📄 তৃতীয় পরিচ্ছেদ: আলমে ইসলামে উছমানী খেলাফতের উত্থান
ইতিহাসের মঞ্চে তুর্কী শক্তির আগমন
অষ্টম শতাব্দীর ঐ সঙ্কট-সন্ধিক্ষণে ইতিহাসের মঞ্চে একটি অপ্রতিহত শক্তিরূপে ওছমানিদের আবির্ভাব ঘটলো এবং তারা ইতিহাসের গতিধারার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলো। সাতশ তেপ্পান্ন হিজরীতে (১৪৫৩ খৃঃ) খলীফা মুহম্মদ ছানী বিশাল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অপরাজেয় রাজধানী কনস্টান্টিনোপল পদানত করলেন। তখন তিনি 'সতের বছরের তরুণ' না হলেও মাত্র চব্বিশ বছরের টগবগে যুবক। কনস্টান্টিনোপল জয়ের মাধ্যমেই তিনি মুহম্মদ আলফাতিহ বা বিজয়ী মুহম্মদ উপাধিতে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
এই অভাবিতপূর্ব বিজয়ের ফলে মুসলিম উম্মাহর নির্জীব দেহে নতুন করে আশা-উদ্দীপনা ও প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো। ইসলামও যেন নতুন গতি ও শক্তি লাভ করলো। মুসলিম উম্মাহর অন্তরে আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হলো যে, ওছমানী খেলাফতের নেতৃত্বে তুর্কী জাতি বিশ্বের বুকে মুসলিম উম্মাহর হারানো শক্তি ও গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবে, আর মুসলিম উম্মাহ বিশ্বনেতৃত্বের আসনে পুনঃসমাসীম হবে। সাহসে ও শৌর্যবীর্যে তুর্কীরা যেমন ছিলো অতুলনীয় তেমনি যুদ্ধাস্ত্র ও সমরকুশলতায় তাদের উদ্ভাবনী প্রতিভা ছিলো ঈর্ষণীয়। বস্তুত বাইজান্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপল, যা সুদীর্ঘ আটশ বছর মুসলিমশক্তির সামনে ছিলো অপরাজেয়,¹ তুর্কীরা তা পদানত করে তাদের যোগ্যতা ও শক্তিমত্তার বাস্তব প্রমাণও রেখেছিলো। সমর-নেতৃত্ব ও যুদ্ধপরিচালনায় তাদের কুশলতা ও সৃজনশীলতা দূরের কাছের সবাই দেখতে পেয়েছিলো। ফলে সমকালীন বিশ্ব সর্বক্ষেত্রে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছিলো। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের পথে জ্ঞান ও কর্মশক্তিকে তারা সর্বোচ্চরূপেই ব্যবহার করেছিলো, যা বিশ্বে কোন জাতির শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের অপরিহার্য শর্ত।
সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ড্রপার মুহম্মদ আলফাতিহ-এর সমরকুশলতাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেছেন, 'গণিতশাস্ত্র (ও অন্যান্য জ্ঞানে) তিনি পারদর্শী ছিলেন এবং যুদ্ধবিদ্যায় সেগুলোর সুপ্রয়োগ জানতেন। বস্তুত এ বিজয়ের জন্য তাঁর পূর্ণ প্রস্তুতি ছিলো এবং যুদ্ধের সকল আধুনিক সরঞ্জাম তিনি পূর্ণ কুশলতার সঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন।'
জনৈক পর্যটক কনস্টান্টিনোপলজয়ের কাছাকাছি সময়ে মুহম্মদ আলফাতিহ-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তিনি তাঁর দেহাবয়ব, মহামানবোচিত চরিত্র এবং তাঁর বিস্তৃত জ্ঞান ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আলোচনার পর বলেন—
'মাত্র ছাব্বিশ বছরের যুবক',¹ কিন্তু ইটালী, তার রাজধানী এবং সম্রাট সম্পর্কে তাঁর আলোচনা অত্যন্ত বাস্তবানুগ ও নিখুঁত তথ্যভিত্তিক! ইউরোপে কত শত দেশ! অথচ তাঁর সামনে রয়েছে সেগুলোর বিস্তারিত মানচিত্র, প্রতিটি দেশ-অঞ্চল তাতে সুস্পষ্ট। বিশ্বপরিস্থিতি ও যুদ্ধশাস্ত্রের মত প্রিয় ও আনন্দদায়ক আর কোন আলোচনার বিষয় তাঁর কাছে নেই। বিষয় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে খুবই বিচক্ষণ ও সুবিজ্ঞ। শাসনকার্যে একনিষ্ঠ ও টগবগে। দেখো, ইনি সেই ব্যক্তি, যার মোকাবেলা করতে হবে আমাদের খৃস্টান-বিশ্বকে! অত্যন্ত সতর্ক, অত্যন্ত তীক্ষ্ণ তাঁর পর্যবেক্ষণ। শীত-গরম, ক্ষুধা-পিপাসা ও সর্বপ্রকার কষ্ট সহ্য করতে সক্ষম। তাঁর ভাষায়, সময় এখন গতি পরিবর্তন করেছে; তাই তিনি পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাত্রা করছেন, অতীতে যেমন পশ্চিমারা পূর্বদিকে যাত্রা করেছিলো। তিনি বলেন, বিশ্বের সাম্রাজ্য একটিমাত্র হওয়া উচিত; একটিমাত্র ধর্ম এবং একটিমাত্র দেশ। আর এই ঐক্য সম্পন্ন করার জন্য পৃথিবীতে কনস্টান্টি-নোপলের চেয়ে উপযুক্ত স্থান আর কোনটি নেই।
পশ্চিমা লেখক baron carra de vaux তার সুবিখ্যাত islamic thinkers গ্রন্থে বলেন, ‘মুহম্মদ আলফাতিহ-এর এ বিজয় নিছক ভাগ্যের উপহার ছিলো না, কিংবা ছিলো না শুধু প্রতিপক্ষ শক্তির দুর্বলতার ফল, বরং এজন্য দীর্ঘকাল তিনি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন এবং সমকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সব শক্তি ব্যবহার করেছেন।¹ কামান ছিলো তখন সদ্য-উদ্ভাবিত যুদ্ধাস্ত্র। আর তিনি জনৈক হাঙ্গেরীয় প্রকৌশলীর সাহায্যে বিশ্বের সর্ববৃহৎ কামান তৈরী করেছিলেন, যাতে তিনশ কিলোগ্রাম ওজনের গোলা এক মাইলের বেশী দূরে নিক্ষেপ করা যেতো। বলা হয়, ঐ কামান চালাতো সাতশ লোক, আর তা বাবুদবোঝাই হতো দু'ঘণ্টায়।
কনস্টান্টিনোপল অভিযানকালে মুহম্মদ আলফাতিহ-এর অধীনে ছিলো তিন লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী এবং অতি শক্তিশালী কামানবহর। আর সমুদ্রের দিক থেকে শহর অবরোধকারী নৌ-বহরে যুদ্ধজাহায ছিলো একশ বিশটি। তিনিই সেই মহান সমরকুশলী যিনি আপন উদ্ভাবনী প্রতিভাবলে স্থলপথে নৌজাহায চালিয়ে উপসাগরে নামানোর পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছিলেন, শত্রু-পক্ষের কাছে যা ছিলো অকল্পনীয়। বহুকাষ্ঠখণ্ড চর্বিত করে তার উপর দিয়ে সত্তরটি জাহায টেনে নিয়ে তিনি 'কাসিমপাশা'র সাগরজলে নামিয়েছিলেন। পরিখাযুদ্ধে কোরায়শ বাহিনী যেমন মদীনার তিনদিকের পরিখা দেখে হতবাক হয়েছিলো, প্রায় তেমনি হতবাক হয়েছিলো বাইজান্টাইন বাহিনী কাসিম-পাশার সাগরজলে তুর্কীদের নৌবহর দেখে! হাঁ, এই অভাবিতপূর্ব সমরকৌশলের কোন জবাব তাদের কাছে ছিলো না, শুধু দেখে থাকা ছাড়া।
তুর্কী জাতির কতিপয় গুণ ও বৈশিষ্ট্য
সমগ্র মুসলিম উম্মাহর মধ্যে তুর্কী জনগোষ্ঠী তখন এমন কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলো, যাতে সঙ্গত কারণেই তারা হয়ে উঠেছিলো মুসলিমবিশ্বের নেতৃত্ব লাভের যোগ্য হকদার।
প্রথমত তারা ছিলো উদীয়মান, উচ্চাভিলাষী ও প্রাণচাঞ্চল্যে পরিপূর্ণ একটি জাতি। তাদের মধ্যে ছিলো সত্যিকার জিহাদী চেতনা। তাছাড়া জীবনযাপনের ক্ষেত্রে স্বভাব ও প্রকৃতির নিকটবর্তী হওয়ার কারণে তারা ঐ সমস্ত নৈতিক ও সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্ত ছিলো, যাতে প্রাচ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীগুলো ছিলো আক্রান্ত।
দ্বিতীয়ত তাদের সামরিক শক্তি ছিলো এমন পর্যাপ্ত যার সাহায্যে তারা ইসলামের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক বিস্তার ঘটাতে এবং যে কোন শত্রুর আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে সক্ষম ছিলো। এককথায় মুসলিম উম্মাহর পক্ষ হতে সমগ্র বিশ্বের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য তারা ছিলো যোগ্যতম এক জনগোষ্ঠী। সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ওছমানীরা আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র, বিশেষত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার প্রতি মনোযোগী ছিলো। তাদের কামানগুলো ছিলো অধিকতর দূরপাল্লার। আর অস্ত্রাগারে ছিলো সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। সামরিক প্রশিক্ষণ, যুদ্ধকৌশল উদ্ভাবন, সেনা-বাহিনীর আধুনিক বিন্যাস ইত্যাদি সকল বিষয়ে তারা পূর্ণ যত্নবান ছিলো। ফলে যুদ্ধবিদ্যা ও সমরবিজ্ঞানে তারাই ছিলো শ্রেষ্ঠ এবং ইউরোপের আদর্শ। তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করার সাধ্য ছিলো না কারো।
তাদের সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিলো ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা—এই তিন মহাদেশে। ইসলামী প্রাচ্যের পারস্য থেকে মরক্কো পর্যন্ত ছিলো তাদের শাসন এবং এশিয়া মাইনর ছিলো তাদের অধিকারে। অন্যদিকে ইউরোপে তাদের অগ্রাভিযান ভিয়েনার প্রাচীরে আঘাত হেনেছিলো। সমগ্র ভূমধ্যসাগরে তারাই ছিলো অপ্রতিদ্বন্দ্বী নৌশক্তি; অন্য কোন নৌশক্তির সেখানে প্রবেশাধিকার ছিলো না। তুর্কী খলীফার দরবার 'আলবাবুল আলী'তে নিযুক্ত পিটার দ্যা গ্রেট-এর প্রতিনিধি এক পত্রে বলেন, 'সুলতান কৃষ্ণসাগরকে মনে করেন তার নিজস্ব অধিকার, যেখানে নেই অন্য কারো প্রবেশাধিকার।'
তাদের নৌবহর ছিলো এত বিশাল, যা ইউরোপের সম্মিলিত শক্তির কাছেও ছিলো না। ৯৪৫ (১৫৪৭ খৃঃ) হিজরীতে পোপের আহ্বানে ভেনিস, স্পেন, পুর্তগাল ও মাল্টার সম্মিলিত নৌশক্তি তুর্কী নৌবহরকে পরাস্ত করার অপপ্রয়াস চালিয়ে উল্টো পর্যদুস্ত হয়েছিলো। তুর্কী নৌসেনাদের নিক্ষিপ্ত গোলার আঘাতে শত্রুপক্ষের অধিকাংশ জাহাজ সাগরে ডুবে গিয়েছিলো, আর বহু সৈন্য 'সাগর-সমাধি' লাভ করেছিলো।
খলীফা সোলায়মান আলকানূনী-এর শাসনকালে তুর্কিদের যেমন জলভাগ ও স্থল-ভাগে ছিলো নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব, তেমনি ছিলো অখণ্ড রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব-প্রতিপত্তি। ওছমানী সালতানাত তখন উত্তরে সাভা নদী, দক্ষিণে নীলনদের উৎসমুখ ও ভারতসাগর, পূর্বে ককেসাস পর্বতশ্রেণী এবং পশ্চিমে আটলাস পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। তুর্কী নৌবহরে জঙ্গিজাহাযের সংখ্যা ছিলো তিন হাজারের বেশী। একমাত্র রোম ছাড়া প্রাচীন বিশ্বের সমস্ত প্রসিদ্ধ শহর ছিলো 'আলবাবুল আলী'র অধীন।¹
তুর্কিদের ভয়ে সমগ্র ইউরোপ এমনই কম্পমান ছিলো যে, বড় বড় প্রতাপশালী শাসক তুর্কী সুলতানের ছত্রচ্ছায়ায় থাকাই নিরাপদ মনে করতো। তুর্কী সুলতানদের সম্মানে এমনকি গীর্জার ঘণ্টাধ্বনিও বন্ধ রাখা হতো। মুহম্মদ আলফাতিহ-এর মৃত্যুসংবাদে পোপ তিনদিনব্যাপী জাতীয় আনন্দ ঘোষণা করেছিলেন এবং ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা নিবেদনের জন্য প্রার্থনা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছিলেন। শত্রুপক্ষের সম্রাটের মৃত্যুতে ধর্মীয় পর্যায়ে আনন্দ-অনুষ্ঠানের আয়োজন, সম্ভবত এটা ছিলো ইতিহাসের একমাত্র ঘটনা। এতেই বোঝা যায়, কী পরিমাণ তুর্কীভীতি কাজ করছিলো সমগ্র ইউরোপে এবং স্বয়ং পোপের 'অন্তর-গীর্জায়'।
তৃতীয়ত ভৌগলিক ও কৌশলগত বিচারে তাদের অবস্থান ছিলো তদানীন্তন বিশ্বমানচিত্রের সবচে' গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে, যা বিশ্বকে শাসন করার জন্য ছিলো অতি উপযোগী। কেননা তাতে বলকান উপসাগর থেকে যুগপৎ এশিয়া ও ইউরোপের উপর নজরদারি করা সম্ভব ছিলো। তাদের রাজধানী ইস্তাম্বুল (কনস্টান্টিনোপল) ছিলো ইউরোপ ও এশিয়ার সঙ্গমস্থলে, যেখান থেকে একই সঙ্গে তারা তিন মহাদেশের উপর সহজে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারতো। তাই নেপোলিয়ান বলেছেন, 'কনস্টান্টিনোপলই হচ্ছে কল্পিত 'বিশ্বসাম্রাজ্যের' আদর্শ রাজধানী।' if a world-government ever came to be established, constantinople alone would be an ideal capital for it.²
ইউরোপে তুর্কিদের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলো, আর নিকট ভবিষ্যতে ইউরোপ হতে যাচ্ছিলো 'নবসম্ভাবনা'র অধিকারী। ইউরোপের বুকে তখন নতুন জীবনীশক্তি টগবগ করছিলো এবং উন্নতি-অগ্রগতির যাবতীয় উপকরণ ও কার্যকারণ বিকাশ লাভ করছিলো। তাকদীর যদি চাইতো তাহলে তুর্কিদের জন্য সহজেই সম্ভব ছিলো জ্ঞান, বিজ্ঞান, চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গনে অগ্রসর হওয়া এবং খৃস্টীয় ইউরোপকে ছাড়িয়ে যাওয়া। এমনকি সম্ভব ছিলো বিশ্বনেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা এবং বিশ্বকে ইউরোপীয় ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে রক্ষা করে ন্যায় ও সত্যের পথে পরিচালিত করা, যার বার্তা তারা ইসলামের কল্যাণে আগেই লাভ করেছে।
উত্থানের মধ্যকালেই তুর্কীজাতির পতন
কনস্টান্টিনোপল জয়ের মাধ্যমে মহান বিজেতা মুহম্মদ আলফাতিহ ইতিহাসের গতিধারা তো ঠিক করে দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর উত্তরসূরীদের অযোগ্যতা ও অবহেলায় ইতিহাসের গতি আবার চলে গিয়েছিলো অন্যদিকে। এটা শুধু তুর্কীজাতিরই দুর্ভাগ্য ছিলো না, বরং গোটা মুসলিম উম্মাহর দুর্ভাগ্য ছিলো যে, উত্থান ও উন্নতির মধ্যকালেই তুর্কীরা অধঃপতনের শিকার হলো এবং পূর্ববর্তী জাতিসমূহের রোগ-ব্যাধি তাদেরও মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো। পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ও বিবাদ-কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। শাসকদের মধ্যে দেখা দিলো দ্বন্দ্ব ও অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং স্বেচ্ছাচার ও ভোগের অনাচার। যুবরাজদের শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়লো। চরিত্র ও নৈতিকতায় মারাত্মক অবক্ষয় দেখা দিলো। শাসক, সেনানায়ক ও রাজকর্মচারী, সবার মধ্যে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়লো। দেশ ও জাতি এবং রাজ্য ও সাম্রাজ্যের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতাই হলো তাদের নীতি। এমনকি রাজপুরুষদের অনুগমনে গোটা জাতি বিলাসিতাও ভোগবাদিতার মানসিকতায় আক্রান্ত হলো। এভাবে একটি পতনশীল যাবতীয় দোষ-ব্যাধি ও স্বভাবনষ্টতা তুর্কিদের মধ্যেও দেখা দিলো, যার বিশদ বিবরণ রয়েছে 'তুর্কীজাতির ইতিহাস'গ্রন্থে।¹ এখানে সে আলোচনার অবকাশ নেই।
সবচে' ভয়ঙ্কর যে ব্যাধি তুর্কীজাতির গভীরে শিকড় গেড়ে বসেছিলো তা হলো নির্জীবতা ও স্থবিরতা। এটা যেমন ছিলো জ্ঞান ও শিক্ষার ক্ষেত্রে তেমনি ছিলো যুদ্ধবিদ্যা, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের ক্ষেত্রেও। তারা যেন ভুলেই গিয়েছিলো আসমানের এই অমোঘ নির্দেশ—
وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ وَمِن رَبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوٌّ اللَّهِ وَعَدُوِّكُمْ وَمَاخَرِينَ مِن دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ وَمَا تُنفِقُوا مِن شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنتُمْ لَا تُظْلَمُونَ
'আর তোমরা প্রস্তুত করো তাদের মুকাবেলার জন্য তোমাদের সাধ্যের সকল শক্তি এবং অশ্বদল। তা দ্বারা ভীত-সন্ত্রস্ত করবে তোমরা আল্লাহর শত্রুকে এবং তোমাদের শত্রুকে এবং তাদেরকে ছাড়া আরো কিছু লোককে, যাদের তোমরা চেনো না, আল্লাহ তাদের চেনেন। আর আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদের প্রস্তুতিতে) যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে তার প্রতিদান তোমাদের পূর্ণরূপে দান করা হবে, আর তোমাদের প্রতি কোন অবিচার করা হবে না।' (আনফাল, ৮: ৬০)
এবং ভুলে গিয়েছিলো নবুওয়তের সেই চিরন্তন বাণী—
الحكمة ضالة المؤمن حيث وجدها فهو أحق بها
'জ্ঞান ও প্রজ্ঞা মুমিনের হারানো সম্পদ, যেখানেই সে তা পাবে, সেই হবে তার অধিক হকদার।'¹
আর যেহেতু তাদের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থান ছিলো খুবই নাযুক এবং ইউরোপীয় রাষ্ট্রবর্গ দ্বারা পরিবেষ্টিত সেহেতু সবসময় তাদের স্মরণ রাখা কর্তব্য ছিলো মিশরবিজয়ী ছাহাবী হযরত আমর ইবনুল আছ (রা)-এর সেই শাশ্বত উপদেশ, যা তিনি মিশরে মুসলিম গাজীদর উদ্দেশ্যে প্রদান করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন—
واعلموا أنكم في رباط إلى يوم القيامة لكثرة الأعداء خولكم، وتشوف قلوبهم إليكم وإلى داركم
'মনে রেখো, কেয়ামত পর্যন্ত তোমরা বিপদ ও ঝুঁকির মুখে রয়েছো। তোমাদের অবস্থান হচ্ছে নাযুক এক মোর্চায় সতর্ক প্রহরার অবস্থায়। তোমাদের থাকতে হবে সদাসশস্ত্র। কেননা চারপাশে তোমাদের বিপুল শত্রু, আর তাদের লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে তোমাদের উপর এবং তোমাদের ভূখণ্ডের উপর।'²
কিন্তু আফসোস, তুর্কীজাতি বসে থাকলো, আর সময় এগিয়ে গেলো। তারা পিছিয়ে পড়লো, আর ইউরোপ তাদের ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেলো। তুরস্কের বিদুষী লেখিকা খালিদা এদীব খানম তার জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার যে চিত্র এঁকেছেন এখানে তা তুলে ধরা বেশ উপযুক্ত ও যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। 'তুরস্কে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্ঘাত' গ্রন্থে তিনি বলেন—
'জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির জগতে যত দিন কালামশাস্ত্রীয় দর্শনের কর্তৃত্ব ছিলো তত দিন ওলামা ও জ্ঞানী সমাজ তুরস্কে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সুচারুরূপেই পালন করেছেন। সোলায়মানিয়া মাদরাসা ও মাদরাসাতুল ফাতিহ ছিলো সমকালীন যাবতীয় জ্ঞান ও শাস্ত্রের কেন্দ্র। কিন্তু পাশ্চাত্য যখন ঈশ্বরতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্বের বৃত্ত ভেঙ্গে বের হয়ে এলো এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও নতুন দর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করলো, যার ফলে বিশ্বে এক নতুন বিপ্লব সৃষ্টি হলো তখন মুসলিম ওলামা ও জ্ঞানীসমাজ আধুনিক শিক্ষার দায়িত্ব ও আদর্শ শিক্ষকের কর্তব্যপালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেন। তারা ভাবতেন, জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তি এখনো সেখানেই নিশ্চল আছে যেখানে ছিলো খৃস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে। এই মারাত্মক ভ্রান্তিকর চিন্তা খৃস্টীয় উনিশ শতক পর্যন্ত তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করে ছিলো।
তুরস্ক ও অন্যান্য মুসলিম দেশের বিদ্বানসমাজের এ চিন্তাধারার সঙ্গে ইসলাম ও ইসলামী চেতনার কোন সম্পর্ক ছিলো না। কারণ খৃস্টীয় ঈশ্বরতত্ত্ব বা মুসলিম ইলমুল কালাম, মূলত এর ভিত্তি ছিলো গ্রীক দর্শনের উপর, যাতে এরিস্টটলীয় দর্শনেরই ছাপ ছিলো প্রধান, আর এরিস্টটল ছিলেন পৌত্তলিক দার্শনিক। এখানে সংক্ষেপে আমরা খৃস্টান পণ্ডিত ও মুসলিম ওলামা সমাজের চিন্তাধারার একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা তুলে ধরবো।
কোরআনুল কারীম কখনো প্রকৃতি ও বিশ্বজগতের সৃষ্টিপ্রসঙ্গ বিশদ আলোচনায় আনেনি। কারণ কোরআনী শিক্ষার আসল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নৈতিক ও সামাজিক জীবন। কোরআনের মূল উদ্দেশ্যই হলো ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় এবং কল্যাণ-অকল্যাণের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দেয়া। কারণ কোরআন এসেছে মানুষের জন্য একটি জীবনবিধানরূপে, নিছক জ্ঞান ও শাস্ত্রগ্রন্থরূপে নয়। তাই কোরআন যখনই কোন আধ্যাত্মিক বা অতিপ্রাকৃতিক বিষয় আলোচনা করেছে সেখানে বলতে গেলে কোন জটিলতা বা অস্পষ্টতাই আমাদের চোখে পড়ে না। কোরআনী শিক্ষার ভিত্তিই হলো তাওহীদ বা একত্ববাদ। তাই (বিশ্বাসগত দিক থেকেও) ইসলাম একটি সহজ-সরল, নির্জটিল ও উদার ধর্মরূপে পরিচিত হয়েছে।
বিশ্বজগত সম্পর্কে নতুন নতুন চিন্তাধারা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ইসলাম অন্যান্য ধর্মের চেয়ে অনেক উদার ছিলো। কিন্তু এই সরলতা ও উদারতা, যা নতুন জ্ঞান-গবেষণার জন্য সহায়ক হতে পারতো মুসলিমদের জীবনে তা দীর্ঘ সময় বহাল ছিলো না। হিজরী নবম শতকে মুসলিম ওলামা ও কালামবিদগণ ফিকাহ তো বটেই, এমনকি ঈশ্বরতত্ত্বীয় আলোচনাকেও বিচিত্র নিয়ম-নীতি ও বিধি-বন্ধনের বেড়াজালে আবদ্ধ করে ফেলেছিলেন। ফলে ইজতিহাদ ও গবেষণার দুয়ার বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। আর ঐ সময়কালেই ইসলামী দর্শনের গভীরে এরিস্টেটলীয় ধ্যান-ধারণার অনুপ্রবেশ ঘটেছিলো।
ব্যাপারটা সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা ছিলো ঈসায়ী ধর্মের, যাকে সেন্ট পল-এর ধর্ম বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। সেখানে ধর্মগ্রন্থের সৃষ্টিপর্বে বিশ্বসৃষ্টি সম্পর্কে বিশদ বিবরণ রয়েছে। খৃস্টানদের কাছে যেহেতু এটা ছিলো আল্লাহর কালাম সেহেতু তাদের বিশ্বাসগত অপরিহার্য কর্তব্য ছিলো তার সত্যতা সাব্যস্ত করা। কিন্তু বাস্তব পর্যবেক্ষণ যেহেতু তাদের ব্যাখ্যা-বক্তব্যের সমর্থনে ছিলো না সেহেতু তারা তাত্ত্বিক প্রমাণের আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলো। আর এক্ষেত্রে তারা এরিস্টেটলের আঁচল ধরেছিলো এজন্য যে, তার দর্শনে তখন ছিলো আশ্চর্যরকম জাদুশক্তি।
এর মধ্যে পাশ্চাত্যজগত যখন মুক্তমনে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণ ও নিরীক্ষণের মাধ্যমে বিশ্বজগতের নতুন অধ্যয়ন শুরু করলো এবং বাস্তব প্রমাণের ভিত্তিতে জ্ঞানের নতুন নতুন তত্ত্ব ও সত্য আবিষ্কৃত হতে লাগলো তখন গীর্জার ভিত কেঁপে উঠলো। ধর্মনেতা ও ধর্মপণ্ডিতগণ বিচলিত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন যে, গীর্জার প্রভাব-প্রতিপত্তির বুঝি 'ঘণ্টা বেজে গেলো'। এভাবে শুরু হয়ে গেলো বিজ্ঞান ও ধর্মের ভয়াবহ সঙ্ঘাত। বহু বিজ্ঞানী, যারা জ্ঞান-গবেষণা ও বিজ্ঞান-সাধনায় নিবেদিত ছিলেন, তাদের হতে হলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি বিশ্বস্ততার বলি। কিন্তু বহু রক্ত ঝরিয়ে শেষ পর্যন্ত গীর্জার কর্ণধারগণ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে বাধ্য হলেন এবং গীর্জার বিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যসূচীতে বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করলেন। ফলে তাদের বিদ্যালয়গুলো, যা নিকট অতীতেও মুসলিম বিদ্যালয়গুলোর প্রতিবিম্ব ছিলো, হঠাৎ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হলো (এবং সমাজে গ্রহণযোগ্যতাও অর্জন করলো) তবে তারা তারা তাদের ঈশ্বরতত্ত্ব ও ধর্মদর্শন ত্যাগ করেনি। ফল এই দাঁড়ালো যে, আধুনিক সমাজের অন্তত কিছু অংশের উপর গীর্জার প্রভাব আগের মতই রয়ে গেলো। ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান্ট পাদ্রিগণ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানেও পারদর্শী হলেন এবং সর্ববিষয়ে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কথা বলার যোগ্যতা অর্জন করলেন।
পক্ষান্তরে তুরস্কে মুসলিম ওলামা-সমাজের অবস্থা ছিলো সম্পূর্ণ বিপরীত। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে তারা মনোযোগী হবেন কি, বরং তাদের এলাকায় নতুন চিন্তার প্রবেশও নিষিদ্ধ করে দিলেন। আর যেহেতু মুসলিম উম্মাহর শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ ছিলো তাদেরই হাতে সেহেতু একই স্থবিরতা শিক্ষাব্যবস্থায়ও চেপে বসলো। তদুপরি অবক্ষয়যুগে বিভিন্ন কারণে আলিমদের রাজনৈতিক তৎপরতা ছিলো দ্রুত বর্ধমান। (আর রাজনীতি ও জ্ঞানচর্চা একই মস্তিষ্ক খুব কমই ধারণ করতে পারে।) তাই গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার গুরুভার বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভবও ছিলো না। এজন্য সহজ নোসখা হিসাবে বাধ্য হয়েই তারা এরিস্টেটলের দর্শন আঁকড়ে ধরলেন এবং তাত্ত্বিক প্রমাণকেই জ্ঞানের ভিত্তিরূপে বহাল রাখলেন। ফলে তের শতকে মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থার যে হাল ছিলো, উনিশ শতকে এসেও তা বহাল ছিলো।'¹
মুসলিমবিশ্বব্যাপী স্থবিরতা
জ্ঞান ও চিন্তার এ স্থবিরতা ও বন্ধ্যাত্ব শুধু তুরস্কে এবং ধর্মীয় শিক্ষার মহলেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, বরং পূর্ব থেকে পশ্চিম গোটা মুসলিমবিশ্বই এর শিকার ছিলো। মস্তিষ্ক যেন নিশ্চল, চিন্তা যেন নির্জীব এবং শরীর যেন অবশ। অষ্টম শতকের কথা নাও যদি বলি, কোন সন্দেহ নেই যে, নবম শতকই ছিলো শেষ যুগ, যেখানে দ্বীন ও ইলম এবং জ্ঞান ও চিন্তার ক্ষেত্রে ইজতিহাদ ও গবেষণার এবং কবিতা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার কিছু না কিছু স্বাক্ষর ছিলো। এ শতকেই ইবনে খালদূনের আলমুকাদ্দিমার মত চিন্তাসমৃদ্ধ গ্রন্থ মুসলিম বিশ্বের গ্রন্থাগারে সংযোজিত হয়েছে। পক্ষান্তরে দশম শতাব্দী ছিলো নিশ্চলতা, স্থবিরতা ও অনুকরণের সূচনাযুগ। এবং এটা যেমন ছিলো ধর্মীয় জ্ঞানের সকল শাখার চিত্র, তেমনি ছিলো জ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও শিক্ষাব্যবস্থার ছবি।
তখনকার জ্ঞান-গবেষণার ইতিহাস দেখুন, এমন একটি নামও খুঁজে পাবেন না যাকে বলা যায় 'প্রতিভা', কিংবা অন্তত 'মনীষা', যিনি জ্ঞান ও শাস্ত্রের কোন শাখায় সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন এবং প্রশংসা করার মত নতুন কোন মাত্রা যোগ করেছেন। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শুধু কয়েকটি নাম, যারা তাদের যুগের চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির স্তর থেকে অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন, যারা দ্বীনী ও ইলমী পরিমণ্ডলে কোন 'কারনামা' বা বুদ্ধিবৃত্তিক কীর্তি উপহার দিয়েছেন। সৌভাগ্যক্রমে প্রায় সব ব্যতিক্রমই ছিলো ভারতবর্ষে। যেমন শায়খ আহমদ সারহিন্দী মুজাদ্দিদে আলফে ছানী (রহ, মৃঃ ১০৩৪ হিঃ), যার 'মাকতুবাত' দ্বীনী ও ইলমী খাজানায় একটি মূল্যবান সংযোজন বলে সর্বস্বীকৃত।
এবং শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী (রহ, মৃ. ১১৭৬ হি.), যার গ্রন্থত্রয় হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ইযালাতুল খাফা ও রিসালাতুল ইনছাফ হচ্ছে স্ব-স্ব বিষয়ে সত্যি অনন্য কীর্তি!
তদ্রূপ শাহ ছাহেবের সুযোগ্য পুত্র শাহ রফীউদ্দীন দেহলবী (রহ, মৃ. ১২৩৩ হি.), যিনি 'তাকমীলুল আযহান' ও 'রিসালাতুল মাহাব্বাহ' কিতাবে কিছু নতুন ও চমকপ্রদ চিন্তা উপস্থাপন করেছেন।
তদ্রূপ শাহ ইসমাঈল শহীদ দেহলবী (রহ, শাহাদাত, ১২৪৬ হি.) যার 'মানছিবে ইমামত ও আকাবাত' গ্রন্থদু'টি বিস্ময়কর ইজতিহাদি শানের অধিকারী এবং স্ব-স্ব বিষয়ে অতুলনীয়।
একই ভাবে বলা যায় ওলামায়ে ফিরিঙ্গি মহল-এর কথা এবং পূর্বাঞ্চলের কতিপয় শিক্ষাঙ্গন ও চিন্তাকেন্দ্রের কথা। মেধায়, মননে ও সৃজনশীলতায় তারা অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিলেন এবং আপন আপন সময়কালের শিক্ষাধারায় সুগভীর প্রভাব বিস্তার করেছেন; তবে তাদের মেধা ও প্রতিভা এবং চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির কীর্তি-কর্ম পাঠ্যবিষয়ের গণ্ডি খুব কমই অতিক্রম করেছে।
শুধু দ্বীনী ইলমের কথা বলি কেন, কবিতা ও সাহিত্যের অঙ্গনও ছিলো একই রকম বন্ধ্যাত্বের শিকার। কাব্যকর্ম পরিমাণে প্রচুর হলেও তাতে জীবন ও সজীবতার ছাপ ছিলো না, ছিলো শুধু প্রথামনস্কতা, স্থূলতা ও অনুকরণ-সর্বস্বতা। সাধারণভাবে কবিতার বিষয়বস্তু ছিলো রাজতোষামোদ, সস্তা চাটুকারিতা ও আত্মপ্রশস্তি। গদ্যসাহিত্যও ছিলো আড়ম্বর, কৃত্রিমতা, ছান্দিকতা ও অন্তসারশূন্য শব্দজৌলুসে আকীর্ণ। এমনকি ইতিহাসগ্রন্থ, দাপ্তরিক লেখা, প্রশাসনিক ফরমান এবং বন্ধুমহলীয় পত্রাবলীও এ দোষ থেকে মুক্ত ছিলো না। বিচ্ছিন্ন দু'একটি সাহিত্যকর্মে অবশ্য এমন কিছু নমুনা পাওয়া যায়, যা তখনকার সাধারণ রুচি ও প্রবণতা থেকে কিছুটা উপরে এবং পতিত স্তর থেকে কিছুটা উর্ধ্বে।
মাদরাসা ও শিক্ষাকেন্দ্রগুলোও চরম স্থবিরতা, নির্জীবতা ও বন্ধ্যাত্বের শিকার হয়ে পড়েছিলো। সেখানেও ছিলো জ্ঞানদৈন্য ও চিন্তানৈতিক অবক্ষয়ের ছাপ। পূর্ববর্তিদের সমৃদ্ধ গ্রন্থাবলী, যা জ্ঞান, শিক্ষা ও রুচিপ্রদ ছিলো, সেগুলোকে ক্রমান্বয়ে পাঠ্যসূচী থেকে সরিয়ে পরবর্তিদের রচনাবলীর অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছিলো, নিজ নিজ বিষয়ে যাদের ইজতিহাদি যোগ্যতা ছিলো না। তারা শুধু পূর্ববর্তিদের ব্যাখ্যাকারী ও ভাষ্যকার ছিলেন। সমগ্র পাঠ্যসূচী ব্যাখ্যা, টীকা, সারসঙ্কলন ও 'মতন'-এ পূর্ণ ছিলো, যেখানে বিজ্ঞ লেখকগণ কাগজ-কালিতে কৃষ্ণ করে বোধগম্য সরল ও বিশদ ভাষার পরিবর্তে 'সঙ্কেতভাষা' ব্যবহার করেছেন, যা বোঝার জন্য আবার বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতো। এভাবে ব্যাখ্যার উপর ব্যাখ্যা, তার উপর আবার টীকা-এর সিলসিলা জারি থাকতো। অর্থাৎ একবার করা হতো কাগজ-কালির সাশ্রয়, আবার করা হতো কালি-কাগজের অপচয়।
উপরের চিত্র থেকে মোটামুটি বোঝা যায়, মুসলিম বিশ্বের উপর তখন জ্ঞান-বন্ধ্যাত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতা কেমন কঠিনভাবে চেপে বসেছিলো, যা থেকে জীবনের কোন অঙ্গন মুক্ত ছিলো না।
তুর্কী সালতানাতের সমকালীন পূর্বাঞ্চল
তুর্কী সালতানাতের সমকালে পূর্বাঞ্চলে দু'টি শক্তিশালী মুসলিম সাম্রাজ্য ছিলো। প্রথমটি হলো তৈমূর বংশীয় যহীরুদ্দীন বাবর (৯৩৩ হিঃ ১৫৪৬ খৃঃ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মোঘল সাম্রাজ্য। বাবর ছিলেন তুর্কী খলিফা সুলতান সেলীম প্রথম-এর সমসাময়িক। শুরুতে যারা মোঘল সিংহাসন অলঙ্কৃত করেছেন, সাহস ও প্রতাপে এবং সামরিক শক্তি ও সাম্রাজ্যের বিস্তারে তারা মুসলিমবিশ্বে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিলেন। তাদের মধ্যে আবার শ্রেষ্ঠ ছিলেন আওরঙ্গযেব আলমগীর রহ.। তিনিই ছিলেন প্রতাপশালী শেষ মোঘলসম্রাট। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব যেমন ছিলো একের পর এক বিজয়াভিযান ও সাম্রাজ্য বিস্তারে এবং পূর্ণ দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে রাজ্যপরিচালনার ক্ষেত্রে তেমনি ছিলো কিতাব ও সুন্নাহর জ্ঞানে এবং নৈতিকতা ও ধার্মিকতায়। তিনি সুদীর্ঘ পঞ্চাশ বছর সাম্রাজ্য শাসন করেছেন এবং নব্বই বছরেরও বেশী বয়সে ১১১৮ হিজরীতে (খৃস্টীয় অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকে) ইন্তিকাল করেছেন।
সেটা ছিলো ইউরোপের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। ইউরোপ তখন আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠেছে এবং চারদিকে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্য এবং দুর্ভাগ্য, খোদ আওরঙ্গযেব বা তাঁর পূর্বসূরী কারোই ইউরোপ সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিলো না। সেখানে তখন কী বিরাট পরিবর্তন শুরু হয়েছে এবং নবজাগরণের কার্যকারণগুলো কত দ্রুত শক্তি অর্জন করছে সে সম্পর্কে তারা ছিলেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তাই ইউরোপ থেকে যে সামান্যসংখ্যক বণিক, চিকিৎসক ও পর্যটক মোঘল দরবারে এসেছে, তাদের তারা দয়া ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতেই দেখেছেন।
ভাবতে সত্যি অবাক লাগে, এত বিশাল-বিস্তৃত এবং এমন জটিল জনগোষ্ঠী-অধ্যুষিত সাম্রাজ্যের শাসনভার যাদের হাতে তারা সমকাল সম্পর্কে এতটা বেখবর কীভাবে থাকতে পারেন! কিন্তু এটাই ছিলো বাস্তবতা। আরো দুর্ভাগ্য যে, আওরঙ্গযেবের উত্তরসূরীরা ছিলো ভীরু, দুর্বল, অযোগ্য ও আরামপ্রিয় শাসক। ইউরোপ থেকে ধেয়ে আসা বিপদ-দুর্যোগের মোকাবেলায় ইসলামী উম্মাহকে রক্ষা করা দূরের কথা, তাদের তো পৈতৃক রাজত্ব ও সিংহাসন রক্ষা করারও যোগ্যতা ছিলো না। শেষ ফল এই দাঁড়ালো, তাদের অনৈক্য ও অন্তর্কলহ, ভীরুতা ও দুর্বলতা এবং অন্তহীন অযোগ্যতার কারণে বিশাল ভারতবর্ষে বৃটিশ রাজত্ব কায়েম হয়ে গেলো, যা ছিলো গ্রেট বৃটেনের সুসমৃদ্ধি ও সফল শিল্প-বিপ্লবের বুনিয়াদ।¹
প্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহৎ সাম্রাজ্য ছিলো ইরানের ছাফাভী সালতানাত। এটি ছিলো সত্যিকার অর্থেই একটি সুউন্নত ও সুসমৃদ্ধ দেশ। কিন্তু শাসকবর্গ শিয়াবাদ ও উগ্রসাম্প্রদায়িকতায় এতই মেতে ছিলো এবং ওছমানী সালতানাতের সঙ্গে সঙ্ঘাত-সঙ্ঘর্ষে এমনই ব্যতিব্যস্ত ছিলো যে, অন্য বিষয়ে চিন্তা-ভাবনার ফুরসতই তাদের ছিলো না। ফলে ইউরোপ যখন উন্নতির পথে শনৈঃশনৈঃ এগিয়ে চলেছে, সেই সুবর্ণ সময়কালটি তারা অপচয় করেছে কখনো তুর্কী সীমান্তে হামলা চালিয়ে, কখনো আত্মরক্ষার যুদ্ধে জড়িয়ে।
বস্তুত প্রাচ্যের এদু'টি বৃহৎ সাম্রাজ্য নিজ নিজ সমস্যায় এমনই নাজেহাল ছিলো এবং বাইরের দুনিয়া থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন ছিলো যে, ইউরোপের মত দূর-দূরাঞ্চল তো অনেক পরে, নিকটবর্তী মুসলিম দেশগুলোর পরিবেশ-পরিস্থিতি ও ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কেও তাদের কোন 'জানাজান্তি' ছিলো না। আর ইসলামী ভ্রাতৃত্ব, বা আন্ত-মুসলিম ঐক্য গড়ে তোলা, এগুলো তো সম্ভবত শাসকবর্গের চিন্তায়ও কখনো আসেনি। এমনকি ইউরোপের শিক্ষা-জাগরণ ও বিজ্ঞানসাধনা এবং শিল্পবিপ্লব ও সামরিক অগ্রগতি সম্পর্কে নিকট পর্যবেক্ষণ এবং তা থেকে যথাসাধ্য উপকৃত হওয়ার প্রচেষ্টাটুকুও তাদের মধ্যে ছিলো না; ছিলো শুধু অন্তর্কলহে মেতে থাকা, আর ভোগ-বিলাসে গা ভাসিয়ে দেয়া। এককথায়, 'ইউরোপে যখন জাগরণের শোর, মুসলিম জাহানে তখন ঘুমের ঘোর! কিংবা আমরা যখন 'তাজ ও মমতাজ' নিয়ে ব্যস্ত, ইউরোপ তখণ 'পথ ও পাথেয়'র সন্ধানে ব্যতিব্যস্ত। আমাদের হাজার হাজার শ্রমিক যখন তাজমহল তৈরী করছে, ওরা তখন তৈরী করছে কল-কারখানা এবং সাগরে ভাসার মত বড় বড় জাহাজ! এসব কথা স্মরণ করেই হয়ত কবি ইকবালের চোখ থেকে ঝরেছে অশ্রু, আর কলম থেকে ঝরেছে কবিতা—
ম্যাঁয় তুম কো বাতাতা হুঁ তাকদীরে উমাম কেয়া হায়
শামশের ও সেনাঁ আওয়াল, তাউস ও রবাব আখের!
শোনো, বলি তোমাকে কোন জাতির উত্থান পতনের তাকদীর
শুরুতে তীর-তলোয়ার, শেষে পায়েল-সেতারের মধুর ঝঙ্কার
হেমন্তেও বসন্তের কিছু আভাস
একথা সত্য যে, মুসলিম উম্মাহর সবুজ-সজীব উদ্যান, যেখানে নিরন্তর প্রস্ফুটিত হতো প্রতিভার অসংখ্য ফুল, তা তখন উজাড় হয়ে গিয়েছিলো এবং বসন্ত-বাহার বিদায় নিয়েছিলো। তবে একথাও সত্য যে, ঐ অবস্থায়ও মাঝে মধ্যে এখানে সেখানে ইসলামবৃক্ষে কিছু সবুজ কিশলয়ের উন্মেষ ঘটেছে এবং হেমন্তকালেও তা এমন কিছু ফুল ও ফল উপহার দিয়েছে, যার তুলনা পৃথিবীর অন্যান্য জাতির ইতিহাসের বসন্তকালেও খুব বেশী পাওয়া যায় না। সোজা করে বলতে পারি, 'জাতীয় পর্যায়ে যুগটা ছিলো অবক্ষয় ও অধঃপতনের, তবে ব্যক্তিপর্যায়ে কিছু অবিস্মরণীয় কীর্তি ও কর্মের।
মুসলিমবিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তখন উচ্চ মনোবল, উদ্দীপ্ত চেতনা ও জাগ্রত মস্তিষ্কের অধিকারী এমন কতিপয় ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে, যারা কিছু সময়ের জন্য হলেও পতনোন্মুখ জাতি ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে নবজীবনের সঞ্চার করেছেন।
ভারতবর্ষে সুলতান ফতহে আলী খান টিপুর মত সাহসী, দূরদর্শী ও সিংহহৃদয় শাসক জন্মগ্রহণ করেছেন, হিন্দুস্তানকে যিনি নতুন আযাদীর ও নয়া যিন্দেগির প্রায় দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছিলেন, যদি না কতিপয় 'মীর সাদিক'-এর জন্ম হতো! অন্যদিকে হযরত সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ)-এর মত জাদুকরী ব্যক্তিত্বের দাঈ ও মুজাহিদ জন্মগ্রহণ করেছেন, যিনি খেলাফতে রাশেদার আলোকে ইসলামী হুকুমত কায়েমের জিহাদ শুরু করেছিলেন, তাঁর কল্পনা ও পরিকল্পনায় যার সীমানা বিস্তৃত ছিলো হিন্দুস্তান থেকে বোখারা পর্যন্ত; তাঁর মহান তারবিয়াতের ফলে উন্নতচরিত্র অসংখ্য মুজাহিদ এবং নিবেদিত প্রাণ দাঈ ও সিপাহী তৈরী হয়েছিলো, যাদের ঈমান ও ইয়াকীন, ইখলাছ ও লিল্লাহিয়াত এবং জোশ ও জাযবা সেই 'কুরুনে উলা'র ঝলক দেখিয়েছিলো। বলতে গেলে ঐ পতনমুখী যুগে তিনি এক অসাধ্যই সাধন করেছিলেন। কিন্তু সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক অরাজকতা, চারিত্রিক অধঃপতন এবং জাতীয় তন্দ্রাচ্ছন্নতা এমনই চূড়ান্ত ছিলো যে, বিশাল বটবৃক্ষের মত এসকল ব্যক্তিত্বও মুসলমানদের পতন ও অধঃপতনের গতিমাত্রায় বিশেষ কোন 'রোকথাম' আনতে পারেননি এবং উম্মাহ সামগ্রিকভাবে তাঁদের জিহাদ ও মুজাহাদা, ত্যাগ ও আত্মত্যাগ এবং তাজদীদী মেহনত থেকে তেমন কিছু সুফল অর্জন করতে পারেনি।
শিল্প ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে ইউরোপের উত্থান
ষোড়শ শতাব্দীর শেষ এবং সপ্তদশ শতাব্দীর শুরু থেকেই তুর্কীরা নীতি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে অবক্ষয় এবং জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদতার শিকার হয়ে পড়েছিলো। মানবজাতির ইতিহাসে এটা ছিলো এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ ও ভাগ্যনির্ধারণকারী যুগ, যার সুস্পষ্ট ছাপ ও প্রভাব আমরা দেখতে পাই পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে।
ইউরোপ তখন দীর্ঘ নিদ্রা থেকে জেগে উঠেছে এবং বিপুল উদ্দীপনা ও উন্মাদনা নিয়ে এগিয়ে চলেছে, যাতে দ্রুততম সময়ে পিছনের অজ্ঞাতা ও মূর্খতার ক্ষতিপূরণ হতে পারে। জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে তাদের উন্নতির গতি ছিলো বিস্ময়কর। আপন লক্ষ্যের পথে তারা শুধু দৌড়ে যাচ্ছিলো না, বরং ডানা মেলে উড়ে চলেছিলো। প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তি তারা আয়ত্ত করছিলো এবং সৃষ্টিজগতের রহস্যরাজি উন্মোচিত করছিলো। অজানা দেশ-মহাদেশ ও সাগর-পথ আবিষ্কৃত হচ্ছিলো। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় তাদের অগ্রযাত্রা এবং জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে তাদের শোভাযাত্রা অব্যাহত ছিলো। এই সংক্ষিপ্ত সময়কালে সেখানে অনন্যসাধারণ বহু বিজ্ঞান-প্রতিভার আবির্ভাব ঘটেছিলো। সংক্ষিপ্ত উদাহরণে যাদের নাম আসে তারা হলেন কোপার্নিকাস, ব্রনো, গ্যালিলিও, কেপলার, নিউটন ও অন্যান্য। বস্তুত এই মহাবিজ্ঞানিগণ জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৃতিবিজ্ঞানের জগতে প্রাচীন ব্যবস্থা ভেঙ্গে নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন এবং জ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। অভিযাত্রী ও নাবিকদের মধ্যে ছিলেন কলোম্বাস, ভাসকো ডি গামা ও ম্যাগলিন-এর মত সাহসী, উদ্যমী ও দৃঢ়চেতা ব্যক্তি, যারা অজানা দেশ-মহাদেশ এবং নতুন সাগর-পথ আবিষ্কার করেছেন।
উপরোক্ত সময়কালে ইতিহাসের পাতায় বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠীর স্থান ও অবস্থান নতুনভাবে বিন্যস্ত হচ্ছিলো। কারো ভাগ্যতারকা ছিলো উদয়ের পথে, কারো ভাগ্যতারকা ছিলো অস্তাচলে। তখনকার একটি মুহূর্ত ছিলো কয়েক দিন এবং একটি দিন ছিলো কয়েক বছরের সমান। সুতরাং এ যুগসন্ধিক্ষণে সামান্য সময়ও নষ্ট করার অর্থ ছিলো বহু দীর্ঘকাল নষ্ট করা। কিন্তু হায় আফসোস, মুসলিম উম্মাহ তখন শুধু দিন, মাস ও বছর নয়, বরং বহু যুগ ও বহু প্রজন্মের অপচয় করেছে। পক্ষান্তরে ইউরোপের জাতিবর্গ প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করেছে এবং জ্ঞান-গবেষণা ও বিজ্ঞানসাধনার সকল অঙ্গনে বছরে যুগের পথ অতিক্রম করেছে।
জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে তুর্কিদের পশ্চাৎপদতার একটা সাধারণ ধারণা পেতে হলে এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে, ষোড়শ শতাব্দীর আগে সেখানে জাহাজনির্মাণ শিল্পের কোন অস্তিত্বই ছিলো না। পক্ষান্তরে ছাপাখানা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ইউরোপীয় পদ্ধতির সামরিক একাডেমির সাথে পরিচয় ঘটেছে মাত্র অষ্টাদশ শতকে। এই শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত তুরস্ক শিল্প, প্রযুক্তি, আবিষ্কার ও উদ্ভাবনার জগত থেকে এত দূরে ছিলো যে, রাজধানীর আকাশে উড়ন্ত বেলুন দেখে মানুষ ভেবেছে, জাদুমন্ত্রের কিছু! ইউরোপের ছোট ছোট দেশগুলোও এক্ষেত্রে তুরস্ককে ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। এমনকি মিশরও তুরস্কের চার বছর আগে রেলযোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেছিলো, আর ডাকটিকেট চালু হয়েছিলো তুরস্কের কয়েক মাস আগে।
এই যখন ছিলো মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বদানকারী তুরস্কের অবস্থা তখন তার শাসনাধীন বা প্রভাবাধীন আরব-অনারব দেশগুলোর অবস্থা কী হতে পারে তা তো সহজেই বোঝা যায়। মাঝারি তো নয়ই, এমনকি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্পেরও প্রচলন সেসব দেশে ছিলো না। ফরাসী পর্যটক মঁসিয়ে ভলনে—যিনি অষ্টাদশ শতকে মিশর ভ্রমণ করেন এবং চার বছর সিরিয়ায় অবস্থান করেন—তার সফরনামায় লিখেছেন, 'শিল্পে এদেশ (সিরিয়া) এতই অনগ্রসর যে, তোমার ঘড়ি নষ্ট হলে মেরামতের জন্য বিদেশী কারিগরের কাছে যেতে হবে।'¹
তদুপরি মুসলমানদের এই পিছিয়ে পড়া শুধু বিজ্ঞান-দর্শন, তত্ত্বীয় জ্ঞান, শিল্প ও কারিগরি ক্ষেত্রেই ছিলো না, বরং ছিলো সর্বব্যাপী। এমনকি যুদ্ধবিদ্যা ও সমরশিল্পেও তারা ইউরোপ থেকে পিছিয়ে পড়েছিলো। অথচ শেষ দিকেও এক্ষেত্রে তুরস্কের শ্রেষ্ঠত্ব ছিলো সর্বস্বীকৃত। কিন্তু দেখতে দেখতে ইউরোপ অস্ত্রনির্মাণ, যুদ্ধকৌশল উদ্ভাবন এবং উন্নত সামরিক ব্যবস্থাপনায় তুরস্ককে ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। ফলে ১৭৭৪ সালে তুরস্ক ইউরোপীয় বাহিনীর হাতে শোচনীয় পরাজয় বরণ করে।
এভাবে যুদ্ধের মাঠেও যখন ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব সুপ্রমাণিত হলো তখন গিয়ে ওছমানী সালতানাতের টনক কিছুটা নড়লো এবং খলীফার আদেশে সামরিক প্রশিক্ষণ ও বাহিনী পুনর্গঠনের জন্য কতিপয় ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞ ডেকে আনা হলো। সুলতান তৃতীয় সেলিম উনিশ শতকের শুরুর দিকে আরো ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি যেমন বাস্তববাদী ও দূরদর্শী ছিলেন তেমনি ছিলেন দৃঢ়চেতা ও কুশলী। শাহী ঐতিহ্যের বিপরীতে তার শিক্ষা-দীক্ষা হয়েছিলো রাজপ্রাসাদের বাইরে রুক্ষ-কঠিন পরিবেশে। তিনি আধুনিক ধারার নতুন নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রকৌশল মহাবিদ্যালয়ে তিনি নিজে শিক্ষা দান করতেন। এছাড়া তিনি আধুনিক পদ্ধতির একটি সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায়ও বেশ কিছু সংস্কার সাধন করেন। কিন্তু তুর্কীজাতি ও তার সমাজব্যবস্থা এতটাই স্থবির ও রক্ষণশীল ছিলো যে, কোন প্রকার পরিবর্তন, আধুনিকায়ন ও সংস্কারপ্রচেষ্টা গ্রহণ করার যোগ্যতা তাদের ছিলো না। ফলে সেনাবাহিনীর পুরোনো অংশ বিদ্রোহ করে বসে এবং তিনি মর্মান্তিকভাবে নিহত হন।
সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ তার স্থলাভিষিক্ত হন, যার শাসকাল ছিলো ১৮০৭ থেকে ৩৯ সাল পর্যন্ত। তারপর সিংহাসনে আসেন সুলতান প্রথম আব্দুল মজীদ, যার শাসনকাল ছিলো ৩৯ থেকে ৫১ সাল পর্যন্ত। তারা উভয়ে শহীদ সুলতান তৃতীয় সেলিমের মিশন অব্যাহত রাখেন। ফলে তুরস্ক কিছুটা উন্নতি-অগ্রগতি লাভ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু তিক্ত সত্য এই যে, আলোচ্য সময়কালে মুসলিম তুরস্কের উন্নতি-অগ্রগতির সঙ্গে ইউরোপীয় জাতিবর্গের তুলনা করলে হতবাক হতে হয়। ইউরো-তুরস্কের প্রতিযোগিতা যেন ছিলো গল্পের খরগোশ ও কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতা, তবে পার্থক্য এই যে, ক্ষিপ্রগতির খরগোশ এখানে জাগ্রত, আর ধীরকচ্ছপ এই জাগে, এই ঘুমিয়ে পড়ে।
আঠারো ও উনিশ শতকে মরক্কো, আলজিরিয়া, মিসর, হিন্দুস্তান, তুর্কিস্তান ও অন্যান্য অঞ্চলে প্রাচ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীর এবং পাশ্চাত্যের বিভিন্ন জাতি ও শক্তির মধে যে ভয়াবহ সঙ্ঘাত-সঙ্ঘর্ষ ঘটেছে তাতে জয়-পরাজয়ের ফায়ছালা আসলে ষোল ও সতের শতকেই হয়ে গিয়েছিলো এবং সাধারণ 'সমঝ-বুঝ' আছে, এমন যে কারো পক্ষে তখনই এর ফলাফল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব ছিলো। অর্থাৎ যা ঘটেছে ইতিহাসের গতিধারায় তা ঘটা অনিবার্য ছিলো।
টিকাঃ
১. হযরত বুসর বিন আরতাত-এর নেতৃত্বে ৪৪ হিজরীতে (৬৬৪ খৃ) আরবনৌবহর কনস্টান্টিনোপল জয়ের চেষ্টা করে। ইয়াযীদ বিন মু'আবিয়া ৫২ হিজরীতে কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেও ব্যর্থ হন। সেই অভিযানে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেযবান ছাহাবী হযরত আবু আইয়ূব আনছারী রাদিয়াল্লাহু আনহু শরীক ছিলেন এবং মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তিনি ওয়াছীয়ত করেছিলেন, আমার জানাযা যত দূর নিয়ে যেতে পারো যাও, তারপর সেখানে দাফন করো। তার অছিয়ত পূর্ণ করা হয়েছিলো এবং নগর-প্রাচীরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়েছিলো। এর পর আরো অন্তত চারবার আরব-বাহিনী কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করে, কিন্তু তা এমনই সুরক্ষিত ছিলো যে, কোন সেনাপতির পক্ষেই ঐ শহর পদানত করা সম্ভব হয়নি। (আরবী অনুবাদক)
২. প্রকৃতপক্ষে তাঁর বয়স তখন ছাব্বিশ নয়, বরং চব্বিশ বছরও অতিক্রম করেনি (আরবী অনুবাদক)
৩. বক্তব্যটি নেয়া হয়েছে استنبول وحضارة الإمبراطورية العثمانية থেকে, লেখক বার্নাড লুয়েস, আরবী অনুবাদ রিযওয়ান আলী নাদাবী, পৃ. ৩৬, ৩৭
৪. ফিলসফাতুত তারিখে উসমানী, মুহম্মদ জমিল বেইহাম পৃ. ২৮০-৮১
৫. ঐ পৃ. ১৫৬
৬. ফেলসফাতুত তারিখিল উসমানী মুহম্মদ জামিল বাইহাম
৭. رواه الترمذي عن أبي هريرة رضي الله عنه في كتاب العلم، وابন ماجه في كتاب الزهد
৮. تاريخ مصر الجرحي زيدان
৯. conflict of stand west in turkey, p. 40-43
১০. এ প্রসঙ্গে brooks adams বলেন, ১৭৫৭ সালে পলাশী-যুদ্ধের পর বাংলার সম্পদ লণ্ডনে আসা শুরু হয় এবং তার সুফলও খুব দ্রুত দেখা দেয়। এই যে এত বড় শিল্পবিপ্লব, যার প্রভাব এখন পৃথিবীর সর্বত্র দৃশ্যমান, হয়ত তার অস্তিত্বই হতো না যদি পলাশীর যুদ্ধ না হতো। বস্তুত ভারতবর্ষের অঢেল সম্পদই ছিলো শিল্পবিপ্লবের সহায়ক ও চালিকাশক্তি। ভারতবর্ষ থেকে সম্পদের ঢল যখন লন্ডনে এসে আছড়ে পড়তে শরু করলো এবং বিশাল পুঁজি তৈরী হলো তখন আবিষ্কার-উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও বিরাট প্রতিযোগিতা শুরু হলো। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত সম্পদ দ্বারা এত অধিক মুনাফা অর্জিত হয়নি, যতটা হয়েছে ভারত থেকে লম্ব (লুন্ঠিত!) সম্পদ দ্বারা। কেননা পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে ইংলেন্ডের কোন প্রতিদ্বন্দী ছিলো না। (the law of civilization and decay, london, 1889, p. 313-17) একই প্রসঙ্গে sir william digby বলেন, ইংলেন্ডের শিল্পসমৃদ্ধি মূলত বাংলা ও কর্নাটকের সম্পদভাণ্ডারের কারণেই সম্ভব হয়েছে। পলাশীর পূর্বে যখন ভারতবর্ষের সম্পদ ইংলেন্ডে আসা শুরু হয়নি তখন আমাদের দেশে শিল্প বলতে কিছুই ছিলো না। (prosperous india: a revolution. p.30) এমনকি এটাই ছিলো মুসলিম বিশ্বের পরাধীনতা ও দাসত্ব-শৃঙ্খলের পরোক্ষ কারণ।
১১. زعماء الإصلاح في العصر الحديث ( الصفحة السادسة )