, বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ দ্বারা শারীরিক উন্নতি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আর আত্মা ও আধ্যাত্মিকতা এবং হৃদয় ও অন্তর্বাদিতা! সত্য এই যে, গ্রীকদের ধর্মব্যবস্থায় এসবের কোন স্থান ছিলো না।'

বহু ইউরোপীয় পণ্ডিত গ্রীক সমাজে ধর্মের প্রভাবহীনতা, ঐশী ভীতির অনুপস্থিতি এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ভাবগাম্ভীর্যের অভাব, সেই সঙ্গে খেলাধূলা ও আনন্দ-বিনোদনের অতিশয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। লেকী বলেন—
'গ্রীক চেতনা ছিলো নিছক বুদ্ধি ও মস্তিষ্কনির্ভর, পক্ষান্তরে মিসরীয় চেতনা ছিলো সম্পূর্ণ আত্মিক ও আধ্যাত্মিক। তাই রোমান লেখক এ্যপিউলিয়াস বলেছেন, 'মিসরীয় দেবতারা সন্তুষ্ট হন কাকুতি-মিনতি ও কান্নাকাটিতে, পক্ষান্তরে গ্রীক দেবতারা খুশী নাচ-গান ও নৃত্যগীতে।'¹

এ্যপিউলিয়াসের এ মন্তব্যের দ্বিতীয় অংশের সত্যতা গ্রীক-ইতিহাসে প্রচুর পাওয়া যায়। বস্তুত কোন জাতির ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে আনন্দ-উৎসব ও ক্রীড়া-কৌতুকের এতটা 'বাড়বাড়তি' এবং ঈশ্বরভীতির এতটা ঘাটতি নেই যতটা রয়েছে গ্রীকসমাজে। ঈশ্বরের প্রতি ভয় ও ভক্তি গ্রীকদের ধর্মজীবনে ততটুকুই ছিলো যতটা থাকে সমাজের বড় ও বয়োবৃদ্ধদের প্রতি।¹

এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ গ্রীকদের ঈশ্বরতত্ত্ব ও ধর্মদর্শনই এমন যে, তারপর অন্তরে ঈশ্বরের প্রতি ভয়ভীতি, আনুগত্য ও আত্মনিবেদনের ভাব জাগ্রত হওয়ার কোন অবকাশই থাকতো না। ঈশ্বরসত্তা থেকে সকল গুণ ও ক্ষমতা বিযুক্ত করে যখন ঘোষণা করা হবে, সৃষ্টিজগতের পরিচালনায় তাঁর কোন ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণ নেই এবং নেই নিরন্তর সৃজনক্রিয়া ও আদেশ-নিষেধ, অর্থাৎ ঈশ্বর হলেন অবসরপ্রাপ্ত একটি নিষ্ক্রিয় সত্তা; এখন নিয়ন্ত্রকশক্তি হচ্ছে তথাকথিত 'সতত সক্রিয় বুদ্ধি ও মহাশূন্যীয় নিরন্তর গতি'। এ-ই যখন হবে কারো বোধ ও বিশ্বাস তখন স্বভাবতই প্রথাসর্বস্বতার বাইরে বাস্তব জীবনে এবং কর্মমুখর অঙ্গনে ঈশ্বরচিন্তার কোন প্রয়োজন এবং ঈশ্বরের প্রতি আত্মনিবেদনের কোন প্রেরণা সে অনুভব করবে না।

গ্রীকদর্শন ও সমাজব্যবস্থায় যেহেতু পার্থিব জীবনই ছিলো মুখ্য এবং ভাস্কর্য-প্রীতি, নৃত্যগীত ও সঙ্গীত তথা ললিতকলার প্রতি আসক্তি ছিলো চরম, সর্বোপরি লেখক, সাহিত্যিক, কবি ও দার্শনিকসমাজ ছিলো বাধাবন্ধনহীন ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী সেহেতু গ্রীকদের জীবন ও চরিত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব ছিলো খুবই ভয়ঙ্কর। নীতি ও নৈতিকতায় দেখা দিয়েছিলো সীমাহীন নৈরাজ্য। প্রতিষ্ঠিত সব ব্যবস্থা ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে দেখা দিয়েছিলো মহাবিদ্রোহ। প্রবৃত্তির পিছনে ছুটে চলা, জীবন ও যৌবনকে যথেচ্ছা ভোগ করে যাওয়া এবং ক্ষুধার্ত হায়েনার মত সবকিছুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়া—এই ছিলো তখনকার ফ্যাশন এবং মুক্তবুদ্ধি ও আলোকিত চিন্তার প্রতীক।

প্লেটো তাঁর বিখ্যাত 'রিপাবলিক' গ্রন্থে সক্রেটিসের পক্ষ হতে একজন গণতান্ত্রিক যুবকের যে চিত্র এঁকেছেন তাতে মনে হতে পারে, বিশ শতকের কোন বোদ্ধা সমালোচক যেন আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার কোন আলোকিত যুবকের চরিত্র তুলে ধরছেন। সক্রেটিস বলেছেন—
'যদি তাকে বলা হয়, মানুষের সব ইচ্ছা ও চাহিদা সমান গ্রহণযোগ্য নয়। কিছু আনন্দ ও বিনোদন আছে যা উত্তম ও সম্মানযোগ্য, যা সাদরে গ্রহণ করা যায়। আবার কিছু আছে অনুত্তম ও অসঙ্গত, যা পরিহার করা এবং বিধি-নিষেধের আওতায় রাখাই কর্তব্য, তখন এই সুসঙ্গত নীতিকথা সে মানতে চায় না, এমন-কি শুনতেও চায় না; বরং উপহাস করে মাথা দোলায় এবং জোরদার বয়ান দিয়ে বলে, ভালো-মন্দ ও সুন্দর-অসুন্দরের পার্থক্য ছাড়া সব চাহিদাই সমান সমাদরযোগ্য।'

পাশ্চাত্য মানসিকতার আরেকটি বড় উপসর্গ হলো উগ্র ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ। এশিয়ার তুলনায় ইউরোপে জাতীয়তাবাদী চেতনা অনেক বেশী ব্যাপক ও প্রকট। ভৌগোলিক প্রকৃতির কারণেই ইউরোপে ছোট ছোট রাজ্য গড়ে উঠেছে এবং প্রাচীনকাল থেকেই সেখানকার রাজনৈতিক ধারণা নগররাষ্ট্রকে অতিক্রম করতে পারেনি। নগররাষ্ট্রীয় এই রাজনৈতিক ধারণার আদর্শ উদাহরণ হলো গ্রীকদেশ। এ সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদ গ্রীকসমাজে বেশ জনপ্রিয় ছিলো এবং তাদের চিন্তা-চেতনার গভীরে প্রবেশ করেছিলো। এমনকি জনৈক দার্শনিক যখন বললেন, 'তিনি তার সহমর্মিতা শুধু স্বদেশে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না, বরং তা ব্যাপ্ত হবে সমগ্র গ্রীসে', তখন তার স্বদেশবাসীর জন্য তা বিস্ময় ও অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।¹

রোমকজাতির অভ্যুদয়

ইতিহাসের অনিবার্য ধারায় রোমকজাতি একসময় গ্রীকদের স্থান দখল করে নেয় এবং শক্তি ও প্রতিপত্তিত, সমরকুশলতা ও সৈনিকতা এবং সাম্রাজ্যের বিস্তার ও শাসন-ব্যবস্থায় গ্রীকদের ছাড়িয়ে যায়, তবে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শন; শিল্প-সাহিত্য ও কাব্যপ্রতিভা এবং নাগরিক সভ্যতা ও সুশীলতায় তারা গ্রীকদের সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। রোম তখনো ছিলো সামরিকতার যুগে। তাই বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে গ্রীকদের সামনে তারা ছিলো অবনত এবং তাদেরই উচ্ছিষ্টভোজী। লেকী বলেন—
'রোম তখনো সামরিকতার স্তরেই পড়ে ছিলো। জাতীয়ভাবে যেমন তাদের কোন জ্ঞানসম্পদ ও সাহিত্যকর্ম ছিলো না, তেমনি তাদের ভাষাসম্পদও ভাব, চিন্তা ও উচ্চাঙ্গ অনুভব প্রকাশে সক্ষম ছিলো না। জ্ঞান-দৈন্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক পশ্চাত্পদতার কারণে স্বাভাবিকভাবেই গ্রীকদের কাছে তারা মার খেয়েছে এবং রাজনৈতিক ও সামরিক বিজয় অর্জন করেও গ্রীকসভ্যতার কাছে তাদের নতি স্বীকার করতে হয়েছে।'¹

রোমকদের এ অনুকরণ ও আনুগত্য শুধু জ্ঞান-গবেষণা এবং ভাষা ও সাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, বরং ভাব ও স্বভাব, নীতি ও নৈতিকতা, সমাজ ও সামাজিকতা, আবেগ ও প্রবণতা এবং সাধারণ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই গ্রীক-সভ্যতা রোমান সভ্যতার উপর আধিপত্য বিস্তার করেছিলো। রোমকদের যা কিছু বৈশিষ্ট্য ছিলো তা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী স্বভাব এবং জীবনের প্রতি আগাগোড়া জড়বাদী ও বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। আজকের ইউরোপ রোমানদের কাছ থেকে এটাই উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছে।

জার্মান নও মুসলিম বিদগ্ধ পণ্ডিত মুহম্মদ আসাদ বলেন—
'রোমানসাম্রাজ্যের উপর যে চিন্তা-চেতনা ও স্বভাবপ্রবণতার নিরঙ্কুশ প্রভাব ছিলো তা হচ্ছে সাম্রাজ্যের অনুকূলে সর্বপ্রকার শক্তি ব্যবহার করা এবং অন্যান্য জাতিকে রোমানস্বার্থের সেবাদাসে পরিণত করা। রোমান শাসক ও প্রশাসকগণ অভিজাত সমাজের আরাম-আয়েশ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য যে কোন ধরনের যুলুম-অত্যাচার ও শোষণ-নিপীড়নে দ্বিধাবোধ করতো না। ধর্ম ও ধার্মিকতা রোমকরা কখনোই নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেনি। তাদের সনাতন উপাস্য দেবতারা ছিলো গ্রীকদের অলীক কল্প-কথারই উপচ্ছায়ামাত্র।'¹

রোমান প্রজাতন্ত্রে নৈতিক অধঃপতন

গণতান্ত্রিক শাসনের শেষ দিকে রোমে নৈতিক অবক্ষয়, পাশবিক স্বেচ্ছাচার ও অবাধ ভোগ-বিলাসের এমন ঢল নেমেছিলো যে, তার তোড়ে সবকিছু ভেসে গিয়েছিলো। ডক্টর ড্রেপার তার 'ধর্ম ও বিজ্ঞানের সঙ্ঘাত' গ্রন্থে এর সুন্দর চিত্র এঁকেছেন এভাবে—
'রোমান সাম্রাজ্য যখন সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির চরমে উপনীত হলো তখন রোমান জাতি নৈতিক অবক্ষয় ও ধর্মীয় অধঃপতনের একেবারে শেষ সীমায় পৌঁছে গেলো। আমোদ-প্রমোদ ও ভোগবিলাসে তারা সীমা ছাড়িয়ে গেলো এবং স্বেচ্ছাচারের চূড়ান্ত করে ছাড়লো। তাদের নীতি ও দর্শন যেন ছিলো এই, 'জীবন শুধু ভোগের জন্য, যেখানে মানুষ আয়েশ থেকে ফুর্তিতে এবং ফুর্তি থেকে স্ফূর্তিতে গড়াগড়ি খাবে।'

বিশ্বজয়ের গর্বে গর্বিত এ জাতি বুঝতে পেরেছিলো, যদি তাদের পূজা লাভ করার উপযুক্ত কিছু থেকে থাকে তাহলে সেটা হচ্ছে শক্তি। শক্তির চেয়ে বড় উপাস্য আর কী হতে পারে! আর রোম-সাম্রাজ্যের অধিপতি ও সম্রাটই হলেন সেই সর্বজয়ী শক্তির একক প্রতীক। রোমের সভ্যতা ও নাগরিকতায় সেই রাজশক্তির বাহ্যস্ফূরণ অবশ্যই দেখা যেতো।

রোমে খৃস্টধর্মের আত্মপ্রকাশ

ঐ সময় এমন একটা বিরাট বিপ্লবাত্মক ঘটনা ঘটে যার সুদূর প্রসারী প্রভাব সম্পর্কে পূর্ণ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রত্যেক দায়িত্বশীল ঐতিহাসিকের কর্তব্য। সেটা হলো প্রতিমাপূজক রোমের সিংহাসনে খৃস্টধর্মের অধিষ্ঠান। ঘটনাটি এভাবে ঘটেছিলো; কনস্টান্টাইন ৩০৫ খৃস্টাব্দে রোমের সিংহাসনে সমাসীন হন। ফলে হঠাৎ করেই প্রতিমাপূজার উপর খৃস্টধর্মের বিজয় অর্জিত হয় এবং এমন এক বিশাল সাম্রাজ্য ও অপ্রতিহত রাজশক্তি তার হাতে চলে আসে, যা আগে সে কল্পনাও করতে পারেনি।

খৃস্টধর্মের আত্মবিপর্যয়

কিন্তু এই সামরিক ও রাজনৈতিক বিজয় ছিলো প্রকৃতপক্ষে খৃস্টধর্মের জন্য চরম আত্মবিপর্যয়ের সূচনা। অস্ত্র-যুদ্ধে জয়লাভ করলেও আন্তধর্ম যুদ্ধে তারা পরাস্ত হয়েছিলো এবং বিরাট সাম্রাজ্যের দখল অর্জন করলেও একটি মহান ধর্ম তাদের হারাতে হয়েছিলো। বড় বড় রাজমর্যাদার প্রলোভনে যাদের ধর্মের বিষয়ে বিন্দুমাত্র উৎসাহ ছিলো না তারাই খৃস্টধর্মের সেবক সেজে সামনে চলে এলো। কনস্টান্টাইন দ্য গ্রেট-এর শাসনামলে খৃস্টধর্মে ভয়াবহ-রূপে শিরক ও মূর্তিপূজার অবাধ অনুপ্রবেশ ঘটতে লাগলো। কনস্টান্টাইন নিজেই ছিলেন তাদের সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষক। ড্রপার লিখেছেন—
'বিজয়ী ও ক্ষমতলাভকারী দলের সঙ্গে যারাই যোগ দিলো তারা বড় বড় পদ ও রাজমর্যাদার অধিকারী হতে লাগলো। খৃস্টান ও মূর্তিপূজক উভয় পক্ষের স্বার্থের বিচারে উভয় ধর্মের মধ্যে কোনভাবে সমন্বয়সাধন করাকেই কনস্টান্টাইন উপযুক্ত ও যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন। সম্ভবত তাদের বিশ্বাস ছিলো, প্রাচীন পৌত্তলিক বিশ্বাসের মিশ্রণ গ্রহণের মাধ্যমে এই নতুন ধর্মটি সমৃদ্ধি ও প্রসার লাভ করবে।'¹

চরম বৈরাগ্যবাদের আত্মপ্রকাশ

কিন্তু প্রতিমাপূজা ও পৌত্তলিকতার পরাগায়নের ফলে খৃস্টধর্ম এমনই বিকৃত হয়ে পড়েছিলো যে, অধঃপতনশীল রোমকজাতির মধ্যে এ ধর্ম কোন পরিবর্তনই আনতে পারেনি। তা তো হলোই না, বরং এ ধর্মের জঠরে অভাবিতপূর্ব এমন এক চরম বৈরাগ্যবাদের জন্ম হলো, মানবতা ও সভ্যতার জন্য যা মূর্তিপূজারী রোমকদের পাশবিকতার চেয়ে নিকৃষ্ট ছিলো। খৃস্টজগতে এ বৈরাগ্যবাদ এমনই এক সর্বগ্রাসী উন্মাদনার রূপ নিয়েছিলো যা কল্পনা করাও এযুগে সম্ভব নয়।

দীর্ঘ দুই শতাব্দী পর্যন্ত সন্ন্যাসব্রতের নামে আত্মপীড়ন ও দেহ-নির্যাতনই ছিলো ধর্ম ও নৈতিকতার সর্বোত্তম আদর্শ। ইতিহাসে এ বিষয়ে বহু অবিশ্বাস্য ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। আলেকজন্দ্রিয়ার সাধু ম্যাকারিউস নাকি দীর্ঘ ছয়মাস নোংরা জলাভূমিতে বাস করেছেন, যাতে বিষাক্ত মাছি ও কীটপতঙ্গ তার নগ্নদেহ দংশন করতে পারে। তদ্রূপ শারীরিক পরিচ্ছন্নতা আত্মার পবিত্রতার জন্য ক্ষতিকর ভাবা হতো। ধার্মিকতা ও বৈরাগ্যের যিনি যত ঊর্ধ্ব-স্তরে উপনীত হতেন তিনি তত বেশী ময়লা-আবর্জনায় মেখে থাকতেন।

আরেকটা ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিলো এই যে, সাধু-সন্ন্যাসীরা জনপদে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতো এবং শিশুদের অপহরণ করে সুরক্ষিত মঠে নিয়ে যেতো। সন্তানের উপর পিতা ও পরিবারপ্রধানের যে অধিকার, তা সাধু-পাদ্রীদের হাতে চলে গিয়েছিলো। চরিত্র ও নৈতিকতার উপর বৈরাগ্যবাদের প্রভাব এই পড়েছিলো যে, বীরত্ব ও পৌরুষের যাবতীয় গুণ-বৈশিষ্ট্য দোষণীয় ও নিন্দনীয় বলে গণ্য হতে লাগলো। পরিবার-পরিজনের প্রতি নির্দয়তা ও নিষ্ঠুরতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিলো। সাধু-সন্ন্যাসীরা নিজ পরিবারের প্রতি দয়াশূন্য আচরণ করাকেই আধ্যাত্মিকতার অংশ ভাবতেন।¹

ভোগবাদের বিরুদ্ধে বৈরাগ্যবাদের ব্যর্থতা

নিষ্ঠুর আত্মপীড়নের এ চরম বৈরাগ্যবাদ রোমকদের লাগামহীন ভোগবাদ ও বস্তুবাদিতা কিছুমাত্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। বরং ফিতরত ও প্রকৃতি এর বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিলো। একসময় দেখা গেলো, ধর্মের প্রাণকেন্দ্র খোদ গীর্জায়ও সেই বস্তুপূজা ও ভোগবাদের অনুপ্রবেশ শুরু হয়েছে। অনাচার-পাপাচার ও নৈতিক অবক্ষয়ে তারা ভোগবাদের প্রবক্তাদেরও ছাড়িয়ে গেলো। ধর্মনেতা পোপ সপ্তম ইনোসেন্ট তার পোপীয় মুকুট পর্যন্ত বন্ধক রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন পাপাচারের দেনা মেটাতে। পোপ দশম লিউ পূর্ববর্তী পোপের সম্পদ এবং নিজের অংশের সম্পদ শেষ করে ফেলেছিলেন ভোগবিলাসে।¹

গীর্জা ও রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব

একাদশ শতাব্দীতে গীর্জা ও রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। পোপের তাপ ও প্রতাপ তখন এমনই ছিলো যে, সম্রাট চতুর্থ হেনরী অবনত মস্তকে ও নগ্নপদে পোপের দরবারে হাজির হতে বাধ্য হয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে এ দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের তীব্রতা বাড়তেই থাকে। শেষ পর্যন্ত গীর্জার প্রভাব ও প্রতাপ দুর্বল হয়ে আসে এবং রাষ্ট্র ও সম্রাট চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেন। এ দীর্ঘ সময় জনসাধারণ যুগপৎ ধর্ম ও রাজনীতির নিপীড়ন এবং গীর্জা ও রাষ্ট্রের দ্বৈত দাসত্বের শিকার ছিলো।

ধর্মীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও ইউরোপীয় সভ্যতার দুর্ভাগ্য

গীর্জার অধিপতি ও ধর্মনেতারা তাদের বিপুল ক্ষমতার অন্যায় ব্যবহার করেছেন। জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থে কাজে লাগিয়েছেন। ফলে ইউরোপ যেমন ছিলো তেমনি মূর্খতা ও কুসংস্কার এবং পাপাচার, অনাচার ও প্রবৃত্তিপূজার আবর্তেই ডুবে থাকলো। ড্রেপার লিখেছেন—
'পোপগণ বিষয়াসক্তি ও প্রবৃত্তিপরায়ণতার শিকার না হলে ইউরোপ একযোগে এমন উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করতো যা দেখে পৃথিবী অবাক হয়ে যেতো। তাদের কাছে একই ভাষা ও এক সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিলো, কিন্তু তারা তা জনকল্যাণে ব্যবহার করেনি।'¹

ধর্মগ্রন্থের বিকৃতি ও পরিণাম

ধর্মনেতারা চরম মূর্খতার পরিচয় দিয়ে ধর্মগ্রন্থে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক তথ্যের অনুপ্রবেশ ঘটালেন যা ছিলো ঐ সময়ের ভ্রান্ত মানবীয় জ্ঞানের ফসল। পরবর্তীকালে যখন বিজ্ঞান ও যুক্তির জয়যাত্রা শুরু হলো তখন ঐসব তথাকথিত ধর্মগ্রন্থীয় তথ্য ভুল প্রমাণিত হতে লাগলো। আর এটাই ছিলো ঈমান ও বিজ্ঞান এবং ধর্ম ও যুক্তির সঙ্ঘাতের মূল কারণ।

ধর্ম ও বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব এবং গীর্জার নিষ্ঠুরতা

গীর্জা এই বিজ্ঞানের অভিযাত্রাকে ধর্মদ্রোহিতা আখ্যা দিল। Court of Inquisition বা তদন্ত আদালত গঠন করে বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের উপর নির্মম নির্যাতন শুরু করা হলো। আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো প্রায় বত্রিশ হাজার মানুষকে। বিজ্ঞানী ব্রনোকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় এবং গ্যালিলিওকে দণ্ড দেয়া হয় শুধু বৈজ্ঞানিক সত্য প্রচারের অপরাধে।

ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া

গীর্জার এই নিষ্ঠুরতার ফলে প্রগতিশীলদের মনে ধর্মমাত্রেরই প্রতি ঘৃণা ও শত্রুতা জন্মে গেলো। তাদের যুদ্ধ শুধু খৃস্টান ধর্মনেতাদের বিরুদ্ধে থাকলো না, বরং তা বিজ্ঞান ও ধর্মের যুদ্ধে পরিণত হলো। তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলেন যে, বুদ্ধি ও ধর্মের অবস্থান দুই বিপরীত প্রান্তে।

চিন্তানায়কদের চিন্তার দৈন্য

বিদ্রোহী চিন্তানায়কদের মধ্যে এতটুকু ধৈর্য ছিলো না যে তারা ধর্ম ও ধর্মব্যবসায়ীদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। তারা ধর্মকে কাঁধের জোয়াল ভেবে ছুঁড়ে ফেললো। তাদের যদি ইসলাম ধর্মের প্রতি সামান্য অনুরাগ থাকতো তবে তারা বুঝতো যে ইসলাম জ্ঞান ও বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও ক্রুশেডযুদ্ধের কারণে তারা ইসলামের সুমহান শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রয়ে গেলো। ফলে ইউরোপ জড়বাদ ও বস্তুবাদের ঘোর অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হলো।

বস্তুবাদের দিকে ইউরোপ

দার্শনিক ও বিজ্ঞানীগণ স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার করে প্রকৃতির যান্ত্রিক ব্যাখ্যা দিতে শুরু করলেন। যা কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, তার অস্তিত্ব তারা অস্বীকার করলেন। জড়বাদ ও বস্তুবাদই হয়ে গেলো ইউরোপের অঘোষিত ধর্ম। মেকিয়াভেলি প্রচার করলেন যে রাজনীতিতে ধর্মের কোন প্রবেশাধিকার নেই। শাসক ও রাষ্ট্রনায়কের জন্য ধোকা, প্রতারণা ও শঠতাকে জাতীয় স্বার্থে বৈধ করে দেয়া হলো।

খৃস্টবাদ নয়, ইউরোপের ধর্ম বস্তুবাদ

আধুনিক ইউরোপের হৃদয় ও আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করে জড়বাদ ও বস্তুবাদ। শিল্পকারখানা ও প্রেক্ষাগৃহ হয়েছে তাদের মন্দির। মুহম্মদ আসাদ যথার্থই বলেছেন, 'পাশ্চাত্যসভ্যতা আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার না করলেও কার্যত তাদের চিন্তা-ব্যবস্থায় আল্লাহর কোন স্থান নেই।'¹ প্রফেসর জোড দেখিয়েছেন যে আধুনিক প্রজন্মের বড় অংশই খৃস্টধর্মের প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করে।

ইউরোপের বস্তুবাদী স্বভাব ও পরিণতি

ইউরোপের মানুষ আজ ভোগবাদিতায় এমন আচ্ছন্ন যে বিপদে-আপদেও তারা আল্লাহকে স্মরণ করে না। বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও তাদের নাচ-গান ও ফুর্তিবাজি চলতো। এটা সাহস নয়, বরং হৃদয়ের কাঠিন্য। যেখানে মুমিন বিপদে আল্লাহর সাহায্য চায়, সেখানে তারা মদের গ্লাসে ও নৃত্যের তালে বিজয় উদযাপন করে। আলকোরআনের ভাষায়, 'তাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গিয়েছিলো এবং শয়তান তাদের কাজকে শোভন করে তুলেছিলো।'

আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনেও বস্তুবাদী চিন্তাচেতনা!

ইউরোপের আধ্যাত্মিক আন্দোলনগুলোও এখন নিছক এক ধরণের প্রযুক্তি বা বিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে (যেমন প্ল্যানচেট)। সেখানে হৃদয়ের সংশোধন নেই, আছে শুধু রহস্যের বিনোদন। তাদের প্রতিটি কর্ম ও ত্যাগের পেছনে জাগতিক যশ ও খ্যাতির লালসা থাকে, যেখানে ইসলামের মূল শিক্ষা হলো প্রতিটি কাজ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা।

অর্থনীতির সর্বগ্রাসিতা

কার্ল মার্কস প্রচার করলেন যে অর্থব্যবস্থাই হলো সমাজব্যবস্থার মূল প্রাণ। ধর্ম, দর্শন ও নৈতিকতাকে তিনি অর্থনীতির উপজাত হিসেবে গণ্য করলেন। তার দৃষ্টিতে মানব-ইতিহাস হলো নিছক শ্রেণী-সংগ্রামের ইতিহাস। এভাবে মানুষ সম্পর্কে পাশ্চাত্যের ধারণা 'পকেট ও পাকস্থলী'র মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লো।

ডারউইনের বিবর্তনবাদ ও তার প্রভাব

ডারউইন তার বিবর্তনবাদের মাধ্যমে মানুষকে 'উন্নত বানর' হিসেবে উপস্থাপন করলেন। এই মতবাদ মানুষের মধ্য থেকে ঐশ্বরিক শ্রেষ্ঠত্বের বোধটুকু কেড়ে নিল। ফলে পারিবারিক জীবন বিপর্যস্ত হলো এবং মানুষ পশুর মত যথেচ্ছ যৌনাচারে লিপ্ত হলো।

বস্তুবাদের অমার্জনীয় অপরাধ

এই ধর্মহীন বস্তুবাদী রাজনীতির ফল হলো চরম নিষ্ঠুরতা। ব্রিটিশ রাজত্বকালে বাংলায় কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল শুধুমাত্র নিজেদের সামরিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থে। ১৯৪৭ সালে লর্ড মাউন্ট ব্যাটন তার ব্যক্তিগত আক্রোশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখেও না দেখার ভান করেছিলেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ভোটের লোভে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থন দিয়েছিলেন। এসকল ঘটনা প্রমাণ করে যে পাশ্চাত্যের কাছে নীতি ও আদর্শের চেয়ে স্বার্থই বড়।

টিকাঃ
১. w. e. h. lecky, history of european morals, london, 1869, vol,1, pp. 344-345
২. ঐ, পৃ. ৩৪৪
৩. republic, book vll
৪. lecky, history of european morals, p. 243
৫. ঐ, p. 243
৬. lecky, history of european morals. p. 190
৭. islam at the cross roads, p. 38-39
৮. history of the conflict between religion and science, london, 1927, p. 312
৯. ঐ, p. 40-41
১০. lecky, history of european morals, part 11 chapter 1v. form constantin to charlemagne
১১. history of the conflict between religion and science, p. 230
১২. history of the conflict between religion and science, p. 230
১৩. islam at the cross roads, p. 50
১৪. Guide to Modern Wickedness, p. 114-115
১৫. philosophy for our times, pp. 338-340
১৬. রোয়াহুল বুখারী ফী কিতাবিল ইলম, ওয়া ফী কিতাবিল জিহাদ ওয়াস সীয়ার
১৭. তানকীহাত, প্রবন্ধ 'যুগের ব্যাধিগ্রস্ত জাতিসমূহ', মাওলানা মওদূদী, পৃ. ২৪-২৬

📘 মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো 📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: ইউরোপে স্বদেশবাদ ও জাতীয়তাবাদের বিকাশ

📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: ইউরোপে স্বদেশবাদ ও জাতীয়তাবাদের বিকাশ


রোমান গীর্জার পতন জাতীয়তাবাদের উত্থানের কারণ

পিছনে আমরা বলে এসেছি, উগ্র স্বদেশবাদ, জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও ভৌগোলিকতা ছিলো প্রজন্মপরম্পরায় ইউরোপীয় স্বভাবের প্রধান বৈশিষ্ট্য, বরং এটা ইউরোপের প্রাণসত্তায় ও রক্তমাংসে মিশে ছিলো, যা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা ইউরোপ কল্পনাও করতে পারে না। তবে ইউরোপে খৃস্টধর্মের আগমনের ফলে ধর্মের হাতে তা কিছুটা অবদমিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়েছিলো। কারণ যদিও খৃস্টধর্ম তার আসল রূপ ও প্রকৃতি হারিয়ে ফেলেছিলো এবং তাতে নানা দোষ-দুর্বলতার অনুপ্রবেশ ঘটেছিলো, তবু এটা তো সত্য যে, তাতে হযরত ঈসা (আঃ) ও তাঁর আসমানি ধর্মের শিক্ষা-দীক্ষার কিছু না কিছু ছাপ ও বৈশিষ্ট্য অবশ্যই বিদ্যমান ছিলো। আর, কোন আসমানি ধর্ম, শত বিকার-বিকৃতির পরো মানুষে মানুষে কৃত্রিম কোন ভেদ ও বিভেদ এবং ভাষা, বর্ণ ও জাতীয়তার পার্থক্য স্বীকার করতে পারে না। তাই বিভক্ত ও বিক্ষিপ্ত ইউরোপকে খৃস্টধর্ম রোমান গীর্জার অধীনে ঐক্যবদ্ধ করেছিলো এবং খৃস্টজগতকে অভিন্ন পরিবারে পরিণত করেছিলো। history of morality-এর লেখক বলেন—
'ইউরোপের স্বদেশপ্রেম ও সম্প্রদায়প্রীতি সাধারণ মানবহিতৈষণায় পরিবর্তিত হলো। এই মানসিক পরিবর্তন কতটা সুদূরপ্রসারী ছিলো তা খৃস্টান পণ্ডিতদের বক্তব্য-মন্তব্য থেকেও কিছুটা অনুমান করা যায়। যেমন, ট্রটোলীন বলেন, আমরা একটি প্রজাতন্ত্রের কথাই জানি, 'বিশ্বপ্রজাতন্ত্র'। অরজিন বলেন, 'আমাদের একটিই স্বদেশ, যার ভিত্তি হচ্ছে একটিমাত্র শব্দ, 'ঈশ্বর'।'¹

কিন্তু মার্টিন লুথার (১৪৮৩- ১৫৪৬ খৃ) যখন বৈপ্লবিক ধর্মীয় সংস্কার-আন্দোলনের ডাক দিলেন এবং রোমান গীর্জার বিরোধিতায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন তখনই ধর্ম-প্রভাবে ইউরোপের অবদমিত স্বভাব আবার জেগে উঠলো। লুথার স্বজাতি জার্মানদের সহযোগিতায় এতটাই সফল হলেন যে, শেষ পর্যন্ত রোমান গীর্জাকে পরাজয় মানতে হলো, আর বিক্ষিপ্ত ইউরোপকে যে ঐক্যসূত্রে গাঁথা হয়েছিলো তা ছিঁড়ে গেলো, কোন বন্ধনই আর থাকলো না। ফলে ইউরোপের বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠী ক্রমে আভ্যন্তরীণভাবে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সত্তায় আত্মপ্রকাশ করতে লাগলো।

বস্তুত ইউরোপে খৃস্টধর্মের পতন এবং সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদের উত্থান শুরু হয়েছিলো সমান্তরালে। অর্থাৎ ধর্ম ও জাতীয়তাবাদ যেন ছিলো দাঁড়িপাল্লার দুই দিক; একটি যত নীচে নামে অন্যটি তত উপরে ওঠে। আর ধর্মের পাল্লাই ভার হারিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছিলো এবং জাতীয়তাবাদের পাল্লা ভারী হয়ে নীচে নামছিলো। আমেরিকায় একসময়ের ব্রিটিশরাষ্ট্রদূত সুপ্রসিদ্ধ পণ্ডিত লর্ড লুথিয়ান, ১৯৩৮-এর জানুয়ারিতে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া ভাষণে এ ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করেই বলেছিলেন—
'ইউরোপে একসময় ঐরকম সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐক্য বিদ্যমান ছিলো, যেমন ছিলো ভারতে 'খৃস্টীয়তা'র প্রথম সময়ে। কিন্তু পনের শতকে (মার্টিন লুথারের) ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন যখন ইউরোপের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐক্য বিলুপ্ত করে দিলো তখন সমগ্র মহাদেশ বিভিন্ন জাতীয়তায় বিভক্ত হয়ে গেলো, যাদের পারস্পরিক সঙ্ঘাত শুধু ইউরোপ নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য স্থায়ী হুমকি হয়ে দেখা দিলো।'

ধর্মের অপসৃতি এবং ধর্মীয় নীতি ও নৈতিকতার বিলুপ্তির কারণে স্বদেশবাদ ও জাতীয়তাবাদের যে প্রবল উত্থান ঘটেছিলো, একই ভাষণে তিনি সেদিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন—
'ধর্ম হলো মানুষের অপরিহার্য পথপ্রদর্শক এবং জীবনে নৈতিক ও আত্মিক মর্যাদাবোধ অর্জনের একক মাধ্যম। কিন্তু ধর্মের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বিলুপ্ত হওয়ার অনিবার্য ফলরূপে পাশ্চাত্য এমন সব রাজনৈতিক মতবাদ ও চিন্তাধারায় আক্রান্ত হয়ে পড়লো যার ভিত্তি ছিলো নিছক জাতিগত ও শ্রেণীগত ভেদ-বিভেদ। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার প্রভাবে পাশ্চাত্য এ বিশ্বাসে আচ্ছন্ন হলো যে, বস্তুগত উন্নতিই হচ্ছে জীবনের শ্রেষ্ঠ লক্ষ্য। এজন্যই ইউরোপে এখন জীবনের সমস্যা ও জটিলতা বেড়েই চলেছে এবং আধ্যাত্মিক ও জাগতিক সমন্বয় দুরূহ হয়ে পড়েছে, অথচ এ সমন্বয়ই হলো 'যুগের বড় দুর্যোগ' জাতীয়তাবাদের কবল থেকে মুক্তির উপায়।'¹

পাশ্চাত্যের অহং ও প্রাচ্যবিদ্বেষ

ধর্মব্যবস্থার পতন ও জাতীয়তাবাদের উত্থানের প্রথম ফল এই হলো যে, আত্ম-বিভেদ সত্ত্বেও ইউরোপ সমগ্র প্রাচ্যের বিপক্ষে এক অভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে পরিণত হলো এবং পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য, কিংবা ইউরোপ ও গর-ইউরোপ, আরো পরিষ্কার ভাষায় আর্য ও অনার্য জাতিবর্গের মধ্যে এমন একটি স্থায়ী পার্থক্যরেখা টেনে দেয়া হলো যে, 'এপারের' সকল সভ্যতা ও সংস্কৃতি 'ওপারের' সকল সভ্যতা ও সংস্কৃতির চেয়ে শ্রেষ্ঠ। বেঁচে থাকার, সমৃদ্ধি অর্জন করার এবং শাসন করার অধিকার এপারের একচ্ছত্র; অন্য কারো, বা অন্য কিছুর বেঁচে থাকার ও বিস্তার লাভ করার অধিকার নেই।

বলাবাহুল্য, এটাই ছিলো স্ব-স্ব উত্থানকালে গ্রীক ও রোমান জাতির স্বভাবচিন্তা। তাদের চোখে শুধু তারাই ছিলো পৃথিবীর সভ্য জাতি, আর বিশেষ করে আটলান্টিকের পূর্বতীরের সবকিছু ছিলো 'বর্বর'।¹

জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার এ চরম উগ্র ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনার ফল এই ছিলো যে, বহিরাগত যে কোন ব্যক্তি, বস্তু, শিক্ষা ও দর্শনের প্রতিই তারা ছিলো চরম বিদ্বেষী। এমনকি ইউরোপের কোন কোন জনগোষ্ঠী স্বয়ং যীশু ও তাঁর ধর্মের প্রতিও বিদ্বেষ পোষণ করতো। কারণ তিনি বহিরাগত, সুতরাং তাঁর ধর্ম বহিষ্কারযোগ্য। যেমন জনৈক জার্মান শিক্ষাবিদ বলেন, 'আমাদের সন্তানদের কেন আমরা ভিন্ন জাতির ইতিহাস শেখাবো? কেন তাদের 'ইবরাহীম-ইসহাকের' কাহিনী শোনাবো? আমাদের চাই খাঁটি জার্মান ঈশ্বর।'

সেখানে এমন সম্প্রদায়ও ছিলো যারা যীশুকে শুধু ইসরাঈলী হওয়ার 'অপরাধে' প্রত্যাখ্যান করেছে। পক্ষান্তরে তাঁর প্রতি বিশ্বাসীরা তাঁকে 'আর্যরক্তীয়' প্রমাণ করার জোর প্রয়াস চালিয়েছিলো। এমনকি একসময় জার্মান জাতির উপাস্য প্রাচীন দেব-দেবীর পুনঃঅধিষ্ঠানের আন্দোলন বা প্রবণতাও বেশ দানাবেঁধে উঠেছিলো।

আজকের আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রবক্তা রাশিয়াও উগ্র জাতীয়তাবাদে তার প্রাচীন শত্রু জার্মানির চেয়ে কোনভাবেই পিছিয়ে ছিলো না। সেখানে বহু মানুষ বিশ্বাস করে, আধুনিক যুগের যা কিছু মৌলিক আবিষ্কার-উদ্ভাবন, তাতে সিংহভাগ অবদান রুশবিজ্ঞানীদের। তাদের মতে পদার্থের যৌগিকতা-সূত্রের আবিষ্কারক ফরাসী রসায়নবিদ lavoisier নন, বরং এক্ষেত্রে তিনি রুশ বিজ্ঞানী মিশেল লোমুতৃসেভ-এর কাছে ঋণী। তদ্রূপ বিদ্যুৎশক্তির উদ্ভাবক টমাস এডিসন নন, বরং রুশ বিজ্ঞানী লিউজীন তার ছয় বছর আগে বিদ্যুৎ উদ্ভাবন করেছেন। প্রাভদা পত্রিকার মতে, রুশ বিজ্ঞানিগণ মার্কিন বিজ্ঞানী স্যামুয়েল মুরিস-এর আগে টেলিগ্রাফ উদ্ভাবন করেছেন এবং জর্জ স্টিফেনসন-এর আগে বাষ্পীয় ইঞ্জিন উদ্ভাবন করেছেন। ইতিহাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাদের আরো বহু দাবী আছে, যার উৎস উগ্র জাতীয়তাবাদ ও যুক্তিহীন রুশবন্দনা ছাড়া আর কিছু নয়।

ছোঁয়াচে জাতীয়তাবাদ মুসলিম জাহানে

পরম পরিতাপের বিষয়, জাতীয়তাবাদের এ ভয়াবহ ব্যাধি মুসলিম দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে, অথচ প্রত্যাশা ছিলো, তারা হবে ইসলামের বিশ্বদাওয়াতের অগ্রদূত এবং পৃথিবীর জন্য শান্তি ও নিরাপত্তার বার্তাবাহী। বরং তারাই হবে অভিশপ্ত জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধের শক্তিশালী কেন্দ্র। বলাবাহুল্য যে, এটা হতে পেরেছে মুসলিমসমাজে দ্বীনের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়া এবং পাশ্চাত্যের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিল্প-সাহিত্যের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে। তাই তুরস্কের উছমানি সালতানাতে দেখা যায় 'তুরানবাদ' নামে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ফেতনা, যার লক্ষ্য ছিলো প্রাচীন তুর্কী জাহিলিয়াত ও সভ্যতা-সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ। ইসলাম, যা আরবদের মাধ্যমে তুর্কীরা পেয়েছে, তার প্রতি তারা ছিলো চরম বৈরী, যেমন ছিলো নতুন জার্মানে অনার্য মাধ্যমে আগত ধর্ম ও সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রতি, যাকে তারা উপহাস করে বলতো, 'সেমিটিক ধর্ম ও সভ্যতা'। একই ভাবে নবীন তুরস্কের কোন কোন চিন্তানায়ক ভাবতেন, ইসলাম হচ্ছে তুর্কীজাতির উপর চাপিয়ে দেয়া একটি বহিরাগত ধর্ম, যা কিছুতেই তাদের উপযোগী নয়। সুতরাং তাদের জাতীয় কর্তব্য হলো প্রাচীন প্রতিমাপূজায় ফিরে যাওয়া, যা ছিলো ইসলামপূর্ব যুগে তাদের নিজস্ব ধর্ম। নতুন তুরস্কের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান রূপকার বলে খ্যাত যিয়া কোক আলিব সম্পর্কে খালিদা এদীব খানম বলেন—
'তিনি এমন এক নতুন তুরস্কের স্বপ্ন দেখছিলেন যা উছমানি তুর্কী এবং তাদের পূর্ববর্তী তুরানিদের মধ্যে যোগসূত্র হবে। তিনি ইসলামপূর্ব তুর্কীদের নাগরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিশদ তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন যাতে এগুলোর উপর ভিত্তি করে একটি ব্যাপক নাগরিক সংস্কার-আন্দোলন গড়ে তোলা যায়। তার স্থির বিশ্বাস ছিলো, আরবদের প্রবর্তিত ইসলাম আমাদের অবস্থার উপযোগী নয়। সুতরাং যদি আমরা আমাদের জাহেলি যুগে ফিরে যেতে না চাই, তাহলে অন্তত এমন কোন ধর্মীয় সংস্কার-আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে যা আমাদের পূর্ণ স্বভাব-উপযোগী।'¹

বলাবাহুল্য, এরূপ আত্মঘাতী ঝোঁক-প্রবণতা শেষদিকে যেমন তুর্কীদের মধ্যে দানা বেঁধেছিলো তেমনি বেঁধেছিলো ইরানীদের মধ্যেও। মরহুম আমীর শাকীব আরসলান আরববিষয়ের মত তুর্কীবিষয়েও ছিলেন আস্থা-যোগ্য বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত। কারণ 'মজলিসুল উম্মাহ'-এর সদস্যরূপে দীর্ঘকাল তিনি তুরস্কে বাস করেছেন। তিনি বলেন—
'ইসলামী উছমানি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে আরেকটি চিন্তাধারা ছিলো তুরানি জাতীয়তাবাদ। এর অগ্রবর্তী কাতারের প্রবক্তারা হলেন যিয়া কোক আলিব, আহমদ আগায়েফ, ইউসুফ আকশোর (এদু'জন রুশঅঞ্চল থেকে আগত), জালাল সাহির, ইয়াহয়া কামাল, হামদুল্লাহ ছাবহী, জাতীয় কবি মুহম্মদ আমীন বেক এবং আরো বহু সাহিত্যিক চিন্তাবিদ। ছাত্রসমাজ ও নতুন প্রজন্মের অধিকাংশ এ মতবাদে অনুরক্ত ছিলো।
এদের দাবী হলো, সভ্যতার ক্ষেত্রে তুর্কীরা হচ্ছে অগ্রবর্তী প্রাচীনতম জাতি। তুর্কী ও মঙ্গোল হচ্ছে অভিন্ন নৃতাত্ত্বিক সত্তার অধিকারী। সুতরাং তাদেরকে 'তুরানি সঙ্ঘ' নামে আবার অভিন্ন সত্তায় ফিরে যেতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টি শুধু সাইবেরিয়া, তুর্কিস্তান, চীন, ককেসাস ও বলকানের তুর্কীদের পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলো না, বরং এদিকে চীনের মঙ্গোল এবং ওদিকে ইউরোপের হাঙ্গেরি ও ফিনল্যান্ড পর্যন্ত প্রসারিত ছিলো। কারণ তাদের মতে এরা সবাই তুরানী নৃ-মূল থেকে উৎসারিত। প্রথম চিন্তাধারার বিপরীতে এদের দাবী ছিলো, 'আমরা প্রথমে তুর্কী, তারপর মুসলিম।' বরং এরা ধর্মপরিচয় ও ইসলামী বন্ধন বর্জনের পক্ষে ছিলো, তবে তা 'তুরানবাদ' বিস্তারে কোনভাবে সহায়ক হলে ভিন্ন কথা। অর্থাৎ ইসলামী পরিচয়টি উদ্দেশ্য না হয়ে শুধু মাধ্যম হতে পারে। কোন কোন তুরানবাদী এতটা বেড়েছেছিলো যে, তাদের উদ্ধত ঘোষণা ছিলো, 'আমরা তুর্কী, সুতরাং আমাদের কা'বা হলো তুরান।' চেঙ্গিজ খান ছিলো তাদের জাতীয় বীর এবং মঙ্গোল বিজয়াভিযান ছিলো তাদের স্তুতি-বন্দনার বিষয়। এসম্পর্কে বহু গান, কবিতা ও সঙ্গীত রচিত হয়েছিলো, যাতে তরুণ প্রজন্ম চেঙ্গিজপূজা ও মঙ্গোলবন্দনার দীক্ষায় গড়ে ওঠে এবং 'যেন তাদের সাহস ও মনোবল উৎকর্ষ লাভ করে।'¹

তিনি আরো বলেন—
'ইউরোপের অনুকরণে যেহেতু এ যুগটি ছিলো বিভিন্ন জাতীয়তাবাদের যুগ সেহেতু পারসিক জাতীয়তাবাদও পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশী শক্তি লাভ করেছিলো। বস্তুত এটা ছিলো তুরানবাদেরই পারসীয় সংস্করণ। তাই পারস্যের নতুন প্রজন্মকে দেখতে পাই পারস্যের প্রাচীন ধর্ম সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে উঠতে যেমন তুর্কী নতুন প্রজন্ম তাদের প্রাচীন ধর্ম ও উপাস্য সাদা নেকড়ে সম্পর্কে উৎসাহী হয়ে উঠেছিলো, যার একটি প্রকাশ ঘটেছিলো আধুনিক বইপত্রে সাদা নেকড়ের চিত্র অঙ্কিত করার মাধ্যমে। এদের উদ্দেশ্যে শায়খুল ইসলাম মূসা কাযিম বলেছিলেন তিনি নিজে আমাকে শুনিয়েছেন—'আরবদেরও ছিলো এমন সব পূজা-পদ্ধতি যা ভাবলেও গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। কিন্তু তারা ইসলামের মাধ্যমে সেগুলো নির্মূল করেছিলো। তাদের গর্ব ছিলো যে, আল্লাহ দয়া করে এরূপ নীচতা ও মূর্খতা থেকে তাদের উদ্ধার করেছেন। অথচ আজ তোমরা আল্লাহকে ত্যাগ করে নেকড়েপূজায় লিপ্ত হতে চাও! ধিক তোমাদের! তো তুর্কীদের ঘটনা পারসিকদের বেলায়ও ঘটলো। তাদের নতুন প্রজন্ম পারসীয় প্রাচীন ধর্মগুলোর পুনরুজ্জীবনপ্রয়াসে মেতে উঠলো। যেমন 'আলো ও অন্ধকার তত্ত্ব', যা থেকে অগ্নিপূজার উদ্ভব ঘটেছে। তদ্রূপ যরথোস্ট্রো-চিন্তা, প্রথমে যিনি আল্লাহর একত্বের প্রচারক ছিলেন। তিনি বলতেন, আল্লাহ হচ্ছেন আলো ও অন্ধকারের স্রষ্টা, আর এদু'য়ের সংমিশ্রণেই কল্যাণ ও অকল্যাণের অস্তিত্ব। এ সংমিশ্রণ ছাড়া বিশ্বজগতের অস্তিত্ব সম্ভবই হতো না। এধরনের বিভিন্ন সংস্কার ও ধর্মবিশ্বাস যা প্রাচীন পারস্যে প্রচলিত ছিলো, যেমন দ্বিত্ববাদ ও মানুবাদ। কেউ কেউ মাযদাক-বাদেরও প্রবক্তা ছিলো যার মূল কথা হলো নাস্তিকতা ও অবাধ স্বেচ্ছাচার।'¹

আরবজাহানে জাতীয়তাবাদ

এর চেয়ে ভয়াবহ বিষয় এই যে, খৃস্টীয় উনিশশতকের শেষ দিকে জাতীয়তাবাদের সর্বনাশা ব্যাধি আরবদের মধ্যেও সংক্রমিত হলো; অথচ আরবরাই সুদীর্ঘ তেরশ বছর বিশ্বকে মানবভ্রাতৃত্ব ও মানবসাম্যের শিক্ষা দিয়ে এসেছে। কারণ তাদের জন্য আল্লাহর মনোনীত দ্বীনুল ইসলামের এটাই ছিলো শিক্ষা। এই দুষ্ট জাতীয়তাবাদ একসময় তাদের অস্থি-মজ্জায় মিশে স্বভাবের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। অবশ্য এর যথোপযুক্ত কার্যকারণও ছিলো, কিছু অন্তর্গত এবং কিছু বহির্গত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্গত কারণটি হচ্ছে জাতীয় অহঙ্কার, যা তুর্কী শাসক-প্রশাসক ও রাজকর্মচারীদের আচরণে প্রকাশ পেতো। হাঁ, তুর্কীদের অহমিকা ও দম্ভ খুব অবমাননাকরভাবে আরবদের এধারণা দিতো যে, তারা হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেণীর জনগোষ্ঠী। বিশেষ করে যারা অতি সংবেদনশীল তাদের দৃষ্টিতে তুর্কীদের আচরণ-উচ্চারণ ছিলো চরম ঔপনিবেশিক। পরিস্থিতি আরো সঙ্গিন হয়ে গেলো এ কারণে যে, আরবীভাষাকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও গুরুত্ব দেয়া হয়নি। পক্ষান্তরে শাসকজাতির ভাষা তুর্কীকে করা হলো সরকারী ভাষা। তুর্কীদের এজাতীয় আরো কিছু রাজনৈতিক নির্বুদ্ধিতা ও হঠকারিতা আরবদের মধ্যে জাতীয় আক্রোশ ও আরবীয় অহমিকা উসকে দিয়েছিলো।

অবশ্য খৃস্টান আরব বুদ্ধিজীবীরাও পিছন থেকে যথেষ্ট ইন্ধন যুগিয়েছে, তুর্কীদের সঙ্গে যাদের না ছিলো দ্বীন ও আকীদার সম্পর্ক, না ছিলো ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। এরা সম্পূর্ণরূপে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে প্রতিপালিত হয়েছিলো, যার সাহিত্যে, সঙ্গীতে, কাব্যে ও দর্শনে ছিলো শুধু জাতি ও জাতীয়তাবাদের স্তুতি-বন্দনা।

এরপর উপস্থিত হলো বহির্গত কার্যরকারণটি। অর্থাৎ পাশ্চাত্যের চিন্তানায়ক ও রাজনৈতিক কর্ণধাররা পরিস্থিতির পূর্ণ সুযোগ নিলো। উছমানি সাম্রাজ্যের পতন তো তাদের বহু কালের স্বপ্ন, যাতে প্রাচ্য থেকে তুর্কীদের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব-প্রতিপত্তি বিলুপ্ত হয়ে যায়। তারা যখন দেখলো, কিছু আরব যুবকের চিন্তাজগতে জাতীয়তাবাদী চেতনা অঙ্কুরিত হচ্ছে তখন তারা 'শতাব্দীর সুযোগ' ভেবে মুখে, কলমে ও লেখায়, বক্তৃতায় ঐ চিন্তা-চেতনাকে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পুষ্টি যোগাতে লাগলো। এ উদ্দেশ্যে তারা আরব-জাহানের বড় বড় শহর ও রাজধানীতে নিয়মিত যাতায়ত শুরু করলো এবং আরব লেখক, কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী এবং গোত্রপ্রধান ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হলো। নিঃস্বার্থ আরবপ্রেম ও আরব-অধিকার সংরক্ষণের মুখোশ পরে তারা এ চিন্তা ছড়িয়ে দিলো যে, খেলাফাতের কেন্দ্র হবে, 'আস্তানা' নয়, হারামাইন বা কোন আরব ইসলামী রাজধানী। কারণ হিজরী দশম শতাব্দীতে তুর্কীরা আরবদের হাত থেকে খেলাফাত ছিনিয়ে নিয়েছিলো, সুতরাং আরবরাই হচ্ছে খেলাফতের স্বাভাবিক, বৈধ ও শরীয়তসম্মত হকদার।

এ সর্বনাশা চিন্তা আরবদের মাথায় কীভাবে অনুপ্রবেশ করলো এবং ধীরে ধীরে তার বিষক্রিয়া শুরু হলো, সর্বোপরি পাশ্চাত্যের পণ্ডিতগণ এ চিন্তার জন্মদান ও স্তন্যদানের পিছনে কী খেল খেলেছে তা পরিষ্কার বুঝতে হলে আমাদের মিস্টার ওয়েলফার্ড বেলেন্টির future of islam নামের রহস্যপূর্ণ বইটি অবশ্যই পড়তে হবে। আঠারোশ' বিরাশিতে লেখা বইটি আরব ও মুসলিম বিশ্বে তখন বেশ চমক ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। আরবীসহ এর বিভিন্ন অনুবাদও বিপুল প্রচার পেয়েছিলো। ভূমিকায় লেখক বলেন—
'খেলাফতবিষয়ে মিশরীয় নেতৃবৃন্দ ভারসাম্যপূর্ণ এক মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। তাদের পূর্ণ শক্তি ও মনোযোগ এখন নিবন্ধ 'স্বাধীনতায়', অন্যকিছুতে নয়। কখনো তারা প্রতিদ্বন্দ্বীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হননি, বা ইসলামের দুর্গে কোন রকম ফাটল ধরাননি। সে ইচ্ছাও তাদের ছিলো না। কেননা আমীরুল মুমিনীন হিসাবে সুলতান আব্দুল হামীদ খান সবার কাছেই স্বীকৃত ছিলেন এবং তুলনা-মূলক তিনিই ছিলেন এ মহান পদের যোগ্যতম ব্যক্তি। মোটকথা, খেলাফতের নবজাগরণ বা দ্বিতীয় উত্থানের বিষয়টি তুলে রাখা হয়েছিলো ঐ সময়ের জন্য যখন উছমানি খেলাফতের 'নাকে শ্বাস নিয়ে' স্বাভাবিক মৃত্যু হবে। কোন সন্দেহ নেই যে, এটি ছিলো মিশরীয়দের ধীরস্থির ও প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং এটাই ছিলো তাদের জন্য উপযুক্ত।'

কত ভয়ঙ্কর বিষ কী সুন্দর মোড়কে তুলে দেয়া হচ্ছে সোজা-সরল আরবদের হাতে! একপর্যায়ে তিনি আরো বলেন—
'যদি আমরা আর কয়েকটি বছর ধৈর্য ধারণ করতে পারি তাহলে এ বিজয় যে আরো ব্যাপক ও চমকপ্রদ হবে তাতে খুব বেশী মানুষের সন্দেহ নেই। কারণ সুলতান আব্দুল হামীদ খানের মৃত্যু হোক বা অপসারণ, এর অবশ্যম্ভাবী ফল হবে কায়রোয় খেলাফতকেন্দ্রের স্থানান্তর, আর তা আরবদের সামনে তাদের হারানো ধর্মীয় নেতৃত্ব পুনরুদ্ধারের সুবর্ণ সুযোগ এনে দেবে।'

উক্ত বইয়ের একটি অধ্যায় হলো, 'মক্কা- প্রকৃত রাজধানী', সত্যি ভদ্রলোকের ধূর্ততার প্রশংসা করতে হয়! তাতে তিনি বলেন—
'মুসলিম জ্ঞানীসমাজের সামনে এটা সুস্পষ্ট যে, যদি আমরা পিছনের দিকে যাত্রা করি (অর্থাৎ যদি খেলাফতকেন্দ্র কনস্টান্টিনোপল থেকে এশিয়ার অন্য কোন স্থানে নেয়া হয়) তাহলে (উদ্দেশ্যে উপনীত হওয়ার জন্য) বাধ্য হয়ে আমাদের এক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে। বস্তুত দ্বীনের প্রাণকেন্দ্র ও রাজধানী হচ্ছে জাযীরাতুল আরবে, যা ইসলামের লালনক্ষেত্র এবং অহীর অবতরণক্ষেত্র। সর্বোপরি সেটাই হচ্ছে ধর্মীয় শাসন ও নেতৃত্বের যাবতীয় গুণ ও যোগ্যতার অধিকারী একমাত্র নিরাপদ শহর। ফলে তা এই শাসন ও নেতৃত্ব সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত বহন করতে পারবে। বাড়তি সুবিধা হলো, সেখানে ইহুদি-খৃস্টানদের উপস্থিতি নেই, তাই বিবাদ-সঙ্ঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কাও নেই। আর তা পশ্চিমা দেশগুলোর লালা ঝরবে, এমন উর্বর ও প্রাচুর্যপূর্ণ ভূখণ্ডও নয়। খলিফাকে সেখানে বৃটিশ ও ফরাসী রাষ্ট্রদূত বা অন্য কোন বিদেশী প্রতিনিধির 'তম্বীহ' শুনতে হবে না। ফলে তিনি সত্যিকার 'নাইবে রাসূলের' উপযুক্ত (মর্যাদা ও) স্বাধীনতার সঙ্গে শাসনকার্য পরিচালনা করতে পারবেন। আর ইসলাম ফিরে পাবে তার সর্বপ্রকার আবিলতামুক্ত স্বচ্ছ নির্মল রূপ। এসব কারণে খুবই সম্ভব যে, খেলাফত মক্কায়, কিংবা মদিনায় তার যোগ্য অধিকারীদের কাছে ফিরে আসবে।'

ভদ্রলোক এখানে এসেই থামেননি। আরো বিষ ছিলো তার বোতলে। সেটা উপুড় করে ঢেলে দিয়ে তিনি আরো বলেন—
'মুসলিম জাতির আধ্যাত্মিক রাজধানী কুসতুনতুনিয়া থেকে মক্কায় স্থানান্তরের বিষয়টি খুব সহজ ও স্বাভাবিক একটি পদক্ষেপ, যা মানুষের বর্তমান চিন্তা-বিশ্বাসে তেমন কিছু আলোড়ন বা পরিবর্তন সৃষ্টি করবে না, এমনকি তা আলেমসমাজের চিন্তাধারা ও মতামতের সঙ্গেও পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। বস্তুত উম্মাহর যারা কর্ণধার তাদের জন্য মক্কা-মদিনাই হচ্ছে শরিয়তনির্দেশিত আধ্যাত্মিক নিরাপদ আশ্রয়স্থান এবং অতিসত্বর এদু'টি শহরই হবে আধ্যাত্মিক শক্তির কেন্দ্রভূমি। এ বিষয়ে যার সঙ্গেই আমি কথা বলেছি, তুর্কীদের বন্ধুরা ছাড়া সবাই পূর্ণ একমত প্রকাশ করেছেন এবং আমাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, আলেমগণও এ চিন্তার স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থক। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, মক্কাই হওয়া উচিত খেলাফতের প্রধান কেন্দ্র। বহুদিন থেকে আমরা একটি জনপ্রিয় বাক্য শুনি, রোমই হচ্ছে রাজধানী। তো 'মক্কাই হচ্ছে রাজধানী' এ বাক্যটিও মানুষের চিন্তায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করবে। সঙ্গে যদি যোগ করা হয়, 'খেলাফত কোরাইশের' তাহলে নিঃসন্দেহে আরবরা তা সাদরে গ্রহণ করবে, আর আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, আরবদের প্রভাববলয় মরোক্কো থেকে বুশেহর পর্যন্ত বিস্তৃত। সুতরাং এ শ্লোগান দ্বারা কমপক্ষে মরোক্কো থেকে বুশেহর পর্যন্ত বিস্তৃত বিশুদ্ধ আরবজনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি আলোড়ন ও আন্দোলন অবশ্যই সৃষ্টি হবে। একইভাবে ভারত ও মালয়-এর মুসলিম জনগোষ্ঠীও ঐ প্রভাববলয়ের মধ্যে পড়ে, বরং যে কোন মুসলিম জনগোষ্ঠী, যেখানেই হোক তাদের অধিবাস, অভিন্ন কক্ষপথেই তাদের চিন্তা আবর্তিত হবে, শুধু তুর্কীদের বাদ দিয়ে, যারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শক্তি ও প্রভাব হারিয়েই চলেছে।'

এ থেকেই বোঝা যায়, আরবদের মগজ ধোলাইয়ের কাজটা কত বুদ্ধিবৃত্তিক কুশলতা ও রাজনৈতিক ধূর্ততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছিলো। যাই হোক, ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে গেলো। এর মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠলো আর আরবদের সামনে উছমানি আনুগত্যের 'জোয়াল' ছুঁড়ে ফেলার সুযোগ অবারিত হলো, ওদিকে মিত্রশক্তিও সুযোগটি লুফে নিয়ে আরবদের সামনে জাতীয়তাবাদের বাজনা বাজাতে শুরু করলো। ধুরন্ধর টমাস লরেন্স এ সময় মাঠে নামলেন এবং আরব-জাতীয়তাবাদের আগুন ছড়িয়ে দিলেন। বিশিষ্ট-সাধারণ প্রতিটি আরবকে, যাকে যেভাবে পারা যায়, তুর্কীদের বিরুদ্ধে তিনি ক্ষেপিয়ে তুললেন। হিজাযে শরীফ হোসায়ন বিদ্রোহ করলেন, শামে শামীরা এবং মিশরে মিশরীয়রা একই পথের পথিক হলো। মুসলিম তুর্কীরা, শত ত্রুটি ও দুর্বলতা সত্ত্বেও তখনো পর্যন্ত যারা ছিলো ইসলামের শক্তি ও প্রতাপের প্রতীক, এ দুঃসময়ে তাদের পাশে থাকার চেয়ে আরবরা মিত্রশক্তির পক্ষে ভিড়ে যাওয়াকেই লাভজনক মনে করলো। এ বিষয়ে কোরআন ও সুন্নাহর যত স্পষ্ট বাণী ও সতর্কবাণী ছিলো, সব ভুলে গিয়ে মিত্রশক্তির মিষ্টি মিষ্টি প্রতিশ্রুতির উপরই তারা ভরসা করলো, যাদের রাজনীতি ও কূটনীতি সতত পরিবর্তনশীল; সুবিধা ও স্বার্থ ছাড়া আর কিছু যারা জানে না এবং শক্তি ও ক্ষমতা ছাড়া আর কিছুর যারা পূজা করে না; সর্বোপরি ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষই যাদের রাজনীতি ও শাসননীতির মূল চালিকাশক্তি। সিরিয়ায় আরব হাশেমি শাসন প্রতিষ্ঠার পর মিত্রশক্তি কীভাবে সব প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে গেলো এবং হাশেমীদের দু'দিনের রাজত্ব তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়লো সে ইতিহাস তো সবারই জানা। ইতিহাসে তো অনেক কিছুই আছে, কিন্তু সময়মত মনে পড়ে কোথায়! মনে পড়লেও তা থেকে শিক্ষা নেয়ার ইচ্ছা কোথায়!

তারপর এলো আরবজাতীয়তাদের আদর্শিক চেতনার যুগ। বস্তুত এটা ছিলো আগাগোড়া এক পাশ্চাত্য চিন্তা-চেতনা এবং সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ এক চিন্তা-দর্শন। ধর্মের প্রতি যে পরিমাণ আবেগ-উদ্দীপনা, উচ্ছ্বাস-উত্তেজনা ও প্রশ্নাতীত পবিত্রতার অনুভূতি মানুষের অন্তরে থাকে জাতীয়তাবাদের পক্ষে সেগুলো পূর্ণমাত্রায়ই সক্রিয় ছিলো, বরং বলা চলে, একটি নতুন ধর্মরূপেই যেন তা আত্ম-প্রকাশ করেছিলো। ফলে শিক্ষিত আরবজনগোষ্ঠী, বিশেষত যুবসমাজ, বিভিন্ন কারণে ধর্মের সঙ্গে যাদের যোগসূত্র দুর্বল হয়ে পড়েছিলো, দলে দলে জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে সমবেত হলো। সম্ভাব্য কম সময়ে এবং সহজতম উপায়ে গৌরব ও মর্যাদা অর্জনের এবং উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে স্বাধীন ও প্রগতিশীল জাতিবর্গের সমকক্ষতা অর্জনের এক উদগ্র আকাঙ্ক্ষা তাদের পেয়ে বসেছিলো। আর এজন্য তাদের ধারণামতে আরবজাতীয়তাবাদের কোন বিকল্প ছিলো না। অন্যদিকে পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রতি তাদের মধ্যে বিরাট ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছিলো, যারা আরবদের বুকে বিষফোড়ার মত ইহুদিরাষ্ট্র ইসরাইলের জন্ম দিয়েছিলো এবং সর্বোতভাবে তাকে লালন-পালন করে যাচ্ছিলো। এ অপমান-জনক পরিস্থিতিরই প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া ও চিন্তানৈতিক বিপ্লবরূপে আরবরা আরব-জাতীয়তাবাদের আশ্রয় গ্রহণ করলো। অতিউৎসাহীরা এক্ষেত্রে এতই সীমালঙ্ঘন করলো যে, আরবজাতীয়তাবাদ ছাড়া সবকিছু প্রত্যাখ্যান করার এবং প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যও তারা প্রস্তুত হয়ে গেলো, এমনকি ইসলাম ও ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বিরুদ্ধেও।

ঝড় ঝড়ের মতই এসেছিলো সাগর উত্তাল করে এবং জোয়ার জোয়ারের মতই এসেছিলো সবকিছু ভাসিয়ে নিতে; তবে জাতীয়তাবাদের জোয়ারে ভাটার টান লাগতেও বেশী দেরী হলো না। কারণ শত্রুর বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠ অস্ত্র এবং হারানো আরবমর্যাদা পুনরুদ্ধারের সর্বোত্তম উপায়েরূপে যে আরবজাতীয়তাবাদ তারা আঁকড়ে ধরেছিলো তা ষাটের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে কোন অলৌকিক ফল বয়ে আনতে পারেনি, বরং বয়ে এনেছে নতুন জাতীয় লাঞ্ছনা ও যিল্লতি।

ইউরোপের জাতীয়তাবাদ- উপকরণ ও প্রকৃতি

আগের আলোচনায় ফিরে আসি। ইউরোপে সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদী চিন্তা-চেতনার অনিবার্য ফল এই দাঁড়িয়েছিলো যে, ছোট-বড় প্রতিটি জনপদ ও জনগোষ্ঠী নিজেদের ভিন্ন জগতের বাসিন্দা বলে ভাবতে শুরু করলো, যার বাইরে আর কোন জগত নেই। একদিকে ভূগোল ও প্রকৃতি তাদের নদী-পর্বতের সীমারেখা দ্বারা বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলো, অন্য দিকে তারা নিজেরাও রাজনৈতিক ও ঔপনিবেশিক স্বার্থে সঙ্কীর্ণ একটি 'আত্মবেষ্টনী' তৈরী করে নিয়েছিলো। ঐ সীমারেখা ও বেষ্টনীর বাইরে যে আরো জগত আছে এবং সেখানে আছে মানুষের অধিবাস তা তারা ভাবতেই প্রস্তুত ছিলো না। নিজেদের অস্তিত্বের বাইরে অন্য কিছুর প্রতি তাদের না ছিলো আগ্রহ, না ছিলো শ্রদ্ধা। নিজেদের তারা উপাস্যের আসনে বসিয়ে আত্ম-উপাসনায় মেতে উঠেছিলো। উপাস্য ও উপাসিতের মধ্যে উপাসনা ও বন্দনার যত রকম সম্পর্ক হতে পারে সবই তারা গ্রহণ করেছিলো। তাদের যুদ্ধ ছিলো এই উপাস্যের সন্তুষ্টির জন্য; হত্যা ও লুণ্ঠন এবং জনপদের পর জনপদের ধ্বংসসাধন, সবই ছিলো ঐ উপাস্যের ক্ষুধা ও চাহিদা পূরণের জন্য। এককথায় আত্ম-উপাস্যের আত্মবন্দনার জন্যই ছিলো তাদের জীবন ও মরণ এবং যুদ্ধ ও লুণ্ঠন।

জাতীয়তাবাদ নামের এ নতুন ধর্মের প্রথম বিশ্বাসই ছিলো এই যে, জাতি ও জাতীয়তা হচ্ছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। আমার জাতির চেয়ে উত্তম এবং আমার দেশের চেয়ে সুন্দর কোন দেশ ও জাতি পৃথিবীতে নেই। স্রষ্টা বলে যদি কিছু থেকে থাকে, কিংবা এ শব্দটির ব্যবহার যদি জাতীয় স্বার্থের অনুকূল হয় তাহলে বুদ্ধি, মেধা, গুণ ও প্রজ্ঞায় এবং বিশ্বকে শাসন করার যোগ্যতায় তিনিই আমার জাতিকে অন্য জাতির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। সুতরাং পৃথিবীতে আমরাই স্রষ্টার নির্বাচিত শাসক ও অভিভাবক। শাসন করা আমাদের অধিকার, আর আনুগত্য ও দাসত্ব হলো সর্বজাতির কর্তব্য। এককথায় জাতীয়তাবাদের এই আগ্রাসী দানব অন্য কোন জাতি ও জনগোষ্ঠীকে পৃথিবীর কোন ভূখণ্ডে বাস করার ও বেঁচে থাকার অধিকারই দিতে রাজি নয়, যতক্ষণ না তারা দাসত্ব ও আনুগত্য স্বীকার করে নেবে।

এই আগ্রাসী চিন্তার ক্ষেত্রে বর্তমান ইউরোপের জাতি ও রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে গুণগত কোন পার্থক্য নেই। হিংস্রতায়, রক্তলোলুপতায়, সম্পদলুণ্ঠনের উন্মত্ততায় একই সমান্তরালে সবার অবস্থান। পার্থক্য শুধু কৌশলে ও কর্মপন্থায় এবং আবরণে ও আলখেল্লায়। কেউ যা বলে তাই করে এবং যা করে তাই বলে, আর কেউ যা করে, মুখে তা বলে না, অর্থাৎ পিঠে ছুরি বসায়, তবে মুখের হাসি থাকে অটুট। কৌশল যাই হোক, উদ্দেশ্য অভিন্ন। কারণ জাতীয়তাবাদের বীজ যে মাটিতে এবং যে জলবায়ুতে যেভাবেই বপন করা হোক তার বৃক্ষ হবে কণ্টকাকীর্ণ এবং ফল হবে তিক্ত ও বিষাক্ত। এটা সম্ভবই নয় যে, কোন জাতি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হবে আর তার মধ্যে লুণ্ঠন ও আগ্রাসনের মনোভাব থাকবে না, কিংবা অন্য জাতির প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ ও তাচ্ছিল্যের অনুভূতি থাকবে না। যেমন সম্ভব নয়, কেউ মদে চুর হবে, কিন্তু নেশাগ্রস্ত হবে না এবং প্রলাপ বকবে না। কবির ভাষায়—
ألقاه في اليم مكتوفا وقال له رباك إياك أن تبتل بالماء
'হাত-পা বেঁধে ফেলে দিলো নদীতে, আর বলা হলো, সাবধান, ভিজে না যেন পানিতে।'¹

বিশেষ করে শিল্প ও সাহিত্য এবং ইতিহাস ও দর্শন, এমনকি জ্ঞান-বিজ্ঞানও যখন জাতীয়তাবাদী চেতনার অনুঘটকরূপে কাজ করে এবং জাতির সর্বস্তরে রক্ত-বংশের অহঙ্কার ও অতীত ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করার মানসিকতায় সুড়সুড়ি দেয়, আর তাতে কোন ধর্মীয় ও নৈতিক বাধা-প্রতিবন্ধকও না থাকে, তদুপরি জাতির নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব যখন তাদের হাতে চলে যায়, জাতীয় অহঙ্কার ও আত্মগৌরবের প্রচার ছাড়া যাদের আর কোন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নেই তখন অবস্থা কত ভয়াবহ হতে পারে তা তো বলাই বাহুল্য।

যে দু'টি উপাদান ছাড়া জাতীয়তাবাদ কখনো টিকে থাকতে পারে না, যাকে বলা যায় জাতীয়তাবাদের মূল প্রাণ, তা হলো ভীতি ও ঘৃণা। জাতির সামনে যদি ঘৃণা ও ভয় করার মত কিছু তুলে ধরা না যায় তাহলে জাতীয়তাবাদের চেতনা সৃষ্টি হতে পারে না, হলেও স্থায়ী হতে পারে না। তাই জাতীয় নেতৃত্ব যাদের হাতে, খুব কৌশলে তারা ঘৃণা ও ভয়, এ দুই পথে জাতির আবেগ-অনুভূতি উস্কে দেয় এবং 'ব্যথার শিরায়' চাপ দিয়ে এমন তোলপাড় ও উন্মাদনা সৃষ্টি করে, যেন এক প্রলয়ঙ্করী ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস!

এজন্য কখনো তারা তিলকে তাল বানায়, তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে এবং বাস্তব-অবাস্তব শত্রুকে সামনে এনে জাতির ভিতরে ভয়-ভীতি ও ক্রোধ-ঘৃণার অনুভূতি চাঙ্গা রাখার প্রয়াস চালায়। কারণ এরই মধ্যে রয়েছে তাদের অস্তিত্বের নিশ্চয়তা এবং শাসন ও নেতৃত্বের নিরাপত্তা। ভয়-ভীতি ও ক্রোধ-ঘৃণাই জাতীয়তাবাদের প্রধান খাদ্য। বস্তুত এদু'টি অনুঘটক না থাকলে জাতীয়তাবাদের বেলুন বহু আগেই চুপসে যেতো এবং জাতীয়তাবাদের জোয়ারে কবেই ভাটার টান শুরু হয়ে যেতো। এবিষয়ে প্রফেসর জুড যে দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ পেশ করেছেন তা দেখুন—
'কোন সম্প্রদায়ে যে চেতনাটি সার্বজনীনরূপে বিদ্যমান এবং যা খুব সহজেই জাগিয়ে ও চাগিয়ে তোলা যায় এবং যার মাধ্যমে গোটা সম্প্রদায়কে উদ্দীপ্ত করা যায় তা কিন্তু প্রেম-ভালোবাসার অনুভূতি নয়, বরং ভয়-ভীতি ও ক্রোধ-ঘৃণার অনুভূতি। ভালো-মন্দ যে কোন উদ্দেশ্যে যারা কোন সম্প্রদায়ের উপর শাসন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাতে সফল হওয়া সম্ভব নয়, যতক্ষণ না ভয় বা ঘৃণা করার মত কিছু তারা মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারবে, হোক তা কোন বস্তু বা ব্যক্তি, কিংবা কোন দল ও জনগোষ্ঠী। আমার কথাই ধরুন; আমি যদি (পরস্পর যুদ্ধরত) বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করতে চাই তাহলে আমার কর্তব্য হবে চাঁদ-মঙ্গল যে কোন গ্রহ-উপগ্রহ থেকে কোন কাল্পনিক শত্রু তাদের সামনে খাড়া করা, যাকে তারা ভয় বা ঘৃণা করবে (তারপর অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে সমস্ত আত্মকলহ ভুলে গিয়ে ঐ শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে)। এ দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে আর অবাক হওয়ার কিছু থাকে না যখন আমরা দেখি, সে যুগের জাতীয় সরকারগুলো প্রতিবেশী জাতির সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে ভীতি ও ঘৃণার আবেগের উপর নির্ভরশীল ছিলো এবং শাসকশ্রেণীর কাছে এটাই ছিলো শাসন ও নেতৃত্বের রক্ষাকবচ এবং এটাই ছিলো জাতীয় ঐক্য-চেতনার বুনিয়াদ।'¹

জাতিগত হানাহানি ও সঙ্ঘাত নিরসনের ইসলামী সমাধান

আজকের বিশ্বে এই যে জাতিগত হানাহানি ও সঙ্ঘর্ষ এবং অর্থ ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত তা থেকে মানবজাতির উদ্ধারের জন্য প্রফেসর জুড যে সমাধান দিয়েছেন তা খুবই যুক্তিপূর্ণ ও বোধগম্য। এটা অবশ্যই স্বতঃসিদ্ধ সত্য যে, বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত কখনো বন্ধ হবে না যদি না তা অন্যখাতে প্রবাহিত করার ব্যবস্থা হয়। এজন্য কোন বহিঃশত্রুকে তাদের সামনে আনতে হবে যার প্রতি তাদের সবার থাকবে প্রচণ্ড ভয়-ভীতি, ক্রোধ-আক্রোশ ও ঘৃণা-বিদ্বেষ, আর ঐ সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে তারা পরস্পরের প্রতি বাড়িয়ে দেবে সহযোগিতার হাত এবং পোষণ করবে সহানুভূতি ও সহমর্মিতা। তবে এজন্য, মিস্টার জুড যেমন বলেছেন, কল্পনা ও উদ্ভাবনা শক্তির প্রয়োজন নেই এবং চাঁদ-মঙ্গল থেকে শত্রু খুঁজে আনার দরকার নেই। কারণ কোরআনের ভাষায়—
أنى لهم التناوش من مكان بعيد
'কীভাবে সম্ভব হবে তাদের জন্য অত দূর থেকে লড়াই করা।'

তাই আল্লাহর মনোনীত আসমানী ধর্ম ইসলাম সমগ্র মানবজাতিকে সতর্ক করে দিয়ে ঘোষণা করেছে, আদম-সন্তানের এই সাধারণ শত্রু অন্যখানে, অন্য কোন গ্রহে নয়, বরং এই পৃথিবীতেই রয়েছে। সুতরাং আদম-সন্তানের কর্তব্য হলো ভয় ও ঘৃণা এবং জোশ ও জযবা, যাই বলো, এই সাধারণ শত্রুর প্রতি নিবদ্ধ করা এবং তাকেই ঘায়েল করার জন্য ভাষা, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা। কোরআনের ভাষায়—
يَتَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُم بِاللَّهِ الْغَرُورُ إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوا إِنَّمَا يَدْعُوا حِزْبَهُ لِيَكُونُوا مِنْ أَصْحَابِ السَّعِيرِ
হে লোকসকল, নিঃসন্দেহে আল্লাহর ওয়াদা চিরসত্য, সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদের ধোকায় না ফেলে, আর ঐ প্রতারক যেন আল্লাহর বিষয়ে তোমাদের প্রতারিত না করে। শয়তান তোমাদের জন্য শত্রু, সুতরাং তাকে শত্রুরূপেই গ্রহণ করো। নিঃসন্দেহে শয়তান তার দলকে ডাকে যাতে তারা জাহান্নামী হয়। (ফাতির, ৩৫: ৬)
يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا ادْخُلُوا فِي السَّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা শান্তির ধর্মে প্রবেশ করো পরিপূর্ণরূপে, আর তোমরা শয়তানের পথে চলো না। নিঃসন্দেহে সে তোমাদের 'খোলা দুশমন'।' (বাকারাহ, ২: ২০৮)

এ কারণেই ইসলাম গোটা মানবজাতিকে শুধু দু'ভাগে ভাগ করেছে; হক ও সত্যের অনুসারী এবং মিথ্যা ও বাতিলের পূজারী; এককথায় আল্লাহর দল ও শয়তানের দল। তারপর আল্লাহর দলের প্রতি ইসলামের উদাত্ত আহ্বান হলো শয়তানি দলের বিরুদ্ধে জিহাদ ও লড়াই করা। কেননা তারা যমীনে শুধু ফিতনা-ফাসাদ, অনাচার-পাপাচার ছড়ায়, আর সত্য ও সুন্দর এবং ন্যায় ও কল্যাণকে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত করতে চায়। তাই তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে, দেশ ও জাতীয়তা এবং ভাষা ও গোত্রপরিচয় তাদের যাই হোক। ঘৃণা-বিদ্বেষ ও লড়াই-যুদ্ধের বুনিয়াদ ইসলামের দৃষ্টিতে ভূগোলের সীমারেখা যেমন নয় তেমনি নয় ভাষা ও বর্ণের ব্যবধান, বরং একমাত্র বুনিয়াদ হলো আকীদা ও বিশ্বাস, নীতি ও নৈতিকতা, মানবতার কল্যাণ-অকল্যাণ এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও বিদ্রোহ। কোরআনের ঘোষণা—
الَّذِينَ ءَامَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا
'যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে, আর যারা কুফুরি করেছে তারা লড়াই করে তাগূতের পথে। সুতরাং তোমরা শয়তানের দোসরদের বিরুদ্ধে লড়াই করো। নিঃসন্দেহে শয়তানের চক্রান্ত অতি দুর্বল।' (নিসা, ৪: ৭৬)

এই যে শয়তান ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে লড়াই, এর ফল ও পরিণাম কী? তাও আগাম জানিয়ে দিয়ে মানুষকে আল্লাহ আশ্বস্ত করেছেন—
أُوْلَبِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
ওরাই হলো আল্লাহর দল, আর শোনো, আল্লাহর দলই হবে সফলকাম। (মুজাদালাহ, ৫৮: ২২)
فَأَنسَهُمْ ذِكْرَ اللَّهِ أُوْلَبِكَ حِزْبُ الشَّيْطَانِ أَلَا إِنَّ اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ تِ الشَّيْطَانِ هُمُ الْخَسِرُونَ
শয়তান তাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছে, অনন্তর তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে। ওরাই হলো শয়তানের দল, আর শোনো, শয়তানের দলই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। (মুজাদালাহ, ৫৮: ১৯)

হাঁ, আল্লাহর নবী আল্লাহর জন্য জিহাদ ও যুদ্ধ করেছেন, তবে তা আরব বা অনারব কোন জাতি ও জনগোষ্ঠীর স্বার্থের জন্য ছিলো না, বরং ছিলো মানবতার সামগ্রিক কল্যাণের জন্য। এই জিহাদ ও যুদ্ধ একদিকে যেমন শয়তানের বন্ধু ও মানবতার শত্রুদের দমন করেছে তেমনি অন্যদিকে বয়ে এনেছে মানবতার জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি এবং পারলৌকিক মুক্তি ও সৌভাগ্য। অথচ সভ্যতার ইতিহাস এর চেয়ে কম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর কখনো দেখেনি। ছোট একটি পরিসংখ্যান শুনুন। দ্বিতীয় থেকে নবম হিজরী পর্যন্ত সমস্ত গাযওয়া ও সারিয়ায় উভয় পক্ষে নিহতের সংখ্যা হচ্ছে একহাজার আঠারো। মুসলমান দু'শ ঊনষাট, আর কাফির হলো সাতশ ঊনষাট।¹ পক্ষান্তরে ইতিহাসে এর আগে ও পরে যত যুদ্ধ হয়েছে তার যে কোন একটির রক্তপাতের পরিমাণ দেখুন, আপনি হতবাক হবেন; হিংস্রতা ও নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা ও পাশবিকতা এবং অর্থসম্পদের ক্ষয়ক্ষতির কথা নাই বা বলা হলো।

ইসলামের ধর্মযুদ্ধ তো রক্তপাত বন্ধ করেছে এবং শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে; সর্বোপরি তা মানবতার জন্য কল্যাণ ও সৌভাগ্য বয়ে এনেছে। পক্ষান্তরে অন্যান্য যুদ্ধ মানবজাতিকে কী উপহার দিয়েছে? সঙ্ঘাতের পর সঙ্ঘাত, ধ্বংসের পর ধ্বংস ছাড়া আর কিছু? প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী বীর মিস্টার লয়েড জর্জ, যিনি তখন বৃটিশ মন্ত্রিসভার প্রধান ছিলেন এবং ১৯১৯ খৃ- অনুষ্ঠিত ভার্সাই সন্ধিচুক্তিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তার মন্তব্য শুনুন—
'প্রভু যিশু যদি ফিরে আসেন, খুব সামান্য সময়ই বেঁচে থাকতে পারবেন। কারণ তিনি দেখবেন, দু'হাজার বছর পরো মানুষ পাপাচারে ও খুনাখুনিতে লিপ্ত। মানুষই এখন মানুষের হিংস্রতায় বিপর্যস্ত। আমি তো বলতে চাই, ইতিহাসের বৃহত্তম যুদ্ধটি মানবজাতির রক্ত নিঃশেষ করে সেরেছে। ফসল ও গবাদিপশু ধ্বংস হওয়ার পর মানুষ এখন অনাহারে দুর্ভিক্ষে মারা যাচ্ছে। বলুন তো প্রভু যিশু পৃথিবীতে এসে কী দেখবেন? তিনি কি দেখবেন যে, মানুষ ভাই ও বন্ধুর মত পরস্পর করমর্দন করছে? নাকি দেখবেন, প্রথম যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের আয়োজন শুরু হয়েছে, আর মানুষ পাশবিকতা ও নিষ্ঠুরতার নতুন নতুন উপায় উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে?'¹

এই যে বিভিন্ন জাতি আজ হিংসা-হানাহানিতে লিপ্ত; এই যে তারা একের পর এক ভয়ঙ্কর সব যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, কেন? এই যে ভৌগোলিকতার শ্লোগান এবং জাতীয়তাবাদের জয়গান, মানুষ তাতে কেন এমন বিভোর? কারণ শুধু এই, দেশ, অঞ্চল, বর্ণ, ভাষা, গোত্র নির্বিশেষে মানুষ আজ তার প্রকৃত শত্রুকে ভুলে গিয়েছে। যা ছিলো মানবজাতির সম্মিলিত যুদ্ধক্ষেত্র তা থেকে সরে গিয়ে মানুষ নিজেই এখন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে আত্মঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। এটাই স্বাভাবিক; আগুন যদি গ্রাস করার মত কিছু না পায় তখন নিজেই নিজেকে গ্রাস করে। তাই তো সেই কবে জাহেলি যুগের কবি বলে গিয়েছেন—

وأحيانا على بكر أخينا إذا ما لم تجد إلا أخانا
'কখনো ঝাঁপিয়ে পড়ি আমাদের গোত্র-ভাই বকরের উপর, যখন ভাই ছাড়া কাউকে খুঁজে না পাই।'

পক্ষান্তরে মানুষ যদি তার আসল শত্রুকে চিনতে পারে এবং অদৃশ্য এই শত্রু, শক্তিতে ও কূটকৌশলে কতটা ভয়ঙ্কর তা বুঝতে পারে তাহলে মুহূর্তের মধ্যে তারা নিজেদের মধ্যে বিদ্যমান সব কৃত্রিম শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ ও লড়াই-বিবাদ ভুলে যাবে। এত দিনের সব শত্রু তখন হয়ে যাবে ভাই ও বন্ধু তখন তারা শিসাঢালা প্রাচীরের মত ঐ শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। যেমন আরবের প্রাচীন প্রবাদে বলা হয়েছে—
عند الحفيظة تذهب الأحقاد
'আত্মরক্ষার লড়াই হিংসা-বিদ্বেষ ভুলিয়ে দেয়।'

বিশ্বনবী মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নববী তারবিয়াতের মাধ্যমে এটাই করেছিলেন। মদীনায় আউস ও খাযরাজ গোত্রের যে দীর্ঘ ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ এবং জাযীরাতুল আরবে কাহতান ও আদনান গোত্রের যে আত্মবিনাশী সঙ্ঘাত-সঙ্ঘর্ষ, কীভাবে তা বন্ধ হলো? কারণ ছোট-বড় সমস্ত গোত্রকে তিনি কুফুর, জাহিলিয়াত ও শয়তানিয়াতের বিরুদ্ধে এক উম্মাহ ও অভিন্ন শিবিরে পরিণত করেছিলেন। তাদের তিনি এক আল্লাহর প্রতি ঈমানের দাওয়াত দিয়েছিলেন। পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও খুন-খারাবি ভুলে গিয়ে তারা হয়েছিলো ভাই ভাই। 'ইন্নামাল মু'মিনূনা ইখওয়াহ' এই বিশ্বাস ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা যেন এক নবজন্ম লাভ করেছিলেন। কারণ আল্লাহর নবী তাদের জন্য অতি ধুরন্ধর ও শক্তিধর একটি বহিঃশত্রু চিহ্নিত করেছিলেন, যাকে তারা ভয় ও ঘৃণা করবে এবং চিরশত্রুরূপে তার বিরুদ্ধে লড়াই করবে, আর সে শত্রু হলো শয়তান ও তার অনুচর, কোরআনের ভাষায় যারা হলো তাগুত এবং আউলিয়াউশ শয়তান। তিনি তাদের সামনে এ আসমানি ঘোষণা তুলে ধরেছেন—
الَّذِينَ ءَامَنُوا يُقَتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا
'যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে, আর যারা কুফুরি করেছে তারা লড়াই করে তাগূতের পথে। সুতরাং তোমরা শয়তানের দোসরদের বিরুদ্ধে লড়াই করো। নিঃসন্দেহে শয়তানের চক্রান্ত অতি দুর্বল।' (নিসা, ৪: ৭৬)

মুসলিম উম্মাহ যতদিন এই সাধারণ শত্রুর কথা মনে রেখেছে ততদিন তারা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও লড়াই-বিবাদ থেকে দূরে ছিলো। কিন্তু যখনই তারা এই সাধারণ শত্রুর কথা ভুলে গেলো এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করা ছেড়ে দিলো তখনই তাদের মধ্যে জাহেলিয়াতের শত্রুতা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো এবং তারা ভয়াবহ অন্তর্কলহ ও গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়লো। এভাবে এক ও অভিন্ন মুসলিম উম্মাহর ভিতরে সর্বগ্রাসী ফেতনার আগুন জ্বলে উঠলো, যা ইতিহাসের পাতায় আমাদের কলঙ্ক হিসাবে এখনো লেখা আছে।

ফেতনার আগুন কি এখন নিভেছে? না নিভেনি। এখনো মুসলিমের তলোয়ার মুসলিমের রক্তে রঞ্জিত হয়; এখনো আমাদের বারুদে আমাদের জনপদ দাউ দাউ জ্বলে, আর শয়তান হাসে হায়েনার হাসি! যে পথে মুক্তি এসেছিলো সেদিন জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে, সে পথেই আজ মুক্তি আসতে পারে ইউরোপের আধুনিক জাহেলিয়াতের দুর্যোগ থেকে।
لن يصلح آخر هذه الأمة إلا بما صلح أولها
এই উম্মাহর শুরুর সংশোধন যেভাবে হয়েছে, সেভাবেই শুধু হতে তার শেষ-ভাগের সংশোধন।

মানব-ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী চেতনা ও উন্মাদনা যখন যেখানে শিকড় গেড়েছে, পরস্পরের প্রতি ভয়ভীতি ও ঘৃণা-বিদ্বেষের মাধ্যমেই গেড়েছে। অতীত ও বর্তমানের প্রত্যেক জাতীয়তাবাদী সরকার ও সাম্রাজ্য ভয়-ভীতি ও ঘৃণা-বিদ্বেষ, এদু'টি অশুভ শক্তির উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। প্রাচীন ও আধুনিক যতগুলো ভয়াবহ যুদ্ধ সঙ্ঘটিত হয়েছে, যা সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বের প্রতি ছিলো অব্যাহত হুমকি, মূলত তা এদুই জিঘাংসা ও উন্মাদনারই মর্মন্তুদ পরিণতি।

তাওহীদ ও রিসালাতের দাওয়াত এবং মানবতার ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের আহ্বান নিয়ে যখন ইসলামের আবির্ভাব হলো তখন এই অভিশপ্ত সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদকে জাহিলিয়াত বলে ঘোষণা করলো এবং ঐসব যুদ্ধ-বিগ্রহ ও খুন-খারাবিকে হারাম ঘোষণা করলো যার ভিত্তি হচ্ছে নিছক সম্প্রদায়প্রীতি ও জাত্যাভিমান; যেখানে নীতি ও ন্যায়নীতির চিন্তা নেই, সততা ও সুবিচারের প্রশ্ন নেই; আছে শুধু আপন সম্প্রদায়ের স্তুতি-বন্দনা এবং অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি ভীতি ও ঘৃণা। আল্লাহর নবী সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করলেন—
ليس منا من دعا إلى عصبية، وليس منا من قاتল على عصبية، وليس منا من مات على عصبية
যারা সাম্প্রদায়িকতার ডাক দেবে তারা আমাদের দলভুক্ত নয় এবং যারা সাম্প্রদায়িকতার উপর লড়াই করবে তারা আমাদের দলভুক্ত নয় এবং যারা সাম্প্রদায়িকতার উপর মারা যাবে তারা আমাদের দলভুক্ত নয়।¹

জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার যুদ্ধে মৃত্যুকে ইসলাম জাহিলিয়াতের মৃত্যু বলে ঘোষণা করেছে, যার পরিণাম হলো চিরস্থায়ী জাহান্নাম। হাদীছ শরীফে ইরশাদ হয়েছে—
من قاتل تحت راية عمية يغضب بعصبية أو يدعو إلى عصبية أو ينصر جاهلية
অন্ধ ও অন্ধকার পতাকার নীচে, সাম্প্রদায়িকতার উন্মাদনায় একত্র হয়ে, কিংবা সাম্প্রদায়িকতার ডাক দিতে গিয়ে, কিংবা সাম্প্রদায়িকতাকে সমর্থন দিতে গিয়ে যে লড়াই করবে এবং নিহত হবে, তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু (অন্য বর্ণনায় 'সে আমার উম্মতভুক্তই নয়।')¹

কিন্তু আফসোস, ইসলামি উম্মাহর নবী যে মহাফেতনা সম্পর্কে এত কঠিন সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেন তা ভুলে গিয়ে শত্রুর কূটচক্রান্তে উম্মাহ সেই তাতেই লিপ্ত হয়ে পড়লো। তাওহীদ ও রিসালাতের আকীদা-বিশ্বাস এবং উন্মুওয়াত ও ভ্রাতৃত্বের জাযবা-চেতনার উপর প্রতিষ্ঠিত এক ও অভিন্ন মুসলিম উম্মাহ আজ শতধা বিভক্ত এবং প্রতিটি খণ্ড শত্রুর একেকটি সহজ লোকমায় পরিণত, যেমন আল্লাহর নবী বলেছেন—
يوشك الأمم أن تداعى عليكم كما تداعى الأكلة إلى قصعتها، فقال قائل : ومن قلة نحن يومئذ؟ قال : بل أنتم يومئذ كثير، ولكنكم غثاء كغثاء السيل، ولينز عن الله من صدور عدوكم المهابة منكم، وليقذفن الله في قلوبكم الوهن، فقال قائل : يا رسول الله، وما الوهن؟ قال : حب الدنيا وكراهية الموت
খুব দূরে নয় যে, বিভিন্ন জাতি তোমাদের বিরুদ্ধে ডাকাডাকি করবে, যেমন একে অন্যকে ডেকে আনে দস্তরখানে। একজন জিজ্ঞাসা করলেন, (এমন হবে কি) তখন আমাদের সংখ্যাল্পতার কারণে? তিনি বললেন, বরং তোমরা সেদিন (সংখ্যায়) অনেক হবে, কিন্তু তোমরা হবে ঢলে ভেসে আসা খড়কুটোর মত। আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের অন্তর থেকে তোমাদের প্রতি ভীতি তুলে নেবেন এবং অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের অন্তরে 'ওয়াহন' প্রক্ষেপণ করবেন। একজন জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, ওয়াহন কী? তিনি বললেন, দুনিয়ার মোহ এবং মৃত্যুর অনিহা।¹

জাতীয়তাবাদের পূজারীদের কর্মকৌশল

জাতীয়তাবাদের পূজারীরা তাদের লক্ষ্য অর্জনে যে কৌশল গ্রহণ করে তা এই যে, প্রথমে তারা ক্ষুদ্র ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর সামনে জাতীয়তাবাদের আলোঝলমল রূপ তুলে ধরে এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য ও সভ্যতা-সংস্কৃতির গুণগানে এবং অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অতিবন্দনায় তাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে তোলে। ফলে প্রতিটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী জাতীয়তাবাদের নেশায় এমনই বুঁদ হয়ে থাকে এবং জাতীয় ঐতিহ্যের মিথ্যা অহমিকায় এতই আত্মহারা হয়ে পড়ে যে, তারাই যেন শ্রেষ্ঠ, তারাই যেন একমাত্র। ফলে বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা নিজেদের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্কীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এভাবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সঙ্ঘাত-সঙ্ঘর্ষ ও যুদ্ধবিগ্রহ ছড়িয়ে পড়ে এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল জনগোষ্ঠী শক্তিশালী জনগোষ্ঠীর আগ্রাসনের শিকার হয়। শক্তির অহমিকায় বিজয়ী জনগোষ্ঠী তখন এমনই বেশামাল হয়ে পড়ে যে, বড় শক্তির সঙ্গেও সঙ্ঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, কিংবা বড় শক্তি যে কোন অজুহাতে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফল এই দাঁড়ায় যে, তারা বড় শক্তির নরম লোকমায় পরিণত হয়, আর বিচ্ছিন্নতার কারণে কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে না, বরং দূর থেকে তামাশা দেখে, খুব বেশী হলে কিছু 'ঠোঁট-সেবা' প্রদান করে। এমনকি যারা জাতীয়তাবাদের ফানুস দেখিয়েছিলো দুঃসময়ে তারাও তাদের পরিত্যাগ করে। কোরআনের ভাষায়—
مِنكَ إِنِّي كَمَثَلِ الشَّيْطَانِ إِذْ قَالَ لِلْإِنسَانِ اكْفُرْ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّي بَرِىءٌ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبِّ الْعَالَمِينَ
শয়তানের মত, যে মানুষকে বলে কুফুরি করো। যখন মানুষ কুফুরি করে তখন সে বলে ওঠে, তোমার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমি মুক্ত। আমি তো রাব্বুল আলামীন আল্লাহকে ভয় করি। (আল-হাশর, ৫৯: ১৬)

দুর্বল জনগোষ্ঠী জাতীয়তাবাদের প্রাচীর সৃষ্টি করে এবং সারা বিশ্ব থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ভাবে, তারা আরো শক্তিশালী ও নিরাপদ হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত সত্য এই যে, এভাবে তারা বৃহৎ শক্তিবর্গের আগ্রাসন ডেকে আনে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে মধ্য ইউরোপের ক্ষুদ্র ও দুর্বল দেশগুলোর ভাগ্যে এটাই ঘটেছিলো। কিন্তু হায় আফসোস, ইসলামী দেশগুলো, যাদের হাতে রয়েছে বিশ্ব-দাওয়াতের পতাকা এবং এমন অফুরন্ত শক্তি যে, যদি তা কাজে লাগানোর যোগ্যতা থাকে তাহলে গোটা ইউরোপ যাবতীয় বল ও লোকবলসহ তাদের পদানত হতে বাধ্য। কারণ তাদের শক্তি ইউরোপের জাতীয়তাবাদ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দর্শনের চেয়ে অনেক বেশী। কিন্তু ইসলামি ভ্রাতৃত্বের পরিবর্তে তাদেরও ঝোঁক এখন সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদ। অথচ অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে ইউরোপীয় দেশ-গুলোর চেয়ে তারা যথেষ্ট পিছিয়ে। সুতরাং এ আশা করা একেবারেই বাতুলতা যে, জাতীয়তাবাদের দুর্গে বাস করে মুসলিম দেশগুলো খুব বেশী দিন কোন বিপদের মোকাবেলা করতে পারবে।

পক্ষান্তরে জাতীয়তাবাদের পূজারী বৃহৎ শক্তির দেশগুলো মনে করে, যে কোন মূল্যে-বিভিন্ন মহাদেশে বড় বড় ভূখণ্ডের উপর তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে হবে এবং বিশাল-বিস্তৃত উপনিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে দুর্বল জাতি ও জনগোষ্ঠীর উপর প্রভুত্ব এবং তাদের সম্পদের উপর দখলস্বত্ব কায়েম করা যায়। প্রতিবেশী দেশ ও প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির উপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য তারা একদিকে যেমন অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি অর্জন করে, তেমনি অন্য-দিকে ভাষা, বর্ণ ও ভূগোলভিত্তিক জাতীয় অহমিকা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। জাতিকে তারা এ উন্মাদনায় বিভোর করে রাখে যে, তাদের ভাষা ও সাহিত্য এবং ইতিহাস ও সভ্যতাই হলো শ্রেষ্ঠ গৌরবের অধিকারী; পক্ষান্তরে দূর ও নিকটের অন্যান্য জাতি ও জনগোষ্ঠীর কাছে গর্ব করার মত কোন সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্য নেই। নিজেদের জাতীয় শক্তি ও শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য নির্দ্বিধায় হিংস্র থেকে হিংস্র এবং নিষ্ঠুর থেকে নিষ্ঠুর যে কোন কাজ তারা করতে পারে। তুচ্ছাতিতুচ্ছ স্বার্থের জন্য অন্যজাতির অধিকার-মর্যাদা ভুলুণ্ঠিত করতে, এমনকি ব্যাপক গণহত্যা চালাতেও তাদের কোন দ্বিধা নেই। এর পেছনে কোন নৈতিক বা মানবিক উদ্দেশ্য থাকে না, থাকে শুধু তাদের ভাষায় 'জাতীয় গৌরব'।

এধরনের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নৈতিক, চারিত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধ যতই নিকৃষ্ট হোক, মানুষ ও মানবতার প্রতি তাদের আচরণ যত জঘন্য ও হিংস্রতাপূর্ণ হোক জাতীয়তাবাদের দৃষ্টিতে সেই দেশ, জাতি ও তাদের কর্ণধাররাই হলো প্রশংসা ও বন্দনার যোগ্য। এই জাতীয় গৌরবের বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রফেসর জুড বলেন—
'জাতীয় মর্যাদা ও গৌরবের একমাত্র অর্থ হলো এমন শক্তির অধিকারী হওয়া যাতে প্রয়োজনে নিজের ইচ্ছা ও চাহিদা অন্য জাতির উপর চাপিয়ে দেয়া সম্ভব হয়। তথাকথিত এই জাতীয় গৌরবই হচ্ছে জাতীয়তাবাদের পূজারীদের একমাত্র আরাধ্য। এর অসারতা প্রমাণের জন্য এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে, এটা নৈতিক ও চারিত্রিক মহত্বের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। স্বার্থ ত্যাগ করে শুধু ন্যায় ও সত্য অনুসরণ করা, কথা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং ক্ষুদ্র ও দুর্বল জাতির সঙ্গে মানবিক আচরণ করা, জাতীয়তাবাদের দৃষ্টিতে মর্যাদা ও গৌরবের কোন বিষয় নয়। মিস্টার বোলডন-এর মতে মর্যাদা মানে এমন শক্তি যা দ্বারা জাতি গর্ব ও গৌরব ছিনিয়ে আনতে পারে এবং অন্যান্য জাতিকে তটস্থ রাখতে পারে। আর বলাবাহুল্য, এমন শক্তি নির্ভর করে গোলা ও বোমার উপর এবং সেই সাহসী ও দেশপ্রেমী সৈনিকের উপর যারা যে কোন জনপদে নির্দ্বিধায় গোলা ও বোমা নিক্ষেপ করতে পারে। মোটকথা, কোন জাতি ও জনগোষ্ঠীর মর্যাদা ঐসব নীতি ও নৈতিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত যা কোন ব্যক্তির জন্য মর্যাদার বিষয়। সুতরাং আমার মতে কোন জাতি ও জাতীয় নেতা যত বেশী এ ধরনের মর্যাদার অধিকারী হবে, আসলে সে তত বেশী বর্বর ও অসভ্য হবে। ধোকা, প্রতারণা ও শোষণ-নিপীড়ন দ্বারা অর্জিত মর্যাদা না ব্যক্তির জন্য গৌরবের, না জাতির জন্য।'¹

অন্যস্থানে তিনি বলেন, 'লালসার চেয়ে দম্ভই বৃটেনের শাসক শ্রেনীতে সেই নীতি ও কর্মপন্থা অনুসরণে বাধ্য করছে যা তাদের তথাকথিত শান্তি, সন্ধি ও সমঝোতা-প্রেমের সঙ্গে খাপ খায় না। কাউকে বলুন, বৃটিশ-সিংহাসনের কাছে আবেদন জানাতে, যে বিশাল সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না, তা থেকে এক ইঞ্চি ভূমি ছেড়ে দিক, এমন ভূমি যা সবচে' দুর্ভিক্ষপীড়িত; দেখবেন, ইংলেন্ডের রক্ষণশীল বীর পুরুষেরা ক্ষোভে ক্রোধে কেমন জ্বলে ওঠে এবং জগত তোলপাড় করে ফেলে! দেখবেন, উদারপন্থী বৃটিশ সংবাদপত্র কেমন গযবে ফেটে পড়ে! তাহলে বোঝা গেলো, এরা শুধু লোভী নয়, অহঙ্কারী ও হঠকারীও বটে।'¹

সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা

জাতীয়তাবাদের পূজারী বিভিন্ন শক্তি যখন সাম্রাজ্য ও উপনিবেশ বিস্তারের নির্লজ্জ প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে তখন মানবজাতির দুর্ভোগ আরো চরমে পৌঁছে যায়। কারণ কোন শক্তি যখন আগ্রাসন চালিয়ে সমৃদ্ধ কোন জনপদ দখল করে নেয়, প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি তখন চুপচাপ বসে থাকে না, বরং অগ্রবর্তী শক্তিকে হটিয়ে পাল্টা দখল প্রতিষ্ঠায় উঠে পড়ে লেগে যায়। কারণ সম্পদ লুণ্ঠন ও পণ্য-সামগ্রীর বাজার সৃষ্টির জন্য তারও উপনিবেশ চাই। তাকে তো যে কোন মূল্যে একচ্ছত্র সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সর্বোচ্চ শিখরে জাতীয় গৌরবের পতাকা উড্ডীন করতে হবে।

জাতীয়তাবাদ এক পৃথিবীতে দুই শক্তির অবস্থান মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে দখলদার শক্তিও দখল ছাড়তে রাজি নয়। এভাবে দেশে দেশে ও জাতিতে জাতিতে উপনিবেশ ও সাম্রাজ্য বিস্তারের লড়াই শুরু হয়ে যায়। তাতে বিপুল সম্পদ ধ্বংস হয় এবং দু'পক্ষেই লোকক্ষয় ঘটে প্রচুর। তবে ধ্বংসযজ্ঞের আসল ঝড় বয়ে যায় সেই জনপদ ও জনগোষ্ঠীর উপর, দুর্ভাগ্যক্রমে যাদের ভূগর্ভে লুকিয়ে আছে বিপুল সম্পদভাণ্ডার, কিন্তু নেই আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয় শক্তি ও অস্ত্রসম্ভার। তবে পরিহাসের বিষয়, এ-সবই সঙ্ঘটিত হয় মানবতা, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার নামে এবং দুর্বল জাতিকে সাহায্য করার নামে।¹

উভয় পক্ষেরই দাবী, তাদের যুদ্ধ নিজেদের জন্য নয়, বরং দুর্বল জাতিকে শাসন ও শোষণ থেকে রক্ষা বা উদ্ধার করার জন্য। তবে ভিতরে-বাইরে অনেকেই তাদের সাধুচিন্তা ও সদিচ্ছা সম্পর্কে প্রবলভাবে সন্দিহান। প্রফেসর জুড বলেন—
'ইংরেজ ভুলে যায়, বা ভুলে যাওয়ার ভান করে যে, সমস্যা ও সঙ্কটের মূল শিকড় কোথায়? কী কী কারণে সঙ্ঘাত-সঙ্ঘর্ষ এবং শোষণ ও বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। ভুলে যায়, বা ভুলে যাওয়ার ভান করে যে, জাপান ও অন্যান্য জাতির ঘৃণা, বিদ্বেষ ও ক্রোধের উৎস কী? তাদের বরং দাবী হলো, ইংরেজ খুবই শান্তিপ্রিয় জাতি, জাপানীরাই বরং পররাজ্যলোভী যুদ্ধোন্মাদ। তাদের দাবী হয়ত ঠিক, ইংরেজ নির্লোভ ও শান্তিপ্রিয় জাতি, তবে সে ঐ লুণ্ঠনকারীর মত যে এখন লুণ্ঠন-পেশা ছেড়ে সাধু সেজেছে। কারণ লুণ্ঠিত সম্পদ ইতিমধ্যেই তাকে নিরঙ্কুশ প্রভাব ও প্রতাপ এবং গৌরব ও মর্যাদায় ভূষিত করেছে। সুতরাং শান্তিরক্ষার তাগিদে নব্যলুণ্ঠকদের বিরুদ্ধে সে সংহারমূর্তি ধারণ করতেই পারে। অর্থাৎ সাবেক লুণ্ঠক ও বর্তমানের সাধু ব্যক্তিটি তাদেরকে যুদ্ধবাজ বলছে যারা শোষণে ও লুণ্ঠিত সম্পদে ভাগ বসাতে চায়।'¹

আগ্রাসন ও রাজ্যদখলের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া ও পিছিয়ে পড়া, কিন্তু জাতীয়তাবাদের উন্মাদনায় একই রকম উন্মাদ শক্তিগুলোর মধ্যে যত যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে ও হচ্ছে তার বীভৎসতা ও ধ্বংসলীলা তো আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে, সুতরাং তফসীল করে বলার প্রয়োজন নেই; শুধু বলতে চাই, এগুলোকে ঐসব যুদ্ধের সঙ্গে কিছুতেই তুলনা করা উচিত নয় যার উদ্দেশ্য ছিলো যালিমকে দমন এবং মযলূমকে রক্ষা; যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন—
وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَنَهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ ۚ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
যদি মুমিনদের দু'টি দল পরস্পর সঙ্ঘর্ষে লিপ্ত হয় তবে তাদের মধ্যে সমঝোতা করে দাও। আর যদি একদল অপর দলের বিরুদ্ধে সীমালঙ্ঘন করে তাহলে যারা সীমালঙ্ঘন করেছে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো যেন তারা আল্লাহর আদেশের কাছে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে তাহলে উভয়ের মধ্যে ইনসাফের সঙ্গে সমঝোতা করে দাও, আর সুবিচার করো। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলা সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন। (আলহুজুরাত, ৪৯ : ৯)

কারণ জাতীয়তাবাদের যুদ্ধ হচ্ছে রাজ্যদখল, সম্পদ লুণ্ঠন এবং জাতীয় অহমিকা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের উদ্দেশ্যে। এগুলো অবশ্যই বিলুপ্ত জাতিপুঞ্জ ও বর্তমান জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানেই ঘটে থাকে, তবে সেটা শুধু আগ্রাসন, লুণ্ঠন, শোষণ ও নিধনযজ্ঞকে আইনগত বৈধতা দেয়ার জন্য। বস্তুত (মরহুম) জাতিপুঞ্জ বলুন, কিংবা (বর্তমান) জাতিসঙ্ঘ, তাদের নিষেধ-নির্দেশ ও প্রস্তাব অবনত মস্তকে মেনে নেয় শুধু দুর্বল পক্ষ। আগ্রাসী শক্তির উপর কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার ক্ষমতা আগেও ছিলো না, এখনো নেই, আর তা এমনই জ্বলন্ত সত্য যা কোন অন্ধকেও বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। ইংরেজ প্রফেসর জুড সত্যের অনুরোধ রক্ষা করে তাই বলেছেন—
'জাতিপুঞ্জ নামের বিশ্বপুলিশি সংস্থাটির তত্ত্বাবধানে যে যুদ্ধই হয় তা ন্যায়, সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য, কিংবা অত্যাচারী ও সীমালঙ্ঘনকারীকে প্রতিহত করার জন্য নয়। এগুলো আসলে শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই। একদলের লক্ষ্য, যে কোন মূল্যে বিশ্বের সম্পদভাণ্ডারের সর্বোচ্চ পরিমাণের উপর দখল বজায় রাখা; অন্যপক্ষের উদ্দেশ্য হলো যে কোন উপায়ে তাতে ভাগ বসানো। এসব যুদ্ধ অতীতের বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী জাতির মধ্যকার যুদ্ধের চেয়ে ভিন্ন কিছু ছিলো না, ছিলো শুধু নামের ভিন্নতা। পক্ষান্তরে এসকল যুদ্ধের পক্ষে সাফাই গেয়ে যা কিছু বলা হয়, যেমন গণতন্ত্র রক্ষা, ফ্যাসিবাদ প্রতিহত করা, বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করা, ইত্যাদি, এগুলো প্রকৃতপক্ষে মুখের মুখোশ ছাড়া আর কিছু নয়।'¹

পথ প্রদর্শন, না সম্পদশোষণ?

পৃথিবীর সকল ধর্মহীন সরকার চরিত্রগত দিক থেকে মূলত একটি উন্নত, সুশৃঙ্খল ও সুরক্ষিত বাণিজ্যকেন্দ্র ছাড়া আর কিছু নয়। নীতি ও লক্ষ্যের দিক থেকে এসব সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় প্রজা-শাসন ও জনকল্যাণের জন্য নয়, বরং প্রজাশোষণ ও গণলুণ্ঠনের জন্য। শুরু থেকেই তাদের কাছে নীতি ও নৈতিকতার কোন বার্তা থাকে না এবং থাকে না সংস্কার ও সংশোধনের সাধারণ কোন উদ্দেশ্য; দেশ ও জাতির আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি, মানুষের হিদায়াত ও আত্মশুদ্ধি এবং মানবতার প্রকৃত সেবা ও কল্যাণচিন্তা তো অনেক পরের কথা। উদ্দেশ্যগত কারণে স্বভাবতই তাদের মন ও মনোযোগ সম্পূর্ণরূপে নিবদ্ধ থাকে আয়-আমদানির নতুন নতুন উৎস সন্ধান করা এবং সম্পদ বৃদ্ধি ও রাজকোষের সমৃদ্ধির নতুন নতুন পথ বের করার দিকে। এ উদ্দেশ্যে নির্দ্বিধায় তারা নীতি, নৈতিকতা, চরিত্র ও মূল্যবোধ বিসর্জন দিতে এবং মানবতা ও মানবিকতা পশ্চাতে ছুঁড়ে ফেলতে পারে। যেখানে সুনীতি ও অর্থনীতির সঙ্ঘাত দেখা দেয়, অর্থনীতিকেই তারা অগ্রাধিকার দেয়।

জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হয় নিছক বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক। নগ্নতা ও যৌনতাকেও তারা স্বচ্ছন্দে বৈধতা দান করে 'শিল্প ও পেশা' নাম দিয়ে। অবশ্য প্রয়োজনে কিছু বিধিনিষেধ আরোপিত হয়, যা অপরাধ ও অনৈতিকতাকে রোধ করে না, শুধু নির্দিষ্ট নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আবদ্ধ রাখে। দেহব্যবসা তাদের কাছে শুধু বৈধই নয়, বরং একটি আকর্ষণীয় রাজস্বখাতও বটে। রাষ্ট্র নিজেই ব্যাপক ও সুসংগঠিত সুদ-বাণিজ্যে জড়িত থাকে এবং বিভিন্ন ভদ্র-পোশাকি নামে জুয়াখেলার অনুমতি দেয়। নামের ভদ্রতা রক্ষার উদ্দেশ্য থাকে শুধু সরকারের স্বার্থ ও মুনাফা নিরাপদ করা। নৈতিকতাবিরোধী ও অসামাজিক কোন কার্যকলাপ রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ নয়, যদি তা 'অর্থপূর্ণ' হয়। মদের শুধু অনুমোদনই নয়, বরং এ ব্যবসাটি সরকার নিজের নিয়ন্ত্রণেই রেখে থাকে। এমনকি যারা মদ-জুয়ার বিরোধী, প্রয়োজনে তাদের উপর খড়গহস্ত হতেও পিছপা হয় না।

চলচ্চিত্রশিল্প, যা যাবতীয় সামাজিক অপরাধের উৎস এবং নগ্নতা ও যৌনতার প্রবণতা সৃষ্টির প্রধান কারণ বলে স্বীকৃত, এটা সরকারের এমনই আকর্ষণীয় রাজস্বখাত যে, এর নৈতিক ক্ষতির ভয়াবহতা জেনেও সরকার তা বন্ধ করার কথা কল্পনা করতে পারে না। রেডিও-টিভি চরিত্র সংশোধন ও নৈতিক শিক্ষার বাহন হওয়ার পরিবর্তে সস্তা বিনোদনের মাধ্যমরূপে কাজ করে এবং সর্বস্তরে সুস্থ বোধ ও রুচিবোধ সৃষ্টির পরিবর্তে রুচিবিকৃতিকেই আরো উস্কে দেয় এবং ভোগবাদী মানসিকতা সৃষ্টি করে। সংবাদপত্র ও প্রকাশনা তদারকের জন্য গঠিত সরকারী সংস্থা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তো প্রয়োজনেরও বেশী সংবেদনশীলতার পরিচয় দেয়। ফলে ন্যূনতম সমালোচনাও সহ্য করতে পারে না, অথচ মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বিষয়ে হয়ে থাকে অতি-উদার। দায়িত্বহীন লেখক-সাংবাদিক এবং অশ্লীলতার প্রচারক সাহিত্যিকের দল তুচ্ছ বৈষয়িক লাভের জন্য সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ও চরিত্রহীনতার মহামারি ছড়িয়ে দেয়, কিন্তু পানি মাথার উপর দিয়ে বয়ে গেলেও সরকার থাকে নির্লিপ্ত, বরং যথেষ্ট প্রশ্রয়ী। এদেরে হাতে চরিত্র ও নৈতিকতার সঙ্গে জাতির স্বাস্থ্যও হয়ে পড়ে অনিরাপদ। বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চরিত্র-বিধ্বংসী পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি এমন স্বাস্থ্যহানিকর সামগ্রীও বাজারজাত করে যা জাতির যুবসমাজের চরিত্র সমূলে শেষ করে দেয়। সরকার দেখেও দেখে না। কারণ, যারা দেখবে তারাই বাঁধা পড়ে যায় উৎকোচ-উপঢৌকনের জালে। তাছাড়া বিভিন্ন সরকারী খাত, জাতীয় প্রতিষ্ঠান ও ক্রীড়া-অঙ্গনের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে আইনের পাকড়াও থেকেই শুধু তারা বেঁচে থাকে না, বরং সামাজিক সম্মান ও প্রতিষ্ঠাও অর্জন করে থাকে। এসব হতে পারে শুধু এজন্য যে, আত্মিক ও নৈতিক কল্যাণের পরিবর্তে আর্থিক মুনাফাই হলো সরকারের মূল চিন্তা।

এমন রাজনীতি ও শাসননীতির অনিবার্য ফল দাঁড়ায় এই যে, চরিত্র ও নৈতিকতা দিন দিন নীচে নামতে থাকে এবং একসময় ভয়াবহ নৈতিক ব্যাধি ও অবক্ষয় দেখা দেয়। জাতির সর্বস্তরে মুনাফাবৃত্তি, সুবিধাবাদিতা ও বাণিজ্য-মানসিকতা ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যবসায়িক লুটতারাজের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সবার তখন লক্ষ্যই থাকে বৈধাবৈধ যে কোন উপায়ে অন্যের চেয়ে বেশী মুনাফা অর্জন করা। নীতি ও নৈতিকতা তখন সবার দৃষ্টিপথ থেকেই সরে যায়।

পক্ষান্তরে যে শাসনব্যবস্থা 'মিনহাজে নবুয়ত' বা নববী তরীকার উপর প্রতিষ্ঠিত, তার বুনিয়াদ ও ভিত্তি হয় তিজারাতের পরিবর্তে হিদায়াতের উপর। হযরত উমর বিন আব্দুল আযীয (রহ.)-এর খেলাফত ছিল মাত্র দু'বছরের, কিন্তু তা ছিল খেলাফতে রাশেদার অনুসরণে মিনহাজে নবুয়তের উপর প্রতিষ্ঠিত। একবার তাঁর কাছে অনুযোগ করা হলো, বর্তমান নীতি-ব্যবস্থায় বাইতুল মালের রাজস্ব আয় ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং রাষ্ট্র বিরাট আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তখন তিনি যে ঐতিহাসিক বাক্যটি বলেছিলেন এবং যুগে যুগে বিভিন্ন প্রয়োজনে মুসলিম উম্মাহ যা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছে তা হলো—
ويحك! إن محمدا صلى الله عليه وسلم بعث هاديا و لم يبعث جابيا
চুপ কর, মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো পথপ্রদর্শকরূপে প্রেরিত হয়েছেন, রাজস্ব আদায়কারীরূপে নন।

অত্যন্ত অলঙ্কারসমৃদ্ধ ও সুসংক্ষিপ্ত এই একটিমাত্র বাক্যের মধ্যেই মিনহাজে নবুয়তের উপর প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থা ও সরকারপদ্ধতির রূপ ও স্বরূপ সুস্পষ্ট-রূপে এসে গেছে। দ্বীনী হুকুমতের মূল লক্ষ্যই হলো ঈমান ও আখলাক। এখানে আগে দেখা হয়, কিসে মানুষের ঈমান ও বিশ্বাস সুদৃঢ় হবে এবং নৈতিক উন্নতি ও আখেরাতের কল্যাণ সাধিত হবে। রাজস্ববৃদ্ধি ও সম্পদসমৃদ্ধি এখানে মূল লক্ষ্য নয়, বরং আত্মিক ও নৈতিক উন্নতির পথে এবং সরকারপরিচালনার ক্ষেত্রে সহায়কমাত্র। এখানে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাজস্বনীতি, সবই হয় শরীয়তের অনুগত। তাই দ্বীনী ও আখলাকী মূলনীতিগুলো সর্বদা বিষয় ও বস্তুর উপর প্রাধান্য পায়।

এই হুকুমত তার শাসন-সীমানায় সুদ, জুয়া, মদ, ব্যভিচার, পাপাচার, নগ্নতা ও বেহায়াপনা এবং এর সর্বপ্রকার 'প্ররোচিকা' সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং ঐ সব আর্থিক লেনদেনকেও অপরাধ মনে করে যা ব্যক্তির জন্য উপকারী হলেও সমষ্টির জন্য ক্ষতিকর। তাই তা সে বন্ধ করে দেয়, যদিও তা বিরাট আর্থিক ক্ষতির কারণ হয় এবং সরকারী কোষাগার বিপুল রাজস্ব-আয় থেকে বঞ্চিত হয়। এই হুকুমত সংস্কার ও সংশোধনমূলক বিভিন্নমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করে এবং তা বাস্তবায়নে সর্বপ্রকারে সচেষ্ট হয়। তার দৃষ্টি শুধু মানুষের সাধারণ জীবনযাত্রার উপরই নিবদ্ধ থাকে না, বরং নৈতিকতা ও চিন্তা-চেতনার উপরও নিবদ্ধ থাকে। কারণ এটাই মানুষের জীবন ও কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং নৈতিকতার চিন্তা-চেতনার পরিশুদ্ধি ছাড়া কর্মের সংশোধন এবং অপরাধ ও দুষ্কৃতিরি মূলোৎপাটন কিছুতেই সম্ভব নয়। একারণেই ইসলামী হুকুমত সর্বপ্রথম ঐ সব বিষয়ের উপর বিধি-নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে যা সমাজকে ভোগ-বিলাস, প্রবৃত্তিপরায়ণতা, আইনলঙ্ঘন ও অপরাধ প্রবণতার দিকে নিয়ে যায়। তার দৃষ্টিতে তারাও বড় অপরাধী এবং দেশের শত্রু যারা সমাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ-ভাবে নগ্নতা, বেহায়াপনা ও পাপপ্রবণতার পরিবেশ তৈরী করে, হোক তারা লেখক-বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবী, কিংবা ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও পেশাজীবী।

এই হুকুমত শান্তি-শৃঙ্খলা, সুবিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেমন সচেষ্ট তেমনি আত্মিক ও নৈতিক তত্ত্বাবধানের প্রতিও সমান যত্নবান। কেননা ইসলামী হুকুমতের যিনি প্রধান তার ভূমিকা শুধু পুলিশ ও চৌকিদারের নয়, একজন আদর্শ শিক্ষক ও আধ্যাত্মিক দীক্ষকেরও। পৃথিবীর কোন ভূখণ্ডে এই পদ্ধতির হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হলে তার অগ্রাধিকারমূলক কাজ কী হবে, তা পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে অগ্রবর্তী মুহাজিরদের সম্পর্কে কোরআনের এ ঘোষণায়—
الَّذِينَ إِن مَّكْنَهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَوٰةَ وَءَاتَوُا الزَّكٰوةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ
'(এই মযলুম মুসলমান) তারা, যাদেরকে যদি আমি ভূখণ্ডে ক্ষমতা দান করি, তাহলে তারা ছালাত কায়েম করবে এবং যাকাত আদায় করবে এবং অন্যায়কর্ম হতে বিরত রাখবে। আর আল্লাহরই হাতে সকল বিষয়ের পরিণতি।' (হজ্জ, ২২:৪১)

নৈতিকতা ও শিল্প-বাণিজ্যের বিরোধ

আজ সম্পদস্ফীতির সঙ্কটকালে, কিংবা লর্ড ম্যাকলের অর্থপূর্ণ ভাষায়, 'সম্ভাব্য দ্রুত সম্ভাব্য অধিক সম্পদ' এই দর্শনে বিশ্বাসী মানুষের ক্ষমতার যুগে সর্বত্র এক উন্মত্ত বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা চলছে; যার ফলে শিল্পকারখানা থেকে বিনোদন, প্রসাধন ও বিলাসসামগ্রী ঢলের মত শহরে, জনপদে এসে আছড়ে পড়ছে। রাজধানীর আলোঝলমল দোকানে শুধু নতুন ফ্যাশান ও নতুন ডিজাইন শোভা পায়। কিন্তু আজকের নতুনই হয়ে যায় কালকের সেকেলে। তার জায়গায় আসে আরো নতুন, কিংবা নামেমাত্র নতুন কিছু। শোভা ও সৌন্দর্যের এবং ফ্যাশান ও আধুনিকতার পরিবর্তন হতেই থাকে। এর পিছনে আসল রহস্য হলো পুঁজিপতি ও শিল্পপতিদের উন্মত্ত প্রতিযোগিতা ও লাগামহীন মুনাফালিপ্সা, যা সমাজের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ এবং মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন ও ক্রয়ক্ষমতা সম্পর্কে একেবারেই লা-পরোয়া। ফলে, এখন জীবনযাত্রার মান যেমন ক্রমউচ্চমুখী তেমনি তার ব্যয়ও ঊর্ধ্বমুখী।

জীবনের চাহিদা ও কাল্পনিক প্রয়োজন এমনই মাত্রাছাড়া যে, কোন আয়ই আর যথেষ্ট নয়। ফলে অল্পেতুষ্টি নামে একসময় যে একটি অর্থপূর্ণ শব্দ ছিলো তা এখন অর্থহীন হয়ে পড়েছে এবং হারিয়ে গেছে জীবনের স্বস্তি ও শান্তি। প্রত্যেকের সামনে এখন জীবনযাত্রার উচ্চতর স্তর এবং তা অর্জন করাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। সমাজ ও পরিবেশও এটাই দাবী করে এবং এ দাবী পূরণে যারা ব্যর্থ তাদের মর্যাদার অযোগ্য মনে করে। আরো মর্মান্তিক বিষয় এই যে, বৈধ-অবৈধ সর্বপ্রকার চেষ্টা-তদ্বির করে যখন সে ঐ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উপনীত হয় তখন দেখা যায়, জীবনের চাহিদা ও জীবনযাত্রার মান আরো উপরে উঠে গেছে। তাই জীবন এখন হয়ে পড়েছে এক অন্তহীন দৌড়ঝাঁপ ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার নামান্তর যা মানুষের কর্মশক্তিকে শুধু শুষে নেয়, কোন সুফল দেয় না। এর মনস্তাত্ত্বিক ফল এই দাঁড়িয়েছে যে, যে জীবন হতে পারতো স্বস্তি ও শান্তির, তাই হয়ে পড়েছে অস্থিরতা ও অশান্তির এবং যে পরিবার হতে পারতো দুনিয়ার জান্নাত, সেটাই হয়ে গেছে জাহান্নামের নমুনা, যেখানে জ্বলছে শুধু চাহিদার আগুন।

পক্ষান্তরে এর নৈতিক কুফল হয়েছে এই যে, সামাজিক সকল ঐতিহ্য ও নৈতিক মূল্যবোধ বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। হালাল-হারাম ও বৈধাবৈধ্যের ন্যূনতম সীমারেখাও মুছে গেছে। সীমাবদ্ধ আয় যেহেতু সীমাহীন চাহিদা পূরণে অক্ষম সেহেতু বিভিন্ন নামে ও ছদ্মনামে ঘুষ-উৎকোচ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ-জীবনে কী মহাবিপর্যয় নেমে আসতে পারে তা তো দিবালোকের মতই সুস্পষ্ট। এটা যেহেতু জীবনের বৈধ ও স্বাভাবিক চাহিদা-প্রয়োজনের ফল নয়, বরং অবাস্তব দাবী ও চাহিদার ফল সেহেতু দুর্নীতিদমনের শুধু আইনগত ব্যবস্থা দ্বারা পরিস্থিতির পরিবর্তন করা কিছুতেই সম্ভব নয়। এর জন্য আসল দায়ী হলো ঐ জীবনব্যবস্থা যা দীর্ঘ দিন থেকে আখলাকি হিদায়াত ও নৈতিক দিকনির্দেশনা থেকে এবং আখেরাতের শাস্তি-পুরস্কারের ধারণা থেকে বঞ্চিত। এর জন্য দায়ী ঐ বস্তুসর্বস্ব শিক্ষাব্যবস্থা যা মানুষের মধ্যে নৈতিক চেতনা ও বিবেকবোধ জাগ্রত করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। আর দায়ী ঐ শাসনব্যবস্থা যা আয় ও উৎপাদনের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখাকে তো কর্তব্য মনে করে, কিন্তু জীবনের বৈষয়িক চাহিদা ও আত্মিক প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলার তাগাদা অনুভব করে না।

কিন্তু প্রাচ্যের দেশ, জাতি ও জনপদ একসময় তো এমন ছিলো না। প্রাচ্য তো ছিলো প্রাচ্যের মত। প্রতিটি জনপদে মায়া ছিলো, মমতা ছিলো, একের প্রতি অন্যের দরদ-ব্যথা ছিলো। প্রাচ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ছিলো, কিন্তু মুনাফা-লিপ্সা ছিলো না। জীবনের প্রতি আকর্ষণ ছিলো, কিন্তু সীমাহীন চাহিদা ছিলো না, বরং ছিলো অল্পে তুষ্টির মহাসম্পদ। এমনকি এই সেদিনও নও মুসলিম মুহম্মদ আসাদ, তার দেখা দামেস্কের বিবরণ দিয়েছেন, দোকানদার তার খরিদ্দারকে বলছে, আমার যথেষ্ট বিক্রি হয়েছে, আপনি পাশের দোকান থেকে নিন, তার আজ প্রয়োজনীয় বিক্রিও হয়নি।

সবকিছু কীভাবে এমন তছনছ হয়ে গেলো! এজন্য একমাত্র দায়ী প্রাচ্যে উপনিবেশবাদী ইউরোপের আগ্রাসন এবং সম্পদ লুণ্ঠনের লোভে উপনিবেশ স্থাপন। এশিয়ায় চীনের সমগ্রজনগোষ্ঠীকে আফিমে আসক্ত করেছিলো এই ইউরোপীয়রা শুধু বাণিজ্যিক মুনাফার লোভে। তাহলে এরা করতে পারে না, এমন কী আছে পৃথিবীতে?! সুতরাং এটা খুবই স্বাভাবিক যে, এই শাসক ও শোষক জাতির শুধু সংস্পর্শের কারণে শাসিত ও শোষিত জাতিও নৈতিক অবক্ষয় ও আত্মিক অধঃপতনের শিকার হবে এবং তাদের মধ্যেও ঐসব রোগ-ব্যাধি দেখা দেবে, যা পাশ্চাত্য সমাজে পাশ্চাত্য সভ্যতা জন্ম দিয়েছে। এ তিক্ত সত্য তো তারা নিজেরাই এখন স্বীকার করছে এবং তা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজছে।

মুসলিম জনপদগুলোতে পাশ্চাত্যের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের পথ ধরে অবধারিতভাবে সভ্যতারও আগ্রাসন ঘটেছে। পাশ্চাত্য সভ্যতার যাবতীয় অনাচার, পাপাচার ও নষ্টাচারও মুসলিম জনপদগুলোতে বন্যার ঢলের মত ছড়িয়ে পড়েছে। সম্পদ পাচার হয়েছে এদিক থেকে ওদিকে, আর নৈতিক ও আত্মিক রোগ-ব্যাধি সংক্রমিত হয়েছে ওদিক থেকে এদিকে। এটাই ছিলো স্বাভাবিক। যে জাতি, যে সভ্যতা নিজ ভূমিতে নীতি ও নৈতিকতা, আত্মিকতা ও আধ্যাত্মিকতার পরিচর্যা করতে পারেনি, তাদের ছত্রচ্ছায়ায় কীভাবে বিজিত জাতি ও জনগোষ্ঠী আত্মিক ও নৈতিক উৎকর্ষ লাভ করতে পারে? চরিত্র ও নৈতিকতা, শুচিতা ও পবিত্রতা, এগুলো তো কখনোই তাদের চিন্তা-ভাবনারই বিষয় ছিলো না, বরং এগুলোর প্রয়োজনীয়তাও তারা বিশ্বাস করেনি এবং করে না। 'পাত্র থেকে তো তাই গড়িয়ে পড়বে, যা পাত্রে রয়েছে। দুধ-মধুর পাত্র থেকে দুধ-মধু, মদ ও শরাবের পাত্র থেকে মদ-শরাব। বিজয়ী শাসক ও শোষকদের নীতি ও পন্থা তো সর্বযুগে মানবতার হেদায়াত ও সংশোধনের প্রয়াসী আম্বিয়া কেরামের পথ ও পন্থা থেকে সবসময়ই ভিন্ন ছিলো। যে সত্য আল-কোরআন তুলে ধরেছে সাবার মালিকা বিলকীসের যবানিতে, তা এমন চিরসত্য যা স্থান ও কালের পরিবর্তনে পরিবর্তিত হয় না, তা তখন সাবার রাজ্যে যেমন সত্য ছিলো, এখন প্রাচ্যের মুসলিম জনপদেও একই রকম সত্য। আল-কোরআনের ভাষায়—
قَالَتْ إِنَّ الْمُلُوكَ إِذَا دَخَلُوا قَرْيَةً أَفْسَدُوهَا وَجَعَلُوا أَعِزَّةَ أَهْلِهَا أَذِلَّةٌ وَكَذَلِكَ يَفْعَلُونَ
রানী বললো, রাজা-বাদশাহ যখন কোন জনপদে ঢুকে পড়ে তাতে ফাসাদ সৃষ্টি করে, আর অভিজাত ও সম্ভ্রান্তদের লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করে। এখানেও তারা তাই করবে। (আন-নামল, ২৭: ৩৪)

টিকা:
১. lecky, history of european morals, london, 1869, vol,1, pp. 243
২. convocation adress of lord lothian at muslim university aligrah
৩. history of european morals, p. 243
৪. men muhadarat khalid adib alam alati alqataha fil jami'atil milliyati bidehli.
৫. men hawashi al-amir shakib arsalan ala "hazirul alam al-islami", d. q. j. 4 s. 247-248.
৬. hawashi hazirul al-alam al-islami 1. p. 268-269.
৭. diwan akhlaj tab' dar sadir bayrut, p. 26.
৮. guide to modern wickedness, p. 150.
৯. guide to modern wickedness, p. 153.
১০. ঐ, পৃ. ১৮০.
১১. guide to modern wickedness, p. 180.
১২. guide to modern wickedness, p. 191.
১৩. কাযী মুহম্মদ সোলায়মান মানছুরপুরী-রচিত 'সীরাতে রাহমাতুল-লিল আলামীন' থেকে গৃহীত পরিসংখ্যান।
১৪. লয়েড জর্জের ভার্সাই চুক্তি পরবর্তী মন্তব্য।
১৫. আত্মরক্ষার লড়াই ও সাম্প্রদায়িকতা হীনতা সম্পর্কিত প্রাচীন আরব্য প্রবাদ।
১৬. আবু দাউদ।
১৭. মুসলিম, নাসাঈ।
১৮. রওয়াহু আবু দাউদ ফী কিতাবিল মালাহিম ফী বাবি তাদা'ইল উমামি আলাল ইসলাম।
১৯. বিবিসিসহ ইহুদিনিয়ন্ত্রিত বিশ্বপ্রচারমাধ্যমের মুখ ও মুখোশ এতদিনেও যদি কেউ বুঝতে না পেরে থাকে, অন্তত সাম্প্রতিক কালে 'আরববসন্ত' নামে যে খেলা তারা খেলছে তাতে তো নির্বোধ শিশুরও সব বুঝতে পারার কথা। সজ্ঞানে সচেতনভাবে তারা মিথ্যা প্রচার করে, যখন উদ্দেশ্য সাধিত হয়ে যায়, সততা ও বস্তুনিষ্ঠতার মুখোশ পরার জন্য, খবরটি ভুল ছিলো বলে দুঃখ প্রকাশ করে। তাদের খবরের কারিশমায় এই তো সেদিন শাপলাচত্বরে হাজার মানুষের উপস্থিতি হয়ে গেলো লক্ষজনতার মহাসমাবেশ। পরে যথারীতি ক্ষমাপ্রার্থনা। মিশরে মুসলিম ভ্রাতৃসঙ্ঘের দশলক্ষ জনতার বিক্ষোভ তাদের চোখে পড়ে না, চোখে পড়ে সামরিক জান্তার পক্ষে হাজার মানুষের বিক্ষোভ, তারপরো বিশ্বপ্রচার মাধ্যম গণতন্ত্রের বন্ধু! (অনুবাদক)
২০. guide to modern wickedness, p. 180.
২১. guide to modern wickedness, p. 191.
২২. যো'আমাউল ইসলাহ ফীল আছরিল হাদীছ (আল্লামা কুর্দ আলী).
২৩. তানকীহাত, প্রবন্ধ 'যুগের ব্যাধিগ্রস্ত জাতিসমূহ', মাওলানা মওদূদী, পৃ. ২৪, ২৫, ২৬.

📘 মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো 📄 তৃতীয় পরিচ্ছেদ: আত্মহত্যার পথে ইউরোপ

📄 তৃতীয় পরিচ্ছেদ: আত্মহত্যার পথে ইউরোপ


আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের যুগ

ইতিহাসের বিভিন্ন যুগকে যদি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা দ্বারা চিহ্নিত করা যায় তাহলে আমরা অবশ্যই বলতে পারি, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও প্রায়ুক্তিক উদ্ভাবনের দিক থেকে আজকের যুগ হচ্ছে মানবজাতির ইতিহাসের বিশিষ্টতম যুগ এবং এ কারণে অতি সঙ্গতভাবেই একে আমরা আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের এবং তার ও বেতার যন্ত্রের যুগ বলতে পারি। আর তিক্ত হলেও সত্য, এ ক্ষেত্রে ইউরোপের নেতৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বও অনস্বীকার্য। ইউরোপের জ্ঞানী-বিজ্ঞানী, আবিষ্কারক ও উদ্ভাবকদের যোগ্যতা ও প্রতিভা যে অন্তত এখনকারের জন্য আমাদের ধরা-ছোঁয়ার ঊর্ধ্বে তাও অস্বীকার করার উপায় নেই।

তবে অতিউৎসাহীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আধুনিক ইউরোপের অগ্রগতির যতই স্তুতি-বন্দনা করুন এবং ইউরোপীয় প্রতিভার অবদানে যতই আমরা মুগ্ধ হই, এ সত্য আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যাবতীয় আবিষ্কার-উদ্ভাবন জীবনের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নয়, বরং নিছক উপায় ও মাধ্যম। সুতরাং নিজস্ব সত্তায় এগুলো ভালো-মন্দ কিছুই নয়। উপায় ও মাধ্যমের ভালো-মন্দ নির্ধারিত হয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মানদণ্ডে। সুতরাং বিচারে বসতে হলে আমাদের দেখতে হবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তা সৎ, সুন্দর ও কল্যাণপ্রসূ কি না?

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের জীবনে কী ভূমিকা পালন করে? এককথায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের অজ্ঞতা ও দুর্বলতা দূর করে; জগতের অজানা সব রহস্য উদ্ঘাটন করে; প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তি ও সম্পদ আয়ত্তে আনে এবং জীবনের গতিকে দ্রুততর ও সহজতর করে।

একসময় মানুষ পায়ে হেঁটে, তারপর ঘোড়ায় চড়ে পথ অতিক্রম করতো। কিন্তু তার চাই আরো গতি, আরো স্বস্তি। এক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এগিয়ে এসেছে তার সেবায়। তাই মানুষের আয়ত্তে এখন এমন বাহন ও যানবাহন এসে গেছে যা মানুষের দূরতম কল্পনায়ও ছিলো না। এখন দূরত্ব অতিক্রমের এই গতি ও স্বস্তিকে যদি মানবজাতির কল্যাণে ব্যবহার করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে তা আল্লাহর বিরাট নিয়ামত। যেমন ইরশাদ হয়েছে—
وَالْأَنْعَامَ خَلَقَهَا لَكُمْ فِيهَا دِفْءٌ وَمَنَافِعُ وَمِنْهَا تَأْكُلُونَ * وَلَكُمْ فِيهَا جمَالُ حِينَ تُرِيحُونَ وَحِينَ تَسْرَحُونَ وَتَحْمِلُ أَثْقَالَكُمْ إِلَى بَلَدٍ لَّمْ تَكُونُوا بَالِغِيهِ إِلَّا بِشِقِّ الْأَنفُسِ إِنَّ رَبَّكُمْ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ وَالْخَيْلَ وَالْبِغَالَ وَالْحَمِيرَ لِتَرْكَبُوهَا وَزِينَةً وَيَخْلُقُ مَا لَا تَعْلَمُونَ
'আর এসব পশু তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য, তাতে রয়েছে উষ্ণতা এবং বিভিন্ন উপকারিতা, আর কিছু পশুর গোশত তোমরা আহার করো। আর তাতে রয়েছে তোমাদের জন্য সৌন্দর্য, যখন তোমরা সন্ধ্যায় (সেগুলো চারণভূমি থেকে) ফেরত আনো এবং সকালে (চারণভূমির উদ্দেশ্যে) নিয়ে যাও। আর এই পশুগুলো তোমাদের বোঝা বহন করে নিয়ে যায় এমন সব শহরে যেখানে তোমরা পৌঁছতে পারতে না প্রাণান্ত কষ্ট ছাড়া। নিঃসন্দেহে তোমাদের প্রতিপালক অত্যন্ত স্নেহময়, করুণাময়। আর (তিনি সৃষ্টি করেছেন) ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা যেন তাতে তোমরা আরোহণ করতে পারো এবং শোভারূপে গ্রহণ করতে পারো। আর তিনি সৃষ্টি করবেন এমন কিছু যা তোমরা জানো না।' (আন-নাহল, ১৬:৫-৮)

দেখুন, আল্লাহ তা'আলা এখানে গতি ও স্বস্তির সফরকে মানুষের উপর তাঁর একান্ত দয়া ও অনুগ্রহ বলে উল্লেখ করেছেন। তারপর দেখুন, 'সৃষ্টি করবেন যা তোমরা জানো না' এই ছোট্ট একটি বাক্য যোগ করে কী আশ্চর্য প্রজ্ঞার সঙ্গে কী অপার সম্ভাবনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন! এমন অলৌকিকতা কি মানুষের কালামে কখনো সম্ভব!

আরো ইরশাদ হয়েছে—
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي ءَادَمَ وَحَمَلْتَهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْتَهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْتَهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلاً
'আর অতি অবশ্যই বনী আদমকে আমি মর্যাদা দান করেছি এবং তাকে স্থলে ও জলে 'বাহন' দান করেছি এবং তাকে রিযিক দান করেছি উত্তম বস্তু হতে এবং যে সকল মাখলুক আমি সৃষ্টি করেছি, তা থেকে অধিকাংশের উপর আমি তাকে অত্যন্ত শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।' (আল-ইসরা, ১৭:৭০)

অন্যত্র সোলায়মান আলাইহিস্-সালামের প্রতি অনুগ্রহের উল্লেখ-প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে—
وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيحَ غُدُوهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ
'আর সোলায়মানের জন্য আমি বাতাসকে অনুগত করেছিলাম, তার সকালের যাত্রা ছিলো এক মাসের পথ, আর সন্ধ্যার যাত্রা ছিলো এক মাসের পথ।' (সাবা, ৩৪-১২)

প্রকৃতির সমস্ত শক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যাবতীয় আবিষ্কার-উদ্ভাবন, যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হচ্ছে সে সম্পর্কেও একই কথা। এ বিষয়ে ইসলামের শিক্ষা খুবই সুস্পষ্ট। কারণ إني جاعل في الأرض خليفة বলে আদম ও বনী আদমকে আল্লাহ তা'আলা 'খলীফাতুল্লাহি ফিল আরদি'-এর মহামর্যাদা দান করেছেন। তারপর ঘোষণা করেছেন, তাঁর আদেশে বিশ্বজগতের সবকিছু মানবের সেবায় নিয়োজিত এবং প্রকৃতির সকল শক্তি ও সম্পদ মানুষের অনুগত। ইরশাদ হয়েছে—
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَأَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ وَسَخَّرَ لَكُمُ الْفُلْكَ لِتَجْرِيَ فِي الْبَحْرِ بِأَمْرِهِ، وَسَخَّرَ لَكُمُ الْأَنْهَرَ وَسَخَّرَ لَكُمُ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ دَابِبَيْنِ وَسَخَّرَ لَكُمُ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَاتَنكُم مِّن كُلِّ مَا سَأَلْتُمُوهُ وَإِن تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُصُوهَا إِنَّ الْإِنسَانَ لَظَلُومٌ كَفَّارٌ
'আল্লাহ ঐ মহান সত্তা যিনি আসমানসকল ও যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, অনন্তর তা দ্বারা ফলফলাদি হতে তোমাদের জন্য রিযিক বের করেছেন এবং অনুগত করেছেন তোমাদের জন্য জলযানকে, যেন চলে তা সমুদ্রে তাঁর আদেশে। আর অনুগত করেছেন তিনি তোমাদের জন্য নদ-নদী। আর অনুগত করেছেন তোমাদের জন্য সূর্য ও চাঁদ সদাসক্রিয় অবস্থায়। আর অনুগত করেছেন তোমাদের জন্য রাত ও দিন। আর দান করেছেন তিনি তোমাদের, ঐ সকল বস্তু হতে যা তোমরা তাঁর কাছে চেয়েছো। আর যদি তোমরা গণনা করো আল্লাহর নেয়ামত, তা শুমার করতে পারবে না নিঃসন্দেহে মানুষ বড় অবিচারী, বড় অকৃতজ্ঞ।' (ইবরাহীম, ১৪: ৩২-৩৪)

জগত-প্রকৃতির সকল শক্তি-সম্পদ মানুষ ব্যবহার করবে এটাই তো স্বাভাবিক। কারণ সবকিছু আল্লাহ মানুষেরই জন্য সৃষ্টি করেছেন। তবে একজন মুমিন, যে আল্লাহকে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করে, তার মধ্যে এবং অবিশ্বাসী ও অবাধ্য মানুষের মধ্যে চেতনাগত ও আচরণগত বিরাট পার্থক্য রয়েছে।

আপন অনুসারীর প্রতি ইসলামের হিদায়াত হলো, জগত-প্রকৃতির সকল শক্তি-সম্পদ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যাবতীয় উপায়-উপকরণ ব্যবহার করার সময় তার অন্তরে এ চেতনা যেন জাগ্রত থাকে যে, এগুলো আল্লাহর দান ও অনুগ্রহ। সে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হোক বা গাড়ীতে; জাহাজে আরোহণ করুক, বা উড়োজাহাজে, সে আল্লাহর নেয়ামত স্মরণ করবে এবং তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করবে, যিনি এগুলোকে তার অনুগত করে দিয়েছেন। বস্তুত তিনি যদি তাকে জ্ঞান, বুদ্ধি, যোগ্যতা ও প্রজ্ঞা দান না করতেন, এগুলোর অর্জন, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালন তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হতো না। দেখুন আল-কোরআনের কত মমতাপূর্ণ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ! ইরশাদ হয়েছে—
وَالَّذِي خَلَقَ الْأَزْواجَ كُلَّهَا وَجَعَلَ لَكُم مِّنَ الْفُلْكِ وَالْأَنْعَامِ مَا تَرْكَبُونَ لِتَسْتَوُا عَلَى ظُهُورِهِ، ثُمَّ تَذْكُرُوا نِعْمَةَ رَبِّكُمْ إِذَا اسْتَوَيْتُمْ عَلَيْهِ وَتَقُولُوا سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ
আর যিনি সব জিনিসের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, আর তোমাদের জন্য বানিয়েছেন জলযান ও চতুষ্পদজন্তু, যাতে তোমরা আরোহণ করো। যেন তোমরা সেগুলোর পিঠে চড়ে বসো। তারপর যখন সেগুলোর উপর সমাসীন হবে তখন তোমাদের প্রতিপালকের নেয়ামত স্মরণ করবে আর বলবে, চিরপবিত্রতা ঐ সত্তার যিনি আমাদের অনুগত করে দিয়েছেন এটিকে, অথচ আমরা তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম ছিলাম না। আর অতি অবশ্যই ফিরে যাবো আমরা আমাদের প্রতিপালকের দিকে। (যুখরুফ, ৪৩: ১২-১৪)

একটি স্বাধীন প্রাণীকে, যার শক্তি মানুষের চেয়ে অনেক বেশী, কী সাধ্য ছিলো মানুষের তাকে বশ করার, তার পিঠে চড়ে বসার! কিংবা খণ্ড খণ্ড লোহা, ইস্পাত ও খনিজ দ্রব্য, যা নিশ্চল, নিষ্প্রাণ, কী সাধ্য ছিলো মানুষের তাতে এমন গতি ও 'প্রাণ' সৃষ্টি করার! দয়াময়, প্রজ্ঞাবান আল্লাহই এগুলো মানুষের অনুগত করে দিয়েছেন এবং মানুষকে যোগ্যতা দান করেছেন। তারই আদেশে এগুলো চলমান হয়, যেন অনুকূল বায়ু প্রবাহিত হয় ঐ দিকে যেদিকে মানুষ ইচ্ছা করে। সুতরাং কৃতজ্ঞ মানুষের কি কর্তব্য নয়, ঘোড়া বা হাতির পিঠে বসে; গাড়ী ও জাহাজ-উড়োজাহাজে আসন গ্রহণ করে, কিংবা সাগরের তলদেশে ও মহাশূন্যের উদ্দেশ্যে যাত্রাকালে উচ্চারণ করবে—
سُبْحَانَ الَّذِى سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ
চিরপবিত্রতা ঐ সত্তার যিনি আমাদের অনুগত করে দিয়েছেন এটিকে, অথচ আমরা তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম ছিলাম না।

সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, যত উন্নত বাহনেই সে আরোহণ করুক, জলে, স্থলে ও অন্তরীক্ষে যেখানেই বিচরণ করুক তার পরিণতি হলো—
وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ
আর অতি অবশ্যই ফিরে যাবো আমরা আমাদের প্রতিপালকের দিকে।

তাকে মনে রাখতে হবে, সে আল্লাহর অনুগত ও নিয়ন্ত্রিত দাস। জীবন, মৃত্যু ও পুনরুত্থান কোন কিছুর উপর তার নিয়ন্ত্রণ নেই। নির্ধারিত সময়ে তাকে ফিরে যেতে হবে আপন প্রতিপালকের সমীপে। তখন তাকে প্রতিটি নেয়ামত, প্রতিটি শক্তি ও সক্ষমতা এবং প্রতিটি সচ্ছলতা ও প্রাচুর্যের হিসাব দিতে হবে যে, কোথায় কীভাবে সে এগুলো ব্যবহার করেছে? যদি এমন কাজে এমনভাবে ব্যবহার করে থাকে যা আল্লাহর পছন্দ নয় তাহলে তাকে কঠিন শাস্তি পেতে হবে।

জীবনের সর্বক্ষেত্রে মুমিনের আচরণ একথা প্রমাণ করে যে, শক্তি, সম্পদ ও উপায়-উপকরণ হচ্ছে আল্লাহর দান ও অনুগ্রহ এবং আল্লাহর পক্ষ হতে পরীক্ষার বিষয়। তার প্রতিটি আচরণ যেন ঘোষণা করে—
هَذَا مِن فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ وَمَن شَكَرَ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ رَبِّي غَنِيٌّ كَرِيمٌ
'এটা তো আমার রবের পক্ষ হতে অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন, আমি কি শোকর করি, না অ-শোকর! আর যে শোকর করে সে নিজেরই জন্য শোকর করে, আর যে না-শোকরি করে, (সে জেনে রাখুক) আমার রব তো নির্মোহাপেক্ষী, মহান।' (আন-নামল, ২৭: ৪০)

এভাবেই শোকর আদায় করেছিলেন আল্লাহর নবী হযরত সোলায়মান আ. চোখের পলক পড়ার আগে রানী বিলকিসের সিংহাসন নিজের দরবারে উপস্থিত দেখতে পেয়ে! এভাবেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে যুগে যুগে আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দারা।

শক্তি, সম্পদ ও উপায়-উপকরণকে মুমিন সঠিক ক্ষেত্রে, সঠিক লক্ষ্যে ব্যবহার করে। আর তার একমাত্র উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং মানবতার কল্যাণ সাধন করা। কারণ এটাই হচ্ছে জগত-প্রকৃতির সকল শক্তি-সম্পদ এবং যাবতীয় উপায়-উপকরণ সৃষ্টির উদ্দেশ্য। ইরশাদ হয়েছে—
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ وَرُسُلَهُ بِالْغَيْبِ إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ
'অতিঅবশ্যই প্রেরণ করেছি আমি আমার রাসূলদের, প্রমাণাদিসহ, আর অবতারণ করেছি তাদের সঙ্গে কিতাব ও মীযান যাতে মানুষ সুবিচার পালন করতে পারে। আর আমি লৌহ 'অবতারণ' করেছি; তাতে রয়েছে প্রচণ্ড পরাক্রম এবং রয়েছে মানুষের জন্য বিভিন্ন উপকার। আর (এগুলো মানুষের অনুগত করে দেয়ার উদ্দেশ্য এই যে,) যেন আল্লাহ জেনে নেন, কে তাঁকে এবং তাঁর রাসূলদের সাহায্য করে, না দেখে। (প্রকৃত বিষয় তো এই যে,) নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বশক্তির অধিকারী, মহাপ্রতাপশালী।' (আল-হাদীদ, ৫৭: ২৫)

শুরুতে রাসূল প্রেরণ ও কিতাব অবতারণের উল্লেখ করেছেন, আবার শেষে বলেছেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করার বিষয়। মাঝখানে এনেছেন লৌহ অবতারণের বিষয়। আবার কিতাব ও হাদীদ উভয়ের জন্য ব্যবহার করেছেন 'ইনযাল' বা অবতারণ শব্দটি। এসব বিষয়ের আলোকে আয়াতের অন্তর্নিহিত মর্ম সম্ভবত এই যে, লোহার সবচে' বড় উপকারিতার একটি এই যে, এর শক্তি ও পরাক্রম যেন ব্যবহৃত হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করার কাজে। এটা কীভাবে সম্ভব হবে যদি লৌহের সকল শক্তি ও পরাক্রম আমি আয়ত্ত না করি?! সুতরাং সেই জ্ঞান অর্জনের আহ্বানও রয়েছে এ আয়াতে। আর লৌহের উল্লেখ হচ্ছে প্রতীকী। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, এই জগত প্রকৃতিতে আল্লাহ যত শক্তি গচ্ছিত রেখেছেন, মুসলিম তা অর্জন করবে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে, আল্লাহর দ্বীন প্রচারে এবং আল্লাহর কালিমাকে বুলন্দ করার কাজে ব্যবহার করবে এবং ব্যবহার করবে ঐ সকল বৈধ কাজে যার প্রতি শরীআত উদ্বুদ্ধ করেছে; যেমন হালাল ব্যবসা ও উপার্জন, সৎ উদ্দেশ্যে সফর ও ভ্রমণ এবং অন্যান্য কল্যাণপূর্ণ কাজ।

আল্লাহর কোন নেয়ামতকে মুমিন কখনো অন্যায় কাজে, অন্যায়কারীর সাহায্যে ব্যবহার করতে পারে না। যেমন বলেছেন আল্লাহর নবী মূসা আ.—
رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَيَّ فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِلْمُجْرِمِينَ
'হে রব, যেহেতু আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন সেহেতু কিছুতেই আমি অপরাধীদের সাহায্যকারী হবো না।' (আল-কাছাছ, ৩৮: ১৭)

মোটকথা নবী ও নবুয়ত এবং দ্বীন ও শরী'আতই একমাত্র পথ যা মানুষের অন্তরে আল্লাহর পরিচয় এবং আল্লাহর প্রতি ভয় সৃষ্টি করে, আর সকল সৃষ্টির স্রষ্টা ও জগতের প্রকৃত নিয়ন্টার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী করে এবং তাকে এ শিক্ষা দান করে যে, মানুষ কোনকিছুর মালিক নয়, রক্ষকমাত্র। একদিন তাকে তার মালিকের সামনে দাঁড়াতে হবে এবং জওয়াব দিতে হবে, এসকল শক্তি, সম্পদ ও উপায়-উপকরণ সে কোথায়, কী কাজে ব্যবহার করেছে? দ্বীন ও শরী'আতই শুধু পারে মানুষকে শক্তির দম্ভ ও ক্ষমতার অপপ্রয়োগ থেকে বিরত রাখতে এবং সম্পদ ও উপায়-উপকরণের সঠিক ব্যবহারক্ষেত্র নির্ধারণ করতে, যাতে তা মানবজাতির জন্য কল্যাণপ্রসূ হয়।

বস্তুত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর উন্নতি মানবজাতিকে আজ যে মহাধ্বংস ও বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে চলেছে তাতে পদার্থ ও যন্ত্রের কোন অপরাধ নেই। কারণ এগুলো সম্পূর্ণরূপে মানুষের ইচ্ছা ও চাহিদা এবং নীতি ও নৈতিকার অনুগত। স্বকীয় সত্তায় এগুলো না ভালো, না মন্দ। মানুষই ব্যবহার ও প্রয়োগের মাধ্যমে এগুলোকে ভালো বা মন্দে পরিণত করে।

এই যে আজ বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা চলছে; এই যে শহরে, জনপদে বিমান থেকে বোমা বর্ষিত হচ্ছে আর সবকিছু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে; এই যে ডুবোজাহাজ শান্তিপ্রিয় বেসামরিক যাত্রীদের জাহাজ ও বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবিয়ে দিচ্ছে, আর এই যে বেতার যন্ত্র (এবং বর্তমানে মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা) মিথ্যাচার, পাপাচার, নগ্নতা ও বেহায়াপনার প্রসার ঘটাচ্ছে, তো পশ্চিমা সমাজ এবং তাদের অনুসারীদের কোরআনের ভাষায় বলা যায়— طيرُكُم مَّعَكُمْ তোমাদের কুফল তো তোমাদের সঙ্গে।

কারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি তো শুধু পদার্থ ও প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তি মানুষের আয়ত্তে এনে দেয় এবং বিভিন্ন যন্ত্র তার হাতে তুলে দেয়। এতটুকুই তার কাজ। এখন কোথায়, কীভাবে ও কী উদ্দেশ্যে এর ব্যবহার হবে, এটা শিক্ষা দেয়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কাজ নয়। দিয়াশলাই মানুষের হাতে আগুনের দাহ্যক্ষমতা তুলে দেয়। মানুষ এখন চুলার আগুন জ্বেলে খাবার প্রস্তুত করতে, বা ঘর গরম করতে পারে, আবার পারে সমগ্রজনপদ জ্বালিয়ে দিতে। মানুষ তার আয়ত্তের শক্তি-সম্পদ কোথায় কীভাবে ব্যবহার করবে, কোন উপায়ে তা থেকে যথার্থ উপকৃত হবে সেটা শিক্ষা দিতে পারে একমাত্র দ্বীন ও শরী'আত।

যারা দ্বীন ও শরীআতের অনুগত তাদের হাতে 'শক্তি' হয় কল্যাণের মাধ্যম, আর যারা নফস ও শয়তানের অনুগত, একই শক্তি তাদের হাতে হয়ে যায় ফাসাদ ও বরবাদির কারণ। দ্বীন ও শরী'আতই পারে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি ও নৈতিকতার মধ্যে এবং ব্যক্তিস্বার্থ ও সামষ্টিক কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির ঔদ্ধত্যের পরিবর্তে বিনয় ও আবদিয়াতের শান পয়দা করতে।

আলকোরআন তার ই'জাযপূর্ণ ও অলৌকিক ভাষায় উভয় তরফের নমুনা পেশ করেছে। হযরত ইউসুফ (আ.) তাঁর বাদশাহাতের পূর্ণ শান ও জালালের সময় বলেছেন—
رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِن تَأْوِيلِ الأَحَادِيثِ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنتَ وَلِي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
'হে রব! আপনি আমাকে রাজত্ব দান করেছেন এবং আমাকে বক্তব্যের মর্ম অনুধাবন শিক্ষা দান করেছেন। হে আসমান-যমীনের সৃষ্টিকারী, আপনি দুনিয়া ও আখেরাতে আমার অভিভাবক। আপনি আমাকে মুসলিমরূপে ওয়াফাত দান করুন এবং আমাকে আপনার নেক বান্দাদের সঙ্গে যুক্ত করুন।' (সূরা ইউসুফ, ১২: ১০১)

হযরত সোলায়মান (আ.) যখন শাহানশাহির শান-শৌকত ও দবদবা দেখলেন তখন 'বে-সাখতা' তাঁর যবানে এসে গেলো—
فَتَبَسَّمَ ضَاحِكًا مِّن قَوْلِهَا وَقَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَى وَعَلَى وَالِدَى وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّالِحِينَ
'তখন পিঁপড়ের কথা শুনে তিনি মৃদু হাসলেন, আর বললেন, হে রব, আমাকে তাওফীক দান করুন, যেন আপনার নেয়ামতের শোকর আদায় করতে পারি, যা আপনি দান করেছেন আমাকে এবং আমার পিতা-মাতাকে; আর যেন এমন আমল করতে পারি যাতে আপনি সন্তুষ্ট হন। আর আপনি আমাকে আপনার করুণাবশে নেক বান্দাদের মধ্যে দাখিল করুন।' (আন-নামল, ২৭: ১৯)

পক্ষান্তরে দ্বীন ও শরী'আতের আলো থেকে যারা বঞ্চিত, যাদের অন্তরে নেই আল্লাহর ভয় ও পরিচয়; স্রষ্টাকে ভুলে গিয়ে যারা হয়ে পড়েছিলো নিজের সৃষ্টি-উদ্দেশ্য সম্পর্কেও বে-খবর তারা ছিলো ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির গর্বে গর্বিত। কারণ তারা ভাবতো না, তাদের উপরে আছে কোন শক্তি যার কাছে তাদের জবাবদেহি করতে হবে। ইরশাদ হয়েছে—
فَأَمَّا عَادٌ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَقَالُوا مَنْ أَشَدُّ مِنَّا قُوَّةً أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَهُمْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَكَانُوا بِنَايَتِنَا تَجْحَدُونَ
'আর কাউমে আদ, তারা যমীনে বড়াই করেছিলো অন্যায়ভাবে, আর বলেছিলো, শক্তিতে কে আমাদের চেয়ে প্রচণ্ড! তারা কি দেখতে পায়নি যে, আল্লাহ, যিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন তিনিই শক্তিতে তাদের চেয়ে প্রচণ্ড! আসলে তারা আমার নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করতো।' (হা-মীম সিজদাহ, ৪১: ১৫)

সত্যকে অনুধাবন করার পক্ষে কত সুন্দর যুক্তি! কিন্তু অনুধাবনের যোগ্যতা তো চাই! তো এই যে শক্তির এত বড় দম্ভ, কী হয়েছিলো শেষপর্যন্ত তাদের পরিণতি, তাও আল-কোরআন পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে তার অনুসারীদের—
فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا صَرْصَرًا فِي أَيَّامٍ نَحِسَاتٍ لِنُذِيقَهُمْ عَذَابَ الْخِزْيِ فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَلَعَذَابُ الْآخِرَةِ أُخْزَى وَهُمْ لَا يُنصَرُونَ
তখন আমি কতিপয় অশুভ দিনে তাদের উপর পাঠালাম এক ঝঞ্ঝা বায়ু, যাতে আস্বাদন করাই তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনাকর আযাব, আর আখের আযাব অবশ্যই অধিক লাঞ্ছনাকর, আর তখন তাদের সাহায্য করা হবে না। (হা-মীম সিজদাহ, ৪১: ১৬)

সম্পদগর্বে গর্বিত কারুনের ঘটনা এভাবে বলা হয়েছে—
إِنَّ قَرُونَ كَانَ مِن قَوْمِ مُوسَى فَبَغَى عَلَيْهِمْ وَمَاتَيْنَهُ مِنَ الْكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوأُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ إِذْ قَالَ لَهُ قَوْمُهُ لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ وَابْتَغِ فِيمَا وَاتَنكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِنَ كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ
'কারূন ছিলো মূসার সম্প্রদায়ভুক্ত, অনন্তর সে তাদের উপর স্বেচ্ছাচার শুরু করলো। আর তাকে আমি দান করেছি এত ধনভাণ্ডার যে, তার চাবিগুলো ভারী ছিলো বলশালী দলের জন্য। ঐসময় তার কাউম তাকে বললো, বড়াই করো না; আল্লাহ বড়াইকারীদের পসন্দ করেন না। আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তা দিয়ে পরকালের ঘর তালাশ করো, অবশ্য দুনিয়া থেকে তোমার প্রাপ্য অংশও ভুলো না। আর সদাচার করো, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি সদাচার করেছেন। আর যমীনে ফাসাদের অপচেষ্টা করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ ফাসাদ-কারীদের পসন্দ করেন না।' (কাছাছ, ২৮ : ৭৬-৭৭)

সম্পদের আধিক্যের পরিমাণ বর্ণনা করার কী আশ্চর্য সুন্দর অলৌকিক শৈলী! সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে প্রথম সম্পর্ক সিন্দুকের, দ্বিতীয় সম্পর্ক তালার, তৃতীয় সম্পর্ক চাবির, এর মধ্যে সবচে হালকা ও ক্ষুদ্র বস্তু হলো চাবি। সুতরাং চাবির উল্লেখ দ্বারাই সম্পদের আধিক্যের বিষয়টি অন্তরে অধিক রেখাপাত করবে। কারুন দম্ভভরে জবাব দিলো, আমার প্রতি কারো কোন দান ও দয়া নেই। যা কিছু দেখো, তা আমার জ্ঞান-বুদ্ধি ও হুনর-হেকমতের ফল—
قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَى عِلْمٍ عِندِي
সে বললো, এগুলো তো আমি প্রাপ্ত হয়েছি আমার বিশেষ জ্ঞান দ্বারা। (কাছাছ, ২৮:৭৮)

শক্তির অনুভূতি ও ক্ষমতার দম্ভ এবং ঊর্ধ্বশক্তির অস্তিত্ব অস্বীকার করার ফলে মানুষের মধ্যে এমন এক নেশা ও উন্মাদনা সৃষ্টি হয় যে, সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কোন উপদেশ ও নীতিকথা, কোন মানবিক আবেদন ও সাধুবাদ তখন তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। তার ক্ষমতার দাপটে মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে; দুর্বল জনগোষ্ঠী তার পদতলে পিষ্ট হতে থাকে। যেমন কাউমে আদকে তাদের পায়গম্বর বলেছিলেন—
وَإِذَا بَطَشْتُم بَطَشْتُمْ جَبَّارِينَ
'যখন তোমরা কাউকে ধরো শক্তিমত্ত অবস্থায় ধরো।' (শুয়ারা, ২৬: ১৩০)

কোন কল্যাণকর্ম ও ন্যায়-আচারণই তার কাছ থেকে আর আশা করা যায় না। ফেতনা-ফাসাদ, অনাচার-স্বেচ্ছাচার ও মানাবনিপীড়নই হয়ে থাকে তার একমাত্র কাজ। যেমন ফেরআউন সম্পর্কে বলা হয়েছে—
إِنَّ فِرْعَوْنَ عَلَا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيَعًا يَسْتَضْعِفُ طَائِفَةٌ مِّنْهُمْ يُذَبِّحُ أَبْنَاءَهُمْ وَيَسْتَحْيِ نِسَاءَهُمْ إِنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ
'নিঃসন্দেহে ফির'আউন (তার) রাজ্যে মাথা তুলেছিলো এবং রাজ্যের অধিবাসীদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে রেখেছিলো। তাদের একটি দলকে সে দুর্বল করে রাখছিলো, (অর্থাৎ) তাদের পুত্রদের যবাই করছিলো, আর তাদের নারিদের জীবিত রাখছিলো। নিঃসন্দেহে সে ছিলো ফাসাদীদের অন্তর্ভুক্ত।' (সূরাতুল কাছাছ, ২৮:৪)

তো কারূনের শক্তির দম্ভ ও অহঙ্কারের কী পরিণতি হয়েছিলো? শুনুন আল-কোরআনে আল্লাহ বলছেন—
فَخَسَفْنَا بِهِ، وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ فَمَا كَانَ لَهُ مِن فِئَةٍ يَنصُرُونَهُ مِن دُونِ اللَّهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنتَصِرِينَ
অনন্তর আমি তাকে ও তার বাড়ী-ঘর ভূমিতে ধ্বসিয়ে দিলাম। ফলে তার পক্ষে এমন কোন দল ছিলো না, যারা তাকে সাহায্য করবে আল্লাহর মোকাবেলায়। সে নিজেও নিজেকে সাহায্য করার অবস্থায় ছিলো না। (সূরাতুল কাছাছ, ২৮: ৮১)

নবী ও নবুয়তের নূর, দ্বীন ও শরী'আতের হিদায়াত এবং আখলাকি তারবিয়াত ছাড়া যখন জ্ঞান-বুদ্ধি ও শিল্প-প্রযুক্তির উন্নতি হতে থাকে তখন তার স্বাভাবিক পরিণতি সেটাই হয় যা উপরে বর্ণনা করা হলো। যিনি বলেছেন বড় সুন্দর বলেছেন, 'শক্তি ও ভক্তির যখন শুভমিলন হয় তখনই মনবতার কল্যাণ সাধিত হয়।'

ইউরোপের দুর্ভাগ্য এবং দুর্ভাগ্য মানবজাতির, ইউরোপ আজ দ্বীন ও শরী'আত থেকে এবং 'আকাশ ও পৃথিবীর সেতু বন্ধন' থেকে বঞ্চিত। তাদের সামনে তাই নীতি ও নৈতিকতার কোন বাধা নেই এবং নেই দ্বীন ও ধর্মের কোন বিধিনিষেধ, এমনকি নেই আসমানী জ্ঞানের অধিকারী কোন ব্যক্তি যিনি তাদের সঠিক পথ দেখাবেন। ফলে তারা তাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং জীবনের পরিণতি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছে। তারা ভাবছে (কোরআনের ভাষায়)—
إِنْ هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ
'আমাদের পার্থিব জীবন ছাড়া আর কোন জীবন নেই। আমরা মৃত্যুবরণ করি, আর জীবনযাপন করি, আর আমরা পুনরুত্থিত হবো না।' (আল-মুমিনুন, ২৩: ৩৭)

এই বিশ্বাসের অনিবার্যতায় তারা ধরে নিয়েছে যে, ভোগ-উপভোগ, আয়েশ-বিলাস, বস্তুগত উপকৃতি এবং ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তার—এছাড়া মানবজীবনে আর কোন উদ্দেশ্য নেই। বিশ্বজগত যেন রাজাহীন এক রাজ্য, বা মালিকানাহীন কোন পতিত ভূমি। সুতরাং দখল করো, আর ভোগ করো।

ফলে ইউরোপ তার যাবতীয় জ্ঞান ও শক্তি ব্যয় করেছে ভোগ-বিলাসের উপায়-উপকরণ তৈরী, কিংবা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য মারণাস্ত্র উৎপাদনের পিছনে। এ ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মধ্যেও রয়েছে অস্ত্র ও যন্ত্রের উদ্ভাবন ও উৎপাদনের উন্মত্ত প্রতিযোগিতা, যার শুরু আছে, শেষ নেই। এভাবে চলতে চলতে একসময় লক্ষ্য ও উপলক্ষ এবং উদ্দেশ্য ও মাধ্যমের পার্থক্যই মুছে গেছে তাদের মন-মস্তিষ্ক থেকে, আর তারা বিশ্বাস করে নিয়েছে যে, আবিষ্কার-উদ্ভাবন, উপায়-উপকরণ এবং বস্তু ও যন্ত্র, এগুলো কোন উদ্দেশ্যের মাধ্যম নয়, বরং সত্তাগত-ভাবে নিজেই উদ্দেশ্য। ফলে এ নিয়েই তারা এমন মেতে উঠেছে যেমন খেলনা নিয়ে মেতে থাকে শিশু। তারা ধরেই নিয়েছে, 'ভোগই হলো সভ্যতা', তারপর আরো এগিয়ে ভাবতে শুরু করেছে 'গতিই হলো সভ্যতা'। প্রফেসর জুড বলেন,
'ডিযরেইলীর মতে তার যুগের সমাজ ভাবতো, সভ্যতার মূল কথা হচ্ছে ভোগ, কিন্তু আমরা মনে করি, সভ্যতা মানে গতি। গতিই হচ্ছে আধুনিক যুবকের উপাস্য এবং গতির যূপকাষ্ঠে নির্দয়ভাবে তারা বলি দিতে পারে সর্বপ্রকার সুখ, স্বস্তি ও শান্তি, এমনকি অন্যের প্রতি দয়া-মায়াও।'¹

ইউরোপে নীতি ও শক্তির ভারসাম্যহীনতা

দুর্ভাগ্যক্রমে ইউরোপে বহু শতাব্দী থেকে নীতি ও চরিত্র এবং শক্তি ও সম্পদের মধ্যে, তদ্রূপ জাগতিক জ্ঞান ও যুক্তি এবং ধর্ম ও পরকাল-চিন্তার মধ্যে ভারসাম্য গুরুতরভাবে নষ্ট হয়ে আছে। নবজাগরণের পর থেকে চরিত্র ও ধর্মচিন্তার বিপরীতে জড়শক্তি ও জাগতিক জ্ঞান দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে, আর তারা অধঃপতনের দিকে এগিয়ে গেছে। যদি দাঁড়িপাল্লার দু'দিকের কথা ভাবি তাহলে বলতে হয়, শক্তি ও জ্ঞানের পাল্লা ভারি হয়ে শুধু নীচে নেমে এসেছে, আর ধর্ম ও চরিত্রের পাল্লা হালকা হয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। এভাবে জীবনের মঞ্চে একসময় এমন এক প্রজন্ম আত্মপ্রকাশ করেছে যারা জ্ঞান ও শক্তির চর্চায় যেন আকাশের উচ্চতাকে ছুঁয়ে ফেলে, পক্ষান্তরে ধর্ম ও চরিত্রের বিষয়ে রয়ে গেছে ভূমিলগ্ন। এ প্রজন্ম জ্ঞান ও প্রযুক্তির অভিযাত্রায় এবং পদার্থ ও প্রাকৃতিক শক্তি আয়ত্ত করার সফলতায় যেন অতিমানবীয় কোন প্রাণী; অন্যদিকে কর্ম ও চরিত্রে, লোভ-লালসা ও ভোগ-বিলাসিতায় এবং নিষ্ঠুরতা ও নির্দয়তায় যেন চতুষ্পদ ও হিংস্র পশুর চেয়ে নীচে।

জীবনযাপনের সব উপায়-উপকরণ তাদের হাতে, কিন্তু তারা জানে না, জীবন কীভাবে যাপন করতে হয়। জড়জীবনের ভোগ-বিনোদন ও নান্দনিকতার চূড়ান্ত-সীমারও জ্ঞান আছে তাদের, অথচ মানবিক জীবন এবং সভ্যতা ও চরিত্রের প্রাথমিক নীতি ও মূলনীতি সম্পর্কেও অজ্ঞ। মোটকথা, তাদের জ্ঞানের উন্নতি ও চরিত্রের অবনতি দু'টোই অবিশ্বাস্য রকমের। প্রযুক্তি ও শিল্পের অগ্রযাত্রায় তারা যেন তারকালোকে পৌঁছে যেতে চায়, অথচ জানে না, পায়ের নীচের মাটি কী করে হবে বাস-উপযোগী? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি তাদের দিয়েছে অন্তহীন শক্তি, কিন্তু তার সুন্দর ব্যবহার ও সুপ্রয়োগের যোগ্যতা দান করেনি। প্রফেসর জুড বড় সুন্দর বলেছেন, 'প্রাকৃতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান আমাদের এমন শক্তি দান করেছে যা দেবতার উপযোগী, কিন্তু আমরা তা ব্যবহার করছি শিশু ও হিংস্র পশুর বুদ্ধি দ্বারা।'¹

সুতরাং এর বেশী আর কী হতে পারে যে, সম্পদ নষ্ট হবে, আর লাশ ছিন্নভিন্ন হবে! অন্যত্র তিনি আরো বিশদ করে লিখেছেন—
'একদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে বিস্ময়কর অগ্রযাত্রা, অন্যদিকে লজ্জাজনক সামাজিক 'শিশুতা'; উভয়ের মধ্যে এই যে এত বিরাট ব্যবধান, জীবনের মোড়ে মোড়ে আমাদেরকে এর মন্দ পরিণতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। একদিকে আমরা ঘরে বসে মহাদেশ থেকে মহাদেশে কথা বলি; ছবি আদান-প্রদান করি; সিলনে বসে রেডিওতে লন্ডনের বড় ঘড়ির ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পাই; ভূমি ও সমুদ্রের উপরে-নীচে বিচরণ করি; নিঃশব্দ টেলিপ্রিন্টার ব্যবহার করি; বিদ্যুতের সাহায্যে ফসল ফলাই; এক্স-রের সাহায্যে দেহের অভ্যন্তরে উঁকি দেই; ছবি এখন কথা বলে, গান গায়¹; বেতার যন্ত্রের সাহায্যে অপরাধী সনাক্ত হয়; উড়ো জাহাজ ও ডুবো-জাহাজ দক্ষিণমেরু ও উত্তরমেরুতে যায়। এত কিছু হয়, হয় না শুধু এইটুকু যে, বড় বড় শহরে কিছু মুক্ত মাঠ তৈরী করি যেখানে গরীব শিশুরা মনের আনন্দে নিরাপদে খেলাধুলা করবে। ফল এই যে, প্রতি বছর আমরা দু'হাজার শিশুকে হত্যা করি এবং নব্বই হাজার শিশুকে আহত করি।

একবার এক ভারতীয় দার্শনিকের সঙ্গে আলাপকালে আমি আমাদের সভ্যতার প্রশংসা করছিলাম। তখনকার ঘটনা, একজন গাড়ীচালক বালুসড়কে ঘণ্টায় চারশ মাইল অতিক্রম করার রেকর্ড গড়েছেন এবং একজন বিমানচালক মস্কো থেকে নিউইয়র্কে সম্ভবত বিশঘণ্টায় উড়ে এসেছেন। সব শুনে তিনি বললেন, হাঁ, তোমরা বাতাসে পাখীর মত উড়তে পারো এবং পানিতে মাছের মত সাঁতরাতে পারো, শুধু জানো না, কীভাবে মাটির উপরে হাঁটতে হয়!'²

যা ক্ষতিকর তাই শেখে

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এসব আবিষ্কার-উদ্ভাবন যদি এমন মানুষের হাতে ব্যবহৃত হতো যারা কল্যাণ-অকল্যাণে পার্থক্য করতে পারে এবং কল্যাণের পথে নিবেদিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে, তাহলে নিঃসন্দেহে এগুলো মানবজাতির জন্য হতো 'আশীর্বাদ', কিন্তু মানুষেরই ব্যবহারদোষে কল্যাণের পরিবর্তে মানবজাতির জন্য তা চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে। বাবেলের জাদু সম্পর্কে যেমন কোরআন বলেছে—
وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ
'আর তারা ঐসব বিষয় শিক্ষা করতো যা তাদের উপকার না করে ক্ষতি করে।' (সূরা বাকারাহ, ২: ১০২)

দেখুন, প্রফেসর জুড কীভাবে প্রযুক্তি-সম্পদের স্বরূপ উদ্ঘাটন করে এর বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করছেন—
'আমরা এখন অভাবনীয় গতিতে দূরত্ব অতিক্রম করতে পারি, কিন্তু খুব কমই আমাদের গন্তব্য হয়ে থাকে আদর্শ গন্তব্য। পর্যটক ও পরিভ্রমণকারীর জন্য পৃথিবী ছোট হয়ে এসেছে ঠিক এবং সমস্ত জাতি ও জনগোষ্ঠী এখন এত কাছে যে, সবার অঙ্গন যেন অভিন্ন। কিন্তু ফল? শুধু এই যে, পারস্পরিক সম্পর্কের আরো বেশী অবনতি ঘটেছে। আর যেসব উপায় ও সুবিধার সাহায্যে আমরা পরস্পর পরিচিত হতে পেরেছি সেগুলোই আসলে বিশ্বকে যুদ্ধের আগুনে নিক্ষেপ করেছে। আমরা রেডিও বেতার উদ্ভাবন করেছি এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেছি, কিন্তু প্রতিবেশী দেশের আকাশ ও বাতাস ব্যবহার করা হচ্ছে তারই বিরুদ্ধে 'প্রচারযুদ্ধে' এবং নিজেদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে।'¹

'এই বিমানটি দেখুন আকাশে ঘোরপাক খাচ্ছে, প্রথমে যারা তাতে উড্ডয়ন করেছিলো, কোন সন্দেহ নেই যে, তাদের সাহস ও মেধা ছিলো অতুলনীয়। কিন্তু এখন কী উদ্দেশ্যে তা ব্যবহৃত হয় এবং ভবিষ্যতে হবে? বোমা ফেলে শহর জনপদ ধ্বংস করা এবং জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সবকিছু ভগ্নস্তূপ করার জন্য, অসংখ্য মৃতদেহ ছিন্নভিন্ন করার জন্য। এটা তো (কোন জ্ঞানী ও ভদ্র মানুষের কাজ নয়;) হয় নির্বোধ (ও ইতর) লোকের কাজ, কিংবা শয়তানের।'¹

'আগামী দিনের ঐতিহাসিক আমাদের সম্পর্কে কী লিখবেন? লিখবেন, কীভাবে বেতারতরঙ্গের সাহায্যে সোনার খনি আবিষ্কার করতাম, সোনা আহরণ করতাম এবং কী অপূর্ব দক্ষতার সঙ্গে সোনা ওজন করতাম, আর কীভাবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে পরাস্ত করে বিভিন্ন রাজধানীতে সোনা হস্তান্তর করতাম। তিনি আরো লিখবেন, মানুষরূপী এই হিংস্র পশুরা, যারা শিল্প ও প্রযুক্তির উন্নতি সাধনে যেমন ছিলো কুশলী তেমনি ছিলো দুঃসাহসী, কিন্তু তারা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠায় ছিলো অক্ষম, যা সঠিক স্বর্ণবণ্টন ও স্বর্ণসংরক্ষণের দাবী ছিলো। তারা বরং একটা জিনিসই বুঝতো, যথাসম্ভব দ্রুত খনিগুলো দাফন করা; অর্থাৎ দক্ষিণ আফ্রিকার খনি থেকে সোনা তুলে আনা, আর লন্ডন, নিউইয়র্ক ও প্যারিসের ব্যাঙ্কে দাফন করা।'²

জ্ঞান, শিল্প ও প্রযুক্তি এবং ধর্ম, চরিত্র ও মানবতার মধ্যে বর্তমান পশ্চিমা সভ্যতা যে বিরাট ব্যবধান সৃষ্টি করে রেখেছে এবং মানবতার কল্যাণসাধনে যে অমার্জনীয় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে সে সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে অন্য এক পশ্চিমা পণ্ডিৎ, যিনি দর্শনশাস্ত্র ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান উভয় বিষয়ে বৈদগ্ধ্য অর্জন করেছেন, তিনি আরো সূক্ষ্ম-গভীর শৈলী ও দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি ডক্টর আলেক্সস কেরল, তার মন্তব্য—
'বর্তমান জীবনব্যবস্থা মানুষকে শুধু সম্ভাব্য সকল উপায়ে সম্পদ অর্জনে প্রলুব্ধ করে, কিন্তু মানুষকে সম্পদের উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌঁছায় না, বরং তার মধ্যে একটা স্থায়ী উত্তেজনা ও জৈবিক চাহিদা সৃষ্টি করে এবং সেটাকে প্রশমিত ও পরিতৃপ্ত করার একটা অপরিপক্ব তাড়না সৃষ্টি করে। ফলে মানুষ ধৈর্য ও স্থৈর্য থেকে বঞ্চিত হয় এবং এমন যে কোন কাজ থেকে সে দূরে সরে থাকে যা কিছুটা কষ্টকর ও ধৈর্যসাপেক্ষ। আধুনিক সভ্যতা যেন এমন মানুষ সৃষ্টিই করতে পারে না যার মধ্যে সৃজনশীলতা, সাহস ও মেধা রয়েছে। প্রত্যেক দেশে দেখা যায়, যে শ্রেণীটি দেশ পরিচালনা করে এবং যাদের হাতে দেশের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা, তাদের মধ্যে নৈতিক ও চিন্তানৈতিক সক্ষমতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, আধুনিক সভ্যতা ঐসব বৃহৎ আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে সক্ষম হয়নি যা তার কাছে মানবজাতির কাম্য ছিলো। আধুনিক সভ্যতা এমন মানুষ সৃষ্টি করতে পারেনি যাদের মধ্যে সাহস আছে এবং মেধা ও যোগ্যতা আছে; যারা এই সভ্যতাকে ঐ দুর্গম চড়াই-উৎরাইপূর্ণ পথে নিরাপদে নিয়ে যেতে পারবে যেখানে এখন সভ্যতা শুধু ঠোকর খাচ্ছে এবং একের পর এক স্খলনের শিকার হচ্ছে। প্রকৃত ঘটনা এই যে, মানবসম্প্রদায় ঐরকম দ্রুত উন্নতি করতে পারেনি যেমন মানবমস্তিষ্ক থেকে জন্মলাভ করা প্রতিষ্ঠানগুলো করেছে। এটা মূলত রাজনৈতিক নেতৃবর্গের নৈতিক ও চিন্তানৈতিক ত্রুটি-বিচ্যুতিরই ফল এবং ঐ মূর্খতার ফল যা আজকের সমস্ত জাতি ও সম্প্রদায়কে বিপদ-ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।'¹

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আজ যে পরিবেশ ও পরিপার্শ্ব তৈরী করেছে তা মানুষের উপযোগী নয়। কেননা তা গড়ে উঠেছে শুধু তাৎক্ষণিকতার উপর, কোন পূর্ব-পরিকল্পনা ও চিন্তা-ভাবনার উপর নয়। মানুষের ব্যক্তিসত্তা ও চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতির বিষয়টি সেখানে চিন্তা করা হয়নি। এই পরিবেশ ও পরিপার্শ্ব, যা শুধু মেধা ও বুদ্ধি এবং প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনার ফসল, তা আমাদের আকার-আকৃতি ও দেহাবয়বের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ অবস্থায় আমরা খুশী ও সুখী নই। আমরা এক নিরন্তর নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের শিকার। যে সব জাতি ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিল্পসভ্যতার বিকাশ ঘটেছে এবং যারা উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধির চূড়ায় উপনীত হয়েছে তারা কিন্তু আগের চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং দ্রুত বন্যতার দিকে ধাবিত হচ্ছে, কিন্তু তাদের সে অনুভূতি নেই। ঐ ক্ষিপ্ত ও উন্মত্ত পরিবেশ-পরিপার্শ্ব থেকে কোন শক্তি এখন তাদের বাঁচাতে পারবে না, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি তাদের চারপাশে বেষ্টনীর মত তৈরী করে রেখেছে।¹

সত্য এই যে, পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর মত আমাদের বর্তমান সভ্যতাও জীবনের জন্য এমন কিছু শর্ত আরোপ করে রেখেছে, যা বিভিন্ন অজ্ঞাত কারণে জীবনকে অসম্ভব করে তোলবে। আমরা জড়বস্তু সম্পর্কে যতটা জ্ঞান অর্জন করেছি তার তুলনায় জীবন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান খুবই অল্প। আমরা আসলে জানিই না, মানুষের কীভাবে জীবনযাপন করা উচিত। এ বিষয়ে আমাদের জ্ঞান এখনো অনেক পিছনে এবং এ জ্ঞানদৈন্যই আমাদের সর্বনাশ করেছে। এর মাশুল আমাদের দিয়েই যেতে হবে।¹

উদ্ভাবিত যন্ত্রের যত দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটছে, তা থেকে সেভাবে উপকার গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, মহাকাশ বিজ্ঞান ও রসায়নশাস্ত্রের আবিষ্কারগুলোকে বেশী গুরুত্ব দিয়েও কোন লাভ নেই। কারণ সভ্যতার ভোগ-সামগ্রী, বিলাসপ্রাচুর্য এবং সৌন্দর্য ও নান্দনিকতাকে গুরুত্ব দিলেই বা কী হবে যদি নিজেদেরই দুর্বলতার কারণে তা থেকে আমরা উপকৃত না হতে পারি এবং মানব-কল্যাণে নিয়োজিত করতে না পারি। আমাদের জীবন থেকে যদি চরিত্র ও নৈতিকতার দিকটি এবং সর্বোত্তম মানবীয় গুণগুলো সম্পূর্ণ বের করে দেয়া হয় তাহলে সেই জীবনব্যবস্থাকে সুসংহত করে কী লাভ? আমাদের জন্য তো বেশী ভালো ছিলো দ্রুতগামী বিমান, আরামদায়ক গাড়ী, সস্তা রেডিও এবং দূর মহা-কাশের অনুসন্ধানী টেলিস্কোব তৈরী করার চেয়ে নিজের প্রতি অধিক মনোযোগী হওয়া। কোন বিমান যদি সল্পতম সময়ে দূরতম কোন স্থানে পৌঁছে দেয় তাতে আমাদের প্রকৃত কী উন্নতিটা অর্জিত হবে? আমাদের জন্য কি খুব জরুরি যে, আমরা উৎপাদন বাড়িয়েই যাবো, যাতে মানুষ অধিক হারে অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ব্যবহার করতে থাকে? এতে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে যে, যন্ত্রবিজ্ঞান, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও রসায়নশাস্ত্র আমাদেরকে মেধা ও প্রজ্ঞা দান করতে পারে না এবং পারে না নৈতিক ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যবিধান, স্নায়ুবিক ভারসাম্য ও শান্তি-নিরাপত্তা দান করতে?

যন্ত্র ও প্রযুক্তির ধ্বংসযজ্ঞতা

বিভিন্ন পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে, যার কিছু বিবরণ পিছনে তুলে ধরা হয়েছে, পাশ্চাত্যের জনপদে শুভ ও শুভ্রতা এবং কল্যাণ ও উত্তমতার প্রতি আগ্রহ-অনুরাগ প্রায় লোপ পেয়ে গেছে। সভ্যতা ও নৈতিকতার সুস্থ-সুন্দর নীতি ও মূলনীতিগুলো বহু আগেই তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। দায়িত্বহীন ও ভ্রান্ত সাহিত্য তাদের হৃদয় ও হৃদয়বৃত্তিকে ভুল পথে নিয়ে গেছে। অন্তঃসারশূন্য ও নাস্তিকতামুখী দর্শন তাদের চিন্তা-চেতনাকে ভ্রষ্টতার পথে পরিচালিত করেছে। ফলে তাদের মন ও মনন, সংস্কার ও সংস্কৃতি এবং রুচি-রোচ্যতায় এমন ধ্বস নেমেছে যে, কল্যাণ ও সুকৃতির কোন যোগ্যতাই আর অবশিষ্ট থাকেনি। ফলে অসুস্থ পাকস্থলীর জন্য যেমন সুখাদ্যও ক্ষতিকর তেমনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চা এবং জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির উদ্ভাস ও বিকাশ স্বয়ং ইউরোপের জন্য এবং সাধারণ-ভাবে মানবজাতি ও মানবসভ্যতার জন্য চরম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিস্টান এডেন ১৯৩৮ সনে তার এক ভাষণে বড়-সুন্দরভাবে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন—
'কিছু বুঝে ওঠা এবং কিছু সংশোধন করার আগেই হয়ত মানুষ এ শতাব্দীর শেষভাগে সেই অসভ্যতা ও বর্বরতার যুগে ফিরে যাবে, যা পৃথিবীতে একসময় বিরাজমান ছিলো। হয়ত আজকের আধুনিক মানুষ প্রাচীন পৃথিবীর জঙ্গলী গুহাবাসিদের জীবনই গ্রহণ করবে। কী আশ্চর্য! সমস্ত জাতি ও রাষ্ট্র মারণাস্ত্র থেকে বাঁচার জন্য পানির মত অর্থ ব্যয় করছে। এসব অস্ত্রের ধ্বংসযজ্ঞতার বিষয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত তো সবাই, কিন্তু সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা কেউ ভাবছে না। কখনো কখনো অবাক হয়ে ভাবি, যদি ভিনগ্রহের কোন বুদ্ধিমান প্রাণী এখন পৃথিবীতে নেমে আসে, তাহলে সে কী দেখবে এবং কী ভাববে? সে দেখবে, আমরা নিজের হাতে নিজের ধ্বংসের সরঞ্জাম তৈরী করছি! আবার তথ্যবিনিময় করছি যে, এসব নারকীয় অস্ত্রের, আরো উন্নয়ন ঘটিয়ে, কীভাবে আরো কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।'

মিস্টার এডিন যখন কথা বলছিলেন তখন হয়ত তার কল্পনায়ও ছিলো না যে, উন্নত বিশ্ব ও তার অভিভাবক আমেরিকা, মুখে যারা শান্তির দাবিদার, ঐ যুদ্ধেই এমন অস্ত্র ব্যবহার করবে, যার ধ্বংসযজ্ঞতা সব মারণাস্ত্রকে ছাড়িয়ে যাবে, যার বীভৎসতা স্বয়ং বিজ্ঞানীদেরও ধারণাকে হার মানাবে। স্রষ্টার সঙ্গে যাদের সম্পর্ক নেই, নিজেদেরই যারা মনে করে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির স্রষ্টা তাদের সেই 'ভয়ঙ্কর সুন্দর' সৃষ্টির নাম হলো—পারমাণবিক বোমা।

কয়েক বছরের সুপরিকল্পিত গবেষণা ও চেষ্টা-সাধনা এবং বিপুল অর্থব্যয়ের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত আমেরিকা পারমাণবিক বোমার 'জনক' হলো। এবার আধুনিক প্রযুক্তির এই নতুন দৈত্যটির ধ্বংসযজ্ঞতার পরীক্ষার পালা। প্রথম পরীক্ষাটি সম্পন্ন হলো ১৯৪৫-এর ১৬ই জুলাই ভোর পাঁচটায় নিউ মেক্সিকোর জনমানবহীন মরুভূমিতে। তারপর চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত ঠাণ্ডামাথায় বেছে নেয়া হলো জাপানে কয়েক লাখ মানুষের শান্তিপূর্ণ দু'টি জনপদকে। কারণ এর পিছনে পাশ্চাত্য তার সর্বোচ্চ মেধা ও প্রযুক্তি ব্যয় করেছিলোই তো এ জন্য যে, শত্রুজাতি যেন সন্ত্রস্ত হয়ে পরাজয় মেনে নেয়, হোক না তাতে লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষের দেহ ভষ্ম!

১৯৪৫-এর ৬ই আগস্ট জাপানের দুর্ভাগা শহর হিরোশিমা হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞের প্রথম শিকার, দ্বিতীয় শিকার হলো নাগাসাকি, ঠিক তিন দিন পর! যে সভ্যতা মানুষকে শিক্ষা দেয় শুধু বর্বরতা, ধিক তাকে ধিক! যে বিজ্ঞান, যে প্রযুক্তি মানুষের জন্য বয়ে আনে এমন ধ্বংস, এমন মৃত্যু, ধিক তাকে শত ধিক!

বোমাবিস্ফোরণের মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ মানুষের বিশাল সমৃদ্ধ জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে গেলো। না প্রাণ অবশিষ্ট ছিলো, না কোন প্রাণী; না মাকান অক্ষত ছিলো, না কোন 'মাকীন'। চোখের পলকে মানুষ, পশু, জড়পদার্থ সব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো। বিস্ফোরণের বিকট 'ধামাকা', আলোর তীব্র ঝলকানি, বাতাসের চাপ ও ধোঁয়া সব মিলিয়ে বলা যায়, জাহান্নামের বিভীষিকা ছিলো। ধূলোবালি ও ধোঁয়ার কয়েক মাইলব্যাপী যেন সুউচ্চ এক পাহাড়, যার নীচে জ্বলছে জাহান্নামের আগুন, যা সবকিছুকে, শাব্দিক অর্থেই সবকিছুকে, ছাইভষ্মে পরিণত করে ফেলেছে।

নিক্ষিপ্ত বোমার ধ্বংসলীলা উপভোগ করার লোভ ছিলো বিমানচালকের, কিন্তু বোমা ফেলেই তাকে সরে যেতে হয়েছে নিরাপদ দূরত্বে। নইলে বিমান ও চালক 'গলিত পদার্থ' হয়ে নীচে পড়ে যেতো। বোমার ধামাকা এত বিকট ছিলো যে, বোমাবর্ষণকারীদেরও অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছিলো। ভয়-ভীতি ও হতভম্বতার অবস্থার মুখ থেকে 'হায় খোদা'—এই একটিমাত্র শব্দই বের হতে পেরেছিলো। কিন্তু মিশনের সফলতার খবর শোনামাত্র মিত্রশক্তির শিবিরে শুরু হয়ে গিয়েছিলো নৃত্য ও আনন্দ-উল্লাস। ধ্বংস ও উল্লাসের এ বীভৎস দৃশ্য শয়তানের জন্য ছিলো কত না আনন্দের!

১৯৪৫ সালের ২০শে আগস্ট হিরোশিমার নগরপ্রধান এক বিবৃতিতে বলেছেন, ৬ই আগস্টে তাৎক্ষণিকভাবে যারা এ বোমার নির্মম বলি হয়েছে তাদের সংখ্যা দু'লাখ দশ হাজার থেকে চল্লিশ হাজার।

মিস্টার স্টুয়ার্ট গিল্ডার ভারতের স্টেটম্যান পত্রিকার ১৬ই সেপ্টেম্বর (১৯৪৫) সংখ্যায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে এটম বোমার ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে লিখেছেন—
'যদিও বিশদ বৃত্তান্ত জানা ছিলো না, তবু বিজ্ঞানীরা এতটুকু অবশ্যই জানতেন, যে বোমা তারা ফেলতে যাচ্ছেন তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এই হবে যে, মানবতার ধ্বংস রোধ করা আর সম্ভব হবে না। বিশদ বিবরণ জানতে হলে হিরোশিমার ধ্বংসপরবর্তী যেসব রিপোর্ট সংবাদদাতাদের হাতে এসেছে তা দেখুন। বোমা বিস্ফোরণের এটমিক প্লেগ সম্পর্কে তারা লিখেছেন—
'বহু মানুষ, যারা বোমার বিস্ফোরণ ও তাপবিকিরণের প্রতিক্রিয়ায় তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করেনি, তারা এখন নিয়মিত মারা যাচ্ছে এবং মৃত্যুর কারণ এই যে, তাদের রক্ত 'বিশ্লিষ্ট' হয়ে যায়। প্রথমে শ্বেত কণিকা, পরে লোহিত কণিকা ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের চুল পড়ে যায়, আর যত দিনই বেঁচে থাকে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শুকিয়ে যেতে থাকে। এভাবে ক্রমে মৃত্যুর থাবা এগিয়ে আসে এবং তারা মৃত্যুর শিকার হয়। এর কারণ, সম্ভবত বিস্ফোরণের পর বাতাসে কিছু তেজস্ক্রিয় পদার্থ রয়ে গেছে এবং দেহের ত্বকে শোষিত হয়ে বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে অনুপ্রবেশ করছে।'

'এ খবর সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এর আগ পর্যন্ত পৃথিবী এ বোমার ভয়াবহতা সম্পর্কে যেমন কিছু জানতো না তেমনি তেজষ্ক্রিয়তার ক্ষতি সম্পর্কেও অবগত ছিলো না, কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো ত্রিশবছর আগেই জানতেন, এটা হবে এমন এক মারণাস্ত্র যার কোন প্রতিরোধ ও পাল্টা ব্যবস্থা নেই, যা পক্ষ-প্রতিপক্ষ সমগ্র মানবজাতির জন্য ধ্বংসকর প্রমাণিত হতে পারে।'

'জাপানীরা নাকি তেজষ্ক্রিয়তার প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য গৃহে প্রস্তুত মুখোশ ব্যবহার করেছে। সম্ভবত এগুলো হচ্ছে প্রচণ্ড শীত থেকে রক্ষার মুখাবরণ, যা তারা এত দিন ব্যবহার করে এসেছে, কিন্তু তা কোন কাজেই আসেনি; যেমন কাজে আসেনি ইথিওপীয় বাহিনীর নাক-পেঁচানো রুমাল, যা তারা হানাদার মুসোলিনীয় বাহিনীর বিমান থেকে ছোঁড়া বিষাক্ত গ্যাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করেছিলো।'

'বোমা নিক্ষেপকারী বৈমানিকের মতে বিস্ফোরণের পর ধূলো ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী শূন্যে নয় মাইল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিলো। প্রফেসর প্লেসেস বলেন, বিস্ফোরণ-ক্ষেত্র থেকে একশ মাইল দূরের লোকেরাও এর মরণছোবল থেকে নিরাপদ নয়। সুতরাং তাদেরও মেডিকেল পরীক্ষা হওয়া দরকার এবং নিবিড় বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে রেখে দেখা দরকার, কোনভাবে তারা তেজস্ক্রিয়তার শিকার হয়েছে কি না। এটা মোটেও অসম্ভব নয় যে, পৃথিবীর মানুষ এক ভোরে ঘুম থেকে জেগে খবরের কাগজে পড়বে, জাপান থেকে হাজার মাইল দূরের বসতিতেও এটমিক প্লেগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। একটি ছোট্ট এটম বোমার ধোঁয়া ও ধূলা যদি নয় মাইল পর্যন্ত পরিবেশকে বিষাক্ত করতে পারে তাহলে এটা ভাবা খুবই যৌক্তিক যে, আরো বড় বোমা আরো বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে প্রভাব ফেলবে।'

বার্মিঙহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম, ভি ওলে ফিনেট এটমবোমা শিল্প-সংস্থার সদস্য, বলেন—
'কেউ যদি এটা ভাবে তাহলে খুবই হাস্যকর হবে যে, ব্রিটেন বা অন্য কেউ এটমবোমার কৌশল ও রহস্য গোপন রাখতে পারবে। যে সব সূত্রের উপর ভিত্তি করে এ বোমা তৈরী হয়েছে তা এখন প্রতিটি দেশের জন্য 'খোলা পাতা'। ব্রিটেন ও আমেরিকা পূর্ববর্তীদের জ্ঞান-অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পারমাণবিক শক্তি অর্জন করেছে। তো নির্দ্বিধায় বলা যায়, একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর তা সামরিক গোপনীয় বিষয় কিছুতেই থাকবে না, বরং প্রতিটি শিল্পোন্নত দেশ সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের মধ্যে এ বোমা বানাতে পারবে। আর যদি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সর্বশক্তি এ প্রকল্পেই নিয়োজিত করা হয় তাহলে দু'বছরই যথেষ্ট।'

তিনি আরো বলেন, 'আমি নিশ্চিত যে, অচিরেই বিশ্ব এমন বোমা দেখতে পাবে যা প্রথমটির চেয়ে দশ হাজার টন বেশী বিস্ফোরকশক্তির অধিকারী হবে। এর পর আসবে এমন বোমা যার বিস্ফোরণ শক্তি হবে দশলক্ষ টন। কোন সতর্কতা ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাই তখন কাজে আসবে না। আর এধরনের মাত্র ছয়টি বোমা পুরো ইংল্যান্ডকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট। রুশবোমাও এখন আর খুব দূরে নয়।'

সম্প্রতি আমেরিকা আরেকটি বোমা উদ্ভাবনে সফল হয়েছে, হাইড্রোজেন বোমা, যার শক্তি ও ধ্বংসকরতা এটম বোমা থেকে অনেক বেশী। ১৯৫৪ সালের ২৬শে মার্চ প্রশান্ত মহাসাগরে দ্বিতীয়বারের মত এর পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। প্রতিরক্ষা সচীব মিস্টার চার্লস ই উইলসন বলেছেন, পরীক্ষার ফল ছিলো অবিশ্বাস্য পর্যায়ের। আমেরিকার পারমাণবিক শক্তি কমিশনের প্রধান মিস্টার লুইস স্ট্রাস বলেন, একটি হাইড্রোজেন বোমা নিউইয়র্কের মত বিশাল শহর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারে। প্রখ্যাত প্রকৃতি-বিজ্ঞানী এবং নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান, সাহেব সিং নতুন দিল্লীতে বলেছেন, চারটি হাইড্রোজেন বোমা, যার প্রতিটির ওজন একশ টন, ভূপৃষ্ঠের প্রতিটি মানবসন্তানকে হত্যা করার জন্য যথেষ্ট। আর সর্বশেষ খবরে প্রকাশ, রাশিয়া নাইট্রোজেন বোমা উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে যার ধ্বংস-বীভৎসতা হাইড্রোজেন বোমা থেকে অনেক বেশী।

টিকাঃ
১. guide to modern wickedness, p. 241
২. guide to modern wickedness, p. 261
৩. প্রফেসর জুড যে সময়ের কথা বলছেন, 'ছবি কথা বলে', এটাই ছিলো তখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সর্বশেষ উন্নতি। কিন্তু আমাদের কাছে এখন খুবই সাদামাটা কথা। আজকের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি তো দূর মহাকাশে বিচরণ করছে, এমনকি মঙ্গল গ্রহ ছাড়িয়ে আরো দূরের অভিযাত্রার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, পক্ষান্তরে নীতি ও নৈতিকতা এবং আত্মা ও আত্মিকতার ক্ষেত্রে এই মহাশূন্যচারী মানুষের দৈন্য দারিদ্র্য আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রফেসর জুড যদি বেঁচে থাকতেন, হয়ত দু'টো বিষয়ই তাকে আরো বেদনাহত করতো। (অনুবাদক)
৪. guide to modern wickedness, p. 293
৫. guide to modern wickedness, p. 247
৬. guide to modern wickedness, p. 292
৭. man the unknown, p. 33
৮. man the unknown, p. 38

📘 মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো 📄 চতুর্থ পরিচ্ছেদ: যা খবীছ তা খবীছ ছাড়া আর কী দেবে?

📄 চতুর্থ পরিচ্ছেদ: যা খবীছ তা খবীছ ছাড়া আর কী দেবে?


বিভিন্ন ঐতিহাসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও স্বভাবগত অনিবার্য কারণে ইতিহাসের প্রাচীনতম সময় থেকেই জড়বাদ ও বস্তুবাদই হয়ে পড়েছিলো পাশ্চাত্যের জীবন ও সভ্যতার প্রতীক। ইউরোপের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নব-উত্থান সেটাকে নতুন গতি ও শক্তি দান করেছে মাত্র।

যা খবীছ তা খবীছ ছাড়া আর কী দেবে?

উপরে বর্ণিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এটা স্পষ্ট যে, ইউরোপীয় সভ্যতার বুনিয়াদ এখন নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। দিন দিন তার উচ্চতা যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা ও পতনঝুঁকি ততই বেড়ে চলেছে। আর এটাই স্বাভাবিক। কারণ এ সভ্যতার বীজ নষ্ট বীজ; সুতরাং তার বৃক্ষ যেমন ভালো হতে পারে না তেমনি তার ফলও উত্তম হতে পারে না।
وَالْبَلَدُ الطَّيِّبُ يَخْرُجُ نَبَاتُهُ بِإِذْنِ رَبِّهِ وَالَّذِي خَبُثَ لَا تَخْرُجُ إِلَّا نَكِدًا
'আর উত্তম শহর, তার উদ্ভিদ (উত্তমরূপে) অঙ্কুরিত হয়, কিন্তু যা নিকৃষ্ট তা তো নিকৃষ্ট ছাড়া আর কোনরূপে অঙ্কুরিত হতে পারে না।' (আল-আ'রাফ, ৭: ৫৮)

উপমহাদেশের প্রখ্যাত এক মুসলিম স্কলার সংক্ষেপে বিষয়টি এভাবে তুলে ধরছেন—
'যে ভূখণ্ড ও জনগোষ্ঠীতে পাশ্চাত্য সভ্যতার আত্মপ্রকাশ, সেখানে আসমানি হিকমত ও ঐশী প্রজ্ঞার কোন স্বচ্ছ ও সুমিষ্ট ঝর্ণাধারা ছিলো না (যা হৃদয় ও আত্মার পিপাসা নিবারণ করতে পারে, যার সম্পর্কে বলা যায়, 'একবার পান করে আর পিপাসা ধরে না')। সেখানে ধর্মনেতা কম ছিলেন না, কিন্তু তাদের কাছে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আসমানি শরী'আত ছিলো না; ছিলো ধর্মের কিছু আবছা ছায়া, যা চিন্তা ও কর্মের সরল পথে মানবজাতিকে পরিচালিত করতে যদি ইচ্ছাও করতো, পারতো না। তবে ধর্ম নামের ঐ বস্তুটির উচিত ছিলো না জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধক ও 'হোঁচটখাওয়া পাথর' হওয়া, কিন্তু তাই হয়েছিলো। ফলে, যারা বিজ্ঞানের অভিযাত্রায় বদ্ধপরিকর ছিলো তারা ধর্মের জোয়াল ছুঁড়ে ফেলে দিলো এবং একটি পথ ও পন্থা গ্রহণ করলো যেখানে অবলোকন ও পরীক্ষা এবং গবেষণ ও নীরিক্ষা ছাড়া তাদের আর কোন প্রমাণ ও প্রদর্শক ছিলো না। এই প্রমাণ ও প্রদর্শক-এর উপরই তারা নিঃশর্ত আস্থা স্থাপন করেছিলো, অথচ এগুলো নিজেই ছিলো প্রমাণসাপেক্ষ এবং হিদায়াত ও নূরের মুহতাজ। অবলোকন, নিরীক্ষণ ও পরীক্ষণ—এসব প্রমাণের ভিত্তিতেই তারা চিন্তা-গবেষণা, সন্ধান-অনুসন্ধান ও নির্মাণ-বিনির্মাণের পথে অগ্রসর হলো এবং চেষ্টা-সাধনায় আত্মনিয়োগ করলো। কিন্তু প্রতিটি দিকে, প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের প্রথম পদক্ষেপই ছিলো ভ্রান্ত। ফলে জ্ঞানসাধনার সর্বঅঙ্গনে তাদের অভূতপূর্ব সফলতা এবং চিন্তা-গবেষণার পথে তাদের সব প্রয়াস-প্রচেষ্টা তাদেরকে সঠিক লক্ষ্যে উপনীত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো।

তারা যাত্রা শুরু করলো জড়বাদ ও নাস্তিকতা, এই বিন্দু থেকে। বিশ্বজগতকে তারা দেখলো এই বিশ্বাস থেকে যে, এর কোন স্রষ্টা নেই এবং অবলোকন ও অনুভবের বাইরে কোন কিছুর উপস্থিতি নেই। এই যে দৃশ্য পর্দা, এর আড়ালে অদৃশ্য কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তারা প্রকৃতির নীতি ও সূত্র অনুধাবন করতে তো সক্ষম হলো, কিন্তু প্রকৃতির নিয়ন্তা-শক্তির পরিচয় অর্জনে ব্যর্থ হলো। বিদ্যমান বস্তু, পদার্থ ও ব্যবস্থাকে তারা 'নিয়ন্ত্রিত' দেখতে পেলো এবং বিভিন্ন কাজেও লাগালো, কিন্তু ভুলে গেলো যে, তারা এগুলোর মালিক নয়, প্রকৃত মালিকের প্রতিনিধিমাত্র। তাই তাদের মনেই হলো না যে, এ বিষয়ে তাদের কোন দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা আছে এবং কোন ঊর্ধ্বশক্তির কাছে তাদের জবাবদেহি করতে হবে। ফলে তাদের সভ্যতার ভিত্তিতেই গলদ রয়ে গেলো। স্রষ্টার উপাসনা ছেড়ে তারা মেতে উঠলো আত্মপূজায়। প্রবৃত্তিই হলো তাদের উপাস্য, যা তাদের নিক্ষেপ করলো এক মহাফিতনার আবর্তে, যা থেকে উদ্ধারের কোন উপায় থাকলো না। বরং মন-মনন ও চিন্তা-চেতনার সব ক্ষেত্রেই আপাত সুন্দর, কিন্তু বড় ভয়ঙ্কর পথে তারা এগিয়ে গেলো, যার পরিণতি ধ্বংস ছাড়া আর কিছু নয়।

এটাই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে বিকৃত ও বিনষ্ট করেছে। ফলে মানব-কল্যাণের মাধ্যম না হয়ে তা হয়ে পড়েছে মানবতার ধ্বংসের বাহন। এবং আখলাক ও চরিত্র হয়ে পড়েছে খাহেশাত ও প্রবৃত্তির অনুগামী এবং নগ্নতা ও স্বেচ্ছাচারের অপর নাম। সর্বোপরি জীবন ও জীবিকা এবং সমাজ ও সামাজিকতা, সবকিছুর উপর চেপে বসেছে কৃপণতা, স্বার্থপরতা, নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার শয়তান। শিরায় শিরায় প্রবাহিত হচ্ছে আত্মপূজা, আত্মকেন্দ্রিকতা, আত্মঅহমিকা ও ভোগ-লালসা। একারণেই রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতিতে চলছে বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের জিঘাংসা ও উন্মাদনা, চলছে শক্তিদেবতার পূজা ও বন্দনা, যা মানবতার জন্য আজ সবচে' বড় অভিশাপ।

মোটকথা, নবজাগরণের পর ইউরোপের মাটিতে যে দুষ্ট বীজ বপন করা হয়েছিলো, কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই তা এক বিরাট বিষবৃক্ষের রূপ ধারণ করে ফেলেছে এবং স্বাভাবিক ফল দিতে শুরু করেছে, যা বাইরে সুন্দর, কিন্তু ভিতরে তিতা ও বিষে ভরা, যার শাখা-প্রশাখা সবুজ পাতায় ছাওয়া, কিন্তু তা অক্সিজেন নির্গত করে না, বিষাক্ত গ্যাস ছড়ায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহের রক্তে গিয়ে মিশে যায়।

পাশ্চাত্য জাতি, যারা নিজেরাই এ দুষ্ট বৃক্ষ রোপণ করেছে, এর বিষাক্ততায় আজ অতিষ্ঠ ও দিশেহারা হয়ে পড়েছে। কেননা জীবনের সর্বক্ষেত্রে তা অসংখ্য সমস্যা ও সঙ্কট সৃষ্টি করেছে এবং করে চলেছে। হয়ত তারা একটি সমস্যার সমাধান করে, কিন্তু সেখান থেকে নতুন নতুন সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। একটি ডাল যদি বা কাটে, সেখান থেকে আরো অসংখ্য ডাল-কাঁটা গজিয়ে ওঠে। তাদের অবস্থা হয়েছে সেই হতভাগ্য চিকিৎসকের মত যে রোগ দিয়ে রোগের চিকিৎসা করে এবং কাঁটা দিয়ে কাঁটারের আঘাত সারাতে চায়। তারা যখন পূজিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো তখন কমিউনিজম জন্ম নিলো। যখন গণতন্ত্রের মূলোৎপাটন করতে চাইল তখন একনায়কত্ব আজদাহার মত মুখ হা করলো। যখন সামাজিক সঙ্কটের সমাধান করার চেষ্টা করলো, তখন সমাধান তো হলোই না, বরং দানা বেঁধে উঠলো নারীর পুরুষায়ণ ও জন্মনিরোধ আন্দোলন। নৈতিক অনাচার দূর করার জন্য যখন আইন ও বিধান তৈরী করলো তখন অপরাধ ও আইন অমান্যের প্রবণতা হলো সর্বগ্রাসী। ফলে একটি মন্দ আরেকটি মন্দকে এবং একটি ফাসাদ আরো বড় ফাসাদকেই শুধু ডেকে আনতে লাগলো। এভাবে এ বিষবৃক্ষ তাদের জীবনে বিষ ও বিষাক্ত কাঁটাই শুধু ছড়িয়ে চলেছে এবং নিত্য নতুন বিপদ ও বিপর্যয় ডেকে আনছে। ফলে পাশ্চাত্যের সমাজদেহ আজ তাদের চিন্তানায়ক ও বিদগ্ধ পণ্ডিতদের মতেও দগদগে ঘা ও পূজপূর্ণ ক্ষতে এমনভাবে ভরে গেছে যে, ক্ষত ধোয়া ও মলম লাগানোরও উপায় নেই—

'তান হামা দাগ দাগ শুদ, পুম্বা কুজা কুজা নিহাম'—সারা দেহে ক্ষত, তুলো ও মলম লাগাব কোথায়?

রোগ-ব্যাধি এখন চিকিৎসককেই যেন দিশেহারা করে ফেলেছে এবং ছেঁড়া-ফাড়া রিফুকারীকে হতভম্ব করে ফেলেছে। পাশ্চাত্য আজ রোগে, শোকে, ব্যথায়, যন্ত্রণায় কাতর। অস্থিরতায় শুধু ছটফট করছে, কিন্তু উপশমের উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। তার হৃদয় শান্তির জন্য ব্যাকুল এবং তার আত্মা অমৃতজলের জন্য পিপাসার্ত, কিন্তু জানা নেই কোথায় জল ও জলাশয়?! কোথায় অমৃত, কোথায় আবেহায়াত?!

পাশ্চাত্যের বিদগ্ধ সমাজের সাধারণ ধারণা, সমস্যার উৎস হচ্ছে গাছের ডাল-পালায়। তাই তারা ডাল-পালা কাটতেই ব্যস্ত এবং এতেই তাদের সময়, শ্রম ও মেধার অপচয় ঘটছে। তারা জানে না, কিংবা জানতে চায় না যে, ফাসাদ ও নষ্টতা ডাল-পালায় নয়, গাছের গোড়ায়। আর এটা কোন বিচক্ষণতা ও বুদ্ধি-মত্তার পরিচয় নয় যে, নষ্ট বীজ থেকে উত্তম বৃক্ষ এবং মন্দ মূল থেকে উত্তম শাখা আশা করা হবে।

কতিপয় জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি অবশ্য সত্য অনুধাবন করতে পেরেছে, কিন্তু যেহেতু তারা বহু শতাব্দী ধরে এই বিষবৃক্ষের বিষাক্ত ছায়ায় প্রতিপালিত হয়েছে এবং এর ফল দ্বারা তাদের অস্থি-মাংস তৈরী হয়েছে তাই তারা চাইলেও বিষবৃক্ষের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। দুর্বল চিন্তা ও অসুস্থ বুদ্ধি তাদের একথা ভাবারই সুযোগ দিচ্ছে না যে, জীবন ও সভ্যতার নতুন নির্মাণের জন্য নতুন কোন ভিত্তি ও বুনিয়াদ থাকতে পারে, কিংবা থাকতে পারে অন্য কোন সুস্থ বীজ যা থেকে জন্ম লাভ করবে একটি উত্তম বৃক্ষ, যার প্রতিটি শাখা-প্রশাখা হবে উত্তম, প্রতিটি ফল-পাতা হবে উত্তম। এজন্য উভয় পক্ষের পরিণামই হচ্ছে অভিন্ন। উভয় পক্ষই সন্ধান করছে রোগ নিরাময়ের সঠিক উপায়, কিন্তু কেউ জানে না, প্রকৃত আরোগ্য কোথায়?'¹

টিকাঃ
১. তানকীহাত, প্রবন্ধ 'যুগের ব্যাধিগ্রস্ত জাতিসমূহ', মাওলানা মওদূদী, পৃ. ২৪, ২৫, ২৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px