📄 চরিত্র ও কৃতিত্ব
প্রথম আবদুর রহমান স্পেনে উমাইয়া সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন । কিন্তু ইহাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করিবার দায়িত্ব অর্পিত হয় তাহার উত্তরাধিকারদের ওপর । হিশামের শাসনকাল যদিও বিরাট কোন সামরিক অভিযান অথবা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক উন্নতি সাধনের জন্য উল্লেখযোগ্য ছিল না, তথাপিও তিনি এই নতুন প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রকে বিপদের হাত হইতে রক্ষা করিতে সমর্থ হন । তিনি প্রথম বারমুডো ও দ্বিতীয় আলফন্সোর নেতৃত্বে আস্তুরিয়াদের প্রচণ্ড আক্রমণকে প্রতিরোধ ও প্রতিহত করেন । তিনি দক্ষিণ ফ্রান্সে অভিযান প্রেরণ করেন এবং তাঁহাকে গতিচ্যুত করার জন্য সচেষ্ট বিদ্রোহী নেতাদের প্রচেষ্টাকে তিনি বার বার ব্যর্থ করিয়া দেন । বিদ্রোহীরা সংখ্যায় ছিল অধিক । ফলে তাহাকে এই সমস্ত বিদ্রোহীদের দমন করিবার কাজে অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকিতে হয় । তিনি তাহার তিন পুত্র উমায়াদ আল মালিক, মুয়াবিয়া এবং হাকামের সহযোগিতায় এই সমস্ত বিদ্রোহীদের দমন করিতে সমর্থ হন । আবদুল মালিক এবং আবদুল করিম নামে আবদুল ওয়াহিদ মুগিছের দুই প্রৌ-পুত্র এই বিদ্রোহ দমনে তাহাকে সাহায্য করেন । তিনি তাহার শাসনের শেষ দিকে যে শান্তিপূর্ণ স্বল্প সময় পান তাহা রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্র এবং সামাজিক জীবনের উন্নয়ন ও কল্যাণ সাধনে নিয়োজিত করেন । তিনি তাহার পিতার উজির ও প্রশাসনিক কর্মচারীদের নিজ নিজ পদে বহাল রাখেন কিন্তু দেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে অপ্রয়োজনীয় আইন পরিবর্তন করেন । মাক্কারী বলেন, "দুর্নীতি পরায়ণ ও অসৎ কর্মচারীদের তিনি বরখাস্ত করেন এবং কখনও তাহাদিগকে পুনর্নিয়োগ করেন নাই ।" ৪ তিনি বেআইনী কর আদায় নিষিদ্ধ করেন এবং যাকাত ও ছাদকা আদায়ের আদেশ দেন । সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের তিনি বিচারক নিযুক্ত করেন । কর্ডোভার প্রধান বিচারপতি মুসাব বিন ইমরান তাহার বিচার বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা এবং হিশামের সেক্রেটারী মুহাম্মদ বিন বশির আল মাদিরী তাহার ধর্মপরায়ণতা, অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গভীর জ্ঞানের জন্য সুপরিচিত ছিলেন । হিশামের অনুসৃত নীতির ফলে দেশের ব্যবসা বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নতি সাধিত হয় । আমীর রাজপথ নির্মাণ এবং গোয়াদালকুইভির নদীর উপর ব্রীজ নির্মাণ করেন । তিনি একটি সুন্দর ঝর্ণা প্রস্তুত করেন যাহা রাজধানীর শ্রীবৃদ্ধি করে । হিশাম নতুন নতুন প্রাসাদ নির্মাণ ও পুরাতন সরকারী অট্টালিকাসমূহের মেরামতে বিশেষভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন । কর্ডোভার জামে মসজিদ নির্মাণের কার্য সমাপ্ত করেন—যাহা তাহার পিতা নির্মাণ করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন । ইহা দৈর্ঘ্যে ছিল ৬০০ ফুট এবং প্রস্থে ছিল ২৫০ ফুট । ইহা তৈয়ার করিতে ব্যয় হইয়াছিল এক লক্ষ ৬০ হাজার দিনার । এই মসজিদ তৈয়ারীর এগার শত বৎসর পরেও ইহার সৌন্দর্য ও আকর্ষণ এতটুকুও ক্ষুণ্ণ হয় নাই । ইহা ব্যতীত তিনি আরও অনেক মসজিদ নির্মাণ করেন । ৫ দামেস্কের ওমর বিন আবদুল আজিজের ন্যায় তিনিও তাহার সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে গুপ্তচর প্রেরণ করিয়া তাহার প্রজাদের অবস্থা এবং সরকারী কর্মচারী ও গভর্নরদের যোগ্যতা সম্বন্ধে নির্ভরযোগ্য খবর সংগ্রহ করিতেন এবং নিশ্চিত হইতেন । জনসাধারণের অবস্থা অবগত হইবার জন্য তিনি নিজে রাত্রিতে ছদ্ম বেশে কর্ডোভার রাজপথে ভ্রমণে বাহির হইতেন । আমীরের অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হইয়া মুসায়াব প্রধান বিচারকের পদ গ্রহণ করিতে সম্মত হন । তিনি ছিলেন আরবী কবিতার ভক্ত এবং নিজে ছিলেন একজন কবি । তাহার দরবারের বিখ্যাত কবি ছিলেন আমর ইবনে আলী গাফফার । পণ্ডিত ব্যক্তিদের মধ্যে যাহাদের তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করিতেন তাহারা হইলেন ইসা বিন দিনার, আবদুল মালিক বিন হাবিব, ইয়াহিয়া বিন ইয়াহিয়া, সাইদ বিন হাসান এবং ইবনে আবু হিন্দ । ৬ হিশাম তাহার পিতার ন্যায় নিজেকে আমীর বলিয়া দাবী করিতেন । যতদূর জানা যায় তিনি মুদ্রা ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন সাধন করেন নাই । তিনি ছিলেন নিয়মানুবর্তী ও সুন্দর স্বভাবের অধিকারী । হিশাম ছিলেন একজন ধার্মিক বাদশাহ । রাজপরিবারের সাদা পোষাক তিনি পরিধান করিতেন । আইনবিদদের নিকট তিনি ছিলেন খুবই জনপ্রিয় । তিনি ছিলেন ন্যায়বান ও দয়ালু । দরিদ্রদের জন্য তাহার দ্বার ছিল অবারিত । ৭ তাহার চরিত্র ও ব্যবহারকে ওমর বিন আবদুল আজিজের সহিত যথার্থই তুলনা করা যায় । জাইয়াদ বিন আবদুর রহমান লাখমীর নিকট তাহার ধর্মানুরাগের কথা শুনিয়া ইমাম মালিক বিন আনাস ৮ এতই মুগ্ধ হন যে তিনি হিশামের সহিত হজ্জব্রত পালনের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন । ৯
টিকাঃ
৪। নাফলুল-তিব, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৫৮; মাজমুয়া আখবার, আন্দালুস, পৃঃ ১২১।
৫। ঐ, পৃঃ ১৫৮; রিয়াসত আলী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৫৩।
৬। রিয়াসত আলী, দ্যা তারিখ-ই-আন্দালুস, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৫৩।
৭। মাজমুয়া, পৃঃ ১২০-১২১।
৮। ইবনুল আছির, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১০২; নাফলুল-তিব, পৃঃ ১৫৮।
৯। আল-আন্দালুস, পৃঃ ৪৩; নাফলুল তিব, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৫৪।