📄 ভূমিকা (সাইয়েদ কুতুব)
মুসলিম উম্মাহর আজ এমন যোগ্য মানুষের কত না প্রয়োজন, যিনি গৌরবময় অতীতের প্রতি তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনবেন এবং সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত সম্পর্কে তাদের উজ্জীবিত করে তোলবেন। (অবিচল বিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় নিয়ে উম্মাহকে যিনি বলতে পারবেন, তোমাদের সুন্দর অতীত ছিলো এবং তোমাদের সুন্দর ভবিষ্যত রয়েছে।)
এমন মানুষের আজ সত্যি বড় প্রয়োজন, যিনি দ্বীনের প্রতি তাদের ঈমান ও বিশ্বাসকে নতুন শক্তি ও সজীবতা দান করবেন, যারা দ্বীনের নাম তো ধারণ করে, কিন্তু হাকীকত ও মর্ম অনুধাবন করে না, যারা নিছক রক্ত-সূত্রে 'মুসলিম' পরিচয় তো বহন করে, কিন্তু পরিচয়-মর্যাদা উপলব্ধি করে না। ماذا خسر العالم কিতাবটি উম্মাহর সে প্রয়োজন পূরণেরই একটি সার্থক প্রচেষ্টা। এ বিষয়ে আধুনিক ও প্রাচীন যা কিছু আমি পড়েছি তার মধ্যে নিঃসন্দেহে এটি অন্যতম সেরা গ্রন্থ। (ইসলামে দুর্বলতা ও হীনমন্যতার কোন অবকাশ নেই) ইসলাম হচ্ছে শ্রেষ্ঠত্ব-বোধের আকীদা, বিশ্বাস ও প্রত্যয়, যার বড় বৈশিষ্ট্য এই যে, মুমিনের অন্তরে তা মর্যাদাবোধ সঞ্চারিত করে, তবে অহঙ্কার ছাড়া এবং আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে, তবে আত্মপ্রতারণা ছাড়া এবং স্বস্তির অনুভূতি জাগ্রত করে, তবে দায়িত্বহীনতার মানসিকতা ছাড়া। এ বিশ্বাস তাদের মধ্যে এ চেতনা সৃষ্টি করে যে, তাদের কাঁধে অর্পিত হয়েছে বিশ্বমানবতার দায়িত্বভার; পূর্ব-পশ্চিম, পৃথিবীর সব জনপদের সমগ্র মানব সম্প্রদায়ের অভিভাবকের দায়িত্বভার। উম্মাহ হিসাবে তাদের কর্তব্য হলো পথহারা মানব-কাফেলাকে সিরাতুল মুস্তাকীমের দিকে পথপ্রদর্শন করা এবং 'সর্ব-অন্ধকার' থেকে উদ্ধার করে সেই আলো ও নূরের দিকে নিয়ে আসা, যা আল্লাহ তাদের দান করেছেন হিদায়াতের কিতাব আল কোরআনরূপে-
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত যাদের উত্থিত করা হয়েছে মানুষের (কল্যাণের) জন্য। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করো এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করো, আর আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখো। (আলে ইমরান, ৩: ১১০)
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّসُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا
আর এভাবেই আমি তোমাদের বানিয়েছি এক মধ্যপন্থী সম্প্রদায়, যাতে তোমরা সাক্ষী থাকো লোকেদের উপর, আর রাসূল সাক্ষী থাকেন তোমাদের উপর। (বাকারাহ, ২: ১৪৩)
আমার সামনে এই যে কিতাবটি, পাঠকের অন্তরে তা এ সকল অনুভব অনুভূতিই জাগিয়ে তোলে এবং এ সকল চিন্তা-চেতনাই প্রবাহিত করে। তবে কিতাবের বর্ণনাশৈলী ও উপস্থাপন-পদ্ধতি এমন নয় যে, শুধু ভাবাবেগ উসকে দিলো, কিংবা ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করলো; বরং প্রতিটি বক্তব্যের স্বপক্ষে তিনি বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণ ব্যবহার করেছেন, যা যুগপৎ চিন্তা, বুদ্ধিবৃত্তি ও আবেগ-অনুভূতিকে সম্বোধন করে। সমস্ত ঐতিহাসিক ঘটনা এবং সে যুগের পরিবেশ-পরিস্থিতি তিনি অত্যন্ত ন্যায়ানুগ ও যুক্তিনিষ্ঠরূপে উপস্থাপন করেছেন। তদুপরি যে বিষয়ই আলোচনায় এসেছে সেক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার সত্য ও বাস্তবতা এবং যুক্তি ও বিবেকের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, যার ফলে সমস্ত আলোচনা-পর্যালোচনা, যুক্তি ও তথ্যপ্রমাণ যেন সারিবদ্ধ ও সুশৃঙ্খলভাবে তাঁর দাবীর অনুকূলে এসে দাঁড়িয়েছে। কোন ক্ষেত্রেই যুক্তি-প্রয়োগ ও সিদ্ধান্ত আহরণের ক্ষেত্রে অজ্ঞতা ও কৃত্রিমতার সামান্যতম ছাপও পড়েনি। আমার দৃষ্টিতে এটাই হচ্ছে এ কিতাবের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ইসলামের আলো উদিত হওয়ার পূর্বে পৃথিবীর কী অবস্থা ছিলো? পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ, প্রতিটি জনপদে কী পরিবেশ-পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিলো? চীন, আরব ও হিন্দুস্তান থেকে শুরু করে রোম ও পারস্য পর্যন্ত বিস্তৃত সমকালীন পৃথিবীর চিন্তানৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক রূপ ও প্রকৃতি কেমন ছিলো? তখন সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ঝোঁক ও প্রবণতা এবং অভিমুখ ও গতিধারা কোন দিকে ছিলো? যে সমস্ত সম্প্রদায়ের উপর আসমানি ধর্মের ছায়া ছিলো, যেমন ইহুদি-ধর্ম ও খৃস্ট-ধর্ম, কিংবা যারা মুর্তিপূজা-ধর্মের অনুসারী ছিলো, যেমন হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম ও জরথোস্ট্রীয় ধর্ম, তাদের জীবন ও নীতি-নৈতিকতার কী অবস্থা ছিলো? কিতাবের প্রারম্ভ-অংশে এসব প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত, তবে স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বস্তুত এটি অতি সর্বাঙ্গিণ ও সুসম্পূর্ণ একটি 'জীবনচিত্র' যা মানবভূখণ্ডের সঠিক রেখা ও রূপরেখা ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু এ বিষয়ে লেখক এখানে কোন প্রকার হঠকারিতা প্রকাশ করেননি বা পূর্ব-নির্ধারিত কোন সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছাচারিতার সঙ্গে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেননি, বরং সম্পূর্ণ পর্যালোচনায় আধুনিক ও প্রাচীন অমুসলিম লেখক, গবেষক ও ঐতিহাসিকদেরও শরীক রেখেছেন। অথচ এটাই খুব স্বাভাবিক যে, ইসলামের বিষয়ে তারা উদ্দেশ্য-তাড়িত হবে এবং মুসলিম উম্মাহর অতীতের নেতৃত্বকালকে কলঙ্কিত করার কিছু না কিছু চেষ্টা করবে। বলাবাহুল্য, সে চেষ্টা তারা করেছেও যথেষ্ট। লেখক ঐ সময়ের পৃথিবীর চিত্র উপস্থাপন করেছেন যখন জাহেলিয়াতের চিন্তা চেতনারই একক আধিপত্য ছিলো। বিবেক-বুদ্ধি, হৃদয় ও আত্মা, এককথায় সর্ব-মানবসত্তায় পচন ধরে গিয়েছিলো। সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় সবকিছুর মাপকাঠি এবং যাবতীয় মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। মানুষ ছিলো দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দী এবং যুলুম-অনাচার ও শোষণ-নিপীড়নের অসহায় শিকার। মানবতার বুনিয়াদ ধ্বসে পড়েছিলো, একদিকে পাপাচারপূর্ণ বিলাস-প্রাচুর্য, অন্যদিকে সীমাহীন বঞ্চনা ও দুর্দশার কারণে। তদুপরি সমগ্র মানব-জাতির উপর কুফুর ও গোমরাহীর অন্ধকার ছেয়ে গিয়েছিলো। যদিও তখনো আসমানি ধর্ম ছিলো, কিন্তু তা বিকৃতির শিকার হয়ে পড়েছিলো এবং তাতে ঘুণ ধরে গিয়েছিলো। মানুষের চিন্তা-চেতনা ও জীবনাচরণের উপর তার কোন নিয়ন্ত্রণ ছিলো না। ধর্মগুলোর বাহ্যিক কাঠামোই শুধু রয়ে গিয়েছিলো, যাতে না ছিলো রূহ, না ছিলো প্রাণ। বিশেষ করে খৃস্টধর্মের অবস্থা ছিলো আরো শোচনীয়, যার নিখুঁত চিত্র এঁকেছেন জি, এইচ, ডেন্সন তার emotions as the basis of civilization গ্রন্থে। তিনি বলেন, 'পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে সভ্য পৃথিবী নৈরাজ্যের ধ্বংস-গহ্বরের মুখে দাঁড়িয়েছিলো। কেননা যে সকল ধর্মবিশ্বাস সভ্যতার বিনির্মাণে সহায়ক হয় সেগুলোই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। সেখানে উল্লেখযোগ্য এমন কিছু ছিলো না, যা সেগুলোর স্থান গ্রহণ করতে পারে। তখন মনে হচ্ছিলো, যে সভ্যতা গড়ে তুলতে চারহাজার বছরের প্রয়াস-প্রচেষ্টা ব্যয় হয়েছিলো তা ছিন্নভিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং মানবজাতি আবার অসভ্যতা ও বর্বরতার পূর্ববর্তী স্থানে ফিরে যাচ্ছে। কেননা গোত্র ও সম্প্রদায়গুলো পরস্পর সঙ্ঘাত-সঙ্ঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো। আইন-শৃঙ্খলা বলতে কিছু ছিলো না। পক্ষান্তরে খৃস্টধর্ম যেসব ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলো তা ঐক্য ও শৃঙ্খলার পরিবর্তে বিভেদ ও বিপর্যয় সৃষ্টির পক্ষেই কাজ করছিলো। সভ্যতা যেন ছিলো ডালপালা ছড়ানো এক বিরাট বৃক্ষ, যার ছায়া সারা বিশ্বে বিস্তৃত ছিলো, তবে তা দাঁড়িয়ে থাকলেও পতনোন্মুখ অবস্থায় ছিলো এবং বিনষ্টি তার মর্মমূলে পৌঁছে গিয়েছিলো। এই ব্যাপক ফাসাদ ও বিপর্যয়ের মধ্যেই সেই মানুষটি জন্মগ্রহণ করলেন যিনি সমগ্র বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।'¹
জাহেলিয়াতের অন্ধকারে আচ্ছন্ন পৃথিবীর চিত্র উপস্থাপনের পর লেখক মানব- জাতির জীবনে ইসলামের ভূমিকা ও অবদানের আলোচনা শুরু করেছেন এবং দেখিয়েছেন, কীভাবে ইসলাম মানবজাতিকে যাবতীয় কুসংস্কার থেকে মুক্তি দান করেছে এবং দাসত্বের লাঞ্ছনা থেকে উদ্ধার করেছে; কীভাবে হৃদয় ও আত্মাকে সব ব্যাধি ও অবক্ষয় এবং কদর্যতা ও পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করেছে। সর্বোপরি মানবসমাজকে যুলুম, শোষণ, নিপীড়ন, শ্রেণীবৈষম্য ও শাসকদের স্বেচ্ছাচার থেকে এবং পুরোহীতদের ধর্মীয় স্বৈরাচার থেকে রক্ষা করেছে। ইসলাম আত্মিক পবিত্রতা, নৈতিক শুচিতা, ইতিবাচক ব্যক্তিত্বগঠন, স্বাধীনতা ও নবশক্তির উত্থানের মযবুত বুনিয়াদের উপর এবং বিশ্বাস, আস্থাবোধ, পরিজ্ঞান, সুবিচার ও আত্মমর্যাদার সুদৃঢ় ভিত্তির উপর পৃথিবীর নতুন পরিচয় সৃষ্টি করেছে। জীবনকে উন্নতি ও অগ্রগতির পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য অব্যাহত কর্মপ্রচেষ্টা ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনার উপর উদ্বুদ্ধ করেছে। জীবনের অঙ্গনে প্রত্যেককে তার প্রাপ্য স্থান ও যথাযথ অধিকার দান করেছে।
এসব অবিস্মরণীয় কীর্তি ও কর্ম ইসলাম সম্পন্ন করেছে যখন এবং যেখানে নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও কার্যক্ষমতা ছিলো ইসলামের হাতে। আর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের আসন থেকেই শুধু ইসলাম তার যোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ স্বভাবগতভাবেই ইসলাম শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাস পোষণ করে এবং নেতৃত্বের সুনির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা ধারণ করে। সৃজনশীলতা ও স্বকীয়তাই হচ্ছে ইসলামের প্রকৃতি; অধীনতা ও অনুসরণ নয়। এর পর এলো সেই সময় যখন মুসলিম জাতি অবক্ষয় ও অধঃপতনের শিকার হলো এবং বিশ্বনেতৃত্বের যে দায়িত্ব ইসলাম তাদের উপর অর্পণ করেছিলো তা থেকে তারা সরে গেলো; এমনকি মানবতার অভিভাবকত্ব এবং ঐসব দায়-দায়িত্ব থেকেও তারা হাত গুটিয়ে নিলো, জীবনের প্রতিটি গতিপথে যা তাদের পালন করার কথা ছিলো। এর ফলে জীবন ও জগতের উপর নিয়ন্ত্রণ ইসলামের হাতছাড়া হয়ে গেলো। এখানে লেখক এই আত্মিক ও জাগতিক অবক্ষয়ের বিভিন্ন কারণ পর্যালোচনা করেছেন এবং দ্বীন থেকে বিচ্যুতি ও দায়-দায়িত্ব থেকে নিবৃত্তির কারণে স্বয়ং মুসলিমজাতি যে দুর্দশা ও দুর্যোগের সম্মুখীন হয়েছে তা বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। তারপর মানবজাতি এই কল্যাণ-নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার এবং জাহেলিয়াতের দিকে ফিরে যাওয়ার কারণে সমগ্র বিশ্বের উপর যে মহাদুর্যোগ নেমে এসেছে তারও বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। লেখক মানবতার ভয়াবহ অধঃপতনের যে রেখাচিত্র এঁকেছেন তা এমন সময় ঘটেছে যখন জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, প্রযুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির বিস্ময়কর সকল দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছিলো এবং মানবসভ্যতা বস্তুজগতে বিরাট অগ্রগতি অর্জন করেছিলো। এ রেখাচিত্র তিনি এঁকেছেন গভীর চিন্তা ও অনুসন্ধিৎসার মাধ্যমে; উচ্ছ্বসিত আবেগ ও জ্বালাময়ী ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে নয়। কেননা লেখক যে সকল সত্য ও তথ্য এবং বাস্তব প্রমাণ পেশ করেছেন তা কোন প্রকার অতিকথন ও অতিরঞ্জনের মুখাপেক্ষী ছিলো না।
এসমস্ত ঐতিহাসিক পর্যালোচনার আলোকে পাঠক অবশ্যই উপলব্ধি করবেন যে, মানবতার অস্তিত্বরক্ষার জন্যই আজ বিশ্বনেতৃত্বে পরিবর্তনের কত প্রয়োজন এবং কত প্রয়োজন ঐ সত্যের দিকে প্রত্যাবর্তনের যার অবির্ভাব ঘটেছে মানুষকে সর্ব- অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এবং জাহেলিয়াত থেকে জ্ঞান ও অন্তর্জানের দিকে বের করে আনার জন্য। পাঠক আরো উপলব্ধি করবেন যে, পৃথিবীতে এ কল্যাণ -নেতৃত্ব বিদ্যমান থাকা কত অপরিহার্য এবং এর অনুপস্থিতির কারণে শুধু মুসলিমজাতি নয়, বরং সমগ্র মানবজাতি কী ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বস্তুত এ ক্ষতির পরিধি এত ব্যাপক ও বিস্তৃত যে, তা অতীত, বর্তমান এবং নিকট ও দূর ভবিষ্যত সবকিছুকেই বেষ্টন করে আছে।
এ কিতাবের মাধ্যমে একই সঙ্গে মুসলিম হৃদয়ে লজ্জা ও অনুতাপের অনুভূতি জাগে যে, কী অমার্জনীয় অপরাধ সে করেছে; আবার মর্যাদার চেতনাও সৃষ্টি হয় যে, কী বিপুল যোগ্যতা তাকে দান করা হয়েছে; এমনকি সেই নেতৃত্ব পুন:- অর্জনের প্রেরণাও তার মধ্যে সঞ্চারিত হয়, যা সে গাফলতে অবহেলায় হাতছাড়া করেছে। একটি প্রশংসনীয় দিক এই যে, মুসলিমজাতির নেতৃত্বদানের অক্ষমতার কারণে মানবজাতি যে মহাদুর্যোগ ও অধঃপতনের শিকার হয়েছে, লেখক সেটিকে সব-সময় 'জাহেলিয়াত' বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ সুচিন্তিত শব্দব্যবহার একথার সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, ইসলামের মূলপ্রাণ এবং অতীত ও বর্তমান জাহেলিয়াতের মূলপ্রাণের মধ্যকার পার্থক্যটি লেখক যথার্থ উপলব্ধি করেন। বস্তুত আবরণে যত ভিন্নতাই থাক, স্বভাব, চরিত্র ও প্রকৃতির দিক থেকে প্রাচীন জাহেলিয়াত, যা ইসলামের পূর্বে পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো এবং আধুনিক জাহেলিয়াত, যা নেতৃত্বের আসন থেকে ইসলামের অপসরণের পর আজ পৃথিবীর উপর আধিপত্য বিস্তার করে আছে, দু'টোই সম্পূর্ণ অভিন্ন। বস্তুত জাহেলিয়াত নির্দিষ্ট কোন সময়, বা স্থানের গণ্ডীতে আবদ্ধ নয়, বরং জাহেলিয়াত হচ্ছে হৃদয়, আত্মা, চিন্তা, বুদ্ধি ও জীবনের একটা বিশেষ রূপ ও প্রকৃতি, যা তখনই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে যখন মানবজীবনের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত মৌলিক মূল্যবোধগুলোর পতন ঘটে এবং ঐসব কৃত্রিম মূল্যবোধ তার স্থলবর্তী হয় যার ভিত্তি হচ্ছে ভোগবাদ ও বস্তুবাদ, যার যন্ত্রণা মানবজাতি আজ তার চরম উন্নতির যুগেও ভোগ করছে, যেমন ভোগ করেছে বর্বরতার প্রথম যুগে। বিজ্ঞ লেখক কিতাবের শেষ অধ্যায়ে লিখেছেন-
'চৌদ্দশ বছর আগের মত আজো বিশ্বমানবতার উদ্দেশ্যে ইসলামী উম্মাহর একই দাওয়াত, একই পায়গাম, অর্থাৎ- 'হে মানুষ, এক আল্লাহকে বিশ্বাস করো। আল্লাহর রাসূলকে বিশ্বাস করো, এক আল্লাহর ইবাদত করো। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো। আখেরাত ও বিচারদিবসে বিশ্বাস করো।'
এই দাওয়াত ও পায়গাম কবুল করার পুরস্কার কী? পুরস্কার এই যে, জাহেলিয়াতের যে পরত পরত অন্ধকারে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ ডুবে আছে তা থেকে বের হয়ে ঈমান ও বিশ্বাসের আলোর বলয়ে প্রবেশ করবে। মানুষের গোলামি ও দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহর দাসত্ব ও বন্দেগির গৌরব অর্জন করবে। জীবনের সঙ্কীর্ণ কারাগার ও যিন্দেগীর যিন্দানখানা থেকে বের হয়ে জীবনের মুক্ত অঙ্গনে এবং পৃথিবীর প্রশস্ত পরিবেশে শান্তি ও স্বস্তির শ্বাস গ্রহণ করবে। বিভিন্ন ধর্মের অনাচার ও বাদ-মতবাদের স্বেচ্ছাচার থেকে বের হয়ে স্বভাবধর্ম ইসলামের ন্যায় ও সুবিচারের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করবে।
অতীতের যে কোন যুগের তুলনায় এ দাওয়াত ও পায়গামের সত্যতা ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং গুরুত্ব ও প্রয়োজন অনুধাবন করা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। কেননা জাহেলিয়াত আজ ভরা বাজারে নাঙ্গা হয়ে গেছে। তার সব পঙ্কিলতা ও কলঙ্ক-কালিমা উৎকটভাবে ধরা পড়ে গেছে। জড়বাদী ও ভোগবাদী জীবনের অনাচার-স্বেচ্ছাচারে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। সর্ব-অন্তরে জাহেলিয়াতের প্রতি ঘৃণা ও ধিক্কার উপচে পড়ছে। বিশ্ব এখন জাহেলিয়াতের নেতৃত্ব ত্যাগ করে ইসলামের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ইসলামী উম্মাহরও তার ছিনতাই হওয়া নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার করার এখনই সর্বোত্তম সুযোগ। যদি আজ ইসলামী উম্মাহ উঠে দাঁড়ায় এবং ইখলাছ, আত্মনিবেদন, পূর্ণ উদ্যম ও সঙ্কল্পের সঙ্গে এই দাওয়াত ও পায়গাম বুকে ধারণ করে আবার মানবজাতিকে ডাক দেয়, আস্থার সঙ্গে, দরদের সঙ্গে, মমতার সঙ্গে, কল্যাণকামিতার সঙ্গে; যুক্তি দিয়ে, ভক্তি দিয়ে, আচরণ দিয়ে এবং জীবনের পাতায় অঙ্কন করে বিশ্বকে যদি সে বোঝাতে পারে যে, এটাই একমাত্র দাওয়াত ও পায়গাম, যা মানবতা ও মানবসভ্যতাকে পতন ও অধঃপতনের চরম পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারে; যদি মুসলিম উম্মাহ মানবজাতিকে একথা বোঝাতে পারে তাহলে কবির ভাষায়- 'এ ভূমি এখন বড় সিক্ত উর্বর এবং খুবই উপযোগী; চাই শুধু উন্নত বীজ, আর বিচক্ষণ ও দরদী কৃষক।'
পরিশেষে, কিতাবের সর্বত্র যে বৈশিষ্ট্যটি বিশেষভাবে উদ্ভাসিত তা হচ্ছে ইসলামের মূলনীতিমালা ও বুনিয়াদি বিষয়গুলোকে সেগুলোর ব্যাপক পরিসরে এবং বিশুদ্ধ ইসলামী চেতনা অনুযায়ী অনুধাবন। এ কারণেই এ কিতাব শুধু ধর্মীয় ও সামাজিক গবেষণারই আদর্শ নমুনা নয়, বরং একইভাবে তা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসের গবেষণা ও গ্রন্থনা কেমন হওয়া উচিত তারও আদর্শ নমুনা। ইউরোপের পণ্ডিৎ-গবেষকগণ বিশ্বের ইতিহাস পশ্চিমাদৃষ্টিকোণ থেকেই লিখে আসছেন। আর স্বভাবতই তারা তাদের বস্তুবাদী শিক্ষা, দর্শন ও সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি ধর্মীয় ও জাতীয় সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব থেকে কখনো মুক্ত হতে পারেননা; বুঝে হোক বা না বুঝে, সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে। তাই তাদের ইতিহাস গবেষণায় প্রচুর ভুলবিচ্যুতি ঘটেছে। কারণ তারা জীবনের এমন বহু মূল্যবোধ সম্পর্কে 'বেখেয়াল' যেগুলোর সযত্ন পরিচর্যা ছাড়া মানবজীবনের ইতিহাস নিখুঁত -নির্ভুল হতে পারে না, এবং ঘটনার সঠিক ব্যাখ্যাপ্রদান ও সঠিক সিদ্ধান্ত- গ্রহণ সম্ভব হতে পারে না। আরো কারণ এই যে, সাম্প্রদায়িক চিন্তার কারণে ইউরোপকেই তারা জীবন ও মানবজীবনের অক্ষদণ্ড ও কেন্দ্রবিন্দু মনে করেন এবং জীবনের আরো বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক ও কার্যকারণকে শুধু এজন্য উপেক্ষা করেন যে, সেগুলোর উৎস পাশ্চাত্য সভ্যতা নয়। উপেক্ষা করেন, কিংবা অন্তত অবমূল্যায়ন করেন। দুর্ভাগ্যবশত বহুকাল ধরে আমরা এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, জীবনের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসম্ভার যেমন ইউরোপ থেকে গ্রহণ করি, তেমনি আহরণ করি জীবনের ইতিহাসও, এবং যাবতীয় ভুলবিচ্যুতিসহ। অথচ তাদের গবেষণা ও গ্রন্থনার নীতি-পদ্ধতি আগাগোড়াই ভুল। কারণ জীবনকে তারা একটি সীমাবদ্ধ, প্রান্তিক ও পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে থাকে। আর নীতি, পদ্ধতি ও উপস্থাপনের ভ্রান্তির ফলে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা ভ্রান্তির শিকার হয়ে থাকে। প্রমাণ ও সূত্র সঠিক না হলে আহরিত সিদ্ধান্ত কীভাবে সঠিক হতে পারে? আলোচ্য গ্রন্থটি ইতিহাসের গবেষণা ও গ্রন্থনার এমন একটি আদর্শ নমুনা, যাতে এসব বিষয় পূর্ণরূপে লক্ষ্য রাখা হয়েছে। সমস্ত কার্যকারণ এবং বিভিন্নমুখী মূল্যবোধও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
পাঠক হয়ত আশা করেননি যে, একজন আলিম, যিনি ইসলামের রূহানী ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে পূর্ণ আস্থাবান, এবং বিশ্বনেতৃত্বের আসনে ইসলামের প্রত্যাবর্তনের জোরালো প্রবক্তা, তিনি নেতৃত্বের বিভিন্নমুখী যোগ্যতা সম্পর্কেও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করবেন এবং আত্মিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির পাশাপাশি শিল্প, প্রযুক্তি ও সমরশক্তি অর্জনের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করবেন। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও স্বনির্ভরতা অর্জনেরও আহ্বান জানাবেন এবং আহ্বান জানাবেন পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের। কিন্তু পরম পরিতোষের বিষয় যে, এসকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁর চিন্তা থেকে বাদ পড়েনি। নিঃসন্দেহে এ গ্রন্থে মানবজীবনের উপর প্রভাব সৃষ্টিকারী সকল কার্যকারণ ও উপাদানের সুসংহত ও সুবিন্যস্ত সমাবেশ ঘটেছে এবং পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিকোণ থেকেই মুসলিম জাতি ও মানবজাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং মুসলিম উম্মাহকে এমন দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে যাতে পূর্ণ বাস্তবতাবোধ ও ভারসাম্য রক্ষিত হয়েছে। এসব কারণেই কিতাবটি ইতিহাস-গ্রন্থনার আদর্শ উদাহরণ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এ কিতাব আমাদের পথ দেখিয়েছে যে, একজন মুসলিম পশ্চিমা নীতি ও পদ্ধতি পরিহার করে কীভাবে ইতিহাসের গবেষণা ও গ্রন্থনায় অগ্রসর হবে, সেই পশ্চিমা নীতি ও পদ্ধতি যাতে সুসমন্বয়, সুবিচার ও গবেষণা-কৌলীন্য, সবকিছুরই মারাত্মক অভাব রয়েছে। আমার সৌভাগ্য যে, গ্রন্থ সম্পর্কে গ্রন্থকারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে এবং অভিন্ন অনুভূতি পোষণ করে কিছু কথা বলতে পেরেছি এবং মনের এ প্রতিক্রিয়াগুলো প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছি। আমি আরো আনন্দিত যে, কিতাবটি আরবী ভাষায় অধ্যয়নের সুযোগ হয়েছে। কারণ বিজ্ঞ লেখক এর জন্য আরবী ভাষাকেই নির্বাচন করেছেন।
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِمَن كَانَ لَهُ قَلْبُ أَوْ أَلْقَى السَّমْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ
নিঃসন্দেহে এতে উপদেশ রয়েছে ঐ ব্যক্তির জন্য যার রয়েছে হৃদয়, কিংবা যে কর্ণপাত করে এমন অবস্থায় যে, সে মনোযোগী। (ক্বাফ, ৫০: ৩৭)
সাইয়েদ কুতুব
হুলওয়ান, মিশর
টিকাঃ
১. লেখক আখেরি নবী ও বিশ্ব নবী মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা বলছেন।