📄 কিতাবের তরজমা
বিদায় মুছাফাহার সময় তিনি বললেন, যওক ছাহেব বলেছেন, আপনি বাংলায়ও লেখেন। আমার কোন কিতাবের তরজমা কি করেছেন? লজ্জিত হলাম। উত্তরের অপেক্ষা না করে তিনি বললেন, 'মাযা খাসিরা'-এর তরজমা করুন, আমি দু'আ করি।' আমার মনের এতদিনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাটিই যেন তাঁর পাক যবানে উচ্চারিত হলো, খুব আপ্লুত ও উদ্দীপ্ত হলাম, বললাম, ইনশাআল্লাহ আমি তরজমা করবো, হযরত, আপনি খাছ করে দু'আ করবেন, আল্লাহ যেন তাওফীক দান করেন। তিনি আরো বললেন, 'লক্ষ্য রাখবেন, আদবি মি'য়ার যেন অক্ষুণ্ণ থাকে, আর উর্দু তরজমাটি সঙ্গে রাখবেন।'
তারপর কত দিন, কত বছর পার হলো! রায়বেরেলির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীটি দিয়ে কত পানি গড়ালো। এমনকি আমার প্রিয়তম হযরত আলী মিয়াঁ দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন, কিন্তু কিতাবটির তরজমা আর হলো না। অথচ ইতিমধ্যে তাঁর আরকানে আরবা'আ এবং পা-জা সুরাগে যিন্দেগি তরজমা করেছি। জীবনের বহু কাজের মত এখানেও সত্য হলো كل أمر مرهون بوقته প্রতিটি কাজ তার সময়ের বন্ধনে আবদ্ধ। সেই সময় যখন হলো, তরজমাও শুরু হলো। কিন্তু ধারবাহিকভাবে নয়। পুষ্পের দ্বিতীয় প্রকাশনার প্রথম সংখ্যা প্রকাশের সময় সামান্য অংশ তরজমা করলাম, ছাপা হলো। কয়েক মাস পর দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হলো, তখন আবার কিছু তরজমা হলো। এভাবে পুষ্পের একটি সংখ্যা বের হয় মাস দু'মাস, কখনো তিনমাস পর, তখন কিতাবটিরও কিছু অংশ তরজমা হয়। এভাবে বিশটি সংখ্যায় কিতাবের প্রায় চারভাগের তিনভাগ তরজমা হলো এবং ছাপা হলো। তারপর পুষ্পের প্রকাশনা স্থগিত হয়ে গেলো, সেই সঙ্গে কিতাবের তরজমাও। 'কবে আবার পুষ্পের তৃতীয় প্রকাশনা শুরু হবে এবং কিতাবের তরজমা শেষ হবে', এই যখন অবস্থা, আল্লাহ তখন তাঁর এক বান্দাকে আমার উপর যেন 'মুসাল্লাত' করে দিলেন (চাপিয়ে দিলেন)। কিছু দিন পরপর তিনি জিজ্ঞাসা করেন, কিতাবটির বাকি অংশের তরজমা কবে শেষ হবে, কবে কিতাব আকারে পাবো? আমি বলি, এই তো শুরু করছি। এটাও যখন কয়েকবার হলো, তখন তিনি কিছুটা যেন হতাশ হয়ে বললেন, 'শুরু করছি'টা 'শুরু করেছি' কবে হবে? আসলে তিনি জানতেন, আমারও আকাঙ্ক্ষা কত এবং মজবুরি কত! তাই যখনই তাগাদা দিতেন কোমলভাবেই দিতেন। গত রামাযানের সম্ভবত প্রথম সেহরির সময় ফোনে আবার সেই প্রসঙ্গ! বাহ্যত কাজটি শুরু করার কোন সুযোগই ছিলো না। কারণ আমার সামনে তখন এমন কিছু নিছাবী কাজ ছিলো, যা একদিনের জন্যও বিলম্বিত করার 'বৈধতা' ছিলো না, কিন্তু আমার প্রিয়তম আলী মিয়াঁ- রহ. এর ভাষায় বলতে হয়, 'ভিতর থেকে কেউ যেন উদ্বুদ্ধ করলো। নিজের অজ্ঞাতেই যেন বলে ফেললাম, 'দু'আ করুন আজ থেকেই শুরু করছি এবং ইনশাআল্লাহ শাওয়ালের মধ্যে ছাপাখানায় যাবে'। তিনি খুশী হলেন, আমিও বলা যায়, আল্লাহর এ বান্দার খুশিটুকু অক্ষুণ্ণ রাখার তাগিদে অবশিষ্ট অংশের তরজমা শুরু করলাম। অন্যান্য কাজ এবং সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ রেখে, এমনকি -আল্লাহ মাফ করুন- রামাযানের যে স্বাভাবিক তিলাওয়াত, সেটাও সঙ্কোচিত করে তরজমার কাজ অব্যাহত রাখলাম। এভাবে আল্লাহর শোকর ই'তিকাফের শেষ দিকে তরজমাটি সমাপ্ত হলো। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য ফোন করে প্রথমে তাঁকেই সুসংবাদটি দিলাম। কারণ তাঁর এই অব্যাহত তাগাদা না হলে কাজটি এখন এভাবে সমাপ্ত হতো না, আরো অনেক পিছিয়ে যেতো। অবশ্য আমার নিছাবি কাজগুলো যে বিলম্বিত হলো, এজন্য কিছুটা হলেও তাকে দায়ী করা যায়। তরজমা সমাপ্ত হয়েছে শুনে তিনি বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন, আমার ভালো লাগলো। আসলে একটা সময় এমন আসে, অন্তরঙ্গ মানুষের তাড়া ও তাগাদা ছাড়া কাজ হতে চায় না। হয়ত আমি এখন সেই সময়ের মুখে পড়েছি। তাঁর উচ্ছ্বসিত আনন্দের প্রতি আমার ভালোলাগা প্রকাশ করে বললাম, 'ইনশাআল্লাহ কিতাবটি ছাপা হয়ে আসার পর এর প্রথম নোসখাটি আপনার হাতে অর্পণ করবো'। যদিও পুষ্পে তরজমার প্রতিটি কিস্তি যথেষ্ট সম্পাদনার পরই ছাপা হয়েছিলো তবু মনে হলো, গ্রন্থাকারে প্রকাশের জন্য আরো সম্পাদনা দরকার। তাই ঈদের পর নতুন করে সম্পাদনার কাজ শুরু করলাম। আলহামদু লিল্লাহ বিশদিনের লাগাতার মেহনতের পর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পাদনার কাজটিও সমাপ্ত হয়েছে। আশা করি, এখন তরজমাটি পূর্ণ মানোত্তীর্ণ না হলেও অপেক্ষাকৃত সুন্দর ও ত্রুটিমুক্ত হয়েছে।
📄 তরজমা সম্পর্কে
এবার তরজমা সম্পর্কে কিছু কথা। কোন কিতাবের সফল অনুবাদ সত্যি এক দুরূহ কাজ। একথা বহুবার বহুজন বলেছেন। কিন্তু প্রতিটি অনুবাদ সেই সত্যকে যেন আরো কঠিনভাবে সত্য বলে প্রমাণ করে। অনুবাদ আসলে একটি শিল্প এবং ললীত ও চারুশিল্প। এর যেমন রয়েছে মোটা দাগের কিছু নিয়মনীতি ও বিধিবিধান তেমনি রয়েছে কিছু সূক্ষ্ম কলাকৌশল ও রীতি-শৈলী। ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও বুদ্ধিবৃত্তি, বিষয় ও বিষয়বস্তু যাই হোক, অনুবাদের ক্ষেত্রে এটাই প্রথম কথা ও শেষকথা।
আফসোস, অন্যদের কথা জানি না, আমাদের দ্বীনী মহলে উচ্চারণে না হলেও আচরণে সম্ভবত মনে করা হয়, অনুবাদই সবচে' সহজ কাজ। বিষয়টি কিন্তু তা নয়। আমার মতে, অন্তত যারা ধর্মীয় সাহিত্যের সেবারূপে অনুবাদের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে চান তাদের কর্তব্য হবে জীবনের উল্লেখযোগ্য একটা সময় দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনার মাধ্যমে অনুবাদ ও তরজমার দুরূহ কাজের জন্য আগে নিজেকে প্রস্তুত করা। যে কোন কিতাবের উত্তম অনুবাদের জন্য প্রথম কাজ হলো দু'টি। বিভিন্ন কিতাব অধ্যয়নের মাধ্যমে বিষয়বস্তুর সঙ্গে অন্তরঙ্গ একটি পরিচয় গড়ে তোলা। তারপর 'অনুবাদিতব্য' বইটি আগাগোড়া বারবার পড়ে লেখকের ভাষা ও উপস্থাপনশৈলী এবং তার মনমানসের সঙ্গে 'নিবিড়তা' অর্জন করা। বিষয়যোগ্যতা, ভাষাজ্ঞান, ও রুচিবোধের ক্ষেত্রে অনুবাদককে এমন একটি স্তরে অবশ্যই উঠে আসতে হবে যে, তিনি ভাববেন, অনুবাদের ভাষায় তিনি লেখকের প্রতিনিধিত্ব করছেন। অর্থাৎ লেখক যদি বাংলাভাষী হতেন এবং বাংলাভাষার পাঠকের জন্য লিখতেন তাহলে তাঁর লেখাটি মোটামুটি এমনই হতো যেমন আমি অনুবাদ করেছি। এভাবেও বলা যায়, লেখক যদি শুধু বাংলা জানতেন, আর অনুবাদটি পাঠ করে বলতেন, 'আমার মনের কথাগুলো আমার মনের মত করেই এখানে বলা হয়েছে।' তাহলেই বলা হবে, অনুবাদ সফল ও সার্থক হয়েছে।
কথাটা যত সহজ করে বলা হলো, কাজটা অবশ্যই তত সহজ নয়, যথেষ্ট কঠিন। কঠিন বলেই তো সাধনার এবং নিরন্তর সাধনার প্রয়োজন। সাধনার পর, যত কঠিনই হোক কোন কাজ আর অসাধ্য থাকে না। মানুষ তো পর্বতচূড়ায় আরোহণের মত 'অর্থহীন' কাজকেও সাধনার বিষয় বানিয়ে নিয়েছে, সেজন্য প্রাণও বিসর্জন দিচ্ছে, কেউ কেউ সফলতাও অর্জন করছে। এমনকি যারা মারা যাচ্ছে তাদেরও কেউ ব্যর্থ বলছে না, বরং সাহসী মানুষ বলে তাদের প্রশংসা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় করণীয় হলো কিতাবের বিষয়বস্তু, ভাষাগত মান ও উপস্থাপন শৈলী বিচার করে অনুবাদের প্রকৃতি নির্ধারণ করা এবং আগাগোড়া সেই প্রকৃতি অনুসরণ করে অনুবাদ করা। এটাও বিস্তৃত ব্যাখ্যা দাবী করে, যার সুযোগ এখানে নেই। বরং যে উদ্দেশ্যে এ আলোচনার অবতারণা এখন আমরা সেদিকেই অগ্রসর হচ্ছি।
ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين؟
কয়েকটি বিষয় গভীরভাবে চিন্তা করেছি। প্রথমত কিতাবটির বেশীর ভাগ উর্দু অনুবাদ লেখক নিজেই করেছেন, বাকি অংশের অনুবাদও নিজের তত্ত্বাবধানে অতি আপনজনদের দ্বারা করিয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, উর্দু অনুবাদে মূল আরবীকে অনুসরণ করা হয়নি, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বক্তব্যের অনুবাদ বক্তব্য দ্বারা করা হয়েছে। অবশ্য মূল বক্তব্যের ভাব ও আবেদন এবং গতি ও তরঙ্গময়তা রক্ষিত হয়েছে পূর্ণ মাত্রায়, বরং কোথাও কোথাও তা মূলকেও অতিক্রম করেছে। কিন্তু শব্দ, বাক্য, উপমা, প্রবাদ, বাগ্ধারা স্বাধীনভাবে পরিবর্তন, সংযোজন, বিয়োজন করা হয়েছে। এমনকি আরবী কবিতার অনুবাদ না করে একই অর্থের উর্দু কবিতা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, উর্দু অনুবাদে কেন এরূপ করা হলো এবং লেখক কেন তা অনুমোদন করলেন?
আমার মতে আলোচ্য কিতাবটির অনুবাদের ক্ষেত্রে উপরোক্ত রীতি অনুসরণ করাই যথোপযুক্ত হয়েছে এবং কিছু কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বেশ সফল অনুবাদ হয়েছে, ক্ষেত্র-বিশেষে, এমনকি মূলের চেয়ে অনুবাদই উত্তম হয়েছে। আরবীকে হুবহু অনুসরণ করে তরজমা করা হলে এমন হতো বলে মনে হয় না। এর একটি কারণ এই যে, আরবীভাষার স্বভাব বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে ইজাজ বা প্রকৃতি-গত সুসংসক্ষিপ্ততা। তাই দেখা যায়, আরবী ছোট ছোট দু'টিমাত্র বাক্যে যে বক্তব্যটি সুন্দরভাবে এসে গেছে, উর্দুতে সেখানে বড় বড় চারটি বাক্য ব্যবহার করতে হয়েছে। নইলে বক্তব্যের স্পষ্টতা, আবেদন ও গতিময়তা ক্ষুণ্ণ হতো। আর এ কিতাবের লেখক যিনি, তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্যই হলো স্রোতের গতিময়তা এবং জলপ্রপাতের উচ্ছলতা। সেটা যে কোনভাবেই হোক রক্ষা করতেই হবে (তবে বক্তব্যকে অক্ষত রেখে)। উর্দু অনুবাদক সেটাই করেছেন এবং লেখক তা অনুমোদন করেছেন। তাতে অনুবাদে শব্দ ও বাক্য কমেছে, বেড়েছে, কিন্তু সৌন্দর্য রক্ষিত হয়েছে।
আরেকটি বিষয়, লেখক আমাকে উপদেশ দিয়েছেন (উর্দু থেকে নয়, বরং) আরবী থেকে অনুবাদ করতে, কিন্তু উর্দু অনুবাদটি সামনে রাখতে। আর সতর্ক করেছেন অনুবাদে যেন মূলের সাহিত্যমান রক্ষিত হয়। (অবশ্য এ বিষয়ে এমনিতেও তিনি যথেষ্ট সংবেদনশীল ছিলেন।)
এখানেও প্রশ্ন; লেখকের উপরোক্ত উপদেশ ও সতর্কবাণীর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য কী ছিলো?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, উর্দু অনুবাদের স্থানে স্থানে মূল কিতাবের কিছু কিছু অংশ বাদ দেয়া হয়েছে, আবার কোথাও কোথাও দীর্ঘ দীর্ঘ অংশ সংযোজন করা হয়েছে, যা মূল কিতাবে নেই। শেষ অধ্যায়টির পূর্বে সর্বোচ্চ চৌদ্দ পৃষ্ঠার দীর্ঘ একটা সংযোজন রয়েছে। এসব কিছু হয়েছে মূল লেখকেরই তত্ত্বাবধানে।
তো সবদিক বিচার করে অনেক চিন্তাভাবনার পর কিতাবটির অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি যে পন্থা ও কৌশল অবলম্বন করেছি তা মোটামুটি এই-
(ক) উর্দু অনুবাদকের মতই বাংলায়ও ভাষার অনুবাদের পরিবর্তে বক্তব্যের অনুবাদ করা হয়েছে; উর্দু অনুবাদেরও হুবহু অনুসরণ করা হয়নি। বলা যায়, লেখকের 'আত্মিক' তত্ত্বাবধানে মূল আরবী থেকে দ্বিতীয় একটি 'উর্দু' অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। তবে নতুন সংযোজন-বিয়োজন তেমন একটা করা হয়নি, বরং মূলের অধিকতর নিকটবর্তী থাকারই চেষ্টা করেছি।
(খ) উর্দু অনুবাদে যে অংশগুলো বাদ গিয়েছে, অথচ প্রয়োজনীয় বলে মনে হয় সেগুলো বাংলা অনুবাদে সংযোজন করা হয়েছে, তদ্রূপ উর্দু অনুবাদে যে অংশগুলো পরিবর্ধিত হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে সেগুলো মূল আরবীতে না থাকলেও বাংলা অনুবাদে গ্রহণ করা হয়েছে। এ কারণে কিতাবের কলেবর যেমন যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি অনুবাদের কাজটিও বেশ জটিল হয়েছে এবং সময়ও অনেক বেশী লেগেছে।
(গ) উর্দু অনুবাদের মত বাংলা অনুবাদেও প্রয়োজনে সঙ্কোচন বা সম্প্রসারণের রীতি অনুসরণ করা হয়েছে। অবশ্য আগাগোড়া চেষ্টা করা হয়েছে মূল আরবী ও তার উর্দু অনুবাদের শব্দচয়নের বৈশিষ্ট্যটি অক্ষুণ্ণ রাখার।
(ঘ) অনুবাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে লেখক যেমন উপদেশ দিয়েছিলেন- মূলের এবং উর্দু অনুবাদের সাহিত্যমান অক্ষুণ্ণ রাখার। আশা করি, এক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা প্রত্যাশার অধিক সাফল্য দান করেছেন। তবে আমার ধারণা, এক্ষেত্রে আরো উৎকর্ষ অর্জনের প্রচুর সুযোগ রয়েছে, যদি আরো এক-দু'বার আগাগোড়া সম্পাদনা করা হয়। কিন্তু আমার সামনে এখন মাদানী নেছাবের এমন কিছু কাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়ে গেছে যা আর বিলম্বিত করার কোন সুযোগ নেই। তাই বর্তমান 'চেহারা-সুরতেই' বইটি প্রকাশ করতে হচ্ছে। আল্লাহ যদি কখনো সুযোগ দেন তাহলে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পরিমার্জনের ইচ্ছে আছে।
একথাগুলো এজন্য বলতে হলো যে, যারা মূল আরবী ও উর্দুভাষায় কিতাবটি পড়েছেন, বা পড়বেন (এবং তাদের সংখ্যাও প্রচুর) তারা যেন বাংলা অনুবাদটি পাঠ করার সময় পেরেশানিতে না পড়েন।
মূল লেখকের তত্ত্বাবধানে বইটির ইংরেজি তরজমাও হয়েছে, Islam and the World নামে, তবে তা আরবী থেকে নয়, উর্দু থেকে। তিনি মোটামুটি উর্দুর মূলানুগ তরজমাই করেছেন, আবার ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনের তাগিদে কিছুটা কমবেশী করেছেন। তবে দেখা যাচ্ছে, নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি সচরাচরতার বৃত্তেই রয়ে গেছেন। মূলে বা উর্দু অনুবাদে নামের যে অন্যরকম একটি আবেদন ছিলো তা রক্ষিত হয়নি।
ইংরেজি অনুবাদকের নাম আছিফ কিদওয়াঈ, তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় কঠিন প্রতিকূলতার মধ্যে বলতে গেলে শয্যাশায়ী অবস্থায় বইটির তরজমা করেছেন, যখন উঠে বসা, দূরের কথা, নিজে নিজে পার্শ্বপরিবর্তন করাও তার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। দীর্ঘ চল্লিশ বছর তিনি এ হালতে কাটিয়েছেন তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট অবস্থায়। তিনি হযরত আলী নাদাবী রহ.-এর আরো কয়েকটি কিতাবেরও তরজমা করেছেন, শুধু তাঁর প্রতি ভক্তি মুহব্বতের কারণে এবং উম্মতের একটি বড় খেদমত মনে করে। হযরত আলী মিয়াঁ, 'পুরানে চেরাগ' এর তৃতীয় খণ্ডে তার খুব উচ্চ প্রশংসা করেছেন। যাদের ইংরেজি জ্ঞান উচ্চ মানের তাদের বরাতে হযরত আলী মিয়াঁ লিখেছেন- 'বইটিকে কোনভাবেই মনে হয় না অনুবাদ, বরং মনে হয়, ইংরেজির টাকশাল থেকে বের হওয়া চকচকে মুদ্রা। অনেকের মতে উর্দুভাষার কোন বইয়ের এর চেয়ে ভালো ইংরেজি অনুবাদ এপর্যন্ত হয়নি।' আল্লাহ তাঁকে জান্নাত নছীব করুন, আমীন।
ইরানের অভিজাত ইসলামী সংস্থা جلسات علمی اسلام شناسی قم কিতাবটির ফারসি তরজমা প্রকাশ করেছে با ضعف مسلمین دنیا در خطر سقوط নামে। ফারসী নামটির মূলানুগ তরজমা করলে দাঁড়ায়, 'মুসলমানদের দুর্বলতার কারণে পৃথিবী দুর্যোগে পড়েছে'।¹ তুর্কীভাষায়ও এর তরজমা প্রকাশিত হয়েছে। ফরাসীভাষায়ও তরজমার আয়োজন চলছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ভাষায় তরজমার কথাও লেখক জানিয়েছেন। বাংলায় অবশ্য ইতিমধ্যে বইটির দু'টি তরজমা হয়েছে; একটি বাংলাদেশ থেকে, অন্যটি পশ্চিমবঙ্গ থেকে। বাংলাদেশের তরজমাটি করেছেন আমার সুহৃদ বন্ধু মরহুম ওমর আলী ছাহেব।
এটি অবশ্য একটি সঙ্গত প্রশ্ন যে, দু'টি অনুবাদের পর তৃতীয় অনুবাদ কেন করা হলো? উত্তরে শুধু বলতে পারি, এর প্রয়োজন ছিলো। ইতিমধ্যে যারা তরজমা করেছেন, বিশ্বাস করি, আন্তরিকতার সঙ্গেই করেছেন, তাদের মেহনতকেও আল্লাহ কবুল করুন, আমীন।
লেখক নিজেই বলেছেন, এটি তাঁর প্রথম জীবনে রচনাকর্ম, আর আরবীভাষায় এটিই হচ্ছে তাঁর প্রথম কলমচালনা। কিন্তু আল্লাহর কী শান! আরববিশ্বে এবং মুসলিমবিশ্বে কিতাবটি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। আরববিশ্বে পঁচিশেরও বেশী অনুমোদিত ও অননুমোদিত সংস্করণ ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। উর্দু ও ইংরেজি তরজমারও বেশক'টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাভাষার অনুবাদ দু'টিরও একাধিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।
বহু বছরের দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর আল্লাহ তা'আলা আমাকে তাওফীক দান করেছেন কিতাবটি বাংলা তরজমা করার; এজন্য আল্লাহর দরবারে সিজদায়ে শোকর। কত না আত্মিক প্রশান্তির কারণ হতো যদি আমার প্রিয়তম হযরত আলী মিয়াঁর জীবদ্দশায় এটি প্রকাশিত হতো, আর আমি নিজে তাঁর হাতে তা তুলে দিতে পারতাম! এখন আল্লাহর কাছে আন্তরিক প্রার্থনা, আল্লাহ যেন তরজমাটি কবুল করেন, মাকবুল করেন এবং ছাহিবে কিতাবের ইখলাছ ও লিল্লাহিয়াত দ্বারা অনুবাদ ও অনুবাদককে 'ফায়যইয়াব' করেন, আমীন।
যারা আমার দ্বীনী কাজে আন্তরিকভাবে সাহায্য করেছেন, করছেন এবং করবেন তাদের নাম তো আল্লাহ জানেন, তিনি যেন সবাইকে তাঁর শায়ানে শান আজর দান করেন, আমীন। শেষদিকে যিনি বারবার কোমলভাবে তাগাদা দিয়ে তরজমার কাজটি দ্রুত সুসমাপ্তির দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন তিনি আমার প্রিয় ব্যক্তিদের একজন, আমার হজ্বের সফরসঙ্গী ভাই শাহজালাল, আল্লাহ তাকেও উত্তম বিনিময় দান করেন।
কিতাবের শেষ একশ পৃষ্ঠার মত কম্পোজ করেছেন আমার প্রিয় ছাত্র মাওলানা মুহম্মদ আলী, আর প্রুফ দেখার কাজে সহায়তা করেছেন মাওলানা যাহিদ, মাওলানা আলমামুন, মাওলানা মীযান, মাওলানা হোসায়ন, মাওলানা মাহমূদ হাসান, মাওলানা আছিম এবং এবারের চতুর্থ বর্ষের কয়েকজন তালিবে ইলম। আমার পক্ষে এ কাজটি করা এখন কঠিনই হতো, আল্লাহ তাদের উত্তম বিনিময় দান করুন, আমীন।
অনেক চিন্তাভাবনার পর এ কিতাবটি আমি আমার পুত্র মুহম্মদের নামে উৎসর্গ করলাম। আমার জীবনের একটি বড় ব্যর্থতা এই যে, এখনো আমি আমার পরবর্তী মানুষটির সন্ধান পাইনি, যা দ্বীন ও দুনিয়া উভয় ক্ষেত্রেই কাজের স্থিতি ও স্থায়িত্ব এবং বিস্তার ও প্রসারের জন্য অপরিহার্য। অনেক হতাশার পর, বার্ধক্যের কাছাকাছি এসে আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করে ভাবছি, হয়ত আমার সন্তানকে আল্লাহ তা'আলা আমার কাজের ওয়ারিছ বানাবেন। হয়ত এ উৎসর্গের লাজ রক্ষা করার জন্য হলেও কিছু পূর্ণতা ও সৌন্দর্য, কিছু শুভ্রতা ও পবিত্রতা এবং কিছু যোগ্যতা ও প্রজ্ঞা অর্জন করার চেষ্টায় নিজেকে সে নিয়োজিত করবে। وَمَا ذٰلِكَ عَلَى اللّٰهِ بِعَزِيْز
সবশেষে আমার স্নেহের ভাই বশির মেছবাহের কথা বলতেই হয়। এখনো পর্যন্ত আমার সমস্ত কিতাবের প্রচ্ছদ তার হাতেই হয়েছে, যা আমার জন্য অতি সন্তোষের বিষয়। মাঝে মধ্যে অবশ্য আমার উপর দিয়ে ছোটখাটো পরীক্ষা যায়, তবে আল্লাহর রহমতে এখনো অনুত্তীর্ণ হইনি।
এখন সব কাজ মোটামুটি শেষ, বাকি শুধু প্রচ্ছদ। আশা করছি খুব মর্মসমৃদ্ধ ও দৃষ্টিনন্দন একটি প্রচ্ছদ বইটির অঙ্গশোভা বর্ধনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তাই যেন হয় এবং দ্রুতই যেন হয়। আল্লাহ তাকেও উত্তম বিনিময় দান করুন, আমীন।
আবু তাহের মেছবাহ
মাদরাসাতুল মাদীনাহ হযরতপুর, কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা
২৯/১০/৩৪ হি.
পুনশ্চ- আল্লাহর কী ইশারা! শেষ পর্যন্ত আমার সামনে উপস্থিত হয়েছে বশির মিছবাহের মেয়ে আমার ভাতিজি-এর হাতে তৈরী একটি প্রচ্ছদ! আমি অন্তর থেকে বললাম, যত সুন্দরই হোক আর কোন প্রচ্ছদের আমার প্রয়োজন নেই। আমার ভাতিজির প্রচ্ছদই এ কিতাবের শোভা এবং তার শিল্পগুণের শুভস্মৃতি হয়ে থাক। কামনা করি, তার এ শিল্পগুণ সর্বদা দ্বীনের খিদমতে যেন নিয়োজিত থাকে।
আমরা সাত ভাই, সাত বোন, আমার ভাতিজা, ভাতিজি, ভাগিনা, ভাগিনি ও নাতি-নাতিন, সংখ্যায় আল্লাহর শোকর, পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাদের সবার জন্য অন্তরের অন্তঃস্তল থেকে দু'আ করি, আল্লাহ সবাইকে যেন কবুল করেন, সুখী সুন্দর জীবন দান করেন। তাদের কোন হক তো আমি আদায় করতে পারি না, আল্লাহ যেন আমার পক্ষ হতে তাদেরকে উত্তম থেকে উত্তম জাযা দান করেন, আমীন।
টিকাঃ
১. এই ফারসি তরজমাটি আল্লাহর কোন বান্দা যদি আমাকে যোগাড় করে দিতে পারেন حزاء الله خيرا আজীবন আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো।
📄 (কিতাব সম্পর্কে) ছাহিবে কিতাবের কথা
সমস্ত প্রশংসা রাব্বুল আলামীন আল্লাহর; দুরূদ ও সালাম তাঁর রাসূলের প্রতি; আল্লাহর রহমত ও করুণা সমস্ত আছহাবে রাসূলের প্রতি এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা সুচারুরূপে তাঁদের অনুসরণ করবে, তাঁদের প্রতি।
অনেক সুধী পাঠকের হয়ত জানা নেই, ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين কিতাবটি আমার একেবারে প্রথম দিকের রচনা। বলা যায় এর মাধ্যমেই আরবীভাষায় আমার 'কলম-সফরের' শুরু। ১৯৪৪ ও ৪৭ এর মধ্যবর্তী সময় হলো এই কিতাবের রচনাকাল। আমার বয়স তখন মাত্র ত্রিশ অতিক্রম করেছে। বিষয়- বস্তুর জটিলতা, সংবেদনশীলতা এবং গভীরতা ও গম্ভীরতার দিক থেকে এটা ছিলো এমন 'অপরিণত' বয়সে আমার মত 'সাধারণ' মানুষের আয়ত্বের ঊর্ধ্বে। তদুপরি আমার জন্ম, প্রতিপালন, শিক্ষাদীক্ষা ও বেড়ে ওঠা, সবই ছিলো আরবী ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি থেকে বহু দূরে ভারতবর্ষে। বাইরের কোন দেশ তখনো দেখার সুযোগ হয়নি। আল্লাহ আমাকে জীবনের প্রথম যে সফরের তাওফীক দিয়েছেন সেটা ছিলো ১৩৬৬ হিজরীতে ফরয হজ্জ আদায়ের মোবারক সফর। অর্থাৎ এ গ্রন্থরচনার তিন বছর পর। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে এটা ছিলো এক দুঃসাহসী বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযাত্রা, যার জন্য না আমি প্রস্তুত ছিলাম, না আমার যোগ্যতা ছিলো। বস্তুত এটা ছিলো এমন কোন বিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ ও বিদগ্ধ ব্যক্তির কাজ, যার কলম আমার কলমের চেয়ে পরিণত, যার জ্ঞান আমার জ্ঞানের চেয়ে সমৃদ্ধ এবং লেখক হিসাবে যার অভিজ্ঞতা আমার চেয়ে অনেক দীর্ঘ; কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ইচ্ছাই তো কার্যকর হয়।
আসলে এ বিষয়ে আমি এমন জোরালো ও রহস্যময় এক আত্মিক তাড়না অনুভব করছিলাম, যা শেষ পর্যন্ত আর এড়াতে পারিনি। যেন অদৃশ্যের কোন শক্তি আমার হাতে কলম তুলে দিয়েছে এবং এ বিষয়ে আমাকে দিয়ে কিছু লিখিয়ে নিয়েছে। তখন যদি আকল-বুদ্ধির 'পরামর্শ' চাইতাম, আকল আমাকে অবশ্যই বাধা দিতো, কিংবা যদি লেখক-গবেষকদের অভিজ্ঞতা, বৈদগ্ধ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চতার কথা ভাবতাম তাহলেও এমন চিন্তা থেকে আমাকে পিছিয়ে আসতে হতো; এমনকি যদি কোন বিজ্ঞ আলিম ও প্রাজ্ঞ বুদ্ধিজীবীর কাছে বিষয়টি উত্থাপন করতাম, অবশ্যই তিনি এই ইলমী ও বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযান থেকে আমাকে বিরত রাখতেন। তবে ভালোই হয়েছে, আমি কারো পরামর্শ নেইনি, না বুদ্ধির, না কোন বুদ্ধিমানের। (আসলে অপার্থিব এক আচ্ছন্নতার কারণে পরামর্শের কথা মনেই আসেনি।) আল্লামা ইকবাল যথার্থ বলেছেন-
বুদ্ধির ইশারায় চলা সবসময় ঠিক নয়/ কিছু বিষয়ে গুটিয়ে রেখো বুদ্ধিকে / কেননা ঝুঁকির মুখে ভয় দেখাবে বুদ্ধি তোমায় / আর এসব তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বলবে দূরে থাকতে
সুতরাং কোন দিকে না দেখে, কোন কিছু না ভেবে একমাত্র আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করে সেই ভিতরের তাড়নায় কলম হাতে তুলে নিয়েছিলাম। তাছাড়া কিতাবটির প্রাথমিক ধারণা মোটামুটি একটি প্রবন্ধের চেয়ে বেশি কিছু ছিলো না, যেখানে কাজ হবে-
(ক) সংক্ষেপে দেখাতে চেষ্টা করবো, জীবনের মানচিত্রে এবং বিশ্বসভায় মুসলিম উম্মাহর অবস্থান ও মর্যাদা কী? উম্মাহর পতন ও অধঃপতন এবং পৃথিবীর নেতৃত্ব ও অভিভাবকত্ব থেকে তার অপসারণের কারণে মানবতার কী ক্ষতি ও দুর্গতি হয়েছে?
(খ) মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বি'ছাত (আবির্ভাব ও প্রেরণ) জাহেলিয়াতের কোন্ পরিবেশে হয়েছিলো, মানবজাতি তখন অধঃপতনের কোন্ স্তরে উপনীত হয়েছিলো। তাঁর দাওয়াত ও তারবিয়াত কীভাবে উম্মাহকে خير أمةরূপে তৈয়ার করেছিলো। উম্মাহর ঈমান, আখলাক ও সীরাত এবং বিশ্বাস, চরিত্র ও জীবনবোধ কেমন ছিলো? কীভাবে উম্মাহ বিশ্বের নেতৃত্ব-ভার নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলো এবং মানবজাতির জীবন ও সভ্যতা, ঝোঁক ও প্রবণতা এবং স্বভাব ও কর্মের উপর কী প্রভাব পড়েছিলো? জাহেলিয়াতের ঘোর অন্ধকার থেকে ইসলামের আলোর দিকে পৃথিবীর গতিধারা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছিলো?
(গ) এমন উম্মাহর জীবনে এমন অধঃপতন কীভাবে শুরু হলো? কেন তাকে দুনিয়ার ইমামত ও কিয়াদাত এবং পৃথিবীর নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও আত্মিক অভিভাবকত্ব থেকে সরে যেতে হলো? কীভাবে তা দুর্বল, উদাসীন, অথচ বিশ্বাসী একটি জাতির হাত থেকে শক্তিশালী, উদ্যমী, অথচ স্রষ্টাবিমুখ ও বস্তুবাদী ইউরোপের হাতে গেলো? খোদ ইউরোপে বস্তুপূজা ও ধর্মবিমুখ-তার প্রকাশ ও বিস্তার কীভাবে ঘটেছে? পশ্চিমা সভ্যতার আসল স্বভাব ও প্রকৃতি কী? কী কী অণু-উপাদান দ্বারা এর 'খামীর' ও সত্তা তৈরী হয়েছে? ইউরোপের বিশ্বনেতৃত্ব জীবন ও সভ্যতাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?
(ঘ) পৃথিবীর গতি এখন কোন্ দিকে এবং এর সম্ভাব্য পরিণতি কী? মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব ও কর্তব্য কী এবং এই দায়িত্বপালনে কীভাবে সে সফল হতে পারে?
মোটামুটি এই ছিলো আলোচনার পরিধি এবং উদ্দেশ্য ছিলো শুধু উম্মাহর মধ্যে যেন বিশ্বমানবতার প্রতি তার দায়িত্বহীনতার এ অমার্জনীয় অপরাধের অনুভূতি জাগে; তারপর আত্মসংশোধন ও পুন: যোগ্যাতা অর্জনের মাধ্যমে এর ক্ষতিপূরণ ও প্রায়শ্চিত্তের প্রেরণা জাগ্রত হয়। একই সঙ্গে মানবজাতিও যেন তার দুর্ভাগ্যের কথা জানতে পারে, যার শিকার সে হয়েছে মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব থেকে তার বঞ্চিত হওয়ার কারণে। তদ্রূপ এ অমোঘ সত্য যেন সে অনুভব করতে পারে যে, অবস্থার বড় কোন পরিবর্তন কিছুতেই হতে পারে না, যতক্ষণ না বিশ্বের নেতৃত্ব, স্রষ্টার প্রতি ভয়, বিশ্বাস ও আনুগত্যহীন, বস্তুবাদী জীবনের পূজারী মানুষের হাত থেকে ঐ সকল খোদামুখী ও খোদাভীরু মানুষের হাতে আসবে যারা নববী তা'লীমাত ও শিক্ষা এবং হিদায়াত ও দীক্ষা থেকে জীবন-পথের পাথেয় ও দিকনির্দেশনা গ্রহণ করে; যাদের কাছে রয়েছে আখেরি নবীর আখেরি শরী'আত এবং দ্বীন ও দুনিয়ার মুকাম্মাল দস্তুর ও পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান।
লেখা কিছুদূর এগুতেই আমার পূর্ণ উপলব্ধি হয়ে গেলো যে, গভীরতা ও গম্ভীরতা এবং বিস্তার ও প্রসারের দিক থেকে এটি সাধারণ কোন প্রবন্ধের বিষয়বস্তু নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন বড় আয়তনের কোন কিতাব এবং কোন যোগ্য হাতে তা রচিত হওয়া সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। কারণ এ বিষয়ে খোদ মুসলিম সমাজেরও চিন্তাভাবনা তেমন স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন নয়। জীবন ও জগতের সঙ্গে দায়দায়িত্বের কোন সম্পর্কই এখন তারা অনুভব করে না। অনেকে অবশ্য উম্মাহর পতন ও অধঃপতনকে স্থানীয় গুরুতর ঘটনা বা জাতীয় বিপর্যয় মনে করে, কিন্তু এ অনুভূতি কারো নেই যে, এটা কেমন বিশ্বব্যাপী দুর্যোগ এবং সমগ্র মানবতার জন্য কত বড় দুর্ভাগ্য! বাস্তব সত্য এই যে, এ বিষয়টি এড়িয়ে গেলে আমরা না ইসলামের ইতিহাস বুঝতে পারবো, না মানবজাতির ইতিহাস; আর না মানবতার বর্তমান দুর্গতির সঠিক রূপ নির্ণয় করতে পারবো। সারা বিশ্বকে তছনছকরা এই যে ব্যাপক বিপ্লব, এর সঠিক কারণ ও অনুষঙ্গ নির্ধারণ করাও আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না, যা হচ্ছে ইসলামের বিশ্ব-বিপ্লবের পর পৃথিবীর সবচে' বড় বিপ্লব। পার্থক্য এই যে, প্রথমটি ছিলো অকল্যাণ থেকে কল্যাণের দিকে, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে; এবং ছিলো মুহম্মদী নবুয়তের আবির্ভাব ও ইসলামী দাওয়াতের উত্থানের ফল। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় বিপ্লবটি হচ্ছে উম্মতে মুহম্মদীর অধ:পতন এবং ইসলামী দাওয়াতের প্রতি অবহেলা, অবজ্ঞা ও উদাসীনতার ফল। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে আস্থা ও আত্মবিশ্বাস এবং ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তনের প্রেরণা ও কর্মোদ্যম সৃষ্টি করার জন্যও অবশ্যকর্তব্য হলো তাদেরকে তাদের অবস্থান ও মর্যাদা স্মরণ করিয়ে দেয়া এবং এটা বুঝিয়ে দেয়া যে, বিশ্বমানবতার বিনির্মাণের মহান কর্মপ্রচেষ্টায় তারা অত্যন্ত প্রভাবক ও কার্যকর উপাদান, তারা কোন চলন্ত যন্ত্রের নিছক যন্ত্রাংশ নয়; নয় কোন নাট্যমঞ্চের অভিনেতা মাত্র।
আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু হলো এবং কাজ এগিয়ে চললো, তবে বড় সমস্যা দেখা দিলো এই যে, এ বিষয়ে যেসব আরবী উৎসগ্রন্থের সাহায্য নেয়া জরুরি, আমার হাতের কাছে তা খুব কমই ছিলো। কারণ সময়টা ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। ভারতবর্ষ ও আরববিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ ছিলো প্রায় বিচ্ছিন্ন। সাধারণ -ভাবে আরবদেশে এবং বিশেষভাবে মিশরে ইতিহাস, সভ্যতা ও সংস্কৃতিবিষয়ক যে সমস্ত ইলমী কিতাব ও বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রন্থ ছিলো সহজলভ্য, ভারতবর্ষে তা খুব কমই আসতো। অবশ্য ইংরেজি ও উর্দুভাষার একাডেমিক উৎসগ্রন্থ পর্যাপ্ত পরিমাণে এবং হাতের নাগালে ছিলো। জ্ঞান ও সংস্কৃতির শহর বলে পরিচিত লক্ষ্ণৌতে অনেক সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ছিলো, যেখানে ইংরেজি ভাষার সর্বশেষ প্রকাশনা এবং বিভিন্ন জ্ঞানবিশ্বকোষ পাওয়া যায়। সেখানে আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিলো। প্রয়োজনীয় বইপুস্তক আমি ধার নিয়ে পড়তাম। বিভিন্ন ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারও আমার যথেষ্ট উপকারে এসেছে। এ কঠিন কাজটি আল্লাহ তা'আলা এভাবেও সহজ করে দিয়েছেন যে, নিকট অতীতে আমি ইউরোপের ধর্ম, সমাজ, চরিত্র, রাজনীতি, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাস খুব আগ্রহের সঙ্গে গভীর ও ব্যাপক পরিসরে অধ্যয়ন করেছিলাম। রাজা ও গীর্জার দ্বন্দ্ব এবং ধর্ম ও বিজ্ঞানের সঙ্ঘাত-বিষয়ে আমার পড়াশোনা ছিলো বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের। সুতরাং ইউরোপের চরিত্র ও নৈতিকতার ইতিহাস, এর ক্রমবিবর্তন এবং যেসব 'কার্যকারণ' ইউরোপের নৈতিকতাকে বিশেষ কাঠামো ও প্রকৃতি দান করেছে, যা ইউরোপকে বস্তুবাদের বর্তমান নাযুক অবস্থায় এনে পৌঁছিয়েছে, যা পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের জীবন ও চিন্তার গতিধারায় ব্যাপক ও গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে; এসব বিষয়ে আমার স্বচ্ছ ধারণা ছিলো। এছাড়াও রয়েছে ইসলামী প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, ধর্ম, ধর্মীয় ও সংস্কার-আন্দোলন ও দর্শনের ইতিহাস, ইসলাম ও মুসলিম জাতির ইতিহাস, আরবদের জাহেলি ও ইসলামি যুগের ইতিহাস, যা অধ্যয়ন করার মাধ্যম ছিলো সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বই-পুস্তক, এবং কবিতা ও সাহিত্যের সম্ভার। তো ধর্ম, সাহিত্য ও ইতিহাসচর্চার পরিবেশে প্রতিপালনের কারণে এ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা আমার জন্য অপেক্ষাকৃত সহজ ছিলো। তাছাড়া নদওয়াতুল উলামার বিরাট কুতুবখানায় এবং বিভিন্ন ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত সংগ্রহ ছিলো এবং ভারত উপমহা-দেশের অনুবাদ ও প্রকাশনা-আন্দোলনের সঙ্গে আমার অব্যাহত যোগাযোগ ছিলো। উন্নত মানের গবেষণামূলক পত্রপত্রিকাও আমার অধ্যয়নে ছিলো, যাতে মূল্যবান ও গবেষণাসমৃদ্ধ বহু প্রবন্ধ থাকতো।
সবকিছুর উপরে ছিলো আমার বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিপালনের বিশেষ পরিবেশ, যা ঐতিহ্যিকভাবেই এ বিশ্বাসে বিশ্বাসী ছিলো যে, ইসলামের দাওয়াত ও পায়গাম হচ্ছে চিরন্তন; মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল, যিনি 'তা-কেয়ামাত' মানবজাতির ইমামত ও নেতৃত্বের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত। আমিও এ বিশ্বাসের উপর প্রতিপালিত হয়েছে। এ বিষয়েও আমার পরিষ্কার ধারণা ছিলো যে, পাশ্চাত্যের জাতি ও সভ্যতার স্বভাব-প্রকৃতিতেই রয়েছে এমন কিছু বিচ্যুতি-স্খলন যা কোনভাবেই তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না; অতি প্রকটভাবেই যা ধরা পড়ে তার শাসন ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে। শুরু থেকেই এগুলো আমার চিন্তা-চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে পেরেছিলো আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই ডাক্তার সাইয়েদ আব্দুল আলী হাসানী (নদওয়াতুল উলামার মহাসচীব)-এর তারবিয়াত ও দীক্ষাগুণে, যিনি ছিলেন ইসলাম ও আধুনিক সংস্কৃতির সুসমন্বয়ের ক্ষেত্রে এক বিরল উদাহরণ। বস্তুত ইসলাম সম্পর্কে তাঁর বোধ ও উপলব্ধি যেমন ছিলো গভীর, তেমনি চিন্তা-চেতনাও ছিলো পূর্ণ ভারসাম্য পূর্ণ এবং সর্বপ্রকার উগ্রতা ও প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত। মূলত তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ তারবিয়াত ও প্রতিপালনই আমাকে এ যোগ্যতা দান করেছিলো, যা দ্বারা আমি আমার বৈচিত্র্যপূর্ণ অধ্যয়ন থেকে পূর্ণ উপকৃত হতে পেরেছি। (অনেক সময় যা মনে হয় পরস্পরবিরোধী এবং 'অপরিপক্ব' পাঠকের জন্য যা চিত্তচাঞ্চল্য ও চিন্তাবিক্ষেপের কারণ হয়) এবং তা থেকে সুনির্দিষ্ট ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আহরণে সক্ষম হয়েছি; বরং এ বৈচিত্র্যপূর্ণ অধ্যয়নই আমার অন্তরে এ আস্থা ও প্রত্যয় আরো সংহত করেছে যে, ইসলামের রয়েছে প্রত্যেক যুগে মানবসভ্যতাকে নেতৃত্বদান ও পথপ্রদর্শনের পূর্ণ যোগ্যতা এবং মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই হচ্ছেন সর্বশেষ রাসূল এবং সর্বযুগের সর্বজাতির পথপ্রদর্শক, হাদী ও রাহনুমা।
তারপরো বিষয়বস্তুর গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতা, সেইসঙ্গে নবীন বয়সের অল্প অভিজ্ঞতা, জ্ঞানস্বল্পতা এবং পথের ঝুঁকি ও বিপদ সম্পর্কে আমি পূর্ণ সচেতন ছিলাম। কিন্তু যে কথা আগেও বলেছি, এক্ষেত্রে আমি নিজের ইচ্ছা দ্বারা নয়, বরং কোন অদৃশ্য শক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়েছি। ভিতরের কোন প্রক্ষেপক যেন অন্তরে একথা প্রক্ষেপণ করেছে, 'ওঠো, কলম ধরো; সময়ের এ প্রয়োজন তোমাকেই পূর্ণ করতে হবে'। আল্লাহর নামে আমি কলম ধরলাম। লিখতে শুরু করলাম, এবং অদৃশ্যের পথ-নির্দেশনায় পূর্ণ উদ্যম ও উদ্দীপনার সঙ্গে লিখেই চললাম। প্রত্যেক প্রতিকূলতায়, প্রত্যেক জটিলতায় আল্লাহর সাহায্য হলো এবং এ দীর্ঘ কাজ শেষ পর্যন্ত সমাপ্তিতে উপনীত হলো। সর্বাবস্থায় সকল প্রশংসা আল্লাহর।
এরই মধ্যে ১৯৪৭-এ হিজাযের প্রথম সফর হলো এবং মক্কায় অবস্থানকালে মনে হলো, কিতাবের প্রথম অধ্যায়ে অনেক অসম্পূর্ণতা রয়েছে। জাহেলিয়াতের পুরো চেহারা-নকশা এখানে উঠে আসেনি। অথচ ইসলামের শানদার ইনকিলাব ও অনন্যসাধারণ বিপ্লব এবং অবিশ্বাস্য কীর্তি ও 'কারনামা' ততক্ষণ পর্যন্ত বুঝে আসতে পারে না যতক্ষণ না জাহেলিয়াতের পূর্ণ চিত্র ও চরিত্র উপস্থাপিত হবে এবং সবিশদ এটা তুলে ধরা হবে যে, মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাব ও ইসলামী দাওয়াতের আত্মপ্রকাশকালে পৃথিবীর অবস্থা কী ছিলো এবং ধর্মীয়, নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি কেমন ছিলো? তাই এ অধ্যায়ের উপর নতুন করে কাজ করার প্রয়োজন অনুভূত হলো। তখন দেখা গেলো, জাহেলিয়াত ও তার যুগ সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত একত্রে খুব কম পাওয়া যায়; যা কিছু আছে তা বহুগ্রন্থের বহুসহস্র পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এগুলো একত্র করে জাহেলিয়াতের একটা পূর্ণ ছবি ও চিত্র তৈরী করা, যাতে সে যুগের পূর্ণ জীবন ও চরিত্র এবং স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য উঠে আসে; নিঃসন্দেহে এটা সীরাতে নববীর এক বিরাট খেদমত, তবে এর জন্য চাই অপরিসীম ধৈর্য ও অধ্যবসায়। সৌভাগ্যক্রমে মক্কায় প্রাচীন ও আধুনিক কিছু গ্রন্থের একটি 'সঞ্চয়' পাওয়া গেলো, যা এক্ষেত্রে বেশ কাজে এসেছে। ভারতে আসার পরও অধ্যয়ন ও গবেষণা অব্যাহত ছিলো। একসময় অধ্যায়টি পূর্ণাঙ্গতা লাভ করলো। ফলে কিতাবের কলেবরও যথেষ্ট বৃদ্ধি পেলো।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি চিন্তা মনে এলো যে, মুহম্মদী নবুয়তের বহুমুখী প্রভাব এবং দাওয়াতে ইসলামের বিভিন্ন গুণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও বিশদ আলোচনা দরকার। এ দাওয়াতের স্বভাব, প্রকৃতি, কৌশল ও কর্মপন্থা কী? নবীগণ স্ব-স্ব যুগে জাতি ও সম্প্রদায়-এর ইছলাহ ও সংশোধন কীভাবে করতেন? তাঁদের দাওয়াত ও মেহনতের 'আন্দায'¹ ও প্রকৃতি সাধারণ সংস্কার-পুরুষ ও সংশোধন-প্রয়াসীদের থেকে কতটা ভিন্ন হতো? তাঁদের দাওয়াতের প্রতিক্রিয়া কেমন হতো এবং জাহেলিয়াত কী কী উপায় ও কৌশলে নববী দাওয়াতের মোকাবেলা করতো? নবীগণ তাঁদের অনুসারীদের শিক্ষা, দীক্ষা ও তারবিয়াত কীভাবে করতেন? অবশেষে দাওয়াত কীভাবে সফলতা লাভ করতো এবং জীবন ও চরিত্রের উপর এর কী কী সুফল ও সুপ্রভাব দেখা দিতো? এটি ছিলো কিতাবের অতি জরুরি একটি অধ্যায়, যা যুক্ত না হলে বিষয়বস্তু অসম্পূর্ণ থেকে যেতো এবং কিতাবের আবেদন ক্ষুণ্ণ হতো।
কিতাবটি উর্দুতে নয়, বরং ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين নামে আরবীভাষায় লেখা হয়েছে। কিন্তু কেন?! যে দেশ, সমাজ ও পরিবেশের সঙ্গে লেখকের সম্পর্ক এবং যে পরিমণ্ডলে গ্রন্থরচনার চিন্তা ও পরিকল্পনা তার স্বাভাবিক দাবী তো ছিলো ঐ দেশের জ্ঞান-চর্চার ভাষা উর্দুকেই মাধ্যমরূপে গ্রহণ করা! হাঁ, একটি বিশেষ চিন্তার অধীনেই আরবীকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, আর তা এই যে, আমি তীব্রভাবে অনুভব করেছি, আরববিশ্ব ও আরবজাতিই আজ হীনমন্যতা ও আত্মবিস্মৃতির সবচে' বড় শিকার। মানবজাতি যদিও তাদেরই কাছ থেকে নতুন জীবন এবং নতুন ঈমান লাভ করেছে, কিন্তু আজ তাদের পরিবেশই সবচে' বেশী নীরব, নির্বাক; তাদের জীবন-সমুদ্রই সবচে' বেশী নিস্তরঙ্গ। প্রাচ্যের দার্শনিক কবি আল্লামা ইকবাল কয়েক বছর আগে আরবভূখণ্ড ঘুরে এসে ভুল কিছু বলেননি-
মিশর-ফিলিস্তীনে সেই আযান আমি শুনিনি/ যা পর্বতে সৃষ্টি করেছিলো জীবনের স্পন্দন/ ঐ সিজদা যা ভূমির প্রাণে তুলতো কাঁপন/ সেই সিজদার জন্য ব্যাকুল আজ মিম্বর-মিহরাব।
ইউরোপের নৈকট্য, বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থা এবং ঐসব 'মাজনুপ্রাণ' ব্যক্তির সংখ্যাল্পতার কারণে, সৌভাগ্যক্রমে ভারতবর্ষে প্রজন্মপরম্পরায় যাদের রয়েছে বিপুল উপস্থিতি, দুর্ভাগ্যক্রমে পবিত্র আরবভূমি যাদের পুণ্যউপস্থিতি থেকে ছিলো বঞ্চিত, এসব কারণে আরবজাতি আজ খুব সহজেই ইউরোপের ধোকা, প্রতারণা ও কূটকৌশলের অসহায় শিকারে পরিণত হয়েছে। শায়খ হাসানুল বান্না, 'জীবন-সূর্য যখন মধ্যগগনে' ঘাতকের গুলিতে শহীদ হয়েছেন। তাঁর মত ব্যক্তিত্ব নিকট ভবিষ্যতে আসবে, এরূপ সম্ভাবনা তেমন দেখা যায় না। তাঁর প্রতিষ্ঠিত 'ইখওয়ানুল মুসলিমূন' ছাড়া আর কোন শক্তিশালী ইসলামী আন্দোলন ও দাওয়াতি মেহনত গোটা আরবজাহানে নেই। কোথাও কোন দ্বীনী তড়প ও অস্থিরতা এবং হিম্মত ও চঞ্চলতার চিহ্নমাত্র নেই। মানুষ হয় সময়ের সঙ্গে সমঝোতা করে নিয়েছে, কিংবা উম্মাহর ভবিষ্যত সম্পর্কে হতাশ হয়ে বসে পড়েছে। আর অনেকে নৌকা ভাসিয়েছে স্রোতের অনুকূলে। কোন মুসাফির যখন আরবজনপদের বর্তমান ও অতীতের মধ্যে তুলনা করে তখন দরদ-ব্যথায়-কাতর হয়ে বলতে বাধ্য হয়-
হেজাযের কাফেলায় আজ নেই কোন হোসাইন, যদিও দজলা-ফোরাত ও এখনো বয়ে যায় আগের স্রোতে।
এ বেদনাদায়ক অনুভূতির কারণেই 'হিন্দী মুসাফির'-এর কলম উর্দুর বদলে আরবীকেই গ্রহণ করেছে তার কান্না ও দরদ-ব্যথা প্রকাশে মাধ্যমরূপে। তাছাড়া গৌরবময় ইতিহাস এবং গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অবশ্যই আরব জাহান এখনো বিশ্বনেতৃত্বের দায়িত্বভার গ্রহণ করে সমগ্র সভ্য পৃথিবীকে প্রভাবিত করার পূর্ণ যোগ্যতা রাখে। আরবজনপদ লোহিত সাগর ও ভূমধ্য সাগরের তীরে অবস্থিত। পাশ্চাত্য ও দূরপ্রাচ্যের মাঝে তার অবস্থান। নতুন বিশ্ব বিপ্লব এবং ইসলামের দ্বিতীয় উত্থান ও নবজাগরণের জন্য আরবজাহান ও মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে অধিক উপযোগী আর কোন জনপদ হতে পারে না। এটাও ছিলো এক বড় 'অনুপ্রাণিকা', যার ভিত্তিতে দূর ভারতের বাসিন্দা হয়েও এমন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়বস্তুর জন্য আরবী ভাষাকেই আমি নির্বাচন করেছি এবং বিশ্বাস করি, আমি ঠিকই করেছি।
সাতচল্লিশের হিজাযসফরে পবিত্রভূমি ও তার অধিবাসীদের খুব নিকট থেকে দেখার এবং বিভিন্ন শ্রেণীর সঙ্গে ওঠাবসা ও আলাপ-আলোচনার যখন সুযোগ হলো, তখন কিতাবটি যথাসম্ভব দ্রুত প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার অনুভূতি আরো জোরদার হলো। কিন্তু লেখার জগতে, বিশেষ করে আরবীভাষায় কলম ধরার ক্ষেত্রে আমি ছিলাম নতুন। তাই স্বভাবতই কিছুটা দ্বিধা-উৎকণ্ঠা ছিলো যে, কিতাবটি কি আরবদেশে, আরবের বুদ্ধিজীবী মহলে সমাদর পাবে? একারণে আমার ইচ্ছা ও চেষ্টা ছিলো, কিতাবটি যেন মিশরের অভিজাত ও মর্যাদাপূর্ণ কোন প্রকাশনাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়, যাতে তা সর্বোচ্চ প্রচার ও পরিচিতি লাভ করে এবং লেখকের অন্তরের আসল যে উদ্দেশ্য ও চাহিদা তা পূর্ণ হয়। لجنة التأليف والترجمة والنشر হচ্ছে মিশরের অত্যন্ত অভিজাত প্রকাশনাপ্রতিষ্ঠান, যা উচ্চাঙ্গের বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রন্থপ্রকাশের কারণে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ খ্যাতি ও মর্যাদার অধিকারী। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হলেন ড: আহমদ আমীন, যিনি তার লেখার গুণে, বিশেষ করে ফজরুল ইসলাম, যোহাল ইসলাম সিরিজগ্রন্থের সুবাদে বিশ্বের সুধী মহলে অতি সমাদৃত ব্যক্তি। তাঁর চিন্তার বিশুদ্ধতা, সূক্ষ্মদর্শিতা, সিদ্ধান্তের নির্ভুলতা ইত্যাদি সম্পর্কে আমার সুধারণা ছিলো। তাই খুব আকাঙ্ক্ষা হলো, কিতাবটি যদি 'লাজনা' থেকে প্রকাশের ব্যবস্থা হতো, খুব ভালো হতো! কারণ এখান থেকে প্রকাশিত যে কোন গ্রন্থ আরববিশ্বে বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদার চোখে দেখা হয়। যারা বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর অধ্যয়ন ও জ্ঞান-গবেষণায় আগ্রহী তারা এবং শিক্ষিত আরব যুবসমাজ যথেষ্ট আগ্রহের সঙ্গে লাজনার প্রকাশিত গ্রন্থ গ্রহণ করে থাকে।
অনেক চিন্তা ও দ্বিধা-সঙ্কোচের পর আমি ড: আহমদ আমীনের নিকট এ বিষয়ে পত্র লিখলাম। সঙ্গে কিতাবের সূচীপত্রও পাঠালাম, যেন কিতাব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা লাভ করা সহজ হয়। অনেক দিন পার হলো, কিন্তু জানতে পারলাম না, প্রেরিত পত্র ও কাগজপত্র-এর কী পরিণতি হলো? অজ্ঞাত, অখ্যাত এক আজমি লেখক, যার কোন একাডেমিক কীর্তি নেই এবং যাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কেউ নেই তার 'আবেদনপত্রের' কীই বা গুরুত্ব হবে এত বড় প্রতিষ্ঠানের এমন বিরাট ব্যক্তির কাছে?! কিন্তু হঠাৎ একদিন আমাকে হতবাক করে এই অখ্যাত 'হিন্দী'র নামে পত্র এলো। তিনি অনুরোধ করলেন, কিতাবের কিছু নমুনা-অংশ পাঠাতে! পাঠালাম।
কিতাবের বিষয়বস্তু পছন্দ হলো, তবে তাঁর আশঙ্কা হলো, পাশ্চাত্যের শিক্ষা ও সভ্যতার সঙ্গে অপরিচিত একজন আলিমের লেখা 'কিতাবে' হয়তো ওয়াজ ও ধর্মীয় ছাপই প্রকট হবে, আজহার ও অন্যান্য প্রাচীন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাপ্রাপ্ত আলিমদের ক্ষেত্রে যেমন হয় বলে তাঁর ধারণা। তাই তিনি জানতে চাইলেন 'বিদেশী উৎস' কী পরিমাণ ব্যবহার করা হয়েছে? উত্তরে ইংরেজি উৎসগ্রন্থের তালিকা পাঠালাম। 'ডক্টর সাহেব' আশ্বস্ত হলেন এবং সুসংবাদ দিলেন, লাজনা আপনার কিতাব প্রকাশের জন্য অনুমোদন দিয়েছে। তদুপরি তিনি আত্মিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্যিক সর্বদিক থেকেই কিতাবটির উচ্চ প্রশংসা করলেন। বলতে দ্বিধা নেই, ঐ বয়সে ঐ পত্র পাওয়ার দিনটি ছিলো আমার জীবনের অন্যতম প্রধান আনন্দের দিন, যা আজ পর্যন্ত আমি ভুলিনি।
এরপর কয়েক মাস কেটে গেলো। কিতাবের ভাগ্যে কী ঘটলো, জানা হলো না। এর মধ্যে ১৩৬৯ হিজরীতে (১৯৫০ খৃঃ) হিজাযের দ্বিতীয় সফর হলো। হঠাৎ একদিন সিরিয়ার রাষ্ট্রদূত (দামেস্কের আল মাজমাউল ইলমীর মাননীয় সদস্য) উস্তাদ জাওয়াদ আল মুরাবিত-এর নিকট কিতাবের একটি নোসখা দেখতে পেলাম, যা তিনি কায়রো থেকে সংগ্রহ করেছেন। কিতাবটি দেখিয়ে তিনি হিন্দুস্তানী আলিমদের চিন্তার গভীরতা ও মৌলিকত্বের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। তিনি জানতেন না, স্বয়ং ছাহিবে কিতাবের সঙ্গেই তিনি কথা বলছেন! একজন নবীন লেখক, এভাবে এমন পরিবেশে তার জীবনের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থটির দেখা পেলে কী পরিমাণ আনন্দিত হতে পারে তা অনুমান করা খুবই সহজ। মাননীয় রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে 'পড়া শেষে ফিরিয়ে দেয়ার শর্তে কিতাবটি নিলাম। কিন্তু কিতাবের শুরুতে স্বয়ং আহমদ আমীনের ছোট আকারের ভূমিকাটি দেখে হতাশ হলাম। কারণ তাতে বক্তব্যের সেই জোরালো আবেদনটি অনুপস্থিত যা ড: আহমদ আমীনের মত বড় মাপের একজন লেখক-গবেষকের কাছ থেকে প্রত্যাশা ছিলো। গ্রন্থ ও গ্রন্থকার সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য ছিলো খুবই সংরক্ষিত।
বিষয়টি লেখকের জন্য কষ্টকর হলেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কোন গ্রন্থের ভূমিকা লেখার জন্য শুধু সুস্থ চিন্তা, সূক্ষ্মদর্শিতা ও বিস্তৃত অধ্যয়নই যথেষ্ট নয়; গ্রন্থের বিষয়বস্তু, আলোচনা-পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্তের প্রতি সহমর্মিতা এবং লেখকের যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, যে দাওয়াত ও বার্তা, তার প্রতি পূর্ণ আস্থা ও একাত্মতা থাকাও একান্ত জরুরী। লেখকের সঙ্গে তাকেও হতে হবে একই দাওয়াতের দা'ঈ, একই বার্তার বাহক এবং 'একই কিশতির মুসাফির'। এদিক থেকে ভূমিকা লেখকের মধ্যে যথেষ্ট ঘাটতি ছিলো। তিনি শুধু ছিলেন উচ্চস্তরের লেখক, গবেষক, চিন্তাবিদ ও সফল ইতিহাসবেত্তা। ইসলামের দ্বিতীয় উত্থান এবং বিশ্বনেতৃত্বের আসনে প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে তিনি খুব আশাবাদী ছিলেন না। এ বিষয়টিকে তিনি বড়জোর বুদ্ধিবৃত্তিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে পারেন, কিন্তু এর প্রতি তাঁর অন্তরে আলাদা কোন মমত্ব ও উচ্ছ্বাস এবং আবেগ ও উদ্দীপনা নেই। কিতাবটি প্রকাশে উদ্যোগী হলেও এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি তাঁর বিশেষ কোন অন্তরঙ্গতা ছিলো না। ফলে তাঁর লিখিত ভূমিকাটি ছিলো নিষ্প্রাণ ও আবেদনহীন, নিছক নিয়মরক্ষা ও দায়সারা-গোছের। মিশর, সিরিয়া, ফিলিস্তীন ও হিজায, সর্বত্র এটা অনুভূত হয়েছে যে, ভূমিকাটি কিতাবের রূপ ও স্বরূপ তুলে ধরা এবং মূল্য ও মর্যাদা বৃদ্ধি করার পরিবর্তে এর মূল প্রাণ ও আবেদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কিন্তু তখন আর কিছুই করার ছিলো না। তবু আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞ যে, ড: আহমদ আমীন কিতাবটি তাঁর প্রকাশনা- সংস্থা থেকে প্রকাশের ব্যবস্থা করেছেন এবং তা কল্যাণপ্রসূই হয়েছে। কেননা ঐসব মহলেও কিতাবটি সহজেই পৌঁছার সুযোগ পেয়েছে যেখানে মূল্যবান গবেষণাগ্রন্থও শুধু 'ধর্মীয়' পরিচয়ের কারণে প্রবেশাধিকার পায় না। ভালো না লাগতে পারে, কিন্তু এটাই বাস্তবতা।
১৯৫১ সালে যখন মিশর ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের সুযোগ হলো তখন এটা দেখে বিস্ময় যেমন হলো তেমনি আনন্দও হলো যে, সুধীসমাজ ও যুবমহলে কিতাবটি ব্যাপক সমাদর লাভ করেছে এবং অত্যন্ত মনোযোগ ও গুরুত্বের সঙ্গে পঠিত হচ্ছে। প্রকাশের দু'তিন মাসের মধ্যেই তা সমস্ত আরব দেশে পৌঁছে গেছে। আধুনিক সমাজের যারা ইসলাম সম্পর্কে দরদের সঙ্গে ভাবেন; যারা ইসলামের দ্বিতীয় উত্থান ও মুসলিম উম্মাহর নবজাগরণের মহান প্রচেষ্টায় নিবেদিত তারা কিতাবটি এমনভাবে গ্রহণ করেছেন, যা আমার প্রত্যাশা, এমনকি ধারণারও বাইরে। ইখওয়ানের কর্মতৎপরতা তখন একটু একটু শুরু হয়েছে। দুর্যোগের মেঘও কিছুটা কেটেছে। ইমাম হাসানুল বান্নার মর্মান্তিক শাহাদাতের কারণে হৃদয়ের গভীর ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে; এমন সময় কিতাবটি যেন তাদের জন্য ছিলো শোকের সান্ত্বনা, জখমের মলম এবং তাদের দরদে দিলের দাওয়া। তারা যে পথের পথিক কিতাবটি ছিলো সে পথেরই পাথেয়। তাদের হৃদয়ের অনুভব- অনুভূতিই যেন তাতে অনুরণিত হয়েছে। তাই কিতাবটি তারা অন্তর দিয়েই গ্রহণ করলেন। ইখওয়ানের দায়িত্বশীলরা এটিকে তাদের তালিম-তারবিয়াত ও প্রশিক্ষণ কোর্সের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন, এমনকি জেলখানায়ও কর্মীদের হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলেন। শুনে ভালো লাগলো যে, আদালতের বিতর্কে ও পার্লামেন্টের বক্তৃতায়ও কিতাবের উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে এবং তথ্য-উপাত্ত কাজে লাগানো হয়েছে।
লেখকের জন্য এটি যেমন সৌভাগ্যের বিষয় এবং শোকর ও কৃতজ্ঞতার কারণ তেমনি তা আরবের উদারচিত্ততা, গুণগ্রাহিতা, ন্যায়পরতা ও সত্যনিষ্ঠার সুস্পষ্ট প্রমাণ। কিতাব ও তার দূরদেশের অজ্ঞাত লেখকের প্রতি আরবদেশে যে সমাদর ও সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে তার আশা তো নিজের দেশে আপনজনের কাছেও করা যায় না। মিশরে আমার অবস্থানকালেই কিতাবটির দ্বিতীয় সংস্করণের সময় হয়ে গেলো, তখন আমার সুহৃদ এবং কিতাবটির 'সমঝদার' ড: মুহম্মদ ইউসুফ মুসা মরহুম (সাবেক উস্তায আলজামিউল আযহার, প্রফেসর ইসলামী আইনশাস্ত্র কায়রো ইউনিভার্সিটি) এগিয়ে এলেন এবং তাঁর নিজস্ব সংস্থা جماعة الأزهر থেকে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের প্রস্তাব দিলেন। লেখকের ইঙ্গিতে তিনি ড: আহমদ আমীনের কাছ থেকে অনুমোদনও সংগ্রহ করলেন। ফলে আগের ভুল সংশোধনেরও সম্ভাবনা তৈরী হলো।
এখন প্রয়োজন ছিলো ভূমিকা লেখার জন্য এমন যোগ্য ও বিজ্ঞ কোন ব্যক্তিকে নির্বাচন করা যিনি কিতাবের উদ্দেশ্য ও প্রাণপ্রেরণার প্রতি পূর্ণ আস্থা ও প্রত্যয় পোষণ করেন এবং যিনি এর প্রতি পূর্ণ একাত্ম ও আত্ম-নিবেদিত, যিনি নিজেই এ দাওয়াতের 'পুরজোশ' দাঈ ও আহ্বায়ক। সৈয়দ কুতুবই ছিলেন এর জন্য সবচে' উপযুক্ত ব্যক্তি। তিনি তখন আধুনিক মিশরে ইসলামী চিন্তা ও জীবনদর্শন এবং ইসলামী দাওয়াতের পতাকাবাহী। বহুদিন থেকে তাঁর কলম নওজোয়ান ও তরুণসমাজের ইসলামী চেতনা, আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত। তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিলো বিদগ্ধ আলিমের বিস্তৃত অধ্যয়ন, আধুনিক সাহিত্যের শিল্প ও শৈলীসৌন্দর্য, দাঈ-এর জযবা ও ইখলাছ এবং একজন নওমুসলিমের জোশ-উদ্দীপনার অপূর্ব সমাবেশ।
হাঁ, মুসলিম পরিবারের সন্তান হলেও বিশেষ অবস্থা ও পরিস্থিতির কারণে তাঁকে নওমুসলিমই বলতে হয়। প্রচলিত শিক্ষা-দীক্ষা ও সমাজ-পরিবেশ তাঁকে ইসলাম থেকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছিলো এবং তিনি ইসলাম থেকে 'বেগানা' হয়ে পড়েছিলেন। আল-কোরআনের সুগভীর ও একনিষ্ঠ অধ্যয়ন এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার ব্যর্থতা ও দৈন্য সম্পর্কে তাঁর চাক্ষুষ জ্ঞান তাঁকে আবার ইসলামের কাছে ফিরিয়ে এনেছে। তিনি নতুন উদ্যম-উদ্দীপনা, নতুন জোর ও জোয়ার এবং আস্থা ও প্রত্যয়ের সঙ্গে ইসলামে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। তিনি দারুল উলুম মিশর থেকে শিক্ষা সমাপন করেছেন এবং সাহিত্যসমালোচনার মাধ্যমে সাহিত্য- জগতে প্রবেশ করেছেন এবং খুব দ্রুত সুখ্যাতি অর্জন ও নিজস্ব অবস্থান তৈরী করেছেন (التصوير الفني في القرآن) (কোরআনের শিল্পচিত্র) (النقد الأدبي )সাহিত্যসমালোচনা( (مشاهد القيامة في القرآن) (কোরআনে কেয়ামতের দৃশ্য-চিত্র) এগুলো তাঁর ঐ সময়ের সুন্দর স্মারক এবং সাহিত্যিক, সমালোচক ও বোদ্ধামহলে সর্বপ্রিয় ও সফলতম গ্রন্থ।
দীর্ঘদিন শিক্ষাবিভাগে কর্মরত থাকার সুবাদে শিক্ষাবিষয়ক কতিপয় দর্শন ও চিন্তাধারা অধ্যয়নের জন্য কিছুদিন তাকে আমেরিকায় থাকতে হয়েছে। সেখানে তিনি পশ্চিমা সভ্যতা ও জীবন-দর্শনের ব্যর্থতা ও কদর্যতা নিজের চোখে দেখেছেন এবং তুলনামূলক চিন্তার মাধ্যমে ইসলামের সভ্যতা ও জীবনদর্শনের সৌন্দর্য অনুধাবন করেছেন। ফলে নতুন ঈমান ও বিশ্বাসে তিনি বলীয়ান হন এবং ইসলামের দাওয়াত ও পায়গামের প্রতি তাঁর অন্তরে নব-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। আমেরিকা থেকে ফেরার পর তিনি ইসলামের জোশীলা দাঈ এবং পশ্চিমা সভ্যতার চিন্তাশীল সমালোচকরূপে আত্মপ্রকাশ করেন। আর তখন থেকে তিনি প্রত্যয়দৃপ্ত ইসলামী সাহিত্য গড়ে তোলার মহান কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর চিন্তার বৈশিষ্ট্য এই যে, ইসলামকে তিনি একটি চিরন্তন ও বিশ্বজনীন পায়গাম মনে করেন, যে পায়গাম ছাড়া বিশ্বমানবতার মুক্তি ও নিরাপত্তা কল্পনা করা যায় না। তাঁর লেখনীর সবচে' বড় শৈলী-বৈশিষ্ট্য হলো আত্মরক্ষামূলক অবস্থানের পরিবর্তে আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করা এবং পশ্চিমা সভ্যতার ভিত্তিমূলে আঘাত হানা এবং প্রতিপক্ষের উপর আগে বেড়ে জোরদার হামলা করা। তাঁর দৃষ্টিতে ইসলামে কোন দুর্বলতা বা অসম্পূর্ণতা নেই, যার জন্য কৈফিয়ত দিতে হবে। ইসলামকে তিনি বরং পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধানরূপে পূর্ণ আস্থা ও প্রত্যয়ের সঙ্গে তুলে ধরেন। তাই তাঁর লেখা যারা পড়ে তাদের মধ্যে আস্থা ও প্রত্যয়ের এক নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং পশ্চিমা চিন্তাব্যবস্থার প্রতি অবজ্ঞা ও ঘৃণা বদ্ধমূল হয়ে যায়। বিশেষ করে তরুণ ও যুবশ্রেণী তাঁর লেখা দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়। তাঁর রচিত (العدالة الاجتماعية في الإسلام )কিছু কিছু ভুলবিচ্যুতি সত্ত্বেও) এই চিন্তা-পদ্ধতি ও রচনাশৈলীর সফল উদাহরণ, যা আধুনিক ইসলামী সাহিত্যে বিশেষ অবস্থান ও মর্যাদা লাভ করেছে।
সৈয়দ কুতুব এ কিতাবটি অত্যন্ত আগ্রহ ও মনোযোগের সঙ্গে অধ্যয়ন করেছেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত সাপ্তাহিক আলোচনাসভায় এর সংক্ষিপ্তসার তৈরী করা হয়েছে এবং এর উপর আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে, যাতে আমারও অংশ-গ্রহণের সুযোগ হয়েছে। আমার পক্ষ হতে কিতাবটির ভূমিকা লেখার অনুরোধ তিনি সানন্দে গ্রহণ করেছেন এবং এমন সারগর্ভ ও জীবন্ত ভূমিকা লিখেছেন যে, তাতে কিতাবের সারনির্যাস ও প্রাণপ্রেরণা এসে গেছে। ভূমিকাটি এখন কিতাবের শুরুতে শোভা ও সৌন্দর্যরূপে সন্নিবেশিত হয়েছে। যথার্থভাবেই এটিকে এখন কিতাবের সার্থক 'উদ্বোধনিকা' বলা যায়। এছাড়াও, ড: ইউসুফ মুসা মরহুমও মহত্ত্বের প্রকাশরূপে একটি ভূমিকা বা পূর্বকথা লিখেছেন, যাতে তিনি বইটি সম্পর্কে তাঁর অন্তর-অভিব্যক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাভাবনা প্রকাশ করেছেন।
এর মধ্যে ঘটেছে অভিনব একটি ঘটনা। আমার বন্ধু ড: আহমদ শিরবাছী (আল আযহারের প্রাজ্ঞ আলিম ও শিক্ষক) এক সাক্ষাতে বিভিন্ন কথার ফাঁকে আমার পরিবার, পরিবেশ, প্রতিপালন, শিক্ষা-দীক্ষা ও জীবন সম্পর্কে কিছু তথ্য কিভাবে যেন 'হাতিয়ে' নেন। আমি তেমন কিছু ভাবিনি; আর কল্পনায়ও আসেনি যে, এগুলো দিয়ে তিনি আমার পরিচিতিমূলক কোন 'রেখা-চিত্র' তৈরী করবেন। সত্য কথা এই যে, কিতাবের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার পরই শুধু তা আমার নযরে এসেছে। এটি তাঁর মুহব্বতের নিজস্ব প্রকাশ। তবে উর্দু অনুবাদে এ লেখাদু'টি সংযুক্ত না করাই আমার কাছে ভালো মনে হয়েছে।
সবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এ কিতাব মুসলিম বিশ্বের আলিম, বুদ্ধিজীবী, গবেষক, যুবসমাজ, ইসলামী আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীবৃন্দ, সর্বমহলে কীভাবে এতটা পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করলো এবং এরূপ অভাবনীয় আলোড়ন সৃষ্টি করলো? বিভিন্ন উপলক্ষে আমাকেও এ প্রশ্ন করা হয়। ১৯৮৭ সনের মার্চ মাসে জিদ্দা মালিক আব্দুল আযীয বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়, যাতে ছাত্র-শিক্ষকসহ বহু জ্ঞানী-গুণী ও সুধী-বুদ্ধিজীবী অংশগ্রহণ করেন। বিষয়বস্তু ছিলো ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين؟ কিতাবটির দাওয়াতি অবদান ও তাৎপর্য। অনেকেই মূল্যবান বক্তব্য রেখেছেন। সেখানেও আমাকে এ প্রশ্ন করা হয়েছে। তখন উত্তরে যা বলেছিলাম সংক্ষেপে সেটাই এখানে তুলে ধরছি।
'এ প্রশ্নের উত্তরে সর্বপ্রথম যা বলতে চাই তা এই যে, শুরু থেকে শেষ এটা শুধু এবং শুধু আল্লাহ তা'আলার অশেষ দয়া ও অনুগ্রহের প্রকাশ। তিনি যখন দয়া করেন, কবুল করেন এবং মাকবুল করেন তখন বান্দার যোগ্যতা ও কাজের সৌন্দর্য দেখেন না। সাধারণ থেকে সাধারণ মানুষ দ্বারাও তিনি কাজ নেন এবং তুচ্ছ থেকে তুচ্ছ কাজকে উম্মতের জন্য কল্যাণকর করে দেন। এ কিতাবটির ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এটাই ঘটেছে।
বাহ্যিক কোন কারণ যদি নির্দেশ করতে হয় তাহলে বলবো, এখানে আমার নতুন গবেষণা বা নব-আবিষ্কার বলে কিছু নেই। তবে বিষয়বস্তুটি ছিলো সম্পূর্ণ নতুন ও অভিনব। 'মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো?' আসলেই কি মানবজাতির ভাগ্য ও পরিণতি এবং বিশ্বের পরিস্থিতি ও ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর নিবিড় কোন সম্পর্ক রয়েছে, যার ভিত্তিতে প্রশ্ন করা যায়, উম্মাহর পতনের বিশ্বের কী ক্ষতি হলো? অথবা উম্মাহর নব-উত্থানে এবং মানবতার নেতৃত্বভার গ্রহণে বিশ্বের কী কল্যাণ হবে? মুসলিম জাতি কি এমন কোন অবস্থানে আছে যে, তাদের পতন ও অধঃপতনের কারণে এত শত জাতি ও সভ্যতার পৃথিবী ক্ষতিগ্রস্ত হবে?!!
এর আগে এ আঙ্গিকে মানুষ কখনো চিন্তাই করেনি। বিশিষ্ট-সাধারণ সবাই একটিমাত্র চিন্তাধারায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলো, আর তা হলো বিশ্বইতিহাসের বাতায়নপথে মুসলিম উম্মাহকে অবলোকন করা এবং বহু জাতি ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে উম্মাহকেও একটি সাধারণ জাতি ও জনগোষ্ঠীরূপে চিন্তা করা। কিন্তু এ কিতাবের লেখক সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে পূর্ব-অঙ্কিত সীমারেখা অতিক্রম করেছেন এবং ঐ প্রথাগত বৃত্ত থেকে বের হয়ে এসেছেন যা আরব-অনারব লেখক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবীসমাজের উপর আরোপ করা হয়েছে, আর তারা বিনাবাক্য-ব্যয়ে তা মেনেও চলেছেন। লেখক সম্পূর্ণ বিপরীত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে, বিশ্বকে তিনি মুসলিম উম্মাহর দর্পণে অবলোকন করবেন। বলা-বাহুল্য যে, উভয় দৃষ্টিকোণের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। একটি হলো, বিশ্ব-ইতিহাসের যা কিছু উত্থান-পতন, চলমান ঘটনাপ্রবাহ এবং বিশ্বের যা কিছু ভবিষ্যত সম্ভাবনা, এর আলোকে মুসলিম উম্মাহকে অবলোকন করা। মুসলিম উম্মাহ যেন সাধারণ কোন জনগোষ্ঠী, যাদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়, বৃহৎ পরিসরে পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে তা দ্বারা। সুতরাং চিন্তা-গবেষণা ও আলোচনা-পর্যালোচনার এপর্যন্ত এটাই ছিলো সাধারণ ধারা যে, অমুক ঘটনায়, অমুক রাজ্যের পতনে মুসলিম জাতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? পাশ্চাত্যের নবজাগরণ ও শিল্পবিপ্লব মুসলিম জাতির উপর কী প্রভাব ফেলেছে? উছমানি খেলাফতের বিলুপ্তিতে মুসলিম জাতি কী বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে? বিভিন্ন মুসলিম জনপদে পাশ্চাত্যের আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের কারণে মুসলিম জাতি বর্তমানে কী কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে? অর্থনৈতিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক দৈন্য ও সমর-শক্তিতে পিছিয়ে পড়ার কারণে মুসলিম জাতির আরো কী ভাগ্যবিপর্যয় ঘটতে পারে? এটাই ছিলো তখনকার গণ্ডীবদ্ধ ও প্রথাগত চিন্তাধারা, যাতে মানুষ সম্পূর্ণ অভ্যন্ত হয়ে পড়েছিলো।
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আমার বক্ষ উন্মোচিত করলেন এবং অন্তরে এ চিন্তা প্রক্ষেপণ করলেন যে, বিষয়টিকে আমি নতুন চেতনা ও নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবো। অর্থাৎ বিশ্বের দর্পণে মুসলিম উম্মাহকে নয়, বরং উম্মাহর দর্পণে বিশ্বকে দেখবো, যেন মুসলিম উম্মাহই হচ্ছে প্রধান ও কেন্দ্রীয় প্রভাবক। নিদিষ্ট কোন ভৌগোলিক সীমানায়, কিংবা বিশেষ কোন রাজনৈতিক অঞ্চলে নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহের উপর রয়েছে মুসিলম উম্মাহর মৌলিক প্রভাব। আমার আশঙ্কা, বহু ইসলামী লেখক, চিন্তাবিদ ও গবেষক, বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাদের রয়েছে অবিস্মরণীয় কীর্তি ও অবদান, তারা কেউ এভাবে বিষয়টি চিন্তা করেননি। কারণও ছিলো; যে জঘন্যভাবে ইসলামী ইতিহাসের বিকৃতি সাধন করা হয়েছে এবং আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত নতুন প্রজন্ম যে মর্মান্তিক হীনমন্যতা ও দৃষ্টিসঙ্কীর্ণতার শিকার হয়ে পড়েছে, তাতে মুসলিম উম্মাহর সঙ্কট-সমস্যাকে বশ্বের সমস্য ও মানবজাতির সঙ্কট বলে ভাবতে বহু লেখক-গবেষকই বিব্রত বোধ করেন। কোথায় মুসলিম উম্মাহ, আর কোথায় বিশ্বনেতৃত্ব?! কী আছে এখন মুসলিম উম্মাহর কাছে? দরিদ্র, দুর্বল, পশ্চাদপদ, পরাধীন এবং যুগের দুর্যোগ ও বিপ্লব-প্রতিবিপ্লবের সামনে অসহায় এক জাতি! সুতরাং কীভাবে যুক্তিগ্রাহ্য হতে পারে বিশ্ব ও বিশ্বমানবতার ভাগ্য-পরিণতিকে মুসলিম উম্মাহর ভাগ্য-পরিণতির সঙ্গে যুক্ত করা?! কিছুতেই না। বরং বহু মানুষ তো একথাই বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিলো না যে, মুসলিম জাতির এমন কোন অবস্থা ও অবস্থান রয়েছে, যাতে তারা এধরণের আলোচনায় উঠে আসতে পারে এবং এর উপর কোন কিতাব লেখা যেতে পারে যে, তাদের পতনের কারণে সমকালীন বিশ্ব ও মানবজাতি কোন প্রকার ক্ষতির সম্মুখীন হবে। বিষয়টি আসলেই ছিলো খুব নাযুক ও গুরুতর। এ বিষয়ে আলোচনায় অবতীর্ণ হওয়া ছিলো রীতিমত এক দুঃসাহসিক বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযান। কিন্তু গায়ব থেকে আল্লাহ তা'আলা সাহায্য করেছেন বলেই তা সম্ভব হয়েছে। এ কিতাবের গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার এটাই রহস্য যে, তাতে মুসলিম উম্মাহকে এমন উচ্চ অবস্থান থেকে দেখা হয়েছে যেখান থেকে সে ইতিহাসের গতিধারা পরিবর্তন করতে পারে এবং পারে মানবজাতির ভাগ্য- নিয়ন্ত্রণ করতে।
আলহামদু লিল্লাহ নিজের সম্পর্কে আমি কোন ভুল ধারণায় লিপ্ত নই। নিজের জ্ঞানের দৈন্য, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পুঁজির স্বল্পতা সম্পর্কে আমার পরিষ্কার ধারণা রয়েছে। সুতরাং এ কিতাবে বুদ্ধিবৃত্তিক নতুন কোন আবিষ্কার, নতুন গবেষণা, নতুন উদ্ঘাটন ও ইজতিহাদ, এজাতীয় কোন দাবী আমার নেই। এখানে পূর্ণ সততার সঙ্গে শুধু একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হয়েছে। চিন্তার জগতে স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন ছিলো, যার যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তর এখানে আন্তরিকতার সঙ্গে সন্ধান করা হয়েছে। শুধু এইটুকু, এর বেশী কিছু নয়। হয়ত এ প্রশ্ন আরো অনেকের চিন্তায় এসেছে এবং বিভিন্ন উপায়ে এর সমাধানও উপস্থাপন করা হয়েছে। হয়ত প্রত্যেকের চিন্তার পথ ও পন্থা ভিন্ন এবং সমাধানও ভিন্ন, তবে আন্তরিকতা ও ঐকান্তিকতা অভিন্ন। এটা হতে পারে এবং হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে প্রশ্নটিকে আমি আলোচনা-পর্যালোচনা ও অনুসন্ধান- গবেষণার অঙ্গনে নিয়ে এসেছি এবং স্বতন্ত্র বিষয়রূপে এর উপর ঐতিহাসিক উপকরণ ও তথ্য-উপাত্ত একত্র করে দিয়েছি। এর দ্বারা যদি কোন হৃদয়ে নতুন ঈমানী চেতনা জাগ্রত হয় এবং কোন বিবেকে কিছুটা দহন-যন্ত্রণা সৃষ্টি হয় আর নিজ নিজ সাধ্যের পরিধিতে কর্মসচেতন হয় তাহলেই ভাববো, লেখক হিসাবে আমার উদ্দেশ্য সফল।
কল্যাণপ্রসূ যে কোন বিপ্লব এবং সৎ, সুন্দর ও আদর্শ সমাজ গঠনের জন্য বিবেক ও চেতনার জাগৃতি এবং মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি অপরিহার্য। আর এজন্য চাই ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ ও উদ্দেশ্যমুখী নতুন বিন্যাস এবং চাই এমন সব গবেষণা-গ্রন্থ যা একদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক আশ্বস্তি ও চিত্ত-প্রশান্তি সৃষ্টি করবে; অন্যদিকে নতুন বিশ্বাস ও প্রত্যয়, নতুন বল ও মনোবল এবং নতুন কর্ম- উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে। অতিকথন ও অতিবিনয়, দু'টো থেকেই মুক্ত হয়ে একথা বলার সাহস করছি যে, বিষয়বস্তু ও তথ্য-উপাত্তের দিক থেকে কিতাবটি এক্ষেত্রে অত্যন্ত উপকারী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ইসলামী দাওয়াত ও ইসলামী চিন্তার সর্বমহল তা দ্বারা উপকার লাভ করতে পারে।
وما توفيقي إلا بالله، عليه توكلت وإليه أنيب
আবুল হাসান আলী
নদওয়াতুল উলামা, লৌখনো, ভারত
২০শে রজব, ১৪০১ হি.
২৪শে মে ১৯৮১ খৃ.
টিকাঃ
১. আন্দায শব্দটি মূলত ফার্সি। সেখান থেকে উর্দু ও বাংলায় শব্দটির আগমন। বাংলায় শব্দটির অর্থ অনুমান, ধারণা। (আন্দাযে ঢিল ছোঁড়া, আন্দাযের উপর লেখা) অনুভব করা, টের পাওয়া। (অন্ধকারেও আন্দায পাচ্ছি ঘরে কেউ ঢুকেছে।) আনুমানিক, মোটামুটি। (সভায় আন্দায দু'শ লোক হয়েছে। আন্দায পাঁচশ' টাকা খরচ হবে।) অনুরূপ, আনুপাতিক পরিমাণ। (একসের ময়দা, সেই আন্দায ঘী)। উর্দুতে এসব অর্থে (আন্দাযা) শব্দটি ব্যবহৃত হয়। উর্দুতে আন্দায শব্দটির অর্থ, ভাব, ভঙ্গি, ধরণ, প্রকৃতি। এখানে শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলায় বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এ অর্থে শব্দটি ব্যবহার করার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলেই মনে হয়। যেমন, 'তার লেখার একটি নিজস্ব আন্দায আছে।' 'আমাকে অনেকেই মুহব্বত করে, তবে তোমার মুহব্বতের আন্দাযই আলাদা!'
📄 ভূমিকা (সাইয়েদ কুতুব)
মুসলিম উম্মাহর আজ এমন যোগ্য মানুষের কত না প্রয়োজন, যিনি গৌরবময় অতীতের প্রতি তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনবেন এবং সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত সম্পর্কে তাদের উজ্জীবিত করে তোলবেন। (অবিচল বিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় নিয়ে উম্মাহকে যিনি বলতে পারবেন, তোমাদের সুন্দর অতীত ছিলো এবং তোমাদের সুন্দর ভবিষ্যত রয়েছে।)
এমন মানুষের আজ সত্যি বড় প্রয়োজন, যিনি দ্বীনের প্রতি তাদের ঈমান ও বিশ্বাসকে নতুন শক্তি ও সজীবতা দান করবেন, যারা দ্বীনের নাম তো ধারণ করে, কিন্তু হাকীকত ও মর্ম অনুধাবন করে না, যারা নিছক রক্ত-সূত্রে 'মুসলিম' পরিচয় তো বহন করে, কিন্তু পরিচয়-মর্যাদা উপলব্ধি করে না। ماذا خسر العالم কিতাবটি উম্মাহর সে প্রয়োজন পূরণেরই একটি সার্থক প্রচেষ্টা। এ বিষয়ে আধুনিক ও প্রাচীন যা কিছু আমি পড়েছি তার মধ্যে নিঃসন্দেহে এটি অন্যতম সেরা গ্রন্থ। (ইসলামে দুর্বলতা ও হীনমন্যতার কোন অবকাশ নেই) ইসলাম হচ্ছে শ্রেষ্ঠত্ব-বোধের আকীদা, বিশ্বাস ও প্রত্যয়, যার বড় বৈশিষ্ট্য এই যে, মুমিনের অন্তরে তা মর্যাদাবোধ সঞ্চারিত করে, তবে অহঙ্কার ছাড়া এবং আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে, তবে আত্মপ্রতারণা ছাড়া এবং স্বস্তির অনুভূতি জাগ্রত করে, তবে দায়িত্বহীনতার মানসিকতা ছাড়া। এ বিশ্বাস তাদের মধ্যে এ চেতনা সৃষ্টি করে যে, তাদের কাঁধে অর্পিত হয়েছে বিশ্বমানবতার দায়িত্বভার; পূর্ব-পশ্চিম, পৃথিবীর সব জনপদের সমগ্র মানব সম্প্রদায়ের অভিভাবকের দায়িত্বভার। উম্মাহ হিসাবে তাদের কর্তব্য হলো পথহারা মানব-কাফেলাকে সিরাতুল মুস্তাকীমের দিকে পথপ্রদর্শন করা এবং 'সর্ব-অন্ধকার' থেকে উদ্ধার করে সেই আলো ও নূরের দিকে নিয়ে আসা, যা আল্লাহ তাদের দান করেছেন হিদায়াতের কিতাব আল কোরআনরূপে-
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত যাদের উত্থিত করা হয়েছে মানুষের (কল্যাণের) জন্য। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করো এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করো, আর আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখো। (আলে ইমরান, ৩: ১১০)
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّসُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا
আর এভাবেই আমি তোমাদের বানিয়েছি এক মধ্যপন্থী সম্প্রদায়, যাতে তোমরা সাক্ষী থাকো লোকেদের উপর, আর রাসূল সাক্ষী থাকেন তোমাদের উপর। (বাকারাহ, ২: ১৪৩)
আমার সামনে এই যে কিতাবটি, পাঠকের অন্তরে তা এ সকল অনুভব অনুভূতিই জাগিয়ে তোলে এবং এ সকল চিন্তা-চেতনাই প্রবাহিত করে। তবে কিতাবের বর্ণনাশৈলী ও উপস্থাপন-পদ্ধতি এমন নয় যে, শুধু ভাবাবেগ উসকে দিলো, কিংবা ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করলো; বরং প্রতিটি বক্তব্যের স্বপক্ষে তিনি বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণ ব্যবহার করেছেন, যা যুগপৎ চিন্তা, বুদ্ধিবৃত্তি ও আবেগ-অনুভূতিকে সম্বোধন করে। সমস্ত ঐতিহাসিক ঘটনা এবং সে যুগের পরিবেশ-পরিস্থিতি তিনি অত্যন্ত ন্যায়ানুগ ও যুক্তিনিষ্ঠরূপে উপস্থাপন করেছেন। তদুপরি যে বিষয়ই আলোচনায় এসেছে সেক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার সত্য ও বাস্তবতা এবং যুক্তি ও বিবেকের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, যার ফলে সমস্ত আলোচনা-পর্যালোচনা, যুক্তি ও তথ্যপ্রমাণ যেন সারিবদ্ধ ও সুশৃঙ্খলভাবে তাঁর দাবীর অনুকূলে এসে দাঁড়িয়েছে। কোন ক্ষেত্রেই যুক্তি-প্রয়োগ ও সিদ্ধান্ত আহরণের ক্ষেত্রে অজ্ঞতা ও কৃত্রিমতার সামান্যতম ছাপও পড়েনি। আমার দৃষ্টিতে এটাই হচ্ছে এ কিতাবের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ইসলামের আলো উদিত হওয়ার পূর্বে পৃথিবীর কী অবস্থা ছিলো? পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ, প্রতিটি জনপদে কী পরিবেশ-পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিলো? চীন, আরব ও হিন্দুস্তান থেকে শুরু করে রোম ও পারস্য পর্যন্ত বিস্তৃত সমকালীন পৃথিবীর চিন্তানৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক রূপ ও প্রকৃতি কেমন ছিলো? তখন সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ঝোঁক ও প্রবণতা এবং অভিমুখ ও গতিধারা কোন দিকে ছিলো? যে সমস্ত সম্প্রদায়ের উপর আসমানি ধর্মের ছায়া ছিলো, যেমন ইহুদি-ধর্ম ও খৃস্ট-ধর্ম, কিংবা যারা মুর্তিপূজা-ধর্মের অনুসারী ছিলো, যেমন হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম ও জরথোস্ট্রীয় ধর্ম, তাদের জীবন ও নীতি-নৈতিকতার কী অবস্থা ছিলো? কিতাবের প্রারম্ভ-অংশে এসব প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত, তবে স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বস্তুত এটি অতি সর্বাঙ্গিণ ও সুসম্পূর্ণ একটি 'জীবনচিত্র' যা মানবভূখণ্ডের সঠিক রেখা ও রূপরেখা ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু এ বিষয়ে লেখক এখানে কোন প্রকার হঠকারিতা প্রকাশ করেননি বা পূর্ব-নির্ধারিত কোন সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছাচারিতার সঙ্গে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেননি, বরং সম্পূর্ণ পর্যালোচনায় আধুনিক ও প্রাচীন অমুসলিম লেখক, গবেষক ও ঐতিহাসিকদেরও শরীক রেখেছেন। অথচ এটাই খুব স্বাভাবিক যে, ইসলামের বিষয়ে তারা উদ্দেশ্য-তাড়িত হবে এবং মুসলিম উম্মাহর অতীতের নেতৃত্বকালকে কলঙ্কিত করার কিছু না কিছু চেষ্টা করবে। বলাবাহুল্য, সে চেষ্টা তারা করেছেও যথেষ্ট। লেখক ঐ সময়ের পৃথিবীর চিত্র উপস্থাপন করেছেন যখন জাহেলিয়াতের চিন্তা চেতনারই একক আধিপত্য ছিলো। বিবেক-বুদ্ধি, হৃদয় ও আত্মা, এককথায় সর্ব-মানবসত্তায় পচন ধরে গিয়েছিলো। সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় সবকিছুর মাপকাঠি এবং যাবতীয় মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। মানুষ ছিলো দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দী এবং যুলুম-অনাচার ও শোষণ-নিপীড়নের অসহায় শিকার। মানবতার বুনিয়াদ ধ্বসে পড়েছিলো, একদিকে পাপাচারপূর্ণ বিলাস-প্রাচুর্য, অন্যদিকে সীমাহীন বঞ্চনা ও দুর্দশার কারণে। তদুপরি সমগ্র মানব-জাতির উপর কুফুর ও গোমরাহীর অন্ধকার ছেয়ে গিয়েছিলো। যদিও তখনো আসমানি ধর্ম ছিলো, কিন্তু তা বিকৃতির শিকার হয়ে পড়েছিলো এবং তাতে ঘুণ ধরে গিয়েছিলো। মানুষের চিন্তা-চেতনা ও জীবনাচরণের উপর তার কোন নিয়ন্ত্রণ ছিলো না। ধর্মগুলোর বাহ্যিক কাঠামোই শুধু রয়ে গিয়েছিলো, যাতে না ছিলো রূহ, না ছিলো প্রাণ। বিশেষ করে খৃস্টধর্মের অবস্থা ছিলো আরো শোচনীয়, যার নিখুঁত চিত্র এঁকেছেন জি, এইচ, ডেন্সন তার emotions as the basis of civilization গ্রন্থে। তিনি বলেন, 'পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে সভ্য পৃথিবী নৈরাজ্যের ধ্বংস-গহ্বরের মুখে দাঁড়িয়েছিলো। কেননা যে সকল ধর্মবিশ্বাস সভ্যতার বিনির্মাণে সহায়ক হয় সেগুলোই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। সেখানে উল্লেখযোগ্য এমন কিছু ছিলো না, যা সেগুলোর স্থান গ্রহণ করতে পারে। তখন মনে হচ্ছিলো, যে সভ্যতা গড়ে তুলতে চারহাজার বছরের প্রয়াস-প্রচেষ্টা ব্যয় হয়েছিলো তা ছিন্নভিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং মানবজাতি আবার অসভ্যতা ও বর্বরতার পূর্ববর্তী স্থানে ফিরে যাচ্ছে। কেননা গোত্র ও সম্প্রদায়গুলো পরস্পর সঙ্ঘাত-সঙ্ঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো। আইন-শৃঙ্খলা বলতে কিছু ছিলো না। পক্ষান্তরে খৃস্টধর্ম যেসব ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলো তা ঐক্য ও শৃঙ্খলার পরিবর্তে বিভেদ ও বিপর্যয় সৃষ্টির পক্ষেই কাজ করছিলো। সভ্যতা যেন ছিলো ডালপালা ছড়ানো এক বিরাট বৃক্ষ, যার ছায়া সারা বিশ্বে বিস্তৃত ছিলো, তবে তা দাঁড়িয়ে থাকলেও পতনোন্মুখ অবস্থায় ছিলো এবং বিনষ্টি তার মর্মমূলে পৌঁছে গিয়েছিলো। এই ব্যাপক ফাসাদ ও বিপর্যয়ের মধ্যেই সেই মানুষটি জন্মগ্রহণ করলেন যিনি সমগ্র বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।'¹
জাহেলিয়াতের অন্ধকারে আচ্ছন্ন পৃথিবীর চিত্র উপস্থাপনের পর লেখক মানব- জাতির জীবনে ইসলামের ভূমিকা ও অবদানের আলোচনা শুরু করেছেন এবং দেখিয়েছেন, কীভাবে ইসলাম মানবজাতিকে যাবতীয় কুসংস্কার থেকে মুক্তি দান করেছে এবং দাসত্বের লাঞ্ছনা থেকে উদ্ধার করেছে; কীভাবে হৃদয় ও আত্মাকে সব ব্যাধি ও অবক্ষয় এবং কদর্যতা ও পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করেছে। সর্বোপরি মানবসমাজকে যুলুম, শোষণ, নিপীড়ন, শ্রেণীবৈষম্য ও শাসকদের স্বেচ্ছাচার থেকে এবং পুরোহীতদের ধর্মীয় স্বৈরাচার থেকে রক্ষা করেছে। ইসলাম আত্মিক পবিত্রতা, নৈতিক শুচিতা, ইতিবাচক ব্যক্তিত্বগঠন, স্বাধীনতা ও নবশক্তির উত্থানের মযবুত বুনিয়াদের উপর এবং বিশ্বাস, আস্থাবোধ, পরিজ্ঞান, সুবিচার ও আত্মমর্যাদার সুদৃঢ় ভিত্তির উপর পৃথিবীর নতুন পরিচয় সৃষ্টি করেছে। জীবনকে উন্নতি ও অগ্রগতির পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য অব্যাহত কর্মপ্রচেষ্টা ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনার উপর উদ্বুদ্ধ করেছে। জীবনের অঙ্গনে প্রত্যেককে তার প্রাপ্য স্থান ও যথাযথ অধিকার দান করেছে।
এসব অবিস্মরণীয় কীর্তি ও কর্ম ইসলাম সম্পন্ন করেছে যখন এবং যেখানে নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও কার্যক্ষমতা ছিলো ইসলামের হাতে। আর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের আসন থেকেই শুধু ইসলাম তার যোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ স্বভাবগতভাবেই ইসলাম শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাস পোষণ করে এবং নেতৃত্বের সুনির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা ধারণ করে। সৃজনশীলতা ও স্বকীয়তাই হচ্ছে ইসলামের প্রকৃতি; অধীনতা ও অনুসরণ নয়। এর পর এলো সেই সময় যখন মুসলিম জাতি অবক্ষয় ও অধঃপতনের শিকার হলো এবং বিশ্বনেতৃত্বের যে দায়িত্ব ইসলাম তাদের উপর অর্পণ করেছিলো তা থেকে তারা সরে গেলো; এমনকি মানবতার অভিভাবকত্ব এবং ঐসব দায়-দায়িত্ব থেকেও তারা হাত গুটিয়ে নিলো, জীবনের প্রতিটি গতিপথে যা তাদের পালন করার কথা ছিলো। এর ফলে জীবন ও জগতের উপর নিয়ন্ত্রণ ইসলামের হাতছাড়া হয়ে গেলো। এখানে লেখক এই আত্মিক ও জাগতিক অবক্ষয়ের বিভিন্ন কারণ পর্যালোচনা করেছেন এবং দ্বীন থেকে বিচ্যুতি ও দায়-দায়িত্ব থেকে নিবৃত্তির কারণে স্বয়ং মুসলিমজাতি যে দুর্দশা ও দুর্যোগের সম্মুখীন হয়েছে তা বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। তারপর মানবজাতি এই কল্যাণ-নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার এবং জাহেলিয়াতের দিকে ফিরে যাওয়ার কারণে সমগ্র বিশ্বের উপর যে মহাদুর্যোগ নেমে এসেছে তারও বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। লেখক মানবতার ভয়াবহ অধঃপতনের যে রেখাচিত্র এঁকেছেন তা এমন সময় ঘটেছে যখন জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, প্রযুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির বিস্ময়কর সকল দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছিলো এবং মানবসভ্যতা বস্তুজগতে বিরাট অগ্রগতি অর্জন করেছিলো। এ রেখাচিত্র তিনি এঁকেছেন গভীর চিন্তা ও অনুসন্ধিৎসার মাধ্যমে; উচ্ছ্বসিত আবেগ ও জ্বালাময়ী ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে নয়। কেননা লেখক যে সকল সত্য ও তথ্য এবং বাস্তব প্রমাণ পেশ করেছেন তা কোন প্রকার অতিকথন ও অতিরঞ্জনের মুখাপেক্ষী ছিলো না।
এসমস্ত ঐতিহাসিক পর্যালোচনার আলোকে পাঠক অবশ্যই উপলব্ধি করবেন যে, মানবতার অস্তিত্বরক্ষার জন্যই আজ বিশ্বনেতৃত্বে পরিবর্তনের কত প্রয়োজন এবং কত প্রয়োজন ঐ সত্যের দিকে প্রত্যাবর্তনের যার অবির্ভাব ঘটেছে মানুষকে সর্ব- অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এবং জাহেলিয়াত থেকে জ্ঞান ও অন্তর্জানের দিকে বের করে আনার জন্য। পাঠক আরো উপলব্ধি করবেন যে, পৃথিবীতে এ কল্যাণ -নেতৃত্ব বিদ্যমান থাকা কত অপরিহার্য এবং এর অনুপস্থিতির কারণে শুধু মুসলিমজাতি নয়, বরং সমগ্র মানবজাতি কী ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বস্তুত এ ক্ষতির পরিধি এত ব্যাপক ও বিস্তৃত যে, তা অতীত, বর্তমান এবং নিকট ও দূর ভবিষ্যত সবকিছুকেই বেষ্টন করে আছে।
এ কিতাবের মাধ্যমে একই সঙ্গে মুসলিম হৃদয়ে লজ্জা ও অনুতাপের অনুভূতি জাগে যে, কী অমার্জনীয় অপরাধ সে করেছে; আবার মর্যাদার চেতনাও সৃষ্টি হয় যে, কী বিপুল যোগ্যতা তাকে দান করা হয়েছে; এমনকি সেই নেতৃত্ব পুন:- অর্জনের প্রেরণাও তার মধ্যে সঞ্চারিত হয়, যা সে গাফলতে অবহেলায় হাতছাড়া করেছে। একটি প্রশংসনীয় দিক এই যে, মুসলিমজাতির নেতৃত্বদানের অক্ষমতার কারণে মানবজাতি যে মহাদুর্যোগ ও অধঃপতনের শিকার হয়েছে, লেখক সেটিকে সব-সময় 'জাহেলিয়াত' বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ সুচিন্তিত শব্দব্যবহার একথার সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, ইসলামের মূলপ্রাণ এবং অতীত ও বর্তমান জাহেলিয়াতের মূলপ্রাণের মধ্যকার পার্থক্যটি লেখক যথার্থ উপলব্ধি করেন। বস্তুত আবরণে যত ভিন্নতাই থাক, স্বভাব, চরিত্র ও প্রকৃতির দিক থেকে প্রাচীন জাহেলিয়াত, যা ইসলামের পূর্বে পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো এবং আধুনিক জাহেলিয়াত, যা নেতৃত্বের আসন থেকে ইসলামের অপসরণের পর আজ পৃথিবীর উপর আধিপত্য বিস্তার করে আছে, দু'টোই সম্পূর্ণ অভিন্ন। বস্তুত জাহেলিয়াত নির্দিষ্ট কোন সময়, বা স্থানের গণ্ডীতে আবদ্ধ নয়, বরং জাহেলিয়াত হচ্ছে হৃদয়, আত্মা, চিন্তা, বুদ্ধি ও জীবনের একটা বিশেষ রূপ ও প্রকৃতি, যা তখনই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে যখন মানবজীবনের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত মৌলিক মূল্যবোধগুলোর পতন ঘটে এবং ঐসব কৃত্রিম মূল্যবোধ তার স্থলবর্তী হয় যার ভিত্তি হচ্ছে ভোগবাদ ও বস্তুবাদ, যার যন্ত্রণা মানবজাতি আজ তার চরম উন্নতির যুগেও ভোগ করছে, যেমন ভোগ করেছে বর্বরতার প্রথম যুগে। বিজ্ঞ লেখক কিতাবের শেষ অধ্যায়ে লিখেছেন-
'চৌদ্দশ বছর আগের মত আজো বিশ্বমানবতার উদ্দেশ্যে ইসলামী উম্মাহর একই দাওয়াত, একই পায়গাম, অর্থাৎ- 'হে মানুষ, এক আল্লাহকে বিশ্বাস করো। আল্লাহর রাসূলকে বিশ্বাস করো, এক আল্লাহর ইবাদত করো। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো। আখেরাত ও বিচারদিবসে বিশ্বাস করো।'
এই দাওয়াত ও পায়গাম কবুল করার পুরস্কার কী? পুরস্কার এই যে, জাহেলিয়াতের যে পরত পরত অন্ধকারে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ ডুবে আছে তা থেকে বের হয়ে ঈমান ও বিশ্বাসের আলোর বলয়ে প্রবেশ করবে। মানুষের গোলামি ও দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহর দাসত্ব ও বন্দেগির গৌরব অর্জন করবে। জীবনের সঙ্কীর্ণ কারাগার ও যিন্দেগীর যিন্দানখানা থেকে বের হয়ে জীবনের মুক্ত অঙ্গনে এবং পৃথিবীর প্রশস্ত পরিবেশে শান্তি ও স্বস্তির শ্বাস গ্রহণ করবে। বিভিন্ন ধর্মের অনাচার ও বাদ-মতবাদের স্বেচ্ছাচার থেকে বের হয়ে স্বভাবধর্ম ইসলামের ন্যায় ও সুবিচারের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করবে।
অতীতের যে কোন যুগের তুলনায় এ দাওয়াত ও পায়গামের সত্যতা ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং গুরুত্ব ও প্রয়োজন অনুধাবন করা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। কেননা জাহেলিয়াত আজ ভরা বাজারে নাঙ্গা হয়ে গেছে। তার সব পঙ্কিলতা ও কলঙ্ক-কালিমা উৎকটভাবে ধরা পড়ে গেছে। জড়বাদী ও ভোগবাদী জীবনের অনাচার-স্বেচ্ছাচারে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। সর্ব-অন্তরে জাহেলিয়াতের প্রতি ঘৃণা ও ধিক্কার উপচে পড়ছে। বিশ্ব এখন জাহেলিয়াতের নেতৃত্ব ত্যাগ করে ইসলামের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ইসলামী উম্মাহরও তার ছিনতাই হওয়া নেতৃত্ব পুনরুদ্ধার করার এখনই সর্বোত্তম সুযোগ। যদি আজ ইসলামী উম্মাহ উঠে দাঁড়ায় এবং ইখলাছ, আত্মনিবেদন, পূর্ণ উদ্যম ও সঙ্কল্পের সঙ্গে এই দাওয়াত ও পায়গাম বুকে ধারণ করে আবার মানবজাতিকে ডাক দেয়, আস্থার সঙ্গে, দরদের সঙ্গে, মমতার সঙ্গে, কল্যাণকামিতার সঙ্গে; যুক্তি দিয়ে, ভক্তি দিয়ে, আচরণ দিয়ে এবং জীবনের পাতায় অঙ্কন করে বিশ্বকে যদি সে বোঝাতে পারে যে, এটাই একমাত্র দাওয়াত ও পায়গাম, যা মানবতা ও মানবসভ্যতাকে পতন ও অধঃপতনের চরম পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারে; যদি মুসলিম উম্মাহ মানবজাতিকে একথা বোঝাতে পারে তাহলে কবির ভাষায়- 'এ ভূমি এখন বড় সিক্ত উর্বর এবং খুবই উপযোগী; চাই শুধু উন্নত বীজ, আর বিচক্ষণ ও দরদী কৃষক।'
পরিশেষে, কিতাবের সর্বত্র যে বৈশিষ্ট্যটি বিশেষভাবে উদ্ভাসিত তা হচ্ছে ইসলামের মূলনীতিমালা ও বুনিয়াদি বিষয়গুলোকে সেগুলোর ব্যাপক পরিসরে এবং বিশুদ্ধ ইসলামী চেতনা অনুযায়ী অনুধাবন। এ কারণেই এ কিতাব শুধু ধর্মীয় ও সামাজিক গবেষণারই আদর্শ নমুনা নয়, বরং একইভাবে তা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসের গবেষণা ও গ্রন্থনা কেমন হওয়া উচিত তারও আদর্শ নমুনা। ইউরোপের পণ্ডিৎ-গবেষকগণ বিশ্বের ইতিহাস পশ্চিমাদৃষ্টিকোণ থেকেই লিখে আসছেন। আর স্বভাবতই তারা তাদের বস্তুবাদী শিক্ষা, দর্শন ও সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি ধর্মীয় ও জাতীয় সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব থেকে কখনো মুক্ত হতে পারেননা; বুঝে হোক বা না বুঝে, সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে। তাই তাদের ইতিহাস গবেষণায় প্রচুর ভুলবিচ্যুতি ঘটেছে। কারণ তারা জীবনের এমন বহু মূল্যবোধ সম্পর্কে 'বেখেয়াল' যেগুলোর সযত্ন পরিচর্যা ছাড়া মানবজীবনের ইতিহাস নিখুঁত -নির্ভুল হতে পারে না, এবং ঘটনার সঠিক ব্যাখ্যাপ্রদান ও সঠিক সিদ্ধান্ত- গ্রহণ সম্ভব হতে পারে না। আরো কারণ এই যে, সাম্প্রদায়িক চিন্তার কারণে ইউরোপকেই তারা জীবন ও মানবজীবনের অক্ষদণ্ড ও কেন্দ্রবিন্দু মনে করেন এবং জীবনের আরো বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক ও কার্যকারণকে শুধু এজন্য উপেক্ষা করেন যে, সেগুলোর উৎস পাশ্চাত্য সভ্যতা নয়। উপেক্ষা করেন, কিংবা অন্তত অবমূল্যায়ন করেন। দুর্ভাগ্যবশত বহুকাল ধরে আমরা এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, জীবনের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসম্ভার যেমন ইউরোপ থেকে গ্রহণ করি, তেমনি আহরণ করি জীবনের ইতিহাসও, এবং যাবতীয় ভুলবিচ্যুতিসহ। অথচ তাদের গবেষণা ও গ্রন্থনার নীতি-পদ্ধতি আগাগোড়াই ভুল। কারণ জীবনকে তারা একটি সীমাবদ্ধ, প্রান্তিক ও পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে থাকে। আর নীতি, পদ্ধতি ও উপস্থাপনের ভ্রান্তির ফলে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা ভ্রান্তির শিকার হয়ে থাকে। প্রমাণ ও সূত্র সঠিক না হলে আহরিত সিদ্ধান্ত কীভাবে সঠিক হতে পারে? আলোচ্য গ্রন্থটি ইতিহাসের গবেষণা ও গ্রন্থনার এমন একটি আদর্শ নমুনা, যাতে এসব বিষয় পূর্ণরূপে লক্ষ্য রাখা হয়েছে। সমস্ত কার্যকারণ এবং বিভিন্নমুখী মূল্যবোধও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
পাঠক হয়ত আশা করেননি যে, একজন আলিম, যিনি ইসলামের রূহানী ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে পূর্ণ আস্থাবান, এবং বিশ্বনেতৃত্বের আসনে ইসলামের প্রত্যাবর্তনের জোরালো প্রবক্তা, তিনি নেতৃত্বের বিভিন্নমুখী যোগ্যতা সম্পর্কেও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করবেন এবং আত্মিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির পাশাপাশি শিল্প, প্রযুক্তি ও সমরশক্তি অর্জনের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করবেন। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও স্বনির্ভরতা অর্জনেরও আহ্বান জানাবেন এবং আহ্বান জানাবেন পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের। কিন্তু পরম পরিতোষের বিষয় যে, এসকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁর চিন্তা থেকে বাদ পড়েনি। নিঃসন্দেহে এ গ্রন্থে মানবজীবনের উপর প্রভাব সৃষ্টিকারী সকল কার্যকারণ ও উপাদানের সুসংহত ও সুবিন্যস্ত সমাবেশ ঘটেছে এবং পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিকোণ থেকেই মুসলিম জাতি ও মানবজাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং মুসলিম উম্মাহকে এমন দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে যাতে পূর্ণ বাস্তবতাবোধ ও ভারসাম্য রক্ষিত হয়েছে। এসব কারণেই কিতাবটি ইতিহাস-গ্রন্থনার আদর্শ উদাহরণ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এ কিতাব আমাদের পথ দেখিয়েছে যে, একজন মুসলিম পশ্চিমা নীতি ও পদ্ধতি পরিহার করে কীভাবে ইতিহাসের গবেষণা ও গ্রন্থনায় অগ্রসর হবে, সেই পশ্চিমা নীতি ও পদ্ধতি যাতে সুসমন্বয়, সুবিচার ও গবেষণা-কৌলীন্য, সবকিছুরই মারাত্মক অভাব রয়েছে। আমার সৌভাগ্য যে, গ্রন্থ সম্পর্কে গ্রন্থকারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে এবং অভিন্ন অনুভূতি পোষণ করে কিছু কথা বলতে পেরেছি এবং মনের এ প্রতিক্রিয়াগুলো প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছি। আমি আরো আনন্দিত যে, কিতাবটি আরবী ভাষায় অধ্যয়নের সুযোগ হয়েছে। কারণ বিজ্ঞ লেখক এর জন্য আরবী ভাষাকেই নির্বাচন করেছেন।
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِمَن كَانَ لَهُ قَلْبُ أَوْ أَلْقَى السَّমْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ
নিঃসন্দেহে এতে উপদেশ রয়েছে ঐ ব্যক্তির জন্য যার রয়েছে হৃদয়, কিংবা যে কর্ণপাত করে এমন অবস্থায় যে, সে মনোযোগী। (ক্বাফ, ৫০: ৩৭)
সাইয়েদ কুতুব
হুলওয়ান, মিশর
টিকাঃ
১. লেখক আখেরি নবী ও বিশ্ব নবী মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা বলছেন।