📄 শার্লমান ও আরব নেতাদের মৈত্রী
৭৫৯ খ্রীস্টাব্দে নারবোনের পতনের এক বৎসর পর বার্সিলানোর গভর্নর সুলায়মান নিজেকে কর্ডোভার সার্বভৌম শাসক বলিয়া ঘোষণা করিবার জন্য পেপিনের সাহায্য কামনা করেন । প্রথম আবদুর রহমানকে তাহার শাসন আমলের শেষাংশে পূর্ব স্পেনের আরব নেতা আবুল আসওয়াদ ও আবদুর রহমান বিন হাবিব এবং বার্সিলানোর কালবী সম্প্রদায়ভুক্ত গভর্নরের ঐক্যবদ্ধ শক্তির মোকাবিলা করিতে হয় । তাহারা স্পেন হইতে আবদুর রহমানকে বিতাড়িত করিতে চাহিয়াছিল । জোটভুক্ত তিন মিত্র ফ্রান্সের রাজা শার্লমানকে স্পেন আক্রমণের জন্য আহবান জানান । পরিকল্পনা মাফিক শার্লমান যাত্রা শুরু করেন । ১৬১ হিঃ/৭৭৭ খ্রীস্টাব্দে শার্লমান পীরেনীজ পর্বত অতিক্রম করিয়া স্পেনে পৌঁছে । অভ্যন্তরীণ মতভেদের দরুন মৈত্রীবন্ধন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় । ১৬২ হিঃ/ ৭৭৮ খ্রীঃ সারাগোসায় শার্লমান হুসায়েন বিন ইয়াহিয়া আল আনসারীর হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন । ৩১ কোন প্রকার সাফল্য ব্যতীতই শার্লমানকে স্পেন হইতে ফ্রান্সে ফিরিয়া যাইতে হয় । শার্লমান-সেনাবাহিনী যে সময় পীরেনীজ পর্বতশ্রেণী অতিক্রম করিতেছিলেন, সেই সময় বাস্কুয়াস সেনাবাহিনীর পশ্চাদভাগ আক্রমণ করিয়া সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস সাধন করে । ৩২ আবদুর রহমান কর্তৃক সারাগোসা অবরুদ্ধ হয় । অবশেষে ১৬৪/৭৮০ খ্রীস্টাব্দে রাজকীয় বাহিনী সারাগোসার দুর্গ অধিকার করে । ৩৩ ইহার পর আবদুর রহমান দৃষ্টি নিবন্ধ করেন আসওয়াদের প্রতি । রাজকীয় বাহিনী বিদ্রোহীদের আক্রমণ করে । শেষ পর্যন্ত আবুল আসওয়াদ ৭৭৮ খ্রীস্টাব্দে গোয়াদালিমার নদীর তীরে পরাজিত হয় ও তাহার ৪,০০০ হাজার সৈন্য নিহত হয় । ৩৪
টিকাঃ
৩১। নাফলুল-তিব, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৭২
৩২। ঐ, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৭২।
৩৩। শাকিয়া আব্দুল্লাহ বিন মুহম্মদ, ডজি, পৃঃ ২০২ দেখুন।
৩৪। ইবনুল আছির, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৪৬৩-৬৪; আল মাক্কারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৭৩।
📄 চরিত্র ও কৃতিত্ব
প্রথম আবদুর রহমান ৫৯ বৎসর বয়সে ১৭৩ হিঃ/ ৭৮৮ খ্রীঃ রবিউল আওয়াল মাসে পরলোক গমন করেন । তিনি তাহার ৩২ বৎসরের শাসন আমলে বার্বার ইয়ামানী ও ফিহরীদের বৈরিতার মোকাবিলা করিয়াছেন । যে বিশেষ পন্থায় আবদুর রহমান রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং জনগণের হৃদয় জয় করিয়া নিজের পক্ষে আনয়ন করেন তাহা সকলের প্রশংসা পাইবার যোগ্য । তিনি ছিলেন জ্ঞানী, বিচক্ষণ ও কৃতবিদ্য এবং সংস্কৃতিমনা শাসক । ৩৫ তাহার সেনাপতিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বদর, তাম্মাম বিন আল কামাহ, হাবিব বিন আবদুল মালিক আল কারশী এবং আছিম বিন মুসলিম ছাকাফী । অনেক সময় আমীর নিজেই সৈন্য পরিচালনা করিতেন । ৭৭৩ খ্রীস্টাব্দে তিনি খলিফা মনসুরের নামে খুতবা পাঠ বন্ধ করেন এবং নিজে 'আমীরুল মুসলিমীন' খেতাব ধারণ করেন । ৩৬
আমীর তাহার রাজ্যকে ছয়টি প্রদেশে বিভক্ত করেন । তাহার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাম্মাম বিন আলকামাহ । ৩৭ উমাইয়া বিন জাইয়াদ ছিলেন তাঁহার প্রাসাদের সচিব । ৩৮ প্রধান বিচারপতি পদে ইয়াজিদ আল ইয়াকুবি বহাল ছিলেন । ৩৯ তাহার পরে শায়েক মাসার বিন ইমরান উক্ত পদে অধিষ্ঠিত হন । ৪০ সচিবালয় অবস্থিত ছিল বাবুল সুদ্দার নিকট আল কাইজারে । ৪১ আমীর প্রায়ই তাহার প্রজাদের অভাব অভিযোগ ও কর্মচারীদের আচরণ সম্বন্ধে খবর সংগ্রহের জন্যে ভ্রমণে বাহির হইতেন । প্রথম আবদুর রহমান তাহার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কৃত্রিম জল প্রণালী নির্মাণ করান কর্ডোভা নগরে । ৪২ তিনি সিরিয়া ইরাক মিশর ও প্রাচ্যের অন্যান্য দেশ হইতে সব রকমের ফল ও ফুলের বীজ সংগ্রহের জন্য লোক প্রেরণ করেন । ৪৩ দামেস্ক হইতে প্রচারিত মুদ্রার ন্যায় মুদ্রা তৈয়ার করিবার জন্য কর্ডোভাতে তিনি একটি টাকশাল নির্মাণ করেন । ৪৪ তিনি মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম ও সৌন্দর্যে অদ্বিতীয় কর্ডোভার জামে মসজিদ তৈয়ার করিতে ব্যয় করেন ৮০,০০০ হাজার দিনার । ১৭০ হিজরীতে ৭৫০ খ্রীস্টাব্দে ১২ মাসে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয় । মসজিদের পার্শ্বে একটি মাদ্রাসা নির্মিত হয় যাহা পরবর্তীকালে কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয় । আমীর নিজে একজন সুসাহিত্যিক ছিলেন । তাঁহার প্রভাবে ও আগ্রহে সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রেও নব তৎপরতা ও উদ্যোম দেখা দেয় । হিশাম বিন আব্দুল্লাহ ও তাহার ভ্রাতাগণ তাঁহার দরবারের বিখ্যাত সুধী ছিলেন ।
টিকাঃ
৩৫। ইবনুল কুতাইবা, পৃঃ ৩৪, ৩৫, ৩৬।
৩৬। ইবনুল খাতিব, খেলাফত-ই-মুয়াহিদীন, পৃঃ ১৩-১৪ দেখুন।
৩৭। মেনেন্দেজ পিদাল, হিস্টোরিয়া ডি ইস্পানা, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৫৬৯-৫৭০।
৩৮। গায়ানগোস, ১ম খণ্ড পৃঃ ৮৬।
৩৯। ইবনুল আছির, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৭৯; ইবনে খালদুন, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৪২১।
৪০। গায়ানগোস, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৮৬।
৪১। নাফলুল-তিব, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২১৭-২১৮, রিবেরা আলজুকসানী মূল পৃঃ ৩৩, অনুবাদ পৃঃ ৪১।
৪২। আমীরাত শাসনামলের কোন মুদ্রা আমাদের হস্তগত হয় নাই।
৪৩। ইবনুল আছির, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৭৬; নাফলুল তিব ২য় খণ্ড, পৃঃ ৬৯।
৪৪। ঐ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৭৭, ঐ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৬৯, ৭৬।