📄 ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজবংশ
রাজনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব হ্রাস পাইলেও নেতাগণ সাংস্কৃতিক, কৃষি ও উদ্যান উন্নয়নে একে অপরের সহিত প্রতিযোগিতা করিত। কর্ডোভার গোত্রীয় প্রধানগণ তাহাদের সামর্থ অনুসারে রাজপ্রাসাদের জাঁকজমকের অনুকরণ করিত। ক্ষুদ্ররাজ্যে শাসকগণ খুবই কর্মতৎপর ছিলেন এবং মন্ত্রীগণকে ইচ্ছা মাফিক কোণঠাসা করিয়া রাখিত। অপরদিকে নিকৃষ্ট চরিত্রের শাসকগণ তাহাদের মন্ত্রীদের দ্বারা পরিচালিত হইত। মন্ত্রীগণ শাসকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তাহারা একদিকে শাসকগণকে জাঁকজমক ও জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত রাখিত অপরদিকে নিজেদের উচ্চ আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য শক্তি সঞ্চয় করিত।
বার্বার, আন্দালুসীয় ও নওমুসলিমদের লইয়া পৃথক পৃথক তিনটি গোত্র গড়িয়া ওঠে। উমাইয়া সাম্রাজ্য পতনের পর বার্বার ও স্লাভগণ বেশি লাভবান হয়। বার্বার শাসকগণ গ্রানাডা ও গোয়াদালকুইভির দ্বীপসহ উহার দক্ষিণ উপকূল অধিকার করে। স্লাভগণ দেশের পূর্ব দিকে অগ্রসর হইয়া উপকূলীয় শহর আলমেরিয়া ভ্যালেন্সিয়া ও তোরতোসা অধিকার করে। কিন্তু তাহারা বার্বার ও আন্দালুসীয়দের ন্যায় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা হইতে বিরত থাকে। কতিপয় আরব অভিজাত তাহাদের নীতি অব্যাহত রাখে। তাহাদের এই আভিজাত্যের বিরুদ্ধে তৃতীয় আবদুর রহমান ও হাজীব আল-মনসুর প্রত্যক্ষ আক্রমণ চালান। একইভাবে মুসলমানগণ অবশিষ্ট মুসলিম স্পেনে তাহাদের প্রভুত্ব ও প্রভাব বিস্তার করে। আন্দালুসীয় শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল আব্বাসীগণ। আলমুত্তাদিদ সেভিলের ক্ষুদ্ররাষ্ট্রকে পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে বিস্তৃত করেন এবং কর্ডোভা ও গ্রানাডার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। জাঁকজমকে সেভিলের রাজপ্রাসাদ কর্ডোভার রাজপ্রাসাদের সমকক্ষ ছিল।
উল্লেখযোগ্য ক্ষুদ্র শাসকদের মধ্যে কর্ডোভার বানু জাওহার, মালাগা ও আলজেসিরার বানু হাম্মুদ, সারাগোসার বানু হুদ এবং সেভিলের বানু আব্বাস ছিলেন আরব। গ্রানাডার বানু জিরি ও টলেডোর বানু জুনুন ছিলেন বার্বার এবং দক্ষিণপূর্ব স্পেনের ও বেলিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জের ক্ষুদ্র স্লাভ শাসকগণ যেমন আলমেরিয়ার খায়রান মুরসিয়ার জুহাইর, দেনিয়ার মুযাহিদ ও অন্যান্য শাসকগণ ছিলেন স্লাভ। এই ক্ষুদ্র শাসকগণ সর্বদা একে অপরের সহিত যুদ্ধে লিপ্ত থাকিত এমন কি অপরকে ধ্বংস করিবার জন্য খ্রীস্টানদিগকেও সাহায্য করিত। ইফ্রিকার দুই শক্ত বার্বার শাসক মুরাবিতিন ও মুওয়াহিদীনদের কবলে পড়িয়া তাহারা দুর্বল হইয়া পড়ে।
📄 কর্ডোভার জাহওয়ারী রাজবংশ
উমাইয়াদের শাসনের শেষ যুগে কর্ডোভার সিংহাসনে চতুর্থ আবদুর রহমানের ভ্রাতা হিশামের স্থলে রাজপ্রাসাদের জনৈক প্রভাবশালী সদস্য আবুল হাজম ইবনে জাহওয়ার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁহার পূর্বপুরুষ আবু ওবায়দা আল কালবী আরব দেশ হইতে স্পেনে আগমন করিয়াছিলেন। তৃতীয় হিশাম ইবনে জাহওয়ারকে ভক্তি শ্রদ্ধা করিতেন। কিন্তু তাঁহার প্রধান মন্ত্রী হাকাম তাঁহাকে ঘৃণা করিতেন। হাকাম ইবনে জাহওয়ারকে ক্ষমতা হইতে অপসারণ করিতে ব্যর্থ হন। হাকামের অবিরাম প্রচেষ্টায় ইবনে জাহওয়ার সতর্কতা অবলম্বন করেন। তিনি শুধু হাকামকে অপসারণের ষড়যন্ত্রেই লিপ্ত হইলেন না রাজত্ব উৎখাতের চেষ্টায়ও আত্মনিবেশ করিলেন। তাঁহাকে এই ষড়যন্ত্রে সহযোগিতা করিলেন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যগণ যাহারা উমাইয়া শাসনের শেষ আমলে দেশকে শাসন করিবার জন্য কর্ডোভায় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিলেন। কিন্তু তিনি জনগণকে বিশ্বাস করিতে পারিতেছিলেন না কারণ জনগণের আনুগত্য ছিল রাজতন্ত্রের প্রতি। তাঁহার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তিনি একজন দুর্বল শাসকের অনুসন্ধানে ছিলেন। তিনি তৃতীয় হিশামের আত্মীয় জনৈক উমাইয়াকে সিংহাসন দখল করিবার জন্য বিদ্রোহ করিতে প্ররোচিত করিলেন। তিনি কর্ডোভাবাসীদের সহযোগিতায় তৃতীয় হিশাম ও তাঁহার প্রধান মন্ত্রী হাকাম ইবনে মাইককে ক্ষমতাচ্যুত করেন। হিশামকে কারারুদ্ধ করে পরে নির্বাসিত করা হয়। খেলাফতের অবসান ঘোষণা করা হইলে ১০৩১ খ্রীস্টাব্দে উপদেষ্টা পরিষদ রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। তাহারা জাহওয়ারকে উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত করেন এবং তাঁহার উপর রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বময় ক্ষমতা ন্যস্ত করেন।
টিকাঃ
২। এন্টনিও প্রিটো ওয়াই ভাইভস্, লস রিইয়েচ, পৃঃ ২১, ২৮: আল-আন্দালুস, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৯৪১. পৃঃ ১৮: আল-বোরনোজ, লা ইস্পানা মুসালমানা, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৪৪-৫৩।
📄 আবুল হাজম ইবনে জাহওয়ার
আবুল হাজম ইবনে জাহওয়ার ছিলেন একজন আত্মোৎসর্গিত ও নিঃস্বার্থ প্রশাসক। বার্বারদের ক্ষমতা গ্রহণের পর আরব নেতাগণ দ্বিতীয় হিশামের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। তাঁহার নিকট আত্মসমর্পণ ব্যতীত ইবনে জাহওয়ারের অন্য কোন উপায় ছিল না। সুতরাং আরব ও স্লাভগণ বার্বার শক্তির বিরুদ্ধে একমাত্র নেতার অধীনে একতাবদ্ধ হন। ১০৩৫ খ্রীঃ তিনি কর্ডোভাবাসীকে দ্বিতীয় হিশামের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু আবুল কাসিম যখন দ্বিতীয় হিশামের সহিত কর্ডোভার সিংহাসনে আরোহণ করিতে চেষ্টা করেন, জাহওয়ার ইহার বিরোধিতা করেন। তিনি খোৎবা হইতে হিশামের নাম অপসারণ করেন এবং খলিফাকে প্রতারক ও ভণ্ড হিসাবে জনগণের নিকট প্রচার করেন। আবুল কাশেম বাধ্য হইয়া ভগ্নহৃদয়ে সেভিলে প্রত্যাবর্তন করেন।
সিনেটের দুইজন সদস্য মুহাম্মদ ইবনে আব্বাস ও আবদুল আজিজ ইবনে হাসান উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করে। তিনি উদ্ধত বার্বারগণকে বরখাস্ত করেন। বানু ইফরানের বিরুদ্ধে কর্ডোভাবাসীদের কোন অভিযোগ না থাকায় তিনি তাহাদিগকে বহাল রাখেন এবং ন্যাশনাল গার্ডদের দ্বারা অন্যদের জায়গা পূরণ করেন। তিনি কখনও রাজা উপাধি গ্রহণ করেন নাই এবং তিনি তাঁহার জীর্ণ কুটিরে বাস করিতেন এবং সিনেটের অনুমোদন ব্যতীত তিনি কখনও কাহাকেও কোন উপঢৌকন দিতেন না। তাঁহার দক্ষ প্রশাসনের কারণে ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি সাধিত হয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের মূল্য কমিয়া যায় এবং জনগণের মধ্যে শান্তি ফিরিয়া আসে কিন্তু অতীতের জাঁকজমক ও রাজনৈতিক প্রাধান্য কখনও ফিরিয়া আসে নাই।
টিকাঃ
৩। এন্টনিও প্রিটো ওয়াই ভাইভস্, লস রিইয়েচ, পৃঃ ২১, ২৮: আল-আন্দালুস, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৯৪১. পৃঃ ১৮: আল-বোরনোজ, লা ইস্পানা মুসালমানা, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৪৪-৫৩।
📄 আবদুল ওয়ালিদ ইবনে জাহওয়ার
১০৪৫ খ্রীঃ আবুল হাজম ইবনে জাওহারের মৃত্যুর পর তাহারই ন্যায় সৎ প্রতিভাবান ও যোগ্য শাসক তাঁহার পুত্র আবুল ওয়ালিদ ইবনে জাহওয়ার উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হন। তিনিও তাঁহার পিতার ন্যায় সুবিচার প্রতিষ্ঠা করেন এবং শহরের সুধী ও বিদ্বান ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। তিনি ইব্রাহিম বিন জাহওয়ারের মত যোগ্য ব্যক্তিকে তাঁহার উজির নিযুক্ত করেন এবং শহরে দীর্ঘ বিশ বৎসর কাল নিরপেক্ষ ও নিঃস্বার্থ শাসন পরিচালনা করেন।