📄 টলেডোর আত্মসমর্পণ
লোয়ার মার্চে বাদাজোজের শাসক ইবনে মারওয়ানের উত্তরাধিকারী কঠিন প্রতিরোধ গড়িয়া তোলেন এবং ৯৩০ খ্রীঃ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করেন নাই । টলেডো যদিও দীর্ঘ দিন ধরিয়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করিয়া আসিতেছিল, কিন্তু দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয় । কারণ খলিফার নেতৃত্বাধীনে রাজকীয় বাহিনী দুই বৎসর কাল ইহা অবরোধ করিয়া রাখে । দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে খাদ্যশস্য গুদামজাত করা হয় এবং টলেডোবাসীদিগকে রেশনে পানি সরবরাহ করা হয় । অপর দিকে দীর্ঘদিন অবরোধ করিয়া রাখিবার জন্য তৃতীয় আবদুর রহমান টলেডোর পার্শ্ববর্তী এলাকায় পাহাড়ের উপরে আল-ফাতাহ নামে একটি নতুন শহর গড়িয়া তোলেন । লিওনের রাজা অর্ডোন ও জিল্লিকীয়ার খ্রীস্টান রাজা দ্বিতীয় রামিরো টলেডোর সাহায্যার্থে আগাইয়া আসেন । কিন্তু ৩২০ হিঃ/ ৯৩২ খ্রীঃ পরাজিত হন । মিডল মার্চের বিদ্রোহীদের জন্য টলেডো ছিল শক্তিশালী ঘাঁটি ।
আপার মার্চের তুজুবিদগণ শুরুতে আনুগত্যের ইচ্ছা প্রকাশ করেন । সারাগোসার লর্ড ৯৩৭ খ্রীঃ লিওনের খ্রীস্টান শাসকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন । অবরোধ করা হইলে বাধ্য হইয়া সারাগোসা আত্মসমর্পণ করে । এইরূপে আরব, বার্বার ও স্পেনীয়গণ পরাজিত হইয়া স্বেচ্ছাচারী সরকারের নিকট আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য হয় । চাতুর্য, দয়াহীন কঠোরতা এবং অদম্য মনোবল সুদৃঢ় প্রত্যয় ও ঐকান্তিক নিষ্ঠার কারণে খলিফা মুসলিম স্পেনে সার্বিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করিতে সক্ষম হন এবং তাঁহার বহুশত্রু কর্তৃক তিনি প্রশংসিত ও সম্মানিত হন ।
📄 বৈদেশিক নীতি
অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রতিষ্ঠার পর তৃতীয় আবদুর রহমান শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন । দুইটি উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করিয়া তাঁহার পররাষ্ট্রনীতি গৃহীত হয় । দেশের উত্তরাংশের খ্রীস্টান নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও সেখানে তাহার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা । দ্বিতীয়ত উত্তর আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরে ফাতেমীয়দের প্রভাব ও প্রতিপত্তির বিরোধীতা করা ।
📄 দেশের উত্তরাংশে খ্রীস্টান আক্রমণ
প্রথম আলফন্সোর সময় হইতে খ্রীস্টান যুবরাজগণ স্পেনের মুসলিম অধ্যুসিত এলাকায় বিশেষ অগ্রসর হইতে পারে নাই । আবদুল্লাহর শাসন আমলে কতিপয় বিদ্রোহের দরুন দেশ দুর্বল হইয়া পড়ে । কিন্তু দেশের উত্তরাংশে অবস্থিত খ্রীস্টান নেতাগণ এই সুযোগ গ্রহণ করা হইতে বিরত থাকেন । উপরোন্তু তাঁহারা মুসলমানদের সম্মুখে বাঁধা স্বরূপ সীমান্তে অবস্থিত কয়েকটি দুর্গ অধিকার করিতে সমর্থ হন । খলিফা শুধু অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহই দমন করেন নাই বরং বাহিরের শত্রুকেও মুকাবিলা করেন । দেশের উত্তরাংশে খ্রীস্টানগণ যথা- বাস্ক, আরাগণ ও ক্যাস্টিলিয়ানগণ অপরাজিত থাকিয়া যায় । তাহারা ছিল ধর্মোন্মত্ত অসহিষ্ণু এবং মুসলিম স্পেনের সভ্যতার ধ্বংস সাধনকারী । ৯১৪ খ্রীঃ লিওনের অধিবাসীগণ অর্ডোনোর নেতৃত্বাধীনে মেরিদা প্রদেশের ক্ষতি সাধন করে । তাহারা ছিল মুসলমানদের চিরশত্রু । যখনই তাহারা কোন মুসলিম শহরকে দখল করিত তখনই শহরের অধিবাসীদের হত্যা করিত । তাহারা আলাঞ্জের অধিবাসীদের উপর চরম অত্যাচার করে এবং তালাভেরার শহরতলীকে ভস্মীভূত করে । কিন্তু সেই সময়কার খ্রীস্টান শাসকগণ তাহাদের পূর্ববর্তীদের তুলনায় দুর্বল ছিল । কারণ কারোলিঞ্জিয়ান সাম্রাজ্যের পতনের পর তাহারা স্পেনের বাহির হইতে কোন প্রকার সামরিক সাহায্য হইতে বঞ্চিত হয় ।
গৃহে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর আবদুর রহমান দেশের উত্তরাংশে বসবাসকারী মুসলিম প্রজাদের রক্ষার্থে খ্রীস্টানদের কঠোর শাস্তি বিধানের জন্য আবি আবদাহর পুত্র আহম্মাদকে ৯১৬ এবং পুনরায় ৯১৭ খ্রীঃ প্রেরণ করেন । দ্বিতীয়বার যখন আহাম্মদ কাষ্ট্রো মারোসের শক্তিশালী দুর্গকে প্রচণ্ডভাবে আক্রমণের প্রস্তুতি লইতেছিলেন সেই সময় লিওনের দ্বিতীয় অর্ডোনো তাঁহার সাহায্যার্থে অগ্রসর হন । আহাম্মদের আধা বার্বার ও আধা স্পেনীয় সেনাবাহিনী লিওনীদের প্রচণ্ড আক্রমণ প্রতিহত করিতে ব্যর্থ হয় । মুসলিম সেনাপতি নিহত হন এবং সৈন্যগণ বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে । ৯১৮ খ্রীস্টাব্দে তাঁহার মিত্র নাভাররের সাঞ্চোর সহযোগিতায় অর্ডোনো তুদেলা, নাজেরা, ও ভালতিয়েরার ধ্বংস সাধন করেন ।
📄 লিওন ও নাভারেরদের আত্মসমর্পণ
৯১৮ খ্রীঃ জুলাই মাসে হাজীব বদর রাজকীয় বাহিনীর সেনাপতিত্ব গ্রহণ করেন এবং তিনি মুটোনিয়ায় লিওন বাসীদিগকে পরপর দুইবার পরাজিত করেন । ৯২৩ খ্রীস্টাব্দে জুন মাসে আবদুর রহমান স্বয়ং সৈন্য পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন । দ্বিতীয় অর্ডোনো ওসমা অবরোধ করেন এবং কাস্ট্রো মরোসের আলকুবিলা ও কলুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দুর্গসমূহের ধ্বংস সাধন করেন । আবদুর রহমানের শত্রুগণ তাহার আগমনে বাধা দানে সাহস না পাইয়া এই স্থান হইতে অন্যস্থানে পলাইয়া যান । আবদুর রহমান সামান্য কিছু সৈন্যকে টলেডোর গভর্নর মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ লোপের নেতৃত্বে লিওন বাসীদের অগ্রগমনে বাধা প্রদানের জন্য রাখিয়া নাভারের দিকে অগ্রসর হন । এবরো পৌঁছা পর্যন্ত মুসলিম সেনাবাহিনী পথিমধ্যে কোন প্রকার বাঁধার সম্মুখীন হয় না ।
নাভারীয়গণ আবদুর রহমানের অগ্রগামী সেনাদলের ক্ষতিসাধন করে এবং তৎপর তাহার মূল সেনাবাহিনীকে বিচ্ছিন্ন করিবার উদ্দেশ্যে সংকীর্ণ গিরিসংকটের মধ্যে অবস্থান লইয়া অপেক্ষা করিতে থাকে । কিন্তু মুসলিম সেনাবাহিনী নাভারের রাজা সাঞ্চো এবং তাঁহার মিত্র অর্ডোনোর সম্মিলিত সেনা বাহিনীকে ভালদে জুনকেরাসের যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে এবং তাহাদের কিছু সুরক্ষিত স্থানের ধ্বংস সাধন করে । সালামানকার বিশপ দুলচিদাস এবং তুইয়ের হারমুজিয়াস মুসলমানদের হস্তে বন্দী হন । পর্বত হইতে অবতরণ করিয়া খ্রীস্টানগণ মুয়েস ও সালিমাস ডেওরোর মধ্যবর্তী স্থলে জুনকেয়াসের সমতল ভূমিতে যুদ্ধকে স্বাগত জানায় । তাহাদের এই কৌশলগত ভুলের দরুন শোচনীয় পরাজয় বরণ করিতে হয় । আমীর তিন মাস পরে সেপ্টেম্বর মাসে ৯২০ খ্রীস্টাব্দে বিজয়ীর বেশে রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করেন ।
কিন্তু খ্রীস্টানগণ তাহাদের বিজয় সম্বন্ধে আশাবাদী ছিল । অর্ডোনো ও সাঞ্চো পুনরায় মুসলিম সীমান্ত প্রদেশসমূহ আক্রমণ করে । তাহারা ৯২৩ খ্রীঃ নাজেরা ও ভিগুয়েরা দখল করে বহুসংখ্যক লোককে হত্যা করে । নারী ও শিশুদের বন্দী হিসাবে লইয়া যায় । ৯২৩ খ্রীস্টাব্দে জুলাই মাসে আবদুর রহমান তাহাদের আক্রমণ প্রতিহত করেন । বাস্ক ও লিওনিজদের কঠোর শাস্তি প্রদান করা হয় । আবদুর রহমান নাভারের রাজধানী সুদূর পাম্পলোনা পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং ইহার বহু দুর্গ ধ্বংস করেন । ইতিমধ্যে ৯২৪ খ্রীস্টাব্দে অর্ডোনো মৃত্যু বরণ করেন । তাহার পুত্রগণ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় পিতার সিংহাসন দখলের জন্যে । সাঞ্চো এখন তাহার ভগ্নোদ্যোম সেনা লইয়া একাকী কর্ডোভার সেনাদের মুকাবিলা করিতে থাকেন । নাভারেগণ মুসলিম অগ্রাভিযানকে প্রতিহত করিবার জন্য পথিমধ্যে বহুস্থানে বাঁধা দিতে চেষ্টা করেন কিন্তু প্রতিবারই পরাজিত হন এবং তাহাদের রাজা সাঞ্চো অপমানিত ও লাঞ্ছিত হন । নাভারে রাজ্যের পতনের পর আবদুর রহমান "আমীরুল মোমেনীন" ও "আলনাসির লিদিনিল্লাহ" উপাধি (৩১৬ হিঃ ২৩ শে জিলকদ শুক্রবার/ ১২ জানুয়ারী ৯২৯ খ্রীস্টাব্দ) ধারণ করেন ।
দ্বিতীয় অর্ডোনো ৯২৪ খ্রীস্টাব্দে মারা যান । তৎপর তাঁহার ভ্রাতাদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় । চতুর্থ আলফন্সো তাঁহার ভ্রাতা সাঞ্চোকে পরাজিত করিয়া লিওন অধিকার করেন এবং সাঞ্চো গ্যালেসিয়া অধিকারে রাখিতে সমর্থ হন । ৯৩১ খ্রীস্টাব্দে চতুর্থ আলফন্সো তাহার ভ্রাতা দ্বিতীয় রামিরোর পক্ষে সিংহাসন ত্যাগ করেন । রামিরো স্বজাতীয়দের পরাজিত করিয়া ৯৩২ খ্রীঃ মুসলিম সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন । খলিফা আবদুর রহমান তাহাকে বিতাড়িত করেন এবং ক্যাস্টিলের রাজধানী বোরগোসের ধ্বংস সাধন করেন এবং আলভা ও গ্যালেসিয়ার মধ্য দিয়া দ্রুত অগ্রসর হন । কিন্তু দেশের উত্তরাংশে অনতিবিলম্বে গোলযোগ ও অশান্তি দেখা দেয় এবং খলিফার বিরুদ্ধে শক্তিশালী দুর্দমনীয় দল গঠিত হয় । ৯৩৪ খ্রীস্টাব্দে সারাগোসার তুজুবিদ গভর্নর মুহাম্মদ বিন হাশিম খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা এবং রামিরোর অধীনে চাকুরী করিবার অভিপ্রায় জ্ঞাপন করেন । মুহাম্মদ ও রামিরো তৎপর নাভাররের নাবালেগ শাসক গার্সিয়ার সহিত সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হন । দেশের সমস্ত উত্তরাংশ এইরূপে খলিফার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হয় । খলিফা দৃঢ়তার সহিত ইহা মোকাবিলা করেন । তিনি বানু হাশিম ও খ্রীস্টানদিগকে কালাতাইউদে ৯৩৭ খ্রীস্টাব্দে পরাজিত করিবার পর প্রায় তিরশটি দুর্গ অধিকার করেন এবং নাভাররে ও সারাগোসায় প্রতিরোধকারীদের আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য করেন । সারাগোসার গভর্নর ও ক্ষমতাশালী অভিজাত সম্প্রদায়ভুক্ত মুহাম্মদ ইবনে হাশিমকে ক্ষমা প্রদর্শন করিয়া পূর্ব পদে বহাল রাখেন । গার্সিয়ার অভিভাবক ও সাঞ্চোর বিধবা পত্নী তুতাহ একের পর এক পরাজয় বরণ করিয়া শান্তিচুক্তি সম্পাদনের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন ও নাভাররের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসাবে খলিফাকে স্বীকার করিয়া নেন । এইরূপে লিওন ও ফ্রান্সের তাবেদার রাজ্য ক্যাটালোনিয়ার কিছু অংশ ব্যতীত সমস্ত স্পেন খলিফার নিকট আত্মসমর্পণ করে ।