📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: জাহেলী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা
ধর্ম ও রাজনীতি এবং নীতি ও অর্থনীতির সম্পর্ক
সমাজ-সংস্কার ও সমাজ-সংশোধনের কল্যাণ-চিন্তা যারা করেন তারা সাধারণত সমাজে বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা ভেবে দেখেন না, বা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করেন না। অথচ রাজনীতি ও অর্থনীতি হচ্ছে সমাজ-জীবনের অবিচ্ছেদ্য বিষয়। ভুল করে হলেও সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা কালমার্কস তো অর্থনীতিকেই (সেই সূত্রে রাজনীতিকেও) ভেবেছেন সকল সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং সকল পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি ভুল করেছেন, তবে এর দ্বারা মানবজীবনে অর্থনীতি ও রাজনীতির গুরুত্ব তো অতি-অবশ্যই প্রমাণিত হয়। রাজনীতি ও অর্থনীতিকে বাদ দিয়ে বা পাশকাটিয়ে পরিচালিত যে কোন সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারপ্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। কোরআন ও সুন্নাহ তাই ধর্ম ও নীতি-নৈতিকতার কথা যেমন বলেছে তেমনি শাসনব্যবস্থা ও অর্থব্যবস্থার সংশোধনের কথাও গুরুত্বের সঙ্গে বলেছে। পৃথিবীতে ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে যত পরিবর্তন এসেছে এবং যত উত্থান-পতন ঘটেছে তাতে মানুষের চরিত্র ও নৈতিকতার যেমন ভূমিকা ছিলো তেমনি ভূমিকা ছিলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরও। জাতীয় জীবনের গঠন-পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধ্যান-ধারণা ও বিধিবিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর অনুঘটকরূপে গণ্য হয়ে থাকে।
ইসলামপূর্ব যুগের জাহেলিয়াত সম্পর্কে আলোচনার ক্ষেত্রেও একই কথা। জাহেলী যুগের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও জনপদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক ও সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা করার পর তখনকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চালচিত্রের উপরও বিশেষভাবে আলোকপাত করা জরুরী বলে আমরা মনে করি। সুতরাং এখানে আমরা অতি সংক্ষেপে সে আলোচনাটা সেরে নিচ্ছি।
স্বেচ্ছাচারী রাজতন্ত্র
এককথায় বলা যায়, ইসলামপূর্ব জাহেলী যুগ ছিলো একনায়কতন্ত্র ও স্বেচ্ছাচারী শাসনের যুগ। কেননা অবাধ রাজতন্ত্রই ছিলো সে যুগের একমাত্র প্রচলিত শাসন -ব্যবস্থা, যেখানে রাজ্যের ও প্রজাবর্গের প্রতিটি বিষয়ে রাজ-আজ্ঞাই ছিলো প্রথম কথা এবং শেষ কথা। রাজতন্ত্র প্রায় ক্ষেত্রে রাজবংশের অতিমানবীয় মর্যাদার উপর প্রতিষ্ঠা লাভ করতো, যেমন ছিলো ইরানে। সাসানী রাজবংশের দাবী ও বিশ্বাস ছিলো, শাসনক্ষমতার উপর তাদের রয়েছে মৌরুসি অধিকার এবং তা ঐশী সমর্থনপুষ্ট। প্রজাসমাজেও এ বিশ্বাস তারা বদ্ধমূল করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে এবং সফলও হয়েছে। একসময় পারস্যের প্রজাবর্গ সাসানীদের এই পবিত্র রাজ-অধিকার স্বীকার করে নিয়েছিলো, এমনকি তা তাদের ধর্মবিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিলো।
কখনো রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বয়ং সম্রাটের নিরঙ্কুশ অতিমানবীয় মর্যাদার উপর। যেমন ছিলো চীনে সম্রাটকে প্রজারা 'আকাশের পুত্র' বলে অভিহিত করতো। কেননা তাদের বিশ্বাসে, আকাশ ও পৃথিবী হলো 'নর' ও 'নারী' এবং উভয়ের মিলনে সৃষ্টিকুলের উদ্ভব। আর সম্রাট প্রথম 'খাতা' হচ্ছেন আকাশ-পৃথিবীর মিলনের প্রথম ফল। এ বিশ্বাসের ভিত্তিতেই সিংহাসনে সমাসীন সম্রাটকে মনে করা হতো প্রজাকূলের একমাত্র পিতা, যার নিরঙ্কুশ অধিকার রয়েছে যে কোন ইচ্ছা করার এবং তা কার্যকর করার। সম্রাটকে সম্বোধন করা হতো 'আপনিই আমাদের মাতা-পিতা' বলে! সম্রাট লীয়ান, কিংবা তাঈশুঙের মৃত্যুতে সমগ্র চীন এমন শোক-মাতম করেছিলো যার নযির ইতিহাসে দ্বিতীয়টি আর নেই। কেউ সুই-খুঁচিয়ে চেহারা রক্তাক্ত করেছে, কেউ কফিনে মাথা ঠুকে নাক-কান জখম করেছে। বুকফাটা কান্না তো ছিলো মামুলি কথা!¹
কখনো রাজতন্ত্রের ভিত্তি ছিলো বিশেষ কোন জাতির এবং বিশেষ কোন দেশ ও ভূখণ্ডের অতিমানবীয় মর্যাদার উপর। যেমন ছিলো রোমান সাম্রাজ্যে। রোম ও রোমান জাতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ছিলো সাম্রাজ্যের মৌলিক বিধানের অন্তর্ভুক্ত। অন্যান্য জাতি ও জনগোষ্ঠী ছিলো রোমান জাতীয়তার সেবাদাস, দেহের শিরা- উপশিরা যেমন রক্ত সঞ্চালন করে নিয়ে যায় দেহের মূল কেন্দ্র হৃদপিণ্ডে, তেমনি রোমানরা ছিলো সাম্রাজ্যের হৃদপিণ্ড। তাদের অধিকার ছিলো যে কোন আইন লঙ্ঘন করার, যে কারো অধিকার হরণ এবং সম্ভ্রম লুণ্ঠন করার। যে কোন জুলুম ও স্বেচ্ছাচার তাদের জন্য ছিলো বৈধ। এমনকি রোমান-ধর্মবিশ্বাস গ্রহণ এবং রোমান সাম্রাজ্যের প্রতি আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততা প্রদর্শনের পরও কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রোমানদের জুলুম-নির্যাতন থেকে রেহাই পাবে, এমন নিশ্চয়তা ছিলো না। নিজেদের ভূখণ্ডে বিজিত জাতির স্বায়ত্তশাসন, বা মৌলিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার কোন উপায় ছিলো না। এ ধরনের চিন্তা করাও ছিলো ফাঁসি-যোগ্য রাজদ্রোহিতার অপরাধ। বিজিত প্রতিটি অঞ্চল ও জনগোষ্ঠী যেন ছিলো সেই উটনী যা ভার বহন করবে, দুধও দেবে। বিনিময়ে পাবে শুধু বেঁচে থাকার এবং ওলানে দুধ জমা হওয়ার মত দানাপানি।
রোমান সাম্রাজ্য সম্পর্কে রবার্ট ব্রিফোল্ট বলেন- 'রোমান সাম্রাজ্যের পতন ও ধ্বংসের মূল কারণ কিন্তু ক্রমবর্ধমান অপরাধ ও দুর্নীতি ছিলো না (যেমন হত্যা, লুণ্ঠন, ঘুষ ইত্যাদি), বরং মূল কারণ ছিল এই যে, যাবতীয় দুর্নীতি, মন্দাচার ও বাস্তববিমুখতা ছিলো তাদের স্বভাবপ্রবণতা, যা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের সূচনা থেকেই বিদ্যমান ছিলো এবং তা সমাজ ও রাষ্ট্রের গভীরে শিকড় গেড়ে বসেছিলো। যে কোন মানবসমাজ বা মানবপ্রতিষ্ঠান যদি এ ধরনের ভুল বুনিয়াদ ও ভ্রান্ত ভিত্তির উপর গড়ে ওঠে তাহলে নিছক মেধা ও কুশলতা দ্বারা, তা যত বিপুল পরিমাণেই হোক, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানকে পতন থেকে রক্ষা করতে পারে না। যেহেতু অনাচার ও মন্দাচারই ছিলো রোমান সাম্রাজ্যের ভিত্তি-বুনিয়াদ সেহেতু একদিন না একদিন তার পতন ও বিলুপ্তিও ছিলো অনিবার্য। কেননা আমরা দেখেছি, রোমান সাম্রাজ্য গড়েই উঠেছিলো বিপুল জনগোষ্ঠীকে শোষণ করে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভোগবিলাসের আয়োজন করার উদ্দেশ্যে। এটা ঠিক যে, রোমে ব্যবসা-বাণিজ্য পূর্ণ সততা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে পরিচালিত হতো এবং তা ছিলো রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। তদুপরি বহুমুখী যোগ্যতায় এবং বিচারব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতায় এ সাম্রাজ্য ছিলো অতুলনীয়, কিন্তু এতসব গুণ ও বৈশিষ্ট্য সাম্রাজ্যকে তার বুনিয়াদি গলদের নির্মম পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারেনি এবং পারার কথাও নয়।'²
রোমান শাসনে মিসর ও সিরিয়া
ডক্টর আলফ্রেড বাটলার মিসর ও রোমান শাসন সম্পর্কে বলেন- 'মিসরে রোমান শাসনের একটাই শুধু লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিলো, শাসকদের ভোগের জন্য প্রজাশোষণ ও সম্পদলুণ্ঠন। মানুষের কল্যাণ ও সুখ-শান্তি এবং জীবন ও জীবিকা নিশ্চিত করার চিন্তাও তাদের ছিলো না; মন ও মনন এবং চিন্তা ও দর্শনের উৎকর্ষসাধন তো অনেক পরের কথা, এমনকি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের কথাও তারা ভাবতো না। আগা থেকে গোড়া তাদের শাসন ছিলো একটি বিদেশী শাসন, যা টিকে ছিলো প্রজাসমর্থনের পরিবর্তে সম্পূর্ণ সামরিক শক্তির উপর। শাসিত জনগোষ্ঠীর প্রতি হিতৈষণা ও মমত্ববোধ বলতে কিছুই তাদের মধ্যে ছিলো না।'³
একজন সিরীয় আরব ঐতিহাসিক সিরিয়ায় রোমান শাসন সম্পর্কে লিখেছেন- 'শুরুর দিকে সিরীয়দের প্রতি রোমান-আচরণ ছিলো কিছুটা ন্যায়ানুগ; যদিও তাদের রাজত্বে আভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলা ছিলো। কিন্তু যখন রোমান সাম্রাজ্য জরাগ্রস্ত হয়ে পড়ে তখন সিরিয়ায় তাদের শাসন স্বেচ্ছাচারের নিকৃষ্টতম স্তরে নেমে গিয়েছিলো। অসহায় দাসের প্রতি নিষ্ঠুর মনিবের যে পাশবিকতম আচরণ কল্পনা করা যায় সেটাই তারা তাদের শাসিত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে করতো। রোমানরা সিরিয়াকে কখনো সরাসরি তাদের সাম্রাজ্যভুক্ত করেনি। ফলে সিরীয় ভূমি যেমন রোমান ভূখণ্ডের মর্যাদা পায়নি তেমনি সিরীয়রাও পায়নি রোমান নাগরিকের স্বীকৃতি। একজন রোমান যেসব অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতো, হতভাগ্য সিরীয়দের জন্য সেগুলো ছিলো নিষিদ্ধ। নিজ ভূমিতেই তারা ছিলো প্রবাসী, শাসিত ও শোষিত। শোষণমূলক কর-খাজনা আদায়ের জন্য অনেক সময় মানুষ কোলের সন্তান পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হতো। শোষণ- নিপীড়ন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলো। ক্রীতদাস বানানো এবং বেগার খাটানো ছিলো সাধারণ রেওয়াজ। ক্রীতদাস ও মজুরদের বেগার-শ্রমেই রোমানরা তাদের এতো গর্বের ইমারত-স্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছিলো তাদের বিশাল সাম্রাজ্যে।'
রোমানরা সিরিয়ায় সাতশ বছর রাজত্ব করেছে। সিরিয়া ছিলো শান্তিপূর্ণ দেশ, রোমান রাজত্বের উপসর্গরূপেই সেখানে শুরু হয় বিবাদ-গোলযোগ, হানাহানি ও স্বেচ্ছাচার। এদিকে গ্রীকরা সিরিয়ায় রাজত্ব করেছে তিনশ উনসত্তর বছর। তাদের রাজত্বকালে সমগ্র ভূখণ্ডটি ছিলো ভয়ঙ্কর যুদ্ধবিগ্রহের কবলে। সিরীয়দের উপর তখন নেমে আসে অত্যাচার উৎপীড়নের ভয়াবহ অন্ধকার। গ্রীকজাতির স্বভাবপাশবিকতা ও সম্পদলিলা বীভৎসতম রূপে প্রকাশ পায়। বস্তুত সিরীয় জনগোষ্ঠীর জন্য গ্রীকশাসন দেখা দিয়েছিলো চরম অভিশাপ এবং ঘোরতম বিপদরূপে।⁴
মোটকথা, রোমান ও পারসিক উপনিবেশগুলো বিদেশী শাসনের যাঁতাকলে শুধু পিষ্ট হচ্ছিলো এবং তাদের দুঃখদুর্দশা চরমে পৌঁছে গিয়েছিলো। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সর্বদিক থেকেই দেশ ছিলো চরম অস্থিরতার শিকার; এমনকি রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর অবস্থা ছিলো আরো করুণ।
ইরানের খাজনা ও রাজস্বব্যবস্থা
ইরানের খাজনাব্যবস্থা ও রাজস্বনীতি কোনভাবেই ন্যায়ানুগ ও স্থিতিশীল ছিলো না, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছিলো চরম শোষণমূলক ও অস্থিতিশীল। রাজস্ব-সংগ্রহকারীদের খেয়ালখুশি ও মন-মর্জির উপর যেমন তা নির্ভর করতো তেমনি দেশের রাজনৈতিক ও যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে তা ওঠানামা করতো। 'সাসানী শাসনকালে ইরান' গ্রন্থের লেখক বলেন- 'কর নির্ধারণ ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে রাজকর্মচারীরা সততা ও স্বচ্ছতার পরিচয় দিতো না, বরং শোষণ ও লুণ্ঠনের মানসিকতা পোষণ করতো। যেহেতু কর ও রাজস্বের পরিমাণ ফি বছর পরিবর্তিত হতো এবং ওঠানামা করতো সেহেতু রাজ্যের আয়-ব্যয় কখনো পরিকল্পিত ও স্থিতিপূর্ণ হতো না। 'যেমন খুশি আয় যেমন খুশি ব্যয়' এই ছিলো অবস্থা। এমনও হতো যে, যুদ্ধ বেঁধে গেছে, অথচ রাজকোষ শূন্য, তখন 'যুদ্ধব্যয়' নামে নতুন কর চাপানো হতো। আর প্রায় সবসময় সাধারণভাবে পশ্চিমের সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলো এবং বিশেষভাবে বাবিল এই করনৈরাজ্যের শিকার হতো।'⁵
রাজভাণ্ডার ও রাজার ভাণ্ডার
দেশের উন্নয়ন ও প্রজাকল্যাণে রাজকোষ থেকে যা ব্যয় করা হতো তার পরিমাণ ছিলো অতি নগণ্য। বরং 'সম্পদ জমা করো রাজভাণ্ডারে নয়, রাজার ভাণ্ডারে' এ-ই ছিলো প্রাচীনকাল থেকে পারস্যের নীতি। তাই যতদূর সম্ভব নগদ অর্থ, সোনাদানা ও মূল্যবান সামগ্রী সম্রাটের ব্যক্তিগত কোষাগারে জমা হতো। সম্রাট দ্বিতীয় খসরুর ব্যক্তিগত সম্পদ যখন মাদায়েনে নবনির্মিত প্রাসাদে স্থানান্তরিত হয় তখন শুধু স্বর্ণের পরিমাণই ছিলো ৪৬ কোটি ৮০ লাখ মিছকাল, অর্থাৎ ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ফ্রাংক স্বর্ণমুদ্রা। তার রাজত্বের তেরবছর পূর্তির পর এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিলো ৮০ কোটি মিছকাল। সম্রাট সাহেবের রাজমুকুটে ব্যবহৃত স্বর্ণের পরিমাণ ছিলো ১২০ পাউন্ড (প্রায় দেড় মন)। (রাজমুকুটটি ছিলো স্বর্ণ-রৌপ্যনির্মিত এবং হিরা, পান্না ও মুক্তাখচিত। আর তা 'রাজমস্তকের' উপর এত সূক্ষ্ম স্বর্ণশৃঙ্খল দ্বারা ঝুলন্ত ছিলো যে, দূর থেকে বোঝা যেতো না। মনে হতো রাজমস্তক স্বয়ং তা ধারণ করে আছে, অথচ কোন মানব-মস্তকের পক্ষে এত ভার ধারণ করা সম্ভবই ছিলো না। কেননা তার ওজন ছিলো ৯১ কিলোগ্রামেরও বেশী। বেচারা সম্রাট!)
বিশাল শ্রেণীবৈষম্য
পারস্যের জাতীয় জীবনে সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য ছিলো অকল্পনীয় পরিমাণে। তবে তা সীমাবদ্ধ ছিলো অল্পকিছু ব্যক্তি ও পরিবারের মধ্যে। আর বিশাল জনগোষ্ঠী ছিলো অভাব ও দারিদ্র্যের অসহায় শিকার। পারস্যের ইতিহাসে সম্রাট নওশেরাঁওয়া ছিলেন সুশাসন ও সুবিচারের ক্ষেত্রে প্রবাদমর্যাদার অধিকারী। তারই শাসনকাল সম্পর্কে 'সাসানী শাসনে ইরান' গ্রন্থের লেখক বলেন- 'সম্রাট নওশেরাঁওয়া রাজ্যের অর্থব্যবস্থায় যে সংস্কার সাধন করেছিলেন তা প্রজাস্বার্থের চেয়ে রাজকোষের স্বার্থই বেশী রক্ষা করেছিলো। ফলে প্রজাসাধারণ আগের মতই অজ্ঞতা ও দারিদ্র্যের অন্ধকারে জীবনধারণ করতো। যেসব বাইজান্টাইন দার্শনিক 'রাজ-আশ্রয়' গ্রহণ করেছিলেন, অচিরেই তারা পারস্যের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। একথা সত্য যে, তারা এমন উচ্চমার্গের দার্শনিক ছিলেন না যে, একটি ভিন্ন জাতির সংস্কৃতি ও রীতি-প্রথা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করতে পারেন; তদুপরি একজন দার্শনিকসম্রাটের রাজত্বে যে সকল কল্যাণচিন্তার প্রত্যাশা ছিলো তা তারা দেখতে পাননি; সর্বোপরি জাতিতত্ত্বের গভীর অধ্যয়নেও তাদের আগ্রহ ছিলো না এবং তাদের মননশীলতাও এমন ছিলো না, যা জাতিতত্ত্বে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তির হয়ে থাকে; এসব কারণে পারস্যের প্রতি তাদের বীতশ্রদ্ধার ভিত্তি ছিলো সাধারণ কতিপয় আচার-প্রথা, যেমন কন্যা-ভগ্নিবিবাহপ্রথা এবং মৃতদেহ উন্মুক্ত ফেলে রাখার সংস্কার। অথচ নিছক এ জাতীয় রীতি-প্রথা তাদের পারস্যবাস অপ্রিয় হওয়ার কারণ হওয়া উচিত ছিলো না। আসল কারণ তো ছিলো উচ্চ-নীচ জাতপ্রথা, সমাজের অনতিক্রম্য শ্রেণী-বৈষম্য, নিদারুণ অভাব ও দুর্দশাগ্রস্ত জীবন, দুর্বলের প্রতি সবলের অবর্ণনীয় যুলুম-নিপীড়ন এবং চরম পাশবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ; এগুলো ছিলো আসল মর্মপীড়ার কারণ, (অথচ এগুলো তাদের নযরেই পড়েনি)।'⁶
এ নাযুক অবস্থা শুধু ইরানেই ছিলো না, বরং তাদের সমসাময়িক ও প্রতিপক্ষ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যেও অমানবিক শ্রেণীব্যবস্থা ও বৈষম্যপ্রথা বিদ্যমান ছিলো। রবার্ট ব্রিফোল্ট লিখেছেন- 'এটাই চিরাচরিত নিয়ম যে, যখন কোন সমাজ-প্রতিষ্ঠান পতনমুখী হয়ে পড়ে তখন সমাজনিয়ন্ত্রকরা আর কোন উপায় খুঁজে পায় না সমাজের গতি ও অগ্রগতি রুদ্ধ করে দেয়া ছাড়া। এ কারণেই দেখা যায়, রোমান সমাজ (তার পতনযুগে) চরম নিপীড়নমূলক শ্রেণীপ্রথার নিগড়ে আবদ্ধ হয়ে ধুকে ধুকে মরছিলো। সমাজের নিম্নশ্রেণীর কারো উপায় ছিলো না পেশা পরিবর্তন করার। সন্তান বাধ্য ছিলো বাবার পেশায় পড়ে থেকে অন্ধকার ভবিষ্যতকেই বরণ করে নিতে।'⁷ উভয় সাম্রাজ্যেই বড় বড় রাজপদ ঐসব বনেদি ঘর ও ঘরানার জন্যই নির্ধারিত ছিলো যাদের প্রভাব ও প্রতাপ ছিলো এবং রাজবংশের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিলো।
পারস্যের কৃষকসমাজ
নিত্যনতুন কর ও খাজনার বোঝা পারস্যের কৃষকসমাজ ও সাধারণ মানুষের কোমর ভেঙ্গে দিয়েছিলো। ফলে বহু কৃষক কৃষিকাজ ছেড়ে ধর্মীয় উপাসনালয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। উদ্দেশ্য ছিলো করভার থেকে এবং বাধ্যতামূলক সেনাভর্তি থেকে আত্মরক্ষা করা। কেননা রাজবংশের প্রতি যেমন তাদের ভালোবাসা ছিলো না, তেমনি যুদ্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতিও কোন আকর্ষণ ছিলো না। ফলে ব্যাপক বেকারত্ব দেখা দিলো এবং অপরাধপ্রবণতা বেড়ে গেলো, আর মানুষ ঝুঁকে পড়লো অসদুপায়ে উপার্জনের বিভিন্ন পথে। পারস্যের কৃষকসমাজ, যারা ছিলো রাজ্যের খাদ্য ও রাজস্বের প্রধান উৎস তাদের দুর্দশা ও করুণ অবস্থা সম্পর্কে 'সাসানী আমলে ইরান' গ্রন্থের লেখক বলেন- 'কৃষকরা ছিলো চরম দুঃখ-দুর্দশায় নিপতিত। তাদের পরিচয় ছিলো, নিজ নিজ ভূমির সঙ্গে বাঁধা ভূমিদাস। তাদের থেকে যখন তখন যে কোন বেগারশ্রম নেয়া হতো। ঐতিহাসিক এ্যাম্মিয়ান মারসেলিনিউস বলেন, 'এই হতভাগ্য কৃষকদের বড় বড় দল (ভারবহন ও অন্যান্য কাজের জন্য) সৈন্যবাহিনীর পিছনে পায়ে হেঁটে চলতো। এ থেকে বাঁচার কোন উপায় ছিলো না। দাসত্বই যেন ছিলো তাদের স্থায়ী নিয়তি ও জীবন-পরিণতি। ন্যূনতম মজুরি বা সামান্য সান্ত্বনা-পুরস্কারও জুটতো না তাদের ভাগ্যে। ভূস্বামীদের সঙ্গে তাদের নিতান্তই দাস-মনিবের সম্পর্ক ছিলো।'⁸
স্বেচ্ছাচার ও যুলুম-অত্যাচার
সিরিয়া ও ইরাকে ইহুদিরা এবং মিসরে ইয়াকূবীরা ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়ন ও যুলুম-অত্যাচারের শিকার ছিলো। রাজকর্মচারী ও শাসকশ্রেণী এমন পাশবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করতো যে, সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছিলো। না জানমালের নিরাপত্তা ছিলো, না ইয্যত-আবরু রক্ষিত ছিলো। চোখ বুজে ঠোঁট কামড়ে সবকিছু সয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের কোন উপায় ছিলো না। ক্ষমতার বাগডোর যাদের হাতে তারা কারো অভিযোগ-ফরিয়াদ কানেই তুলতো না, শুনেও শুনতো না। হতভাগ্য মানুষ শেষে ধরেই নিয়েছিলো, এ অভিশপ্ত জীবনই তাদের নিয়তি, যা থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই। তবে কখনো কখনো কেউ কেউ মৃত্যুযন্ত্রণার মাধ্যমে জীবনযন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণের চেষ্টা করতো।
অসার সভ্যতা ও ভোগবাদী জীবন
রোম ও পারস্য উভয় সাম্রাজ্যেই মানুষ ভোগবিলাসের জীবনে প্রবলভাবে মেতে উঠেছিলো এবং কৃত্রিম জীবন ও নগরসভ্যতার পঙ্কে আকণ্ঠ ডুবে ছিলো। রোমান ও পারসিক রাজপুরুষ ও শাসকশ্রেণী ভোগবিলাসের ঘোরে এমনই বিভোর ছিলো, যেন রাজ্যশাসন ছিলো গৌণ; জীবনকে চুটিয়ে ভোগ করাই ছিলো মুখ্য। তাদের একমাত্র চিন্তা ছিলো চেটেপুটে আনন্দ করা এবং জীবন থেকে স্ফূর্তির রস নিংড়ে বের করা। আয়েশ-অপচয় ছিলো এমনই সীমাহীন যে, কল্পনা করাও সম্ভব নয়। জীবনের আড়ম্বরে, ভোগের উপাদানে এবং বিনোদনের উপায়-উপকরণে ছিলো এমন বৈচিত্র্য, সূক্ষ্মতা ও রসবোধ যার বিবরণ মনে হবে স্বপ্নের মত। তবু কিছুটা শোনা যাক- সম্রাট পারভেজের 'ব্যবহারে' ছিলো বারো হাজার সুন্দরী নারী এবং পঞ্চাশ হাজার সুন্দর ঘোড়া; ছিলো অসংখ্য মনোরম প্রাসাদ। আনন্দ-বিলাসের এমন সব আয়োজন এবং সম্পদপ্রাচুর্যের এমন রকমারি প্রদর্শন ছিলো যে, চিন্তা-বুদ্ধি রীতিমত তাক লেগে যায়। জৌলুসে, জাঁকজমকে ও আলোঝলমলতায় তার খাছ মহল নিজে ছিলো নিজের তুলনা। পার্সিক ধর্মের অনুসারী ঐতিহাসিক শাহীন ম্যাকারিউস বলেন- 'ইতিহাস বলে না যে, পৃথিবীর কোন বাদশাহ বা সম্রাট পারস্যের রাজপুরুষদের মত ভোগবিলাসের দৃষ্টান্ত রাখতে পেরেছেন, যাদের কাছে উপহার উপঢৌকন জড়ো হতো দূর ও নিকটপ্রাচ্যের সকল দেশ থেকে।'⁹
ইসলামী বিজয়াভিযানের মুখে ইরাক থেকে পলায়নকালে তারা বিপুল পরিমাণ বিলাসপোশাক, স্বর্ণপাত্র, প্রসাধনী, সুবাসদ্রব্য এবং বিচিত্র বস্তুসামগ্রী ফেলে গিয়েছিলো, যার অর্থমূল্য পরিমাপ করাও দুঃসাধ্য ছিলো। তাবারীর বর্ণনায়, মাদায়েন বিজয়কালে আরবরা কিছু তুর্কী খিমা পেয়েছিলো যা মুখগালা করা অসংখ্য ঝুড়িতে পূর্ণ ছিলো। আরবরা বলে, 'আমরা ভেবেছিলাম, এগুলোতে খাদ্যসামগ্রী রয়েছে, কিন্তু দেখা গেলো, তা সোনা-রূপার দ্রব্যসামগ্রীতে পূর্ণ!'¹⁰ মাদায়েনদিবসে আরবরা যে আজব গালিচাটি পেয়েছিলো, যার নাম ছিলো 'ফরাস বাহার', যাতে বসে ইরানী রাজপুরুষেরা সুর ও সুরা উপভোগ করতেন তার বর্ণনা দিতে গিয়ে আরব ঐতিহাসিকগণ বলেন- 'একটি মাত্র গালিচার আয়তন ছিলো ষাট বর্গগজ, যা প্রায় এক একর ভূমি জুড়ে বিছানো হতো। যার যমিন ছিলো সোনার তারে বোনা এবং মণিমুক্তাখচিত। পুরো গালিচা ছিলো বাগানসদৃশ, যাতে বৃক্ষ ছিলো স্বর্ণের, পাতা ছিলো সবুজ রেশমের, ফুল ও ফুলের কলি এবং ফল ও ফলের মুকুল ছিলো ছোট বড় হিরা-জহরতের। তাতে বিভিন্ন নহর-নালা ও পায়চারির পথ ফুটিয়ে তোলা হয়েছিলো। আশ্চর্য সব কারুকাজ করে। তার চারপাশে ছিলো বসন্তের সবুজ ফসলভূমি এবং সবজীর বাহার। সবই রচনা করা হয়েছিলো সোনা-রূপা, রেশমসুতা, হিরা-মুক্তা ইত্যাদি দ্বারা। এটা তারা প্রস্তুত করেছিলো শীতকালের জন্য, যখন ফুলের মৌসুম গত হয়ে যেতো। তখন তারা সেই গালিচার উপর সুর ও সুরার আসর জমাতো, আর মনে হতো যেন বসন্ত-উদ্যান!'¹¹ এ থেকেই আন্দায করা যায়, পারস্যসভ্যতা ভোগ-উপভোগ ও বিলাসপ্রাচুর্যের কোন্ চরম সীমায় গিয়ে উপনীত হয়েছিলো। বস্তুত পারস্যের রাজপুরুষদের আনন্দবিনোদনে সম্পদপ্রাচুর্যের এমন কারিশমা ঝলমল করে উঠতো যা প্রবহমান সময় ও কাল কখনো কোথাও দেখেনি।
একই অবস্থা ছিলো রোমান শাসনাধীন সিরিয়া ও তার কেন্দ্রীয় শহরগুলোতে। বলা যায়, ভোগবিলাসে, বিনোদনপ্রাচুর্যে এবং নগরসংস্কৃতির সূক্ষ্মতা ও বৈচিত্র্যে রোমান ও পারসিক সভ্যতা যেন পরস্পরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় ছিলো বিভোর। রোমান রাজপুরুষগণ এবং তাদের সিরীয় রাজন্যবর্গ প্রাণ খুলে ভোগ-উপভোগ ও আনন্দবিনোদনের 'সমঝদারি' করতেন। তাদের আলিশান মহল ও বালাখানা এবং নাচগান ও শরাবের জলসাগুলো ছিলো বিলাস ও প্রাচুর্যের বিচিত্র সব দ্রব্যসামগ্রীতে পরিপূর্ণ। ইতিহাস ও লোকবর্ণনা থেকে জানা যায়, রুচিবোধ, পরিপাটিতা ও বিলাসবৈচিত্র্যে এরা অনেক দূর গিয়েছিলো। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে হযরত হাসসান বিন ছাবিত সিরিয়ার গাস্সানী সরদারদের মজলিসে ওঠাবসা করেছেন। তিনি জাবালা ইবনুল আয়হামের বিনোদনজলসার চিত্র এঁকেছেন এভাবে- 'আমি দশজন গায়িকা দাসী দেখেছি, পাঁচজন ছিলো রোমের, যারা সেতারা বাজিয়ে রোমান গান গায়। অন্য পাঁচজন গায় হিরা অঞ্চলের সুরে। আরব সরদার ইয়াস ইবনে কোবায়সা উপঢৌকনরূপে তাদের পাঠিয়েছিলো। এছাড়া মক্কা ও অন্যান্য অঞ্চল থেকেও গায়ক-গায়িকার দল তার কাছে আসতো। যখন শরাবের মজলিসে জাবালার ফরাসের উপর জুই-চামেলী ও অন্যান্য ফুল বিছিয়ে দেয়া হতো এবং সোনা-রূপার পাত্রে মিশক-আম্বর পরিবেশন করা হতো। শীতকালে হলে উদ ও চন্দনকাঠ জ্বালানো হতো, আর গরমকালে বরফ ছড়িয়ে দেয়া হতো। গরমের সময় তার ও তার পানসঙ্গীদের জন্য বিশেষ ঠাণ্ডা পোশাকের ব্যবস্থা করা হতো; পক্ষান্তরে শীতকালে পশমী পোশাক এবং চর্মবস্ত্রাদির ব্যবস্থা করা হতো।'¹²
দেশের অভিজাত ও বিত্তশালী শ্রেণী, এমনকি মধ্যবিত্তরাও পানাহার, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং জীবনযাপনের সর্বক্ষেত্রে রাজপুরুষদের অনুকরণের চেষ্টায় মেতে উঠেছিলো। জীবনযাত্রা হয়ে পড়েছিলো অতি ব্যয়বহুল এবং সমাজযাত্রা অত্যন্ত জটিল। একজন মানুষ শুধু নিজের উপর, শুধু নিজের পোশাকপরিচ্ছদের উপর, এমনকি পোশাকের একেকটি অংশের উপর এত বিপুল অপচয় করতো যা গোটা জনপদের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থানের জন্য যথেষ্ট হতে পারতো। কিন্তু যে কোন ভদ্র ও অভিজাত ব্যক্তি এ অপচয় বা অপব্যয় করতে বাধ্য ছিলো। কেননা এ বিষয়ে সামান্য শিথিলতা করার অর্থই ছিলো সমাজের চোখে নিজেকে হেয় করা এবং লোকনিন্দার শিকার হওয়া। মোটকথা, এটা হয়ে পড়েছিলো জীবনের অপরিহার্য প্রয়োজন এবং সমাজের অপরিবর্তনীয় বিধান। শা'বী বলেন, পারস্যের অভিজাত লোকেরা নিজ নিজ সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী মস্তকাবরণ গ্রহণ করতো। যে ব্যক্তি পূর্ণ অভিজাত্য অর্জন করেছে তার মস্তকাবরণের মূল্য একলাখ দিরহাম। হুরমুয ছিলেন পূর্ণ আভিজাত শ্রেণীর, তাই তার মস্তকাবরণের মূল্য ছিলো একলাখ এবং তা মুক্তো-খচিত ছিলো। পূর্ণ আভিজাত্যের অর্থ ছিলো ইরানের সপ্তঅভিজাত পরিবারের কোন একটির সদস্য হওয়া। কিসরার শাসনামলে হিরা অঞ্চলের শাসক আযাদিয়া ছিলেন অর্ধআভিজাত্যের অধিকারী, তাই তার মস্তকাবরণের মূল্য ছিলো পঞ্চাশ হাজার দিরহাম। (মুসলিম বিজয়াভিযানের পর) রুস্তমের মস্তকাবরণ সত্তর হাজার দিরহামে বিক্রি হয়েছিলো, যার প্রকৃত মূল্য ছিলো একলাখ।¹³
এই বিলাস-সভ্যতা ও তার পচনধরা রীতি-প্রথা মানুষের অস্থিমজ্জায় এমনই মিশে গিয়েছিলো যে, তা থেকে বেরিয়ে আসা তাদের জন্য একরকম অসম্ভব হয়ে পড়েছিলো। এমনকি কঠিন থেকে কঠিন বিপদ ও দুর্যোগের সময়ও তাদের পক্ষে সহজ-সরল জীবনের স্তরে নেমে আসা সম্ভব হতো না। একটিমাত্র উদাহরণ দেখুন, মুসলিম বাহিনীর হাতে মাদায়েনের পতন হলো এবং পারস্যের হতভাগ্য শেষ সম্রাট ইয়াযদাজারদকে মাদায়েন থেকে পালাতে হলো, তখন তার কী নাযুক অবস্থা ছিলো! তবু তিনি সঙ্গে নিয়েছেন একহাজার পাচক, একহাজার গায়ক, একহাজার ব্যঘ্রপালক এবং একহাজার ইত্যাদি ইত্যাদি! তবু তার মনে হয়েছে, তাড়াহুড়ায় আয়োজনটা কম হয়েছে।¹⁴ আহওয়াযের প্রশাসক হরমুযানকে যখন বন্দী অবস্থায় মদীনায় হযরত ওমর (রা)-এর সামনে হাযির করা হলো তখন তার খুব পানির পিপাসা। একটি সাধারণ পেয়ালায় পানি দেয়া হলো (সম্ভবত খলীফাতুল মুসলিমীনের 'পানিপাত্র')। বেচারা তখন বলে, পিপাসায় মরে গেলেও এমন পেয়ালায় পানি পান করতে পারবো না। শেষে অনেক তালাশ করে তার পছন্দমত পেয়ালা আনা হলো।¹⁵ এ দু'টো ঘটনা থেকেই অনুমান করুন, ইরানীদের স্বভাব ও জীবনাচার কেমন নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো; আড়ম্বর ও লৌকিকতায় তারা কেমন 'কাবু' হয়ে পড়েছিলো এবং সহজ-সরল জীবনযাত্রা থেকে কতটা দূরে সরে গিয়েছিলো।
অর্থশোষণ ও করভার
এই সীমাহীন ভোগবিলাস এবং অপচয়পূর্ণ জীবনের অনিবার্য ফল এই ছিলো যে, সাধারণ মানুষের উপর 'কোমরভাঙ্গা' করের বোঝা চাপানো হলো। তাতেও যখন কুলায় না তখন কৃষি, ব্যবসা ও অন্যান্য পেশার লোকদের ধনসম্পদ লুণ্ঠনের জন্য নতুন নতুন করবিধান প্রবর্তন করা হলো, এমনকি তা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেলো এবং মানুষের জীবন শাব্দিক অর্থেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো। 'সাসানী আমলে ইরান' গ্রন্থের লেখক বলেন- নিয়মিত কর ও খাজনা ছাড়াও ইরানী শাসকেরা বিভিন্ন উপলক্ষে প্রজাসাধারণের কাছ থেকে রাজদর্শনী বা রাজউপঢৌকন প্রথার প্রচলন করেছিলেন, যার সরকারী নাম ছিলো 'আইন'। নওরোয বা নববর্ষ এবং মেহেরগান বা জাতীয় উৎসবে বাধ্যতামূলক রাজউপঢৌকন গ্রহণ করা হতো। এছাড়া আরমেনিয়ার স্বর্ণখনি-গুলো গণ্য করা হতো সম্রাটের ব্যক্তিসম্পদ, যা থেকে তিনি ব্যক্তিগত ব্যয় নির্বাহ করবেন।¹⁶
রোমান সাম্রাজ্যের শাসননীতি ও আয়-ব্যয় সম্পর্কে এক আরব সিরীয় ঐতিহাসিক লিখেছেন- 'সিরীয়দের জন্য বাধ্যতামূলক ছিলো যে, তারা নিয়মিত খাজনা ও রাজস্ব আদায় করবে এবং যাবতীয় আয় ও উৎপন্ন ফসলের একদশমাংশ এবং মূলধনের উপর ধার্যকৃত কর পরিশোধ করবে। মাথাপিছু একটি পরিমাণ নির্ধারিত ছিলো যা আদায় করা ছিলো বাধ্যতামূলক। রোমান সাম্রাজ্যের সম্পদ আহরণের আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাত ছিলো, যেমন, নগরশুল্ক, বাণিজ্যশুল্ক, বিভিন্ন খনি ও অন্যান্য রাজস্ব। তাছাড়া গমচাষের উপযোগী জমি ও চারণভূমি ইজারায় দিয়ে দেয়া হতো। এই ঠিকাদারদের বলা হতো আশারীন। এরা সরকারের কাছ থেকে টোল-অধিকার ক্রয় করে নিতো। প্রতিটি প্রদেশে আশারীনদের যৌথপ্রতিষ্ঠান ছিলো এবং সেখানে মুন্সী ও তহশীলদার নিযুক্ত ছিলো, প্রজাসাধারণের সঙ্গে যাদের আচরণ ছিলো প্রভুসুলভ। তারা নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশী কর উশুল করতো এবং মানুষকে আরাম আয়েশের সব উপায়-উপকরণ থেকে বঞ্চিত রাখতো; এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ক্রীতদাসের মত বিক্রি করে দিতো।'¹⁷
জনৈক ঐতিহাসিক রোমানসাম্রাজ্যের শাসননীতির চিত্র সুসংক্ষেপে তুলে ধরেছেন এভাবে- 'আদর্শ রাখাল সে-ই যে ভেড়ার লোম কাটে, কিন্তু উপড়ে ফেলে না। তো দুই শতাব্দী ধরে রোমান সম্রাটগণ তাদের প্রজাবর্গের শুধু লোম কাটছেন, (তবে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করছেন না।) অর্থাৎ তিনি তাদের বিপুল সম্পদ হরণ করছেন, তবে বহিঃশত্রু থেকে তাদের রক্ষাও করছেন।'
প্রজাসাধারণের দুর্ভোগ-দুর্দশা
এভাবে উভয় সাম্রাজ্যে সম্পূর্ণ পৃথক দুটি শ্রেণী সৃষ্টি হয়েছিলো। প্রথমটি হলো রাজা ও রাজবংশ এবং রাজ-অনুগ্রহধন্য অভিজাত ও বিত্তশালী পরিবার। তারা সোনার পেয়ালায় আহার করতো, ফুলের বিছানায় ঘুমোতো, গোলাব ও দুধের নহরে গোসল করতো এবং সর্বপ্রকার ভোগবিলাসে গা ভাসিয়ে দিতো। তাদের ঘোড়ার নাল হতো মূল্যবান পাথরের এবং ঘরের দেয়াল সাজানো হতো রেশমি কাপড়ে। দ্বিতীয় শ্রেণীতে ছিলো কৃষিজীবী, বিভিন্ন পেশাজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং খেটে খাওয়ার লোকেরা, যাদের জীবন ছিলো আগাগোড়া দুঃখ-কষ্টের ও বিপদ- দুর্যোগের। কর-খাজনার ভারে তারা এমনই ভারাক্রান্ত ছিলো যে, জীবন তাদের কাছে সত্যি দুর্বিসহ হয়ে পড়েছিলো। এককথায় অর্থনৈতিক শোষণের জালে তারা এমনই আবদ্ধ ছিলো যে, যতই ছিন্ন করার চেষ্টা করতো সেই জাল যেন তাদের আরো অষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতো। শাব্দিক অর্থেই তাদের জীবন ছিলো পশুর জীবন। এই যে, অন্যের ভোগবিলাসের জন্য কাজ করে যাওয়া, আর বেঁচে থাকার জন্য কিছু দানা-পানি মুখে দেয়া, জীবনের কাছে এই যেন ছিলো শুধু তাদের পাওয়া। এ ছাড়া অন্য কোন চিন্তার সুযোগ তাদের ছিলো না। কখনো যদি এই অভিশপ্ত জীবন অসহ্য হয়ে উঠতো তখন তারা নেশা-বিনোদনে ও নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয়ে পড়তো। এ দুর্বিষহ জীবনের উপর আরো বিপদ এই ছিলো যে, তারা অভিজাত শ্রেণী জীবনপদ্ধতির অনেক কিছু অনুসরণের প্রাণান্ত চেষ্টা করতো। জীবনধারণের মেহনতে তাদের যত না কষ্ট হতো তার চেয়ে বেশী কষ্ট হতো উচ্চ শ্রেণীর অনুকরণের কসরতে। ফল হতো আরো দুর্ভোগ, আরো দুর্দশা এবং আরো দুশ্চিন্তা। সুখ-শান্তি তো দূরের কথা, সামান্য স্বস্তিও তাদের জীবনে জুটতো না কখনো।
সম্পদস্ফীতি ও চরম দারিদ্র্য
মোটকথা, তদানীন্তন সভ্য পৃথিবীর জীবনযাত্রা দুই চরম প্রান্তিকতার মাঝখানে বিপর্যস্ত ছিলো। একদিকে ছিলো অফুরন্ত সম্পদ এবং সম্পদের লাগামহীন স্বেচ্ছাচার, অন্যদিকে ছিলো অভাব ও দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাত। এ দুই জীবনযাত্রার টানা-পড়েনের মধ্যে নবুয়তের দাওয়াত ও তালীম এবং মহৎ চরিত্র ও উন্নত নীতি-নৈতিকতা যেন পথ হারিয়ে ফেলেছিলো। যারা সম্পদের প্রাচুর্যে ডুবে ছিলো তাদের জীবন ছিলো এমনই ভোগবিলাস ও ফুর্তি-উচ্ছ্বাসের জীবন যে, দ্বীন-আখেরাত এবং মৃত্যু ও পরকালচিন্তার তাতে কোন অবকাশই ছিলো না। অন্যদিকে অভাব ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের জীবন ছিলো রুটি-রোজির দৌড়ঝাঁপে এমনই ব্যতিব্যস্ত যে, অন্নচিন্তা ছাড়া অন্য কোন চিন্তার সেখানে কোন উপায় ছিলো না। বিত্তশালীরা মেতে ছিলো সম্পদের জৌলুসে এবং ভোগ-উপভোগের উল্লাসে, পক্ষান্তরে মেহনতি মানুষের দল পর্যুদস্ত ছিলো অভাবের তাড়নায় এবং ক্ষুধার যন্ত্রণায়। এভাবে জাগতিক জীবন ও তার বহুমুখী চাহিদার জাল ধনী-গরীব সবাইকে এমনভাবে জড়িয়ে রেখেছিলো যে, কলব ও রূহ এবং হৃদয় ও আত্মার বিষয়ে সামান্যতম চিন্তা করারও কোন অবকাশ ছিলো না।
হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী (রহ) হলেন শেষ যুগে ইসলামী উম্মাহর শ্রেষ্ঠ তাত্ত্বিক ও দার্শনিক। তিনি তাঁর মহামূল্যবান কিতাব হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগায় ইসলামপূর্বযুগের সভ্য পৃথিবীর এই সুরতেহালের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছেন অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে। তিনি বলেন- 'বহু শতাব্দী ধরে রাজ্য শাসন করে এবং ভোগবিলাস ও প্রবৃত্তিপূজায় ডুবে থেকে রোম ও পারস্যের মানুষ আল্লাহ ও আখেরাত একেবারেই ভুলে গিয়েছিলো। আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসের উপায়-উপকরণের ক্ষেত্রে তাদের যেমন অসম্ভব সৌখিনতা ছিলো তেমন ছিলো সুতীব্র সামাজিক প্রতিযোগিতা। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বড় বড় জ্ঞানী, গুণী ও কলাকুশলীরা সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলগুলোতে এসে জড়ো হয়েছিলো, যারা জীবনের ভোগ-উপভোগের নিত্যনতুন সামগ্রী এবং আয়েশ-বিলাসের চমকপ্রদ কলাকৌশল উদ্ভাবনে তাদের সবটুকু মেধা ও প্রতিভা নিয়োজিত রেখেছিলো। সমাজের অভিজাত শ্রেণী সেগুলো তখনই লুফে নিতো এবং একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো। এগুলোই ছিলো তাদের নিজেদের মধ্যে গর্ব ও গৌরবের বিষয়। অবস্থা এমন হয়েছিলো যে, লাখ দিরহামের নীচে কোন রাজকর্মচারীর কোমরবন্ধ বা মুকুট ব্যবহার করা ছিলো রীতিমত লজ্জার বিষয়। আলিশান বালাখানা, বাগবাগিচা, উৎকৃষ্ট সওয়ারি এবং সুদর্শন দাসদাসী ছাড়া সামাজিক মর্যাদা লাভের কোন উপায় ছিলো না। আভিজাত্য বিচার করা হতো বেশভূষা ও আহার-বিহারের জৌলুস দ্বারা। আমি আর কত বলবো, নিজ দেশের রাজাবাদশাহদের যে অবস্থা দেখছো তা থেকেই অনুমান করতে পারো। এসকল আড়ম্বর ও জাঁকজমক তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছিলো এবং তাদের মনমগজে এমনভাবে মিশে গিয়েছিলো যে, তা থেকে মুক্ত হওয়া কোনভাবেই সম্ভব ছিলো না। সর্বোপরি এর ফলে শহরজীবনে এবং সমগ্র সমাজ-সভ্যতায় বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছিলো। এ ছিলো এমন এক সর্বগ্রাসী বিপদ যা থেকে ধনী-গরীব, আম-খাছ, আশরাফ-আতরাফ, এককথায় সমাজের কোন স্তরই মুক্ত ছিলো না। আড়ম্বরপূর্ণ জীবনের মোহ সবাইকে এমন পেয়ে বসেছিলো যে, শান্তি, স্বস্তি ও স্থিতির পরিবর্তের দুঃখ-দুর্দশা এবং হতাশা ও যন্ত্রণাই হয়ে পড়েছিলো তাদের অবধারিত পরিণতি। কারণ অঢেল সম্পদ ছাড়া বিলাসী জীবন সম্ভব ছিলো না, আর অঢেল সম্পদ অর্জন করা সম্ভব ছিলো না লাগামহীন শোষণ ছাড়া এবং কৃষক, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য পেশার লোকদের উপর নিপীড়নমূলক করের বোঝা চাপানো ছাড়া। এই শাসন-শোষণে যদি তারা অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা করতো তাহলে তাদের উপর নেমে আসতো পাশবিক নির্যাতন, আর যদি নির্বিবাদে মেনে নিতো তাহলে তারা হতো হালের বলদ, যাদের বাঁচিয়ে রাখা হতো শুধু কাজ নেয়ার জন্য। আর দিনরাত পশুর মত খেটে যাওয়াই ছিলো তাদের কাজ। ফলে আত্মিক উন্নতি ও পরকালীন সৌভাগ্যের বিষয়ে চিন্তা করারও সুযোগ ছিলো না তাদের এই অভিশপ্ত জীবনে। হয়ত গোটা দেশে এবং সমগ্র প্রদেশে এমন একজনও পাওয়া যেতো না, ধর্ম সম্পর্কে যার কোন চিন্তা ভাবনা রয়েছে।'¹⁸
সর্বনাশা এক অন্ধকার
মোটকথা এই সপ্তম খৃস্টাব্দে পৃথিবীর কোথাও এমন কোন জাতি ও জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিলো না, স্বভাব ও প্রকৃতির দিক থেকে যাদের সৎ ও যোগ্য বলা যেতে পারে। এমন কোন সমাজ ও জীবনধারাও ছিলো না, যা নীতি ও নৈতিকতার উচ্চ মূল্যবোধ ধারণ করতে পারে। এমন কোন শাসক ও শাসনব্যবস্থাও ছিলো না, যার ভিত্তি হবে ন্যায় ও সুবিচার, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এবং দয়া-মায়া ও মানব-দরদ। ছিলো না এমন কোন দ্বীন ও শরীয়াত, নবুয়তের সঙ্গে যার আছে সঠিক সম্পর্ক এবং যা নবিদের শিক্ষাদীক্ষা, আদর্শ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। চারদিকে ছিলো শুধু ঘোর অন্ধকার। এই সর্বগ্রাসী অন্ধকারের মাঝে এখানে সেখানে দু'চারটি খানকা ও উপাসনাগৃহে সামান্য কিছু আলো যদিও বা দেখা যেতো, সেটা অন্ধকার রাতে জোনাকির 'আলো-কণিকার' ক্ষণিক নেভা-জ্বলার চেয়ে বেশী কিছু ছিলো না। ছহীহ ইলম ও আমল এবং বিশুদ্ধ জ্ঞান ও কর্ম ছিলো এত দুর্লভ এবং আল্লাহপ্রেমিক ও সত্যপথের পথিক যারা তাদের অস্তিত্ব ছিলো এতই বিরল যে, পারস্যের সাহসী যুবক সালমান ফারসী, যিনি স্বজাতির অগ্নিপূজার ধর্মের প্রতি আস্থা হারিয়ে সত্যধর্মের সন্ধান লাভের জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, তিনি ইরান থেকে শামের শেষ সীমা পর্যন্ত সুদীর্ঘ সফরকালে মাত্র চারজন এমন ব্যক্তির সন্ধান পেয়েছিলেন যারা নবী-রাসূলদের রেখে যাওয়া পথের উপর অবিচল ছিলেন এবং যাদের দ্বারা তাঁর বেচায়ন কলব ও রূহ কিছুটা সুকুন ও ইতমিনান লাভ করেছিলো এবং তাঁর অস্থির হৃদয় ও আত্মা কিছুটা শান্ত ও তৃপ্ত হয়েছিলো। এই সর্বগ্রাসী অন্ধকার ও নৈরাজ্যের যে নিখুঁত চিত্র আলকোরআন আমাদের সামনে তুলে ধরেছে তার চেয়ে উত্তম কিছু আর হতে পারে না। দেখুন কোরআনের ভাষায়-
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِى النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِى عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُو نَ
'জলে-স্থলে (সর্বত্র) ফাসাদ (ও বিপর্যয়) ছড়িয়ে পড়েছে মানুষেরই কৃতকর্মের কারণে, যেন আল্লাহ চাখিয়ে দেন তাদেরকে তাদের কিছু কর্মের ফল, আর তারা (তাদের মন্দ কর্ম থেকে) ফিরে আসে। (রূম, ৩০ : ৪১)
টিকাঃ
১. জেমস কারকর্ন-রচিত, চীনের ইতিহাস।
২. robert briffault: the making of hummanity. p. 159
৩. arab's conquest of egipt and the last thirty years of the roman dominion
৪. خطط الشام للأستاذ محمد کرد علي .২. ৩. ص305-300
৫. a.l. christensen: l'iran sous les sassanides উর্দু অনুবাদ মুহম্মদ ইকবাল, পৃ.১৬৩
৬. সাসানী শাসনে ইরান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে দেখুন 'ইরান বা-আহদে সাসান (উর্দু অনুবাদ) মূল লেখক a.l. christensen মূল গ্রন্থের নাম, l'iran sous les sassanides
৭. robert briffault: the making of hummanity. p. 160
৮. সাসানী আমলে ইরান, আর্থার কৃস্টিন রচিত (উর্দুতে অনূদিত, পৃ. ১৬১)
৯. (لشاهين مكاريوس) طבע مصر تاريخ ايران ১৮৯৮ সনে প্রকাশিত, পৃ. ৯০ এবং ২১১
১০. 'তারীখে তাবারী ৪র্থ খণ্ড
১১. 'তারীখে ইসলাম, মওলভী আব্দুল হালীম শরর, খ. ১ পৃ. ৩৫৪ (তাবারী ও অন্যান্য সূত্র থেকে)
১২. أغاني لأبي الفرج الأصفهان المجلد الأول الصفحة الثار ১১এবং তারীখে তাবারী, খ. ৪ পৃ. ১৭৮
১৩. ৪ تاريخ العلم في ৬, ১১. ১৩৪
১৪. সাসানী শাসনে ইরান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে দেখুন 'ইরান বা-আহদে সাসান (উর্দু অনুবাদ) মূল লেখক a.l. christensen মূল গ্রন্থের নাম, l'iran sous les sassanides
১৫. ৪ تاريخ الطبري
১৬. সাসানী আমলে ইরান, আর্থার কৃস্টিন রচিত (উর্দুতে অনূদিত, পৃ. ১৬১)
১৭. خطط الشام للأستاذ محمد كرد علي .4 ص 89 .
১৮. حجة الله البالغة، باب إقامة الاتفاقات وإصلاح الرسوم (طבע دار الكتب العلمية، بيروت، عام أحد وعشرين وأربع مائة بعد الألف من الفجرة النبوية খ.১ পৃ. ১৯৭-৯৮)