📘 মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো 📄 প্রথম পরিচ্ছেদ: খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের বিশ্ব

📄 প্রথম পরিচ্ছেদ: খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের বিশ্ব


এ বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই যে, খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী ছিলো মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকার যুগ। শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ যে অধঃপতনের পথে চলেছিলো, এটা ছিলো তার শেষ ধাপ। পৃথিবীতে তখন এমন কোন কল্যাণশক্তি ছিলো না, যা বিভ্রান্ত মানবতাকে হাত ধরে পথ দেখাবে এবং চূড়ান্ত পতন থেকে রক্ষা করবে, বরং দিন দিন তার পতন ও অধঃপতনের গতি যেন বেড়েই চলেছিলো। খালিক, মালিক আল্লাহকে ভুলে গিয়ে মানুষ তখন নিজেকেই ভুলে গিয়েছিলো এবং নিজের পরিণাম-পরিণতি সম্পর্কে হয়ে পড়েছিলো উদাসীন। সে হারিয়ে ফেলেছিলো তার স্বভাবগত বোধ ও বুদ্ধি এবং কল্যাণ-অকল্যাণের বিবেচনাশক্তি। ভালো কী, মন্দ কী? সত্য কী, মিথ্যা কী? তা যেন তার জানাই ছিলো না।

আল্লাহর আদেশে নবিগণ হকের যে দাওয়াত দিয়েছিলেন, বাতিলের শোরগোলে তা চাপা পড়ে গিয়েছিলো বহু আগেই। মানুষের সমাজে হেদায়াতের যে বাতি তাঁরা জ্বেলেছিলেন, তাঁদের পর বাতিলের ঝড়-ঝাপটায় হয় তা নিভে গিয়েছিলো, কিংবা ছিলো নিভু নিভু। যুলমাতের ঘোর অন্ধকারে সেই নিভু নিভু প্রদীপ হয়ত দু'একটি হৃদয়ে কিছু আলো দিতে পারতো। কিন্তু ঘরে, পরিবারে, সমাজ ও জনপদে আলো তো দূরের কথা, ছিলো না সামান্য আলোর আভাস। দ্বীনের যারা ধারক ও বাহক তারাও পিছু হটে গিয়েছিলেন যিন্দেগির ময়দান থেকে এবং কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন মন্দিরে গির্জায় এবং ঘরের ইবাদতখানায়। তারা ভেবেছিলেন, এভাবে অন্তত নিজেদের দ্বীন-ঈমান রক্ষা পাবে যামানার ফিতনা থেকে এবং বাকি জীবন কেটে যাবে আরামে নির্ঝঞ্ঝাটে। আসলে এটা ছিলো জীবনের বাস্তবতা ও দায়-দায়িত্ব থেকে তাদের পলায়ন। এটা ছিলো ধর্মশাসন ও রাজশাসন এবং আধ্যাত্মবাদ ও বস্তুবাদের দ্বন্দ্বযুদ্ধে তাদের কাপুরুষোচিত পরাজয়ের নামান্তর। এককথায়, প্রবল ঝড়তুফানের মুখে তারা হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং জনপদ ও জনসমাজের নেতৃত্ব থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন।

অল্পক'জন, যারা তখনো রয়ে গিয়েছিলো যিন্দেগির ময়দানে ঝড়তুফানের মাঝে, তারা ধরেছিলো সমঝোতার পথ, শাসক ও শোষকদের সঙ্গে। যুলুম ও শোষণ-নিপীড়নের ক্ষেত্রে তারা ছিলো রাজশক্তির ধর্মীয় সহযোগী। অন্যায় পথে মানুষের সম্পদ লুণ্ঠনে তারাও ছিলো দুনিয়াদারদের সমান অংশীদার। এককথায়, তারা ছিলো দ্বীনের বিক্রেতা ও দুনিয়ার খরিদদার।

ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে এবং কালের বিবর্তনধারায় শাসন ও সিংহাসন ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে, পরিবার থেকে পরিবারে এবং জাতি থেকে জাতিতে বদল হতেই থাকে। কিন্তু শোষণ-নিপীড়ন এবং মানুষের উপর মানুষের শাসন চালানোর ক্ষেত্রে তারা যেহেতু একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ, তাই ক্ষমতার এই পালাবদলে মানবতার কিছু যায় আসে না। নীতি ও নৈতিকতার অবক্ষয় এবং জরা ও জড়তার পচনে যে জাতি আক্রান্ত, তদ্রূপ যুলুম-শোষণ ও অনাচার-স্বেচ্ছাচার যে সাম্রাজ্যের বুনিয়াদ ধ্বসে পড়েছে সেই সাম্রাজ্যের পতনে এবং সেই জাতির অধঃপতনে এ জগতসংসার না কখনো দুঃখবোধ করে, না কোন শোক প্রকাশ করে, বরং এটাই বিশ্বজগত ও তার ঐশী ব্যবস্থার স্বভাবদাবী। কোন রাজা ও রাজ্যের বিদায়ে মানুষের চোখ থেকে অশ্রু ঝরবে, চোখের অশ্রু এর চেয়ে অনেক মূল্যবান। মানবতার কল্যাণসাধনে যার কোন কীর্তি ও কর্ম নেই; সভ্যতার উন্নতিবিধানে যার কোন দান ও অবদান নেই তার শোকে বিলাপ করবে, সে অবসর কোথায় মানুষের! এসব ঘটনা তো অতীতে ঘটেছে বহুবার, ভবিষ্যতেও ঘটবে বারবার। নির্লিপ্ত আসমান-যমীন তা দেখে আসছে নিরবধিকাল-

كَمْ تَرَكُوا مِن جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ * وَزُرُوعٍ وَمَقَامٍ كَرِيمٍ ، وَنَعْمَةٍ كَانُوا فِيهَا فَنكِهِينَ كَذَلِكَ وَأَوْرَثْنَهَا قَوْمًا وَآخَرِينَ فَمَا بَكَتْ عَلَيْهِمُ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ وَمَا كَانُوا مُنظَرِينَ

কত বাগবাগিচা, কত ঝরণাধারা, কত ফল-ফসল এবং কত উন্নত স্থান তারা ছেড়ে গেছে এবং (ছেড়ে গেছে) কত নেয়ামত, যার ভোগে তারা মগ্ন ছিলো। এভাবেই অন্যকোন জাতিকে আমি এগুলোর উত্তরাধিকার দান করেছি, কিন্তু তাদের শোকে কাঁদেনি আসমান ও যমীন, আর তাদের দেয়া হয় নি অবকাশ। (দোখান, ৪৪: ২৫-২৮)

বরং এসব সম্রাট ও সাম্রাজ্য এবং জাতি ও নৃপতি পৃথিবীর জন্য ছিলো বোঝা, মানবজাতির জন্য ছিলো অভিশাপ এবং ক্ষুদ্র ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য ছিলো আযাব। সভ্যতার দেহে তারা ছিলো রোগ-ব্যাধির উৎস, যেখান থেকে দেহের রগ-রেশায় ছড়িয়ে পড়ে রোগজীবাণু, এমনকি সুস্থ দেহেও ঘটে রোগের সংক্রমণ। এ অবস্থায় অনিবার্য হয়ে পড়ে কঠিন কোন অস্ত্রোপচার। রোগাক্রান্ত অঙ্গের কর্তন এবং সুস্থ দেহ থেকে তার অপসারণ, প্রকৃতপক্ষে এটা হলো রাব্বুল আলামীনের রাবুবিয়াত এবং তাঁর অসীম দয়া ও রহমতেরই অভিপ্রকাশ। এজন্য মানব-পরিবারের, বরং বিশ্বজগতের সকল সদস্যের অবশ্যকর্তব্য হলো রাব্বুল আলামীনের হামদ ও প্রশংসা করা এবং তাঁর প্রতি শোকর ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

فَقُطِعَ دَابِرُ الْقَوْমِ الَّذِينَ ظَلَمُوا ۖ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

যে কাওম যুলুম করেছে তাদের গোড়া কেটে দেয়া হয়েছে, সুতরাং সকল প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের। (আন'আম, ৬:৪৫)

কিন্তু.. কিন্তু মুসলিম উম্মাহ তো ছিলো নবুয়ত ও রিসালাতের বার্তাবাহী। মানবদেহের জন্য বিশুদ্ধ রক্ত যেমন, বিশ্বমানবতার জন্য তো তাদেরও ছিলো তেমনি প্রয়োজন! সুতরাং তাদের শাসন ও সাম্রাজ্যের পতন এবং তাদের জাতিগত অবক্ষয়-অধঃপতন নিছক একটি জাতি ও জনগোষ্ঠীর এবং দেশ ও জনপদের পতন বা অধঃপতন ছিলো না, বরং তা ছিলো একটি আদর্শের এবং একটি বার্তা ও রিসালাতের পতন, যা মানবসমাজের জন্য রূহ ও প্রাণসমতুল্য। তা ছিলো এমন এক স্তম্ভের ধ্বস, যার উপর নির্ভর করে দ্বীন ও দুনিয়ার নেযাম ও ব্যবস্থাপনা। তো মুসলিম উম্মাহর পতন এবং জীবনের অঙ্গন থেকে তাদের অপসৃতি কি বাস্তবেই এমন কোন ঘটনা ছিলো, যার জন্য পূর্ব-পশ্চিমে সকল মানবসমাজের শোকে সন্তাপে অশ্রুপাত করা কর্তব্য, ঘটনার এত যুগ, এত শতাব্দী পরও? বিশ্বজগত সত্যি কি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই উম্মাহর পতনে, অধঃপতনে, বিশ্বের নেতৃত্ব থেকে তার অপসৃতিতে? অথচ এ বিশ্বে জাতি ও সভ্যতার এবং জনপদ ও জনগোষ্ঠীর তো কমতি নেই! কী ধরনের ক্ষতি ও দুর্গতি ছিলো তা? ইউরোপীয় জাতিবর্গ বিশ্বের শাসন ও নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর এবং মুসলিম সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষের উপর তাদের বিশাল বিস্তৃত নবসাম্রাজ্য গড়ে তোলার পর পৃথিবীর রূপ ও প্রকৃতি কী দাঁড়িয়েছে এবং মানবজাতি কী পরিণাম ও পরিণতির শিকার হয়েছে? বিশ্বের শাসন ও মানবজাতির নেতৃত্বে এই বিরাট পরিবর্তনের কী প্রভাব-প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, দ্বীন-ধর্ম, আখলাক- চরিত্র, নীতি ও নৈতিকতা এবং শাসন ও জীবন সর্বক্ষেত্রে? এককথায়, মানব ও মানবতার ভাগ্যনির্মাণের ক্ষেত্রে? সর্বোপরি আগামী বিশ্বের গতি-প্রকৃতিতে কী পরিবর্তন আসতে পারে যদি ইসলামী বিশ্ব জেগে ওঠে এবং আবার জীবনের নেতৃত্ব গ্রহণ করে? এসকল প্রশ্নেরই বস্তুনিষ্ঠ ও যুক্তিনির্ভর জবাব দিতে চেষ্টা করবো আগামী পৃষ্ঠাগুলোতে।

পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠীর পতন-অধঃপতনের ঘটনা বারবার ঘটেছে। বহু রাজ্য ও সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়েছে। জনপদের পর জনপদ পদানতকারী বহু সম্রাট ও সেনাপতি একসময় চূড়ান্ত পরাজয় বরণ করেছে। কালের নির্মম থাবায় বহু সমৃদ্ধ সভ্যতা ধ্বংসাবশেষের নীচে চাপা পড়ে এমনভাবে হারিয়ে গেছে যে, এখন খোঁড়াখুঁড়ি করে তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ উপস্থিত করতে হয়। মোটকথা, জোয়ারের পর ভাটা এবং উত্থানের পর পতন প্রত্যেক জাতির ইতিহাসেই ঘটেছে। মানবজাতির সাধারণ ইতিহাসে এর উদাহরণের অভাব নেই। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর পতন ও অধঃপতন, এবং পরবর্তী পর্যায়ে বিশ্বনেতৃত্বের আসন থেকে তাদের বিচ্যুতি, আর সর্বশেষে জীবনের কর্মমুখর অঙ্গন থেকে তাদের অপসৃতি, এটা কিন্তু ইতিহাসের বারবার দেখা সাধারণ কোন ঘটনা নয়। এ এমন এক বিরল ঘটনা, যার নযির মানবজাতির সুদীর্ঘ ইতিহাসে দ্বিতীয়টি আর নেই; অথচ যে কোন বিরল ঘটনারই কোন না কোন নযির ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া যায়।

এ মর্মন্তুদ ঘটনা ও বিপর্যয় শুধু আরবদের নয়, এমনকি ঐসব জাতি ও জন-গোষ্ঠীরও নয়, নিজ নিজ ধর্মত্যাগ করে ইসলামের পতাকাতলে যারা সমবেত হয়েছিলো; বিশেষ কোন ঘর ও ঘরানার তো নয়ই, যারা শাসন ও সিংহাসন থেকে বিতাড়িত হয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে; বরং এ এমন ব্যাপক ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়, যার স্বাক্ষী হয়ে ইতিহাস নিজেও আজ স্তব্ধ। কারণ আগে বা পরে এমন করুণ ও নিদারুণ ঘটনার সম্মুখীন ইতিহাস আর কখনো হয়নি। বিশ্ব যদি এ বিপর্যয়ের প্রকৃত স্বরূপ অনুধাবন করতে পারতো; সাম্প্রদায়িকতার কুয়াসাচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্ব যদি নিজের ক্ষতি ও দুর্গতির গভীরতা ও গুরুতরতা কিছুমাত্র বুঝতে পারতো, সর্বনাশের সেই দিনটিকে তাহলে সে কান্না ও বেদনার এবং শোক ও সন্তাপের দিবসরূপে গ্রহণ করতো এবং বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠী একে অপরকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করতো। এককথায় সেটা হতো কালো পোশাক ধারণের বিশ্বশোকদিবস। কিন্তু এ বিপর্যয় একদিনে ঘটেনি, ঘটেছে ধীর পর্যায়ক্রমে, কয়েক যুগের দীর্ঘ সময়-পরিসরে। তদুপরি বিশ্ব এখনো এ ঘটনার সঠিক মূল্যায়নের কোন উদ্যোগও গ্রহণ করেনি। তাছাড়া নিজের বঞ্চনা ও দুর্ভাগ্যের পরিমাণ নিরূপণের সঠিক মাপকাঠিও তার জানা নেই। তাই এ বিষয়ে এখনো সে অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির শিকার। আর অজ্ঞতা হলো বেদনা ও যন্ত্রণার বিরাট উপশম।

জাতি হিসাবে যদিও আমরা আজ বিপর্যস্ত ও পর্যুদস্ত এবং এখনকার বিশ্ব-শাসকদের দ্বারা চরমভাবে নিগৃহীত ও নির্যাতিত, তবু আসমানি রিসালাতের দায়দায়িত্ব থেকে কোনভাবেই আমরা মুক্ত হতে পারি না। তাই আমাদের এখন দায়িত্ব হলো, বিশ্বের সামনে তার ক্ষতি ও দুর্গতির এবং বঞ্চনা ও দুর্ভাগ্যের সঠিক চিত্র তুলে ধরা, যাতে সে অনুধাবন করতে পারে, মুসলিম উম্মাহর পতনের উল্লাসের মধ্য দিয়ে সে নিজে কী মহাসর্বনাশ ডেকে এনেছে! এজন্য আইয়ামে জাহেলিয়াত, ইসলামের আবির্ভাব, মুসলিম উম্মাহর উত্থান ও তার সুফল, পতন ও পরিণাম এবং উত্থান ও পতনের কার্যকারণ, ইত্যাদি প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে আমাদের স্বচ্ছ ধারণা অর্জন করতে হবে। তো প্রথমে আমরা আলোচনা করবো, ইসলামের আবির্ভাবপূর্ব সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের কী অবস্থা ছিলো?

এক নজরে বিভিন্ন জাতি ও ধর্ম

পৃথিবীর বৃহৎ ধর্মগুলো তখন হয়ে পড়েছিলো ধর্মজীবী ও ধর্মবণিকদের স্বেচ্ছাচার ও প্রবৃত্তিপরতার শিকার। পদে পদে চলছিলো ধর্মের বিকৃতি ও অপব্যাখ্যা। এভাবে একসময় প্রতিটি ধর্ম হারিয়ে ফেলে তার আসল আকৃতি ও প্রকৃতি। অবস্থা এত দূর গড়িয়েছিলো যে, যদি ধর্মের আদিপুরুষদের কোনভাবে ফিরে আসা সম্ভব হতো তাহলে নিজেদের রেখে যাওয়া ধর্ম তাঁরাও চিনতে পারতেন না। বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং ক্ষমতা ও শক্তির কেন্দ্রগুলো হয়ে পড়েছিলো শোষণ-নিপীড়ন এবং চরম অরাজকতা ও নৈরাজ্যের শিকার। তারা ব্যতিব্যস্ত ছিলো শুধু নিজেদের নিয়েই। বিশ্ব ও বিশ্বের জাতিবর্গের জন্য তাদের কাছে কোন বাণী ও বার্তা ছিলো না। কারণ নীতি ও নৈতিকতা এবং আত্মা ও আত্মিকতার দিক থেকে তারা হয়ে পড়েছিলো একেবারে দেউলিয়া। তাদের জীবন-নির্ঝর হয়ে পড়েছিলো বিশুষ্ক। ফলে তাদের নিজেদেরই জাতীয় সত্তার ছিলো না কোন প্রাণ-সজীবতা। তো অন্যকোন জাতিকে তারা কিভাবে যোগাবে প্রাণের সজীবতা এবং আত্মার শক্তি! তাদের কাছে না ছিলো আসমানী দ্বীনের কোন স্বচ্ছ ধারা, না ছিলো মানুষের তৈরী কোন সংহত শাসনব্যবস্থা।

খৃস্টধর্ম, খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতকে

মানবজীবনের সকল সমস্যার সমাধান এবং মনোজগতের যাবতীয় জটিলতা নিরসনের যোগত্যার ক্ষেত্রে খৃস্টধর্ম কখনো বিশদতা, ব্যাপকতা, স্পষ্টতা ও স্বচ্ছতার এমন পর্যায়ে ছিলো না, যার উপর কোন সভ্যতার 'ভিত' তৈরী হতে পারে, কিংবা যার আলোকে কোন দেশ ও সমাজ সামনে অগ্রসর হতে পারে। তারপরো তাতে ছিলো হযরত ঈসা মাসীহের শিক্ষা ও আদর্শের ছিটেফোঁটা এবং সহজ-সরল তাওহীদী বিশ্বাসের হালকা ছাপ। কিন্তু সেন্ট পল এসে সেই শেষ আলোটুকুও নিভিয়ে দিলেন। যে প্রতিমাপূজার পরিবেশে তিনি প্রতিপালিত হয়েছিলেন এবং যে জাহিলিয়াত থেকে খৃস্টধর্মে প্রবেশ করেছিলেন, সেখানকার নানা সংস্কার-কুসংস্কার এবং ভ্রষ্ট চিন্তা-বিশ্বাসের তিনি তাতে সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। এরপর কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার কাজটি সম্পন্ন করেছেন কনস্টান্টাইন। ফলে খৃস্টধর্ম হয়ে পড়ে গ্রীক কল্পকথা ও রোমান প্রতিমাবাদ এবং মিশরীয় প্লেটোবাদ ও সন্ন্যাসবাদের অদ্ভুত এক মিশ্ররূপ। বলা যায়, খৃস্টধর্মে তখন সবকিছু ছিলো, ছিলো না শুধু ঈসা মাসীহের সহজ-সরল শিক্ষা-দীক্ষা, আদর্শ ও বিশ্বাস। সাগরে যেমন হারিয়ে যায় বৃষ্টিবিন্দু তেমনি তা হারিয়ে গিয়েছিলো বহুমুখী জলের ঐ জলাশয়ে।

খৃস্টধর্ম তখন হয়ে পড়েছিলো বিক্ষিপ্ত কিছু চিন্তা-বিশ্বাস ও আচার-সংস্কারের সমষ্টি, যাতে না ছিলো রূহ ও আত্মার প্রয়োজনীয় খাদ্য, পুষ্টি; না ছিলো আকল-বুদ্ধি এবং ভাব ও আবেগের চাহিদা পূরণের পর্যাপ্ত উপকরণ। এগুলো না পেরেছে জীবনের জটিল গ্রন্থি উম্মোচন করতে, না পেরেছে জাতি ও সভ্যতার চলার পথ আলোকিত করতে; বরং মূর্খ ধর্মনেতা ও ধূর্ত ধর্মবণিকদের লাগাতার হস্তক্ষেপের ফলে একসময় তা হয়ে পড়েছিলো জ্ঞান ও বিজ্ঞানের প্রতিপক্ষ, হয়ে পড়েছিলো মানুষ এবং তার মুক্তবুদ্ধি ও সুস্থ চিন্তার মাঝে অন্তরায়। এমনকি বহু শতাব্দীর ধারাপ্রবাহে একসময় তা হয়ে পড়ে নিছক প্রতিমানির্ভর একটি ধর্ম। পবিত্র কোরআনের ইংরেজী অনুবাদক শেল খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতকের নাছারাদের সম্পর্কে বলেন- 'ধর্মজাযকদের পূজা এবং খৃস্টের ছবি ও প্রতিমার উপাসনা করার ক্ষেত্রে খৃস্ট-সম্প্রদায় বড় সীমাছাড়া হয়ে পড়েছিলো, এমনকি এ যুগের ক্যাথলিকদেরও ছাড়িয়ে গিয়েছিলো।'¹

রোমান সাম্রাজ্যে ধর্মীয় গৃহযুদ্ধ

পরবর্তীকালে খৃস্টধর্মের মৌলিক ও পার্শ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে এমন প্রবল বিতর্ক ও কলহ দানাবেঁধে উঠেছিলো যে, গোটা জাতির চিন্তা-চেতনা তাতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো। যদিও তাতে অন্তসার বলে কিছু ছিলো না তবু তা গোটা জাতির মেধা, যোগ্যতা ও কর্মশক্তি একরকম গ্রাস করে ফেলেছিলো। এসব তর্কযুদ্ধ সুযোগে সুযোগে অস্ত্রযুদ্ধের ভয়াল রূপ ধারণ করতো, যার পরিণতি ছিলো নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা ও রক্তপাত। মানুষের জানমাল, এমনকি ইজ্জত-আবরু পর্যন্ত লুণ্ঠিত হতো ধর্মান্ধদের হাতে। গীর্জা ও ধর্মচর্চার কেন্দ্রগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী ও যুদ্ধমান ধর্মীয় দল-উপদলের সমরশিবিরে পরিণত হয়েছিলো। এভাবে গোটা সাম্রাজ্য নিক্ষিপ্ত হয়েছিলো ভয়াবহ এক গৃহযুদ্ধে। এই ধর্মীয় বিরোধ-বিবাদের উৎকটতম প্রকাশ ঘটেছিলো রোমান ও সিরিয়ান এবং মিশরীয় খৃস্টানদের মধ্যে; আরো সঠিক ভাষায়, রাজধর্ম ও মানুবাদের মধ্যে। রাজধর্মের মূল বিষয় ছিলো যিশুখৃস্টের দ্বৈতসত্তায় বিশ্বাস, পক্ষান্তরে মানুবাদীরা বিশ্বাস করতো, তিনি একটিমাত্র সত্তা ধারণ করেন, অর্থাৎ ইশ্বরীয় সত্তা, যার মাঝে তাঁর মানবীয় সত্তা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে; বড় জলপাত্রে একফোঁটা দুধ যেমন।

দু'দলের এ বিরোধ-সঙ্ঘাত খৃস্টীয় ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে এমনই চরম আকার ধারণ করেছিলো, যেন তা পরস্পরের বিনাশকামী দু'টি ভিন্ন ধর্মের যুদ্ধ, কিংবা (কোরআনে বর্ণিত) ইহুদী-নাছারাদের ধর্মীয় বিরোধ, যাতে ইহুদীদের দাবী ছিলো, নাছারারা কোন ধর্মের উপর নেই, আর নাছারাদের জবাব ছিলো, ইহুদীরা কোন ধর্মের উপর নেই। ডঃ আলফ্রেড জি, বাটলার বলেন- 'ঐ দু'টি শতাব্দী ছিলো মিশরীয় ও রোমানদের মধ্যে লাগাতার রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত-সঙ্ঘর্ষের যুগ, যার ইন্ধন ছিলো জাতিগত ভিন্নতা এবং ধর্মীয় বিরোধ, তবে দ্বিতীয়টিই ছিলো প্রবলতর। কেননা সে যুগের সর্বরোগের মূলই ছিলো রাজবাদ ও মানুবাদের হিংস্রতা। প্রথমটি ছিলো, যেমন নাম থেকে বোঝা যায়, রোমান সাম্রাজ্যের রাজধর্ম এবং সার্বজনীন প্রজাধর্ম, যার মূলকথা হলো যিশুখৃস্টের স্বভাবসত্তার দ্বৈততা। এ ধর্মবিশ্বাস ছিলো সনাতন ও পরম্পরাপূর্ণ। পক্ষান্তরে মিশরীয় মানুবাদীরা ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করতো; এমনকি এর প্রতিরোধে তারা এমন পাশবিক উন্মত্ততা ও জিঘাংসার পরিচয় দিয়েছিলো যা আমাদের পক্ষে আজ কল্পনা করাও সম্ভব নয়। পবিত্র ইন্জীলে বিশ্বাসীরা দূরে থাক, ন্যূনতম বিবেকের অধিকারী কোন সম্প্রদায়ও কীভাবে পাশবিকতার এমন স্তরে নামতে পারে তা ভেবে পাই না।'²

৬২৮ খৃস্টাব্দে পারসিকদের উপর বিজয় লাভের পর সম্রাট হিরাক্লিয়াস (৬১০- ৬৪১) সাম্রাজ্যের বিবাদমান ধর্মসম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ঐক্যবিধান ও সমন্বয়সাধনের এক জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার সমন্বয়-প্রচেষ্টার ভিত্তি ছিলো যিশুখৃস্টের স্বভাব ও সত্তার প্রকৃতি সম্পর্কে যাবতীয় আলোচনা ও বিতর্ক পরিহার করা। অর্থাৎ তিনি কি একক সত্তার অধিকারী না দ্বৈত সত্তার, এ বিষয়ে কোন পক্ষ নিজস্ব মত প্রচার করবে না; তবে সকল পক্ষের জন্য এ বিশ্বাস গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক যে, 'ইশ্বর' তাঁর রয়েছে একক ইচ্ছা এবং একক কার্য-ক্ষমতা। ৬৩১ খৃস্টাব্দের শুরুতে ঐক্যমত স্থির হলো এবং এটাই সাম্রাজ্য ও গীর্জার অনুসারীদের রাষ্ট্রীয় ধর্মরূপে স্বীকৃতি লাভ করলো। অন্যসব ধর্মমতের উপর এই নতুন ধর্মমত চাপিয়ে দেয়ার জন্য সম্রাট হিরাক্লিয়াস বদ্ধপরিকর ছিলেন এবং এ জন্য সর্বউপায় অবলম্বন করেছিলেন। কিন্তু কিবতীরা এটাকে ধর্মবিকৃতি আখ্যা দিয়ে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলো এবং নিজেদের পুরোনো ধর্মবিশ্বাস রক্ষার জন্য প্রাণপণ প্রতিরোধে অবতীর্ণ হয়েছিলো।

অবশেষে সম্রাট হিরাক্লিয়াস দ্বিতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করলেন এবং কিছুটা ছাড় দিয়ে ঘোষণা করলেন, 'ঈশ্বর' তাঁর রয়েছে একক ইচ্ছা, এ বিশ্বাস গ্রহণ করাই যথেষ্ট। দ্বিতীয় অংশটি, অর্থাৎ ইচ্ছাকে কার্যকর করার ক্ষমতা, তো এ বিষয়টি মুলতবী রেখে এসংক্রান্ত তর্ক-বিতর্কের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন, এমনকি তিনি রাজকীয় ফরমানরূপে প্রাচ্যদেশের সব অঞ্চলে তা প্রেরণ করলেন। কিন্তু তাতেও মিশরের গণঅসন্তোষ প্রশমিত হলো না। মিশরে সাইরাসের দীর্ঘ দশবছরের শাসনকাল ছিলো নিষ্ঠুরতম নিপীড়ন-নির্যাতনের যুগ। তখন এমন সব লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে যা শুনলে এখনো শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। হাজার হাজার মানুষকে পানিতে ডুবিয়ে মারা হতো। ঝুলন্ত মানুষকে আগুনে ঝলসানো হতো এবং চর্বি গলে গলে আগুন নিভে যেতো। কখনো বস্তায় ভরে 'অপরাধী'কে নিক্ষেপ করা হতো সমুদ্রে। এধরনের অসংখ্য নিষ্ঠুরতা ও পাশবিকতার কাহিনীতে ইতিহাস ভরপুর।³

সামাজিক অরাজকতা এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা

রোমান সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ছিলো চরম। একদিকে সাধারণ মানুষের জীবন ছিলো বিপদ-সমস্যায় জর্জরিত, তার উপর চাপানো হচ্ছিলো নিত্য-নতুন করের বোঝা। এর মধ্যে বিপদের উপর বিপদ ছিলো লাগামহীন শোষণের হাতিয়াররূপে ইজারাদারি ও সম্পদ বাজেয়াপ্তির ব্যবস্থা। ফলে প্রজা-সমাজে শাসকদের বিরুদ্ধে ধূমায়িত হয়ে উঠেছিলো আক্রোশ ও তীব্র অসন্তোষ। এমনকি স্বদেশী শাসকদের চেয়ে যে কোন বিদেশী শাসন তাদের কাছে অধিক কাম্য হয়ে উঠেছিলো। এসব কারণে ব্যাপক গোলযোগ ও বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিলো। ৫৩২ খৃস্টাব্দের এক দাঙ্গা-গোলযোগে শুধু রাজধানীতেই নিহত হয়েছিলো ত্রিশ হাজার মানুষ। (লক্ষ্য করুন, তৎকালীন জনসংখ্যার বিচারে ত্রিশ হাজার মানুষ!)⁴

সময় ও পরিবেশ-পরিস্থিতির বিচারে জীবনের সর্বক্ষেত্রে তখন কঠোর মিত- ব্যয়িতাই ছিলো কাম্য, অথচ সীমাহীন অপচয় ও অপব্যয়ই ছিলো সাধারণ প্রবণতা। নৈতিক অধঃপতনের এমন চূড়ান্ত হয়েছিলো, যেখানে মানুষে আর পশুতে কোন পার্থক্য থাকে না। সবার তখন একটাই চিন্তা, একটাই নেশা, যেভাবে পারো, সম্পদ অর্জন করো এবং যত পারো, সম্পদ ওড়াও। লাগাম ছেড়ে ভোগ করো, উপভোগ করো এবং সর্বউপায়ে প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ করো। মানবিক মূল্যবোধ বিলীন হয়ে গিয়েছিল এবং চারিত্র ও নৈতিকতার ভিত ধ্বসে পড়েছিলো। এমনকি অবাধ যৌনসম্ভোগের লালসায় মানুষ পারিবারিক ও বৈবাহিক বন্ধন থেকে বিমুখ হয়ে পড়েছিলো।⁵ ন্যায় ও সুবিচার, শেলের ভাষায়, বাজারের পণ্যের মত বেচা-কেনা হতো। ঘুষ ও দুর্নীতি এবং খেয়ানত ও দুষ্কৃতি পেয়েছিলো সামাজিক উৎসাহ।⁶ ঐতিহাসিক গীবন বলেন- 'ষষ্ঠ শতকের শেষ দিকে রোমান সাম্রাজ্য পতন ও অধঃপতনের একেবারে শেষ ধাপে পৌঁছে গিয়েছিল। এ যেন সেই বৃক্ষ, একসময় যা ছিলো সবুজ বিস্তৃত এবং যার ছায়া ছিলো বিশ্বের সকল জাতির আশ্রয়, কিন্তু এখন আছে শুধু তার কাণ্ড, যা দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে।'⁷

হিস্টোরিয়ানস হিস্টোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড-এর লেখকমণ্ডলী বলেন- 'বড় বড় নগর-জনপদ, যা দেখতে দেখতে বিরান হয়ে পড়েছিলো এবং কখনো আর নিজের হৃত গৌরব ও হারানো জৌলুস ফিরিয়ে আনতে পারেনি, সেগুলো এ সাক্ষ্যই দেয় যে, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য তখন চরম অবক্ষয় ও অরাজকতার শিকার হয়ে পড়েছিলো এবং এর কারণ ছিলো মাত্রারিক্ত কর ও রাজস্ব আরোপ, ব্যবসা-বাণিজ্যের অবনতি, কৃষি ও চাষাবাদে অবহেলা এবং পরিণতিতে বসতি ও জনপদ ধীরে ধীরে কমে আসা।'⁸

রোমান শাসনে মিশরঃ ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক অবস্থা

মিশর ছিলো রোমান সাম্রাজ্যের অধীন খুব গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। নীলনদের কল্যাণে দেশটি ছিলো সুজলা, সুফলা ও উর্বরা। কিন্তু রোমকদের যুগপৎ শাসন- শোষণ ও ধর্মীয় নিপীড়নের ফলে সপ্তম শতকে মিশরই ছিলো আল্লাহর যমীনে সবচে' দুর্ভাগা দেশ। খৃস্টধর্ম মিশরকে কিছুই দিতে পারেনি। দিয়েছে শুধু যিশুর সত্তাগত প্রকৃতি, ইশ্বরতত্ত্ব এবং অতিপ্রাকৃত দর্শনবিষয়ক ব্যাপক কোন্দল ও বিবাদ-বিতর্ক, যা সপ্তম শতকে বীভৎসতম রূপ ধারণ করেছিলো এবং মিশরীয় জাতির চিন্তাশক্তিকে স্থবির এবং কর্মশক্তিকে নিস্তেজ করে দিয়েছিলো। পক্ষান্তরে রোমান শাসন তাদের দিয়েছিলো শুধু ধর্মীয় নিপীড়নের বিভীষিকা এবং রাজনৈতিক শাসন-শোষণ ও দাসত্বের বীভৎসতা। মাত্র দশ বছরে মিশর যে ভয়াবহ ধর্মীয় নিপীড়ন ও রাজনৈতিক শাসন-শোষণের শিকার হয়েছে ইউরোপ ধর্মীয় তদন্তের যুগে কয়েক দশকেও তা ভোগ করেনি। ফলে জীবনের সার্বজনীন সৃজনশীলতা থেকে এবং ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সাধনায় উত্তরণের ক্ষেত্রে মিশর একেবারেই পিছিয়ে পড়েছিলো। রোমান উপনিবেশ হওয়া সত্ত্বেও তার যেমন রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করার অধিকার ছিলো না, তেমনি ছিলো না খৃস্টধর্মের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা ভোগ করার অধিকার। ডঃ গ্যাস্টপ লেভন বলেন- 'বলতেই হবে, মিশরকে খৃস্টধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছিলো এবং এর ফলে সে অবক্ষয়ের অতলে চলে গিয়েছিলো, ইসলামের বিজয়াভিযানের আগে যা থেকে সে আর উদ্ধার পায়নি। নানা ধর্মীয় বিবাদ-বিতর্কের বেড়াজালে আটকা পড়ে মিশর হয়ে পড়েছিলো চরম দুর্দশার শিকার। কারণ দল-উপদলগুলো ছিলো ভয়ঙ্কর হানাহানি ও সঙ্ঘাত-সঙ্ঘর্ষে লিপ্ত। ফলে ধর্মীয় বিভক্তি এবং শোষণ-নিপীড়নে বিপর্যস্ত মিশর রোমকদের প্রতি চরম বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলো এবং রোমান শাসনের থাবা থেকে মুক্তি লাভের প্রহর গুণছিলো।'⁹

ডঃ আলফ্রেড জি, বাটলার বলেন- 'সপ্তম শতকে ধর্ম-সমস্যা ছিলো মিশরীয়দের কাছে রাজনৈতিক সমস্যার চেয়ে গুরুতর। কেননা রাজক্ষমতা ও রাজ্যশাসনকে কেন্দ্র করে দল-উপদল ও বিবাদ-কোন্দল সৃষ্টি হয়নি, হয়েছে ধর্মীয় চিন্তাধারা ও মতবিশ্বাসকেই কেন্দ্র করে। আর ধর্মকে মানুষ এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতো না যে, তা পুণ্য-কর্মের সহায়ক, বরং তাদের কাছে ধর্ম ছিলো কিছু মৌলিক বিষয়ের তত্ত্ব-বিশ্বাস। ফলে যাবতীয় বিরোধ ও তর্ক-বিবাদ ছিলো নানান বিশ্বাসের মধ্যে বিভিন্ন সূক্ষ্ম-জটিল পার্থক্য ও কল্পনাপ্রসূত চিন্তাধারার ভিত্তিতে। এমনকি অর্থহীন ও দুর্বোধ্য বিভিন্ন বিষয় এবং ধর্মের মূল ও অতিপ্রাকৃত দর্শনের চুলচেরা পার্থক্যকে উপলক্ষ করে জীবন দিতেও তারা কুণ্ঠিত হতো না।'¹⁰

অন্যদিকে রোমানরা মিশরকে গ্রহণ করেছিলো শুধু দুধের বকরীরূপে। তারা দুধ দোহন করতো শেষ ফোঁটা পর্যন্ত। ঘাস ও দানা-পানি যা খাওয়াতো তা শুধু এজন্য যে ওলানে দুধ যেন ভালো করে জমে। মিশরে তাদের কাজ ছিলো শুধু মিশরীয়দের সম্পদলুণ্ঠন ও রক্তশোষণ। আলফ্রেড জে বাটলারের নীচের মন্তব্য থেকে তা স্পষ্ট- 'রোমকরা মিশর থেকে মাথাপিছু খাজনা ও বিভিন্নমুখী কর উত্তল করে নিতো এবং নিঃসন্দেহে তা ছিলো মানুষের সাধ্যাতীত, আর তা আরোপ করা হতো সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে।'¹¹

হিস্টোরিয়ানস হিস্টোরি অব দ্যা ওয়ার্ল্ড-এর লেখকবৃন্দ বলেন- বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজভাণ্ডারে মিশর তার উৎপাদিত সম্পদের বিরাট অংশ জমা দিতো। মিশরীয় কৃষকশ্রেণী যদিও সর্বপ্রকার রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলো তবু তারা কর ও খাজনা দিতে বাধ্য ছিলো। উচ্চহারের ভূমিখাজনা ছাড়াও ছিলো বিভিন্ন কর। ফলে ঐ সময়কালে মিশরের সম্পদ হয়ে পড়েছিলো ক্রমসঙ্কোচনশীল।¹² এভাবেই মিশর নিষ্পেষিত হচ্ছিলো একাধারে ধর্মীয় নিপীড়ন, রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচার ও অর্থনৈতিক শোষণের জাঁতাকলে। ফলে জনগণ নিছক বেঁচে থাকার সংগ্রামেই ছিলো ব্যতিব্যস্ত। তাদের জীবনে নেমে এসেছিলো চরম দুর্দশা এবং তারা হয়ে পড়েছিলো সর্বপ্রকার সুশীল চিন্তা সম্পর্কে উদাসীন।

আবিসিনিয়া

মিশরের প্রতিবেশী দেশ আবিসিনিয়া, আরবদের কাছে তার পরিচয় ছিলো হাবাশা নামে। হাবাশার জনগোষ্ঠীও মানুবাদের অনুসারী ছিলো। তদুপরি তারা অসংখ্য প্রতিমার উপাসনা করতো, একত্ববাদের নামে যা কিছু ছিলো তা প্রতিমাবাদেরই উন্নত রূপ ছাড়া আর কিছু ছিলো না, তবে তার উপর খৃস্টধর্মের তত্ত্ব ও পরিভাষার আবরণ ছিলো। তাদের মধ্যে না ছিলো আধ্যাত্মিক প্রাণ ও প্রেরণা, না ছিলো জাগতিক উচ্চাভিলাষ। বরং নিকা ধর্মসম্মেলনের সিদ্ধান্ত ছিলো, ধর্মীয় বিষয়ে আবিসিনিয়ার নিজস্ব কোন সত্তা নেই, বরং তা হবে রাজসভার সম্পূর্ণ অনুগত। হাবাশার কর্তব্য ছিলো শুধু রোমানদের সেবার জন্য প্রচুর পরিমাণে কালো ও কর্মঠ দাস সরবরাহ করা। মিশরে যাও কিছু ধর্মীয় উত্তাপ ছিলো, হাবাশায় তাও ছিলো না। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিলো শোচনীয়, কিন্তু ধর্মীয় অবস্থা ছিলো আরো শোচনীয়।

উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের জাতিগোষ্ঠী

ইউরোপের উত্তর-পশ্চিম জনপদে যেসব জাতির বসবাস ছিলো, এককথায় তারা ছিলো অজ্ঞতা ও মূর্খতার ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত এবং ছিলো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ-বিগ্রহে বিপর্যস্ত। জ্ঞান ও সভ্যতার উষার আলো তাদের ভাগ্যাকাশে উদিত হতে এখনো অনেক দেরী। কেননা দুর্ভাগা ইউরোপের মানচিত্রে তখনো আমাদের 'উন্দুলুস'-এর অভ্যুদয় ঘটেনি, ইউরোপকে যারা জ্ঞান ও বিজ্ঞানের আলো উপহার দিয়েছিলো এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে এনেছিলো। যুগের বিভিন্ন দুর্যোগ এবং ইতিহাসের ঝড়ঝাপ্টা, যা কোন জাতিকে ঘোর থেকে জাগিয়ে তোলে এবং এগিয়ে চলার যোগ্যতা দান করে তাও ছিলো তাদের জাতীয় জীবনে অনুপস্থিত। তারা শুধু ক্ষতবিক্ষত ছিলো খুনাখুনি, হানাহানি ও রক্তক্ষয়ী গৃহ-যুদ্ধে। মানবসভ্যতার চলমান কাফেলার যে রাজপথ, তা থেকে তারা ছিলো দূরে বহু দূরে। সমকালীন পৃথিবী সম্পর্কে তারা ছিলো প্রায় অজ্ঞ; পৃথিবীও বলতে গেলে জানতো না তাদের কোন খবর। প্রাচ্য ও প্রতিচ্যের বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন জনপদে ইতিহাসের মোড় পরিবর্তক যে সকল ঘটনা ঘটছিলো সেগুলোর সঙ্গে তাদের না ছিলো কোন যোগ, না ছিলো যোগাযোগ। চিন্তা ও বিশ্বাসের দিক থেকে তারা ছিলো নবীন খৃস্টধর্ম ও প্রাচীন মূর্তিপূজার মাঝামাঝি অবস্থানে। ধর্ম ও ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে যেমন তাদের কাছে কোন বাণী ও বার্তা ছিলো না, তেমনি রাজ্য ও রাজনীতির ক্ষেত্রেও ছিলো না নিজস্ব কোন ব্যবস্থা ও দর্শন। এইচ, জি, ওয়েলস যেমন বলেছেন, 'পশ্চিম ইউরোপে তখন একতা ও ঐক্য এবং আইন ও শৃঙ্খলার চিহ্নমাত্র ছিলো না।'¹³ রবার্ট ব্রিফল্ট (robert briffault) বলেন- 'পঞ্চম শতক থেকে দশম শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপ ছিলো অন্ধকারে আচ্ছন্ন এবং ক্রমশ তা ঘোর থেকে ঘোরতর হয়ে চলেছিলে। সে যুগের পাশবিকতা ও বর্বরতা ছিলো আদি যুগের চেয়ে অনেক ভয়াবহ। যেন পচনধরা সভ্যতার লাশ পচেই চলেছে। যা কিছু ভালো সব মুছে যাচ্ছে এবং ধ্বংস ও বিলুপ্তি অবধারিত হয়ে পড়েছে। যে সকল সমৃদ্ধ জনপদে ঐ সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিলো এবং একসময় চরম উন্নতি লাভ করেছিলো, যেমন ইটালি ও ফ্রান্স, সেগুলো তখন হয়ে পড়েছিলো গোলযোগ, নৈরাজ্য ও বরবাদির শিকার।'¹⁴

ইহুদি জাতি ও তাদের ধর্ম

ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকায় তখন এমন একটি জাতির অধিবাস ছিলো যারা বিশ্বের জাতিবর্গের মধ্যে এদিক থেকে অনন্য ছিলো যে, তাদের কাছে ধর্মের বিরাট সম্পদ ছিলো; আবার ধর্মজ্ঞান ও ধমগ্রন্থের ভাষা-পরিভাষা অনুধাবনের ক্ষেত্রে ছিলো সবচে' প্রাগ্রসর। কিন্তু.. কিন্তু তারা ধর্ম ও সভ্যতা এবং শাসন ও রাজনীতির ক্ষেত্রে এমন কোন প্রভাবক শক্তি ছিলো না, যাতে অন্যান্য জাতির উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, বরং বহুশতাব্দী থেকে তাদের ভাগ্যলিপিই ছিলো অন্য জাতির দাসত্ব করা এবং শোষণ-নিপীড়ন, বিতাড়ন-নির্বাসন ও বিপদ-দুর্যোগের শিকার হয়ে বেঁচে থাকা। পৃথিবীর অন্যান্য জাতির মাঝে তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক ধারা এই ছিলো যে, একদিকে তারা দীর্ঘ দাসত্বের লাঞ্ছনা ভোগ করেছে, অন্যদিকে জাত্যাভিমান, বংশগৌরব, সম্পদলিন্সা ও সুদখোরিতা, এগুলো তাদের মধ্যে অদ্ভুত কিছু জাতীয় স্বভাব ও চরিত্র এবং ঝোঁক ও প্রবণতা সৃষ্টি করেছে এবং এগুলো ছিলো জাতিবর্গের মধ্যে তাদের একক বৈশিষ্ট্য। যুগ ও প্রজন্মপরম্পরায় তাদের জাতীয় পরিচয়। দুর্বলতা ও পরাজয়কালে আত্ম-সমর্পণ ও পদলেহন, আর শক্তি ও বিজয়ের সময় নীচতা ও নিষ্ঠুরতা। তদ্রূপ কপটতা, প্রতারণা, নির্দয়তা, স্বার্থপরতা ও সম্পদ আত্মসাৎ এবং সত্যের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা, এগুলো ছিলো তাদের স্বভাবদোষ। হাঁ, এতক্ষণ যাদের কথা বললাম, আলকোরআনের ভাষায় তারা হলো অভিশপ্ত ইহুদীজাতি। ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে তারা চারিত্রিক অধঃপতন, নৈতিক অবক্ষয়, মনুষ্যত্বহীনতা ও সামষ্টিক নষ্টাচারের যে চরম স্তরে উপনীত হয়েছিলো এবং যে কারণে মানব-জাতির নেতৃত্বের মর্যাদাপূর্ণ আসন থেকে তাদের অপসারণ ঘটেছিলো, তার এক সূক্ষ্ম নিখুঁত বিবরণ আলকোরআন আমাদের সামনে তুলে ধরেছে।¹⁵

ষষ্ঠ শতকের শেষভাগে এবং সপ্তম শতাব্দীর সূচনাপর্বে এমন কিছু ঘটনা ও পরিবেশ- পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিলো, যার ফলে ইহুদী ও খৃস্টসম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা-বিদ্বেষ এমন স্তরে পৌঁছেছিলো যে, পরস্পরের বিনাশসাধন ও প্রতিশোধ গ্রহণের কোন সুযোগ হাতছাড়া করতে তারা প্রস্তুত ছিলো না। একদল যখন বিজয় ও আধিপত্য লাভ করতো তখন পরাজিত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এমনই অমানবিক ও পৈশাচিক আচরণ তারা করতো যা বিশ্বাস করা সত্যি কঠিন। সম্রাট ফোকাসের রাজত্বের শেষ বছর (৬১০ খৃঃ) ইহুদীরা এন্টাকিয়ায় খৃস্টানদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দাঙ্গাবাজি শুরু করলে সম্রাট তার সেনাপতি বোনোসাসকে বিদ্রোহদমনের দায়িত্ব দিয়ে পাঠালেন। আর সেনাপতি চরম নিষ্ঠুরতার সঙ্গে ইহুদীনিধনে মেতে ওঠেন, হয় তলোয়ারের লোকমা বানিয়ে, ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে এবং পানিতে ডুবিয়ে, এমনকি হিংস্র পশুর মুখে নিক্ষেপ করে। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে এই নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার পালাবদল হতো এবং যখন যারা জয়ী হতো, পাশবিকতা ও নির্মমতায় অন্যকে ছাড়িয়ে যেতো।

রোমান সম্রাট ফোকাসের শাসনামলে, ৬১৫ খৃস্টাব্দে ইরানীরা যখন শাম (সিরিয়া, জর্দান ও ফিলিস্তীনের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড) জয় করলো তখন ইহুদীদেরই প্ররোচনায় সম্রাট খসরু খৃস্টানদের উপর পাশবিকতা ও বর্বরতার চূড়ান্ত করে ছাড়েন। তিনি তাদের এমন কচুকাটা করেন যে, খুব কমসংখ্যক খৃস্টানই ইরানী তলোয়ার থেকে রক্ষা পেয়েছিলো। এমনকি তিনি তাদের মিশর পর্যন্ত ধাওয়া করে হত্যাযজ্ঞ চালান, আর দাসরূপে বন্দী করেন বেশুমার। বিজয়ী বাহিনীর ছত্রচ্ছায়ায় ইহুদীরা তখন বহুমঠ ও গীর্জা যেমন ধ্বংস করেছে তেমনি নির্বিচারে তাদের ঘরবাড়ী জ্বালিয়েছে। পরে যখন রোমক বাহিনী ইরানীদের উপর জয়লাভ করে তখন প্রতিশোধ স্পৃহায় উন্মত্ত খৃস্টানদের দাবীর মুখে সম্রাট হিরাক্লিয়াস এমন হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠেন যে, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া বা আত্মগোপন করা ইহুদীরাই শুধু জানে বেঁচেছিলো।¹⁶

উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকেই বোঝা যায়, সপ্তম শতকে ইহুদী-খৃস্টান, দুই ধর্মসম্প্রদায় নৃশংসতা, বর্বরতা ও বিনাশ-উন্মাদনার কোন ভয়াবহ স্তরে পৌঁছেছিলো। আর বলাবাহুল্য, এমন মানবতাবর্জিত ও পাশবিক চরিত্রের কোন জাতির পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয় যে, পৃথিবীকে তারা ন্যায় ও সত্যের এবং ইনছাফ ও শান্তির বার্তা শোনাবে এবং তাদের শাসন-ছায়ায় মানবসভ্যতা সুখী-সমৃদ্ধ হবে।

ইরানঃ মানবতাবিনাশী আন্দোলন-তৎপরতা

সভ্য পৃথিবীর শাসন ও শোষণের ক্ষেত্রে ইরান ছিলো রোমের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। সেখানেও নেমে এসেছিলো মানবতার চরম বিপর্যয়। ইনসানিয়াতের দুশমন ও মানবতার শত্রুরূপে ইতিহাসে যাদের কুখ্যাতি তাদের যাবতীয় অপতৎপরতার প্রাচীন কেন্দ্রভূমি ছিলো ইরান। পারসিক জাতির নৈতিকতার ভিত্তিমূল নড়বড়ে হয়ে পড়েছিলো বহু আগেই। বলা যায়, কুষ্ঠরোগের মত পচন ধরে গিয়েছিলো তাদের জাতীয় চরিত্রে। অবক্ষয় ও অধঃপতনের একটা ধারাবাহিকতা চলে আসছিলো যুগ যুগ ধরে। যেসব রক্তসম্পর্কের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক সকল সভ্য -জাতির নিকট সর্বকালে আইনত অবৈধ এবং স্বভাবত ঘৃণ্য ছিলো, ইরানে সেটাই ছিলো বিবাদ-বিতর্কের বিষয়। সামাজিকভাবেও ভাইবোনের বিবাহকে গর্হিত মনে করা দূরে থাক, বরং তা প্রশ্রয় পেতো। এমনকি পঞ্চম শতকের মধ্যভাগে রাজত্বকারী সম্রাট দ্বিতীয় ইয়াযদাগিদ আপন কন্যাকে বিবাহ করেছিলো এবং পরে নিজ হাতে তাকে খুন করেছিলো। ষষ্ঠ শতাব্দীর শাসক বাহরাম চুবীন-এর স্ত্রী ছিলো তার আপন বোন।¹⁷ ডেনমার্কের কোপেনহ্যাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যভাষার অধ্যাপক ক্রিস্টেনসিন, যিনি ইরানের ইতিহাসবিষয়ে বিশেষজ্ঞ, বলেন- 'সাসানী যুগের সমসাময়িক ঐতিহাসিক জ্যাতিয়াস ও অন্যান্যরা পারসিক সমাজে রক্তসম্পর্কের মধ্যে বিবাহের প্রচলন ছিলো বলে স্বীকার করেছেন। সমাজের দৃষ্টিতে এটা অন্যায় কিছু ছিলো না, বরং তা পুণ্যকর্ম বলেই সাধুবাদ পেতো। চৈনিক পর্যটক হোয়ান স্যাঙ সম্ভবত এজাতীয় বিবাহপ্রথার প্রতি ইঙ্গিত করেই লিখেছেন, 'ইরানীরা অবাধ বিবাহে বিশ্বাসী। তাদের আইন ও সমাজে কোন রক্তসম্পর্কই বিবাহের পথে বাধা নয়।'¹⁸

খৃস্টীয় তৃতীয় শতকে মানীর আবির্ভাব ঘটে। বস্তুত তার আন্দোলন ছিলো সমাজের অবাধ যৌন অনাচারের বিরুদ্ধে অপ্রাকৃতিক ও স্বভাববিরুদ্ধ এক প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া। তিনি ভাবতেন, এটা হলো 'তথাকথিত' আলো ও অন্ধকারের চিরন্তন দ্বন্দ্বের স্বাভাবিক ফল, আর যে কোন মূল্যে মানুষকে অন্ধকারের পরিবর্তে আলোর পথ গ্রহণ করতে হবে। তাই সমাজকে কলুষমুক্ত করার লক্ষ্যে তিনি অযৌন জীবন যাপন এবং কুমারব্রত পালনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার ঘোষণা ছিলো, 'আলো ও অন্ধকারের মিশ্রণই সমস্ত অনিষ্টের মূল, যা থেকে মুক্ত হওয়া মানবজীবনের জন্য অপরিহার্য।' মানবজাতির আশু বংশবিলুপ্তির মাধ্যমে আলো যেন অন্ধকারের উপর স্থায়ী বিজয় লাভ করে, এজন্য তিনি বিবাহ নিষিদ্ধ করেন। দু'শ ছিয়াত্তর সালে সম্রাট বাহরাম মানীকে এই যুক্তিতে হত্যা করেন যে, সে তো মানবজাতির বিলুপ্তি চায়; সুতরাং সেটা অন্যের পরিবর্তে নিজেকে দিয়ে শুরু করাই তার কর্তব্য। কিন্তু মানী নিহত হলেও তার আন্দোলনের মৃত্যু ঘটেনি, বরং বহুকাল তা বেঁচে ছিলো, এমনকি মুসলিম বিজয়ের পরো পারসিক সমাজে তার প্রভাব বিদ্যমান ছিলো।

পরবর্তীকালে পারস্যজাতির স্বভাব-প্রবণতা মানীর প্রকৃতিবিরুদ্ধ শিক্ষা ও দর্শনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলো, যা মাযদাকের (জন্ম ৪৮৭ খৃঃ) আন্দোলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে। মাযদাক ঘোষণা করেন- মানুষ জন্মগ্রহণ করেছে পার্থক্যহীন সমতার উপর। সুতরাং তাদের জীবনযাপনও হতে হবে পার্থক্যহীন সমতার উপর। আর যেহেতু সম্পদ ও নারীই হলো এমন দু'টি উপকরণ যার নিরাপত্তা ও সুরক্ষা মানবস্বভাবের চাহিদার অন্তর্ভুক্ত, সেহেতু এদু'টি ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে সাম্য ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। শাহরাস্তানী বলেন- তিনি নারী ও সম্পদের মালিকানা অবাধ করে দেন এবং আগুন, পানি ও ঘাসের মত নারী ও সম্পদের ক্ষেত্রেও সমমালিকানা ঘোষণা করেন।¹⁹ যুবসমাজ ও ভোগবাদী শ্রেণীর মধ্যে এ আন্দোলন ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কারণ এটা ছিলো তাদের ভোগলিন্সা ও কামপ্রবৃত্তির পূর্ণ অনুকূল। আর চমকপ্রদ বিষয় এই যে, এ আন্দোলন এমনকি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও লাভ করেছিলো। স্বয়ং পারস্যসম্রাট কোবায একে আনুকূল্য ও ছত্রচ্ছায়া দান করেন এবং সাম্রাজ্যব্যাপী তার প্রচার-প্রসারের ব্যবস্থা করেন। ফলে অত্যল্প সময়ের মধ্যে গোটা দেশে এ আন্দোলন দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে এবং পারসিক সমাজ নৈতিক নৈরাজ্য ও যৌন অনাচারের বাঁধভাঙ্গা জোয়ারে ভেসে যায়। তাবারী বলেন- 'বিকৃতরুচির ইতর লোকেরা এ সুযোগ লুফে নিয়ে মাযদাকীদের দলে ভিড়ে গেলো। তারা এমনই বেপরোয়া হয়ে উঠলো যে, সাধারণ মানুষ হয়ে পড়লো তাদের ভোগলিন্সা ও কামলালসার অসহায় শিকার। দিনে দুপুরে ঘরে ঘরে হানা দিয়ে মানুষের 'মান ও সামান' তারা ভোগদখলে নিয়ে নিতো। গৃহস্বামীর কিছুই করার থাকতো না। মাযদাকীরা সিংহাসনচ্যুতির হুমকি দিয়ে সম্রাট কোবাযকেও বাধ্য করেছিলো মাযদাকবাদের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করতে। ফলে অত্যল্প সময়ে অবস্থা এতদূর গড়ালো যে, সমাজে পিতৃপরিচয় বিলুপ্ত হয়ে গেলো এবং বস্তুর উপর ব্যক্তির মালিকানা রহিত হয়ে হয়ে গেলো। তাবারী বলেন, 'শুরুতে কোবায ছিলেন পারস্যের অন্যতম আদর্শ শাসক, কিন্তু মাযদাকী আন্দোলনে জড়িত হয়ে তিনি এমন বিপর্যয় ডেকে আনেন যে, গোটা রাজ্যে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে এবং সকল সীমান্ত হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত।'²⁰

পারস্যের সম্রাট পূজা

কিসরা (খসরু) উপাধিধারী পারস্যের সম্রাটগণ ভাবতেন, পৃথিবীতে তারা ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব। তাদের ধমনীতে ঐশী রক্ত প্রবাহিত এবং তার বর্ণ নীল। প্রজারাও সম্রাট ও রাজ-পরিবারকে সে দৃষ্টিতেই দেখতো এবং বিশ্বাস করতো, রাজবংশের স্বভাব-প্রকৃতিতে ঊর্ধ্বজাগতিক পবিত্র কোন উপাদান রয়েছে। তাই তারা তাদের সিজদা-প্রণাম করতো এবং তাদের ঈশ্বরত্বের বন্দনা গাইতো। সম্রাট ছিলেন আইন ও সমালোচনার, এমনকি মানবত্বেরও ঊর্ধ্বে। তাই সম্রাটের 'পবিত্র' নাম তারা মুখে উচ্চারণ করতো না এবং রাজসভায় উপবেশনের সাহস করতো না। প্রজাদের আরো বিশ্বাস ছিলো, প্রতিটি মানুষের উপর সম্রাটের অধিকার রয়েছে, কিন্তু সম্রাটের উপর কারো কোন অধিকার নেই। সম্রাট যদি কাউকে কিছু দান করেন, কিংবা ভোজপাত্র থেকে কোন টুকরো ছুঁড়ে দেন তবে সেটা শুধুই করুণা, অধিকার ও প্রাপ্য কিছুতেই নয়। সম্রাটের প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্যই হলো প্রজা-কর্তব্য এবং মোক্ষ লাভের একমাত্র উপায়। রাজবংশের দাসত্বেই প্রজাবংশের গৌরব।

রাজ্যশাসন ও প্রজাপালনের জন্য একটি বিশেষ পরিবার তথা কায়ানী পরিবার নির্ধারিত ছিলো। পারস্যবাসী মনে করতো, রাজমুকুট ধারণ এবং সিংহাসনে আরোহণ, এটা তাদের একক অধিকার এবং রাজ্য ও রাজভাণ্ডারের তারাই একমাত্র হকদার, যা উত্তরাধিকারসূত্রে পিতা থেকে পুত্রে হস্তান্তরিত হবে, হতেই থাকবে। তাতে হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার সাম্রাজ্যের আর কারো নেই। এ অধিকার এমনই মৌরুসি ছিলো এবং প্রজাদের বোধ, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের এমনই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিলো যে, তাতে সামান্য ব্যত্যয় ঘটাবার সাধ্য ছিলো না কারো। এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক উত্তরাধিকারী পাওয়া না গেলে সম্রাটের শিশুপুত্রকে সিংহাসনে বসিয়ে দেয়া হতো। পক্ষান্তরে পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকলে কোন নারীকেই প্রজারা সম্রাজ্ঞীরূপে বরণ করে নিতো, যাতে শাসনদণ্ড রাজপরিবারেই সংরক্ষিত থাকে। যেমন সম্রাট শেরোবার মৃত্যুর পর সাতবছরের পুত্র আর্দেশীরকে সিংহাসনে বসানো হয়। একইভাবে কিসরা পারভেজের শিশুপুত্র ফররূখযাদ খসরু সিংহাসনে আরোহণ করেন। অন্যদিকে কিসরার দুই কন্যা বোরান ও আযরামিদখত একই সূত্রে সিংহাসন লাভ করেন।²¹ কিন্তু এত বড় জাতীয় সঙ্কটকালেও কারো কল্পনায়ও আসেনি যে, যোগ্য, বিজ্ঞ ও প্রভাবশালী কোন সেনাপতি বা সভাসদকে, যেমন ছিলেন বুস্তম, জাভান ও অন্যান্য, তাদের কাউকে রাজ্যশাসনের ভার দেয়া যেতে পারে। কেননা হয়ত তাদের সবকিছু ছিলো, কিন্তু তাদের ধমনীতে ছিলো না রাজবংশের নীল রক্ত।

ইরানী সমাজে শ্রেণীবিভক্তি

ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিবার এবং ভূস্বামী ও অভিজাত শ্রেণী সম্পর্কে জন-সাধারণের বিশ্বাস ছিলো যে, সাধারণ মানবীয় স্তর থেকে বহু ঊর্ধ্বে তাদের অবস্থান। এই বিশেষ শ্রেণীটিকে পারস্যের সাধারণ মানুষ সীমাহীন ক্ষমতা, অধিকার ও মর্যাদা দিয়ে রেখেছিলো এবং তাদের প্রতি প্রজা-আনুগত্যও ছিলো নিরঙ্কুশ। ইতর-ভদ্রের পার্থক্য, শ্রেণীভেদ ও পেশাগত বিভক্তি ছিলো ইরানী সমাজের অটল বিধান, যাতে সামান্য পরিবর্তনেরও কোন অবকাশ ছিলো না। অধ্যাপক আর্থার ক্রিস্টেনসিন বলেন- ‘পারস্যে সমাজব্যবস্থার ভিত্তি ছিলো বংশ ও পেশাগত পরিচয়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে ছিলো অনতিক্রম্য ব্যবধান ও দূরত্ব। উপর থেকে নীচে, বা নীচ থেকে উপরে যাওয়ার কোন যোগসূত্র যেমন ছিলো না তেমনি ছিলো না উভয় শ্রেণীর মধ্যে দাস-প্রভু ছাড়া অন্য কোন সম্পর্ক-সূত্র। সাধারণের জন্য অভিজাত ও শাসক শ্রেণীর কারো ভূসম্পত্তি ক্রয় করা আইনতই নিষিদ্ধ ছিলো। সাসানী শাসননীতির অন্যতম বিধান ছিলো এই - প্রত্যেকে সেই অবস্থা ও অবস্থানেই সন্তুষ্ট থাকবে, যা সে জন্মসূত্র ও বংশপরিচয় থেকে লাভ করেছে। এর চেয়ে উচ্চ মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়াস তার জন্য কিছুতেই বৈধ নয়। তদ্রূপ জন্মগত পেশা, যে জন্য ঈশ্বর তাকে সৃষ্টি করেছেন, তা ছেড়ে অন্য কোন পেশা সে গ্রহণ করতে পারে না। তাছাড়া ইরানী শাসকগণ রাজকার্যে সাধারণ শ্রেণী ও নীচবংশের কাউকে কখনো নিযুক্ত করতো না। এমনকি প্রজাসাধারণের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যেও সুস্পষ্ট ভেদরেখা বিদ্যমান ছিলো এবং প্রত্যেকের পৃথক অবস্থান সুনির্ধারিত ছিলো।'²²

বলাবাহুল্য, এই শ্রেণীভেদ ছিলো মানবতার চরম অপমান, যা রাজসভায় এবং অভিজাত শ্রেণীর সমাবেশে প্রকট হয়ে ধরা পড়তো। যেমন সেখানে তাদের বসার অধিকার ছিলো না, বরং বুকে হাত রেখে নিশ্চল পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। সেখানে প্রবেশাধিকারই ছিলো তাদের জন্য চূড়ান্ত মর্যাদার বিষয়। রাজদরবারের এসব দৃশ্য কোন মুসলিম দূতের জন্য এমনই অসহনীয় হতো যে, তিনি প্রকাশ্যে এর সমালোচনা করতেন। তাবারীর একটি বর্ণনায় পরিষ্কার বোঝা যায়, পারস্যসমাজ তাদের চিরাচরিত সংস্কার ও সংস্কৃতি অনুযায়ী দাস-প্রভু মনোবৃত্তির কোন স্তরে পৌঁছে গিয়েছিলো। তিনি বলেন- 'আবু উছমান আন-নাহদী বর্ণনা করেন, ছাহাবী হযরত মুগীরা সেতু পার হয়ে পারস্যে প্রবেশ করলেন। তখন লোকেরা তাকে বসিয়ে রেখে সেনাপতি রুস্তমের সমীপে তার উপস্থিতির জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলো। তারা তাদের প্রতাপ প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে রাজকীয় ঠাটবাটের কোন পরিবর্তন করলো না। তো হযরত মুগীরা বিন শো'বা (রা) অগ্রসর হলেন। দরবারে সকলে ছিলো রাজকীয় পোশাকে। মাথায় মুকুট এবং দেহে স্বর্ণখচিত বস্ত্র। তাদের ফরাস ছিলো নির্দিষ্ট দূরত্বে। সেটা হেঁটে অতিক্রম করেই সেনাপতি রুস্তমের নিকটে পৌঁছতে হতো। হযরত মুগীরা হেঁটে রুস্তমের নিকট পৌঁছলেন, তারপর সোজা তার পাশে তার গদিতে বসে পড়লেন। এ অভাবনীয় দৃশ্য দেখে দরবারীরা প্রথমে হতবাক হলো, তারপর ছুটে এসে কঠোর তিরস্কার করে তাঁকে নামিয়ে দিলো। তিনি বললেন, তোমাদের সম্পর্কে তো আমাদের কাছে প্রজ্ঞাপূর্ণ সংবাদই পৌঁছতো, কিন্তু আমি তো তোমাদের চেয়ে নির্বোধ সম্প্রদায় দেখিনি। আমরা আরবজাতি তো সবাই সমান। কেউ কাউকে দাস বানিয়ে রাখি না, তবে যদি সে প্রতিপক্ষ যোদ্ধা হয়। তাই আমার ধারণা ছিলো, পরস্পর তোমরা সম্প্রীতিপূর্ণ আচরণ করো যেমন আমরা নিজেদের মধ্যে করি। তার চেয়ে ভালো ছিলো যদি আমাকে আগেই জানিয়ে দিতে যে, তোমরা একে অন্যের প্রভু, আর এ আচরণ তোমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলে আমি তা করতাম না। কিন্তু আমি তো নিজে থেকে তোমাদের কাছে আসিনি, তোমরা ডেকে এনেছো। আজ নিশ্চিত হলাম যে, তোমাদের প্রতাপ অস্তগামী এবং তোমরা পরাজিত হবে। কেননা এমন নীতি ও চরিত্র এবং এরূপ চিন্তা ও মানসিকতার উপর কোন রাজত্ব স্থায়ী হতে পারে না।'²³

ইরানীদের জাত্যাভিমান

এতসব নষ্টাচারের পরও ইরানীদের জাত্যাভিমান ছিলো অতিমাত্রায় প্রবল। নিজেদের তারা পৃথিবীর সমস্ত জাতি ও জনগোষ্ঠীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতো। তাদের বিশ্বাস ছিলো, ইশ্বর তাদের এমন কিছু গুণ, বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবযোগ্যতা দান করেছেন, যা আর কোন জাতির মধ্যে নেই। তাই চারপাশের অন্যান্য জাতিকে তারা কৃপা ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখতো এবং এমন সব নামে তাদের সম্বোধন করতো যাতে তাচ্ছিল্য ও বিদ্রুপ ছাড়া আর কিছু ছিলো না।

অগ্নিপূজা: জীবনের উপর তার প্রভাব

একেবারে প্রাচীন কালে ইরানীরা আল্লাহর ইবাদত করতো এবং আল্লাহকেই সিজদা করতো। পরে তারা অন্যান্য আদি জনগোষ্ঠীর মত সূর্য, চাঁদ-তারা এবং আকাশের অন্যান্য জ্যোতিষ্কের উপাসনা শুরু করে। তারপর আগমন ঘটলো পারসিক ধর্মের প্রবর্তক জরথোস্ট্রর। বলা হয়, মূর্তিপূজা প্রত্যাখ্যান করে তিনি একত্ববাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিলো, বিশ্বজগতের আলোকিত ও উজ্জ্বল প্রতিটি বস্তুতে মূলত আল্লাহর নূর বা আলোই প্রতিবিম্বিত হয়। প্রার্থনার সময় তিনি অগ্নি ও সূর্যের অভিমুখী হওয়ার আদেশ করেছেন। কেননা আলো হচ্ছে ইলাহের সর্বশক্তির প্রতীক। তাছাড়া তিনি উপাদানচতুষ্টয় তথা অগ্নি, বায়ু, মৃত্তিকা ও জল- এগুলোকে অসম্মান করতে নিষেধ করতেন। পরবর্তীকালে ধর্মবেত্তাগণ জরথোস্ট্রীয় ধর্মের বিভিন্ন বিধান প্রণয়ন করেছেন। তখন তারা এমন সব পেশা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন যাতে আগুনের সাহায্য গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে। ফলে এ ধর্মের অনুসারীরা ব্যবসা ও কৃষিকাজেই নিজেদের আবদ্ধ করে রাখে। কর্মক্ষেত্রে এই অগ্নি-সম্মান এবং উপাসনায় এ অগ্নিমুখিতার কারণেই একসময় মানুষ অগ্নিপূজায় লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং স্বয়ং অগ্নিসত্তারই উপাসনা শুরু করে। তখন থেকেই অগ্নিকুণ্ড ও অগ্নিমন্দির নির্মাণের সূচনা। পরে অগ্নিপূজা ছাড়া অন্যসব উপাসনা ও ধর্মবিশ্বাস বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। প্রকৃত সত্য চলে যায় অজ্ঞতার আড়ালে এবং ইতিহাস হয়ে পড়ে বিস্মৃত।²⁴ আগুনের যেহেতু নিজস্ব কোন শক্তি নেই এবং পূজারীদের জন্য আগুনের যেহেতু কোন বিধান ও বার্তা নেই এবং আগুণ যেহেতু জীবনসমস্যার কোন সমাধান দিতে পারে না এবং পারে না অপরাধীদের দমন ও শাসন করতে সেহেতু অগ্নিপূজার ধর্ম পরিণত হলো নির্দিষ্ট স্থানের এবং নির্দিষ্ট সময়ের নিছক কতিপয় আচার-অনুষ্ঠানে। উপাসনালয়ের বাইরে জীবনের বিস্তৃত অঙ্গনে ধর্মের কোন ভূমিকাই ছিলো না। ঘরে, পরিবারে, সমাজপরিসরে ও রাজ্যশাসনে মানুষ ছিলো সম্পূর্ণ স্বাধীন, বরং নিজস্ব চিন্তা ও বুদ্ধির, চাহিদা ও প্রবৃত্তির এবং সুবিধা ও স্বার্থের অধীন, যেমন হয়ে এসেছে সব যুগে সব দেশে সকল মুশরিক সমাজে।

মোটকথা পারস্যজাতি তাদের জীবন ও কর্মের ক্ষেত্রে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ও সর্বাঙ্গীন ধর্ম ও জীবন বিধান থেকে বঞ্চিত ছিলো যা আত্মিক ও নৈতিক সংশোধনে সক্ষম এবং প্রবৃত্তির অবদমন ও পুণ্যকর্মে উদ্বুদ্ধকরণে সফল; যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র-পরিচালনায় হতে পারে পথপ্রদর্শক; এবং যা পারে শাসকবর্গকে শোষণ-নিপীড়ন থেকে নিবৃত্ত করতে এবং শোষিত ও বঞ্চিতদের অধিকার ও প্রাপ্য নিশ্চিত করতে। কিন্তু আগেই যেমন বলা হয়েছে, পারস্যজাতির কাছে এমন কোন ধর্ম ও ধর্মব্যবস্থা ছিলো না। ফলে এই অগ্নিপূজক জাতিও হয়ে পড়েছিলো ধর্মহীন ও নীতি-নৈতিকতাহীন জনগোষ্ঠীর মত। আচরণে ও চরিত্রে তাদের মধ্যে কোনই পার্থক্য ছিলো না।

চীনঃ ধর্ম ও সমাজ

চীনের বিশাল ভূখণ্ডে এই শতকে তিনটি ধর্ম বিদ্যমান ছিলো। লাউতিশো-প্রবর্তিত ধর্ম, দার্শনিক কনফোসিয়াস-প্রবর্তিত ধর্ম এবং গৌতম বুদ্ধের ধর্ম। লাউতিশোর ধর্ম একে তো আত্মপ্রকাশের অল্পকাল পরেই মূর্তিপূজাকবলিত হয়ে পড়ে, তদুপরি তাতে তাত্ত্বিকতার পরিবর্তে বাস্তব জীবনের প্রাধান্য ছিলো অনেক বেশী। এ ধর্মের অনুসারীরা ছিলো জীবনবিমুখ ও কঠিন সংসারবিরাগী। সারা জীবন তারা বিবাহ ও নারীসংশ্রব পরিহার করে চলতো। সুতরাং একটি বিশুদ্ধ জীবন ও সমাজ এবং আদর্শ সরকার ও শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হওয়ার কোন যোগ্যতা এ ধর্মের ছিলো না। ফলে ধর্মপ্রবর্তকের পরবর্তী অনুসারীরাই তার বিরোধিতা করে নতুন পথ ও ধর্মমত গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলো।

অন্যদিকে দার্শনিক কনফোশিয়াস তাত্ত্বিকতার পরিবর্তে বাস্তব জীবনকে অধিক গুরুত্ব দিতেন, তবে তাঁর শিক্ষা ও দর্শন আবর্তিত হয়েছে পার্থিব জীবনকে কেন্দ্র করে। জাগতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেই শুধু কিছু দিকনির্দেশনা তাতে ছিলো। পরকালীন জীবনের সুস্পষ্ট কোন ধারণা সেখানে ছিলো না। কোন একটা সময় কনফোসিয়াসের অনুসারীরা নির্দিষ্টি কোন উপাস্যে বিশ্বাসী ছিলো না, বরং তারা ইচ্ছেমত প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের, পাথর, গাছ, বা নদনদীর পূজা করতো। তাতে না ছিলো ঈমানের নূর, না ছিলো বিশ্বাসের প্রত্যয়, আর না ছিলো ঐশী বিধানের কোন দিকনির্দেশ, বরং তা ছিলো নিছক একজন প্রাজ্ঞ দার্শনিকের প্রজ্ঞা এবং একজন অভিজ্ঞ মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ কিছু শিক্ষা, যা মানুষ যখন ইচ্ছা গ্রহণ এবং যখন ইচ্ছা বর্জন করতে পারতো। তাতে কোন বাধা ও বিধিনিষেধ ছিলো না।

বৌদ্ধ ধর্মের উত্থান ও পতন

পক্ষান্তরে বৌদ্ধধর্ম ছিলো অপেক্ষাকৃত উন্নত ও সংহত একটি ধর্ম এবং তার অনুসারীর সংখ্যা ছিলো বিপুল। বৌদ্ধধর্ম বহুপূর্বেই তার স্বভাবসরলতা ও প্রাণ-উচ্ছলতা হারিয়ে ফেলেছিলো। ব্রাহ্মণ-ধর্মের 'বিশ্বাস ও সংস্কার এবং দেবতা ও অবতার' গ্রহণ করে বৌদ্ধধর্ম আসলে নিজের অস্তিত্বই শেষ করে দিয়েছিলো। উগ্র ও হিংস্র ব্রাহ্মণবাদ বৌদ্ধ-ধর্মকে এমনভাবে গ্রাস করেছিলো যে, তার স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিলো না। বস্তুত, বৌদ্ধধর্ম তখন হয়ে পড়েছিলো মূর্তিপূজারই ধর্ম। পৃথিবীর যেখানে বৌদ্ধধর্ম গিয়েছে, মূর্তি ও প্রতিমা সঙ্গে গিয়েছে। বুদ্ধের অনুসারীরা যত দেশে তাদের অধিবাস গড়েছে সেখানে বুদ্ধের অসংখ্য প্রতিমা ও ভাস্কর্য নির্মাণ করেছে। তাদের ধর্মীয় জীবন ও নাগরিক সভ্যতা বলতে গেলে প্রতিমাসংস্কৃতি দ্বারাই আচ্ছন্ন ছিলো, যা বৌদ্ধধর্মের উন্নতির যুগে বিকাশ লাভ করেছিলো।²⁵

একটি ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসের শিক্ষক প্রফেসর ঈশ্বর টোপা বলেন- 'বৌদ্ধধর্মের ছায়ায় যে ব্যবস্থা ও দর্শন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে তাতে ছিলো বহু অবতার ও মূর্তিপূজার ছড়াছড়ি। বৌদ্ধভ্রাতৃসঙ্ঘের পরিবেশ-পরিমণ্ডল বারবার পরিবর্তিত হয়েছে এবং তাতে নব নব বৈচিত্র্যের প্রকাশ ঘটেছে।'²⁶

ভারতের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পণ্ডিত জওয়াহির লাল নেহরুও বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন। the discovery of india গ্রন্থে বৌদ্ধধর্মের বিকৃতি ও ক্রমাবনতি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন- 'ব্রাহ্মণ্যবাদ গৌতম বুদ্ধকে ইশ্বরের অবতাররূপে উপস্থাপন করেছিলো; এমনকি স্বয়ং বৌদ্ধধর্মও এ বিষয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদের অনুগমন করেছিলো। আর বৌদ্ধভ্রাতৃ-সঙ্ঘ বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়ে বিশেষ কতিপয় গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির আখড়ায় পরিণত হয়েছিলো। সেখানে নিয়ম ও শৃঙ্খলার কোন অস্তিত্ব ছিলো না। উপাসনাব্যবস্থায় জাদু ও কুসংস্কারের ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটেছিলো। ভারতবর্ষে সুদীর্ঘ একহাজার বছর পর্যন্ত উন্নতি ও সমৃদ্ধি লাভ করার পর একসময় বৌদ্ধ-ধর্মের অবনতি ও সঙ্কোচন শুরু হয়। তখন বৌদ্ধধর্মের যে রুগ্নদশা হয়েছিলো তার নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেছেন mrs rhys davids। তিনি বলেন, (যেমন বিখ্যাত দার্শনিক স্যর রাধাকৃষ্ণ তার 'ভারতীয় দর্শন' গ্রন্থে এর বরাত দিয়ে লিখেছেন) 'এসকল রুগ্ন চিন্তাদর্শন গৌতম বুদ্ধের নৈতিক শিক্ষার উপর এমনভাবে ছায়া বিস্তার করেছিলো যে, একসময় তা বুদ্ধের অনুসারীদেরও দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। শেষে অবস্থা এমন হলো যে, একেকটি চিন্তা ও দর্শন আত্মপ্রকাশ করে এবং কিছুকালের জন্য মানুষের মনমস্তিষ্ক আচ্ছন্ন করে রাখে। তারপর ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং অন্য একটি মতবাদ বা চিন্তাধারা তার স্থান দখল করে নেয়। উন্মেষ, বিকাশ ও বিলোপের এ ধারা চলতেই থাকে, এমনকি মানবমস্তিষ্কের এসকল চটকদার উদ্ভাবন ধর্মের সমগ্র পরিমণ্ডলেই গভীর অন্ধকার হয়ে ছেয়ে যায়, আর ধর্মের প্রবর্তকের সহজ, সরল ও সমুচ্চ নৈতিক শিক্ষা নানা রকম সূক্ষ্ম জটিল দার্শনিক আলোচনার আড়ালে হারিয়ে যায়।' সামগ্রিকভাবে বৌদ্ধধর্ম ও ব্রাহ্মণ্যবাদ দু'টোই অবক্ষয়ের শিকার হয়ে পড়ে এবং তাতে জঘন্যরকমের প্রথা ও কুসংস্কারের অনুপ্রবেশ ঘটে। অবশেষে বৌদ্ধ-ধর্ম ব্রাহ্মণ্যবাদে এমনভাবে একীভূত ও দ্রবীভূত হয়ে যায় যে, উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করাই কঠিন হয়ে পড়ে।²⁷

বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস ও গৌতম বুদ্ধের জীবনী যারা লিখেছেন তাদের কাছে বৌদ্ধধর্মে ইশ্বরচিন্তা ও স্রষ্টায় বিশ্বাসের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সংশয় ও বিতর্কের বিষয়রূপেই রয়ে যায়। ফলে তাদের কেউ কেউ হতবাক হয়ে প্রশ্ন রেখেছেন, এমন একটি বিরাট ধর্ম নিছক কতিপয় নীতিশিক্ষার দুর্বল বুনিয়ারের উপর প্রতিষ্ঠিত হলো কীভাবে, যাতে ইশ্বরচিন্তার কোন স্থান নেই! আত্মশুদ্ধি, প্রবৃত্তি-দমন, সদগুণ অর্জন এবং নির্বাণ লাভের বিভিন্নমুখী কিছু সাধনা ছাড়া আর কিছুই তো ছিলো না এ ধর্মের!

মোটকথা, চীন ও বৌদ্ধশাসিত অন্যান্য দেশের কাছে বিশ্বের জন্য কোন ধর্মীয় বার্তা ও দ্বীনী পায়গামই ছিলো না, যার আলোকে বিশ্ববাসী পাবে তাদের জীবনসমস্যার সমাধান এবং পাবে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার সরল পথের সন্ধান। চীন ছিলো সভ্য পৃথিবীর একেবারে পূর্বপ্রান্তে। নিজেদের ধর্মীয় ও জ্ঞানগত ঐতিহ্যের প্রতি তারা ছিলো অতিমাত্রায় রক্ষণশীল। তাদের মধ্যে না ছিলো নিজেদের সম্পদে সমৃদ্ধি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা, না ছিলো অন্য জাতির সম্পদে সমৃদ্ধি সাধনের যোগ্যতা।

মধ্য এশিয়ার জাতিবর্গ

পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার মঙ্গোল, তুর্কী, জাপানী ও অন্যান্য জাতিবর্গ হয় বিকৃত বৌদ্ধধর্মের অনুসারী ছিলো, না হয় বর্বর মৃতিপূজায় লিপ্ত ছিলো। তাদের না ছিলো কোন জ্ঞানসম্পদ, না ছিলো কোন উন্নত শাসনব্যবস্থা। বলা যায়, তারা অন্ধকার ও বর্বরতার যুগ থেকে আলো ও সভ্যতার যুগে উত্তরণের পথে একটি অন্তর্বর্তীকাল অতিক্রম করছিলো। পক্ষান্তরে কোন কোন জাতিগোষ্ঠী তো তখনো বেদুঈন জীবনের স্তরে এবং চিন্তার শৈশবেই রয়ে গিয়েছিলো। তো যারা জীবন ও নগর সভ্যতার মাত্র প্রাথমিক স্তরে উপনীত হয়েছে এবং চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে শৈশব অতিক্রম করছে তারা কীভাবে বিশ্বের জাতিবর্গকে সততা ও সত্যের এবং বিশুদ্ধ জীবনযাপনের পথ দেখাবে; পাথেয় যোগাবে?!

ভারতবর্ষঃ ধর্ম, সমাজ ও নৈতিকতার বিচারে

ভারতবর্ষের ইতিহাস যারা লিখেছেন তারা এ বিষয়ে পূর্ণ একমত যে, খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতকের গোড়া থেকে যে সময়কালের শুরু সেটাই ছিলো ধর্ম, সমাজ ও নৈতিকতার দিক থেকে ভারতবর্ষের সবচেয়ে অধঃপতিত যুগ, যা ইতিহাসের কোন স্তরে জ্ঞান ও সভ্যতা, নীতি ও নৈতিকতা এবং নানা সংস্কার-আন্দোলনের কেন্দ্ররূপে পরিচিত ছিলো। অধঃপতন ও সামাজিক অবক্ষয়, যা তখন সমগ্র পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলেছিলো, সে ক্ষেত্রে বিশাল ভারতবর্ষও চারপাশের অন্যান্য দেশ, জাতি ও জনগোষ্ঠীর সহযাত্রী ছিলো এবং এগিয়ে না থাকলেও কারো থেকে পিছিয়ে ছিলো না কোন ক্ষেত্রেই। সমগ্র মানবজনপদের উপর যে ঘোর অন্ধকার তখন থাবা বিস্তার করেছিলো, ভারতবর্ষ যেন সে অন্ধকারের পর্যাপ্ত অংশই নিজের বরাদ্দে টেনে এনেছিলো। পক্ষান্তরে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো পৃথিবীর এই বিশাল ভূখণ্ডটি ছিলো একক বৈশিষ্ট্যের দাবীদার। সেগুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা এখানে আমরা এই তিনটি শিরোনামে তুলে ধরতে পারি- (ক) উপাস্য দেবদেবীর অকল্পনীয় সংখ্যাধিক্য (খ) লাগামহীন যৌন অরাজকতা (গ) বর্বর ও নিষ্ঠুর জাতিভেদ এবং সামাজিক শ্রেণীভাগ।

'মাত্র' তেত্রিশ কোটি দেবতা!

খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতকে মূর্তিপূজা ভারতবর্ষে চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলো। বেদ গ্রন্থে দেবতাদের সংখ্যা ছিলো মাত্র তেত্রিশ, যার অকল্পনীয় সংখ্যাস্ফিতি এই শতকে পৌঁছে গিয়েছিলো তেত্রিশ কোটিতে। কল্পনা করুন, তেত্রিশ থেকে তেত্রিশ কোটি! যে কোন সুন্দর, আকর্ষণীয়, অভিনব ও বিদঘুটে বস্তু এবং জীবনের প্রয়োজনীয় যে কোন উপকরণ উপাস্য দেবতার মর্যাদা লাভ করতো। এভাবে মূর্তি ও প্রতিমা এবং দেবী ও দেবতার সংখ্যা সকল সীমা ছাড়িয়ে যায়। তাদের উপাস্যের তালিকায় যেমন ছিলো বিভিন্ন উদ্ভিদ ও বৃক্ষলতা তেমনি ছিলো অসংখ্য জড়বস্তু ও খনিজ পদার্থ; ছিলো ছোট বড় হাজারো পশু-প্রাণী, এমনকি লিঙ্গপূজা পর্যন্ত বাদ পড়েনি। পাহাড়-পর্বতও উপাস্যরূপে বরিত হয়েছে এই সুবাদে যে, তাদের কোন কোন দেবতা তাতে অধিষ্ঠান গ্রহণ করেছেন। আর গঙ্গা হলো তাদের মা, যা স্নানকারীর সমস্ত পাপ মোচন করে। কারণ গঙ্গা উৎসারিত হয়েছে 'মহাদেব'-এর মাথার জট থেকে। 'গোমাতা'রও তারা পূজা করে, এমনকি গোবর ও গোচনা হচ্ছে তাদের দৃষ্টিতে পরম পবিত্র পদার্থ। এছাড়া তাদের উপাস্যের তালিকায় রয়েছে কতিপয় ঐতিহাসিক ও কাল্পনিক ব্যক্তিত্ব, হিন্দুবিশ্বাস মতে বিভিন্ন অতিপ্রাকৃতিক ঘটনায় স্বয়ং ভগবান তাদের মাঝে অধিষ্ঠান গ্রহণ করেছেন। এভাবে এই সুপ্রাচীন ধর্ম কিছু কল্পকথা, অলীক কাহিনী, আজগুবী চিন্তাবিশ্বাস ও পূজা-অর্চনার সমাহারে পরিণত হয়েছে, যার স্বপক্ষে না আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেছেন, না কোন যুগের জ্ঞান ও যুক্তি তা সমর্থন করেছে।

ডক্টর গোস্তাভ লী বোন 'ভারতবর্ষের সভ্যতা' গ্রন্থে লিখেছেন- 'পৃথিবীর অন্যান্য জাতির মধ্যে হিন্দুজাতি এদিক থেকে ব্যতিক্রম যে, উপাসনার জন্য তাদের কোন না কোন বাহ্যিক আকৃতির উপস্থিতি অপরিহার্য। যদিও বিভিন্ন যুগে ধর্মসংস্কারকগণ হিন্দুধর্মে একত্ববাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চেয়েছেন, কিন্তু তা ছিলো নিষ্ফল প্রচেষ্টা। বৈদিক যুগের হিন্দু হোক, কিংবা এ যুগের, তারা প্রকৃতির ছোট বড় সবকিছুরই পূজা করে থাকে। যা কিছু তাদের বুদ্ধির অগম্য এবং যা কিছু তাদের নিয়ন্ত্রণাতীত (এবং যা কিছু কোন না কোনভাবে তাদের আকৃষ্ট করে) সেগুলোই তাদের দৃষ্টিতে উপাসনার উপযুক্ত। হিন্দু ব্রাহ্মণ ও দার্শনিকদের এমন সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে যা তারা একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যয় করেছেন, এমনকি উপাস্য দেবতার সংখ্যা তিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রচেষ্টাও পণ্ডশ্রমে পর্যবসিত হয়েছে। সাধারণ মানুষ তাদের শিক্ষা শুনেছে, হয়ত গ্রহণও করেছে, কিন্তু কার্যত এই তিন উপাস্য সংখ্যায় বেড়েই চলেছে এবং প্রকৃতির প্রতিটি বস্তুতে ও শক্তিতে তারা কোন না কোন উপাস্যকে দেখতে পেয়েছে।'²⁸

আমরা যে যুগের আলোচনা করছি তখন মূর্তি ও প্রতিমানির্মাণশিল্প অভাবনীয় উন্নতি লাভ করেছিলো, আর ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে তার চরমোৎকর্ষ ঘটেছিলো এবং অতীতের যে কোন সময়কে ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। রাজা থেকে প্রজা, সমাজের সর্বস্তরেই ছিলো মূর্তিপূজার অপ্রতিহত প্রভাব, এমনকি বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মও মূর্তিপূজা অস্বীকার করার উপায় খুঁজে পায়নি, বরং ধর্মের অস্তিত্ব রক্ষা ও প্রচার-প্রসারের স্বার্থে তাদেরও এর আশ্রয় নিতে হয়েছে। মূর্তিপূজা ও প্রতিমা-শিল্পের প্রভাব ও উৎকর্ষ তখন কোন্ পর্যায়ে ছিলো তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় প্রখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন শাঙ-এর বিবরণ থেকে, যিনি ৬৩০ থেকে ৪৪ খৃস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতবর্ষ পরিভ্রমণ করেছেন। রাজা হর্ষবর্ধন (৬০৬-৬৪৮ খৃঃ) যে বিরাট রাজকীয় উৎসব অনুষ্ঠান করেছিলেন তার বিবরণ দিতে গিয়ে পরিব্রাজক হিউয়েন শাঙ লিখেছেন- 'সম্রাট হর্ষবর্ধন কনৌজে এক বিরাট উৎসবসভার আয়োজন করলেন, তাতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন ধর্মের বিপুল সংখ্যক পুরোহিত ও ধর্মীয় পণ্ডিত অংশগ্রহণ করেন। সম্রাট হর্ষবর্ধন গৌতম বুদ্ধের একটি স্বর্ণমূর্তি তৈরী করে পঞ্চাশ হাত উঁচু এক বিশাল স্তম্ভের উপর তা স্থাপন করেন এবং অপেক্ষাকৃত ছোট একটি মূর্তি নিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রায় বের হন। সম্রাট হর্ষবর্ধন স্বয়ং বুদ্ধমূর্তির পাশে অবস্থান গ্রহণ করে ছত্রদণ্ড বহন করেন। আর সম্রাটের মিত্র রাজা কামরূপ (ঝালর দুলিয়ে) 'মাছি-নিবারণ'-এর দায়িত্ব পালন করেন।' সম্রাট হর্ষবর্ধনের পরিবার ও সভাসদবর্গের ধর্মপরিচয় সম্পর্কে হিউয়েন শাঙ লিখেছেন- তাদের কেউ ছিলো শিবের পূজারী, কেউ বৌদ্ধধর্মের অনুসারী; কেউ সূর্যদেবতার পূজা করতো, কেউ করতো বিষ্ণুপূজা। প্রত্যেকের স্বাধীনতা ছিলো নির্দিষ্ট কোন একটি দেবতার, কিংবা সর্বদেবতার উপাসনা করার।

ভারতের লজ্জা, অবাধ যৌনতা

প্রাচীনকাল থেকেই যৌনতা ও কামকেলি ছিলো ভারতবর্ষের ধর্ম ও সমাজ-সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সম্ভবত আর কোন দেশ, ধর্ম ও সমাজে যৌনতা ও কামচর্চার এমন ছড়াছড়ি নেই যেমনটি রয়েছে ভারতবর্ষের ধর্ম ও সমাজ-সংস্কৃতির গভীরে। ব্রহ্মার বিভিন্ন গুণের অভিপ্রকাশ, সত্যযুগের ঘটনা-মহাঘটনা এবং ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্বরহস্য সম্পর্কে যেসব কাহিনী হিন্দুধর্মের পবিত্র গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত এবং হিন্দুসমাজে আলোচিত হয়ে আসছে, তদুপরি দেব-দেবী এবং দেবতা ও মানবীদের কামলীলার যে অশ্লীল বিবরণ রয়েছে তাতে যে কেউ কানে আঙ্গুল দেবে এবং লজ্জায় মাথা নীচু করতে বাধ্য হবে। ধর্মানুরাগী মানুষ যখন ভক্তি-উচ্ছ্বাসের সঙ্গে এসবের চর্চা করে তখন অবচেতনভাবে তাদের মনুমানস ও আবেগ-অনুভূতিতে এর কী প্রভাব-প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা তো বলাই বাহুল্য। আরো চমকপ্রদ বিষয় এই যে, হিন্দুধর্মের প্রধান উপাস্য শিবের বীভৎস লিঙ্গমূর্তি স্থাপন করা হয় এবং নারী-পুরুষ ও যুবক-যুবতী একত্রে শিবলিঙ্গের পূজা করে। হিন্দুধর্মে লিঙ্গপূজার গুরুত্ব এবং পূজারীদের লিঙ্গভক্তি সম্পর্কে আলোচনাপ্রসঙ্গে ডক্টর গোস্তাভ লী বোন বলেন- 'প্রতিমা ও প্রতীক এবং মূর্তি ও স্থূল আকৃতির প্রতি হিন্দুদের অনুরাগ সীমাহীন। ধর্ম তাদের যাই হোক না কেন, আচার-অনুষ্ঠান তারা নিষ্ঠার সাথে পালন করে থাকে। তাদের মন্দির ও পূজাঘর অসংখ্য উপাস্য বস্তুতে পরিপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে অগ্রগণ্য হলো লিঙ্গ ও যোনি, যা সঙ্গম ও যৌনতার ইঙ্গিতবহ। অশোক স্তম্ভকেও সাধারণ হিন্দুরা লিঙ্গপ্রতীক বলে বিশ্বাস করে। যে কোন শঙ্কু ও ত্রিকোণ আকৃতিই তাদের কাছে পূজ্য ও ভক্তিযোগ্য।'²⁹

কোন কোন ঐতিহাসিকের বর্ণনা মতে কতিপয় হিন্দু সম্প্রদায়ের পুরুষেরা নগ্ন নারীদেহের এবং নারীরা নগ্নপুরুষদেহের পূজা করতো।³⁰ মন্দির এবং উপাসনা- লয়ের সেবায়েত, পুরোহিত ও পাণ্ডাদের লাম্পট্য ছিলো এমনই চরমে যে, দেবতার সেবাদাসীদের তারা যৌনদাসীরূপে ব্যবহার করতো; এমনকি মন্দিরে আগত পূজারিণীদের সতীত্বসম্পদও তাদের দ্বারা লুণ্ঠিত হতো। বহু উপাসনালয় শাব্দিক অর্থেই ছিলো পাপাচারের আখড়া। লম্পট ও পশুরা তাদের লাম্পট্য ও পাশবিকতা চরিতার্থ করার জন্য সেখানে সুযোগের সন্ধানে থাকতো এবং বিভিন্নভাবে তাদের যৌনলালসা মেটাতো। এই যদি হয় মন্দির ও দেবালয়ের অবস্থা, যা গড়েই উঠেছে উপাসনা ও পূজা-অর্চনার উদ্দেশ্যে, তাহলে রাজার রাজপ্রাসাদ ও ধনীর রঙ্গমহলের চালচিত্র কী হতে পারে?! সেখানে তো নগ্নতা ও অশ্লীলতার রীতিমত মহড়া চলতো! নাচগানের জলসায় মদের নেশায় সবাই যখন চুর তখন লজ্জা ও লোকলজ্জার তো কোন বালাই থাকতো না। সম্ভ্রম ও হায়া-শরম হয়ত নিজেই তখন মুখ লুকোবার জায়গা খুঁজে পেতো না। এভাবে সমগ্র দেশ ভেসে গিয়েছিলো পাপাচার ও অবাধ যৌনতার তোড়ে এবং উভয় লিঙ্গের নৈতিকতা ও চরিত্রে নেমে এসেছিলো বিরাট ধ্বস।

এই ভোগলালসা ও ইন্দ্রীয় পূজার সম্পূর্ণ সমান্তরালে আধ্যাত্মিক সাধনা ও যোগ-তপস্যার ধারাও অব্যাহত ছিলো। তাতেও ছিলো বাড়াবাড়ি ও সীমা- লঙ্ঘনের চরম প্রবণতা। মোটকথা, দেশ, ধর্ম ও সমাজ এ দুই প্রান্তিকতায় এমনভাবে বিভক্ত ছিলো যে, সুস্থ চিন্তা ও মধ্যপন্থার কোথাও কোন অবকাশ ছিলো না। কতিপয় ব্যক্তি ও সাধু-সন্ন্যাসী আধ্যাত্মিক সাধনা ও আত্মদমনের কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন ছিলো, পক্ষান্তর সাধারণ জনপদ ভেসে চলেছিলো প্রবৃত্তিপূজা ও ভোগলালসার প্রবল স্রোতে।

নিষ্ঠুর শ্রেণীভেদ ও বর্ণপ্রথা

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ও জনপদে শ্রেণীভেদ ও বর্ণপ্রথা অবশ্যই ছিলো, কিন্তু ভারতবর্ষের মত আর কোথাও এমন কঠোর, নিষ্ঠুর বর্ণপ্রথা ও শ্রেণীভেদ ছিলো না। বস্তুত এটা ছিলো মানবতার প্রতি চরম অবমাননা, যা ভারতবর্ষে শুধু সামাজিকভাবেই নয়, ধর্মীয়ভাবেও স্বীকৃত ছিলো, যা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে, এখনো চলছে। ভারতীয় সমাজের এই জাতিভেদ এবং পেশাগত বিভক্তি ও শৃঙ্খল-বন্ধনের সূচনা হয়েছিলো বৈদিক যুগের শেষভাগে, একই পেশা ও কর্মে বংশপরম্পরায় আবদ্ধ থাকার বাধ্যবাধকতা থেকে। বহিরাগত আর্যরা তাদের বংশমর্যাদা ও জাতকৌলীন্য অক্ষুণ্ণ রাখার এবং বিজেতারূপে নিজেদের তাপ ও প্রতাপ বজায় রাখার স্বার্থে এই শ্রেণীভেদ ও বর্ণপ্রথা অপরিহার্য মনে করেছিলো।

ডক্টর গোস্তাভ লী বোন বলেন- 'বৈদিক যুগের শেষভাগেই আমরা দেখতে পেলাম, বিভিন্ন পেশা ও জীবিকা মোটামুটি পৈত্রিক রূপ ধারণ করে চলেছে এবং শ্রেণীভেদপ্রথার গোড়াপত্তন হয়ে গিয়েছে, যদিও তখনো তা পূর্ণাঙ্গ কাঠামো লাভ করেনি। বৈদিক আর্যদের মধ্যে এ ধারণা পাকাপোক্ত হয়ে গিয়েছিলো যে, বিজেতা জাতি ও জনগোষ্ঠীর মিশ্রণ থেকে নিজেদের সনাতন বংশধারাকে রক্ষা করতে হবে। পরবর্তী পর্যায়ে এই সংখ্যালঘু বিজেতা সম্প্রদায় যখন পূর্বদিকে অগ্রসর হলো এবং দেশীয় জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশের উপর আধিপত্য বিস্তার করে ফেললো তখন এর প্রয়োজনীয়তা আরো তীব্র হলো এবং বিধানপ্রণেতাদের জন্য এটা বিবেচনায় আনা জরুরী হয়ে পড়লো। বংশধারা রক্ষা ও বিলুপ্তির রহস্য ততদিনে তারা বুঝে গিয়েছিলো। ভালো-ভাবেই তাদের জানা হয়ে গিয়েছিলো যে, সংখ্যালঘু বিজেতা জাতি নিজেদের বংশস্বাতন্ত্র্য যদি রক্ষা না করে তাহলে খুব দ্রুত তারা বিজিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিলীন হয়ে যায়, নামচিহ্ন পর্যন্ত আর বাকি থাকে না।'³¹

তবে এই বর্ণপ্রথাকে সুবিন্যস্ত ও পূর্ণাঙ্গ বিধানরূপে প্রবর্তনের কৃতিত্ব এককভাবে মনুজীর। যিশুখৃস্টের জন্মের তিনশ বছর পূর্বে ভারতবর্ষে যখন ব্রাহ্মণ্য সভ্যতার পূর্ণ উত্থান ঘটে তখন ঐ সভ্যতার পৃষ্ঠপোষকতার উদ্দেশ্যে মনুজী ভারতীয় সমাজের জন্য একটি নতুন বিধান প্রবর্তন করেন এবং তাতে নাগরিক ও রাজনৈতিক নিয়মবিধি তৈরী করেন, যা সমগ্র দেশ ও জনপদ মেনে নেয়। ফলে ভারতীয় সমাজ-সভ্যতায় সেটা সার্বজনীন আইন ও ধর্মীয় বিধানরূপে স্বীকৃতি লাভ করে। এটাই বর্তমানে মনুশাস্ত্র বা মনু সংহিতারূপে পরিচিত। মনুসংহিতায় দেশের জনগোষ্ঠীকে চারটি পৃথক শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। যথা- (১) ব্রাহ্মণ, অর্থাৎ ধর্মীয় পুরোহিত শ্রেণী (২) ক্ষত্রিয়, অর্থাৎ যোদ্ধাশ্রেণী (৩) বৈশ্য, অর্থাৎ কৃষি ও বাণিজ্যজীবী শ্রেণী (৪) শূদ্র, অর্থাৎ সেবকশ্রেণী, যাদের নির্ধারিত কোন পেশা নেই; যাবতীয় নিম্নশ্রেণীর পেশার মাধ্যমে উচ্চবর্ণের সেবা করে যাওয়াই যাদের একমাত্র কাজ। মুনসংহিতায় বলা হয়েছে- সংসারের মঙ্গলার্থে ব্রহ্মা ব্রাহ্মণকে আপন মুখ হতে এবং ক্ষত্রিয়কে আপন বাহু হতে এবং বৈশ্যকে আপন উরু হতে এবং শূদ্রকে আপন পদযুগল হতে সৃষ্টি করেছেন। সংসারকে রক্ষাকল্পে ব্রহ্মা স্বয়ং তাদের মধ্যে দায়িত্ব ও কর্মবণ্টন করে দিয়েছেন। ব্রাহ্মণের দায়িত্ব হলো বেদ শিক্ষাদান, দেবতাদের উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য প্রদান, দান গ্রহণ ও প্রসাদ বিতরণ। ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য হলো যোদ্ধাধর্ম পালন, অর্থাৎ মানুষকে যাবতীয় উপদ্রব ও অরাজকতা হতে রক্ষা করা, বেদ অধ্যয়ন করা, দান প্রদান, নৈবেদ্য অর্পণ এবং কামসংযম। বৈশ্যের কর্তব্য হলো গবাদি পশু পালন, বাণিজ্য ও কৃষিকাজ, বেদ পাঠ, দান প্রদান ও নৈবেদ্য অর্পণ। আর শূদ্রকে ব্রহ্মা একটিমাত্র আদেশ করেছেন, অর্থাৎ উপরের সম্প্রদায়ত্রয়ের সেবায় আত্মনিয়োগ এবং সর্ব-উপায়ে তাদের সন্তুষ্টি অর্জন।³²

ব্রাহ্মণসম্প্রদায়, মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য

মনুসংহিতার বর্ণবিধান ব্রাহ্মণকে এত বেশী অধিকার ও বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে যে, তারা প্রায় দেবমর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে পড়েছে। মনুসংহিতার মতে- ব্রাহ্মণসম্প্রদায় হলো ব্রহ্মার প্রিয়পাত্র এবং মানবকুলের সম্রাট। তাদের কাজ শুধু ধর্মের রক্ষণাবেক্ষণ। যেহেতু তারাই হলো সৃষ্টির সেরা এবং জগত-অধিপতি সেহেতু জগতের সকল সম্পদে তাদের একচ্ছত্র অধিকার। ব্রাহ্মণ শূদ্রদাসদের যাবতীয় সম্পদ ইচ্ছামত দখল করতে পারে, এতে কোন পাপ নেই। কেননা দাসের কোন মালিকানাস্বত্ব নেই; তার সম্পদের স্বত্ব আপন মনিবের।³³ ঋগবেদ যে ব্রাহ্মণের মুখস্থ সে পাপমুক্ত ব্যক্তি, যদিও পাপরাশি দ্বারা সে ত্রিলোক নাশ করে ফেলে। এমনকি কঠিনতম অভাব ও প্রয়োজনের মুহূর্তেও রাজার অধিকার নেই ব্রাহ্মণ থেকে কোনরূপ রাজস্ব বা কর গ্রহণ করার, আর রাজার কর্তব্য হলো রাজ্যের ব্রাহ্মণদের ক্ষুধার কষ্ট থেকে রক্ষা করা এবং অনাহারে মরতে না দেয়া। ব্রাহ্মণ যদি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ করে তবে তার শাস্তি হবে শুধু মস্তক মুণ্ডন করা, পক্ষান্তরে অন্যদের শাস্তি হবে যথারীতি মৃত্যুদণ্ড।³⁴

ক্ষত্রিয়সম্প্রদায় যদিও অপর দু'টি বর্ণ বৈশ্য ও শূদ্র থেকে শ্রেষ্ঠ, কিন্তু তাদের অবস্থান ব্রাহ্মণ থেকে অনেক নীচে। মনু বলেন- দশবছর বয়স্ক ব্রাহ্মণ বালক একজন শতায়ু ক্ষত্রিয় থেকে উত্তম, যেমন পিতা সন্তান থেকে উত্তম। মনুসংহিতার বিধান মতে ক্ষত্রিয় সম্প্রদায় যে দায়িত্ব ও মর্যাদা লাভ করেছে তা হলো, যেহেতু তারা বেদ-জ্ঞান দ্বারা নিজেদের চিন্তা ও মস্তিষ্ককে পরিপুষ্ট করেছে সেহেতু তারা দেশের রাজা হতে পারে। শাসক, প্রশাসক, বিচারক ও সেনাপতি হতে পারে। ক্ষত্রিয় সম্প্রদায় হতে রাজা মনোনীত হলে তাকে অমর্যাদা করার অধিকার নেই, হোক সে শিশু। এক্ষেত্রে বলা হবে যে, তিনি মানব, তবে রাজার মানবসত্তায় ভগবানের সত্তা মূর্ত হয়েছে। ক্ষত্রিয়, এমনকি শান্তিকালেও সৈনিক ও যোদ্ধারূপে জীবনযাপন করবে, আর তার কর্তব্য হবে প্রথম ডাকের সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত হওয়া। পক্ষান্তরে রাজার কর্তব্য হবে অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধের যাবতীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা।³⁵

বৈশ্যসম্প্রদায়ের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, বৈশ্যের কর্তব্য হলো আপন সম্প্রদায়ের কোন নারীকে বিবাহ করা। আপন পেশায় যত্নবান হওয়া এবং স্থায়ীভাবে গবাদিপশু পালন করা। আর যারা বাণিজ্য করে তাদের কর্তব্য হলো বাণিজ্যের বিধিবিধান এবং সুদব্যবস্থা উত্তমরূপে জানা, তদ্রূপ কর্তব্য হলো কৃষিজ্ঞান অর্জন করা এবং মাপ ও পরিমাপপদ্ধতি সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি অর্জন করা। আরো কর্তব্য হলো শ্রমিকের মজুরি, মানুষের ভাষা এবং পণ্যসংরক্ষণ ও ক্রয়-বিক্রয়সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় জানা।³⁶

অভিশপ্ত শূদ্রসম্প্রদায়

মনুপ্রবর্তিত সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থামতে ভারতীয় হিন্দুসমাজে শূদ্র বা অস্পৃশ্যই হলো সর্বনিম্ন সম্প্রদায়। ইতর পশুর চেয়েও অধম, সমাজে তাদের অবস্থান ও মর্যাদা। মনুশাস্ত্রের সুস্পষ্ট ঘোষণা- শূদ্রের জন্য এটাই পরম সৌভাগ্য যে, তারা ব্রাহ্মণসেবায় নিয়োজিত হতে পারে; এছাড়া তাদের আর কোন পুণ্য ও প্রাপ্তি নেই। অর্থ উপার্জন ও সম্পদসঞ্চয়ের কোন অধিকার শূদ্রের নেই। কারণ তা ব্রাহ্মণের মনঃকষ্টের কারণ। শূদ্র যদি কোন ব্রাহ্মণের উপর হাত তোলে, বা ক্রোধান্ধ হয়ে লাথি মারে তাহলে তার হাত ও পা কেটে ফেলা হবে। আর যদি কোন পাপিষ্ঠ শূদ্র কোন ব্রাহ্মণের সমকক্ষে বসার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে তাহলে শাসকের অবশ্যকর্তব্য হবে তার পশ্চাদ্দেশে গরম লোহার দাগ দিয়ে দেশছাড়া করা। আর কোন ব্রাহ্মণকে স্পর্শ করা, বা তাকে কটু কথা বলার সাজা হলো জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলা। আর যদি দাবী করে, ব্রাহ্মণকে সে শিক্ষা দিতে পারে তাহলে তার মুখে তপ্ত তেল ঢেলে দাও। কুকুর, বেড়াল, কাক, পেঁচা এবং কোন শূদ্রকে হত্যা করার প্রায়শ্চিত্ত একই সমান।³⁷

হিন্দুসমাজে নারীর মর্যাদা

ব্রাহ্মণদের সমাজ-সভ্যতায় নারীজাতির সেই সম্মান ও মর্যাদা ছিলো না, যা বৈদিক যুগে ছিলো। ডক্টর লী বোন-এর মতে মনুশাস্ত্রে স্ত্রীজাতিকে দুর্বল ও বিশ্বাসঘাতিনী ভাবা হয়েছে এবং ঘৃণা ও অবজ্ঞার ভাষায় তার আলোচনা করা হয়েছে। বস্তুত মনুযুগের হিন্দুসমাজে নারীর মর্যাদা দাসীর চেয়ে বেশী কিছু ছিলো না। জুয়া খেলায় পুরুষ স্ত্রীকে বাজি ধরতো এবং হেরে গিয়ে অন্যের হাতে তুলে দিতো। বিধবাদের জীবন ছিলো মৃত্যুর চেয়ে বিভীষিকাপূর্ণ। তার দ্বিতীয় বিবাহের অধিকার ছিলো না। সমাজ ও পরিবারের লাঞ্ছনা-গঞ্জনাই ছিলো তার ভাগ্যলিপি। মৃত স্বামীর গৃহে দাসিবৃত্তি করেই তাকে জীবন ধারণ করতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে বিধবা নারী (স্বেচ্ছায়, কিংবা জবরদস্তি) স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দিয়ে জীবনের অভিশাপ থেকে মুক্তি লাভ করতো, যার নাম ছিলো সতীদাহ। ডক্টর লী বোন বলেন, 'স্বামীর চিতায় বিধবাকে জ্বালানোর বিধান মনুশাস্ত্রে যদিও নেই, তথাপি মনে হয় এ প্রথা ভারতবর্ষে ব্যাপক ছিলো। কেননা গ্রীক ঐতিহাসিকগণ এর উল্লেখ করেছেন।'³⁸

এভাবেই যে উর্বর ভারতভূমি ছিলো মেধায়, সম্পদে পরিপূর্ণ, একসময় তাই হয়ে পড়েছিলো মূর্খতার অন্ধকারে নিমজ্জিত এবং অভ্যন্তরীণ গোলযোগ, দারিদ্র্য ও নৈরাজ্যের শিকার। যে জাতি সম্পর্কে কোন কোন আরব ঐতিহাসিক লিখেছেন, 'জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আধার; ন্যায়, সুশাসন, বিচক্ষণতা ও সুশীল চিন্তার উৎস' সে জাতিই দীর্ঘকাল আসমানী সত্যধর্মের শিক্ষা হতে বঞ্চিত থাকার কারণে বিভিন্ন আচার-অনাচার ও কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।³⁹ নিকৃষ্টতম মূর্তিপূজার পাশাপাশি ছিলো প্রবৃত্তিপূজার জয়জয়কার। সর্বোপরি ধর্মের নামে এমন বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা ও শ্রেণীবৈষম্য বিদ্যমান ছিলো, যার নযির পৃথিবীর অন্য জাতির ইতিহাসে নেই।

আরবজাতি: স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য

জাহেলিয়াতের যুগে বিশ্বের সমস্ত জাতির মধ্যে আরবরা ছিলো অনন্য কিছু স্বভাবগুণ ও প্রকৃতিপ্রদত্ত যোগ্যতার অধিকারী। এমন কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও তাদের ছিলো, যা সমকালীন অন্যকোন জাতির মধ্যে ছিলো না। যেমন ভাষাসৌন্দর্য ও কাব্যপ্রতিভা, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা, সাহসিকতা ও বীরত্ব, বিশ্বাসের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য ও প্রবল উদ্দীপনা, বদান্যতা ও অতিথি-সেবা, স্পষ্ট ভাষণ ও ইচ্ছার দৃঢ়তা, অনাড়ম্বরতা ও কষ্টসহিষ্ণুতা, আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বিশ্বস্ততা, সামাজিক সমতা ও সম্ভ্রম রক্ষা এবং প্রায় অবিশ্বাস্য স্মৃতিশক্তি।

কিন্তু এত সব বৈশিষ্ট্য ও গুণবৈচিত্র্য সত্ত্বেও একসময় তারা ভীষণভাবে ধর্মীয় ও নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে পড়েছিলো। কারণ একদিকে তারা নবুওয়তের আসমানি শিক্ষা থেকে অনেক দূরে ছিলো, অন্যদিকে জগত-সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বহু শতাব্দী যাবৎ এক আরব উপদ্বীপেই আবদ্ধ ছিলো। তদুপরি তারা বাপ-দাদার ধর্ম এবং জাতীয় আচার-প্রথা ও কুসংস্কারকেই যুগ যুগ ধরে আঁকড়ে ধরেছিলো। খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতকে তারা অবক্ষয় ও অধঃপতনের এমন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলো, যার নযির সমসাময়িক পৃথিবীতে খুব একটা ছিলো না। মূর্তিপূজা তার যাবতীয় বীভৎসরূপ নিয়ে শিকড় গেড়ে বসেছিলো। বিভিন্ন নৈতিক ও সামাজিক ব্যাধি তাদেরকে ভিতর থেকে খোকলা করে ফেলেছিলো। এককথায় বলতে হলে বলা যায়, আসমানি ধর্মের অধিকাংশ গুণ-বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য-মহিমা থেকেই তারা বঞ্চিত ছিলো, আবার জাহেলিয়াতের নিকৃষ্টতম দোষ-ব্যাধিগুলো তাদের মাঝে পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিলো। পুরো আরব জাযিরাতে আলো বলতে কিছুই ছিলো না, ছিলো শুধু ঘোর অন্ধকার।

জাহেলিয়াতের মূর্তিপূজা

বস্তুত শিরক ও মূর্তিপূজাই ছিলো আরবের সাধারণ ধর্ম এবং প্রচলিত বিশ্বাস। আল্লাহকে অবশ্যই তারা মানতো এবং বিশ্বাস করতো যে, তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ, বিশ্বজগতের স্রষ্টা ও ব্যবস্থাপক। তাঁরই কুদরতের হাতে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ। তাদের সম্পর্কেই আল-কোরআনে বলা হয়েছে-
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مِّنْ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ لَيَقُولُنَّ خَلَقَهُنَّ الْعَزِيزُ الْعَلِيمُ
'আর যদি আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, কে সৃষ্টি করেছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী তাহলে অবশ্যই বলবে, সৃষ্টি করেছেন এগুলোকে মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ।' (যুখরুফ, ৪৩: ৯)
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مِّنْ خَلَقَهُمْ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ
'আর যদি আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, কে তাদের সৃষ্টি করেছে, অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ! তাহলে কোথায় তাদের ঘোরানো হচ্ছে?' (যুখরুফ, ৪৩: ৮৭)

কিন্তু খালক ও রবুবিয়্যাতের বিশ্বাস সত্ত্বেও তাওহীদের আকীদা এবং আল্লাহর একত্বের ধারণা তাদের মধ্যে ক্রমশ দুর্বল হয়ে একসময় তা মাত্র অল্পকিছু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিলো। নবিগণ তাওহীদ ও একত্বের যে স্বচ্ছ-সমুচ্চ ও নির্ভেজাল আকীদা-বিশ্বাস নিয়ে এসেছিলেন তা গ্রহণ ও ধারণ করা তাদের জাহেলিয়াত-আচ্ছন্ন চিন্তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব ছিলো না। নবী ও নবুওয়ত এবং ধর্মীয় ভাব ও ভাবনা থেকে তারা এত দূরে ছিলো যে, কিছুতেই বুঝতে পারতো না, মানুষের দু'আ-প্রার্থনা কারো মাধ্যম ছাড়া কীভাবে আসমানে পৌঁছতে পারে?! এবং কারো সুফারিশ ছাড়া কীভাবে আল্লাহর কাছে তা কবুল হতে পারে?! বস্তুত ঊর্ধ্ব-জগতের বিষয়কে তারা বস্তুজগতের উপর বিচার করতো, যেখানে রাজ-দরবারে মাধ্যম ছাড়া পৌঁছা যায় না এবং সুফারিশ ছাড়া কোন আর্যি মঞ্জুর হয় না। এ চিন্তা থেকেই দেব-দেবী ও বিভিন্ন মূর্তিকে তারা আল্লাহর কাছে পৌঁছার মাধ্যম-রূপে গ্রহণ করেছিলো এবং দু'আ-প্রার্থনার ক্ষেত্রে আল্লাহর সঙ্গে তাদেরও শরীক করে নিয়েছিলো সেই সূত্রে তাদেরও উদ্দেশ্যে কিছু কিছু উপাসনা শুরু হয়েছিলো। এভাবে তাদের চিন্তায় সুফারিশের ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিলো এবং একসময় তা এই আকীদা-বিশ্বাসে পরিণত হয়েছিলো যে, সুফারিশকারীদেরও ক্ষমতা রয়েছে উপকার ও ক্ষতি করার।

এভাবে শিরকের পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে একসময় তারা দেব-দেবীকে আল্লাহ ছাড়াও ইলাহ ও উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলো এবং এ বিশ্বাস পোষণ করছিলো যে, বিশ্বজগতের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় তাদেরও শরীকানা রয়েছে এবং ক্ষতি ও উপকার করার এবং কল্যাণ ও অনিষ্ট সাধনের এবং দান করা ও না করার নিজস্ব শক্তিও তাদের রয়েছে। এভাবে চূড়ান্ত পর্যায়ে তারা খোল্লমখোল্লা মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো এবং বন্দেগি ও উপাসনার সম্পর্ক আল্লাহ থেকে কর্তিত হয়ে বিশ্বাসত ও কার্যত বিভিন্ন দেব-দেবী ও মূর্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলো। এবং ইবাদত-বন্দেগির যত অভিপ্রকাশ ছিলো, যেমন দু'আ, সিজদা, কোরবানি, ইত্যাদি; এগুলো দেব- দেবীর নামেই চালু হয়ে গিয়েছিলো। এককথায় পূর্ব-পুরুষরা যেখানে আল্লাহর নিরঙ্কুশ উপাস্যতা, প্রতিপালকত্ব ও একক শক্তিতে বিশ্বাস করতো এবং মাধ্যম ও সুফারিশ পর্যন্তই ক্ষান্ত হতো, সেখানে পরবর্তীরা উপাস্যদের জন্য আল্লাহর সঙ্গে শরীকানাই সাব্যস্ত করেছিলো এবং তাদেরকে ভালো-মন্দ, লাভ-ক্ষতি ও অনাশ-বিনাশের নিজস্ব শক্তির অধিকারী বলে বিশ্বাস করতে লেগেছিলো। অবশ্য তখনো আল্লাহর শ্রেষ্ঠ উপাস্যত্বের এবং শ্রেষ্ঠ প্রতিপালকত্বের অস্পষ্ট একটা ধারণা তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলো।⁴⁰

জাহেলিয়াতের মূর্খতা ও অন্ধকার যত বাড়ছিলো, আকীদা-বিশ্বাসের এ দ্বিতীয় ধারা ততই প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছিলো। কারণ মূর্তিপূজার যাবতীয় কর্মকাণ্ড ছিলো তাদের ইন্দ্রীয় শক্তির নিকটবর্তী এবং তাদের দুর্বল চিন্তাশক্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এমনকি একসময় এটাই হয়ে গেলো সমগ্র আরবের সাধারণ আকীদা-বিশ্বাস। পক্ষান্তরে যারা ইলাহ ও উছিলা মধ্যে পার্থক্য রক্ষা করতো তারা হয়ে গেলো জাতির বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম। তারা ছিলো সমাজের হাতে গোনা ধর্মজ্ঞানী শিক্ষিত শ্রেণী। এছাড়া সমগ্র জাতি ডুবে গিয়েছিলো মূর্তিপূজার ঘৃণ্য আবর্তে।

প্রত্যেক গোত্রের এবং প্রতিটি জনপদের ছিলো আলাদা মূর্তি ও উপাস্য দেব-দেবী, বরং প্রত্যেক ঘরের ও পরিবারের ছিলো নিজস্ব মূর্তি ও পারিবারিক দেব-দেবী। ঐতিহাসিক কালবী বলেন, 'মক্কার প্রত্যেক পরিবারের ছিলো নিজস্ব দেবতা; পরিবারের ভিতরেই শুধু এই পারিবারিক দেবতার উপাসনা হতো। পরিবারের কারো সফরে যাত্রাকালে শেষ কাজ ছিলো গৃহদেবতার স্পর্শ ও আশীর্বাদ গ্রহণ করা, তদ্রূপ সফর থেকে ফিরে প্রথম কাজ ছিলো দেবতার স্পর্শগ্রহণ ও কৃতজ্ঞতা নিবেদন।'⁴¹ মূর্তিপূজার প্রতি তাদের আসক্তি ছিলো এমনই চরম যে, কেউ কেউ স্বতন্ত্র পূজাগৃহে মূর্তির প্রতিষ্ঠা করতো; যাদের সে সামর্থ্য ছিলো না তারা শুধু মূর্তি নির্মাণ করে বাসগৃহে রেখে দিতো। আরো কম সামর্থ্য যাদের তারা হারামের সামনে, বা নিজেদের পছন্দের স্থানে কোন প্রস্তরখণ্ড স্থাপন করে এমন শানে তার তাওয়াফ করতো যেমন করতো বাইতুল্লাহর। এগুলোকে তারা 'আলআনছাব' নামে ডাকতো। এমনকি যে কাবাঘর তৈরী হয়েছিলো শুধু এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য তার ভিতরে ও প্রাঙ্গণে তিনশ ষাটটি মূর্তি স্থাপিত হয়েছিলো।

মূর্তিপূজা একসময় পাথরপূজা পর্যন্ত গড়িয়েছিলো। অর্থাৎ যে কোন সুন্দর পাথরেরও পূজা করা হতো। ইমাম বুখারীর বর্ণনায় আবু রজা আত্‌তারিদী বলেন- 'আমরা সুন্দর পাথরের পূজা করতাম; যখন আরো সুন্দর পাথর পেতাম, আগেরটি ছেড়ে নতুনটির পূজা শুরু করতাম। এমনকি উপযুক্ত পাথর না পেলে মাটি জড়ো করে তার উপর বকরীর দুধ দোহন করতাম এবং দুধ-ভেজা মাটির স্তূপকেই তাওয়াফ করতাম।'⁴² কালবী বলেন- 'সফরে কোথাও থামার পর চারটি পাথর বাছাই করা হতো এবং সবচে' সুন্দরটিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করা হতো, বাকি তিনটিকে বানানো হতো চুলার পায়া। চলে যাওয়ার সময় অবশ্য সবক'টিকেই ফেলে যাওয়া হতো।'⁴³

সবযুগে সবদেশে মুশরিক জাতির অবস্থা যেমন হয়, আরবদেরও ছিলো তেমন। অর্থাৎ উপাস্যের আধিক্য। আরবদেরও উপাস্য দেব-দেবী ছিলো অনেক। সে তালিকায় ফিরেশতা যেমন ছিলো তেমনি ছিলো জ্বিন-পরী, এমনকি আকাশের তারকারাজি। ফিরেশতাদের সম্পর্কে বিশ্বাস ছিলো, তারা হলেন আল্লাহর প্রিয় কন্যা। তাদের উপাসনা এজন্য করা হতো যে, তারা হবেন আল্লাহর নৈকট্য লাভের ওয়াছীলা ও মাধ্যম। প্রার্থনা গ্রহণ ও প্রয়োজন পূরণের জন্য তারা আল্লাহর কাছে তাদের হয়ে সুফারিশ করবেন। একইভাবে জ্বিন ও কল্পিত দেওদানবকেও তারা আল্লাহর শরীকদার ভাবতো এবং তাদের নিজস্ব শক্তি ও ক্ষমতা বিশ্বাস করে তাদের উপাসনা করতো।⁴⁴ কালবী বলেন, 'খোযা'আ গোত্রের শাখা বনু মালীহ জ্বিনপূজা করতো।'⁴⁵ ছা'ইদ উন্দুলুসী বলেন, 'হিময়ার ও কিনানাহ গোত্রদু'টি যথাক্রমে সূর্য ও চন্দ্রের পূজা করতো। তামীম গোত্র বিশেষ রাশির পূজা করতো। পক্ষান্তরে লাখম ও জুযাম গোত্রদ্বয় ছিলো বৃহস্পতির পূজারী। এভাবে একেক গোত্র একেক নক্ষত্র বা গ্রহের পূজা করতো।'⁴⁶

আরবের ইহুদী ও ঈসায়ী ধর্ম

জাযীরাতুল আরবে ইহুদী ও ঈসায়ী ধর্মেরও মোটামুটি অস্তিত্ব ছিলো। তবে আকীদা ও চিন্তা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আরবরা এদু'টি ধর্মের তেমন কোন প্রভাব গ্রহণ করেনি। তদুপরি ধর্মদু'টি কী পরিমাণ বিকৃতি, বক্রতা ও অবক্ষয়ের শিকার হয়ে পড়েছিলো সে আলোচনা তো পিছনে আমরা করে এসেছি। সুতরাং এখানে তা দোহরানোর দরকার নেই।

নবুয়ত ও পুনরুত্থানের বিশ্বাস

নবুয়ত সম্পর্কে আরবদের ধারণা ছিলো নিছক কাল্পনিক। নবী ও রাসূলের এমন অতিমানবীয় সত্তা তারা কল্পনা করতো, যিনি পানাহার করেন না, বিবাহ করেন না, সন্তান জন্ম দেন না এবং বাজারে বিচরণ করেন না। তাদের দুর্বল ও সংকীর্ণ চিন্তায় এটা হজম হতো না যে, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান এবং এ জীবনের পর অন্য জীবন বলে কিছু থাকতে পারে, যেখানে হিসাব ও শাস্তি-পুরস্কার হবে। কোরআনের ভাষায়, তারা বলতো-
مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ وَمَا لَهُم بِذَلِكَ مِنْ عِلْمٍ إِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ
'এ তো আমাদের পার্থিব জীবন ছাড়া আর কিছু নয়; এখানে আমরা মৃত্যু বরণ করি এবং জীবন ধারণ করি। আমাদের তো বিনাশ করে শুধু কাল। আসলে এসম্পর্কে তাদের নেই কোন জ্ঞান, তারা শুধু ধারণা করে' (জাছিয়াহ, ৪৫:২৪) তাদের আরো বক্তব্য আল-কোরআন এভাবে তুলে ধরেছে-
وَقَالُوا أَإِذَا كُنَّا عِظَامًا وَرُفَنَا أَإِنَّا لَمَبْعُوثُونَ خَلْقًا جَدِيدًا
'আর তারা বলে, যখন আমরা অস্থি ও মৃত্তিকায় পরিণত হবো তখন কি নতুন সৃষ্টিরূপে আমরা পুনরুত্থিত হবো?!' (আল-ইসরা, ১৭: ৪৯)

ছা'ইদ উন্দুলুসী বলেন, 'তাদের অধিকাংশই এই পুনরুত্থান অস্বীকার করতো। হাশর ও হিসাবের বিশ্বাস প্রত্যাখ্যান করে তারা ভাবতো, বিশ্বজগত কখনো ধ্বংস হবে না, হয়ত নতুন কোন মাখলুক আসবে। হাশর ও হিশাবে বিশ্বাসী কিছু লোকও ছিলো; তারা মনে করতো, যদি তার বাহন-উটনীটি কবরে জবেহ করে দেয়া হয় তাহলে তাকে হাশরে নেয়া হবে সওয়ার অবস্থায়, নচেৎ তার হাশর হবে হাঁটা অবস্থায়।'⁴⁷

নৈতিক ও সামাজিক ব্যাধি

আরব-জাহেলিয়াতে বহু নৈতিক ও সামাজিক ব্যাধি শিকড় গেড়ে বসেছিলো এবং সেটাই ছিলো স্বাভাবিক। কেননা ব্যাধির কারণগুলো সর্বত্র প্রকটভাবেই বিদ্যমান ছিলো। মদ ও পানাসক্তি ছিলো এমনই ব্যাপক যে, মদের আলোচনা ছিলো তাদের সাহিত্য ও কবিতার বিরাট অংশ জুড়ে। পান ও পানশালার বন্দনা ছিলো কবিদের প্রিয় বিষয়। আরবী ভাষায় মদের নাম-প্রাচুর্য এবং নামকরণে প্রকার ও প্রকৃতির এত সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখে সত্যি অবাক হতে হয়। এতেই মদের ব্যাপকতা ও জনপ্রিয়তা আন্দায করা যায়। যদি বলা হয়, 'তারা মদের সেবা করতো, আর মদ তাদের গ্রাস করতো', তাহলে মোটেই অত্যুক্তি হবে না।⁴⁸ পানশালারও ছিলো অসম্ভব কদর-সমাদর। দিনরাত তা ঝাণ্ডা উড়িয়ে খোলা রাখা হতো এবং দূর থেকেই মানুষ তাদের প্রিয় গন্তব্য চিনতে পারতো। ঝাণ্ডারও আলাদা নাম ছিলো, 'আলগায়াহ'। ঝুলন্ত গীতিকাসপ্তকের কবি লাবীদ বলেন-
وافيت إذ رفعت وعر مدامها قد بت سامرها وغاية تاجر
'কত রাত ভোর হলো বন্ধুদের জলসায়, মদের ফোয়ারায়! কত পানশালায় ছিলো আমার অভিসার 'ঝাণ্ডা' তোলা মাত্র! দুর্লভ মদিরায় পূর্ণ ছিলো পাত্র! এবং আমি ছিলাম বন্ধুদের মধ্যমণি!' (অর্থাৎ আত্মপ্রশংসা করে বলছেন, বন্ধুদের সভায় আমার কদর ছিলো, কারণ আমি তাদের পানশালায় নিয়ে যেতাম এবং তাদের দামী ও দুর্লভ মদ পান করাতাম।⁴⁹
জাহেলী যুগের কবি ইমরুল কায়সের বন্ধু আমর বিন কোমায়আ বলেন-
أدنى تجاري وأنفض الله إذا أسحب الربط والمروط إلى
'চমকদার ও চটকদার পোশাক জড়িয়ে, ঝাঁকড়া চুল ঝাঁকিয়ে ছুটেছি 'তাজিরের' পানশালে। এভাবেই এসেছি গোটা যৌবন কাটিয়ে।' এ দু'টি কবিতাপঙ্ক্তি প্রমাণ করে, মদের ব্যবসা এত জমজমাট ও ব্যাপক ছিলো যে, 'তাজির' দ্বারা মদের ব্যবসায়ী বা পানশালার মালিককে বোঝানো হতো।

আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার মত আরব-জাহেলিয়াতেও মদের পাশাপাশি জুয়ার আসরও ছিলো গর্বের বিষয়। জাহেলী কবি সুবরা বিন ওমায়র বলেন-
وذلك عার يابن ريطة ظاهر ونشرب في أعمالها وتقامر أعيرتنا ألبانها ولحومها نجابي بها أكفاءنا ولهينها
'রায়তার পুত্র! আমাদের লজ্জা দাও উটনীর দুধ-গোশতের কথা বলে! এতে লজ্জার কী হলো! এসব তো বন্ধু, আর অতিথির জন্য! তারপর যা থাকে তা উড়াই মদে ও জুয়ায়।'⁵⁰ জুয়ার আড্ডায় শরীক না হওয়া ছিলো লজ্জার বিষয় এবং কৃপণতার প্রমাণ। জাহেলী কবি হুজুর বিন খালিদ বলেন-
وإذا هلكت فلا تريدي عاجرا غسا ولا برما ولا معزالا
'যদি মরে যাই তবে হে প্রেয়সী! এমন কারো সঙ্গ গ্রহণ করো না, যার হাতে নেই সম্পদ এবং যে বসে থাকে জুয়ার আড্ডা থেকে দূরে।'⁵¹ বিখ্যাত তাবে'ঈ কাতাদাহ বলেন, 'জাহেলী যুগে মানুষ নিজের সম্পদ ও পরিবারের উপর বাজি ধরে জুয়া খেলতো। তারপর সর্বস্ব খুইয়ে হায় আফসোস করতো। যখন সবকিছু অন্যের দখলে দেখতে পেতো তখন তার বুকে হিংসার আগুন জ্বলে উঠতো এবং দুশমনি ও খুনখারাবি শুরু হতো।'⁵²

হিজাযের অধিবাসী আরব ও ইহুদীদের মধ্যে সুদের কারবার ছিলো ব্যাপক। চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ বসানো হতো এবং সুদ আদায়ের ক্ষেত্রেও অবলীলায় চরম নিষ্ঠুর ও পাশবিক আচরণ করা হতো। সুদের কারবার এতই স্বাভাবিক ও সাধারণ ছিলো যে, প্রচলিত বেচাকেনা ও সুদের মধ্যে তারা কোন পার্থক্যই দেখতে পেতো না, বরং উল্টো উপমা দিয়ে বলতো (কোরআনের ভাষায়)-
إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرَّبوا
'বেচা-কেনা তো সুদেরই মতো!' (বাকারাহ, ২: ২৭৫)⁵³

যিনা ও বিবাহবহির্ভূত সম্ভোগ খুব একটা দোষের ছিলো না এবং আরব-জীবনে বিরল ছিলো না। স্ত্রীর বাইরে উপপত্নী রাখার রীতি অভিজাত শ্রেণীতেও ছিলো, এমনকি ছিলো দেহব্যবসাও। দাসীকে জোরপূর্বক দেহব্যবসায় নামানো হতো, আর মনিব তার 'দেহ-উপার্জন' ভোগ করতো। পেশাদার নারীদের আলাদা কুঠি ছিলো, পানশালায়ও নারীদেহের আয়োজন ছিলো।⁵⁴ বিবাহের এমন বিচিত্র প্রকার-পদ্ধতি ছিলো, আদতে যা যৌন স্বেচ্ছাচারেরই নামান্তর। হযরত আয়েশা রা. বর্তমানের শরীয়ত-অনুমোদিত বিবাহ ছাড়া জাহেলিয়াতে প্রচলিত আরো তিনটি বিবাহপ্রথার কথা উল্লেখ করেছেন, যা বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে।⁵⁵ বস্তুত এক্ষেত্রে ইউরোপের আধুনিক জাহেলিয়াত প্রাচীন আরব-জাহেলিয়াতকে তেমন অতিক্রম করে যেতে পারেনি।

জাহেলী সমাজে নারী

পৃথিবীর অন্যান্য জাতির তুলনায় আরব-জাহেলিয়াতের নারী বরং অনেক বেশী নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার শিকার ছিলো। নারী-অধিকার বলতে কিছুই ছিলো না। তার সম্পদ ছিলো পরিবারের পুরুষদের ভোগদখলে। মীরাছ ও উত্তরাধিকার থেকে সে ছিলো সম্পূর্ণ বঞ্চিত। বিবাহবিচ্ছেদ বা স্বামীবিয়োগের পর পছন্দের দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণের অধিকার ছিলো না তার, বরং পশুসম্পদের মত নারীও মীরাছরূপে হস্তান্তরিত হতো। পুরুষ তো তার অধিকার ষোল আনা আদায় করে নিতো, কিন্তু স্ত্রীর যাবতীয় অধিকার হতো লুণ্ঠিত। বেশকিছু আহার্যদ্রব্য পুরুষের জন্য নির্ধারিত ছিলো, যা স্ত্রীলোকের জন্য ছিলো নিষিদ্ধ। পুরুষ যে কোন সংখ্যায় স্ত্রী গ্রহণ করতে পারতো, তদুপরি স্ত্রীদের মধ্যে অধিকার ও ব্যবহারে সমতা রক্ষার কোন বাধ্যবাধকতা ছিলো না।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, পিতার মৃত্যুতে তার পুত্রই 'পিতার স্ত্রীর' অধিক হকদার হতো। ইচ্ছা করলে সে তাকে রেখে দিতো, বা আটকে রাখতো তারপর হয় মোহর ফেরত দিতো, না হয় মারা যেতো, আর সে তার সম্পদ দখল করতো। আসুদ্দী রহ. বলেন, জাহেলিয়াতের প্রথা এই ছিলো যে, কারো বাবা, ভাই বা ছেলে স্ত্রী রেখে মারা গেলো। তখন মাইয়েতের ওয়ারিছ যদি আগেভাগে ঐ বিধবার উপর বস্ত্র নিক্ষেপ করতো তাহলে সেই হতো তার বিষয়ে অধিক হকদার। হয় সে তাকে মাইয়েতেরই মোহরের বিনিময়ে বিবাহ করতো, কিংবা অন্যত্র বিবাহ দিয়ে মোহর নিজে ভোগ করতো। পক্ষান্তরে যদি ঐ বিধবা সবার চোখ এড়িয়ে পিত্রালয়ে চলে যেতে পারতো তাহলে তার আত্মঅধিকার সাব্যস্ত হতো।⁵⁶
কন্যাসন্তান ছিলো লজ্জা-কলঙ্কের বিষয়, এজন্য এমনকি জন্মগ্রহণ করামাত্র জীবন্ত কবর দেয়ার প্রচলন ছিলো। হায়ছাম ইবনে আদীর সূত্রে আলমায়দানী লিখেছেন, জীবন্ত কবর দেয়ার নিষ্ঠুর প্রথা আরবের সব গোত্রেই ছিলো। শতে দশজনই এ নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিতো এবং ইসলামের আবির্ভাব পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো। অনেকে করতো লজ্জা-কলঙ্কের কারণে, আর অনেকে তা দারিদ্র্যের ভয়ে। এক্ষেত্রে আরবের নেতৃস্থানীয়, অভিজাত ও মহানুভব কোন ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে হতভাগ্য শিশুকন্যাদের রক্ষা করতেন। আবি নাহিয়া বলেন, 'ইসলামের আবির্ভাব পর্যন্ত তিনশ শিশুকন্যাকে এমন পরিণতি থেকে আমি উদ্ধার করেছি।' কোন কোন ক্ষেত্রে পিতা তার ঔরসজাত কন্যাকে জীবন্ত কবর দিতে গিয়ে এমন নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিতো যা পড়লে অতি বড় পাষাণেরও চোখে পানি আসে। এমনো হতো যে, বাপ সফরে থাকার কারণে, বা অন্য কোন কারণে সঙ্গে সঙ্গে কবরে পুঁতে ফেলা সম্ভব হয়নি। হতে হতে কন্যা বড় হয়ে গেছে। তখন নিষ্ঠুর বাপ কন্যাকে ফুসলিয়ে দূরে নিয়ে যেতো এবং চরম নির্দয়ভাবে তাকে যিন্দা পুঁতে ফেলতো, অথচ মাটি খোঁড়ার সময় সেই মেয়ে ওড়নার প্রান্ত দিয়ে পরিশ্রান্ত বাবার ঘাম মুছে দিচ্ছিলো। ইসলাম গ্রহণের পর জনৈক ছাহাবী নিজের হাতে যিন্দা কবর দেয়ার এরূপ মর্মবিদারী ঘটনা শুনিয়েছেন, আর পেয়ারা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অঝোরে কেঁদেছেন।⁵⁷

অন্ধ গোত্রপ্রীতি ও বংশগরিমা

আরব জাহেলিয়াতে গোত্রপ্রীতি ও সাম্প্রদায়িকতা ছিলো খুব ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী এবং এর বুনিয়াদ ছিলো জাহেলী চিন্তা-চেতনা ও মনমানসিকতা, যা বোঝার জন্য প্রাচীন কাল থেকে আরবে প্রচলিত এ বাক্যটিই যথেষ্ট, যা জুন্দুব বিন আম্বর সর্বপ্রথম উচ্চারণ করেছেন বলে কথিত আছে- انصر أخاك ظالما أو مظلوما 'তোমার ভাইকে সাহায্য করো, হোক সে যালিম, বা মযলুম।'⁵⁸ তাই করা হতো। মানুষ যখন আপন ভাই এবং স্বগোত্রের পক্ষে নাঙ্গা তলোয়ার হাতে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসতো তখন একবারও ভেবে দেখতো না, কে যালিম, কে মাযলুম।

বংশগরিমা ও গোত্রাভিমানও ছিলো আরবসমাজের আরেকটি দুষ্ট উপসর্গ। কোন কোন গোত্র ও পরিবার ছিলো আভিজাত্য ও স্বতন্ত্র মর্যাদার দাবীদার। পরস্পর তারা শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার গর্ব করতো। কোন কোন পরিবার অন্য পরিবারের সঙ্গে বা সাধারণ মানুষের সঙ্গে আচার অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া অগৌরবের মনে করে তা থেকে বিরত থাকতো, এমনকি হজের মত অনুষ্ঠানেও কোরায়শ কিছু কিছু ক্রিয়াকর্মে সাধারণ হাজীদের থেকে আলাদা অবস্থান করতো। আরাফার মাঠে অন্যান্য গোত্রের সঙ্গে অবস্থান করাকে তারা অগৌরবের মনে করতো। এজন্য গমন ও আগমন অগ্রে অগ্রে সম্পন্ন করতো।⁵⁹ একটি শ্রেণী ছিলো বংশপরম্পরায় প্রভুত্বের অধিকারী। আরেক শ্রেণী ছিলো জন্মগতভাবেই নিম্নশ্রেণীর, যাদের বেগার খাটানোও দোষের কিছু ছিলো না। বাজারশ্রেণীর লোকদের কোন মর্যাদাই ছিলো না অভিজাত শ্রেণীর চোখে। মোটকথা, শ্রেণীভেদ আরবসমাজেও কোন না কোন পর্যায়ে স্বীকৃত বিষয় ছিলো।

যুদ্ধের স্বভাব-আসক্তি

লড়াই, হামলা, লুণ্ঠন ও খুনখারাবি ছিলো আরবীয় স্বভাব-প্রকৃতির অন্তর্গত। তাছাড়া সভ্যতা থেকে দূরে তাদের মরুজীবনের স্বতঃস্ফূর্ত চাহিদাও ছিলো এগুলো। যুদ্ধ শুধু তাদের জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনই ছিলো না, যুদ্ধ ছিলো তাদের গর্ব, গৌরব ও মর্যাদারও সোপান; বরং যুদ্ধই ছিলো তাদের আনন্দ- বিনোদনের এবং উচ্ছ্বাস-উল্লাস প্রকাশের সবচে' প্রিয় মাধ্যম। যুদ্ধ ছাড়া তাদের বেঁচে থাকা যেমন সম্ভব ছিলো না, তেমনি যুদ্ধ ছাড়া তাদের মরণও সম্ভব ছিলো না। কারণ তরবারির আঘাত ছাড়া যে মৃত্যু, শত্রু-মিত্র সবার চোখেই সেটা ছিলো লজ্জাজনক মৃত্যু। এজন্যই আরব জাহেলিয়াতের কবি বলতে পারে-
إذا ما لم نجد إلا أخانا وأحيانا على بكر أخينا
'কখনো ঝাঁপিয়ে পড়ি আমাদের ভাই বনুবকরের উপর/ যখন ভাই ছাড়া কাউকে না পাই।'⁶⁰
আরেক কবি তার মনের বাসনা প্রকাশ করেছে এভাবে-
إذ المهرة الشقراء أدرك ظهرها فشب الإله الحرب بين القبائل
'আমার ঘোড়া যখন হবে জোয়ান ও তেজীয়ান/ যুদ্ধদেবতা যেন ছড়িয়ে দেয় যুদ্ধের আগুন/ আমার ঘোড়া যেন দেখাতে পারে তেজ/ আর তলোয়ার দেখাতে পারে ধার।'⁶¹
যুদ্ধ ও রক্তপাত তাদের জীবনে ছিলো এমনই মামুলি যে, তুচ্ছ থেকে তুচ্ছ ঘটনাও যথেষ্ট হতো ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্কর যুদ্ধের অগ্নিলাভা উদগীর্ণ করার জন্য। ওয়াইল বংশের বকর ও তাগলিব গোত্রদ্বয়ের মধ্যকার যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিলো দীর্ঘ চল্লিশ বছর এবং তাতে বয়ে গিয়েছিলো খুনের নহর। অথচ ঘটনা ছিলো আর কিছুই না, মা'আদের প্রধান কোলায়ব বাসূস বিনতে মুনকিযের উটনীর ওলান লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়েছিলো, যাতে ওলানের সাদা দুধে আর লাল খুনে একাকার হয়ে গিয়েছিলো। এর প্রতিশোধে জাস্সাস বিন মুররাহ কোলায়বকে হত্যা করলো, আর বকর ও তাগলিবের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে গেলো, যা সুদীর্ঘ চল্লিশ বছর স্থায়ী হয়েছিলো এবং জাহেলিয়াতের দীর্ঘতম যুদ্ধরূপে খ্যাতি অর্জন করেছিলো। কোলায়বের ভাই মুহালহালের মুখে শুনুন সেই যুদ্ধের পরিণতি- قد فني الحيان، وتكلت الأمهات، ويتم الأولاد، دموع لا ترقأ، وأجساد لا تدفن 'দুই কবিলা ফানা হয়ে গেলো। মায়েরা হলো পুত্রহারা, সন্তানেরা হলো পিতৃহারা। (চারদিকে ছিলো শুধু এতীম-বিধবা।) কে মুছে দেয় চোখের পানি, আর কে দাফন করে বে-কাফন লাশ!'⁶²
দাহিস যুদ্ধের উপলক্ষ ছিলো আরো তুচ্ছ। কায়স বিন যোহায়র এবং হোযায়ফা বিন বদরের মধ্যে ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতা হলো। কায়সের তেজী ঘোড়া 'দাহিছ' যখন এগিয়ে গেলো তখন হোযায়ফার ইঙ্গিতে আসাদগোত্রীয় কেউ একজন আগে বেড়ে দাহিছ-এর মুখে আঘাত করলো, এতে তার দৌড়ের গতি ব্যাহত হলো এবং অন্যান্য ঘোড়া তাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেলো। এর পর শুরু হলো খুন এবং খুনের বদলা খুন। যার যার গোত্র এসে দাঁড়ালো তার পাশে যুদ্ধের সাজে। উজাড় হলো কবিলার পর কবিলা। নিহত হলো হাজার হাজার যোদ্ধা। (শেষে যুদ্ধ থেমে গেলো যোদ্ধার অভাবে।)⁶³
'খুন এবং খুনের বদলা খুন' এই মরণজালেই যেন জড়িয়ে পড়েছিলো আরব গোত্রগুলোর জীবন। মৃত্যুর সময় পুত্রের প্রতি পিতার একমাত্র উপদেশ হতো: প্রতিশোধ, প্রতিশোধ এবং প্রতিশোধ!
মরুপ্রকৃতি, জীবিকার স্বল্পতা, লোভলালসা, হিংসা ও প্রতিহিংসা এবং জীবনের মূল্যহীনতা- এগুলোই ছিলো খুনখারাবি, লুটতরাজ ও পরস্পর হানাহানির অনুঘটক। অবস্থা এতদূর গড়িয়েছিলো যে, গোটা আরব জাযীরা যেন ছিলো শিকারীর জালে ঘেরা। কেউ জানে না, কখন কে কোথায় খুন হবে, কিংবা হবে লুণ্ঠনের শিকার। নির্জন মরুভূমিতে চলমান কাফেলায় আপন দলবলের মাঝখান থেকে যেন বাজপাখীর মত ছোঁ মেরে তুলে নেয়া হতো জ্যান্ত মানুষকে। এমনকি শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোরও সশস্ত্র প্রহরা, চৌকিব্যবস্থা এবং গোত্রপ্রধানদের ছত্রচ্ছায়া গ্রহণের প্রয়োজন হতো। তারীখে তাবারীর বর্ণনা মতে পারস্যসম্রাট কিসরার কাফেলাকে সশস্ত্র প্রহরায় মাদায়েন থেকে হিরায় নোমান বিন মুনযিরের হেফাযতে পৌঁছানো হতো, আর নোমান তার নিজস্ব প্রহরাব্যবস্থায় ইয়ামামা অঞ্চলের হাওযা বিন আলী আলহানাফীর হেফাযাতে পৌঁছে দিতেন। তার ছত্রচ্ছায়ায় কাফেলা বনু হানীফার এলাকা পাড়ি দিয়ে বনু তামীমের এলাকায় প্রবেশ করতো। তারপর নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে বনু তামীমের ছত্রচ্ছাযায় কাফেলা নিরাপদে ইয়ামান পৌঁছতো। শেষে কিসরার প্রশাসক কাফেলার দায়িত্ব গ্রহণ করতেন। আরবমরুর দস্যুদের লুণ্ঠন থেকে বাণিজ্যকাফেলা ও প্রেরিত দূতদের রক্ষা করার জন্য পারস্য-সম্রাটেরও বিকল্প কোন উপায় ছিলো না।⁶⁴

অন্ধকারে কিছু জোনাকি

মোটকথা পৃথিবীর বুকে তখন না ছিলো বিবেকবান কোন জাতি, না ছিলো নীতি ও নৈতিকতাভিত্তিক কোন সমাজ, আর না ছিলো ন্যায় ও ইনছাফ এবং দয়া ও সদাচারের অনুসারী কোন শাসক ও শাসন। আর নবী ও পয়গম্বরদের আনীত দ্বীন ও শরীয়তের বিশুদ্ধ রূপ তো ছিলো একেবারেই বিলুপ্ত। পৃথিবীর জলে-স্থলে ছড়িয়ে পড়েছিলো শুধু ফাসাদ আর ফাসাদ, গোলযোগ আর গোলযোগ।
এই সর্বগ্রাসী অন্ধকারের মাঝে সাধু সন্ন্যাসীদের কোন কোন মঠ ও গীর্জা থেকে আলোর যে ক্ষীণ রশ্মি দেখা যেতো, তা রাতের অন্ধকারে জ্বলে ওঠা জোনাকির চেয়ে বেশী কিছু ছিলো না, যাতে না অন্ধকার দূর হতো, আর না চলার পথ হতো আলোকিত। এ অন্ধকারের মধ্যে যারা সত্যধর্মের সন্ধানে বের হতো তারা শুধু দিশেহারা হয়ে দেশ থেকে দেশে ঘুরে মরতো, কিন্তু পেতো না সত্যের সন্ধান। সাগরের ঢেউয়ের মত এক ভূখণ্ড তাদের ঊর্ধ্বে তুলে ধরতো, তো অন্য ভূখণ্ড তাদের তলিয়ে দিতো। এর মধ্যে কখনো কোন জনপদ ও ভূখণ্ডে তারা পেয়ে যেতো বিরল কিছু মানুষের সন্ধান। তখন তারা তাদের আশ্রয় গ্রহণ করতো যেমন ডুবন্তজন আশ্রয় গ্রহণ করে ঝড়তুফানে ভেঙ্গে যাওয়া কিশতির ভাসমান কাষ্ঠখণ্ডে।
সত্যের সন্ধানী হযরত সালমান ফারসী (রা) এর ঘটনা হলো এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। ষষ্ঠ শতাব্দীর ঘোর অন্ধকারে তিনি বের হয়েছিলেন সত্যের অনুসারী-দের সন্ধানে দেশ থেকে দেশান্তরের অভিযানে। ছুটে গিয়েছেন শাম থেকে মোছলে, সেখান থেকে নিছীবীনে এবং সেখান থেকে আমুরিয়ায়। আর এক সাধুপুরুষ তাঁকে বলে দিতেন আরেক দূর দেশের কোন সাধুপুরুষের নাম। এমনকি চতুর্থজনের কাছে এসে তিনি আর পঞ্চমজনের সন্ধান পেলেন না। অবশেষে ইসলাম তাঁকে উদ্ধার করলো এই সর্বগ্রাসী অন্ধকার থেকে। হযরত সালমান (রা) এর মুখেই শুনুন সত্যের সন্ধানে তাঁর মর্মস্পর্শী সেই সুদীর্ঘ অভিযানের কাহিনী। তিনি বলেন-
শাম দেশে আগমন করে আমি জানতে চাইলাম, এই (নাছারা) ধর্মের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি কে? লোকেরা বললো, গীর্জার পাদ্রী। তার কাছে হাযির হয়ে আরয করলাম, আমি এ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি। তাই আমার একান্ত আশা, গীর্জায় আপনার সঙ্গে থেকে আপনার সেবা করি, শিক্ষা গ্রহণ করি এবং আপনার সঙ্গে প্রার্থনা করি। তিনি রাজি হলেন; আমি তার সঙ্গে থাকলাম। কিন্তু তিনি ছিলেন মন্দ ব্যক্তি। লোকদের তিনি দানে উদ্বুদ্ধ করতেন। তারা যখন বিপুল দানসামগ্রী তার কাছে এনে জমা করতো, তিনি গরীবের মধ্যে বণ্টন না করে তা নিজে রেখে দিতেন। এভাবে তার কাছে জমা হয়েছিলো সাত কলস সোনা-চাঁদি।
হযরত সালমান বলেন, এসব দেখে তার প্রতি আমার ভীষণ ঘৃণা হলো। মৃত্যুর পর নাছারারা তাকে দাফন করতে জমায়েত হলো। তখন বললাম, তোমাদের ধর্মগুরু ছিলেন মন্দ লোক। তোমাদের তো দানের আদেশ-উপদেশ দিতেন, কিন্তু সেই বিপুল দানসামগ্রী থেকে গরীবদের কিছুমাত্র না দিয়ে নিজেই তা আত্মসাৎ করতেন। এই দেখো তার গোপন ভাণ্ডার! লোকেরা সাত কলস সোনা-চাঁদি দেখে তাকে ধিক্কার দিলো, আর বললো, কসম আল্লাহর, তাকে আমরা দাফন করবো না। তারা তাকে শূলে চড়িয়ে পাথর মারলো। পরে অন্য একজনকে তার স্থানে বসালো।
হযরত সালমান বলেন, আমি এমন কাউকে দেখিনি, যে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে না, অথচ সে তার চেয়ে উত্তম এবং তার চেয়ে দুনিয়াবিমুখ ও আখেরাতমুখী এবং দিন-রাত তার চেয়ে ইবাদতমগ্ন। তাই তাকে এমন ভালোবাসলাম, যা আগে অন্য কাউকে বাসিনি। তার সঙ্গে আমি দীর্ঘকাল অবস্থান করলাম। যখন তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো তখন বললাম, হে আল্লাহর বান্দা! আপনার সঙ্গে থেকে আপনাকে আমি এমন ভালোবেসেছি, যা আগে কাউকে বাসিনি। এখন আল্লাহর যে ফায়ছালা আপনার কাছে এসে গেছে তা তো দেখতে পাচ্ছেন! তো আপনি আমাকে কার কাছে যাওয়ার অছিয়ত করেন এবং আমার প্রতি আপনার কী আদেশ?
তিনি বললেন, হে বৎস! যে (ধর্মশিক্ষার) উপর আমি ছিলাম তার অনুসারী কাউকে আমার জানা নেই। আসল লোকেরা তো মরে গেছে, আর পরবর্তীরা তাদের শিক্ষার অধিকাংশই পরিবর্তন করে ফেলেছে। তবে একজন আছে মোছেলে; তার নাম এই। তিনি শুধু এই শিক্ষার অনুসারী যার উপর আমি ছিলাম। সুতরাং তুমি গিয়ে তার সঙ্গে লেগে থাকো।
হযরত সালমান বলেন, মউতের পর তাকে দাফন করে আমি মোছেলের অধিবাসীর কাছে হাযির হয়ে আরয করলাম, হে আল্লাহর বান্দা! অমুক তার মৃত্যুর সময় আমাকে অছিয়ত করেছেন আপনার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার। কারণ তার মতে আপনি তার শিক্ষার উপর রয়েছেন। তিনি বললেন, আচ্ছা, থাকো আমার কাছে। থাকলাম এবং তাকে তার সঙ্গীর শিক্ষার অনুসারী উত্তম ব্যক্তিরূপেই পেলাম। কিন্তু অল্পকাল পরেই তার মৃত্যু হলো। মৃত্যুর সময় বললাম, হে আল্লাহর বান্দা! অমুকের অছিয়তে আপনার কাছে আমার আসা। এখন আল্লাহর যে ফায়ছালা তা তো আপনি দেখতে পাচ্ছেন! তো আমাকে কার কাছে যাওয়ার অছিয়ত করেন এবং আমার প্রতি আপনার কী আদেশ?
তিনি বললেন, হে বৎস! আমরা যে শিক্ষার উপর ছিলাম, তার অনুসারী কারো পরিচয় আমার জানা নেই, নিছীবীনের অধিবাসী এক ব্যক্তি ছাড়া; তার নাম এই। তুমি গিয়ে তার সঙ্গে লেগে থাকো।
মউতের পর তাকে দাফন করে আমি নিছীবীনবাসীর খেদমতে হাযির হয়ে আমার বৃত্তান্ত বললাম এবং অছিয়তের কথা জানালাম। তিনি বললেন, আচ্ছা, থাকো আমার কাছে। থাকলাম এবং তাকে তার দুই পূর্ববর্তীর শিক্ষার উপর পেলাম। একজন উত্তম ব্যক্তির সঙ্গেই আমি সময় যাপন করতে লাগলাম। কিন্তু আল্লাহর কসম, দেখতে না দেখতে তারও উপর মউত নাযিল হলো। তখন বললাম, হে আল্লাহর বান্দা! অমুক আমাকে অমুকের অছিয়ত করেছিলেন, তারপর সেই অমুক আমাকে আপনার অছিয়ত করেছিলেন। এখন আপনি আমাকে কার অছিয়ত করেন এবং আমার প্রতি আপনার কী আদেশ?
তিনি বললেন, হে বৎস! আল্লাহর কসম! এমন কারো পরিচয় আমার জানা নেই যে আমাদের শিক্ষার উপর রয়েছে, যার কাছে যাওয়ার আদেশ তোমাকে করতে পারি। তবে আমুরিয়ায় একজন মোটামুটি আমাদের শিক্ষার উপর রয়েছেন। তুমি চাইলে তার কাছে যেতে পারো।
হযরত সালমান বলেন, মউতের পর তাকে দাফন করে আমি আমুরিয়ার অধিবাসীর খেদমতে হাযির হলাম এবং আমার বৃত্তান্ত জানালাম। তিনি বললেন, আচ্ছা, আমার কাছে থাকো। তখন আমি এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে থাকলাম যিনি তার পূর্ববর্তীদের তরীকা ও শিক্ষার উপর ছিলেন।
হযরত সালমান বলেন, একসময় তার উপরও আল্লাহর ফায়ছালা নাযিল হলো। মৃত্যুশয্যায় তাকে বললাম, হে আল্লাহর বান্দা! আমি অমুক, অমুক এবং অমুকের মাধ্যমে আপনার কাছে উপনীত হয়েছি। এখন আপনি আমাকে কার অছিয়ত করেন এবং আমার প্রতি আপনার আদেশ কী?
তিনি বললেন, হে বৎস! আল্লাহর কসম! এমন কারো পরিচয় আমার জানা নেই যে আমাদের শিক্ষার উপর রয়েছে, যার কাছে যাওয়ার আদেশ তোমাকে করতে পারি। তবে এমন এক নবীর আগমনকাল ঘনিয়ে এসেছে যিনি ইবরাহীমের দ্বীনের উপর প্রেরিত হবেন। তিনি আরবভূমিতে আবির্ভূত হবেন এবং দুই প্রস্তরভূমির মধ্যবর্তী ভূমিতে হিজরত করবেন, যেখানে রয়েছে খেজুরবাগান। তাঁর মধ্যে নবুয়তের সুস্পষ্ট কতিপয় নিদর্শন পাওয়া যাবে। (যেমন) তিনি হাদিয়া আহার করবেন, কিন্তু ছাদাকা আহার করবেন না। তাঁর দুই কাঁধের মাঝে নবুয়তের মোহর থাকবে। তুমি যদি সেই ভূমিতে পৌঁছতে পারো তবে তাই করো।... (শেষ পর্যন্ত)'⁶⁵

সমকালীন বিশ্বের একটি সাধারণ পর্যালোচনা

প্রখ্যাত ইংরেজ জীবনীকার rvc bodly তার the messenger গ্রন্থে ইসলামের আবির্ভাবকালীন পৃথিবীর একটি সাধারণ পর্যালোচনা পেশ করেছেন। আলোচ্য অধ্যায়ের সমাপ্তিতে সেটা আমরা পাঠকবর্গের সামনে পেশ করতে চাই। তিনি সমকালীন বিশ্বের উল্লেখযোগ্য দেশ ও জনগোষ্ঠীগুলোর অবস্থা এভাবে তুলে ধরেছেন-
'যদিও আরবজাতি প্রাচীন ঐতিহ্যের অধিকারী ছিলো তবু খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর পৃথিবীতে তাদের কোন গুরুত্ব ছিলো না। শুধু আরবরা কেন, প্রকৃতপক্ষে তখন কোন জনগোষ্ঠীরই আলাদা কোন গুরুত্ব ছিলো না। কারণ সেটা ছিলো (মানব-সভ্যতার জন্য) একটা মুমূর্ষুকাল, যখন পূর্বইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার বিশাল দুই সাম্রাজ্য হয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো, কিংবা তাদের রাজকীয় শাসন বিলুপ্তির প্রান্তসীমায় এসে পড়েছিলো।'
'সেটা ছিলো এমন এক পৃথিবী যা তখনো গ্রীকদের ভাষা-অলঙ্কার, পারস্যের তাপ ও প্রতাপ এবং রোমের জৌলুস ও জাঁকজমক দ্বারা বিমোহিত ছিলো। কোন কিছু, এমনকি কোন একটি ধর্মও এমন ছিলো না, যা ঐগুলোর কোন একটির স্থান গ্রহণ করতে পারে।'
'ইহুদীরা তো সারা পৃথিবীতে ছিন্নমূল এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বহীন অবস্থায় ঘুরে মরছিলো। পরিস্থিতি অনুযায়ী কখনো তাদের সহ্য করা হতো, আর কখনো তাদের উপর যুলুম নির্যাতন চালানো হতো। নিজের বলতে তাদের কোন দেশ ছিলো না। তখনো তাদের ভবিষ্যত তেমনি অনিশ্চিত ছিলো যেমন আজ।'
'মহামতি পোপ গ্রেগরীর প্রভাববলয়ের বাইরে খৃস্টানরা তাদের সহজ-সরল ধর্মবিশ্বাসে বিচিত্র সব জটিল তত্ত্ব উদ্ভাবনে তৎপর ছিলো এবং এ নিয়ে পরস্পর হানাহানিতে মেতে উঠেছিলো।'
'শুধু পারস্যে সাম্রাজ্যবিনির্মাণের একটি শেষ সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিলো। সম্রাট দ্বিতীয় খসরু তার সাম্রাজ্যের সীমানা বিস্তারে ব্যস্ত ছিলেন। রোমসাম্রাজ্যকে পর্যুদস্ত করে তিনি কাপাডোসিয়া, মিসর ও সিরিয়া দখল করে নিয়েছিলেন। তাছাড়া ৬২০ খৃস্টাব্দে (যখন মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পথ-প্রদর্শকরূপে আত্মপ্রকাশ করেন সে সময় সম্রাট দ্বিতীয় খসরু বাইতুল মাকদিস ধ্বংস করে পবিত্র ক্রশ লুণ্ঠন করে নিয়ে গিয়েছিলেন। এভাবে তিনি সম্রাট প্রথম দারা-এর রাজপ্রতাপ পুনরুদ্ধার করেছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিলো যেন মধ্যপ্রাচ্যেও শৌর্য-সাহস নতুন প্রাণ লাভ করেছে। অবশ্য বাইজান্টাইন রোমকরাও তাদের অতীতশৌর্য তখনো কিছুটা ধারণ করছিলো। পারস্যসম্রাট খসরু যখন কনস্টান্টিনোপলের নগরপ্রাচীরের কাছে তার বাহিনী নিয়ে উপস্থিত, তখন তারা সংগ্রাম ও প্রতিরোধের একটা চূড়ান্ত প্রচেষ্টার প্রদর্শনী করেছিলো।'
'দূরপ্রাচ্যের পরিবেশ-পরিস্থিতিও সন্তোষজনক কোন ছাপ রাখতে পারছিলো না। হিন্দুস্তান তখনো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও গুরুত্বহীন রাজ্যে বিভক্ত ছিলো এবং সামরিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের চেষ্টায় লিপ্ত ছিলো।'
'চীনারাও সবসময়ের মত পারস্পরিক সঙ্ঘাত-সঙ্ঘর্ষে লিপ্ত ছিলো। সুঈ বংশের উত্থান হলো, পতনও হয়ে গেলো, আর তাদের স্থান দখল করে নিলো তাঙ বংশ, যারা শাসনক্ষমতায় ছিলো তিনশ বছর।'
'জাপানে প্রথমবারের মত এক নারী সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। তখন সেখানে বৌদ্ধধর্ম শিকড় গেড়ে বসছিলো এবং জাপানীদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনার উপরও তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছিলো।'
'স্পেন ও ইংলেন্ড ছিলো গুরুত্বহীন ও ক্ষুদ্র দেশ। স্পেনে ছিলো 'ভিসিগথ'দের শাসন, যারা মাত্র কিছুকাল আগে ফ্রান্সের বিরাট এলাকা দখল করেও সেখান থেকে বিতাড়িত হয়েছে। স্পেনে তারা ইহুদীদের উপর চরম যুলুম নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছিলো, যা শতাব্দীকাল পরের মুসলিম অভিযানের অনুকূল ক্ষেত্র প্রস্তুত করছিলো।'
'বৃটেন উপদ্বীপ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিলো। রোমকরা বিদায় নিয়েছে, দেড়শ বছর হয়ে গিয়েছে এবং নরদিকরা তাদের স্থান দখল করে নিয়েছে। খোদ ইংল্যান্ড সাতটি স্বতন্ত্র রাজ্যের সমষ্টি ছিলো।'⁶⁶
মোটকথা বিশ্বজাতিবর্গের বিশৃঙ্খল ও শক্তিহীন অবস্থা যেন একটি নতুন শক্তির আবির্ভাবের প্রতীক্ষায় ছিলো।

টিকাঃ
১. sal's translation. p. 62 (1896)
২. a. j. butler: arab's conqust of egypt and the last thirty years of the roman dominion, p 29-30
৩. ইয়াঞ্চুক, পৃ: ১৮০-৮১
৪. encyclopedia britanica. see justin
৫. edward gibbon : the history of declin and fall of the roman empire, vol 3.p.327
৬. sal's translation. p. 72 (1896)
৭. edward gibbon: the history of declin and fall of the roman empire, vol 5.p.31
৮. historian's history of the world.v.7.175
৯. حضارة العرب، تعريب الأستاذ عادل زعتير، الفصل الرابع العرب في مصر.
১০. a. j. butler: arab's conqust of egypt and the last thirty years of the roman dominion, p
১১. প্রাগুক্ত
১২. historian's history of the world.v.7.173
১৩. h.g. wells: a short history of the world. p. 164
১৪. the making of humanity. p. 164
১৫. উস্তায আব্দুল ফাত্তাহ আল-খালেদী কৃত اليهود في وصفهم القرآن الكريم পড়ুন, প্রকাশক, দারুল কলম, দামেস্ক
১৬. বিস্তারিত জানতে দেখুন, الخطط المقريزية .৪ পৃ. ৩৯২ এবং the arab's conquest of egypt এবং historian's history of the world.v.8. p.84
১৭. তারিখে তিবরী
১৮. ফরাসি ভাষায় লিখিত, মুহম্মদ ইকবাল কর্তৃক উর্দুতে অনুদিত আহদে সাসানীতে ইরান, পৃ. ৪৩০
১৯. الملل والنحل للشهرستاني جـ ১, ص ٢٠٦
২০. تاريخ الطبري جـ ২, ص ٩٦
২১. تاريخ الطبري খ. ২ এবং তারীখ-ই- ইরান, ম্যাকারিয়স ইরানীকৃত।
২২. ফরাসি ভাষায় লিখিত, মুহম্মদ ইকবার কর্তৃক উর্দুতে অনুদিত আহদে সাসানী ম্যাঁ ইরান, পৃ. ৫৯০, ৪২০, ৪১৮, ৪২২ ও ২১
২৩. تاريخ الطبري . ৪.৪.৩০৯,
২৪. তারীখ-ই- ইরান, শাহীন ম্যাকারিয়স, ইরানী, পৃ. ২২১-২৪
২৫. বৌদ্ধধর্মের প্রাচীন রাজধানী তক্ষশীলার যাদুঘর পরিদর্শনে যারাই যায় তারা ঐসব মূর্তি ও প্রতিমা দেখে অবাক হয়ে পড়ে যা প্রাচীন বৌদ্ধ জনপদ থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে বের হয়েছে। এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, বৌদ্ধধর্ম ও সভ্যতা তখন হয়ে পড়েছিলো একান্তই প্রতিমাসর্বস্ব। ডক্টর গোস্তাভ লী বোন বৌদ্ধ ভবন-প্রাসাদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ অবলোকন করে এ সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছেন। indian civilisation বা ভারতবর্ষের সভ্যতা (উর্দু অনুবাদ, তামাদ্দুন-ই- হিন্দ) গ্রন্থে তিনি বলেন- বৌদ্ধধর্মের প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটন করার জন্য বৌদ্ধসভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ অধ্যয়ন করা আবশ্যক। বইয়ের পাতা থেকে আসল সত্য উদ্ধার করা কিছুতেই সম্ভব নয়। ইউরোপীয় লেখক-গবেষকগণ যে সব তথ্য ও তত্ত্ব আমাদের হজম করাতে চান তা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদির মাধ্যমে প্রমাণিত চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের দাবী হলো, বৌদ্ধধর্ম হচ্ছে নিরিশ্বরবাদী ধর্ম, অথচ প্রত্নতাত্ত্বিক খনন প্রমাণ করছে যে, বাস্তবে বৌদ্ধধর্ম হচ্ছে প্রতিমাপূজা ও বহুউপাস্যবাদী ধর্মের পুরোধা।
২৬. উর্দুভাষায় রচিত হিন্দুস্তানী তামাদ্দুন
২৭. the discovery of india p. 201-203
২৮. উর্দু অনুবাদ, তামাদ্দুন-ই- হিন্দ, পৃ. ৪৪০-৪১
২৯. তামাদ্দুন-ই- হিন্দ, উর্দু তরজমা, পৃ.৪৪১
৩০. দয়ানন্দ সরস্বতী, সত্যার্থ প্রকাশ, পৃ. ৩৪৪
৩১. les civilisations del' inde. by dr. gustav le bon p. 265 (উক্ত বইয়ের উর্দু তরজমা তামাদ্দুন-ই-হিন্দ, মুতারজিম, সাইয়েদ আলী বেলগ্রামী, পৃ. ৩১১)
৩২. মনুসংহিতা প্রথম অধ্যায়
৩৩. মনুসংহিতা, প্রথম অধ্যায় এবং অষ্টম অধ্যায়
৩৪. মনুসংহিতা, নবম অধ্যায়, দ্বিতীয় অধ্যায় এবং মনুসংহিতা, একাদশ অধ্যায়
৩৫. hinduism, by louis. p.p. 34-35
৩৬. hinduism, p.p. 34-35
৩৭. মনুসংহিতা, ১১, ১০, ৮ অধ্যয়
৩৮. les civilisations del' inde. by dr. gustav le bon (উক্ত বইয়ের উর্দু তরজমা তামাদ্দুন-ই- হিন্দ, মুতারজিম, সাইয়েদ আলী বেলগ্রামী, পৃ. ২৩৬-৩৮) সতীদাহ ছিলো ভারতে উচ্চবর্ণ ও অভিজাত শ্রেনীর একটি মর্যাদাপূর্ণ সমাজ-প্রথা, যা স্ত্রীর জন্য তার পতিভক্তি এবং সতিত্ব ও মর্যাদার প্রতি বিশ্বস্ততার প্রমাণ। ফরাসী পর্যটক ড. বার্ণিয়ার-এর মতে মুসলিম শাসনের প্রভাবে এবং মুসলিম শাসকদের হস্তক্ষেপের ফলে এই বর্বর ও নিষ্ঠুর প্রথা যথেষ্ট কমে এসেছিলো, আর শেষ দিকে এসে বৃটিশরা তা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করে দেয়।
৩৯. طبقات الأمم 165 (682) صاعد الأندلسي :
৪০. (আরব জাহেলিয়াতের আকীদা-বিশ্বাসের হাকীকত ও স্বরূপ এবং শিরকের ক্রমবিবর্তন সম্পর্কে জানার জন্য পড়ুন শামদেশীয় বিদগ্ধ পণ্ডিত মুহাম্মদ ইয্যত দারূযাহ রচিত কিতাব بيئة النبي صلى الله عليه وسلم من القرآن (কোরআনের দৃষ্টিতে নবী মুহাম্মাদুর আলাইহিস ওয়াসাল্লামের সমকালীন পরিবেশ) পড়ুন।
৪১. কিতাবুল আছনাম।
৪২. সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব ফাতহে মক্কা।
৪৩. সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব ওয়াফদ বিন হানীফা।
৪৪. কিতাবুল আসনাম : পৃ. ৪৪
৪৫. কিতাবুল আসনাম : পৃ. ৫৮
৪৬. ত্বাবাকাতুল উমাম সায়েদ আল আন্দালুসী : পৃ. ৪৩
৪৭. কিতাবুল আসনাম : ৪৪
৪৮. এসম্পর্কিত বিস্তারিত দেখুন, كتاب المخصص لابن سيده খ. ১১ পৃ. ৮২-১০১
৪৯. المعلقات السبع (طبع دار الكتب العلمية، بيروت
৫০. شرو حماسة أبي تمام ২.১.৫ পৃ. ২
৫১. شرو دیوان الحماسة لبی تمام للتبريزي (طبع دار الكتب العلمية، بيروت
৫২. তাফসীর আত তাবরী, তাফসীর আয়াহ: ইন্না ইউরিদুশ শায়তানু আই ইউকিআ বাইনাকুমুল আদাওয়াতা ওয়াল বাগ্ধাও ফীল খামরি ওয়াল মাইসির।
৫৩. বিস্তারিত দেখুন, তাফসীরে তাবারী, খ. ৪ পৃ. ৫৯-৬৯
৫৪. তাফসীরে তাবারী, খ. ১৮ পৃ. ৪০১ এবং المسند الفريد لابن عبد ربه، كتاب أخبار زياد
৫৫. صحيح البخاري، كتاب النكاح
৫৬. তাফসীরে তাবারী, খ. ৪ পৃ. ৩০৮
৫৭. এসম্পর্কে বিস্তারিত দেখুন بلوغ الأرب في أحوال العرب للأলوسي এবং দেখুন كتاب الأغاني আরো দেখুন, سنن الدارمي باب ما كان عليه الناس قبل مبعث النبي صلى الله عليه وسلم من الجهل والضلالة (المجلد الأول. الصفحة الثالثة)
৫৮. ইমাম বুখারী রহ. হযরত আনাস বিন মালিক রা, হতে বর্ণনা করেছেন 'আলামযালিম ওয়াল গছব' অধ্যায়ে, হাদীছ নম্বর ২২৬৩ এবং ২২৬৪, ইমাম তিরমিযি বর্ণনা করেছে, আলফিতান অধ্যায়ে;
৫৯. দেখুন, বাকারাহ, ১৯৮-৯৯ আয়াতের তাফসীর, তাবারী ও অন্যান্য।
৬০. شرح الحماسة لأبي تمام .৩. দ. ক. ৫৫৯
৬১. شرح الحماسة لأبي تمام
৬২. أيام العرب في الجاهلية
৬৩. أيام العرب في الجاهلية
৬৪. দেখুন, তারীখে তাবারী, খ. ২ পৃ. ১৩৩
৬৫. (ইমাম আহমদ নিজস্ব সনদে তা বর্ণনা করেছেন হযরত ইবনে আব্বাস (রা) হতে, আর তিনি হযরত সালমান (রা) হতে। হাদীছ নম্বর, ২২৬২০, বায্যাও তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন, খ. ৬ পৃ. ৪৬৩, তাবারানীও বর্ণনা করেছেন المعجم الكبير এ; খ. ৬ পৃ. ২২৩। এই বর্ণনাটি অবিচ্ছিন্ন সনদের কারণে এবং বৃর্ণনাকারীদের আদালত ও ন্যায়পরতার কারণে জাহেলিয়াত ও তার ধর্মীয় অবস্থা সম্পর্কে বিশুদ্ধতম ঐতিহাসিক একটি দলীলরূপে গণ্য।)
৬৬. the messenger :the lif of muhammad সংক্ষেপিত, পৃ. ১৮-১৯

📘 মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো 📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: জাহেলী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

📄 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: জাহেলী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা


ধর্ম ও রাজনীতি এবং নীতি ও অর্থনীতির সম্পর্ক

সমাজ-সংস্কার ও সমাজ-সংশোধনের কল্যাণ-চিন্তা যারা করেন তারা সাধারণত সমাজে বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা ভেবে দেখেন না, বা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করেন না। অথচ রাজনীতি ও অর্থনীতি হচ্ছে সমাজ-জীবনের অবিচ্ছেদ্য বিষয়। ভুল করে হলেও সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা কালমার্কস তো অর্থনীতিকেই (সেই সূত্রে রাজনীতিকেও) ভেবেছেন সকল সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং সকল পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি ভুল করেছেন, তবে এর দ্বারা মানবজীবনে অর্থনীতি ও রাজনীতির গুরুত্ব তো অতি-অবশ্যই প্রমাণিত হয়। রাজনীতি ও অর্থনীতিকে বাদ দিয়ে বা পাশকাটিয়ে পরিচালিত যে কোন সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারপ্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। কোরআন ও সুন্নাহ তাই ধর্ম ও নীতি-নৈতিকতার কথা যেমন বলেছে তেমনি শাসনব্যবস্থা ও অর্থব্যবস্থার সংশোধনের কথাও গুরুত্বের সঙ্গে বলেছে। পৃথিবীতে ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে যত পরিবর্তন এসেছে এবং যত উত্থান-পতন ঘটেছে তাতে মানুষের চরিত্র ও নৈতিকতার যেমন ভূমিকা ছিলো তেমনি ভূমিকা ছিলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরও। জাতীয় জীবনের গঠন-পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধ্যান-ধারণা ও বিধিবিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর অনুঘটকরূপে গণ্য হয়ে থাকে।

ইসলামপূর্ব যুগের জাহেলিয়াত সম্পর্কে আলোচনার ক্ষেত্রেও একই কথা। জাহেলী যুগের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও জনপদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক ও সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা করার পর তখনকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চালচিত্রের উপরও বিশেষভাবে আলোকপাত করা জরুরী বলে আমরা মনে করি। সুতরাং এখানে আমরা অতি সংক্ষেপে সে আলোচনাটা সেরে নিচ্ছি।

স্বেচ্ছাচারী রাজতন্ত্র

এককথায় বলা যায়, ইসলামপূর্ব জাহেলী যুগ ছিলো একনায়কতন্ত্র ও স্বেচ্ছাচারী শাসনের যুগ। কেননা অবাধ রাজতন্ত্রই ছিলো সে যুগের একমাত্র প্রচলিত শাসন -ব্যবস্থা, যেখানে রাজ্যের ও প্রজাবর্গের প্রতিটি বিষয়ে রাজ-আজ্ঞাই ছিলো প্রথম কথা এবং শেষ কথা। রাজতন্ত্র প্রায় ক্ষেত্রে রাজবংশের অতিমানবীয় মর্যাদার উপর প্রতিষ্ঠা লাভ করতো, যেমন ছিলো ইরানে। সাসানী রাজবংশের দাবী ও বিশ্বাস ছিলো, শাসনক্ষমতার উপর তাদের রয়েছে মৌরুসি অধিকার এবং তা ঐশী সমর্থনপুষ্ট। প্রজাসমাজেও এ বিশ্বাস তারা বদ্ধমূল করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে এবং সফলও হয়েছে। একসময় পারস্যের প্রজাবর্গ সাসানীদের এই পবিত্র রাজ-অধিকার স্বীকার করে নিয়েছিলো, এমনকি তা তাদের ধর্মবিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিলো।

কখনো রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বয়ং সম্রাটের নিরঙ্কুশ অতিমানবীয় মর্যাদার উপর। যেমন ছিলো চীনে সম্রাটকে প্রজারা 'আকাশের পুত্র' বলে অভিহিত করতো। কেননা তাদের বিশ্বাসে, আকাশ ও পৃথিবী হলো 'নর' ও 'নারী' এবং উভয়ের মিলনে সৃষ্টিকুলের উদ্ভব। আর সম্রাট প্রথম 'খাতা' হচ্ছেন আকাশ-পৃথিবীর মিলনের প্রথম ফল। এ বিশ্বাসের ভিত্তিতেই সিংহাসনে সমাসীন সম্রাটকে মনে করা হতো প্রজাকূলের একমাত্র পিতা, যার নিরঙ্কুশ অধিকার রয়েছে যে কোন ইচ্ছা করার এবং তা কার্যকর করার। সম্রাটকে সম্বোধন করা হতো 'আপনিই আমাদের মাতা-পিতা' বলে! সম্রাট লীয়ান, কিংবা তাঈশুঙের মৃত্যুতে সমগ্র চীন এমন শোক-মাতম করেছিলো যার নযির ইতিহাসে দ্বিতীয়টি আর নেই। কেউ সুই-খুঁচিয়ে চেহারা রক্তাক্ত করেছে, কেউ কফিনে মাথা ঠুকে নাক-কান জখম করেছে। বুকফাটা কান্না তো ছিলো মামুলি কথা!¹

কখনো রাজতন্ত্রের ভিত্তি ছিলো বিশেষ কোন জাতির এবং বিশেষ কোন দেশ ও ভূখণ্ডের অতিমানবীয় মর্যাদার উপর। যেমন ছিলো রোমান সাম্রাজ্যে। রোম ও রোমান জাতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ছিলো সাম্রাজ্যের মৌলিক বিধানের অন্তর্ভুক্ত। অন্যান্য জাতি ও জনগোষ্ঠী ছিলো রোমান জাতীয়তার সেবাদাস, দেহের শিরা- উপশিরা যেমন রক্ত সঞ্চালন করে নিয়ে যায় দেহের মূল কেন্দ্র হৃদপিণ্ডে, তেমনি রোমানরা ছিলো সাম্রাজ্যের হৃদপিণ্ড। তাদের অধিকার ছিলো যে কোন আইন লঙ্ঘন করার, যে কারো অধিকার হরণ এবং সম্ভ্রম লুণ্ঠন করার। যে কোন জুলুম ও স্বেচ্ছাচার তাদের জন্য ছিলো বৈধ। এমনকি রোমান-ধর্মবিশ্বাস গ্রহণ এবং রোমান সাম্রাজ্যের প্রতি আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততা প্রদর্শনের পরও কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রোমানদের জুলুম-নির্যাতন থেকে রেহাই পাবে, এমন নিশ্চয়তা ছিলো না। নিজেদের ভূখণ্ডে বিজিত জাতির স্বায়ত্তশাসন, বা মৌলিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার কোন উপায় ছিলো না। এ ধরনের চিন্তা করাও ছিলো ফাঁসি-যোগ্য রাজদ্রোহিতার অপরাধ। বিজিত প্রতিটি অঞ্চল ও জনগোষ্ঠী যেন ছিলো সেই উটনী যা ভার বহন করবে, দুধও দেবে। বিনিময়ে পাবে শুধু বেঁচে থাকার এবং ওলানে দুধ জমা হওয়ার মত দানাপানি।

রোমান সাম্রাজ্য সম্পর্কে রবার্ট ব্রিফোল্ট বলেন- 'রোমান সাম্রাজ্যের পতন ও ধ্বংসের মূল কারণ কিন্তু ক্রমবর্ধমান অপরাধ ও দুর্নীতি ছিলো না (যেমন হত্যা, লুণ্ঠন, ঘুষ ইত্যাদি), বরং মূল কারণ ছিল এই যে, যাবতীয় দুর্নীতি, মন্দাচার ও বাস্তববিমুখতা ছিলো তাদের স্বভাবপ্রবণতা, যা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের সূচনা থেকেই বিদ্যমান ছিলো এবং তা সমাজ ও রাষ্ট্রের গভীরে শিকড় গেড়ে বসেছিলো। যে কোন মানবসমাজ বা মানবপ্রতিষ্ঠান যদি এ ধরনের ভুল বুনিয়াদ ও ভ্রান্ত ভিত্তির উপর গড়ে ওঠে তাহলে নিছক মেধা ও কুশলতা দ্বারা, তা যত বিপুল পরিমাণেই হোক, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানকে পতন থেকে রক্ষা করতে পারে না। যেহেতু অনাচার ও মন্দাচারই ছিলো রোমান সাম্রাজ্যের ভিত্তি-বুনিয়াদ সেহেতু একদিন না একদিন তার পতন ও বিলুপ্তিও ছিলো অনিবার্য। কেননা আমরা দেখেছি, রোমান সাম্রাজ্য গড়েই উঠেছিলো বিপুল জনগোষ্ঠীকে শোষণ করে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভোগবিলাসের আয়োজন করার উদ্দেশ্যে। এটা ঠিক যে, রোমে ব্যবসা-বাণিজ্য পূর্ণ সততা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে পরিচালিত হতো এবং তা ছিলো রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। তদুপরি বহুমুখী যোগ্যতায় এবং বিচারব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতায় এ সাম্রাজ্য ছিলো অতুলনীয়, কিন্তু এতসব গুণ ও বৈশিষ্ট্য সাম্রাজ্যকে তার বুনিয়াদি গলদের নির্মম পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারেনি এবং পারার কথাও নয়।'²

রোমান শাসনে মিসর ও সিরিয়া

ডক্টর আলফ্রেড বাটলার মিসর ও রোমান শাসন সম্পর্কে বলেন- 'মিসরে রোমান শাসনের একটাই শুধু লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিলো, শাসকদের ভোগের জন্য প্রজাশোষণ ও সম্পদলুণ্ঠন। মানুষের কল্যাণ ও সুখ-শান্তি এবং জীবন ও জীবিকা নিশ্চিত করার চিন্তাও তাদের ছিলো না; মন ও মনন এবং চিন্তা ও দর্শনের উৎকর্ষসাধন তো অনেক পরের কথা, এমনকি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের কথাও তারা ভাবতো না। আগা থেকে গোড়া তাদের শাসন ছিলো একটি বিদেশী শাসন, যা টিকে ছিলো প্রজাসমর্থনের পরিবর্তে সম্পূর্ণ সামরিক শক্তির উপর। শাসিত জনগোষ্ঠীর প্রতি হিতৈষণা ও মমত্ববোধ বলতে কিছুই তাদের মধ্যে ছিলো না।'³

একজন সিরীয় আরব ঐতিহাসিক সিরিয়ায় রোমান শাসন সম্পর্কে লিখেছেন- 'শুরুর দিকে সিরীয়দের প্রতি রোমান-আচরণ ছিলো কিছুটা ন্যায়ানুগ; যদিও তাদের রাজত্বে আভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলা ছিলো। কিন্তু যখন রোমান সাম্রাজ্য জরাগ্রস্ত হয়ে পড়ে তখন সিরিয়ায় তাদের শাসন স্বেচ্ছাচারের নিকৃষ্টতম স্তরে নেমে গিয়েছিলো। অসহায় দাসের প্রতি নিষ্ঠুর মনিবের যে পাশবিকতম আচরণ কল্পনা করা যায় সেটাই তারা তাদের শাসিত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে করতো। রোমানরা সিরিয়াকে কখনো সরাসরি তাদের সাম্রাজ্যভুক্ত করেনি। ফলে সিরীয় ভূমি যেমন রোমান ভূখণ্ডের মর্যাদা পায়নি তেমনি সিরীয়রাও পায়নি রোমান নাগরিকের স্বীকৃতি। একজন রোমান যেসব অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতো, হতভাগ্য সিরীয়দের জন্য সেগুলো ছিলো নিষিদ্ধ। নিজ ভূমিতেই তারা ছিলো প্রবাসী, শাসিত ও শোষিত। শোষণমূলক কর-খাজনা আদায়ের জন্য অনেক সময় মানুষ কোলের সন্তান পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হতো। শোষণ- নিপীড়ন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলো। ক্রীতদাস বানানো এবং বেগার খাটানো ছিলো সাধারণ রেওয়াজ। ক্রীতদাস ও মজুরদের বেগার-শ্রমেই রোমানরা তাদের এতো গর্বের ইমারত-স্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছিলো তাদের বিশাল সাম্রাজ্যে।'

রোমানরা সিরিয়ায় সাতশ বছর রাজত্ব করেছে। সিরিয়া ছিলো শান্তিপূর্ণ দেশ, রোমান রাজত্বের উপসর্গরূপেই সেখানে শুরু হয় বিবাদ-গোলযোগ, হানাহানি ও স্বেচ্ছাচার। এদিকে গ্রীকরা সিরিয়ায় রাজত্ব করেছে তিনশ উনসত্তর বছর। তাদের রাজত্বকালে সমগ্র ভূখণ্ডটি ছিলো ভয়ঙ্কর যুদ্ধবিগ্রহের কবলে। সিরীয়দের উপর তখন নেমে আসে অত্যাচার উৎপীড়নের ভয়াবহ অন্ধকার। গ্রীকজাতির স্বভাবপাশবিকতা ও সম্পদলিলা বীভৎসতম রূপে প্রকাশ পায়। বস্তুত সিরীয় জনগোষ্ঠীর জন্য গ্রীকশাসন দেখা দিয়েছিলো চরম অভিশাপ এবং ঘোরতম বিপদরূপে।⁴

মোটকথা, রোমান ও পারসিক উপনিবেশগুলো বিদেশী শাসনের যাঁতাকলে শুধু পিষ্ট হচ্ছিলো এবং তাদের দুঃখদুর্দশা চরমে পৌঁছে গিয়েছিলো। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সর্বদিক থেকেই দেশ ছিলো চরম অস্থিরতার শিকার; এমনকি রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর অবস্থা ছিলো আরো করুণ।

ইরানের খাজনা ও রাজস্বব্যবস্থা

ইরানের খাজনাব্যবস্থা ও রাজস্বনীতি কোনভাবেই ন্যায়ানুগ ও স্থিতিশীল ছিলো না, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছিলো চরম শোষণমূলক ও অস্থিতিশীল। রাজস্ব-সংগ্রহকারীদের খেয়ালখুশি ও মন-মর্জির উপর যেমন তা নির্ভর করতো তেমনি দেশের রাজনৈতিক ও যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে তা ওঠানামা করতো। 'সাসানী শাসনকালে ইরান' গ্রন্থের লেখক বলেন- 'কর নির্ধারণ ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে রাজকর্মচারীরা সততা ও স্বচ্ছতার পরিচয় দিতো না, বরং শোষণ ও লুণ্ঠনের মানসিকতা পোষণ করতো। যেহেতু কর ও রাজস্বের পরিমাণ ফি বছর পরিবর্তিত হতো এবং ওঠানামা করতো সেহেতু রাজ্যের আয়-ব্যয় কখনো পরিকল্পিত ও স্থিতিপূর্ণ হতো না। 'যেমন খুশি আয় যেমন খুশি ব্যয়' এই ছিলো অবস্থা। এমনও হতো যে, যুদ্ধ বেঁধে গেছে, অথচ রাজকোষ শূন্য, তখন 'যুদ্ধব্যয়' নামে নতুন কর চাপানো হতো। আর প্রায় সবসময় সাধারণভাবে পশ্চিমের সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলো এবং বিশেষভাবে বাবিল এই করনৈরাজ্যের শিকার হতো।'⁵

রাজভাণ্ডার ও রাজার ভাণ্ডার

দেশের উন্নয়ন ও প্রজাকল্যাণে রাজকোষ থেকে যা ব্যয় করা হতো তার পরিমাণ ছিলো অতি নগণ্য। বরং 'সম্পদ জমা করো রাজভাণ্ডারে নয়, রাজার ভাণ্ডারে' এ-ই ছিলো প্রাচীনকাল থেকে পারস্যের নীতি। তাই যতদূর সম্ভব নগদ অর্থ, সোনাদানা ও মূল্যবান সামগ্রী সম্রাটের ব্যক্তিগত কোষাগারে জমা হতো। সম্রাট দ্বিতীয় খসরুর ব্যক্তিগত সম্পদ যখন মাদায়েনে নবনির্মিত প্রাসাদে স্থানান্তরিত হয় তখন শুধু স্বর্ণের পরিমাণই ছিলো ৪৬ কোটি ৮০ লাখ মিছকাল, অর্থাৎ ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ফ্রাংক স্বর্ণমুদ্রা। তার রাজত্বের তেরবছর পূর্তির পর এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিলো ৮০ কোটি মিছকাল। সম্রাট সাহেবের রাজমুকুটে ব্যবহৃত স্বর্ণের পরিমাণ ছিলো ১২০ পাউন্ড (প্রায় দেড় মন)। (রাজমুকুটটি ছিলো স্বর্ণ-রৌপ্যনির্মিত এবং হিরা, পান্না ও মুক্তাখচিত। আর তা 'রাজমস্তকের' উপর এত সূক্ষ্ম স্বর্ণশৃঙ্খল দ্বারা ঝুলন্ত ছিলো যে, দূর থেকে বোঝা যেতো না। মনে হতো রাজমস্তক স্বয়ং তা ধারণ করে আছে, অথচ কোন মানব-মস্তকের পক্ষে এত ভার ধারণ করা সম্ভবই ছিলো না। কেননা তার ওজন ছিলো ৯১ কিলোগ্রামেরও বেশী। বেচারা সম্রাট!)

বিশাল শ্রেণীবৈষম্য

পারস্যের জাতীয় জীবনে সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য ছিলো অকল্পনীয় পরিমাণে। তবে তা সীমাবদ্ধ ছিলো অল্পকিছু ব্যক্তি ও পরিবারের মধ্যে। আর বিশাল জনগোষ্ঠী ছিলো অভাব ও দারিদ্র্যের অসহায় শিকার। পারস্যের ইতিহাসে সম্রাট নওশেরাঁওয়া ছিলেন সুশাসন ও সুবিচারের ক্ষেত্রে প্রবাদমর্যাদার অধিকারী। তারই শাসনকাল সম্পর্কে 'সাসানী শাসনে ইরান' গ্রন্থের লেখক বলেন- 'সম্রাট নওশেরাঁওয়া রাজ্যের অর্থব্যবস্থায় যে সংস্কার সাধন করেছিলেন তা প্রজাস্বার্থের চেয়ে রাজকোষের স্বার্থই বেশী রক্ষা করেছিলো। ফলে প্রজাসাধারণ আগের মতই অজ্ঞতা ও দারিদ্র্যের অন্ধকারে জীবনধারণ করতো। যেসব বাইজান্টাইন দার্শনিক 'রাজ-আশ্রয়' গ্রহণ করেছিলেন, অচিরেই তারা পারস্যের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। একথা সত্য যে, তারা এমন উচ্চমার্গের দার্শনিক ছিলেন না যে, একটি ভিন্ন জাতির সংস্কৃতি ও রীতি-প্রথা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করতে পারেন; তদুপরি একজন দার্শনিকসম্রাটের রাজত্বে যে সকল কল্যাণচিন্তার প্রত্যাশা ছিলো তা তারা দেখতে পাননি; সর্বোপরি জাতিতত্ত্বের গভীর অধ্যয়নেও তাদের আগ্রহ ছিলো না এবং তাদের মননশীলতাও এমন ছিলো না, যা জাতিতত্ত্বে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তির হয়ে থাকে; এসব কারণে পারস্যের প্রতি তাদের বীতশ্রদ্ধার ভিত্তি ছিলো সাধারণ কতিপয় আচার-প্রথা, যেমন কন্যা-ভগ্নিবিবাহপ্রথা এবং মৃতদেহ উন্মুক্ত ফেলে রাখার সংস্কার। অথচ নিছক এ জাতীয় রীতি-প্রথা তাদের পারস্যবাস অপ্রিয় হওয়ার কারণ হওয়া উচিত ছিলো না। আসল কারণ তো ছিলো উচ্চ-নীচ জাতপ্রথা, সমাজের অনতিক্রম্য শ্রেণী-বৈষম্য, নিদারুণ অভাব ও দুর্দশাগ্রস্ত জীবন, দুর্বলের প্রতি সবলের অবর্ণনীয় যুলুম-নিপীড়ন এবং চরম পাশবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ; এগুলো ছিলো আসল মর্মপীড়ার কারণ, (অথচ এগুলো তাদের নযরেই পড়েনি)।'⁶

এ নাযুক অবস্থা শুধু ইরানেই ছিলো না, বরং তাদের সমসাময়িক ও প্রতিপক্ষ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যেও অমানবিক শ্রেণীব্যবস্থা ও বৈষম্যপ্রথা বিদ্যমান ছিলো। রবার্ট ব্রিফোল্ট লিখেছেন- 'এটাই চিরাচরিত নিয়ম যে, যখন কোন সমাজ-প্রতিষ্ঠান পতনমুখী হয়ে পড়ে তখন সমাজনিয়ন্ত্রকরা আর কোন উপায় খুঁজে পায় না সমাজের গতি ও অগ্রগতি রুদ্ধ করে দেয়া ছাড়া। এ কারণেই দেখা যায়, রোমান সমাজ (তার পতনযুগে) চরম নিপীড়নমূলক শ্রেণীপ্রথার নিগড়ে আবদ্ধ হয়ে ধুকে ধুকে মরছিলো। সমাজের নিম্নশ্রেণীর কারো উপায় ছিলো না পেশা পরিবর্তন করার। সন্তান বাধ্য ছিলো বাবার পেশায় পড়ে থেকে অন্ধকার ভবিষ্যতকেই বরণ করে নিতে।'⁷ উভয় সাম্রাজ্যেই বড় বড় রাজপদ ঐসব বনেদি ঘর ও ঘরানার জন্যই নির্ধারিত ছিলো যাদের প্রভাব ও প্রতাপ ছিলো এবং রাজবংশের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিলো।

পারস্যের কৃষকসমাজ

নিত্যনতুন কর ও খাজনার বোঝা পারস্যের কৃষকসমাজ ও সাধারণ মানুষের কোমর ভেঙ্গে দিয়েছিলো। ফলে বহু কৃষক কৃষিকাজ ছেড়ে ধর্মীয় উপাসনালয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। উদ্দেশ্য ছিলো করভার থেকে এবং বাধ্যতামূলক সেনাভর্তি থেকে আত্মরক্ষা করা। কেননা রাজবংশের প্রতি যেমন তাদের ভালোবাসা ছিলো না, তেমনি যুদ্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতিও কোন আকর্ষণ ছিলো না। ফলে ব্যাপক বেকারত্ব দেখা দিলো এবং অপরাধপ্রবণতা বেড়ে গেলো, আর মানুষ ঝুঁকে পড়লো অসদুপায়ে উপার্জনের বিভিন্ন পথে। পারস্যের কৃষকসমাজ, যারা ছিলো রাজ্যের খাদ্য ও রাজস্বের প্রধান উৎস তাদের দুর্দশা ও করুণ অবস্থা সম্পর্কে 'সাসানী আমলে ইরান' গ্রন্থের লেখক বলেন- 'কৃষকরা ছিলো চরম দুঃখ-দুর্দশায় নিপতিত। তাদের পরিচয় ছিলো, নিজ নিজ ভূমির সঙ্গে বাঁধা ভূমিদাস। তাদের থেকে যখন তখন যে কোন বেগারশ্রম নেয়া হতো। ঐতিহাসিক এ্যাম্মিয়ান মারসেলিনিউস বলেন, 'এই হতভাগ্য কৃষকদের বড় বড় দল (ভারবহন ও অন্যান্য কাজের জন্য) সৈন্যবাহিনীর পিছনে পায়ে হেঁটে চলতো। এ থেকে বাঁচার কোন উপায় ছিলো না। দাসত্বই যেন ছিলো তাদের স্থায়ী নিয়তি ও জীবন-পরিণতি। ন্যূনতম মজুরি বা সামান্য সান্ত্বনা-পুরস্কারও জুটতো না তাদের ভাগ্যে। ভূস্বামীদের সঙ্গে তাদের নিতান্তই দাস-মনিবের সম্পর্ক ছিলো।'⁸

স্বেচ্ছাচার ও যুলুম-অত্যাচার

সিরিয়া ও ইরাকে ইহুদিরা এবং মিসরে ইয়াকূবীরা ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়ন ও যুলুম-অত্যাচারের শিকার ছিলো। রাজকর্মচারী ও শাসকশ্রেণী এমন পাশবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করতো যে, সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছিলো। না জানমালের নিরাপত্তা ছিলো, না ইয্যত-আবরু রক্ষিত ছিলো। চোখ বুজে ঠোঁট কামড়ে সবকিছু সয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের কোন উপায় ছিলো না। ক্ষমতার বাগডোর যাদের হাতে তারা কারো অভিযোগ-ফরিয়াদ কানেই তুলতো না, শুনেও শুনতো না। হতভাগ্য মানুষ শেষে ধরেই নিয়েছিলো, এ অভিশপ্ত জীবনই তাদের নিয়তি, যা থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই। তবে কখনো কখনো কেউ কেউ মৃত্যুযন্ত্রণার মাধ্যমে জীবনযন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণের চেষ্টা করতো।

অসার সভ্যতা ও ভোগবাদী জীবন

রোম ও পারস্য উভয় সাম্রাজ্যেই মানুষ ভোগবিলাসের জীবনে প্রবলভাবে মেতে উঠেছিলো এবং কৃত্রিম জীবন ও নগরসভ্যতার পঙ্কে আকণ্ঠ ডুবে ছিলো। রোমান ও পারসিক রাজপুরুষ ও শাসকশ্রেণী ভোগবিলাসের ঘোরে এমনই বিভোর ছিলো, যেন রাজ্যশাসন ছিলো গৌণ; জীবনকে চুটিয়ে ভোগ করাই ছিলো মুখ্য। তাদের একমাত্র চিন্তা ছিলো চেটেপুটে আনন্দ করা এবং জীবন থেকে স্ফূর্তির রস নিংড়ে বের করা। আয়েশ-অপচয় ছিলো এমনই সীমাহীন যে, কল্পনা করাও সম্ভব নয়। জীবনের আড়ম্বরে, ভোগের উপাদানে এবং বিনোদনের উপায়-উপকরণে ছিলো এমন বৈচিত্র্য, সূক্ষ্মতা ও রসবোধ যার বিবরণ মনে হবে স্বপ্নের মত। তবু কিছুটা শোনা যাক- সম্রাট পারভেজের 'ব্যবহারে' ছিলো বারো হাজার সুন্দরী নারী এবং পঞ্চাশ হাজার সুন্দর ঘোড়া; ছিলো অসংখ্য মনোরম প্রাসাদ। আনন্দ-বিলাসের এমন সব আয়োজন এবং সম্পদপ্রাচুর্যের এমন রকমারি প্রদর্শন ছিলো যে, চিন্তা-বুদ্ধি রীতিমত তাক লেগে যায়। জৌলুসে, জাঁকজমকে ও আলোঝলমলতায় তার খাছ মহল নিজে ছিলো নিজের তুলনা। পার্সিক ধর্মের অনুসারী ঐতিহাসিক শাহীন ম্যাকারিউস বলেন- 'ইতিহাস বলে না যে, পৃথিবীর কোন বাদশাহ বা সম্রাট পারস্যের রাজপুরুষদের মত ভোগবিলাসের দৃষ্টান্ত রাখতে পেরেছেন, যাদের কাছে উপহার উপঢৌকন জড়ো হতো দূর ও নিকটপ্রাচ্যের সকল দেশ থেকে।'⁹

ইসলামী বিজয়াভিযানের মুখে ইরাক থেকে পলায়নকালে তারা বিপুল পরিমাণ বিলাসপোশাক, স্বর্ণপাত্র, প্রসাধনী, সুবাসদ্রব্য এবং বিচিত্র বস্তুসামগ্রী ফেলে গিয়েছিলো, যার অর্থমূল্য পরিমাপ করাও দুঃসাধ্য ছিলো। তাবারীর বর্ণনায়, মাদায়েন বিজয়কালে আরবরা কিছু তুর্কী খিমা পেয়েছিলো যা মুখগালা করা অসংখ্য ঝুড়িতে পূর্ণ ছিলো। আরবরা বলে, 'আমরা ভেবেছিলাম, এগুলোতে খাদ্যসামগ্রী রয়েছে, কিন্তু দেখা গেলো, তা সোনা-রূপার দ্রব্যসামগ্রীতে পূর্ণ!'¹⁰ মাদায়েনদিবসে আরবরা যে আজব গালিচাটি পেয়েছিলো, যার নাম ছিলো 'ফরাস বাহার', যাতে বসে ইরানী রাজপুরুষেরা সুর ও সুরা উপভোগ করতেন তার বর্ণনা দিতে গিয়ে আরব ঐতিহাসিকগণ বলেন- 'একটি মাত্র গালিচার আয়তন ছিলো ষাট বর্গগজ, যা প্রায় এক একর ভূমি জুড়ে বিছানো হতো। যার যমিন ছিলো সোনার তারে বোনা এবং মণিমুক্তাখচিত। পুরো গালিচা ছিলো বাগানসদৃশ, যাতে বৃক্ষ ছিলো স্বর্ণের, পাতা ছিলো সবুজ রেশমের, ফুল ও ফুলের কলি এবং ফল ও ফলের মুকুল ছিলো ছোট বড় হিরা-জহরতের। তাতে বিভিন্ন নহর-নালা ও পায়চারির পথ ফুটিয়ে তোলা হয়েছিলো। আশ্চর্য সব কারুকাজ করে। তার চারপাশে ছিলো বসন্তের সবুজ ফসলভূমি এবং সবজীর বাহার। সবই রচনা করা হয়েছিলো সোনা-রূপা, রেশমসুতা, হিরা-মুক্তা ইত্যাদি দ্বারা। এটা তারা প্রস্তুত করেছিলো শীতকালের জন্য, যখন ফুলের মৌসুম গত হয়ে যেতো। তখন তারা সেই গালিচার উপর সুর ও সুরার আসর জমাতো, আর মনে হতো যেন বসন্ত-উদ্যান!'¹¹ এ থেকেই আন্দায করা যায়, পারস্যসভ্যতা ভোগ-উপভোগ ও বিলাসপ্রাচুর্যের কোন্ চরম সীমায় গিয়ে উপনীত হয়েছিলো। বস্তুত পারস্যের রাজপুরুষদের আনন্দবিনোদনে সম্পদপ্রাচুর্যের এমন কারিশমা ঝলমল করে উঠতো যা প্রবহমান সময় ও কাল কখনো কোথাও দেখেনি।

একই অবস্থা ছিলো রোমান শাসনাধীন সিরিয়া ও তার কেন্দ্রীয় শহরগুলোতে। বলা যায়, ভোগবিলাসে, বিনোদনপ্রাচুর্যে এবং নগরসংস্কৃতির সূক্ষ্মতা ও বৈচিত্র্যে রোমান ও পারসিক সভ্যতা যেন পরস্পরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় ছিলো বিভোর। রোমান রাজপুরুষগণ এবং তাদের সিরীয় রাজন্যবর্গ প্রাণ খুলে ভোগ-উপভোগ ও আনন্দবিনোদনের 'সমঝদারি' করতেন। তাদের আলিশান মহল ও বালাখানা এবং নাচগান ও শরাবের জলসাগুলো ছিলো বিলাস ও প্রাচুর্যের বিচিত্র সব দ্রব্যসামগ্রীতে পরিপূর্ণ। ইতিহাস ও লোকবর্ণনা থেকে জানা যায়, রুচিবোধ, পরিপাটিতা ও বিলাসবৈচিত্র্যে এরা অনেক দূর গিয়েছিলো। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে হযরত হাসসান বিন ছাবিত সিরিয়ার গাস্সানী সরদারদের মজলিসে ওঠাবসা করেছেন। তিনি জাবালা ইবনুল আয়হামের বিনোদনজলসার চিত্র এঁকেছেন এভাবে- 'আমি দশজন গায়িকা দাসী দেখেছি, পাঁচজন ছিলো রোমের, যারা সেতারা বাজিয়ে রোমান গান গায়। অন্য পাঁচজন গায় হিরা অঞ্চলের সুরে। আরব সরদার ইয়াস ইবনে কোবায়সা উপঢৌকনরূপে তাদের পাঠিয়েছিলো। এছাড়া মক্কা ও অন্যান্য অঞ্চল থেকেও গায়ক-গায়িকার দল তার কাছে আসতো। যখন শরাবের মজলিসে জাবালার ফরাসের উপর জুই-চামেলী ও অন্যান্য ফুল বিছিয়ে দেয়া হতো এবং সোনা-রূপার পাত্রে মিশক-আম্বর পরিবেশন করা হতো। শীতকালে হলে উদ ও চন্দনকাঠ জ্বালানো হতো, আর গরমকালে বরফ ছড়িয়ে দেয়া হতো। গরমের সময় তার ও তার পানসঙ্গীদের জন্য বিশেষ ঠাণ্ডা পোশাকের ব্যবস্থা করা হতো; পক্ষান্তরে শীতকালে পশমী পোশাক এবং চর্মবস্ত্রাদির ব্যবস্থা করা হতো।'¹²

দেশের অভিজাত ও বিত্তশালী শ্রেণী, এমনকি মধ্যবিত্তরাও পানাহার, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং জীবনযাপনের সর্বক্ষেত্রে রাজপুরুষদের অনুকরণের চেষ্টায় মেতে উঠেছিলো। জীবনযাত্রা হয়ে পড়েছিলো অতি ব্যয়বহুল এবং সমাজযাত্রা অত্যন্ত জটিল। একজন মানুষ শুধু নিজের উপর, শুধু নিজের পোশাকপরিচ্ছদের উপর, এমনকি পোশাকের একেকটি অংশের উপর এত বিপুল অপচয় করতো যা গোটা জনপদের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থানের জন্য যথেষ্ট হতে পারতো। কিন্তু যে কোন ভদ্র ও অভিজাত ব্যক্তি এ অপচয় বা অপব্যয় করতে বাধ্য ছিলো। কেননা এ বিষয়ে সামান্য শিথিলতা করার অর্থই ছিলো সমাজের চোখে নিজেকে হেয় করা এবং লোকনিন্দার শিকার হওয়া। মোটকথা, এটা হয়ে পড়েছিলো জীবনের অপরিহার্য প্রয়োজন এবং সমাজের অপরিবর্তনীয় বিধান। শা'বী বলেন, পারস্যের অভিজাত লোকেরা নিজ নিজ সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী মস্তকাবরণ গ্রহণ করতো। যে ব্যক্তি পূর্ণ অভিজাত্য অর্জন করেছে তার মস্তকাবরণের মূল্য একলাখ দিরহাম। হুরমুয ছিলেন পূর্ণ আভিজাত শ্রেণীর, তাই তার মস্তকাবরণের মূল্য ছিলো একলাখ এবং তা মুক্তো-খচিত ছিলো। পূর্ণ আভিজাত্যের অর্থ ছিলো ইরানের সপ্তঅভিজাত পরিবারের কোন একটির সদস্য হওয়া। কিসরার শাসনামলে হিরা অঞ্চলের শাসক আযাদিয়া ছিলেন অর্ধআভিজাত্যের অধিকারী, তাই তার মস্তকাবরণের মূল্য ছিলো পঞ্চাশ হাজার দিরহাম। (মুসলিম বিজয়াভিযানের পর) রুস্তমের মস্তকাবরণ সত্তর হাজার দিরহামে বিক্রি হয়েছিলো, যার প্রকৃত মূল্য ছিলো একলাখ।¹³

এই বিলাস-সভ্যতা ও তার পচনধরা রীতি-প্রথা মানুষের অস্থিমজ্জায় এমনই মিশে গিয়েছিলো যে, তা থেকে বেরিয়ে আসা তাদের জন্য একরকম অসম্ভব হয়ে পড়েছিলো। এমনকি কঠিন থেকে কঠিন বিপদ ও দুর্যোগের সময়ও তাদের পক্ষে সহজ-সরল জীবনের স্তরে নেমে আসা সম্ভব হতো না। একটিমাত্র উদাহরণ দেখুন, মুসলিম বাহিনীর হাতে মাদায়েনের পতন হলো এবং পারস্যের হতভাগ্য শেষ সম্রাট ইয়াযদাজারদকে মাদায়েন থেকে পালাতে হলো, তখন তার কী নাযুক অবস্থা ছিলো! তবু তিনি সঙ্গে নিয়েছেন একহাজার পাচক, একহাজার গায়ক, একহাজার ব্যঘ্রপালক এবং একহাজার ইত্যাদি ইত্যাদি! তবু তার মনে হয়েছে, তাড়াহুড়ায় আয়োজনটা কম হয়েছে।¹⁴ আহওয়াযের প্রশাসক হরমুযানকে যখন বন্দী অবস্থায় মদীনায় হযরত ওমর (রা)-এর সামনে হাযির করা হলো তখন তার খুব পানির পিপাসা। একটি সাধারণ পেয়ালায় পানি দেয়া হলো (সম্ভবত খলীফাতুল মুসলিমীনের 'পানিপাত্র')। বেচারা তখন বলে, পিপাসায় মরে গেলেও এমন পেয়ালায় পানি পান করতে পারবো না। শেষে অনেক তালাশ করে তার পছন্দমত পেয়ালা আনা হলো।¹⁵ এ দু'টো ঘটনা থেকেই অনুমান করুন, ইরানীদের স্বভাব ও জীবনাচার কেমন নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো; আড়ম্বর ও লৌকিকতায় তারা কেমন 'কাবু' হয়ে পড়েছিলো এবং সহজ-সরল জীবনযাত্রা থেকে কতটা দূরে সরে গিয়েছিলো।

অর্থশোষণ ও করভার

এই সীমাহীন ভোগবিলাস এবং অপচয়পূর্ণ জীবনের অনিবার্য ফল এই ছিলো যে, সাধারণ মানুষের উপর 'কোমরভাঙ্গা' করের বোঝা চাপানো হলো। তাতেও যখন কুলায় না তখন কৃষি, ব্যবসা ও অন্যান্য পেশার লোকদের ধনসম্পদ লুণ্ঠনের জন্য নতুন নতুন করবিধান প্রবর্তন করা হলো, এমনকি তা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেলো এবং মানুষের জীবন শাব্দিক অর্থেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো। 'সাসানী আমলে ইরান' গ্রন্থের লেখক বলেন- নিয়মিত কর ও খাজনা ছাড়াও ইরানী শাসকেরা বিভিন্ন উপলক্ষে প্রজাসাধারণের কাছ থেকে রাজদর্শনী বা রাজউপঢৌকন প্রথার প্রচলন করেছিলেন, যার সরকারী নাম ছিলো 'আইন'। নওরোয বা নববর্ষ এবং মেহেরগান বা জাতীয় উৎসবে বাধ্যতামূলক রাজউপঢৌকন গ্রহণ করা হতো। এছাড়া আরমেনিয়ার স্বর্ণখনি-গুলো গণ্য করা হতো সম্রাটের ব্যক্তিসম্পদ, যা থেকে তিনি ব্যক্তিগত ব্যয় নির্বাহ করবেন।¹⁶

রোমান সাম্রাজ্যের শাসননীতি ও আয়-ব্যয় সম্পর্কে এক আরব সিরীয় ঐতিহাসিক লিখেছেন- 'সিরীয়দের জন্য বাধ্যতামূলক ছিলো যে, তারা নিয়মিত খাজনা ও রাজস্ব আদায় করবে এবং যাবতীয় আয় ও উৎপন্ন ফসলের একদশমাংশ এবং মূলধনের উপর ধার্যকৃত কর পরিশোধ করবে। মাথাপিছু একটি পরিমাণ নির্ধারিত ছিলো যা আদায় করা ছিলো বাধ্যতামূলক। রোমান সাম্রাজ্যের সম্পদ আহরণের আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাত ছিলো, যেমন, নগরশুল্ক, বাণিজ্যশুল্ক, বিভিন্ন খনি ও অন্যান্য রাজস্ব। তাছাড়া গমচাষের উপযোগী জমি ও চারণভূমি ইজারায় দিয়ে দেয়া হতো। এই ঠিকাদারদের বলা হতো আশারীন। এরা সরকারের কাছ থেকে টোল-অধিকার ক্রয় করে নিতো। প্রতিটি প্রদেশে আশারীনদের যৌথপ্রতিষ্ঠান ছিলো এবং সেখানে মুন্সী ও তহশীলদার নিযুক্ত ছিলো, প্রজাসাধারণের সঙ্গে যাদের আচরণ ছিলো প্রভুসুলভ। তারা নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশী কর উশুল করতো এবং মানুষকে আরাম আয়েশের সব উপায়-উপকরণ থেকে বঞ্চিত রাখতো; এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ক্রীতদাসের মত বিক্রি করে দিতো।'¹⁷

জনৈক ঐতিহাসিক রোমানসাম্রাজ্যের শাসননীতির চিত্র সুসংক্ষেপে তুলে ধরেছেন এভাবে- 'আদর্শ রাখাল সে-ই যে ভেড়ার লোম কাটে, কিন্তু উপড়ে ফেলে না। তো দুই শতাব্দী ধরে রোমান সম্রাটগণ তাদের প্রজাবর্গের শুধু লোম কাটছেন, (তবে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করছেন না।) অর্থাৎ তিনি তাদের বিপুল সম্পদ হরণ করছেন, তবে বহিঃশত্রু থেকে তাদের রক্ষাও করছেন।'

প্রজাসাধারণের দুর্ভোগ-দুর্দশা

এভাবে উভয় সাম্রাজ্যে সম্পূর্ণ পৃথক দুটি শ্রেণী সৃষ্টি হয়েছিলো। প্রথমটি হলো রাজা ও রাজবংশ এবং রাজ-অনুগ্রহধন্য অভিজাত ও বিত্তশালী পরিবার। তারা সোনার পেয়ালায় আহার করতো, ফুলের বিছানায় ঘুমোতো, গোলাব ও দুধের নহরে গোসল করতো এবং সর্বপ্রকার ভোগবিলাসে গা ভাসিয়ে দিতো। তাদের ঘোড়ার নাল হতো মূল্যবান পাথরের এবং ঘরের দেয়াল সাজানো হতো রেশমি কাপড়ে। দ্বিতীয় শ্রেণীতে ছিলো কৃষিজীবী, বিভিন্ন পেশাজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং খেটে খাওয়ার লোকেরা, যাদের জীবন ছিলো আগাগোড়া দুঃখ-কষ্টের ও বিপদ- দুর্যোগের। কর-খাজনার ভারে তারা এমনই ভারাক্রান্ত ছিলো যে, জীবন তাদের কাছে সত্যি দুর্বিসহ হয়ে পড়েছিলো। এককথায় অর্থনৈতিক শোষণের জালে তারা এমনই আবদ্ধ ছিলো যে, যতই ছিন্ন করার চেষ্টা করতো সেই জাল যেন তাদের আরো অষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতো। শাব্দিক অর্থেই তাদের জীবন ছিলো পশুর জীবন। এই যে, অন্যের ভোগবিলাসের জন্য কাজ করে যাওয়া, আর বেঁচে থাকার জন্য কিছু দানা-পানি মুখে দেয়া, জীবনের কাছে এই যেন ছিলো শুধু তাদের পাওয়া। এ ছাড়া অন্য কোন চিন্তার সুযোগ তাদের ছিলো না। কখনো যদি এই অভিশপ্ত জীবন অসহ্য হয়ে উঠতো তখন তারা নেশা-বিনোদনে ও নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয়ে পড়তো। এ দুর্বিষহ জীবনের উপর আরো বিপদ এই ছিলো যে, তারা অভিজাত শ্রেণী জীবনপদ্ধতির অনেক কিছু অনুসরণের প্রাণান্ত চেষ্টা করতো। জীবনধারণের মেহনতে তাদের যত না কষ্ট হতো তার চেয়ে বেশী কষ্ট হতো উচ্চ শ্রেণীর অনুকরণের কসরতে। ফল হতো আরো দুর্ভোগ, আরো দুর্দশা এবং আরো দুশ্চিন্তা। সুখ-শান্তি তো দূরের কথা, সামান্য স্বস্তিও তাদের জীবনে জুটতো না কখনো।

সম্পদস্ফীতি ও চরম দারিদ্র্য

মোটকথা, তদানীন্তন সভ্য পৃথিবীর জীবনযাত্রা দুই চরম প্রান্তিকতার মাঝখানে বিপর্যস্ত ছিলো। একদিকে ছিলো অফুরন্ত সম্পদ এবং সম্পদের লাগামহীন স্বেচ্ছাচার, অন্যদিকে ছিলো অভাব ও দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাত। এ দুই জীবনযাত্রার টানা-পড়েনের মধ্যে নবুয়তের দাওয়াত ও তালীম এবং মহৎ চরিত্র ও উন্নত নীতি-নৈতিকতা যেন পথ হারিয়ে ফেলেছিলো। যারা সম্পদের প্রাচুর্যে ডুবে ছিলো তাদের জীবন ছিলো এমনই ভোগবিলাস ও ফুর্তি-উচ্ছ্বাসের জীবন যে, দ্বীন-আখেরাত এবং মৃত্যু ও পরকালচিন্তার তাতে কোন অবকাশই ছিলো না। অন্যদিকে অভাব ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের জীবন ছিলো রুটি-রোজির দৌড়ঝাঁপে এমনই ব্যতিব্যস্ত যে, অন্নচিন্তা ছাড়া অন্য কোন চিন্তার সেখানে কোন উপায় ছিলো না। বিত্তশালীরা মেতে ছিলো সম্পদের জৌলুসে এবং ভোগ-উপভোগের উল্লাসে, পক্ষান্তরে মেহনতি মানুষের দল পর্যুদস্ত ছিলো অভাবের তাড়নায় এবং ক্ষুধার যন্ত্রণায়। এভাবে জাগতিক জীবন ও তার বহুমুখী চাহিদার জাল ধনী-গরীব সবাইকে এমনভাবে জড়িয়ে রেখেছিলো যে, কলব ও রূহ এবং হৃদয় ও আত্মার বিষয়ে সামান্যতম চিন্তা করারও কোন অবকাশ ছিলো না।

হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী (রহ) হলেন শেষ যুগে ইসলামী উম্মাহর শ্রেষ্ঠ তাত্ত্বিক ও দার্শনিক। তিনি তাঁর মহামূল্যবান কিতাব হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগায় ইসলামপূর্বযুগের সভ্য পৃথিবীর এই সুরতেহালের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছেন অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে। তিনি বলেন- 'বহু শতাব্দী ধরে রাজ্য শাসন করে এবং ভোগবিলাস ও প্রবৃত্তিপূজায় ডুবে থেকে রোম ও পারস্যের মানুষ আল্লাহ ও আখেরাত একেবারেই ভুলে গিয়েছিলো। আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসের উপায়-উপকরণের ক্ষেত্রে তাদের যেমন অসম্ভব সৌখিনতা ছিলো তেমন ছিলো সুতীব্র সামাজিক প্রতিযোগিতা। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বড় বড় জ্ঞানী, গুণী ও কলাকুশলীরা সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলগুলোতে এসে জড়ো হয়েছিলো, যারা জীবনের ভোগ-উপভোগের নিত্যনতুন সামগ্রী এবং আয়েশ-বিলাসের চমকপ্রদ কলাকৌশল উদ্ভাবনে তাদের সবটুকু মেধা ও প্রতিভা নিয়োজিত রেখেছিলো। সমাজের অভিজাত শ্রেণী সেগুলো তখনই লুফে নিতো এবং একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো। এগুলোই ছিলো তাদের নিজেদের মধ্যে গর্ব ও গৌরবের বিষয়। অবস্থা এমন হয়েছিলো যে, লাখ দিরহামের নীচে কোন রাজকর্মচারীর কোমরবন্ধ বা মুকুট ব্যবহার করা ছিলো রীতিমত লজ্জার বিষয়। আলিশান বালাখানা, বাগবাগিচা, উৎকৃষ্ট সওয়ারি এবং সুদর্শন দাসদাসী ছাড়া সামাজিক মর্যাদা লাভের কোন উপায় ছিলো না। আভিজাত্য বিচার করা হতো বেশভূষা ও আহার-বিহারের জৌলুস দ্বারা। আমি আর কত বলবো, নিজ দেশের রাজাবাদশাহদের যে অবস্থা দেখছো তা থেকেই অনুমান করতে পারো। এসকল আড়ম্বর ও জাঁকজমক তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছিলো এবং তাদের মনমগজে এমনভাবে মিশে গিয়েছিলো যে, তা থেকে মুক্ত হওয়া কোনভাবেই সম্ভব ছিলো না। সর্বোপরি এর ফলে শহরজীবনে এবং সমগ্র সমাজ-সভ্যতায় বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছিলো। এ ছিলো এমন এক সর্বগ্রাসী বিপদ যা থেকে ধনী-গরীব, আম-খাছ, আশরাফ-আতরাফ, এককথায় সমাজের কোন স্তরই মুক্ত ছিলো না। আড়ম্বরপূর্ণ জীবনের মোহ সবাইকে এমন পেয়ে বসেছিলো যে, শান্তি, স্বস্তি ও স্থিতির পরিবর্তের দুঃখ-দুর্দশা এবং হতাশা ও যন্ত্রণাই হয়ে পড়েছিলো তাদের অবধারিত পরিণতি। কারণ অঢেল সম্পদ ছাড়া বিলাসী জীবন সম্ভব ছিলো না, আর অঢেল সম্পদ অর্জন করা সম্ভব ছিলো না লাগামহীন শোষণ ছাড়া এবং কৃষক, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য পেশার লোকদের উপর নিপীড়নমূলক করের বোঝা চাপানো ছাড়া। এই শাসন-শোষণে যদি তারা অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা করতো তাহলে তাদের উপর নেমে আসতো পাশবিক নির্যাতন, আর যদি নির্বিবাদে মেনে নিতো তাহলে তারা হতো হালের বলদ, যাদের বাঁচিয়ে রাখা হতো শুধু কাজ নেয়ার জন্য। আর দিনরাত পশুর মত খেটে যাওয়াই ছিলো তাদের কাজ। ফলে আত্মিক উন্নতি ও পরকালীন সৌভাগ্যের বিষয়ে চিন্তা করারও সুযোগ ছিলো না তাদের এই অভিশপ্ত জীবনে। হয়ত গোটা দেশে এবং সমগ্র প্রদেশে এমন একজনও পাওয়া যেতো না, ধর্ম সম্পর্কে যার কোন চিন্তা ভাবনা রয়েছে।'¹⁸

সর্বনাশা এক অন্ধকার

মোটকথা এই সপ্তম খৃস্টাব্দে পৃথিবীর কোথাও এমন কোন জাতি ও জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিলো না, স্বভাব ও প্রকৃতির দিক থেকে যাদের সৎ ও যোগ্য বলা যেতে পারে। এমন কোন সমাজ ও জীবনধারাও ছিলো না, যা নীতি ও নৈতিকতার উচ্চ মূল্যবোধ ধারণ করতে পারে। এমন কোন শাসক ও শাসনব্যবস্থাও ছিলো না, যার ভিত্তি হবে ন্যায় ও সুবিচার, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এবং দয়া-মায়া ও মানব-দরদ। ছিলো না এমন কোন দ্বীন ও শরীয়াত, নবুয়তের সঙ্গে যার আছে সঠিক সম্পর্ক এবং যা নবিদের শিক্ষাদীক্ষা, আদর্শ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। চারদিকে ছিলো শুধু ঘোর অন্ধকার। এই সর্বগ্রাসী অন্ধকারের মাঝে এখানে সেখানে দু'চারটি খানকা ও উপাসনাগৃহে সামান্য কিছু আলো যদিও বা দেখা যেতো, সেটা অন্ধকার রাতে জোনাকির 'আলো-কণিকার' ক্ষণিক নেভা-জ্বলার চেয়ে বেশী কিছু ছিলো না। ছহীহ ইলম ও আমল এবং বিশুদ্ধ জ্ঞান ও কর্ম ছিলো এত দুর্লভ এবং আল্লাহপ্রেমিক ও সত্যপথের পথিক যারা তাদের অস্তিত্ব ছিলো এতই বিরল যে, পারস্যের সাহসী যুবক সালমান ফারসী, যিনি স্বজাতির অগ্নিপূজার ধর্মের প্রতি আস্থা হারিয়ে সত্যধর্মের সন্ধান লাভের জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, তিনি ইরান থেকে শামের শেষ সীমা পর্যন্ত সুদীর্ঘ সফরকালে মাত্র চারজন এমন ব্যক্তির সন্ধান পেয়েছিলেন যারা নবী-রাসূলদের রেখে যাওয়া পথের উপর অবিচল ছিলেন এবং যাদের দ্বারা তাঁর বেচায়ন কলব ও রূহ কিছুটা সুকুন ও ইতমিনান লাভ করেছিলো এবং তাঁর অস্থির হৃদয় ও আত্মা কিছুটা শান্ত ও তৃপ্ত হয়েছিলো। এই সর্বগ্রাসী অন্ধকার ও নৈরাজ্যের যে নিখুঁত চিত্র আলকোরআন আমাদের সামনে তুলে ধরেছে তার চেয়ে উত্তম কিছু আর হতে পারে না। দেখুন কোরআনের ভাষায়-
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِى النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِى عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُو نَ
'জলে-স্থলে (সর্বত্র) ফাসাদ (ও বিপর্যয়) ছড়িয়ে পড়েছে মানুষেরই কৃতকর্মের কারণে, যেন আল্লাহ চাখিয়ে দেন তাদেরকে তাদের কিছু কর্মের ফল, আর তারা (তাদের মন্দ কর্ম থেকে) ফিরে আসে। (রূম, ৩০ : ৪১)

টিকাঃ
১. জেমস কারকর্ন-রচিত, চীনের ইতিহাস।
২. robert briffault: the making of hummanity. p. 159
৩. arab's conquest of egipt and the last thirty years of the roman dominion
৪. خطط الشام للأستاذ محمد کرد علي .২. ৩. ص305-300
৫. a.l. christensen: l'iran sous les sassanides উর্দু অনুবাদ মুহম্মদ ইকবাল, পৃ.১৬৩
৬. সাসানী শাসনে ইরান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে দেখুন 'ইরান বা-আহদে সাসান (উর্দু অনুবাদ) মূল লেখক a.l. christensen মূল গ্রন্থের নাম, l'iran sous les sassanides
৭. robert briffault: the making of hummanity. p. 160
৮. সাসানী আমলে ইরান, আর্থার কৃস্টিন রচিত (উর্দুতে অনূদিত, পৃ. ১৬১)
৯. (لشاهين مكاريوس) طבע مصر تاريخ ايران ১৮৯৮ সনে প্রকাশিত, পৃ. ৯০ এবং ২১১
১০. 'তারীখে তাবারী ৪র্থ খণ্ড
১১. 'তারীখে ইসলাম, মওলভী আব্দুল হালীম শরর, খ. ১ পৃ. ৩৫৪ (তাবারী ও অন্যান্য সূত্র থেকে)
১২. أغاني لأبي الفرج الأصفهان المجلد الأول الصفحة الثار ১১এবং তারীখে তাবারী, খ. ৪ পৃ. ১৭৮
১৩. ৪ تاريخ العلم في ৬, ১১. ১৩৪
১৪. সাসানী শাসনে ইরান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে দেখুন 'ইরান বা-আহদে সাসান (উর্দু অনুবাদ) মূল লেখক a.l. christensen মূল গ্রন্থের নাম, l'iran sous les sassanides
১৫. ৪ تاريخ الطبري
১৬. সাসানী আমলে ইরান, আর্থার কৃস্টিন রচিত (উর্দুতে অনূদিত, পৃ. ১৬১)
১৭. خطط الشام للأستاذ محمد كرد علي .4 ص 89 .
১৮. حجة الله البالغة، باب إقامة الاتفاقات وإصلاح الرسوم (طבע دار الكتب العلمية، بيروت، عام أحد وعشرين وأربع مائة بعد الألف من الفجرة النبوية খ.১ পৃ. ১৯৭-৯৮)

ফন্ট সাইজ
15px
17px