📄 লিওন ও নাভারেরদের আত্মসমর্পণ
৯১৮ খ্রীঃ জুলাই মাসে হাজীব বদর রাজকীয় বাহিনীর সেনাপতিত্ব গ্রহণ করেন এবং তিনি মুটোনিয়ায় লিওন বাসীদিগকে পরপর দুইবার পরাজিত করেন । ৯২৩ খ্রীস্টাব্দে জুন মাসে আবদুর রহমান স্বয়ং সৈন্য পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন । দ্বিতীয় অর্ডোনো ওসমা অবরোধ করেন এবং কাস্ট্রো মরোসের আলকুবিলা ও কলুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দুর্গসমূহের ধ্বংস সাধন করেন । আবদুর রহমানের শত্রুগণ তাহার আগমনে বাধা দানে সাহস না পাইয়া এই স্থান হইতে অন্যস্থানে পলাইয়া যান । আবদুর রহমান সামান্য কিছু সৈন্যকে টলেডোর গভর্নর মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ লোপের নেতৃত্বে লিওন বাসীদের অগ্রগমনে বাধা প্রদানের জন্য রাখিয়া নাভারের দিকে অগ্রসর হন । এবরো পৌঁছা পর্যন্ত মুসলিম সেনাবাহিনী পথিমধ্যে কোন প্রকার বাঁধার সম্মুখীন হয় না ।
নাভারীয়গণ আবদুর রহমানের অগ্রগামী সেনাদলের ক্ষতিসাধন করে এবং তৎপর তাহার মূল সেনাবাহিনীকে বিচ্ছিন্ন করিবার উদ্দেশ্যে সংকীর্ণ গিরিসংকটের মধ্যে অবস্থান লইয়া অপেক্ষা করিতে থাকে । কিন্তু মুসলিম সেনাবাহিনী নাভারের রাজা সাঞ্চো এবং তাঁহার মিত্র অর্ডোনোর সম্মিলিত সেনা বাহিনীকে ভালদে জুনকেরাসের যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে এবং তাহাদের কিছু সুরক্ষিত স্থানের ধ্বংস সাধন করে । সালামানকার বিশপ দুলচিদাস এবং তুইয়ের হারমুজিয়াস মুসলমানদের হস্তে বন্দী হন । পর্বত হইতে অবতরণ করিয়া খ্রীস্টানগণ মুয়েস ও সালিমাস ডেওরোর মধ্যবর্তী স্থলে জুনকেয়াসের সমতল ভূমিতে যুদ্ধকে স্বাগত জানায় । তাহাদের এই কৌশলগত ভুলের দরুন শোচনীয় পরাজয় বরণ করিতে হয় । আমীর তিন মাস পরে সেপ্টেম্বর মাসে ৯২০ খ্রীস্টাব্দে বিজয়ীর বেশে রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করেন ।
কিন্তু খ্রীস্টানগণ তাহাদের বিজয় সম্বন্ধে আশাবাদী ছিল । অর্ডোনো ও সাঞ্চো পুনরায় মুসলিম সীমান্ত প্রদেশসমূহ আক্রমণ করে । তাহারা ৯২৩ খ্রীঃ নাজেরা ও ভিগুয়েরা দখল করে বহুসংখ্যক লোককে হত্যা করে । নারী ও শিশুদের বন্দী হিসাবে লইয়া যায় । ৯২৩ খ্রীস্টাব্দে জুলাই মাসে আবদুর রহমান তাহাদের আক্রমণ প্রতিহত করেন । বাস্ক ও লিওনিজদের কঠোর শাস্তি প্রদান করা হয় । আবদুর রহমান নাভারের রাজধানী সুদূর পাম্পলোনা পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং ইহার বহু দুর্গ ধ্বংস করেন । ইতিমধ্যে ৯২৪ খ্রীস্টাব্দে অর্ডোনো মৃত্যু বরণ করেন । তাহার পুত্রগণ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় পিতার সিংহাসন দখলের জন্যে । সাঞ্চো এখন তাহার ভগ্নোদ্যোম সেনা লইয়া একাকী কর্ডোভার সেনাদের মুকাবিলা করিতে থাকেন । নাভারেগণ মুসলিম অগ্রাভিযানকে প্রতিহত করিবার জন্য পথিমধ্যে বহুস্থানে বাঁধা দিতে চেষ্টা করেন কিন্তু প্রতিবারই পরাজিত হন এবং তাহাদের রাজা সাঞ্চো অপমানিত ও লাঞ্ছিত হন । নাভারে রাজ্যের পতনের পর আবদুর রহমান "আমীরুল মোমেনীন" ও "আলনাসির লিদিনিল্লাহ" উপাধি (৩১৬ হিঃ ২৩ শে জিলকদ শুক্রবার/ ১২ জানুয়ারী ৯২৯ খ্রীস্টাব্দ) ধারণ করেন ।
দ্বিতীয় অর্ডোনো ৯২৪ খ্রীস্টাব্দে মারা যান । তৎপর তাঁহার ভ্রাতাদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় । চতুর্থ আলফন্সো তাঁহার ভ্রাতা সাঞ্চোকে পরাজিত করিয়া লিওন অধিকার করেন এবং সাঞ্চো গ্যালেসিয়া অধিকারে রাখিতে সমর্থ হন । ৯৩১ খ্রীস্টাব্দে চতুর্থ আলফন্সো তাহার ভ্রাতা দ্বিতীয় রামিরোর পক্ষে সিংহাসন ত্যাগ করেন । রামিরো স্বজাতীয়দের পরাজিত করিয়া ৯৩২ খ্রীঃ মুসলিম সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন । খলিফা আবদুর রহমান তাহাকে বিতাড়িত করেন এবং ক্যাস্টিলের রাজধানী বোরগোসের ধ্বংস সাধন করেন এবং আলভা ও গ্যালেসিয়ার মধ্য দিয়া দ্রুত অগ্রসর হন । কিন্তু দেশের উত্তরাংশে অনতিবিলম্বে গোলযোগ ও অশান্তি দেখা দেয় এবং খলিফার বিরুদ্ধে শক্তিশালী দুর্দমনীয় দল গঠিত হয় । ৯৩৪ খ্রীস্টাব্দে সারাগোসার তুজুবিদ গভর্নর মুহাম্মদ বিন হাশিম খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা এবং রামিরোর অধীনে চাকুরী করিবার অভিপ্রায় জ্ঞাপন করেন । মুহাম্মদ ও রামিরো তৎপর নাভাররের নাবালেগ শাসক গার্সিয়ার সহিত সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হন । দেশের সমস্ত উত্তরাংশ এইরূপে খলিফার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হয় । খলিফা দৃঢ়তার সহিত ইহা মোকাবিলা করেন । তিনি বানু হাশিম ও খ্রীস্টানদিগকে কালাতাইউদে ৯৩৭ খ্রীস্টাব্দে পরাজিত করিবার পর প্রায় তিরশটি দুর্গ অধিকার করেন এবং নাভাররে ও সারাগোসায় প্রতিরোধকারীদের আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য করেন । সারাগোসার গভর্নর ও ক্ষমতাশালী অভিজাত সম্প্রদায়ভুক্ত মুহাম্মদ ইবনে হাশিমকে ক্ষমা প্রদর্শন করিয়া পূর্ব পদে বহাল রাখেন । গার্সিয়ার অভিভাবক ও সাঞ্চোর বিধবা পত্নী তুতাহ একের পর এক পরাজয় বরণ করিয়া শান্তিচুক্তি সম্পাদনের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন ও নাভাররের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসাবে খলিফাকে স্বীকার করিয়া নেন । এইরূপে লিওন ও ফ্রান্সের তাবেদার রাজ্য ক্যাটালোনিয়ার কিছু অংশ ব্যতীত সমস্ত স্পেন খলিফার নিকট আত্মসমর্পণ করে ।
📄 আলহানদেগার যুদ্ধ
৩২৭ হিঃ/ ৯৩৮-৯ খ্রীঃ গ্যালেসিয়ান, লিওনিজ, ও বাস্কগণ পুনরায় বিদ্রোহ ঘোষণা করে । খলিফার নেতৃত্বে তাহাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয় । একলক্ষ সৈন্য লইয়া গঠিত এই বাহিনীতে সাকালিবাহ নামে পরিচিত স্নাভগণ অন্তর্ভুক্ত ছিল । আরবগণ একজন স্লাভ জেনারেল নাজদাহ এর অধীনে যুদ্ধ করিতে অপমান বোধ করে । বংশ গৌরবে গর্বিত আরবগণ স্লাভ জেনারেলের নেতৃত্বে জয়ের পরিবর্তে পরাজয়কে গৌরবের বলিয়া মনে করিত । খলিফা লিওনের দিকে অগ্রসর হন এবং রাজকীয় বাহিনী আধুনিক ভাল্লাডালকের দক্ষিণে অবস্থিত সিমানকাসে কয়েকদিন যুদ্ধের পর পলায়ন করিতে শুরু করে এবং জামোরার চতুর্দিকে অবস্থানরত মুসলিম সেনার পশ্চাদভাগে রামিরো কর্তৃক খননকৃত খন্দকে পতিত হইয়া তাহাদের অনেকেই প্রাণ হারায় । দুর্গ অবরুদ্ধ হয় ।
এই দুর্গকে রক্ষার জন্য ইহার চারিদিকে প্রাচীর নির্মাণ ও গভীর পরীখা খনন করা হয় । পরীখা পর্যন্ত পৌছাইবার পূর্বে মুসলিম বাহিনীকে গ্যালেসীয় ও বাস্কদের সম্মিলিত বাহিনীর সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হইতে হয় । এখানেই আরবগণ স্লাভদিগকে পরিত্যাগ করিয়া প্রত্যাবর্তনের পথে সর্বশান্ত ও ধ্বংস হইয়া যায় । লিওনিজরা তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন করে । ফলে অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী বিশৃঙ্খলভাবে পলায়ন করিতে শুরু করে । পরিত্যক্ত স্লাভগণ পরিখার অভ্যন্তরভাগে প্রবেশ করিয়া সাহসিকতার সহিত মুশলধারে বর্ষিত তীর ও বর্শার মধ্যে যুদ্ধ করে এবং পরিখা অতিক্রম করিয়া খ্রীস্টানদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়ে, তাহাদের অনেককে হত্যা করে । এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় তুরমেস নদীর তীরে সালামানকার দক্ষিণে অবস্থিত আল খন্দক নামক গ্রামের নিকট । স্লাভগণ সাহসিকতার সহিত যুদ্ধ করা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয় । ঊনপঞ্চাশ জন সঙ্গীসহ খলিফা আত্মরক্ষা করিতে সক্ষম হন । তৃতীয় আবদুর রহমান ইহাতে চরম আঘাত পান । রামিরো সালামানকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় খ্রীস্টানদিগকে পুনর্বাসিত করেন এবং ক্যাস্টিলীয় বিদ্রোহীদের দমন করিতে আত্মনিয়োগ করেন । এইরূপে লিওন ও আস্তুরিয়ার রাজা দ্বিতীয় রামিরো কর্তৃক মুসলিম সেনাবাহিনী দেশের উত্তরাংশে অগ্রসর হইতে বাধা প্রাপ্ত হয় । গৃহযুদ্ধের জন্য খ্রীস্টানগণ এই বিজয়ের ফল ভোগ করতে পারে না । যদিও তাহারা খলিফাকে ত্যক্ত-বিরুক্ত করিয়া চলিয়াছিল । বাদাজোজের গভর্নর আহম্মদ ইবনে ইয়ালা ৯৪০ খ্রীঃ লিওনিজদের অগ্রগমনে বাধা দান করেন । গ্যালেসিয়ান ও বাস্কদের শায়েস্তা করিবার জন্য খলিফা অপর একদল সেনা প্রেরণ করেন । ৯৪৪ ও ৯৪৭ খ্রীস্টাব্দে রাজকীয় বাহিনী ক্যাস্টিলিয়ান অঞ্চলে লুণ্ঠনের জন্য সহসা আক্রমণ করেন । ৯৫০ খ্রীস্টাব্দে দ্বিতীয় রামিরোর মৃত্যুর পর তৃতীয় আবদুর রহমান দেশের উত্তরাঞ্চলে তাঁহার প্রভাব ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করেন । লিওনের রাজা নাভাররের রানী ক্যাস্টাইল ও বার্সিলানোর কাউন্টগণ তাঁহার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেন । তাহারা বাৎসরিক কর দিতে সম্মত হন এবং মুসলিম সীমান্তে অবস্থিত তাহাদের শক্তিশালী দুর্গ পরিত্যাগ ও হস্তান্তর করেন । ক্যাস্টিলের সহিত সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে ডুয়েরো নদীর তীরে মেদিনাত আল সালিম রাজধানী করিয়া খলিফা অপর আর একটি সীমান্ত প্রদেশ গঠন করেন । এখন হইতে ক্যাস্টিলের বিরুদ্ধে দুর্গপ্রাচীর নির্মাণের দায়িত্ব বর্তায় মুসলমানদের উপর ।
দ্বিতীয় রামিরোর পুত্র ও উত্তরাধিকারী তৃতীয় অর্ডোনোর ৯৫৫ খ্রীস্টাব্দে শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পূর্ব পর্যন্ত খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে অভিযান চলে । খ্রীস্টানদের পক্ষে সুবিধাজনক শর্তে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয় । ফাতেমীয়দের সহিত যুদ্ধের জন্য তৃতীয় আবদুর রহমান দেশের উত্তরাংশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন । আটলান্টিকের তীরে অবস্থিত লেরিদা হইতে এবরো নদীর উৎপত্তি স্থল পর্যন্ত প্রলম্বিত মুসলিম সীমান্তে তাহার শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় ।
📄 সাঞ্চো ও তুতাহর (থিওডা) কর্ডোভা আগমন
৯৫৫ খ্রীস্টাব্দের আগস্ট মাসে তৃতীয় অর্ডোনোর মৃত্যুর পর তাহার উত্তরাধিকারী স্থুলাকায় সাঞ্চো তাহার ভ্রাতা কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তিসমূহ মানিতে অস্বীকার করেন । ৯৫৪ খ্রীঃ টলেডোতে নিযুক্ত গভর্নর আহম্মদ ইবনে ইয়ালা ৯৫৭ খ্রীঃ লিওনিজদের চরমভাবে পরাজিত করেন । ১০ লিওনিজরা ক্যাস্টিল অধিপতি ফারনান গঞ্জালেজের সহযোগিতায় পরাজিত সাঞ্চোকে অনতিবিলম্বে বিতাড়িত করে এবং সাঞ্চোর পিতৃব্য পুত্র চতুর্থ অর্ডোনোকে তাহার স্থলে নেতা নির্বাচিত করেন । নাভাররের বৃদ্ধা রাণীর প্রতিনিধির সহিত সাঞ্চো পাম্পলোনায় আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী পিতৃব্য পুত্র চতুর্থ অর্ডোনোর বিরুদ্ধে আবদুর রহমানের সাহায্য প্রার্থনা করেন । আলোচনা চলাকালীনই খলিফা তাহার ইহুদী চিকিৎসক হাসডাই এবনে শাপরুটকে সাঞ্চোর অতিরিক্ত স্থূলতার চিকিৎসার জন্য নিয়োগ করেন । হাসডাই ছিলেন কর্ডোভার আমদানী রফতানী শুল্ক বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল । সাঞ্চো ও তাহার পিতামহী তুতাহ স্বয়ং কর্ডোভা আগমন করেন এবং রাজকীয় সামরিক সাহায্যের বিনময়ে দশটি দুর্গ হস্তান্তরের অঙ্গীকার করেন । রাজকীয় বাহিনী সাঞ্চোর পক্ষে ৯৫৯ খ্রীঃ জামোরা ও পরবর্তী বৎসর অভিয়েডো দখল করেন । চতুর্থ অর্ডোনো বোরগোসে পলায়ন করেন ও ফার্ডিনান্ড ফারনান গঞ্জালেজ বন্দী হন । ৯৬০ খ্রীস্টাব্দের দিকে সাঞ্চো পুনরায় লিওন গ্যালেসিয়া ও নাভাররেতে আধিপত্য বিস্তার করেন সত্য কিন্তু খলিফার আধিপত্য স্বীকার করিয়া নেন । উমাইয়া শাসনের ধ্বংস সাধন ও মুসলিম সভ্যতার মূল উৎপাটনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত খ্রীস্টান আক্রমণকে প্রতিহত করা হয় । এক কথায় মুসলিম সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ শেষ সীমায় পৌছে ও আইবেরিয় উপদ্বীপের বিজয় অভিযান সমাপ্ত হয় । এইরূপে সাম্রাজ্য বিস্তারের কার্য দশম শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত চলে ।
টিকাঃ
১০। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৪২৭ ও ৪২৯।
📄 ফাতেমীয়দের সহিত যুদ্ধ
দেশের উত্তর অঞ্চলে যখন অভিযান চলিতেছিল সেই সময় তৃতীয় আবদুর রহমানকে উত্তর আফ্রিকার ফাতেমীয়দের মোকাবেলা করিতে হয় । ফাতেমীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ফলে স্পেন বিপদের সম্মুখীন হয় । ফাতেমীয়দের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করিবার উদ্দেশ্যে ও মৌরিতানিয়াতে তাহাদের সাম্রাজ্য বিস্তারে বাঁধা প্রদানের জন্য তিনি দক্ষিণ উপকূলে দুর্গ নির্মাণ করেন এবং শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়িয়া তোলেন এবং পশ্চিম আফ্রিকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহকে বিদ্রোহে ইন্ধন যোগায় ।
ফাতেমীয় সামাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ওবায়দুল্লাহ আল মাহদী ওমর ইবনে হাফসুনের সহিত মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন । তিনি গোপনে সংবাদ সংগ্রহের জন্য স্পেনে গুপ্তচর প্রেরণ করেন । সেভিলের বানু ইসহাক গোত্রের নেতা আহমদ ফাতেমীদের সমর্থনে স্পেনের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করে । ১১ মাহদীকে উত্তর আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তার করিতে দিলে স্পেনে তিনি বিপদাপন্ন হইবেন ভাবিয়া আবদুর রহমান সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন । ৩১৯ হিঃ/ ৯৩১ খ্রীঃ সিউটা আধিকার করিয়া সেখানে প্রতিরক্ষা বাহিনী নিয়োগ করেন এবং আহমদ বিন মোহাম্মদ বিন ইলিয়াস ও ইউনুস বিন সাঈদ নামে দুইজন সেনাপতির অধীনে জিব্রাল্টায় নৌবাহিনী মোতায়েন করেন । আবদুর রহমান তাহার অনুগত প্রজাদের সাহায্যে উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা অধিকার করেন । আলজিরিয়া এবং ওরয়ানের বার্বারগণ তাহার আধিপত্য স্বীকার করিয়া নেয় । নুকুরের ক্ষুদ্র আরব শাসকসহ স্থানীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যসমূহ যাহারা ফাতেমীদের আক্রমণ হইতে আত্মরক্ষা করিতেছিল, তাহাদিগকে তাহার সমর্থনে সমবেত করিতে সক্ষম হন । মাগরাওয়ার সাহায্যে উমাইয়া খলিফা তাহিরাত ব্যতীত মৌরিতানিয়ার সমগ্র ভূখণ্ড অধিকার করেন । পরে তৃতীয় আবদুর রহমান উত্তর স্পেনের খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত থাকাকালে ৯৫২ খ্রীঃ চতুর্থ ফাতেমী শাসক আল মুইজ সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং স্পেনীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদিগকে উত্তর আফ্রিকা হইতে বিতাড়িত করেন ।
তিনি আলেকজান্দ্রিয়া যাইবার পথে আবদুর রহমানের বাণিজ্যপোত, মাহদীয়ায় গমনকারী একটি সিসিলিয় বাণিজ্যজাহাজের গতিরোধ করে । মুইজ সিসিলির গভর্নরকে আন্দালুসীয়ার উপকূলভাগ আক্রমণ করিবার আদেশ করেন । এবং গভর্নর আদেশ পালন করেন । তিনি আলমেরিয়া বিধ্বস্ত করিয়া কিছু সংখ্যক বন্দী লইয়া সিসিলি প্রত্যাবর্তন করেন । আবদুর রহমান তাহার প্রতিনিধি এডমিরাল গালিবকে উত্তর আফ্রিকার উপকূল ভাগে লুণ্ঠন ও ধ্বংসাত্মক কার্য পরিচালনার জন্য প্রেরণ করেন । আহমদ বিন ইয়ালার নেতৃত্বাধীনে অপর একটি অভিযানে প্রেরিত হয় । এই অভিযানে উত্তর আফ্রিকার উপকূলের অন্তর্গত কালাব্রিয়ার নিকট অবস্থিত মারছা আল-খারাজ-এ অগ্নি সংযোগ এবং সুসা ও তাবারকাহ পল্লীসমূহের ধ্বংস সাধন করা হয় । ৯৫৯ খ্রীঃ ফাতেমী সেনাপতি জাওহারের আক্রমণের পর আফ্রিকায় তৃতীয় আবদুর রহমানের অধিকারে শুধু তাঞ্জিয়ার ও সিউটা অবশিষ্ট থাকে ।
টিকাঃ
১১। গায়ানগোস, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৪৬।