📄 কৃতিত্ব
তাঁহার কৃতিত্ব ছিল ব্যাপক । তাঁহার শাসনকালে আইবেরিয়ার উপদ্বীপ সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান চর্চায় বিরাট সাফল্য অর্জন করে । তিনি তাহার রাজ্যের অভ্যন্তরে শান্তি শৃঙ্খলা অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং খ্রীস্টান ও ফাতেমী আক্রমণ প্রতিহত করেন । হাকাম তাঁহার পিতা কর্তৃক বিলুপ্ত হাজীবের পদ পুনর্জীবিত করেন । তিনি শিক্ষা সংস্কৃতির প্রসার সাধন ও উন্নতি বিধানের জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন । পরিচ্ছন্নতা পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা, সাবানের ব্যবহার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, রাস্তায় আলোর ব্যবস্থা ও রুমালের ব্যবহার প্রভৃতি মুসলমানদের নিকট হইতে পাশ্চাত্য জগত গ্রহণ করিয়াছে । দ্বিতীয় আবদুর রহমান ও দ্বিতীয় হাকামের ন্যায় উমাইয়া শাসকগণ এই সমস্ত জিনিসের প্রবর্তন করেন । দ্বিতীয় হাকামের হেরেমে তখন যে সাবান ও প্রসাধনী দ্রব্য ব্যবহার হইত সমসাময়িক ইউরোপবাসীগণ কয়েক মাসেও উহা একবার ব্যবহার করিত না । আচার ব্যবহার, শালীনতা ও সৌজন্যবোধ এবং মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞান ইউরোপীয় সমাজ ব্যবস্থায় ও শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশ করে । তাঁহার রাজত্বকালে ইউরোপীয় নাইটগণ আরব অশ্বারোহী সৈনিকদের নিকট শিক্ষার্থী হিসাবে আগমন করিত । হাকাম স্পেনীয় সভ্যতাকে এমন উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেন যে তৎকালীন অন্ধকারময় ইউরোপে কর্ডোভা আলোর দিশারী হিসাবে কাজ করে । ৩ ৪ ৫ ৬
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ: দ্বিতীয় আল হাকাম ছিলেন বিদ্যানুরাগী ও শিক্ষা সংস্কৃতির একনিষ্ঠ সেবক ও পৃষ্ঠপোষক । তাঁহার ভ্রাতা মুনজিরকে তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের পরিদর্শক নিযুক্ত করেন । তাহার সময়ে কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় চরম উন্নতি ও সমৃদ্ধি লাভ করে । কায়রোর আল আজহার ও বাগদাদের নিজামীয়া ইহার প্রতিদ্বন্দ্বী হইয়া ওঠে । খ্রীস্টান, ইহুদী ও মুসলিম ছাত্রগণ বিদ্যা শিক্ষার্থে এখানে আগমন করিত । এখানে শুধু স্পেনের ছাত্রগণই শিক্ষা লাভ করিত না, ইউরোপের বিভিন্ন অংশ আফ্রিকা ও এশিয়ার বিদ্যার্থীগণও ভীড় জমাইত । রাজধানীতে প্রতিষ্ঠিত সাতাইশটি অবৈতনিক স্কুলে গরীব ছাত্র-ছাত্রীগণ শিক্ষা গ্রহণ করিত । প্রথম মসজিদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় তিনটি ও কর্ডোভার শহরতলীতে অবৈতনিক শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে চব্বিশটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় । প্রতিটি বড় শহরে উচ্চ শিক্ষার্থে পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়িয়া ওঠে । সেভিল, মালাগা, সারাগোসা, ও জায়েনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি কর্ডোভার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যতালিকা অনুসরণ করিত । স্পেনের অধিকাংশ জনগণ লিখিতে ও পড়িতে জানিত । কর্ডোভার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির উচ্চ পারিতোষিক দেশ বিদেশের পণ্ডিতদিগকে আকৃষ্ট করিত । কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বৃহৎ লাইব্রেরিতে বহু দুষ্পাপ্য পাণ্ডুলিপি ও মূল্যবান গ্রন্থ সংরক্ষিত ছিল । ৭ ৮
কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকবৃন্দ: খলিফা হাকাম কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্য হইতে অধ্যাপকদের আমন্ত্রণ জানান এবং তাহাদের বেতনের বিনিময়ে জায়গীর প্রদান করেন । এই সমস্ত শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন বাগদাদের বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ ও ঐতিহাসিক আবু বকর ইবনে কুতিয়াহ যিনি কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাকরণ ও ইতিহাস শিক্ষা দান করিতেন । বাগদাদের ভাষাতত্ত্ববিদ পণ্ডিত আবু আলী আলকালী (মৃঃ ৯৬৭) শিক্ষা দিতেন প্রবাদবাক্য, ভাষা, কাব্য-সাহিত্য ও প্রাচীন আরবদের কৌতূহলোদ্দীপক জীবন-কাহিনী । তাহার রচিত 'আমালী' গ্রন্থখানি এখনও আরবী সাহিত্যের ছাত্রগণ শ্রুতিলিখন গ্রন্থহিসাবে পাঠ করিয়া থাকে । আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল উজরী ছিলেন হাকামের প্রাসাদ-চিকিৎসক । মুহাম্মদ আবু বকর আল জুবাইদী হাকামের পুত্র হিশামের গৃহশিক্ষক ছিলেন । ফিকাহ শাস্ত্রবিদ আবু ইব্রাহিম কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করিয়া ইহাকে ধন্য করিয়াছিলেন । আবু বকর ইবনে মুয়াবিয়াহ হাদীস, ধর্মতত্ত্ব, কুরআনী আইন, শিষ্টাচার ও প্রাচ্য বিজ্ঞানের উপর বক্তৃতা দান করিতেন ।
গ্রন্থাগারসমূহ: দ্বিতীয় হাকাম ও তাঁহার ভ্রাতা আবদুল্লাহ তাঁহাদের পিতার জীবদ্দশায়ই নিজস্ব গ্রন্থাগার গড়িয়া তোলেন । হাকাম এই গ্রন্থাগারগুলিকে তাঁহার পিতার গ্রন্থাগারের সহিত একত্রিত করিয়া দুষ্পাপ্য ও অমূল্য গ্রন্থ সংগ্রহে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন । তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত গ্রন্থ সংগ্রাহক । তাঁহার প্রতিনিধি ফাতিমাহ পুরাতন ও নতুন পাণ্ডুলিপি ক্রয় ও অনুলিপি সংগ্রহের জন্য কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, দামেস্ক ও বাগদাদের বিভিন্ন গ্রন্থাগার এবং পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্রগুলি তন্ন তন্ন করিয়া খোঁজ করেন । কোন কোন ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপির সংখ্যা ৬,০০,০০০ লক্ষ উল্লেখ করিয়াছেন । তবে কোন ইতিহাস লেখকই ৪,০০,০০০ লক্ষের কম উল্লেখ করেন নাই । ৯ ১০ তালিদ নামক জনৈক খোঁজা ছিলেন প্রধান গ্রন্থাগারিক । রাজ প্রাসাদের কিছু কক্ষ অনুলিপি তৈয়ারি ও পুস্তক দ্বারা সুসজ্জিত ছিল ।
টিকাঃ
৩। হিট্টি, হিস্ট্রি অব দি আরবস, পৃঃ ৫৩০।
৪। সাম অ্যাসপেক্টস, পৃঃ ১৮৪।
৫। গুরুনেবাউম, মেডিয়াভ্যাল ইসলাম, পৃঃ ৫৭।
৬। লেভি প্রভেঙ্কাল, ল্যা-সিভিলাইজেশন, আরব এন ইস্পানা, পৃঃ ১০১।
৭। ম্যাককেব, স্পেলান্ডার অব মুরিশ স্পেন, পৃঃ ৮০; মাক্কারী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৪০৮; এস. এম. ইমামউদ্দিন, হিস্পানো আরব লাইব্রেরিয়া, বুক্স এ্যান্ড ম্যানাসক্রিপ্টস (J. P. H. S. VII) করাচি, ১৯৫৯, পৃঃ ১০৬; হোল, আন্দালুস, টীকা-৩৮।
৮। মাক্কারী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩০২।
৯। জে. ম্যাককেব, স্পেলান্ডার অব মুরিশ স্পেন, পৃঃ ৮১; রিবেরা, ডিজারটেরনস, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৯৩।
১০। ম্যাককেব, পৃঃ ৮১; এস. এম. ইমামউদ্দিন, হিস্পানো আরব, করাচি, ১৯৫৯, পৃঃ ১০৮।
📄 বিদ্বান ও বিদ্যানুরাগী আল হাকাম
দ্বিতীয় আল হাকাম শুধু গ্রন্থের সংগ্রাহকই ছিলেন না । তিনি ছিলেন জ্ঞানের একনিষ্ঠ সাধক । খলিফা ও অভিজাত শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতায় আকৃষ্ট হইয়া বহু চিকিৎসাবিদ, দার্শনিক, ঐতিহাসিক, ভূগোল বিশারদ, জ্যোতির্বিদ ও অঙ্কশাস্ত্রের পণ্ডিতগণ কর্ডোভায় বসবাস করিবার জন্য আগমন করেন । হাকাম তাঁহার সময়কার পণ্ডিত ব্যক্তিদের অতিক্রম করেন । তিনি ছিলেন বিজ্ঞ ঐতিহাসিক ও নিরপেক্ষ সমালোচক । ১১ ১২ তাঁহার ঐতিহাসিক জ্ঞান ছিল খুবই নির্ভুল এবং তর্কাতীত । তাঁহার সুগভীর বিচারবুদ্ধি ও পাণ্ডিত্য সম্পর্কে মুসলিম বিশ্বের পণ্ডিতগণ গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করিতেন । তিনি স্পেন সম্পর্কে সুন্দর একখানা ইতিহাস রচনা করেন কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ গ্রন্থখানি বিনষ্ট হইয়া যায় । ১৩ হাকাম বিদ্বান, পণ্ডিত ও ধর্মবেত্তাদের শ্রদ্ধা ও সাহায্য করিতেন । একবার আবু ইব্রাহিম কর্ডোভার প্রধান মসজিদে ধর্মতত্ত্বের ওপর বক্তৃতা করিতেছিলেন, সেই সময় খলিফা তাহাকে ডাকিয়া পাঠান । বক্তৃতা সমাপ্তির পর ইব্রাহিম প্রাসাদে প্রবেশ করিয়া দেখিতে পান যে খলিফা মন্ত্রীগণসহ তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন । খলিফা তাহাকে আন্তরিক অভিবাদন ও অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন এবং মূল্যবান উপহার ও উপঢৌকনে সম্মানিত করেন ।
মৌলিক গ্রন্থ রচনা ও অনুবাদের কাজ খলিফা হাকামের রাজত্বকালে সমভাবে চলিতে থাকে । গ্রীকভাষায় লিখিত দর্শনের পুস্তকসমূহ অনুবাদ করানো হয় । চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণা এবং ঔষধের উপর গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক রচিত হয় । আবুল কাসেম অস্ত্রোপচার সম্পর্কে লিখিত পুস্তক 'আল-তাসরিফের' জন্য সুখ্যাতি অর্জন করেন । মানচিত্র অংকন ও ভূগোলশাস্ত্র সম্পর্কে গবেষণা করা হয় । আবিতার নামক জনৈক ব্যক্তি স্বয়ংক্রীয় ঘড়ি আবিষ্কার করেন । ১৪ ১৫
টিকাঃ
১১। এস. এম. ইমামউদ্দিন, হিস্পানো আরব, করাচি, ১৯৬১, পৃঃ ৪-৫।
১২। ঐ পৃঃ ৫।
১৩। হিস্পানিস, ১৮শ খণ্ড, ১৯৩৪, পৃঃ ১৯৮-২০০; লেডি প্রভেঙ্কাল, ল্যা-সিভিলাইজেশন; পৃঃ ৮৭, টীকা নং-২১।
১৪। গায়ানগোস, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৭০।
১৫। ডজি, ম্যাককেব ও স্কট কর্তৃক বর্ণিত।
📄 জনহিতকর কার্যাবলী
খলিফা জনহিতকর কার্যের প্রতি আগ্রহশীল ছিলেন । তিনি রাজপথের সংস্কার সাধন ও পথের পার্শ্বে কূপ খনন করান । সরাইখানা নির্মাণ করা হয় । গরীব ছাত্রদের জন্য ছাত্রাবাস, রুগ্নদের জন্য হাসপাতাল এবং গণশিক্ষার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলেন । ১৬ কেন্দ্রীয় রাজধানীসহ প্রাদেশিক রাজধানীতেও সাধারণ জনগণের জন্য গোসলখানা (হাম্মাম), সরাইখানা, বাজার, পুষ্করিণী ও হাসপাতাল নির্মিত হয় । খলিফা জনসাধারণকে তাহাদের গৃহপ্রাঙ্গণে ও গৃহের আশেপাশে খালি জায়গায় বাগান তৈরী করিয়া উহার রক্ষণাবেক্ষণ ও যত্ন লইতে অনুরোধ করেন । তিনি নিজে রাজকীয় বাগানের পরিচর্যায় অংশ গ্রহণ করিতেন ।
টিকাঃ
১৬। এস. এম. ইমামউদ্দিন, সাম অ্যাসপেক্টস, অব দ্যা সোশিও-ইকনোমিক এ্যান্ড কালচারাল হিস্ট্রি অব মুসলিম স্পেন, লেডেন, ১৯৬৫, পৃঃ ১৭৩।
📄 কর্ডোভা মসজিদের সংস্কারসাধন
স্থাপত্য বিদ্যা ও শিল্পের একনিষ্ঠ সেবক ছিলেন খলিফা আল হাকাম । কর্ডোভা মসজিদের সংস্কার সাধন করিয়া উহা আকারে বড় করেন । প্রথম আবদুর রহমান কর্তৃক নির্মিত দক্ষিণ পার্শ্বের প্রাচীর ভাঙ্গিয়া মূল এগার সারির (চক্র) সহিত আরও কিছু সারি সংযোগ করিয়া দৈর্ঘ্যে বর্ধিত করেন । সুন্দর একটি কামরা (মাকসুরা) নির্মাণ করা হয় । তাঁহার সময়ে মসজিদের বর্ধিত অংশে বাগদাদের স্থাপত্যশিল্পের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় । অলঙ্কৃত খিলান ও সুসজ্জিত মিহরাবের জন্য কর্ডোভা মসজিদ স্থাপত্যশিল্পের বিকাশে চরমে পৌঁছে । ১৭ খলিফা কনস্টান্টিনোপল হইতে ৩২৫ কিউব মোজাইক সামগ্রী উপঢৌকন পান । কর্ডোভা মসজিদের মিম্বার কাষ্ঠ নির্মিত । ইহা কারুকার্যখচিত শিল্পকর্মের এক উজ্জ্বল নিদর্শন । এই মিম্বার নির্মাণ করিতে ৩৬০০০ খণ্ড আইভরি, আবলুস, সেগুন ও অন্যান্য সুগন্ধিযুক্ত কাষ্ঠ, মূল্যবান পাথর ও স্বর্ণের ব্যবহার করা হয় । মসজিদের নির্মাণ কার্য সমাপ্ত করিতে সময় লাগে সাত বৎসর এবং ৩৫,৭০৭ দিনার খরচ হয় । কর্ডোভা মসজিদ নির্মাণ করিতে সর্বমোট ২,৬১,০০০ দিনার ব্যয় হয় । কর্ডোভার প্রস্তরখনি হইতে কর্তনকৃত আস্ত পাথরের তৈরি দুইটি বিরাট ঝরণা খলিফা প্রধান মসজিদের জন্য তৈয়ার করান ।
টিকাঃ
১৭। ১ দিনার = ১৩২ শিলিং (১৯৬৯ খ্রীঃ)