📄 পোলের যুদ্ধ
আবদুল্লাহর আর্থিক অবস্থা খুবই সঙ্গীন হইয়া ওঠে । রাজকোষ শূন্য হইয়া পড়ে ফলে সেনাদের বেতন দেওয়া সম্ভব হয় না । দেশকে পুনরায় একত্রিকরণে আমীরের নীতি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় । সুবিধাজনক শর্তে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উদ্ধত ওমর প্রত্যাখান করেন । অনন্যোপায় আমীর সাহস সঞ্চার করিয়া শক্তিশালী শত্রুকে আক্রমণ করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । তাঁহার সেনাপতি আবদুল মালিক বিন উমাইয়াহ ৪,০০০ হাজার নিয়মিত সৈন্য এবং ১০,০০০ হাজার নতুন সংগৃহীত সৈন্যকে লইয়া পোলের দিকে অগ্রসর হন । ওমর ৩০,০০০ হাজার সুদক্ষ সৈন্যের এক বাহিনী লইয়া দুর্গ হইতে দেড় ক্রোশ দূরে নদীর তীরে শিবির স্থাপন করেন । ১২ই মুহররম শুক্রবার ২৭৮ হিঃ/১৬ এপ্রিল ৮৯১ খ্রীস্টাব্দে যুদ্ধ শুরু হয় ।
উমাইয়াহ সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়া সত্ত্বেও আবদুল্লাহ নিজে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন নাই । আমীরের সেনাবাহিনী পূর্ণ শক্তি ও সাহসিকতার সহিত যুদ্ধ করে । অপরদিকে প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াও ওমর পরাজিত হন । কিছু সংখ্যক সৈন্য লইয়া ওমর পোলে দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন । আরবদের পশ্চাদ্ধাবনের তীব্রতায় বাকি অংশ এচিজার দিকে পলাইয়া যায় । বিপদের পূর্বলক্ষণ দেখিয়া ইবনে হাফসুন ও ইবনে মস্তানাহ পোলে এবং আর্কিডোনা দুর্গ ত্যাগ করিয়া বার্বারদের পশ্চাৎ অপসারণ করেন । আবদুল্লাহ প্রচুর যুদ্ধ সামগ্রী ও ধন সম্পদসহ পোলে দুর্গ অধিকার এবং এচিজা অবরোধ করিলে অতিসহজে উহার পতন ঘটে । অতঃপর তিনি বোবাষ্ট্রো অভিমুখে যাত্রা করেন । বোবাষ্ট্রো অবরোধ করা হয় । কিন্তু অপরাজিত থাকে । পরিশ্রান্ত সেনাবাহিনী আর্কিডোনা ও এলভিরার মধ্য দিয়া কর্ডোভা প্রত্যাবর্তন কালে জায়েনে আত্মসমর্পণ করে ।
📄 পরবর্তী ঘটনাসমূহ
ইতিমধ্যে ওমর তাঁহার সুনাম ও প্রতিপত্তি বহুগুণে হারাইয়া ফেলেন । উত্তর আফ্রিকায় ইবনে আগলাব তাঁহার দূতগণকে উদাসীনতা ও অবহেলার সহিত গ্রহণ করেন । তিনি আব্বাসীয় খলিফার নিকট হইতে গভর্নর হিসাবে কোন নিয়োগপত্র না পাওয়ায় ইবনে হাফসুন আমীরের সহিত সন্ধি স্থাপন করেন ও তাঁহার পালক পুত্রকে জামিন হিসাবে রাখেন । আবদুল্লাহ তাঁহার নিজ পুত্রকে জামিন হিসাবে চাহিলে তিনি দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন । ফলে যুদ্ধ শুরু হয় । ওমর তাঁহার হারান এলাকা পোলে, এচিজা, আর্কিডোনা ও এলভিরা পুনরুদ্ধার করেন । পরে তিনি জায়েন অধিকার করেন । ক্ষমতা ও সাফল্যগর্বে গর্বিত ওমর ৮৯৯ খ্রীস্টাব্দে সপরিবারে খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন ৬ । তাঁহার ধর্মত্যাগের সাথে সাথে তাঁহার যোগ্য কর্মচারী আনাতোলের পুত্র ইয়াহিয়া তাঁহাকে ত্যাগ করেন এবং তাঁহার একজন শক্তিশালী মিত্র কানিয়াতের বার্বার নেতা আও সাজা বিন আল খালিত আবদুল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেন । গৃহযুদ্ধ অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলতায় জর্জরিত জনগণ শান্তির আশায় দলে দলে আবদুল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে ।
আমীর ৯০১ খ্রীস্টাব্দে ওমরের সহিত শান্তি চুক্তি স্থাপন করেন । ইবনে হাফসুন সারাগোসার বানুকাসি ও লিওনের রাজার সহিত ইবনে হাজ্জাজ মিলিত হন ৭ । ইবনে হাফসুনকে শত্রু শিবির হইতে বিচ্ছিন্ন করিবার উদ্দেশ্যে আবদুল্লাহ তাঁহার পুত্রকে জামিন হিসাবে গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত লইয়া হাজ্জাজের অন্তর জয় ও আনুগত্য লাভ করিতে সমর্থ হন । নবম শতাব্দীতে স্পেনের খ্রীস্টান ও মুসলমানদের ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ধরনের । ১লা রবিউল আউয়াল ৩০০ হিঃ/১৫ই অক্টোবর ৯১২ খ্রীস্টাব্দে ৬৮ বৎসর বয়সে এই আমীরের মৃত্যু হয় ৮ । স্পেনের মুসলমান শাসনের একখানি পূর্ণ ইতিহাস গ্রন্থ উর্দু ভাষায় রচনার জন্য আজমগড়ে প্রকাশিত হয় ।
টিকাঃ
৬। আন্দালুস, স্পেন আন্ডার দ্যা মুসলিমস্, পৃঃ ১৬৩।
৭। গমেজ, হিস্টোরিয়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ২৩৮ দেখুন।
৮। ইবনুল ফারাজী, নং ১৯৯; আর গুয়েন্ট, দ্যা গভর্নরস্ এ্যান্ড জাজেস অব ইজিপ্ট, পৃঃ ৫৪৮
📄 স্বাধীন আমীরদের শাসন আমলের পর্যালোচনা
আরব, বার্বার নবমুসলিম এবং খ্রীস্টানগণ পৃথকভাবে এবং কখনও কখনও সম্মিলিতভাবে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে । তাহারা প্রত্যেকে নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে সচেষ্ট হন কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারেন নাই । প্রথম আবদুর রহমান ও হিশাম তাঁহাদের উদারতা ও মহত্ত্বের মাধ্যমে জনগণের নিকট ইসলামী সংস্কৃতিকে দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করিতে চেষ্টা করেন কিন্তু প্রথম হাকাম তাঁহার বিলাসিতাপূর্ণ জীবন যাপন ও ক্ষমতার অপব্যবহার দ্বারা নবমুসলিমদিগকে তাঁহার নিকট হইতে দূরে রাখেন ।
ধর্মীয় আন্দোলন দমন করা হয় বটে কিন্তু সংখ্যাগুরু খ্রীস্টানদের কিছু অংশ মুসলিম শাসন স্বীকার করিতে অস্বীকৃতি জানায় । আরব শাসনের প্রতি অসন্তুষ্ট ও বৈরীভাবাপন্ন বার্বার ও নব মুসলিমগণ বিদ্রোহে যোগদান করে । শক্তিশালী শাসকগণই উহাদিগকে বশে রাখিতে পারিতেন । আরব ও বার্বারদের পুরাতন উপজাতীয় শত্রুতা, দেশী-বিদেশী বিরোধ, প্রথম হাকাম ও আবদুল্লাহর রাজত্বকালে এমনকি হাজীব আল-মনসুরের পরেও সাংঘাতিক ভাবে আত্মপ্রকাশ করে । এই সময় আরব এবং ইসলামী সংস্কৃতি স্বকীয়তা হারাইয়া ফেলে এবং তদস্থলে বহুজাতীয় সংমিশ্রণে স্পেনীয় মুসলিম সংস্কৃতি গড়িয়া ওঠে । গোত্রীয়, জাতিগত এবং ধর্মীয় বিরোধের কুফল থাকা সত্ত্বেও একটা ভাল ফল দেখিতে পাওয়া যায় । বহু যুগের কূপমণ্ডকতা হইতে মুসলমানগণ স্পেনীয়দিগকে মুক্ত করেন । তাহারা বুদ্ধিমান দৃঢ়চেতা সাহসী কর্মঠ জাতিতে পরিণত হয় এবং একমাত্র কর্ডোভার শাসকের নেতৃত্বে তাহাদের হারানো ক্ষমতা ও গৌরব নেতৃত্ব লাভ করতে সক্ষম হয় ।