📄 প্রথম পরিচ্ছেদ: জাহেলিয়াত থেকে ইসলামের দিকে
সংস্কার ও সংশোধনের নববী পদ্ধতি
যে সমাজে মুহম্মদী নবুয়তের আবির্ভাব
মানবতা যখন মুমূর্ষুদশায় উপনীত হয়েছিলো এবং মানুষের এই পৃথিবী যখন সমস্ত চাকচিক্য ও জাঁকজমকসহ ধ্বংস ও বরবাদির অন্ধকার গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হতে চলেছিলো, গোটা মানবজাতি যখন আঁধার রাতের মুসাফিরের মত দিশেহারা অবস্থায় ছিলো এবং মুক্তির কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলো না, বরং উপায় খোঁজার যোগ্যতাও ছিলো না; ঠিক সেই চরম মুহূর্তে আল্লাহ তা'আলা যেন তাঁর রহমতের দরজা খুলে দিলেন এবং মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রহমাতুল-লিল আলামীনরূপে এবং আখেরি নবীরূপে দুনিয়াতে পাঠালেন, যাতে মুমূর্ষু মানবতাকে তিনি নবজীবন দান করেন এবং মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে বের করে আনেন। আলকোরআনের ভাষায়—
الرَّ كِتَبُ أَنزَلْتَهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَى صِرَاطٍ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ
'আলিফ-লাম-রা, এ তো সেই কিতাব যা আমি নাযিল করেছি আপনার প্রতি, যাতে সমস্ত মানুষকে আপনি তাদের প্রতিপালকের ইচ্ছায় বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, মহা-পরাক্রমশালী মহা-প্রশংসিত সত্তার পথের দিকে।' (ইবরাহীম, ১৪: ১)
নবুয়ত লাভের সময় যে পৃথিবীর তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন, কেমন ছিলো সেই পৃথিবী? কেমন ছিলো পৃথিবীর মানুষ? কেমন ছিলো সমাজ, সভ্যতা ও তার অন্ধকার? যিনি বলেছেন বড় সুন্দর বলেছেন—
'পৃথিবীটা যেন ছিলো এক বিশাল ভবন, যা প্রবল কোন ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছে, যার আসবাবপত্র সব তছনছ হয়ে গিয়েছে। কোন কিছু যথাস্থানে নেই, বরং যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। কোন কিছুই ব্যবহার-উপযোগী নেই; হয় ভেঙ্গেচুরে, না হয় দুমড়েমুচড়ে গিয়েছে। স্তূপ ও ধ্বংস্তূপ ছাড়া সেখানে আর কিছুই নেই।'
আল্লাহর নবী যখন নবুয়তের দৃষ্টিতে পৃথিবীর দিকে তাকালেন, দেখতে পেলেন এমনসব মানুষ যাদের কাছে নিজেদের মানবসত্তাই ছিলো মূল্যহীন। তারা ভুলে গিয়েছে আপন স্রষ্টাকে এবং নিজেদের সৃষ্টি-মর্যাদাকে। তাই তারা পূজা শুরু করেছে চাঁদ-সূর্যের, নদী-সাগরের, আগুন-পাথরের, কারো ক্ষতি-উপকারের কোন ক্ষমতা নেই যাদের।
তিনি দেখতে পেলেন এমনসব মানুষ যাদের চিন্তা-চেতনার হয়ে গিয়েছে বক্র এবং রুচি ও স্বভাব হয়ে পড়েছে বিকৃত। ফলে সহজ সত্যকে মনে হচ্ছে দুর্বোধ্য এবং দুর্বোধ্যকে সহজ সত্য। বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ছিলো তাদের দ্বিধা-সংশয়, আর যা কিছু সন্দেহযোগ্য তাতে ছিলো অটল বিশ্বাস। অসুন্দর ছিলো তাদের চোখে সুন্দর, আর যা কিছু শোভন-সুন্দর তা ছিলো অসুন্দর। যা কিছু অখাদ্য-কুখাদ্য, তাদের কাছে মনে হয় সুখাদ্য, আর সুখাদ্যকে মনে হয় অখাদ্য। কল্যাণকামী বন্ধুকে তারা শত্রু ভেবে দূরে সরিয়ে দেয়, আর প্রাণঘাতী শত্রুকে বন্ধু ভেবে কাছে টেনে নেয়।
চারপাশে তিনি দেখতে পেলেন এমন এক সমাজ, যা বৃহৎ বিশ্বেরই এক ক্ষুদ্র সংস্করণ। সবকিছু নষ্ট হয়ে গিয়েছে, সবকিছু উল্টে গিয়েছে। সেখানে নেকড়ে হয়েছে মেষপালের রক্ষক এবং অপরাধীর হাতে চলে এসেছে বিচারের দণ্ড। যারা পাপাচারী ও দুস্কৃতিকারী তারা হলো সবল সচ্ছল; যারা সৎ ও সদাচারী তারা হলো বঞ্চিত দুর্বল। সমাজের চোখে যেন সততার চেয়ে মন্দ এবং শঠতার চেয়ে উত্তম কিছু আর নেই। সরলতাকে মনে করা হয় নির্বুদ্ধিতা, আর ধূর্ততাকে ভাবা হয় কুশলতা।
সমাজদেহে এমন সব দুষ্ট ব্যাধি বাসা বেঁধেছে যা মানবতার ধ্বংসকেই শুধু তরান্বিত করছে এবং আশা ও আশ্বাসের সব আলো নিভিয়ে এমন অন্ধকার গহ্বরের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে যেখান থেকে উদ্ধারের কোন উপায় থাকে না। সেখানে মদ ও মদাসক্তি ছিলো, নগ্নতা ও বেহায়াপনা ছিলো, লোভ-লালসা ও নিষ্ঠুরতা ছিলো, সুদের নামে শোষণ ও লুণ্ঠন ছিলো। পাশবিকতা ও হিংস্রতা ছিলো। এতীমের কান্না ছিলো, দুর্বলের ফরিয়াদ ছিলো, অবলা নারীর আহাজারি ছিলো এবং পুঁতে ফেলা জীবন্ত কন্যাসন্তানের আর্তনাদ ছিলো। মোটকথা নীচতা, হীনতা, জঘন্যতা ও বীভৎসতার যত রূপ হতে পারে, ঐ সমাজে তার সবই ছিলো এবং সদম্ভে ছিলো।
তিনি দেখতে পেলেন, যারা ছিলো রাজা ও শাসক তারা হয়ে পড়েছে শোষক ও উৎপীড়ক। আল্লাহর যমিন যেন তাদের জন্য ছিলো শিকারভূমি, আর আল্লাহর বান্দারা তাদের অসহায় শিকার। যাদের হাতে ছিলো দ্বীন ও ধর্মের দায়িত্ব, খোদার পরিবর্তে তারাই দাবীদার সেজেছে খোদায়িত্বের। ধর্মের নামে নির্দ্বিধায় তারা আত্মসাৎ করছে মানুষের ধনসম্পদ এবং মানুষকে সরিয়ে রাখছে আল্লাহর পথ থেকে।
তিনি দেখতে পেলেন, আল্লাহ-প্রদত্ত মানবপ্রতিভার বড় নির্দয়ভাবে অপচয় হচ্ছে, কিংবা হচ্ছে অপব্যবহার। জীবনের কোন ক্ষেত্রেই তা সঠিক খাতে পরিচালিত এবং সঠিক কাজে নিয়োজিত নয়। মানুষের যাবতীয় মেধা ও প্রতিভা মানবজাতি ও মানবসভ্যতার কল্যাণ সাধনের পরিবর্তে ডেকে আনছে তার চরম সর্বনাশ। সাহস ও বীরত্বের প্রকাশ ঘটছে যুলুম অত্যাচারের পথে। দানশীলতা ও বদান্যতার প্রকাশ ঘটছে অপচয় ও অপব্যয়ের মাধ্যমে, আভিজাত্য ও আত্ম-মর্যাদাবোধের প্রকাশ ঘটছে জাহেলিয়াতের অহমিকায়। মেধা ও বুদ্ধির প্রকাশ ঘটছে অপরাধের নব নব কৌশল এবং প্রবৃত্তির চরিতার্থতার নতুন নতুন উপায় উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে।
বস্তুত বহু গুণ ও যোগ্যতার আধার মানুষ ছিলো এমন মহামূল্যবান কাঁচামাল যা কাজে লাগানোর জন্য ছিলো না কোন বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ কারিগর, যিনি সভ্যতার বিনির্মাণে এগুলোর সঠিক ব্যবহার করতে পারেন। কিংবা মানুষ যেন ছিলো উৎকৃষ্ট কাঁচা কাঠ, যা রোদ-বৃষ্টিতে পচে গলে শেষ হচ্ছে, কিন্তু এমন কারো উপস্থিতি ছিলো না যিনি এগুলোকে শুকিয়ে জোড়া দিয়ে জাহাজ তৈরী করবেন, আর সে জাহাজ জীবনসমুদ্র পাড়ি দিয়ে মানবতাকে নিয়ে যাবে অনন্ত সৌভাগ্যের আলোকিত বন্দরে।
পৃথিবীর সব জাতি ও জনগোষ্ঠী যেন ছিলো রাখালহীন মেষপাল, যাতে ক্ষুধার্ত নেকড়ের দল ঝাঁপিয়ে পড়ে বারবার। রাজনীতি যেন ছিলো লাগামহীন পাগলা ঘোড়া এবং শাসনক্ষমতা যেন মাতালের হাতে তলোয়ার, যা জখম করে আপন-পর সবাইকে, এমনকি কখনো নিজেকে।
খণ্ডিত সংস্কারের ব্যর্থতা
এই পচনধরা নষ্ট জীবনের সংশোধন ও সংস্কার সহজ কোন কাজ ছিলো না। জীবন যত কঠিন জীবনের সংশোধন তার চেয়ে অনেক বেশী কঠিন; এত কঠিন যে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র একজন সংস্কারকের সারা জীবনের সাধনা ও পরিশ্রম দাবী করে। বরং এমনও হয় যে, সবটুকু মনোযোগ এবং সর্বশক্তি নিয়োগ করার পরও একটি মাত্র ফাসাদ ও মন্দের মূলোৎপাটন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কর্মক্লান্ত ও হতাশাগ্রস্ত সংস্কারকের জীবন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু ফাসাদ ও মন্দের শিকড় থেকে যায়।
তো আরবের সে যুগের সেই সমাজে যদি সাধারণ কোন সমাজসংস্কারকের আবির্ভাব হতো যিনি নূরে নবুয়তের পরিবর্তে নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিচার-বিচক্ষণতা দ্বারা পরিচালিত, তিনি কী করতেন? নিজের সংস্কার-কর্মকাণ্ডের জন্য অবশ্যই জীবনের কোন একটি শাখা বেছে নিতেন এবং সারা জীবনের সাধনা ও পরিশ্রম নিয়োজিত করতেন অসংখ্য ব্যাধিগ্রস্ত সমাজের কোন একটি ব্যাধি দূর করার পিছনে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হতো না। ব্যাধি যেমন ছিলো তেমনি থেকে যেতো, কিংবা তার রূপ পরিবর্তন হতো, অথবা দেখা দিতো নতুন কোন ব্যাধি। কারণ মানুষের স্বভাব ও মনস্তত্ত্ব খুবই দুর্বোধ্য ও সূক্ষ্ম-জটিল এবং বহুমুখী ও বহুরূপী। তাতে রয়েছে অনেক চোরাপথ এবং অসংখ্য ফাঁক-ফোকর। স্বভাব ও মনস্তত্ত্বের আসল দুর্বলতা চিনতে পারা এবং তার কেন্দ্রবিন্দুকে চিহ্নিত করা যুগের সেরা জ্ঞানী ব্যক্তির পক্ষেও সহজ কাজ নয়। কেননা জনে জনে এবং ক্ষণে ক্ষণে তা পরিবর্তিত হতে থাকে।
মানুষের চিন্তা, রুচি ও স্বভাব যখন বক্র ও বিকৃত হয়ে পড়ে তখন একটিমাত্র দোষের সংশোধন এবং একটিমাত্র দুর্বলতা নিরসনের চেষ্টা কিছুতেই ফলপ্রসূ হয় না, বরং তখন অনিবার্য প্রয়োজন দেখা দেয় এমন এক সর্বাত্মক ও সর্বব্যাপী চেষ্টা-সাধনার, যা স্বভাবের গতিমুখ মন্দ থেকে ভালোর দিকে এবং অনিষ্ট থেকে কল্যাণের দিকে আমূল পরিবর্তিত করে দেবে এবং জীবনের অঙ্গন থেকে সেই সব দুষ্ট আগাছা উপড়ে ফেলবে যা সমাজ ও পরিবেশ দূষিত হওয়ার কারণে এবং শিক্ষা-দীক্ষার অনুপস্থিতির সুযোগে গজিয়ে উঠেছে, যেমন বে-আবাদ পড়ে থাকার কারণে উৎকৃষ্ট ভূমিও আগাছা-পরগাছায় ভরে যায়। এভাবে জীবনের অঙ্গন এবং হৃদয়ের ভূমি যখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পূর্ণ উপযোগী হয়ে যাবে তখনই শুধু তাতে কল্যাণপ্রীতি ও আল্লাহভীতির সবুজ বৃক্ষ অঙ্কুরিত হতে পারে। এভাবেই শুধু জীবন ও সমাজের এবং মানবস্বভাবের কাঙ্ক্ষিত সংশোধন ও কল্যাণ সাধন সম্ভব হতে পারে।
এছাড়াও সংস্কার ও সংশোধনের যে কোন খণ্ডিত প্রয়াস-প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। মানবসমাজে রোগব্যাধির অভাব নেই এবং মানবজীবনেও দোষ-দুর্বলতার কমতি নেই। প্রতিটি ব্যাধি ও দুর্বলতার সংশোধনের পিছনেই কেটে যায় একজন সংস্কারকের সারা জীবন। বরং কখনো কখনো বহুজনের সারা জীবনের সম্মিলিত সংস্কার-প্রয়াসের পরও দেখা যায়, জীবন শেষ হয়ে গেছে, অথচ ব্যাধি একই অবস্থায় রয়ে গেছে, বরং তার প্রকোপ আরো বেড়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, যে সমাজ গড়ে উঠেছে বল্গাহীন ভোগবিলাস ও আনন্দ-উল্লাসের জীবনদর্শনের উপর সেখানে কেউ যদি মদ ও মাদকবিরোধী আন্দোলন শুরু করে তাহলে ফল কী হবে? মদাসক্তি তো শিকড় গেড়ে বসেছে সমাজের সর্বস্তরে এবং মিশে আছে মানুষের অস্থিমজ্জায়! সুতরাং ফল হবে ব্যর্থতা এবং চরম ব্যর্থতা; ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু নয়। ক্লান্ত শ্রান্ত ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে একসময় সে হাল ছেড়ে দেবে এবং তার সকল প্রয়াস-প্রচেষ্টা ভেসে যাবে মদের তোড়ে। কারণ মদাসক্তি তো উপসর্গ মাত্র, মূল ব্যাধি তো হলো বিকৃত রুচি এবং অসুস্থ মানসিকতা যা শুধু আনন্দের স্বাদ পেতে চায়, এমনকি বিষের পাত্রে চুমুক দিয়ে হলেও; যা শুধু ভোগের ফুর্তিতে মাতোয়ারা হতে চায়, এমনকি পাপের পঙ্কে ডুব দিয়ে হলেও। সুতরাং নিছক প্রচার-প্রচারণা, বক্তৃতা-বিবৃতি এবং মদের চরিত্রগত ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির লম্বা লম্বা বয়ান-বিবরণ দ্বারা মদের নেশা ছোটানো যাবে না, এমনকি কঠোর থেকে কঠোর আইন প্রণয়ন ও শান্তি প্রয়োগের মাধ্যমেও তা রোধ করা যাবে না। সব শ্রমই হবে শুধু পণ্ডশ্রম।
এটা সম্ভব হতে পারে শুধু মৌলিক মানসিক পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমে এবং অন্তরের গভীরে ঊর্ধ্বজাগতিক মহাশক্তির বিশ্বাস উৎপাদনের মাধ্যমে। এছাড়া আর যে কোন পথ ও পন্থাই অবলম্বন করা হোক, কোন কাজ হবে না। কারণ মানুষ মদ হালাল করে নেবে অন্য কোন নামে, অন্য কোন কৌশলে, কিংবা মদাসক্তি আবার ফিরে আসবে অপরাধের ভিন্ন কোন রূপ ধারণ করে।
এটা শুধু তত্ত্ব কথা এবং উর্বর কল্পনা নয়, আমাদের আধুনিক যুগেই রয়েছে এর বাস্তব প্রমাণ। আমেরিকার কথা ধরুন; মদাসক্তির ভয়াবহ পরিণামে মার্কিনসমাজ যখন বিধ্বস্তপ্রায় তখন সেখানে আইন করে মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। সরকার ও তার সমগ্র প্রশাসন সর্বশক্তি নিয়োগ করে মদবিরোধী অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। মদের ক্ষতি ও অপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পত্রপত্রিকায় এবং সিনেমা ও টিভি-পর্দায় বিজ্ঞাপন ও প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে শুরু করে সভা-সেমিনার ও ব্যাপক গণসংযোগ, কোন কিছুই বাদ যায়নি। এক পরিসংখ্যানমতে মদবিরোধী প্রচারণায় মার্কিন সরকার ষাট মিলিয়ন ডলারেরও বেশী ব্যয় করেছিলো এবং প্রকাশিত বইপত্র ও পুস্তক-পুস্তিকার পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিলো দশ বিলিয়ন। তাছাড়া মদনিষিদ্ধ আইন কার্যকর করার পিছনে সুদীর্ঘ চৌদ্দ বছরে সরকারকে দু'শ পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছিলো। আইনের প্রয়োগ এত কঠোর ছিলো যে, তিনশ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিলো, আর কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছিলো পাঁচ লাখ বত্রিশ হাজার তিনশ পঁয়ত্রিশ ব্যক্তিকে। অর্থ-জরিমানার পরিমাণ ছিলো ১৬ মিলিয়ন ডলার এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্তির পরিমাণ ছিলো চারশ চার মিলিয়ন ডলার। কিন্তু এত কিছুর পরো দেখা গেলো, মার্কিন জাতির মদাসক্তি বেড়েই চলেছে। জীবনের মূল্যেও তারা মদের পেয়ালা ছাড়তে রাজি নয়। শেষ পর্যন্ত মার্কিন সরকারকে নতি স্বীকার করতে হলো এবং ১৯৩৩ সালে মদবিরোধী আইন তুলে নিয়ে ঘোষণা দিতে হলো, এখন থেকে মার্কিন মুল্লুকে মদ নিঃশর্তভাবে বৈধ।
নবুয়তের মেহনত
সমাজ ও মানবসমাজের সংশোধনের জন্য মুহম্মদ বিন আব্দুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে মেহনত শুরু করেছিলেন তা নির্দিষ্ট কোন ব্যাধি ও দুর্বলতার সংশোধনের খণ্ডিত মেহনত ছিলো না। তাঁর মেহনত ছিলো সমাজ ও পরিবেশের, স্বভাব ও চরিত্রের এবং মন ও মানসের আমূল পরিবর্তনের এক সামগ্রিক মেহনত। সর্বোপরি তাঁর দাওয়াত ও মেহনত ছিলো না নিজস্ব জ্ঞান-বুদ্ধি ও বোধ-বিচার দ্বারা পরিচালিত এবং নিজের বা অন্যের অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত। তাঁর দাওয়াত ছিলো অহী ও নবুয়তের দাওয়াত। আলকোরআনের ভাষায়—
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَى : إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى
'তিনি নিজস্ব ইচ্ছায় কিছু বলেন না, তা তো শুধু অহী, যা তাকে দান করা হয়।' (আন-নাজম, ৫৩: ৩-৪)
মানুষকে তিনি দাওয়াত দিয়েছেন দুনিয়ার সব দাসত্ববন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণের এবং শুধু তাঁর ইবাদতের। আলকোরআনের ভাষায়—
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَجِدٌ فَمَن كَانَ يَرْجُوا لقاء ربه . فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ، أَحَدًا
'আপনি বলুন, আমি তো শুধু তোমাদেরই মত একজন মানুষ, আমাকে অহী প্রদান করা হয় যে, তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ। সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ প্রত্যাশা করে সে যেন নেক আমল করে, আর আপন প্রতিপালকের সঙ্গে কাউকে শরীক না করে।' (কাহফ, ১৮: ১১০)
মানুষের সামনে তিনি তুলে ধরেন জীবনের আসল নেয়ামত ও প্রকৃত সুখ-শান্তি, যা থেকে মানুষ অজ্ঞতাবশে নিজেকে বঞ্চিত করে রেখেছিলো। যেসব জোয়াল ও শৃংঙ্খল মানুষ অযথা নিজের উপর চাপিয়ে রেখেছিলো, তা থেকে তিনি তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করেন। কোরআন বলছে—
يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهُم عن المنكر ويُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبِنيت ويضع عنهم إصرهم والأغلال التي كانت عليهم
'তাদের তিনি সৎ কর্মের আদেশ করেন এবং মন্দ কর্ম থেকে বিরত রাখেন। উত্তম বস্তুসকল তাদের জন্য হালাল করেন এবং নিকৃষ্ট বস্তুসকল তাদের জন্য হারাম করেন। আর ঐসব বন্ধন ও শৃঙ্খল থেকে তাদের মুক্ত করেন যা তাদের উপর চেপে বসেছিলো।' (আল-আ'রাফ, ৭: ১৫৭)
তাঁর নবুয়তকে ঘোষণা করা হয়েছে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত বলে। তাঁর মাধ্যমে মুমূর্ষু মানবতা লাভ করেছে এক নতুন জীবন, নতুন শক্তি, নতুন উত্তাপ, নতুন আলো ও ঈমান, নতুন চেতনা ও বিশ্বাস এবং নতুন সমাজ ও নতুন সভ্যতা। মূলত তাঁর আবির্ভাব থেকেই শুরু হয়েছে পৃথিবীর নতুন ইতিহাস এবং মানবতার নতুন পথ চলা। কেননা আত্মবিস্মৃতি ও আত্মবিনাশের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে যে দীর্ঘ সময় তাতে তো নেই কোন কল্যাণ! আলো ও অন্ধকার তো এক হতে পারে না! কোরআন বলছে—
وَمَا يَسْتَوِي الْأَعْمَىٰ وَالْبَصِيرُ وَلَا الظُّلُمَتُ وَلَا النُّورُ : وَلَا الظَّلُ وَলَا الْحَرুরُ : وَمَا يَسْتَوِي الْأَحْيَاءُ وَلَا الْأَمْوَاتُ إِنَّ اللَّهَ يُسْمِعُ مَن يَشَاءُ ۚ وَمَا أَنتَ بِمُسْمِعٍ مِّن فِي الْقُبُورِ
'সমান হতে পারে না অন্ধ ও চক্ষুষ্মান এবং যাবতীয় অন্ধকার ও আলো এবং ছায়া ও রোদ এবং সমান হতে পারে না জীবিতরা ও মৃতরা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন শ্রবণযোগ্যতা দান করেন। আপনি তো শোনাতে পারেন না ঐ ব্যক্তিকে যে কবরে আছে' (আল-ফাতির, ৩৫: ১৯-২২)
ক্ষণস্থায়ী জীবনের আরো ক্ষণস্থায়ী ভোগ-আনন্দের পরিবর্তে মানুষকে তিনি সুসংবাদ দিয়েছেন অনন্ত জীবনের অফুরন্ত নেয়ামতের, যা মানুষ না চোখে দেখেছে, না কানে শুনেছে, আর না মনে কল্পনা করেছে। কোরআনের ভাষায়—
وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ كُلَّمَا রُزِقُوا مِنْهَا مِن ثَمَرَةٍ রِزْقًا قَالُوا هَذَا الَّذِي রُزِقْنَا مِن قَبْلُ وَأُتُوا بِهِ مُتَشَابِهًا وَلَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَهُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
'আর সুসংবাদ দান করুন আপনি তাদেরকে যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, (এমর্মে) যে, তাদের জন্য রয়েছে এমন 'বাগবাগিচা' যার পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদী-নহর। যখনই তাদেরকে তা থেকে কোন ফল রিযিকরূপে দান করা হবে, তারা বলবে, এটা তো আমাদের দেয়া হয়েছে ইতিপূর্বে, আসলে তাদের দেয়া হবে দেখতে সদৃশ ফলফলাদি। আর তাদের জন্য রয়েছে সেখানে পবিত্র সঙ্গিনিসকল।' (বাকারাহ, ২: ২৫)
পার্থিব জীবনের মোহে পড়ে যারা ভুলে যায় আখেরাতের জীবন তাদের তিনি সতর্ক করেছেন জাহান্নামের কঠিন শাস্তির বিষয়ে, যা শুরু হবে তো শেষ হবে না, চলতেই থাকবে। কোরআনের ভাষায়—
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًا كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُم بَدَّلْنَاهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَزِيزًا حَكِيمًا
'নিঃসন্দেহে যারা অস্বীকার করেছে আমার আয়াতসমূহ তাদের আমি আগুনে ঝলসাবো। যখনই তাদের চামড়া সিদ্ধ হবে, আমি বদলে দেবো তাদের চামড়া, যেন তারা আযাব চাখতে পারে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রজ্ঞাবান।' (নিসা, ৩: ৫৬)
এসমস্ত সুসংবাদ বা সতর্কবাণী তাঁর নিজের পক্ষ থেকে নয়, মহা-পরাক্রমশালী আল্লাহর পক্ষ থেকে। নিজের জন্য তিনি কোন কীর্তি ও কৃতিত্ব দাবী করেননি। তিনি ছিলেন শুধু আল্লাহর প্রেরিত সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রাসূল। তাঁর দায়িত্ব শুধু মানুষের দুয়ারে সত্যের বাণী পৌঁছে দেয়া। বিদায় হজ্বে ছাহাবা কেরামের মজমায় তিনি অন্যকিছু বলেননি, শুধু এই প্রশ্ন করেছেন, الا هل بلغت শোনো, আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?
টিকাঃ
১. নেভা ও নেভা, নিবে যাওয়া ও নিভে যাওয়া, বলা হয়, সুতরাং নিবু নিবু ও নিভু নিভু হতেই পারে।
📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: রাসূল নন কোন আঞ্চলিক বা জাতীয় নেতা
উত্তম নেতৃত্বগুণের অধিকারী যে কোন উচ্চাভিলাষী ব্যক্তির জন্য আরবদেশ ও আরবজাতি ছিলো কাজের অত্যন্ত অনুকূল ও বিস্তৃত এক ক্ষেত্র। তো মুহম্মদ বিন আব্দুল্লাহ যদি আল্লাহর প্রেরিত নবী ও রাসূল না হতেন, বরং কোন আঞ্চলিক ব্যক্তি বা দেশপ্রেমিক নেতা হতেন; আপন জাতির মাঝে তিনি যদি জাতীয় নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন এবং রাজনীতির পথ ও পন্থা অনুসরণ করতেন তাহলে তিনি কী করতেন? প্রথমেই তিনি আরবজাতীয়তাবাদের ডাক দিয়ে মক্কার কোরায়শ ও আরবের গোত্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতেন এবং একটি সুসংহত আরবসাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে তিনি হতেন মহামান্য আরব-সম্রাট। তারপর শুরু হতো তাঁর অব্যাহত অগ্রযাত্রা। ইচ্ছে করলে তিনি বীর আরবের অশ্বারোহী যোদ্ধাদল নিয়ে রোম ও পারস্যের ভূখণ্ডে আরবজাতীয়তাবাদের বিজয় পতাকাও উড্ডীন করতে পারতেন। বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত আরবদের একসময় যারা অবজ্ঞার চোখে দেখেছে সেই বলদর্পী আগ্রাসী আজমীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব কিছু ছিলো না। যদি মেনে নেয়া হয় যে, তখনকার দুই বৃহৎ শক্তির কোন একটির সঙ্গে শক্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়া রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক হতো না তাহলে অন্তত ইয়ামান, হাবাশা ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশে হামলা চালিয়ে সেগুলোকে নতুন আরবসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া তো অবশ্যই সহজ ছিলো?!
তিনি যদি ইচ্ছা করতেন, শুধু ইচ্ছা, তাহলেই তা হতে পারতো। এমনকি কোন সন্দেহ নেই যে, আবুল হাকাম বিন হিশাম¹ ওতবা বিন রাবী'আ এবং অন্যান্য কোরাইশনেতা তাঁর নেতৃত্বে এই জাতীয় পতাকার নীচে সবার আগে জমায়েত হতো। নবুয়তের অনেক আগে, যখন তিনি মাত্র যুবক, তখনই তারা তাঁকে আছ-ছাদিক, আল-আমীন-এর মর্যাদায় ভূষিত করেনি?! কোরাইশ কি তাদের জীবনের সবচে' নাযুক ঘটনায়, হজরে আসওয়াদ স্থাপনের কঠিন বিরোধের সময় তাঁকে বিচারক মেনে নেয়নি?! সমস্বরে বলে উঠেনি—
هذا الأمين رضينا
এই যে আমাদের আল-আমীন, আমরা তাঁর ফায়ছালা মেনে নিলাম! সবচে' বড় কথা, কোরাইশ কি ওতবার মাধ্যমে তাঁকে বলে পাঠায়নি, 'যদি রাজত্ব তোমার উদ্দেশ্য হয় তাহলে বলো, আমরা আমাদের পতাকা তোমার হাতে তুলে দেবো। আজীবন তুমিই হবে আমাদের নেতা!'
এটা তো নিছক মুখের কথা, বা কোন ছল ও ছলনা ছিলো না, ছিলো সম্ভ্রান্ত কোরাইশের ওয়াদা এবং অভিজাত আরবের প্রতিশ্রুতি, যা জীবন যেতে পারে, কিন্তু মিথ্যা হতে পারে না। রাজনৈতিক প্রতারণা, প্ররোচনা, কপটতা তো তাদের জানাই ছিলো না। কোরাইশের নেতা তো রোম-সম্রাটের দরবারেও মুহম্মদ বিন আব্দুল্লাহ সম্পর্কে সামান্য একটি মিথ্যা উচ্চারণেরও সাহস করেনি এই ভয়ে যে, মানুষ বলবে, দেখো, নেতা হয়ে মিথ্যা বলে! সুতরাং কোরাইশের প্রস্তাবের পর তিনি শুধু ইচ্ছা করলেই হতো, শুধু হাত বাড়ালেই হতো।
কিন্তু না, তিনি তা করেননি। কারণ নবী রাহমাতুল্লিল আলামীন তো এজন্য প্রেরিত হননি যে, একটি মিথ্যার বদলে আরেকটি মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা দান করবেন এবং একটি অনাচার দিয়ে আরেকটি অনাচারের অপসারণ ঘটাবেন; নবী তো এজন্য আসেন না যে, একটি জাতির অহমিকা, আগ্রাসন ও স্বেচ্ছাচার দমন করে আরেকটি জাতিকে সে পথেই পরিচালিত করবেন! তিনি তো বিশেষ কোন দেশ-অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর নেতা ছিলেন না, যার কাজ হলো ন্যায়-অন্যায় সর্ব-উপায়ে স্বজাতির স্বার্থ রক্ষা করা এবং অন্য দেশের ভূমি ও সম্পদ লুণ্ঠন করে স্বদেশের ভাণ্ডার পূর্ণ করা। রোম ও পারস্যের গোলামি থেকে মুক্ত করে মানুষকে আরবের গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ করবেন, এজন্য তো পৃথিবীতে তাঁর আগমন ঘটেনি!
তিনি তো প্রেরিত হয়েছেন সমগ্র মানবজাতির জন্য ‘বাশীর ও নাযীর’, তথা জান্নাতের সুসংবাদদাতা এবং জাহান্নামের আযাব সম্পর্কে সতর্ককারীরূপে! তিনি তো সিরাজুম-মুনীর, আল্লাহর আদেশে আল্লাহর পথে আহ্বানকারী উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তিনি তো পথ দেখাবেন সাদা-কালো, আরব-আজম সবাইকে, আলোর দিকে, সত্যের দিকে!
তিনি তো প্রেরিত হয়েছেন সমস্ত মানুষকে বান্দার বন্দেগি থেকে এক আল্লাহর বন্দেগিতে টেনে আনার জন্য এবং দুনিয়ার সঙ্কীর্ণ গণ্ডী থেকে আখেরাতের প্রশস্ততার দিকে এবং নানা ধর্মের আনাচার থেকে ইসলামের ন্যায় ও সুবিচারের দিকে বের করে আনার জন্য! তিনি তো মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেবেন, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবেন এবং মানুষের জন্য উৎকৃষ্ট বস্তুকে হালাল করবেন, আর নিকৃষ্ট বস্তুসকল তাদের জন্য হারাম করবেন এবং ঐ সকল বন্ধন ও শৃঙ্খল থেকে মানুষকে মুক্ত করবেন যা তাদের উপর এমনভাবে চেপে বসেছিলো যে, বাহ্যত তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোন উপায় ছিলো না। কোথাও কোন আশার আলো ছিলো না। মুক্তির কোন পথ ছিলো, এমনকি মুক্তির কোন ইচ্ছাও ছিলো না।
তাঁর দাওয়াত ও আহ্বান বিশেষ কোন অঞ্চল ও দেশ এবং বিশেষ কোন জাতি ও জনগোষ্ঠীর প্রতি ছিলো না; তাঁর উদাত্ত আহ্বান ও মর্মস্পর্শী আবেদন ছিলো মানবজাতি ও মানববিবেকের উদ্দেশ্যে। তবে অধঃপতনের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যাওয়ার কারণে দয়া ও রহমতের দাবী এটাই ছিলো যে, আরবজাতির মধ্যেই তাঁর আবির্ভাব হবে এবং সেখান থেকেই শুরু হবে নবুয়তের দাওয়াত ও মেহনত। তাছাড়া ভৌগোলিক অবস্থান ও রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের কারণে উম্মুল কোরা ও জাযীরাতুল আরবই ছিলো তাঁর নবুয়ত ও রিসালাতের কেন্দ্রভূমি হওয়ার সবচে' উপযোগী এবং বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে আরবজাতিই ছিলো তাঁর দাওয়াতের ধারক, বাহক ও প্রচারক হওয়ার প্রথম হকদার।
টিকাঃ
১. আবু জেহেল
📄 তৃতীয় পরিচ্ছেদ: নববী তারবিয়াতে আদর্শ ইসলামী সমাজ
যেন মানব-ফুলের তোড়া
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস এবং আখেরাত ও তার পূর্ণ তাফসীরের প্রতি ইয়াকীন ও প্রত্যয়, সর্বোপরি দ্বীন ও শরীয়াতের প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের ভিত্তিমূলের উপর এমন একটি আদর্শসমাজ গড়ে উঠলো যেখানে অন্যায় ও অসুন্দর এবং অসত্য ও অস্বচ্ছ কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিলো না। জীবনের সকল বক্রতা ও জটিলতা, অসমতা ও অমসৃণতা এবং মলিনতা ও আবিলতা সম্পূর্ণরূপে অপসৃত হয়েছিলো। সমাজের প্রতিটি মানুষ এবং আদমের প্রত্যেক সন্তান সেখানে সঠিক অবস্থা ও অবস্থান লাভ করেছিলো। কারো সম্মানহানি যেমন ঘটেনি, তেমনি ঘটেনি কারো অতিমর্যাদাপ্রাপ্তি। যেমন ছিলো মানবসাম্যের অপূর্ব প্রকাশ তেমনি ছিলো নিজস্ব গুণ ও বৈশিষ্ট্যের স্বাভাবিক স্বীকৃতি। গোটা সমাজ যেন কণ্টকমুক্ত ও সুবিন্যস্ত একটি পুষ্পস্তবক, প্রতিটি ফুল ও প্রতিটি পাপড়ি যেখানে শোভাবর্ধক ও দৃষ্টিনন্দন। সমগ্র জনবসতি সেখানে ছিলো অভিন্ন এক পরিবার। সবাই এক আদমের সন্তান, আর আদম হলেন 'মাটির সন্তান'। আরবের সেখানে শ্রেষ্ঠত্ব ছিলো না আজমের উপর এবং আজমের ছিলো না প্রাধান্য আরবের উপর, তবে তাকওয়ার মানদণ্ডে। অর্থাৎ যিনি যত মুত্তাকী তিনি তত মর্যাদাবান এবং তত বিনয়ী। আল্লাহকে যিনি যত ভয় করেন, মানুষ তাকে তত শ্রদ্ধা করে, আর মানুষকে তিনি তত ভালোবাসেন। শ্রেষ্ঠত্বের জাহেলী সংস্কারের মূলে কুঠারাঘাত করে আল্লাহর নবী প্রথমেই ঘোষণা করেছিলেন—
كُلُّكُمْ بَنُو آدَمَ وَآدَمُ خُلِقَ مِنْ تُرَابٍ وَلَيَنْتَهِيَنَّ قَوْمٌ يَفْخَرُونَ بِآبَائِهِمْ أَوْ لَيَكُونُنَّ أَهْوَنُ عَلَى اللهِ تَعَالَى مِنَ الجُعْلانِ
তোমরা সবাই আদমের সন্তান, আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। যারা পূর্বপুরুষের কৌলীন্যে গর্ব করে তারা যেন নিবৃত্ত হয়, নতুবা আল্লাহর কাছে তারা হয়ে যাবে গুবরে পোকার চেয়ে হীন।
মানুষ তাঁর পবিত্র মুখে আরো শুনতে পেলো আরব-চিন্তাচেতনায় মহাবিপ্লব সৃষ্টি-কারী এ মহান বাণী—
يا أيها الناس ! إن الله قد أذهب عنكم عبية الجاهلية وتعظمها بآبائها ، فالناس رجلان رجل بر تقسي كريم على الله ، ورجل فاجر شقي هين على الله
হে লোকসকল! আল্লাহ তোমাদের থেকে দূর করে দিয়েছেন জাহেলিয়াতের নীচতা এবং বংশ-গর্বের কুপ্রথা। মানুষের শ্রেণী এখন শুধু দু'টি; নেক ও মুত্তাকী, যারা আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান এবং মন্দ ও দুর্ভাগা, যারা আল্লাহর কাছে মর্যাদাহীন।
হযরত আবু যর (রা) হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন তাঁকে বললেন,
انظر، فإنك ليس بخير من أحمر ولا أسود، إلا أن تفضله بتقوى الله
'দেখো, তুমি কিন্তু সাদা ও কালো, কারো চেয়ে উত্তম নও এবং নও অভিজাত, তবে আল্লাহর ভয় ও তাকওয়া দ্বারা যদি কারো চেয়ে অগ্রগামী হতে পারো।'
রাতের শেষ প্রহরে যখন তিনি আপন প্রতিপালকের সান্নিধ্যে মুনাজাতে মগ্ন হতেন তখন আর সবকিছুর মধ্যে একথাও নিবেদন করতেন—
وأنا شهيد أن العباد كلهم إخوة
'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তোমার বান্দারা সকলে ভাই ভাই।'
জাহেলিয়াতের শেষ শিকড়টি পর্যন্ত তিনি উপড়ে ফেলেছিলেন এবং ইসলামী সমাজে তার অনুপ্রবেশের সকল ছিদ্রপথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন এই উদাত্ত ঘোষণার মাধ্যমে—
ليس منا من دعا إلى عصبية، وليس منا من قاتل على عصبية، وليس منا من مات على.. عصبية
'সম্প্রদায়প্রীতির ডাক দেবে যে, সে আমাদের দলভুক্ত নয় এবং সাম্প্রদা-য়িকতার উপর লড়াই করবে যে সেও আমাদের দলভুক্ত নয় এবং আমাদের দলভুক্ত নয়, যে সাম্প্রদায়িকতার উপর মারা যাবে।'
হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, আমরা কোন এক যুদ্ধে ছিলাম, হঠাৎ এক মুহাজির এক আনছারীকে কিছু একটা বলে বসলেন, আর আনছারী চিৎকার দিলেন, ইয়া লালআনছার! (কোথায় আনছারীদল), মুহাজিরও চিৎকার করে উঠলেন, ইয়া লালমুহাজিরীন! এ ডাক-চিৎকার শুনে আল্লাহর নবী বললেন—
دعوها، فإنها منتنة
'সাম্প্রদায়িকতার শ্লোগান বর্জন করো, এ তো শুধু দুর্গন্ধ!'
ন্যায়-অন্যায় নির্বিশেষে আপন গোত্র-গোষ্ঠী ও বেরাদারির পক্ষাবলম্বন করা ছিলো জাহেলিয়াতের যুগযুগের সংস্কার। এটা ছিলো জাহেলিয়াতের হামিয়্যাত বা অন্ধগোত্রপ্রীতি। বস্তুত জাহেলিয়াতের সমগ্র জীবনের আবর্তন ছিলো এই একটি নীতির উপর, 'যালিম হোক বা মযলুম, সাহায্য করো তোমার ভাইকে।' আল্লাহর নবী এখানেও আঘাত হানলেন এবং একমাত্র ন্যায় ও সত্যকে পক্ষ গ্রহণের মাপকাঠি ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন—
من نصر قومه على غير الحق فهو كالبعير الذي ردي فهو يزرع بذنبه
'যারা অন্যায়ের উপর আপন কাউমের পক্ষাবলম্বন করবে তাদের উদাহরণ হলো সেই উট যা কুয়ার ভিতরে ঝাঁপ দিতে চায়, আর তার লেজ ধরে তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়।' (অর্থাৎ লেজ টেনে যেমন পতন থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয় তেমনি ঐ ব্যক্তির ধ্বংস অনিবার্য।)
এই নববী দীক্ষা ও তারবিয়াতের ফলে আরবদের স্বভাব ও মানসিকতার এমনই মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছিলো যে, এখন তাদের রুচি ও বোধ ঐ জাহেলী শ্লোগান কোনভাবেই গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলো না। এমনকি কোন একপ্রসঙ্গে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বললেন—
انصر أخاك ظالما أو مظلوমা
'তোমার ভাইকে সাহায্য করো, হোক সে যালিম বা মযলুম',
ছাহাবা কেরাম তখন হয়রান হয়ে বলে উঠলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মযলূমকে তো সাহায্য করবো, কিন্তু যালিমের সাহায্য? তখন তিনি বুঝিয়ে বললেন—
تمنعه من الظلم، فذاك نصرك إياه
তাকে যুলুম থেকে বিরত রাখবে, এটাই হবে তাকে সাহায্য করা।
এভাবেই মদীনার ইসলামী সমাজ এমন এক শান্তিসমাজরূপে আত্মপ্রকাশ করলো, যেখানে সকল শ্রেণী মিলে-মিশে দুধ-চিনির মত একাকার। যেখানে আছে শুধু সহমর্মিতা ও কল্যাণকামিতা; নেই কারো প্রতি কারো সীমালঙ্ঘন ও বিদ্বেষ-আচরণ। পুরুষ সেখানে নারীর পরিচালক এবং নারীর প্রতি দায়িত্ববান, আর নারীসমাজ সততা, বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যে মহীয়ান।
দায়িত্বশীল ও সত্যানুগত সমাজ
সমাজের সর্বস্তরে কর্তব্যবোধ ও দায়িত্বশীলতা এমন জাগ্রত ছিলো যে, নিজের গণ্ডিতে প্রত্যেকে ছিলো শাসক ও পরিচালক এবং প্রত্যেকে তার শাসিত ও পরিচালিতদের বিষয়ে ছিলো পূর্ণ দায়বদ্ধ। পুরো সমাজ গড়ে উঠেছিলো আল্লাহর নবীর এই সুমহান শিক্ষার উপর—
ألا كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته، فالإمام راع ومسؤول عن رعيته، والرجل راع في أهله ومسؤول عن رعيته، والمرأة راعية في بيت زوجها ومسؤولة عن رعيتها، والخادم راع في مال سيده ومسؤول عن رعيته
'শোনো, তোমরা প্রত্যেকে শাসক এবং আপন শাসিতদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত (ও দায়বদ্ধ)। সুতরাং ইমাম তার জনগণের শাসক এবং আপন শাসিতদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত এবং স্বামী তার পরিবার-পরিজনের শাসক এবং আপন শাসিতদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত, আর স্ত্রী তার স্বামীগৃহের শাসক এবং আপন শাসিতদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত। তদ্রূপ সেবক তার মনিবের সম্পদের ব্যবস্থাপক এবং তার অধীন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত।'
এভাবেই সেযুগের ইসলামী সমাজ গড়ে উঠেছিলো এক সত্যিকারের সুশীল ও দায়িত্বসচেতন সমাজরূপে। সেখানে কর্তব্যবোধ যেমন ছিলো তেমনি ছিলো জবাবদেহির অনুভূতি। সবাই সত্যের প্রতি পূর্ণ অনুগত এবং আজীবন সত্যের রক্ষক। মশওয়ারা ও পরামর্শ ছিলো (রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক) সমস্ত কাজের ভিত্তি। খলীফার প্রতি ছিলো তাদের পূর্ণ আনুগত্য, তবে তার ভিত্তি ছিলো আল্লাহর প্রতি খলীফার আনুগত্য। অর্থাৎ মুসলমানদের আনুগত্য তিনি লাভ করবেন, যতক্ষণ তিনি নিজে থাকবেন আল্লাহর পূর্ণ অনুগত। কখনো তিনি আল্লাহর অবাধ্য হলে তার প্রতি আনুগত্যের কোন অবকাশ নেই। কারণ শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের মূলভিত্তি ছিলো আল্লাহর প্রিয় নবীর এই শাশ্বত বাণী—
الاطاعة لمخلوق في معصية الخالق
'খালিকের অবাধ্যতায় কোন মাখলুকের আনুগত্য নেই।'
দেশের সম্পদ, যা একসময় ছিলো শুধু রাজা ও রাজপুরুষদের 'নরম লোকমা' ও সুস্বাদু গ্রাস; যে সম্পদের আবর্তন ছিলো শুধু অভিজাত ও ধনীদের বৃত্তে, তা এখন খলীফার হাতে আল্লাহর আমানত বলে গণ্য হলো, যা ব্যয় হতো শুধু আল্লাহর নির্দেশিত পথে এবং বণ্টিত হতো শুধু হকদারদের মধ্যে। খলীফার ভূমিকা ছিলো শুধু 'মালে ইয়াতীমের' যিম্মাদারের মত, যিনি সচ্ছলতার ক্ষেত্রে বিরত থাকতেন, আর প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করতেন। দেশের জমি ও ভূমি, যা ছিলো রাজা ও রাজপুরুষদের ব্যক্তিগত জায়গীর, আর অবস্থা ছিলো এই, তুষ্ট হলে দান করো বিশাল ভূমি, আর রুষ্ট হলে যা আছে তাও ছিনিয়ে নাও, বরং ভূমিকে তার জন্য এমন সঙ্কীর্ণ করে দাও যেন বেঁচে থাকাই হয়ে পড়ে কঠিন। কয়েকজন ছিলো ভূস্বামী, আর সবাই ছিলো অসহায় ভূমিদাস। যারা ভূস্বামী তারাই ছিলো ভূমিদাসদের ভাগ্যবিধাতা। তাদের ঘামঝরা ফসল নিয়ে তারা ছিনিমিনি খেলতো; কারো কিছু বলার ছিলো না; কিন্তু এখন যমীন হয়ে গেলো আল্লাহর। যমিনের প্রতিটি টুকরার এবং ভূমির প্রতিটি অংশের হিসাব দেয়া খলিফার জন্য এবং তাঁর অধীন সবার জন্য হলো বাধ্যতামূলক। কারণ আল্লাহর নবী তাঁদের এ বিশ্বাস দান করেছিলেন যে, যুলুমের বলে একবিঘত জমি যে গ্রাস করবে কেয়ামতের দিন তার গলায় সাত তবক যমিনের বেড়ী পরানো হবে। তিনি তাঁদের এ ভয় ও বিশ্বাস দান করেছিলেন, আর তাঁরা হৃদয়ের গভীরে তা গ্রহণ করেছিলেন।
রাসূল হলেন সমাজের প্রাণ
বহুদিন থেকে মানবসমাজ জীবনের সকল উদ্যোগ-ইচ্ছা এবং উদ্যম-স্পৃহা হারিয়ে ফেলেছিলো। ত্যাগ ও ভোগ এবং গ্রহণ ও বর্জন কিছুই মানুষের স্বাধীন ইচ্ছায় হতো না। গোটা সমাজ যেন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে ছটফট করছিলো। লাঞ্ছিত, অপদস্থ ও স্বাধীনতাবঞ্চিত এক সমাজ, যার নিজস্ব কোন কণ্ঠ ও কণ্ঠস্বর ছিলো না। মানুষ জানতো না, দু'টি দেশে কেন যুদ্ধ হয়, কেনই বা সন্ধি হয়? সবকিছু হতো তাদের অজ্ঞাতে, অথচ তারাই ছিলো যুদ্ধ বা শান্তির প্রথম বলি! রাজা ও রাজ্যের কোন কিছুতে তাদের না ছিলো আকর্ষণ, না ছিলো বিকর্ষণ; তবু রাজ্যের জন্য তারা যুদ্ধ করতো এবং রাজার জন্য প্রাণ দিতো; দিতে বাধ্য হতো।
সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণীর লোকেরাও যুলুম ও স্বেচ্ছাচারের চূড়ান্ত করতো। সাধারণ মানুষের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরু ছিলো তাদের খেলার বস্তু। বড় থেকে বড় কষ্ট এবং কঠিন থেকে কঠিন কাজ করতে মানুষকে তারা বাধ্য করতো। তারপর ইচ্ছে হলে দাও একমুষ্টি খাবার, কিংবা একটি মুষ্টাঘাত। অনন্যোপায় মানুষ সবকিছু করে যেতো এবং সবকিছু সয়ে যেতো। রাজশক্তি ও তার আশীর্বাদপুষ্ট অন্যান্য শক্তির হাতে তারা ছিলো এমনই অসহায় ও মজবুর। রাজা ও রাজপুরুষদের প্রতি অন্তরে তাদের ভালোবাসা ও আনুগত্য কিছুই ছিলো না, ছিলো শুধু হিংসা, ঘৃণা ও বিদ্বেষ; ছিলো ধিকিধিকি আগুন। প্রভুদেরও মনে অনুগত প্রজাদের প্রতি দয়া-মায়ার কোন অনুভূতি ছিলো না; ছিলো ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের অনুভূতি।
যার প্রতি নেই অন্তরের ভালোবাসা, যদি তারই আনুগত্য করতে মানুষ বাধ্য হয়; বরং যার প্রতি রয়েছে ঘৃণা ও বিদ্বেষ, যদি তারই জন্য ধন-জন বিসর্জন দিতে হয় তাহলে কী হতে পারে এর পরিণতি! যা হতে পারে তাই হলো। হৃদয়ের প্রেরণা-স্ফুলিঙ্গ নিভে গেলো, আবেগ-অনুভূতি এবং উদ্যম-উদ্দীপনা শীতল হয়ে গেলো। কপটতা, প্রতারণা ও লৌকিকতা স্বভাবে পরিণত হলো। অবজ্ঞা ও হীনতা এবং লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার জীবনে মানুষ এমনই অভ্যস্ত হয়ে পড়লো যে এর বিপরীত কিছু কল্পনা করতেও তারা অক্ষম ছিলো।
মানবহৃদয়ের যে সহজাত আবেগ মানুষকে সর্বদা কল্যাণের পথে অনুপ্রাণিত করেছে এবং ইতিহাসের সব অধ্যায়ে অবিস্মরণীয় সব কীর্তি ও কর্মের গৌরব দান করেছে, তার নাম প্রেম ও ভালোবাসা। কিন্তু বহুদিন থেকে মানবহৃদয়ে প্রেম-ভালোবাসার স্রোতধারা শুকিয়ে গিয়েছিলো, কিংবা মানবকল্যাণের পরিবর্তে তা অন্যখাতে প্রবাহিত হয়েছিলো। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে পশুর স্তরে নেমে গিয়েছিলো। এভাবেই যুগের পর যুগ বিগত হয়েছে। রাজার পর রাজা এসেছে, বহু রাজ্যের ভাঙ্গা-গড়া হয়েছে, কিন্তু ইতিহাসের মঞ্চে এমন কোন মহামানবের আবির্ভাব ঘটেনি, যিনি হৃদয়ের শুকিয়ে যাওয়া এ 'প্রেমধারা' নতুনভাবে প্রবাহিত করতে পারেন এবং মানবতার কল্যাণের জন্য তা ব্যবহার করতে পারেন; যিনি তাঁর পরিপূর্ণ গুণ ও সৌন্দর্য এবং সমুন্নত স্বভাব ও চরিত্র দ্বারা মানুষের হৃদয়রাজ্য জয় করতে পারেন এবং মানবহৃদয়ের প্রেম, ভালোবাসা ও ভক্তি-শ্রদ্ধার অধিকারী হতে পারেন। এই যে শূন্যতা, এর ফলে মানুষের হৃদয়ে প্রেম ও ভালোবাসার যা কিছু অবশিষ্ট ছিলো তার একমাত্র আরাধ্য বিষয় হয়ে পড়েছিলো প্রকৃতির সৌন্দর্য, নারীর রূপঐশ্বর্য এবং ক্ষণস্থায়ী জীবনের কৃত্রিম উচ্ছ্বাস-উচ্ছলতা। একারণেই আমরা দেখি, নারী ও প্রকৃতি এবং জীবন ও যৌবনই হলো প্রাচীন কাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত কবিদের কবিতার প্রধান উপজীব্য।
এমন একটি দিকভ্রান্ত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত সমাজে আল্লাহর আখেরি রাসূলরূপে শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ আবির্ভূত হলেন। তিনি সব বেড়াজাল ছিন্ন করলেন এবং সব জঞ্জাল সাফ করলেন। মানবসমাজকে তিনি সত্য-ন্যায়ের আলো দান করলেন এবং হৃদয়ের জগতে নতুন করে প্রেম ও ভালোবাসার ঝর্ণাধারা উৎসারিত করলেন এবং সঠিক খাতে তা প্রবাহিত করলেন। মানুষকে তিনি শুভ্র-সুন্দর ও সফল-সার্থক জীবনের পথ দেখালেন এবং অনন্ত সৌভাগ্য লাভের সুসংবাদ দান করলেন। তাঁর মহান ব্যক্তিসত্তায় আল্লাহ তা'আলা গুণ ও সৌন্দর্যের এবং জ্ঞান ও ঐশ্বর্যের এমন সর্বোত্তম সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন, যার তুলনা মানবজাতির মাঝে দ্বিতীয়টি আর নেই। দূর থেকে মানুষ তাঁকে ভয় করতো, কিন্তু নিকটসান্নিধ্যে এসে শুধু হৃদয় দিয়ে নয়, প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতো। তাঁর রূপ-গুণের 'বয়ানী' শুধু বলতে পেরেছেন, 'তাঁর আগে ও পরে তাঁর কোন তুলনা আমি দেখিনি।'
তাঁর আগমনে মানবহৃদয়ে বিশুদ্ধ প্রেমের বিশুষ্ক ঝর্ণাধারা আবার প্রবাহিত হলো এবং হৃদয় ও আত্মা তাঁর প্রতি এমন আকৃষ্ট হতে লাগলো যেন আছে চুম্বকের কোন আকর্ষণ, যেন তৃষিত আত্মা তাঁরই প্রতীক্ষায় ছিলো ব্যাকুল। তাঁর সম্প্রদায় তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের এমন অনপম প্রদর্শন করেছে যার তুলনা প্রেম ও প্রেমিকদের ইতিহাসে নেই। বিশ্বাস ও বিশ্বস্ততার, ত্যাগ ও আত্মত্যাগের এবং আনুগত্য ও আত্মনিবেদনের এমন সব ঘটনা ঘটেছে এবং সম্পদ, সন্তান, পরিবার ও আপন প্রাণ উৎসর্গ করার এমনসব দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে যা না আগে কখনো ছিলো, না পরে কখনো হবে।
অপূর্ব প্রেম ও প্রাণনিবেদন
হযরত আবু বকর ইবনে আবু কোহাফা (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের পরের ঘটনা। কোরাইশ-নেতারা একদিন মক্কায় তাঁর উপর হামলে পড়লো ও নির্দয়ভাবে প্রহার করলো। আঘাতে আঘাতে শরীর-চেহারা এমন বিধ্বস্ত হলো যে, চেনা যায় না! তাঁর স্বগোত্র বনু তাইমের লোকেরা মৃত্যু নিশ্চিত জেনে কাপড়ে পেঁচিয়ে তাঁকে বহন করে বাড়িতে নিয়ে গেলো। কিন্তু শেষ বিকেলে তিনি কথা বলে উঠলেন এবং প্রথম যে কথাটি বললেন তা হলো, 'আল্লাহর রাসূল কেমন আছেন? তাঁর কী অবস্থা?' লোকেরা তখন রাগ ঝেড়ে বকাঝকা করলো যে, যার জন্য আজ এ দুর্দশা, এ অবস্থায়ও তাঁকেই স্মরণ করা! তারা উঠে চলে গেলো এবং তাঁর মা উম্মে খায়রকে বলে গেলো, মুখে কিছু খানা-পানি দিতে চেষ্টা করুন।
মা যখন একান্ত হলেন এবং কিছু মুখে দিতে পীড়াপীড়ি করলেন তখনো তাঁর একই কথা, আল্লাহর রাসূল কেমন আছেন? তাঁর কী অবস্থা?
মা বললেন, 'আল্লাহর কসম, তোমার সঙ্গীর কোন খবর আমি জানি না।'
তিনি বললেন, খাত্তাবের কন্যা উম্মে জামীলের কাছে গিয়ে তাঁর খোঁজ নিন।
(মায়েরা সন্তানের কথা কবে ফেলতে পেরেছে!) বাধ্য হয়ে তিনি উম্মে জামীলের কাছে গেলেন, বললেন, 'আবু বকর তোমার কাছে মুহম্মদ বিন আব্দুল্লাহর কুশল জিজ্ঞাসা করছে।' হায়, কী কঠিন দিন ছিলো! কেমন কোরবানির দ্বীন কত সহজে আমরা পেয়েছি! উম্মে জামীল হুঁশিয়ার হয়ে বললেন, 'কে আবু বকর, কে মুহম্মদ, আমি জানি না; তবে আপনি চাইলে আপনার পুত্রের কাছে যেতে পারি।' উম্মে খায়র বললেন, 'চলো'।
উম্মে জামীল হযরত আবু বকরের করুণ অবস্থা দেখে অস্থির কন্ঠে বললেন, 'আল্লাহর কসম, আপনার মত মানুষের যারা এ দুরবস্থা করেছে তারা অবশ্যই পাপাচারী, কাফির। আমার বিশ্বাস, আল্লাহ আপনার পক্ষ হতে এর প্রতিশোধ নেবেন।'
আবু বকর শুধু বললেন, 'আল্লাহর রাসূল কেমন আছেন? তাঁর কী খবর?'
উম্মে জামীল বললেন, 'এই যে আপনার আম্মা শুনছেন!'
তিনি বললেন, 'তার দিক থেকে তোমার কোন আশঙ্কা নেই।'
উম্মে জামীল বললেন, 'তিনি ইবনুল আরকামের বাড়ীতে সুস্থ নিরাপদ আছেন।'
তখন হযরত আবু বকর বললেন, 'তাহলে আল্লাহর কসম, আল্লাহর নবীকে নিজের চোখে না দেখে আমি খানা-পানি গ্রহণ করবো না।'
উম্মে খায়র এবং উম্মে জামীল অপেক্ষায় থাকলেন; যখন রাত হলো এবং লোকচলাচল বন্ধ হলো তখন তাঁরা কাঁধের সাহারা দিয়ে তাঁকে নিয়ে বের হলেন এবং বহু কষ্টে তাঁকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে হাজির করলেন। আর হযরত আবু বকর আল্লাহর নবীকে নিজের চোখে দেখার পরই শুধু শান্ত হলেন এবং খানা-পানি গ্রহণ করলেন।
অহুদের বিপর্যয়ের দিন এক আনছারিয়া অস্থির-পেরেশান অবস্থায় বের হলেন। তার বাপ-ভাই ও স্বামী রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলেন এবং সবাই শহীদ হয়েছেন, কিন্তু তিনি যাকে দেখেন শুধু জিজ্ঞাসা করেন, আল্লাহর রাসূল কী অবস্থায় আছেন? লোকেরা বললো, আলহামদু লিল্লাহ, তিনি তেমনই আছেন যেমন তুমি কামনা করো। তিনি বললেন, 'আমাকে দেখাও, আমি নিজের চোখে তাঁকে দেখতে চাই।'
তিনি দেখলেন, আর বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার (নিরাপদ থাকার) পর সব বিপদই আমার কাছে তুচ্ছ।'
হযরত খোবায়ব (রা)-এর হৃদয়বিদারক ঘটনা তো সবাই জানে! এই মযলূম শহীদের স্মরণে যুগে যুগে কত হৃদয় থেকে রক্ত এবং কত চোখ থেকে অশ্রু ঝরেছে তা কে বলতে পারে! তাঁকে যখন শূলে চড়ানো হলো তখন কোরাইশ আমোদ করে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি কি চাইবে যে, মুহম্মদ তোমার স্থানে হোন? তিনি বললেন, 'না, আল্লাহর কসম, না! আমি তো এমনও চাইবো না যে, আমার মুক্তির জন্য তাঁর পায়ে সামান্য কাঁটা বিঁধবে!' একথা শুনে লোকেরা তাঁকে উপহাস করতে লাগলো, আর (কাফের অবস্থায়) সেখানে উপস্থিত আবু সুফয়ান বলে উঠলেন, 'আল্লাহর কসম, কেউ কাউকে এমন ভালোবাসতে আমি দেখিনি যেমন মুহম্মদের সঙ্গীরা তাকে ভালোবাসে!'
হযরত যায়দ ইবনে ছাবিত (রা) বলেন, অহুদের দিন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সা'দ বিন রাবী'-এর খোঁজে পাঠালেন, আর বললেন, যদি তার দেখা পাও, তাকে আমার সালাম বলো, আর বলো, আল্লাহর রাসূল বলছেন, নিজেকে তুমি কী অবস্থায় পাচ্ছো? যায়দ বিন ছাবিত রা. বলেন, আমি নিহতদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তাঁর কাছে পৌঁছলাম। তীর-তলোয়ারের অসংখ্য যখম নিয়ে তিনি তখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছেন। আমি বললাম, হে সা'দ, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে সালাম বলছেন, আর বলছেন, 'আমাকে জানাও নিজেকে তুমি কী অবস্থায় পাচ্ছো?'
তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূলকে সালাম বলো, আর বলো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, জান্নাতের ঘ্রাণ পাচ্ছি।' আর আমার আনছারী কাউমকে বলবে, 'আল্লাহর কাছে তোমাদের কোন কৈফিয়ত থাকবে না, যদি তোমাদের একজনেরও চক্ষু খোলা থাকে, আর আল্লাহর রাসূলের কিছু হয়।' একথা বলেই তিনি প্রাণ ত্যাগ করলেন। অহুদের যুদ্ধে আবু দোজানা ছিলেন আল্লাহর রাসূলের জন্য ঢাল। তীর এসে বিধতো তার পিঠে, আর তিনি ভাবতেন, আমার পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে যাক, আল্লাহর রাসূল নিরাপদ থাকুন।
হযরত মালিক আলখুদরী (রা) রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যখম থেকে রক্ত চুষে নিয়েছিলেন। আল্লাহর রাসূল যখন বললেন, 'থুথু করে রক্তটা ফেলে দাও।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি থুথু ফেলবো না।'
হোদায়বিয়ার সন্ধিকালে আবু সুফয়ান মদিনায় এলেন এবং আপন কন্যা (উম্মুল মুমিনীন) উম্মে হাবীবাহ (রা.)-এর ঘরে গেলেন। তিনি যখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিছানায় বসতে গেলেন, উম্মে হাবীবাহ (রা) সঙ্গে সঙ্গে বিছানা গুটিয়ে ফেললেন। আবু সুফয়ান অবাক হয়ে বললেন, 'হে কন্যা, জানি না, বিছানাকে আমার অনুপযুক্ত ভেবেছো, না আমাকে বিছানার!'
তিনি বললেন, 'এটি আল্লাহর রাসুলের বিছানা, আর আপনি নাপাক মুশরিক।'
হোদায়বিয়ার সন্ধি-আলোচনা থেকে ফিরে গিয়ে ওরওয়া ইবনে মাসউদ ছাকাফী তার কাউমকে বলেছিলেন, 'হে কাউম, আল্লাহর কসম, বহু রাজদরবারে আমি প্রতিনিধিত্ব করেছি। কিসরা, কায়সার, নাজ্জাসীর দরবার দেখেছি। আল্লাহর কসম, আমি দেখিনি, কোন রাজাকে তার সভাসদ এতটা ভক্তি-শ্রদ্ধা করে যতটা মুহম্মদকে তাঁর সঙ্গীরা করে। আল্লাহর কসম, তিনি নাক ঝাড়লে তা তাদের কারো না কারো প্রসারিত হাতের উপর পড়ে, আর সে তা চেহারায় শরীরে মেখে ফেলে। তিনি আদেশ করেন, তারা ছুটে আসে। তিনি অযু করেন, আর লাড়াই শুরু হয় অযুর পানি গ্রহণ করার জন্য। তিনি কথা বলেন, আর পূর্ণ নীরবতা নেমে আসে। আদবের প্রাবল্যে তারা তাঁর প্রতি পূর্ণ নযরে তাকাতেও পারে না।
তুলনাহীন আনুগত্য
জীবন ও সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ যাকে ভালোবেসেছে তার আনুগত্য করে এসেছে; আচরণে, বিচরণে, কর্মে, কর্তব্যে এবং জীবনযাপনের সর্বক্ষেত্রে। আনুগত্যই হলো প্রেম ও ভালোবাসার স্বভাবপ্রকাশ। তো আল্লাহর নবীর অনুসারীরা যখন সর্ব-অন্তকরণে তাঁকে ভালোবাসলেন তখন নিজেদের সর্বসত্তা ও সর্বশক্তি তাঁর নিরঙ্কুশ আনুগত্যে সঁপে দিলেন। কেমন ছিলো তাঁর প্রতি তাঁদের আনুগত্য ও 'আত্মসমর্পণ', এর কিছুটা ঝলক দেখতে হলে শুনুন হযরত সা'দ ইবনে মু'আয (রা)-এর মর্মস্পর্শী বক্তব্য। বদরযুদ্ধের পূর্বে নিজের এবং স্বগোত্রের পক্ষ হতে তিনি বলেছিলেন—
'আমি আনছারদের পক্ষ হতে পূর্ণ আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলছি, আপনি যেখানে ইচ্ছা যাত্রা করুন, যার সঙ্গে ইচ্ছা সম্পর্ক গড়ুন বা ছিন্ন করুন। আমাদের সম্পদ যা ইচ্ছা গ্রহণ করুন, যা ইচ্ছা আমাদের জন্য রাখুন; তবে আপনার রেখে দেওয়া অংশের চেয়ে গ্রহণ করা অংশই হবে আমাদের কাছে অধিক প্রিয়। আর যে বিষয়ে আপনি যে আদেশ করবেন, আমাদের সবকিছু হবে আপনার আদেশের অনুগত। আল্লাহর কসম, আপনি যদি (সুদূর) বারকে গামাদানে যেতে চান, আমরা সঙ্গে যাবো; আল্লাহর কসম, আপনি যদি আমাদের নিয়ে এই সাগরে ঝাঁপ দিতে চান, আমরা ঝাঁপ দেবো।'
তাঁদের নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের আরেকটি উদাহরণ হলো—
তাবুকের গাযওয়া থেকে পিছিয়ে থাকা তিনজনের সঙ্গে যখন কথা বলতে নিষেধ করা হলো, ছাহাবা কেরাম তা এমনভাবে পালন করলেন যে, শাব্দিক অর্থেই মদীনা তাঁদের জন্য হয়ে গেলো কবরের নীরবতার শহর; না কেউ ডাক দেয়, না সাড়া দেয়। পরবর্তী জীবনে সেই তিনজনের একজন হযরত কা'ব নিজেই ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন—
'(তাবুকের গাযওয়ায়) তাঁর সঙ্গ গ্রহণ থেকে যারা পিছিয়ে ছিলো তাদের মধ্য হতে আমাদের তিনজনের সঙ্গে তিনি কথা বলা নিষিদ্ধ করলেন। ব্যস, লোকেরা আমাদের এড়িয়ে চলতে লাগলো এবং আমাদের জন্য অন্যরকম হয়ে গেলো। ফলে এই যমিন আমাদের জন্য হয়ে গেলো একেবারে 'আনজান'। এ যেন আমাদের পরিচিত সেই প্রিয় ভূমি নয়! ...
হতে হতে মানুষের উপেক্ষা যখন আমার জন্য অসহনীয় দীর্ঘ হয়ে গেলো তখন (একদিন) আবু কাতাদার বাগানের দেয়াল টপকে ভিতরে ঢুকলাম। সে ছিলো আমার চাচাত ভাই এবং আমার সবচে' প্রিয় মানুষ। তাকে সালাম দিলাম, আল্লাহর কসম, সে জবাব দিলো না। আমি বললাম, হে আবু কাতাদা, আল্লাহর দোহাই দিয়ে জানতে চাই, তুমি কি জানো যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি?
সে নীরব, আবার দোহাই দিলাম, এবারও নীবর। তৃতীয়বার সে বললো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তখন আমার চোখে অশ্রুর ঢল নামলো এবং আমি আবার দেয়াল টপকে বের হয়ে এলাম।'
নিষেধাজ্ঞার শাস্তিতে দগ্ধ হওয়ার সময় হযরত কা'আব (রা)-এর আনুগত্যের একটি অপূর্ব দৃষ্টান্ত এই যে, এক পর্যায়ে আল্লাহর রাসূলের আদেশবাহক তাঁর কাছে এসে বললেন, আল্লাহর রাসূল আপনাকে স্ত্রী থেকে পৃথক হওয়ার আদেশ করছেন।
তিনি বললেন, তালাক দেবো, না কী করবো? বলা হলো, শুধু পৃথক থাকুন, 'কাছে' যাবেন না। তখন তিনি স্ত্রীকে বললেন, তুমি তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও, এবিষয়ে আল্লাহ কোন ফায়ছালা করা পর্যন্ত সেখানেই থাকো।
এই হযরত কা'আবেরই দুনিয়ার সবকিছুর উপর রাসূলের ভালোবাসাকে অগ্রাধিকার প্রদানের একটি দৃষ্টান্ত এই যে, উপরোক্ত ঘটনায় গাস্সানের বাদশাহ তাঁকে সহানুভূতির প্ররোচনা দিয়ে তার কাছে চলে আসার প্রস্তাব দিলো। আপনজনের বিরূপতার সময় এ সত্যি এক কঠিন পরীক্ষা, কিন্তু তিনি ঘৃণাভরে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। তাঁর নিজের ভাষায় শুনুন—
'মদীনার বাজারে হাঁটছি, এমন সময় সিরিয়াবাসী এক নিবতীকে, যে মদীনায় খাদ্যপণ্য বিক্রি করতে এসেছে, বলতে শুনলাম, কে আমাকে কা'আব ইবনে মালিকের খোঁজ দেবে? লোকেরা আমাকে দেখিয়ে দিলো, আর সে কাছে এসে গাস্সানী বাদশাহর পত্র দিলো। আমি পড়া জানতাম এবং পত্রটি পড়লাম। তাতে ছিলো—
আমি জানতে পেয়েছি, তোমার মনিব তোমার প্রতি বিরূপ। আল্লাহ তো তোমাকে হীনতা ও বঞ্চনার ভূমিতে থাকার জন্য সৃষ্টি করেননি। আমার কাছে চলে এসো, যোগ্য সমাদর পাবে।'
আমি ভাবলাম, এ আরেক পরীক্ষা। তাই পত্রটি চুলায় নিক্ষেপ করলাম।'
আদেশ পাওয়ামাত্র আনুগত্য করার এবং মাথা পেতে গ্রহণ করার একটি উদাহরণ হলো পানমজলিসে মদের নিষিদ্ধতার আয়াত শ্রবণের ঘটনা। হযরত আবু বোরায়দা তাঁর আব্বা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, শরাবের মজলিসে আমরা শরাব পানে মগ্ন ছিলাম। একসময় আমি উঠলাম যে, আল্লাহর রাসূলের খিদমতে হাযির হয়ে সালাম পেশ করবো। এরই মধ্যে মদ হারাম হওয়ার এই আয়াত নাযিল হয়ে গিয়েছিলো—
يَتَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ * إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ
হে ঈমানদারগণ, নিঃসন্দেহে মদ, জুয়া, পূজার বেদী ও ভাগ্য-শর, এগুলো হচ্ছে শয়তানের কাজ, সুতরাং এগুলো পরিহার করো, যাতে সফলকাম হতে পারো। শয়তান তো চায় তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে মদ ও জুয়ার মাধ্যমে, আর (চায়) আল্লাহর স্মরণ থেকে এবং নামায থেকে তোমাদের বাধা দিতে। সুতরাং তোমরা কি (মন্দ থেকে) বিরত হবে'?। (মাইদা, ৯০-৯১)
তখন আমি বন্ধুদের কাছে ফিরে এসে ঐ পর্যন্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করে শুনালাম। বর্ণনাকারী বলেন, কেউ কেউ পানরত ছিলো। কিছুটা মুখে, কিছুটা ঠোঁটে, কিছুটা পেয়ালায়, এমন অবস্থা! তো তারা মুখের ও ঠোঁটের মদ থুথিয়ে ফেলে দিলো এবং পেয়ালার মদ উপুড় করে দিলো, আর বলতে লাগলো, বিরত হলাম ইয়া রাব্ব! বিরত হলাম!
আল্লাহর রাসূলের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য এবং সম্পদ-প্রাণ ও পরিবার পরিজনের উপর তাঁকে অগ্রগণ্য করার একটি অনুপম দৃষ্টান্ত হচ্ছে মুনাফিক-সরদার আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের পুত্র হযরত আব্দুল্লাহ (রা) এর ঘটনা। ইবেন জারীর তাঁর নিজস্ব সনদে ইবনে যায়দ হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের পুত্র আব্দুল্লাহকে ডেকে বললেন, শোনছো না তোমার বাবা কী বলছে? তিনি আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার প্রতি আমার মা-বাবা কোরবান, কী বলেন তিনি? তিনি বললেন, সে বলে, 'যদি আমরা মদীনায় ফিরে যাই, তখন অবশ্যই অভিজাত লোকেরা সেখান থেকে ইতর লোকদের বের করে দেবে।'
আব্দুল্লাহ বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, অবশ্যই সে সত্য বলেছে। আল্লাহর কসম, আপনিই অভিজাত, আর সেই যলীল। ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি তো মদীনায় এসে পড়েছেন। আহলে ইয়াছরিব জানে যে, তাদের মধ্যে আমার চেয়ে পিতানুগত কেউ নেই। তো যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সন্তুষ্ট হন যে, আমি তার মাথা কেটে আনি, তাহলে অবশ্যই আমি তার মাথা হাযির করবো।' তিনি বললেন, 'না, এটা করো না।'
যখন লোকেরা মদীনায় উপনীত হলো তখন হযরত আব্দুল্লাহ মদীনার প্রবেশ-পথে তলোয়ার হাতে পিতার সামনে দাঁড়ালেন আর বললেন, 'তুমিই কি বলেছো, যদি আমরা মদীনায় ফিরে যেতে পারি, তাহলে অবশ্যই অভিজাত লোকেরা সেখান থেকে যলীল লোকদের বের করে দেবে? আল্লাহর কসম, এখনই তুমি জানতে পারবে যে, মর্যাদা তোমার জন্য নাকি আল্লাহর রাসূলের জন্য? আল্লাহর কসম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুমতি ছাড়া তুমি মদীনায় তোমার ঘরের ছায়া পর্যন্ত পাবে না।'
তখন সে চিৎকার করে বলতে লাগলো, 'হে আহলে খাযরাজ, দেখো, আমার পুত্র আমাকে ঘরে যেতে বাধা দেয়! হে আহলে খাযরাজ, দেখো আমার পুত্রের কাণ্ড!'
লোকেরা তাঁকে বুঝালো, কিন্তু তাঁর একই কথা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ইজাযত ছাড়া সে মদীনায় দাখেল হতে পারবে না। লোকেরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘটনা জানালো। তিনি বললেন, গিয়ে বলো, সে যেন তাকে আসতে দেয়। লোকেরা এসে তাঁকে নবীর ফরমান শুনালো। তখন তিনি বললেন, হাঁ নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ যখন এসেছে তখন ঠিক আছে।
টিকাঃ
১. তাফসীরে ইবনে কাছীর, সুরাতুল হুজুরাত
২. তিরমিযি, হযরত আবু হোরায়রা রা. হতে, কিতাবু তাফসীরিল কোরআন, হাদীছ নম্বর ৩১৯৩
৩. মুসনাদের আহমাদ, (মুসনাদুল আনছার) হাদীছ নম্বর, ২০৪৩৮
৪. رواه أبو داود عن زيد بن أرقم رضي الله عنه في كتاب الصلاة
৫. رواه أبو داود عن جبير بن مطعم في كتاب الأدب, হাদীছ নম্বর, ৪৪২৯
৬. ورواه مسلم في كتاب البر والصلة, ১৪২৯ এবং ورواه البخاري في كتاب تفسير القرآن, ৭৪২৬ এবং ৮০২৯
৭. ورواه أحمد في مسنده ৫২০৯ এবং ورواه الترمذي في كتاب تفسير القرآن ৩৩৬২ এবং হাদীছ নম্বর, ২৮৮৬ এবং আল-আদাব (في باقي مسند المكترين) হাদীছ নম্বর, ১৪১০৫ এবং ১৪৫৯৭ এবং ১৪৬৮৮
৮. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৩/০২৮০
৯. বুখারী ও মুসলিম।
১০. رواه البخاري عن عبد الله بن عمر رضي الله عنهما في الكتاب الجمعة : الاستقراض وأداء الديون হাদীছ নম্বর, ২২৩২ ও كتاب العتق হাদীছ নম্বর, ২৩৬৮ এবং ২৩৭১
১১. انظر صحيح البخاري, كتاب الجهاد, باب ماجاء الاطاعة لمخلوق في ... .
১২. ذكره أحمد بن مروান المالكي في " المجالسة " .
১৩. البداية والنهاية المجلد السابع, الصفحة الثالثة والخمسون .
১৪. ইবনুল জাওযীকৃত তারিখ عمر بن الخطাব, ঐ খ. ২ পৃ. ১৬
১৫. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ৩ পৃ. ৩০
১৬. رواه ابن إسحاق إمام المغازي, ورواه البيهقي مرسلا :
১৭. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খ. ৪ পৃ. ৬৩
১৮. যাদুল মা'আদ, খ. ২ পৃ. ১৩৪
১৯. ঐ খ. ২ পৃ. ১৩০
২০. ঐ খ. ২ পৃ. ১৩৬
২১. سيرة ابن هشام ذكر الأسباب الموجبة للمسير إلى مكة .
২২. যাদুল মা'আদ, খ. ৩ পৃ. ১২৫
২৩. যাদুল মা'আদ, খ. ৩ পৃ. ১৩০
২৪. رواه مسلم হাদীছ নম্বর ৮০৮৮
২৫. رواه البخاري عن عبد الرحمن بن عبد الله بن كعب بن مالك في كتاب المغازي
২৬. ورواه أحمد في মুসনাদে আহমাদ, ২০৮২
২৭. (مسند المكيين) হাদীছ নম্বর, ১৫২২৯
২৮. প্রাগুক্ত
২৯. رواه ابن جرير بسنده في التفسير عند قوله : إنما الخمر والميسر, تفسير الطبري, المجلد السابع
৩০. তাফসীরে তাবারী
📄 চতুর্থ পরিচ্ছেদ: জাহেলিয়াতের কাঁচামাল থেকে মানবতার শ্রেষ্ঠ সম্পদ
নতুন ব্যক্তি, নতুন জাতি
এই সুব্যাপ্ত ও সুগভীর ঈমান, এই মহাপ্রজ্ঞাপূর্ণ নববী শিক্ষা ও দীক্ষা, এই অতুলনীয় ছোহবত ও সাহচর্য, এবং এই অলৌকিক গ্রন্থ আলকোরআন, যা চিরসজীব, যার বিস্ময় অনিঃশেষ—এগুলোর মাধ্যমে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমূর্ষু মানবতাকে নতুন প্রাণ ও নতুন জীবন দান করলেন। মানবতার যে বিপুল অব্যবহৃত কাঁচা সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছিলো এবং কারোই জানা ছিলো না, এগুলোর গুণ কী এবং সঠিক ব্যবহারক্ষেত্র কোনটি, বরং জাহেলিয়াতের ঘোর অমানিশায় সব হারিয়ে যাচ্ছিলো, তিনি সেই কাঁচা মানবসম্পদে নতুন প্রাণ সঞ্চার করলেন; সুপ্ত সকল প্রতিভা জাগ্রত করলেন এবং চাপা পড়া যোগ্যতার বিকাশ ঘটালেন। প্রতিটি প্রতিভা ও যোগ্যতাকে তিনি যথাস্থানে নিয়োজিত করলেন। তখন মনে হলো জীবনের শূন্য ক্ষেত্রগুলো এত দিন এই সব প্রতিভা ও যোগ্যতারই অপেক্ষায় ছিলো। সব যেন প্রস্তর-মূর্তির মত নিষ্প্রাণ ছিলো, আর তিনি সেগুলোকে জীবন্ত মানবে রূপান্তরিত করলেন, কিংবা সব যেন মৃতদেহ ছিলো, আর তাঁর প্রাণস্পর্শে সেগুলো প্রাণ লাভ করলো এবং সমাজকে জীবনের বার্তা শোনাতে লাগলো। যারা নিজেরাই ছিলো অন্ধ এবং অন্ধকারে নিমজ্জিত, এখন তারাই মনবতাকে আলো দিয়ে পথ দেখাতে লাগলো। কোরআনের ভাষায়—
أَوَمَن كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُورًا يَمْشِي بِهِ فِي النَّاسِ كَمَن مَّثَلُهُ فِي الظُّلُمَاتِ لَيْسَ بِخَارِجِ مِنْهَا
'যারা মৃত ছিলো, অনন্তর তাদের আমি জীবন দান করলাম এবং তাদের নূর দান করলাম, যা দ্বারা তারা মানবসমাজে পথ চলতে লাগলো, তারা কি হতে পারে ঐ ব্যক্তির মত যে হারিয়ে গেছে বিভিন্ন অন্ধকারে, আর তা থেকে বের হতেই পারছে না!' (আন'আম, ৬:১২২)
তাঁর নূরানী ছোহবত ও জ্যোতির্ময় সাহচর্য এবং হাকীমানা তারবিয়াত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ দীক্ষার গুণে ধ্বংসের প্রান্তে উপনীত জাতির মধ্যে এমন এক বিপ্লব সৃষ্টি হলো যে, অল্প সময়ের মধ্যেই এমন সব ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব হলো, যারা সত্যিকার অর্থেই ছিলেন ইতিহাসের মহাবিস্ময় এবং মানবতার অমূল্য সম্পদ।
ওমর (রা), যিনি পিতা খাত্তাবের বকরিপাল চরাতেন, আর 'অকর্মণ্য, অপদার্থ' ইত্যাদি তিরস্কার শুনতেন, শক্তি, মর্যাদা ও আভিজাত্যে যিনি কোরায়শের মধ্যস্তরের ছিলেন; সমাজে ও সমবয়সীদের মধ্যে যার আলাদা কোন বৈশিষ্ট্য ছিলো না, সেই সাধারণ একজন ওমর হঠাৎ সারা বিশ্বকে আপন প্রতিভা, যোগ্যতা, গুণ ও বৈশিষ্ট্য দ্বারা তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন, কায়সার ও কিসরার সাম্রাজ্য তছনছ করে তাদের রাজমুকুট ছিনিয়ে আনছেন এবং এমন এক ইসলামী সালতানাত গড়ে তুলছেন যা যুগপৎ উভয় সাম্রাজ্যের উপর বিস্তৃত, অথচ সুশাসনে ও সুব্যবস্থায় উভয় সাম্রাজ্যের উর্ধ্বে যার অবস্থান। পক্ষান্তরে তাকওয়া ও ধার্মিকতা এবং ইনছাফ ও সুবিচারের ক্ষেত্রে তো তুলনার কোন প্রশ্নই আসে না; এমনকি ছাহাবা কেরামের মধ্যেও এসব বিষয়ে তিনি ছিলেন বিশিষ্ট।
খালিদ বিন ওলীদের কথা ধরুন; কী ছিলেন তিনি?! খুব বেশী হলে কোরায়শের উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক যুবক, স্থানীয় ও গোত্রীয় যুদ্ধে যার যথেষ্ট খ্যাতি। সেই সুবাদে গোত্রে ও গোত্রপতির কাছে আলাদা কদর আছে, কিন্তু গোত্রীয় গণ্ডি পেরিয়ে আরব উপদ্বীপেও তার বিশেষ কোন পরিচিতি নেই, সেই সাধারণ একযোদ্ধা খালেদ বিন ওয়ালীদ 'আসমানি তলোয়ার' হয়ে এমন ঝলসে উঠলেন, যা সামনে আসে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এই খোদায়ি তলোয়ার রোম সাম্রাজ্যের উপর বিজলী হয়ে এমন চমকালো যে, ইতিহাসের দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে ছড়িয়ে থাকলো শুধু তারই খ্যাতি ও সুখ্যাতি।
আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ, যার সততা, বিশ্বস্ততা ও কোমলতার প্রশংসা ছিলো, ছিলো ক্ষুদ্র বাহিনীপরিচালনার অভিজ্ঞতা, হঠাৎ তিনি হয়ে গেলেন আমীনুল উম্মাহ! উম্মতের বিশ্বস্ততম ব্যক্তি! মুসলমানদের বৃহত্তম বাহিনী-পরিচালনার গুরু দায়িত্ব অর্পিত হলো তাঁর উপর, আর তিনি এমন বিস্ময়কর যোগ্যতার পরিচয় দিলেন যে, রোমকবাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো! এমনকি সমগ্র সিরিয়ায় রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটলো, আর বিদায়কালে রোমসম্রাট সিরিয়ার উপর অসহায় দৃষ্টি বুলিয়ে বলে ওঠেন, 'হে সিরিয়া, তোমাকে বিদায় সালাম, এমন বিদায় যার পর নেই কোন মিলন।'
আমর ইবনুল আছ, কোরায়শে যার বুদ্ধির খ্যাতি ছিলো, কিন্তু তার কীর্তি শুধু এই যে, হাবশার রাজদরবারে দূতরূপে গিয়েছেন হিজরতকারী মুসলমানদের ফেরত আনতে, কিন্তু ফিরে এসেছেন ব্যর্থতার লজ্জা নিয়ে; ইসলাম গ্রহণের পর সেই তিনি হলেন ফাতিহে মিছর—মিশরবিজয়ী এবং অখণ্ড ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির অধিকারী।
সা'আদ বিন আবী ওয়াক্কাছ, ইসলামপূর্ব জীবনে যার বড় কোন যুদ্ধের খবর কেউ জানে না, তিনি হলেন কাদেসিয়ার বিজয়ী বীর। মাদায়েনের চাবি শোভা পেলো তাঁর হাতে। ইরাক ও ইরানকে ইসলামী সালতানাতের সবুজ মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত করে পেলেন 'ফাতিহে আ'যম'—এ অনন্য উপাধি।
সালমান ফারসী, যিনি ছিলেন পারস্যের কোন বস্তির ধর্মীয় নেতার পুত্র। নিজের এলাকার বাইরে যার কোন পরিচিতি ছিলো না। তিনি পারস্য থেকে বের হলেন। দাসত্বের পর দাসত্ব এবং বিপদের পর বিপদ বরণ করে অবশেষে মদীনায় এলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন, আর স্বদেশভূমি পারস্যের রাজধানী মাদায়েনের আমীর ও প্রশাসক হলেন! কালকের সাধারণ এক প্রজা, আজ হলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী শাসক! তার চেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এমন শাসন-ক্ষমতার অধিকারী হয়েও তাঁর তাকওয়া ও ধার্মিকতায় এবং নির্মোহতা ও অনাড়ম্বরতায় আসেনি সামান্যতম পরিবর্তন! পারস্যের বিমুগ্ধ মানুষ অবাক হয়ে দেখে, তাদের শাসক ঝুপড়িতে বাস করেন এবং বোঝা মাথায় বাজারে আসা-যাওয়া করেন।
হাবশী দাস বেলাল, যার কোন মূল্য ছিলো না এমনকি বেচাকেনার বাজারেও, গুণ ও যোগ্যতায় এবং সততা ও ধার্মিকতায় তিনি এমন উচ্চস্তরে উপনীত হলেন যে, আমীরুল মুমিনীন ওমর ইবনুল খাত্তাব পর্যন্ত তাঁকে বলতেন, সাইয়িদুনা বিলাল!
আবু হোযায়ফা (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম সালিম, আরব জাহিলিয়াতে যার আলাদা কোন পরিচয় ছিলো না, ইসলাম তাকে এমনই অত্যুচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত করলো যে, খলীফা ওমর (রা) তাকে খেলাফতের গুরু দায়িত্ব বহনেরও উপযুক্ত মনে করেছেন। তিনি বলেছেন, 'আবু হোযায়ফার আযাদকৃত গোলাম সালিম যদি বেঁচে থাকতো, তাকে আমার স্থলবর্তী করে যেতাম।'
যায়দ ইবনে হারিছা, যিনি লুণ্ঠিত কাফেলা থেকে দাসবাজারে গিয়ে বিক্রি হয়েছেন, মুতার যুদ্ধে ছিলেন মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি, যেখানে ছিলেন জা'ফর বিন আবু তালিব ও খালিদ ইবনে ওয়ালীদের মত অভিজাত কোরায়শ-বীর; আর তাঁর পুত্র উসামা ছিলেন সেই বাহিনীর প্রধান যাতে ছিলেন আবু বকর ও ওমর (রা)-এর মত সাহাবী।
আবু যর, আলমিকদাদ, আবুদ্-দারদা, আম্মার বিন ইয়াসির, মু'আয বিন জাবাল ও উবাই ইবনে কা'আব—জাহেলী যুগের এই সাধারণ মানুষগুলোর উপর দিয়ে যখন ইসলামের সুরভিত বায়ু প্রবাহিত হলো, তাঁরা হয়ে গেলেন যুহদ ও তাকওয়ার আদর্শ এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞার জগতে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক।
আলী ইবনে আবু তালিব, আয়েশা বিনতে আবু বকর, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, যায়দ ইবনে ছাবিত ও আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস—উম্মী নবীর ক্রোড়ে প্রতিপালিত হয়ে এঁরা প্রত্যেকে হয়ে গেলেন মুসলিম উম্মাহর এমন জ্ঞানপ্রদীপ যার আলোতে উদ্ভাসিত হলো সারা বিশ্ব। তাঁদের কলব থেকে প্রবাহিত হলো ইলমের এমন ঝর্ণাধারা এবং তাদের যবান থেকে নিঃসৃত হলো হিকমত ও প্রজ্ঞার এমন অমীয় বাণী, যার তুলনা হতে পারে শুধু যমযমের ঝর্ণাধারা।
তাঁরা এবং অন্যসকল ছাহাবা—এককথায় তাঁদের পরিচয় হলো, হৃদয়ের দিক থেকে মানবসমাজে পবিত্রতম, ইলম ও প্রজ্ঞার দিক থেকে গভীরতম এবং লৌকিকতার দিক থেকে সহজতম। তাঁরা যখন কথা বলতেন, যামানা নিশ্চুপ হয়ে তাঁদের কথা শুনতো এবং ইতিহাসের কলম তা লিখে রাখতো।
ভারসাম্যপূর্ণ মানবগোষ্ঠী
দেখতে দেখতে সবকিছু বিস্ময়কর ভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেলো। জাহেলিয়াতের এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা এই যে 'মানবকাঁচাপণ্য', সমসাময়িক জাতি যাদের দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাতো এবং প্রতিবেশী দেশ যাদের অবজ্ঞা করতো, হঠাৎ তারা দেখে, সেই তুচ্ছ কাঁচাপণ্য থেকে তৈরী হয়ে গেছে এমন মহামূল্যবান মানবসম্পদ যার চেয়ে উত্তম কিছু সভ্যতার ইতিহাসে কখনো ছিলো না, কখনো হবে না। যেমন সুষম ও সুসংহত তেমনি সুবিন্যস্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ, যেন গোল আঙটা, যার প্রান্ত বোঝা যায় না, কিংবা যেন একপশলা বৃষ্টি, যার শুরুতে বেশী কল্যাণ না শেষে, বলা যায় না।
এমন এক মানবগোষ্ঠী, যা মানবজাতি ও মানবসভ্যতার প্রয়োজনের সকল দিকে পরিপূর্ণ ও সুসম্পূর্ণ। কোথাও কোন খুঁত নেই এবং কমবেশী করার সুযোগ নেই। বিশ্বের কাছে তাদের নেই কোন প্রয়োজন, অথচ তাদের কাছে বিশ্বের আছে প্রয়োজন এবং তা সর্ববিষয়ে।
এই নতুন মানবগোষ্ঠী পৃথিবীতে এক নতুন সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করলো এবং নতুন রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার গোড়াপত্তন করলো, অথচ আধুনিক সভ্যতা ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের কোন পরিচয়ই ছিলো না। তবু কোন জাতির কাছ থেকে তাঁদের মেধা ও মানুষ ধার করতে হয়নি এবং কোন রাজা ও রাজ্যের সাহায্য নিতে হয়নি। সম্পূর্ণ আত্মশক্তি ও আত্মযোগ্যতায় তারা এমন এক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেন যা বিস্তৃত ছিলো দুই মহাদেশের বিশাল এলাকায়। প্রতিটি স্থান ও অবস্থান এবং প্রতিটি আসন ও উপবেশন এমন সব মানুষ দ্বারা পূর্ণ করা হলো যারা যোগ্যতা ও ধার্মিকতা এবং শক্তি ও সততার মধ্যে অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেছিলেন।
এই বিশাল বিস্তৃত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার পর স্বভাবতই তা রক্ষা ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিলো সর্বোচ্চ যোগ্যতার অসংখ্য মানুষের। অথচ উম্মাহর তখন মাত্র আবির্ভাবকাল; কয়েকটি দশক মাত্র তার বয়স এবং সেটাও পার হয়েছে শুধু প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা এবং জিহাদ ও সংগ্রামের মধ্যে। কিন্তু বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে দেখতে পেলো নব-আবির্ভূত উম্মাহ কীভাবে সমাজ, রাষ্ট্র ও শাসনযন্ত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি স্তরে কেমন যোগ্যতম মানুষ সরবরাহ করেছে! যেমন আদর্শ শাসক ও প্রশাসক, তেমনি সুদক্ষ পরিচালক ও ব্যবস্থাপক; যেমন বিশ্বস্ত কোষাগার ও হিসাবরক্ষক, তেমনি ন্যায়পরায়ণ কাজী ও বিচারক এবং সুদক্ষ সেনাপতি ও একনিষ্ঠ সৈনিক। সর্বোপরি ধার্মিকতা ও সাধুতায় এবং সরলতা ও উদারতায় অতুলনীয়। সর্ববিষয়ে অন্তরে তাঁদের আল্লাহর ভয় এবং আল্লাহর কাছে জবাবদেহির চিন্তা।
যেহেতু দ্বীনী তারবিয়াত ও ইসলামী দাওয়াতের ধারা অব্যাহত ছিলো সেহেতু সদাপ্রবহমান ঝর্ণার মত উম্মাহ তার রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসনযন্ত্রকে যোগ্য, দক্ষ, দায়িত্ববান ও নিবেদিতপ্রাণ এবং মুত্তাকী ও ধর্মপ্রাণ কর্মী ও কর্মকর্তা সরবরাহ করে যেতে পেরেছে। কখনোই উম্মাহ যোগ্যতা, দক্ষতা, মেধা, প্রতিভা, সততা ও ধার্মিকতার সঙ্কটে পড়েনি। শাসনক্ষমতা সবসময় তাদেরই হাতে ছিলো যারা বিশ্বাস করতেন, এ ক্ষমতা খাজনা উশুল করার জন্য নয়, আর মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের পথে হিদায়াত করার জন্য। চরিত্রে ও ব্যক্তিত্বে যারা সততা ও যোগ্যতার একত্র সমাবেশ ঘটিয়েছেন। ফলে ইসলামী সভ্যতা ও শাসনব্যবস্থা স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছে এবং সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে ঐ সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্য উদ্ভাসিত হতে পেরেছে যা মানবজাতির ইতিহাসের কোন অধ্যায়ে হয়নি।
বস্তুত এত অল্প সময়ে এমন অসাধ্য সাধন হতে পেরেছে শুধু এজন্য যে, আল্লাহর নবী মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবস্বভাবের বন্ধ তালা খোলার জন্য সঠিক চাবিটি ব্যবহার করেছেন। ফলে প্রথম প্রচেষ্টাতেই তা খুলে গিয়েছে এবং মানবস্বভাবের লুকায়িত সকল সম্পদ ও শক্তি, গুণ ও বৈশিষ্ট্য এবং প্রতিভা ও সম্ভাবনা দুনিয়ার সামনে চলে এসেছে। জাহেলিয়াতের মর্মমূলে তিনি সঠিকভাবে আঘাত হেনেছিলেন এবং প্রথম আঘাতেই তা ধরাশায়ী হয়েছিলো। আল্লাহ প্রদত্ত শক্তিতে, অবাধ্য বিশ্বকে তিনি নতুন দিকে এবং সহজ সরল পথে চলতে বাধ্য করেছিলেন, যাতে মানবজাতি তার সৌভাগ্যের নতুন যুগের শুভ উদ্বোধন করতে পারে, আর তা হলো ইসলামী সভ্যতার সেই স্বর্ণালী যুগ, যা মানবতার ললাটে একমাত্র শুভ্র তিলকরূপে এখনো জ্বলজ্বল করছে।