📄 ফ্রাঙ্কদের সহিত যুদ্ধ
হাকাম যখন তাঁহার চাচার বিরুদ্ধে যুদ্ধ অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেছিলেন সেই সময় দক্ষিণ-ফ্রান্স হইতে মুসলমানদের উচ্ছেদের সংবাদ আসে । নারবোনের ও গেরোনার মুসলমানগণ চার্লমানের পুত্র লুইস কর্তৃক বিতাড়িত হয় । লুইস তাঁহার ভ্রাতা চার্লসকে সঙ্গে লইয়া এবরো নদীর তীরে অগ্রসর হন । আমীর ভীষণ বিপদের সম্মুখীন হন । তিনি কয়েকজন অভিজ্ঞ সেনাপতিকে বিশেষ করিয়া আবদুল করিম বিন মুগিছের নেতৃত্বে ৭৯৭ খ্রীস্টাব্দে বিরাট এক সেনাবাহিনীকে সীমান্তে প্রেরণ করেন । এই অভিযানে অভাবিত সাফল্য লাভ হয় । অতি অল্প সময়ের মধ্যে স্পেন ফ্রান্সের সীমান্তে অবস্থিত গেরোনা, হুয়েস্কা এবং লেরিদার মত হৃত শহরগুলিকে পুনরুদ্ধার করেন । পর্বতমালা অতিক্রম করিয়া আমীর সাময়িকভাবে দক্ষিণ-ফ্রান্স পুনরায় অধিকার করেন । এই বিজয়ের পর তাঁহাকে আল মুজাফফর নামে অভিহিত করা হয় ।
📄 গথিক সীমান্তে সেনানিবাসের ভিত্তি স্থাপন
দেশের সীমান্তের আপার মার্চ প্রতিরক্ষার জন্য সারাগোসা, মধ্য মার্চের জন্য টলেডো এবং নিম্ন মার্চের জন্য মেরিদাকে কেন্দ্র করিয়া উমাইয়া প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়িয়া ওঠে । ৫ ফ্রাঙ্ক সম্রাট শার্লমান মুসলমানদেরকে উত্যক্ত ও বিরক্ত করার জন্য এবং ফ্রান্সকে আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করিবার উদ্দেশ্যে গথিক মার্চ নামে একটি সীমান্ত রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে । গথিক মার্চে সেনানিবাস প্রতিষ্ঠিত হয় ৭৯৮ খ্রীস্টাব্দে । ১৮৫ হিঃ/৮০১ খ্রীস্টাব্দে ফ্রাঙ্কগণ বার্সিলোনা দখলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । বার্সিলোনাতে অবস্থিত সেনাদল অবরোধকারীদের প্রতিহত করিবার জন্য এক দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করে । কিন্তু খাদ্যের অভাবে তাহারা আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য হয় । গভর্নর জাইদ ৬ সাহায্যের আশায় কর্ডোভা গমন করেন । ৮৩৯ খ্রীস্টাব্দে রাজা লুইস মেদিনাসেলী আক্রমণ করেন কিন্তু প্রচুর ক্ষতিসহ পশ্চাদপসারণ করিতে বাধ্য হন । ৮ খ্রীস্টানগণ পুনরায় স্পেনে আক্রমণ করিয়া লুসিতানিয়া অধিকার করিয়া নেয় । আমীর নিজে ১৯৭ হিঃ/ ৮১২ খ্রীস্টাব্দে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন । শেষ পর্যন্ত ২০০হিঃ ৮১৬ খ্রীষ্টাব্দে কর্ডোভা ও আইক্স-লা-চ্যাপেল্লের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয় এবং ফ্রাঙ্কগণ গোলযোগ সৃষ্টি হইতে বিরত থাকে ফলে ইহা হাকামের শাসনের শেষ সাত বছর অবধি স্থায়ী হয় । ৯
টিকাঃ
৫। চার্লসের মৃত্যুর পর ৮০০ খ্রীঃ শার্লমান তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হন। পরবর্তী বছর তিনি জনৈক আব্বাসীয় দূতকে বহু মূল্যবান উপঢৌকন দ্বারা তাঁহার রাজপ্রাসাদ আইকস্-লা-চাপেল্লিতে অভ্যর্থনা জানান।
৬। এইচ. কে. শেরওয়ানী, লিখিত জায়তুন নহে (মুসলিম কলোনিস, পৃঃ ১০১।)
৭। আমরুস খ্রীস্টান মাতার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। এইচ. কে. শেরওয়ানী, মুসলিম কলোনিস্ পৃঃ ১০৫।
৮। ইবনুল আছির, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ১০৮-১০৯।
৯। ই. জি. গোমেজ, হিস্টোরিয়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১০৪; ডজি বলেন যে, আমরুস হিঃ ১৯১/৮০৭ খ্রীঃ গভর্নর নিযুক্ত হন, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২৪৬; রিয়াসত আলী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৬২।
📄 খন্দক বা পরিখা দিবস
ভিজিগথ সাম্রাজ্যের প্রাচীন রাজধানী টলেডো মুসলিম স্পেনের এক গুরুত্বপূর্ণ নগর ছিল । আমরুস বিন ইউসুফ—যিনি তালাভেরার ১০ শাসনকর্তা ছিলেন, শান্তি স্থাপনের জন্য সেখানে প্রেরিত হন । টলেডোবাসীদের সম্মতিক্রমে শহরের উত্তর-পূর্বে তাগুস নদীর উপর অবস্থিত পুলের সন্নিকটে সংরক্ষিত সেনাবাহিনী রাখিবার উদ্দেশ্যে তিনি একটি দুর্গ নির্মাণ করেন । যখন ভবিষ্যৎ শাসক যুবরাজ আবদুর রহমান খ্রীস্টান-স্পেনে যাইবার পথে ১৮১ হিঃ/৭৯৭ খ্রীস্টাব্দে নগর পরিদর্শনের জন্য আগমন করেন ১১ সেই সময় উক্ত দুর্গে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরকে অনুষ্ঠানে যোগ দানের জন্য আমন্ত্রণ জানান হয় । অনুষ্ঠানে যোগদানের পর গভর্নর তাহাদিগকে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া হত্যা করে এবং সমস্ত মৃতদেহকে একটি পরিখা বা দিঘীতে (Fosse) নিক্ষেপ করে । ইতিহাসে এই ঘটনা পরিখা দিবস "The Day of the Ditch" নামে খ্যাত । সঠিক মৃতের সংখ্যা জানা যায় না । এই সংখ্যা ৭০০ হইতে ৫,০০০ হাজার পর্যন্ত বলিয়া অনুমান করা হয় । ১২ টলেডোবাসীরা এইরূপে তাহাদের নেতাদিগকে হারায় । ১৩
টিকাঃ
১০। রাফায়েল, আলতামিরা, দ্যা ওয়েস্টার্ন খেলাফত, কেমব্রীজ মেডিয়াভ্যাল হিস্ট্রি, ৩য় খণ্ড, ১৯২২, পৃঃ ৪১৫।
১১। ইবনুল আছির, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৩৫-৩৭; ইবনুল কুতাইবা, পৃঃ ৪৫-৪৯; রিয়াসত আলী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৬২-৬৭ এবং ই. জি. গমেজ, হিস্টোরিয়া ডি ইস্পানা, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১০৩-১০৪।
১২। ইবনুল খাতিব, দ্যা খেলাফত-ই-মুয়াহিদীন, পৃঃ ১৬ দেখুন।
১৩। জে. রিবেরা (ইবনুল কুতিয়া) হিস্টোরিয়া ডি-ল্যা কনকুইজটা ডি ইস্পানা, মাদ্রিদ, ১৯২৬, মূল পৃঃ ৫৫-৫৭ (অনুবাদ পৃঃ ৪৪৪-৪৬)।
📄 বেজা (বাজাটল) ও মেরি যাতে বিদ্রোহ
আসবাগ বিন আবদুল্লাহ ছিলেন হাকামের চাচাত ভাই এবং ভগ্নিপতি । তিনি ছিলেন মেরিদার গভর্নর । আমীর এবং গভর্নরের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হইয়াছিল । আসবাগ একজন উজিরকে বরখাস্ত করেন । আমীর হাকাম তাহাকে বরখাস্তের আদেশ প্রদান করেন । ইহাতে আসবাগ বিদ্রোহী হইয়া ওঠে । ৮০৬ খ্রীস্টাব্দে আমীর নিজে মেরিদা রওয়ানা হন । আসবাগের স্ত্রী যিনি আমীরেরও ভগ্নি তিনি তাঁহার স্বামীর পক্ষ হইতে ক্ষমা প্রার্থনা করেন । আমীর তাহাকে ক্ষমা করিয়া পূর্বপদে পুনর্বহাল করেন । লিসবনের ৯৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত বাজ্জাতে ৮০৭ ও ৮১৭ খ্রীস্টাব্দে হাজম বিন ওয়াহাব ও ওয়ালিদ একাধিকবার বেজায় বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং পরাজিত হইয়া শাস্তি ভোগ করে । ১৪ ৮০৭ খ্রীস্টাব্দে আলজেসিরায় খারিজী বিদ্রোহকেও দমন করা হয় ।
টিকাঃ
১৪। এ. এ. ভেসিলেভ, বাইজেন্স ইটলাস আরবস, ১ম খণ্ড, ১৯৩৫, পৃঃ ৪৯-৫৫।