📄 কর্ডোভার জাহওয়ারী রাজবংশ
উমাইয়াদের শাসনের শেষ যুগে কর্ডোভার সিংহাসনে চতুর্থ আবদুর রহমানের ভ্রাতা হিশামের স্থলে রাজপ্রাসাদের জনৈক প্রভাবশালী সদস্য আবুল হাজম ইবনে জাহওয়ার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁহার পূর্বপুরুষ আবু ওবায়দা আল কালবী আরব দেশ হইতে স্পেনে আগমন করিয়াছিলেন। তৃতীয় হিশাম ইবনে জাহওয়ারকে ভক্তি শ্রদ্ধা করিতেন। কিন্তু তাঁহার প্রধান মন্ত্রী হাকাম তাঁহাকে ঘৃণা করিতেন। হাকাম ইবনে জাহওয়ারকে ক্ষমতা হইতে অপসারণ করিতে ব্যর্থ হন। হাকামের অবিরাম প্রচেষ্টায় ইবনে জাহওয়ার সতর্কতা অবলম্বন করেন। তিনি শুধু হাকামকে অপসারণের ষড়যন্ত্রেই লিপ্ত হইলেন না রাজত্ব উৎখাতের চেষ্টায়ও আত্মনিবেশ করিলেন। তাঁহাকে এই ষড়যন্ত্রে সহযোগিতা করিলেন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যগণ যাহারা উমাইয়া শাসনের শেষ আমলে দেশকে শাসন করিবার জন্য কর্ডোভায় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিলেন। কিন্তু তিনি জনগণকে বিশ্বাস করিতে পারিতেছিলেন না কারণ জনগণের আনুগত্য ছিল রাজতন্ত্রের প্রতি। তাঁহার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তিনি একজন দুর্বল শাসকের অনুসন্ধানে ছিলেন। তিনি তৃতীয় হিশামের আত্মীয় জনৈক উমাইয়াকে সিংহাসন দখল করিবার জন্য বিদ্রোহ করিতে প্ররোচিত করিলেন। তিনি কর্ডোভাবাসীদের সহযোগিতায় তৃতীয় হিশাম ও তাঁহার প্রধান মন্ত্রী হাকাম ইবনে মাইককে ক্ষমতাচ্যুত করেন। হিশামকে কারারুদ্ধ করে পরে নির্বাসিত করা হয়। খেলাফতের অবসান ঘোষণা করা হইলে ১০৩১ খ্রীস্টাব্দে উপদেষ্টা পরিষদ রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। তাহারা জাহওয়ারকে উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত করেন এবং তাঁহার উপর রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বময় ক্ষমতা ন্যস্ত করেন।
টিকাঃ
২। এন্টনিও প্রিটো ওয়াই ভাইভস্, লস রিইয়েচ, পৃঃ ২১, ২৮: আল-আন্দালুস, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৯৪১. পৃঃ ১৮: আল-বোরনোজ, লা ইস্পানা মুসালমানা, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৪৪-৫৩।
📄 আবুল হাজম ইবনে জাহওয়ার
আবুল হাজম ইবনে জাহওয়ার ছিলেন একজন আত্মোৎসর্গিত ও নিঃস্বার্থ প্রশাসক। বার্বারদের ক্ষমতা গ্রহণের পর আরব নেতাগণ দ্বিতীয় হিশামের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। তাঁহার নিকট আত্মসমর্পণ ব্যতীত ইবনে জাহওয়ারের অন্য কোন উপায় ছিল না। সুতরাং আরব ও স্লাভগণ বার্বার শক্তির বিরুদ্ধে একমাত্র নেতার অধীনে একতাবদ্ধ হন। ১০৩৫ খ্রীঃ তিনি কর্ডোভাবাসীকে দ্বিতীয় হিশামের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু আবুল কাসিম যখন দ্বিতীয় হিশামের সহিত কর্ডোভার সিংহাসনে আরোহণ করিতে চেষ্টা করেন, জাহওয়ার ইহার বিরোধিতা করেন। তিনি খোৎবা হইতে হিশামের নাম অপসারণ করেন এবং খলিফাকে প্রতারক ও ভণ্ড হিসাবে জনগণের নিকট প্রচার করেন। আবুল কাশেম বাধ্য হইয়া ভগ্নহৃদয়ে সেভিলে প্রত্যাবর্তন করেন।
সিনেটের দুইজন সদস্য মুহাম্মদ ইবনে আব্বাস ও আবদুল আজিজ ইবনে হাসান উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করে। তিনি উদ্ধত বার্বারগণকে বরখাস্ত করেন। বানু ইফরানের বিরুদ্ধে কর্ডোভাবাসীদের কোন অভিযোগ না থাকায় তিনি তাহাদিগকে বহাল রাখেন এবং ন্যাশনাল গার্ডদের দ্বারা অন্যদের জায়গা পূরণ করেন। তিনি কখনও রাজা উপাধি গ্রহণ করেন নাই এবং তিনি তাঁহার জীর্ণ কুটিরে বাস করিতেন এবং সিনেটের অনুমোদন ব্যতীত তিনি কখনও কাহাকেও কোন উপঢৌকন দিতেন না। তাঁহার দক্ষ প্রশাসনের কারণে ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি সাধিত হয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের মূল্য কমিয়া যায় এবং জনগণের মধ্যে শান্তি ফিরিয়া আসে কিন্তু অতীতের জাঁকজমক ও রাজনৈতিক প্রাধান্য কখনও ফিরিয়া আসে নাই।
টিকাঃ
৩। এন্টনিও প্রিটো ওয়াই ভাইভস্, লস রিইয়েচ, পৃঃ ২১, ২৮: আল-আন্দালুস, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৯৪১. পৃঃ ১৮: আল-বোরনোজ, লা ইস্পানা মুসালমানা, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৪৪-৫৩।
📄 আবদুল ওয়ালিদ ইবনে জাহওয়ার
১০৪৫ খ্রীঃ আবুল হাজম ইবনে জাওহারের মৃত্যুর পর তাহারই ন্যায় সৎ প্রতিভাবান ও যোগ্য শাসক তাঁহার পুত্র আবুল ওয়ালিদ ইবনে জাহওয়ার উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হন। তিনিও তাঁহার পিতার ন্যায় সুবিচার প্রতিষ্ঠা করেন এবং শহরের সুধী ও বিদ্বান ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। তিনি ইব্রাহিম বিন জাহওয়ারের মত যোগ্য ব্যক্তিকে তাঁহার উজির নিযুক্ত করেন এবং শহরে দীর্ঘ বিশ বৎসর কাল নিরপেক্ষ ও নিঃস্বার্থ শাসন পরিচালনা করেন।
📄 আবদুল মালিক
১০৬৪ খ্রীঃ বৃদ্ধ আবদুল ওয়ালিদ ইবনে জাহওয়ার তাঁহার দুইপুত্র আবদুর রহমান ও আবদুল মালিকের পক্ষে ক্ষমতা ত্যাগ করেন। আবদুর রহমানের উপর অর্থ দফতর ও সাধারণ প্রশাসনের ভার অর্পিত হয়। আবদুল মালিক সেনাবাহিনীর দায়িত্বে নিযুক্ত হন। আবদুল মালিক তাঁহার ভ্রাতা হইতে বেশি ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। ওয়াজির ইবনুল সাক্কারের সুযোগ্য প্রশাসনের ফলে রাজ্যে কিছু দিনের জন্য শান্তি বিরাজ করে। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার জন্য তাঁহাকে সকলেই প্রশংসা করিতেন। তিনি ছিলেন কর্ডোভার শত্রুদের হৃদয়ে ত্রাস সৃষ্টিকারী। কর্ডোভা অধিকারের উদ্দেশ্যে সেভিলের রাজা মুতামিদ, আবদুল মালিক ও ইবনুল সাক্কার মধ্যে বিভেদের বীজ বপন করেন। ফলে ওয়াজির নিহত হয়। ওয়াজিরের প্রতি অনুগত অধিকাংশ অভিজাত ব্যক্তি ও কর্মচারী আবদুল মালিককে ত্যাগ করে। পরিত্যক্ত শাসক প্রজাতন্ত্রের শেষ চিহ্নটুকু মুছিয়া ফেলেন। এই সুযোগে ১০৭০ খ্রীস্টাব্দে টলেডোর মামুন কর্ডোভা আক্রমণ করেন। আবদুল মালিক শত্রু নিধনের জন্য সেভিলের মুতাসিককে আমন্ত্রণ জানান। ইতিমধ্যে মুতাসিকের মৃত্যু ঘটে। শত্রু অবরোধ তুলিয়া লইতে বাধ্য হয় সত্য কিন্তু কর্ডোভাবাসী তাহাদের প্রভুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং মুতামিদের সহিত যোগদান করে। মুতামিদ কর্ডোভা অধিকার করিয়া আবদুল মালিক ও তাঁহার বৃদ্ধ পিতাসহ সমস্ত পরিবারকে সাল্টেশের কারাগারে বন্দী করেন। বৃদ্ধ আবুল ওয়ালিদ এই ঘটনার পর চল্লিশ দিন জীবিত ছিলেন। মামুনের নিকট হইতে মুতামিদ বলপূর্বক কর্ডোভা দখল করেন। এইরূপে অল্পদিনের মধ্যে কর্ডোভা টলেডোর মামুনের নিকট হইতে সেভিলদের অধিকারে চলিয়া যায়।