📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 খ্রিষ্টান বিদ্রোহ দমন

📄 খ্রিষ্টান বিদ্রোহ দমন


দ্বিতীয় হাকামের সিংহাসনে আরোহণের অব্যবহিত পরই দেশের উত্তরাঞ্চলে খ্রীস্টান শক্তি মাথা চাড়া দিয়া ওঠে ও বিদ্রোহ ঘোষণা করে । সাঞ্চো ও গার্সিয়া যথাক্রমে লিওন ও নাভাররের রাজাদ্বয় তৃতীয় আবদুর রহমানের সহিত সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হন । কিন্তু আবদুর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁহারা চুক্তি ভঙ্গ করেন । সাঞ্চো দুর্গ হস্তান্তর করিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন । গার্সিয়া তাঁহার বন্দী ফার্ডিনান্দকে (ফারনান গঞ্জালেজ) হাকামের নিকট সমর্পণ করিতে অক্ষমতা প্রকাশ করেন । কর্ডোভার উমাইয়াদের মিত্র চতুর্থ অর্ডোনীওর সহিত বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাইবার জন্য ফার্ডিনান্দ তাহার কন্যাকে প্রভাবিত ও বাধ্য করেন । সাঞ্চো ও গার্সিয়ার ধারণা ছিল সামরিক কার্যকলাপে বিমুখ ও সাহিত্যের প্রতি অতিশয় অনুরাগী হাকাম সন্ধির শর্তসমূহ পালনের জন্য চাপ-প্রয়োগ করিবেন না । আর একান্তই যদি তিনি সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ ও যুদ্ধ ঘোষণা করেন তবে তাঁহার পিতার ন্যায় সামরিক সফলতা অর্জন করিতে সক্ষম হইবেন না । ঠিক একই সময়ে ক্যাস্টাইলের কাউন্ট ফারনান গঞ্জালেজও তাঁহার বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করিতে শুরু করেন । কিন্তু হাকাম প্রমাণ করেন যে একজন বিদ্বান ও সাহিত্যানুরাগী ব্যক্তি সামরিক ক্ষেত্রেও সমভাবে পারদর্শী হইতে পারেন তাহার পূর্বসূরীর ন্যায় তিনিও দেশের উত্তরাংশের ঘটনাবলীর নীরব দর্শক ছিলেন না । ৯৭২ খ্রীষ্টাব্দে ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি গঞ্জালেজের বিরুদ্ধে নিজে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন এবং সীমান্তের অপর পার্শ্বে খ্রীষ্টানদিগকে বিতাড়িত করেন ।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 খ্রীস্টান শাসকদের আত্মসমর্পণ

📄 খ্রীস্টান শাসকদের আত্মসমর্পণ


অভিযান হইতে প্রত্যাবর্তনের পর চতুর্থ অর্ডোনীও তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করেন । অর্ডোনীও আবদুর রহমানের সহায়তায় সাঞ্চোকে বিতাড়িত করিয়াছিলেন । মদিনাতুস সালিমের গভর্নরের মাধ্যমে তিনি নতুন খলিফার সহিত সাক্ষাৎ করেন । ওবায়দুল্লাহ (আবদুল্লাহ) ইবনে কাসিম পাহারা দিয়া তাহাকে সেভিলের রাজধানী আল জাহরাতে আনয়ন করেন । সেখানে তাঁহাকে অতি সম্মানের সহিত গ্রহণ করা হয় । তিনি নাউরা প্রাসাদে অবস্থান করেন । খলিফার সহিত আলজাহরা প্রাসাদে তাহাকে পরিচয় করাইয়া দেওয়া হয় । তিনি তাঁহার পিতৃব্য পুত্র সাঞ্চোর বিরুদ্ধে খলিফার সাহায্য প্রার্থনা করেন । খলিফা তাঁহাকে সাহায্যের আশ্বাস প্রদান করেন । তিনি তাঁহার সেনাপতি গালিবকে লিওনের সিংহাসনে অর্ডোনী ওকে অধিষ্ঠিত করিতে সাহায্য দেওয়ার আদেশ প্রদান করেন । মুসলমানদের সহিত শান্তিতে বসবাস করিবার জন্য অর্ডোনীও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন । তিনি তাঁহার পুত্র গার্সিয়াকে জিম্মী হিসাবে প্রেরণ করিয়া প্রতিজ্ঞা করেন যে, তিনি কখনও গঞ্জালেজের বিদ্রোহীদিগকে সাহায্য করিবেন না ।

সাঞ্চোকে তাঁহার প্রজাকুল পছন্দ করিত না । এই মারাত্মক পরিস্থিতি দেখিয়া তিনি আত্মসমর্পণ করেন এবং পূর্ববর্তী চুক্তি মোতাবেক দুর্গসমূহ সমর্পণ করেন । হাকাম সাঞ্চোর উপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করিয়া অর্ডোনীওর সহিত সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করেন । সাঞ্চো পুনরায় বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন । তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্ডোনীওর মৃত্যুর পর সাঞ্চো চুক্তির শর্তসমূহ পালন করিতে অস্বীকৃতি জানান । কথিত আছে ৯৬২ খ্রীঃ অর্ডোনীও হতাশ হৃদয়ে কর্ডোভায় দেহত্যাগ করেন । ইহার পর খ্রীস্টান নেতাদের সহিত পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয় । মেদিনাসিলের গভর্নর গালিবের নেতৃত্বে এক বিরাট সৈন্য বাহিনী ক্যাস্টিলে প্রেরিত হয় । তিনি গ্যালেসীয়দের বিরাট বাহিনীকে পরাজিত করিয়া সান এষ্টেভান দে-গরমাজের গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ অধিকার করেন । মুহাম্মদ তাজিবীর পুত্র ইয়াহিয়া সারাগোসার গভর্নর গালিবের সহিত যোগদান করেন । গালিব ও ইয়াহিয়ার সম্মিলিত বাহিনী বাস্কদের দেশে অনুপ্রবেশ করে । নাভাররের নেতা গার্সিয়াকে পরাজিত ও কালাহোররাকে বন্দী করেন । সীমান্ত শহর ক্যাটালোনীয়া আক্রান্ত ও ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয় । অধিকৃত গুরুত্বপূর্ণ শহরসমূহ বহির-আক্রমণ হইতে সুরক্ষিত করিবার উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হয় । তৎপর সাঞ্চোর (৯৬৬ খ্রীঃ) পরাজয়ের পর নাভাররের গার্সিয়া ও ক্যাস্টিলের গঞ্জালেজও একের পর এক আত্মসমর্পণ করেন । তাহাদের মিত্র কাউন্ট, বরেল ও মিরন তাহাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন । ক্যাটালান কাউন্টগণও উত্তর অঞ্চলের খ্রীস্টান সর্দারদের ন্যায় মুসলিম স্পেনের দুর্দিনে উহাকে আক্রমণ করিয়া নিজ রাজ্যের সীমা বৃদ্ধি করিতে চেষ্টা করে । ১ ৯৬৬ খ্রীঃ শেষের দিকে ডুরো নদীর তীরে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি তাঁহার শত্রু কাউন্ট গোনঝালভো কর্তৃক বিষ পরিবেশিত হইয়া মৃত্যুবরণ করেন । তাঁহার পাঁচ বৎসর বয়স্ক পুত্র রামিরো ও তাঁহার চাচী এলভিরা রাষ্ট্রকেই ডানদের ধ্বংস লীলার কবল হইতে রক্ষা করিতে ব্যর্থ হন । হীনবল লিওনগণও দ্বিতীয় হাকামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে সাহস পায় না । বার্সিলোনার কাউন্ট বরেল ৯৭১ খ্রীস্টাব্দে দ্বিতীয় হাকামের নিকট ত্রিশজন স্নাভকে উপঢৌকন হিসাবে প্রেরণ করেন । পরবর্তী বৎসর ক্যাস্টিলিয়ান শাসক সীমান্তচুক্তি মানিতে অস্বীকৃতি জানাইলে তাহার প্রতিনিধি দলকে হাকাম বন্দী করেন । ৯৭৫ খ্রীঃ লিওন, ক্যাস্টাইল ও নাভারের রাজাগণ তাহাদের স্বাধীনতা দাবী করিলে গালিব তাহাদিগকে কঠোর হস্তে দমন করেন ।

টিকাঃ
১। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৪৫৩; মুসলিম কলোনিস, পৃঃ ১৫৮-১৫৯।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 ফাতেমী ও সানহাজাহদের সহিত যুদ্ধ

📄 ফাতেমী ও সানহাজাহদের সহিত যুদ্ধ


সমান দক্ষতার সহিত তিনি উত্তর আফ্রিকার তরফ হইতে বিপদের হুমকিকেও প্রতিহত করেন । প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতেমী খলিফাগণ সমগ্র মুসলিম জাহানকে তাহাদের শাসনাধীনে আনিবার চেষ্টা করেন । তাঁহারা স্পেনের শহরসমূহে ধর্মোন্মত্ত নাগরিকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে গোয়েন্দা পাঠান । ফাতেমী গোয়েন্দাগণ সেনাবিভাগ, এমন কি আল হাকামের রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত অনুপ্রবেশ করে । ৯৭২ খ্রীঃ ফাতেমী রাজধানী কায়রোতে স্থানান্তরের পর অবশ্য এই ফাতেমী আতঙ্ক অন্তর্হিত হয় । তিউনিসিয়া হইতে মরক্কো পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় ফাতেমী প্রভাব হ্রাস পাইতে থাকে । সেনাপতি গালিবের নেতৃত্বে ৯৭২ ও ৯৭৪ খ্রীঃ উমাইয়া অভিযানের ফলে ইফ্রিকার কিছু এলাকা পুনরুদ্ধার করা হয় । ফাতেমী খলিফাদের অনুগত সানহাজাহগণ উত্তর আফ্রিকায় উমাইয়া সমর্থকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় । উমাইয়া সেনাপতি ইবনে তুমলুস যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন । ফলে মৌরিতানিয়ার উমাইয়া সমর্থকগণ তাহাদের আনুগত্য প্রত্যাহার করিয়া হাসান ইবনে গানুনের সহিত যোগদান করে । দ্বিতীয় হাকামের অধিকারে শুধু সিউটার ন্যায় কয়েকটি সুরক্ষিত শহর অবশিষ্ট থাকে ।

গালিবের নেতৃত্বে ৯৭২ খ্রীঃ মৌরিতানিয়ায় এক অভিযান পরিচালিত হয় । ফাতেমী অগ্রাভিযানকে প্রতিহত করিবার উদ্দেশ্যে গালিব সিউটা ও তাঞ্জিয়ারের মধ্যবর্তী কাসরে-মাসমুদাতে অবতরণ করেন । গালিব সুকৌশলে সৈন্য পরিচালনা করিয়া ভূমধ্যসাগরের তীরে বার্বার সৈন্যদের সমাবেশকে ছত্রভঙ্গ করেন । ইবনে গানুনের সমর্থক ও অফিসারদিগকে উপহার ও উপঢৌকন দেওয়া বাবদ গালিব প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন । ইফ্রিকিয়ায় আর্থিক ব্যবস্থাপনার পুনর্বিন্যাস ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আলহাকাম কর্ডোভা টাকশালের পরিচালক ইবনে আবি আমিরকে সেখানে প্রেরণ করেন । আবি আমির সম্বন্ধে বিস্তারিত জানা যাইবে মৌরিতানিয়ার সেনাপতি ইয়াহিয়া ইবনে মুহাম্মদ সম্পর্কে আলোচনাকালে । তাহারা দীর্ঘদিন হাসান বিন গানুনকে প্রতিরোধ করেন । অবশেষে ৯৭৪ খ্রীঃ ফেব্রুয়ারি মাসে ইবনে গানুন আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য হন । হাজরাতুন নাশরের দুর্গ হইতে তাহাকে বন্দী করিয়া কর্ডোভার কারাগারে প্রেরণ করা হয় । পরবর্তী কালে তিনি তিউনিসিয়াতে নির্বাসিত জীবনযাপন করেন এবং সেখান হইতে তিনি আলেকজান্দ্রিয়াতে গমন করেন । জানাতা মাগরাওয়া ও মিকনাশার বার্বার উপজাতিগণ কায়রোর খলিফার সমর্থন প্রত্যাহার করিয়া কর্ডোভার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে । আন্দালুসিয়ায় শান্তি স্থাপনের পর আল হাকাম তাঁহার প্রিয় বিষয় সাহিত্য ও বিজ্ঞান সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন ।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 কৃতিত্ব

📄 কৃতিত্ব


তাঁহার কৃতিত্ব ছিল ব্যাপক । তাঁহার শাসনকালে আইবেরিয়ার উপদ্বীপ সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান চর্চায় বিরাট সাফল্য অর্জন করে । তিনি তাহার রাজ্যের অভ্যন্তরে শান্তি শৃঙ্খলা অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং খ্রীস্টান ও ফাতেমী আক্রমণ প্রতিহত করেন । হাকাম তাঁহার পিতা কর্তৃক বিলুপ্ত হাজীবের পদ পুনর্জীবিত করেন । তিনি শিক্ষা সংস্কৃতির প্রসার সাধন ও উন্নতি বিধানের জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন । পরিচ্ছন্নতা পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা, সাবানের ব্যবহার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, রাস্তায় আলোর ব্যবস্থা ও রুমালের ব্যবহার প্রভৃতি মুসলমানদের নিকট হইতে পাশ্চাত্য জগত গ্রহণ করিয়াছে । দ্বিতীয় আবদুর রহমান ও দ্বিতীয় হাকামের ন্যায় উমাইয়া শাসকগণ এই সমস্ত জিনিসের প্রবর্তন করেন । দ্বিতীয় হাকামের হেরেমে তখন যে সাবান ও প্রসাধনী দ্রব্য ব্যবহার হইত সমসাময়িক ইউরোপবাসীগণ কয়েক মাসেও উহা একবার ব্যবহার করিত না । আচার ব্যবহার, শালীনতা ও সৌজন্যবোধ এবং মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞান ইউরোপীয় সমাজ ব্যবস্থায় ও শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশ করে । তাঁহার রাজত্বকালে ইউরোপীয় নাইটগণ আরব অশ্বারোহী সৈনিকদের নিকট শিক্ষার্থী হিসাবে আগমন করিত । হাকাম স্পেনীয় সভ্যতাকে এমন উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেন যে তৎকালীন অন্ধকারময় ইউরোপে কর্ডোভা আলোর দিশারী হিসাবে কাজ করে । ৩ ৪ ৫ ৬

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ: দ্বিতীয় আল হাকাম ছিলেন বিদ্যানুরাগী ও শিক্ষা সংস্কৃতির একনিষ্ঠ সেবক ও পৃষ্ঠপোষক । তাঁহার ভ্রাতা মুনজিরকে তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের পরিদর্শক নিযুক্ত করেন । তাহার সময়ে কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় চরম উন্নতি ও সমৃদ্ধি লাভ করে । কায়রোর আল আজহার ও বাগদাদের নিজামীয়া ইহার প্রতিদ্বন্দ্বী হইয়া ওঠে । খ্রীস্টান, ইহুদী ও মুসলিম ছাত্রগণ বিদ্যা শিক্ষার্থে এখানে আগমন করিত । এখানে শুধু স্পেনের ছাত্রগণই শিক্ষা লাভ করিত না, ইউরোপের বিভিন্ন অংশ আফ্রিকা ও এশিয়ার বিদ্যার্থীগণও ভীড় জমাইত । রাজধানীতে প্রতিষ্ঠিত সাতাইশটি অবৈতনিক স্কুলে গরীব ছাত্র-ছাত্রীগণ শিক্ষা গ্রহণ করিত । প্রথম মসজিদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় তিনটি ও কর্ডোভার শহরতলীতে অবৈতনিক শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে চব্বিশটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় । প্রতিটি বড় শহরে উচ্চ শিক্ষার্থে পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়িয়া ওঠে । সেভিল, মালাগা, সারাগোসা, ও জায়েনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি কর্ডোভার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যতালিকা অনুসরণ করিত । স্পেনের অধিকাংশ জনগণ লিখিতে ও পড়িতে জানিত । কর্ডোভার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির উচ্চ পারিতোষিক দেশ বিদেশের পণ্ডিতদিগকে আকৃষ্ট করিত । কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বৃহৎ লাইব্রেরিতে বহু দুষ্পাপ্য পাণ্ডুলিপি ও মূল্যবান গ্রন্থ সংরক্ষিত ছিল । ৭ ৮

কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকবৃন্দ: খলিফা হাকাম কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্য হইতে অধ্যাপকদের আমন্ত্রণ জানান এবং তাহাদের বেতনের বিনিময়ে জায়গীর প্রদান করেন । এই সমস্ত শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন বাগদাদের বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ ও ঐতিহাসিক আবু বকর ইবনে কুতিয়াহ যিনি কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাকরণ ও ইতিহাস শিক্ষা দান করিতেন । বাগদাদের ভাষাতত্ত্ববিদ পণ্ডিত আবু আলী আলকালী (মৃঃ ৯৬৭) শিক্ষা দিতেন প্রবাদবাক্য, ভাষা, কাব্য-সাহিত্য ও প্রাচীন আরবদের কৌতূহলোদ্দীপক জীবন-কাহিনী । তাহার রচিত 'আমালী' গ্রন্থখানি এখনও আরবী সাহিত্যের ছাত্রগণ শ্রুতিলিখন গ্রন্থহিসাবে পাঠ করিয়া থাকে । আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল উজরী ছিলেন হাকামের প্রাসাদ-চিকিৎসক । মুহাম্মদ আবু বকর আল জুবাইদী হাকামের পুত্র হিশামের গৃহশিক্ষক ছিলেন । ফিকাহ শাস্ত্রবিদ আবু ইব্রাহিম কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করিয়া ইহাকে ধন্য করিয়াছিলেন । আবু বকর ইবনে মুয়াবিয়াহ হাদীস, ধর্মতত্ত্ব, কুরআনী আইন, শিষ্টাচার ও প্রাচ্য বিজ্ঞানের উপর বক্তৃতা দান করিতেন ।

গ্রন্থাগারসমূহ: দ্বিতীয় হাকাম ও তাঁহার ভ্রাতা আবদুল্লাহ তাঁহাদের পিতার জীবদ্দশায়ই নিজস্ব গ্রন্থাগার গড়িয়া তোলেন । হাকাম এই গ্রন্থাগারগুলিকে তাঁহার পিতার গ্রন্থাগারের সহিত একত্রিত করিয়া দুষ্পাপ্য ও অমূল্য গ্রন্থ সংগ্রহে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন । তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত গ্রন্থ সংগ্রাহক । তাঁহার প্রতিনিধি ফাতিমাহ পুরাতন ও নতুন পাণ্ডুলিপি ক্রয় ও অনুলিপি সংগ্রহের জন্য কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, দামেস্ক ও বাগদাদের বিভিন্ন গ্রন্থাগার এবং পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্রগুলি তন্ন তন্ন করিয়া খোঁজ করেন । কোন কোন ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপির সংখ্যা ৬,০০,০০০ লক্ষ উল্লেখ করিয়াছেন । তবে কোন ইতিহাস লেখকই ৪,০০,০০০ লক্ষের কম উল্লেখ করেন নাই । ৯ ১০ তালিদ নামক জনৈক খোঁজা ছিলেন প্রধান গ্রন্থাগারিক । রাজ প্রাসাদের কিছু কক্ষ অনুলিপি তৈয়ারি ও পুস্তক দ্বারা সুসজ্জিত ছিল ।

টিকাঃ
৩। হিট্টি, হিস্ট্রি অব দি আরবস, পৃঃ ৫৩০।
৪। সাম অ্যাসপেক্টস, পৃঃ ১৮৪।
৫। গুরুনেবাউম, মেডিয়াভ্যাল ইসলাম, পৃঃ ৫৭।
৬। লেভি প্রভেঙ্কাল, ল্যা-সিভিলাইজেশন, আরব এন ইস্পানা, পৃঃ ১০১।
৭। ম্যাককেব, স্পেলান্ডার অব মুরিশ স্পেন, পৃঃ ৮০; মাক্কারী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৪০৮; এস. এম. ইমামউদ্দিন, হিস্পানো আরব লাইব্রেরিয়া, বুক্স এ্যান্ড ম্যানাসক্রিপ্টস (J. P. H. S. VII) করাচি, ১৯৫৯, পৃঃ ১০৬; হোল, আন্দালুস, টীকা-৩৮।
৮। মাক্কারী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩০২।
৯। জে. ম্যাককেব, স্পেলান্ডার অব মুরিশ স্পেন, পৃঃ ৮১; রিবেরা, ডিজারটেরনস, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৯৩।
১০। ম্যাককেব, পৃঃ ৮১; এস. এম. ইমামউদ্দিন, হিস্পানো আরব, করাচি, ১৯৫৯, পৃঃ ১০৮।

ফন্ট সাইজ
15px
17px