📄 বিদ্বান ও বিদ্যানুরাগী আল হাকাম
দ্বিতীয় আল হাকাম শুধু গ্রন্থের সংগ্রাহকই ছিলেন না । তিনি ছিলেন জ্ঞানের একনিষ্ঠ সাধক । খলিফা ও অভিজাত শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতায় আকৃষ্ট হইয়া বহু চিকিৎসাবিদ, দার্শনিক, ঐতিহাসিক, ভূগোল বিশারদ, জ্যোতির্বিদ ও অঙ্কশাস্ত্রের পণ্ডিতগণ কর্ডোভায় বসবাস করিবার জন্য আগমন করেন । হাকাম তাঁহার সময়কার পণ্ডিত ব্যক্তিদের অতিক্রম করেন । তিনি ছিলেন বিজ্ঞ ঐতিহাসিক ও নিরপেক্ষ সমালোচক । ১১ ১২ তাঁহার ঐতিহাসিক জ্ঞান ছিল খুবই নির্ভুল এবং তর্কাতীত । তাঁহার সুগভীর বিচারবুদ্ধি ও পাণ্ডিত্য সম্পর্কে মুসলিম বিশ্বের পণ্ডিতগণ গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করিতেন । তিনি স্পেন সম্পর্কে সুন্দর একখানা ইতিহাস রচনা করেন কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ গ্রন্থখানি বিনষ্ট হইয়া যায় । ১৩ হাকাম বিদ্বান, পণ্ডিত ও ধর্মবেত্তাদের শ্রদ্ধা ও সাহায্য করিতেন । একবার আবু ইব্রাহিম কর্ডোভার প্রধান মসজিদে ধর্মতত্ত্বের ওপর বক্তৃতা করিতেছিলেন, সেই সময় খলিফা তাহাকে ডাকিয়া পাঠান । বক্তৃতা সমাপ্তির পর ইব্রাহিম প্রাসাদে প্রবেশ করিয়া দেখিতে পান যে খলিফা মন্ত্রীগণসহ তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন । খলিফা তাহাকে আন্তরিক অভিবাদন ও অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন এবং মূল্যবান উপহার ও উপঢৌকনে সম্মানিত করেন ।
মৌলিক গ্রন্থ রচনা ও অনুবাদের কাজ খলিফা হাকামের রাজত্বকালে সমভাবে চলিতে থাকে । গ্রীকভাষায় লিখিত দর্শনের পুস্তকসমূহ অনুবাদ করানো হয় । চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণা এবং ঔষধের উপর গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক রচিত হয় । আবুল কাসেম অস্ত্রোপচার সম্পর্কে লিখিত পুস্তক 'আল-তাসরিফের' জন্য সুখ্যাতি অর্জন করেন । মানচিত্র অংকন ও ভূগোলশাস্ত্র সম্পর্কে গবেষণা করা হয় । আবিতার নামক জনৈক ব্যক্তি স্বয়ংক্রীয় ঘড়ি আবিষ্কার করেন । ১৪ ১৫
টিকাঃ
১১। এস. এম. ইমামউদ্দিন, হিস্পানো আরব, করাচি, ১৯৬১, পৃঃ ৪-৫।
১২। ঐ পৃঃ ৫।
১৩। হিস্পানিস, ১৮শ খণ্ড, ১৯৩৪, পৃঃ ১৯৮-২০০; লেডি প্রভেঙ্কাল, ল্যা-সিভিলাইজেশন; পৃঃ ৮৭, টীকা নং-২১।
১৪। গায়ানগোস, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৭০।
১৫। ডজি, ম্যাককেব ও স্কট কর্তৃক বর্ণিত।
📄 জনহিতকর কার্যাবলী
খলিফা জনহিতকর কার্যের প্রতি আগ্রহশীল ছিলেন । তিনি রাজপথের সংস্কার সাধন ও পথের পার্শ্বে কূপ খনন করান । সরাইখানা নির্মাণ করা হয় । গরীব ছাত্রদের জন্য ছাত্রাবাস, রুগ্নদের জন্য হাসপাতাল এবং গণশিক্ষার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলেন । ১৬ কেন্দ্রীয় রাজধানীসহ প্রাদেশিক রাজধানীতেও সাধারণ জনগণের জন্য গোসলখানা (হাম্মাম), সরাইখানা, বাজার, পুষ্করিণী ও হাসপাতাল নির্মিত হয় । খলিফা জনসাধারণকে তাহাদের গৃহপ্রাঙ্গণে ও গৃহের আশেপাশে খালি জায়গায় বাগান তৈরী করিয়া উহার রক্ষণাবেক্ষণ ও যত্ন লইতে অনুরোধ করেন । তিনি নিজে রাজকীয় বাগানের পরিচর্যায় অংশ গ্রহণ করিতেন ।
টিকাঃ
১৬। এস. এম. ইমামউদ্দিন, সাম অ্যাসপেক্টস, অব দ্যা সোশিও-ইকনোমিক এ্যান্ড কালচারাল হিস্ট্রি অব মুসলিম স্পেন, লেডেন, ১৯৬৫, পৃঃ ১৭৩।
📄 কর্ডোভা মসজিদের সংস্কারসাধন
স্থাপত্য বিদ্যা ও শিল্পের একনিষ্ঠ সেবক ছিলেন খলিফা আল হাকাম । কর্ডোভা মসজিদের সংস্কার সাধন করিয়া উহা আকারে বড় করেন । প্রথম আবদুর রহমান কর্তৃক নির্মিত দক্ষিণ পার্শ্বের প্রাচীর ভাঙ্গিয়া মূল এগার সারির (চক্র) সহিত আরও কিছু সারি সংযোগ করিয়া দৈর্ঘ্যে বর্ধিত করেন । সুন্দর একটি কামরা (মাকসুরা) নির্মাণ করা হয় । তাঁহার সময়ে মসজিদের বর্ধিত অংশে বাগদাদের স্থাপত্যশিল্পের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় । অলঙ্কৃত খিলান ও সুসজ্জিত মিহরাবের জন্য কর্ডোভা মসজিদ স্থাপত্যশিল্পের বিকাশে চরমে পৌঁছে । ১৭ খলিফা কনস্টান্টিনোপল হইতে ৩২৫ কিউব মোজাইক সামগ্রী উপঢৌকন পান । কর্ডোভা মসজিদের মিম্বার কাষ্ঠ নির্মিত । ইহা কারুকার্যখচিত শিল্পকর্মের এক উজ্জ্বল নিদর্শন । এই মিম্বার নির্মাণ করিতে ৩৬০০০ খণ্ড আইভরি, আবলুস, সেগুন ও অন্যান্য সুগন্ধিযুক্ত কাষ্ঠ, মূল্যবান পাথর ও স্বর্ণের ব্যবহার করা হয় । মসজিদের নির্মাণ কার্য সমাপ্ত করিতে সময় লাগে সাত বৎসর এবং ৩৫,৭০৭ দিনার খরচ হয় । কর্ডোভা মসজিদ নির্মাণ করিতে সর্বমোট ২,৬১,০০০ দিনার ব্যয় হয় । কর্ডোভার প্রস্তরখনি হইতে কর্তনকৃত আস্ত পাথরের তৈরি দুইটি বিরাট ঝরণা খলিফা প্রধান মসজিদের জন্য তৈয়ার করান ।
টিকাঃ
১৭। ১ দিনার = ১৩২ শিলিং (১৯৬৯ খ্রীঃ)
📄 চরিত্র
আল হাকাম ছিলেন সুশিক্ষিত ও ন্যায়বিচারক শাসক । ১৮ যিনি প্রদেশগুলির উপর ধার্যকৃত কর লাঘব করেন । তিনি প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে শরিক হইতেন এবং দরিদ্রদের মধ্যে দান-খয়রাত করিতেন । তিনি কঠোরভাবে ধর্মীয় অনুশাসন মানিয়া চলিতেন এবং রসূলুল্লাহর জীবন আদর্শ (সুন্না) সাম্রাজ্যের সর্বত্র চালু করিয়াছিলেন । বিবাহ এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি মদ্যপান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন । হাকাম ছিলেন নম্র দয়ালু ধর্মপরায়ণ ও সরল প্রাণ । ১৯ তিনি শত্রুকে পর্যন্ত ক্ষমা প্রদর্শন করিতেন । দ্বিতীয় হাকাম তাঁহার সামরিক শক্তি হ্রাস করেন এবং সাম্রাজ্যের সর্বত্র বর্ধিত করের ছয় ভাগের একভাগ লাঘব করেন । ২০ খলিফা আল হাকাম ছিলেন কর্মঠ । তিনি তাঁহার পিতার ন্যায় রাজনীতি প্রিয় ছিলেন না । খলিফা অঙ্কশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যা পাঠে উৎসাহী ছিলেন । তাঁহার রাজত্বকালে পোশাক পরিচ্ছদের ও বিলাসিতার প্রভূত উন্নতি সাধিত হয় ।
টিকাঃ
১৮। এস. এম. ইমামউদ্দিন, সাম অ্যাসপেক্টস অব দ্যা সোশিও-ইকনোমিক এ্যান্ড কালচারাল হিস্ট্রি অব মুসলিম স্পেন (৭১১-১৪৯২), লেডেন, ১৯৬৫, পৃঃ ১-৯।
১৯। ইবনুল ফারাজী, নং ১৩২।
২০। লেভি প্রভেঙ্কাল, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৬৮, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৩৮।