📄 কৃতিত্ব ও অবদান
তৃতীয় আবদুর রহমানের দীর্ঘ রাজত্বকাল মুসলিম স্পেনের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায় । স্পেনের উমাইয়া শাসকের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক । তাঁহার দীর্ঘদিনের সফল শাসনে দেশ এবং জাতির উন্নতি সাধিত হয় । আরব ও বার্বার অভিজাত সম্প্রদায়ের ক্ষমতা খর্ব করা হয় এবং দেশ ও নগরসমূহে সুদক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা কায়েম করেন । ১২ চুক্তির শর্তসমূহ নিষ্ঠার সহিত পালন করা হয় । ১৩
বার্বার খ্রীস্টান এবং স্লাভদের সমন্বয়ে গঠিত ১৩,৭৫০ জন নিয়মিত সৈন্য বাহিনীকে আবদুর রহমান ভরণপোষণ করিতেন । খলিফা প্রশাসন ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষার্থে স্লাভ ও মুক্তব্যক্তিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন । বদর ইবনে আহমদ ৯২১ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত তৃতীয় আবদুর রহমানের দক্ষিণ হস্ত ছিলেন । তৃতীয় আবদুর রহমান পূর্ববর্তী শাসকদের নির্ধারিত সমস্ত বেআইনী কর মওকুফ করেন । সেনাবাহিনী ও পণ্য সামগ্রীর দ্রুত গমনাগমনের জন্য আবদুর রহমান পুরাতন রাস্তাগুলিকে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাই করেন না বরং দেশের সর্বত্র নতুন নতুন রাস্তাও নির্মাণ করেন । পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার জন্য রাজপথের মাঝে মাঝে চকিদারের ব্যবস্থা ছিল । সরকারি গৃহ নির্মাণ ও মেরামতে প্রচুর টাকা ব্যয় হইত । ১৪ দেশের সর্বত্র পয়ঃপ্রণালী, সেতু ও দুর্গ নির্মিত হয় । সর্বসাধারণের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, পথিকের জন্য বিশ্রামাগার ও এতিমদের জন্য এতিমখানা নির্মিত হয় । এইরূপে স্পেন পশ্চিম ইউরোপে সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয় ।
টিকাঃ
১২। এস. এম. ইমামউদ্দিন, সাম অ্যাস্পেক্টস অব দ্যা সোশিও ইকনোমিক এ্যান্ড কালচারাল হিস্ট্রি অব মুসলিম স্পেন, লেডেন, ১৯৬৫, পৃঃ ৫৪।
১৩। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৪৪৫।
১৪। ইবনে ইজারী, বাইয়ান, পৃঃ ২১২/৩২৭; লেভি প্রভেঙ্কাল, লা ইস্পানা, পৃঃ ৪৫-৪৭. ও লাজাসিওন, পৃঃ ৩৩-৩৪।
📄 খলিফা উপাধি গ্রহণ
সুন্নী মতে রাষ্ট্রের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রধান-যাহার অধীনে পবিত্র মক্কা, মদীনা ও বায়তুল মুকাদ্দাস থাকে তাহাকে খলিফা বলা হয় । মক্কা, মদীনা ও বায়তুল মুকাদ্দাস নগরী বাগদাদের আব্বাসী খলিফার অধিকারে ছিল । প্রথম আব্দুর রহমান নিজেকে স্বাধীন বলিয়া ঘোষণা করেন ও স্বীয় নামে খোতবা প্রচলন করেন । দশম শতাব্দীতে আব্বাসীয় খলিফাগণ তাঁহাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাই শুধু হারান না বরং ধর্মীয় ও নৈতিক সমর্থনও তাঁহাদের হ্রাস পায় । এই সুযোগে মাহদীয়ার ফাতেমী শাসক ৯০৯ খ্রীঃ নিজেকে খলিফা বলিয়া ঘোষণা করেন । আবদুর রহমান নিজের ক্ষমতাকে সুসংহত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া ৩১৬ হিঃ/ ৯২৯ খ্রীঃ তিনি নিজেকে খলিফা বলিয়া ঘোষণা করেন । তিনি "আমীরুল মোমেনীন" ও "আল-নাসির লিদিন আল্লাহ" খেতাব ধারণ করেন । ১৫ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ফাতেমী ও বাইজান্টাইন শাসকদের সহিত প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্যে তৃতীয় আবদুর রহমান স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করেন ।
টিকাঃ
১৫। এইচ. কে. শেরওয়ানী, মুসলিম কলোনিস, পৃঃ ১৫৫-৫৭।
📄 বিদেশে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ
খলিফা দেশের অভ্যন্তরে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সাম্রাজ্যের গৌরব বৃদ্ধির সাথে সাথে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ ও দূর-দূরান্তের দেশ হইতেও রাষ্ট্রদূতগণকে সাদরে গ্রহণ করা হয় । কনস্টান্টিনোপলের সম্রাট এবং জার্মানী ও ফ্রান্সের রাজাগণ তাঁহার সহিত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন ও রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করেন । ১৬ ৩৩৬ হিঃ/৯৪৭-৮ খ্রীস্টাব্দে গ্রীক সম্রাট কনস্টান্টাইন কর্তৃক প্রেরিত রাষ্ট্রদূতকে তৃতীয় আবদুর রহমান আল-জাহরা প্রাসাদের বিরাট কক্ষে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন । ১৭
বাইজান্টাইন দূতের বিনিময়ে তৃতীয় আবদুর রহমান হিশাম বিন ফুলাইব গাছিক্ককে কনস্টান্টিনোপলে দূত হিসাবে প্রেরণ করেন । জার্মানীর মহান অটো খলিফার সহিত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন । খলিফার রাষ্ট্রদূত রেছেমুণ্ড যিনি ল্যাটিন ও আরবী উভয় ভাষায় পারদর্শী ছিলেন, তিনি জার্মানের মহান অটোর দরবারে রাবি ইবনে জাইদ নামে পরিচিত ছিলেন । খলিফার প্রাসাদ চিকিৎসক হাসদাই ইবনে শাপরুতকে জার্মান ও বাইজান্টাইন রাষ্ট্রদূতদ্বয়ের পরিচর্যায় নিয়োগ করা হয় ।
টিকাঃ
১৬। হোল, আন্দালুস, পৃঃ ৯১।
১৭। ঐ. পৃঃ ৭০।
📄 কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন
উৎপাদিত শস্যের অংশদানের ভিত্তিতে চাষাবাদ করিবার ব্যবস্থা চালু ছিল । ১৮ ইবনে বাশকুয়ালের বর্ণনা অনুসারে, তৃতীয় আবদুর রহমান তাহার নিজস্ব ব্যবহারের জন্য সরকারী সম্পত্তির আয় হইতে বৎসরে ৭৫০,০০০ হাজার দিনার গ্রহণ করিতেন । ১৯ ইবনে হাওকাল বলেন, ফলমূল এত সস্তায় বিক্রয় হইত যে প্রায় বিনা মূল্যে পাওয়া যাইতো বলা যাইতে পারে । ২০ উন্নতমানের কৃষি শস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ও উদ্যান পরিচর্যায় নতুন নতুন কলা-কৌশল প্রবর্তন করা হয় । তাঁহার সময়ে স্পেন অতি উচ্চ প্রযুক্তির চাষাবাদ ও সমৃদ্ধ উৎপাদনশীল উদ্যান সামগ্রীর নজির স্থাপন করে । চিড়িয়াখানা ও উদ্ভিদ-উদ্যানের জন্য স্পেন দশম খ্রীস্টাব্দে খ্যাতি অর্জন করে । উদ্ভিদ সংরক্ষণের প্রচেষ্টাও পুরাদমে চলে । খাদ্য-সামগ্রীর প্রাচুর্য ও স্বল্পমূল্য থাকার ফলে মুসলিম স্পেনের জনসংখ্যা ৩০,০০০,০০০ লক্ষ ২১ বৃদ্ধি পায় । কর্ডোভার শহরতলী ও মুরসিয়া উদ্ভিদ ও গাছপালার জন্য প্রবাদে পরিণত হয় ।
টিকাঃ
১৮। ক্রেমারস্, ইবনে হাওকাল, পৃঃ ১০৮।
১৯। ক্রেমারস্, ইবনে হাওকল, পৃঃ ১১৪।
২০। ম্যাককেব, পৃঃ ৬৩।
২১। ম্যাককেব, পৃঃ ৬৩; কেমব্রীজ মেডিয়াভ্যাল হিস্ট্রি, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৪৩২।