📄 ইউসুফ বিন তাশফিন
ইউসুফ বিন তাশুফিন: সংক্ষেপে এই হইল মুরাবিতুনদের প্রাথমিক ইতিহাস। তাহাদের নিকট হইতে আন্দালুসিয়ান মুসলিম শাসকগণ বিপদের সময় সাহায্য কামনা করিতেন। মুরাবিতুন শাসক ইউসুফ বিন তাশুফিন আব্বাসীয় খলিফাদের নিকট হইতে 'আমিরুল মুসলিমীন' উপাধি লাভ করিয়াছিলেন এবং ধর্মীয় মতের জন্য এরূপ সুখ্যাতি অর্জন করেন যে, ইমাম গাজ্জালী তাহার দর্শন লাভের অভিপ্রায় জ্ঞাপন করেন। (১০৮৬ খ্রীঃ ইউসুফ বিন তাশুফিন স্পেনে আগমন করেন) তাহার সহিত কর্মঠ বার্বার সেনার বিরাট বাহিনী আলজেসিরাসে পদার্পণ করে। আলজেসিরাস তাহার সৈন্যের ঘাটি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। সেভিলের নিকটে মুতামিদসহ মুসলিম নেতা ও রাজা তাহার সহিত যোগদান করেন। প্রায় বিশ হাজার সৈন্যের সম্মিলিত বাহিনী বাদাজোজের দিকে অগ্রসর হইয়া ১০৮৬ খ্রীঃ জাল্লাকায় শত্রুদের সম্মুখীন হন। এক রক্তাক্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং খ্রীস্টানগণ এই যুদ্ধে চরমভাবে পরাজিত হয়। ষষ্ঠ আলফন্সো শুধু তিনশত সৈন্য লইয়া পলায়ন করিতে সমর্থ হয়। ইউসুফ বিন তাশুফিন আন্দালুসীয় মুসলমানদের ত্রাণকর্তা হিসাবে বিবেচিত হইতে থাকেন। অঙ্গীকার মোতাবেক ইউসুফ তাহার নবনির্মিত রাজধানী মারাকুশে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু তিনি তিন হাজার সুদক্ষ সেনাকে মুতামিদের অধীনে রাখিয়া আসেন। ৩
ইউসুফের স্পেন ত্যাগের অব্যবহিত পর খ্রীস্টানগণ মুসলমানদের সহিত পুনরায় সংঘর্ষে অবতীর্ণ হয়। খ্রীস্টানগণ যদিও ভ্যালেন্সিয়া রাজ্য ত্যাগ করিয়াছিল এবং সারাগোসার অবরোধ তুলিয়া লইয়াছিল তথাপিও মুসলিম রাজ্য মুরসিয়া, লোরকা ও আলমেরিয়ায় তাহাদের বিরাট প্রভাব ছিল। মুরসিয়া ও লোরকার মধ্যে অবস্থিত আলেডো খ্রীস্টানদের শক্তিশালী ঘাটিতে পরিণত হয়। অনৈক্যের ফলে মুসলমানগণ ক্রমে ক্রমে দুর্বল হইয়া খ্রীস্টানদের আক্রমণ প্রতিহত করিতে অক্ষম হইয়া পড়ে।
মুরাবিতুন নেতা ইবনে জামী যিনি বিভিন্ন যুদ্ধে পরাজিত হন ইয়াহিয়া বিন গানিয়ার নিকট কর্ডোভার শাসনভার অর্পণ করিয়া পলাইয়া যান। ইয়াহিয়া ও সবশেষে আত্মসমর্পণ করেন মুয়াহিদিনদের নিকট। এই রূপে বিভিন্ন জেলার পরিচালনায় নিযুক্ত স্বাধীন শাসকগণ, আত্মসমর্পণ করেন এবং খ্রীস্টানগণ পলাইয়া যায়।
টিকাঃ
৩। কোডেরা, ফ্যামিলিয়া রিয়েল ডি লস বেনিটেকসুফিন ইন রাভিস্তা ডি এ্যারাগণ, ১৯০৩; প্রিটো ওয়াই ভাইভস, পৃঃ ৪৩, টীকা-১।
📄 আলী বিন ইউসুফ
আলী ডাকনাম। আবুল হাসান, ইউসুফ বিন আশুফিনের পুত্র ও উত্তরাধিকারী। ১১০৭ খ্রীস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ কালে তাহার বয়স ছিল তেইশ বৎসর। তিনি আন্দালুসিয়ার শহর ও বিভিন্ন প্রদেশে অভিজ্ঞ ও অনুগত গভর্নরদিগকে নিয়োগ করেন। ইউসুফের পুত্র তামিম বানু হুদদের বিরুদ্ধে সারাগোসার জনসাধারন ও ভ্যালেন্সিয়ার গভর্নরের সাহায্যে এবরো উপত্যকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সারাগোসা ১১১০ খ্রীস্টাব্দে অতি সহজে অধিকার করেন। মুরাবিতুন জেনারেল সির বিন আবুবকর পশ্চিম স্পেন আক্রমণ করিয়া লিসবন ও সানতারেন অধিকার করেন। আলীর ভ্রাতা আমিরের মৃত্যুর পর খ্রীস্টানগণ আরাগণের বিখ্যাত যোদ্ধা প্রথম আলফন্সো সারাগোসা, কালাতাইউদ এবং তাগুসের অদূরে অবস্থিত বহু প্রসিদ্ধ জায়গা ফ্রান্সবাসীদের সাহায্যে পুনরোধিকার করেন। পশ্চিম স্পেনের বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানের পর্তুগাল ও ডুরো উপত্যকা আলী বিন ইউসুফের অধিকারে আসে। আলী নিজে বিরাট সেনাবাহিনী লইয়া খ্রীস্টান শক্তিকে ধ্বংস করিতে অগ্রসর হন। তিনি কর্ডোভা পৌছিয়া ইফ্রিকিয়ায় বিদ্রোহ সম্পর্কে অবহিত হন এবং ১১৪৫ খ্রীস্টাব্দে প্রত্যাবর্তন করিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হন।
আলী তাহার পিতার ন্যায় যোগ্য ছিলেন না। তিনি রাজ্যের প্রশাসনিক কার্যে উদাসীন ছিলেন এবং অধিকাংশ সময় ধর্মকর্মে ধ্যানমগ্ন থাকিতেন। তিনি তাহার পত্নী কামারের নির্দেশে পরিচালিত হইতেন। প্রকৃত পক্ষে রাজ্য পরিচালিত হইত হারেম হইতে। জনগণ সুখে শান্তিতে ছিল না এবং অভিজাত শ্রেণী ক্ষমতা গ্রহণের চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। বার্বারগণ তাহাদের ঐশ্বর্য ও ক্ষমতায় আসীন থাকিয়া ইসলাম বিরোধী আদেশ প্রদান ও অসংযত জীবন যাপনে লিপ্ত হয়।
📄 আল মুয়াহিদুনদের শাসন
মুয়াহিদুন ছিলেন আটলাস পর্বতে বসবাসকারী জাতি মাসমুদাহ উপজাতির অর্ন্তগত। ১২ শত শতাব্দীর প্রারম্ভে মাসমুদা গোত্রের ধর্ম সংস্কারক ইফ্রিকিয়ায় আগমন করেন। তিনি ছিলেন আব্দুলাহ বিন তুমারাতের পুত্র আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ (সিঃ ১০৭৮-১১৩০)। তিনি আটলাসের হিন্তাতা গোত্রে ১০৮২ খ্রীঃ জন্মগ্রহণ করেন। তাহার পিতা ছিলেন সুস পল্লীর মসজিদের খাদেম। তিনি তাকালিদ বিরোধী, কোরআন সুন্না ও ইজমায়ে সাহাবাতে দৃঢ় বিশ্বাসী। মুসলিম মসিহর ন্যায় পরবর্তীকালে তিনি নিজেকে মাহদী (খোদার একত্ববাদ) মতবাদ প্রচার করিতেন। এই কারণেই তাহার অনুসারীদের মুয়াহিদুন বলা হইত। নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি ইসলামী আদর্শের প্রচার করিতে শুরু করেন। আল-মুয়াহিদুন (একত্ববাদীগণ) নামে পরিচিত অসংখ্য শিষ্য মরক্কো যাত্রা কালে তাহার অনুসরণ করে।
মাহদীর প্রথম ও প্রধান শিষ্য ছিলেন আবদুল মুমিন। তিনি ছিলেন নেদরোনার কুমিয়া গোত্রের ধনী বার্বার কুম্ভকার আলীর পুত্র। আবদুল মুমিন বুজাইয়াহর সন্নিকটে তাহার গুরুর সহিত মিলিত হন, যেখান হইতে ১১১৭/১৮ খ্রীঃ মাহদী মরক্কোর ফেজে গমন করিতে বাধ্য হন। মৃত্যু ভয়ে সেখান হইতে তিনি একদিনের দূরত্বে অবস্থিত পার্বত্য অঞ্চলের এক সুরক্ষিত দুর্গ তিনমালে গমন করেন। সেখানে তিনি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন শুরু করেন এবং ১১২১ খ্রীঃ নিজেকে মাহদী বলিয়া দাবী করেন। আব্দুল মুমিনকে তাহার উত্তরাধিকারী মনোনয়ন করিয়া ১১২৮-৩০ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে মাহদী ইন্তেকাল করেন।
📄 আবদুল মুমিনের হাস্তে মুরাবিতুনদের পরাজয়
আলী বিন ইউসুফ আল-মুরাবিত তাহার প্রথম জীবন শান্তি ও সমৃদ্ধির মধ্যে অতিবাহিত করেন কিন্তু তাহার শাসনের শেষ দিনগুলি অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও বৈদেশিক হস্তক্ষেপের শিকারে পরিণত হয়। ইউসুফের পুত্র তাশুফিন মুয়াহিদিনদের মোকাবিলা করিতে ব্যর্থ হন। মুয়াহিদিন অধিকৃত তিলিমসানের নিকটবর্তী এলাকায় তাহার সেনাবাহিনী পরাজিত হয়। ফেজ, সিউটা, তাঞ্জিয়ার, আগমাত আত্মসমর্পণ করে। তাশুফিন অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়িত করিতে অক্ষম হইয়া এগার মাসের অবরোধের পর ১১৪৬ খ্রীঃ মরক্কো আব্দুল মুমিনের নিকট সমর্পণ করেন। প্রায় সত্তর হাজার ক্ষুধার্ত ও দুর্ভিক্ষ প্রপীড়িত লোককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। আবদুল মুমিন তাহার তেত্রিশ বৎসরের রাজত্বকালে রাজ্যের সীমানা ১২৬০ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে ত্রিপলী সীমান্তের অভ্যন্তরে সম্প্রসারিত করেন। ইহাই ছিল সর্বপ্রথম বৃহৎ মুসলিম সাম্রাজ্য যাহা গেডেস উপসাগর হইতে আটলান্টিক মহাসাগর এলাকা পর্যন্ত ও মুসলিম স্পেনের সম্মিলিত অঞ্চল লইয়া গঠিত হইয়াছিল।