📄 কর্ডোভার গোঁড়া খ্রীস্টানগণ
টলেডো হইতে প্রত্যাবর্তনের পর আমীর কর্ডোভার গোঁড়া খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তাহাদের জমিজমা জন-সাধারণের মধ্যে বণ্টন করিয়া দেন এবং উত্তেজনার সূতিকাগৃহ তাহাদের তাবানিওসের গীর্জা ধূলিস্মাৎ করিয়া দেওয়া হয়। আরবীয় খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত গোঁড়া খ্রীস্টান আন্দোলন শুরু করিয়াছিল তাহাদের শাস্তি দেওয়া হয় সত্য কিন্তু কোমল হৃদয় দ্বিতীয় আবদুর রহমান তাহাদের সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করেন না। ফ্লোরার মৃত্যুদণ্ডের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাহাদের শত্রুতা আরও বৃদ্ধি পায়। কারাগার হইতে মুক্তিপ্রাপ্ত ইউলোজিয়াসকে তাহার সমর্থক গোঁড়া খ্রীস্টানগণ প্রধান ধর্মাধ্যক্ষ নির্বাচিত করে। এই সমস্ত খ্রীস্টানগণ ফ্রান্সের রাজা কেশহীন চার্লসের নিকট গোপন চিঠি পাঠায় এবং তাহাকে মুসলমানদিগকে বিতাড়িত করিবার উদ্দেশ্যেই স্পেন আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। খ্রীস্টানদের পুরাকীর্তির অবস্থান ও নকশা প্রস্তুত করিবার ভান করিয়া উসুয়ার্দ ও আদিলাদ নামে ফ্রান্সের দুইজন খ্রীস্টান সন্ন্যাসী ৮৫৮ খ্রীঃ কর্ডোভায় আসেন। কর্ডোভা হইতে প্রত্যাবর্তনের পর তাহারা ফ্রান্সের রাজার নিকট সেখানকার খ্রীস্টানদের অসন্তুষ্টির রিপোর্ট প্রদান করে। খ্রীস্টান গোঁড়া সম্প্রদায় রাজধানীর নাগরিকদের বিদ্রোহ করিবার জন্য উত্তেজিত করে। প্রথম মুহম্মদকে তাহাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করিতে হয়। ফলে তাহাদের শক্তি সম্পূর্ণরূপে খর্ব হয়। গোঁড়া ইউলোজিয়াস, আলভেরো ও লিওক্রিটিয়াকে (ইসলাম ধর্মত্যাগী অত্যুৎসাহী রমণী) ৮৫৯ খ্রীঃ ফাঁসী দেওয়া হয়।
📄 নাভারের ও গ্যালেসিয়ার যুদ্ধ
ইতিমধ্যে ফ্রাঙ্কগণ যাহারা ৮৪৭ খ্রীস্টাব্দে দ্বিতীয় আবদুর রহমানের সহিত শান্তিচুক্তি করিয়াছিল তাহারা স্পেনের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের সুযোগ লইয়া যুদ্ধাভিযান শুরু করে এবং দেশের প্রভূত ক্ষতি সাধন করে। গ্যালেসিয়ান এবং নাভাররেগণ একই পথ অনুসরণ করিয়া এই সুযোগ গ্রহণ করে। মেরিদা এবং সারাগোসার গভর্নরদ্বয়কে মুহাম্মদ সৈন্য সংগ্রহ করিয়া সীমান্তের দিকে অগ্রসর হইতে নির্দেশ দেন। এই সময় হাম্বলী ও মালেকী দুই সুন্নী সম্প্রদায় স্পেনে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। মুহাম্মদ নিজে এই সংঘর্ষে হস্তক্ষেপ করেন এবং দুই বিরোধী সম্প্রদায়কে একত্রিত করিয়া খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করিতে সক্ষম হন। গ্যালেসিয়া, লিওন ও নাভাররের খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝেই অভিযান পরিচালিত হয়। গথিক মার্চ পুনর্বার যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। বাস্কদের বাসভূমি নাভাররে ৮৬১ খ্রীস্টাব্দে আক্রান্ত হয় এবং রাজধানী পাম্পলোনাসহ ইহার পার্শ্ববর্তী এলাকা পুনরায় মুসলমানদের দখলে আসে। খ্রীস্টানরা তাহাদের দুর্গে আত্মগোপন করে কিন্তু মুনজিরের প্রত্যাবর্তনের সাথে সাথে তাহারা পুনরায় বাহিরে আসে এবং উত্তর স্পেনের মুসলমানদের মধ্যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তাহারা বহু শহর লুণ্ঠন করিবার পর অগ্নি সংযোগ করে। লুসিতানিয়া ও লিওট্রা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমীরের নেতৃত্বে কর্ডোভার অশ্বারোহী সৈন্যদল গ্যালেসিয়া অভিমুখে অগ্রসর হয়। মেরিদাতে অবস্থানরত সেনাবাহিনী তাহার সহিত যোগদান করে। ৮৬৫ খ্রীস্টাব্দে লিওনের খ্রীস্টান শাসক বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করেন এবং তাহার সহিত এক শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন। পরবর্তী বৎসর প্রথম মুহাম্মদ ও কেশহীন চার্লসের মধ্যে অন্য একটি চুক্তি সম্পাদিত হয় এবং বিদ্রোহীদের কোন প্রকার সাহায্য করিবে না এই শর্তে তাহাকে ক্যাটালোনিয়া প্রত্যার্পণ করা হয়।
📄 বানু কাসিদের স্বাধীনতা ঘোষণা
নবম শতাব্দীর শেষ প্রান্তে কিছু সংখ্যক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে। নবমুসলিম বার্বার ও খ্রীস্টানদের অসন্তুষ্টির সুযোগ লইয়া তাহারা স্বাধীন ও আধা-স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েমের চেষ্টা করে। ক্যাটালোনিয়ার যুদ্ধ অব্যাহত থাকে এবং পূর্ববর্তী বৎসরের যুদ্ধবিজয়ী সীমান্তের গভর্নর দ্বিতীয় মুসা এবার আস্তুরিয়ানদের কঠিন চাপের সম্মুখীন হন। মুসা আমীরের ক্রোধে পতিত হন। তিনি আস্তুরিয়ান রাজার পক্ষ অবলম্বন করেন এবং নাভাররের কাউন্ট গার্সিয়ার সহিত তাহার কন্যার বিবাহ দেন। দক্ষিণ-পূর্ব স্পেনের ঘনবসতি পূর্ণ এলাকা খ্রীস্টানদের আক্রমণ হইতে রক্ষার জন্য মার্চগুলি উপকারে আসে, সীমান্ত প্রদেশের গভর্নরদের হস্তে সীমাহীন ক্ষমতা প্রদত্ত হয়। এই সমস্ত ক্ষমতা তাহারা স্বীয় স্বার্থে ব্যবহার করে। পুরাতন ভিজিগথিক পরিবারের বনু কাসি উত্তরে মার্চের আরাগোনে এক স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম করে। ইহার রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয় সারাগোসায়। এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জনৈক জাইয়াদ, ভিজিগথিক অভিজাত সম্প্রদায়ের পরবর্তী বংশধর। তিনি পূর্বে সারাগোসার গভর্নর ছিলেন। স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া তিনি বিদ্রোহীদের সহিত যোগদান করেন এবং ৮৪২ খ্রীঃ সারাগোসা অধিকার করেন। তিনি বহুবার রাজকীয় বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করেন। তুদেলা, হুয়েস্কা এবং টলেডোর নেতাগণ দ্বিতীয় মুসা নামে পরিচিত বনু কাসির শাসক মুসা ইবনে মুসা ইবনে আল কাসীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। মুসা যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন আমীরকে প্রতিহত করেন। তিনি সারাগোসা, তুদেলা এবং হুয়েস্কাকে প্রধান নগর রূপে আপার মার্চে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। উত্তর সীমান্তের অসন্তুষ্ট জনগণ দলে দলে তাহার সহিত যোগদান করে। গাসকোন ও নাভাররেগণও তাহাকে সমর্থন জানায়। নাভাররে ও পামপ্লোনার সহিত ইবনে কাসির রক্ত ও বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। নাভাররে ও পাম্পলোনা এলাকায় খ্রীস্টান রাজ্য প্রতিষ্ঠায় দ্বিতীয় মুসা সাহায্য করে। পরে তিনি ক্যাস্টাইল এবং বার্সিলানোর কাউন্টসদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং পীরেনীজ অতিক্রম করিয়া কেশহীন চার্লসকে শান্তিচুক্তি সম্পাদন ও কর প্রদানে বাধ্য করেন। ফ্রান্সের খ্রীস্টান ও স্পেনের মুসলমানগণ তাহার স্বাধীনতাকে স্বীকার করিয়া নেয়। তিনি নিজেকে স্পেনের তৃতীয় রাজা বলিয়া ঘোষণা করেন। ২ মুসার মৃত্যুর পর তাহার পুত্র লোপ টলেডোতে একজন সেনানায়ক রূপে নিযুক্ত হয়। ৮৬২ খ্রীস্টাব্দে প্রথম মুহাম্মদ সারাগোসা ও তুদেলা অধিকার করেন। দশ বৎসর পর মুসার তিন পুত্র পিতার হৃত গৌরবকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে এবং রাজকীয় সেনাকে পুনরায় বিতাড়িত করিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। আলফন্সোর সাহায্যে তাহারা ৮৮৪ খ্রীস্টাব্দে আমীরের সারাগোসা দখলের প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করিয়া দেয় এবং স্বাধীন সত্তা বজায় রাখে। এই এলাকায় আরব বংশোদ্ভূত লোকেরা গোলযোগের সৃষ্টি করে এবং স্বাধীনতা দাবী করে।
টিকাঃ
২. পারেজা, ইসলামোলোজিয়া, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৬৭।
📄 ইবনে মারোয়ানের স্বাধীনতা ঘোষণা
মেরিদার অধিবাসিগণ সারাগোসার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া ৮৬৮ খ্রীঃ নাগাদ আবদুর রহমান ইবনে মারোয়ান বিন ইউনুস আল জিল্লিকী নামে জনৈক নব মুসলিমের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। দ্বিতীয় আবদুর রহমানের শাসন আমলে তাহার পিতা মারোয়ান বিন ইউনুস লোয়ার মার্চে মেরিদার গভর্নর ছিলেন। রাজকীয় বাহিনীর আক্রমণের মুখে মেরিদাবাসিগণ অবশ্য আত্মসমর্পণ করে এবং তাহাদের নেতাকে আমীরের দেহরক্ষীদের ক্যাপ্টেন নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু ৮৭৫ খ্রীঃ প্রধানমন্ত্রী হাশিম বিন আবদুল আজিজ কর্তৃক অপমানিত হইয়া সে মেরিদার দক্ষিণ পূর্বে ২০ কিলোমিটার (১২২ মাইল) দূরে অবস্থিত আলাঞ্জেতে এবং তৎপর গোয়া-দিয়ানার উপত্যকা বাদাজোজে পলাইয়া যায়। ইহা সে দুর্গ দ্বারা সুরক্ষিত করিয়াছিল। সে অপর বিদ্রোহী আদুন আল সুরুনবাকীর সহিত যোগ দিয়া মেরিদা ও অন্যান্য জায়গার নব মুসলিমদের মধ্য হইতে বহুসংখ্যক সেনা সংগ্রহ করে এবং সারা এলাকা ব্যাপী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। সে তৃতীয় আল ফন্সোর সহযোগিতায় হাশিমের নেতৃত্বে তাহার বিরুদ্ধে প্রেরিত সেনা বাহিনীকে পরাজিত করে। উমাইয়া সেনাপতি পরাজিত হইয়া বন্দী অবস্থায় লিওনের শাসকের নিকট প্রেরিত হন। একলক্ষ দিনার মুক্তিপণের বিনিময়ে তিনি দুই বৎসর পর মুক্তি লাভ করেন। ইতিমধ্যে ইবনে মারোয়ান সেভিল ও নিয়েবলার জেলাসমূহের ধ্বংস সাধন করে। বার বার তাহার বিরুদ্ধে রাজকীয় বাহিনী প্রেরণ করিয়াও তাহাকে দমন করা সম্ভব হয় না। এই এলাকায় শান্তি স্থাপনের জন্য আমীর বাদাজোজ ও মেরিদাতে তাহার শাসন স্বীকার করিয়া নেন। ৩২০ হিঃ/ ৯৩২ খ্রীঃ পর্যন্ত ইহা সম্পূর্ণভাবে পুনর্দখল করিতে পারেন নাই। ৩ এইরূপে মুয়াল্লাদ নবমুসলিম বংশোদ্ভূত ইবনে জিল্লিকী ও তাহার পুত্র মেরিদাকে রাজধানী করিয়া প্রায় পঞ্চান্ন বৎসর নিম্ন মার্চ শাসন করেন।
টিকাঃ
৩. ইবনে ইজারী, বেয়ান, পৃঃ ১১১-১১২।