📄 কিছু কথা
মুসলিম উম্মাহর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কে এ পর্যন্ত যা কিছু লেখা হয়েছে, তার মধ্যে, কোন সন্দেহ নেই, ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين؟ হচ্ছে সবচেয়ে তথ্যপূর্ণ ও বাস্তবমুখী এবং সবচে' দরদপূর্ণ ও উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী কিতাব, যার বাংলা তরজমা এখন পাঠকবর্গের হাতে আমরা তুলে দিতে যাচ্ছি। তরজমা সম্পর্কে কিছু বলার আগে কিতাব ও ছাহিবে কিতাব সম্পর্কে আমার অন্তরের কিছু অনুভব অনুভূতি এখানে তুলে ধরতে চাই।
📄 ছাহিবে কিতাব সম্পর্কে
ছাহিবে কিতাব, আমার জীবনের আদর্শপুরুষ, হযরত মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নাদাবী রহ. এখন এই নশ্বর পৃথিবীতে বেঁচে নেই। মুসলিম উম্মাহর চলার পথে আলো ছড়িয়ে, জীবনের নির্ধারিত সময় পাড়ি দিয়ে, মৃত্যুর সেতু পার হয়ে, এখন তিনি কবরের শয্যায় শায়িত; রায়বেরেলীর কবরস্তানে, তাঁর মহান পূর্বপুরুষগণের সান্নিধ্যে। طيب الله ثراه
তাঁর জীবন আমি দেখিনি; দেখিনি তাঁর মৃত্যুও। মানুষের মুখে শুনেছি, আর কাগজের পাতায় পড়েছি। আমার বিশ্বাস, তাঁর আলোকিত জীবন ও সমুজ্জ্বল মৃত্যু দু'টোর মধ্যেই আমাদের জন্য রয়েছে অনেক শিক্ষা। সুতরাং আজ এখানে এই সুযোগে মুসলিম উম্মাহর দরদী এই মানুষটির জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে আমি কিছু বলতে চাই। অনেক ভেবেছি, তাঁর জীবনের কথা আগে বলবো, না মৃত্যুর কথা! বুঝতে পারিনি। হঠাৎ হৃদয়ের গভীর থেকে কে যেন পথ দেখালো, আর বললো, মৃত্যুর কথাই আগে বলো। কারণ তাঁর জীবন ছিলো খুব সুন্দর, কিন্তু মৃত্যু ছিলো আরো সুন্দর। কল্পনা করো, রামাযানের পবিত্র মাস। রহমতের প্রথম দশদিন গত হলো। রহীমের দরবারে তিনি রহমতের কাঙ্গাল হলেন, নিজের জন্য এবং উম্মতের জন্য। তারপর অতিবাহিত হলো মাগফিরাতের দ্বিতীয় দশদিন। গাফুরের দরবারে তিনি মাগফিরাতের ভিখারী হলেন, নিজের জন্য এবং উম্মতের জন্য। রহমত-মাগফেরাতের পর শুরু হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তির শেষ দশদিন। শুরু হলো তাঁর অশ্রুপাত এবং وقنا عذاب النار মুনাজাত, নিজের জন্য এবং উম্মতের জন্য। নবীর ওয়ারিছ যারা, উম্মতের দরদে দরদী হন তাঁরা। তাঁদের যা কিছু কান্না ও প্রার্থনা, দু'আ ও মুনাজাত, শুধু নিজের জন্য নয়; নিজের জন্য এবং প্রিয় নবীর প্রিয় উম্মতের জন্য।
সেদিন ছিলো ২৩শে রামাযান, শুক্রবার। জুমু'আর জামা'আতের সময় হয়ে এসেছে। সুন্নত গোসল সম্পন্ন করেছেন। কাফন-বর্ণের সাদা লেবাস পরেছেন; পাক-ছাফ লেবাস। আতর-খোশবু মেখে সুবাসিত হয়েছেন। এরপর এমন নাযুক অসুস্থতার মধ্যেও জুমার জামা'আতের ইন্তিজার! ৯৩২ হিজরীতে মৃত্যুবরণকারী গুজরাতের দরবেশ-ছিফত বাদশাহ মুযাফ্ফর শাহ হালীম রহ. বলেছিলেন- 'যোহর তো তোমাদের এখানে পড়লাম, আছর ইনশাআল্লাহ জান্নাতে গিয়ে পড়বো।' সেদিনও ছিলো জুমার দিন। অসুস্থতা ছিলো এত গুরুতর যে, বাদশাহ জুমার জামা'আতে শরীক হতে পারেননি। অন্যদের তাগাদা দিয়ে জুমায় পাঠিয়ে মৃত্যু-শয্যায় তিনি একা যোহর পড়েছেন। দীর্ঘ ছয় শতাব্দী পর ১৪২০ হিজরীতে আল্লাহর এই প্রিয় বান্দা যেন বললেন, 'জুমার নামায ইনশাআল্লাহ জান্নাতে পড়বো এবং জান্নাতে ইফতার করবো!' সূরা ইয়াসীন, যার নাম কালবুল কোরআন, যা মুমিনের মউতকে আসান করে, তিলাওয়াত শুরু করলেন। فبشره بمغفرة وأجر كريم পর্যন্ত পড়লেন, আর মৃত্যু এসে তাঁকে আলিঙ্গন করলো। এমন মৃত্যুকেই তো বলা হয় সুন্দর মৃত্যু! এমন মৃত্যুরই তো তামান্না প্রত্যেক মুমিনের দিলে! আমারও তামান্না, আল্লাহ যেন মাগফিরাতের এবং আজরে কারীমের খোশখবরওয়ালা মউত নছীব করেন, আমাকে এবং একটি দীর্ঘ সুন্দর জীবনের পর আমার সুন্দর মৃত্যুর জন্য যারা দু'আ করে তাদের সবাইকে, আমীন।
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় নব্বই বছরের দীর্ঘ জীবন তিনি যাপন করেছেন এই পৃথিবীতে, এই ভারতের মাটিতে। বড় সুন্দর জীবন ছিলো তাঁর, যেন একখণ্ড শুভ্র বস্ত্র, দাগহীন, নিষ্কলঙ্ক। সুন্নতকে ভালোবেসেছেন, সুন্নতের পথে চলেছেন এবং দূরের কাছের সবাইকে সুন্নতের পথে ডেকেছেন। সংশোধনের মাধ্যমে, নৈতিক, আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতির মাধ্যমে উম্মাহ যেন আবার অগ্রসর হয় এবং বিশ্বনেতৃত্বের আসনে সমাসীন হয়, এজন্য উম্মাহর খেদমতে নিজেকে তিনি ওয়াক্ফ করেছেন। এখানে এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাঁর কীর্তিময় বিশাল জীবন সম্পর্কে আলোচনা করা তো সম্ভব নয়, শুধু বলা যায়, 'হৃদয়ের উদারতা, চিন্তার প্রসারতা, চেতনার গভীরতা, চরিত্রের পবিত্রতা, দ্বীনের প্রতি দরদ-ব্যথা, উম্মতের প্রতি মায়া-মমতা এবং বিশ্বমানবতার প্রতি দয়া ও করুণা, আল্লাহর কালিমাকে সকল কালিমার উপর বুলন্দ করার জন্য নিরন্তর জিহাদ ও মুজাহাদা, প্রতিটি আচরণে, প্রতিটি উচ্চারণে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ব্যাকুলতা', এগুলো ছিলো তাঁর শুভ্র-সুন্দর জীবনের কিছু উজ্জ্বল শিরোনাম।
তিনি যখন যা বলেছেন, একজনের সঙ্গে, কিংবা লক্ষজনতার সামনে, সকলে অনুভব করেছে, তাঁর মুখের কথায় রয়েছে দিলের গরমি ও হৃদয়ের উত্তাপ। তিনি যখন যা লিখেছেন, কোন শাসকের নামে, কিংবা পুরো উম্মাহর উদ্দেশ্যে, সকলে অনুভব করেছে, কাগজে কালো কালিতে রয়েছে অশ্রুর মিশ্রণ। মুখের কথায় দিলের তড়প এবং কলমের লেখায় কলবের 'ধড়কন', এটা ছিলো এ যুগে তাঁর প্রায় একক বৈশিষ্ট্য, যা তাঁর মুখের প্রতিটি কথাকে এবং কলমের প্রতিটি লেখাকে দূরের কাছের, তাঁর নিজের ভাষার, এমনকি অন্যান্য ভাষার মানুষের জন্যও উপকারী ও কল্যাণময় করে তুলেছে। যত দিন বেঁচে ছিলেন, উম্মতের ইলমী, আমলী, আখলাকী, ফিকরী ও রূহানী তারবিয়াতে নিয়োজিত ছিলেন, আর ভক্তি-মুহব্বত ও শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় আপ্লুত উম্মাহ তাঁর দীর্ঘ জীবনের জন্য প্রার্থনা করেছে। এখন রায়বেরেলীর কবর-শয্যায় শায়িত থেকেও কলমের ইরফান ও কলবের ফায়যান দ্বারা তিনি উম্মতের হিদায়াত ও রাহনুমাঈর খেদমত অব্যাহত রেখেছেন, আর উম্মত আল্লাহর দরবারে তাঁর মাগফিরাত ও দরজাবুলন্দির জন্য দু'আ করে চলেছে। এমন সুন্দর জীবন যারা যাপন করে এবং এমন সুন্দর মৃত্যু যারা বরণ করে, অবশ্যই তারা আল্লাহর পক্ষ হতে তাওফীকপ্রাপ্ত এবং সত্যি তারা বড় ভাগ্যবান।
কবরে শায়িত প্রিয়জনদের জন্য তাঁর একটি প্রিয় প্রার্থনা ছিলো, অনেকবার অনেক উপলক্ষে এ প্রার্থনা তিনি উচ্চারণ করেছেন, আমিও তাঁকে স্মরণ করে উচ্চারণ করি- আসমান উনকে লাহদ প্যর শবনম আফশানি ক্যরে সবযায়ে নওরস্তা ইস ঘর কী ন্যগাহবানী ক্যরে (আসমান যেন তাঁর কবরে শবনম ঝরায়, সবুজ গালিচা যেন ঐ ঘর ঢেকে রাখে)। তিনি নেই, কারণ তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। كل نفس ذائقة الموت আমাকে, তোমাকে, সবাইকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আমরা সবাই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবো, যখন যার সময় হবে। আমাদের শুধু কর্তব্য, একটি সুন্দর জীবন যাপনের নিরন্তর সাধনায় আত্মনিয়োগ করা, যেখানে আছে হৃদয়ের পবিত্রতা, চরিত্রের সৌন্দর্য, কীর্তি ও কর্মের ঐশ্বর্য, চিন্তার উচ্চতা, আত্মার সজীবতা এবং উম্মাহর প্রতি দরদ-ব্যথা। আমাদের শুধু কর্তব্য, প্রতিটি কথা ও কাজের মাধ্যমে একটি সুন্দর মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা, যেখানে আছে জান্নাতের খুশবু ও নূরের কাফন হাতে ফিরেশতাদের মুখের হাসি, যেখানে আছে ارجعى إلى ربك এর হৃদয়-প্রাণ আশ্বস্ত করা আহ্বান এবং আছে অনন্ত জীবনের উদ্দেশ্যে মহাপ্রয়াণের আনন্দ-উচ্ছ্বাস।
নশ্বর জীবনের বিচারের তিনি এখন আমাদের মাঝে নেই, এটা যেমন সত্য তেমনি এটাও সত্য যে, তিনি আছেন আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায়, আমাদের চেতনায়, প্রেরণায়, অনুভবে এবং আমাদের প্রার্থনায়। তিনি আছেন তাঁর বিপুল কর্ম ও কীর্তির মধ্যে, আমাদের জন্য রেখে যাওয়া তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও চিন্তা-সম্পদের মধ্যে। জীবনের চলার পথে যখন অত্যন্ত প্রয়োজন ছিলো একজন অভিভাবকের, একজন আদর্শ পথপ্রদর্শকের; যখন সামনে চলার আকুতি ছিলো, কিন্তু প্রস্তুতি ছিলো না, পথের আঁক-বাঁক ও চড়াই-উৎরাই জানা ছিলো না; যখন চিন্তার মধ্যে আলোড়ন ছিলো, উত্তেজনা ছিলো, কিন্তু স্থিতি ছিলো না, প্রসারতা ও গভীরতা ছিলো না; যখন কিছু করার অদম্য একটা উদ্যম ছিলো, কিন্তু জানা ছিলো না, কাজের উপায় কী, আয়োজন কী, পথ ও পন্থা কী? যখন নিজের কাছেই নিজের প্রশ্ন ছিলো, আমার অতীত কী, বর্তমান কী এবং আমার ভবিষ্যত কী? প্রশ্ন ছিলো কিন্তু উত্তর জানা ছিলো না, কিংবা যে উত্তর পেয়েছি তাতে আশ্বস্তি ছিলো না, প্রশান্তি ছিলো না, বরং হতাশা ও অস্থিরতা আরো বেড়ে যাওয়ার উপকরণ ছিলো; তখন, জীবনের সেই কঠিন প্রয়োজনের সময় আমি পেয়েছিলাম তাঁকে চলার পথের আলোরূপে, চিন্তা-চেতনার প্রদীপরূপে, মনের সব উত্তপ্ত প্রশ্নের প্রাণ-শীতলকারী উত্তররূপে এবং আগামী দিনের জন্য নিজেকে গড়ে তোলার কঠিন সাধনায় আত্মনিয়োগ করার সজীব প্রেরণারূপে। জীবনের যৌবনকালে, আসল পথচলা যখন শুরু হয় তখন আলোর অভাবে দ্বিধাগ্রস্ত ও হতাশায় চুপসে যাওয়া একজন তালিবে ইলমের জন্য এ পাওয়া যে কত বড় পাওয়া তা বুঝতে পারে শুধু সে-ই যে আলোর অভাবে চলার পথে বারবার হোঁচট খেয়েছে, পাথেয়র অভাবে বারবার যার পথচলা থেমে গিয়েছে এবং প্রেরণার অভাবে বারবার হতাশাগ্রস্ত হয়েছে! তাঁর জীবন সম্পর্কে একসঙ্গে অনেক কিছু জানার সুযোগ আমার হয়নি; তবে যখন যেটুকু জেনেছি তাতে উদ্দীপ্ত হয়েছি। মনে হয়েছে আমার জীবনও বুঝি একটু একটু করে আলোকিত উদ্ভাসিত হচ্ছে। মনে হয়েছে; আমাকেও হতে হবে এমন, অন্তত যতটা কাছে যাওয়া যায় এমন আলোকিত জীবনের, এমন মহত্ত্বের, এমন শুভ্রতা ও পবিত্রতার।
পূর্ণ গ্রন্থরূপে প্রথম তাঁর যে লেখা আমার হাতে আসে তা হলো 'পুরানে চেরাগ' প্রথম খণ্ড। পরে তিনখণ্ড হয়েছে; তখন শুধু প্রথম খণ্ডটি ছিলো। সেখানে তিনি সমকালের বিশিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের আলোচনা করেছেন নিজস্ব সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে। তাতে ঐসকল বড় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যেমন শ্রদ্ধার সম্পর্ক তৈরী হয়েছে, তেমনি তাঁর জীবনেরও বিভিন্ন আলোকিত দিক আমার সামনে এসেছে জীবনের মূল্যবান পাথেয়রূপে। তারপর পেলাম 'পা-জা সুরাগে যিন্দেগী'! এটি বিভিন্ন সময় তালিবানে ইলমের উদ্দেশ্যে দেয়া তাঁর বক্তৃতার মূল্যবান সঙ্কলন। কত দীর্ঘকাল আগের কথা! কিন্তু মনে হয়, এই সেদিনের কথা। বইটি প্রথমে পড়লাম প্রথম হাতে পাওয়ার আনন্দ-জোয়ারে প্লাবিত হয়ে একবারে। তারপর পড়লাম একটু একটু করে, সময় নিয়ে, পারিপার্শ্বিক ও মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে। যতটুকু পড়ি ততটুকু গভীরভাবে চিন্তা করি এবং হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করি। তার চেয়ে বড় কথা, লেখার হরফের যে ছাপ তার মধ্যে সেই মানুষটির জলছাপ দেখার চেষ্টা করি এবং.. এবং আশ্চর্য! মানুষ যাকে বলে নিষ্প্রাণ কালো হরফ, সেই হরফের মধ্যে আমি অনুভব করি, সেই জীবন্ত মানুষটির জীবন্ত হৃদয়ের স্নিগ্ধ কোমল স্পন্দন! এমনিতে শোনা যায় না, তবে যখন কেউ থাকে না, থাকে শুধু অখণ্ড নীরবতা, চোখের সামনে থাকে শুধু কিতাবের খোলা পাতা তখন ধীরে ধীরে কালো হরফের মধ্যে সেই জলছাপটি ভেসে ওঠে। চোখ বন্ধ করলে আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বাইরের কান বন্ধ করে মনের কান পেতে রাখলে হৃদয়ের স্নিগ্ধ কোমল স্পন্দনটিও শোনা যায়; আমি শুনলাম, আর সেদিনই যেন এক নবজীবন লাভ করলাম। 'পা-জা সুরাগে যিন্দেগি'; সত্যি যেন আমি প্রকৃত জীবনের সন্ধান পেয়ে গেলাম। আগে শুধু জানতাম, আমি মাদরাসার ছাত্র। ধীরে ধীরে জেনেছি, আমি মাদরাসার তালিবে ইলম। তখনো জানি না, মাদরাসা কী এবং কাকে বলে তালিবে ইলম। 'পা-জা সুরাগে যিন্দেগি'-এর মাধ্যমে জানলাম মাদরাসার হাকীকত এবং পেলাম তালিবে ইলমের পরিচয়। অবাক হলাম, এত বড় সত্য এত দিন আমার অজানা ছিলো! আমার এমন মর্যাদাপূর্ণ পরিচয় আমার অজ্ঞাত ছিলো! আমার নতুন পরিচয়, আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং ভবিষ্যতের কর্ম- পরিসরের ব্যাপকতা সম্পর্কে নতুন চেতনা লাভ করে আমি অভিভূত হলাম এবং উদ্দীপ্ত হলাম। তখনকার সেই তরুণ বয়সের অনুভব-অনুভূতি সম্পর্কে বলার আরো কত কিছু আছে! কিন্তু এমনিতেই তো প্রসঙ্গের উপর অনেক অবিচার হয়ে গেলো! সুতরাং থাক সে কথা।
টিকাঃ
১. কেউ যদি ভাবে, এসব বলে আমি নিজের বুযুর্গি বয়ান করছি, তাহলে শুনুন, এটা বুযুর্গি নয়, এটা ভক্তি-ভালোবাসা। এটা যে কারো হতে পারে, যে কারো প্রতি হতে পারে। রবিঠাকুরের কবিতা পড়াকে যারা মনে করে 'ইবাদত' তাদের একজন বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতায় তিনি তার ছবি ও প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। রবীন্দ্রনাথ যেন তার কবিতায় জীবন্ত হয়ে ওঠেন, এমনকি কবিতার সুর ও ছন্দে তিনি তার হৃদয়ের স্পন্দন শুনতে পান। আমি তাকে বুযুর্গ ভাবিনি, তবে তার কথা বিশ্বাস করেছি। এর নাম ভক্তি-ভালোবাসা। লেখার মধ্যে যখন লেখকের ছবি ও প্রতিচ্ছবি দেখা যায় এবং লেখকের হৃদয়ের স্পন্দন অনুভব করা যায়, সেটা তখন লেখকের কলমের লেখা থাকে না, সেটা তখন পাঠকের কলবের রেখা হয়ে যায়। সেটা হোক তাদের রবিঠাকুরের লেখা, কিংবা হোক আমাদের আলী মিয়ার লেখা। পুষ্পের পাতায় যখন শেখ সা'দীর গুলিস্তার তরজমা করেছি তখনও আমার এ অনুভূতি হয়েছে। মনে হয়েছে, বহু শতাব্দীর আগের মানুষটিকে আমি যেন স্পর্শ করতে পারছি। এভাবে সামান্য পড়েও প্রাপ্তি হয় অসামান্য, অন্যথায় অনেক পড়েও প্রাপ্তি হয় সামান্য। (এখানে কলমে প্রবল স্রোত ও প্রবাহ ছিলো! আরো অনেক কিছু লেখা যেতো। কিন্তু কলম ও কলব উভয়কে সংযমে রেখেছি। আল্লাহর শোকর, শেষ পর্যন্ত লেখার ইচ্ছের উপর না লেখার শক্তি জয়ী হয়েছে। নইলে হয়ত আপনজনেরাও সমালোচনা শুরু করতো। তবু এইটুকু বলে রাখি, কারো যদি ভালো লাগে, যেন অন্তর থেকে গ্রহণ করে। এমন কারো লেখাই যেন শুধু পড়ি যাকে ভালোবাসা যায়, যার জন্য হৃদয় উৎসর্গ করা যায় এবং এমনভাবে যেন পড়ি, যাতে কালো হরফের পর্দায় সেই মানুষটির ছবি দেখা যায়, তার হৃদয়ের স্পন্দন শোনা যায়।)
📄 কিতাব সম্পর্কে
আবুল হাসান আলী নাদাবী রহ. তখন আমার প্রিয়তম ব্যক্তি এবং বিশেষ করে আমার চিন্তাজীবনের আদর্শ। তাঁর জীবন সম্পর্কে, কর্ম ও চিন্তা সম্পর্কে জানার আকুতি অনেক, কিন্তু উপায় ও সূত্র নেই। এখন তো কত 'মাকতাবা', কত কিতাব! তখন অবস্থা এমন ছিলো না। কোন কিতাব পাওয়ার উপায় ছিলো না। 'তারীখে দাওয়াত ও আযীমত'-এর নাম শুনেছি, দেখার সৌভাগ্য হয়েছে অনেক পরে। ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين؟ কিতাবের সম্ভবত নামও জানা ছিলো না। মোটকথা, এদিক থেকে বড় দৈন্যের মধ্যে কেটেছে আমাদের, বিশেষ করে আমার জীবন। এমন সময় গায়েব থেকে যেন বান্দার জন্য একটি সুন্দর আয়োজন হলো! মাওলানা মুহম্মদ হারুন ইসলামাবাদী, যার স্নেহ-সান্নিধ্য পেয়ে একসময় মনে হতো, আমি তাঁর মত হবো, তিনি তাঁর কর্মস্থল আবুধাবি থেকে দেশে এলেন। দেখা করতে শহীদ বাড়িয়া (তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া) গেলাম। দেখি তাঁর হাতে একটি কিতাব। নামটিও দেখা যাচ্ছে, ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين؟ নীচে জ্বল জ্বল করছে, تاليف السيد أبي الحسن على الحسن الندوي মনে তখন কেমন আনন্দ- অনুভূতি হলো! যেন নাগালের মধ্যে সাতরাজার ধন! আমার প্রিয়তম আলী মিয়াঁর কিতাব! হাত বাড়ালেই স্পর্শ পাবো! আলতো করে কিতাবটি মাওলানা হারূন ছাহেবের হাত থেকে নিলাম এবং কিতাবটি আমার হয়ে গেলো! এমনই ছিলো তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা-ভালোবাসা এবং আমার প্রতি তাঁর স্নেহ-মায়া যে, কোনকিছু তাঁর হাত থেকে নেয়ার অর্থই ছিলো আমার হয়ে যাওয়া। এটা আমি যেমন জানতাম, তিনিও জানতেন। সুতরাং কিতাবটি তিনি আর ফেরত চাইলেন না। আজ এত বছর পরও, কত কিতাব আমার হারিয়ে যায়, কিন্তু এ কিতাবটি আছে আমার কাছে। অতি সাধারণ নিউজপ্রিন্টের সাধারণ ছাপা, আরো সাধারণ বাঁধাই। এখন এই কিতাবের কত সুন্দর কাগজের ঝকঝকে ছাপা ও মনোরম বাঁধাইয়ের নোসখা আমার সংগ্রহে আছে, কিন্তু ঐটি হাতে নিলে যে রোমাঞ্চ ও আনন্দঘন অনুভূতি হয় তার কোন তুলনা নেই। কারণ তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার প্রথম ভালোবাসার প্রথম স্পর্শ! তরজমা করার সময় ঐ নোসখাটিই আমার সামনে ছিলো। তাতে যেন আলাদা একটি প্রেরণা অনুভব করেছি! পক্ষান্তরে অনিবার্য কারণে যখন ঝকঝকে সুন্দর নোসখাটি নিয়েছি, মনে হয়েছে, কী যেন নেই! কিসের যেন অসম্পূর্ণতা! কেন এমন হয়, আমার জানা নেই!
দুপুরের গাড়ীতে ফিরলাম এবং সন্ধ্যার আগে কমলাপুর স্টেশনে নামলাম। এর মধ্যে কিতাবটি পড়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এখন মনে পড়ে না, কোথায় যেন পড়েছি- 'তোমার সামান্য একটু তন্ময়তা, তোমাকে মুক্তি দিতে পারে চারপাশের সব শোরগোল থেকে।' সেদিন কিতাব হাতে ঐ সফরে আমার জীবনে কথাটা সত্য হয়েছিলো। কামরা ভরা যাত্রীদের কত কথা, কত হৈচৈ, স্টেশনে স্টেশনে গাড়ী থামার, যাত্রীদের ওঠা-নামার কত শোরগোল, কোনকিছু আমাকে ছোঁয়নি, আমার তন্ময়তাকে বিঘ্নিত করেনি। এই ছোট্ট সফরের মধ্যে আমি আসলে চলে গিয়েছিলাম দূরে বহু দূরে, আমার প্রিয়তম মানুষটির 'কলম-সফরের' মহাযাত্রার সামান্য একজন অনুগামী হয়ে। আমি তখন হারিয়ে গিয়েছিলাম, যে উম্মাহর ঘুমিয়ে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে আমিও একজন, সেই উম্মাহর উত্থান-পতনের আনন্দ-বেদনার কাহিনীর জগতে। কী মর্মস্পর্শী ভাষায় কত জীবন্তরূপে তিনি তুলে ধরেছেন প্রতিটি বিষয়! আমাদের প্রিয় নবীর আবির্ভাবকালে কেমন বেদনাদায়ক ও মুমূর্ষু অবস্থা ছিলো বিশ্বের এবং বিশ্ব-মানবতার! আরবের ভূমিতে কেমন কঠিন পরিস্থিতিতে কীভাবে শুরু হলো তাঁর দাওয়াতি মেহনত এবং তৈরী হলো ছাহাবা কেরামের মহান জামা'আত! কীভাবে শুরু হলো বিশ্বের দিকে দিকে ছাহাবা কেরামের বিজয়াভিযান, বরং বলা ভালো, মানবতার মুক্তির অভিযান! এ পর্যন্ত ছিলো গর্ব ও গৌরবের এবং প্রেরণা ও উদ্দীপনার অধ্যায়। তারপর তিনি এঁকেছেন সর্বব্যাপী এক হতাশার চিত্র, যেন অশ্রুর ভাষায়, রক্তের হরফে। একসময় কীভাবে নেমে এলো তন্দ্রার ঘোর! কীভাবে ঘটলো প্রথমে উম্মাহর পতন, তারপর অধঃপতন! কীভাবে ঝড় উঠলো ক্রুশেডের এবং তাতারীদের! কীভাবে তছনছ হয়ে গেলো বিশাল বিস্তৃত মুসলিম জাহান! আমার প্রিয় মানুষটি শুধু হতাশার কথা শুনিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি। বলেছেন, ইসলামের অন্তর্নিহিত আত্মশক্তির কথাও, যুগে যুগে যা মুসলিম উম্মাহকে রক্ষা করেছে, যদিও মুসলিম উম্মাহ সবসময় পারেনি ইসলামকে রক্ষা করতে। তিনি শুনিয়েছেন, পতনের যুগেও কীভাবে উঠে এলেন গাজী ছালাহুদ্দীন, কীভাবে দীর্ঘ নব্বই বছর পর উদ্ধার পেলো বাইতুল মাকদিস! হাঁ, সেই বাইতুল মাকদিস যা এখন ইহুদিদের জ্বালানো আগুনে জ্বলছে, আর পথ চেয়ে আছে যামানার নতুন ছালাহুদ্দীনের! তিনি আমাদের শুনিয়েছেন, যে তাতারীদের পরাজয়কে কাদেসিয়া-ইয়ারমুকের উত্তরসূরীরা মনে করতে অসম্ভব, কীভাবে তারা পরাজিত হলো আইনে জালুতের যুদ্ধে মিশরের মুসলিম বাহিনীর হাতে! আরো শুনিয়েছেন, বিজয়ী তাতারীদের উদ্ধত মাথা কীভাবে নত হলো ইসলামের অপরাজেয় শক্তির সামনে। যারা চেয়েছিলো মুসলিম উম্মাহ বিনাশ, কীভাবে তারাই হয়ে গেলো ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর রক্ষক! সবচে' ইতিবাচক প্রশ্ন হলো, এই পতন থেকে মুসলিম উম্মাহর উত্তরণের উপায় কী? পতনের কান্না যেমন তিনি কেঁদেছেন তেমনি উত্তরণের পথ ও পন্থাও তিনি বলেছেন। তাঁর ভাষায়- لا ينهض العالم الإسلامي إلا برسالته التي وكلها إليه نبيهم الأمين، ولا ينهض العالم الإسلامي بهذه الرسالة التي هي الدعوة إلى الله ورسوله إلا بقوة الإيمان، لا بقوة المادة 'ইসলামী বিশ্বের উত্থানের কোন পথ নেই, সেই দাওয়াত ও পায়গামকে ধারণ করা ছাড়া, যা তাদের নবী আল-আমীন তাদের কাছে সোপর্দ করে গিয়েছেন। আর বস্তুগত কোন শক্তি দ্বারা দাওয়াতের এ মহান দায়িত্ব পালন করা তাদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হবে না; সম্ভব হবে শুধু ঈমানের শক্তি দ্বারা।' এটা তো চিরসত্য কথা! ঈমানই ছিলো আমাদের অতীতের শক্তি, ঈমানই হচ্ছে আমাদের বর্তমানের শক্তি এবং ঈমানই হবে আমাদের ভবিষ্যতের শক্তি। ঈমান ছাড়া আমাদের কোন শক্তি নেই, মুক্তিও নেই। একথা তিনি বলেছেন, তাঁর আগেও সবাই বলেছেন, এমনকি তাঁর সমকালেরও সবাই বলছেন। এটা নতুন কথা নয়। তাঁর স্বকীয়তা এই যে, আধুনিক ও প্রাচীন উভয় সমাজকে চমকিত করে একটি নির্মম সত্যের প্রতি তিনি অঙ্গুলি-নির্দেশ করেছেন। তাঁর ভাষায়- إذا أراد العالم الإسلامي أن يعود إلى قيادة العالم من جديد فعليه أن يأخذ الاستعداد التام في العلوم والصناعة والتجارة وفي فن الحرب وأن يستغني عن الغرب في كل مرفق من مرافق الحياة وفي كل حاجة من الحاجات 'ইসলামী বিশ্ব যদি নতুন করে বিশ্বনেতৃত্বের আসনে ফিরে যেতে চায়, তাহলে তার অবশ্যকর্তব্য হবে, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প, বাণিজ্য ও যুদ্ধবিদ্যায় পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করা এবং জীবনের যাবতীয় উপকরণ ও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য-নির্ভরতা পরিহার করা।' এটা ছিলো একেবারে নতুন কথা যা তাঁর পর্যায়ের কোন আলিম আগে বলেননি, অন্তত এমন করে বলেননি। তিনি আরো বলেছেন- ومن واجب رجال التعليم والتربية وولاة الأمر أن يربوا الشبيبة العربية على الفروسية والحياة العسكرية على مبدأ قول النبي صلى الله عليه وسلم : ألا إن القوة الرمي! ألا إن القوة الرمي 'শিক্ষা-দীক্ষা ও রাষ্ট্রের কর্ণধার যারা, তাদের কর্তব্য হলো আরবযুবশক্তিকে 'অশ্বচালনা' ও সৈনিকতার উপর গড়ে তোলা এবং তা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই মহান নীতিনির্ধারণী বাণীর ভিত্তিতে, 'শোনো, নিক্ষেপই আসল শক্তি, শোনো, নিক্ষেপই আসল শক্তি।' এটাও একেবারে নতুন কথা, বিশেষ করে এ যুগের 'খানকাহি জীবনে অভ্যস্ত' কোন বুযুর্গের কলমে! তিনি আরো বলেছেন- إذا أراد العالم الإسلامي أن يستأنف حياته ويتحرر من رق غيره، وإذا كان يطمح إلى القيادة فلابد إذا من وضع منهاج تعليمي جديد يجمع بين محكمات الكتاب والسنة وبين العلوم العصرية النافعة، ولابد له من تدوين العلوم العصرية على أساس روح الإسلام، ويجب على العالم الإسلامي أولا وقبل كل شيء أن يخلصوا شبابهم من النظام التعليمي الغربي الذي قد استولى اليوم على العالم الإسلامي كله 'ইসলামী বিশ্ব যদি নতুনভাবে জীবন শুরু করতে চায় এবং অন্যের দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করতে চায়, সর্বোপরি যদি বিশ্বনেতৃত্বের স্বপ্ন দেখতে চায় তাহলে অবশ্যকর্তব্য হবে এমন নতুন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা যা কোরআন-সুন্নাহর অপরিবর্তনীয় বিধান এবং কল্যাণপূর্ণ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে। মুসলিমবিশ্বকে অবশ্যই ইসলামের প্রাণপ্রেরণার উপর ভিত্তি করে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে। মোটকথা, ইসলামী বিশ্বকে প্রথমে এবং সবকিছুর আগে পাশ্চাত্যের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে, যা সমগ্র মুসলিমবিশ্বের উপর আধিপত্য বিস্তার করে আছে, তা থেকে তাদের যুবকদের উদ্ধার করতে হবে।' শহীদ সৈয়দ কুতুব এ গ্রন্থের ভূমিকায় ঠিকই বলেছেন, 'পাঠক হয়ত আশা করেননি যে, একজন আলিম, যিনি ইসলামের রূহানী ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে পূর্ণ আস্থাবান, এবং বিশ্বনেতৃত্বের আসনে ইসলামের প্রত্যাবর্তনের জোরালো প্রবক্তা, তিনি নেতৃত্বের যোগ্যতা সম্পর্কেও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করবেন এবং আত্মিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির পাশাপাশি শিল্প, প্রযুক্তি ও সমরশক্তি অর্জনের প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করবেন। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও স্বনির্ভরতা অর্জনেরও আহ্বান জানাবেন এবং আহ্বান জানাবেন পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের। কিন্তু পরম পরিতোষের বিষয় যে, এসকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁর চিন্তা থেকে বাদ পড়েনি।' ফিরে আসি আগের কথায়। আমি তো ছিলাম কিতাবের পাতায় আমার তন্ময়তায়। রেলগাড়ীর সফর শেষ হয়ে গেলো, কিন্তু কিতাবের সফর তখনো শেষ হয়নি। যাত্রীরা সব বাড়ী ফেরার তাড়নায় ব্যতিব্যস্ত, আমার হলো তখন অন্য অবস্থা। কমলাপুর স্টেশনের নিকটবর্তী একটি মসজিদে বসে শেষ অধ্যায়টি সমাপ্ত করলাম, যাতে তিনি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন আরবজাতিকে আবার জেগে ওঠার, আরবজাতিয়তাবাদের অন্ধকার ত্যাগ করে কোরআনের আলোকিত অঙ্গনে এবং সুন্নাহর উদ্ভাসিত আঙ্গিনায় আবার ফিরে আসার! মানবতার মুক্তির দূতরূপে আবার জিহাদের ঝাণ্ডা হাতে তুলে নেয়ার। আরবজাতিকে তিনি স্মরণ করিয়েছেন যে, তাদের শক্তি ও মর্যাদার উৎস অন্য কিছু নয়, শুধু কোরআন ও সুন্নাহ! তাদের প্রাণ ও প্রেরণা অন্য কেউ নন, শুধু মুহাম্মদে আরাবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তিনি তাদের বলেছেন, কোনরকম অস্পষ্টতা ও সৌজন্যের আবরণ ছাড়া একেবারে স্পষ্ট ও সোজা ভাষায়, 'যদি বিশ্বাস না হয়, তাহলে ফিরিয়ে দাও যা কিছু পেয়েছো তোমাদের আরব-ভূমির এই উম্মী নবীর কাছ থেকে। ফিরিয়ে দাও আল-কোরআন যা এত দিন রক্ষা করেছে তোমাদের ভাষা ও সাহিত্য, এমনকি তোমাদের অস্তিত্ব, তারপর ফিরে যাও তোমাদের জাহেলিয়াতের যুগে! তখন দেখো, কী পরিণতি হয় তোমাদের! মরুভূমির বালুর উপর অঙ্কিত রেখার চেয়ে বেশী কিছু হবে না তোমাদের অস্তিত্ব। .... কিতাবের সমাপ্তি অংশে ছিলো আরবদের উদ্দেশ্যে তাঁর এ জ্বলন্ত প্রশ্ন- إلى متى أيها العرب تصرفون قواكم الجبارة التي فتحتم بها العالم القديم في ميادين ضيقة محدودة؟ إلى متى ينحصر هذا السيل العرم الذي حرف بالأمس بالمدنيات والحكومات في حدود هذا الوادي الضيق تصطرع أمواجه ويلتهم بعضها بعضا؟ 'আর কত দিন হে আরব, এসকল ক্ষুদ্র তুচ্ছ ক্ষেত্রে তোমাদের বিপুল শক্তির অপচয় করবে, যা দ্বারা একবার তোমরা প্রাচীন বিশ্বকে জয় করেছিলে? এই সর্বপ্লাবী জোয়ার আর কতকাল এই সঙ্কীর্ণ উপত্যকায় আবদ্ধ থেকে নিজের ঢেউয়ে নিজে মার খাবে, যা একদিন সমস্ত সভ্যতা ও শাসনব্যবস্থাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো?'
কিতাব সমাপ্ত হলো। মাগরিবের তখনো কিছু সময় বাকি, আর আমি একই তন্ময়তায় আচ্ছন্ন। কী পড়লাম! কী দেখলাম!! কী শুনলাম!!! মনে হলো চিন্তার জলাশয় থেকে চিন্তার সাগরে অবগাহন করলাম! অতীতকে যেন নতুন করে খুঁজে পেলাম! বর্তমানকে যেন আসল চেহারায় দেখতে পেলাম! আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন-ছায়া যেন পূর্ণ একটি অবয়ব লাভ করলো! এমন কি লিখেছেন তিনি যা আগে জানা ছিলো না, যা আগে পড়া হয়নি, শোনা হয়নি! ইতিহাসের পাতায়, সীরাতের আঙ্গিনায় সবই তো ছিলো! সবই তো পড়েছি! তাহলে!! সত্য কথা এই যে, হৃদয়ের উত্তাপ, চেতনা, মমতা, দহন ও যন্ত্রণা! এগুলোই আসলে কলব থেকে কলমে আসে, আবার কলম থেকে কলবে যায়! তখন মনে হয়, আগে তো শুনিনি! আগে তো পড়িনি! আগে তো কেউ বলেনি! যেমন হযরত আবু বকর রা.-এর যবানে- وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ এ আয়াত শুনে ছাহাবা কেরাম বলেছিলেন, মনে হলো, আয়াতটি এই প্রথম নাযিল হলো! প্রিয় চাচা আবু তালিবকে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত দেখে, সেই অসহায়ত্বের সময়, নবুয়তের পূর্ণ জালাল ও প্রতাপ নিয়ে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছিলেন, কত পড়েছি এবং কত কত উপলক্ষে বলেছি ও লিখেছি- يَا عَمِّ وَاللَّهِ لَوْ وَضَعُوا الشَّمْسَ فِي يَمِينِي وَالْقَمَرَ فِي يَسَارِي عَلَى أَنْ أَتْرُكَ هَذَا الْأَمْرَ حَتَّى يُظْهِرَهُ اللهُ أَوْ أَهْلَكَ فِيهِ مَا تَرَكْتُهُ সেখানে একথাও আছে বলতে বলতে আল্লাহর রাসূল অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লেন। যতবার পড়েছি আমাদের চোখ কিন্তু যেমন শুকনো তেমনি ছিলো! আজ কেন চোখের পাতা একটু ভিজলো! আজ কেন অন্তরে বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের এমন ঢেউ সৃষ্টি হলো! পারস্যের রাজদরবারে হযরত রাবঈ বিন আমির রা. এর বিপ্লবী ঘোষণা আগেও পড়েছি- اللهُ ابْتَعَثَنَا لِنُخْرِجَ مَنْ شَاءَ مِنْ عِبَادَةِ الْعِبَادِ إِلَى عِبَادَةِ اللهِ وَمِنْ ضِيقِ الدُّنْيَا إِلَى سِعَتِهَا وَمِنْ جَوْرِ الْأَدْيَانِ إِلَى عَدْلِ الْإِسْلَامِ কিন্তু আজ যখন পড়লাম, চোখ থেকে ঝরঝর করে অশ্রু ঝরলো। ভিতরের আমি বাইরের আমাকে প্রশ্ন করলো, 'কত উচ্চতা থেকে কত নীচে ঘটেছে আমাদের পতন? কত বড় মর্যাদা ত্যাগ করে কী হীনতা ও দীনতায় আমরা আজ তুষ্ট?' বলাবাহুল্য, ভিতরের সত্তার কাছ থেকে আর কখনো এমন করে এ প্রশ্নের সম্মুখীন আমি হইনি। কোন কলমের, কোন লেখার এবং কারো সান্নিধ্যের সার্থকতা হয় তখনি যখন তা কারো অন্তর্জগতে আত্মজিজ্ঞাসা জাগ্রত করে এবং তার সর্বসত্তাকে প্রবল ভাবে আলোড়িত ও আন্দোলিত করে। তখন সেই আত্মজিজ্ঞাসার সন্তোষজনক উত্তর না খুঁজে এবং না পেয়ে তার আত্মা কখনো শান্তি পায় না। আমাদের সমস্ত দুর্দশার বড় কারণ এই যে, কখনো আমরা আত্ম-জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হইনি, হই না; না নিজের শক্তিতে, না কারো কলবের সান্নিধ্য থেকে, না কোন কলমের সাহচর্য থেকে। সেদিনের সেই বরকতপূর্ণ সফরে ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين কিতাবটির প্রথম পাঠ থেকে এই যে আত্মজিজ্ঞাসার জাগৃতি, এটাই ছিলো আমার বড় প্রাপ্তি, যার জন্য সেদিন মাগরিবের পর, বহুদিন পর আওয়াবীন পড়ার তাওফীক হলো এবং দু'রাকাত শোকরানা পড়ে আল্লাহর শোকর আদায় করলাম যে, কত আয়োজন করে এ কিতাবটি তিনি আমার হাতে তুলে দিয়েছেন এবং পড়ার তাওফীক দান করেছেন।
যাকে এত ভালোবাসলাম, যার কাছ থেকে এত কিছু পেলাম, তখনো তাঁকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি! তবে এটা ভেবে সান্তনা পেতাম যে, তিনি আমার কথা জেনেছেন এবং....। সম্ভবত ১৯৮৪ সালে তিনি প্রথম বাংলাদেশ সফর করলেন এবং দূর থেকে তাকে দেখলাম। স্বপ্নেও ভাবিনি তাঁর সঙ্গে দেখার করার সুযোগ হবে। সেই সুযোগও আল্লাহ দিলেন, আমার মুহসিন উস্তায হযরত মাওলানা সুলতান যওক ছাহেবের ওছিলায়। দিনটি ছিলো শুক্রবার। হাজী বশির ছাহেবের বাসভবনে তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন। দু'চোখ ভরে দেখলাম আমার প্রিয়তম আলী মিয়াঁকে! আহা, কী ফিরেশতা-ছুরত। নাম শুনেই বললেন, 'আচ্ছা, ছাহেবে ইকরা!' কোথায় আজ তুমি হে ইকরা! তোমাকে আমি ভুলিনি, কখনো ভোলবো না; তোমাকে দিয়েই যে তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কের উদ্বোধন! (ত্রিশ বছরেরও বেশী হবে, আমার সেই যুবক বয়সে নূরিয়া মাদরাসা থেকে ইকরা নামে একটি আরবী পত্রিকা বের করেছিলাম, ছোটদের আরবী শেখার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। এখন বোঝা যাবে না, তখন কী বৈপ্লবিক ছিলো চিন্তাটি এবং কত কঠিন ছিলো পদক্ষেপটি। বাংলাদেশ তো বটেই, পাক-ভারতেও এর কোন নমুনা ছিলো না। সাহস করে পত্রিকাটি হযরত মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নাদাবী রহ.-এর খিদমতে পাঠানো হয়েছিলো। তিনি খুব উৎসাহ দান করে একটি চিঠি লিখেছিলেন। তাতে একটি বাক্য ছিলো এরকম, 'আমার জানা ছিলো না, বাংলাদেশের মত পরিবেশে এমন ইনকিলাবি চিন্তা করার মত মানুষ রয়েছে। আমার খুব তামান্না, আপনাকে দেখি।')
📄 কিতাবের তরজমা
বিদায় মুছাফাহার সময় তিনি বললেন, যওক ছাহেব বলেছেন, আপনি বাংলায়ও লেখেন। আমার কোন কিতাবের তরজমা কি করেছেন? লজ্জিত হলাম। উত্তরের অপেক্ষা না করে তিনি বললেন, 'মাযা খাসিরা'-এর তরজমা করুন, আমি দু'আ করি।' আমার মনের এতদিনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাটিই যেন তাঁর পাক যবানে উচ্চারিত হলো, খুব আপ্লুত ও উদ্দীপ্ত হলাম, বললাম, ইনশাআল্লাহ আমি তরজমা করবো, হযরত, আপনি খাছ করে দু'আ করবেন, আল্লাহ যেন তাওফীক দান করেন। তিনি আরো বললেন, 'লক্ষ্য রাখবেন, আদবি মি'য়ার যেন অক্ষুণ্ণ থাকে, আর উর্দু তরজমাটি সঙ্গে রাখবেন।'
তারপর কত দিন, কত বছর পার হলো! রায়বেরেলির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীটি দিয়ে কত পানি গড়ালো। এমনকি আমার প্রিয়তম হযরত আলী মিয়াঁ দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন, কিন্তু কিতাবটির তরজমা আর হলো না। অথচ ইতিমধ্যে তাঁর আরকানে আরবা'আ এবং পা-জা সুরাগে যিন্দেগি তরজমা করেছি। জীবনের বহু কাজের মত এখানেও সত্য হলো كل أمر مرهون بوقته প্রতিটি কাজ তার সময়ের বন্ধনে আবদ্ধ। সেই সময় যখন হলো, তরজমাও শুরু হলো। কিন্তু ধারবাহিকভাবে নয়। পুষ্পের দ্বিতীয় প্রকাশনার প্রথম সংখ্যা প্রকাশের সময় সামান্য অংশ তরজমা করলাম, ছাপা হলো। কয়েক মাস পর দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হলো, তখন আবার কিছু তরজমা হলো। এভাবে পুষ্পের একটি সংখ্যা বের হয় মাস দু'মাস, কখনো তিনমাস পর, তখন কিতাবটিরও কিছু অংশ তরজমা হয়। এভাবে বিশটি সংখ্যায় কিতাবের প্রায় চারভাগের তিনভাগ তরজমা হলো এবং ছাপা হলো। তারপর পুষ্পের প্রকাশনা স্থগিত হয়ে গেলো, সেই সঙ্গে কিতাবের তরজমাও। 'কবে আবার পুষ্পের তৃতীয় প্রকাশনা শুরু হবে এবং কিতাবের তরজমা শেষ হবে', এই যখন অবস্থা, আল্লাহ তখন তাঁর এক বান্দাকে আমার উপর যেন 'মুসাল্লাত' করে দিলেন (চাপিয়ে দিলেন)। কিছু দিন পরপর তিনি জিজ্ঞাসা করেন, কিতাবটির বাকি অংশের তরজমা কবে শেষ হবে, কবে কিতাব আকারে পাবো? আমি বলি, এই তো শুরু করছি। এটাও যখন কয়েকবার হলো, তখন তিনি কিছুটা যেন হতাশ হয়ে বললেন, 'শুরু করছি'টা 'শুরু করেছি' কবে হবে? আসলে তিনি জানতেন, আমারও আকাঙ্ক্ষা কত এবং মজবুরি কত! তাই যখনই তাগাদা দিতেন কোমলভাবেই দিতেন। গত রামাযানের সম্ভবত প্রথম সেহরির সময় ফোনে আবার সেই প্রসঙ্গ! বাহ্যত কাজটি শুরু করার কোন সুযোগই ছিলো না। কারণ আমার সামনে তখন এমন কিছু নিছাবী কাজ ছিলো, যা একদিনের জন্যও বিলম্বিত করার 'বৈধতা' ছিলো না, কিন্তু আমার প্রিয়তম আলী মিয়াঁ- রহ. এর ভাষায় বলতে হয়, 'ভিতর থেকে কেউ যেন উদ্বুদ্ধ করলো। নিজের অজ্ঞাতেই যেন বলে ফেললাম, 'দু'আ করুন আজ থেকেই শুরু করছি এবং ইনশাআল্লাহ শাওয়ালের মধ্যে ছাপাখানায় যাবে'। তিনি খুশী হলেন, আমিও বলা যায়, আল্লাহর এ বান্দার খুশিটুকু অক্ষুণ্ণ রাখার তাগিদে অবশিষ্ট অংশের তরজমা শুরু করলাম। অন্যান্য কাজ এবং সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ রেখে, এমনকি -আল্লাহ মাফ করুন- রামাযানের যে স্বাভাবিক তিলাওয়াত, সেটাও সঙ্কোচিত করে তরজমার কাজ অব্যাহত রাখলাম। এভাবে আল্লাহর শোকর ই'তিকাফের শেষ দিকে তরজমাটি সমাপ্ত হলো। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য ফোন করে প্রথমে তাঁকেই সুসংবাদটি দিলাম। কারণ তাঁর এই অব্যাহত তাগাদা না হলে কাজটি এখন এভাবে সমাপ্ত হতো না, আরো অনেক পিছিয়ে যেতো। অবশ্য আমার নিছাবি কাজগুলো যে বিলম্বিত হলো, এজন্য কিছুটা হলেও তাকে দায়ী করা যায়। তরজমা সমাপ্ত হয়েছে শুনে তিনি বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন, আমার ভালো লাগলো। আসলে একটা সময় এমন আসে, অন্তরঙ্গ মানুষের তাড়া ও তাগাদা ছাড়া কাজ হতে চায় না। হয়ত আমি এখন সেই সময়ের মুখে পড়েছি। তাঁর উচ্ছ্বসিত আনন্দের প্রতি আমার ভালোলাগা প্রকাশ করে বললাম, 'ইনশাআল্লাহ কিতাবটি ছাপা হয়ে আসার পর এর প্রথম নোসখাটি আপনার হাতে অর্পণ করবো'। যদিও পুষ্পে তরজমার প্রতিটি কিস্তি যথেষ্ট সম্পাদনার পরই ছাপা হয়েছিলো তবু মনে হলো, গ্রন্থাকারে প্রকাশের জন্য আরো সম্পাদনা দরকার। তাই ঈদের পর নতুন করে সম্পাদনার কাজ শুরু করলাম। আলহামদু লিল্লাহ বিশদিনের লাগাতার মেহনতের পর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পাদনার কাজটিও সমাপ্ত হয়েছে। আশা করি, এখন তরজমাটি পূর্ণ মানোত্তীর্ণ না হলেও অপেক্ষাকৃত সুন্দর ও ত্রুটিমুক্ত হয়েছে।