📄 সভাসদদের সহিত আবু আমীরের সম্পর্ক
আবু আমীর মুহাম্মদ তাঁহার শ্বশুর গালিবের সহায়তায় হাজীব জাফর ইবনে উসমান আল মুশাফীকে ও অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিগণ যাহারা তাঁহার ক্ষমতা গ্রহণে বিরোধিতা করিয়াছিলেন তাহাদিগকে অপসারণ করেন । তিনি শেষ আঘাত হানেন রাজকীয় দেহরক্ষী স্লাভদের উপর, যাহারা গালিবের প্রতি বিশেষ অনুগত ছিল । মঞ্চে একমাত্র বিরোধী জেনারেল গালিব অবশিষ্ট থাকেন । আবু আমীরের সৌভাগ্য গালিব খ্রীস্টানদের সহিত যুদ্ধকালে নিহত হন । তিনি খলিফাকে প্রাসাদের চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ করেন এবং উৎসব অনুষ্ঠান ব্যতীত সরকারি কর্মচারীদের সহিত দেখা সাক্ষাৎ করিতে নিষেধ করেন । কর্ডোভাতে উমাইয়াদের দ্বারা নির্মিত প্রাসাদ আল কাজার হইতে নতুন নগরী মদিনাতুল জাহিরাতে প্রশাসনিক সদর দফতর স্থানান্তর করিয়া বাহিরের জগত হইতে ইহাকে বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলেন ।
📄 আলেমদের সহিত তাঁহার সম্পর্ক
সুলতানা সুব্হর সহিত তাহাদের পূর্ব সম্পর্ক লইয়া কর্ডোভায় বিরূপ সমালোচনা হয় । খলিফার সহিত তাঁহাকেও হত্যা করিতে ফকিহগণ ঐক্যবদ্ধভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং তৃতীয় আবদুর রহমানের অপর পৌত্রকে সিংহাসনে বসাইতে চেষ্টা করেন । ৮ বিচারক ও আলেমদের সন্তুষ্ট করিবার জন্য আল-মনসুর আল হাকামের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত দর্শনের গ্রন্থসমূহ জ্বালাইয়া দেন এবং বহু দার্শনিককে নির্বাসিত করেন । ইহার পরও তাহাদের সমর্থন লাভের জন্য তিনি স্বহস্তে কোরআন শরীফ নকল করেন ।
টিকাঃ
৮. ধ্বংসের এই বিভীষিকাময় চিত্র টলেডোর সাঈদ কর্তৃক আমাদের নিকট পৌঁছিয়াছে।
📄 সেনাবাহিনীর পুনর্গঠন
প্রধানমন্ত্রী মুশাফীকে উৎখাত করিবার পর আল-মনসুর প্রধান সেনাপতির প্রভাব হইতে নিজেকে মুক্ত করিতে চেষ্টা করেন । তিনি প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন সেনাবাহিনীকে তাঁহার আয়ত্তে আনিবার জন্য । আরব বার্বার এবং স্পেনীয়দের লইয়া সেনাবাহিনী গঠন করা হয় । গালিবের পক্ষপাতিত্ব ও অবহেলার দরুন সেনাবাহিনী পূর্বের শৃঙ্খলাবোধ হারাইয়া ফেলে । উত্তর আফ্রিকা হইতে নতুন সেনা সংগ্রহ করিয়া তিনি খলিফার সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করিয়া গড়িয়া তোলেন । ৯ বার্বার সৈন্যগণ দুই শ্রেণীর ছিল— মুরতাজিকা (বেতনভোগী নিয়মিত সেনা) ও মুত্তাবিয়া (স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী) । দেশের উত্তরাঞ্চলের খ্রীস্টানগণও অধিক সংখ্যায় কর্ডোভার সেনাবাহিনীতে যোগদান করে । গোত্রীয় আদর্শে গঠিত মুসলিম সেনাবাহিনী উহাদের বৈশিষ্ট্য হারাইয়া ফেলে । আল-মনসুর আরব সৈন্যদিগকে বার্বার ও খ্রীস্টান বেতনভোগী সৈন্যদের মধ্যে ভাগাভাগী করিয়া দেন ।
টিকাঃ
৯. লা ইস্পানা, পৃঃ ১৩৭-৩৮।
📄 সামরিক অভিযান
বেসামরিক প্রশাসনের মত সামরিক ক্ষেত্রেও আবু আমীর মুহাম্মদ কৃতিত্বের পরিচয় দান করেন । ১০ ৩৭১ হিঃ/ ৯৮১ খ্রীঃ লিওনের রাজা তৃতীয় রামিরো, ক্যাস্টিলের কাউন্ট গার্সিয়া ফার্নান্ডেজ ও পাম্পলোনার রাজা সাঞ্চো আবারকার সম্মিলিত বাহিনীকে আবু আমীর মুহাম্মদের সেনাপতি রোয়েদাতে পরাজিত করেন । ১১ ১২ খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় লাভের পর তিনি ৯৮১ খ্রীঃ 'মনসুর বিল্লাহ' উপাধি গ্রহণ করেন । ৯৮৫ খ্রীঃ তিনি বার্সিলোনা অধিকার ও লুণ্ঠন করেন এবং কাউন্ট বরেলকে বিতাড়িত করেন । ইবনে আব্বারের মতে ইহা ছিল তাঁহার তেইশতম অভিযান । ১৩ দ্বিতীয় বেরমুডের অধীনে লিওনবাসীগণ ৯৮৭ খ্রীঃ পুনরায় বিদ্রোহ ঘোষণা করিলে ৯৮৮ খ্রীঃ তাহারা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয় । স্পেনের মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমা পুনরায় পীরেনীজ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে । ১৪
মৌরিতানিয়াতেও তাঁহার সেনাবাহিনী সফলতা অর্জন করে । জিরি বিন আতিয়া আবু আমীরের বিরুদ্ধে সুলতানা সুবহের সহিত যোগদান করেন । জিরিকে শাস্তি প্রদানের জন্য মনসুর তাঁহার পুত্র আবদুল মালিককে প্রেরণ করেন । ৯৯৭ খ্রীঃ কাসরে আবি দানিশে রক্ষিত যুদ্ধোপযোগী বেশ কিছু সংখ্যক যুদ্ধ জাহাজকে অভিজ্ঞ ও পারদর্শী নাবিক দ্বারা সুসজ্জিত করিয়া গ্যালেসিয়া অভিযানে প্রেরণ করা হয় । এই দুঃসাহসিক অভিযানে মনসুর বিরাট সফলতা অর্জন করেন । দক্ষিণে আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল এবং সুদূর উত্তরে লিওন, সান্তিয়াগো, দি কম্পোস্টিলা ও কান্টাব্রিয়ান সমুদ্র পর্যন্ত তাঁহার সাম্রাজ্যের সীমা সম্প্রসারিত হয় ।
টিকাঃ
১০. হিস্ট্রি অব দ্যা আরবস, পৃঃ ৫৩২।
১১. লা ইস্পানা, পৃঃ ১৪৭-৪৮।
১২. গায়ানগোস, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২১৮।
১৩. আ'মাল, পৃঃ ১১৯।
১৪. ম্যাককেব, মুরিশ স্পেন, পৃঃ ৬৩।