📘 মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো 📄 প্রথম পরিচ্ছেদ: ইসলামের সোনালী যুগ

📄 প্রথম পরিচ্ছেদ: ইসলামের সোনালী যুগ


মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বের যুগ

মুসলিম শাসকদের বৈশিষ্ট্য

উপরে বর্ণিত সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে জীবনের বিস্তৃত অঙ্গনে মুসলিম উম্মাহ যখন আত্মপ্রকাশ করলো তখন স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের শাসন ও নেতৃত্বের ভার তাদেরই হাতে অর্পিত হলো এবং জরাগ্রস্ত জাতিসমূহ নেতৃত্বের আসন থেকে অপসারিত হলো। কারণ তারা শক্তি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলো এবং নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বকে অনাচার-পাপাচার, যুলুম-অত্যাচার ও শোষণ-স্বেচ্ছাচারের বাহন বানিয়েছিলো। আর জাতি ও সভ্যতার ইতিহাসের শুরু থেকেই আসমানের বিধান হলো, জরাগ্রস্ত জাতিকে নেতৃত্বের আসন থেকে ছুঁড়ে ফেলা এবং উদীয়মান জাতিকে তাদের স্থলবর্তী করা।

তো আসমানী বিধানের শাশ্বত ধারায় মুসলিম উম্মাহ যখন বিশ্বনেতৃত্বের আসনে সমাসীন হলো তখন মানবজাতিকে সে ন্যায় ও সত্যের পথে সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ গতিতে পরিচালিত করলো। আর উম্মাহর জন্য তা সহজেই সম্ভব হয়েছিলো। কারণ ঐসব গুণ ও যোগ্যতা তাদের স্বভাব-চরিত্রে তখন পরিপূর্ণরূপে বিকশিত ছিলো, যা কোন জাতিকে বিশ্বনেতৃত্বের যোগ্যতা দান করে এবং যাদের পরিচালনা ও ছত্রচ্ছায়ায় বিশ্বের সুখ-শান্তি, সফলতা ও সৌভাগ্য সুনিশ্চিত হয়। কী ছিলো সেই গুণ ও যোগ্যতা?

প্রথমত তারা ছিলো আসমানী কিতাব ও আসমানী শরীয়াতের অধিকারী। তাই তাদের নিজেদের আইন ও বিধান তৈরী করার প্রশ্ন ছিলো না। ফলে চলমান অভিজ্ঞতা ও পরিস্থিতির তাগিদে আইন ও বিধানের অব্যাহত রদবদল এবং অনিবার্য ভ্রান্তি, বিচ্যুতি ও বিপর্যয় থেকে তারা নিরাপদ ছিলো, যা মানবরচিত যে কোন আইনের অবধারিত দোষ ও দুর্বলতা। তারা তাদের আচরণ-বিচরণ ও শাসন-প্রশাসনের ক্ষেত্রে অন্ধকারে অন্ধ পথিকের মত ছিলো না। তাদের কাছে ছিলো আল্লাহপ্রদত্ত সেই চিরসমুজ্জ্বল আলো, যা জীবনের সকল পথ ও পথের বাঁক আলোকিত করে রেখেছিলো। ফলে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিলো আলোর সাহায্যে আলোরই মধ্যে। তাদের চলার পথ যেমন ছিলো উদ্ভাসিত তেমনি গন্তব্য ছিলো সুস্পষ্ট। আলকোরআনের ভাষায়—
أَوَمَن كَانَ مَيْتًا فَاحْيَيْنَاهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُورًا يَمْشِي بِهِ فِي النَّاسِ كَمَن مَّثَلُهُ فِي الظُّلُمَاتِ لَيْسَ بِخَارِجِ مِنْهَا
'যারা মৃত ছিলো, অনন্তর আমি তাদের জীবন দান করেছি এবং তাদের জন্য নির্ধারণ করেছি নূর, যার সাহায্যে তারা বিচরণ করে মানুষের মাঝে, তারা কি হতে পারে ঐ ব্যক্তির মত যে নিমজ্জিত বিভিন্ন অন্ধকারে, যা থেকে সে বের হতে পারে না!' (আন'আম, ৬: ১২২)

মানুষকে শাসন এবং মানুষের মাঝে সুবিচার করার জন্য তাদের কাছে ছিলো আসমানী শরীয়াত ও জীবনবিধান। আল্লাহ তাদেরকে বানিয়েছিলেন হক ও ইনছাফের ধারক এবং ন্যায় ও সত্যের বাহক। তাই চরম ক্রোধ ও অসন্তোষের মুহূর্তে এবং শত্রুতা ও বিদ্বেষের চূড়ান্ত মানবীয় দুর্বলতার সময়ও ন্যায় ও সুবিচার থেকে তারা তিলপরিমাণ বিচ্যুত হতো না এবং প্রতিশোধের পাশবিকতায় গা ভাসিয়ে দিতো না। তাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ ছিলো এবং সে নির্দেশ তারা অক্ষরে অক্ষরে পালনও করতো—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُونُوا قَوْمِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَتَانُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تعدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর প্রতি অবিচল থাকো (এবং) ন্যয়পরতার সাথে সাক্ষ্যদানকারী হও। আর কোন দলের প্রতি শত্রুতা যেন ইনছাফ না করার অপরাধে তোমাদের লিপ্ত না করে। (বরং) তোমরা ইনছাফ করো। (কারণ) সেটাই হলো তাকওয়া (ও আল্লাহভীতির) অধিকতর নিকটবর্তী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত। (আল-মাইদাহ, ৫: ৮)

দ্বিতীয়ত তারা শাসন ও নেতৃত্বের গুরুভার গ্রহণ করেছিলো নৈতিক ও আধ্যাত্মিক তারবিয়াত ও সংশোধনের মাধ্যমে যথাযথ যোগ্যতা অর্জন করার পর। পক্ষান্তরে অন্যান্য জাতি ক্ষমতা ও শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলো নৈতিক ও চারিত্রিক এবং আত্মিক ও আধ্যাত্মিক কোন রকম তারবিয়াত ও সংশোধন ছাড়া। ফলে ন্যায় ও কল্যাণের উৎস হওয়ার পরিবর্তে পৃথিবীর জন্য তারা হয়ে পড়েছিলো মন্দ ও অকল্যাণ এবং অনাচার ও দুস্কৃতির প্রজননক্ষেত্র। এটা অতীতের সমাজ-পতি, সেনাপতি, 'রাষ্ট্রপতি' ও শাসক-প্রশাসকদের ক্ষেত্রে যেমন সত্য ছিলো, তেমনি সত্য বর্তমানের ক্ষেত্রেও। কিন্তু ছাহাবা কেরামের বিষয়টি ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁরা দীর্ঘ একটা সময় ছিলেন আল্লাহর নবী মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাকীমানা তারবিয়াত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ তত্ত্বাবধানে। তিনি তাঁদের শিক্ষা দিয়েছেন, তাঁদের নাফসের তাযকিয়া এবং হৃদয় ও আত্মার সংশোধন করেছেন এবং নির্মোহতা, ধার্মিকতা, নৈতিক পবিত্রতা, সততা, সত্যবাদিতা, আত্মত্যাগ ও আল্লাহভীতির উপর তাদের গড়ে তুলেছেন এবং ক্ষমতার লোভ ও নেতৃত্বের মোহ তাদের অন্তর থেকে বিলুপ্ত করেছেন। তিনি বলতেন—
انا والله لا تولى على هذا العمل أحدا سأله، ولا أحدا حرض عليه
আল্লাহর কসম, এই শাসনক্ষমতা আমি এমন কাউকে দেবো না যে দাবী করে, বা লোভ করে।¹

আলকোরআনের এ আয়াত বারবার তাঁদের কানে পড়েছে এবং হৃদয়ের গভীরে এর মর্মবাণী বদ্ধমূল হয়েছে—
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
ঐ আখেরাত আমি তাদেরই জন্য নির্ধারণ করবো যারা যমিনে বড়ত্ব অর্জন করতে চায় না এবং ছড়াতে চায় না ফাসাদ। আর সুপরিণতি রয়েছে মুত্তাকীদের জন্য। (কাছাছ, ২৮:৮৩)

এই বরকতপূর্ণ নববী তারবিয়াতের ফল হলো এই যে, পদ ও সম্পদ এবং ক্ষমতা ও নেতৃত্বের মোহ তাদের অন্তর থেকে একেবারে মুছে গেলো, এমনকি তার চিহ্নমাত্র বাকি ছিলো না, মানুষ যেমন এগুলোর মোহে ছুটে যায় আগুনের দিকে পতঙ্গের মত, তাঁরা ছিলেন এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁরা বরং অন্যকে এগিয়ে দিয়ে নিজেরা পিছিয়ে থাকতেন এবং সভয়ে তা এড়িয়ে যেতে চাইতেন, নিজে প্রার্থী হওয়া এবং দৌড়ঝাঁপ ও চেষ্টা-তদ্‌দ্বীর করা তো দূরের কথা। অনন্যোপায় হয়ে কখনো কোন পদ বা ক্ষমতা গ্রহণ করলে সেটাকে তারা দুধেল গাভী ও গাছপাকা ফল ভাবতেন না, বরং অর্পিত কঠিন আমানত এবং আল্লাহর পক্ষ হতে বিরাট পরীক্ষা মনে করতেন। তারা বিশ্বাস করতেন, এজন্য একদিন আল্লাহর সামনে তাদের দাঁড়াতে হবে এবং ছোট-বড় সব বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের শাসক ও বিচারক হিসাবে এ আয়াত সবসময় ছিলো তাঁদের সামনে, তাঁদের চিন্তায় চেতনায়—
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَنَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا
অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের আদেশ করছেন যেন তোমরা আমানতসমূহ সেগুলোর হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার করো, যেন ইনসাফের সঙ্গে বিচার করো। (নিসা, ৪:৫৮)

যখনই তাঁরা যা বলতেন এবং যা করতেন, আলকোরআনের এ আয়াত স্মরণ রেখে করতেন—
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَفَ الْأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَبْلُوَكُمْ فِي مَا وَاتَنكُمْ إِنَّ رَبَّكَ سَرِيعُ الْعِقَابِ وَإِنَّهُ لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
তিনিই ঐ সত্তা যিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে 'স্থলবর্তী' বানিয়েছেন এবং তোমাদের কাউকে কারো উপর বিভিন্ন মর্যাদা দান করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন ঐ সকল বিষয়ে যা তিনি তোমাদের দান করেছেন। নিঃসন্দেহে তোমার প্রতিপালক দ্রুত শাস্তিদানকারী, আর অতিঅবশ্যই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (আন'আম, ৬: ১৬৫)

তৃতীয়ত তাঁরা বিশেষ কোন শ্রেণী ও গোষ্ঠী এবং বিশেষ কোন দেশ ও অঞ্চলের, সেবক বা প্রতিনিধি ছিলেন না, যারা শুধু ঐ শ্রেণী ও গোষ্ঠীর কল্যাণচিন্তা করবে এবং শুধু ঐ দেশ বা অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষা করবে; কিংবা বিশেষ কোন সম্প্রদায় বা দেশের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাস করবে।

কখনো তাঁরা এমন ধারণা দ্বারা আক্রান্ত হননি যে, শাসক হওয়ার জন্য তাদের সৃষ্টি, আর অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি শাসিত বা শোষিত হওয়ার জন্য। তাঁরা জানতেন, বিশ্বমঞ্চে তাদের আবির্ভাব এজন্য নয় যে, তাঁরা আরবসাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবেন এবং তার ছত্রচ্ছায়ায় ভোগ-উপভোগ ও স্বেচ্ছাচার চালিয়ে যাবেন, আর পৃথিবীতে আরব-রক্তের গর্ব ও দম্ভ প্রচার করে বেড়াবেন। ইসলামের ঝাণ্ডা নিয়ে তাঁদের দেশ-মহাদেশের অভিযান এজন্য নয় যে, মানবসম্প্রদায়কে রোম ও পারস্যের দাসত্ব থেকে বের করে আরবদের গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ করবেন। না, তাঁদের অভিযান তো ছিলো মানবকে মানবের দাসত্ব থেকে বের করে এক আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত করার জন্য। যেমন ইরানের রাজদরবারে মুসলিম দূত হযরত রাবঈ বিন আমির বলেছিলেন—
الله ابتعثنا لنخرج من شاء من عبادة العباد إلى عبادة الله وحده، ومن ضيق الدنيا إلى سعتها ، ومن جور الأديان إلى عدل الإسلام
'আল্লাহ আমাদের প্রেরণ করেছেন যেন মানুষকে বের করে আনি বান্দার বান্দেগি থেকে এক আল্লাহর বান্দেগির দিকে এবং দুনিয়ার সঙ্কীর্ণতা থেকে আখেরাতের প্রশস্ততার দিকে এবং সব ধর্মের অনাচার থেকে ইসলামের সুবিচারের দিকে।'¹

তাঁদের দৃষ্টিতে দেশ-ভাষা-বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত মানুষ অভিন্ন এক জাতি। কারণ নবীর ছোহবত থেকে তাঁরা শিক্ষা পেয়েছেন, সমগ্র মানবজাতি দু'টি একত্বের বন্ধনে আবদ্ধ, রব ও আব্‌-এর একত্ববন্ধন। অর্থাৎ সাদা-ালো, আরব-আজম সবার রব ও প্রতিপালক এক আল্লাহ এবং সবার আব্ ও পিতা এক আদম। নবীর পাক যবানে শুনে শুনে এ সত্য তারা আত্মস্থ করেছেন—
الناس كلهم من آدم وآدم من تراب لا فضل لعربي على عجمي، ولا لعجمي على عربي إلا بالتقوى
মানুষে মানুষে কোন ভেদ নেই, সকলে সমান, সকলে আদমসন্তান, আর আদম হলেন মাটির তৈরী। আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই আজমের উপর এবং আজমের কোন কৌলীন্য নেই আরবের উপর, তবে তাকওয়ার ভিত্তিতে।¹

মানবসভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে এটাই ছিলো সবচে' বড় মর্মান্তিকতা। একারণেই স্বয়ং আলকোরআনও 'খায়রে উম্মত'কে এভাবে তারবিয়াত করেছে—
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَـٰكُم মِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَـٰكُمْ شُعُوبًا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓا۟ ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ ٱللَّهِ أَتْقَنَـٰكُمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
হে লোকসকল! নিশ্চয় তোমাদের আমি সৃষ্টি করেছি একজন নর ও একজন নারী হতে এবং তোমাদের ভাগ করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো। নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সম্মানী সে-ই যে তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মোত্তাকী। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবগত। (আলহুজুরাত, ৪৯: ১৩)

এভাবেই তাঁরা গড়ে উঠেছিলেন আলকোরআনের অঙ্গনে রহমতের নবীর তারবিয়াতের ছায়ায়। বস্তুত মুসলিম উম্মাহর সমগ্র ইতিহাসই মানবসাম্য ও মানবভ্রাতৃত্বের ইতিহাস। তবে এখানে আমি শুধু শোনাবো সোনালী যুগের সেই অনন্য ঘটনা, ইতিহাস যা আজো সংরক্ষণ করে রেখেছে। মিসরের শাসক হযরত আমর ইবনুল আছ (রা)-এর এক পুত্র কোন এক ঘটনায় জনৈক মিসরীয় কিবতীকে চাবুক মেরেছিলো বংশকৌলীন্যের গর্ব করে একথা বলে—নাও, কুলীন ও অভিজাতবর্গের সন্তানের পক্ষ হতে চাবুকের স্বাদ গ্রহণ করো।

ফরিয়াদ নিয়ে সেই কিবতী মিসর থেকে সোজা মদীনায় খলীফাতুল মুসলিমীন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর দরবারে হাযির। তিনি শুনলেন এবং কিছাছের হুকুম দিয়ে বললেন—
متى استعبدتم الناس وقد ولدتهم أمهاتهم أحرارا؟
কবে থেকে মানুষকে তোমরা গোলাম বানাতে শুরু করলে, অথচ মায়েরা তাদের স্বাধীন অবস্থায় জন্ম দিয়েছে?¹

তো এই মহান ব্যক্তিগণ, তাঁদের নিকট দ্বীন ও ইলমের যে সম্পদ ছিলো তা বিতরণের ক্ষেত্রে কোন কৃপণতা করেননি এবং দেশ, ভাষা, বর্ণ ও বংশের কোন পার্থক্য করেননি, তেমনি শাসনপরিচালনার ক্ষেত্রেও মানুষে মানুষে তাদের কাছে কোন ফরক-তমিয ছিলো না। মানবজাতির জন্য তারা যেন ছিলেন সেই 'করুণাবৃষ্টি' যা সর্বত্র বর্ষিত হয় এবং সর্বজনে সিক্ত করে। যে মেঘ-বৃষ্টিকে পৃথিবীর প্রতিটি ভূখণ্ড স্বাগত জানায় এবং স্ব স্ব যোগ্যতা অনুসারে তা থেকে কল্যাণ ও উর্বরতা গ্রহণ করে। এই সকল 'মেঘমানবের' শীতল ছায়ায় এবং তাদের কল্যাণশাসনের ছত্রচ্ছায়ায় পৃথিবীর সকল জাতি ও জনগোষ্ঠী, এমনকি প্রাচীন কাল থেকে যারা শুধু যুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়ে এসেছে, তারা সকলে 'াত্মনির্মাণ' ও বিশ্বের বিনির্মাণের মহান কর্মযজ্ঞে শরীকদার হতে পেরেছিলো। ইলমচর্চা ও জ্ঞান-সাধনা এবং ধর্ম-কর্ম ও শাসন-পরিচালনা, সবকিছুতে তারা আরবদের সমান অংশীদার হতে পেরেছিলো, বরং কোন কোন গুণ ও বৈশিষ্ট্যে এবং প্রতিভা ও যোগ্যতায় অনেকে আরবদেরও ছাড়িয়ে গিয়েছিলো এবং আরবরা তাদের সাদরে বরণ করে নিয়েছিলো। তাদের মধ্য হতে এমন এমন ইমাম, ফকীহ, মুহাদ্দিছ ও মুফাস্সির আত্মপ্রকাশ করেছেন যারা ছিলেন আরবদেরও মাথার মুকুট এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর গর্ব ও গৌরবের পাত্র। এমনকি ইবনে খালদুনের মতে—
'বিস্ময়কর বাস্তবতা এই যে, ইসলামী উম্মাহর ইলমের ধারক ও জ্ঞানসাধকদের অধিকাংশই হলেন আজমী, অনারব; আর তা দ্বীন ও শরীয়াতের ইলম এবং যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান উভয় ক্ষেত্রেই। এর ব্যতিক্রম খুবই বিরল। এমনকি কেউ কেউ নসব ও বংশপরিচয়ে আরব হলেও ভাষায় অনারব, অন্তত শিক্ষাদীক্ষায় এবং শিক্ষকসূত্রে অনারব। (অর্থাৎ আরব হয়েও জ্ঞান ও শিক্ষা-দীক্ষা তারা গ্রহণ করেছেন অনারব শায়খ থেকে।) অথচ মিল্লাত ও মাযহাব ছিলো আরবীয় এবং শরীয়তের বাহক ছিলেন আরব।'¹

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও অনারব মুসলিম জনগোষ্ঠীতে এমন এমন শাসক ও প্রশাসক, সিপাহি ও সিপাহসালার, উযির ও নাযিম, জ্ঞানী-গুণী ও বিদগ্ধজন এবং আলিম-ওলামা ও আইম্মা-মাশায়েখের আবির্ভাব ঘটেছে, সত্যিকার অর্থেই যারা ছিলেন মানবতার অলঙ্কার এবং মানবজাতির ভূষণ। জ্ঞানে গুণে, ভদ্রতা ও আভিজাত্যে, ধার্মিকতা ও নৈতিকতায় এবং যোগ্যতা ও প্রতিভায় তাঁরা ছিলেন উজ্জ্বলতম একেকটি নক্ষত্র, আর তাঁদের সঠিক সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।

চতুর্থত মানুষ হচ্ছে দেহ ও আত্মা, হৃদয় ও বুদ্ধি এবং আবেগ ও রক্তের সমন্বিত অস্তিত্ব। সুতরাং মানুষ প্রকৃত সুখ-শান্তি ও সৌভাগ্য এবং জীবনের সফলতা ও সার্থকতা ততক্ষণ অর্জন করতে পারে না এবং মানবজাতি ও মানবতা ততক্ষণ ভারসাম্যপূর্ণ উন্নতি ও সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে না ততক্ষণ না মানুষের এ সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্য এবং শক্তি ও যোগ্যতা সুসমন্বিতরূপে এবং যথাযথভাবে বিকশিত ও প্রতিপালিত হবে।

পৃথিবীতে একটি আদর্শ ও কল্যাণকর সভ্যতার অস্তিত্ব ততক্ষণ কল্পনা করা সম্ভব নয় যতক্ষণ না এমন একটি ধর্মীয়, নৈতিক, বুদ্ধি-বৃত্তিক ও বৈষয়িক পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে যেখানে সহজে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে কারো পক্ষে মানবীয় পূর্ণতার শিখরে আরোহণ করা সম্ভব। আর সভ্যতার পথে মানবজাতির সুদীর্ঘ প্রয়াস-প্রচেষ্টা এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা এটা সন্দেহাতীতরূপে প্রমাণ করেছে যে, আদর্শ সভ্যতার এ সুন্দর স্বপ্নের বাস্তবায়ন কখনোই সম্ভব নয়, যদি না জীবনের নিয়ন্ত্রণ এবং সভ্যতার গতিনির্ধারণের ক্ষমতা এমন লোকদের হাতে থাকে যারা আত্মা ও জড়তা এবং হৃদয় ও বুদ্ধির অবিচ্ছেদ্যতায় বিশ্বাস রাখে, যারা যুগপৎ ধর্মীয়, নৈতিক ও জাগতিক জীবনের আদর্শ উদাহরণ হতে পারে এবং যারা সুস্থ বুদ্ধি, জাগ্রত বিবেক এবং কল্যাণকর জ্ঞানের অধিকারী। সুতরাং যদি তাদের শিক্ষা-দীক্ষায়, আকীদা-বিশ্বাসে এবং তারবিয়াত ও প্রতিপালনে কোন ত্রুটি থেকে যায় তাহলে অবধারিতভাবেই সে ত্রুটি তাদের হাতে গড়ে ওঠা সভ্যতায়ও সংক্রমিত হবে, হতে বাধ্য এবং তার প্রতিক্রিয়া বিভিন্নরূপে ও বিচিত্রভাবে প্রকট হয়ে দেখা দেবে।

এভাবে যদি সভ্যতার পথযাত্রায় এমন মানবগোষ্ঠীর আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, যারা শুধু বস্তুর পূজায় বিশ্বাসী এবং শুধু স্থূল ভোগ-বিলাস ও জাগতিক লাভলোকসানের চিন্তায় বিভোর; যারা দৃশ্যমান জীবন ও জগত ছাড়া ঊর্ধ্বজাগতিক অন্য কিছুতে বিশ্বাসী নয়; যারা মনে করে, ভোগ-উপভোগের এই জড়জীবনের পর মানুষ মাটির নীচে মিশে যাবে এবং সবকিছু অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে, তো তাদের স্বভাব, মন-মানস ও চিন্তাচেতনার প্রভাব অবধারিতভাবেই সভ্যতার আকৃতি ও প্রকৃতিতে পড়বে। তারপর সেই ছাঁচেই তা গড়ে ওঠবে ও বিকশিত হবে। ফলে মানবতার কিছু কিছু দিক যেমন পূর্ণতা লাভ করবে তেমনি কিছু কিছু দিক বিনষ্ট হবে।

এমন সভ্যতা হয়ত ইট-পাথরে, লোহা-তামায়, কাগজে-বস্ত্রে ও সোনায়-মুদ্রায় উন্নতি শিখরে পৌঁছে যাবে এবং বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে, সমরকৌশলে ও যুদ্ধাস্ত্রে সময় থেকেও এগিয়ে যাবে এবং আনন্দ-বিনোদন ও পাপাচারের রূপবৈচিত্রে কল্পনাকেও হার মানাবে, কিন্তু কলব ও রূহ এবং হৃদয় ও আত্মার জগত পরিণত হবে ঊষরমরুতে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা হয়ে পড়বে বিপর্যস্ত। স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা ও সন্তান এবং ভাই-বোন ও বন্ধুর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে সুবিধা ও স্বার্থের টানে। এককথায় সেই সভ্যতা পরিণত হবে এমন ফোলা-ফাঁপা দেহে যা দেখতে হবে আকর্ষণীয়, কিন্তু স্বাস্থ্য ও সুস্থতা থেকে বঞ্চিত এবং তার হৃদয় ও আত্মা হবে ব্যথা-বেদনায় জর্জরিত।

পক্ষান্তরে সভ্যতার চালকের আসনে বসা সেই মানবগোষ্ঠী যদি জড় ও বস্তুকে অস্বীকার বা অবহেলা করে এবং শুধু হৃদয়, আত্মা ও ঊর্ধ্বজাগতিক বিষয়কেই গুরুত্ব প্রদান করে এবং জীবন ও জীবনের স্বাভাবিক চাহিদার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয় তাহলে পরিণাম কী হবে?

সভ্যতার বৃক্ষ সজীবতা হারিয়ে শুকিয়ে যাবে। মানুষের ভিতরের স্বভাবশক্তি ও সহজাত যোগ্যতা দুর্বল হয়ে ঝিমিয়ে পড়বে এবং স্বভাব ও প্রকৃতির সঙ্গে সাঙ্ঘর্ষিক এই নেতৃত্বের প্রভাবে মানুষ জীবনের আলোকিত মঞ্চ থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেবে অরণ্যে, প্রান্তরে, পর্বতে ও গুহার অন্ধকার নির্জনতায়। বিবাহ ও পারিবারিক জীবনের পরিবর্তে তারা বরণ করবে কৌমার্যের ব্রত ও সাধনা এবং সেটাকেই মনে করবে মোক্ষ লাভের স্বর্ণদ্বার। আত্মাকে পবিত্র করার জন্য দেহের উপর তারা চালাবে এমন আত্মনির্যাতন যে, দেহের সব ক্ষমতা ও সক্ষমতা বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। এককথায় জীবনকে হরণ করে তারা মৃত্যুকে বরণ করে নেবে, যাতে তারা পৌঁছে যেতে পারে নোংরা জড়জগত থেকে আত্মার পুতপবিত্র জগতে, যেখানে ঘটবে তাদের প্রকৃত শক্তির পরিপূর্ণ বিকাশ। কারণ তাদের তো বিশ্বাস, জড়জগতের স্থূলতায় মানবশক্তির পূর্ণতা অর্জন সম্ভব নয়।

এ আত্মঘাতী চিন্তা-চেতনার ফল এছাড়া আর কী হতে পারে যে, সভ্যতার অপমৃত্যু ঘটবে, নগর-শহর বিপর্যস্ত হবে এবং পুরো জীবনব্যবস্থা বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে!

যেহেতু এটা মানবের স্বভাব ও ফিতরতের সাথে সঙ্ঘর্ষপূর্ণ চিন্তাধারা সেহেতু তা গ্রহণযোগ্য হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়, বরং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের উত্থান হবে অবশ্যম্ভাবী। মানুষের বাইরের জড়সত্তা ও ভিতরের পাশবিকতা একসঙ্গে এমনই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠবে যে, নীতি ও নৈতিকতা এবং আত্মা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি কোন দয়া-মায়া ও কোমলতার অবকাশ থাকবে না। এককথায় মানবতার ঘটবে অপমৃত্যু এবং পাশবিকতা ও হিংস্রতার হবে জয়জয়কার। কিংবা খুব কম করে যদি হয় তাহলে সন্ন্যাসপ্রবণ এই গোষ্ঠীর উপর জড়বাদী একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে যে, প্রকৃতিগত দুর্বলতার কারণেই তারা তা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হবে এবং পরাজয় মেনে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করবে, অথবা জীবন ও জগতের সমস্যার প্রতিকার করতে গিয়ে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে সে নিজেই আগবাড়িয়ে জড়বাদী শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করতে চাইবে। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা এবং রাজনীতি ও অর্থনীতির দায়দায়িত্ব তাদের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজেদের তারা গুটিয়ে নেবে প্রথাগত ধর্মকর্ম ও আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষুদ্র বৃত্তে।

এভাবে জীবন ও ধর্ম এবং দ্বীন ও যিন্দেগির বিচ্ছিন্নতা সামনে আসবে। নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং জীবন থেকে তার ছায়া ক্রমে সঙ্কুচিত হতে থাকবে, আর মানবসমাজে ও ব্যবহারিক জীবনে তার নিয়ন্ত্রণ একেবারে শিথিল হয়ে পড়বে। একসময় এগুলো হয়ে যাবে ভাবনা ও কল্পনার বিষয়, যা জীবনের অঙ্গন থেকে নির্বাসিত হয়ে আশ্রয় নেবে দর্শন ও মতবাদ হিসাবে বুদ্ধিজীবীদের গবেষণাপত্রে। পৃথিবীর যেসব জাতি ও জনগোষ্ঠী মানবজাতি ও মানবসভ্যতার নেতৃত্ব দান করেছে তাদের মধ্যে খুব কমই এমন ছিলো যারা প্রান্তিকতার এ ভয়ানক দোষ ও বিচ্যুতি থেকে মুক্ত ছিলো। হয় তারা ছিলো ভোগবিলাসে মত্ত আগাগোড়া জড়বাদের পূজারী, কিংবা জীবন ও তার চাহিদার প্রতি বীতশ্রদ্ধ নিছক আত্মার পূজারী ও সন্ন্যাসবাদী। একারণেই জীবন ও সভ্যতার তরী সবসময় ছিলো দোলায়মান। কখনো তা কাত হয়ে পড়তো জড়বাদের দিকে, কখনো সন্ন্যাসবাদের দিকে। সর্বাঙ্গীণতা ও ভারসাম্যপূর্ণতা বলতে গেলে ছিলো না কোথাও কখনো।

পক্ষান্তরে ছাহাবা কেরামের বৈশিষ্ট্য ছিলো এই যে, তাঁরা ধার্মিকতা ও নৈতিকতা, নির্মোহতা ও জীবনবাদিতা, বস্তুশক্তি ও আত্মিক শক্তি এবং নীতি ও রাজনীতির মধ্যে অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেছিলেন। সভ্যতার জন্য অপরিহার্য সমস্ত দিক তাঁদের মধ্যে পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিলো এবং মানবতার যেসমস্ত গুণ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো, কিংবা বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন জাতির মধ্যে ছিলো সেগুলোর একত্র সমাবেশ ঘটেছিলো তাঁদের জীবনে।

সমগ্র মানবজাতির মধ্যে তাঁরাই ছিলেন একমাত্র জনগোষ্ঠী যারা নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ স্তরে যেমন ছিলেন তেমনি দেহ ও আত্মার স্বাভাবিক চাহিদার মধ্যে এমন সুন্দর ভারসাম্য এবং সমকালীন জীবনের সর্বক্ষেত্রে এমন বিস্ময়কর সর্বাঙ্গীণতা অর্জন করেছিলেন যার দৃষ্টান্ত কোন জাতির ইতিহাসে খুব কমই পাওয়া যায়। তদুপরি তাঁদের ছিলো পরিপূর্ণ জাগতিক ও বস্তুগত প্রস্তুতি এবং জ্ঞান ও বুদ্ধির অনন্যসাধারণ ব্যাপ্তি—এসবের কল্যাণে একমাত্র তাঁদের পক্ষেই সম্ভব ছিলো মানবতা ও মানব-সভ্যতাকে সফলতা, সার্থকতা, সৌভাগ্যের পথ দেখানো এবং আত্মিক, নৈতিক ও জড়জাগতিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছে দেয়া।

খেলাফাতে রাশেদাই হলো সর্বোত্তম আদর্শ

নবুয়তে মুহম্মদীর মাধ্যমে মানবজাতির সেই স্বপ্ন ও প্রত্যাশাই পূর্ণ হলো। আসমানী তত্ত্বাবধানে এবং নববী তারবিয়াত ও প্রতিপালনে ছাহাবা কেরামের এক আদর্শ জামা'আত তৈরী হলো। খেলাফাতে রাশেদার মাধ্যমে মানবজাতি ধর্ম, কর্ম, চরিত্র ও নৈতিকতা এবং প্রজ্ঞা, প্রতিভা ও যোগ্যতার সুসমন্বয়ে এমন এক সুন্দর, সুপরিণত ও সুসমৃদ্ধ সমাজ, সভ্যতা ও শাসনব্যবস্থা লাভ করলো, যার ন্যূনতম তুলনা মানব-ইতিহাসের কোন অধ্যায়ে আমরা দেখতে পাই না। এককথায়, আদর্শ মানব তৈরী এবং আদর্শ সভ্যতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক, জাগতিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক এবং জ্ঞান ও ধর্মীয় শক্তিগুলো সেখানে পরস্পর সহায়করূপে পূর্ণ সক্রিয় ছিলো। সেটা ছিলো তদানীন্তন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রব্যবস্থা। রাজনৈতিক ও জাগতিক শক্তির বিচারে তা সমকালীন সব শক্তিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। সমাজজীবনে ও শাসনব্যবস্থায় উন্নত নৈতিকতা ও আদর্শ চরিত্রেরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিলো। ব্যবসা-বাণিজ্য, পেশা-শিল্প, লেনদেন ও সামাজিক সম্পর্ক, আচার-বিচার, এককথায় জীবনের সর্বক্ষেত্রে উন্নত মানবিক মূল্যবোধের একচ্ছত্র শাসন ছিলো। বিজয়াভিযানের বিস্তার ও সভ্যতার ব্যাপ্তির পাশাপাশি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতিও অব্যাহত ছিলো। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির এবং ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক ছিলো আস্থা ও দায়িত্বশীলতা এবং ভালোবাসা ও কল্যাণকামিতার বুনিয়াদের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত। ফলে সাম্রাজ্যের বিশালতা ও জনসংখ্যার স্ফীতির তুলনায় অপরাধ ও দুষ্কৃতির পরিমাণ ছিলো খুবই কম, প্রায় শূন্যের কোঠায়; অথচ পরিবেশ-পরিস্থিতি ও কার্যকারণ সবই ছিলো অপরাধপ্রবণতার অনুকূল।

এককথায়, খেলাফাতে রাশেদা ছিলো এমনই এক আদর্শ শাসনযুগ, যার চেয়ে উত্তম ও সমৃদ্ধতর আর কিছু কল্পনা করারও উপায় ছিলো না। আর তা সম্ভব হয়েছিলো শুধু তাঁদের জীবন ও চরিত্রের সৌন্দর্যের কারণে যারা শাসন পরিচালনা করতেন এবং নাগরিক জীবন ও সভ্যতার পরিচর্যা করতেন। সম্ভব হয়েছিলো তাঁদের আকীদা-বিশ্বাস, শিক্ষা-দীক্ষা এবং রাজনীতি ও শাসননীতির মহত্ত্বের কারণে। যেখানে যে কাজে ও যে দায়িত্বেই তাঁরা ছিলেন, চরিত্র ও ধার্মিকতায় সবার আদর্শ হয়েই ছিলেন। শাসক ও শাসিত, কর্মী ও কর্মকতা, পরিচালক ও পরিচালিত, সৈনিক ও সেনাপতি, এককথায় সর্বাবস্থায় সততা ও সত্যবাদিতা, বিনয় ও 'ভীতি', ত্যাগ ও আত্মত্যাগ এবং সহমর্মিতা ও কল্যাণ-কামিতাই ছিলো তাঁদের বৈশিষ্ট্য। রোমের জনৈক বিশিষ্ট ব্যক্তি একবার মুসলিম সৈনিকদের অবস্থা বর্ণনাপ্রসঙ্গে বলেছেন—
'রাতে তারা ইবাদতগুজার এবং দিনে রোযাদার। তারা ওয়াদা পূর্ণ করে, সৎ কাজে আদেশ করে এবং মন্দ কাজে নিষেধ করে। আর পরস্পর ইনসাফপূর্ণ আচরণ করে।'¹

অন্য একজনের মতে, 'দিনে তারা ঘোড়সওয়ার, রাতে ইবাদতগুজার। অধিকৃত এলাকায়ও তারা বিনামূল্যে কিছু গ্রহণ করে না এবং বিনাসালামে কোথাও প্রবেশ করে না। অন্যদিকে তাদের বিরুদ্ধে যারা মাথা তোলে তাদের শেষ না করে তারা ক্ষান্ত হয় না।'²

তৃতীয়জনের মতে, 'রজনীতে তারা সংসারত্যাগী, দিবসে অশ্বারোহী, তীরচালনায় পারদর্শী এবং বর্শানিক্ষেপে কুশলী। তুমি যদি পাশের ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে চাও, সে তোমার কথা বুঝতে পারবে না; কারণ চারপাশে শুধু তিলাওয়াত ও যিকিরের গুঞ্জন।'³

এ নববী দীক্ষা ও তারবিয়াতেরই ফল ছিলো এই যে, মাদায়েন বিজয়কালে পারস্যসম্রাটের রাজমুকুট এবং ঐতিহ্যবাহী ফরাস সৈনিকদের হস্তগত হলো, যার মূল্য ছিলো কয়েক লাখ দীনার। কিন্তু লোভে পড়ে কেউ তাতে তসরূফ করলো না, বরং অক্ষত অবস্থায় সেনাপতির হাতে তুলে দিলো, আর তিনি তা খলীফাতুল মুসলিমীনের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। খলীফা সন্তোষ প্রকাশ করে বললেন, এ আমানত যারা রক্ষা করেছে তারা অবশ্যই আমানতদার!¹

জীবনের উপর ইসলামী নেতৃত্বের প্রভাব

নবীর অনুসারীদের এই যে প্রথম জামা'আত, তাঁদের সুশাসনের সুস্নিগ্ধ ছায়ায় মানবজাতি পরম সুখ-শান্তির অধিকারী হবে এবং তাঁদের সুপ্রাজ্ঞ নেতৃত্বের কল্যাণে সোজা-সরল পথে সঠিক গন্তব্যে পরিচালিত হবে, আর পৃথিবী হবে ফলে, ফুলে, ফসলে পরিপূর্ণ এবং আনন্দরসে সুসিক্ত 'জান্নাত-নমুনা' এক শান্তি-উদ্যান, এটাই ছিলো স্বাভাবিক এবং তাই হয়েছিলো। কেননা তাঁরা ছিলেন পৃথিবীর সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তার উত্তম ব্যবস্থাপক এবং উত্তম প্রহরী। জীবনের প্রতি তাঁদের দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। জীবন তাঁদের কাছে লোহার খাঁচা, কিংবা পায়ের বেড়ী ছিলো না, চরম আক্রোশে যা ভেঙ্গে ফেলার ইচ্ছে হবে; তদ্রূপ তা ছিলো না ভোগ-উপভোগের এমন বিরল সুযোগ, যা আর ফিরে আসবে না বলে এখনই লুটে নিতে হবে এবং চেটেপুটে খেয়ে ফেলতে হবে। একই ভাবে জীবন তাঁদের কাছে ছিলো না কোন জন্মগত পাপের শাস্তি, যা থেকে মুক্তি লাভের জন্য অস্থির বে-কারার হতে হবে, তদ্রূপ ছিলো না সাজানো বিছানো ও সুস্বাদু খাবারে পরিপূর্ণ কোন দস্তরখান, যার উপর এখনই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে এবং ভোগের ভাগ বাড়ানোর উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হবে। দুর্বল জাতিবর্গ তাদের দৃষ্টিতে কোন লোভনীয় শিকার ছিলো না যে, 'কে কার আগে' তাদের উপর হামলে পড়তে হবে।

না, এমন ছিলো না, বরং তাঁদের দৃষ্টিতে জীবন ছিলো আল্লাহর নেয়ামত, যা সকল পুণ্য ও সকল কল্যাণের উৎস; জীবন ছিলো তাঁদের কাছে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম এবং আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত মানবীয় পূর্ণতায় উত্তরণের সোপান; জীবন ছিলো তাঁদের কাছে কর্মের এবং অর্জনের সংগ্রামসাধনার একমাত্র সুযোগ যা দ্বিতীয় বার ফিরে আসবে না।
تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُ الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَوَةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ
'বরকতপূর্ণ হয়েছেন ঐ সত্তা যার হাতেই রয়েছে রাজত্ব, আর তিনি সর্ববিষয়ের উপর ক্ষমতাবান; যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যুকে এবং জীবনকে, যেন তোমাদের পরীক্ষা করেন যে, তোমাদের মধ্যে কে অধিক উত্তম কর্মে ও আচরণে।' (সূরাতুল মূলক, ৬৭: ১)
إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَإِنَّا لَجَاعِلُونَ مَا عَلَيْهَا صَعِيدًا جُرُزًا
'নিঃসন্দেহে বানিয়েছি আমি পৃথিবীস্থ সকল কিছুকে পৃথিবীর জন্য শোভা, যেন তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন যে, তোমাদের মধ্যে কে উত্তম, কর্মে ও আচরণে। তবে পৃথিবীর বুকে যা কিছু আছে সেগুলোকে অবশ্যই আমি বানাব ঊষর ভূমি।' (কাহফ, ১৮:৭)

বিশ্বজগতের প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো এই যে, তা আল্লাহর রাজত্ব, তাদেরকে তিনি তাতে স্থলাভিষিক্ত করেছেন, প্রথমত মানবসত্তাগত দিক থেকে; কারণ মানবজাতিকে তিনি পৃথিবীতে খলীফারূপে সৃষ্টি করেছেন। ইরশাদ হয়েছে—
وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً
'আর (স্মরণ করুন ঐ সময়কে) যখন বললেন আপনার প্রতিপালক, অবশ্যই আমি পৃথিবীতে সৃষ্টি করবো একজন খলীফা।'
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ فَسَوَّنَهُنَّ سَبْعَ سمَاوَاتٍ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
'তিনি ঐ সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু আছে পৃথিবীতে, তা সকলই। তারপর তিনি অভিমুখী হলেন আকাশের দিকে, অনন্তর তাকে সপ্তআকাশে সুবিন্যস্ত করলেন, আর সর্ববিষয়ে তিনি সর্বজ্ঞ।' (বাকারাহ, ২:২৯)
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي ءَادَمَ وَحَمَلْتَهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْتَهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْتَهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلاً
'আর অবশ্যই মর্যাদাবান করেছি আমি বনী আদমকে এবং বহন করিয়েছি তাদেরকে স্থলে ও জলে এবং রিযিক দান করেছি তাদেরকে উত্তম বস্তুসকল হতে এবং বিরাট শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি তাদেরকে আমার বহু সৃষ্টির উপর।' (আল-ইসরা, ১৭: ৭০)

দ্বিতীয়ত এদিক থেকে যে, তাঁরা সেই পুণ্যবান জামা'আত যারা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে এবং আল্লাহর আদেশের অনুগত হয়েছে। তাই তাঁদের তিনি পৃথিবীতে খেলাফাত দান করেছেন এবং পৃথিবীর অধিবাসীদের শাসক নির্বাচন করেছেন। ইরশাদ হয়েছে—
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ ءَامَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ هُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى هُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنَا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُوْلَبِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
'ওয়াদা করেছেন আল্লাহ তাদের প্রতি যারা ঈমান এনেছে এবং নেক 'আমল করেছে যে, অতি অবশ্যই তিনি তাদের পৃথিবীতে স্থলাভিষিক্ত করবেন, যেমন স্থলাভিষিক্ত করেছেন তাদেরকে যারা তাদের পূর্বে বিগত হয়েছে এবং তাদের অনুকূলে প্রতিষ্ঠা দান করবেন তাদের দ্বীনকে যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তারা ভয়তাড়িত হওয়ার পর পরিবর্তে তাদের স্বস্তি দান করবেন। কারণ তারা আমার ইবাদত করে, আর কোন কিছুকে আমার সাথে শরীক করে না। আর যে কুফুরি করবে এরপর, তো তারাই হলো পাপাচারী।' (আন-নূর, ২৪: ৫৫)

আর তাদেরকে তিনি পৃথিবীর যাবতীয় নেয়ামত ভোগ করার অধিকার দান করেছেন, তবে অপচয় ও অপব্যয়ের সাথে নয়। ইরশাদ হয়েছে—
خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا
'তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু রয়েছে পৃথিবীতে।' (বাকারাহ, ২:২৯)
أَلَمْ تَرَوْا أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُم مَّا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ
তোমরা কি দেখোনি যে আল্লাহ তোমাদের বশীভূত করেছেন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা আছে সেগুলোকে। (লুকমান, ৩১: ২০)
يَبَنِي ءَادَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
'হে আদমের পুত্রগণ, গ্রহণ করো তোমরা তোমাদের সাজ প্রত্যেক সিজদার সময়। আর আহার করো এবং পান করো, তবে অপচয় করো না। নিঃসন্দেহে তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।' (আল-আ'রাফ, ৭: ৩১)
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ، وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ ءَامَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ
'আপনি বলুন, কে হারাম করেছে, আল্লাহর (দেয়া) যীনাত (ও শোভা), যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য বের করেছেন এবং (কে হারাম করেছে) উত্তম রিযিকসমূহ? বলুন, তা তো ঐ লোকদের জন্য যারা ঈমান এনেছে দুনিয়ার জীবনে, কেয়ামত-দিবসের জন্য নিজেদের নিবিষ্ট করে। এভাবেই আমি বিশদরূপে বর্ণনা করি আয়াতসমূহ এমন কাউমের জন্য যারা জ্ঞান রাখে।' (আল-আ'রাফ, ৭:৩২)

আর তিনি তাঁদেরকে পৃথিবীর সকল জাতি ও জনগোষ্ঠীর উপর কর্তৃত্ব দান করেছেন, যাতে তাঁরা তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং তাদের জীবন ও চরিত্র, গতি ও গতিবিধি এবং ঝোঁক ও প্রবণতাকে কল্যাণের পথে সুনিয়ন্ত্রিত রাখে; যেন তাঁরা ভ্রষ্টকে পথ প্রদর্শন করে এবং বিনষ্টকে সংশোধন করে এবং যাবতীয় ফাটল মেরামত করে; যেন তাঁরা সবল থেকে দুর্বলকে রক্ষা করে এবং যালিমের কাছ থেকে মযলুমের অধিকার উদ্ধার করে; যেন তাঁরা পৃথিবীতে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে এবং সারা বিশ্বে শান্তি, স্বস্তি ও স্থিতির ছায়া বিস্তার করে।

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّাসِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
'তোমরা হলে সর্বোত্তম জাতি, যাদের উত্থিত করা হয়েছে মানবজাতির জন্য, তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে, আর তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।' (আলে ইমরান, ৩: ১১০)

يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ
'হে ঐ লোকেরা যারা ঈমান এনেছো, তোমরা সুবিচারে অবিচল থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদানকারী হও; হোক তা তোমাদের নিজেদের বিপক্ষে, বা পিতা-মাতার এবং নিকট স্বজনদের বিপক্ষে।' (আন-নিসা, ৪: ১৩৫)

জার্মান নওমুসলিম পণ্ডিত মুহম্মদ আসাদ মুসলিম ব্যক্তিত্বের এ বৈশিষ্ট্যের একটি খুব নিখুঁত ও বাস্তবানুগ চিত্র এঁকেছেন। তিনি বলেন—
'খৃস্টবাদের মত ইসলাম জীবন ও জগতের প্রতি কালো চশমার ভিতর দিয়ে দৃষ্টিপাত করে না, বরং একদিকে ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, যেন আমরা পার্থিব জীবনের মূল্যায়নে অতিকৃষ্ণ ও বৈরাগ্যের শিকার না হই, অন্যদিকে আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার মত জীবনের ভোগবাদিতা ও স্বেচ্ছাচারে নিমজ্জিত না হই।

খৃস্টধর্ম জীবনকে ঘৃণা করে এবং জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা পোষণ করে। পক্ষান্তরে খৃস্টীয় দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ বিপরীতে পাশ্চাত্য সভ্যতা জীবনের প্রতি লোভাতুর আচরণ করে, যেমন ভোজনলোভী গোগ্রাসে খাবার গিলতে থাকে, অথচ খাবারের প্রতি তার কোন সম্মানবোধ থাকে না। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। জীবন ও জগতকে ইসলাম শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখে এবং তার প্রতি প্রশান্ত অনুভূতি পোষণ করে। জীবনকে ইসলাম পূজা করে না, বরং ঊর্ধ্বজাগতিক জীবনের অভিযাত্রার পথে এমন একটি পর্যায় বলে গণ্য করে, যা তাকে যোগ্যতা ও কুশলতার সঙ্গে অতিক্রম করতে হবে। যেহেতু এটি মহাজীবনের একটি পর্যায় এবং অপরিহার্য পর্যায়, সেহেতু মানুষের অধিকার নেই এর অবমূল্যায়ন করার।

আমাদের মহাজীবনের এ সফরে ইহজীবনের এই পথটুকু অতিক্রম করতেই হবে, এটাই আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত তাকদীর। সুতরাং পারলৌকিক জীবনের সফলতা অর্জনে পৃথিবীর মানবজীবনের বিরাট মূল্য ও ভূমিকা রয়েছে; তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, এ জীবন অন্য জীবনে উত্তরণের জন্য নিছক মাধ্যম; পার হওয়ার সংক্ষিপ্ত অথচ অপরিহার্য এক সেতু। পার্থিব জীবনের মূল্য এর চেয়ে কমও নয়, বেশীও নয়।

ইসলাম এই জড়বাদী চিন্তাকে কখনো অনুমোদন করে না যে, আমার চাওয়া-পাওয়া শুধু দৃশ্য জীবন ও দৃশ্য জগত। তদ্রূপ জীবনের প্রতি চরম তাচ্ছিল্যপূর্ণ এই চিন্তাকেও স্বীকার করে না যে, এই পাপপূর্ণ জীবনের কাছে আমার কোন চাওয়া-পাওয়া নেই। ইসলামের চলার পথ হলো এ দুয়ের মধ্যবর্তী পথ। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, তোমার প্রতিপালকের কাছে এভাবে দু'আ করো—
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
'হে আমাদের প্রতিপালক! দান করুন আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ এবং আখেরাতে কল্যাণ, আর রক্ষা করুন আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে।' (আল-বাকারাহ, ২: ২০১)

সুতরাং জীবন এবং জীবনের সাথে সম্পর্কিত বস্তুসকল আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনের সাধনার পথে হোঁচট খাওয়ার জন্য পড়ে থাকা প্রস্তরখণ্ড নয়, বরং জাগতিক উন্নতি ও বস্তুগত সমৃদ্ধি অর্জন করা হচ্ছে জীবনের কাঙ্ক্ষিত বিষয়, তবে নিজস্ব সত্তাগতভাবে তা কখনোই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নয়। আমাদের সকল চেষ্টা-সাধনার লক্ষ্য হওয়া উচিত এই যে, ব্যক্তিপর্যায়ে ও সামাজিক স্তরে আমরা এমন অবস্থা ও পরিবেশ সৃষ্টি করবো এবং পরবর্তী পর্যায়ে তা রক্ষার চেষ্টা করবো যা ইসলামের জীবনদর্শন অনুযায়ী মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়। জীবনের বিস্তৃত অঙ্গনে মানুষ ছোট বড় যে কোন কাজ করুক ইসলাম তাকে নৈতিক দায়িত্ববোধ অর্জনের প্রতি অনুপ্রাণিত করে। ইসলামের জীবনব্যবস্থা কখনোই তা অনুমোদন করে না যা (বর্তমান) ইঞ্জিল তার অনুসারীকে শিক্ষা দেয়—'সিজারকে দাও যা তার প্রাপ্য এবং ঈশ্বরকে দাও যা তার প্রাপ্য।'

ইসলামের দৃষ্টিতে কোন সিজারের নিজস্ব পাওনা বলে কিছু নেই। সবই আল্লাহর প্রাপ্য। সেই প্রাপ্যের আলোকে সিজারের প্রতি আমাদের অবশ্যই কিছু দায় ও দায়িত্ব রয়েছে। জীবনের প্রয়োজনগুলোকে আধ্যাত্মিক ও জাগতিক এবং নৈতিক ও বস্তুগত—এই বিভাজনে ইসলাম বিশ্বাস করে না। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের দেহ ও আত্মার সকল প্রয়োজনই জীবনের প্রয়োজন। জীবনের কাছে ইসলামের একমাত্র দাবী হলো হক ও বাতিলের মধ্যে একটিকে বেছে নেয়া। হক ও বাতিলের মধ্যবর্তী কোন পথ ও পন্থা ইসলামের কাছে নেই। তাই ইসলামের জোরদার আদেশ হলো কর্মময় জীবনের। কেননা কর্ম জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা থেকে দূরে থাকার কোন সুযোগ নেই। প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্যকর্তব্য হলো নিজেকে দায়বদ্ধ মনে করা তার চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে এবং তার সামনে, পিছনে ও ডানে-বামে যা কিছু ঘটছে সে সম্পর্কে। তাকে নিয়োজিত থাকতে হবে হকের প্রতিষ্ঠা এবং বাতিলের বিলুপ্তির নিরন্তর জিহাদে। কারণ তার প্রতি কোরআনের সম্বোধন হলো—
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّাসِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
'তোমরা হলে শ্রেষ্ঠ উম্মত, যাদের উত্থিত করা হয়েছে মানবের (কল্যাণের) জন্য। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে, আর আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।' (আলে ইমরান, ৩: ১১০)

এটাই হচ্ছে ইসলামী জিহাদের, প্রারম্ভিক যুগের ইসলামী বিজয়াভিযানের এবং আধুনিক যুগের পরিভাষায় ইসলামী উপনিবেশবাদের নৈতিক বৈধতার ভিত্তি। হাঁ, এ পরিভাষা ব্যবহার করা যদি অপরিহার্যই হয় তবে আমি বলবো, ইসলাম অবশ্যই উপনিবেশবাদী, তবে ঐ উপনিবেশবাদ নয়, যার উৎস হলো ক্ষমতা ও আধিপত্য এবং সম্পদ লুণ্ঠন ও স্বাধীনতা হরণ। প্রথম যুগের মুজাহিদগণ নিজেদের এবং প্রতিপক্ষের সামরিক শক্তির অনুপাতের পরোয়া না করে যেভাবে জিহাদের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তেন তার পিছনে বিজিত জাতির সম্পদ লুণ্ঠন ও ক্ষমতা দখল এবং জীবনের সুখ-সচ্ছলতা নিশ্চিত করার আকাঙ্ক্ষা ক্রিয়াশীল ছিলো না, বরং তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো মানবজাতির আধ্যাত্মিক উন্নতির সম্ভাব্য সর্বোত্তম বিশ্বপরিবেশের বিনির্মাণ। যেমন ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী মহত্ত্ব-এর জ্ঞান মানুষের উপর মহত্ত্বকে গ্রহণ ও প্রতিপালন করার দায় আরোপ করে। মহত্ত্ব ও নীচতার নিছক তাত্ত্বিক বিভাজন এবং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার প্লেটোবাদকে ইসলাম মোটেই সমর্থন করে না। বরং ইসলাম এটাকে অতি নীচতা বলেই গণ্য করে যে, মানুষ হক ও বাতিলের মধ্যে তাত্ত্বিক পার্থক্য তো অনুধাবন করবে কিন্তু হকের প্রতিষ্ঠা ও পৃষ্ঠপোষকতা এবং বাতিলের অপসারণ ও মূলোৎপাটনের জন্য জিহাদ করবে না। কেননা ইসলাম তার অনুসারীকে এ শিক্ষা দেয় যে, মহত্ত্ব ততক্ষণই জীবন্ত থাকবে যতক্ষণ মানুষ পৃথিবীতে মহত্ত্বের বিস্তারের জন্য জিহাদ ও মোজাহাদা করবে। পক্ষান্তরে যখনই সে মহত্ত্বের পৃষ্ঠপোষকতা পরিত্যাগ করবে মহত্ত্ব নির্জীব হয়ে যাবে এবং একসময় তার অপমৃত্যু ঘটবে।'¹

মানবজাতির গতিধারায় ইসলামী সভ্যতার প্রভাব

হিজরী প্রথম শতকে ইসলামী সভ্যতা নিজস্ব প্রাণপ্রাচুর্য এবং স্বকীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্যসহ আত্মপ্রকাশ করেছিলো এবং ইসলামী সালতানাত ও সাম্রাজ্য তার বিশুদ্ধ আকৃতি ও প্রকৃতিসহ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলো। মানবজাতির ধর্মনীতি ও চরিত্রনীতির ইতিহাসে সেটা ছিলো এক নতুন অধ্যায় এবং রাজনীতি ও সমাজনীতির জগতে ছিলো এক নতুন ঘটনা, যার ফলে মানবসভ্যতার গতিধারা পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিলো এবং পৃথিবী ও তার জীবন এক নতুন মোড় গ্রহণ করেছিলো।

এমনিতে ইসলামী দাওয়াত তো যুগে যুগে নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে আসমান থেকে নাযিল হয়ে আসছিলো এবং তাঁদের শিষ্য-অনুসারিগণ সুসমাচার প্রচার করে আসছিলেন এবং দাওয়াতের পথে পূর্ণ ইখলাছের সঙ্গে জিহাদ ও মুজাহাদা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাদের পক্ষে কখনো সম্ভব হয়নি দাওয়াতের ভিত্তি ও বুনিয়াদ এবং চিন্তা ও দর্শনের উপর কোন রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং সভ্যতার গোড়াপত্তন করা, যেমনটি সম্ভব হয়েছিলো আখেরী নবী হযরত মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর অনুসারিদের পক্ষে। বস্তুত এক্ষেত্রে খোলাফায়ে রাশেদীনের সফলতা ছিলো অতুলনীয় ও নযিরবিহীন। ফলে ইসলামের এ অনন্যসাধারণ বিজয় ছিলো জাহিলিয়াতের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক চ্যালেঞ্জ, যার সঙ্গে ইতিপূর্বে তার কোন পরিচয় ছিলো না এবং কীভাবে এর মোকাবেলা করা সম্ভব তা সে বুঝেই উঠতে পারছিলো না।

প্রথমে সে ইসলামের মুখোমুখি হয়েছিলো নিছক একটি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক দাওয়াত মনে করে, কিন্তু দেখতে দেখতে তা পরিণত হলো ইহকালীন ও পরকালীন শান্তি ও মুক্তির একমাত্র পথরূপে, যেখানে দেহসত্তা ও অন্তসত্তার সুসমন্বয় ঘটেছে এবং সমাজ, সভ্যতা, শাসননীতি ও রাজনীতি এবং নৈতিকতা ও ধার্মিকতার অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে। ইসলাম ছিলো আসমানি ওহী ও ঐশী-বিধানসম্বলিত একটি ধর্ম যা সর্বোতভাবে বুদ্ধি ও যুক্তির সমর্থনপুষ্ট এবং পূর্ণ প্রজ্ঞা ও স্বতঃসিদ্ধতার অধিকারী; অন্যদিকে জাহিলিয়াত ছিলো নিছক কতিপয় কুসংস্কার, আজগুবি চিন্তা-বিশ্বাস ও কল্পকাহিনী, মানবীয় বিদ্যাবুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা-প্রসূত কতিপয় জীবনাচারের সমষ্টি। সুতরাং জাহিলিয়াত কীভাবে তার মোকাবেলা করতে পারে?

ইসলামী রাষ্ট্র ও সভ্যতা ছিলো মযবুত বুনিয়াদের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং সুসংহত একটি আদর্শ রাষ্ট্র ও সভ্যতা, যেখানে তাকওয়া, পবিত্রতা, সততা ও সত্যবাদিতাই ছিলো সবকিছুর মাপকাঠি, যেখানে নীতি ও নৈতিকতার মূল্য ছিলো পদ ও সম্পদের উপরে এবং আত্মা ও আত্মিকতার মূল্য ছিলো প্রদর্শনবাদিতা ও বাহ্যিকতার ঊর্ধ্বে।

সমাজের সর্বস্তরের সকল মানুষ, মানুষ হিসাবে সমান; কেউ কারো চেয়ে বড় নয় কোন বিচারে। সেখানে মানুষে মানুষে যা কিছু পার্থক্য তা শুধু তাকওয়ার ভিত্তিতে। সেখানে মানুষের একমাত্র চিন্তা ও ধ্যান-জ্ঞান হলো আখেরাত। তাই পার্থিববিষয়ে হৃদয় ও আত্মা ছিলো প্রশান্ত এবং আখেরাতের বিষয়ে কলব ও রূহ ছিলো খুশু-খুযুতে আচ্ছন্ন।

দুনিয়ার 'মুরদার' নিয়ে তাদের মধ্যে কুকুরের কামড়াকামড়ি ছিলো না, এমনকি ছিলো না কোন পার্থিব প্রতিযোগিতা। হিংসা-বিদ্বেষ ও রেষারেষি, লোভ-লালসা ও কৃপণতা এবং ইতরতা ও স্বার্থপরতা ছিলো সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত।

পক্ষান্তরে জাহিলিয়াতের কাছে ছিলো ঘুণে ধরা ও জরাগ্রস্ত এক সমাজ ও সভ্যতা, যেখানে ছিলো শুধু কোলাহল ও গোলযোগ, হানাহানি ও রেষারেষি এবং সীমাহীন অশান্তি ও নৈরাজ্য; সবল যেখানে দুর্বলের উপর যুলুম করে; শাসক যেখানে শুধু শোষণ করে, অথচ শোষণের শিকার যারা তারা করতে পারে না ফরিয়াদ, করে শুধু আর্তনাদ। সমাজের উচ্চস্তর ও অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা মেতে থাকে ভোগ-বিলাস ও অনাচার-পাপাচারে, আর পদ ও সম্পদ এবং প্রতিষ্ঠা ও প্রতিপত্তি অর্জনের উন্মত্ত প্রতিযোগিতায়। তাদের দিন-রাতের চিন্তা, কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে ভোগের আয়োজনে ও বিলাস-প্রাচুর্যে। ফলে সমাজ ও সভ্যতা মানুষের জন্য ছিলো যেন এক 'কুরুক্ষেত্র' এবং জীবন ও জীবনব্যবস্থা ছিলো এক জ্বলন্ত অভিশাপ ও মূর্তিমান আযাব। কোরআনের ভাষায়—
وَلَنُذِيقَنَّهُم مِّنَ الْعَدَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَدَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
'আর অতি অবশ্যই ভোগ করাবোই আমি তাদেরকে বড় আযাবের আগে ছোট আযাব, যাতে তারা ফিরে আসে।' (আস-সিজদাহ, ৩২: ২১)

ইসলাম মানুষকে দান করেছিলো এমন এক ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা, যা ছোট-বড়, ধনী-গরীব ও সাধারণ-অভিজাত সর্বশ্রেণীর মধ্যে ইনসাফ ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করে এবং সবলের হাত থেকে দুর্বলকে রক্ষা করে। মানুষের জান-মাল ও ইয্যত-আবরু যেমন হিফাযত করে তেমনি স্বভাব-চরিত্র ও নীতি-নৈতিবতা রক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করে। সেখানে সমাজের সর্বোত্তম লোকেরাই হলো শাসক এবং যার যত সম্পদ ও প্রাচুর্য সে তত সংযমী ও ভোগবিমুখ; পক্ষান্তরে জাহিলিয়াতের পুরো শাসন-ব্যবস্থায় ছিলো নির্যাতন-নিপীড়ন ও শোষণ-লুণ্ঠনের আধিপত্য। শাসক, কর্তা ও কর্মকর্তা সবাই যেন জোট বেঁধেছে দুষ্কৃতি, দুর্নীতি ও আত্মসাতের উপর। যেন এক উন্মত্ত প্রতিযোগিতা ছিলো যে, মানুষের জান-মাল ও ইয্যত-আববুর উপর কে কত 'হাতসাফ' করতে পারে। সমাজের সামনে তারা ছিলো যাবতীয় অন্যায় ও দুষ্কর্মের নিকৃষ্টতম উদাহরণ। ফলে সমাজের নৈতিক পচন ও চারিত্রিক অধঃপতনের জন্য তারাই ছিলো দায়ী। সম্প্রদায়ের নিকৃষ্টতম লোকেরা ছিলো সমাজের 'মাথা ও ব্যথা'। তাদের পশু ও কুকুরের তো উদরপূর্তির ব্যবস্থা ছিলো, কিন্তু প্রজাদের ছিলো না ক্ষুধার অন্ন। তাদের প্রাসাদে ছিলো মূল্যবান গালিচা ও দামী পর্দা, অথচ প্রজাদের ঘরে ছিলো না স্ত্রী-কন্যার লজ্জা ঢাকার আবরণ।

তাই পরবর্তী যুগে মানুষের সামনে ইসলামের সত্য ও জাহিলিয়াতের মিথ্যা ছিলো আলো-অন্ধকারের মতই সুস্পষ্ট। ইসলামের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এবং ইসলামকে আলিঙ্গন করার পথে তাদের সামনে কোন প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা ও নির্যাতনের হুমকি ছিলো না এবং ছিলো না জাহিলিয়াতের দিক থেকে কোন পিছুটান।

ইসলাম গ্রহণ করে মানুষ কিছুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতো না, বা কোন কিছু হারাতো না; না পারিবারিক অবস্থা, না সামাজিক অবস্থান। বরং হৃদয় ও আত্মার জগতে সে লাভ করতো চেতনা ও বিশ্বাসের প্রশান্তি এবং ঈমান ও ইয়াকীনের স্বাদ ও লজ্জত। লাভ করতো ইসলামের প্রভাব ও প্রতাপ এবং একটি অপ্রতিহত রাষ্ট্রশক্তির ছত্রচ্ছায়া। সর্বোপরি সে অর্জন করতো এমন একটি জাতির ভ্রাতৃত্ব-বন্ধন যারা জান-মাল ও সর্বশক্তি দিয়ে তাকে রক্ষা করার জন্য ছিলো প্রস্তুত। মৃত্যুর পর অনন্ত জীবনের সুখ-শান্তির নিশ্চিন্ততা তাদের অন্তসত্তায় এনে দিতো এমন এক প্রশান্তি ও স্নিগ্ধতা এবং স্বস্তি ও ইতমিনান যে, তখন মৃত্যুকে মনে হতো জীবনের চেয়ে প্রিয়। তাই মানুষ স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাহিলিয়াতের কাঁটাবন ত্যাগ করে ইসলামের পুষ্পোদ্যানে প্রবেশ করতো। ফলে জাহিলিয়াতের ভূমি চারদিক থেকে সঙ্কুচিত হয়ে আসছিলো, আর ইসলামের ভূমি ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছিলো।

কালিমার আওয়ায উচ্চ থেকে উচ্চ এবং সবুজ বৃক্ষের সুশীতল ছায়া আরো সুবিস্তৃত হয়ে চলেছিলো। এভাবে একসময় যাবতীয় ফিতনা বিলুপ্ত হয়ে গেলো এবং আল্লাহর দ্বীন একচ্ছত্র হয়ে গেলো। সব সমাজে ও সব জনপদে ইসলামের এ মহাবিপ্লবের প্রভাব ছিলো ব্যাপক ও বিস্তৃত। যখন জাহিলিয়াতের শক্তি ও প্রতাপ ছিলো, আর ইসলাম ছিলো দুর্বল ও শক্তিহীন তখন আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার পথ ছিলো কঠিন ও বিপদসঙ্কুল এবং দুর্গম ও ঝুঁকিবহুল। সেই পথ এখন হয়ে গেলো সহজ-সুগম, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ। জাহেলি সমাজে আল্লাহর আনুগত্য করা যেমন কঠিন ছিলো, এখন ইসলামী সমাজে তেমনি কঠিন হলো আল্লাহর নাফরমানি করা। তখন পাপাচার ও জাহান্নামিয়াতের প্রচার হতো প্রকাশ্যে, এখন তা গোপনে ও সঙ্গোপনে করাও হয়ে গেলো কঠিন। তখন দাওয়াত ইলাল্লাহ ছিলো মহাঅপরাধ, যা চলতো সঙ্গোপনে এবং যার পরিণাম ছিলো ভয়াবহ, কিন্তু এখন দাওয়াত চলতে লাগলো প্রকাশ্যে ও স্বাধীনভাবে; না ছিলো কোন বাদ-প্রতিবাদ, না ছিলো ঘাত-সঙ্ঘাত, না ছিলো নির্যাতন-নিপীড়ন। না ছিলো অন্যকিছু। দাওয়াত দেয়া হতো যেমন নির্বিঘ্নে তেমনি তা কবুল করা হতো নির্ভয়ে। কোরআনের ভাষায়—
وَأَذْكُرُوا إِذْ أَنتُمْ قَلِيلٌ مُسْتَضْعَفُونَ فِي الْأَرْضِ تَخَافُونَ أَن يَتَخَطَّفَكُمُ النَّاسُ فَتَاوَنَكُمْ وَأَيْدَكُم بِنَصْرِهِ، وَرَزَقَكُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
'স্মরণ করো তোমরা ঐ সময়কে যখন ছিলে (সংখ্যায়) অল্প (এবং শক্তিতে) দুর্বল। তোমরা আশঙ্কা করতে যে, মানুষ তোমাদের ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে, অনন্তর তিনি আশ্রয় দান করেছেন এবং আপন সাহায্য দ্বারা তোমাদের সুদৃঢ় করেছেন, আর উত্তম বস্তুসমূহ হতে তোমাদের রিযিক দান করেছেন।' (আনফাল, ৮: ২৬)

মানুষকে তাঁরা নির্ভয়ে সৎ কাজের আদেশ দিতেন এবং অসৎ কাজের নিষেধ করতেন; যথার্থ আদেশ-নিষেধ, যা কার্যকর করার শক্তি ও সক্ষমতা ছিলো তাদের।

মানুষের স্বভাব ও চিন্তা-বুদ্ধিও পরিবর্তিত হতে লাগলো চেতনে, বা অবচেতনে। এবং জীবনের সবকিছু ইসলামের আলো দ্বারা উদ্ভাসিত হতে লাগলো, যেমন বসন্তের আগমনে সবুজ-সজীব হয় গাছের পাতা এবং মানুষের হৃদয়। একসময় যে হৃদয় ছিলো নিষ্ঠুর ও নির্দয়, এখন তা হয়ে গেলো কোমল ও সদয়। ইসলামের আদর্শ, বিশ্বাস ও চেতনা হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করলো এবং মানুষের অন্তসত্তায় মিশে গেলো।

মূল্যবোধ পরিবর্তিত হলো এবং পুরোনো চিন্তা-চেতনা ও মানদণ্ডের স্থান গ্রহণ করলো নতুন চিন্তা-চেতনা ও নতুন মানদণ্ড। জাহিলিয়াত ও তার জীবনদর্শন হয়ে গেলো পশ্চাদমুখিতা, স্থবিরতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যের আলামত। পক্ষান্তরে ইসলাম ও ইসলামী জীবনদর্শন হয়ে গেলো আধুনিকতা, প্রগতিশীলতা ও প্রাগ্রসরতার প্রমাণ এবং গর্ব ও গৌরবের বিষয়। ফলে সকল জাতি এবং সমগ্র পৃথিবী ধীরে ধীরে ইসলামের নিকটবর্তী হতে লাগলো, যদিও তা ছিলো অননুভূতভাবে, যেমন পৃথিবীর মানুষ পারে না তাদের গ্রহের গতি অনুভব করতে। ইসলামের অপ্রতিহত এ প্রভাব প্রকাশ পেয়েছিলো জাতিবর্গের ধর্মে, দর্শনে, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে এবং সভ্যতার সকল অঙ্গনে। মানুষের চিন্তা, বিবেক ও অন্তর্জগতেও এ প্রভাবের সুস্পষ্ট স্বাক্ষর ছিলো; এমনকি মুসলিম সালতানাতের পতন ও অধঃপতনের পর বিভিন্ন জাতির জীবনে যেসব সংস্কার আন্দোলনের আবির্ভাব ঘটেছে তাতেও ইসলামের প্রভাব ছিলো সুস্পষ্ট।

ইসলামের মূল প্রাণ ছিলো তাওহীদ ও আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস। তাই শিরক ও মূর্তিপূজার নিন্দা-সমালোচনায় সে এমন কঠোর ছিলো এবং এর গোড়ায় এমন জোরদার আঘাত হেনেছিলো যে, শিরক ও মূর্তিপূজার 'ভাবমূর্তি'ই গুঁড়িয়ে গিয়েছিলো। এমনকি মুশরিকদের কাছেও তা হয়ে পড়েছিলো লজ্জার বিষয়। ফলে একসময় যেখানে তারা মহাউৎসাহে শিরক ও মূর্তিপূজার পক্ষে যুক্তি-দর্শন উপস্থাপন করে বলতো—
أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَيْهَا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ
'তিনি কি উপাস্যসকল (প্রত্যাখ্যান করে) এক উপাস্য সাব্যস্ত করছেন! এ তো বড় অদ্ভুত কথা!' (ছোয়াদ, ৩৮: ৫)

সেখানে তারাই মূর্তিপূজার কথা স্বীকার করতে লজ্জাবোধ করতো। ফলে প্রতিটি ধর্মব্যবস্থায় বিদ্যমান প্রতিমাপূজার যাবতীয় আচার-বিশ্বাসের 'তাওহীদ-আশ্রয়ী' বিকল্প ব্যাখ্যা দিতে শুরু করলো। আহমদ আমীন বলেন—
'খৃস্টধর্মের অনুসারীদের মধ্যে এমন কিছু ঝোঁক ও প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছিলো যাতে ইসলামের প্রভাব ছিলো সুস্পষ্ট। যেমন একটি সম্প্রদায় যিশুর ঈশ্বরত্ব অস্বীকার করে ত্রিত্ববাদের প্রায় তাওহীদমুখী ব্যাখ্যা পেশ করতো। সেখানে একসময় এমন সংস্কারকও এসেছেন যিনি ঈশ্বর ও মানবের মধ্যে গীর্জার বিশেষ মধ্যস্থতা-অধিকারের ধারণা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অষ্টম শতাব্দী তথা হিজরী দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে ফ্রান্সের সিপ্টিমানিয়ায় (septimania) একটি আন্দোলনের অভ্যুদয় ঘটেছিলো যার মূল কথা ছিলো, পাদ্রীদের অধিকার নেই পাপের স্বীকৃতি গ্রহণের। মানুষ মানুষের সামনে পাপ স্বীকার করবে, এর কোন ধর্মীয় ভিত্তি নেই; মানুষ শুধু আল্লাহর সামনে পাপস্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা করবে। বলাবাহুল্য যে, ইসলামে যেহেতু 'পোপ' নেই সেহেতু 'পাপ স্বীকারের'ও অবকাশ নেই।'¹

একই ভাবে খৃস্টীয় অষ্টম-নবম শতাব্দীতে (হিজরী তৃতীয়-চতুর্থ শতক) ধর্মীয় চিত্র ও মূর্তি অপসারণের একটি আন্দোলন প্রবলভাবে দানাবেঁধে ওঠে। তারা চিত্র ও প্রতিমার পবিত্রায়ণের কঠোর বিরোধী ছিলো। এ আন্দোলন একসময় এতই শক্তি ও প্রতিপত্তি অর্জন করে যে, তৃতীয় লুই, পঞ্চম কনস্টান্টাইন ও চতুর্থ লুই-এর মত প্রবল প্রতাপান্বিত রোমান সম্রাটগণও এর সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসেন।

৭২৬ ও ৩০ খৃস্টাব্দে রোমান সম্রাট তৃতীয় লুই সরকারীভাবে চিত্র ও মূর্তির পবিত্রায়ণ নিষিদ্ধ করে ফরমান জারি করেন এবং এটিকে মূর্তিপূজা বলে অভিহিত করেন। পক্ষান্তরে পোপ দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্রেগরী, কনস্টান্টিনোপলের পাদ্রী গ্রেম্যান্স ও সম্রাজ্ঞী ইরীনী ছিলেন চিত্র-উপাসনার সমর্থক। উভয় পক্ষের মধ্যে এবিষয়ে যে তীব্র দ্বন্দ্ব-বিবাদ হয়েছিলো তার বিশদ আলোচনার অবকাশ নেই। আমরা শুধু বলতে চাই, রোমান ও গ্রীক সভ্যতার প্রতীমাপ্রেম ও ভাস্কর্যপ্রীতির খ্যাতি তো জগৎ-জোড়া এবং সেখান থেকেই খৃস্টধর্মে মূর্তিপূজার অনুপ্রবেশ, এমনকি একসময় তা প্রবলভাবে শিকড় গেড়ে বসেছিলো। সুতরাং সেখানে প্রতীমাবিরোধী এই প্রবল আন্দোলন নিঃসন্দেহে একথা প্রমাণ করে যে, এটা ছিলো ইসলামের মূর্তিবিনাশী ভূমিকা ও তাওহীদী চেতনারই প্রতিধ্বনি, যা ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে মুসলিম স্পেন থেকে পাশ্চাত্বে পৌঁছেছিলো।

বেশ কিছু ঐতিহাসিক এ সত্য স্বীকারও করেছেন যে, চিত্র ও প্রতীমাবিরোধী আন্দোলন ছিলো ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত। এ বক্তব্যের সমর্থনে তারা উল্লেখ করেছেন, টুরীনের বিশপ ক্লেডিয়াস (claadius) যিনি ৮২৮ খৃস্টাব্দ মোতাবেক ২১০ হিজরীতে নিযুক্তি লাভ করেন এবং যিনি তার বিশপ-অঞ্চলে ক্রশ উপাসনা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন এবং সমস্ত ক্রশ জ্বালিয়ে দেয়ার আদেশ জারি করেন তার জন্ম ও প্রতিপালন হয়েছিলো মুসলিম স্পেনে। এটা হলো হিজরী দ্বিতীয় শতকের কথা, যা ছিলো স্পেনে মুসলিম শাসন ও মুসলিম সভ্যতার উত্থানকাল। আর চিত্র ও মূর্তিসংস্কৃতির প্রতি ইসলামী শরী'আতের বিদ্বেষ তো সর্বস্বীকৃত।

বুখারী ও মুসলিম হযরত আয়েশা (রা) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সফর থেকে ফিরে এলেন, আমি জানালায় ছবিওয়ালা পর্দা টানিয়েছিলাম। তিনি তা দেখে ছিড়ে ফেললেন, তাঁর মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে গেলো। তিনি বললেন, হে আয়েশা, কেয়ামতের দিন কঠিনতম আযাব হবে তাদের যারা আল্লাহর সৃজন-এ সাদৃশ্য গ্রহণ করবে। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তখন আমি তা কেটে একটি বা দু'টি বালিশ বানালাম।¹ এসম্পর্কিত হাদীছ প্রচুর।

ধর্মীয় ছবি ও মূর্তি সম্পর্কে প্রখ্যাত ইউরোপীয় ঐতিহাসিক গীবন যথেষ্ট বিশদ আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন—
'গীর্জায় ছবিপূজা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো। দুর্বল বিশ্বাসের খৃস্টানরা ধীরে ধীরে তা গ্রহণ করেছে এবং এর পবিত্রতা ও নিষ্পাপতার ধারণা মেনে নিয়েছে। অষ্টম শতকের শুরুতে, যখন এই 'ধর্মীয় উপসর্গ' চরমে পৌঁছে গেছে, তখন গ্রীকরা হঠাৎ আবিষ্কার করলো যে, খৃস্টধর্মের ছদ্মাবরণে তারা নতুন ভাবে তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মের পুনরুত্থান ঘটিয়ে ফেলেছে। এ বিষয়ে ইহুদি ও মুসলিমরা তাদের প্রতি অপ্রসন্ন ছিলো, যারা তাওরাত ও কোরআন থেকে প্রতিমা-শিল্প ও মূর্তিপূজার আচার-প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষের অনুভূতি আহরণ করেছিলো। তো বিষয়টি গীর্জার লোকদের ভাবিয়ে তুললো এবং বেশ উৎকণ্ঠায় ফেলে দিলো। কারণ শুধু ইহুদিদের কথা হলে তাদের হীনতা ও দুর্বলতার কারণে বিষয়টি তারা উপেক্ষা করতে পারতো, কিন্তু বিজেতা মুসলিম জাতি, যারা দামেস্ক শাসন করছিলো এবং কনস্টান্টিনোপল অধিকার করার কাছাকাছি এসে পড়েছিলো, তাদের নিন্দা-অসন্তোষের বিষয়টি তাদেরকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়েছিলো।'

গীবন আরো বলেন, 'যিনি ছবি ও প্রতিমাপূজার বিরুদ্ধে প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন তিনি হলেন (প্রতিমা ধ্বংসকারী উপাধিপ্রাপ্ত) সম্রাট লীও এবং তার পুত্র পঞ্চম কনস্টান্টাইন। সাতশ' চুয়ান্নতে কনস্টান্টিনোপলে অনুষ্ঠিত synod সভায় দীর্ঘ ছয়মাস আলোচনা পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত হলো যে, যিশুখৃস্টের ছবি ও প্রতিমা পূজা করা হচ্ছে ধর্মীয় নব-উদ্ভাবন। তবে পূর্বাঞ্চল এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছিলো, যদিও পরে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। ইটালীয়রা সাতশ' আটাশ সনে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলো।'¹

ইউরোপের ধর্মীয় ইতিহাস এবং খৃস্টীয় গীর্জার সমগ্র কার্যক্রম যদি গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয় তাহলে সমকালের সুসংহত বিশপীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী সংস্কারকদের উপর ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব সুস্পষ্টরূপেই অনুভব করা যায়। স্বয়ং মার্টিন লুথারের সংস্কার-আন্দোলন ছিলো ইসলামের প্রভাব গ্রহণের স্পষ্টতম প্রমাণ, যদিও তাতে যথেষ্ট ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিলো। ঐতিহাসিকগণ পরিষ্কার ভাষায় স্বীকার করেছেন যে, আন্দোলনের প্রাণপুরুষ লুথারের জীবনে ইসলামের বিভিন্ন নীতি ও শিক্ষার প্রভাব ছিলো।

শুধু ধর্মই নয়, বরং ইউরোপের সমগ্র জীবন ও সভ্যতার উপর ইসলামের বিপুল প্রভাব ছিলো। রবার্ট ব্রিফল্ট (robert briffault) the making of humanity গ্রন্থে বলেন—
'ইউরোপের উন্নতি-অগ্রগতির এমন কোন অঙ্গন নেই যেখানে ইসলামী সভ্যতার বিরাট অবদান নেই। বস্তুত ইউরোপীয় জীবনের উপর ইসলামের বিপুল প্রভাবক ভূমিকা রয়েছে।' (p. 190)
একই গ্রন্থের অন্যত্র তিনি বলেন—
'প্রকৃতি বিজ্ঞান (যাতে, স্বীকার করতেই হবে, মূল অবদান আরবদের), এটাই শুধু ইউরোপে নবজাগরণ সৃষ্টি করেনি, বরং সামগ্রিকরূপেই ইসলামী সভ্যতা ইউরোপের জীবনে সুগভীর ও বহুমুখী প্রভাব বিস্তার করেছে এবং এর শুভ সূচনা হয়েছে তখন থেকে যখন ইসলামী সভ্যতার প্রথম আলোকরশ্মি ইউরোপের উপর পড়েছে।' (p. 202)

একই ভাবে মূর্তিপূজক ভারতীয় জাতিবর্গের নীতি ও চরিত্র, সমাজ ও সংস্কৃতি এবং আইন ও বিধানের ক্ষেত্রেও ইসলামী শরিয়া ও বুদ্ধিবৃত্তির বিপুল প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে নারীর অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি এবং বিভিন্ন শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্যনীতির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য, যা ইসলামী সভ্যতা ও জীবনবিধানের একক বৈশিষ্ট্য এবং ইসলামই যা সর্বপ্রথম ঘোষণা করেছে। ভারতবর্ষে যখন ইসলামের বিজয়াভিযান শুরু হয় এবং ভারতীয় জাতিবর্গ মুসলিম জাতির সংস্পর্শে আসতে শুরু করে তখন থেকেই ভারতীয় সমাজজীবনে এর প্রভাব অব্যাহতরূপে বৃদ্ধি পেয়ে এসেছে।¹

প্রসিদ্ধ ভারতীয় গবেষক এবং মিসরে ভারতের সফল রাষ্ট্রদূত k.m. panikkar ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মনমানস এবং তাদের ধর্মবিশ্বাসে ইসলামের তাওহীদ ও একত্ববাদের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনাপ্রসঙ্গে বলেন—
'এটা সুস্পষ্ট ও সুস্বীকৃত যে, হিন্দুধর্মে তখন ইসলামের প্রভাব ছিলো সুগভীর এবং হিন্দুমানসে ঈশ্বর-উপাসনার চিন্তা ইসলামেরই অবদান। তখনকার চিন্তা-নায়ক ও ধর্মপুরুষগণ উপাস্যদের বিভিন্ন নাম দিলেও তারা ঈশ্বরের উপাসনার আহ্বান জানিয়েছেন এবং স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন উপাস্য মাত্র একজন এবং তিনিই উপাসনার একক অধিকারী। তাঁরই কাছে মুক্তি ও সৌভাগ্য প্রার্থনা করতে হবে। ইসলামী যুগে ভারতবর্ষে যেসব ধর্ম ও সংস্কারপ্রচেষ্টা আত্মপ্রকাশ করেছে সেগুলোতে উপরোক্ত প্রভাব ছিলো সুপ্রকাশিত। যেমন ভক্তিধর্ম (Bhagti) এবং গুরু কবিরের ধর্মমত।'¹

ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু তার Discovary of India গ্রন্থে বলেন—
'উত্তর-পশ্চিম ভারতের দিক থেকে বিজেতাদের আগমন এবং ইসলামের প্রবেশ, ভারতের ইতিহাসে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভারতীয় সমাজে যে ব্যাধি ও পচন ছড়িয়ে পড়েছিলো, ইসলামই তা প্রকাশ করেছে। বর্ণভেদ ও অদ্ভুত প্রথা এবং বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার প্রবণতা, যাতে ভারতবর্ষ তখন আচ্ছন্ন ছিলো, ইসলামই তা চিহ্নিত করেছে। ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব যা মুসলিম জাতির জীবন ও বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিলো তা ভারতীয়দের মনমানসে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে এবং এ প্রভাব ঐসব হতভাগ্য জনগোষ্ঠীর মধ্যেই ছিলো সর্বাধিক, ভারতীয় সমাজ যাদের সাম্য ও মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিলো।'

আধুনিক যুগের বিদগ্ধ লেখক N. C. Mehta, Indian Civilization And Islam গ্রন্থে বলেন—
'ভারতবর্ষে ইসলাম এমন এক আলোর মশাল নিয়ে এসেছিলো যা মানুষের জীবন থেকে অন্ধকার দূর করেছে, যে অন্ধকার প্রাচীন সভ্যতাগুলোর পতনকালে জেকে বসেছিলো। কিছু উত্তম আদর্শ তখন চিন্তানৈতিক বিশ্বাসের রূপ লাভ করেছিলো। বস্তুত ইসলামের বিজয়াভিযানের প্রভাব রাজনৈতিক ক্ষেত্রের চেয়ে চিন্তার জগতেই ছিলো অধিকতর ব্যাপক ও শক্তিশালী, যেমনটি হয়েছিলো অন্যান্য ভূখণ্ডেও। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এখানে (ভারতবর্ষে) ইসলামের ইতিহাস রাজশাসনের সাথে যুক্তরূপে পরিচিত হয়ে এসেছে। ফলে ইসলামের মূল সত্য এবং ইসলামের মহান দান ও অবদান লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে।'

মোটকথা, ইসলাম ও নবুয়তে মুহম্মদি ও দাওয়াতে মুহম্মদি আবির্ভাবের পর সভ্য পৃথিবীর কোন ধর্ম ও সমাজ এ দাবী করতে পারবে না যে, তা ইসলাম দ্বারা কমবেশী প্রভাবিত হয়নি।

জীবন ও সভ্যতা এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ মহাকালের পথে যেভাবে চলছিলো সেভাবেই যদি চলতে থাকতো এবং মানবজাতি যদি সেই মহান জামা'আতের নেতৃত্বেই পরিচালিত হতে থাকতো যাদের উত্থানই হয়েছিলো কল্যাণের পথে মানবসভ্যতার নেতৃত্বদানের জন্য তাহলে মানবজাতির ইতিহাস অবশ্যই এই কলঙ্কিত রূপ থেকে অনেক ভিন্ন হতো যা এখন আমাদের সামনে রয়েছে, যাতে লেখা আছে শুধু মানবতার দুর্ভোগ ও দুর্যোগের মর্মন্তুদ কাহিনী।

তখন আমাদের সামনে থাকতো এমন এক সুন্দর সমুজ্জ্বল ইতিহাস যা নিয়ে গোটা মানবজাতি গর্ব করতো এবং যা মানবতার চক্ষু জুড়িয়ে দিতো। কিন্তু তাকদীরের লিখন অন্যকিছু লিখে দিলো এবং স্বয়ং মুসলিম উম্মাহর জীবনেই শুরু হয়ে গেলো অবক্ষয় ও অধঃপতন।

টিকাঃ
১. বুখারী, কিতাবুল আহকাম, আবু মূসা আশ'আরী রা. হতে, হাদীছ নম্বর, ৬৬১৬, মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ, হাদীছ নম্বর, ৩৪০২
২. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ৭. পৃ. ৪০
৩. من خطبة النبي صلى الله عليه وسلم في حجة الوداع، وقد تلا صلى الله عليه وسلم بعد هذا القول هذه الآية : يا أيها الناس إنا خلقناكم من ذكر وأنثى
৪. ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে রয়েছে ইবনুল জাওযীকৃত তারিখ عمر بن الخطاب কিতাবে
৫. ইবনে খালদুনের আল-মুকাদ্দিমা, পৃ. ৪৯৯
৬. islam at the cross roads, fifth edition. p. 29
৭. ذكره أحمد بن مروان المالكي في " المجالسة " .
৮. البদাية والنهاية المجلد السابع، الصفحة الثالثة والخمسون .
৯. ঐ, এবং الصفحة السادسة عشرة .
১০. انظر سيرة عمر بن الخطাব لابن الجوزي
১১. islam at the cross roads, p. 29
১২. আহমদ আমীন যোহাল ইসলাম (ছালাহুদ্দীন খোদাবখস, এর বরাতে)
১৩. গীবন p. 255-256
১৪. বুখারী, কিতাবুল্-লিবাস, হাদীছ নম্বর, ৫৪৯৮, মুসলিম, কিতাবুল-লিবাসি ওয়াযযীনাহ, হাদীছ নম্বর ৩৯৩৭, নাসাঈ কিতাবুয-যীনাহ, হাদীছ নম্বর, ৫২৬১ এবং ৫২৬৮, মসনাদের আহমদ (বাকী মুসনাদিল আনছার, হাদীছ নম্বর, ২২৯৫২ এবং ২৩৩৯৫ এবং ২৪৬৫৫
১৫. influence of Islam on indian cultur, by tara chand.
১৬. A Sarvey of Indian History, p 132

📘 মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো 📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মুসলিম উম্মাহর অধঃপতন

📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: মুসলিম উম্মাহর অধঃপতন


দু'টি যুগের মধ্যে পার্থক্য-রেখা

জনৈক সাহিত্যিক বলেন, দু'টি ক্ষেত্রে নিখুঁত সূচনাকাল নির্ধারণ করা সম্ভব নয়; ব্যক্তিজীবনে নিদ্রা এবং জাতীয় জীবনে অধঃপতন। আসলেও তাই। কোন জাগ্রত ব্যক্তি সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে একথা বলা সম্ভব নয় যে, ঠিক কখন সে ঘুমিয়ে পড়েছে। তদ্রূপ কোন জাতি সম্পর্কেও একথা বলা সম্ভব নয় যে, ঠিক কোন্ সময়টাতে জাতির অধঃপতন শুরু হয়েছে। বস্তুত এদু'টি বিষয় তখনই পূর্ণ উপলব্ধিতে আসে যখন তা ভালোভাবে জেঁকে বসে। তবে অধিকাংশ জাতির ইতিহাসে এটা সত্য হলেও মুসলিম উম্মাহর জীবনে অবক্ষয় ও অধঃপতনের সূচনা ছিলো বেশ স্পষ্ট। এমনকি যদি উন্নতি ও অবনতির এই মধ্যবর্তী পার্থক্য-রেখাটির উপর অঙ্গুলিনির্দেশ করতে বলা হয় তাহলে অতি সহজেই আমরা সেই ঐতিহাসিক রেখাটি চিহ্নিত করতে পারবো যা খিলাফাতে রাশেদা ও আরব-মুসলিম শাসনকে পৃথক করে রেখেছে।

আমরা যদি একনজরে মুসলিম উম্মাহর উত্থানের কারণসমূহ পর্যালোচনা করতে চাই তাহলে দেখতে পাবো যে, সূচনাকালে প্রত্যক্ষভাবে মুসলিম শাসন এবং পরোক্ষভাবে বিশ্বশাসনের দায়িত্বভার এমন একদল মানুষের হাতে ছিলো যারা প্রত্যেকে ঈমান ও বিশ্বাস, জীবন ও চরিত্র, নীতি ও নৈতিকতা, মহত্ত্ব ও মহানুভবতা, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকতা এবং পূর্ণতা ও ভারসাম্যপূর্ণতার ক্ষেত্রে মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন্ত মু'জিযা ছিলেন। ইসলামের ছাঁচে তাঁদের তিনি এমন পরিপূর্ণরূপে গড়ে তুলেছিলেন যে, দেহসত্তা ছাড়া অন্যকোন ক্ষেত্রে অতীতের সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক ছিলো না; না চিন্তা-চেতনায়, না ভাবে ও স্বভাবে এবং না চাওয়া ও চাহিদার ক্ষেত্রে। সূক্ষ্ম বিচারকের দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করেও তাঁদের জীবন ও চরিত্রে ইসলামের প্রাণ ও চেতনার পরিপন্থী জাহিলিয়াতের সামান্য কোন চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যেতো না। বরং নির্দ্বিধায় বলা যায়, ইসলামকে মানবরূপে উপস্থিত করা হলে তা হুবহু তাঁদেরই যে কোন একজনের মতই হতো। আগেও যেমন বলেছি, তাঁরা ছিলেন দ্বীন ও দুনিয়ার সুসমন্বয়ের যিন্দা নমুনা ও আদর্শ উদাহরণ।

একদিকে তাঁরা ছিলেন মসজিদের মাননীয় ইমাম, অন্যদিকে আদালতের মহামান্য বিচারক। মসজিদে তাঁরা দ্বীন ও ইলম শিক্ষা দিতেন এবং আদালতে বিচারকের আসনে ইনছাফ কায়েম করতেন।

একদিকে তাঁরা ছিলেন বাইতুল মালের আমানতদার ও পাহারাদার, অন্যদিকে রণাঙ্গনের যোগ্য সেনাপতি ও কুশলী যুদ্ধ-পরিচালক। রাজ্যশাসন ও প্রজাপালনে যেমন তাঁদের কোন তুলনা ছিলো না, তেমনি ইকামাতে দ্বীন ও আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠায়ও তাঁরা ছিলেন তুলনাহীন।

এককথায় তাঁদের প্রত্যেকে একই সঙ্গে ছিলেন মুত্তাকী, পরহেযগার ও আল্লাহ-ভীরু ধার্মিক এবং সাহসী মুজাহিদ, ফকীহ মুজতাহিদ, বিজ্ঞ বিচারক, সুদক্ষ শাসক ও কুশলী রাজনীতিক। তাঁদের একই ব্যক্তি ছিলেন দ্বীন ও দুনিয়া এবং ধর্ম ও রাজনীতির ধারক, আর তিনি হলেন খলীফাতুল মুসলিমীন ও আমীরুল মুমিনীন। তাঁর চারপাশে ছিলো এমন এক জামা'আত, যারা মসজিদে নববীতে এবং নববী শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষা অর্জন করে অভিন্ন ছাঁচে গড়ে উঠেছেন। তাঁরা অভিন্ন চিন্তা-চেতনা এবং আত্মা ও আত্মিকতার অধিকারী ছিলেন। তাঁদের শিক্ষা, দীক্ষা ও তারবিয়াত ছিলো এক ও অভিন্ন। শাসনকার্যে ও অন্যান্য বিষয়ে খলীফা তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন এবং তাঁদের সাহায্য নিতেন। তাঁদের উপস্থিতি ও পরামর্শ ছাড়া উম্মাহর কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না। ফলে তাঁদের চিন্তা-ভাবনা ও প্রাণ-চেতনা সমাজে ও প্রশাসনে এবং মানুষের জীবন ও চরিত্রে গভীরভাবে প্রতিফলিত হতো এবং তাঁদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য ও চাহিদা-প্রবণতা সর্বত্র পূর্ণরূপে প্রতিবিম্বিত হতো। তাই মানুষের আত্মা ও জড়সত্তা, ইহজীবন ও পরজীবন এবং ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত ছিলো না। তদ্রূপ নীতি ও প্রবৃত্তি এবং উদ্দেশ্য ও নৈতিকতার মধ্যে ছিলো না কোন রেষারেষি; এমনকি বিভিন্ন সমাজশ্রেণীর মধ্যেও ছিলো না কোন সঙ্ঘর্ষ।

এককথায় ইসলামী সালতানাত ও মুসলিম সমাজ ছিলো তার পুরোধাপুরুষদের আখলাক ও চরিত্র, স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য এবং পূর্ণতা ও ভারসাম্যপূর্ণতার আদর্শ প্রতিচ্ছবি।

জিহাদ ও ইজতিহাদ থেকে বিচ্যুতি

বস্তুত বিশ্বের বুকে ইসলামী ইমামাত ও নেতৃত্ব এবং শাসন ও রাজত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বেশ কিছু সংবেদনশীল ও সুবিস্তৃত গুণ ও যোগ্যতার অনিবার্য প্রয়োজন। সংক্ষেপে সেগুলোকে আমরা জিহাদ ও ইজতিহাদ, এদু'টি শব্দে প্রকাশ করতে পারি। যে কোন ব্যক্তি বা দল ইসলামী ইমামাতের মহান মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ার অভিলাষী হবে তাদেরকে অবশ্যই সততা, সত্যবাদিতা এবং তাকওয়া ও ন্যায়পরতার পাশাপাশি জিহাদ ও ইজতিহাদেরও পূর্ণ যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে।

বাহ্যত শব্দদু'টি খুব সহজ-সরল, কিন্তু কার্যত তা অত্যন্ত ব্যাপক ও মর্মসমৃদ্ধ। জিহাদ অর্থ জীবনের প্রিয়তম ও মূল্যবানতম উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য চূড়ান্ত প্রচেষ্টা ও সর্বশক্তি ব্যয় করা। মুসলিম জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্য ও সন্তুষ্টি অর্জন এবং আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও বিধানের সামনে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ। আর সেজন্য প্রয়োজন এক সুদীর্ঘ জিহাদ ও সুকঠিন সংগ্রামের। এই জিহাদ ও সংগ্রাম হবে ঐসব চিন্তা-বিশ্বাস, চাহিদা ও প্রবৃত্তি এবং শিক্ষা-দীক্ষা ও আদর্শের বিরুদ্ধে যা আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের পথে প্রতিবন্ধক হয়; তদ্রূপ ভিতরের ও বাইরের ঐসব মিথ্যা উপাস্যের বিরুদ্ধে যারা আল্লাহর ইবাদত ও বন্দেগীর ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায়। পরিপূর্ণ আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের এ মহৎ গুণ অর্জনের পর একজন মুসলিমের অবশ্যকর্তব্য হলো আপন সমাজে, চারপাশের জনপদে এবং পর্যায়ক্রমে সারা পৃথিবীতে আল্লাহর আদেশ, বিধান ও শাসন প্রতিষ্ঠার জিহাদে আত্মনিয়োগ করা এবং সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হওয়া। এটা হলো আল্লাহর পক্ষ হতে তার উপর অর্পিত অপরিহার্য দায়িত্ব, তদুপরি মানবজাতির প্রতি দয়া ও সহৃদয়তারও এটাই দাবী। কেননা মানবতা ও সভ্যতাকে রক্ষা করার এটাই একমাত্র পথ, এমনকি তার আত্মকল্যাণের জন্যও এটা অপরিহার্য। কারণ এই জিহাদ ও মুজাহাদা ছাড়া ব্যক্তিজীবনের ইবাদত ও আনুগত্যও দুসাধ্য, বরং অসম্ভব হয়ে পড়ে। আল-কোরআনের পরিভাষায় এটাকেই বলা হয়েছে 'ফিতনা'।

বলাবাহুল্য যে, মানুষ ও পশু-প্রাণী এবং উদ্ভিদ ও জড়বস্তুসহ সমগ্র বিশ্বজগত আল্লাহর ইচ্ছার অধীন এবং তাঁর জাগতিক নিয়ম ও প্রাকৃতিক বিধানের পূর্ণ অনুগত। ইরশাদ হয়েছে—
أَفَغَيْرَ دِينِ اللَّهِ يَبْغُونَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ
তো তারা কি আল্লাহর দ্বীন ছাড়া অন্যকিছু চায়, অথচ তাঁরই আনুগত্য গ্রহণ করেছে যা কিছু রয়েছে আকাশমণ্ডলীতে এবং পৃথিবীতে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, আর তারা তাঁরই সমীপে প্রত্যাবর্তিত হবে। (আলে ইমরান, ৩:৮৩)

আরো ইরশাদ হয়েছে—
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَمَن فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُ وَكَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ وَمَن يُونِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِن مُكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشاءُ
তুমি কি দেখো না যে, আল্লাহর সামনেই সিজদাবনত রয়েছে যারা আছে আকাশমণ্ডলে ও পৃথিবীতে এবং (সিজদাবনত) সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি, পাহাড়পর্বত, বৃক্ষ ও পশু-প্রাণী এবং বহু মানুষ; আর অনেকের উপর অবধারিত হয়ে গেছে আযাব। আর আল্লাহ যাকে অপদস্থ করেন, তার জন্য নেই কোন মর্যাদা-দানকারী। অবশ্যই আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা করেন। (আল-হজ্জ, ২২ : ১৮)

এটা হলো প্রাকৃতিক ও বিশ্বজাগতিক বিধান, যাতে মানুষের প্রয়াস-প্রচেষ্টার কোন ভূমিকা নেই। সৃষ্টিজগতে জীবন-মৃত্যু এবং উন্মেষ-বিকাশের যে বিধান আল্লাহ নির্বাচন করেছেন এবং প্রত্যেক শরীর ও স্বভাবের জন্য যে ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছেন সেই নিয়ম ও বিধানের বৃত্তেই সবাই বিচরণ করছে এবং করতেই থাকবে; তা থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হওয়ার ক্ষমতা ক্ষুদ্র-বৃহৎ কোন সৃষ্টিরই নেই। সুতরাং এক্ষেত্রে মানুষের চেষ্টা-মেহনতের না প্রয়োজন আছে, না অবকাশ। মুসলিম উম্মাহকে যে জিহাদ ও মুজাহাদার আদেশ করা হয়েছে তা হলো আল্লাহর বিধান ও শারী'আত প্রতিষ্ঠার জিহাদ এবং ইকামাতে দ্বীন ও ই'লায়ে কালিমাতুল্লাহ-এর মুজাহাদা, যা নবী-রাসূলগণ নিয়ে এসেছেন। যেহেতু ঐশী বিধান ও আসমানী শারী'আতের বিপক্ষ শক্তি ও তার আন্দোলন পৃথিবীতে সবসময় আছে এবং থাকবে সেহেতু জিহাদ ও মুজাহাদাও কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। অবশ্য জিহাদ ও মুজাহাদার অসংখ্য শ্রেণী ও প্রকার রয়েছে, যার মধ্যে একটি হলো যুদ্ধ ও লড়াই এবং পরিবেশ-পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে কখনো তা সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ বলেও গণ্য হয়, যার উদ্দেশ্য হলো, ইসলামের সমকক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী কোন শক্তির অস্তিত্ব যেন পৃথিবীতে না থাকে, যা মানুষকে খাহেশাত ও কুপ্রবৃত্তি এবং শিরক ও কুফুরির দিকে টেনে নিতে পারে। তাই ইরশাদ হয়েছে—
وَقَتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ
'আর 'কিতাল' করো তাদের বিরুদ্ধে, যেন না থাকে কোন ফিতনা এবং (যেন) হয়ে যায় পূর্ণ আনুগত্য আল্লাহর জন্য।' (বাকারাহ, ২: ১৯৩)

এই জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর অন্যতম দাবী এই যে, মানুষ ইসলামের পূর্ণ পরিচয় ও পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করবে, যার প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়নের জন্য সে জিহাদ করতে চায়, তদ্রূপ কুফর ও জাহিলিয়াত সম্পর্কেও তার পূর্ণ অবগতি থাকবে, যার মূলোৎপাটনের জন্য সে লড়াই করতে চায়। ইসলাম সম্পর্কে তার জ্ঞান হবে সঠিক ও নির্ভুল এবং কুফুর সম্পর্কেও তার অবগতি হবে পুঙ্খানুপুঙ্খ, যাতে বাহ্যিকতার বর্ণচ্ছটা দ্বারা কখনো সে প্রতারিত না হয়। হক-বাতিল এবং সত্য-মিথ্যা যখন যেরূপেই তার সামনে আসুক, সে যেন তা চিনতে পারে। এজন্যই হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেছেন—
إنما ينقض الإسلام عروة عروة من نشأ في الإسلام ولم يعرف الجاهلية
'আমার আশঙ্কা হয় যে, যার জন্ম ও প্রতিপালন হয়েছে ইসলামের পরিমণ্ডলে, অথচ জাহিলিয়াতের পূর্ণ অবগতি অর্জন করেনি, সে একটি একটি করে ইসলামের অঙ্গচ্ছেদন করে ফেলবে।'

একথা অবশ্যই ঠিক যে, কুফুর ও জাহিলিয়াতের যাবতীয় প্রকার ও প্রকৃতি এবং প্রকাশ ও অভিপ্রকাশ সম্পর্কে সূক্ষ্ম-নিখুঁত ও পরিপূর্ণ অবগতি প্রত্যেক সাধারণ মুসলমানের জন্য জরুরি নয় এবং সম্ভবও নয়, তবে কুফুর ও জাহিলিয়াতের বিরুদ্ধে জিহাদে যারা নেতৃত্ব দেবে এবং সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে লড়াই করবে তাদের জ্ঞান ও অবগতি অবশ্যই সাধারণ ও মধ্যস্তরের মানুষের চেয়ে বেশী হতে হবে এবং ইসলাম ও কুফুর উভয় সম্পর্কেই তাদের জ্ঞান হতে হবে পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ।

তদ্রূপ কুফুর ও জাহিলিয়াতের বিরুদ্ধে জিহাদ ও সংগ্রামের ক্ষেত্রে তাদের সর্বপ্রকার শক্তি ও প্রস্তুতিও থাকতে হবে এবং তা হতে হবে সাধ্যের ভিতরে চূড়ান্ত স্তরে, যাতে তারা লোহার মুকাবেলায় লোহা হয়ে, এমনকি সম্ভব হলে ইস্পাত হয়ে এবং বাতাসের বিরুদ্ধে ঝড় হয়ে ময়দানে আসতে পারে এবং যুগের বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করতে পারে। সম্ভাব্য সকল উপায়-উপকরণ যেন তারা অর্জন করে এবং মানুষের জ্ঞান-প্রযুক্তি যত অস্ত্র ও যন্ত্র এবং কল ও কৌশল উদ্ভাবন করেছে সবই যেন তারা আয়ত্ত করে। কারণ আল্লাহ তা'আলার সুস্পষ্ট আদেশ হলো—
وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ وَمِن رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِن دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ وَمَا تُنفِقُوا مِن شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنتُمْ لَا تُظْلَمُونَ
'আর তোমরা প্রস্তুত করো তাদের মুকাবেলার জন্য তোমাদের সাধ্যের সকল শক্তি এবং অশ্বদল। তা দ্বারা ভীত-সন্ত্রস্ত করবে তোমরা আল্লাহর শত্রুকে এবং তোমাদের শত্রুকে এবং তাদেরকে ছাড়া আরো কিছু লোককে, যাদের তোমরা চেনো না, আল্লাহ তাদের চেনেন। আর আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদের প্রস্তুতিতে) যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে তার প্রতিদান তোমাদের পূর্ণরূপে দান করা হবে, আর তোমাদের প্রতি কোন অবিচার করা হবে না।' (আনফাল, ৮:৬০)

আর ইজতিহাদ দ্বারা উদ্দেশ্য এই যে, মুসলিম উম্মাহর ইমামাত ও নেতৃত্ব এমন সুযোগ্য মানুষের হাতে থাকবে যারা উম্মাহর জীবনে, বিশ্বের অঙ্গনে এবং মুসলিম শাসিত অঞ্চলে নব-উদ্ভূত সকল সমস্যার সঠিক সমাধান দিতে পারেন, যেগুলোর উত্তর বিধিবদ্ধ মাযহাব ও সঙ্কলিত ফিকাহগ্রন্থে পাওয়া যায় না। শারী'আতের নিগূঢ় তত্ত্ব এবং ইসলামী আইনের মূলনীতিমালা সম্পর্কে তাদের থাকতে হবে পূর্ণ জ্ঞান এবং থাকতে হবে—একক বা সমষ্টিগত—এমন উদ্ভাবনী ও ইজতিহাদী যোগ্যতা, যাতে নতুন যে কোন সমস্যার যথার্থ ইসলামী সমাধান তারা নির্ধারণ করতে পারেন এবং সঙ্কটকালে মুসলিম উম্মাহকে নির্ভুলভাবে পথপ্রদর্শন করতে পারেন।

তাঁরা হবেন এমন মেধা ও উদ্যম এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী যাতে আল্লাহর সৃষ্ট সকল প্রাকৃতিক শক্তিকে কাজে লাগাতে পারেন এবং ঐসব সম্পদ ব্যবহার করতে পারেন যা আল্লাহ ভূমিতে ও ভূগর্ভে লুকিয়ে রেখেছেন। তাদেরকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যেন সমস্ত শক্তি ও সম্পদ ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর সেবায় নিয়োজিত হয়; শয়তান ও তাগুতি শক্তি যেন তাদের অশুভ উদ্দেশ্যে এবং পৃথিবীতে অনাচার-পাপাচার সৃষ্টির কাজে ঐগুলো ব্যবহার করতে না পারে।

উম্মাহর জীবনে রাজতন্ত্রের অশুভ প্রভাব
(যোগ্য হাত থেকে অযোগ্য হাতে উম্মাহর ইমামাত)

কিন্তু মানবজাতির দুর্ভাগ্য এই যে, খিলাফাতে রাশেদার পর ইসলামী উম্মাহর ইমামাতের মহাগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার ক্রমে এমন লোকদের দখলে চলে গেলো যারা কোনভাবেই এর যোগ্য ছিলো না এবং এজন্য তাদের যথাযথ প্রস্তুতিও ছিলো না। তাদের পূর্ববর্তীগণ, এমনকি তাদের সমকালীন অনেকে যে দ্বীনী তারবিয়াত ও আধ্যাত্মিক দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তা থেকে তারা বঞ্চিত ছিলো, বরং আরবদের প্রাচীন গোত্রীয় চিন্তা-চেতনা ও ঝোঁক-প্রবণতা থেকেও তাদের মন-মস্তিস্ক সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলো না। ইসলামের শিক্ষা, আদর্শ ও ভাবধারায় তারা এতটা আত্মস্থ ছিলো না, ইসলামী উম্মাহর নেতৃত্বদানের জন্য যা ছিলো অপরিহার্য। জিহাদী চেতনা ও ইজতিহাদী যোগ্যতা কোনটাই তাদের ছিলো না, যা ইসলামী খিলাফাতের গুরু-দায়িত্ব বহন এবং বিশ্বের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য ছিলো জরুরী। আর এটা উমাইয়া ও আব্বাসী উভয় খিলাফাতের ক্ষেত্রেই ছিলো প্রায় সমান সত্য। পূর্ণ ব্যতিক্রম ছিলেন শুধু আদর্শ খলীফা হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)।

এর ফলে ইসলামের মযবুত দেয়াল এমন এমন ফাটল দেখা দিলো, যা আর বন্ধ করা সম্ভব হয়নি এবং ইসলামী উম্মাহর জীবনে এমন বিচ্যুতি ও বিকৃতি ঘটলো এবং একের পর এক এমন সব ফিতনা ও দুর্যোগ ধেয়ে আসতে লাগলো যা রোধ করা কারো পক্ষেই সম্ভব হয়নি। এখানে আমরা খুব সংক্ষেপে এগুলোর বিবরণ তুলে ধরছি।

রাজনীতি থেকে ধর্মের নির্বাসন

ইসলাম তো সাধারণ অর্থে একটি ধর্মমাত্র ছিলো না; ইসলাম তো ছিলো মানবজাতির ইহকালীন ও পরকালীন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। মানুষের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সমাজজীবন ও আন্তর্জাতিক জীবন, সবকিছুকে ইসলাম সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করে। ইসলামের দ্ব্যর্থহীন দাবী হলো, সবকিছুতে শুধু আল্লাহর আদেশ নিষেধ কার্যকর হবে, অন্যকারো নির্দেশ নয়। সুতরাং রাজনীতি ও দেশশাসনের ক্ষেত্রেও রয়েছে ইসলামের নিজস্ব আদেশ-নিষেধ ও বিধিবিধান। খিলাফতে রাশিদার দায়িত্ব ছিলো ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাজ্যশাসন পর্যন্ত সর্বত্র আল্লাহর আদেশ-নিষেধের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন এবং খোলাফায়ে রাশিদীন পূর্ণ আমানতদারির সঙ্গে সে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে দ্বীন ও সিয়াসাত তথা ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে কার্যত বিভাজন সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিলো।

শাসনক্ষমতা এমন লোকদের হাতে চলে গিয়েছিলো যাদের না দ্বীন ও শারী'আতের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ছিলো, না তারা ওলামায়ে উম্মতের পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণ করেছিলো। রাজনীতি ও রাজ্যশাসনে তাদের ছিলো একচ্ছত্র ক্ষমতা। খেয়াল-খুশিতে, বা স্বার্থ-সুবিধার তাগাদায় তারা ওলামায়ে উম্মত ও ফোকাহায়ে দ্বীন-এর সাহায্য নিতো এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থে নিজেদের মত করে তাঁদের ব্যবহার করতো, অর্থাৎ ওলামায়ে উম্মতের পরামর্শ যতটুকু ইচ্ছা গ্রহণ করতো, যতটুকু ইচ্ছে বর্জন করতো। আবার সুযোগ হলে একেবারেই মুখ ফিরিয়ে নিতো। এমনকি অনেক সময় তাঁদের উপর নির্মম নির্যাতন চালাতো। এভাবে রাজনীতি ও রাজ্যশাসন দ্বীনের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে গিয়েছিলো এবং ইসলামী খিলাফত রোম ও পারস্যের মত নিছক স্বেচ্ছাচারী রাজতন্ত্রে পরিণত হয়েছিলো। খলীফা ও তার খিলাফত তখন যেন ছিলো লাগামহীন অবাধ্য উট।

পরিস্থিতি যখন এমন গুরুতর, তখন ওলামায়ে উম্মতের অবস্থা ছিলো এই যে, কেউ হুকুমতের প্রকাশ্য বিরোধিতায় অবতীর্ণ হতেন এবং কখনো বিদ্রোহ ঘোষণা করতেন। কেউ সংশোধনের চেষ্টায় কখনো কঠোর, কখনো কোমল ভাষায় তিরস্কার করতেন এবং উপদেশ দিতেন। তাঁরা সব দেখতেন, শোনতেন, আর নীরবে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলতেন; কার্যত তাঁদের করার কিছুই ছিলো না। আরেকদল সংশোধনে হতাশ হয়ে সবকিছু থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিলেন। রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছানির্বাসনে গিয়ে তাঁরা আত্মশোধন ও ব্যক্তিসংশোধনের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হয়েছিলেন। হয়ত তাঁরা ভাবতেন, এভাবে যদি নিজেকে ও অল্পসংখ্যক অনুসারীকে দুনিয়ার ফিতনা থেকে বাঁচানো যায়, সেটাও অনেক বড় কামিয়াবি।

কেউ দ্বীনের কল্যাণ ভেবে শাসক ও সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। একদল এমনও ছিলো যারা শুধু হালুয়া-রুটির জন্য শাহী দরবারে হাজিরা দিতো। সব মিলিয়ে ফলাফল এই ছিলো যে, তত্ত্বে ও বিশ্বাসে না হলেও কার্যত দ্বীন ও সিয়াসাত এবং ধর্ম ও রাজনীতি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো।

আরো সরল ভাষায় যদি বলি, খিলাফতে রাশেদা-পূর্ব দুনিয়ার শাসনব্যবস্থার মত নামসর্বস্ব খিলাফতও তেমনি ধর্মহীন ও চরিত্রহীন অবয়ব লাভ করেছিলো। দ্বীন ও শরী'আত যেন ছিলো ডানাকাটা পাখী, কিংবা শেকলপরা বন্দী, আর রাজনীতি ছিলো অবাধ ও মুক্ত-স্বাধীন। ধর্মের বাঁধন ও নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতেই থাকলো, আর রাজনীতির ভ্রষ্টাচার ও স্বেচ্ছাচার বেড়েই চললো। শেষ পর্যন্ত আহলে ইলম ও আহলে সিয়াসাত দু'টি বিপরীত শ্রেণীরূপে আত্মপ্রকাশ করলো, যাদের অপরিচয় ও দূরত্ব কখনো কখনো বিরোধ ও বিদ্বেষের রূপ নিতো।

শাসকদের মধ্যে জাহিলিয়াতের ভাবধারা

শাসকবর্গ, এমনকি খিলাফাতের 'আমানতদার' ব্যক্তিটিও দ্বীন ও আখলাক এবং ধর্ম ও নৈতিকতার আদর্শ ছিলেন না, বরং অনেকেই জাহেলিয়াতের চিন্তা-চেতনা ও রোগজীবাণু বহন করতো। ফলে স্বভাবতই জীবন ও সমাজের সর্বত্র তা সংক্রমিত হয়ে পড়েছিলো এবং মানুষ তাদের স্বভাব-চরিত্র ও নীতি-নৈতিকতাকেই অনুসরণ করতে শুরু করেছিলো। এটাই মানুষের স্বভাব ও ফিতরাত। তাই বলা হয়, 'আন্নাসু আলা দ্বীনি মুলুকিহিম'—রাজার চালে রাজ্য চলে।

দ্বীনের নিয়ন্ত্রণ, নৈতিকতার শাসন এবং বিবেকের অনুশাসন একেবারে শিথিল হয়ে পড়েছিলো। 'আমর বিল মা'রূফ ও নাইহী আনিল মুনকার' হয়ে পড়েছিলো নিষ্ক্রিয় ও নিষ্ফল। কারণ তার পিছনে ছিলো না সরকারি ব্যক্তি ও শক্তি। দ্বীনদার শ্রেণীর স্ব-উদ্যোগের আদেশ-নিষেধের কেউ পরোয়া করতো না। কেননা তাদের না ছিলো তিরস্কারের ক্ষমতা, না পুরস্কারের সামর্থ্য। অথচ খাহেশাত ও প্রবৃত্তির উপকরণ ছিলো প্রচুর এবং অনাচার ও পাপাচারের হাতছানি ছিলো প্রবল। ফলে ইসলামী সমাজ ও মুসলিম জীবনে জাহেলিয়াত আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো এবং দ্রুত শক্তি বিস্তার করতে লাগলো। আর দ্বীন ও দ্বীনিয়াত ভুলে মানুষ ডুবে গেলো ভোগ-বিলাস, খেল-বিনোদন ও খাহেশাতের গলীয গান্দেগিতে। চিরস্থায়ী আখেরাতের পরিবর্তে মানুষের তখন লক্ষ্য ছিলো দুনিয়ার ধনদৌলত এবং ক্ষণস্থায়ী যিন্দেগির শানশৌকত। নফস ও নফসানিয়াতের বাজার ছিলো গরম। নাচ-গান এবং সুর ও সুরার মায়ফিল ছিলো জমজমাট। একথায় সমাজের প্রায় সবমানুষ সবকিছু ভুলে সবকিছুতে ডুবে গিয়েছিলো।

ইছফাহানীর কিতাবুল আগানী এবং জাহিযের কিতাবুল হায়াওয়ান খুলুন; এদু'টোই আপনাকে খুলে খুলে বলে দেবে, মানুষ তখন কতটা ভোগবাদী ও প্রবৃত্তিপরায়ণ হয়ে পড়েছিলো! কেমন সর্বগ্রাসী ছিলো দুনিয়ার লোভ-লালসা এবং পাপসর্বস্ব জীবনের আসক্তি! জীবন ও চরিত্রের এত দূর অধঃপতনের পর এবং অনাচার, পাপাচার ও ভোগ-বিলাসের এমন অতলে ডুবে যাওয়ার পর কোন জাতির পক্ষে আর যাই হোক, ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করা এবং নবুয়তের স্থলবর্তী হয়ে আল্লাহ ও আখেরাতের পথে দাওয়াত দেয়া এবং তাকওয়া ও তাহারাতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা এবং জীবন ও চরিত্রে মানুষের জন্য আদর্শ হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়, এমনকি দীর্ঘকাল স্বাধীন জীবনের স্বাদ গ্রহণ করাও তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যিল্লতি ও বরবাদি এবং লাঞ্ছনা ও অপদস্থতাই শুধু হতে পারে তাদের ভাগ্যলিপি। আলকোরআনের ভাষায়—
سُنَّةَ اللَّهِ فِي الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلُ وَلَن تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلاً
'এটাই ছিলো আল্লাহর শাশ্বত বিধান ঐসকল জাতির ক্ষেত্রে যারা বিগত হয়েছে, আর কিছুতেই পাবে না তুমি আল্লাহর বিধানে কোন পরিবর্তন।' (আহযাব, ৩৩: ৬২)

ইসলামের মন্দ প্রতিনিধিত্ব

এই অপদার্থ শাসকবর্গ তাদের যাবতীয় আচরণে উচ্চারণে প্রকৃতপক্ষে নিজেদের ভ্রান্ত চিন্তা-চেতনা এবং ভ্রষ্ট রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থারই শুধু প্রতিনিধিত্ব করছিলো; ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ, ইসলামের রাজনীতি ও সমরনীতি এবং ইসলামের সভ্যতা ও শাসনব্যবস্থার খুব কম প্রতিফলনই ছিলো তাদের জীবনে। ফলে অমুসলিমদের সামনে ইসলামের বাণী ও বার্তা এবং দাওয়াত ও আহ্বান তার সব আবেদন হারিয়ে ফেলেছিলো, বরং ইসলামের প্রতি তাদের আস্থা ও আশ্বস্তিই দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। জনৈক ইউরোপীয় ঐতিহাসিকের ভাষায়—'ইসলামের অবনতি শুরু হয়েছিলো এজন্য যে, মানবজাতি তাদের সততা ও সত্যতায় সন্দিহান হয়ে পড়েছিলো যারা এই নতুন ধর্মটির প্রতিনিধিত্ব করছিলো।'

জ্ঞানচর্চার মৌলিক ভ্রান্তি

আরেকটি বড় বেদনাদায়ক বিষয় ছিলো এই যে, অবনতি ও অবক্ষয়ের ঐ যুগে মুসলিম জ্ঞানী-মনীষিগণ যে গভীর অধ্যবসায় ও অনুসন্ধিৎসা নিয়ে অতিপ্রাকৃতিক জ্ঞান ও গ্রীক ঈশ্বরতত্ত্ব চর্চা করেছেন, প্রাকৃতিক ও প্রায়োগিক বিজ্ঞানের চর্চা-গবেষণা সেই পরিমাণ করেননি, অথচ জীবন ও জগতের নেতৃত্বদানের জন্য সেগুলোই ছিলো কার্যকর ও ফলপ্রসূ জ্ঞান। পক্ষান্তরে গ্রীক ঈশ্বরতত্ত্ব ছিলো শুধু গ্রীকদের জাতীয় প্রতিমাতত্ত্ব, যা তারা দার্শনিক পরিভাষা ও শাস্ত্রীয় পোশাকে উপস্থাপন করেছিলোমাত্র। তাতে তত্ত্ব ও সত্য এবং সার ও সর বলতে কিছুই ছিলো না, ছিলো শুধু ধারণা ও অনুমান এবং শব্দজৌলুস ও বাক্য-ঝিলিক। অথচ মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে এসবের না ছিলো প্রয়োজনীয়তা, না ছিলো কোন সার্থকতা। কেননা নবী ও নবুয়তের মাধ্যমে উম্মাহকে আল্লাহ তা'আলা যাত ও ছিফাত এবং ইলাহিয়্যাত সম্পর্কে সুসংহত ও সুনিশ্চিত জ্ঞান দান করেছিলেন, যার পর ঈশ্বরতত্ত্বীয় এসব চুলচেরা দার্শনিক আলোচনা-পর্যালোচনা ও 'রাসায়নিক' বিশ্লেষণে যাওয়া ছিলো নিরর্থক, বরং ধ্বংসাত্মক। আল্লাহ তো তাদের দান করেছিলেন 'আল-ফোরকান' নামে সুস্পষ্ট হিদায়াত ও নূর। কিন্তু মুসলিম চিন্তানায়কেরা এ মহান নিয়ামতের 'শায়ানে শান' শোকর এবং যথাযোগ্য কদর করেনি, বরং দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী তারা গ্রীক-চিন্তাপ্রসূত এসকল জ্ঞান ও শাস্ত্র নিয়েই মাথা ঘামিয়েছে এবং দার্শনিক ও কালামশাস্ত্রীয় এসকল অর্থহীন ও নিষ্ফল জটিলতায় মেধা ও বুদ্ধির অপচয় ঘটিয়েছে। এককথায় জিহাদের প্রকৃত ক্ষেত্র ত্যাগ করে তারা 'বীরবিক্রমে বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ' করেছে এবং নিজেদের হাতে নিজেদের বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এই নির্বোধ বুদ্ধিবিলাস তাদেরকে ঐসব প্রায়োগিক জ্ঞান-গবেষণা ও শাস্ত্রচর্চা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে, যা দ্বারা প্রকৃতির যাবতীয় শক্তি ও সম্ভাবনা করায়ত্ত করে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে সেগুলো নিয়োজিত করা যায় এবং সমগ্র বিশ্বের উপর ইসলামের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

একই ভাবে তারা রূহ ও আত্মা, ফালসাফাতুল ইশরাক ও নবপ্লেটো-দর্শন এবং ওয়াহদাতুল ওজুদ ও এককসত্তাবাদ-এর জটিল আলোচনায় আত্মনিয়োগ করেছে এবং সময়, শ্রম, মেধা ও প্রতিভার বিপুল অংশ তাতেই ব্যয় করেছে।

একথা অবশ্য সত্য যে, মুসলিম মনীষিগণ প্রায়োগিক জ্ঞান ও প্রকৃতি বিজ্ঞানে যথেষ্ট অবদান রেখেছেন এবং তাদের কীর্তি ও কর্ম, গবেষণা ও উদ্ভাবনা পূর্ববর্তীদের তুলনায় অনেক বেশী ছিলো; কিন্তু সত্য এই যে, জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় তাদের সুবিস্তৃত অবদানের সঙ্গে এর তুলনাই হয় না। তদ্রূপ ইতিহাসের যে সুদীর্ঘ সময়কাল তারা ভোগ করেছে সেদিক থেকেও তা সন্তোষজনক ছিলো না। এসময় প্রকৃতি বিজ্ঞানের শাখায় ঐ পরিমাণ প্রতিভা ও মনীষার আবির্ভাব ঘটেনি, জ্ঞান ও শাস্ত্রের অন্যান্য শাখায় যেমন ঘটেছে।

পক্ষান্তরে পরবর্তী যুগের সঙ্গে যদি তুলনা করি তাহলেও বলতে হবে, প্রকৃতি বিজ্ঞান ও মহাজাগতিক বিজ্ঞানের উপর যে পরিমাণ গবেষণা ও গ্রন্থনা তারা রেখে গেছেন যদিও উত্থানকালের ইউরোপ তা থেকে বিরাটভাবে উপকৃত হয়েছে এবং মোটামুটি মূল্যায়নও করেছে; কিন্তু মাত্র সতের ও আঠারো শতকের সময়সীমায় ইউরোপের জ্ঞানী-বিজ্ঞানিগণ যে বিশাল ও সুসমৃদ্ধ গ্রন্থাগার তৈরী করেছেন তার তুলনায় সেগুলো একেবারেই নগণ্য। স্পেন ও প্রাচ্যের মুসলিম বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার-উদ্ভাবন ও গবেষণাকর্ম নিয়ে আমরা যতই গর্ব করি পাশ্চাত্যের কীর্তি ও কর্মের পাশে তা উল্লেখযোগ্যই নয়। মানে ও পরিমাণেও নয়, নতুনত্ব ও সৃজনশীলতায়ও নয় এবং বৈজ্ঞানিক সূক্ষ্মতা ও শাস্ত্রীয় উৎকর্ষেও নয়। প্রাকৃতিক ও প্রায়োগিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের তুলনায় আধ্যাত্মিক বিষয়াদির প্রতি ইসলামী প্রাচ্য কত বেশী যত্নবান ছিলো তা যদি বুঝতে চান তাহলে উদাহরণস্বরূপ শায়খ ইবনুল আরাবী-এর আলফুতুহাতুল মাক্কিয়্যাহ এবং প্রকৃতি বিজ্ঞানের শ্রেষ্ট গ্রন্থটির মধ্যে তুলনা করে দেখুন; প্রথমটির তত্ত্ব ও তথ্যের বিপুলতায় এবং বিষয়বস্তুর প্রতি সযত্ন প্রয়াস ও আত্মনিবেদনের গভীরতায় আপনি হতবাক হবেন এবং তা থেকেই বুঝে যাবেন, প্রাচ্যের রুচি, ঝোঁক ও প্রবণতা মূলত কী ছিলো!

শিরক ও বিদ'আতের ছড়াছড়ি

মুসলিম উম্মাহর অবক্ষয় ও অধঃপতনের এ চরম সময়কালে বিভিন্ন প্রকার শিরক ও বিদ'আত এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিলো যে, আকল হতবাক হয়ে যায়। বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয়, এ উম্মাহ হযরত ইবরাহীমের অনুসারী তাওহীদবাদী উম্মাহ, যার নাম তিনি রেখেছেন 'মুসলিমীন'। শিরক ও বিদ'আত এবং মূর্খতা ও গোমরাহীর ঘোর অন্ধকারে ইসলামের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন তাওহীদ প্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো এবং জাহেলিয়াতের ভ্রান্তি ও বিভ্রান্তি, চিন্তা-চেতনা ও কুসংস্কার মুসলিম জীবনের গভীরে অনুপ্রবেশ করেছিলো এবং শিকড় গেড়ে বসেছিলো। বলা যায়, সমাজজীবন ও ধর্মীয় জীবনের এক বিরাট অংশ জাহেলিয়াতের কবলে চলে গিয়েছিল এবং মুসলিম জাতি সঠিক দ্বীন থেকে যেমন বিচ্যুত ছিলো তেমনি বাস্তব দুনিয়া থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো। অথচ বিশ্বের জাতিবর্গের মধ্যে মুসলিম উম্মাহর যা কিছু বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্ব তার মূল হচ্ছে এই আসমানী দ্বীন যা আল্লাহর নবী মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়ে এসেছেন এবং উম্মাহর কাছে আমানত রেখে গেছেন। আর মৌলিকতা, নির্ভুলতা, নির্ভেজালতা ও সংরক্ষণীয়তাই হলো এই দ্বীনের একক বৈশিষ্ট্য ও অলৌকিকত্ব। এই দ্বীন হচ্ছে আল্লাহর অহী, যা চিরসংরক্ষিত—
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
'আমিই নাযিল করেছি এই যিকির এবং অবশ্যই আমিই তার হিফাযাতকারী।' (সূরাতুল হিজর, ১৫:৯)

এই দ্বীন হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ হতে অবতারিত মহাপ্রজ্ঞাপূর্ণ শরী'আত যার প্রতিটি আদেশ, উপদেশ এবং প্রতিটি হুকুম বিধান পরিপূর্ণ ও নিখুঁত।—
صُنْعَ اللَّهِ الَّذِي أَتْقَنَ كُلَّ شَيْءٍ
সেই আল্লাহর কীর্তি যিনি সকল কিছুকে নিখুঁত করেছেন।' (আন-নামল, ২৭: ৮৮)

এই দ্বীন হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত এমন এক সত্যপথ, যাতে মিথ্যা ও ভ্রান্তির সামান্যতম অনুপ্রবেশেরও অবকাশ নেই—
لَّا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ، تَنزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٌ
'তাতে আসতে পারে না বাতিল তার সম্মুখ থেকে এবং না তার পশ্চাত থেকে। (তা তো) মহাপ্রজ্ঞার অধিকারী, চিরপ্রশংসিত-এর অবতারণ।' (ফুচ্ছিলাত, ৪১: ৪২)

সুতরাং আল্লাহ না করুন, অন্যান্য ধর্মের মত এখানেও যদি মানব-মস্তিষ্কের অনুপ্রবেশ ঘটে; খাহেশাত ও প্রবৃত্তির চাহিদা চরিতার্থ করার জন্য এখানেও যদি মানুষ হস্তক্ষেপ করে তাহলে অন্যান্য ধর্মের উপর তার কোন বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্বই তো আর বাকি থাকে না এবং এ ধর্ম উম্মাহর দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য ও সফলতার যামিন হতে পারে না, এমনকি এ যোগ্যতাও আর থাকে না, যাতে মানুষের বুদ্ধি ও মস্তিষ্ককে অনুগত করতে হৃদয় ও আত্মার জগতে সে কোন আবেদন সৃষ্টি করতে পারে।

দ্বীনের দওয়াত ও তাজদীদের চিরন্তনতা

উপরে যে চিত্র তুলে ধরা হলো তারপরো একথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, অবক্ষয় ও অধঃপতনের এ দীর্ঘ সময়কালেও আল্লাহর প্রেরিত 'দ্বীনুল ইসলাম' ছিলো পূর্ণ জীবন্ত এবং সর্বপ্রকার পরিবর্তন ও বিকৃতি থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। দ্বীন ও শরী'আত মুসলমানদের কোন ভ্রান্তি ও বিচ্যুতিতে কখনো সঙ্গ দান করেনি, বরং সতর্ক করেছে, তিরস্কার করেছে এবং অন্ধকার থেকে আলোতে ফিরে আসার আহ্বান অব্যাহত রেখেছে। এ আলোর মিনার থেকে আলোর বিচ্ছুরণ কখনো বন্ধ হয়নি। তখনো মানুষ দ্বীনের আলোতে সত্যের পথ দেখতে পেতো এবং সত্যের পতে চলতে থাকতো—
يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَن اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَامِ وَيُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
'প্রদর্শন করেন তা দ্বারা আল্লাহ শান্তির পথ ঐ লোকদেরকে যারা তাঁর সন্তুষ্টি অনুসরণ করে এবং বের করে আনেন তিনি তাঁর ইচ্ছায় তাদেরকে যাবতীয় অন্ধকার থেকে নূরের দিকে এবং পথপ্রদর্শন করেন তাদেরকে সরল পথের দিকে।' (আল-মাইদাহ, ৫: ১৬)

কিতাব ও সুন্নাহ তখনো মুসলিম-হৃদয়ে শিরক ও বিদ'আত এবং গোমরাহি ও জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সৃষ্টি করতো। কোরআন ও সুন্নাহর উদাত্ত আহ্বানে তখনো মানুষ ভোগবাদ ও স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতো এবং দ্বীন ও শরী'আতের যে কোন অবমাননায় ক্রদ্ধ হতো। তখনো বহু মানুষের দিলে জাযবায়ে জিহাদ ও তামান্নায়ে শাহাদাত যিন্দা ছিলো। একারণেই ইসলামী ইতিহাসের প্রত্যেক যুগে এবং মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি অংশে এমন অসংখ্য মহান ব্যক্তি ও সাহসী ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে, শত প্রতিকূলতার মুখেও উম্মাহর জীবনে যারা নবীর নেয়াবাত ও প্রতিনিধিত্বের হক আদায় করেছেন এবং দ্বীনের তাজদীদ ও নবায়ন এবং পুনর্জাগরণের সুকঠিন দায়িত্ব পূর্ণ নিষ্ঠা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে পালন করেছেন।

একদিকে তাঁরা উম্মাহর মুর্দা দিলে জিহাদের রূহ ফুঁকেছেন এবং বহু যুগের শান্ত সমুদ্রে তরঙ্গদোলা সৃষ্টি করেছেন; অন্যদিকে তাদের সামনে ইজতিহাদের বদ্ধ দুয়ার খুলে দিয়েছেন এবং স্বকীয় যোগ্যতা দ্বারা মুসলিম সমাজে চিন্তার বন্ধ্যাত্ব দূর করে নতুন ইলমি চেতনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ সৃষ্টি করেছেন। এমন মর্দে মুজাহিদেরও তখন অভাব ছিলো না যারা খিলাফাতে রাশেদার অনুসরণে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। এ মহান উদ্দেশ্যের পথে অনেকে যেমন শাহাদাত বরণ করেছেন তেমনি কেউ কেউ খিলাফাতে রাশেদার নূরানি যামানার ছায়াস্বরূপ ইকালীমী শাসন প্রতিষ্ঠায়ও সক্ষম হয়েছেন। কোরআনের ভাষায়—
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُم مِّن قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُم مِّن يَنتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلاً
'মুমিনদের মধ্যে রয়েছে এমন কিছু লোক যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত তাদের ওয়াদাকে সত্য সাব্যস্ত করেছে; তারপর তাদের একদল নিজ নিজ সময় পূর্ণ করেছে, আর একদল অপেক্ষা করছে; তারা কোন প্রকার পরিবর্তন আনয়ন করেনি।' (আহযাব, ৩৩: ২৩)

উম্মাহর এই সুনির্বাচিত জামা'আত সম্পর্কেই হাদীছ শরীফে বলা হয়েছে—
لا تزال طائفة من أمتى ظاهرين على الحق، لا يضرهم من خذلهم حتى يأتي أمر الله (وهم كذلك (رواه مسلم عن ثوبان رضي الله عنه في كتاب الإمارة
'আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা হকের উপর অবিচল থাকবে, তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না তারা, যারা তাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করবে, এমনকি এসে যাবে আল্লাহর ফায়ছালা, আর তারা ঐ অবস্থারই উপর অবিচল থাকবে।'

মোটকথা, জিহাদ ও তাজদীদের ইতিহাস ছিলো ধারাবাহিক ও নিরবচ্ছিন্ন; তাতে কখনো কোন শূন্যতা ছিলো না। ইছলাহ ও সংশোধন এবং তাজদীদ ও সংস্কারের মশাল সবসময় সমুজ্জ্বল ছিলো, যা এক হাত থেকে অন্য হাতে প্রজ্বলিত হয়ে এসেছে। উম্মাহর জীবনে প্রবল থেকে প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝার সময়ও তাগূত ও বাতিল ইসলামী জাহানের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সর্বব্যাপী অন্ধকার ছড়াতে পারেনি। কোথাও না কোথাও, কেউ না কেউ দ্বীনের ঝাণ্ডা এবং সত্যের মশাল সমুচ্চ রেখেছেন। তদ্রূপ ইসলাম ও ইসলামী জাহানের সামনে যখন নতুন কোন ফেতনা ও খাতরা এবং বিপদ ও দুর্যোগ দেখা দিয়েছে তখনই কোন না কোন শেরদিল মর্দে মুজাহিদ হুঙ্কার দিয়ে ময়দানে এসেছেন এবং বিপদ-দুর্যোগের শুধু মুকাবেলাই করেননি, বরং ইসলামী উম্মাহ ও মুসলিম জাহানকে নতুন প্রাণ ও নতুন জীবন দান করেছেন।¹ ইসলামী ইতিহাসের মহান শাসক নূরুদ্দীন ও ছালাহুদ্দীন হচ্ছেন তেমনি দু'টি আলোকিত উদাহরণ।

ক্রুশেডের প্রতিরোধে মুসলিম জাহান

কয়েক শতাব্দী ধরেই খৃস্টান ইউরোপ ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষে টগবগ করছিলো। মুসলিম উম্মাহ খৃস্টানদের সমগ্র পূর্বসাম্রাজ্য অধিকার করে রেখেছে। বাইতুল মাকদিসসহ তাদের সকল পবিত্র ভূমি তখন মুসলিম-নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু বিভিন্ন শক্তিশালী সালতানাতের উপস্থিতি এবং তাদের অব্যাহত অগ্রাভিযানের কারণে এদিকে চোখ তুলে তাকাবারও খৃস্টানবিশ্বের সাহস ছিলো না, হামলা করা তো দূরের কথা। কিন্তু হিজরী ষষ্ঠ শতকে সেলজুকীদের পতনের পর মুসলিম জাহান দুর্বলতার চরমে পৌঁছে যায়, বরং বলা ভালো, অল্প সময়ের মধ্যেই যেন জরাবার্ধক্যে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। বিশাল বিস্তৃত মুসলিম জাহান তখন খণ্ডবিখণ্ড। 'বড় বড়' শাসক যাকে বলে 'প্রবল প্রতাপে' ছোট ছোট রাজ্য শাসন করছেন।

অবস্থা এমনই নাযুক হয়ে পড়ে যে, ইউরোপের ধর্মোন্মাদ ক্রুশেডবাহিনী হামলা ও আগ্রাসন শুরু করে দেয়। তাদের প্রথম লক্ষ্য তো ছিলো মুসলিম-দখল থেকে পবিত্র-ভূমিগুলো উদ্ধার করা। কিন্তু একসময় তারা, ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর জন্যই চ্যালেঞ্জ এবং সিরিয়ার পার্শ্ববতী রাজ্যগুলোসহ ইসলামের প্রাণকেন্দ্র জাযিরাতুল আরবের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ালো। ক্রুশেডবাহিনী ঝড়-তুফানের মত সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের দিকে ধেয়ে এলো এবং ৪৯২ হিজরীতে (১০৯৯ ঈসায়ী) বাইতুল মাকদিস দখল করে নিলো। যত সহজ করে বলা হলো তত সহজেই! কারণ মুসলিম জাহানের পক্ষ হতে তেমন কোন প্রতিরোধের মুখেই পড়তে হয়নি ক্রুশেডশক্তিকে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের প্রায় সব শহর-জনপদ তাদের দখলে চলে গেলো, এমনকি তারা মদীনাতুর-রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) দিকেও নাপাক দৃষ্টি দেয়ার আস্পর্ধা দেখাতে লাগলো।

প্রসিদ্ধ ইংরেজ ঐতিহাসিক stanley lan poel লিখেছে—'ক্রশেড বাহিনী দেশের গভীরে এমনভাবে ঢুকে পড়লো যেমন পচা কাঠে পেরেক ঢুকে যায়। কিছু সময়ের জন্য এমনই মনে হচ্ছিলো যে, তারা ইসলাম-বৃক্ষের কাণ্ড চিরে ফালি ফালি করে ফেলবে।'¹

যত খারাপই লাগুক, লেনপোল সাহেব কিন্তু ভুল উপমা দেননি। আসলেই তখন আমাদের অবস্থা ছিলো পচা কাঠ, আর ক্রুশেডবাহিনী লোহার পেরেকের মতই আরামসে ঢুকে যাচ্ছিলো আমাদের শরীরের গভীর অংশে। ইংরেজদের একটা প্রিয় উপমা হলো, 'ছুরি দিয়ে নরম কেক কাটা'; ইচ্ছে করলে লেনপোল এটা ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু তাচ্ছিল্যের চূড়ান্ত প্রকাশের জন্যই সম্ভবত তিনি 'পচা কাঠ' বেছে নিয়েছেন। অবস্থাটাও হয়েছিলো তেমনই। বিজয়োল্লাসে উন্মাদ ক্রুসেডাররা বাইতুল মাকদিসের অসহায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর যে চরম পাশবিকতা ও হিংস্রতা চালিয়েছিলো তা কিছুটা দায়িত্বশীল এক খৃস্টান ঐতিহাসিক এভাবে তুলে ধরেছেন—
'বাইতুল মাকদিসে বিজয়ী বেশে প্রবেশের পর ধর্মযোদ্ধারা এমন ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছিলো যে, বলা হয়, মসজিদে ওমরে যাওয়ার পথে তাদের ঘোড়া হাঁটু পর্যন্ত রক্তে ডুবে গিয়েছিলো। দেয়ালে আছড়ে আছড়ে শিশুদের হত্যা করা হয়েছে, অথবা নগর-প্রাচীর থেকে চরকির মত ঘুরিয়ে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে।'¹

বস্তুত বাইতুল মাকদিসের 'পতন' ছিলো ইসলামী সালতানাতের চরম দুর্বলতা এবং নতুন শক্তিরূপে খৃস্টজগতের উত্থানের প্রতীক এবং ইসলামী জাহানের জন্য বিপদ-ঘণ্টা।

খৃস্টানদের সাহস তখন এতটাই বেড়েছিলো যে, কর্ক-এর শাসন-কর্তা রেজিনাল্ড পবিত্র মক্কা-মদীনায় হামলা চালানোর চিন্তা পর্যন্ত করেছিলো। বস্তুত হযরত আবু বকর (রা)-এর খিলাফাতের শুরুতে 'ফিতনায়ে ইরতিদাদ' নামে যে ব্যাপক ধর্মত্যাগ ঘটেছিলো তারপর ইসলামের ইতিহাসে এর চেয়ে ভয়াবহ ও বিপজ্জনক ফিতনা আর কখনো আসেনি। এই নাযুকতম মুহূর্তে হতাশার অন্ধকারে প্রায় ডুবে যাওয়া ইসলামী উম্মাহর প্রতি আল্লাহ তা'আলা বিরাট অনুগ্রহ করলেন এবং এমন কতিপয় মর্দে মুজাহিদের আবির্ভাব ঘটালেন যারা আল্লাহর রহমতের ছায়া হয়ে মুসলিম উম্মাহকে রক্ষা করলেন এবং ইসলামী জাহানে নবজাগরণ সৃষ্টি করলেন। তাঁদেরই একজন হলেন ইমাদুদ্-দীন আতাবেক যাঙ্গী (মৃ ৫৪১ হিজরী)। তিনি বিপুল বিক্রমে লড়াই করে বহু রণক্ষেত্রে ক্রুশেড বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেন এবং অবশেষে রাহা অধিকার করেন। তারপর তাঁর সুযোগ্য পুত্র আলমালিকুল আদিল (ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ) নূরুদ-দীন যাঙ্গী জিহাদের ঝাণ্ডা হাতে নেন এবং সিরিয়া-ফিলিস্তিন থেকে খৃস্টানদের উৎখাত করে বাইতুল মাকদিস মুসলিম-অধিকারে ফিরিয়ে আনার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন। তিনি বাইতুল মাকদিস ছাড়া ফিলিস্তিনের প্রায় সমগ্র ভূখণ্ড থেকে খৃস্টান বাহিনীকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হন। বাইতুল মাকদিস পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁর ইনতেকাল হয়ে যায়। আসলে এ মহাসৌভাগ্য আল্লাহ তা'আলা সুলতান ছালাহুদ্-দীন আইয়ূবী (রহ)-এর ভাগ্যে লিখে রেখেছিলেন।

সুলতান নূরুদ্দীনের যতই প্রশংসা করা হবে, কম হবে। বস্তুত মহত্ত্ব ও মহানুভব-তায়, ধার্মিকতা ও নির্মোহতায়, সুবিচার ও শাসনকুশলতায়, বিনয় ও সরলতায়, জিহাদী চেতনা ও শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় এবং ঈমান ও বিশ্বাসের দৃঢ়তায় তিনি ছিলেন ইসলামী ইতিহাসের উজ্জ্বলতম ব্যক্তিদের একজন। সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ইবনুল আছীর ছিলেন তাঁর কনিষ্ঠ সমসাময়িক। তিনি বলেন, 'বিগত শাসকদের জীবনচরিত আমি অধ্যয়ন করেছি। খোলাফায়ে রাশেদীন এবং হযরত ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহ)-এর পর নূরুদ-দীনের চেয়ে উত্তম চরিত্রের এবং অধিক ন্যায়পরায়ণ শাসক আমার নযরে আসেনি।'¹

নূরুদ-দীনের পর তাঁরই প্রিয়পাত্র ও মনোনীত ব্যক্তি সুলতান ছালাহুদ্-দীন ইউসুফ বিন আইয়ূব (রহ) মিশরের শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেন, আর তিনিই হলেন সেই মহান ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তা'আলা বাইতুল মাকদিস পুনরুদ্ধারের মহাসৌভাগ্যের জন্য নির্বাচন করেছেন। ক্রুশেডবিশ্বের মুকাবেলার জন্য তিনি ইসলামী জাহানের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং বেশকিছু রণাঙ্গণে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ-পরিচালনা করেন। তারপর ১৪ই রবিউল আখির ৫৮৩ হিজরীতে (৪ঠা জুলাই ১১৮৭ ঈসায়ী) হিত্তীনের ভাগ্যনির্ধারণী যুদ্ধে ক্রশেডবাহিনীকে এমন পর্যুদস্ত করেন যে, তাদের কোমর ভেঙ্গে যায় এবং ভাগ্যবিপর্যয় অবধারিত হয়ে পড়ে। লেনপোল রণাঙ্গনের যুদ্ধপরবর্তী চিত্র এভাবে এঁকেছেন—
'একেকজন মুসলিম সৈনিক ত্রিশ ত্রিশজন বন্দীকে রশি-বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। ভাঙ্গা ক্রশ ও কর্তিত অঙ্গ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। ধড়গুলো এমন স্তূপ হয়ে ছিলো, যেন থরে থরে রাখা বৃক্ষকাণ্ড। ছিন্ন মস্তকগুলো যেন ক্ষেতে সাজানো তরবুজ। এ খুনি লড়াই যেখানে হয়েছিলো, যেখানে ত্রিশ হাজার সৈন্য নিহত হয়েছিলো তা হিত্তীনের ময়দান বলে এখনো ইতিহাসে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে।'¹

হিত্তীনের বিজয়ের পর গাজী সালাহুদ্-দীন আইয়ূবী ২৭শে রজব ৫৮৩ হিজরীতে (১১৮৭ ঈসায়ী) দ্বিতীয়বার বাইতুল মাকদিস আযাদ করেন এবং মুসলিম উম্মাহর সেই স্বপ্নকে পূর্ণতা দান করেন, যা দীর্ঘ নব্বই বছর প্রতিটি মুসলিম-হৃদয় ব্যাকুল বে-কারার করে রেখেছিলো। সুলতানের আস্থাভাজন সহচর কাজী শাদ্দাদ লিখেছেন—
'চারদিকে শোনা যাচ্ছে শুধু তাকবীর ও দু'আর গুঞ্জন। (নব্বই বছর পর) বাইতুল মাকদিসে জুমু'আর নামায হলো। সাখরা গম্বুজের উপর যে ক্রুশ স্থাপন করা হয়েছিলো তা নামিয়ে ফেলা হলো। চোখের সামনে অভাবিতপূর্ব সব দৃশ্য। আল্লাহর সাহায্য এবং ইসলামের বিজয় সবাই স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছে।'¹

বাইতুল মাকদিস বিজয়কালে গাজী ছালাহুদ্-দীন যে উদারতা, মহানুভবতা ও মহোত্তম ইসলামী চরিত্র প্রদর্শন করেছিলেন সে সম্পর্কে লেনপোলকে লিখতে হয়েছে—
'মানুষ যদি ছালাহুদ্-দীনের অন্যান্য কীর্তির মধ্যে শুধু এই একটি কীর্তির কথা সঠিকভাবে জানতে পারতো যে, কীভাবে তিনি জেরুযালেম পুনরুদ্ধার করেছেন তাহলে এটাই যথেষ্ট ছিলো একথা প্রমাণ করার জন্য যে, তিনি শুধু তাঁর যুগের নন, বরং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন। আভিজাত্যে ও মহত্ত্বে সত্যি তিনি অনন্য ও অতুলনীয় ছিলেন।'¹

হিত্তীনের শোচনীয় পরাজয়ের পর বাইতুল মাকদিসও হাতছাড়া! গোটা ইউরোপ যেন ক্রোধের আগুনে জ্বলে উঠলো এবং সমগ্র খৃস্টজগত একজোটে সিরিয়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো, কিন্তু তিনি ছিলেন গাজী ছালাহুদ্-দীন, পাহাড়ের মত অটল, অবিচল! সারা ইসলামী জাহানের পক্ষ হতে তিনি ও তাঁর কতিপয় সহযোগী একা লড়াই চালিয়ে গেলেন।

শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছরের লাগাতার যুদ্ধের পর ১১৯৩ ঈসায়ীতে ক্লান্ত-শ্রান্ত ও বিধ্বস্ত উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধি হলো। বাইতুল মাকদিস এবং অন্যান্য বিজিত শহর ও দুর্গ বদস্তুর মুসলিম-দখলেই থাকলো। উপকূলীয় এলাকায় একটি ক্ষুদ্র রাজ্য আক্কা শুধু খৃস্টানদের দখলে ছিলো। এছাড়া বিস্তীর্ণ সমগ্র রাজ্য ছিলো সুলতান ছালাহুদ্-দীনের কব্জায়।

যে মহান দায়িত্ব সুলতান ছালাহুদ্দীন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, আরো সঠিক ভাষায়, আল্লাহ তা'আলা তাঁর কাঁধে অর্পণ করেছিলেন, তা তিনি সুচারুরূপে সম্পন্ন করেই ক্ষান্ত হলেন।

লেনপোল লিখেছেন—'পবিত্র ধর্মযুদ্ধ শেষ হলো। পাঁচ বছরের অব্যাহত হানাহানি ও রক্তপাত বন্ধ হলো। জুলাই ১১৮৭ খৃস্টাব্দে হিত্তীন রণাঙ্গনে মুসলমানদের মহাবিজয়ের পূর্বে জর্দাননদীর পশ্চিম তীরে তাদের নিয়ন্ত্রণে একইঞ্চি ভূমিও ছিলো না; পক্ষান্তরে সেপ্টেম্বর ১১৯২-এ যখন রামলায় সন্ধি হলো তখন সমগ্র ভূভাগ মুসলিম-অধিকারে চলে গিয়েছে, ছোর থেকে ইয়াফা পর্যন্ত একচিলতে উপকূলীয় ভূখণ্ড ছাড়া, যেখানে তখনো খৃস্টানদের নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিলো। সুতরাং এই সন্ধিতে ছালাহুদ্-দীনের জন্য লজ্জার কিছু ছিলো না। কারণ ক্রুশেডারদের ক্ষয়ক্ষতি ছিলো বিপুল, অথচ অর্জন ছিলো অতি সামান্য। পোপের ধর্মযুদ্ধের আহ্বানে গোটা ইউরোপ ও সমগ্র খৃস্টশক্তি পবিত্র ভূমির অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। তাদের লক্ষ্য ছিলো জেরুযালেম দখলে রাখা এবং পতনোন্মুখ খৃস্টানরাজ্য রক্ষা করা। কিন্তু এ বিপুল আয়োজন, তোড়জোর ও সংগ্রামের ফল কী হলো? কাইজার ফ্রেডারিক এসময় মারা গেলেন। ইংলেও ও ফ্রান্সের সম্রাটদ্বয় স্ব-স্ব দেশে ফিরে গেলেন। তাদের অনুগামী অসংখ্য নাইট ও বীর যোদ্ধা ইলিয়ার মাটিতে দাফন হলো। জেরুযালেম যেমন ছিলো তেমনি ছালাহুদ্-দীনের দখলে থেকে গেলো। খৃস্টানদের ভাগে ছিলো শুধু উপকূলীয় এলাকায় ক্ষুদ্র আক্কা রাজ্য।'

সুলতান গাজী ছালাহুদ্-দীন যেমন ছিলেন অতি উচ্চ প্রশাসনিক যোগ্যতা ও দুর্লভ নেতৃত্বগুণের অধিকারী শাসক তেমনি মানুষ হিসাবে ছিলেন সততা, ধার্মিকতা, আভিজাত্য, মহানুভবতা ও মহোত্তম চরিত্রের অধিকারী। এত অসংখ্য মানবীয় গুণ ও বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ আল্লাহ তাঁর মধ্যে ঘটিয়েছিলেন, যা বিশ্ব-ইতিহাসের বিরল ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের মধ্যেই শুধু ঘটে থাকে। বস্তুত তিনি ছিলেন ইসলামের অসংখ্য অলৌকিকতার একটি এবং একথার প্রমাণ যে, বিশ্বের মানবমঞ্চে ইসলামের ভূমিকা এখনো শেষ হয়ে যায়নি এবং মুসলিম উম্মাহ তার প্রাণশক্তি ও উৎপাদনশীলতা এখনো হারিয়ে ফেলেনি।

দীর্ঘকাল পর এই প্রথমবার ফুরাত ও নীলনদের মধ্যবর্তী মুসলিম ভূখণ্ড সুলতান ছালাহুদ্-দীনের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলো এবং ইসলামী জাহানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া ইউরোপের ধর্মোন্মাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলো। মুসলিম উম্মাহর বহু জাতি ও জনগোষ্ঠী জিহাদের উদ্দেশ্যে গাজী ছালাহুদ্-দীনের পতাকাতলে সমবেত হয়েছিলো, যা ইতিপূর্বে কখনো হয়নি। দীর্ঘকাল পর ইসলামী গায়রত ও জিহাদী চেতনা প্রজ্বলিত হয়েছিলো। সে যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সমরশিল্পে ইসলামী বিশ্ব যা কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছিলো গাজী ছালাহুদ্দীন তা সবই খৃস্টান শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন।

তিনি শুধু একজন বিজয়ী সেনাপতিই ছিলেন না, বরং ছিলেন প্রত্যেক মুসলিম সিপাহীর প্রাণপ্রিয় নেতা। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত তাঁর বিশাল বাহিনী এক দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ও রক্তক্ষয়ী জিহাদে নিয়োজিত ছিলো। বছরের পর বছর প্রবল শক্তিশালী এক শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছিলো, কিন্তু সেনা-পরিচালক থেকে সাধারণ সৈনিক, কারো মুখে কখনো সামান্য অনুযোগের শব্দ উচ্চারিত হতে শোনা যায়নি। যখনই তিনি জিহাদ ও যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন 'জানহাতে' তারা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বাহিনীর বড় বড় আরব-অনারব পরিচালক পরম আনুগত্যে তাঁর ডাকে লাব্বাইক বলেছে। বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠীর লোক ছিলো। ভাষা ও জাতীয়তার যেমন পার্থক্য ছিলো তেমনি ছিলো দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং জাতিগত সঙ্ঘাত ও গোত্রীয় কোন্দল, কিন্তু তিনি তাঁর বিরল ব্যক্তিত্বগুণে বিপরীতমুখী বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে আশ্চর্য এক সমন্বয় সাধন করেছিলেন এবং এমন সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন, যেন এক দেহ, এক আত্মা। সকলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতো, সুলতান ছালাহুদ্-দীনই তাদের নেতা ও পরিচালক। বিভিন্ন সঙ্কটে, কঠিন থেকে কঠিন মুহূর্তে, ঘোরতর যুদ্ধে একটিমাত্র হৃদয় এবং একটি মাত্র ইচ্ছা তাদের নিয়ন্ত্রণ করতো, আর তা হলো গাজী ছালাহুদ্-দীনের সবল হৃদয় ও লৌহকঠিন ইচ্ছা। কারণ তারা জানতো, তাঁর উদ্দেশ্য ইসলামের হিফাযত এবং জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ ছাড়া আর কিছু নয়। লেনপোল সঠিক মন্তব্যই করেছেন—
'তৃতীয় ক্রুশেডযুদ্ধে সম্মিলিত খৃস্টানশক্তি মুকাবেলায় নেমেছিলো, কিন্তু তারা গাজী ছালাহুদ্-দীনের শক্তি ও মনোবলে সামান্যতম চির ধরাতে পারেনি এবং পারেনি তার বাহিনীতে কোন ফাটল সৃষ্টি করতে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি সৈনিক তার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলো।'¹

সালাহুদ্দীনের পর নেতৃত্ব-সংকট

২৭শে ছফর ৫৮৯ হিজরীতে ইসলামের এই ওয়াফাদার ও নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদ দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করলেন। তিনি তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব বহুদূর পর্যন্ত সম্পন্ন করে গিয়েছিলেন। যে মহাদুর্যোগ ইসলামের অস্তিত্বের জন্য ছিলো বিরাট হুমকি, তা অনেকটা দূর হয়ে গিয়েছিলো এবং ক্রুশেড-হামলার ঢল থেমে গিয়েছিলো। তবে খৃস্টানজগত তাদের তিক্ত পরাজয় থেকে যথেষ্ট শিক্ষা নিয়েছিলো এবং বিস্তর চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে উভয়পক্ষের শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পেরেছিলো। তারা আসলে ফিরে গিয়েছিলো নতুন ক্রুশেডের প্রস্তুতি নিতে, যা উনিশ শতকে সঙ্ঘটিত হয়েছিলো। কিন্তু মুসলিম উম্মাহ?!

হায়, তারা ফিরে গিয়েছিলো তাদের পুরোনো চরিত্রে; সেই বিভাজন-বিভক্তি, আত্মকলহ ও দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত এবং সেই গাফলত ও তন্দ্রালুতা! এরপর ইসলামী বিশ্বে এমন কোন নেতার অবির্ভাব ঘটেনি যিনি ইসলামের প্রতি হবেন নিবেদিত-প্রাণ, যিনি ব্যক্তিগত লোভ ও লাভ এবং স্বার্থ ও চাহিদার উপর ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে অগ্রাধিকার প্রদান করবেন, যিনি শুধু জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর জন্য নিজেকে কোরবান করবেন, যিনি আপন ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে সর্বহৃদয় জয় করে নেবেন এবং যাকে কেন্দ্র করে সমস্ত বিভক্ত শক্তি আবার ঐক্যবদ্ধ হবে, যেমন ছিলেন সুলতান গাজী ছালাহুদ্-দীন, যিনি আল্লাহ-প্রদত্ত শক্তি ও প্রতিভা-বলে মুসলিম উম্মাহকে জিহাদের পতাকাতলে এক করেছিলেন এবং গোটা ইউরোপকে পর্যুদস্ত করেছিলেন; যিনি 'প্রবলপ্রতাপ' শত্রুর কবল থেকে ইসলামের সাম্রাজ্য ও মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন।

এসব কিছুই হলো না, বরং মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামী জাহান আরেকবার গৃহবিবাদ ও হানাহানি এবং স্বার্থান্ধ ও কুচক্রী নেতৃবর্গের অবাধ শিকারভূমিতে পরিণত হলো। বিশাল বিস্তৃত মুসলিম জাহানের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত অবক্ষয় ও অধঃপতনের মেঘ ছেয়ে গেলো এবং ক্রমশ পরিস্থিতি আরো গুরুতর হতে লাগলো।

তবে এই ব্যাপক অবক্ষয়ের যুগে যাবতীয় বিচ্যুতি ও দুর্বলতা সত্ত্বেও ইসলামের অন্তর্নিহিত শক্তি সতত সক্রিয় ছিলো। কখনো কখনো এমন শাসক ও সেনাপতি সামনে আসছিলেন, যারা তাঁদের জীবন ও চরিত্রে এবং ধার্মিকতা ও নৈতিকতায় ছাহাবা কেরাম ও মহান পূর্ববর্তীদের কিছু না কিছু নমুনা ছিলেন। এখানে সেখানে এমন ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটছিলো যাদের আলোক-চ্ছটায় ইতিহাস এখনো সমুজ্জ্বল।

মুসলিম উম্মাহ যদিও তাদের মহান পূর্ববর্তীদের আদর্শ পথ ও পন্থা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছিলো তবু সমকালীন জাহিলী জাতিগোষ্ঠীর মুকাবেলায় তারাই ছিলো আম্বিয়ায়ে কেরামের জীবনাদর্শের অধিকতর নিকটবর্তী এবং আল্লাহর প্রতি অধিকতর অনুগত। তাদের নিছক অস্তিত্ব এবং বিপর্যস্ত সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট প্রতাপ জাহেলিয়াতের গতি ও অগ্রগতির পথে ছিলো সবচে' বড় বাধা ও প্রতিবন্ধক। এখনো ইসলামী সাম্রাজ্য ছিলো সমকালীন বিশ্বের একটি বড় শক্তি, যাকে হিসাব করে চলতো সব জাতি এবং যার ভয়ে কম্পমান ছিলো সকল সাম্রাজ্য। কিন্তু প্রকৃত সত্য ছিলো এই যে, বাইরের অগোচরে ভিতরে ভিতরে এই শক্তি তার প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলছিলো। অবশেষে হিজরী সপ্তম শতকের মধ্যভাগে ইসলামী উম্মাহর রাজনৈতিক অরাজকতা ও নৈতিক অবক্ষয় হয়ে গেলো খোলামেলা বিষয়, যা আর লুকিয়ে রাখার উপায় ছিলো না। ফলে ইসলামী শক্তির যে 'ত্রাশছায়া' দূর থেকে দৃশ্যমান ছিলো এবং সবার সন্ত্রস্ততার কারণ ছিলো তা অদৃশ্য হয়ে গেলো এবং যা ঘটার তাই ঘটলো। শত্রুজাতি এবং অসভ্য ও বন্য জনগোষ্ঠী মুসলিম উম্মাহর উপর উন্মত্ত উল্লাসে ঝাঁপিয়ে পড়লো। বিশাল বিস্তৃত ইসলামী সাম্রাজ্য যেন হয়ে গেলো এক লাওয়ারিছ সম্পত্তি, যা বিজেতাদের খেয়াল-খুশি মত বণ্টিত হতে লাগলো।

খাওয়ারেযম শাহ-এর হুকুমতই শেষ ইসলামী সাম্রাজ্য, যাকে শত্রুরা কিছুটা ভয় করে চলতো, কিন্তু সপ্তম শতকে তাতারীদের হাতে যখন খাওয়ারেযম সাম্রাজ্য ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো এবং বাগদাদেরও পতন হলো তখন শত্রুর সব ভয়ভীতি একেবারে দূর হয়ে গেলো। যেন বিরাট ফসলের ক্ষেতে ছিলো এক কাকতাড়ুয়া, তাই পশু-পাখী কাছে আসতে ভয় পেতো। একসময় উই পোকা লাঠির গোড়া খেয়ে ফেললো, আর কাকতাড়ুয়া পড়ে গেলো। তখন পশু পাখী সব যেন একযোগে ক্ষেতের ফসলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।

চেঙ্গিজখানের তাতারী ফেতনা

মুসলিম উম্মাহর উপর ঐসময় যত বিপদ ও দুর্যোগ নেমে এসেছে তার মধ্যে বর্বর তাতারীজাতির হামলাই ছিলো সবচে' ভয়াবহ ও মর্মন্তুদ। তাতারীরা পূর্ব দিক থেকে পঙ্গপালের মত ধেয়ে এসেছিলো এবং দেখতে দেখতে সমগ্র মুসলিম জাহানে ছেয়ে গিয়েছিলো। বস্তুত তাতারী হামলা ছিলো মুসলিম উম্মাহর সুদীর্ঘ ইতিহাসের সবচে' বড় ফেতনা ও দুর্যোগ, যা বলতে গেলে উম্মাহর অস্তিত্বকেই কাঁপিয়ে দিয়েছিলো। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় সমস্ত মুসলিম জাহান যেন একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলো। চারদিকে শুধু হতাশা, নৈরাশ্যের অন্ধকার। একপর্যায়ে প্রায় সমগ্র মুসলিম জাহান, বিশেষত তার পূর্ব-অংশ তাতারী আগ্রাসনের সর্বনাশা থাবায় এসে গিয়েছিলো। ঐতিহাসিক ইবনে আছীর তাতারী হামলার ইতিহাস লিখতে গিয়ে তাঁর মনোবেদনা ও হৃদয়-যন্ত্রণা চেপে রাখতে পারেননি। তিনি বলেন—
'এ ঘটনা এমনই লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক যে, কয়েক বছর আমি 'লিখবো কি লিখবো না' এ দ্বিধাদ্বন্দ্বেই ছিলাম! এখনো বড় দ্বিধা-বেদনার মধ্যেই লিখছি। আসলে ইসলামের দুর্দশা এবং মুসলিম উম্মাহর সর্বনাশের কাহিনী শোনাতে পারে এমন দিলগুর্দা কারই বা আছে! হায়, আমি যদি পয়দাই না হতাম, কিংবা এর আগেই মরে যেতাম এবং আমার অস্তিত্ব বিস্মৃত হয়ে যেতো। কিন্তু কিছু বন্ধুর দাবী, এ ঘটনা আমি যেন ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষণ করি, তবু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভেবে দেখলাম, না লেখার মধ্যেও কোন ফায়দা নেই! এ ছিলো এমন এক কেয়ামতি বিপদ ও দুর্যোগ যার নযির দুনিয়ার ইতিহাসে আর নেই। যদিও এর প্রধান শিকার ছিলো মুসলিম উম্মাহ তবু এর বিস্তার ছিলো অন্যান্য জাতি পর্যন্ত। কেউ যদি দাবী করে যে, আদম থেকে 'এইদম' এমন ঘটনা দুনিয়ায় আর ঘটেনি তাহলে তার দাবী মিথ্যা হবে না। কারণ এর ধারেকাছের ঘটনাও ইতিহাসের পাতায় নেই এবং সম্ভবত কেয়ামত পর্যন্ত দুনিয়া এমন ঘটনা আর দেখবে না, ইয়াজুজ-মাজুজের ঘটনা ছাড়া। নারী-পুরুষ ও শিশু-বৃদ্ধ, কারো প্রতি এই পশুরা কোন দয়া করেনি। যাকে পেয়েছে তাকেই খুন করেছে; পেট ফেড়ে গর্ভের সন্তান পর্যন্ত। (ইন্-না লিল্লাহি ওয়া ইন্-না ইলাইহি রাজি'ঊন, ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল 'আলিয়্যিল 'আযীম।)

এ ফিতনা ছিলো বিশ্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী, যা এক ভয়ঙ্কর তুফানের মত ধেয়ে এসেছিলো এবং সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিলো।'¹

৬৫৬ হিজরীতে তাতারীরা দারুল খিলাফাহ বাগদাদে বিজয়ীবেশে ঢুকেছিলো এবং তা গুঁড়িয়ে দিয়েছিলো। ঐতিহাসিক ইবনে কাছীর বাগদাদের বরবাদী ও তাতারীদের 'হালাকাতি' সম্পর্কে যে মর্মন্তুদ বিবরণ দিয়েছেন, তা বিশ্বাস করা করা সত্যি কঠিন। এজন্য নয় যে, শেষ পর্যন্ত তাতারীরা তো মানুষ ছিলো, তাদের পক্ষে এমন পাশবিক বর্বরতা কী করে সম্ভব হলো! তা নয়, বরং বিশ্বাস করা কঠিন এজন্য যে, মুসলিম উম্মাহর বড় বড় 'লকব বহনকারী' সুলতানরা কোথায় ছিলো? বাগদাদ কীভাবে তাতারীদের এমন সহজ লোকমায় পরিণত হলো! ইবনে কাছীর বলেন—
'বাগদাদে চল্লিশদিন পর্যন্ত গণহত্যা ও লুটতরাজ অব্যাহত ছিলো। চল্লিশদিন পর এই উদ্যান-নগর, যা পৃথিবীর সুন্দরতম ও সমৃদ্ধতম নগর ছিলো, এমন বরবাদ ও বিরান হলো যে, অল্প ক'জন মানুষই শুধু বেঁচে ছিলো। বাজারে ও অলিগলিতে গলিত লাশের স্তূপ ছিলো। সেই লাশের উপর বৃষ্টি হয়ে সারা শহরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো এবং শহরের পরিবেশ দুর্বিষহ হয়ে উঠলো। মহামারি এমন ছড়িয়ে পড়লো যে, সুদূর সিরিয়া পর্যন্ত তার প্রভাব দেখা গেলো। অসংখ্য মানুষ রোগ-ব্যাধিতে মারা গেলো। দুর্মূল্য, মহামারি ও বরবাদি-বাগদাদে যেন এই তিনেরই রাজত্ব ছিলো।'¹

তাতারীদের পরাজয়

ইরাক ও সিরিয়ার বরবাদির পর স্বাভাবিকভাবেই তাতারীদের রোখ ছিলো মিশর, যা তখন তাতারী-ধ্বংসযজ্ঞ থেকে নিরাপদ একমাত্র মুসলিম দেশ। মিশরের সাহসী শাসক সাইফুদ্দীন কুতুয বুঝতে পেরেছিলেন, এখন মিশরের পালা, আর তাতারীরা চড়াও হলে দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচানো কঠিন হবে। তাই তিনি ভাবলেন, মিশরে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করার চেয়ে বিজ্ঞতার পরিচয় হবে আগে বেড়ে তাতারীদের উপর হামলা করা। মউত যদি হয় তাকদীর, তাহলে হোক শাহাদাতের মউত এবং লড়াইয়ের ময়দানে।

যত সহজে বলা হলো, তখনকার পরিস্থিতিতে এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা তত সহজ ছিলো না। রীতিমত দুঃসাহসী, আর অন্যান্য 'বিচক্ষণ' মুসলিম শাসকের দৃষ্টিতে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছিলো। কিন্তু আল্লাহ যখন কাউকে কবুল করেন তখন এমনই হয়। বদরের সুন্নত অনুসরণ করে আল্লাহর বান্দা সাইফুদ্দীন কুতুয তার বাহিনী নিয়ে মিশর থেকে বের হলেন। সতেরই রামাযানের আটদিন পর ২৫শে রামাযান সিরিয়ার নিকটবর্তী আইনে জালুত নামক স্থানে তাতারীদের সঙ্গে ইসলামী বাহিনীর 'মুলাকাত' হলো। এবং.. এবং অতীতের সকল অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ বিপরীত তাতারীরা চরম পরাজয় বরণ করলো। আমাদের জানা নেই, আইনে জালুতে আসমান থেকে ফিরেশাতারা নেমেছিলেন কি না! তবে শুধু অস্ত্রবলে এ যুদ্ধ জয় করা যে সম্ভব ছিলো না, তাতে কারো দ্বিমত নেই। যুদ্ধ যখন শেষ হলো তখন দৃশ্যটা ছিলো এই, ময়দান ছেড়ে তাতারীরা পালায়, আর মুসলিম বাহিনী পিছু ধাওয়া করে তাদের কচুকাটা করে, কিংবা বেশুমার গ্রেফতার করে।

সুলতান সাইফুদ্দীন কুতুয শুরুটা করে দিয়েছিলেন। তারপর আলমালিকুয্যাহির বাইবার্স বেশ কয়েকবার তাতারীদের পরাজিত করেন এবং সমগ্র সিরিয়া অঞ্চল থেকে তাদের বিতাড়িত করেন। ফলে প্রচলিত সেই বিশ্বাস থেকে মানুষ মুক্তি পেলো যে, তাতারীরা অপরাজেয়, তাদের পরাজিত করা সম্ভব নয়। বাগদাদের খলিফা ঘর থেকে বের হতে চাননি, তাই যিল্লতির মউত ছিলো তার ভাগ্য, আর বরবাদি ছিলো বাগদাদের তাকদীর। মিশরের সুলতান জিহাদের ডাক দিয়ে তলোয়ার হাতে মিশর থেকে বের হয়েছিলেন, তাই তাকদীর তাকে এবং মিশরকে দিয়েছে ইয্যতের যিন্দেগি।

মুসলমানদের উপর বিজয়ী, ইসলামের কাছে পরাজিত

মিশর ও সিরিয়ায় শোচনীয় পরাজয়ের পরও তাতারীরা ইরাক থেকে শুরু করে ইরান ও তুর্কিস্তান পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের উপর দখল কায়েম রেখেছিলো। খোদ দারুল খিলাফাহ বাগদাদ ছিলো তাদের হাতে। অর্ধসভ্য মূর্তিপূজক একটি জাতির ইসলামী জাহানের জ্ঞান ও সভ্যতার কেন্দ্রস্থল দখল করে রাখা ছিলো যথার্থই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছিলো ইসলামী উম্মাহর সমগ্র জীবন, সভ্যতা ও চরিত্রের উপর। ইসলামী বিশ্বে তখন এমন কোন শক্তি ছিলো না যা বাগদাদ থেকে তাতারীদের উৎখাত করতে পারে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ইসলামের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির অলৌকিকতা প্রকাশ পেলো।

কতিপয় অজ্ঞাত, অখ্যাত ও নিবেদিতপ্রাণ মুবাল্লিগের দাওয়াতি মেহনতে এবং তাতারী দরবারের কতিপয় মুসলিম আমির-ওমরাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় তাতারী শাসকদের ইসলাম গ্রহণের ধারা শুরু হয়ে গেলো। এভাবে ইসলাম ঐ অপরাজেয় জাতির উপর বিজয় অর্জন করলো যারা একবার সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে জয় করেছিলো।

৬৯৪ সনের ঘটনা লিখতে গিয়ে ইবনে কাছীর বলেন—'এবছর চেঙ্গিজখানের প্রপৌত্র কাযান তাতারীদের সম্রাট মনোনীত হলেন এবং আমীর তুযান (রহ)-এর হাতে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করলেন। ফলে সমগ্র তাতারী জাতি, বা তাদের সিংহভাগ ইসলামের গণ্ডিতে প্রবেশ করলো। সেদিন লোকদের মধ্যে সোনাচাঁদি ও মণিমুক্তা ছিটানো হলো এবং সম্রাট নিজের নাম রাখলেন মাহমূদ। পরবর্তী শুক্রবার তিনি জুমু'আর জামা'আতে শরীক হলেন। বহু মূর্তিঘর তিনি ধ্বংস করলেন এবং মূর্তিপূজকদের উপর জিযিয়া আরোপ করলেন। বাগদাদ ও অন্যান্য শহরের লুণ্ঠিত মূল্যবান দ্রব্যাদি ফিরিয়ে দেয়া হলো এবং ন্যায় ও সুবিচার নিশ্চিত করা হলো। এরপর লোকেরা তাতারীদের হাতে তাসবীহ শোভা পেতে দেখলো এবং তারা আল্লাহ তা'আলার দয়া ও অনুগ্রহের শোকর আদায় করলো।'¹

মুসলিম জাহানে তাতারী হামলার প্রভাব

তাতারীদের হামলায় মুসলিম জাহান এমনই ধ্বস্ত-বিধ্বস্ত হয়েছিলো যে, আবার উঠে দাঁড়ানোর জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ছিলো। কারণ মুসলিম উম্মাহর সমর-শক্তি ও সৈন্যবল যেমন নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলো তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তানৈতিক শক্তি, উদ্যম ও চেতনা স্থবির হয়ে পড়েছিলো। এমন এক সর্বগ্রাসী হতাশা ও নৈরাশ্য ঘিরে ধরেছিলো যে, অতি বড় আশাবাদী ব্যক্তিও আশার কোন আলো দেখতে পাচ্ছিলো না। জ্ঞান, সাহিত্য ও কাব্যসাধনা এবং চিন্তা-গবেষণা ও গ্রন্থরচনা, এমনকি সামাজিক আচরণ এবং নীতি ও নৈতিকতা, এককথায় জীবনের সর্বক্ষেত্রে এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছিলো। সুতরাং জ্ঞান ও সাহিত্যের অঙ্গনে সংযোজন ও সৃজন এবং বিনির্মাণ ও উৎকর্ষসাধন তো দূরের কথা, আহলে ইলম ও চিন্তাশীল সমাজের তখন একমাত্র চিন্তা ছিলো ইলম ও ফিকাহ এবং জ্ঞান ও সাহিত্যের বর্তমান সম্পদকে কোন না কোনভাবে হিফাযত করা এবং ধ্বংস ও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা। কারণ এগুলো ছিলো তাদের হাতে মহান পূর্ববর্তীদের পবিত্র আমানত।

মানবজাতি ও মানবসভ্যতার চরম দুর্ভাগ্য এই যে, বিশ্বের নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ তখন চলে এসেছিলো এই মূর্খ, অসভ্য ও বর্বর জাতির হাতে, যাদের না ছিলো কোন আসমানী ধর্ম ও আসমানী কিতাব, না ছিলো কোন সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তি। সুতরাং তাদের নেতৃত্বে জ্ঞান, ধর্ম, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে উন্নতি ও অগ্রগতির কথা চিন্তা করাও ছিলো অবান্তর। তাতারীদের ইসলাম গ্রহণের পর যদিও মুসলিম উম্মাহ তাদের হিংস্রতা ও রক্তোন্মাদনা থেকে বেঁচে গিয়েছিলো এবং দ্বীনী আযাদী ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছিলো, এমনকি ইসলাম রাষ্ট্রীয় ধর্মের মর্যাদাও লাভ করেছিলো, কিন্তু নওমুসলিম তাতারীদের মধ্যে ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বদান এবং ইসলামী ইমামাতের গুরুদায়িত্ব বহনের নূন্যতম যোগ্যতাও ছিলো না। সেজন্য প্রয়োজন ছিলো সুদীর্ঘ সময়ের অব্যাহত চর্চা ও অনুশীলন। তখন প্রয়োজন ছিলো এমন এক তাজাদম ও সতেজ-সজীব জনগোষ্ঠীর, যাদের মধ্যে রয়েছে শৌর্যবীর্য ও জিহাদী চেতনা, যারা মুসলিম জাহানকে পতন ও অধঃপতনের গহ্বর থেকে তুলে আনতে পারে এবং তাদের নির্জীব দেহে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে, সর্বোপরি মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের গুরু দায়িত্ব পালন করতে পারে, সাহসের সঙ্গে, যোগ্যতার সঙ্গে।

টিকাঃ
১. اقرأ في هذا الموضوع سلسلى كتب العلامة المؤلف "رجال الفكر والدعوة في الإسلام"
২. লেন পোলকৃত saladin, তরজমা, মওলভী মুহম্মদ ইনায়াতুল্লাহ, সুলতান ছালাহুদ্দীন, পৃ. ২১
৩. encyclopaedia britannica, (9th edition) vol. 6, art. crusades
৪. তারীখুল কামিল, খ. ১১ পৃ. ১৬৪
৫. লেন পোলকৃত saladin, তরজমা, মওলভী মুহম্মদ ইনায়াতুল্লাহ, সুলতান ছালাহুদ্দীন, পৃ. ১৮৯
৬. তারীখে আবিল ফিদা
৭. লেন পোলকৃত saladin, তরজমা, মওলভী মুহম্মদ ইনায়াতুল্লাহ, সুলতান ছালাহুদ্দীন, পৃ. ২০৫
৮. ইবনুল আছীর-রচিত আল-কামিল, খ. ১৩ পৃ. ২০২-২০৩
৯. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া
১০. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ১৩ পৃ. ৩৪০

📘 মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো 📄 তৃতীয় পরিচ্ছেদ: আলমে ইসলামে উছমানী খেলাফতের উত্থান

📄 তৃতীয় পরিচ্ছেদ: আলমে ইসলামে উছমানী খেলাফতের উত্থান


ইতিহাসের মঞ্চে তুর্কী শক্তির আগমন

অষ্টম শতাব্দীর ঐ সঙ্কট-সন্ধিক্ষণে ইতিহাসের মঞ্চে একটি অপ্রতিহত শক্তিরূপে ওছমানিদের আবির্ভাব ঘটলো এবং তারা ইতিহাসের গতিধারার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলো। সাতশ তেপ্পান্ন হিজরীতে (১৪৫৩ খৃঃ) খলীফা মুহম্মদ ছানী বিশাল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অপরাজেয় রাজধানী কনস্টান্টিনোপল পদানত করলেন। তখন তিনি 'সতের বছরের তরুণ' না হলেও মাত্র চব্বিশ বছরের টগবগে যুবক। কনস্টান্টিনোপল জয়ের মাধ্যমেই তিনি মুহম্মদ আলফাতিহ বা বিজয়ী মুহম্মদ উপাধিতে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

এই অভাবিতপূর্ব বিজয়ের ফলে মুসলিম উম্মাহর নির্জীব দেহে নতুন করে আশা-উদ্দীপনা ও প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো। ইসলামও যেন নতুন গতি ও শক্তি লাভ করলো। মুসলিম উম্মাহর অন্তরে আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হলো যে, ওছমানী খেলাফতের নেতৃত্বে তুর্কী জাতি বিশ্বের বুকে মুসলিম উম্মাহর হারানো শক্তি ও গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবে, আর মুসলিম উম্মাহ বিশ্বনেতৃত্বের আসনে পুনঃসমাসীম হবে। সাহসে ও শৌর্যবীর্যে তুর্কীরা যেমন ছিলো অতুলনীয় তেমনি যুদ্ধাস্ত্র ও সমরকুশলতায় তাদের উদ্ভাবনী প্রতিভা ছিলো ঈর্ষণীয়। বস্তুত বাইজান্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপল, যা সুদীর্ঘ আটশ বছর মুসলিমশক্তির সামনে ছিলো অপরাজেয়,¹ তুর্কীরা তা পদানত করে তাদের যোগ্যতা ও শক্তিমত্তার বাস্তব প্রমাণও রেখেছিলো। সমর-নেতৃত্ব ও যুদ্ধপরিচালনায় তাদের কুশলতা ও সৃজনশীলতা দূরের কাছের সবাই দেখতে পেয়েছিলো। ফলে সমকালীন বিশ্ব সর্বক্ষেত্রে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছিলো। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের পথে জ্ঞান ও কর্মশক্তিকে তারা সর্বোচ্চরূপেই ব্যবহার করেছিলো, যা বিশ্বে কোন জাতির শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের অপরিহার্য শর্ত।

সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ড্রপার মুহম্মদ আলফাতিহ-এর সমরকুশলতাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেছেন, 'গণিতশাস্ত্র (ও অন্যান্য জ্ঞানে) তিনি পারদর্শী ছিলেন এবং যুদ্ধবিদ্যায় সেগুলোর সুপ্রয়োগ জানতেন। বস্তুত এ বিজয়ের জন্য তাঁর পূর্ণ প্রস্তুতি ছিলো এবং যুদ্ধের সকল আধুনিক সরঞ্জাম তিনি পূর্ণ কুশলতার সঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন।'

জনৈক পর্যটক কনস্টান্টিনোপলজয়ের কাছাকাছি সময়ে মুহম্মদ আলফাতিহ-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তিনি তাঁর দেহাবয়ব, মহামানবোচিত চরিত্র এবং তাঁর বিস্তৃত জ্ঞান ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আলোচনার পর বলেন—
'মাত্র ছাব্বিশ বছরের যুবক',¹ কিন্তু ইটালী, তার রাজধানী এবং সম্রাট সম্পর্কে তাঁর আলোচনা অত্যন্ত বাস্তবানুগ ও নিখুঁত তথ্যভিত্তিক! ইউরোপে কত শত দেশ! অথচ তাঁর সামনে রয়েছে সেগুলোর বিস্তারিত মানচিত্র, প্রতিটি দেশ-অঞ্চল তাতে সুস্পষ্ট। বিশ্বপরিস্থিতি ও যুদ্ধশাস্ত্রের মত প্রিয় ও আনন্দদায়ক আর কোন আলোচনার বিষয় তাঁর কাছে নেই। বিষয় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে খুবই বিচক্ষণ ও সুবিজ্ঞ। শাসনকার্যে একনিষ্ঠ ও টগবগে। দেখো, ইনি সেই ব্যক্তি, যার মোকাবেলা করতে হবে আমাদের খৃস্টান-বিশ্বকে! অত্যন্ত সতর্ক, অত্যন্ত তীক্ষ্ণ তাঁর পর্যবেক্ষণ। শীত-গরম, ক্ষুধা-পিপাসা ও সর্বপ্রকার কষ্ট সহ্য করতে সক্ষম। তাঁর ভাষায়, সময় এখন গতি পরিবর্তন করেছে; তাই তিনি পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাত্রা করছেন, অতীতে যেমন পশ্চিমারা পূর্বদিকে যাত্রা করেছিলো। তিনি বলেন, বিশ্বের সাম্রাজ্য একটিমাত্র হওয়া উচিত; একটিমাত্র ধর্ম এবং একটিমাত্র দেশ। আর এই ঐক্য সম্পন্ন করার জন্য পৃথিবীতে কনস্টান্টি-নোপলের চেয়ে উপযুক্ত স্থান আর কোনটি নেই।

পশ্চিমা লেখক baron carra de vaux তার সুবিখ্যাত islamic thinkers গ্রন্থে বলেন, ‘মুহম্মদ আলফাতিহ-এর এ বিজয় নিছক ভাগ্যের উপহার ছিলো না, কিংবা ছিলো না শুধু প্রতিপক্ষ শক্তির দুর্বলতার ফল, বরং এজন্য দীর্ঘকাল তিনি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন এবং সমকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সব শক্তি ব্যবহার করেছেন।¹ কামান ছিলো তখন সদ্য-উদ্ভাবিত যুদ্ধাস্ত্র। আর তিনি জনৈক হাঙ্গেরীয় প্রকৌশলীর সাহায্যে বিশ্বের সর্ববৃহৎ কামান তৈরী করেছিলেন, যাতে তিনশ কিলোগ্রাম ওজনের গোলা এক মাইলের বেশী দূরে নিক্ষেপ করা যেতো। বলা হয়, ঐ কামান চালাতো সাতশ লোক, আর তা বাবুদবোঝাই হতো দু'ঘণ্টায়।

কনস্টান্টিনোপল অভিযানকালে মুহম্মদ আলফাতিহ-এর অধীনে ছিলো তিন লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী এবং অতি শক্তিশালী কামানবহর। আর সমুদ্রের দিক থেকে শহর অবরোধকারী নৌ-বহরে যুদ্ধজাহায ছিলো একশ বিশটি। তিনিই সেই মহান সমরকুশলী যিনি আপন উদ্ভাবনী প্রতিভাবলে স্থলপথে নৌজাহায চালিয়ে উপসাগরে নামানোর পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছিলেন, শত্রু-পক্ষের কাছে যা ছিলো অকল্পনীয়। বহুকাষ্ঠখণ্ড চর্বিত করে তার উপর দিয়ে সত্তরটি জাহায টেনে নিয়ে তিনি 'কাসিমপাশা'র সাগরজলে নামিয়েছিলেন। পরিখাযুদ্ধে কোরায়শ বাহিনী যেমন মদীনার তিনদিকের পরিখা দেখে হতবাক হয়েছিলো, প্রায় তেমনি হতবাক হয়েছিলো বাইজান্টাইন বাহিনী কাসিম-পাশার সাগরজলে তুর্কীদের নৌবহর দেখে! হাঁ, এই অভাবিতপূর্ব সমরকৌশলের কোন জবাব তাদের কাছে ছিলো না, শুধু দেখে থাকা ছাড়া।

তুর্কী জাতির কতিপয় গুণ ও বৈশিষ্ট্য

সমগ্র মুসলিম উম্মাহর মধ্যে তুর্কী জনগোষ্ঠী তখন এমন কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলো, যাতে সঙ্গত কারণেই তারা হয়ে উঠেছিলো মুসলিমবিশ্বের নেতৃত্ব লাভের যোগ্য হকদার।

প্রথমত তারা ছিলো উদীয়মান, উচ্চাভিলাষী ও প্রাণচাঞ্চল্যে পরিপূর্ণ একটি জাতি। তাদের মধ্যে ছিলো সত্যিকার জিহাদী চেতনা। তাছাড়া জীবনযাপনের ক্ষেত্রে স্বভাব ও প্রকৃতির নিকটবর্তী হওয়ার কারণে তারা ঐ সমস্ত নৈতিক ও সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্ত ছিলো, যাতে প্রাচ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীগুলো ছিলো আক্রান্ত।

দ্বিতীয়ত তাদের সামরিক শক্তি ছিলো এমন পর্যাপ্ত যার সাহায্যে তারা ইসলামের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক বিস্তার ঘটাতে এবং যে কোন শত্রুর আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে সক্ষম ছিলো। এককথায় মুসলিম উম্মাহর পক্ষ হতে সমগ্র বিশ্বের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য তারা ছিলো যোগ্যতম এক জনগোষ্ঠী। সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ওছমানীরা আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র, বিশেষত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার প্রতি মনোযোগী ছিলো। তাদের কামানগুলো ছিলো অধিকতর দূরপাল্লার। আর অস্ত্রাগারে ছিলো সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। সামরিক প্রশিক্ষণ, যুদ্ধকৌশল উদ্ভাবন, সেনা-বাহিনীর আধুনিক বিন্যাস ইত্যাদি সকল বিষয়ে তারা পূর্ণ যত্নবান ছিলো। ফলে যুদ্ধবিদ্যা ও সমরবিজ্ঞানে তারাই ছিলো শ্রেষ্ঠ এবং ইউরোপের আদর্শ। তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করার সাধ্য ছিলো না কারো।

তাদের সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিলো ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা—এই তিন মহাদেশে। ইসলামী প্রাচ্যের পারস্য থেকে মরক্কো পর্যন্ত ছিলো তাদের শাসন এবং এশিয়া মাইনর ছিলো তাদের অধিকারে। অন্যদিকে ইউরোপে তাদের অগ্রাভিযান ভিয়েনার প্রাচীরে আঘাত হেনেছিলো। সমগ্র ভূমধ্যসাগরে তারাই ছিলো অপ্রতিদ্বন্দ্বী নৌশক্তি; অন্য কোন নৌশক্তির সেখানে প্রবেশাধিকার ছিলো না। তুর্কী খলীফার দরবার 'আলবাবুল আলী'তে নিযুক্ত পিটার দ্যা গ্রেট-এর প্রতিনিধি এক পত্রে বলেন, 'সুলতান কৃষ্ণসাগরকে মনে করেন তার নিজস্ব অধিকার, যেখানে নেই অন্য কারো প্রবেশাধিকার।'

তাদের নৌবহর ছিলো এত বিশাল, যা ইউরোপের সম্মিলিত শক্তির কাছেও ছিলো না। ৯৪৫ (১৫৪৭ খৃঃ) হিজরীতে পোপের আহ্বানে ভেনিস, স্পেন, পুর্তগাল ও মাল্টার সম্মিলিত নৌশক্তি তুর্কী নৌবহরকে পরাস্ত করার অপপ্রয়াস চালিয়ে উল্টো পর্যদুস্ত হয়েছিলো। তুর্কী নৌসেনাদের নিক্ষিপ্ত গোলার আঘাতে শত্রুপক্ষের অধিকাংশ জাহাজ সাগরে ডুবে গিয়েছিলো, আর বহু সৈন্য 'সাগর-সমাধি' লাভ করেছিলো।

খলীফা সোলায়মান আলকানূনী-এর শাসনকালে তুর্কিদের যেমন জলভাগ ও স্থল-ভাগে ছিলো নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব, তেমনি ছিলো অখণ্ড রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব-প্রতিপত্তি। ওছমানী সালতানাত তখন উত্তরে সাভা নদী, দক্ষিণে নীলনদের উৎসমুখ ও ভারতসাগর, পূর্বে ককেসাস পর্বতশ্রেণী এবং পশ্চিমে আটলাস পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। তুর্কী নৌবহরে জঙ্গিজাহাযের সংখ্যা ছিলো তিন হাজারের বেশী। একমাত্র রোম ছাড়া প্রাচীন বিশ্বের সমস্ত প্রসিদ্ধ শহর ছিলো 'আলবাবুল আলী'র অধীন।¹

তুর্কিদের ভয়ে সমগ্র ইউরোপ এমনই কম্পমান ছিলো যে, বড় বড় প্রতাপশালী শাসক তুর্কী সুলতানের ছত্রচ্ছায়ায় থাকাই নিরাপদ মনে করতো। তুর্কী সুলতানদের সম্মানে এমনকি গীর্জার ঘণ্টাধ্বনিও বন্ধ রাখা হতো। মুহম্মদ আলফাতিহ-এর মৃত্যুসংবাদে পোপ তিনদিনব্যাপী জাতীয় আনন্দ ঘোষণা করেছিলেন এবং ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা নিবেদনের জন্য প্রার্থনা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছিলেন। শত্রুপক্ষের সম্রাটের মৃত্যুতে ধর্মীয় পর্যায়ে আনন্দ-অনুষ্ঠানের আয়োজন, সম্ভবত এটা ছিলো ইতিহাসের একমাত্র ঘটনা। এতেই বোঝা যায়, কী পরিমাণ তুর্কীভীতি কাজ করছিলো সমগ্র ইউরোপে এবং স্বয়ং পোপের 'অন্তর-গীর্জায়'।

তৃতীয়ত ভৌগলিক ও কৌশলগত বিচারে তাদের অবস্থান ছিলো তদানীন্তন বিশ্বমানচিত্রের সবচে' গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে, যা বিশ্বকে শাসন করার জন্য ছিলো অতি উপযোগী। কেননা তাতে বলকান উপসাগর থেকে যুগপৎ এশিয়া ও ইউরোপের উপর নজরদারি করা সম্ভব ছিলো। তাদের রাজধানী ইস্তাম্বুল (কনস্টান্টিনোপল) ছিলো ইউরোপ ও এশিয়ার সঙ্গমস্থলে, যেখান থেকে একই সঙ্গে তারা তিন মহাদেশের উপর সহজে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারতো। তাই নেপোলিয়ান বলেছেন, 'কনস্টান্টিনোপলই হচ্ছে কল্পিত 'বিশ্বসাম্রাজ্যের' আদর্শ রাজধানী।' if a world-government ever came to be established, constantinople alone would be an ideal capital for it.²

ইউরোপে তুর্কিদের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলো, আর নিকট ভবিষ্যতে ইউরোপ হতে যাচ্ছিলো 'নবসম্ভাবনা'র অধিকারী। ইউরোপের বুকে তখন নতুন জীবনীশক্তি টগবগ করছিলো এবং উন্নতি-অগ্রগতির যাবতীয় উপকরণ ও কার্যকারণ বিকাশ লাভ করছিলো। তাকদীর যদি চাইতো তাহলে তুর্কিদের জন্য সহজেই সম্ভব ছিলো জ্ঞান, বিজ্ঞান, চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গনে অগ্রসর হওয়া এবং খৃস্টীয় ইউরোপকে ছাড়িয়ে যাওয়া। এমনকি সম্ভব ছিলো বিশ্বনেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা এবং বিশ্বকে ইউরোপীয় ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে রক্ষা করে ন্যায় ও সত্যের পথে পরিচালিত করা, যার বার্তা তারা ইসলামের কল্যাণে আগেই লাভ করেছে।

উত্থানের মধ্যকালেই তুর্কীজাতির পতন

কনস্টান্টিনোপল জয়ের মাধ্যমে মহান বিজেতা মুহম্মদ আলফাতিহ ইতিহাসের গতিধারা তো ঠিক করে দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর উত্তরসূরীদের অযোগ্যতা ও অবহেলায় ইতিহাসের গতি আবার চলে গিয়েছিলো অন্যদিকে। এটা শুধু তুর্কীজাতিরই দুর্ভাগ্য ছিলো না, বরং গোটা মুসলিম উম্মাহর দুর্ভাগ্য ছিলো যে, উত্থান ও উন্নতির মধ্যকালেই তুর্কীরা অধঃপতনের শিকার হলো এবং পূর্ববর্তী জাতিসমূহের রোগ-ব্যাধি তাদেরও মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো। পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ও বিবাদ-কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। শাসকদের মধ্যে দেখা দিলো দ্বন্দ্ব ও অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং স্বেচ্ছাচার ও ভোগের অনাচার। যুবরাজদের শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়লো। চরিত্র ও নৈতিকতায় মারাত্মক অবক্ষয় দেখা দিলো। শাসক, সেনানায়ক ও রাজকর্মচারী, সবার মধ্যে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়লো। দেশ ও জাতি এবং রাজ্য ও সাম্রাজ্যের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতাই হলো তাদের নীতি। এমনকি রাজপুরুষদের অনুগমনে গোটা জাতি বিলাসিতাও ভোগবাদিতার মানসিকতায় আক্রান্ত হলো। এভাবে একটি পতনশীল যাবতীয় দোষ-ব্যাধি ও স্বভাবনষ্টতা তুর্কিদের মধ্যেও দেখা দিলো, যার বিশদ বিবরণ রয়েছে 'তুর্কীজাতির ইতিহাস'গ্রন্থে।¹ এখানে সে আলোচনার অবকাশ নেই।

সবচে' ভয়ঙ্কর যে ব্যাধি তুর্কীজাতির গভীরে শিকড় গেড়ে বসেছিলো তা হলো নির্জীবতা ও স্থবিরতা। এটা যেমন ছিলো জ্ঞান ও শিক্ষার ক্ষেত্রে তেমনি ছিলো যুদ্ধবিদ্যা, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের ক্ষেত্রেও। তারা যেন ভুলেই গিয়েছিলো আসমানের এই অমোঘ নির্দেশ—
وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ وَمِن رَبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوٌّ اللَّهِ وَعَدُوِّكُمْ وَمَاخَرِينَ مِن دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ وَمَا تُنفِقُوا مِن شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنتُمْ لَا تُظْلَمُونَ
'আর তোমরা প্রস্তুত করো তাদের মুকাবেলার জন্য তোমাদের সাধ্যের সকল শক্তি এবং অশ্বদল। তা দ্বারা ভীত-সন্ত্রস্ত করবে তোমরা আল্লাহর শত্রুকে এবং তোমাদের শত্রুকে এবং তাদেরকে ছাড়া আরো কিছু লোককে, যাদের তোমরা চেনো না, আল্লাহ তাদের চেনেন। আর আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদের প্রস্তুতিতে) যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে তার প্রতিদান তোমাদের পূর্ণরূপে দান করা হবে, আর তোমাদের প্রতি কোন অবিচার করা হবে না।' (আনফাল, ৮: ৬০)

এবং ভুলে গিয়েছিলো নবুওয়তের সেই চিরন্তন বাণী—
الحكمة ضالة المؤمن حيث وجدها فهو أحق بها
'জ্ঞান ও প্রজ্ঞা মুমিনের হারানো সম্পদ, যেখানেই সে তা পাবে, সেই হবে তার অধিক হকদার।'¹

আর যেহেতু তাদের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থান ছিলো খুবই নাযুক এবং ইউরোপীয় রাষ্ট্রবর্গ দ্বারা পরিবেষ্টিত সেহেতু সবসময় তাদের স্মরণ রাখা কর্তব্য ছিলো মিশরবিজয়ী ছাহাবী হযরত আমর ইবনুল আছ (রা)-এর সেই শাশ্বত উপদেশ, যা তিনি মিশরে মুসলিম গাজীদর উদ্দেশ্যে প্রদান করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন—
واعلموا أنكم في رباط إلى يوم القيامة لكثرة الأعداء خولكم، وتشوف قلوبهم إليكم وإلى داركم
'মনে রেখো, কেয়ামত পর্যন্ত তোমরা বিপদ ও ঝুঁকির মুখে রয়েছো। তোমাদের অবস্থান হচ্ছে নাযুক এক মোর্চায় সতর্ক প্রহরার অবস্থায়। তোমাদের থাকতে হবে সদাসশস্ত্র। কেননা চারপাশে তোমাদের বিপুল শত্রু, আর তাদের লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে তোমাদের উপর এবং তোমাদের ভূখণ্ডের উপর।'²

কিন্তু আফসোস, তুর্কীজাতি বসে থাকলো, আর সময় এগিয়ে গেলো। তারা পিছিয়ে পড়লো, আর ইউরোপ তাদের ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেলো। তুরস্কের বিদুষী লেখিকা খালিদা এদীব খানম তার জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার যে চিত্র এঁকেছেন এখানে তা তুলে ধরা বেশ উপযুক্ত ও যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। 'তুরস্কে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্ঘাত' গ্রন্থে তিনি বলেন—
'জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির জগতে যত দিন কালামশাস্ত্রীয় দর্শনের কর্তৃত্ব ছিলো তত দিন ওলামা ও জ্ঞানী সমাজ তুরস্কে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সুচারুরূপেই পালন করেছেন। সোলায়মানিয়া মাদরাসা ও মাদরাসাতুল ফাতিহ ছিলো সমকালীন যাবতীয় জ্ঞান ও শাস্ত্রের কেন্দ্র। কিন্তু পাশ্চাত্য যখন ঈশ্বরতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্বের বৃত্ত ভেঙ্গে বের হয়ে এলো এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও নতুন দর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করলো, যার ফলে বিশ্বে এক নতুন বিপ্লব সৃষ্টি হলো তখন মুসলিম ওলামা ও জ্ঞানীসমাজ আধুনিক শিক্ষার দায়িত্ব ও আদর্শ শিক্ষকের কর্তব্যপালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেন। তারা ভাবতেন, জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তি এখনো সেখানেই নিশ্চল আছে যেখানে ছিলো খৃস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে। এই মারাত্মক ভ্রান্তিকর চিন্তা খৃস্টীয় উনিশ শতক পর্যন্ত তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করে ছিলো।

তুরস্ক ও অন্যান্য মুসলিম দেশের বিদ্বানসমাজের এ চিন্তাধারার সঙ্গে ইসলাম ও ইসলামী চেতনার কোন সম্পর্ক ছিলো না। কারণ খৃস্টীয় ঈশ্বরতত্ত্ব বা মুসলিম ইলমুল কালাম, মূলত এর ভিত্তি ছিলো গ্রীক দর্শনের উপর, যাতে এরিস্টটলীয় দর্শনেরই ছাপ ছিলো প্রধান, আর এরিস্টটল ছিলেন পৌত্তলিক দার্শনিক। এখানে সংক্ষেপে আমরা খৃস্টান পণ্ডিত ও মুসলিম ওলামা সমাজের চিন্তাধারার একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা তুলে ধরবো।

কোরআনুল কারীম কখনো প্রকৃতি ও বিশ্বজগতের সৃষ্টিপ্রসঙ্গ বিশদ আলোচনায় আনেনি। কারণ কোরআনী শিক্ষার আসল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নৈতিক ও সামাজিক জীবন। কোরআনের মূল উদ্দেশ্যই হলো ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় এবং কল্যাণ-অকল্যাণের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দেয়া। কারণ কোরআন এসেছে মানুষের জন্য একটি জীবনবিধানরূপে, নিছক জ্ঞান ও শাস্ত্রগ্রন্থরূপে নয়। তাই কোরআন যখনই কোন আধ্যাত্মিক বা অতিপ্রাকৃতিক বিষয় আলোচনা করেছে সেখানে বলতে গেলে কোন জটিলতা বা অস্পষ্টতাই আমাদের চোখে পড়ে না। কোরআনী শিক্ষার ভিত্তিই হলো তাওহীদ বা একত্ববাদ। তাই (বিশ্বাসগত দিক থেকেও) ইসলাম একটি সহজ-সরল, নির্জটিল ও উদার ধর্মরূপে পরিচিত হয়েছে।

বিশ্বজগত সম্পর্কে নতুন নতুন চিন্তাধারা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ইসলাম অন্যান্য ধর্মের চেয়ে অনেক উদার ছিলো। কিন্তু এই সরলতা ও উদারতা, যা নতুন জ্ঞান-গবেষণার জন্য সহায়ক হতে পারতো মুসলিমদের জীবনে তা দীর্ঘ সময় বহাল ছিলো না। হিজরী নবম শতকে মুসলিম ওলামা ও কালামবিদগণ ফিকাহ তো বটেই, এমনকি ঈশ্বরতত্ত্বীয় আলোচনাকেও বিচিত্র নিয়ম-নীতি ও বিধি-বন্ধনের বেড়াজালে আবদ্ধ করে ফেলেছিলেন। ফলে ইজতিহাদ ও গবেষণার দুয়ার বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। আর ঐ সময়কালেই ইসলামী দর্শনের গভীরে এরিস্টেটলীয় ধ্যান-ধারণার অনুপ্রবেশ ঘটেছিলো।

ব্যাপারটা সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা ছিলো ঈসায়ী ধর্মের, যাকে সেন্ট পল-এর ধর্ম বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। সেখানে ধর্মগ্রন্থের সৃষ্টিপর্বে বিশ্বসৃষ্টি সম্পর্কে বিশদ বিবরণ রয়েছে। খৃস্টানদের কাছে যেহেতু এটা ছিলো আল্লাহর কালাম সেহেতু তাদের বিশ্বাসগত অপরিহার্য কর্তব্য ছিলো তার সত্যতা সাব্যস্ত করা। কিন্তু বাস্তব পর্যবেক্ষণ যেহেতু তাদের ব্যাখ্যা-বক্তব্যের সমর্থনে ছিলো না সেহেতু তারা তাত্ত্বিক প্রমাণের আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলো। আর এক্ষেত্রে তারা এরিস্টেটলের আঁচল ধরেছিলো এজন্য যে, তার দর্শনে তখন ছিলো আশ্চর্যরকম জাদুশক্তি।

এর মধ্যে পাশ্চাত্যজগত যখন মুক্তমনে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণ ও নিরীক্ষণের মাধ্যমে বিশ্বজগতের নতুন অধ্যয়ন শুরু করলো এবং বাস্তব প্রমাণের ভিত্তিতে জ্ঞানের নতুন নতুন তত্ত্ব ও সত্য আবিষ্কৃত হতে লাগলো তখন গীর্জার ভিত কেঁপে উঠলো। ধর্মনেতা ও ধর্মপণ্ডিতগণ বিচলিত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন যে, গীর্জার প্রভাব-প্রতিপত্তির বুঝি 'ঘণ্টা বেজে গেলো'। এভাবে শুরু হয়ে গেলো বিজ্ঞান ও ধর্মের ভয়াবহ সঙ্ঘাত। বহু বিজ্ঞানী, যারা জ্ঞান-গবেষণা ও বিজ্ঞান-সাধনায় নিবেদিত ছিলেন, তাদের হতে হলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি বিশ্বস্ততার বলি। কিন্তু বহু রক্ত ঝরিয়ে শেষ পর্যন্ত গীর্জার কর্ণধারগণ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে বাধ্য হলেন এবং গীর্জার বিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যসূচীতে বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করলেন। ফলে তাদের বিদ্যালয়গুলো, যা নিকট অতীতেও মুসলিম বিদ্যালয়গুলোর প্রতিবিম্ব ছিলো, হঠাৎ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হলো (এবং সমাজে গ্রহণযোগ্যতাও অর্জন করলো) তবে তারা তারা তাদের ঈশ্বরতত্ত্ব ও ধর্মদর্শন ত্যাগ করেনি। ফল এই দাঁড়ালো যে, আধুনিক সমাজের অন্তত কিছু অংশের উপর গীর্জার প্রভাব আগের মতই রয়ে গেলো। ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান্ট পাদ্রিগণ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানেও পারদর্শী হলেন এবং সর্ববিষয়ে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কথা বলার যোগ্যতা অর্জন করলেন।

পক্ষান্তরে তুরস্কে মুসলিম ওলামা-সমাজের অবস্থা ছিলো সম্পূর্ণ বিপরীত। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে তারা মনোযোগী হবেন কি, বরং তাদের এলাকায় নতুন চিন্তার প্রবেশও নিষিদ্ধ করে দিলেন। আর যেহেতু মুসলিম উম্মাহর শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ ছিলো তাদেরই হাতে সেহেতু একই স্থবিরতা শিক্ষাব্যবস্থায়ও চেপে বসলো। তদুপরি অবক্ষয়যুগে বিভিন্ন কারণে আলিমদের রাজনৈতিক তৎপরতা ছিলো দ্রুত বর্ধমান। (আর রাজনীতি ও জ্ঞানচর্চা একই মস্তিষ্ক খুব কমই ধারণ করতে পারে।) তাই গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার গুরুভার বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভবও ছিলো না। এজন্য সহজ নোসখা হিসাবে বাধ্য হয়েই তারা এরিস্টেটলের দর্শন আঁকড়ে ধরলেন এবং তাত্ত্বিক প্রমাণকেই জ্ঞানের ভিত্তিরূপে বহাল রাখলেন। ফলে তের শতকে মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থার যে হাল ছিলো, উনিশ শতকে এসেও তা বহাল ছিলো।'¹

মুসলিমবিশ্বব্যাপী স্থবিরতা

জ্ঞান ও চিন্তার এ স্থবিরতা ও বন্ধ্যাত্ব শুধু তুরস্কে এবং ধর্মীয় শিক্ষার মহলেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, বরং পূর্ব থেকে পশ্চিম গোটা মুসলিমবিশ্বই এর শিকার ছিলো। মস্তিষ্ক যেন নিশ্চল, চিন্তা যেন নির্জীব এবং শরীর যেন অবশ। অষ্টম শতকের কথা নাও যদি বলি, কোন সন্দেহ নেই যে, নবম শতকই ছিলো শেষ যুগ, যেখানে দ্বীন ও ইলম এবং জ্ঞান ও চিন্তার ক্ষেত্রে ইজতিহাদ ও গবেষণার এবং কবিতা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার কিছু না কিছু স্বাক্ষর ছিলো। এ শতকেই ইবনে খালদূনের আলমুকাদ্দিমার মত চিন্তাসমৃদ্ধ গ্রন্থ মুসলিম বিশ্বের গ্রন্থাগারে সংযোজিত হয়েছে। পক্ষান্তরে দশম শতাব্দী ছিলো নিশ্চলতা, স্থবিরতা ও অনুকরণের সূচনাযুগ। এবং এটা যেমন ছিলো ধর্মীয় জ্ঞানের সকল শাখার চিত্র, তেমনি ছিলো জ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও শিক্ষাব্যবস্থার ছবি।

তখনকার জ্ঞান-গবেষণার ইতিহাস দেখুন, এমন একটি নামও খুঁজে পাবেন না যাকে বলা যায় 'প্রতিভা', কিংবা অন্তত 'মনীষা', যিনি জ্ঞান ও শাস্ত্রের কোন শাখায় সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন এবং প্রশংসা করার মত নতুন কোন মাত্রা যোগ করেছেন। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শুধু কয়েকটি নাম, যারা তাদের যুগের চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির স্তর থেকে অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন, যারা দ্বীনী ও ইলমী পরিমণ্ডলে কোন 'কারনামা' বা বুদ্ধিবৃত্তিক কীর্তি উপহার দিয়েছেন। সৌভাগ্যক্রমে প্রায় সব ব্যতিক্রমই ছিলো ভারতবর্ষে। যেমন শায়খ আহমদ সারহিন্দী মুজাদ্দিদে আলফে ছানী (রহ, মৃঃ ১০৩৪ হিঃ), যার 'মাকতুবাত' দ্বীনী ও ইলমী খাজানায় একটি মূল্যবান সংযোজন বলে সর্বস্বীকৃত।

এবং শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী (রহ, মৃ. ১১৭৬ হি.), যার গ্রন্থত্রয় হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ইযালাতুল খাফা ও রিসালাতুল ইনছাফ হচ্ছে স্ব-স্ব বিষয়ে সত্যি অনন্য কীর্তি!

তদ্রূপ শাহ ছাহেবের সুযোগ্য পুত্র শাহ রফীউদ্দীন দেহলবী (রহ, মৃ. ১২৩৩ হি.), যিনি 'তাকমীলুল আযহান' ও 'রিসালাতুল মাহাব্বাহ' কিতাবে কিছু নতুন ও চমকপ্রদ চিন্তা উপস্থাপন করেছেন।

তদ্রূপ শাহ ইসমাঈল শহীদ দেহলবী (রহ, শাহাদাত, ১২৪৬ হি.) যার 'মানছিবে ইমামত ও আকাবাত' গ্রন্থদু'টি বিস্ময়কর ইজতিহাদি শানের অধিকারী এবং স্ব-স্ব বিষয়ে অতুলনীয়।

একই ভাবে বলা যায় ওলামায়ে ফিরিঙ্গি মহল-এর কথা এবং পূর্বাঞ্চলের কতিপয় শিক্ষাঙ্গন ও চিন্তাকেন্দ্রের কথা। মেধায়, মননে ও সৃজনশীলতায় তারা অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিলেন এবং আপন আপন সময়কালের শিক্ষাধারায় সুগভীর প্রভাব বিস্তার করেছেন; তবে তাদের মেধা ও প্রতিভা এবং চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির কীর্তি-কর্ম পাঠ্যবিষয়ের গণ্ডি খুব কমই অতিক্রম করেছে।

শুধু দ্বীনী ইলমের কথা বলি কেন, কবিতা ও সাহিত্যের অঙ্গনও ছিলো একই রকম বন্ধ্যাত্বের শিকার। কাব্যকর্ম পরিমাণে প্রচুর হলেও তাতে জীবন ও সজীবতার ছাপ ছিলো না, ছিলো শুধু প্রথামনস্কতা, স্থূলতা ও অনুকরণ-সর্বস্বতা। সাধারণভাবে কবিতার বিষয়বস্তু ছিলো রাজতোষামোদ, সস্তা চাটুকারিতা ও আত্মপ্রশস্তি। গদ্যসাহিত্যও ছিলো আড়ম্বর, কৃত্রিমতা, ছান্দিকতা ও অন্তসারশূন্য শব্দজৌলুসে আকীর্ণ। এমনকি ইতিহাসগ্রন্থ, দাপ্তরিক লেখা, প্রশাসনিক ফরমান এবং বন্ধুমহলীয় পত্রাবলীও এ দোষ থেকে মুক্ত ছিলো না। বিচ্ছিন্ন দু'একটি সাহিত্যকর্মে অবশ্য এমন কিছু নমুনা পাওয়া যায়, যা তখনকার সাধারণ রুচি ও প্রবণতা থেকে কিছুটা উপরে এবং পতিত স্তর থেকে কিছুটা উর্ধ্বে।

মাদরাসা ও শিক্ষাকেন্দ্রগুলোও চরম স্থবিরতা, নির্জীবতা ও বন্ধ্যাত্বের শিকার হয়ে পড়েছিলো। সেখানেও ছিলো জ্ঞানদৈন্য ও চিন্তানৈতিক অবক্ষয়ের ছাপ। পূর্ববর্তিদের সমৃদ্ধ গ্রন্থাবলী, যা জ্ঞান, শিক্ষা ও রুচিপ্রদ ছিলো, সেগুলোকে ক্রমান্বয়ে পাঠ্যসূচী থেকে সরিয়ে পরবর্তিদের রচনাবলীর অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছিলো, নিজ নিজ বিষয়ে যাদের ইজতিহাদি যোগ্যতা ছিলো না। তারা শুধু পূর্ববর্তিদের ব্যাখ্যাকারী ও ভাষ্যকার ছিলেন। সমগ্র পাঠ্যসূচী ব্যাখ্যা, টীকা, সারসঙ্কলন ও 'মতন'-এ পূর্ণ ছিলো, যেখানে বিজ্ঞ লেখকগণ কাগজ-কালিতে কৃষ্ণ করে বোধগম্য সরল ও বিশদ ভাষার পরিবর্তে 'সঙ্কেতভাষা' ব্যবহার করেছেন, যা বোঝার জন্য আবার বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতো। এভাবে ব্যাখ্যার উপর ব্যাখ্যা, তার উপর আবার টীকা-এর সিলসিলা জারি থাকতো। অর্থাৎ একবার করা হতো কাগজ-কালির সাশ্রয়, আবার করা হতো কালি-কাগজের অপচয়।

উপরের চিত্র থেকে মোটামুটি বোঝা যায়, মুসলিম বিশ্বের উপর তখন জ্ঞান-বন্ধ্যাত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতা কেমন কঠিনভাবে চেপে বসেছিলো, যা থেকে জীবনের কোন অঙ্গন মুক্ত ছিলো না।

তুর্কী সালতানাতের সমকালীন পূর্বাঞ্চল

তুর্কী সালতানাতের সমকালে পূর্বাঞ্চলে দু'টি শক্তিশালী মুসলিম সাম্রাজ্য ছিলো। প্রথমটি হলো তৈমূর বংশীয় যহীরুদ্দীন বাবর (৯৩৩ হিঃ ১৫৪৬ খৃঃ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মোঘল সাম্রাজ্য। বাবর ছিলেন তুর্কী খলিফা সুলতান সেলীম প্রথম-এর সমসাময়িক। শুরুতে যারা মোঘল সিংহাসন অলঙ্কৃত করেছেন, সাহস ও প্রতাপে এবং সামরিক শক্তি ও সাম্রাজ্যের বিস্তারে তারা মুসলিমবিশ্বে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিলেন। তাদের মধ্যে আবার শ্রেষ্ঠ ছিলেন আওরঙ্গযেব আলমগীর রহ.। তিনিই ছিলেন প্রতাপশালী শেষ মোঘলসম্রাট। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব যেমন ছিলো একের পর এক বিজয়াভিযান ও সাম্রাজ্য বিস্তারে এবং পূর্ণ দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে রাজ্যপরিচালনার ক্ষেত্রে তেমনি ছিলো কিতাব ও সুন্নাহর জ্ঞানে এবং নৈতিকতা ও ধার্মিকতায়। তিনি সুদীর্ঘ পঞ্চাশ বছর সাম্রাজ্য শাসন করেছেন এবং নব্বই বছরেরও বেশী বয়সে ১১১৮ হিজরীতে (খৃস্টীয় অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকে) ইন্তিকাল করেছেন।

সেটা ছিলো ইউরোপের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। ইউরোপ তখন আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠেছে এবং চারদিকে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্য এবং দুর্ভাগ্য, খোদ আওরঙ্গযেব বা তাঁর পূর্বসূরী কারোই ইউরোপ সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিলো না। সেখানে তখন কী বিরাট পরিবর্তন শুরু হয়েছে এবং নবজাগরণের কার্যকারণগুলো কত দ্রুত শক্তি অর্জন করছে সে সম্পর্কে তারা ছিলেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তাই ইউরোপ থেকে যে সামান্যসংখ্যক বণিক, চিকিৎসক ও পর্যটক মোঘল দরবারে এসেছে, তাদের তারা দয়া ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতেই দেখেছেন।

ভাবতে সত্যি অবাক লাগে, এত বিশাল-বিস্তৃত এবং এমন জটিল জনগোষ্ঠী-অধ্যুষিত সাম্রাজ্যের শাসনভার যাদের হাতে তারা সমকাল সম্পর্কে এতটা বেখবর কীভাবে থাকতে পারেন! কিন্তু এটাই ছিলো বাস্তবতা। আরো দুর্ভাগ্য যে, আওরঙ্গযেবের উত্তরসূরীরা ছিলো ভীরু, দুর্বল, অযোগ্য ও আরামপ্রিয় শাসক। ইউরোপ থেকে ধেয়ে আসা বিপদ-দুর্যোগের মোকাবেলায় ইসলামী উম্মাহকে রক্ষা করা দূরের কথা, তাদের তো পৈতৃক রাজত্ব ও সিংহাসন রক্ষা করারও যোগ্যতা ছিলো না। শেষ ফল এই দাঁড়ালো, তাদের অনৈক্য ও অন্তর্কলহ, ভীরুতা ও দুর্বলতা এবং অন্তহীন অযোগ্যতার কারণে বিশাল ভারতবর্ষে বৃটিশ রাজত্ব কায়েম হয়ে গেলো, যা ছিলো গ্রেট বৃটেনের সুসমৃদ্ধি ও সফল শিল্প-বিপ্লবের বুনিয়াদ।¹

প্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহৎ সাম্রাজ্য ছিলো ইরানের ছাফাভী সালতানাত। এটি ছিলো সত্যিকার অর্থেই একটি সুউন্নত ও সুসমৃদ্ধ দেশ। কিন্তু শাসকবর্গ শিয়াবাদ ও উগ্রসাম্প্রদায়িকতায় এতই মেতে ছিলো এবং ওছমানী সালতানাতের সঙ্গে সঙ্ঘাত-সঙ্ঘর্ষে এমনই ব্যতিব্যস্ত ছিলো যে, অন্য বিষয়ে চিন্তা-ভাবনার ফুরসতই তাদের ছিলো না। ফলে ইউরোপ যখন উন্নতির পথে শনৈঃশনৈঃ এগিয়ে চলেছে, সেই সুবর্ণ সময়কালটি তারা অপচয় করেছে কখনো তুর্কী সীমান্তে হামলা চালিয়ে, কখনো আত্মরক্ষার যুদ্ধে জড়িয়ে।

বস্তুত প্রাচ্যের এদু'টি বৃহৎ সাম্রাজ্য নিজ নিজ সমস্যায় এমনই নাজেহাল ছিলো এবং বাইরের দুনিয়া থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন ছিলো যে, ইউরোপের মত দূর-দূরাঞ্চল তো অনেক পরে, নিকটবর্তী মুসলিম দেশগুলোর পরিবেশ-পরিস্থিতি ও ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কেও তাদের কোন 'জানাজান্তি' ছিলো না। আর ইসলামী ভ্রাতৃত্ব, বা আন্ত-মুসলিম ঐক্য গড়ে তোলা, এগুলো তো সম্ভবত শাসকবর্গের চিন্তায়ও কখনো আসেনি। এমনকি ইউরোপের শিক্ষা-জাগরণ ও বিজ্ঞানসাধনা এবং শিল্পবিপ্লব ও সামরিক অগ্রগতি সম্পর্কে নিকট পর্যবেক্ষণ এবং তা থেকে যথাসাধ্য উপকৃত হওয়ার প্রচেষ্টাটুকুও তাদের মধ্যে ছিলো না; ছিলো শুধু অন্তর্কলহে মেতে থাকা, আর ভোগ-বিলাসে গা ভাসিয়ে দেয়া। এককথায়, 'ইউরোপে যখন জাগরণের শোর, মুসলিম জাহানে তখন ঘুমের ঘোর! কিংবা আমরা যখন 'তাজ ও মমতাজ' নিয়ে ব্যস্ত, ইউরোপ তখণ 'পথ ও পাথেয়'র সন্ধানে ব্যতিব্যস্ত। আমাদের হাজার হাজার শ্রমিক যখন তাজমহল তৈরী করছে, ওরা তখন তৈরী করছে কল-কারখানা এবং সাগরে ভাসার মত বড় বড় জাহাজ! এসব কথা স্মরণ করেই হয়ত কবি ইকবালের চোখ থেকে ঝরেছে অশ্রু, আর কলম থেকে ঝরেছে কবিতা—

ম্যাঁয় তুম কো বাতাতা হুঁ তাকদীরে উমাম কেয়া হায়
শামশের ও সেনাঁ আওয়াল, তাউস ও রবাব আখের!
শোনো, বলি তোমাকে কোন জাতির উত্থান পতনের তাকদীর
শুরুতে তীর-তলোয়ার, শেষে পায়েল-সেতারের মধুর ঝঙ্কার

হেমন্তেও বসন্তের কিছু আভাস

একথা সত্য যে, মুসলিম উম্মাহর সবুজ-সজীব উদ্যান, যেখানে নিরন্তর প্রস্ফুটিত হতো প্রতিভার অসংখ্য ফুল, তা তখন উজাড় হয়ে গিয়েছিলো এবং বসন্ত-বাহার বিদায় নিয়েছিলো। তবে একথাও সত্য যে, ঐ অবস্থায়ও মাঝে মধ্যে এখানে সেখানে ইসলামবৃক্ষে কিছু সবুজ কিশলয়ের উন্মেষ ঘটেছে এবং হেমন্তকালেও তা এমন কিছু ফুল ও ফল উপহার দিয়েছে, যার তুলনা পৃথিবীর অন্যান্য জাতির ইতিহাসের বসন্তকালেও খুব বেশী পাওয়া যায় না। সোজা করে বলতে পারি, 'জাতীয় পর্যায়ে যুগটা ছিলো অবক্ষয় ও অধঃপতনের, তবে ব্যক্তিপর্যায়ে কিছু অবিস্মরণীয় কীর্তি ও কর্মের।

মুসলিমবিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তখন উচ্চ মনোবল, উদ্দীপ্ত চেতনা ও জাগ্রত মস্তিষ্কের অধিকারী এমন কতিপয় ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে, যারা কিছু সময়ের জন্য হলেও পতনোন্মুখ জাতি ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে নবজীবনের সঞ্চার করেছেন।

ভারতবর্ষে সুলতান ফতহে আলী খান টিপুর মত সাহসী, দূরদর্শী ও সিংহহৃদয় শাসক জন্মগ্রহণ করেছেন, হিন্দুস্তানকে যিনি নতুন আযাদীর ও নয়া যিন্দেগির প্রায় দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছিলেন, যদি না কতিপয় 'মীর সাদিক'-এর জন্ম হতো! অন্যদিকে হযরত সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ)-এর মত জাদুকরী ব্যক্তিত্বের দাঈ ও মুজাহিদ জন্মগ্রহণ করেছেন, যিনি খেলাফতে রাশেদার আলোকে ইসলামী হুকুমত কায়েমের জিহাদ শুরু করেছিলেন, তাঁর কল্পনা ও পরিকল্পনায় যার সীমানা বিস্তৃত ছিলো হিন্দুস্তান থেকে বোখারা পর্যন্ত; তাঁর মহান তারবিয়াতের ফলে উন্নতচরিত্র অসংখ্য মুজাহিদ এবং নিবেদিত প্রাণ দাঈ ও সিপাহী তৈরী হয়েছিলো, যাদের ঈমান ও ইয়াকীন, ইখলাছ ও লিল্লাহিয়াত এবং জোশ ও জাযবা সেই 'কুরুনে উলা'র ঝলক দেখিয়েছিলো। বলতে গেলে ঐ পতনমুখী যুগে তিনি এক অসাধ্যই সাধন করেছিলেন। কিন্তু সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক অরাজকতা, চারিত্রিক অধঃপতন এবং জাতীয় তন্দ্রাচ্ছন্নতা এমনই চূড়ান্ত ছিলো যে, বিশাল বটবৃক্ষের মত এসকল ব্যক্তিত্বও মুসলমানদের পতন ও অধঃপতনের গতিমাত্রায় বিশেষ কোন 'রোকথাম' আনতে পারেননি এবং উম্মাহ সামগ্রিকভাবে তাঁদের জিহাদ ও মুজাহাদা, ত্যাগ ও আত্মত্যাগ এবং তাজদীদী মেহনত থেকে তেমন কিছু সুফল অর্জন করতে পারেনি।

শিল্প ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে ইউরোপের উত্থান

ষোড়শ শতাব্দীর শেষ এবং সপ্তদশ শতাব্দীর শুরু থেকেই তুর্কীরা নীতি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে অবক্ষয় এবং জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদতার শিকার হয়ে পড়েছিলো। মানবজাতির ইতিহাসে এটা ছিলো এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ ও ভাগ্যনির্ধারণকারী যুগ, যার সুস্পষ্ট ছাপ ও প্রভাব আমরা দেখতে পাই পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে।

ইউরোপ তখন দীর্ঘ নিদ্রা থেকে জেগে উঠেছে এবং বিপুল উদ্দীপনা ও উন্মাদনা নিয়ে এগিয়ে চলেছে, যাতে দ্রুততম সময়ে পিছনের অজ্ঞাতা ও মূর্খতার ক্ষতিপূরণ হতে পারে। জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে তাদের উন্নতির গতি ছিলো বিস্ময়কর। আপন লক্ষ্যের পথে তারা শুধু দৌড়ে যাচ্ছিলো না, বরং ডানা মেলে উড়ে চলেছিলো। প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তি তারা আয়ত্ত করছিলো এবং সৃষ্টিজগতের রহস্যরাজি উন্মোচিত করছিলো। অজানা দেশ-মহাদেশ ও সাগর-পথ আবিষ্কৃত হচ্ছিলো। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় তাদের অগ্রযাত্রা এবং জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে তাদের শোভাযাত্রা অব্যাহত ছিলো। এই সংক্ষিপ্ত সময়কালে সেখানে অনন্যসাধারণ বহু বিজ্ঞান-প্রতিভার আবির্ভাব ঘটেছিলো। সংক্ষিপ্ত উদাহরণে যাদের নাম আসে তারা হলেন কোপার্নিকাস, ব্রনো, গ্যালিলিও, কেপলার, নিউটন ও অন্যান্য। বস্তুত এই মহাবিজ্ঞানিগণ জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৃতিবিজ্ঞানের জগতে প্রাচীন ব্যবস্থা ভেঙ্গে নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন এবং জ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। অভিযাত্রী ও নাবিকদের মধ্যে ছিলেন কলোম্বাস, ভাসকো ডি গামা ও ম্যাগলিন-এর মত সাহসী, উদ্যমী ও দৃঢ়চেতা ব্যক্তি, যারা অজানা দেশ-মহাদেশ এবং নতুন সাগর-পথ আবিষ্কার করেছেন।

উপরোক্ত সময়কালে ইতিহাসের পাতায় বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠীর স্থান ও অবস্থান নতুনভাবে বিন্যস্ত হচ্ছিলো। কারো ভাগ্যতারকা ছিলো উদয়ের পথে, কারো ভাগ্যতারকা ছিলো অস্তাচলে। তখনকার একটি মুহূর্ত ছিলো কয়েক দিন এবং একটি দিন ছিলো কয়েক বছরের সমান। সুতরাং এ যুগসন্ধিক্ষণে সামান্য সময়ও নষ্ট করার অর্থ ছিলো বহু দীর্ঘকাল নষ্ট করা। কিন্তু হায় আফসোস, মুসলিম উম্মাহ তখন শুধু দিন, মাস ও বছর নয়, বরং বহু যুগ ও বহু প্রজন্মের অপচয় করেছে। পক্ষান্তরে ইউরোপের জাতিবর্গ প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করেছে এবং জ্ঞান-গবেষণা ও বিজ্ঞানসাধনার সকল অঙ্গনে বছরে যুগের পথ অতিক্রম করেছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে তুর্কিদের পশ্চাৎপদতার একটা সাধারণ ধারণা পেতে হলে এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে, ষোড়শ শতাব্দীর আগে সেখানে জাহাজনির্মাণ শিল্পের কোন অস্তিত্বই ছিলো না। পক্ষান্তরে ছাপাখানা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ইউরোপীয় পদ্ধতির সামরিক একাডেমির সাথে পরিচয় ঘটেছে মাত্র অষ্টাদশ শতকে। এই শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত তুরস্ক শিল্প, প্রযুক্তি, আবিষ্কার ও উদ্ভাবনার জগত থেকে এত দূরে ছিলো যে, রাজধানীর আকাশে উড়ন্ত বেলুন দেখে মানুষ ভেবেছে, জাদুমন্ত্রের কিছু! ইউরোপের ছোট ছোট দেশগুলোও এক্ষেত্রে তুরস্ককে ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। এমনকি মিশরও তুরস্কের চার বছর আগে রেলযোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেছিলো, আর ডাকটিকেট চালু হয়েছিলো তুরস্কের কয়েক মাস আগে।

এই যখন ছিলো মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বদানকারী তুরস্কের অবস্থা তখন তার শাসনাধীন বা প্রভাবাধীন আরব-অনারব দেশগুলোর অবস্থা কী হতে পারে তা তো সহজেই বোঝা যায়। মাঝারি তো নয়ই, এমনকি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্পেরও প্রচলন সেসব দেশে ছিলো না। ফরাসী পর্যটক মঁসিয়ে ভলনে—যিনি অষ্টাদশ শতকে মিশর ভ্রমণ করেন এবং চার বছর সিরিয়ায় অবস্থান করেন—তার সফরনামায় লিখেছেন, 'শিল্পে এদেশ (সিরিয়া) এতই অনগ্রসর যে, তোমার ঘড়ি নষ্ট হলে মেরামতের জন্য বিদেশী কারিগরের কাছে যেতে হবে।'¹

তদুপরি মুসলমানদের এই পিছিয়ে পড়া শুধু বিজ্ঞান-দর্শন, তত্ত্বীয় জ্ঞান, শিল্প ও কারিগরি ক্ষেত্রেই ছিলো না, বরং ছিলো সর্বব্যাপী। এমনকি যুদ্ধবিদ্যা ও সমরশিল্পেও তারা ইউরোপ থেকে পিছিয়ে পড়েছিলো। অথচ শেষ দিকেও এক্ষেত্রে তুরস্কের শ্রেষ্ঠত্ব ছিলো সর্বস্বীকৃত। কিন্তু দেখতে দেখতে ইউরোপ অস্ত্রনির্মাণ, যুদ্ধকৌশল উদ্ভাবন এবং উন্নত সামরিক ব্যবস্থাপনায় তুরস্ককে ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। ফলে ১৭৭৪ সালে তুরস্ক ইউরোপীয় বাহিনীর হাতে শোচনীয় পরাজয় বরণ করে।

এভাবে যুদ্ধের মাঠেও যখন ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব সুপ্রমাণিত হলো তখন গিয়ে ওছমানী সালতানাতের টনক কিছুটা নড়লো এবং খলীফার আদেশে সামরিক প্রশিক্ষণ ও বাহিনী পুনর্গঠনের জন্য কতিপয় ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞ ডেকে আনা হলো। সুলতান তৃতীয় সেলিম উনিশ শতকের শুরুর দিকে আরো ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি যেমন বাস্তববাদী ও দূরদর্শী ছিলেন তেমনি ছিলেন দৃঢ়চেতা ও কুশলী। শাহী ঐতিহ্যের বিপরীতে তার শিক্ষা-দীক্ষা হয়েছিলো রাজপ্রাসাদের বাইরে রুক্ষ-কঠিন পরিবেশে। তিনি আধুনিক ধারার নতুন নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রকৌশল মহাবিদ্যালয়ে তিনি নিজে শিক্ষা দান করতেন। এছাড়া তিনি আধুনিক পদ্ধতির একটি সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায়ও বেশ কিছু সংস্কার সাধন করেন। কিন্তু তুর্কীজাতি ও তার সমাজব্যবস্থা এতটাই স্থবির ও রক্ষণশীল ছিলো যে, কোন প্রকার পরিবর্তন, আধুনিকায়ন ও সংস্কারপ্রচেষ্টা গ্রহণ করার যোগ্যতা তাদের ছিলো না। ফলে সেনাবাহিনীর পুরোনো অংশ বিদ্রোহ করে বসে এবং তিনি মর্মান্তিকভাবে নিহত হন।

সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ তার স্থলাভিষিক্ত হন, যার শাসকাল ছিলো ১৮০৭ থেকে ৩৯ সাল পর্যন্ত। তারপর সিংহাসনে আসেন সুলতান প্রথম আব্দুল মজীদ, যার শাসনকাল ছিলো ৩৯ থেকে ৫১ সাল পর্যন্ত। তারা উভয়ে শহীদ সুলতান তৃতীয় সেলিমের মিশন অব্যাহত রাখেন। ফলে তুরস্ক কিছুটা উন্নতি-অগ্রগতি লাভ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু তিক্ত সত্য এই যে, আলোচ্য সময়কালে মুসলিম তুরস্কের উন্নতি-অগ্রগতির সঙ্গে ইউরোপীয় জাতিবর্গের তুলনা করলে হতবাক হতে হয়। ইউরো-তুরস্কের প্রতিযোগিতা যেন ছিলো গল্পের খরগোশ ও কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতা, তবে পার্থক্য এই যে, ক্ষিপ্রগতির খরগোশ এখানে জাগ্রত, আর ধীরকচ্ছপ এই জাগে, এই ঘুমিয়ে পড়ে।

আঠারো ও উনিশ শতকে মরক্কো, আলজিরিয়া, মিসর, হিন্দুস্তান, তুর্কিস্তান ও অন্যান্য অঞ্চলে প্রাচ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীর এবং পাশ্চাত্যের বিভিন্ন জাতি ও শক্তির মধে যে ভয়াবহ সঙ্ঘাত-সঙ্ঘর্ষ ঘটেছে তাতে জয়-পরাজয়ের ফায়ছালা আসলে ষোল ও সতের শতকেই হয়ে গিয়েছিলো এবং সাধারণ 'সমঝ-বুঝ' আছে, এমন যে কারো পক্ষে তখনই এর ফলাফল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব ছিলো। অর্থাৎ যা ঘটেছে ইতিহাসের গতিধারায় তা ঘটা অনিবার্য ছিলো।

টিকাঃ
১. হযরত বুসর বিন আরতাত-এর নেতৃত্বে ৪৪ হিজরীতে (৬৬৪ খৃ) আরবনৌবহর কনস্টান্টিনোপল জয়ের চেষ্টা করে। ইয়াযীদ বিন মু'আবিয়া ৫২ হিজরীতে কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেও ব্যর্থ হন। সেই অভিযানে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেযবান ছাহাবী হযরত আবু আইয়ূব আনছারী রাদিয়াল্লাহু আনহু শরীক ছিলেন এবং মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তিনি ওয়াছীয়ত করেছিলেন, আমার জানাযা যত দূর নিয়ে যেতে পারো যাও, তারপর সেখানে দাফন করো। তার অছিয়ত পূর্ণ করা হয়েছিলো এবং নগর-প্রাচীরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়েছিলো। এর পর আরো অন্তত চারবার আরব-বাহিনী কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করে, কিন্তু তা এমনই সুরক্ষিত ছিলো যে, কোন সেনাপতির পক্ষেই ঐ শহর পদানত করা সম্ভব হয়নি। (আরবী অনুবাদক)
২. প্রকৃতপক্ষে তাঁর বয়স তখন ছাব্বিশ নয়, বরং চব্বিশ বছরও অতিক্রম করেনি (আরবী অনুবাদক)
৩. বক্তব্যটি নেয়া হয়েছে استنبول وحضارة الإمبراطورية العثمانية থেকে, লেখক বার্নাড লুয়েস, আরবী অনুবাদ রিযওয়ান আলী নাদাবী, পৃ. ৩৬, ৩৭
৪. ফিলসফাতুত তারিখে উসমানী, মুহম্মদ জমিল বেইহাম পৃ. ২৮০-৮১
৫. ঐ পৃ. ১৫৬
৬. ফেলসফাতুত তারিখিল উসমানী মুহম্মদ জামিল বাইহাম
৭. رواه الترمذي عن أبي هريرة رضي الله عنه في كتاب العلم، وابন ماجه في كتاب الزهد
৮. تاريخ مصر الجرحي زيدان
৯. conflict of stand west in turkey, p. 40-43
১০. এ প্রসঙ্গে brooks adams বলেন, ১৭৫৭ সালে পলাশী-যুদ্ধের পর বাংলার সম্পদ লণ্ডনে আসা শুরু হয় এবং তার সুফলও খুব দ্রুত দেখা দেয়। এই যে এত বড় শিল্পবিপ্লব, যার প্রভাব এখন পৃথিবীর সর্বত্র দৃশ্যমান, হয়ত তার অস্তিত্বই হতো না যদি পলাশীর যুদ্ধ না হতো। বস্তুত ভারতবর্ষের অঢেল সম্পদই ছিলো শিল্পবিপ্লবের সহায়ক ও চালিকাশক্তি। ভারতবর্ষ থেকে সম্পদের ঢল যখন লন্ডনে এসে আছড়ে পড়তে শরু করলো এবং বিশাল পুঁজি তৈরী হলো তখন আবিষ্কার-উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও বিরাট প্রতিযোগিতা শুরু হলো। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত সম্পদ দ্বারা এত অধিক মুনাফা অর্জিত হয়নি, যতটা হয়েছে ভারত থেকে লম্ব (লুন্ঠিত!) সম্পদ দ্বারা। কেননা পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে ইংলেন্ডের কোন প্রতিদ্বন্দী ছিলো না। (the law of civilization and decay, london, 1889, p. 313-17) একই প্রসঙ্গে sir william digby বলেন, ইংলেন্ডের শিল্পসমৃদ্ধি মূলত বাংলা ও কর্নাটকের সম্পদভাণ্ডারের কারণেই সম্ভব হয়েছে। পলাশীর পূর্বে যখন ভারতবর্ষের সম্পদ ইংলেন্ডে আসা শুরু হয়নি তখন আমাদের দেশে শিল্প বলতে কিছুই ছিলো না। (prosperous india: a revolution. p.30) এমনকি এটাই ছিলো মুসলিম বিশ্বের পরাধীনতা ও দাসত্ব-শৃঙ্খলের পরোক্ষ কারণ।
১১. زعماء الإصلاح في العصر الحديث ( الصفحة السادسة )

ফন্ট সাইজ
15px
17px