📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 ইউসুফ ও সুমায়েলের বিদ্রোহ

📄 ইউসুফ ও সুমায়েলের বিদ্রোহ


আবদুর রহমানের সম্মুখে বিরাট সমস্যা ছিল, খ্রীস্টান সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর বিদ্রোহ ও বিপ্লবের প্রয়াস । দেশকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত করার আরব অভিজাত সম্প্রদায়ের পরিকল্পনা এবং অত্যাচারে জর্জরিত জনসাধারণের গভীর আর্তনাদ তাঁহাকে আরো বিপর্যস্ত করিয়া তোলে । আবদুর রহমানের অবস্থা তখন পর্যন্ত নিরাপদ ছিল না । ইউসুফ জায়েনে সুমায়েলের সহিত মিলিত হইয়া ও তাহার বিক্ষিপ্ত সেনাদল সংগ্রহ করিয়া এলভিরার পার্শ্ববর্তী এলাকায় গোলযোগ সৃষ্টি করিতে আরম্ভ করে । আবদুর রহমান তাহার প্রধান সমর্থক আবু ওসমানকে কর্ডোভার গভর্নর নিযুক্ত করেন । ইহার পর তিনি শত্রুদমনে অগ্রসর হন । ইউসুফ ইতিমধ্যে কর্ডোভা দখল করিয়া লইয়াছিল । আবু ওসমান প্রধান মসজিদের চূড়ায় আত্মগোপন করেন । আবদুর রহমানের অগ্রাভিযানের মুখে ইউসুফ ও সুমায়েল তাহাদের বাধা দান ব্যর্থ হইবে ভাবিয়া আত্মসমর্পণ করেন । ইহা সফর ১৩৯ হিঃ/৭৫৬ খ্রীঃ জুলাই মাসে ঘটে । আবু জাইদ আবদুর রহমান ও আবুল আসওয়াদ মুহাম্মদ জামিন হিসাবে থাকে এবং তাহাদের পিতা ইউসুফ ও সুমায়েল নির্বিঘ্নে তাহাদের সম্পত্তি ভোগ দখলে রাখেন । ১৬ আবদুর রহমান এবং ইউসুফের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি দুই বৎসরের অধিক কাল স্থায়ী হয় না । প্রাচ্য হইতে আগত আবদুল মালিক বিন ওমর বিন মারওয়ান ও খাইরী বিন আবদুল আজিজ বিন মারওয়ানের মত নিজ বংশীয় লোকদের মধ্যে আমীর ভূমি বণ্টন করেন । আবদুর রহমান এবং ইউসুফের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয় । ইউসুফ মেরিদাতে পলাইয়া যান । সেখানে (২০,০০০) বিশ হাজার লোক তাঁহার সহিত যোগদান করে । ১৭ সুমায়েল এবং ইউসুফের দুই পুত্র কারারুদ্ধ হয় । ১৮ কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয় । শেষ যুদ্ধ হয় ১৪১ হিঃ/৭৫৮ খ্রীস্টাব্দে লুকসা যুদ্ধক্ষেত্রে । ১৯ ইউসুফ সেভিলের গভর্নর আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের নিকট পরাজয় বরণ করেন । তাহার বহু সমর্থক নিহত হয় এবং সে মারাত্মক ভাবে জখম হইয়া আত্মরক্ষা করিতে সমর্থ হয় । পরের বৎসর রজব মাসে তাহার পুরাতন শত্রু আবদুল্লাহ বিন আমর আল আনসারীর হাতে তিনি টলেডোর নিকট এক গ্রামে নিহত হন । সুমায়েল কারারুদ্ধ হন এবং পরে বিষ প্রয়োগের কারণে মারা যান । আবু জাইদ নিহত হন এবং আবুল আসওয়াদ বহু বৎসর কারাবাসের পর অন্ধ মানুষের ছদ্মবেশে কারাগার হইতে পলাইয়া যান ।

নারবোনে অবরুদ্ধ সেনাবাহিনীকে সাহায্যের জন্য সুলাইমানের সেনাপতিত্বে রাজকীয় সেনাবাহিনীর একদল সৈন্য প্রেরিত হয় । কিন্তু ৭৫৯ খ্রীঃ গিরিসংকটে পতিত হইয়া সেনাদল বিভক্ত হইয়া যায় । ২০ খ্রীস্টানগণ পেপিনের সেনাবাহিনীর আগমনের জন্য নারবোনে শহরের প্রবেশ পথ উন্মুক্ত করিয়া দেন । নগরের পতন ঘটে এবং মুসলমানরা বিতাড়িত হয় ।

টিকাঃ
১৬। ইবনুল আছির, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৮১; নাফলুল-তিব, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৬৬।
১৭। ইবনুল আছির, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৮১, রিয়াসত আলী কর্তৃক উল্লেখিত, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২৬০।
১৮। এইচ. কে. শেরওয়ানী, মুসলিম কলোনিস, পৃঃ ৮১-৮২ দেখুন।
১৯। ইবনুল আছির, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৯০।
২০। রিয়াসত আলী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২৮৮; ই. জি. গমেজ, ইস্পানা মুসলমানস (হিস্টোরটা ডি ইস্পানা) ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৬৯।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 দক্ষিণাংশে ইয়ামানীদের বিদ্রোহ

📄 দক্ষিণাংশে ইয়ামানীদের বিদ্রোহ


ইউসুফ পরাজিত ও নিহত হওয়ার পরেও আবদুর রহমানের বিপদ বিদূরিত না হওয়ায় তাহাকে অন্যান্য বিদ্রোহী নেতাদের মোকাবিলা করিতে হয় । ইয়ামানী ও বার্বারগণ তাহার পুরুষানুক্রমিক শাসনকে পছন্দ করিতেছিল না । ফলে একাধিক বিদ্রোহ দেখা দেয় । আবদুর রহমান তাহার ক্ষমতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার পর কর্ডোভার আশেপাশে বিদ্রোহকে দমন করিবার জন্য অগ্রসর হন । ৭৬০ খ্রীস্টাব্দে আরজাক বিন নোমান গাসসানী আলজিরিয়াতে বিদ্রোহ ঘোষণা করিয়া মদীনা সিদোনীয়া এবং সেভিল দখল করেন । ২১

ইয়ামানী নেতা আবুল সাববাহ সেভিলের গভর্নর, মুসারাহর যুদ্ধের পর আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল । আবুল সাববাহ ৭৬৬ খ্রীষ্টাব্দে ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হন । ইহাতে অন্যান্য ইয়ামানী নেতাগণ বিরূপ হইয়া ওঠেন । আবুল সাববাহর ক্ষুব্ধ আত্মীয়-স্বজন যেমন আবদুল গাফফার বিন হামিদ, আমির বিন তালুত, আবু কুলসুম বিন ইয়াসুব এবং হায়াত বিন মুলামিস ২২ বিদ্রোহী হইয়া ওঠেন এবং বহু মুজারীকে নিহত করেন । আমীর আবদুর রহমান দ্রুত উত্তর সীমান্ত হইতে কর্ডোভাতে ফিরিয়া আসেন এবং দক্ষিণাংশে বিদ্রোহ দমনের জন্য অগ্রসর হন । কর্ডোভা প্রদেশে বেমবেজার নামে পরিচিত মাইসার নদীর তীরে ৭৭৪ খ্রীষ্টাব্দে ইয়ামানীদের সহিত তিনি যুদ্ধে লিপ্ত হন । আমীরের বার্বার অনুচরদের দ্বারা প্ররোচিত হইয়া বহু সংখ্যক বার্বার যাহারা বিদ্রোহে যোগদান করিয়াছিল দলত্যাগ করে । ইয়ামানীরা পরাজিত হয়, তাহাদের ২০,০০০ হাজার সৈন্য নিহত হয় এবং তাহাদের ক্ষমতা বিলুপ্ত হয় । নিয়েবলার ইয়ামানী বিদ্রোহী নেতা মাতারী পরাজিত ও নিহত হন ।

টিকাঃ
২১। ঐ, পৃঃ ২৭৩; ঐ, পৃঃ ৭১-৭২।
২২। মাজমুয়া আখবার, আন্দালুস, পৃঃ ১০১।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 টলেডোতে বিদ্রোহ

📄 টলেডোতে বিদ্রোহ


টলেডোর প্রাক্তন গভর্নর হিশাম বিন উরওয়াহ ২৩ ৭৬১ খ্রীস্টাব্দে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন । শহর অবরুদ্ধ হইলে বিদ্রোহী নেতা আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য হন এবং তাহার পুত্রকে জামিন হিসাবে প্রেরণ করেন । কিন্তু তিনি পুনরায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং আমীরকে অবরোধ প্রত্যাহারে বাধ্য করেন । ২৪ শহরে প্রত্যাবর্তন করিয়া আমীর হিশামের পুত্র যিনি জামিন ছিলেন তাহাকে হত্যা করেন । ২৫ চারি বৎসর পর ৭৬৪ খ্রীস্টাব্দে টলেডো আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় । বদর বিদ্রোহী নেতাকে কর্ডোভাতে আনিয়া ফাঁসি দেন । তামামা বিন আলকামা টলেডোর গভর্নর নিযুক্ত হন ।

টিকাঃ
২৩। ঐ, পৃঃ ১০১, ১০৪।
২৪। ইবনুল কুতাইবার মতে, আলা আল-মুগীত বেজার প্রধান ছিলেন। এবং আব্বাসীয়দের সমর্থনে ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন।
২৫। ইবনুল আছির, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৪৪০; ইবনে খালদুন, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৪২৩; আল-মাক্কারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৬৭।

📘 মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস 📄 স্পেনে আব্বাসীয় পতাকা

📄 স্পেনে আব্বাসীয় পতাকা


প্রথম আবদুর রহমান আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুরের নামে খুতবা পাঠ করিতেন । পরবর্তীকালে আবদুল মালেক বিন ওমর বিন মারওয়ান পরামর্শে আব্বাসীয় খলিফাদের নামপাঠ স্থগিত করেন । যদিও তিনি নিজেকে তখন পর্যন্ত খলিফা না বলিয়া আমীর বলিতেন । আব্বাসীয় খলিফা মনসুর কায়রোওয়ানের ওয়ালী আলা বিন মুগিস ইয়াহসুবীকে আন্দালুসীয়া আক্রমণের আদেশ প্রদান করেন । আলা বিন মুগিস ১৪৬ হিঃ/৭৬৩ খ্রীস্টাব্দে বেজা প্রদেশে আগমন করেন এবং ইয়ামানীদের সাহায্যে আব্বাসীয় কাল পতাকা উত্তোলন করেন । ২৬ তাহার সহিত বেজায় বসবাসকারী বহু মিশরীয় এবং ওয়াসীত বিন মুগিস ও উমাইয়া বিন কুতনের ন্যায় বহু নেতা যোগদান করেন । আলা তাহার পর সেভিলের দিকে অগ্রসর হন এবং সেখানে ইয়ামানীদের সমর্থন লাভ করেন । আমীর সেভিলের দিকে অগ্রসর হন আলাকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে । আলা সঙ্কটজনক অবস্থা দেখিয়া কারমোনার দিকে পশ্চাদপসারণ করেন । বদর সিকোনীয়ার গিয়াস বিন আল কামাহকে আব্বাসীয় প্রতিনিধির সহিত যোগদানে বাধা দান করিয়া দ্রুত কারমোনার দিকে অগ্রসর হন এবং সেখানে আমীর বদরের সহিত যোগ দান করেন । আলা কারমোনা অবরোধ করেন । শহরটি সুরক্ষিত হওয়ায় অধিকার করা সহজ ছিল না । অবরোধ দুই মাস স্থায়ী হয় । ২৭ আমীর ওবায়দুল্লাহর সহিত যোগ দেন । আকস্মিক এক রাত্রে আমীর আক্রমণ করে । ফলে ভীষণ যুদ্ধ হয় । যুদ্ধে প্রথম আবদুর রহমানের সেনাবাহিনী আলার অশ্বারোহী সৈন্য দলকে ছত্রভঙ্গ করিয়া দেয় । আলা তাহার ৭,০০০ হাজার বার্বার সমর্থকসহ নিহত হন । ২৮ এই বিদ্রোহকে দমন করিয়া আলার ছিন্ন মস্তক ও আব্বাসীয় খলিফার নিকট হইতে প্রাপ্ত অভিষেক পত্র জনৈক বণিকের মাধ্যমে আব্বাসীয় খলিফার নিকট মক্কায় প্রেরণ করেন । খলিফা তাহাকে সাকর কুরাইশ বলিয়া অভিহিত করেন ।

টিকাঃ
২৬। ইবনুল আছির, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৭; স্টোরি অব দ্যা মেডিরাজ (স্পেন) ৩৬ খণ্ড, পৃঃ ৩২।
২৭। ইবনুল আছির, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৪২, ৪৩, ৪৫; মাজমুয়া, পৃঃ ১১৩-১৬।
২৮। ইবনুল আছির, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৮২; ইবনে খালদুন, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১১৩; নাফলুল-তিব, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৫৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px