📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 সিংহাসনে আরোহণ

📄 সিংহাসনে আরোহণ


প্রথম মুহাম্মদ ছিলেন কর্ডোভার (২৩৮ হিঃ/৮৫২ খ্রীঃ) পূর্ব ঘোষিত আমীর। নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রাসাদের অধিকাংশ খোজা প্রথমে তারুবের পুত্র আবদুল্লাহর দাবী সমর্থন করে। কিন্তু ক্রীতদাস আবুল মুফাররাহ ইহার বিরোধিতা করে এবং অপর ক্রীতদাস সাদুন মুহাম্মদকে আমীরের মৃত্যু সংবাদ দেয় ও তাঁহার সিংহাসন আরোহণ উপলক্ষে অভিনন্দন জানায়। তাঁহার শাসনকাল একাধিক অভ্যন্তরীণ গোলযোগের দরুন উল্লেখযোগ্য। কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করা সত্ত্বেও গোলযোগ আরও বৃদ্ধি পায়।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 টলেডোতে বিদ্রোহীগণ

📄 টলেডোতে বিদ্রোহীগণ


জেল হইতে মুক্তি পাওয়ার পর ধর্ম-বিরোধী আন্দোলনের গোঁড়া নেতা ইউলোজিয়াস নাভাররে গমন করে। এবং সেখান হইতে টলেডোতে আসিয়া গোঁড়া খ্রীস্টানদিগকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিতে শুরু করে। মুহাম্মদের ক্ষমতা লাভের পরপরই সিন্দুলার নেতৃত্বে টলেডোর খ্রীস্টানগণ বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং সিয়েররা মরেনা পর্যন্ত দেশকে ধ্বংস স্তূপে পরিণত করে। বিদ্রোহী খ্রীস্টানদের সহিত নব মুসলিমগণও যোগদান করে। প্রথম মুহম্মদ ৮৫৪ খ্রীস্টাব্দের জুন মাসে টলেডো অভিমুখে অগ্রসর হন। আমীরের আগমন সংবাদ শুনিয়া বিদ্রোহীদের প্রধান নেতা সিন্দুলার লিওনের রাজা প্রথম ওরডোনোর সাহায্য প্রার্থনা করে। বিয়েরজোর কাউন্ট গ্যাটোনের নেতৃত্বে ওরডোনো একদল সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন তাহার সাহায্যার্থে। ইবনে খালদুনের মতে, গ্যালেসিয়ার রাজাও সাহায্য করতে আগাইয়া আসেন। ১ যুদ্ধে বিজয় সম্বন্ধে আমীরের সন্দেহ থাকায় তিনি সৈন্যের একাংশকে আপদকালীন সময়ে অগ্রগামী সেনাবাহিনীকে সাহায্যের উদ্দেশ্যে পশ্চাদভাগে সংরক্ষিত রাখেন। যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে আমীর এই সংরক্ষিত সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেন। এই সেনাবাহিনী গোয়াদাসেলেট বিদ্রোহীদের চতুর্দিক হইতে ঘিরিয়া ফেলিয়া সম্পূর্ণ রূপে নির্মূল করে। কমপক্ষে ৮,০০০ হাজার খ্রীস্টান নিহত হয়। কালাতারাভা ও তালাভেরার গভর্নরের সাহায্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে আমীরের কনিষ্ঠ পুত্র আলমুনজির টলেডোতে থাকিয়া যান। টলেডোর গভর্নর ও উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী যাহারা বিদ্রোহে অংশ গ্রহণ করিয়াছিল তাহাদের শাস্তি দেওয়া হয়। আলমুনজির কর্তব্যপরায়ণ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ করিয়া টলেডোর সরকারী প্রশাসন যন্ত্রকে পুনর্গঠিত করেন। টলেডোবাসীদের অভ্যন্তরীণ শাসন কার্যে স্বাধীনতা প্রদান করা হয়। দীর্ঘ আট বৎসর পর টলেডোতে শান্তি স্থাপিত হয়। আমিরুস দুর্গ পুনরায় নির্মাণ করা হয়। রাজধানী দেশের মধ্যবর্তী স্থলে অবস্থিত হওয়ায় শাসকদের দুর্বলতা সত্ত্বেও বহিরআক্রমণের হাত হইতে রক্ষা পায়।

টিকাঃ
১. ই. জি. গমেজ, হিস্টোরিয়া ডি ইস্পানা, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১৪২, ও টীকা-২৪।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 কর্ডোভার গোঁড়া খ্রীস্টানগণ

📄 কর্ডোভার গোঁড়া খ্রীস্টানগণ


টলেডো হইতে প্রত্যাবর্তনের পর আমীর কর্ডোভার গোঁড়া খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তাহাদের জমিজমা জন-সাধারণের মধ্যে বণ্টন করিয়া দেন এবং উত্তেজনার সূতিকাগৃহ তাহাদের তাবানিওসের গীর্জা ধূলিস্মাৎ করিয়া দেওয়া হয়। আরবীয় খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত গোঁড়া খ্রীস্টান আন্দোলন শুরু করিয়াছিল তাহাদের শাস্তি দেওয়া হয় সত্য কিন্তু কোমল হৃদয় দ্বিতীয় আবদুর রহমান তাহাদের সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করেন না। ফ্লোরার মৃত্যুদণ্ডের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাহাদের শত্রুতা আরও বৃদ্ধি পায়। কারাগার হইতে মুক্তিপ্রাপ্ত ইউলোজিয়াসকে তাহার সমর্থক গোঁড়া খ্রীস্টানগণ প্রধান ধর্মাধ্যক্ষ নির্বাচিত করে। এই সমস্ত খ্রীস্টানগণ ফ্রান্সের রাজা কেশহীন চার্লসের নিকট গোপন চিঠি পাঠায় এবং তাহাকে মুসলমানদিগকে বিতাড়িত করিবার উদ্দেশ্যেই স্পেন আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। খ্রীস্টানদের পুরাকীর্তির অবস্থান ও নকশা প্রস্তুত করিবার ভান করিয়া উসুয়ার্দ ও আদিলাদ নামে ফ্রান্সের দুইজন খ্রীস্টান সন্ন্যাসী ৮৫৮ খ্রীঃ কর্ডোভায় আসেন। কর্ডোভা হইতে প্রত্যাবর্তনের পর তাহারা ফ্রান্সের রাজার নিকট সেখানকার খ্রীস্টানদের অসন্তুষ্টির রিপোর্ট প্রদান করে। খ্রীস্টান গোঁড়া সম্প্রদায় রাজধানীর নাগরিকদের বিদ্রোহ করিবার জন্য উত্তেজিত করে। প্রথম মুহম্মদকে তাহাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করিতে হয়। ফলে তাহাদের শক্তি সম্পূর্ণরূপে খর্ব হয়। গোঁড়া ইউলোজিয়াস, আলভেরো ও লিওক্রিটিয়াকে (ইসলাম ধর্মত্যাগী অত্যুৎসাহী রমণী) ৮৫৯ খ্রীঃ ফাঁসী দেওয়া হয়।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 নাভারের ও গ্যালেসিয়ার যুদ্ধ

📄 নাভারের ও গ্যালেসিয়ার যুদ্ধ


ইতিমধ্যে ফ্রাঙ্কগণ যাহারা ৮৪৭ খ্রীস্টাব্দে দ্বিতীয় আবদুর রহমানের সহিত শান্তিচুক্তি করিয়াছিল তাহারা স্পেনের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের সুযোগ লইয়া যুদ্ধাভিযান শুরু করে এবং দেশের প্রভূত ক্ষতি সাধন করে। গ্যালেসিয়ান এবং নাভাররেগণ একই পথ অনুসরণ করিয়া এই সুযোগ গ্রহণ করে। মেরিদা এবং সারাগোসার গভর্নরদ্বয়কে মুহাম্মদ সৈন্য সংগ্রহ করিয়া সীমান্তের দিকে অগ্রসর হইতে নির্দেশ দেন। এই সময় হাম্বলী ও মালেকী দুই সুন্নী সম্প্রদায় স্পেনে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। মুহাম্মদ নিজে এই সংঘর্ষে হস্তক্ষেপ করেন এবং দুই বিরোধী সম্প্রদায়কে একত্রিত করিয়া খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করিতে সক্ষম হন। গ্যালেসিয়া, লিওন ও নাভাররের খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝেই অভিযান পরিচালিত হয়। গথিক মার্চ পুনর্বার যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। বাস্কদের বাসভূমি নাভাররে ৮৬১ খ্রীস্টাব্দে আক্রান্ত হয় এবং রাজধানী পাম্পলোনাসহ ইহার পার্শ্ববর্তী এলাকা পুনরায় মুসলমানদের দখলে আসে। খ্রীস্টানরা তাহাদের দুর্গে আত্মগোপন করে কিন্তু মুনজিরের প্রত্যাবর্তনের সাথে সাথে তাহারা পুনরায় বাহিরে আসে এবং উত্তর স্পেনের মুসলমানদের মধ্যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তাহারা বহু শহর লুণ্ঠন করিবার পর অগ্নি সংযোগ করে। লুসিতানিয়া ও লিওট্রা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমীরের নেতৃত্বে কর্ডোভার অশ্বারোহী সৈন্যদল গ্যালেসিয়া অভিমুখে অগ্রসর হয়। মেরিদাতে অবস্থানরত সেনাবাহিনী তাহার সহিত যোগদান করে। ৮৬৫ খ্রীস্টাব্দে লিওনের খ্রীস্টান শাসক বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করেন এবং তাহার সহিত এক শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন। পরবর্তী বৎসর প্রথম মুহাম্মদ ও কেশহীন চার্লসের মধ্যে অন্য একটি চুক্তি সম্পাদিত হয় এবং বিদ্রোহীদের কোন প্রকার সাহায্য করিবে না এই শর্তে তাহাকে ক্যাটালোনিয়া প্রত্যার্পণ করা হয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px